Blog Archives

দিনপঞ্জি : মে ২০১৯

Posted on by 0 comment

PddM০১ মে
* প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা আসলেই সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল চেয়েছিলাম। গত নির্বাচনে বিএনপির পরিণতির জন্য তারাই দায়ী। তারা ৩০০ আসনে ৬০০-র বেশি দলীয় প্রার্থী বানিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে। লন্ডন সময় এদিন রাতে সেন্ট্রাল লন্ডনের তাজ হোটেলে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। দলের নেতাদের মুজিববর্ষ পালনে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রবাসী বাংলাদেশি প্রজন্মের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও আদর্শ পৌঁছে দিতেও প্রবাসী নেতাদের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুকের নেতৃত্বে এ-সময় যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের শুভেচ্ছা জানান।

০৫ মে
* তথ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি বলেছেন, বিএনপির জঙ্গি তোষণ ও জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতাই দেশে জঙ্গিবাদ নির্মূলে সবচেয়ে বড় বাধা। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। হাছান মাহমুদ বলেন, ভারতে জঙ্গি হামলা হলে সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল সেটিকে জাতীয় দুর্যোগ মনে করে তা মোকাবেলার জন্য সরকারের পাশে দাঁড়ায়। আর আমাদের দেশে আমরা দেখি, জঙ্গিদের একটি বড় রাজনৈতিক দল থেকে তোষণ ও পোষণ করে রাজনৈতিক মিত্র এবং সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং তাদের জঙ্গি তৎপরতার জন্য সাহায্য করা হয়। এটি খুবই পরিতাপের বিষয়।

০৬ মে
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকম-লীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি অনুত্তীর্ণদের আগামীতে ভালো ফল করার সাহসও জুগিয়েছেন তিনি। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তোমরাই আগামীর বাংলাদেশের কর্ণধার। তোমাদেরই এদেশের জনগণ এবং বিশ্ববাসীর সেবায় নিয়োজিত হতে হবে। এজন্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আয়ত্তের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক এবং মানবিকতায় পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে হবে। এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে এবং লন্ডন থেকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী এই শুভেচ্ছা জানান।

০৯ মে
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খুনি ও অর্থ পাচারকারীদের অবশ্যই শাস্তি হবে। তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি। খুনি ও অর্থ পাচারকারীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, যত টাকাই খরচ করুক, তাদের কোনো ক্ষমা নেই এবং জাতি তাদের ক্ষমা করবে না। লন্ডনে লুকিয়ে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে ইঙ্গিত করে লন্ডনের তাজ হোটেলে এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা আরও বলেন, আদালত খুনি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। আমরা এ রায় কার্যকরের পদক্ষেপ নেব। অর্থ পাচারকারী ও খুনিরা যত সেøাগানই দিক, যত তিরস্কারই করুক, তাদের অবশ্যই শাস্তি হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখা ও দলের সহযোগী সংগঠনগুলো এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ সভাপতিত্ব করেন।

১২ মে
* আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি বলেছেন, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে যখন আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে খুন করা হয়েছিল, তখন ফখরুল সাহেবদের মানবতা কোথায় ছিল? আর এখন ফখরুল সাহেব জনগণের সিমপ্যাথি (সমবেদনা) নেওয়ার জন্য কান্না শুরু করেছেন। তিনি বলছেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা পালিয়ে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছে। তার কথা সঠিক নয়। তার দলের যারা ঢাকায় রিকশা চালায় তারা সন্ত্রাসী। তারা মানুষ পুড়িয়ে, হত্যা করে পালিয়েছে। আর তাদের জন্য ফখরুল সাহেবের চোখে পানি। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় এসব কথা বলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ।

১৭ মে
* আওয়ামী লীগের দুর্দিনে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করাটা যে সঠিক ছিল পরে তার দূরদর্শী নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে আজ তা প্রমাণিতÑ এমন মন্তব্য করেছেন দলের শীর্ষ নেতারা। তারা বলেছেন, শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। নেতারা বলেন, দীর্ঘ নির্বাসন জীবন শেষে অনেক প্রতিকূল পরিবেশে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাজনীতিতে আশার আলো ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তার আগমনে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পেয়েছিল। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনার ৩৯তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। বক্তব্য দেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বাহাউদ্দিন নাসিম এমপি, এনামুল হক শামীম এমপি, তথ্যমন্ত্রী এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি, শিক্ষা সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা, সদস্য মির্জা আজম এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবুল হাসনাত। উপস্থিত ছিলেন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক আবদুস ছাত্তার, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন।

২০ মে
* সব ধর্মের মানুষকে ধর্ম-কর্ম পালনের সমান সুযোগ প্রদানে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এর ফলে কেউ আর নিজেদের অবহেলার শিকার ভাবতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো সম্প্রদায়ই নিজেকে কখনও অবহেলিত যেন মনে না করে, সেদিকে আমরা বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখি। আর সেদিক থেকে আমি বলব, বাংলাদেশ আজ সমগ্র বিশ্বেই একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গণভবনে বৌদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন উপলক্ষে সারাদেশ থেকে আগত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধভিক্ষু, সংঘ সদস্য, সংঘ প্রধানদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এ-কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের মাটিতে যারা বসবাস করেন সবাই যার যার ধর্ম সম্মানের সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারবে, সেটাই আমরা চাই এবং এই সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সবার মাঝে থাকবে, এটাই আমাদের লক্ষ্য।

২৩ মে
* আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বগুড়া-৬ আসনে মনোনয়ন নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দ্বিমতের বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, বিএনপির নেতৃত্বে কোনো সমন্বয় নেই। রাজধানীর বানানী বিআরটিএ নতুন ভবনের সভাকক্ষে আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষের ঘরে ফেরা নির্বিঘœ করতে এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ-কথা বলেন।

২৪ মে
* ‘বিনা চিকিৎসায় সরকার কারাগারে খালেদা জিয়াকে হত্যা করতে চায়’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, আমি এতটুকু বলতে চাই, শেখ হাসিনার সরকার অমানবিক নয়। খালেদা জিয়া আইনগত কারণে কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু তাকে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলতে হবে এ-ধরনের অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ সরকার করবে না। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকম-লীর এক বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ-কথা বলেন।
২৬ মে
* জয়িতা ফাউন্ডেশনকে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার নারী-পুরুষের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। তিনি বহুমুখী ব্যবসা উদ্যোগের জন্য নারীদের সমান ও দক্ষ করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। গণভবনে জয়িতা ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরস’র বিশেষ সভার সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, এই ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এর আওতায় কর্মরত তৃণমূল পর্যায়ে যেসব উদ্যোক্তা রয়েছেন তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি গ্রামের অর্থনীতিকে শক্তিশালী না করি, গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়াই, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করি, তাহলে আমাদের অর্থনীতি কখনই উন্নত হবে না। তিনি মেয়েদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ করে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

৩১ মে
* আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেছেন, বিএনপি-জামাত আপাতত নিষ্ক্রিয় হলেও তাদের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা যত সফল হবেন, এই ষড়যন্ত্র ততই গভীর হবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সবার সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী প্রজন্ম লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। নাসিম বলেন, কোনো বাহিনী নয়, তৃণমূল নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগের মূল শক্তি। এই শক্তির ওপর নির্ভর করেই আওয়ামী লীগ সব চক্রান্ত রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। আগামী নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ।

গ্রন্থনা : আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

Category:

২ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড এডিপি অনুমোদন

Posted on by 0 comment

PddMউত্তরণ প্রতিবেদন: আগামী অর্থবছরের (২০১৯-২০) জন্য উন্নয়ন বাজেটে প্রথমবারের মতো রেকর্ড ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে। এর আগে এত বেশি এডিপির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সেই হিসাবে এটি রেকর্ড। স্থানীয় সরকার বিভাগকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে আগামী অর্থবছরের এডিপির আকার চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা কর্পোরেশনের প্রায় ১২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকার এডিপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি অনুমোদন করেছিল সরকার। সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নসহ এ বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১৮০ হাজার কোটি টাকা। গত ২১ মে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেন এনইসি চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ খুঁজতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন এবং তথ্য ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, এটি রেকর্ড এডিপি অনুমোদন। এবারই প্রথম ২ লাখ কোটি টাকার ওপরে এডিপি অনুমোদন হলো। অনুমোদিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রয়েছে। আর স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনের ১২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস ৭ হাজার ৮২ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস ৫ হাজার ৩১০ কোটি টাকা রয়েছে। সুতরাং মোট ১ হাজার ৫৬৪ প্রকল্পের উন্নয়ন সহায়তাসহ এডিপির সর্বমোট আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।
জানা গেছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকল্প-২০২১, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) বিদ্যমান বিভিন্ন নীতিমালার আলোকে অগ্রাধিকার খাতসমূহে পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ প্রদানের মাধ্যমে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়াও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য হ্রাস তথা জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ইত্যাদিসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একুশ শতকের উপযোগী একটি উন্নত দেশ করার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, এডিপিতে দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন তথা দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
এদিকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রকাশিত দুর্নীতি বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নজরে রাখা হয়েছে। বিষয়টি দেখে আমি এক্সসাইটেড। প্রকল্পে তিন টাকার বালিশ তুলতে পাঁচ টাকা হলো কেন? বিষয়টি তদন্ত করতে রূপপুরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরীবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) টিম পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কেনাকাটায় নিয়ে দুটো তদন্ত চলছে। একটা পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডাব্লিউডি) অন্যটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। আমরাও আইএমইডিকে দিয়ে তদন্ত করাব। রূপপুরে টিম যাবে। এই টিম কি তথ্য দেওয়া তা প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করা হবে। এর পরেই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারব। পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, উন্নয়ন থেমে থাকবে না। দেশের উন্নয়ন চলবে। আমাদের দেশের সকল উন্নয়ন ধরে রাখব।
এডিপি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন অর্থবছরের এডিপির আকার বাড়ছে ১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। এছাড়া মাঝপথে এ অর্থবছরের বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত এডিপিতে ধরা হয় ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপির তুলনায় নতুন এডিপিতে বরাদ্দ বাড়ছে ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। নতুন এডিপিতে পদ্মাসেতু ও পদ্মাসেতুতে রেলসংযোগসহ গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন খাতে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে।
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানান, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন (জুলাই-থেকে) ৫৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ-সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৯৭ হাজার ৩০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে বাস্তবায়ন হয়েছে ৫২ দশমিক ৪২ শতাংশ, ওই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।
অন্যান্য মন্ত্রণালয় বাড়তি বরাদ্দ চেয়েছে কি এমন প্রশ্নের জবাবে এমএ মান্নান বলেন, অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বাড়তি বরাদ্দ চাইলে টাকার কোনো সমস্যা নেই। কোনো মন্ত্রণালয় বাড়তি চাহিদার কথা আমাদের বোঝাতে পারলে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের গবেষণা ও পাটে বিশেষ নজর দিতে বলেছেন। আমরা এই দুটো বিষয়ের উন্নয়নে কাজ করব। কিছু কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ খুঁজতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী অর্থবছরের জন্য খাতভিত্তিক বরাদ্দের সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে পরিবহন খাতে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পদ্মাসেতু ও পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবহন খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৫২ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এছাড়া, অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় বিদ্যুৎ খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন খাতে তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১২ শতাংশ।
এছাড়া, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খাতের বরাদ্দ হচ্ছে শিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা ও ধর্ম খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৩৭৯ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ তথ্য ও প্রযুক্তি প্রসারের লক্ষ্যে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ ১৭ হাজার ৫৪১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে ১৫ হাজার ১৫৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ১৩ হাজার ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষি খাতে ৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়েছে। নদী ভাঙন রোধ ও নদীর ব্যবস্থাপনার জন্য পানি সম্পদ খাতে ৫ হাজার ৬৫২ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হচ্ছে এবং মানব সম্পদ উন্নয়নসহ দক্ষতা বৃদ্ধিতে গতিশীলতা আনতে জন প্রশাসন খাতে ৫ হাজার ২৪ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ ২৯ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ ২৬ হাজার ১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এছাড়া, পর্যায়ক্রমে বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রথম ১০ নম্বরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৫ হাজার ৯০৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয় ১২ হাজার ৫৯৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ৯ হাজার ৯৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ৮ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা, সেতু বিভাগ ৮ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ৬ হাজার ২৫৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা খসড়া বরাদ্দ ধরা হয়েছে। নতুন এডিপিতে মোট প্রকল্প সংখ্যা রয়েছে ১ হাজার ৫৬৪টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৩৫৮, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১১৬, জেডিসিএফ প্রকল্প একটি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব প্রকল্প রয়েছে ৮৯টি। অন্যদিকে সমাপ্তর জন্য নির্ধারিত প্রকল্প ধরা হয়েছে ৩৫৫টি। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) প্রকল্প ৬২। বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প ২৪২ এবং বরাদ্দহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৪৫টি। এছাড়া, বরাদ্দসহ অনুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ৪১টি।
এডিপি’র বিভিন্ন প্রকল্প প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের নামে অহেতুক ও অতিরিক্ত জমি নেওয়া যাবে না। ফসলি জমিতে হাত দেওয়া যাবে না। যেসব প্রকল্প সমাপ্ত হচ্ছে না, সেগুলো কেন হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন। প্রয়োজনে সহায়তা দিয়ে হলেও শেষ করার ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

Category:

সেতু, আন্ডারপাস ও ফ্লাইওভার উদ্বোধন: দেশকে আরও এগিয়ে নেব

Posted on by 0 comment

PddMউত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আরও এগিয়ে নেব। দেশের উন্নয়ন কাজ অব্যাহত থাকবে। দেশবাসী আমাদের ওপর আস্থা-বিশ্বাস রেখে ভোট দিয়েছে। যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সারাদেশে উন্নয়নের মাধ্যমে তা রক্ষা করছি। সড়ক, নৌ, রেল ও বিমান মিলে সব দিক থেকে সারাদেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সহজ করাই আমাদের লক্ষ্য। যাতে প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ কম সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারেন।
গত ২৫ মে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশবাসীর ঈদ উপহার হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় মেঘনা সেতু এবং দ্বিতীয় গোমতী সেতুর উদ্বোধনকালে তিনি এ-কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একই সঙ্গে ঈদযাত্রায় স্বস্তি দিতে কোনাবাড়ী ও চন্দ্রা ফ্লাইওভার, কালিয়াকৈর, দেওহাটা, মির্জাপুর ও ঘারিন্দা আন্ডারপাস এবং কড্ডা-১, সাসেক সংযোগ সড়ক প্রকল্পের আওতায় জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা মহাসড়কে বিমাইল সেতু উদ্বোধন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাঁশি বাজিয়ে ও সবুজ পতাকা উড়িয়ে ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ নামে স্বল্প বিরতির আন্তঃনগর ট্রেনের উদ্বোধন করেন।
এসব বিশাল কর্মযজ্ঞের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনও ডিজেলচালিত ট্রেন চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় মেট্রোরেলের মাধ্যমে দেশের প্রথম বিদ্যুৎচালিত ট্রেনের ব্যবহার শুরু হবে। এরপর দূরপাল্লায়ও বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালু করা হবে। ঢাকায় যানজটে জনগণ কষ্ট পাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভালো কিছু পেতে হলে একটু কষ্ট স্বীকার করতে হবে। মেট্রোরেলের কারণে যে জনদুর্ভোগ তার জন্য একটু কষ্ট হবেই। কিন্তু এর সুফল পরে পাওয়া যাবে। এখানে ১৬টি স্টেশন থাকবে। এর মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ চলাচল করতে পারবে। মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শেষ হলে ঢাকায় যানজট কমে যাবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য কাজের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের উন্নতি করা। এ লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। জাতির জনকের দেখানো সেই নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’, ওই পথেই আমরা হাঁটছি। তিনি বলেন, আজ যে সেতুগুলো উদ্বোধন করা হয়েছে, এগুলো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিরাট অবদান রাখবে। যার কাছ থেকে আমরা উন্নয়ন সহযোগিতা পাচ্ছি তার কাছ থেকে আমরা তা গ্রহণ করছি। এর মাধ্যমে সাউথ এশিয়ান ও সাউথ ইস্ট দেশগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারছি। এখন যেসব সেতুর উন্নয়ন করছি, আশা করি ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করতে পারব। আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়েছি।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহাসড়কগুলোতে চালকের বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা নেই। আমরা অদূর ভবিষ্যতে চালকদের বিশ্রামের জন্য মহাসড়কের পাশে আলাদা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খাওয়া-দাওয়াসহ যে কোনো গাড়িচালক যাতে করে একটা নির্দিষ্ট সময় পর বিশ্রাম নিতে পারে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে আমাদের ছেলেমেয়েদের ধারণা দিতে হবে। স্কুলের সামনে যেসব জেব্রাক্রসিং থাকে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান।
সড়কে চলাচল বিষয়ে সবার মাঝে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে স্কুল-জীবন থেকেই ট্রাফিক আইন প্রশিক্ষণে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয় ট্রাফিক রুলের ওপর স্কুল-জীবন থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। তাহলে সবার মাঝে সচেতনতাটা গড়ে উঠবে।’ তিনি এ-সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কলেজ বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান, যাতে কোনো কোমলমতি শিক্ষার্থী দুর্ঘটনার শিকার না হয়। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি সুস্থ হয়ে দেশে ফেরায় তাকে দোয়া করার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি এ-সময় তার দল আওয়ামী লীগকে একটি পরিবার বলে উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে শুধু রাজনীতিই নয়, আমরা একটা পরিবার। ছোটবেলা থেকে দেখেছিÑ আমার মা-বাবা এবং রাজনৈতিক নেতাদের আমরা একটা পরিবারের মতোই বড় হয়েছি। যখনই কোনো সমস্যা হয় সুখ-দুঃখে আমরা সবসময় সাথী হয়েই চলি। এভাবেই এই সংগঠনটা যেন এগিয়ে যেতে পারে, সে-বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে একসময় দেশে হাহাকার ছিল। আজকে প্রায় ৯৩ ভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে পারছি। যেসব মেগা প্রকল্প এবং যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে, তাতে আমাদের বিদ্যুতের কোনো অভাব থাকবে না। রেলের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যত দিন যাচ্ছে রেল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। মানুষ এখন রেলে বেশি চড়তে চায়। চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের আরও বেশি যাত্রীবাহী কোচ দরকার। কাজেই আরও বেশি কোচ আমাদের কিনতে হবে।
শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় গত সাড়ে ১০ বছরের রেলের উন্নয়নের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমরা রেলের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছি। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে একটা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সম্ভব। আর সেদিকে লক্ষ্য রেখেই রেল, সড়ক, আকাশ, নৌপথ সবদিকেই আমরা দৃষ্টি দিয়েছি এবং উন্নয়ন করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক, লাভজনক নয় বলে বিএনপি সরকারের আমলে পুরো রেল যোগাযোগটাই বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। অনেক ট্রেন ও লাইনগুলো বন্ধ করে দেয়। রেলটাকে সম্পূর্ণভাবে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর আলাদা মন্ত্রণালয় গড়ে তুলে সার্বিকভাবে রেলকে যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর বাংলাদেশ ও ভারতের ভারতের মধ্যে যেসব রেল সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে সেগুলো চালু করা হচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশ যেন সংযুক্ত হয় সে-ব্যবস্থাটাও আমরা নিয়েছি। রেলের ডিজিটাইজেশন, দক্ষিণবঙ্গে পায়রাবন্দর পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপন, ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্যুরিস্ট ট্রেন চালু করা, বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে যমুনার ওপর একটি রেলসেতু নির্মাণের উদোগসহ নানা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে উল্লিখিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উদ্বোধন হওয়া এসব প্রকল্পকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৃষ্টিশীল নেতৃত্বের সফল ফসল হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এতে এবার ঈদযাত্রায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে। নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, তখন অনেকে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি বেঁচে থাকব এটা অনেকে আশাই করতে পারেননি। আমাকে সুস্থ করে তুলতে মমতাময়ী মায়ের মতো সেই সময় ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে তার কাছে ঋণের বোঝা বেড়ে গেল। এর আগে কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা, গোমতী সেতু নির্মাণ প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ মো. নুরুজ্জামান জানান, নবনির্মিত কাঁচপুর ব্রিজ ইতোমধ্যেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন দুটি সেতু চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিশেষ করে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা কিছুটা হলেও আরামদায়ক হবে।
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কুমিল্লা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। শুরুতেই শুভেচ্ছা বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Category:

দেশের জন্য কাজ করায় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে

Posted on by 0 comment

PddMউত্তরণ প্রতিবেদন: আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পঁচাত্তরের পর এত বড় দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে এটা কখনও আমি ভাবিনি, চাইওনি। এটা চিন্তাতেও ছিল না। দেশের জন্য কাজ করতে এবং গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে দেশে ফিরেছিলাম। এজন্যই দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছি। কেননা, গণতান্ত্রিক ধারা ছাড়া দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা ক্ষুণœ হোক, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হোক, গত ৩৮ বছরে এমন কোনো কাজ আমি করিনি বা আমার পরিবারের কোনো সদস্য কখনও করেনি। নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার জন্য কাজ করিনি, কাজ করেছি দেশের মানুষের জন্য।
গত ১৭ মে ছিল বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। দিনটিতে সকালে গণভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে এসব কথা বলেন। এ-সময় তিনি আরও বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এই দেশটা যেন আবারও স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের হাতে না যায়। কেউ যেন দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, স্কুল-জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারপর কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে তখনও ছাত্রলীগেরই সদস্য ছিলাম। আমার রাজনীতি ছাত্র-রাজনীতি থেকেই শুরু। তবে কখনও কোনো বড় পোস্টে ছিলাম না, পোস্ট চাইওনি কখনও। আমরা পদ সৃষ্টি করে এবং সবাইকে পদে বসানো এই দায়িত্বটাই পালন করতাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির একজন সদস্য ছিলাম।
তিনি বলেন, ক্ষমতায় থেকে দেশের জন্য কাজ করার কারণেই মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। আর এ-কারণেই শুধু দেশে নয় গোটা উপমহাদেশে আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। দেশবিরোধীরা পঁচাত্তরের পর স্বাধীনতার চেতনা ব্যাহত করেছে। যারা স্বাধীনতা ও দেশের চেতনায় বিশ্বাস করে না পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে তারা ক্ষমতায় থাকার কারণে যে আদর্শ নিয়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা বলেন, যারা বারবার চেয়েছে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে, তারা সফল হয়নি। আওয়ামী লীগ কিন্তু আওয়ামী লীগের মতোই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আজকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এক নম্বর রাজনৈতিক দল। যে দল মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে। সেই আস্থা ও বিশ্বাস আমরা দেখতে পেয়েছি এবারের নির্বাচনে। নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে প্রথমবার ভোটার হওয়া তরুণরা সবাই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে তাদের আস্থা, বিশ্বাস ও সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এর কারণ হলোÑ আমরা যে ক্ষমতায় থেকে মানুষের জন্য কাজ করেছি, মানুষের জন্য স্নান করেছি, মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য যে কাজগুলো করেছি, সেটা মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে। এটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করা। নইলে ক্ষমতায় থাকলে সাধারণত মানুষের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়।
কিন্তু আমরা ক্ষমতায় এসে মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি বলেই মানুষের ভোট আমরা পেয়েছি। জনপ্রিয়তা ও সমর্থন দুটোই বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা ক্ষুণœ হোক, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হোক, গত ৩৮ বছরে এমন কোনো কাজ আমি বা আমার পরিবারের কোনো সদস্য কখনও করিনি। আমরা যতবার ক্ষমতায় এসেছি, মানুষের জন্য কাজ করেছি, তত মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে কী পেলাম, না পেলাম সেই চিন্তা করি না। দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।
টানা ৩৮ বছর দলের সভাপতি থাকা বোধহয় একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। তখন উপস্থিত নেতাকর্মীরা সমস্বরে ‘না’ বলে ওঠেন। তারা শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনিই সঠিক নেতা, আপনার হাতেই দেশ ও দল নিরাপদ। আপনাকেই এ দায়িত্ব চালিয়ে যেতে হবে।’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমার মনে হয় আপনাদেরও সময় এসেছে, তাছাড়া বয়সও হয়েছে, এ বিষয়গুলো তো দেখতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে যখন ফিরেছিলাম (১৯৮১ সালের ১৭ মে), সেদিন আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। ফ্লাইটটি বাংলার মাটি ছুঁয়েছে, ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ওই সময় ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ এসেছিল। এয়ারপোর্ট থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত এত মানুষের ঢল যে এইটুকু পথ আসতে প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লেগে গিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সেই নির্মম ঘটনার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র ১৫ দিন আগে, জুলাই মাসের ৩০ তারিখে ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে আমি জার্মানিতে গিয়েছিলাম। রেহানা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কলেজে গেলাম। সবাইকে রেখে গিয়েছিলাম, কামাল, জামাল, রাসেল। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় শুনলাম, আমাদের কেউ নেই, আমরা নিঃস্ব। আমাদের দেশেও আসতে দেওয়া হলো না। দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই ফিরে এসেছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে আসব। আমি জানি না কী করব, কোথায় থাকব, কই যাব। অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি। তবু সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে আসতেই হবে।
বঙ্গবন্ধুই রাজনৈতিক আদর্শ ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতির কাজ করে যেতাম আব্বার আদর্শ নিয়ে। তিনি দেশের জন্য কাজ করেছেন। বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। আমরা কখনও টানা দুই বছরও আব্বাকে জেলের বাইরে পাইনি। এ নিয়ে আমাদের কোনো হা-হুতাশ ছিল না। আমার মা খুব চিন্তাশীল ছিলেন, তিনি বাসাও দেখতেন, বাইরেও দেখতেন। সাংসারিক কোনো ঝামেলা তিনি আব্বাকে দিতে চাইতেন না। আমাদের দাদা-দাদি, চাচারা পারস্পরিক সহযোগিতা করতেন। কাজেই এমন একটি পরিবেশ থেকে আমরা উঠে এসেছি, যে মাথাতেই ছিল দেশের জন্য কিছু একটা করে যেতে হবে।
দেশে ফেরার পরের প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ফেরার পর থেকেই পদে পদে বাধা। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না, তারাই তখন ক্ষমতায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ১৯টি ক্যু হয়েছিল। এক সামরিক শাসকের মৃত্যুর পর আরেক সামরিক শাসক এলো। আমরা আওয়ামী লীগ কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য একটার পর একটা সংগ্রাম করেই গেছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক ধারা আর ব্যবস্থা ছাড়া দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব না। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় ছাড়াও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তা সত্ত্বেও দলকে টিকিয়ে রাখতে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ঠিক যেভাবে গড়ে উঠেছিল, ঠিক সেভাবেই আজ বাংলাদেশের এক নম্বর পলিটিক্যাল পার্টি। যেভাবে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস আমরা অর্জন করেছি তা আমরা দেখতে পাই এবারের নির্বাচনে। আজ বাংলাদেশ সারাবিশ্বে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ বলে, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আমি জানি না, যখনই একটা কাজ সফলভাবে করি, তখন শুধু আমার এটাই মনে হয় যে, নিশ্চয় আমার আব্বা-আম্মা বেহেশত থেকে দেখছেন।
সকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা সপরিবারে নিহত হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর বিদেশে নির্বাসিত থেকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে আসার আগে বিদেশে থাকা অবস্থায় তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।
এরপর থেকে তিনি টানা ৩৮ বছর বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠনের আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এক টার্ম ও ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে টানা তিনবার মিলিয়ে বাংলাদেশে ইতিহাসে চার টার্ম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা।

Category:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অভিযাত্রা

Posted on by 0 comment

PddMরায়হান কবির :  ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন। আহ্বায়ক : নঈমউদ্দিন আহমদ। স্থান : ফজলুল হক হল।
* ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম ধর্মঘট। শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার।
* ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পূর্ব বাংলা সফরে এসে জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা। ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ছাত্র নেতৃবৃন্দের এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ। এ বছর ১১ সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানকে আবার আটক করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
* ১৯৪৯ : টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শামসুল হকের জয় লাভ। মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী পরাজিত। মুসলিম লীগে ভাঙনের সূত্রপাত।
*১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার। এপ্রিলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন।
* ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনে অবস্থিত হুমায়ূন সাহেবের বাসভবন রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত। ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ। প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। জেলে থাকা অবস্থায় এই দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। জুন মাসের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন।
* ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সংবিধানের ‘মূলনীতি’ বিরোধী আন্দোলন।
* ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমনকে উপলক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের দুই বছর জেল হয়েছিল।
* হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে ১৯৫১ সালে নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা। সভাপতি মানকি শরীফের পীর এবং সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী।
*১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন; কারাবন্দি শেখ মুজিবের নির্দেশনা। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্তে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জব্বারসহ অগণিত আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে শহিদ।
* ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের যৌথ সম্মেলন। সম্মেলনে শর্তসাপেক্ষে দুই দল একীভূত হয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
* ১৯৫৩ সালের ৩, ৪ ও ৫ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত।
* ১৯৫৩ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে যুক্তফ্রন্টে অংশগ্রহণ ও ২১-দফা অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হয়।
* ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২১-দফা প্রণয়ন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। সংখ্যা গরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী। ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগকে বাদ রেখে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ। ১৫ মে আওয়ামী লীগসহ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত। আদমজীতে দাঙ্গার অজুহাতে ৩০ মে ৯২(ক) ধারা জারি এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত। তীব্র দমননীতি।
* ১৯৫৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। এই কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ।
* ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ মে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে যথাসময়ে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়।
* ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলায় আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা গঠন। ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন।
* ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দলে প্রকাশ্য মতবিরোধ। কাগমারী সম্মেলনের পর ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। অন্যদিকে ১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার শাবিস্তান হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। এই কাউন্সিলে ভাসানীর পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু গৃহীত হয় না। দল থেকে পদত্যাগ করলেও কাউন্সিল ভাসানীকেই সভাপতি করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
* ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কনভেনশনে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন।
* ১৯৫৭ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ। শেখ মুজিবসহ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার। ২৭ অক্টোবর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার অপসারণ, জেনারেল আইউব খানের ক্ষমতা দখল।
* ১৯৫৯ সালের ৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিবের মুক্তিলাভ। গোপনে সহকর্মীদের কাছে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন শেখ মুজিব।
* ষাটের দশকের শুরুতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ছাত্রলীগ নেতাদের গোপন নিউক্লিয়াস গঠন। শেখ মুজিবের অনুমোদন।
* ১৯৬১ রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগ। রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে সরকারের নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।
*১৯৬২ সালে ছাত্রলীগ নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি। সামরিক শাসন শিথিল। ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলো আলাদাভাবে পুনরুজ্জীবিত না করার সিদ্ধান্ত। ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) নামে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে ওঠে।
* ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর পর এনডিএফ কার্যকারিতা হারায়। ১৯৬৪ সালের ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা। এই সভায় দল পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত। পুনরুজ্জীবিত দলে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
* এনডিএফ-পন্থি নেতাদের আওয়ামী লীগ ত্যাগ। পুনরুজ্জীবন বিরোধী আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, জহিরুদ্দিন, নুরুর রহমান, খয়রাত হোসেন, আবদুল জব্বার খদ্দর, আলমাস রুহু বকস, কাজী রোহানউদ্দিন, একে রফিকুল হোসেন, আবদুল হামিদ চৌধুরী, জিল্লুর রহিম, জহুর আহমেদ চৌধুরী, আমির হোসেন দোভাষ, প্রফেসর নুরুল ইসলাম চৌধুরী, ডা. মযহার উদ্দিন আহমেদ, রমিজউদ্দিন আহমেদ, জসিম উদ্দিন আহমেদ, শফিক আহমেদ, তোফাজ্জল আলী, জয়নুল আবেদীন, গাজী ইকবাল আনসারী, এ ওহাব ও শওকত আলী প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতা এনডিএফে থেকে যান। ১৯৬৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইন্দিরা রোডে এনডিএফের অফিস নেওয়া হয়। নুরুল আমিনকে চেয়ারম্যান, মাহমুদ আলীকে সেক্রেটারি জেনারেল এবং হামিদুল হক চৌধুরীকে কোষাধ্যক্ষ করে এনডিএফের কমিটি ঘোষণা করা হয়।
*১৯৬৪ সালের ৬, ৭ ও ৮ মার্চ ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
* ১৯৬৪ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-বিরোধী আন্দোলন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ইত্তেফাকে প্রকাশিত ১৬ জানুয়ারি ১৯৬৪ ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ এবং দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে একই শিরোনামে একটি লিফলেট বিতরণ করা হয়Ñ যা সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে।
* ১৯৬৪ সালে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের নামে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি বা সম্মিলিত বিরোধী দলÑ ‘কপ’ গঠন। আইউব খানের বিরুদ্ধে মহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে ‘কপ’-এর প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন। প্রতিনিধি পদে নির্বাচনে কপ প্রার্থীদের জয় লাভ; কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদে পরোক্ষ নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পরাজয়। সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি জোরদার।
* ১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আলোকে ১১-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১১-দফা দাবি কার্যত ভবিষ্যৎ ৬-দফা দাবিরই ভিত্তি রচনা করে।
* ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ। পূর্ববাংলা অরক্ষিত ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন।
* ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। ৬-দফা বিরোধিতা করে মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের আওয়ামী লীগ ত্যাগ।
* ১৯৬৬ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে ৬-দফা অনুমোদন। আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। সারা বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমানের ঝটিকা সফর। একাধিকবার গ্রেফতার, মুক্তি আবার গ্রেফতার।
* ১৯৬৬ সালের ৮ মে আইউব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে জামিন অযোগ্য নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে। একই সাথে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদসহ সারাদেশে বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতার। ৭ মে থেকে ১০ মে-র মধ্যে সারাদেশের সাড়ে ৩ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ইতোমধ্যে ওয়ার্কিং কমিটির পূর্ব নির্ধারিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। সর্বাত্মক হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। পাশবিক হিংস্রতা নিয়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হরতালে ঢাকার রাজপথ শ্রমিক-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়। শ্রমিক মনু মিয়াসহ কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন।
* ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের হরতালের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে বহুমুখী আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। ১৩ জুনের মধ্যে আওয়ামী লীগের তৃতীয় সারির নেতারাও গ্রেফতার হয়ে যান। ৬-দফার সমর্থক দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে ১৫ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়। ১৬ আগস্ট ইত্তেফাক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
* ১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিল অধিবেশন হয়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য নয়; বরং দলকে চাঙ্গা রাখার জন্যই এই কাউন্সিল ডাকা হয়েছিল। কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে ৬-দফায় প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
* ১৯৬৭ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে একটি নতুন কমিটি গঠিত।
* ১৯৬৮ সালের ১৯ ও ২০ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দুদিনব্যাপী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিল নেতা-কর্মীদের ভয়-ভীতি কাটাতে এবং নতুন করে আন্দোলন গড়ে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। চরম বৈরী পরিবেশেও আওয়ামী লীগ তার কোনো দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল স্থগিত বা সাংগঠনিক কার্যক্রম যে বন্ধ রাখেনি, এ কাউন্সিল সেটিই প্রমাণ করে।
* ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব গং’ তথা আগরতলা মামলা দায়ের। শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর। বিচার শুরু।
* আইউব-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ ৬-দফা ভিত্তিক ১১-দফা দাবিনামা প্রণয়ন করে। সংগ্রাম পরিষদে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), এনএসএফ-এর একাংশ এবং ডাকসু।
* ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ১১-দফা দাবিতে ছাত্র-গণ-আন্দোলনের শুরু। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান। গণজাগরণের ব্যাপকতা। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ প্রভৃতি বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক। তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকে ছাত্রসমাজের হাতে। ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্তভাবে কারাগার থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিলাভ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রজনতার বিশাল সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত।
*  ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইউবের পতন। ইয়াহিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ এবং পুনরায় মার্শাল ল’ জারি।
ক্স ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ক্স সামরিক শাসনের মধ্যেই পাকিস্তানে নির্বাচনের ঘোষণা। এলএফও জারি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত। ১৯৭০ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু নির্বাচনকে ৬-দফার পক্ষে ‘গণভোট’ বলে ঘোষণা করেন।
ক্স ১৯৭০ সালের ৪ ও ৫ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে ১ হাজার ১৩৮ কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই কাউন্সিলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় এবং ৬-দফা আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি গণভোট হিসেবে গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
ক্স ১৯৭০ সালের ৬ জুন হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং এই কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
ক্স ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত। পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আওয়ামী লীগের জয়লাভ। ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮৭টি আসনে জয়লাভ। সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসনও পায় আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি অর্জন। তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত।
ক্স ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি বিশাল জনসভায় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথবাক্য পাঠ করান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ক্স ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া কর্তৃক অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদসভা স্থগিত ঘোষণা। প্রতিবাদে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এই ১-দফা দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা উত্তোলন।
ক্স ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ, পল্টনের জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা বাংলাদেশে পাঁচ দিনব্যাপী হরতাল পালন।
ক্স ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির দিক-নির্দেশনা প্রদান। অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা। ৭ মার্চের পর পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোর নেতৃত্ব চলে যায় বঙ্গবন্ধুর হাতে। ১৯৭১ সালের ১০ মার্চের দৈনিক আজাদ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে আমেরিকার হোয়াইট হাউস, ব্রিটেনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সাথে তুলনা করে মন্তব্য করে : বঙ্গবন্ধুর বাসভবন এখন একটি অঘোষিত সরকারি দফতর। ১৪ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক সরকার ১৫ নম্বর সামরিক আদেশ জারি করে সকল বেসামরিক লোককে চাকরিতে ফিরে আসতে নির্দেশ প্রদান করলে বঙ্গবন্ধু পাল্টা ৩৫-দফা নির্দেশনামা ঘোষণা করেন।
ক্স বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রশাসন হাতে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনা করে নির্দেশাবলী প্রণয়ন করেন এবং তা বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করেন। ৩৫টি বিধি : ১. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েট, সরকারি ও আধা সরকারি অফিসসমূহ, হাইকোর্ট ও দেশের অন্যান্য আদালত হরতাল পালন করবে। তবে অতিপ্রয়োজনীয় ও আন্দোলনের স্বার্থে নির্দিষ্ট অফিস ও দপ্তর ও সংস্থা হরতালের আওতা বহির্ভূত থাকবে। ২. বাংলাদেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ৩. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাÑ ডেপুটি কমিশনার, সাব-ডিভিশনাল অফিসার, আওয়ামী লীগ সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়ন কর্মসূচিসহ দায়িত্ব পালন করবে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে। ৪. বন্দরসমূহÑ অভ্যন্তরীণ নৌযান চলাচল অব্যাহত থাকবে। তবে সৈন্যদের সহযোগিতা করবে না। বন্দরের কাজ চলবে। ৫. মাল আমদানিÑ আমদানিকৃত সকল মালামাল খালাস করতে হবে। সংগৃহীত অর্থ কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাবে জমা হবে না। ৬. রেলওয়ে চলবেÑ তবে সৈন্য চলাচল বা তাদের রসদ বহন করতে পারবে না। ৭. সড়ক পরিবহনÑ ইপিআরটিসি চলাচল করবে। ৮. অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরের কাজ চলবে। ৯. ডাক ও টেলিগ্রাফ বাংলাদেশের মধ্যে কাজ করবেÑ বিদেশে মেল সার্ভিস ও টেলিগ্রাফ করা যেতে পারে। ১০. টেলিফোন বাংলাদেশের মধ্যে চালু থাকবে। ১১. বেতার, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রÑ এগুলো চালু থাকবে এবং জনগণের আন্দোলনের সংবাদ প্রচার করতে হবে। ১২. হাসপাতালসমূহ চালু থাকবে। ১৩. বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। ১৪. পানি, গ্যাস সরবরাহ চালু থাকবে। ১৫. কয়লা সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। ১৬. খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। খাদ্য আমদানি চালু থাকবে। ১৭. কৃষি তৎপরতাÑ ধান ও পাটের বীজ, সার ও কীটনাশক ওষুধ সংগ্রহ ও বণ্টন অব্যাহত থাকবে। পাওয়ার পাম্প ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ চালু থাকবে। কৃষি ব্যাংকের কাজ চালু থাকবে। ১৮. বন্যানিয়ন্ত্রণ ও শহর সংরক্ষণের কাজ অব্যাহত থাকবে। ১৯. উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ চলবে। ২০. সাহায্য ও পুনর্বাসনÑ ঘূর্ণিদুর্গত এলাকায় বাঁধ নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজসহ পুনর্বাসনের কাজ চলতে থাকবে। ২১. ইপিআইডিসি, ইস্টার্ন রিফাইনারি ও সকল কারখানার কাজ চলবে। ২২. সকল সরকারি ও আধা সরকারি সংস্থার কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন নিয়মিতভাবে প্রদান করতে হবে। ২৩. পেনশনÑ নিয়মিতভাবে সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের দেওয়া হবে। ২৪. এজি ও ট্রেজারিÑ বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মচারী কাজ চালিয়ে যাবে। ২৫. ব্যাংক সকাল ৯টা হতে ১২টা পর্যন্ত ব্যাংকিং কাজ করবে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে লেনদেন চলবে না। বিদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশনকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হবে। ২৬. স্টেট ব্যাংকÑ অন্যান্য ব্যাংকের মতোই কাজ করবে। ২৭. আমদানি ও রপ্তানি কন্ট্রোলারÑ আমদানি-রপ্তানি নিশ্চিত করবে এবং কাজ চালিয়ে যাবে। ২৮. ট্রাভেল এজেন্ট ও বিদেশি এয়ারলাইন্স চালু থাকবে। ২৯. ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা চালু থাকবে। ৩০. পৌরসভার কাজ চালু থাকবে। ৩১. ভূমি রাজস্ব আদায় বন্ধ থাকবে। লবণ ও তামাক কর আদায় হবে না। আয়কর আদায় বন্ধ থাকবেÑ এছাড়া প্রাদেশিক কর আদায় হবে এবং বাংলাদেশ সরকারের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কর আবগারী শুল্ক কর, বিক্রয় কর আদায় করে কেন্দ্রীয় সরকারের খাতে জমা না দিয়ে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল বা ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন জমা দিতে হবে। ৩২. পাকিস্তান বীমা কর্পোরেশন, পোস্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স চালু থাকবে। ৩৩. সব ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের সেবাদান নিয়মিতভাবে চলবে। ৩৪. সকল বাড়ির ওপর কালো পতাকা উড়বে। ৩৫. সংগ্রাম পরিষদগুলো সর্বস্তরে তাদের কাজ চালু রাখবে এবং এসব নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে যাবে।
ক্স ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব বাংলার সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। এদিন সর্বত্র মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়তে থাকে স্বাধীন সোনার বাংলার নতুন পতাকা। এমনকি এই সময় ঢাকায় অবস্থানকারী পশ্চিমা নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমানে শেরাটন) উঠেছিলেন, তার শীর্ষদেশেও উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। ঢাকায় অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসের ভবনের শীর্ষেও নতুন পতাকা উড়তে দেখা যায়। এদিন ভোর ৫টায় বিদ্রোহী বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে তার বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন।
ক্স ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা ভেঙে যায়। ওই দিন রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকহানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শুরু। সারাদেশে বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ।
ক্স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইপিআরের ওয়্যারলেস মারফত গোপনে ওই ঘোষণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন।
ক্স ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এক সভায় মিলিত হন। বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ। তারা ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন করেন, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন দেন এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন। গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। বঙ্গবন্ধু সর্বাধিনায়ক।
ক্স ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননকে ‘মুজিবনগর’ (অস্থায়ী রাজধানী) ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত। জাতীয় সংগীত হিসেবে প্রথম ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়া হয়।
ক্স ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর কাছে ৯৩ হাজার পাকবাহিনীর সদস্যের আত্মসমর্পণ। ৩০ লাখ শহিদের আত্মদান এবং ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মুজিবনগর সরকার সদস্যদের ঢাকায় আগমন এবং দায়িত্ব গ্রহণ।
ক্স ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
ক্স ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকার গঠন করেন। শুরু হয় যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন।
ক্স ১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জিল্লুর রহমান।

১৯৭২-৭৫ : জাতীয় পুনর্গঠন, সাফল্য ও অর্জন
ক্স ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন।
ক্স ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়।
ক্স স্বাধীনতার পর আওয়ামী সরকারের অর্জন :
Ñ যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতু, রেলপথ, বন্দর, কল-কারখানা, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার পুনর্নির্মাণ।
Ñ ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী ১ কোটি শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ ৩ কোটি ঘরছাড়া মানুষের পুনর্বাসন।
Ñ স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনিক কাঠামো, সচিবালয়, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশন, প্ল্যানিং কমিশন গঠন, সুপ্রিমকোর্ট প্রতিষ্ঠা।
Ñ স্বাধীন বাংলাদেশের উপযোগী সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী গঠন।
Ñ বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ।
Ñ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদান। কমনওয়েলথ ও ইসলামি ঐক্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ। বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি অর্জন।
Ñ সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার। সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন।
Ñ শিক্ষানীতি প্রণয়ন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা।
ক্স ১৯৭৪ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলে এএইচএম কামারুজ্জামানকে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ দলের কর্মকর্তা পদে থাকতে পারবেন না বিধায় বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। সৃষ্টি হয় গণতন্ত্র চর্চায় নতুন ঐতিহ্য।
ক্স ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন। গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’।
ক্স ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একটি বিচ্ছিন্ন অংশকে নিয়ে খুনি মোশতাক-রশিদ-ফারুক চক্রের অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা। পাকিস্তানি ধারায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।
ক্স খুনি মোশতাক স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি, সামরিক আইন জারি, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি।
ক্স ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা।
ক্স ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়ার স্বৈরশাসন। ক্যান্টনমেন্টে বসে বিএনপি গঠন, সংবিধান পরিবর্তন, প্রহসনের গণভোট, রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন।
ক্স ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান কর্তৃক কারাগারে বন্দী সকল যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের মুক্তি ঘোষণা। দালাল আইন বাতিল।
ক্স ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দল বিধি জারি করা হয়। প্রচ- ও হিং¯্র দমননীতির শিকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই সীমিত গণতান্ত্রিক সুযোগ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। দল পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ২৫ আগস্ট ঢাকায় দলের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদসহ নেতৃবৃন্দের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ আগস্টের বর্ধিত সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয় দলের পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল সাপেক্ষে ১৯৭৫ সালের ৬ জুন পর্যন্ত যে কার্যনির্বাহী সংসদ ছিল সেটিই সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাবে। ১৯৭৪ সালে গঠিত নির্বাহী সংসদের সভাপতি এএইচএম কামারুজ্জামান ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ নিহত হন। সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ তখন কারাবন্দি। এমতাবস্থায় সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
ক্স ১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে দলীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। কাউন্সিলের আগেই দলের নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যের অভাব প্রকাশ্য দলাদলির আকার ধারণ করে। কাউন্সিলে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি। সিদ্ধান্ত হয় আপাতত পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করে একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হবে। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে ১০ দিনের মধ্যে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জোহরা তাজউদ্দীন ১৫ এপ্রিল সাংগঠনিক কমিটির সদস্যগণের নাম ঘোষণা করেন।
ক্স ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়া তার ক্ষমতাকে বৈধতার ছাপ মারার জন্য দেশব্যাপী গণভোটের আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগ গণভোট বর্জন করে।
ক্স ১৯৭৮ সালের ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল মালেক উকিলকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
ক্স ১৯৭৮ সালের ২৩ নভেম্বর হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান করতে ভূমিকা রাখে ওই কাউন্সিল।
ক্স ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই কাউন্সিলে দলে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ এবং দলকে অধিকতর শক্তিশালী ও সংহত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হন। এই কাউন্সিলেই প্রথম গঠনতন্ত্র সংশোধন করে সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক ‘সভাপতিম-লী’ গঠিত হয়।
ক্স ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
ক্স ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে জিয়া নিহত। ১৫ নভেম্বর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার ব্যাপক জনসংযোগ। জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা।
ক্স ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল।
ক্স ১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারি কুখ্যাত রাজাকার আবদুল মান্নান আহূত ‘জমিয়াতুল মোদাররেসিন’ নামক মাদ্রাসা শিক্ষকদের এক সমাবেশে জেনারেল এরশাদ ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস ও শহিদ মিনার সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ কটূক্তি করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জানুয়ারি ১৫টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৫ দলীয় ঐক্য জোট।
ক্স ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে মৌন মিছিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, মোজাম্মেল ও দীপালি সাহা প্রমুখ পাঁচ ছাত্র নিহত হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ১৫ দলের নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়।
ক্স ১৫ ফেব্রুয়ারি ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে বৈঠকরত অবস্থায় সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা, আবদুস সামাদ আজাদ, আবদুল মান্নান, ড. কামাল হোসেন, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমেদ, মো. রহমত আলী, ডা. এসএ মালেক, গোলাম আকবর চৌধুরী, সাহারা খাতুন, অধ্যাপক মানিক গোমেজ, সিপিবি-র মোহাম্মদ ফরহাদ, মঞ্জুরুল আহসান খান, একতা পার্টির সৈয়দ আলতাফ হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়া ও বাসদের খালেকুজ্জামান প্রমুখ ১৫ দলের নেতাদের গ্রেফতার করে। সেনা সদস্যরা নেতৃবৃন্দকে চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। ওই দিন সন্ধ্যা থেকে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়।
সারাদেশে সৃষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই ঐক্যবদ্ধভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস পালিত হয়। ১৫ দলের উদ্যোগে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিটি সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। জনমতের চাপে অবশেষে ১ মার্চ ১৯৮৩ শেখ হাসিনাসহ গ্রেফতারকৃত ২৭ নেতা মুক্তি লাভ করেন।
ক্স ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেওয়া হয় এবং ১৪ নভেম্বর দেশে প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। ১৯৮৩ সাল থেকেই সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনকে অভিন্ন লক্ষ্যে এবং অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ধারায় সংগঠিত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সাতদলীয় জোট দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর একটি অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর উভয় জোটের সর্বসম্মত ৫-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
ক্স ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলের ওপর ট্রাক চালিয়ে হত্যা করা হয় সেলিম-দেলোয়ার নামে দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে। ১ মার্চ আদমজীতে শ্রমিক নেতা তাজুলকে এবং ২৭ সেপ্টেম্বর হরতালের দিন কালীগঞ্জে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনকে সরকারি জনদলের গু-াবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ অক্টোবর মানিক মিয়া এভিনিউতে ১৫ দলের উদ্যোগে স্মরণকালের বৃহত্তম মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মহসমাবেশ থেকে ১৫ দল ২১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
ক্স বিরোধী দলের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে একবার উপজেলা নির্বাচন তারিখ ও সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন এরশাদ। পরে সামরিক আইনের কড়াকড়ি পুনর্বহাল, রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ ঘোষণা এবং রাজনৈতিক নেতাদের আটক রেখে ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ এরশাদ তার ১৮-দফা কর্মসূচির পক্ষে গণভোট অনুষ্ঠান করেন।
ক্স ১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
ক্স ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ১৫ দল ও সাত দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়। সিদ্ধান্ত হয় সামরিক শাসন অবসানের মূল লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্য সামনে রেখে দুই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। ১৫ দল ১৮০টি আসনে এবং সাত দল ১২০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জাতীয় পার্টিকে মোকাবিলা করবে বলে ঐকমত্য হয়। কিন্তু হঠাৎই রহস্যজনক কারণে সাত দল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। ১৫ দলের অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, সাম্যবাদী দলও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করে। স্বভাবতই এরশাদ ও জাতীয় পার্টি এতে উৎসাহিত হয়। ১৫ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
সন্ত্রাস, ভোটকেন্দ্র দখল, টাকার ছড়াছড়ি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার মধ্যেও ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এত কিছু করেও ১৫ দলের বিজয় ঠেকাতে না পেরে ৭ তারিখ রাতে আকস্মিকভাবেই নির্বাচনের ফল ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টা গণমাধ্যমে ফল ঘোষণা বন্ধ রাখার পর মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে ফল উল্টে দিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় জাতীয় পার্টিকে।
ক্স ১৯৮৬ সালের ১০ জুলাই সংসদ অধিবেশন বসলেও সামরিক আইন বহাল থাকে। সামরিক আইন বহাল রেখেই ১৯৮৬-এর ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়। সামরিক শাসকরা বিরোধী দলগুলোর হরতাল, সমাবেশ এবং জনগণের অংশগ্রহণের তোয়াক্কা না করেই গায়ের জোরে ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। ১ নভেম্বর সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী উত্থাপন করা হয় জাতীয় সংসদে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল সপ্তম সংশোধনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সংসদে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। বিরোধিতার মুখেও ১০ নভেম্বর সপ্তম সংশোধনী পাস করা হয়। সপ্তম সংশোধনীর দ্বারা ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে জারিকৃত সকল সামরিক ফরমান, আদেশ, অধ্যাদেশ এবং শাসকদের সকল কৃতকর্ম ‘বৈধতা’ অর্জন করে।
ক্স ১৯৮৬-এর ১০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক আইন প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ক্স ১৯৮৭ সালের ১, ২ ও ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের চতুর্দশ জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও সাজেদা চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কার্যনির্বাহী সংসদ গঠিত হয়।
ক্স ১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর দুই বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে বৈঠক হয়। ১৫ দল, ৭ দল এবং ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ৫-দলীয় বাম জোট যুগপৎ আন্দোলনের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছায়। ১০ নভেম্বর বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে ঢাকা অভিযানের কর্মসূচি নেওয়া হয়। সরকার কর্মসূচি ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১০ নভেম্বর ঢাকার সকল প্রবেশ পথ সরকার বন্ধ করে দিলেও হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় সমবেত হয়। সেদিন পুলিশের গুলিবর্ষণে ঢাকার জিরো পয়েন্টের কাছে শরীরে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক’ লিখে বিক্ষোভরত যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে আসা সিপিবি-র কর্মী আমিনুল হুদা টিটু নিহত হয়। সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ১১ নভেম্বর গৃহে অন্তরীণ করে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ব্যাপক ধরপাকড় করে। বিরোধী দলের আহ্বানে ১১ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত অর্ধদিবস এবং ২১ নভেম্বর থেকে একটানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল বাংলাদেশকে অচল করে দেয়। ২৭ নভেম্বর জেনারেল এরশাদ সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
ক্স ১৯৮৮-এর ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ১৫ দলের মিছিলে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৯ জন নিহত হয়। ১৯৮৮ সালের ২৩ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ছোট-বড় প্রায় সকল দল এই নির্বাচন বর্জন করে।
ক্স ১৯৮৮ সালের ১২ এপ্রিল ১৯৮৭-এর ২৭ নভেম্বর জারিকৃত জরুরি আইন প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৮৮ সালের ৭ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিল পাস করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১০ জুলাই পাস করা হয় নবম সংবিধান সংশোধনী।
ক্স ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে তার বাসভবনে ফ্রিডম পার্টির দুষ্কৃতিকারীরা হামলা চালায়। সমগ্র দেশে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
ক্স ১৯৯০ সালের ৫ জুন শেখ হাসিনা অবিলম্বে এরশাদের পদত্যাগ দাবি করেন এবং নতুন করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল (৮ দল) আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়। ১৯৯০-এর ১০ অক্টোবর বিরোধী জোট ও দলগুলোর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিবর্ষণে ৫ জন নিহত হয়।
ক্স ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর ১৫, ৭ ও ৫ দল অর্থাৎ তিন জোট এরশাদের পদত্যাগ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি ফর্মুলা, যা ‘তিন জোটের রূপরেখা’ হিসেবে পরিচিত ঘোষণা করে।
ক্স ১৯৯০-এর ২৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর অব্যাহত ছাত্র ধর্মঘট, পেশাজীবীদের আন্দোলন, হরতাল-সমাবেশ-প্রতিবাদের মুখে শাসকগোষ্ঠী মরিয়া আঘাত হানে। ২৭ নভেম্বর বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে এরশাদের সন্ত্রাসী গু-ারা গুলি করে হত্যা করে। এই দিন বিকেলে শেখ হাসিনাকে আটক করে গৃহবন্দি রাখা হয়। ৪ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। শেখ হাসিনা ১৫ দলের সমাবেশ থেকে ‘এই মুহূর্তে এরশাদের পদত্যাগ’ দাবি করেন। জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ৫ ডিসেম্বর তিন জোট প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব করেন। অবশেষে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর এরশাদ বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। অবসান ঘটে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের।
ক্স ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী জোটভুক্ত দলগুলো ৯৯টি আসন লাভ করে। বিএনপি পায় ১৪২টি আসন। তারপরও সরকার গঠনে বিএনপিকে জামাতের ১৮ সদস্যের সমর্থন নিতে হয়।
ক্স ১৯৯১ সালের ৩১ জুলাই আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন বাকশাল আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ১৪ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে দলের অভ্যন্তরে আবার উপদলীয় কর্মকা- শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ২১ জুন ড. কামাল হোসেন ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট ‘গণতান্ত্রিক ফোরাম’ গঠন করেন। এই গণতান্ত্রিক ফোরামই ১৯৯৩ সালের ২৩ আগস্ট ‘গণফোরাম’ নামে রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ক্স ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গোলাম আযম ও তার সহযোগীদের বিচারের লক্ষ্যে জাহানারা ইমামকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় জাতীয় সমন্বয় কমিটি। ১৫ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ মানুষের সমাবেশে গণ-আদালতের এজলাস বসিয়ে যুদ্ধাপরাধের জন্য গোলাম আযমের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। শেখ হাসিনা একে জনতার বিজয় বলে অভিহিত করেন। কবি সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম ও শেখ হাসিনা এক মঞ্চ থেকে গোলাম আযমের ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবিতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান। সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
ক্স ১৯৯২ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলের দ্বিতীয় দিন ২০ সেপ্টেম্বর নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের সংশোধনী সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। ওই দিন রাত ৮টায় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সমন্বয়ে গঠিত সাবজেক কমিটি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের রুদ্ধদ্বার কক্ষে বৈঠক বসে এবং শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন প্রশ্নে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর ২১ সেপ্টেম্বর ভোর পৌনে ৪টায় জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে কাউন্সিল।
ক্স ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ মেয়র পদে জয়লাভ করেন। কিন্তু সরকার-দলীয় পরাজিত কমিশনার প্রার্থীর ব্রাশফায়ারে ওই দিন ঢাকার লালবাগে ৬ আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থক নিহত হন।
ক্স মিরপুর ও মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপির ভোট ডাকাতি ও কারচুপির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করে। বিরোধী দলগুলো এই দাবি সমর্থন জানায়। গড়ে ওঠে আন্দোলন।
ক্স ১৯৯৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা উত্তরবঙ্গে গণ-সংযোগের জন্য ট্রেন অভিযাত্রা শুরু করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী ও নাটোরে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ, বোমাবাজি, হামলা ও সন্ত্রাসী তা-ব চালায় বিএনপি ক্যাডাররা। ৬ ডিসেম্বর সংসদের বিরোধী দলগুলো পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামাত ও এনডিপি দলীয় সংসদ সদস্যগণ একযোগে পদত্যাগ করেন।
ক্স ১৯৯৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
ক্স ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি কর্তৃক একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচন। তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে খালেদা সরকার পদত্যাগ করে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
ক্স ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ মোট ভোটের ৩৭.৫৩ শতাংশ ভোট ও ১৪৬টি আসন পায়। বিএনপি পায় ৩৩.৪০ শতাংশ ভোট ও ১১৬টি আসন। জাতীয় পার্টি পায় ১৫.৯৯ শতাংশ ভোট ও ৩২টি আসন এবং জামাত পায় ৮.৫৭ শতাংশ ভোট ও ৩টি আসন। বামফ্রন্ট কোনো আসন পায়নি, ভোট পায় ০.৪২ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ জনগণের রায় নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা দিবসে শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন।

১৯৯৬-২০০১ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল
Ñ বিএনপি আমলের খাদ্য উৎপাদন ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে ২ কোটি ৬৯ লাখ টনে উন্নীতকরণ। খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতার পথে দেশ। শেখ হাসিনার জাতিসংঘের ‘সেরেস’ পুরস্কার অর্জন।
Ñ ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদিত। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়।
Ñ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি বন্ধ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর। শেখ হাসিনার ইউনেস্কোর হুফে বয়েনি শান্তি পুরস্কার লাভ।
Ñ যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণকাজ সম্পন্ন।
Ñ নারীর ক্ষমতায়ন। স্থানীয় সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রথা চালু। পিতার সাথে মাতার নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা।
Ñ প্রবৃদ্ধির হার ৬.৪ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং মুদ্রাস্ফীতি ১.৪৯ শতাংশে নামিয়ে আনা। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।
Ñ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দান করে।
ক্স ১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত করে।
ক্স ২০০০ সালের ২৩ জুন পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
ক্স ২০০১-০৬, ১ অক্টোবর কারচুপির নির্বাচন। বিএনপি-জামাত জোটের ক্ষমতা দখল। হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কালো অধ্যায়।
ক্স ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিলে শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। কাউন্সিলের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। নির্বাচিত হয় নতুন নেতৃত্ব। শেখ হাসিনা সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন মো. আবদুল জলিল এমপি।
ক্স ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত। শেখ হাসিনার কানের পর্দা ফেটে গিয়ে আহত।
ক্স ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে বিএনপি-জামাতের নীলনকশার নির্বাচন বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বঘোষিত প্রধানের পদ থেকে ইয়াজউদ্দিনের পদত্যাগ। জরুরি অবস্থা ঘোষণা।
Ñ ড. ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে নতুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ।
Ñ শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে অপসারণের উদ্দেশ্যে মাইনাস টু ফর্মুলা প্রদান।
Ñ ১৬ জুলাই, ২০০৭-এ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার।
Ñ ড. মুহম্মদ ইউনূসের রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা।
Ñ বিএনপিতে সংস্কারবাদীদের ভিন্ন কমিটি গঠন। আওয়ামী লীগে সংস্কারবাদীরা কোণঠাসা।
ক্স ২০০৮ : গণ-আন্দোলনের মুখে মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যর্থ। শেখ হাসিনাকে মুক্তিদান। ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত। ৩০০টির মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ২৬৪টি আসন লাভ।
ক্স ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অষ্টাদশ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে। কাউন্সিলে পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে নতুন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
ক্স ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর দলের আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
ক্স ২০০৯-১৪ জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের সময়কালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। সবগুলো সূচকেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
ক্স ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ থেকে ২০১৬ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের এ সময়কালে দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
Ñ গত ৬ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশ। যেখানে দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৪১.৫ শতাংশ সেখানে ২০১৫ সালে তা ২২.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অতি দারিদ্র্যের হার ২৪.২৩ থেকে ৭.৯২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক চালু; ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব, দরিদ্র্যদের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল। প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ৫ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ ডলার। বাংলাদেশ নি¤œমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিগণিত। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ অবস্থানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩৩তম স্থান অধিকার করেছে। রপ্তানি আয় ৩৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ১৫.৩২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১.০২ বিলিয়ন ডলার।
Ñ নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বই বিতরণ। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির বয়সী শিশুদের প্রায় শতভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলগামী। প্রাথমিক ও নি¤œ মাধ্যমিক স্তরে সফল পাবলিক পরীক্ষার পদ্ধতি প্রচলন। শিক্ষার হার ৭১ শতাংশে উন্নীত। ২৩ হাজার ৩৩১টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ হাজার ১৭২টি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন। মাধ্যমিক পর্যায়ে সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত। ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ। ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ। বিদ্যালয়বিহীন ১ হাজার ১২৫টি গ্রামে নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন।
Ñ মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়ে এখন ৭১ বছর। দক্ষিণ এশিয়ায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। মাতৃমৃত্যু প্রতি হাজারে ১.৭ জন এবং শিশুমৃত্যু ৩০ জনে নেমে এসেছে।
Ñ এমডিজি-তে নির্ধারিত ২০১৫ সালের এই লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ ২০১৩ সালেই অর্জন করেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও সন্তান জন্মদানের সময় মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এমডিজি পুরস্কার প্রদান করেছে জাতিসংঘ। ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
Ñ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫০০০ মেগাওয়াটে। লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। শিল্প-কারখানায় নতুন করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ প্রদান হয়েছে। ৭৮ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ চলছে। এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।
Ñ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। কৃষিতে বিপুল ভর্তুকি, ধানের বাম্পার ফলন। এখন ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, মাছ উৎপাদনে পঞ্চম এবং আলু উৎপাদনে সপ্তম স্থানে রয়েছে।
Ñ উন্নয়নশীল বিশ্বে বাংলাদেশেই প্রথম সোনালি আঁশ পাটের জিন প্রযুক্তির আবিষ্কার। সম্ভাবনার স্বর্ণদুয়ার উন্মোচিত। বন্ধ পাটকল চালু। শিল্পায়নের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ।
Ñ গার্মেন্ট শ্রমিকদের পে-স্কেল পুনর্নির্ধারণ। সরকারি কমকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বর্ধিত বেতন স্কেল কার্যকর করা। শিল্প পুলিশ বাহিনী গঠন। শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
Ñ কর্মসংস্থান ও হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি সম্প্রসারণ।
Ñ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদে শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণে সংশোধিত শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দুই দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। জিডিপিতে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে।
Ñ সফলভাবে ক্রিকেট বিশ্বকাপ অনুষ্ঠান। ক্রীড়াক্ষেত্রে অব্যাহত সাফল্য। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের শীর্ষ দশে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
Ñ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ শুরু। ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে একাধিক উড়াল সেতু নির্মিত হয়েছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ দ্রুতগতিতে অগ্রসরমান। মেট্রোরেল ও বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু। পায়রা সমুদ্র বন্দর ও দেশে প্রথমবারের মতো আট লেনের মহাসড়ক চালু।
Ñ ডিজিটাল দুনিয়ায় বাংলাদেশের অভিযাত্রা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন মোবাইল সিম গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ কোটি ২০ লাখের বেশি। ইন্টারনেট গ্রাহক ৬ কোটি ২০ লাখের বেশি।
Ñ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ভূমিকা পালন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার লাভ।
Ñ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দ-প্রাপ্ত আসামির মৃত্যুদ- কার্যকর। জাতি কলঙ্কমুক্ত।
Ñ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু। ইতোমধ্যে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী, মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, আবুল কাশেমের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযম এবং আবদুল আলিমকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে (দ-াদেশ বহাল থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ)। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী রাজাকারকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। অন্যদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
Ñ বিডিআর বিদ্রোহের শান্তিপূর্ণ সমাধান। সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ।
Ñ সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক ১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক আইন জারি, সামরিক ফরমান বলে সংবিধান সংশোধন ও জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত। ১৯৭২-এর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদসহ মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালা পুনর্বহাল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ সংযোজিত।
Ñ ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার লক্ষ্যে বিএনপি-জামাত জোট সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। আন্দোলনের নামে হিংসাশ্রয়ী ঘটনায় বহু প্রাণহানি ঘটে। বিএনপি-জামাতের প্ররোচনায় হেফাজতে ইসলাম নামে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও সারাদেশে ভয়াবহ তা-ব চালায়। আওয়ামী লীগ ও সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
Ñ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিপুল সাফল্য অর্জিত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। ৪২ বছরের অমীমাংসিত মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে নতুন সমুদ্রসীমা জয় করেছে বাংলাদেশ।
Ñ ভারতের সাথে স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময়ের ফলে দীর্ঘ ৬৮ বছরের মানবিক লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেয়েছে ছিটমহলবাসী।
Ñ বিএনপি-জামাত জোট ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন বর্জন এবং নির্বাচন বানচালের জন্য একই কায়দায় চেষ্টা চালায়। অসাংবিধানিক ধারা সৃষ্টির এই চেষ্টা ও ব্যর্থ হয়।
ক্স ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নারী ও কন্যা শিশুদের সাক্ষরতা ও শিক্ষা প্রসারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘শান্তির বৃক্ষ’ (ট্রি অব পিস) পুরস্কার তুলে দেন ইউনেস্কোর মহাপরিচালক।
ক্স ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর জাতিসংঘের সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন ‘ভিশনারি’ পুরস্কার পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ৯০ দিনব্যাপী বিএনপি-জামাত জোটের নাশকতামূলক ধ্বংসযজ্ঞ। পেট্রলবোমা ও অগ্নিসন্ত্রাসে হাজার হাজার মানুষ হতাহত। জনতার প্রতিরোধে খালেদা জিয়ার পিছুটান।
ক্স ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনীতিতে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমাতে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ‘উইমেন ইন পার্লামেন্ট (ডব্লিউআইপি) গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড’ পায় বাংলাদেশ।
ক্স ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হন।
ক্স ২০১৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থার (আইটিইউ) ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যাত্রা শুরু হয়। এ পর্যন্ত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ২৬৫টি পৌরসভার মধ্যে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ মনোনীত ২০২ প্রার্থী জয়লাভ করেন।
ক্স ২০১৬ সালে ৬ ধাপে দেশের ৪ হাজার ১০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রথমবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৬৭টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বিজয় লাভ করে।
ক্স ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলাÑ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সফল অভিযান; শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানা থেকে সশস্ত্র জঙ্গিদের আটক। উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সৃষ্ট জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত স্থাপন।
ক্স ২০১৬ সালের  ২২ সেপ্টেম্বর লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ ও ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার প্রদান করে জাতিসংঘ।
ক্স ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সংখ্যা ৭১ থেকে ৮১-তে উন্নীত করা হয়। একইভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যান্য শাখার কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড গঠনসহ বেশ কিছু সংশোধনী ও নতুন ধারা সংযোজিত হয়।
ক্স ২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউসকুপারস (পিডব্লিউসি) বলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে শীষ ৩টি দেশের একটি হবে বাংলাদেশ।
ক্স ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাবী উত্থাপিত হওয়ায় ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করা হয়  এবং ২০১৭ সালের ২৫ মার্চ রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ পালিত হয়।
ক্স ২০১৭ সালের ১২ মার্চ  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে বানৌজা ঈশা খাঁ ঘাঁটিতে ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’ নামে দুইটি সাবমেরিন কমিন করেন। এর মধ্যে দিয়ে বিশ্বের ৪১টি দেশের পর বাংলাদেশও সাবমেরিন এলিট জাতিভুক্ত হয় এবং প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
ক্স ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংসদীয় সংস্থা ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউ’র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আইপিইউ’র ১৩৬তম সম্মেলনে সারাবিশ্বের ১৩২টি দেশের দেড় সহ¯্রাধিক প্রতিনিধি যোগদান করেন। সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৭ সালের ২০ মে জননেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়।
ক্স ২০১৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর স্বল্প খরচে উন্নতমানের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রদানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা। নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দান ও তাদের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করায় ব্রিটেনভিত্তিক গণমাধ্যম চ্যানেল ফোর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা মানবতার জননী বলে ভূষিত করেন।
ক্স ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা প্রতিবেদন ২০১৭-১৮’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা সূচকে (জিসিআই) এক বছরে সাত ধাপ এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
ক্স ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৭ সালের ১-৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন সিপিএ-এর ৬৩তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাইস প্যাট্রন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সিপিএ নির্বার্হী কমিটির চেয়ারম্যান ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
ক্স ২০১৭ সালের ১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বস’র জরিপে বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় প্রদানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০তম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ক্স ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ‘জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজ রেজিস্টার’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে ঘোষণা করে।
ক্স ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৭ সালের নভেম্বরে পিপলস অ্যান্ড পলিটিকসের গবেষণা প্রতিবেদনে সৎ সরকার প্রধান হিসেবে বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি সেবা ফোর-জি সেবা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে ২০১৮ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করে বাংলাদেশ।
ক্স ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ‘গ্লোবাল সামিট অন উইমেন’ প্রদানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাকে ‘গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।
ক্স ২০১৮ সালের ১১ মে শুক্রবার (বাংলাদেশ সময়) দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মহাকাশ কেন্দ্র ‘স্পেস-এক্স’ থেকে নিজস্ব উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ।
ক্স ২০১৮ সালের ২৬ মে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৯তম জন্মজয়ন্তীতে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার (ডি-লিট)’ প্রদান করে।  গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন থেকে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ সম্মাননা প্রদান করে ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’।
ক্স ২০১৮ সালের ২৩ জুন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ’য়ের পুরনো ঠিকানায় দশমতলা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক ও সুদৃশ্য নিজস্ব ভবন উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৮ সালের ২৩ জুন গণভবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ক্স ২০১৮ সালের ৭ জুলাই গণভবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৃতীয় পর্যায়ের বিশেষ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ক্স ২০১৮ সালের ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) বিল-২০১৮ পাসের মধ্য দিয়ে সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়।
ক্স ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে মানবিক ও দায়িত্বশীল নীতির জন্য অনন্য নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল ডিস্টিংকশন অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট’ প্রদান করা হয়।
ক্স ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর হোটেল সোনারগাঁওয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা।
ক্স ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২৫৯টি আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং ১৪ দলীয় জোটের শরীরা ৯টি আসনে বিজয় লাভ করে।
ক্স গত ৭ জানুয়ারি দেশের ইতিহাসে নজির ও রেকর্ড সৃষ্টি করে চতুর্থবারের মতো এবং টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

Category:

ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিব

Posted on by 0 comment

PddMড. এম আবদুল আলীম: বাঙালির হাজার বছরের রাজনীতির আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘তিনি তো শুধু একটি ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন সারা বাংলাদেশের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক।’ চিরকালের উপেক্ষিত বাঙালি তাঁর নেতৃত্বেই ইস্পাতকঠিন ঐক্যে সংঘবদ্ধ হয়েছে এবং লাভ করেছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম মানচিত্র ও গৌরবদীপ্ত পতাকা। এজন্য অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে ‘নেতাজী সুভাষবসুর পর বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ বীর’ বলে অভিহিত করেছেন।
বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক অবিচ্ছিন্ন সত্তা। বাঙালির আবাসভূমি খ্রিষ্টপূর্বকালে বঙ্গাঃ, পু-াঃ, গৌড়াঃ; ঐতরেয় আরণ্যক-এ বঙ্গাঃ; রামায়ণ-মহাভারত-এ বঙ্গ; চর্যাপদ-এ বঙ্গাল দেশ; শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমলে ‘বাঙ্গালা’ কিংবা ইংরেজ শাসনে ‘বেঙ্গল’ নামে পরিচিতি হলেও, কোনোকালেই স্বতন্ত্র স্বাধীন ভূখ- ছিল না। দীর্ঘকালের ইতিহাস-পরিক্রমায় বাংলার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক স্বাধিকার-প্রমত্ত তেজোদীপ্ত মানুষ। তাদের বীরত্ব-বিদ্রোহ বাঙালির চেতনায় স্বাজাত্যবোধ ও স্বাধিকার-চেতনা অগ্নিমশাল প্রজ্বালিত করলেও, তা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার পথ খুঁজে পায়নি।
কালে কালে অধিকারের প্রশ্নে বাঙালি জেগে উঠলেও, সূর্যের তেজে চির-অমøান স্বাধীনতার বীজ এই জাতির চেতনায় প্রথম উপ্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর; এবং সেটা হয়েছিল ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে, যার অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তখন এদেশের ছাত্রসমাজকে তিনি সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিলেন; ‘প্রকৃতপক্ষে বাংলার ছাত্র আন্দোলনের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা।’ ভাষা-আন্দোলনের চেতনার তরুণ সমাজের অস্তিত্বের মর্মমূলে প্রোথিত করে তার লালন, বিকাশ ও মহীরুহ-রূপদানের ক্ষেত্রে তিনি পালন করেন অগ্রসেনানীর ভূমিকা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অবদানের কথা স্বীকার করেও বলা যায়, শেখ মুজিবই স্বাঙালির স্বাধিকার-সংগ্রামের মূল নেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বাংলার জনগণের কাছে পরিচিতি লাভ করলেও, সাতচল্লিশের দেশভাগের পর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হওয়ার প্রথম সোপান, অর্থাৎ ভাষা-আন্দোলন থেকেই পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকায় তার বর্ণাঢ্য ও সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের গোড়াপত্তন ঘটে।
ভাষা-সংস্কৃতির গৌরবে বলীয়ান, দীর্ঘকালের ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ বাঙালি জাতি আপন অস্তিত্বের অহঙ্কারে তীব্র আক্রোশ আর বীরত্বের হুঙ্কারে প্রথম জেগে উঠেছিল ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে। বাঙালির এই জাগরণের মূলে ছিল মাতৃভাষার প্রতি গভীর দরদ ও ভালোবাসা। দুর্যোগ-দুঃশাসন কবলিত বাঙালির বাঙালিত্বের অহমিকা এমন বজ্রকঠিনরূপে আর কখনও প্রকাশ পায়নি। ভাষা-আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ও অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বাংলা মায়ের তেজোদীপ্ত সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ’৫৪-র নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান করে তিনি হয়ে ওঠেন এ ভূখ-ের মুক্তিকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। শুধু তাই নয়, বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের মূল নায়ক ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান নেতা হিসেবে তিনি ইতিহাসে লাভ করেছেন গৌরবোজ্জ্বল স্থান। নিজের সংগ্রামী জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলার কোটি কোটি মানুষের কাছে লাভ করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি এবং জাতির জনকের মর্যাদা।

ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ
প্রায় দু-শো বছরের ইংরেজ শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হলে স্বাধীনতার গৌরবে গৌরবান্বিত পূর্ববাংলার মানুষ আশায় বুক বাঁধে এবং নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর হয়। তারা ভেবেছিল এবার শোষণ-বঞ্চনা মুক্ত একটি সুন্দর জীবন পাবে, পাবে স্বাধীনতার সুফল। কিন্তু বিধি বাম! তাদের সে আশা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। ‘স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিম লীগ পাকিস্তানের জনগণের আশা আকাক্ষার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে।’ এর ফলে বাঙালির স্বপ্নেরও ঘটে অপমৃত্যু। কুচক্রী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকÑ সকল দিক থেকেই পূর্ববাংলার মানুষের টুটি চেপে ধরে। বাঙালির আত্মজাগরণ ও স্বকীয় সত্তাকে চিরতরে স্বব্ধ করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে আঘাত হানে বাঙালির অস্তিত্ব তথা তাদের ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর। পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সরকার সুকৌশলে দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা বর্জন শুরু করে। এ কাজে জনমত গঠন করতে মাঠে নামায় কিছু তল্পিবাহক বুদ্বিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকে। এরই প্রতিবাদে শুরু হয় ভাষা-আন্দোলন।
বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তান সরকারের প্রথম প্রত্যক্ষ অবজ্ঞা ও আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি; এবং সেটা হয় পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব নাকচের ফলে। এর প্রতিক্রিয়ায় পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। মাতৃভাষা বাংলাকে অবহেলার প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমে আসে। বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার প্রশ্নে সর্বপ্রথম দাবি তোলে গণ-আজাদী লীগ নামক একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন। এরপর ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামের আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাষা করার দাবি তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কিছু সংস্কৃতি-কর্মী। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরদার করতে গড়ে তোলা হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ববাংলার ছাত্র, তরুণ ও যুবসমাজের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসেবে জন্মলাভ করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। এর ফলে ভাষা-আন্দোলনে আসে নতুন গতিবেগ। এতদিন যে আন্দোলন প্রধানত বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর ছাত্রসমাজের মধ্যে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে দেশব্যাপী কাজ শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের সম্মিলিত সভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে পুনর্গঠন করা হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। ঐদিন পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতারের শিকার হন অনেক ছাত্র ও যুবনেতা। কারাবন্দি করা হয় অনেককে। এরপর আন্দোলনকে স্তিমিত করতে মুসলিম লীগ সরকার সুকৌশলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ৮-দফা চুক্তি করে এবং কারাবন্দিদের মুক্তি দেয়। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ছাত্ররা তার সামনেই ‘নো-নো’ বলে চিৎকার করে ওঠে। জিন্নাহর সফরের পর ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।
ভাষা-আন্দোলনের প্রবল রূপ লক্ষ করা যায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। নানা কারণে পূর্ববাংলার মানুষের মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়, যার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের পল্টন ময়দানের জনসভায় উর্দুকে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার পর। তার এই ঘোষণায় ফুঁসে ওঠে পূর্ববঙ্গের ছাত্রসমাজ তথা সর্বস্তরের মানুষ। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে আহ্বান করা হয় এক সর্বদলীয় সভা। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় চল্লিশ সদস্যের ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।
‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে সকল প্রকার মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে এবং ১৪৪ ধারা জারি করে। সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনা এবং ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের লক্ষ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অফিসে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর এক সভা আহ্বান করা হয়। সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে পক্ষে-বিপক্ষে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অবশেষে আসে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় হাজার হাজার ছাত্র ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে হয় বিশাল সভা। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত ঐ সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভেঙে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে রাজপথে নেমে আসে বাংলার দামাল সন্তানেরা। এরপর পুলিশের সঙ্গে চলে দফায় দফায় সংঘর্ষ। বেলা তিনটার পর ঘটে মর্মান্তি ট্র্যাজেডি। কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই পুলিশ মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে রফিক-বরকতসহ অনেকে শহিদ হন, আহত ও গ্রেফতার হন অগণিত মানুষ। প্রতিবাদে ফুঁসে ঢাকাসহ সারাদেশ। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দেশজুড়ে চলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। ঢাকা শহরে এদিন শহিদ হন সালাম-শফিউরসহ অনেকে। আন্দোলন যতই দানা বেঁধে ওঠে, সরকারি নির্যাতনও ততই বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যেই গড়ে তোলা হয় ভাষাশহিদদের স্মৃতিঅমøান করে রাখার শহিদ মিনার। এরপর সরকারি দমন-পীড়নে ধীরে ধীরে আন্দোলনের গতি থেমে আসে। আন্দোলন থামলেও নির্বাপিত হয় না চেতনার বহ্নিশিখা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ভাষা-আন্দোলনের চেতনায় জাগরুক বাঙালি ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে পতন ঘটায় মুসলিম লীগ সরকারের। নানা কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়।
ভাষা-আন্দোলন ছিল পাকিস্তান সরকারের নানাবিধ শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলন গড়ে তুলতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন পালন করে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা। এর মধ্যে গণ-আজাদী লীগ, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন, লেবার ফেডারেশন, ইসলামি ভাতৃসংঘ প্রভৃতি সংগঠনের ভূমিকা অতি উজ্জ্বল। সার্বিকভাবে বলা যায়, ভাষা-আন্দোলনে মূল নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা। পরে এতে যুক্ত হয় পূর্ববাংলার সর্বস্তরের মানুষ।
ভাষা-আন্দোলনের কথা বলতে গেলে অসংখ্য নাম সামনে চলে আসে। সকলের নাম স্বল্পপরিসরে তুলে ধরা কঠিন, তবুও যাদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারণ করতে হয়, তারা হলেনÑ কামরুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাসেম, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, আবুল হাশিম, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, আবদুল গফুর, নূরুল হক ভূঁইয়া, শামসুল আলম, নাইমউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, খালেক নেওয়াজ খান, এমএ ওয়াদুদ, মোহাম্মদ সুলতান, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, শহীদুল্লাহ কায়সার, গোলাম মাওলা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ইমাদুল্লাহ, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, আবদুস সামাদ আজাদ, কামরুজ্জামান, শামসুল হক চৌধুরী, এম নূরুল আলম, বদরুল আলম, মুজিবুল হক, জিল্লুর রহমান, এম আর আখতার মুকুল, আহমদ রফিক প্রমুখ। রাজনৈতিক অঙ্গনের পুরোধা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীসমাজও এই আন্দোলনে রেখেছেন অনন্য অবদান। মূলত, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাংলা ভাষাবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রথম লেখনী ধারণ করেছিলেন এবং সোচ্চার হয়েছিলেন পূর্ববাংলার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ। এদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবদুল হক, ড. এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, আই এইচ জুবেরী, মাহবুব জামাল জাহেদী, হাসান হাফিজুর রহমান, আনিসুজ্জামান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা
পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী শেখ মুজিবুর রহমান অতি অল্প বয়সে রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হন। শৈশবেই তার মধ্যে জাগ্রত হয় অন্ন-বস্ত্রহীন মানুষের প্রতি দরদ ও গভীর মমত্ববোধ। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শেখেন। ধীরে ধীরে বয়স যতই বাড়তে থাকে ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে বৃদ্ধি পায় তার বিচরণ। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে তার মধ্যে জাগ্রত হয় স্বাধিকারবোধ, জাতীয়তাবাদী চেতনা ও নেতৃত্বদানের গুণাবলি। জাতির মুক্তি আকাক্সক্ষা আর পরাধীনতার জটাজাল ছিন্ন করতে তিনি যুক্ত হন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। কলকাতায় অবস্থানকালে নেতাজী সুভাষ বসু হয়ে ওঠেন তার রাজনীতির প্রেরণাপুরুষ। যুক্ত হন হলওয়েল মনুমেন্ট বিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধসহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ফরিদপুর তথা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের বিজয়লাভে রাখেন বিশেষ অবদান। এভাবে ব্রিটিশশাসিত বঙ্গদেশে যৌবনকালেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সঙ্গীদের নিয়ে ‘কর্মীশিবির’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে নতুন ধারার কল্যাণধর্মী রাজনীতি গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তিনি সে প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রগতিশীল ও উদার রাজনৈতিক বলয়ের বন্ধু-বান্ধব ও সহযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তোলেন গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রভৃতি সংগঠন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে কার্যনির্বাহী কমিটিতে যুক্ত হন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করলে তিনি প্রথম থেকেই প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সরকারি নানা অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণের পাশাপাশি লিফলেট ছেপে তা জনসাধারারণের মাঝে বিতরণ করেন। ভাষা-আন্দোলন বেগবান করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে আয়োজিত সর্বদলীয় সভায় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হলে তিনি তার সদস্য মনোনীত হন। ঐ সভায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১১ মার্চ ধর্মঘট ও ‘দাবি দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে এই কর্মসূচি সফল করার জন্য জেলায় জেলায় চলে সাংগঠনিক সফর।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘটের পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করেন। এরপর ঢাকায় ফিরে ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে এক সভায় ১১ মার্চের কর্মসূচিতে কে, কোথায়, কী দায়িত্ব পালন করবেÑ তা নির্ধারণ করেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : `Secret information was received on 12.3.48 that the subject (Bangabandhu) along with others took part in the discussions held at Fazlul Haq Hall on 10.3.48 and gave opinion in favour of violating section 144 cr.p.c. on 11.3.48. On this decision, small batches of Hindu and Muslim students were sent out on 11.3.48 to picket the G.P.O., the secretariat and other important Govt. officers. The subject (Bangabandhu) was arrested on 11.3.48 for violating the orders…. He took very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan, and made propoganda at Dacca for general strike on 11.3.48. on this issue. On 11.3.48 the subject was arrested fo violating orders under section 144 Cr. P.C.` ১১ মার্চ সকালে কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি জেনারেল পোস্ট অফিস ও ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পিকেটিং করেন। পিকেটিং করার সময় পুলিশি হামলার শিকার ও গ্রেফতার হন। শেখ মুজিবসহ অনেককে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি অসাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ‘১১ই মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলো।… সকাল নয়টায় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনের দরজায় লাঠিচার্জ হল। খালেক নেওয়াজ খান, বখতিয়ার, শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. ওয়াদুদ গুরুতররূপে আহত হল।… আমাদের উপর কিছু উত্তম মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল।… আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।’ কারাগারের রোজনামচায় তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন : ‘প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আবদুল ওয়াদুদ-সহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।’
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিসহ বিভিন্নজনের স্মৃতিচারণেও স্থান পেয়েছে ১১ মার্চের ধর্মঘট পালনের বিবরণ। তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে লিখেছেন : ‘১১ মার্চ ’৪৮, বৃহস্পতিবার : … সকাল ৭টায় সাধারণ ধর্মঘটের পক্ষে কাজ করতে বেরিয়ে প্রথমে এফএইসএম হলে গেলাম। তোয়াহা সাহেব এবং আমি একসঙ্গে কাজ করছি। রমনা পোস্ট অফিসের কাছে তোয়াহা সাহেব ও অন্য কয়েকজন পুলিশ কর্তৃক আটক হলেন। আমি গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হলাম। একটু পরে তোয়াহা সাহেবকে পুলিশ ছেড়ে দিল। ১২টায় পিকেটিং বন্ধ হলে ১টায় নাইমউদ্দীন সাহেবের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভা হলো। বেলা ২টায় সচিবালয় অভিমুখে মিছিল শুরু হলে পুলিশ হাইকোর্ট গেটের কাছে বাধা দিল। আমরা উত্তর গেটের দিকে রওয়ানা হলাম। তখনই পুলিশ লাঠিচার্জ করল। তোয়াহা সাহেবকে মারাত্মক মারধর করল, অন্যরাও মার খেল। কোথাও যেতে পারলাম না। সাড়ে ৩টায় সভার পর সবাই চলে গেল। মুজিব, শামসুল হক, মাহবুব, অলি আহাদ, শওকত, আনসার ও অন্যান্য ৬৯ জনকে আটক করে জেল হাজতে রাখা হয়েছে। ১৪ জন আহত হয়ে হাসপাতালে। সেন্ট্রাল জেল, কোতয়ালি ও সূত্রাপুর থানা এবং হাসপাতালে তাদের সঙ্গে দেখা করলাম।… বি. দ্র. পুলিশের নির্যাতন ও ভাড়াটে গু-াদের গু-ামি সত্ত্বেও আজকের ধর্মঘট চমৎকার সফল হলো।’
১১ মার্চের ধর্মঘটে পুলিশের লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আন্দোলন আরও প্রবল রূপ ধারণ করে। এই আন্দোলন প্রশমন এবং পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ববঙ্গ সফর শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ৮-দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ হয়েছে কি না তা কারাগার থেকেই দেখে দেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। এদিকে ‘শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৬-৩-৪৮-এ গোপালগঞ্জে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এস এন একাডেমি এবং এম এন ইনষ্টিটিউটের ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “নাজিমুদ্দীন নিপাত যাক”, “মুজিবকে মুক্তি দাও”, “অন্য গ্রেফতারকারীদের মুক্তি দাও” ইত্যাদি সেøাগান দেয়।’ তবে তার আগেই ১৫ মার্চ, ১৯৪৮ তিনি মুক্তি লাভ করেন।
১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন : ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেলা দেড়টায় সভা শুরু হলো। মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সংশোধনীগুলি গৃহীত হলো এবং অলি আহাদের মাধ্যমে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলো।’ সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “১৬ই মার্চ আবার বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় সভা হয়, আমি সেই সভায় সভাপতিত্ব করি। আবার বিকালে আইনসভার সামনে লাঠিচার্জ হয় ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হয়। প্রতিবাদের বিষয় ছিল, ‘নাজিমুদ্দীন সাহেবের তদন্ত চাই না, জুডিশিয়াল তদন্ত করতে হবে।’ ২১শে মার্চ বা দুই একদিন পরে কায়েদে আজম প্রথম ঢাকায় আসবেন। সেই জন্য আন্দোলন বন্ধ করা হলো। আমরা অভ্যর্থনা দেওয়ার বন্দোবস্ত করলাম।” ১৬ মার্চের সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্ব করা প্রসঙ্গে শওকত আলী লিখেছেন : ‘১৬ তারিখ সকাল থেকে আমরা সভার ব্যাপারে কাজকর্ম করতে থাকলাম এবং বেলা দেড়টা দুটোয় সভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হলো। সভায় সভাপতিত্ব করলো শেখ মুজিবর রহমান। সেই বক্তৃতা করলো এবং একটি মিছিল নিয়ে আমরা Assembly House-এর দিকে গেলাম।’
১৭ই মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের পালিত হয়। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ বক্তৃতা করেন। সন্ধ্যার পর ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভা অনুষ্ঠিত হয়, এই সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যোগদান করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : ‘সন্ধ্যার পরে খবর এল ফজলুল হক হলে সংগ্রাম পরিষদের সভা হবে। ছাত্ররাও উপস্থিত থাকবে। আমার যেতে একটু দেরি হয়েছিল। তখন একজন বক্তৃতা করছে আমাকে আক্রমণ করে। আমি দাঁড়িয়ে শুনলাম এবং সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। তার বক্তৃতা শেষ হলে আমার বক্তব্য বললাম। আমি যে আমতলার ছাত্রসভায় বলেছিলাম, কাগজ দিয়েই চলে আসতে এবং এ্যাসেম্বলি হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে সকলকে চলে যেতে অনুরোধ করেছিলাম এবং বক্তৃতাও করেছিলাম, একথা কেউ জানেন কি না? যা হোক, এখানেই শেষ হয়ে গেল, আর বেশি আলোচনা হল না এবং সিদ্ধান্ত হল আপাতত অমাদের আন্দোলন বন্ধ রাখা হল। কারণ, কয়েকদিনের মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম ঢাকায় আসবেন পাকিস্তান হওয়ার পরে। তাঁকে সম্বর্ধনা জানাতে হবে।’
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঢাকার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনার জবাবে তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন এবং রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন : ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।’ তাঁর এ বক্তব্য সকলে নির্বিচারে গ্রহণ করেনি। তাই ‘সভার এক প্রান্তে প্রতিবাদের ধ্বনি উত্থিত হয় এবং যাঁরা এই ধ্বনি তুলেছিলেন তাঁদের নেতৃত্বদান করেন শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদ এবং আবদুল মতিন। যদিও এই প্রতিবাদের সুর খুব প্রচ- ছিল না, তবু পাকিস্তানের জাতির জনক এই প্রথম প্রকাশ্য জনসভায় একটি অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেলেন।’ এ প্রসঙ্গে নূহ-উল-আলম লেনিন লিখেছেন : ‘জিন্নাহ তাঁর বক্তৃতায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। নো নো বলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ছাত্র।’ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড় দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” আমরা প্রায় চার পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিল, ‘মানি না।” তিনি কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন : “তিনি [জিন্নাহ] এসে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ ছাত্ররা তাঁর সামনেই প্রতিবাদ করল। রেসকোর্স ময়দানেও প্রতিবাদ উঠল। তিনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন এরপরে কোনোদিন ভাষার ব্যাপারে কোনো কথা বলেন নাই।”
পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ধুরন্ধর ব্যবহারজীবী ‘জিন্নাহ তাঁর চাতুর্য ও কূটবুদ্ধি প্রয়োগ করে আন্দোলনটির মূল খাত পাল্টে দিলেন, এর লক্ষ্যকে কক্ষচ্যুত করে দিলেন।’ এরপর ভাষা-আন্দোলন ধীরে ধীরে থেমে গেলেও ভাষার প্রশ্নে চলতে বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা। ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সামনে অনুষ্ঠিত এক সভায় কতিপয় ছাত্রনেতা উর্দুপ্রীতিমূলক বক্তৃতা দিলে শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিবাদ জানান। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : “জিন্নাহ চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে ফজলুল হক হলের সামনে এক ছাত্রসভা হয়। তাতে একজন ছাত্র বক্তৃতা করছিল, তার নাম আমার মনে নাই। তবে সে বলেছিল “জিন্নাহ যা বলবেন, তাই আমাদের মানতে হবে। তিনি যখন উর্দুই রাষ্ট্রভাষা বলেছেন তখন উর্দুই হবে।” আমি তার প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করেছিলাম, আজও আমার এই একটা কথা মনে আছে। আমি বলেছিলাম, “কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তা প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে। যেমন হযরত ওমরকে (রা.) সাধারণ নাগরিকরা প্রশ্ন করেছিলেন তিনি বড় জামা পরেছিলেন বলে। বাংলা ভাষা শতকরা ছাপ্পান্নজন লোকের মাতৃভাষা, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাতে যাই হোক না কেন, আমরা প্রস্তুত আছি।” সাধারণ ছাত্ররা আমাকে সমর্থন করল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবকরা ভাষার দাবি নিয়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে চলল।”
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন লিয়াকত আলী খান। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। তার সফরকে কেন্দ্র করে ‘১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি বৈঠক বসে। আজিজ আহমদ, আবুল কাসেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান, আনসার এবং তাজউদ্দীন আহমদ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।’ এতে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।
ভাষা-আন্দোলন ও বিভিন্ন ছাত্র-আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে গঠন করা হয় ‘জুলুম প্রতিরোধ কমিটি’। ১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ‘জুলুম প্রতিরোধ’ কমিটির উদ্যোগে হরতাল, মিছিল ও ছাত্র-সমাবেশ আয়োজন করা হয়। ‘ছাত্রসমাজের উপর দমননীতির ষ্টীমরোলার’ শিরোনামে একটি ইশতেহারও প্রকাশ করা হয়। এ কর্মসূচি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে একটি সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। ৮ জানুয়ারির সভা সম্পর্কে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : `In connection with the observance of the Anti-repression Day at Dacca on 8.1. 49 the subject [Sheikh Mujibur Rahman] bitterly criticised the Government for it’s alleged repressive measures against the students and suggested Direct Action if the demands of the students were not met.`
সভায় ছাত্রদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য সরকারকে এক মাসের সময় দেওয়া হয়। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : “ছাত্ররা আমাকে কনভেনর করে জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালন করার জন্য একটি কমিটি করেছিল। একটা দিবসও ঘোষণা করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলার সমস্ত জেলায় এই দিবসটি উদ্যাপন করা হয়।… এই প্রথম পাকিস্তানে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির আন্দোলন এবং জুলুমের প্রতিবাদ। এর পূর্বে আর কেউ সাহস পায় নাই। তখনকার দিনে আমরা কোনো সভা বা শোভাযাত্রা করতে গেলে এক দল গু-া ভাড়া করে মারপিট করা হতো এবং সভা ভাঙার চেষ্টা করা হতো। ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবসে’ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও কিছু গু-া আমদানি করা হয়েছিল। আমি খবর পেয়ে রাতেই সভা করি এবং বলে দেই, গু-ামির প্রশ্রয় দেয়া হলে এবার বাধা দিতে হবে। আমাদের বিখ্যাত আমতলায় সভা করার কথা ছিল; কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মাঠে মিটিং করলাম। একদল ভাল কর্মী প্রস্তুত করে বিশ্ববিদ্যালয় গেটে রেখেছিলাম, যদি গু-ারা আক্রমণ করে তারা বাধা দিবে এবং তিন দিক থেকে তাদের আক্রমণ করা হবে যাতে রমনা এলাকায় গু-ামি করতে না আসেÑ এই শিক্ষা দিতে হবে।”
১৯৪৯ সালের ১১ মার্চেও ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ কর্মসূচি পালনের প্রধান উদ্যোক্তা। আর সেজন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। ড. মযহারুল ইসলাম বলেছেন : ‘১৯৫০ সালের ১১ই মার্চ গণ-আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। দেশের পরিস্থিতি উপলব্ধি করে পূর্ব বাংলার তৎকালীন নূরুল আমীন সরকার দমননীতির মাধ্যমে আন্দোলনের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা চালালেন। ১১ই মার্চের সংগ্রাম দিবসের কর্মসূচির প্রধান উদ্যোক্তা শেখ মুজিবকে পুনরায় কারারুদ্ধ করা হয়।’
ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অতি উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি এই আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত, ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে তিনি ঢাকার ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হন এবং নিজের সাংগঠনিক দক্ষতায় নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের শক্ত ভিত নির্মাণ করেন।

বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় শেখ মুজিব কারাগারে বন্দি ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৫০ সালে গ্রেফতার হন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে গুলি হয়। সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেক শহীদ রক্ত দেয়। বঙ্গবন্ধু তখনও বন্দি। বন্দি থাকা অবস্থায়ও ছাত্রদের সাথে সবসময় তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতেন।’ বস্তুত, ‘জেল থেকেই তিনি তাঁর অনুসারী ছাত্র নেতাদের গোপনে দিক-নির্দেশনা দিতেন।’ শুধু তাই নয়, তিনি ‘জেল থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।’ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছেন :
১৯৫২ সালের একুশের আন্দোলনে তিনি জেলে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থেকে নানাভাবে তিনি আন্দোলনের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ঐ সময়টায় তাঁর স্বাস্থ্য খুব ভেঙে পড়ে, তাই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তখন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ভবনে অবস্থিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সে সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গভীর রাতে রাজনৈতিক বিষয় ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা করতেন।
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালের ৩০শে আগস্ট থেকে ১৯৫২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে বেশ কয়েকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঐ সময় আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, চিকিৎসক, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। ১৯৫১ সালের ১৩ই নভেম্বরের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঐদিন সকাল ৯টায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে তাঁর কয়েকজন পুরনো বন্ধু, আনোয়ারা বেগম এমএনএ, খয়রাত হোসেন এমএনএ, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আহমদ হোসাইন এবং প্রায় ৩০ জন মেডিকেল ছাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩০শে নভেম্বর ১৯৫১ তারিখে সকাল ৯.১৫টায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান ও জনৈক নজরুল ইসলাম। তাঁরা ৯.১৫টা থেকে ৯.৪৫টা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আব্দুস সালাম খান নামক এক গোয়েন্দা সদস্য একটু দূরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও, তাঁরা কি বিষয়ে আলাপ করেন, তা শুনতে পাননি বলে ৩০শে নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখের গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।
১৯৫২ সালের ২৫শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, আজিজ আহমদ; পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ; পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক চৌধুরী ও সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুুব। তারা সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে নানা আলাপ করেন। এভাবে হাসপাতালের কেবিন থেকে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ‘পুলিশের নজরকে ফাঁকি দিয়ে তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা এবং ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে পরামর্শ প্রদান’ করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, সেখানে বসেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকা- চালাতে থাকেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা সফরে এসে ১৯৫২ সালে ২৭শে জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উক্তি পুনর্ব্যক্ত করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গের ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেন ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের। কেবল তাই নয়, ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র আহ্বায়ক যাতে ছাত্রলীগ থেকেই করা হয়, সে বিষয়েও শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশনা দেন। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং বিভিন্ন ভাষণে তিনি বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : ‘আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে।… বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে।… সেখানেই ঠিক হল, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত গঠন করতে হবে।’
কারাগারের রোজনামচায় তিনি আরও স্পষ্ট করে লিখেছেন : ‘জানুয়ারি মাসে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।… আমি তখন বন্দি অবস্থায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাত্রের অন্ধকারে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সহায়তায় নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদের দিন স্থির করা হয়। আমি ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন শুরু করব মুক্তির জন্য। কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, মোল্লা জালালউদ্দিন, মোহাম্মদ তোয়াহা, নাঈমুদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, আজিজ আহম্মদ, আবদুল ওয়াদুদ ও আরো অনেকে গোপনে গভীর রাতে আমার সঙ্গে দেখা করত।’ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুবের আহ্বায়ক নির্বাচিত হওয়া, সভায় গৃহীত প্রস্তাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির শর্ত যুক্ত করা প্রভৃতি বিষয় পর্যালোচনা করলে এ বিবরণের বস্তুনিষ্ঠতা খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রাধান্য থেকেও এটা অনুধাবন করা যায়। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন : ‘অনেকে ইতিহাস ভুল করে থাকেন। ১৯৫২ সালের আন্দোলনের তথা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস আপনাদের জানা দরকার। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বন্দী অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সেখানেই আমরা স্থির করি যে, রাষ্ট্রভাষার ওপর ও আমার দেশের ওপর যে আঘাত হয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে তার মোকাবেলা করতে হবে। সেখানেই গোপন বৈঠকে সব স্থির হয়।’
বস্তুত, ‘জেল থেকেই তিনি তাঁর অনুসারী ছাত্র নেতাদের গোপনে দিক-নির্দেশনা দিতেন।’ শুধু তাই নয়, তিনি ‘জেল থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।’ এ প্রসঙ্গে ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছেন : ‘১৯৫২ সালের একুশের আন্দোলনে তিনি জেলে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থেকে নানাভাবে তিনি আন্দোলনের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ঐ সময়টায় তাঁর স্বাস্থ্য খুব ভেঙে পড়ে, তাই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তখন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ভবনে অবস্থিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সে সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গভীর রাতে রাজনৈতিক বিষয় ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা করতেন।’
লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত]

Category:

কৃষকবান্ধব আওয়ামী লীগ

Posted on by 0 comment

PddMসরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। তাই বাংলার গণমানুষের মনে অতি অল্প সময়ে স্থান করে নিয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘোষিত ঐতিহাসিক ২১-দফায় ৬টি দফাই ছিল বাংলার কৃষি ও কৃষকের উন্নতির জন্য। যার প্রধান লক্ষ ছিল খাজনাভোগী স্বার্থ বিলোপ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃষিকে আধুনিক যুগোপযোগী করে খাদ্যে দেশকে স্বাবলম্বী করা হবে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কৃষকের পক্ষে কথা বলেছেন, ষাটের দশকে ৬-দফার আন্দোলনে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সোচ্চার হয়েছেন। আর স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও থেকেছেন সর্বক্ষণ কৃষক অন্তপ্রাণ মানুষ।
শোষণহীন সমাজ গঠনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু। তার শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের জমিনের বড় অংশই জুড়ে ছিল বাংলাদেশের কৃষক। এ-কারণে দেশের দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ডাক দেন সবুজ বিপ্লবের (কৃষি বিপ্লবের)। এই পদাঙ্কানুসারে কৃষকদের বাঁচানোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। পিতার কৃষকপ্রীতি মনে রেখেই তিনি কৃষকের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। খাদ্য ঘাটতির দিশেহারা এই দেশে হাতে নিয়েছেন কৃষি উন্নয়নের কাঠামোগত সংস্কার কর্মযজ্ঞ। তাই দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে।
বঙ্গবন্ধু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেই কৃষিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রণীত পরিকল্পনায় কৃষি গবেষণা, শিক্ষায় মেধাবীদের আকর্ষণ করার লক্ষ্যে বৃত্তি বরাদ্দ বাড়ান এবং একক ও বহুমুখী কৃষিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা দ্বারা দ্রুত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য হাতে নিয়েছিলেন কৃষির ব্যাপক আধুনিকীকরণ। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থ-সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতিতে কৃষিবিদদের ঘোষণা দেন প্রথম শ্রেণির পদ মর্যাদা।
১৯৭২ সালেই জরুরিভিত্তিতে বিনামূল্যে ও কয়েকটি ক্ষেত্রে নামমাত্র মূল্যে অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ১৬ হাজার ১২৫ টন ধান বীজ, ৪৫৪ টন পাট বীজ, ১ হাজার ৩৭ টন গম বীজ সরবরাহ করা হয়। মানসম্মত বীজ, সারের কারখানা প্রতিষ্ঠা, সেচ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুকরণ, বালাইনাশক কারখানা তৈরি, বন্যা  প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণ, কৃষির আধুনিক যন্ত্রায়ণ করা হয়। সমন্বিত কৃষি বাস্তবায়ন, জমির প্রকৃতি বুঝে ফসল ফলানো, সময়মতো ফসল উৎপাদন সব কিছু কেবল জরিপ করেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। রবি মৌসুমে বেশি করে ফসল ফলানোর তাগিদ, শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হওয়া, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বাধিক উন্নয়নের জন্য বৈজ্ঞানিক তৎপরতা চালানো হয়। অধিক ফসল উৎপাদন এবং উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৩ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত মূল্যে ৪০ হাজার শক্তিশালী লো-লিফট পাম্প, ২ হাজার ৯০০ গভীর নলকূপ ও ৩ হাজার অগভীর নলকূপের ব্যবস্থা করা হয়। দখলদার পাকিস্তানি শাসনকালে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেওয়া হয়। ’৭৩-এ রাষ্ট্রপতির ৭নং অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয় কৃষি ব্যাংক। প্রবর্তন হয় সাশ্রয়ী সুদে কৃষি ঋণ-ব্যবস্থা।
ভূমি রাজস্বের চাপে নিষ্পিষ্ট কৃষককূলের ঋণভার লাঘবের জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা বিলোপ ও বকেয়া খাজনা মওকুফ করা হয়। ভূমিহীন কৃষকের নামে বিতরণ করা হয় খাসজমি। ধান, পাট, তামাক ও আখসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির লক্ষে মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়। গরিব কৃষকদের সুবিধাজনক রেশনসহ তাদের ছেলে-মেয়েদের বিনা খরচে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়।
কৃষি উন্নয়নে প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ২৯নং আদেশ অনুযায়ী ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার’ চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে ২৫ লাখ টাকার একটি ট্রাস্ট তহবিল গঠন ও পরে সরকারি এবং বৈধ সংস্থাগুলোর চাঁদার সাহায্যে এই তহবিল সম্প্রসারিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এদেশে কৃষি গবেষণাধর্মী কাজ পরিচালনার জন্য তেমন কোনো সমন্বয়ধর্মী প্রতিষ্ঠান ছিল না। ’৭৩-এ ১০নং অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ধান ব্যতিরেকে বহুমুখী ফসল গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। পুনর্গঠন করা হয় হর্টিকালচার বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, সীড সার্টিফিকেশন এজেন্সি, রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ গবেষণা সমন্বয়ের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। সোনালি আঁশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয় পাট মন্ত্রণালয়।
শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, বিভিন্ন বক্তব্যে সামাজিকভাবেও সব সময় তিনি বাংলার কৃষক শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে রাখতেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “… আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ঐ গরীব কৃষক। আপনার মাইনা দেয় ঐ গরীব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ঐ টাকায়। আমরা গাড়ী চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। সরকারী কর্মচারীদের বলি, মনে রেখ এটা স্বাধীন দেশ। এটা বৃটিশের কলোনী নয়। পাকিস্তানের কলোনী নয়। যে লোককে দেখবে তার চেহারাটা তোমার বাবার মত, তোমার ভায়ের মত, ওরই পরিশ্রমের পয়সা, ওরাই সম্মান বেশী পাবে। কারণ ওরা নিজে কামাই করে খায়।” দেশের উন্নয়নে শিক্ষিত শ্রেণির চেয়ে কৃষকদের অবদান যে কোনো অংশে কম নয়, সে-কথা বলতে তিনি মোটেও দ্বিধা করতেন না। সে-কারণে তিনি জাতীয় সংসদে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ বলতে পেরেছেন, “করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি।”
১৯৭৫ সালে কৃষি অর্থনীতি শক্তিশালী করতে বঙ্গবন্ধু ব্যাপকভিত্তিক কৃষি সমবায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমিখ-ের মালিকানা দলিলে অক্ষুণœ রেখে সকল কৃষিভূমিকে সমবায়ের অধীনে একীভূত করে আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত চাষবাসের মাধ্যমে পাঁচ গুণ ফসল ফলানোর প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। যে ব্যবস্থাপনায় পণ্য উৎপাদনে সকল খরচ বহন করবে রাষ্ট্র এবং উৎপাদিত পণ্য তিন অংশে ভাগ হবে। উৎপাদনের এক অংশ পাবে জমির মালিক, এক অংশ শ্রম কৃষকরা এবং এক অংশ যাওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের কোষাগারে। এভাবে ভূমিহীন খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন নিশ্চিতভাবে ও দ্রুতগতিতে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে আর এই ব্যবস্থা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।
মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এই মহামানবের হত্যাকা- দেশের সামগ্রিক চরিত্রের ওপর এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানি ভাবধারার সাংস্কৃতিক চর্চা বাঙালি জাতির জীবনাচারেও আনার অপচেষ্টা চলে। রীতিমতো স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা ঘটতে থাকে একের পর এক। যার মাশুল আজও গুনতে হচ্ছে বাংলার মানুষকে।
কৃষকদের বাঁচানোর জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দরকার, তা বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের রয়েছে। ’৯৬-এ সরকার গঠনের সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুর মতো কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন আধুনিক কৃষি উপকরণ। কৃষকদের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা গ্রহণসহ কৃষি উন্নয়নের কাঠামোগত সংস্কার কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। ফল হলো ১৯৯৮-এর শতাব্দীর দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করেও ১৯৯৯ সালে রেকর্ড পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন। ঐতিহাসিক পানি চুক্তির মাধ্যমে পানি প্রাপ্যতায় চালু হয় জিকে সেচ প্রকল্প। ২৫ হাজার হেক্টর নতুন জমি আসে আবাদের আওতায়। গড়ে তোলা হয় আঞ্চলিক মৃত্তিকা গবেষণার ও ভ্রাম্যমাণ মৃত্তিকা পরীক্ষার সুযোগ। সমন্বিত বালাই ব্যস্থাপনা নীতি হিসেবে পাস হয়। কৃষক নিবেদিত জননেত্রীর কারিশমা, প্রযুক্তির প্রসার, কৃষকের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আর প্রকৃতির শুভেচ্ছায় সৃষ্টি হয় ফসল উৎপাদনে নতুন রেকর্ড। তাই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছিল।
ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ভেঙে পড়ে গ্রামীণ অর্থনীতি। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশ আবার পূর্বের খাদ্য ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর অবস্থায় ফিরে যায়। সুবিদিত সফলতাকে মানুষের দ্বারে নিয়ে যেতে অনেক সময় লাগলেও জামাত-বিএনপি সরকারের ব্যর্থতায় ফিরে যেতে খুব বেশি দেরি হয়নি।
দেশ সেবায় দ্বিতীয়বারের মতো সুযোগ পেয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দেখেছিলেন দেশ আবারও পড়েছে খাদ্য ঘাটতির অনিশ্চয়তার কবলে। অর্থ দিয়েও বিশ্বের কোথাও মিলছিল না খাদ্য। নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই দেশের কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিকরণে গ্রহণ করেছেন হরেকরকম নীতিমালা ও পরিকল্পনা।
২০০৯ সালেই ‘জাতীয় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) নীতিমালা’ গ্রহণ করা হয়। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রেখে প্রয়োজনে এক বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগবালাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমার নিচে রাখা হয়, যাতে পরিবেশ দূষিত না হয়। বালাই নাশকের সময়োচিত ও যুক্তিসংগত ব্যবহারকে নিশ্চিত করা হয়। এ বছরেই ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ গ্রহণ করা হয়। পুনরায় ২০১১ সালে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ এর সংশোধন’ মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের কাছে সহজে সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। যেন জামাত-বিএনপি আমলের মতো সারের জন্য কৃষককে আর গুলি খেয়ে রাস্তায় মরে পড়ে থাকতে না হয়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন আরেক মাত্রা যোগ করার কারণে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়। এ-কারণে ২০১০ সালে ‘আগাম ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ক নীতিমালা’ ও ২০১৮ সালে ‘খসড়া জাতীয় বীজ নীতি-২০১৮’ নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। যার ফলে প্রতিকূল পরিবেশকে আয়ত্তে এনে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি, ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক সম্পদ ও বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন চলমান রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সরকারের সহায়ক এই নীতি আলোকবর্তিকার মতো কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় বাংলাদেশের কৃষি অভিষিক্ত হয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বিশ্ব স্বীকৃতি মিলছেÑ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে ভাসমান সবজি উৎপাদন প্রযুক্তির গর্বিত স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশ। বীজ কৃষির ভিত্তি, তাই এ-বছরেই ‘জাতীয় বীজ নীতি (এনএসপি)’ গ্রহণ করার ফলে ফসল উৎপাদনে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধন হয়। সুনিদ্রিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে বীজকে পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আধুনিক কৌশল অবলম্বন করে সংরক্ষণ করা শুরু হয়। নতুন এই নীতিমালার কারণে দেশের বীজ সেক্টর পেয়েছে গর্বিত শিল্পের মর্যাদা।
২০১৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের নিজেরই করা ১৯৯৯ সালের জাতীয় কৃষি নীতি পরিমার্জন ও সংশোধন করে ‘জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৩’ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ‘জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৮’ এবং এই সালে কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৮ (খসড়া) গ্রহণ করা হয়। যার মাধ্যমে কৃষি খাতের পরিকল্পিত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এবং দরিদ্র জনগণের আত্ম-সামাজিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষ অবদান রাখে।
২০১৫ সালে মোটরযান ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি অকেজো ঘোষণাকরণ নীতিমালা, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি-২০১৫ (খসড়া), আউশে প্রণোদনা ২০১৫-১৬ : বাস্তবায়ন নীতিমালা ও নন-ইউরিয়া সার আমদানি, বিক্রয় এবং ভর্তুকি বিতরণ/প্রদান পদ্ধতি, এই চার নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। যার মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান, বিশ্ববাজারের সাথে প্রতিযোগিতামূলক কৃষি পণ্য উৎপাদন, টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ট ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিশ্চিত হয়।
মাটি উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৬ সালে ‘জাতীয় জৈব কৃষিনীতি-২০১৬’ নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। ফলে গ্রামীণ জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্থায়ী অবদান রেখেছে। ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি ট্রাস্ট আইন, ২০১৬’ পাস করা হয়। ১০টি বিষয়ে অবদানের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে কৃষি খাতে নতুন জ্ঞান অর্জন, কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করতে এই আইন করা হয়।
২০১৭ সালে ‘নীতি-১ শাখা : জাতীয় শস্য ও বন জীবপ্রযুক্তি নীতি-নির্দেশিকা-২০১২, নং-১২০, তারিখ : ২৫.১০.২০১৭’ ও ‘সমন্বিত ক্ষুদ্র সেচ নীতিমালা-২০১৭, কৃষি ফার্ম শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ২০১৭ সংক্রান্ত’ এই দুই নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। যার ফলে দেশে ফার্ম শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত হয়েছে এবং সেচ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন হয়েছে।
২০১৮ সালে কৃষি কর্মকর্তাদের মান উন্নয়নের জন্য ‘বিএআরসি-এর গভর্নিং বডি পুনর্গঠন’, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০১৬, প্রবিধানমালা-২০১৭ প্রণয়ন, মন্ত্রিসভা বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন কমিটিÑ এই চার নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।
২০১৯ সালে দেশীয় জাত রক্ষার্থে ‘ইনব্রিড গমের জাত মূল্যায়ন এবং ছাড়করণ পদ্ধতি’ ও ‘ইনব্রিড ধানের জাত মূল্যায়ন এবং ছাড়করণ পদ্ধতি’ নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাকালীন সময়ে কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ন্যায্য মূল্যে সরবরাহ করা হয় কৃষি উপকরণ। অগ্রাধিকারভিত্তিতে বোরো মৌসুমে সরবরাহ করা হয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। কৃষিক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার দিগন্ত প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয় বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৬টি কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব স্বীকৃতির মর্যাদাপূর্ণ ‘সেরেস’ পদক তিনি উৎসর্গ করেছেন কৃষি প্রধান বাংলার জনগণকে।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। নন-ইউরিয়া সারের দাম কমিয়ে কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এনে নিশ্চিত করা হয়েছে জমিতে সুষম সার ব্যবহার। কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করে উপকরণ প্রাপ্তিতে কৃষক হয়রানি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ কৃষকরা খরা, জলমগ্নতা, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে বিরূপ জলবায়ুকে জয় করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। লবণাক্ততার কারণে আগে দক্ষিণের জেলাগুলোয় বছরে একবার বোরো ধান চাষ হতো। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে দক্ষিণাঞ্চলে খাদ্য ব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। শুধু তাই নয়, ফলদ বৃক্ষ ও উচ্চ ফলনশীল জাত শস্যবীজ উদ্ভাবন করায় খুলেছে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। শেখ হাসিনার সচেতন দৃষ্টি নিবদ্ধতা প্রান্তিক চাষিদের যে মাত্রায় সুযোগ-সুবিধা আর প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছেন, তা শুধু হতদরিদ্র উৎপাদক শ্রেণির জীবনমানই বাড়িয়ে দিচ্ছে না, পাশাপাশি দেশকে স্বয়ংম্ভরতার দিকেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দিন দিন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) এরই মধ্যে পাট ও ক্ষতিকর ছত্রাকের জীবন রহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা মোট ১৩টি প্রতিকূল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে লবণসহিষ্ণু ৯টি, খরাসহিষ্ণু দুটি ও বন্যাসহিষ্ণু ৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম জেনেটিকেলি মোডিফাইড ফসল বিটি বেগুনের ৪টি জাত অবমুক্ত করে। যার মধ্যে বেগুনের প্রধান শত্রু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মাধ্যমে আলুর নাবি ধসা রোগের প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।
মাত্র ১০ টাকায় কৃষকদের সুযোগ দেওয়া হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার এবং উপকরণ সহায়তার অর্থ সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়। কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য যন্ত্রপাতির মূল্যের ২৫ শতাংশ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের বিদ্যুৎ বিলের ওপর দেওয়া হয় ২০ শতাংশ হারে রিবেট সুবিধা।
প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগ হতদরিদ্রের জন্য চালু হয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি। তা বাস্তবায়নে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়া হচ্ছে। বছরের পাঁচ মাস দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার কার্যক্রম চালু করেছে সরকার। খাদ্য শস্যের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাতকে বিকশিত করার লক্ষ্যে বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন চলছে।
কৃষিবিদদের মর্যাদা নতুন মাত্রায় উন্নীত করতে শেখ হাসিনা ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ফার্মগেটে জমি বরাদ্দসহ দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। কৃষিবিদ ও কৃষকের মর্যাদার প্রতীক পেশাজীবী সংগঠনের প্রাণকেন্দ্র কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটশন বাংলাদেশ-এর নান্দনিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠাসহ গুরুত্বারোপ করেছেন দক্ষ কৃষিবিদ তৈরির। গ্রামীণ অর্থনীতির বুনিয়াদ গড়ে তুলে কৃষকদের স্বাবলম্বী করার দূরদর্শী লক্ষ্যে গোড়াপত্তন করেন ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প।
কৃষক-কৃষিবিদ-সহায়ক নীতি ও প্রণোদনায় ধান উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়; আলু উৎপাদনে অষ্টম; মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান এখন ১৬ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ সালের জন্য উন্নয়নের রূপকল্প ঘোষণা করেছেন। সেই সঙ্গে আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত ডেল্টা প্ল্যান তৈরিও সম্পন্ন করেছেন। নতুন সমুদ্রসীমা চুক্তির ফলে মৎস্যসহ সম্ভাবনাময় সম্পদ আহরণের অপরিসীম সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার মাটিতে ফলানো ফল ও সবজি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া ছিল কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যেখানে বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান করেও বাংলাদেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের গর্বিত দেশ। কৃষিতে তাক লাগানো এই সাফল্যের নেপথ্যের প্রেরণা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মহানায়ক, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে, বাংলাদেশ হয়তো বহু আগেই উন্নতিশীল দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়াতে পারত। তার প্রদর্শিত স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়নে বাংলার মানুষ এখন স্বপ্ন দেখে তারই কন্যা কৃষকরতœ শেখ হাসিনার চোখে।

Category:

কলাপাতা ও লাল জবাফুল

Posted on by 0 comment

PddMইমদাদুল হক মিলন: নয়ন দৌড়াতে দৌড়াতে এলো।
গ্রামে ঢোকার মুখে বিশাল কাঠের ব্রিজ। সেই ব্রিজের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন। ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিককার ভোরবেলা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে মাঠঘাট, মানুষের ঘরবাড়ি। খালের পানিতে ভাসছে কুয়াশা।
ভিড় ঠেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে গেল নয়ন। কমান্ডারের কাঁধে স্টেনগান, কোমরে গুলির বেল্ট। অন্যদের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। গুলির বেল্ট তো আছেই। কারও কারও সঙ্গে গ্রেনেড। মোট একুশজন মুক্তিযোদ্ধা।
কমান্ডারের নাম নাসির। ভিড় ঠেলে নয়নকে আসতে দেখে তিনি তার দিকে তাকালেন। নয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কমান্ডার সাহেব, আমার বড়ভাইও মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম বাদল। বাদল মির্জা।
নাসির কমান্ডারের মুখটা উজ্জ্বল হলো। তাই না-কি? বাদলকে তো আমি চিনি। মেলাঘরে একসঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছি। তুমি বাদলের ছোট ভাই?
জি। আমরা তিন ভাইবোন। বাদলদা সবার বড়। তারপর বোন তারপর আমি।
ইসমাইল লোকটা মাতাব্বর গোছের। আগ বাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস আছে। লুঙ্গির ওপর ছেঁড়া কালো কোট পরা। বলল, ভবেরচরের মুক্তিযোদ্ধাগো বাড়িঘর তছনছ করছে রাজাকাররা। নয়নরা তো বাড়িতে থাকতেই পারে নাই। বাড়ি দখল করছিল এক রাজাকারে। মির্জা সাহেব চইলা গেছিলেন দিঘিরপারের ওই দিককার এক গ্রামে। কয়দিন আগে ভবেরচরের রাজাকার আলবদররা সব পলাইছে। মুসলিম লীগের লোক আছিল চেরম্যান সাবে, সেও পলাইছে। তারপর মির্জা সাবে নয়নগো লইয়া গেরামে ফিরছে। ভবেরচর অহন স্বাধীন।
তবে বিপদ আপনাদের কাটেনি। কাল বিকালে খবর পেয়েছি আজ এদিকে মিলিটারি আসতে পারে। ওরা বুঝে গেছে দেশ স্বাধীন হতে আর সময় লাগবে না। এজন্য মরণ কামড় দিছে।
মিলিটারি আসতে পারে শুনে লোকজন আতঙ্কিত হলো। ভয়ার্ত চোখে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল।
জয়নাল বলল, হায় হায়, মেলেটারি আইলে তো সব্বনাশ! গেরামের লোকজন বেবাক মাইরা ফালাইব। বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিব। তয় আমরা যাই কমান্ডার সাব। বউ পোলাপান, মা বাপ ভাই বইন লইয়া পলাই।
না না পালানোর দরকার নেই। মিলিটারি যাতে গ্রামে ঢুকতে না পারে সেই ব্যবস্থা করুন। ওরা যে এদিকে আসবেই আমি তা বলিনি। বলেছি আসতে পারে। আসার সম্ভাবনা বেশি আলিপুর আর মধ্যবাউসিয়ার দিকে। এজন্য ওদিককার ব্রিজ দুটো উড়িয়ে দিয়েছি। এখন আমরা ওইদিকে চলে যাচ্ছি। মিলিটারি এলেই এট্যাক করব। একটাকেও বাঁচতে দেব না।
হাফেজ মিয়া বলল, তয় আমরা অহন কী করুম?
ব্রিজটা ভেঙে ফেলুন। মেইন রোড থেকে গ্রামে ঢোকার এই একটাই পথ। এটা ভেঙে ফেললেই কাজ হয়ে যাবে। তারপরও সাবধানে থাকবেন সবাই।
নাসির কমান্ডার নয়নের দিকে তাকালেন। তোমরাও বসে থাকবে না। তোমাদের বয়সি ছেলেরাও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা। ব্রিজ ভাঙার কাজে লাগো।
নয়ন গভীর উৎসাহের গলায় বলল, ঠিক আছে দাদা।
নয়নের মুখে ‘দাদা’ শব্দটা শুনে নাসির কমান্ডার একটু আবেগ আপ্লুত হলেন। নয়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমার ভাইবোনরাও আমাকে দাদা ডাকে। অনেকদিন তাদের সঙ্গে দেখা হয় না। দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরব। জয় বাংলা।
নয়ন আকাশের দিকে হাত তুলে চিৎকার করে বলল, জয় বাংলা।
মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার পর ইসমাইল বলল, এহেনে ঐ খাড়াইয়া থাকবেননি মিয়ারা? লন পোল ভাঙনের কামে লাইগা যাই। কুড়াল শাবল যার বাড়িতে যা আছে লইয়াহেন। বেবাকতে হাত লাগাইলে দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই পোল ভাইঙ্গা ফালান যাইব।
হাবিব নামের একজন বলল, আরে না মিয়া, এক-দেড় ঘণ্টার বেশি লাগব না।
মনির হোসেন বলল, প্যাঁচাইল না পাইরা কামে লাগো মিয়ারা।
নয়ন বলল, আমাদের বাড়িতে কুড়াল আছে। আমি নিয়া আসতেছি।
বাড়ির দিকে দৌড় দিল নয়ন। নয়নের সঙ্গে দৌড় দিল মোস্তফা। এই প্রথম মোস্তফাকে দেখতে পেল নয়ন। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, তুমি আসছো কখন?
তোমারে দৌড় দিতে দেইখা আমিও দৌড় দিছিলাম মিয়াভাই। গেরামে মুক্তিবাহিনী আইছে, দেখুম না তাগো?
তাহলে আমার আর বাড়ি যাওয়ার দরকার কী? তুমিই কুড়ালটা নিয়া আসো।
না না তুমিও লও। নাইলে মির্জা সাবে আর আম্মায় আমারে আইতে দিব না। মির্জা সাবের জ্বর। বাড়িতে কাম কাইজ আছে। আমি না আইতে পারলে তুমি কুড়ালডা লইয়া আইবা।
মোস্তফার বয়স এখন তেইশ-চব্বিশ বছর। রোগা পটকা শরীর। ছোটবেলা থেকে মির্জা বাড়িতে কাজ করে। এতিম ছেলে। কাছের আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। মির্জা বাড়িই তার বাড়ি, নয়নরাই তার সব। মির্জা সাহেব বিয়ে ঠিক করেছিলেন মোস্তফার। গজারিয়ার মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল দেখে বিয়ে আটকে আছে। দেশ স্বাধীন হলে বিয়ে হবে। বউ নিয়ে মির্জা বাড়িতেই থাকবে সে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাড়ির কাজ করবে।
মির্জা বাড়ির রান্নাঘরে এখন নাশতা তৈরি করছেন আমেনা বেগম। পুরনো শাল গায়ে জড়িয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে আছেন মির্জা সাহেব। খুক খুক করে কাঁশছেন। দিন সাতেক আগে বাড়ি ফিরেছে নয়নরা। বদু রাজাকার বাড়ি দখল করেছিল। দামি জিনিসপত্র সবই সরিয়ে ফেলেছে। বাড়িতে বলতে গেলে নেই কিছুই। বারান্দার চেয়ারটা রয়ে গিয়েছিল। মোস্তফার নড়বড়ে চৌকিটা রয়ে গিয়েছিল। এই শীতে মেঝেতে ঘুমাতে হচ্ছে নয়নদের। হাঁড়ি-পাতিল কিছু জোগাড় করেছেন আমেনা বেগম। থালা-বাসন জোগাড় করেছেন। সংসার চলছে কোনো রকমে।
বাড়ি ঢুকে লাকড়ি খড়ি রাখার ঘরটায় ঢুকল নয়ন। পুরনো কুড়ালটা পড়ে আছে একপাশে। সেটা নিয়ে দৌড় দেবে, মির্জা সাহেব বললেন, কুড়াল নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
ব্রিজ ভাঙতে যাচ্ছি বাবা। গ্রামে মিলিটারি আসবে।
বুদ্ধি করে মোস্তফাকেও সঙ্গে নিল নয়ন। মোস্তফা ভাই, তুমিও চলো। ব্রিজ ভেঙে ফেললে গ্রামে মিলিটারি ঢুকতে পারবে না।
আমেনা বেগম বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। মিলিটারি আসার খবরে ভয় পেয়েছেন। দিশাহারা গলায় বললেন, সর্বনাশ! তোর বাবার জ্বর। মিলিটারি এলে পালাবো কোথায়?
যাতে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতেই যাচ্ছি মা। মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজ ভাঙতে বলে গেছেন।
তোর যাওয়ার দরকার নাই। ও নয়ন, তোর যেতে হবে না বাবা। মোস্তফা যাক। তুই বাড়িতেই থাক। আমার ভয় করছে।
না না। কমান্ডার সাহেব বলেছেন। যেতেই হবে।
মির্জা সাহেব কী বলতে গেলেন! কাঁশির তোড়ে বলতে পারলেন না। নয়ন কুড়াল হাতে দৌড় দিল। মোস্তফা ছুটল তার পিছন পিছন।
ব্রিজ ভাঙা ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। ভারী কাঠের শক্ত ব্রিজ। অনেকদিনের পুরনো। তবে এখনও শক্তপোক্ত। ভাঙা কঠিন। লোকজন শাবল কুড়াল নিয়ে সমানে কোপাকুপি করছে। নয়নের বয়সি জনাদশেক কিশোরও জড়ো হয়েছে। তারাও কাজ করছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে। তাদের সবাইকেই নয়ন চিনল। এক স্কুলেরই ছাত্র সবাই। নয়নের ক্লাসমেটই আছে চারজন। ক্লাস ফাইভে পড়ে।
নয়নকে কুড়াল হাতে দেখে তাদের ক্লাসের আউয়াল এগিয়ে এলো। দে নয়ন, আমাকে দে। আমি কিছুক্ষণ কোপাই। আমি টায়ার্ড হলে তুই কোপাবি। দৌড়ে এসেছিস। একটু জিরিয়ে নে।
নয়নের হাত থেকে কুড়াল নিয়ে ব্রিজে চড়ল আউয়াল।
এইভাবে কুড়ালটা ঘুরতে লাগল। নয়নের হাত থেকে গেল শাহাদাতের কাছে, শাহাদাতের হাত থেকে রবিউলের হাতে। প্রত্যেকেই শরীরের সব শক্তি দিয়ে ব্রিজ ভাঙার কাজ করছে। তবে কাজ বেশিদূর আগাচ্ছে না। পুরনো ব্রিজ ঠিকই কিন্তু কাঠ এত শক্ত, লোহারপাত গজাল এগুলো এত কঠিনভাবে লাগানো হয়েছে, এই শীতেও ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছে লোকজনের।
আমিনুদ্দিন নামের মুসল্লি ধরনের মানুষটি শাবল চালাতে চালাতে বললেন, শুনছি মেলেটারিরা বলে মোসলমান। মোসলমান হইয়া মানুষ মারে? মোসলমান মারে? ওরা তো মোসলমান না। ওরা হইল শয়তান, শয়তান। ইবলিস শয়তান।
আনসার আলী কুড়াল চালিয়ে ক্লান্ত। দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ক্লান্তির শ্বাস ফেলছে। সেই অবস্থায় বলল, বাড়িতে বউ পোলাপানরে বইলা আইছি আমি পোল ভাঙতে গেলাম। মেলেটারি আইলেই দৌড়াদৌড়ি চিল্লাচিল্লি শুরু হইব। ওই রকম আওজ পাইলে এক মিনিটও দেরি করবা না। দক্ষিণ দিকে দৌড় দিবা। যে যেইভাবে পারো পলাইবা।
মফিজউদ্দিন বলল, আমিও কইয়াছি। বেবাকতেই ডরাইতাছে। মে মাসের কথা কইলো পোলাপানের মায়। তিনশো ষাইটজন মানুষ মারছিল আমগো এলাকায়। এক সকালে এতডি মানুষের জান নিল শুয়োরের বাচ্চারা। আইজ আইলে না জানি কী করে?
সোলায়মান মাস্টার বললেন, আসতে যাতে না পারে সেই জন্যই তো পোল ভাঙতে কইয়া গেল নাসির কমান্ডারে। কাম করেন মিয়ারা। তাড়াতাড়ি হাত চালান।
হোসেন বেপারি কুড়ালের বিরাট একটা কোপ বসালো চওড়া কাঠের ওপর। সেই অবস্থায় বলল, চেষ্টা তো চলতাছে মাস্টার সাব। কেউ তো বইসা নাই। তারপরও দেখেন, কাম আগাইতাছে না।
ইউনুস মিয়া বলল, কামডা আউলা ঝাউলা হইতাছে। যে যেই দিক দিয়া পারে কুড়াল শাবল মারতাছে। এইভাবে হইব না। এক দিক দিয়া ভাঙতে হইব। ও মিয়ারা, একদিক দিয়া ভাঙেন।
নয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। কুয়াশা আগের মতোই। বেশিদূর চোখ চলে না। রোদ কখন উঠবে কে জানে! ব্রিজ ভাঙার কাজ কখন শেষ হবে কে জানে! আলিপুরের দিকে, মধ্যবাউসিয়ার দিকে মিলিটারি এসে পড়ল কি না কে জানে!
না আসেনি। এলে গুলির শব্দ পাওয়া যেত। নাসির কমান্ডার বলে গেছেন তারা ওই দিকে পজিসন নিয়ে থাকবেন। মিলিটারি এলেই অ্যাটাক। এলে এতক্ষণে গোলাগুলি শুরু হয়ে যেত। শব্দ পাওয়া যেত।
কিন্তু ব্রিজ ভাঙার কাজ আগাচ্ছে না কেন? আর কতক্ষণ লাগবে? শয়তানগুলো যদি আলিপুর মধ্যবাউসিয়ার দিকে না গিয়ে এদিকে চলে আসে?
হলোও তাই।
দূরের রাস্তার দিকে গাঢ় সাদা কুয়াশার ভিতর দেখা গেল গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। কুয়াশা ভেঙে এগিয়ে আসছে কয়েকটা গাড়ি। এখনও দূরে আছে বলে শব্দ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত এদিকে আসছে গাড়িগুলো।
এই দৃশ্য প্রথমে দেখল রামমোহন। সে কুড়াল চালিয়ে ক্লান্ত। জিরাবার জন্য দাঁড়িয়েছে। তখন দেখে সার ধরে গাড়ি আসছে এই দিকে। কুয়াশায় রাস্তাঘাট দেখা যায় না বলে দিনেরবেলাই জ্বলছে গাড়ির হেডলাইট।
ব্রিজ আধাআধি ভাঙা হয়েছে তবে হয়েছে এলোমেলোভাবে। গাড়ি চলতে পারবে না কিন্তু মিলিটারিরা লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে আসতে পারবে।
রামমোহন তারপর চিৎকারটা দিল। মেলেটারি আইতাছে, মেলেটারি আইতাছে। ওই যে আইয়া পড়ছে। পোল ভাঙতাছে দেখলেই গুল্লি শুরু করব।
মুহূর্তে সাড়া পড়ে গেল লোকজনের মধ্যে। দিশাহারা ভঙ্গিতে রাস্তার দিকে তাকাল তারা। কুড়াল শাবল হাতেই দৌড় দিল কেউ, কেউ দৌড়াল ওসব ফেলেই। কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ‘মেলেটারি আইতাছে, মেলেটারি আইতাছে’ বলে চিৎকার আর দৌড়। বিরাট হুড়াহুড়ি পড়ে গেল।
নয়ন আউয়ালরা প্রথমে বুঝতে পারেনি ঘটনা কী! মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই নানারকম গুজব রটছে চারদিকে। মিলিটারি আসছে, ওই এসে পড়েছে, এ-রকম গুজব রটেছে বহুবার। মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। পরে দেখে কোথায় মিলিটারি? কিচ্ছু না।
এখনও কি তেমন কিছু রটল?
না। ওরা স্পষ্টই দেখতে পেল মিলিটারি ব্রিজের ওইপারে প্রায় এসেই পড়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামছে। গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
কে যেন চিৎকার করে বলল, দৌড় দে নয়ন। দৌড় দে।
বড়রা প্রায় সবাই উধাও হয়ে গেছে। নয়নরা দশ কিশোর দেরি করে ফেলেছে। তারপরও প্রাণপণে দৌড় শুরু করল ওরা…
মিলিটারিরা তখন দ্রুত এবং সাবধানে আধভাঙ ব্রিজ পার হচ্ছে। হাতে রাইফেল। রাইফেলের মাথায় বেয়নেট। শিকার ধরার সময় যে রকম ক্ষিপ্র হয় চিতাবাঘ, মিলিটারিরা সে রকম ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ছুটে আসছে।
নয়নরা এখন কোথায় যাবে? কোন দিকে পলাবে?
ব্রিজের এপারে এসেই চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে মিলিটারিরা। চারদিক দিয়ে ঘেরাও করছে গ্রাম।
নয়নরা এখন কোথায় যাবে? কোথায় পলাবে?
ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে ওরা। বুক ওঠানামা করছে হাঁপড়ের মতো। তিনদিক দিয়ে মিলিটারি এগিয়ে আসছে তাদের দিকে…
সামনে বহুদিনের পুরনো কবরস্থান। গাছপালা ঝোপঝাড়ে ঘেরা। শীতে কুয়াশায় জুবুথুবু হয়ে আছে জায়গাটা। দৌড়াতে দৌড়াতে নয়ন বলল, আউয়াল, কবরস্থানে ঢোক। কবরস্থানে। কবরস্থানে ঢুকে ওরা আমাদের মারবে না।
দশ কিশোর কবরস্থানে ঢুকল। ভয়ে আতঙ্কে দিশাহারা সবাই। দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত। কেউ কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ল পায়ে লতাপাতা জড়িয়ে। মতিউর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
মিলিটারিরা তখন কবরস্থানের দিকে ছুটে আসছে। তাদের বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
নয়ন বলল, চল আমরা একেকজন একেকটা কবর ধরে বসে থাকি। মিলিটারিরা কাছে আসার আগ থেকেই জোরে জোরে সুরা ফাতিহা পড়ব। ওরা মুসলমান আমরাও মুসলমান। ছোট ছেলেরা কবরস্থানে বসে সূরা পড়ছে দেখলে মারবে না। কিছুই বলবে না।
পাশাপাশি কবরগুলোর ধারে বসল ওরা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে একেকজনের। ভয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে কেউ কেউ। সেই কান্না গোঙানির মতো শোনাচ্ছে।
মিলিটারিরা ঢুকে গেল কবরস্থানে।
নয়নরা জোরে জোরে সূরা ফাতিহা পড়তে লাগল। ‘আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। আর রাহ্মানির রাহিম…’
কারও গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে কান্নার মতো করে, কারও গলা ফ্যাসফ্যাসে। শব্দ বোঝা যায় না।
চারজন পাঁচজন করে মিলিটারি রাইফেল বুকের কাছে ধরে একেক কবরের দিকে এগোতে লাগল। গুলি করছে না। চারদিক থেকে বেয়নেট চার্জ করার জন্য ধীরপায়ে এগোচ্ছে। মুখে কোনো শব্দ নেই। নয়নরা চোখ বুজে উচ্চৈঃস্বরে সূরা ফাতিহা পড়ে যাচ্ছে। ‘আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। আর রাহ্মানির রাহিম…’

সাতচল্লিশ বছর পর

সøামালেকুম আন্টি।
ওয়ালাইকুম আসসালাম।
আমি আপনাদের দোতলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটে। কালই ফ্ল্যাটে উঠেছি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এত ব্যস্ততায় গেল কালকের দিনটা। বাসা বদলানো যে কী ঝামেলার কাজ!
আমেনা বেগম চোখ তুলে ভদ্রমহিলার দিকে তাকালেন। তার বয়স হয়েছে আশির কাছাকাছি। চশমা ব্যবহার করেন অনেক বছর। কয়েক মাস ধরে চোখে ঝাপসা দেখছিলেন। শুনে বাদল তার ছোট ছেলে সাজিদকে পাঠাল। নাতি এসে ঢাকায় নিয়ে গেল দাদীকে। চোখের ভালো ডাক্তার দেখাল। পাওয়ার বেড়েছে। নতুন চশমা নিতে হলো। সেই চশমায় সবকিছু এখন পরিষ্কার দেখতে পান।
ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ হবে। স্বাস্থ্য ভালো। গায়ের রং শ্যামলা। চেহারা মন্দ না। হাসি-খুশি ধরনের মানুষ।
তোমার নাম কী মা?
আয়েশা।
বসো, বসো।
আয়েশা চেয়ার টেনে বসল। আমার হাজব্যান্ড এখানকার কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার হয়ে এসেছেন। আগে ছিলেন মানিকগঞ্জে। আমরা পাবনার লোক। একটাই ছেলে আমাদের।
আমেনা বেগম বুঝলেন আয়েশা গল্প করতে পছন্দ করে। ভালোই হলো। গল্প করার মানুষ পাওয়া গেল।
চা খাবে?
খেতে পারি। লিকার চা। দুধ চিনি ছাড়া।
আমিও তাই খাই।
আমেনা বেগম রাজিয়াকে ডাকলেন। রাজিয়া, দুকাপ চা দিতে বল। লিকার চা।
মোস্তফার ছোট মেয়ে রাজিয়া বারান্দায় পায়চারি করতে করতে পড়ছে। ভবেরচর কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। পড়াশোনায় খুবই আগ্রহ মেয়েটির। পরীক্ষার বাকি আছে মাস তিনেক। এ প্লাস পেতেই হবে। এজন্য রাতদিন পড়ছে।
আমেনা বেগমের কথা শুনে তার দিকে তাকাল না রাজিয়া। পড়তে পড়তেই চিৎকার করে মাকে বলল, দাদীর ঘরে দুই কাপ চা দাও।
মোস্তফার বউর নাম বেদানা। সে ছিল রান্নাঘরে। সংসার সে-ই সামলায়। বাড়ির সব কাজ তার। বাইরের কাজ মোস্তফার। দুদিন হলো মোস্তফা বাড়িতে নেই। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে। সেই মেয়ে তার জান। মাসে এক-দুবার মেয়ের কাছে গিয়ে থেকে আসে।
ট্রেতে দুকাপ চা নিয়ে এলো বেদানা। ষাটের কাছাকাছি বয়স। দেখলে মনেই হয় না এতটা বয়স হয়েছে। বেশ শক্তপোক্ত কর্মঠ মানুষ।
নাও মা, চা নাও।
আয়েশা চা নিল। আমেনা বেগমও নিলেন।
চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েশা বলল, একটা কথা আপনাকে বলে রাখা ভালো আন্টি। যাতে আপনি পরে বিরক্ত না হন বা না ভাবেন যে কেন আপনাকে আগে বলিনি।
কী কথা মা?
আমার ছেলেটার কথা। একটু অন্য টাইপের ছেলে। এগারো বছর বয়স। পড়ে ক্লাস ফাইভে। না না, দুষ্টুমি করে না। নিজেকে নিয়ে থাকে। ছবি আঁকে। মাটি দিয়ে এটা ওটা বানায়। ফুল পাতা দিয়ে বানায়। শহিদ মিনারের ছবি আঁকে, গ্রামের ছবি আঁকে, মুক্তিযুদ্ধের ছবি, পতাকার ছবি এসব নিয়েই থাকে।
ভালো তো! এই নিয়ে বলার কী আছে?
না মানে আপনার বাড়িতে এত গাছপালা। কখন কোনদিকে হাত দিবে সে, কোন গাছের ডালপালা ভাঙবে, ফুল ছিঁড়বে… মানে আমি আর ওর বাবা ওকে কিছু বলি না। আমাদের ধারণা ছেলেটা বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে।
এগারো বছর বয়স বললে? ক্লাস ফাইভে পড়ে?
জি আন্টি।
নাম কী?
নয়ন।
আমেনা বেগম কেঁপে উঠলেন। নয়ন? নয়ন?
আয়েশা অবাক। জি আন্টি। ডাকনাম নয়ন। ভালো নাম…
না না অন্য কোনো নাম জানবার দরকার নেই। নয়ন, নয়ন…
আমেনা বেগম উদাস হলেন। স্মৃতিকাতর হলেন। আমার ছেলেটার নামও ছিল নয়ন। এগারো বছর বয়স। ক্লাস ফাইভে পড়ত।
তাই না-কি? আশ্চর্য মিল। আপনার সেই ছেলে কোথায়?
আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই মাটিতে, ওই নদীতে, ফসলের মাঠে আর আকাশে মিশে আছে আমার নয়ন।
কথাটা বুঝতে পারল না আয়েশা। আমেনা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আয়েশাকে একাত্তর সালের সেই দিনটির কথা বললেন আমেনা বেগম। …..কবরস্থানে আশ্রয় নেওয়া নয়নদের দশজনকে গুলি করেনি জন্তুরা। চারদিক দিয়ে বেয়নেট চার্জ করেছিল। এলাকার সব মানুষ পালিয়েছিল। দশটি কিশোরের মরণ চিৎকার আর আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি। কবরস্থানের মাটি তাদের রক্তে ভিজে গিয়েছিল। জন্তুরা চলে যাওয়ার পর একজন দুজন করে ফিরেছিল গ্রামের লোক। যার যার ছেলে নিখোঁজ ছিল তারা বেরিয়েছিল ছেলে খুঁজতে। মির্জা সাহেব আর মোস্তফার সঙ্গে আমিও বেরিয়েছিলাম। নয়ন ছিল আমার জীবন। তার ছিন্নভিন্ন শরীর কবরস্থানে পড়ে থাকতে দেখে আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম…। নয়নের শোক নিয়ে আমি বেঁচে আছি। মির্জা সাহেব বেশিদিন বাঁচলেন না। বাড়িটা তখন এরকম ছিল না। বারান্দাঅলা টিনের ঘর ছিল। সেই বারান্দায় বসে ছেলের জন্য কাঁদতেন। কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকতেন। আমিও যেতাম। দিন নেই রাত নেই, যখন ইচ্ছা চলে যেতাম কবরস্থানে। আমার নয়ন যেখানে পড়েছিল সেখানে গিয়ে বসে থাকতাম। নয়নের কবরে হাত বুলাতাম। যেন ছেলের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি…
দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন আমেনা বেগম। দিনে দিনে সেই কষ্টটা কমে গেছে মা। এখন মনে হয় অন্যকথা। ভাবি, আমি তো স্বার্থক মা। আমার বাদল মুক্তিযোদ্ধা আর নয়ন দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। মা হিসেবে আমার আর কী চাওয়ার আছে? নয়নের জন্য আমার মেয়েও খুব গৌরব করে। বাদল গৌরব করে। আমার নাতি-নাতনীরা গৌরব করে। তোমার নয়নকে বলো সে স্বাধীন বাংলাদেশে বড় হচ্ছে। সে তার মতো করে বড় হোক। স্বাধীনভাবে বড় হোক। তার ভালো লাগা নিয়ে বড় হোক। আর আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে একটু দেখব।
সেদিন দুপুরের পরই নয়নকে দেখতে পেলেন আমেনা বেগম। বেদানা খুবই বিরক্ত হয়ে এসে বলল, নতুন ভাড়াইটার পোলাটা কলাপাতা কাটছে, লাল জবাফুল পাইড়া ওই যে দেখেন উঠানের কোণায় বইসা কী কী করতাছে। আমি না করছি। কথা শোনে নাই।
তাই না-কি। চল তো দেখি কী করে?
আমেনা বেগমের হাঁটতে অসুবিধা হয়। হাঁটুতে ব্যথা আছে। বেদানা বা রাজিয়াকে ধরে হাঁটেন। এখনও তাই করলেন। বেদানার বাহুর কাছটা শক্ত করে ধরে উঠানে এলেন।
উঠানের কোণে বড় একটা কলাপাতা চারকোণা করে কেটে মাটিতে বিছিয়েছে নয়ন। দশটা লাল টকটকে জবাফুল এখন সেই কলাপাতার ঠিক মাঝখানে গোল আর ঘন করে বসাচ্ছে। খুবই মন দিয়ে কাজটা সে করছে। কোনো দিকে খেয়াল নেই।
আমেনা বেগম মায়াবী গলায় ডাকলেন, নয়ন।
নয়ন চোখ তুলে তাকাল। কথা বলল না।
কী করছো? তোমার কথা আমি শুনেছি। তোমার মা বলেছে। এটা কী হচ্ছে?
হাতের কাজ শেষ করে নয়ন উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, বুঝতে পারনি?
না। জিনিসটা কী?
খেয়াল করে দেখো।
দেখছি কিন্তু বুঝতে পারছি না।
আরও খেয়াল করে দেখো। তাহলেই বুঝতে পারবে। খুবই সহজ।
এবার মুখ উজ্জ্বল হলো আমেনা বেগমের। শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, বুঝেছি বুঝেছি। বাংলাদেশের পতাকা। সবুজ কলাপাতার মাঝখানে গোল করে রাখা লাল জবাফুল। বাহ্। দারুণ।
মা বলেছেন, তোমার ছোট ছেলের নামও ছিল নয়ন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে। নয়নদের বাড়িতে আরেক নয়ন। এক নয়ন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন আরেক নয়ন তাদের বাড়িতে কলাপাতা আর জবাফুল দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করছে। নয়নরা দশজন একসঙ্গে শহিদ হয়েছিলেন। এজন্য দশটা লালজবা।
নয়নের কথা শুনে তাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন আমেনা বেগম। অনেকদিন পর ছেলের জন্য কাঁদছেন তিনি।

Category:

উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণে জাপান পাশে থাকবে

Posted on by 0 comment
PddM

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণে জাপানের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। গত ২৯ মে রাজধানী টোকিওতে জাপান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
বৈঠকের পর শিনজো আবে ও শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপানের সঙ্গে আড়াইশ’ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তির পর যৌথ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ’৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি আমরা। এ লক্ষ্য পূরণে জাপান আমাদের পাশে থাকবে ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে বলে প্রধানমন্ত্রী আবে আমাকে নিশ্চিত করেছেন।
জাপান এককভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। ’৭২ সাল থেকে জাপানের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলারের সহায়তা পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটি প্রকল্পের ৩৬ হাজার কোটি টাকার মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর এবং ২২ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থই দিচ্ছে জাপান। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের জন্য ‘বিশেষ জায়গা’ রয়েছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা স্বাধীনতার পর থেকেই জাপানের সহায়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জাপানের ঐতিহাসিক উন্নয়ন থেকে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। ‘স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলতে পারি, সেই কাক্সিক্ষত স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এখন আমরা সঠিক পথ ধরেই এগিয়ে চলেছি।’
জাপানের সঙ্গে করা আড়াইশ’ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তির অর্থে মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১), বিদেশি বিনিয়োগ সহায়ক প্রকল্প (২), জ্বালানি দক্ষতা ও সুরক্ষা সহায়ক প্রকল্প (পর্যায়-২) ও মাতারবাড়ি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে (৫) অর্থায়ন করা হবে। শেখ হাসিনা বলেন, এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, জাপান সব সময় আমাদের পাশে আছে।
শিনজো আবের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করার বিষয়ে কিছু নতুন ধারণা (আইডিয়া) নিয়ে আলোচনা করেছি। সম্ভাব্য যেসব ক্ষেত্র থেকে দুই দেশই লাভবান হতে পারে, সেগুলো নিয়ে কাজ করার বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীই একমত হয়েছেন বলে জানান তিনি। আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বিষয়ে শিনজো আবের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও জাপান সহায়তা দেবে বলে শিনজো আবে নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও দুজনের আলোচনায় স্থান পেয়েছে বলে জানান শেখ হাসিনা।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশ’ জাপান একে অপরের প্রতি সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আড়াই বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি করায় শিনজো আবেকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও উঠে আসার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের বিষয়ে টেকসই ও দ্রুত সমাধানের উপায় খোঁজার বিষয়ে তারা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।

Category:

বাঙালির ৭০ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তরাধি­কার : আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্জন

Posted on by 0 comment

PddMশামসুজ্জামান খান: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে গেলে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠার পটভূমির কথা মনে রাখতে হবে। প্রধানত ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান (১৯৪৭) ছিল রাষ্ট্র-বিজ্ঞানের সংজ্ঞার নিরিখে অবৈজ্ঞানিক এবং ভৌগোলিকভাবে এক উদ্ভট রাষ্ট্র। তদুপরি, প্রথম থেকেই এই রাষ্ট্রে ব্যক্তিমানুষ, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা বৃহৎ নানা আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সাধারণভাবে দেশের সকল অংশের গরিব-দুঃখী-মজলুম জনতার প্রতি ঔপনিবেশিক কায়দায় যে অন্যায়-অবিচার-বৈষম্য এবং অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবিরোধী রাষ্ট্রীয় নিপীড়নমূলক কর্মকা- চালু করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও বহুত্ববাদী (চষঁৎধষরংঃরপ) গণতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম (১৯৪৯) হয়।
আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী আদর্শগত উপযুক্ত ভিত্তি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য থেকেই এর সাংস্কৃতিক নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়। বহু জাতি, উপজাতি এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার দেশ পাকিস্তানের শাসকচক্র সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক মতলব হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে যে এককেন্দ্রিক স্বৈরশাসন চালু করে তাতে স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক সুষম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বা নানা নৃগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মুক্তধারা সৃষ্টি ছিল অসম্ভব। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পাঞ্জাবি আধিপত্যবাদী আমলা, সামরিকচক্র ও বৃহৎ জোতদারেরা নিজেদের আধিপত্য ও কায়েমী স্বার্থকে স্থায়ীভাবে জারি রাখার লক্ষে পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু বাঙালি-জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা এমনকি অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার স্বৈরাচারী একতরফা ঘোষণা প্রদান করে। আর প্রথম রাতেই বিড়াল মারার কায়দায় ১৯৪৮-এ প্রথম সফরে এসে এই ঘোষণা দেন ‘পাকিস্তানের জনক’ স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ওই বছরই পাকিস্তান গণপরিষদে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তৎকালীন বিরোধী দলের সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি তুললে যে-ভাষায় তার উত্তর দেন তা শুধু অগণতান্ত্রিক নয়, এক তথাকথিত স্বাধীন দেশে ঔপনিবেশিক কোনো ভূখ-ের শাসকেরা কোনো প্রজাকে যে ভাষায় অপমান করেন তার কথা মনে করিয়ে দেয়। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও অধিকৃত দেশের শিখ-ী শাসকের মতো প্রভুদের সুরে সুর মেলান।
এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার ছাত্র, সচেতন নাগরিক সমাজ এবং প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। এই ক্ষোভ-বিক্ষোভের রাজনৈতিক রূপ প্রকাশ পায় ১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে। তখনও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে যেসব ছাত্রনেতা ওই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাদের অনেকেই এক বছর পরে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করে নেতৃপদে বৃত হন। শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ এদের মধ্যে অন্যতম। অতএব, বলা যায় পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিরোধকল্পে একটি শক্তিশালী নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠন ও তাকে বাঙালির গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষা ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দÑ মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আতাউর রহমান খান, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ও তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের লক্ষ্য।
পূর্ব-বাংলার ভাষা-আন্দোলন একই সঙ্গে ছিল একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যনির্ভর জাতীয় আন্দোলন এবং বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা রক্ষার মরণপণ লড়াই। ফলে, পূর্ববাংলার অধিকারবঞ্চিত মানুষের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে মূল বিস্ফোরক উপাদান হিসেবে তার মাতৃভাষা ও হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার বিষয়টি যুক্ত হয়ে যাওয়ায় তা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেরই চেহারা লাভ করে। পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী, চক্রান্তকারী শাসকগোষ্ঠী ১৯৪৮-এর ভাষা-আন্দোলনের ওই রূপটি বুঝতে না-পারায় বা বুঝতে না-চাওয়ায়, ১৯৫২ সালে তাদের তল্পিবাহক পূর্ববঙ্গ সরকারের গুলি করে ছাত্রহত্যার ফলে পূর্ববাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটায়। রাজনীতি ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন পাকিস্তানের এক ধরনের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে ছিল এক অবধারিত বিষয়। পাকিস্তানিরা পূর্ববাংলার ওপর যে তীব্র শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেয় তার সঙ্গে তথাকথিত ‘পাকিস্তানি সংস্কৃতি’ প্রবর্তনের নামে বাঙালি সংস্কৃতির প্রবহমান ধারাকে রুদ্ধ করে দেয়ার প্রয়াস পায়। সংস্কৃতির ওপর এই আঘাতকে বাঙালি কোনোদিন মেনে নেয়নি।

দুই
পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলন (১৯৪৮-৫২) এবং সমসামরিক ক’টি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, যথা : পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন, ঢাকা (১৯৪৮-৪৯), পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন, চট্টগ্রাম (১৯৫১), পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন, কুমিল্লা (১৯৫২) এবং পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন, ঢাকা (১৯৫৪) বাঙালির রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনই শুধু ঘটায়নি, রাজনৈতিক দিক- নির্দেশনার কাজও করেছে। ১৯৪৮-এর ৩১ ডিসেম্বর ও ১৯৪৯-এর ১ জানুয়ারি ঢাকায় কার্জন হলে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম দিনে মূল সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন দুটি রাজনৈতিক বিষয়কেও সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন। ভাষা-আন্দোলনের কথা মনে রেখে তিনি বলেন : ‘স্বাধীন পূর্ববাংলার স্বাধীন নাগরিকরূপে আজ আমাদের প্রয়োজন হয়েছে সর্বশাখায় সুসমৃদ্ধ এক সাহিত্য। এই সাহিত্য হবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়। পৃথিবীর কোনো জাতি জাতীয় সাহিত্য ছেড়ে বিদেশি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে যশস্বী হতে পারেননি। ইসলামের ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিকেই পারস্য আরব কর্তৃক বিজিত হয়েছিল, পারস্য আরবদের ধর্ম নিয়েছিল, আরবি সাহিত্যেরও চর্চা করেছিল। কিন্তু তার নিজের সাহিত্য ছাড়েনি।’ অন্যদিকে ওই সম্মেলনে পূর্ববাংলায় বসবাসকারী বাঙালি হিন্দু মুসলমানের জাতিসত্তার অমোঘতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা লুঙ্গি-টুপি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’
উপর্যুক্ত সাহিত্য বা সংস্কৃতি সম্মেলনেও বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং তার বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ওপরই বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে। এর সমর্থক সংখ্যার সিংহভাগ ছিল গরিব-দুস্থ, নিম্নআয়ের লোক এবং নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্তসমাজ আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জোট কৃষক সম্প্রদায়। আর এই দলের নেতৃত্ব ছিল দ্রুত বিকাশমান মধ্যবিত্ত সমাজের হাতে। এই সমাজ স্বভাবতই সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতন। ফলে ভাষা- আন্দোলন তাদের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিক সঙ্গে এদের সহজ সংযোগ থাকার ফলে শুধু ভাষার প্রশ্নে নয়, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার ও তার সঙ্গে রাজনীতিকে সম্পৃক্ত করে নেবার একটা প্রবণতাও তাদের মধ্যে দেখা যায়। এই প্রবণতা থেকেই বাংলা-অঞ্চলের আঞ্চলিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলা, বাঙালি ও বাঙালিত্বের ওপর জোর পড়ে এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের জুলুম, নির্যাতন ও তীব্র অর্থনৈতিক শোষণের বিপরীতে গড়ে ওঠে বাঙালি ঔপনিবেশিক কায়দায় জাতীয়তাবাদ। ফলে আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রায় একক ও অনন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ এই রাজনৈতিক ধারাকে পূর্ববাংলার রাজনীতিতে মূলধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। বাঙালির এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগ্রামের এগিয়ে নেবার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ উপযোগী সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে।

তিন
ঞযব ড়িৎফ ‘ইবহমধষ’ যধং ধ যরংঃড়ৎু, যধং ধ ঃৎধফরঃরড়হ ড়ভ রঃং ড়হি. ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে দেয়া ভাষণে ‘পূর্ববাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখার কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান উপর্যুক্ত উক্তি করেন। এই উক্তির মধ্যদিয়ে শেখ সাহেবের রাজনৈতিক চিন্তা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন, রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে স্বীকার করেও নিয়েছেন; কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে পূর্ববঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাক এমনটি তিনি কখনও চাননি। কারণ, তিনি বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করেন। এই ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করে পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করে তোলাই তার অন্বিষ্ট। বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই তিনি সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম-অত্যাচারকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। বাংলাদেশকে সামনে রেখেই তিনি তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার বিন্যাস ঘটিয়েছেন এবং তার সংস্কৃতিচিন্তাই আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিচিন্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও উপর্যুক্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত বাঙালি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিগত হাজার বছরের অর্জনকে অঙ্গীভূত করে নিয়েছিল। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিন খান ভাসানীর উদ্যোগে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন (৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি) এবং তিন দিনব্যাপী (৮, ৯, ১০ ফেব্রুয়ারি) এক বিরাট আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে পূর্ববাংলার খ্যাতনামা শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মিসর, জাপান প্রভৃতি দেশের বিদ্বজ্জন অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন এই সম্মেলনের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন : ‘আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং তার ফল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক (দার্শনিকও বটে) ভিত্তিভূমি নির্মাণের ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার অন্যতম। জাতি মাত্রেরই সংস্কৃতি আছে। বাঙালি জাতি একটি সুপ্রাচীন যৌথ সংস্কৃতির অধিকারী। এ সংস্কৃতিতে আদিবাসী, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি সকল সম্প্রদায় ও বর্ণের বিশিষ্ট অবদান আছে। বাঙালি জাতির যৌথ উদ্যমে ও আয়োজনে শত শত বছরব্যাপী গ্রহণ ও বর্জনের মাধ্যমে সৃজিত বাঙালির আলাদা জাতীয়সত্তা ও সংস্কৃতির প্রতি বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক দৃষ্টি প্রথম আকর্ষণ করে কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন।
এই সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে বাঙালির জনপ্রিয় তরুণ নেতা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট লোকশিল্পীকে এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে ছিলেন সুনামগঞ্জের বিখ্যাত মরমী বাউল শিল্পী শাহ আবদুল করিম। শেখ সাহেব এই সম্মেলনে একটি লিখিত ভাষণও দেন।

চার
১৯৬১-এর দশকের প্রথম থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই, এমন একটা চিন্তা বঙ্গবন্ধুর মাথায় আসে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে প্রস্তুত করতে থাকেন। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি এজন্য ৬-দফা ঘোষণা করেন, স্বাধীনতার প্রাথমিক কাজগুলো করার জন্য ছাত্রলীগের ক’জন বিশ্বস্ত নেতাকে নিয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করেন এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক কর্মকা- জোরদার করেন। এক্ষেত্রে বিস্ময়ের সঙ্গে একটা বিষয় আমরা লক্ষ্য করিÑ সাধারণত কম্যুনিস্ট ও বামপন্থি নেতারা তাদের রাজনীতিতে সংস্কৃতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। জাতীয়তাবাদী নেতাদের মধ্যে সংস্কৃতির প্রতি তেমন প্রবল ঝোঁক দেখা যায় না। বঙ্গবন্ধু এদিক থেকে ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী এক নেতা। রাজনৈতিক গ্রন্থের সঙ্গে তিনি গল্প-উপন্যাসও যথেষ্ট পড়তেন। শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ ছিল। এমনকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকশিল্পীদের সঙ্গেও তার সখ্য ও প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে অন্তরের যোগ না থাকলে এটা হয় না। সাহিত্য-শিল্পের উন্নতি অগ্রগতির লক্ষ্যে তিনি প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী বা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সরকারপ্রধান হিসেবে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ এফডিসি, শিল্পকলা একাডেমি এবং সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কথা বলা যায়। শুধু তাই না, এসব প্রতিষ্ঠার কী কাজ করবে সেসব বিষয়েও তিনি ভেবেছিলেন। যেমন তার বন্ধু প্রখ্যাত শিল্পী কলিম শরাফীকে তিনি বলেছিলেন : ‘শিল্পকলা একাডেমি করে দিলাম; এর প্রধান কাজ হবে আমাদের দেশের লোকশিল্পসমূহ সকল রকম শিল্পকর্মের নমুনা সংগ্রহ করে তার ওপর গবেষণা করা।’ এই সব দেখে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস’র একটা কথা মনে হয়। এঙ্গেলস বলেছিলেন, ‘যে-কোনো সুস্থ সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ স্বাধীনতাকে সংহত করে।’ মনে হয় যেন একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। ফলে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৭ সালে পূর্ববাংলায় রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করায় তিনি শুধু যে বিচলিত হয়েছিলেন তাই না, জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ও বাংলার অধ্যাপক শ্রী অজিত কুমার গুহের সঙ্গে পরামর্শ করে এক বড় আকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে বলেন। সে অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার লোক উপস্থিত ছিল। আকস্মিকভাবে তাতে রবীন্দ্রসংগীতও পরিবেশন করা হয়। নিষেধের বেড়াজাল এভাবে ভেঙে দেয়ায় গভর্নর মোনায়েম খাঁ ভীষণ ক্ষিপ্ত হন। অজিতবাবুকে কলেজ ছাড়তে হয়, অধ্যক্ষ বদলি হন এবং কিছুদিনের মধ্যে কলেজটিকে সরকারি কলেজ করা হয়।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবশত কবিকে তিনি ‘কবিগুরু’ বলতেন। বক্তৃতা বিবৃতিতে কবির কবিতা আওড়াতেন। এই শ্রদ্ধার কারণেই রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’কে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করেন।
নজরুলের প্রতিও ছিল তার শ্রদ্ধা প্রগাঢ়। বাঙালির মুক্তিমন্ত্র ‘জয় বাংলা’ তিনি নজরুল থেকেই নিয়েছিলেন। স্মর্তব্য যে, কৈশোরে বঙ্গবন্ধু স্বদেশী আন্দোলনের ফরিদপুর জেলার কিছু নেতাকর্মীর সংস্পর্শে আসেন। এই নেতাদের একজন ছিলেন মাদারীপুরে পূর্ণচন্দ্র। তিনি সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগে ধৃত হন। তার মুক্তি উপলক্ষে লেখা গানে নজরুল ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। বঙ্গবন্ধুর মনে হয়তো শব্দটি গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া নজরুলের ‘বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক’ তো ছিলই। অসুস্থ ও নির্বাক কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশে এনে তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সরকার যথাযোগ্য মর্যাদা দেখায়।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনীতি ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলেছে। এ ব্যাপারে আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের দারুণ মিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য দল সংস্কৃতির দাহ্যগুণ উপলব্ধি করেছিল বলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে লৌহদৃঢ় ঐক্য গড়ে ওঠে তাতে সংস্কৃতির অবদান বিরাট। এ বিষয়টি লক্ষ করেই তখনকার এক সোভিয়েত তাত্ত্বিক মস্কোতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশিয়ান সাহিত্য সম্মেলনে আমাকে বলেছিলেন : ‘তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এটা শিখিয়েছে যে, সৃষ্টিশীল জাতীয়তাবাদ দুই বিপরীতকে একত্র করে নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ এবং সুকান্তের সমান্তরাল ব্যবহার আমাদের জন্য এক চমৎকার শিক্ষা।’ আসলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রবীন্দ্রনাথ নজরুল, সাধারণ মধ্যবিত্তের বাঙালিত্ব এবং গ্রামবাংলার মানুষের লোক-সংস্কৃতিকে ৩টি স্তরে বিন্যস্ত করে যে ঐকতানের সৃষ্টি করেন তা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
পাঁচ
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সংস্কৃতির একটা রূপরেখা তৈরি করে দেন। তার মূল কথাগুলো এ-রকমÑ

১.    ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বার্ষিক অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ না থাকলে আমাদের স্বাধীনতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।’
২.    ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।
৩.    আমরা বাঙালি। আমরা ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছি।
৪.    আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র, আমরা চাই না শোষকের গণতন্ত্র।
৫.    আমরা সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে দরিদ্র নই।… স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মর্যাদাকে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।… বিশ্বের স্বাধীনতালব্ধ জাতিগুলির মধ্যে আমরা এদিক থেকে গর্ব করতে পারি যে, আমাদের স্বাধীনতা-আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম হাতে হাত ধরে অগ্রসর হয়েছে। আজকে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে, তখন সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের কাছে আমার প্রত্যাশা আরও অধিক। যারা সাহিত্যসাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাদেরকে দেশের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করে অগ্রসর হবে হবে।… সাহিত্য-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এদেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা, সাহিত্যশিল্পকে কাজে লাগতে হবে তাদের কল্যাণে। (১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণ)।

১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে সংস্কৃতিক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তার শাসন আমলেই নাটকের সেন্সরশিপ তুলে নেওয়া হয়। দেশের গরিব-দুস্থ গ্রামীণ লোকশিল্পীদেরও একুশে পদক দেওয়া হয়। ফলে এই সম্মানজনক পদক পান ঢোলশিল্পী বিনয় বাঁশি জলদাস, কবিয়াল ফণি বড়–য়া ও বাউলশিল্পী শাহ আবদুল করিম। হাসিনা সরকার ১৯৯৬-২০০১-এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও সংস্কৃতিবলয়ের যে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, তা বাস্তাবায়িত হলে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সমন্বিত সাংস্কৃতিক ধারা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের যে যুগল চিত্র প্রস্ফুটিত হতো, তা আমাদের স্বাধীনতাকে অনিঃশেষ শক্তি জোগায়। জোট সরকার এই পরিকল্পনা বন্ধ করে রেখেছে।

Category: