Blog Archives

২০৩০ সালে ভারতের চেয়ে মাথাপিছু আয় বেশি হবে বাংলাদেশের

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের গবেষণা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের চেয়ে ধনী দেশ হবে বাংলাদেশ। গবেষণায় আভাস দেওয়া হয়েছে, এ-সময়ে ভারতীয়দের চেয়ে বাংলাদেশিদের মাথাপিছু আয় ৩০০ ডলার বেড়ে যাবে। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, অর্থনীতির বিচারে আগামী দশক শীর্ষ সাত অর্থনীতির মধ্যে থাকবে এশিয়ার ৫টি দেশ। দেশগুলোÑ বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্স। দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ভারতীয় প্রধান মধুর ঝাঁ গত ১২ মে বিশ্ব অর্থনীতি বিভাগের গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরই বসবাস হবে এশিয়া অঞ্চলে। জনতাত্ত্বিক এই সুবিধা ভারতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয়দের চেয়ে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকবে বাংলাদেশীরা। সে-সময় ভারতের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ৫ হাজার ৪০০ ডলারে। একই সময়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় আরও ৩০০ ডলার বেড়ে দাঁড়াবে ৫ হাজার ৭০০-তে।

Category:

চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন ওবায়দুল কাদের

Posted on by 0 comment

PddMউত্তরণ প্রতিবেদন: সিঙ্গাপুরে দুই মাস ১০ দিন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। গত ১৫ মে বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। দেশে ফিরে নিজের শারীরিক সুস্থতা ফিরে পাওয়ায় চিকিৎসার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি। জনগণের ভালোবাসায় নতুন জীবন পেয়েছি উল্লেখ করে নতুন উদ্যমে আওয়ামী লীগের পাশে থেকে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ওবায়দুল কাদের।
এদিকে বিমানবন্দরে প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিলেন বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওবায়দুল কাদের বেরিয়ে এলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এবং পরে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ-সময় বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি আবেগ ভরা কণ্ঠে তার চিকিৎসার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাকে (প্রধানমন্ত্রী) বলা হয় মাদার অব হিউম্যানিটি। আমার ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরম মমতা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। তিনি একজন মমতাময়ী মা। তিনি সত্যিই মাদার অব হিউম্যানিটি। তার কাছে আমার ঋণের বোঝা আরও বেড়ে গেল। তার সুস্থতা কামনার জন্য বঙ্গবন্ধুর অপর কন্যা শেখ রেহানার কাছেও অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের। এছাড়াও দলের সব নেতাকর্মীসহ যারা তার খোঁজখবর রেখেছেন, সুস্থতা কামনা করে দোয়া করেছেন, সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানান সেতুমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন রাজনীতিবিদের সবচেয়ে বড় অর্জন জনগণের ভালোবাসা। জনগণের ভালোবাসায় আমি নতুন জীবন পেয়েছি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আমার দলের সব নেতাকর্মীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যারা হাসপাতালে আমার ওই সময়ে ছুটে এসেছিলেন। ওই সময় আমার মধ্যে আমি ছিলাম না, আমি জানতাম না আমার কী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা। জীবনটা আসলেই স্রোতের প্রতিকূলে চলার মতো। এই শিক্ষা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনার কাছ থেকে পেয়েছি। মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় শুধু শেখ হাসিনা নাম ধরে ডেকেছিলেন এবং সে-সময় আমি তার ডাকেও সাড়া দিয়েছিলাম।
গত ৩ মার্চ সকালে বুকে প্রচ- ব্যথা নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হন ওবায়দুল কাদের। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৪ মার্চ তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। ওই রাতেই মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ডা. ফিলিপ কোহ’র নেতৃত্বে ওবায়দুল কাদেরের চিকিৎসায় একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। ২০ মার্চ ওই হাসপাতালে তার বাইপাস সার্জারি করেন মেডিকেল বোর্ডের সিনিয়র সদস্য কার্ডিওথোরাসিক সার্জন ডা. সিবাস্টিন কুমার সামি। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে গত ২৬ মার্চ ওবায়দুল কাদেরকে হাসপাতালের আইসিইউ থেকে কেবিনে নেওয়া হয়। এক মাস পর হাসপাতাল ছাড়লেও চিকিৎসকরা ‘চেকআপের জন্য’ আরও কিছুদিন তাকে সিঙ্গাপুরে থাকার পরামর্শ দেন। এরপর একটি বাসা ভাড়া করে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করেন ওবায়দুল কাদের।

Category:

বিশ্বকাপ ক্রিকেট স্বপ্নরঙিন হাতছানি

Posted on by 0 comment

PddMআরিফ সোহেল: অর্জনের রেকর্ডবুকে বাংলাদেশের আরেকটি নতুন অধ্যায় রচিত হলো। বহুজাতিক আসরে শিরোপা না পাওয়ার কষ্ট শেষ। বিশ্বকাপ ক্রিকেট মিশন শুরুর আগে ক্রিকেটপাগল বাঙালিদের কাছে এ এক বড় প্রাপ্তি। আয়ারল্যান্ডে তিন জাতি ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলও এক ফুৎকায় উড়ে গেছে বাংলাদেশের কাছে। ধারাবাহিক পারফরমেন্সে উদ্বেলিত-উজ্জীবিত বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন স্বপ্নের ঘুড়ি উড়তে শুরু করেছে।
দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ভাস্বর বাংলাদেশ এখন বিশ্বকাপ ক্রিকেটালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যেই বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপ খেলাই ছিল স্বপ্নারাধ্যের মতো। সেই বাংলাদেশই এখন অনেকের কাছে নতুন ‘শ্রীলংকা’। ঠিক ১৯৯৬ সালে শ্রীলংকার অবিকল দল বলার চেষ্টা করছেন। নতুন ফরমেটের বিশ্বকাপ আসরে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল নিশ্চিত এহেন কথা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। এমন কী পঞ্চম বিশ্বকাপেই শিরোপা জয়কে অসম্ভব দেখছেন না কেউ কেউ!
কেন তার অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এক্সপার্টরাÑ
এক. প্রথমত গত বিশ্বকাপের দুর্দান্ত ফর্ম। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ।
দুই. স্বাগতিক আয়ারল্যান্ড ও সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জয়।
তিন. ধারাবাহিক দলীয় পারফরমেন্স। গত দেড় বছরে ২৭ ওয়ানডের ১৭টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। এ-সময় বিবেচনায় দল হিসেবে তৃতীয় বাংলাদেশ। তাদের ওপরে রয়েছে ইংল্যান্ড আর ভারত।
চার. ক্রিকেটপ্রাণ মাশরাফি বিন মর্তুজার বুদ্ধিদ্বীপ্ত বোলিং আর চৌকস অধিনায়কত্বে দলের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলার ঈর্ষণীয় গুণ।
পাঁচ. ১৯৯৮ সালে ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়ার ২২ বছর পর কোনো টুর্নামেন্টের বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা জয়ের অনুপ্রেরণা।
ছয়. বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটার। উল্লেখ্য, সদ্য প্রকাশিত আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে সাকিব বিশ্বকাপে এক নম্বর অলরাউন্ডার হিসেবে খেলতে যাচ্ছেন।
আয়ারল্যান্ড পর্ব শেষ করে বিশ্বকাপ ক্রিকেট মঞ্চে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ দল। ৩০ মে পর্দা উঠেছে ক্রিকেটের মহা-আয়োজনের। ব্রিটিশ রাজ প্রাসাদের মলচত্বরে হয়ে গেছে ১২তম বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরের জমকালো উদ্বোধন। ১ জুন থেকে মাঠের লড়াই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচ ২ জুন। প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা।
ত্রিদেশীয় সিরিজে শিরোপা জয়। শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দু-দফা হারিয়ে বাংলাদেশ শতভাগ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে। তাই এক্সপার্টরা মাশরাফির বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখছেন। সম্প্রতি সময়ে দারুণ খেলছে বাংলাদেশ। এই আসরে প্রাপ্তি-অর্জন বড্ড কাজে লাগবে বিশ্বকাপে। বিশেষ করে পেসারদের গুঁড়িয়ে-উড়িয়ে হুক-পুলের অভিজ্ঞতা ইংলিশ কন্ডিশনে খুব কাজে লাগবে। ওয়ানডেতে তামিম, মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর পাশাপাশি লিটন, সৌম্য, মোসাদ্দেক, মিরাজ, জায়েদের ওপরও এখন নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে অভিজ্ঞতা আর সৌরভময় তারুণ্যের দৃঢ়তায় বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য।
ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার অনিল কুম্বলে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে দারুণ খেলছে। তিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আলাদাভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বকাপে এবার অন্যরকম বাংলাদেশকে দেখা যাবে। ধারাবাহিকতা থাকলে তাদের সেমিফাইনাল খেলা নিশ্চিত।’
ভারতের সাবেক ওপেনার ও ধারা বিশ্লেষক আকাশ চোপড়া বলেছেন, ‘এশিয়ায় ভারতের পর দাপুটে দল হিসেবে এখন পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশকেই মনে করে ক্রিকেটপ্রেমীরা। আমার মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ নকআউট পর্বে উঠবে; মানে সেমিফাইনাল খেলবে।’
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম মাশরাফির বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলংকার প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক শ্রীলংকার মতো বাংলাদেশ দলে এখন শুরুতে ঝুঁকি নেওয়ার মতো ক্রিকেটার আছে, আছে তাদের সামর্থ্যও। আবার পরে ধরে খেলার ক্রিকেটারের সংখ্যাও কম নয়। এবারের বাংলাদেশ বিশ্বকাপে যে কোনো দলকেই ভড়কে দিতে পারে।
অন্যদিকে বাইরে থেকে বাংলাদেশ দলের শক্তি হয়ে দারুণ বোলিং-ব্যাটিং-ফ্লিডিং করছেন কোচ স্টিভ রোডস। তার মন্ত্রের উজ্জীবনী সুধা পান করে সিনিয়র-জুনিয়র সব ক্রিকেটাররাই দুর্দান্ত পারফরমেন্স করছেন। প্রথমবারের মতো ওয়ানডে টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ী দলের কোচ স্টিভ রোডস মনে করেন, পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের বাইরেও বাংলাদেশ শক্তি সঞ্চয় করেছে।
পরিসংখ্যানও আদরে কাছে টেনে নিয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ১৯ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ খেলেছে দুটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আর এশিয়া কাপ। ৩টি টুর্নামেন্টেরই ফাইনালে উঠে শিরোপা জিতেছে একটিতে। এ-সময়ের নিষ্কণ্টক পরিসংখ্যানে ৩৫ ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের জয় ২৪টিতে। ৩৩ ম্যাচে ভারতের জয় ২২টিতে। শ্রীলংকার দেড় বছরে ২৬ ওয়ানডে খেলে জিতেছে মাত্র ৬টি ম্যাচে।
বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ড প্রস্তুতিটা দারুণ এবং সুচারুভাবেই সম্পাদন করেছেন মাশরাফিরা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বহুজাতিক আসরে শিরোপা জয়ের সঙ্গে টোটাল দল হিসেবে বাংলাদেশের ড্রেস রিহার্সসোসের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হয়েছে। এই আসরে ওপেনিং সংকট থেকে পরিত্রাণ, রান তাড়া করে জয়, চাপের মধ্যেও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার কৌশল, আশা জাগানিয়া ব্যাটিং এবং সব মিলিয়ে পেশাদার টিম বাংলাদেশ হয়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরুর আগে এক আসরে একগুচ্ছ প্রাপ্তি বাংলাদেশকে নিয়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিত করেছে।
কাটলো শিরোপা জয়ের অর্বাচীন গেরো। গত এক যুগে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ছয়-ছয়টি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেও শিরোপা জিততে পারেনি বাংলাদেশ। অবশেষে সেই অমানিশার আঁধার কেটেছে আয়ারল্যান্ডে এবং তা দুর্দান্তভাবেই।
দুয়ারে বিশ্বকাপ; কিন্তু প্রথমবারের মতো ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ের উৎসব এখনও চলছে। মাশরাফি-সাকিবরা উদযাপনে রং ছড়াতেই আয়ারল্যান্ড থেকে ছুটি পেয়েই দেশে ছুটে এসেছেন। প্রথম শিরোপা জয়ের স্বাদ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। কথা বলেছেন মিডিয়ার সঙ্গে; বিশ্বকাপ আর ত্রিদেশীয় জয় ইতিহাস নিয়ে। বাংলাদেশ তার ক্রিকেটাতিহাসে ২০০৯ ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে উঠেছিল। এশিয়া কাপে ২০১২ ও ২০১৬ সালেও বাংলাদেশ ফানালিস্ট। কিন্তু এই ৩টিতেই ফাইনালে নাকাল বাংলাদেশ। ২০১৮ সালেও ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ ও নিদাহাস ট্রফিতে ফাইনালে উঠেও জয় থেকেছে সোনার হরিণ হয়েই। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল, যে ম্যাচে ভারতের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালেও ভারতের কাছেই হেরেছিলেন মাশরাফিরা। স্মৃতির ক্যানভাসে ২০০০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৮ উইকেটে হারের গল্পটাও ভেসে ওঠে।
তিন জাতি ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৬১ রান তাড়া করে বাংলাদেশ জিতেছে ৮ উইকেটে, ৪০ বল হাতে রেখে। পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৪৭ রান বাংলাদেশ টপকে গেছে ৫ উইকেট এবং ১৬ বল হাতে রেখে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯৩ রানের টার্গেটও স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে এবং ৪২ বল হাতে রেখে। এরপর বৃষ্টিবিঘিœত ফাইনাল ম্যাচে ২৪ ওভারে বাংলাদেশকে করতে হবে ২১০। অর্থাৎ ওভারপ্রতি রানের নামতা গুনতে হয়েছে ৮.৭৫। যদি ৫০ ওভারে এই রানরেট বিবেচনা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের টার্গেট ছিল প্রায় ৪৩৮! এই ম্যাচেও বাংলাদেশ সৌম্য-মোসাদ্দেকের দাপুটে ব্যাটিংয়ে ৭ বল হাতে রেখেই শিরোপা জয় করে।
দীর্ঘ দেড় মাসব্যাপী বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরে এবার ১০ দলের সবাই একে অন্যের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। পয়েন্ট টেবিলের সেরা চার উঠবে সেমিফাইনালে। টাইগারদের প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ৮টি ভেন্যুতে ঘুরে ঘুরে বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বের ৯ ম্যাচ খেলবে মাশরাফি-সাকিবরা। সেখানে স্বপ্ন-সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। ‘বাংলাদেশ সেমিফাইনালও খেলতে পারে’ ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের এই মুখবাক্যকে লাল-সবুজের অনুরাগীরা স্পটলাইন হিসেবে ধারণ করে বসে আছে।

Category:

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

Posted on by 0 comment

PddMউত্তরণ প্রতিবেদন: দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদসহ ৮ হাজার দেশি-বিদেশি অতিথির উপস্থিতিতে গত ৩০ মে সন্ধ্যা ৭টায় নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে মোদি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ছাড়াও ৮ হাজার অতিথি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায় বেশ কিছু নতুন মুখ ঠাঁই পেয়েছেন। নির্বাচনে বিজেপির বিশাল জয়ের পর এ দিন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। এর কিছুক্ষণ আগেই নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, তার একটি তালিকা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি ভবনে উপস্থিত হওয়ার আগে বিকাল ৫টায় নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে হাজির হন। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ তাদের মোদির বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। ২৩ মে ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদে এনডিএ জোট সরকারের মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করতে ২৮ মে দীর্ঘ বৈঠক করেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি। শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান সরকারের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগের সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রী নতুন মেয়াদে নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। তবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মন্ত্রিসভায় নতুন একজন যোগ দিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম সেরা চমক এ রাজ্যেই। একই সঙ্গে বিজেপির নতুন জায়গা করে নেওয়া উড়িষ্যা ও উত্তর-পূর্বের মতো অঞ্চলগুলো থেকে প্রতিনিধি সংযোজন হবে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং জেটলি সত্যিই না থাকলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রদবদল আসতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভার কিছু পরিবর্তন মূলত আনা হবে জোটের কয়েকজনকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য; যেমনÑ নিতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড এবং আকেলি দল রয়েছে এ তালিকায়। বিহারে বিজেপির শক্তিশালী মিত্র নিতিশ কুমার ওই রাজ্যে দলটিকে বিরাট বিজয় অর্জন করতে ভূমিকা রাখেন। সেই অধিকারে তিনি মন্ত্রিসভায় দুটো পদ চেয়েছেন।
শপথ গ্রহণকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি ৩০ মে সকালে মহাত্মা গান্ধী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। নয়াদিল্লি ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালেও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
এবারের শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদসহ প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধান ও দেশ-বিদেশের বিশিষ্টজনসহ রেকর্ড ৮ হাজার অতিথির যোগ দেন। কংগ্রেসপ্রধান রাহুল গান্ধী, ইউপিএ’র চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী এবং নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালও শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। প্রথমে থাকার কথা বললেও নির্বাচনী সহিংসতার অভিযোগ এনে শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

মোদির নতুন মন্ত্রিসভা
নরেন্দ্র মোদি Ñ প্রধানমন্ত্রী, সংস্থাপন, জনস্বার্থ ও অবসর, আণবিক শক্তি দফতর ও মহাকাশ দফতর; প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ; নীতিন গড়করি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী; ডিভি সদানন্দ গৌড়া সার ও রাসায়নিক; নির্মলা সীতারমন অর্থমন্ত্রী ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী; রামবিলাস পাসোয়ান ক্রেতা সুরক্ষা, খাদ্য ও গণবণ্টন; নরেন্দ্র সিং তোমর কৃষি ও কৃষক কল্যাণ, গ্রাম উন্নয়ন ও পঞ্চায়েতি রাজ; রবি শঙ্কর প্রসাদ আইন ও বিচার বিষয়ক, যোগাযোগ, ইলেক্ট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি; হারসিমরাত কাউর বাদল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প; থাওয়ার চাঁদ গেহলত সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন; ড. এস জয়শঙ্কর পররাষ্ট্রমন্ত্রী; রমেশ পোখরিয়াল নিশঙ্ক মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক; অর্জুন মুন্ডু আদিবাসী; স্মৃতি ইরানি নারী ও শিশু কল্যাণ ও বস্ত্র, ডা. হর্ষবর্ধন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ভূ-বিজ্ঞান বিষয়ক; প্রকাশ জাভাদেকর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য ও সম্প্রচার; পিযুষ গয়াল শিল্প ও বাণিজ্য এবং রেলমন্ত্রী; ধর্মেন্দ্র প্রধান পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ইস্পাত; মুখতার আব্বাস নাকভি সংখ্যালঘু; প্রহ্লাদ জোশি পার্লামেন্ট, কয়লা ও খনি; ড. মহেন্দ্র নাথ পান্ডে দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা; অরবিন্দ গুপত সাওয়ান্ত ভারি শিল্প ও সরকারি উদ্যোগ; গিরিরাজ সিং প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ ও মৎস্য; গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত জলবিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীর (স্বতন্ত্র দায়িত্ব) দায়িত্ব পেয়েছেন ৯ জন। শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সন্তোষ কুমার গাংওয়ার; পরিসংখ্যান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী রাও ইন্দ্রজিৎ; আয়ুর্বেদ, যোগ ব্যায়াম ও প্রাকৃতিক চিকিৎসা, ইউনানী, সিদ্ধ ও হোমিওপ্যাথি (এওয়াইইউএসএইচ) বিষয়ক এবং প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী শ্রীপদ নায়েক; উত্তর-পূর্ব অঞ্চল উন্নয়ন বিষয়ক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংস্থাপন, জনস্বার্থ ও অবসর, আণবিক শক্তি ও মহাকাশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ডা. জিতেন্দ্র সিং; যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজিজু; সংস্কৃতি ও পর্যটন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং প্যাটেল; বিদ্যুৎ, নতুন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রাজ কুমার সিং; গৃহায়ন ও শহর বিষয়ক, বেসামরিক বিমান চলাচল, শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হারদ্বীপ সিং পুরি এবং জাহাজ চলাচল এবং রাসায়নিক সার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মনসুখ এল মান্দাভিয়া।
এছাড়া আরও ২৪ জনকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেনÑ ইস্পাত বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফাগনসিং কুলাস্তে; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার কুবে; পার্লামেন্ট বিষয়ক ও ভারী শিল্প ও সরকারি প্রকল্প বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জেনারেল (অব.) ভি কে সিং; সামাজিক ন্যায়বিচার ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কৃষাণ পাল; ক্রেতা সুরক্ষা, খাদ্য ও গণবণ্টন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দানভি রাওসাহেব দাদারাও; স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি; কৃষি ও কৃষক কল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পার্শ্বোত্তম রুপালা; সামাজিক ন্যায়বিচার ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রামদাস আদাওয়ালে; গ্রাম উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী নিরঞ্জন জ্যোতি; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়; প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ ও মৎস্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সঞ্জীব কুমার বালিয়ান; মানবসম্পদ উন্নয়ন, যোগাযোগ, ইলেক্ট্রনিক্স ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ধত্রে সঞ্জয় শ্যামরাও; অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ সিং ঠাকুর; রেলওয়ে প্রতিমন্ত্রী অঙ্গাদি সুরেশ চান্নাবাসাপ্পা; স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায়; জলবিদ্যুৎ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রত্তন লাল কাটারিয়া; পররাষ্ট্র ও পার্লামেন্ট্রারি অ্যাফেয়ার্স প্রতিমন্ত্রী ভি মুরালিধরন; আদিবাসী বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রেণুকা সিং সারুতা; বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী সোম প্রকাশ; খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রামেশ্বও তেলি; ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধ ও মৎস্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি; কৃষি ও কৃষক কল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কৈলাশ চৌধুরী এবং মহিলা ও শিশু কল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী।

আবদুল হামিদ-নরেন্দ্র মোদি বৈঠক
দুই উদযাপনে অংশীদার হতে চায় ভারত
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে অংশীদার হতে চায় ভারত। গত ৩১ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে ওই আয়োজনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ-সময় তিস্তার পানি বণ্টন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও তারা আলোচনা করেন। মোদি বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে দিল্লির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে এই সাক্ষাতে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় মোদিকে অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদিন এসব তথ্য জানান। মোদির শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ২৯ মে ভারতে যান রাষ্ট্রপতি হামিদ।
জয়নাল আবেদিন জানান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে দুই দেশ যৌথ উদ্যোগ নিলে তা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পাবে বলে মত প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মের শত বছর পূর্ণ হবে। ঠিক পরের বছর ২৬ মার্চ বাংলাদেশ উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।
রাষ্ট্রপতি হামিদ আশা প্রকাশ করেন, ভারতের জনগণ মোদির প্রতি যে আস্থা রেখেছে, সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তরফ থেকেও মোদিকে শুভেচ্ছা জানান রাষ্ট্রপতি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরেরও আমন্ত্রণ জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি থাকায় প্রধানমন্ত্রী নিজে আসতে পারেননি। তবে তিনি এবং বাংলাদেশের জনগণ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তাকে স্পর্শ করেছে। দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে এবং সেজন্য দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টিও এদিন আলোচনায় আসে। বাংলাদেশের জনগণ যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী, সে-কথা রাষ্ট্রপতি বৈঠকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তিস্তা বাংলাদেশের জনগণের লাইফলাইন। রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, মোদির নতুন সরকারের অধীনে আগামী পাঁচ বছরে দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হবে।
বৈঠকে মোদি বলেন, তিস্তাসহ দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত বলে ভারত মনে করে। সেজন্য যৌথ নদী কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের একার নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নিরাপত্তা হুমকি। এ সমস্যা সমাধানে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে ভারত এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ভারতও মনে করে এটা বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। এর সুষ্ঠু সমাধানের জন্য ভারত সব সময় আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার থাকবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এই সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে গত পাঁচ বছরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নিরাপত্তা, জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কৃতি, জনগণের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ, ব্লু ইকোনমিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন আবদুল হামিদ।

Category:

আওয়ামী লীগের ৭০ বছরে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি ইনিংস

Posted on by 0 comment

PdM স্বদেশ রায়: ক্রিকেটে দুই ধরনের ব্যাটিং আছে একটি ঝড়ো ইনিংস খেলা অন্যটি টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলা। কিছু কিছু প্লেয়ার আছেন তারা টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলেন আর কিছু কিছু প্লেয়ার আছেন তারা ঝড়ো ইনিংস খেলেন। একমাত্র ক্রিকেটের কিংবদন্তি ডন ব্রাডম্যান এই দুয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার ব্যাটিংয়ে প্রতিটি ইনিংস যেমন ছিল ঝড়ো তেমনি টেকনিক্যালি টপ ইনিংস। রাজনীতিবিদ বা বিপ্লবীদের মধ্যেও ক্রিকেটারের এই চরিত্রের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আবার এখানেও আরেকটি বিষয়, সব বিপ্লবী রাজনীতিতে টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলতে পারেন না। কেউ কেউ শুধু বিপ্লবে একটি চমৎকার ইনিংস খেলেন। কেউ কেউ রাজনীতিতে ফ্লপ করেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ইনিংস যদি আমরা ক্রিকেটের ইনিংসের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে একমাত্র মিল খুঁজে পাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার ডন ব্রাডম্যানের সঙ্গে। যিনি প্রতিটি ইনিংসে ঝড় তুলেছেন এবং প্রতিটি ইনিংসই টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলেছেন। বঙ্গবন্ধুর সব ইনিংসই ব্রাডম্যানের মতো। সব গুলোতেই সেঞ্চুরি, তাও ডাবল ও ট্রিপল। সবগুলো উল্লেখ করতে গেলে বঙ্গবন্ধুর পরিপূর্ণ রাজনৈতিক জীবনের বিশ্লেষণ করতে হয়। আশা আছে ভবিষ্যতে কোনোদিন বই আকারে সেটা লিখব। তবে এখানে এ কলামে তার কয়েকটি ইনিংসই শুধু উল্লেখ করব।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। তখন তার নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। যারা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সকলে মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মী। মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে জনগণের (আওয়ামী) মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারা। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মুসলিম লীগ পাকিস্তান আদায় করেছিল ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের কাছ থেকে। সেই পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র এক বছর দশ মাসের মতো সময় পার না হতে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি ঝড়ো ইনিংস। আর খেলাটি হয়েছিল অত্যন্ত টেকনিক্যালি। এই গতিবেগ চঞ্চল নেতা সে সময়ে কে? যার কারণে এটা সম্ভব হলো! সেদিন আসাম থেকে মওলানা ভাসানী না এলে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার কাজটি বেশ কষ্টের ছিল। তবে মওলানা ভাসানীকে সেদিন যে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে দল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন এর ক্ষেত্রটি মাত্র ওই এক বছর দশ মাসের মতো সময়ে কে তৈরি করলেন? আধুনিক, গণতন্ত্র ও বিপ্লবীমনা একটা তরুণ মুসলিম শ্রেণি সেদিন এ পরিবেশ সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিলেন ঠিকই। মুসলিম লীগের কর্মীকেন্দ্রের অর্থাৎ ১৫০ মোগলটুলিতে অবস্থানরত প্রগতিশীল মুসলিম তরুণরা সেদিন এই আওয়ামী মুসলিম লীগ তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে সর্বাত্মক ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে তাদের বিক্ষিপ্ত ক্ষোভ, মুসলিম লীগের প্রতি অনীহা ও পাকিস্তানের ভেতর নিজস্ব চিন্তা-চেতনার সেই উদার রাষ্ট্র খুঁজে না পাবার হতাশা সবকিছুকে একটি রাজনৈতিক স্রোতধারায় এনে সামনের সকল বাধাকে ভাসিয়ে নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল তৈরির বিন্দুতে পৌঁছানোর মূল নেতৃত্ব সেদিন দিয়েছিলেন তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানই।
PddMশেখ মুজিবুর রহমান ১৫০ মোগলটুলিতে আসার আগে থেকে ওখানকার কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়-কেন্দ্রিক একটি বাংলা ভাষা আন্দোলন করে চলেছিলেন। যা তরুণ ও প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য, লেখা ও আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সেখানে ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা তাদের যে কাজ সেটা তারা করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ১৫০ মোগলটুলিতে এসে দ্রুতই এটাকে একটি রাজনৈতিক স্রোতধারায় রূপ দেন। এবং ১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারির হরতালের ভেতর দিয়ে তিনি এই আন্দোলনকে শুধু বিজয়ী করেননি, এর সপক্ষে জনগণের এক ধরনের ম্যান্ডেট নেন। এই হরতালে ও তার আগের আন্দোলনে মুসলিম লীগের দমননীতি ও ভাষা আন্দোলনকারীদের কাছে পরাজয়ের ভেতর দিয়ে মুসলিম লীগ পূর্ববাংলার একটি জনগোষ্ঠীর কাছে স্পষ্টতই নিন্দিত হয়। ১৯৪৭-এর আগস্ট থেকে ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ভেতর মুসলিম লীগকে এই নিন্দিত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যেমন ছিল প্রগতিশীলদের রাজনৈতিকভাবে একটি বড় বিজয়, তেমনি এর গতিটা ছিল ঝড়ের। এই ঝড়ো গতিতে ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ভেতর এ পরিবেশ শেখ মুজিবুর রহমান তার তরুণ কর্মীদের নিয়ে তৈরি করতে পেরেছিলেন বলেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মুসলিম লীগের বিপরীতে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।
আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হবার পরে দলটি প্রথমেই কঠিন পরীক্ষার সামনে পড়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কি হবে না? সেদিন আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও সাবধানী নেতারা এই ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে ছিলেন। তারা জানতেন খুব শিগগিরই পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন। তাই তাদের আশঙ্কা ছিল এ-মুহূর্তে কোনো আন্দোলন হলে সরকার ওই অছিলায় নির্বাচন থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। তাদের ধারণায় ছিল না, দেশের মানুষ এই আপসকামিতা পছন্দ করবে না। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে ছিলেন। আমরা একটা বিষয় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী ও তার সারা জীবনের রাজনীতি বিশ্লেষণ করে দেখেছি, কী জেলে থাকুন আর জেলের বাইরে থাকুন বঙ্গবন্ধু কখনই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করতেন না। তার সারা জীবনে কোনো একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে, এমনটি কেউ দেখাতে পারবেন না। এমন নির্ভুলভাবে সবগুলো রাজনৈতিক ইনিংস খেলা দ্বিতীয় কোনো রাজনীতিক পৃথিবীতে নেই। অন্তত আমি আজ পর্যন্ত পাইনি। ১৯৫২ সালে তাই ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে বঙ্গবন্ধু কোনো ভুল করেননি; বরং তিনি জেলখানা থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষেই চিঠি পাঠান। বঙ্গবন্ধুর এই তৎপরতা যে মুসলিম লীগ সরকার বুঝতে পেরেছিলেন তার প্রমাণ তারা তাকে ঢাকা জেলখানা থেকে স্থানান্তর করেন।
বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন ছাত্র তরুণ ও তার অনুসারীদের ১৪৪ ধারা ভাঙার নির্দেশ না দিতেন তাহলে ইতিহাস ভিন্ন পথে যেত। অর্থাৎ তরুণরা ১৪৪ ধারা ভাঙত আর আওয়ামী লীগ তার প্রকাশ্যে বিরোধী থাকত। সেখানে প্রগতিশীল তরুণদের মন থেকে আওয়ামী লীগ দূরে চলে যেত। কিন্তু ওই তরুণরা জানতে পারে, তাদের যে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তিনি তাদের আন্দোলনের সঙ্গে এবং তাদের আন্দোলন এগিয়ে নেবার নির্দেশ দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন যদি এ সিদ্ধান্ত না নিতেন তাহলে ১৯৫৪-এর নির্বাচনে এর অনেক বড় প্রভাব পড়ত। কারণ, ১৯৫৪-এর নির্বাচন আসার আগেই প্রগতিশীল তরুণদের অন্তত একাংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব হতো। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ১৯৫৪-তে যে সকল প্রগতিশীল তরুণরা এক হতে পেরেছিল যুক্তফ্রন্টের পতাকাতলেÑ এ ক্ষেত্রটি বাস্তবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২-তেই প্রস্তুত করেছিলেন। আর একটি নির্বাচনে প্রগতিশীল তরুণ ও বুদ্ধিজীবীদের কী ভূমিকা থাকে সেটা পৃথিবীর যে কোনো দেশের নির্বাচনে এখনও প্রমাণ রাখে।
১৯৫৪-এর নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সারা বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান যে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের একটি বিশাল অধ্যায়। শুধু এই অধ্যায় নিয়ে আলাদা একটা বই লেখা প্রয়োজন। ওই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান তরুণ তুর্কী হিসেবে নির্বাচনের মাঠ কীভাবে গরম করেছিলেন এটা কোনো কলামে বা নিবন্ধে লেখা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলা যায়, সেদিন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের অমানুষিক পরিশ্রমই মুসলিম লীগের কবর রচনা করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। এই দুই নেতা (নেতা ও তার স্নেহধন্য কর্মী) সেদিন রাতের পর রাত কাটিয়েছেন পার্টি অফিসে। দিনের পর দিন ঘুরেছেন নৌকায়। মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন গ্রামের আলপথ ধরে। সারা বাংলাদেশ ঘুরে এ ইতিহাস তুলে আনলে আমরা জানতে পাব বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের আরেক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। পাশাপাশি জানতে পাব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। আওয়ামী লীগের ৭০ বছর নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর মানস জগৎ নিয়ে লিখতে হলে অবশ্যই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জানতে হবে। বাস্তবে তাকে নিয়ে আমরা খুবই কম চর্চা করি। তার মতো শিক্ষিত ও নিয়মতান্ত্রিক নেতা ছিলেন বলেই; কিন্তু আওয়ামী লীগ একটি ভিন্ন চরিত্র পায় অন্য সকল রাজনৈতিক দল থেকে। আর বঙ্গবন্ধুর মনোজগতে রয়েছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এক বিশাল ছাপ। বঙ্গবন্ধুর যে সকল মত ও পথের রাজনীতিকদের সঙ্গে নিয়ে চলার এক অসাধারণ যোগ্যতা ছিল এটা যেমন তার নিজের চরিত্রের তেমনি তরুণ বয়সে তিনি এটা শিখেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে।
যা হোক, ’৫৪-র নির্বাচনের পরে বঙ্গবন্ধু যে উদ্যোগ নেন এবং দ্রুত সম্পন্ন করেন তা পূর্ব বাংলা শুধু নয়, পাকিস্তানের রাজনীতিকে বদলে দেয়। এই বদলে দেওয়া কাজটি হলো আওয়ামী মুসলিম লীগের চরিত্র আমূল বদলে দেওয়া। যে ক’জন নেতার উদ্যোগে সেদিন আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ করা হয়, বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাদের অগ্রগণ্য। প্রয়াত নেতা আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে কথা বলে জানি, এই উদ্যোগকে যদি বঙ্গবন্ধুর একক উদ্যোগ বলা হয়, তাহলেও ভুল হবে না। রাজনীতির এই ইংনিসটি যে কত ঝড়ো ইনিংস আর কতটা টেকনিক্যাল ইনিংস, তা আজ কিছুটা হলেও উপলদ্ধি করা যায়, ধর্মের নামে পাকিস্তান সৃষ্টি হবার এক দশক না যেতেই পূর্ববাংলার মূল রাজনৈতিক দলটিকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করা কত বড় কাজ, তা হয়তো বাংলাদেশের মানুষ সঠিক উপলব্ধি করেছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্যে যখন মানুষ বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছে আর তার প্রতিটি ফোঁটা রক্তে একটি করে শপথ তৈরি হচ্ছে; ওই সকল শপথ ছিল একটি সব মানুষের বাংলাদেশের শপথ। নেতা কত দূরদর্শী হলে এমন সিদ্ধান্ত দেড় দশক আগে নিতে পারেন, তা কেবল এই উদাহরণ থেকে বলা যায়। আর আওয়ামী লীগ যে স্রোতস্বিনী নদী, এই নদী যে শুকিয়ে যাবার নয় তার সব থেকে বড় কারণ কিন্তু আওয়ামী লীগ সব মানুষের।
তবে আওয়ামী মুসলিম লীগকে আওয়ামী লীগ করার পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেকগুলো বড় বড় অধ্যায় আছে। যুক্তফ্রন্ট সরকার যখন একটি অস্থিতিশীল সরকারে পরিণত হয়, ওই সময় থেকে মুক্ত হয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের যে স্থিতিশীল সরকার পূর্ববাংলায় হয়েছিল আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বেÑ এই সরকার গঠনের ক্ষেত্রও কিন্তু তৈরি করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আবু হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে তিনিই দিয়েছিলেন ভুখামিছিলের নেতৃত্ব। যা হোক, সে ইতিহাসের ডিটেইলসে না গিয়ে তার থেকে বড় শুধু নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একমাত্র রাজনৈতিক ইনিংস, যা শুধু বঙ্গবন্ধু বলেই খেলা সম্ভব হয়েছিল। অর্থাৎ ডন ব্রাডম্যানীয় ইনিংস। সেটা হলো ১৯৫৭-তে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ নেওয়া। সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু এই সিদ্ধান্ত না নিতেন, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো। আওয়ামী লীগও আওয়ামী লীগ হতে পারত না। মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে যেমন শুধু আওয়ামী লীগের একাংশ নয়, প্রগতিশীল কমিউনিস্টদের একাংশকেও তিনি আইয়ুব খানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি যদি সেদিন বঙ্গবন্ধুর বদলে অন্য কেউ হতেন, তাহলে শতভাগ সম্ভাবনা ছিল আওয়ামী লীগ সেদিন চলে যেত আইয়ুব খানের কব্জায়।
শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি হয়ে কীভাবে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলেছিলেন তার সঠিক ইতিহাস এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতেও এই ইতিহাস যতদূর পারা যায় তুলে আনা সম্ভব হবে কি না জানিনে। তবে আওয়ামী লীগের এই অধ্যায়ের ইতিহাস বা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির এ ইনিংস এই জনপদের মাটি ও বাতাস থেকে তুলে আনা বড়ই দরকার ছিল।
১৯৭৯ সালে খুলনার একটি দুর্গম এলাকায় আমরা নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে একটি খাল পার হবার জন্যে নৌকা খুঁজছিলাম, কারণ তখনও সাঁতার জানতাম না। পানিকে ভীষণ ভয় পেতাম। ওই সময়ে সেখানকার একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলেন, শেখ সাহেব ও শেখ আজিজ এই পথের যতগুলো খাল সব গামছা পরে পার হয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ গড়েছেন। আর আজকে তোমরা শেখ সাহেবের নামে নির্বাচন করতে এসে খাল দেখে ভয় পাচ্ছ? তাই বলা যেতে পারে সেক্রেটারি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অধ্যায় আওয়ামী লীগের সত্যিকার প্রতিষ্ঠালাভের অধ্যায়। এই অধ্যায়েই মূলত প্রতিষ্ঠা পায় প্রকৃত আওয়ামী লীগ।

Category:

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

Posted on by 0 comment

PM2 হারুন হাবীব: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের ইতিহাস রচনায় অবধারিতভাবেই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি অবিস্মরণীয়। বিদেশের মাটিতে প্রায় ছয় বছর নির্বাসন শেষে স্বদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে। বঙ্গবন্ধু-কন্যার এই স্বদেশে ফিরে আসা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে নতুন যুগের সূচনা করে বাংলাদেশের। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, নতুন দিল্লি থেকে বিমানে উড়ে যেদিন তিনি ঢাকার মাটিতে পা রাখেন, লাখো মানুষ হৃদয়ের সবটুকু আবেগ দিয়ে সেদিন তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। এই আবেগের মাঝে ছিল অনেক স্বপ্নভঙ্গের পর নতুন স্বপ্নদেখা, নতুন আশায় বুক বাঁধা।
PM1গণমানুষের সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রেক্ষাপট কারও অজানা নয়। কেবলমাত্র দলীয় নেতাকর্মী নন, বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে তারই কন্যাকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিমানবন্দরে সেদিন জড়ো হয়েছিল সর্বস্তরের লাখো উদ্বেলিত মানুষ; যে মানুষ জাতির পিতার ধমনি বহনকারীকে স্বাগত জানিয়েছে পরিপূর্ণ আবেগ ও ভালোবাসায়, যে মানুষ সেনাপতি শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছে, যে মানুষ মনেপ্রাণে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছে, জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার চেয়েছে, লাখো শহিদের বাংলাদেশ ফিরে চেয়েছে।
১৯৭৫ সালে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের হাতে প্রায় সপরিবারে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেবলমাত্র দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে বেঁচে থাকলেন তার দুই কন্যাÑ শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা। এই ভয়াবহ হত্যাকা-, যা ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়, জাতিকে স্তম্ভিত করে, হতাশায় নিমজ্জিত করে সীমাহীন। সেই সুযোগে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার বিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে। ভেঙে চলে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের, পাকিস্তানি স্বৈশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির দীর্ঘ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক একটি স্তম্ভ। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলটিকে রাষ্ট্রীয় কূটকৌশলে ছিন্নভিন্ন করার সব চেষ্টা নেওয়া হয়। এক সর্বগ্রাসী হতাশা সর্বত্র; জাতি কী মুক্তি পাবে ভয়ঙ্কর এই মহাপ্রলয় থেকে? আছেন কী কোনো ত্রাতা, যিনি হাল ধরবেন উত্তাল ঝড়ের সাগরে?
অতএব বঙ্গবন্ধু-কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাঝে বহু প্রার্থিত এক জাতীয় নবজাগরণ আছে, আছে সাহসের নব অভিযাত্রা, যে অভিযাত্রার সাফল্যে নিজেকে তিনি দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় রাষ্ট্রের স্থপতিকে হত্যা করে জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে যেভাবে অকেজো, অর্থহীন করার চেষ্টা হয়েছিল, যেভাবে ইতিহাসের স্বাভাবিক যাত্রাপথ রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল, স্বাধীনতার পরাজিত শত্রু ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে যেভাবে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, বলাই বাহুল্য, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই অশুভ ভয়ঙ্কর ধারার বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সামরিক আধিপত্যবাদ ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি সঞ্চয় করে। এটিই ইতিহাস যে, বঙ্গবন্ধুর এই জ্যেষ্ঠকন্যা জাতির লুণ্ঠিত গৌরব পুনরুদ্ধার সংগ্রামে অধিনায়কত্ব দান করে চলেন, নতুন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হনÑ যা তার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সাফল্য।
সে-কারণেই তার দেশে ফিরে আসা জাতীয় জীবনের এক নতুন আশীর্বাদ; এবং একই সঙ্গে অভিশাপও প্রতিপক্ষের জন্যে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে রক্তের চিহ্ন দেখতে হয় শেখ হাসিনাকে বুকভাঙা কান্নায়। কিন্তু শোক করার সময় কোথায়? সময়ের কষাঘাত বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে তাকে; শোক ও রোদনকে পরিণত করতে হয় শক্তিতে। না, তিনি রোদন করতে আসেন নি, এসেছেন বদ্ধ ইতিহাসের দুয়ার খুলে তার জন্মভূমিকে রাহুমুক্ত করতে, জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করতে। অনেক বড় এক চ্যালেঞ্জ; ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই যা তারই হাতে সমর্পিত। অতএব পিতা, মাতা, ভাই ও ভাতৃবধূদের স্মৃতিতে শোক করার সময় কই!
ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, জেনারেল জিয়াউর রহমানের অবৈধ শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটিকে আঘাতের পর আঘাতে জর্জরিত করা হয়। ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে, জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। সেই দুর্দিনে, দেশের বাইরে অবস্থানকালেই, আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলো শেখ হাসিনা। অবিন্যস্ত দলকে সংগঠিত করা যেমন গুরু দায়িত্ব, তেমনি অসীম গুরুত্ববাহী অর্পিত কাজ ঘাতক ব্যষ্টিত শাসককূলের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করা, বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে জাগিয়ে তোলা এবং লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে স্বমহীমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
বলা বাহুল্যÑ এ কাজ সহজ ছিল না। মৃত্যুকে বারবার তুচ্ছজ্ঞান করেও শেখ হাসিনা তার অভিষ্ঠ দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন; ঘাতকের বারংবারের হুমকিÑ আক্রমণেও পিছিয়ে আসেন নি, পথভ্রষ্ঠ হননি; হলে, অধঃপতনের গহ্বর থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ফিরে পাওয়া সহজ হতো না।
এক মহা-দুর্দিনে দিকভ্রান্ত স্বদেশের হাল ধরেছিলেন ইতিহাসের আশীর্বাদ বহনকারী শেখ হাসিনা। এ যেন বঙ্গবন্ধু বা তার রক্তেরই ফিরে আসা। স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে জাতির জনকের অভাবিত হত্যাকা-ের পর ঘন যে তমসা, সেই তমসা তাড়াতে প্রথম আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন তিনি। সেই মশাল, প্রাথমিক সংকট-সীমাবদ্ধতার পর, দিকে দিকে আলোকিত করতে থাকে, শুরু হয় রাহু মুক্তির পালা। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটিকে, সে-কারণে, জাতীয় নব জাগৃতির দিন বলতে দ্বিধা হয় না আমার। সব আবর্জনা দূর করতে নববর্ষের প্রভাতে যেমন বাঙালি একাকার হয়, নব প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হয়, তেমনি এক শুভ প্রতিশ্রুতির বাতাস বইতে দেখি তার স্বদেশ ফেরার দিন থেকে।
শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই আমি দেখিনে কেবল। প্রধানমন্ত্রী হন অনেকেই, হয়েছেন এবং হবেনও। তাকে দেখি আমি বাংলাদেশ রাষ্ট্র জনকের বেঁচে যাওয়া দুই কন্যার একজন হিসেবে, যিনি রাষ্ট্রকে তার ছিনতাইকৃত গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার মহাসমরে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। পঁচাত্তরের রক্তপাতের পর দুই যুগের যে ভয়ঙ্কর স্বদেশ, অভাবিত জেগে ওঠা আবারও যে ‘নব্য পাকিস্তান’ (!), তারই বিপরীতে বাঙালির রাষ্ট্রকে আজকের বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনার যে সাহসী ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বÑ তারই সর্বাধিনায়কের নাম শেখ হাসিনা।
আমার বিশ্বাস, তিনবারের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা সামাজিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি একটি বড় রাজনৈতিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। সে যুদ্ধ কতটা প্রয়োজনীয়, কতটা ভয়ঙ্কর এবং কতটা ঝুঁকিপূর্ণÑ তা বলার অপেক্ষা রাখে না এবং যুদ্ধটি এমন এক সময়ে ঘটে চলেছে যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শত্রুরা নানা অঙ্গনে সংগঠিত এবং প্রতিষ্ঠিত।
তিন যুগেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার সম্পন্ন করাটি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মানদ-ে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, যা জাতিকে বড় দায়মুক্তি দিয়েছে, বড় কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছে। শেখ হাসিনার সাহসী ও দৃঢ় প্রত্যয়ী নেতৃত্বে ঘৃণ্য ঘাতকেরা শাস্তি লাভ করেছে, কৃত অপরাধের দায়ে দ-িত হয়েছে, যা সাধারণ কোনো কাজ ছিল না। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী তস্করদের ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়াটি তিনি কেবল শুরুই করেন নি, প্রবল সাহস ও বিচক্ষণতায়, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে, এগিয়ে নিয়েছেন। এই দুটি কাজ, যা অভাবিত ভাবা হতো একসময়, বাঙালি জাতিকে সভ্য জাতিতে পরিণত করেছে, দৃঢ়চিত্ত করেছে, বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে; একই সঙ্গে জাতীয় স্বাধীনতার লাখো শহিদ ও লাখো বীর সৈনিকদের আত্মাকে সম্মানিত করেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ দুই যুগ ধরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে রাষ্ট্র শাসিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ইতিহাস বিরোধীদের হাতে। জেনারেল এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার দেশকে, পরিকল্পিতভাবে, সাম্প্রদায়িক বানিয়েছে নিত্যনতুন পরিকল্পনায়, যাতে বাংলাদেশ অকার্যকর হয়। সরকার, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে একাত্তরের চেতনাবিরোধীদের জায়গা দিয়ে এমন এক প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল, যা ভাঙা সহজ কাজ ছিল না। কাজেই বঙ্গবন্ধু-কন্যা ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিতে হয়েছে। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের সুখ ও সাচ্ছন্দ্য পরিত্যাগ করতে হয়েছে। তাকে দৃঢ়চিত্তে অগ্রসর হতে হয়েছে প্রভাবশালী দেশি-বিদেশি মহলের প্রতিবন্ধকতা-প্রতিরোধ। বিপদসংকুল পথে সামনে এগুবার এই যে সাহস, এই যে দৃঢ়তাÑ তার সবটাই দেখাতে পেরেছেন শেখ হাসিনা। সকলেই জানি, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে সরকার বিরোধীদের স্বাধীন ও উন্মুক্ত কার্যক্রম জরুরি। এছাড়া রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক, মানবিক কিংবা আধুনিক হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দুর্ভাগ্য এই যে, চার যুগ পরও এই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিরোধীরা সর্বাংশে সক্রিয়, যারা পাকিস্তানকে পুনর্বাসিত করতে চায়, একাত্তরের পরাজয়ের শোধ নিতে চায়। গণতান্ত্রিক অধিকারের আবরণে এরা রাষ্ট্রের ইতিহাস ও মৌলিক চেতনার প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের আবির্ভূত করে; রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিত্যনতুন যুদ্ধ চাপিয়ে পুরনো প্রভুর জয়গান করে! কাজেই যে বাংলাদেশ লাখো শহিদের রক্তে অর্জিত তাকে সুরক্ষা দিতে জাতির জনকের কন্যার সাহসী নেতৃত্ব জাতীয় আশীর্বাদ বৈকি।
অনেক অর্জনের পর, বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজও কঠিন সময়ের মুখোমুখি। দুর্ভাগ্য এতটাই যে, রাষ্ট্রবিরোধীরা আজও জয় লাভ করার স্বপ্ন দেখে! কাজেই আত্মতুষ্টির সুযোগ কোথায়? সে কারণেই বলি, প্রতিপক্ষের একাধিক আক্রমণ পরাস্থ করার পরও দীর্ঘস্থায়ী সমরে জেতার প্রস্তুতির বিকল্প নেই। সে-কারণে প্রয়োজন আদর্শিক যোদ্ধা তৈরি করার কৃতিত্ব। ভুলে গেলে চলবে না যে, অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্ত্বার প্রতিপক্ষরা প্রাথমিকভাবে পরাস্থ হলেও তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে। অতএব আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
ইত্যাদি বিবেচনায় রাজনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে এগিয়ে নেয়ার বিকল্প দেখিনে আমি। চাই বাঙালি জীবনের নতুন এক নবজাগৃতি; যা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শচর্চার আরাধ্য কাজ। রাজনীতি কেবলই সেøাগানসর্বস্ব হয়ে উঠুক, তা কারও কাম্য হতে পারে না। এই প্রক্রিয়া সাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম বটে; কিন্তু বৃহৎ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে সামর্থ হারায়।
১৯৮১ থেকে ২০১৯ সাল। তার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সরকারের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের চেহারা সুষ্পষ্টভাবেই ভিন্ন। বাংলাদেশ আজ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। আন্তর্জাতিক মানদ-ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশের চাইতে প্রতিটি উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার পালাক্রমিক রাষ্ট্রশাসনে রাষ্ট্র আজ উন্নয়ন ও প্রগতির মহাসড়কের যাত্রি। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধু-কন্যার কাছে জনপ্রত্যাশা অপরিসীম। প্রত্যাশার এই সীমা এতটাই যে সবাই যেন ভুলতে বসেন কী ভয়ঙ্কর কূট-পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জন্মকে ব্যর্থ করার চেষ্টা হয়েছিল পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে! কিন্তু শেখ হাসিনা ব্যর্থ হননি। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বাংলাদেশকে তিনি নতুন জীবন দান করেছেন। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের লুণ্ঠিত ধারাকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন।
এরপরও বলি, রাজনৈতিক জীবনের কঠিনতম সময় পার করছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা। বাস্তবতা এই যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধীরা নানা ফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ। তারা এক অঘোষিত ‘যুদ্ধ’ চাপিয়ে দিয়েছে। আর অমোঘ সত্যটি এই যে, নতুন সেই যুদ্ধেও বহুধাবিভক্ত ‘বাংলাদেশপন্থি’ শিবিরগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকেই। খুব কমই দেখা হয়েছে শেখ হাসিনার সঙ্গে। যতবার হয়েছে, ততবারই দেখেছি তাকে সাবলীল, বঙ্গবন্ধুর পাওয়া মেজাজ ও অন্তরঙ্গতায় ভরা খাঁটি বাঙালি হিসেবে। এই কিছুকাল আগেও বাংলা নববর্ষের এক শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিনে অভ্যাগতদের সঙ্গে প্রাণখোলা কথাবার্তা বলতে দেখেছিলাম তাকে। এমনই খোলামেলা যে অনেকেই ভয় পেয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন, এতটা খোলামেলা হতে যান কেন তিনি? কিন্তু শেখ হাসিনা কোনোকিছু লুকোবার চেষ্টা করেন, বা তা করার প্রয়োজন বোধ করেনÑ এমনটা ভাবা অনুচিত। যা তিনি ভাবেন, যুক্তিযুক্ত মনে করেনÑ তাকে তিনি রাখঢাকের প্রয়োজন বোধ করেন না। শেখ হাসিনা যাÑ তিনি তাই। এতেই তার স্বাতন্ত্র্যতা।
বঙ্গবন্ধু-কন্যার মুখ থেকে যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার সাহসী প্রত্যয় শুনি, যা আমার মতো মানুষের কাছে ভালোবাসার অনন্ত উচ্চারণ, তখন নিভৃতে বসবাস করেও নিশ্চিত হই, আশান্বিত হই। সাহসে বুক বাঁধি, যখন তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমরা বিজয়ী জাতি, মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছি; কাজেই যত বড় চ্যালেঞ্জ আসুক, আমরা তার মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাব। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই প্রত্যয়ী উচ্চারণ বাংলাদেশকে আরও এবং আরও সামনে এগুবার শক্তি ও সাহস জোগাবে।
জয় বাংলা।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও লেখক

Category:

স্মৃতিময় আওয়ামী লীগ

Posted on by 0 comment

PM1    আবুল মাল আবদুল মুহিত: ২০০৪ সালে জুন মাসে আওয়ামী লীগের জন্মের ৫৫ বছর হয়, সেই উপলক্ষে একটি স্মারক গ্রন্থ ‘গৌরবের ৫৫ বছর’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি প্রকাশ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিভাগ এবং সম্পাদনা পরিষদ ছিল পাঁচ সদস্যের, যার সচিব ছিলেন নূহ-উল-আলম লেনিন। তিনি এবার উদ্যোগ নিয়েছেন যে আওয়ামী লীগের ৭০ বছর উপলক্ষে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করবেন। এবারে হয়তো একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ না হয়ে আওয়ামী লীগের মাসিক পত্রিকা ‘উত্তরণ’-এর একটি বিশেষ সংখ্যা হবে। মনে হচ্ছে, লেনিনের সম্পাদনায় এইটিই হবে উত্তরণের শেষ সংস্করণ।
২০১৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থে ছিল ১৬টি প্রবন্ধ ও কিছু দলিলপত্র এবং তার ভূমিকা লিখেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। সেখানেও আমার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তারই জের টেনে এবারে আমার লেখাটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের ৭০ বছর। স্বাভাবিকভাবে এতে হয়তো কিছু পুনরাবৃত্তি হবে।
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য ছিল যে স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরে এদেশে কতিপয় দেশশত্রু পাকিস্তান ও লিবিয়ার সহায়তায় তাদের এজেন্ট হিসেবে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। সৌভাগ্যবশত; শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে-সময় বিদেশে থাকায় রক্ষা পান এবং বাংলাদেশের সাহসী নেতা জার্মানিতে নিছক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় লন্ডনে আশ্রয় নেন। রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত নেতারা তখন এই রকম আশ্রয়ের জন্য জেনেভা ছাড়া লন্ডনকেই বেছে নিতেন। সেই ট্রাডিশন এখনও বর্তমান আছে। ব্রিটিশ সরকার এজন্য সকলের নমস্য। লেনিন, দগল এরা সবাই লন্ডনেই বিপদকালে আশ্রয় পান ও তাদের বিপ্লব চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। শেখ হাসিনার চূড়ান্ত আশ্রয় হয় ভারতের দিল্লিতে যেখানে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাকে আশ্রয় দেন এবং তার বিশ^স্ত সহকারী পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি মহামান্য শ্রী প্রণব মুখার্জী একজন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। শেখ হাসিনা সেখানে কয়েক বছর অবস্থানের পর ঠিক করলেন যে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন এবং দেশকে হন্তাগোষ্ঠীর দখল থেকে মুক্ত করবেন।
এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ নানা আপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা সম্ভব হয় ১৯৮১ সালের ১৭ মে’তে। আওয়ামী লীগই তাকে সেই সুযোগ করে দেয় ১৯৮১ সালে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচত করে। তিনি এই পদে বারবার নির্বাচিত হয়ে আজও মোট ৩৯ বছর ধরে বহাল আছেন। দায়িত্বটি তিনি গ্রহণ করেন ৩৩ বছরের যুবতী হিসেবে এবং এখন ৭২ বছরেও এই পদটি অলঙ্কৃত করছেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ খুব পুরনো নয়, আমি বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ছিলাম, তবে আমার ছাত্রাবস্থায় তার সঙ্গে পরিচয়ের কোনো সুযোগ হয়নি। কারণ আমার ছাত্র-জীবনের অবসানকালে PM2১৯৫৫ সালে তিনি ছিলেন একজন বালিকা। আমার চাকরি-জীবনের সূচনা হয় দেশে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তখন, ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে। ১৯৫৮ সালে যখন আমার শিক্ষানবিসকাল শেষ হলো তখনই দেশে এলো আইয়ুবের সামরিক শাসন, যা কোনো-না-কোনো উপায়ে বহাল থাকে পরবর্তী ১০ বছর। বঙ্গবন্ধু এ-সময়ে প্রায়ই কারাবন্দি থাকতেন অথবা মামলার চাপে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় হাজিরা দিতে ব্যস্ত থাকতেন। তবে সুযোগ পেলেই তিনি ফুটবল মাঠে আউটার স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতেন। ওখানেই মাঝে মাঝে তার সাথে দেখা হতো। কারণ তখন আমি ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের মহাসচিব এবং প্রায় প্রতি অপরাহ্নেই আমি সেখানে দফতরে কাজ করতাম। অতঃপর ১৯৫৩ সালে আমি প্রশিক্ষণে যাই হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ে এবং সেখানে কেনেডি রাষ্ট্রবিজ্ঞান স্কুল থেকে এমপিও ডিগ্রি নিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করি। তবে চাকরিস্থল হয় করাচি এবং রাওয়ালপিন্ডি। সেখান থেকেই ১৯৬৯ সালে আমি ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে পদায়িত হই। যেখানে আমি অবস্থান করি স্বাধীনতা যুদ্ধকালে এর পরবর্তীতে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত। তবে ১৯৭২ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় সব সময়ই নানা কাজে যখন-তখন ঢাকা বা ঢাকার নির্দেশে অন্যান্য দেশে যেমনÑ ইউএই, ইরাক, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় কার্যোপলক্ষে গমন করি। ১৯৭৪ সালে আমি ম্যানিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে হই বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে নির্বাহী পরিচালক এবং সেখানে থাকি আড়াই বছর। এই সময়েও দেশে ও দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমি নানা উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট থাকি।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের মাত্র কয়েকদিন আগে আমি ঢাকা হয়ে সৌদি আরবে যাই এবং প্রত্যাবর্তন করে আবার ম্যানিলা চলে যাই। সেখানেই বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের খবর পাই এবং তার পরে আরও প্রায় দুবছর ম্যানিলায় থাকি। তাই ঢাকায় আমার এক নাগাড়ে অনুপস্থিতি ছিল ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৭, প্রায় ১৩ বছর। ১৯৭৭ সালে দেশে ফিরে সাড়ে চার বছর পরে ১৯৮১ সালের শেষ দিনে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসরে চলে যাই। তারপর ২০০১ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ছিলাম সুশীল গোষ্ঠীর একজন। অর্থাৎ সেমিনার প্রিয় বাংলাদেশে ব্যস্ত থাকি সেমিনারে এবং সুশীল সমাজের আরও নানা কর্মকা-ে। অতঃপর আমার এক নতুন জীবন শুরু হয় ২০০১ সালে, যখন আমি চিন্তা করছিলাম যে আমার ব্যর্থ জীবনে অবসর নেব।
PMআওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ইচ্ছায় এবং শেখ রেহানার উদ্যোগে আমি সরাসরি রাজনৈতিক অঙ্গনে যোগ দেই। মাননীয় স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর অনাকাক্সিক্ষত তিরোধানে সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণের জন্য আমাকে আহ্বান জানায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আমি তখন বেশি সময়ই কাটাই বিদেশে। নানা দেশে পরামর্শকের কাজ করে আমার জীবন চলে। আওয়ামী লীগের লোভনীয় আহ্বানে আমাকে আমার জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে হলো। আমি ২০০১ সালেই সিলেটে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রথমে নিয়মিতভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করলাম এবং নির্বাচনে প্রার্থী হলাম, আমার নির্বাচনী অভিযান ও প্রচারণা হলো মাত্র ৩৫ দিনের। এই অল্প সময়ে আমার পরিচিতই হলোÑ বড় সমস্যা। ভোটার চায় প্রার্থীকে দেখতে, প্রার্থীর সঙ্গে পরিচয় করতে। অথচ আমার সেজন্য সময় একেবারেই নেই, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন বিএনপির অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ সাইফুর রহমান। আমি ৩৩ হাজার ভোটে হারলাম। ভোটারদের ৭৫ শতাংশ তাতে ভোট দেন, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ভোটার ভোট প্রদান করে। ভোট দিতে গিয়ে দেখলাম যে জালিয়াতির ভোট দেবার জন্যই যেন ভোট প্রদান নীতিমালা খুবই উদার এবং আরও দেখলাম যে ভোট প্রদানে জালিয়াতি, ভোটকেন্দ্র সাময়িকভাবে দখল করে ঢালাওভাবে ভোট বাক্স ভর্তি করে দেওয়া একটি কৌশল হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। আমার বক্তব্য তাই হলো, যা ভোট চুরি বা ভোট জালিয়াতি ভোট ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই ভোট চুরি বা ভোট জালিয়াতি বন্ধ করার ব্যবস্থা না নিলে ভোট প্রদানের কোনো মানেই হয় না। আমি ভোট চুরির ব্যাপারেই হলাম সবচেয়ে বেশি সোচ্চার।
আমার নির্বাচনে আমার ব্যক্তিগত খরচ ছিল যৎসামান্য। আমার আত্মীয়স্বজন-আপনজন সবাই দরাজহস্তে আমাকে সহায়তা করলেন। আমার চিকিৎসক বোন প্রচুর খরচ করল। শেখ হাসিনা মোটামুটিভাবে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ করলেন। তিনি আবার অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা আমার ভাই মোমেনের হাতে গুজে দিলেন। আমি দেখলাম ভোট খরিদের বিয়ষটি একটি ধোঁকাবাজি। স্থানীয় নেতারা এই টাকা নেন, ভোটাররা এর কিছুই পায় না। ভোটকেন্দ্রের জন্য খরচ দলীয়ভাবে নির্বাচন কমিটি নির্বাহ করে, সেজন্য তারা কেন্দ্রীয়ভাবে সাহায্য পায়। আমার ভাই তার হাতের ৫ হাজার টাকা খরচই করতে পারল না। আমার মনে হয়, প্রতিকেন্দ্রে ভোটক্যাম্প স্থাপন এবং অন্যান্য নির্বাচনী খরচ প্রচার ও প্রচারসামগ্রীসহ মোট খরচ হলো প্রায় ৪০ লাখ, যেখানে সরকারি হিসাবে খরচের সীমা ছিল মাত্র ১৫ লাখ। আমার ধারণা হলো যে প্রমাণ সাইজের নির্বাচনী আসনে এই খরচ হয়তো হবে ৩০ লাখ। ঢাকার বড় বড় নির্বাচনী কেন্দ্রে যা হওয়া উচিত ৪-৫ গুণ।
নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে গেলাম দলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। তাকে বললাম যে, তার শত চেষ্টা ও সহায়তায়ও আমি নির্বাচনে জিততে পারলাম না বলে দুঃখিত। তার সহায়তা ও অর্থ সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম যে, আমার পক্ষে এখন আমার নিয়মিত জীবনে প্রত্যাবর্তন করা খুবই সহজ। আমি তাই করতে পারি। নেত্রী চটপট উত্তর দিলেন, তা বটে। তবে আপনি নির্বাচনী জালিয়াতি নিয়ে অনবরত বকে যাচ্ছেন। আমি চাই যে আপনি এ-বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করুন। সেজন্য আপনাকে আমি যা লাগে, তাই ব্যবস্থা করব। আপনি আপনার সহকর্মীদের নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করুন। আমি আমার প্রার্থীদের আপনাকে সাক্ষাৎ দিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাহিনি দিতে পারে।
এই কাজটি হাতে নেওয়ার পর আমি আর রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারলাম না। ২০০১ সালেই শুরু হয় আমার রাজনীতিবিদ হিসেবে নতুন একটি অধ্যায়। অবশেষে মনে হলো কৈশোরের স্বপ্ন যেন সফল হতে চলেছে। ২০০১ সালে নির্বাচনে আমাদের ব্যর্থতার পরেই আমরা শুরু করি আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি। আমরা বলি যে নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে, তবে তা শুধরাতে হবে নিয়মনীতি ঠিক করে। নির্বাচনী আইন ও রীতিনীতি ঠিক না হলে নির্বাচন সঠিক হবে না। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না। জালিয়াতির নির্বাচন প্রতিবেদনে আমরা ১৭টি উপায়ে জালিয়াতি হয় বলেও আমাদের অভিমত ব্যক্ত করলাম এবং তার পুরো প্রমাণ দাখিল করলাম। আমি ১৭ ত্রুটির সংস্কারের প্রস্তাব দিলাম। নেত্রী বললেন যে সংস্কারের প্রস্তাব এবার দেবেন না। প্রথমে তো ঐক্যমত সৃষ্টি করেন যে, নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়। তারপর আসবে সংস্কার। সংস্কারের জন্য জনমত গড়ে তুলতে হবে। আমার রাজনৈতিক শিক্ষার হলো একটি মূল্যবান অধ্যায়।
পরবর্তীতে বলতে গেলে আট বছর হলো নির্বাচনী পদ্ধতি ও আইনের সংস্কার নিয়ে আন্দোলন। এক বিচার বিভাগের অসম্মানের প্রতিভূ জনৈক আজিজ তখন নির্বাচন চিফ কমিশনার হিসেবে পদটিকেই কলঙ্কিত করল। তার মতো বেহায়া, অপদার্থ লোকটি যে কী করে বিচারক হতে পারলো আমার তা বোধগম্য কখনও হলো না। তবে বিএনপি এসব অদ্ভুত সৃষ্টির মেধাটিই শেষ পরিচয় ছিল না। তারপর পাওয়া গেল আর একটি রোবট, নেহায়েত খালেদা ভৃত্য, রাষ্ট্রপতি ইয়াজুদ্দিন। ঐ লোকটিকে ছাত্র-জীবনে চিনতাম, আমার বন্ধু আমিনুলের টেন্ডল হিসেবে ভাবতাম মৃত্তিকাবিজ্ঞানে আমারই সহপাঠী (এক ক্লাসের ছাত্র)। কিন্তু তখন ভাবলাম যে সে আমাদের এক বছর সহগামী। তাতে আমি অবশ্য কোনো বিশেষ নজর দেবার চেষ্টাও করলাম না। সে যেটা করে বসলো এক অসাধারণ দুর্ঘটনা। সে রাষ্ট্র হিসেবেই বনে গেল প্রধান উপদেষ্টাও অর্থাৎ সেদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় দুই পদই দখল করে বসলো। তবে সে তো রোবট, তাই বাস্তবে দুই পদই দখল করে থাকল বেগম খালেদা জিয়া।
PM3যাই হোক, আমাদের নির্বাচনী সংস্কারের পালে জোর হাওয়া লাগল। আমার প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। প্রায় সক্রেটিসের মতো অসংখ্য সংবিধান দেখে পরীক্ষা করে আমি আমার সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করি। এই প্রণয়ন কাজে আমি সহায়তা নিই ১৯ জন সহকর্মীর এবং আরও অনেক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকের। বিশেষত নির্বাচনে আমি কোনো দলমতের পরিচয়ের কোনো হিসাবই নিলাম না। এই কাজে আমার সহায়ক হন নূহ-উল-আলম লেনিন ও জাহেদ। জাহেদ শুধু কেরানি ছিল না, সে ছিল শান্তশিষ্ট একজন ভালো অবজারভার। যার ফলে তার অবদান কখনও হতো একেবারেই মৌলিক। আমি ধান ভানতে শিবের গীত গেয়েছি বলে আসল বক্তব্যে এখন খুব সংক্ষিপ্ত হতে হবে। তবে মৌলিক বক্তব্য যথাযথ ও উত্তম হলে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যই শ্রেয় এবং যথেষ্ট।
অবশেষে সরকার একটি ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন করল। শামসুল হুদা নামের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেন চিফ নির্বাচন কমিশনার। তার সদস্যরাও হলেন মোটামুটি ভালো, তার সঙ্গে নির্বাচনী আইনকানুন ও রীতিনীতির আলোচনা হয় অতি উত্তম। যে কোনো বিষয়ে গভীরে যেতে ও তার সারবস্তু বুঝতে ছিল খুবই পারঙ্গম। তার সঙ্গে আলোচনাটি হয় খুবই আনন্দের এবং শিক্ষণীয়ও বটে! তার স্টাইল অনেকটা ছিল ঝটপট কর্মপদ্ধতি। আলোচনা যখন আমাদের প্রায় শেষ পর্যায়ে তখন আওয়ামী লীগের অতি সচেতন নেতারা ঠিক করলেন যে ঐ আলোচনা করবেন নেতারা, সেখানে আমি যুক্ত হলে একজন উপদেষ্টা হতে পারি। নেত্রী সে-সময় দেশে নেই, প্রয়াত জিল্লুর রহমান সাহেব ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। জিল্লুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় বিশ^বিদ্যালয় জীবনের সূচনালগ্নে এবং তিনি ছিলেন আমার একজন গুরুজন এবং আমাকে শুধু স্নেহ করতেন না, আমাকে সর্বত্র প্রমোট করতেন। তিনি আমাকে বললেন যে প্রতিটি আলোচনার সূচনা করেন অন্যান্য নেতার হাতে বিষয়টি ছেড়ে দিয়ে তিনি আর আলোচনায় থাকবেন না। সুতরাং আমার যা কিছু বিশেষ বলার আছে আমি তাকে বললেই হবে। তিনি বললেন, আমি উপদেষ্টা হিসেবেই দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যেতে পারি। আমি তার সব নির্দেশই মানলাম, তবে বললাম যে আমি ঐ সমালোচনায় যেতে চাই না, তবে তার বক্তব্যটি হবে লিখিত এবং তার খসড়া প্রণয়নে চূড়ান্ত পর্বে আপনাকে থাকতে হবে। এই ব্যবস্থাটি ছিল খুব ভালো। মূল নেতার বক্তব্য লিখিত হওয়ার ফলে যে কোনো নতুন চাল কখনও গৃহীত হতো না। যেমনÑ উপজেলা নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার করবেন বলে খুব জোরাজুরি চলল। আমরা সেটা চাই না। সর্বশেষে আমাদের ভারসা হলো জিল্লুর ভাইয়ের লিখিত বক্তব্য, সেখানে এক ফাঁকে আমি লিখেই দিয়েছিলাম যে উপজেলা নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনে হবে।
আমার মনে হয়, নির্বাচনী আইনকানুন ও পদ্ধতি নির্ধারণ এবং প্রণয়ন করেই আমরা নির্বাচনের গতিও বদলে দিলাম। সেই আমাদের সহায়ক হলো আর একটি কার্যক্রম। সম্ভবত কানাডার সহায়তায় আমাদের সেনাবাহিনী জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত হলো। এই পরিচয়পত্রটি ছিল ছবি সম্বলিত। সুতরাং সেটিই হয়ে গেলে পরিচয় নিতে কখনও কোনো প্রশ্ন উঠলে তার সমাধানের মোক্ষম মাপকাঠি। বস্তুতপক্ষে এখন আর কাউকে পরিচয়পত্র দেখাতে হয় না। পরিচয়পত্র যে আছে এবং তাতে অকাট্ট প্রমাণের সুযোগ আছে। তাতেই এ-ধরনের জালিয়াতি কেউ করতেই যায় না। নির্বাচনী পদ্ধতি ও কার্যক্রম চূড়ান্ত করতে আমাদের বেশ সময় লাগলো। কিন্তু তারও অতিরিক্ত সময় যেন অপরিহার্য হয়ে গেল, সন্দেহ জাগলো যে নির্বাচন দূরে ঠেলে আবার না সেনা বা সেনা সমর্থিত শাসন শুরু হয়ে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় ভালো কাজ মন্দে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ইয়াজুদ্দিন রোবটের অত্যাচারে তখন আমরা অতিষ্ঠ। অর্থাৎ বেগম খালেদা যখন তা কুমতলব হাসিলের উপায়ে প্রতিষ্ঠিত, তখন তারই প্রিয় এক জেনারেল মঈন ইয়াজুদ্দিনের কর্মকা- আর জালিয়াতি থেকে জাতিকে দিলেন মুক্তি। কেমন করে জানি একজন উপযুক্ত প্রশাসক তিনি বিশ^ব্যাংকে চাকরি করছিলেন ড. ফখরুদ্দিন আহমদকে তিনি আবিষ্কার করে তাকে সরকারপ্রধান নিযুক্ত করলেন। ড. ফখরুদ্দিন অবশ্য দুই নেত্রীর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা যেভাবেই হোক বিলম্বিত করে দায়িত্ব নিলেন। ড. ফখরুদ্দিন বাংলাদেশে যখন চাকরি করতেন তখন একজন সুশাসকের খ্যাতি আহরণ করেন। তাই তার সরকার আমলে তার সুশাসনের জন্য ব্যাপক কর্মকা- শুরু হয়ে গেল। আর নির্বাচনী ডামাডোল যেন গৌন হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠল এটা কী গণতন্ত্র প্রবর্তনের নীলনকশাকে বানচালের একটি ষড়যন্ত্র। যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধ বয়স তিন মাস বেঁধে দেওয়া ছিল, তা হয়ে গেল বছরের বেশি। তার এই প্রশ্নের সমাধান পাওয়া গেল ড. ফখরুদ্দিনের পক্ষ থেকে। তিনি জানিয়ে দিলেন যে ২০০৮ সালের অতিরিক্ত একদিনও ক্ষমতায় থাকবেন না। অবশেষে ২০০৮ সালেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলো। ভোটার তালিকা হলো ফটো সম্বলিত। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দুদিনে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা হলো। ভোটের বাক্সের যথেষ্ট দূরত্বে হলো দলীয় ভোট দফতর। সেনাবাহিনী থাকল প্রায় সর্বত্র। তবে কিছু কিছু নির্দিষ্ট কেন্দ্রে তাদের হাজিরা ছিল বেশি। তারা ভোটকেন্দ্রে মোটেই যায়নি, তার এলাকায় টহল দিয়ে বেড়ায় এবং সেটাই ছিল যথেষ্ট ও যথোপযুক্ত। অবশেষে সত্তরের নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের ৩৮ বছর বয়সে হলো একটি চমৎকার, অবাধ, নিরপেক্ষ ও ৭৫ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণে জননন্দিত একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে তারপরে দুটো নির্বাচন সম্পাদিত হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন যেখানে নির্বোধ বেগম খালেদা খামাকা একটি সময়ে বয়কট পালন করলেন, সেটা সুসম্পন্ন হয়েছে। আবার সেদিন ২০১৯ সালে হয়েছে দ্বিতীয় সুসম্পাদিত নির্বাচন। অবশ্য এর মধ্যে আমাদের দুষ্টু বুদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অতিভক্তি ও অত্যুৎসাহের কারণে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
PsM4আমার কথকতা একটি সুন্দর কাহিনি এখানে উপস্থাপন করল। এই কাহিনি বলতে আমি খুবই খুশি এবং বাস্তবেই খুব গর্ববোধ করি। তবে যে অশনি সংকেত এবারের নির্বাচনে পাওয়া গেছে যেখানে বিরোধী দল মাত্র কয়েকটি আসন জিতেছে সেটি কোনোমতেই শুভ নয়। অত্যুৎসাহী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অতিভক্তি ও গভীর ভালোবাসাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। এর উপশম একান্তই কাম্য। কারণ এর বিকল্প হচ্ছে একদলীয় শাসন অথোরোপেরিয়ান সরকার, যার প্রতিফল হলো মহাপ্রলয়। মহাপ্রলয় আমরা কোনোমতেই চাই না। আমরা বেশ কম সময়ে স্বল্পোন্নত আয়ের দেশ থেকে উত্তরণে সক্ষম হয়েছি। আমাদের নেত্রী আমাদের জন্য নতুন লক্ষমাত্রা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন। আমরা আগামী ২০ বছরে ২০৪১ সালে হব একটি সুখী শান্তিপ্রিয় সমৃদ্ধ দেশÑ যেখানে কোনো দারিদ্র্য থাকবে না। হ্যাঁ, ৭-৮ শতাংশ লোক অবশ্যই রাষ্ট্রীয় সহায়তায় খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারবে। এমন সুন্দর ভবিষ্যৎ আমি বাস্তবে হয়তো দেখতে পাব না। কারণ ইতোমধ্যেই তো আমি ৮৫ অতিক্রম করেছি। তবে এটা হবে, এটা একেবারেই সম্ভব ও নিশ্চিত সে-ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। জয় হোক বাংলাদেশের, জয় হোক শেখ হাসিনা।

Category:

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম উদ্বোধন

Posted on by 0 comment

PMউত্তরণ প্রতিবেদন: গত ১৯ মে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশের বেশির ভাগ টিভি চ্যানেল সম্প্রচারের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সঙ্গে চুক্তি করেছে। টিভি চ্যানেলগুলো ঐদিন থেকেই ফ্রিকোয়েন্সি পাবে। চুক্তিতে সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তিন মাস ‘ফ্রি ফ্রিকোয়েন্সি’ পাবে। এরপর ফ্রিকোয়েন্সির ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। তবে এই ভাড়া কত হবে তা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করেনি স্যাটেলাইট কোম্পানি। ১৯ মে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এমপি প্রধান অতিথি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএসসিএল) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এমপি বলেন, দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের বর্ষপূর্তি ও সেবা বিপণন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অপূর্ণতা ছিল, আমাদের একটি স্যাটেলাইট ছিল না, সেটি আমরা পেরেছি। এখন সাশ্রয়ী মূল্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার এবং ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং সেবা দিতে পারবে।
মোস্তাফা জব্বার বলেন, স্যাটেলাইটের এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি, যেটা আলোচনার বিষয় হতে পারে। আমাদের ছেলেরাই এটি পরিচালনা করছে। বিদেশিদের খুব বেশি দিন প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়াররাই স্যাটেলাইট পরিচালনা করতে পারবেন। গাজীপুরে প্রায় ১৩ একর জায়গার ওপর ৫ একরজুড়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ৪০ ট্রান্সপন্ডার রয়েছে, যার ২০টি বাংলাদেশ ব্যবহার করবে। বাকি ২০টি বিদেশি বা প্রতিবেশী দেশের কাছে ভাড়া দেওয়া হবে। উৎক্ষেপণের পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত এর তদারক করবে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। তবে এখনই বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারই এটি পরিচালনায় সক্ষম হচ্ছেন।
১৯ মে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএসসিএল) সঙ্গে যমুনা টিভি, সময় টিভি, দীপ্ত টিভি, বিজয় টিভি, বাংলা টিভি ও মাই টিভি এবং সোনালী ব্যাংক স্যাটেলাইটের সেবা নেওয়ার জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এর আগে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেÑ সময় টিভি, ডিবিসি নিউজ, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি, এনটিভি, একাত্তর টিভি, বিজয় বাংলা ও বৈশাখী টিভি। বাকি টেলিভিশনগুলোও অল্পদিনের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হবে বলে অনুষ্ঠানে বলা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিভিশনগুলোর খরচ কমে যাবে তেমনি দুর্গম এলাকাতে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বাংলাদেশকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

Category:

জাপানের সঙ্গে ২৫০ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: জাপানের সঙ্গে ২৫০ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। এই অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। গত ২৯ মে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এই চুক্তি করা হয়। বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি ও ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ চুক্তিতে সই করেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি উদ্যোক্তা তৈরিতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে। এটা দেশি বা বিদেশি হতে পারে। সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আড়াই হাজারে জাপানের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্দিষ্ট করা আছে। সরকার টু সরকার এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরীতে প্রচুর জায়গা নেওয়া হয়েছে। দুটি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের কাজ চলছে এবং আরও ২৬টি হাইটেক পার্ক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণাধীন রয়েছে।
বাংলাদেশের ৮০০ আইটি কোম্পানির মধ্যে দেড়শ’ কোম্পানি বিদেশি গ্রাহকদের বিশেষ আইটি সেবা দিচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাইক্রোসফট, ইনটেল, আইবিএম, ওরাকল, সিকসোসহ স্বনামধন্য কোম্পানিগুলোতে বাংলাদেশের ২০ হাজার আইটি বিশেষজ্ঞ কাজ করছে। জাপানি ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক সুনাম, ওষুধ শিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে বাংলাদেশ সরকারের নীতির প্রশংসা করেন জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। অন্যদের মধ্যে এ-সময় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ও জাপানের বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সংগঠনের নেতারা।
২৫০ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি : এদিকে, প্রধানমন্ত্রী জাপান যাওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এমপি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এবং শিল্পায়নের জন্য জাপান ২৫০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। ৪০তম এই প্যাকেজ আগেরবারের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। জাপানি এই অর্থে মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১), বিদেশি বিনিয়োগ সহায়ক প্রকল্প (২), জ্বালানি দক্ষতা ও সুরক্ষা সহায়ক প্রকল্প (পর্যায়-২) ও মাতারবাড়ি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে (৫) অর্থায়ন করা হবে। চুক্তির পর দুই নেতা যৌথ বিবৃতি দেন। চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতার আগে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন শেখ হাসিনা ও শিনজো আবে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ জাপানে চার দিনের সফরে ২৮ মে রাজধানী টোকিও এসেছেন শেখ হাসিনা।

Category:

শান্তি-সমৃদ্ধির পথে এশিয়াকেই নেতৃত্ব দিতে হবে

Posted on by 0 comment
PM

টোকিওতে ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে শেখ হাসিনা

উত্তরণ ডেস্ক: বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমিত করে এশীয় দেশগুলো কীভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে, সেই পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নানা চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতে জর্জরিত বর্তমান বিশ্ব কাঠামোতে কীভাবে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া যায়, সে-বিষয়ে তিনি নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে।
শেখ হাসিনা বলেন, মানবতা আর শুভ শক্তির জয় হবেই। বিশ্ব আজ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, এই উদীয়মান এশিয়ার দিকে। উদ্ভাবনে, অনুপ্রেরণায় বিশ্বকে শান্তি আর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে এশিয়াকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও তাত্ত্বিকদের অংশগ্রহণে গত ৩০ মে সকালে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে এ সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। জাপানি সম্প্রচার মাধ্যম নিকেই-এর আয়োজনকে এশিয়ার সম্ভাবনা ও উত্থান নিয়ে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ছাড়াও ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি’ হিসেবে পরিচিত মাহাথির মোহাম্মদ, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এবং ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতের্তে অংশ নিচ্ছেন এ সম্মেলনে।
শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার গল্প সম্মেলনে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য উদারীকরণের নীতি সমর্থন করে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতির বাধা ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের ওই সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতি বিশ্বে বাণিজ্যযুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে। অর্থনীতির সহজ কথা হলোÑ শুল্ক যদি বাড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার কমবে। আমি আশা করব, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মধ্যে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতির প্রবণতা কমিয়ে আনতে কী করা যায় এবং এক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়Ñ সেই পথনির্দেশ এই ফোরাম থেকে উঠে আসবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বিশ্ব নানাভাবে চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতের মুখোমুখি। বিশ্বকে আরও উন্মুক্ত করতে, ঐক্যের বন্ধন আরও মজবুত করার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের মোকাবেলা করতে হবে যৌথভাবে, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকারকে রক্ষা করতে হবে। উদ্ভাবনী ধারণা পদক্ষেপ নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়াতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোকে আরও উদ্ভাবনী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সবার জন্য লাভজনক হয়, সব মানুষের যাতে মঙ্গল হয়Ñ তেমন একটি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে, যা গড়ে উঠবে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান এবং ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চেতনা নিয়ে।
সেজন্য উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক, অংশীদারিত্বমূলক যৌথ উন্নয়নের চেতনা নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে টেকসই ও সুষম উন্নয়নের ওপর, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা এবং সবার জন্য লাভজনক একটি ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর।
আমাদের যৌথভাবে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আমরা বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য একটি গ্রুপ হিসেবে একত্রিত হতে পারি, যারা একটি বহুমাত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সবসময় শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছে, যা থেকে সরাসরি উপকৃত হবে জনগণ। একটি বহুমাত্রিক বিশ্বে বহু-পক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আমরা জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। এশিয়া ও বাইরের অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে সবারই সম্পদের জোগান বাড়বে বলে মত দেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, বাণিজ্যের পাশাপাশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়েই এটা সম্ভব। মানুষে মানুষে এই যোগাযোগই পারে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করে দিতে। অবকাঠামো, মুক্ত বাণিজ্য এবং উদার বিনিয়োগ নীতিই এশিয়ার বিকাশের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, এখন আমরা অভূতপূর্ব সম্পদ ও সম্ভাবনার হাতছানি দেখতে পাচ্ছি, যেখানে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, শিক্ষার সুযোগ আরও উন্মুক্ত হচ্ছে, শিশুমৃত্যুর হার কমে আসছে এবং দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাচ্ছে। একসময় এসব কল্পনা করাও কঠিন ছিল। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানবতার স্বার্থে বাংলাদেশ যে মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, সে-কথাও এশীয় নেতাদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। আমরা শুধু মানবিক আবেদনেই সাড়া দিচ্ছি না, এই সংকট যেন বিশৃঙ্খলা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার দিকে না যায় সে-বিষয়েও সচেতন রয়েছি। তীব্র উত্তেজনা ও সংকটের মুখেও এ সমস্যা সমাধানের জন্য সংলাপ এবং ঐকমত্য চেয়েছি আমরা। তিনি বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও টেকসই বিশ্ব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সব বন্ধু ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাবে। মানব সভ্যতাকে যুদ্ধের বিভীষিকার শিকার হতে হয়েছে বহুবার, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি বিশ্বাস করি, শক্তিশালী, যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বে দেশে দেশে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামনের দিনে চ্যালেঞ্জগুলো যদি আমরা মোকাবেলা করতে পারি, তা ভালো ফলই বয়ে আনবে।

Category: