Blog Archives

ইলিশ একান্ত আমাদের জিআই সনদ লাভ

Posted on by 0 comment

39উত্তরণ ডেস্ক: বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির সনদ পেল ইলিশ। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি গত ২৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে মৎস্য অধিদফতরের কাছে এই সনদ তুলে দেন।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের ৬ আগস্ট পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর জিআই পণ্য হিসেবে ইলিশের স্বীকৃতি পাওয়ার কথা জানায়। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদের কাছে এই সনদ তুলে দেওয়া হয়। ফলে জামদানির পর দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেল। সেই সাথে দেশীয় ঐতিহ্যগত সুরক্ষার পথে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক এমপি উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, কোনো একটি দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া এবং ওই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা হলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গত বছরের নভেম্বরে দেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই) হিসেবে নিবন্ধন পায় জামদানি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর থেকে জিআই সনদ দেওয়া হয়।
ইলিশের একক মালিকানা পাওয়ার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিকভাবে জিআই নিবন্ধনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে মৎস্য অধিদফতর। তথ্য প্রমাণাদি যাচাই ও বিশ্লেষণের পরে চলতি বছরের ১ জুন নিজস্ব জার্নালে ৪৯ পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর। আশঙ্কা ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার ইলিশের জিআই নিবন্ধনের ব্যাপারে আপত্তি জানাতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত আপত্তি তোলেনি কোনো দেশই।
ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ভারতে ১৫ শতাংশ, মিয়ানমারে ১০ শতাংশ, আরব সাগর তীরবর্তী দেশগুলো এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলোতে বাকি ইলিশ ধরা পড়ে। তবে বিশ্বেও অন্য দেশগুলোতে ইলিশের উৎপাদন কমলেও বাংলাদেশে বাড়ছে। এই বৃদ্ধির হার প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ। গত ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইলিশের উৎপাদন ১ লাখ টন বেড়ে ৫ লাখ টন হয়েছিল।

Category:

লাল চালের ভাত কেন খাব

Posted on by 0 comment

বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন এতই কম যে, বাজারে এই চাল খুঁজে পাওয়া যায় না। উচ্চফলনশীল ধানের কল্যাণে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি বটে, বিনিময়ে পেয়েছি পুষ্টির দুর্ভিক্ষ।

38আলমগীর আলম: শত শত বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের পরিবেশবান্ধব দেশীয় ঢেঁকিছাঁটা আউশ এবং আমন চালই ছিল প্রধান খাদ্য। তখন রোগবালাই ছিল অত্যন্ত কম। সিংহভাগ মানুষ ছিল স্বাস্থ্যবান, বিবেকবান, অল্পে সন্তুষ্ট ও মায়া-মমতার মতো মানবিক গুণে গুণান্বিত। শারীরিক সুস্বাস্থ্যের মূলে ছিল প্রকৃতিনির্ভর খাদ্যাচার আর কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই খাদ্যের বিপুল সমাহার। কোনো ধরনের জেনিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও হাইব্রিড শস্য ছিল না। তাই মানুষের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের কোনো অভাব ছিল না। যার দরুন মানুষের মধ্যে শারীরিক সুস্থতা বজায় থাকত।
খাদ্যের সাথে মানবিক গুণগুলোও জড়িত। প্রশ্ন আসতে পারে খাদ্যের সাথে এগুলোর সম্পর্ক কি? উত্তর হচ্ছে, সুষম খাদ্য মানুষের মস্তিষ্কে স্বস্তি দেয় আর স্বস্তি মানুষের মানবিক গুণ ঠিক রাখে, আর মানবিক গুণ ঠিক থাকলে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, বিবেক, বিনয়ী হতে সাহায্য করে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে খাদ্যের জোগান বাড়াতে পঞ্চাশ দশকের পর থেকে কৃষিবিজ্ঞানের কল্যাণে নানা জাতের উচ্চফলনশীল ইরি ধানের উৎপাদন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে শরীরের জন্য পুষ্টিকর আউস এবং আমন ধানের ফলন কমতে থাকে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন এতই কম যে, বাজারে এই চাল খুঁজে পাওয়া যায় না। উচ্চফলনশীল ধানের কল্যাণে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি বটে, বিনিময়ে পেয়েছি পুষ্টির দুর্ভিক্ষ।
উচ্চফলনশীল ধান জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মোডিফাই করা জাত, যা প্রাকৃতিক জীবনচক্রের সাথে সাংঘর্ষিক উপায়ে শুধু উচ্চফলনশীল করা; যা শুধু ফলনই দেবে, গুণাগুণ বহুলাংশে কমে যাবে, যদিও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতের ভিন্নতা রয়েছে। তবু এটা নিয়ে বিশ্বে প্রচুর মতপার্থক্য আছে; কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে যে কৃত্রিমতা ঘটেছে, বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি গবেষণা আরেকটি গবেষণাকে বাতিল করেছে মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর বলে।
বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত, আমরা গড় ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম চালের ভাত খেয়ে থাকি, আমাদের ভাতের চাল এখন ধবধবে সাদা আর মিহি, স্বচ্ছ, কোনো ধরনের পোকা বা মরা চাল থাকে না, মূলত মেশিনের মাধ্যমে চালের উপরিভাগ ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়, সাথে মোমের রাসায়নিক দিয়ে মসৃণ করে আমাদের কাছে ধবধবে সুন্দর চাল দেওয়া হয়, যার মধ্যে খাদ্যগুণ নাই বললেই চলে। চালের উপরিভাগের খাদ্যগুণ ফেলে দেওয়ার ফলে আমরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছি এবং হচ্ছি। কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাসিডিটি, ওবেসিটি, কিডনি এবং লিভার সংক্রান্ত রোগ এখন ঘরে ঘরে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ মেশিনে মিলিং করা সাদা পরিশোধিত চালের আবরণে লেগে থাকা নানা ধরনের মিনারেল নিশ্চিহ্ন হয়ে এনার্জি বর্ধনকারী নিরেট শ্বেতসারে (ঈধৎনড়যুফৎধঃব) রূপান্তরিত হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য।
এবার আমরা দেখে নেইÑ লাল চাল আর সাদা চালের খাদ্যগুণ কতটা হেরফের করে।
পুষ্টি বিবেচনায় লাল এবং সাদা চাল (পরিমাণ ১ কাপ)
লাল ভাতের ক্যালোরি সাদা ভাতের প্রায় সমান, যা দেহে এনার্জি প্রদান করে থাকে।
খাদ্যে আঁশ : সাদা ভাতে আছে ০.৬ গ্রাম, পক্ষাক্ষরে লাল ভাতে আছে ৩.৫ গ্রাম, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং এর (এষুংড়সরপ ওহফবী) কম বিধায় সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
ক্যালসিয়াম : সাদা ভাতে বিন্দুমাত্র নেই, লাল ভাতে ৬০ এমজি’র ওপরে থাকে যা হাড়, দাঁত মজবুত রাখে হৃৎপি-ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে মাংসপেশির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দেহকে রোগবালাই আরোগ্য করার প্রক্রিয়াকে উজ্জ্বীবিত করে।
আয়রন : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে ৩.৪ এমজি থাকে, যা রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন করে, চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায় ও ক্লান্তি দূর করে।
ম্যাগনেসিয়াম : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে থাকে ২৭২ এমজি, যা ¯œায়ুর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে, হজম প্রক্রিয়া শক্তিশালী করে এবং ভিটামিন বি এবং ই-এর কার্যক্ষমতা বাড়ায়।
ফসফরাস : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে থাকে ৫০০ এমজি, যা চুলের বৃদ্ধি, হৃৎপি- এবং কিডনির কার্যক্রম ঠিক রাখে, দেহে এসিড এবং অ্যালকালাইনের ভারসাম্য রক্ষা করে।
পটাসিয়াম : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাত থেকে পাওয়া যায় প্রায় ৫০৯ এমজি, যা দেহের পানির ভারসাম্যতা রক্ষা করে। মাংসপেশির সংকোচন সহজ করে, মেয়েদের হরমোনের সমস্যা থেকে রক্ষা করে।
সোডিয়াম : সাদা ভাতের চাইতে লাল ভাতে বেশি থাকে, যা দেহের পানি ভারসাম্য রক্ষা করে ¯œায়ুর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
জিঙ্ক : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে পাওয়া যায় ৩.৮ এমজি, যা চুল ও চামড়ার স্বাস্থ্য সুন্দর রাখে। ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে নিরাময় হয়, সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে। গর্ভধারণ এবং পুরুষত্ব স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
কপার : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে সামান্য পরিমাণে থাকে ০.৫ এমজি, যা খাদ্য হতে প্রাপ্ত লৌহকে হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া শরীরে ভিটামিন সি-এর ব্যবহার নিশ্চিত করে।
ম্যাঙ্গানিজ : সাদা ভাতে শূন্য। লাল ভাতে থাকে ৭.৯ এমজি, যা ¯œায়ু এবং মস্তিষ্কে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে। এছাড়া চর্বি এবং আমিষ হজম করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
এবার বেছে নিন আপনি কোন চালের ভাত খাবেন?
অনেকেই প্রশ্ন রাখবেন যে লাল চাল কোথায় পাব? ঢেঁকি কোথায় পাব? সুস্থ থাকতে চাইলে আপনাকে জোগাড় করতে হবে, অনেকেই ধানের এক পলিশ দিয়ে চাল সংগ্রহ করে, এক পলিশে চালের উপরি আবরণ নষ্ট করে না, তাই এক পলিশওয়ালা চাল নিরাপদে খেতে পারেন। বিশেষ করে যারা একাধিক রোগে ভুগছেন তাদের জন্য লাল চালের ভাত একটি আদর্শ পথ্য।

লেখক : ন্যাচারোপ্যাথি সেন্টার

Category:

সক্ষমতা সূচকে ৭ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা সূচকে (জিসিআই) এক বছরে সাত ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ১৩৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। গত বছর ১৩৮ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬তম। জিসিআই পর্যবেক্ষণে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর গত ১৬ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম ১০০-র নিচে নেমে আসার সম্মান অর্জন করল বাংলাদেশ। এক ডজন বিষয়ে ভালো অবস্থার ভিত্তিতে এ অবস্থান নির্ণয় করা হয়। এতে গতবারের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা প্রতিবেদন ২০১৭-১৮’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০১৬ সালের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা এ প্রতিবেদনটি গত ২৭ সেপ্টেম্বর সারাবিশ্বে একযোগে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে ডব্লিউইএফের অংশীদার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ঢাকায় এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সংস্থার গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। বাংলাদেশে দলনেতা হিসেবে জরিপ গবেষণাটি পরিচালনা করেন তিনি। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও ড. মোস্তাফিজুর রহমান এতে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচক এবার বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নে ইতিচাক প্রভাব ফেলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনও বৈশ্বিক তুলনায় নি¤œ পর্যায়ে থাকলেও এ সূচকে গত বছরের ১২৫ থেকে এবার ১০৭তম অবস্থানে আসা সম্ভব হয়েছে। এই সূচকে ১৮ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। অবকাঠামো উন্নয়ন সূচকে তিন ধাপ এগিয়েছে। তবে এতদিন বাংলাদেশের ওপরে থাকা তিন দেশ বাদ পড়ার কারণেও সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি সহজ হয়েছে। জরিপে ১২ পয়েন্টের মধ্যে স্কোর এবং অবস্থান দুই বিবেচনাতেই এগিয়েছে বাংলাদেশ। মোট ৭ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর বেড়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ৩ দশমিক ৭ থেকে স্কোর এখন ৩ দশমিক ৯। ব্যবসা পরিচালনায় মৌলিক প্রয়োজন সূচকে অগ্রগতি বাংলাদেশের অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ সূচকে গত বছরের ১০৫ থেকে এবারের অবস্থান ১০১তম।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সূচকে গতবারের তুলনায় ৯ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ৬৫তম অবস্থান থেকে এখন ৫৬তম অবস্থানে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষায়ও অবস্থান কিছুটা এগিয়েছে। তবে মানবসম্পদ উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সংবেদনশীলতা, শ্রমবাজার উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি খুব বেশি সন্তোষজনক নয়। এ ধরনের অনেক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

Category:

মারিদায় দুর্ধর্ষ জঙ্গি সবুজ এবং ১১ সহযোগী গ্রেফতার

Posted on by 0 comment
36

বাংলাদেশ-স্পেনে একযোগে জঙ্গিবিরোধী অভিযান

উত্তরণ প্রতিবেদনঃ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য ছিল সিরিয়ায় নিহত জঙ্গি সাইফুল হক সুজন ওরফে সিফুলের ভাই বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী আতাউল হক সবুজ স্পেনে পলাতক। আইটি ফার্মের আড়ালে সে দেশি-বিদেশি জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে এমন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত গত ২২ সেপ্টেম্বর স্পেনের এপ্রিমাদুরা প্রদেশের মারিদা শহরে তার খোঁজ পায় সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর ওই দিন বিকেল ৫টা থেকে ৮টা পর্যন্ত বাংলাদেশ-স্পেনের মধ্যে তাৎক্ষণিক যৌথ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে মারিদা, ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীতে একযোগে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে স্পেনে গ্রেফতার হয় জঙ্গি অর্থায়ন মামলার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামি আতাউল হক সবুজ। একই সময়ে অভিযান চালিয়ে তার ১১ ‘সহযোগী’কে বাংলাদেশের তিন জেলা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর রূপনগর থানায় গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুই দেশে একই সময়ে এ ধরনের অভিযানকে পারস্পরিক সহযোগিতার ‘উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’ বলে অভিহিত করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতিতে স্পেনের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট যোগাযোগ করে। দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যবিনিময় ও তৎপরতার কারণে সবুজ ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা গেছে। এদিকে চীনা বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সাথে জড়িত অভিযোগে ২২ সেপ্টেম্বর ৩৪ বছর বয়সী এক বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছে স্পেনের পুলিশ।
জানা যায়, সন্ত্রাস দমন ও জঙ্গি অর্থায়নের একাধিক মামলায় আসামি সবুজ। এরই মধ্যে তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে স্পেনে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল।
র‌্যাব জানায়, সবুজ ‘আইসিংকটেল’ ও ‘ওয়াহমি টেকনোলজি’র নামে দুটি আইটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। দেশে গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে ৮ জন পল্লবীর ‘ওয়াহমি টেকনোলজি’তে কর্মরত ছিল। যারা মূলত সবুজের অনুসারী। তারা একসময় আইব্যাকসেও কাজ করত। ‘আইসিংকটেল’ থেকে ওয়াহমির অনুকূলে বিপুল অর্থ পাঠানো হয়। সুজনের প্রতিষ্ঠিত ‘আইব্যাকস’ বন্ধ হওয়ার পর ‘আইসিংকটেল’ ও ‘ওয়াহমি টেকনোলজি’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে আড়ালে জঙ্গি অর্থায়ন করে সে। এরই মধ্যে সবুজ যে অর্থ পাঠিয়েছে যার ৫৩ শতাংশই জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তথ্য আছে র‌্যাবের কাছে।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, ওয়াহমি টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে জঙ্গিদের অর্থায়নের সাথে জড়িত। এরই সূত্র ধরে র‌্যাব-৪-এর একটি দল ধারাবাহিক অভিযানে ১১ জনকে গ্রেফতার করে। ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীতে এ অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে পল্লবীর ই/২ নম্বর রোডের ১৫০ নম্বর বাড়িতে ওয়াহমির কার্যালয় থেকে ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলোÑ হেলাল উদ্দিন, আল আমিন, ফয়সাল ওরফে তুহিন, আল মামুন, আল আমিন (২), আমজাদ হোসেন, মঈন খান ও জাহেদুল্লাহ। রাজশাহী থেকে নাহিদ এবং খুলনা থেকে তাজুল ইসলাম ওরফে শাকিল ও টলি নাথকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১১টি ল্যাপটপ, ১২টি মোবাইল ফোন, ৭টি কার্ড পাঞ্চিং মেশিন, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে স্পেনের এপ্রিমাদুরা প্রদেশের মারিদা শহরে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি অর্থায়ন চক্রটির হোতা আতাউল হক সবুজকে গ্রেফতার করে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মুফতি মাহমুদ খান জানান, গ্রেফতারদের বেশিরভাগই আগে ‘আইব্যাকস লিমিটেডে’ কর্মরত ছিল। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে পরিচালিত হতো। এর চেয়ারম্যান ছিল সিফুল হক সুজন। সে ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সিরিয়াতে বিমান হামলায় নিহত হয়। এরপর ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে বাংলাদেশে আইব্যাকসের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ও বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জঙ্গি অর্থায়নের ৫০ হাজার মার্কিন ডলারসহ (৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা) নাহিদ নামে সুজনের এক সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে জানা যায়, ওই টাকা জঙ্গি বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেটের হাত ঘুরে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। এ ঘটনায় সাতজনকে আসামি করে মামলা হয়। তাদের পাঁচজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। এর মধ্যে সুজনের বাবা হাসনাত কারাগারে মারা যান। বাকি চার আসামি জামিনে রয়েছে। তাদের মধ্যে নাহিদ ও তাজুলকে এবারের অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে।

Category:

মঙ্গল কামনায় দুর্গোৎসব ও আশুরা

Posted on by 0 comment

41উত্তরণ প্রতিবেদন: দুর্গাপূজা : গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকের বাদ্য, নৃত্যগীত আর সিঁদুর খেলা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দু ধর্মের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের অবাঙালিরাও ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে। যেমন কাশ্মীর ও দাক্ষিণাত্যে অম্বা ও অম্বিকা, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী, কান্যকুব্জে কল্যাণী, মিথিলায় উমা এবং কুমারিকা প্রদেশে কন্যাকুমারী নামে দেবীর পূজা ও উৎসব পালিত হয়। হিন্দু ধর্মে তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনা ইত্যাদি নামে অভিহিত হন। দুর্গ বা দুর্গম নামক দৈত্যকে বধ করেন বলে তার নাম হয় দুর্গা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাকে দুর্গা বলা হয়। ব্রহ্মার বলে অবধ্য মহিষাসুর নামে এক দানব স্বর্গরাজ্য দখল করলে রাজ্যহারা দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ থেকে যে দেবীর জন্ম হয় তিনিই দুর্গা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হয়ে এই দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। তাই দেবীর এক নাম হয় মহিষমর্দিনী। কালীবিলাসতন্ত্র, কালিকাপুরাণ, দেবীভাগবত, মহাভাগবত, বৃহন্নন্দিকেশ্বরপুরাণ, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী, দুর্গোৎসববিবেক, দুর্গোৎসবতত্ত্ব প্রভৃতি গ্রন্থে দেবী দুর্গা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই দুর্গাপূজার মূল তাৎপর্য। পূজা শেষে বাবার বাড়ি থেকে ‘আনন্দময়ী’ দেবী দুর্গা ফিরে গেছেন কৈলাসের দেবালয়ে। বিজয়ার ১০ দিন আগে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে দেবীদুর্গা মর্ত্যে আবাহনের মাধ্যমে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, বিজয়া দশমীতে ‘বিহিত পূজা’ আর ‘দর্পণ বিসর্জনে’ দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। সারাদেশে কড়া নিরাপত্তায় শেষ হয় পূজা এবং প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) নৌকায় চড়ে আসায় দেশে হবে অতি বৃষ্টি ও শস্য বৃদ্ধি। আর স্বর্গালোকে ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে যাওয়ায় রোগ-ব্যাধি বাড়বে ও হবে ফসল নষ্ট। তবে ভক্তদের বিশ্বাস, ফল যা-ই হোক মা মঙ্গলময়ী, আনন্দময়ী তিনি জগতের কল্যাণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী; দেবী দুর্গা যে কদিন পিতৃগৃহে ছিলেন, ঢোলের বাদ্য সে কদিন ভক্তদের মনে ভক্তি আর আনন্দ মূর্ছনা দুই-ই জাগিয়েছে। বিজয়ার দিন সকালে সকল ম-পে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও বিসর্জনের আগে দেশের ম-পে ম-পে দুপুর পর্যন্ত চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ উৎসব। মহাদশমী পূজা অন্তে 42গৃহবধূরা একে অপরকে সিঁদুর দান, আলিঙ্গন ও দেবী দুর্গা মায়ের পায়ে ছোঁয়ানো সিঁদুর নিজের সিথীতে লাগিয়ে পুরহিতের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন ম-পে ম-পে। ম-প এলাকা পরিণত হয় এক মহামিলন ক্ষেত্রে। পূজার কদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে হতেই সারারাত নির্ঘুম কাটানোর ফলে চোখে ঘুম ঘুম ভাব থাকলেও যেন কোনো ক্লান্তির প্রভাব লক্ষ করা যায়নি ভক্তদের চেহারার মাঝে। ম-প থেকে ম-পে ঘুরে ফিরেছেন অগণিত ভক্ত। বিজয়া দশমী উপলক্ষে দিনটি ছিল সরকারি ছুটি। এদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। ধর্ম যার যার উৎসব সবারÑ এ বিশ্বাসে সম্প্রীতির এক অটুট বন্ধনের মধ্য দিয়ে আর প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য নির্বিঘেœ শেষ হলো চার দিনব্যাপী দুর্গা উৎসবের। বিএনপি-জামাত আমলে দুর্গোৎসবের পূর্বে জঙ্গি তৎপরতা ও সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার কারণে পূজায় গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার ছায়া পড়েছিল। পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ম-পের সংখ্যা বেড়েছে। সারাদেশে ৩০ হাজার ৭৭টি ম-পে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
আশুরা : গত ১ অক্টোবর পবিত্র আশুরা কারবালা প্রান্তরের বিয়োগান্তক ঘটনার ঐতিহাসিক দিন। এ দিনেই বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে শহীদ হন। সেই থেকে মুসলিম বিশ্বে কারবালার শোকাবহ ঘটনাকে ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে পালন করা হয়। তবে ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণে প্রতিবছর আশুরা পালিত হলেও আরও অনেক কারণে এই দিনটি ইসলামে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসের বর্ণনামতে, পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শুরু করে অনেক ঘটনাই এ দিনে সংঘটিত হয়েছে। আজকের এ দিনেই পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাবে। ইসলামের পরিভাষায় এ দিনটি আরও অনেক কারণে পবিত্র দিন। কারণ ১০ মহররম তারিখে পৃথিবী ও আসমান সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ দিনে পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এ দিনেই হযরত ইব্রাহিম আ. নমরুদের অগ্নিকু- থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। ফেরাউনকে নীলনদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ দিনেই নুহ (আ.)-এর কিস্তি ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তিনি জুদি পাহাড়ে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। এ দিনেই হযরত ইসা (আ.)-কে ঊর্ধ্ব আকাশে তুলে নেওয়া হয়েছে।
আরবি ৬০ হিজরিতে এজিদ বিন মুয়াবিয়া পিতার মৃত্যুর পর নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। শাসক হিসেবে সে ছিল স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী তাই ইমাম হোসেন (রা.) তার আনুগত্য করেন নি। ইসলামের সংস্কারের জন্য মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসেন। সেখান থেকে কুফার উদ্দেশে যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কারবালার উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই সময়ে উমর বিন সাদ আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে ৪ হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে। কয়েক ঘণ্টা পর সীমারের নেতৃত্বে বহু সৈন্য এসে তার সাথে যোগ দেয়। কারবালায় দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। অসম এই যুদ্ধে ইমাম হোসেন এবং তার ৭২ জন অনুসারী মৃত্যুবরণ করেন। সীমার নিজে ছুড়ি চালিয়ে ইমাম হোসেনকে হত্যা করে। সেদিন ছিল আরবি ৬১ হিজরির ১০ মহররম।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা কারবালার ঐতিহাসিক ত্যাগের ঘটনাকে স্মরণ করে জাতীয় জীবনেও ত্যাগের দৃষ্টান্ত অনুসরণসহ মুসলিম উম্মার সুখ সমৃদ্ধি এবং শান্তি কামনা করেছেন। এ বছর পুলিশি নিরাপত্তা ছিল আরও বেশি। এছাড়াও মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বকশিবাজার, লালবাগ, পল্টন, মগবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও আশুরার মিছিল বের করা হয়েছে। শিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি পবিত্র কোরআনখানি, ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল, জিকির-আজকার, আলোচনা সভা, নফল নামাজ আদায়, দান-খয়রাতের মাধ্যমে পালন করেছেন। অনেকে নফল রোজাও রাখেন এই দিনে। আশুরা উপলক্ষে বেতার ও টেলিভিশনে প্রচার করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশ হয়েছে বিশেষ নিবন্ধ।
গ্রন্থনা : সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

Category:

আম্রপালির ঘ্রাণ

Posted on by 0 comment

44স্বকৃত নোমান: এবং তখন পারভিনের মনে পড়ে আম্রপালি আমের কথা। আ¤্রপালি, না আমরুপালি? সে ঠিক জানে না সঠিক নাম কোনটি। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে তার বাবা প্রায়ই হাট থেকে কিনে আনতো। বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে থলেটা বাবার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে আমের ঠোঙাটা বের করে একটা আম হাতে নিয়ে সে চামড়া ছিলতে শুরু করত। তার মা বকতো, ‘শকুনের লাগান ইংকা শুরু করলু ক্যা? বিষ না ধুয়ে খাচ্চু, মরবু তো!’ তার হাতের তালু তো তখন মিষ্টি রসে ভরা, চোখ বন্ধ করে চুষছে―মরার কথা কি কানে ঢোকে!
আ¤্রপালি হোক বা আমরুপালি―কৈশোরের সেই আমের কথা মনে পড়ার পরমুহূর্তে মনে পড়ে গেল তার বুড়ো দাদির মুখখানা। দাদির মুখখানাও ছিল ঠিক আ¤্রপালি বা আমরুপালির মতো। লম্বা। আমের রং হলুদ, দাদির শ্যামলা―পার্থক্য শুধু এটুকু। সে চোখ বন্ধ করে আ¤্রপালি বা আমরুপালির ঘ্রাণ শোঁকে। তখন শুনতে পায় বাতাসে ভেসে আসা গান, ‘এখানে আম কুড়াবার ধুম লেগেছে চলো না অন্য কোথাও যাই।’ কোত্থেকে ভেসে আসছে এই সুর? আকরামউল্লাহর মতো কোনো আইসক্রিমঅলা বুঝি কাস্টমার আকৃষ্ট করতে সিডি প্লেয়ারে গানটা বাজাচ্ছে।
পারভিন তখন ভাবে, জান্নাতে কি আ¤্রপালি বা আমরুপালি খেতে দেওয়া হবে? আকরামউল্লাহ, মোফাজ্জেল হোসেন বা তার স্বামী শফিউল আযম তো কখনও বলেনি জান্নাতে আম-কাঁঠাল পাওয়া যায়। ভাবনাটি সহসা তলিয়ে গেল এই প্রশ্নের নিচে―আচ্ছা, জান্নাতে তো পুরুষেরা সত্তুর হাজার হুর পাবে, বেশুমার গেলমান পাবে, আমি তো নারী, আমি কী পাব? নারীরাও কি সত্তুর হাজার সুপুরুষ পাবে? আকরামউল্লাহ বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করা যেত। সে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আলের ধারে শুকাতে দেওয়া খড়ের ওপর। বোমার স্পিøন্টারের আঘাতে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। কোরবানির গরুর মতো রক্ত বেরুচ্ছে, মাটি শুষে নিচ্ছে সেই রক্ত। তার সিথানের দিকে একটি গর্ত থেকে মস্ত একটি ইঁদুর মাথা বের করে রক্ত শোঁকে, তার লাশের চারদিকে চক্কর দিয়ে লেজ নাড়াতে নাড়াতে আবার গর্তে ঢুকে পড়ে।
নিশ্চয় রহমতের ফেরেশতা! পারভিন ভাবে। ইঁদুরের রূপ ধরে রহমতের ফেরেশতা বুঝি আকরামউল্লাহর লাশ পাহারা দিচ্ছে। আকরামউল্লাহ প্রায়ই বলতো, ‘আল্লার পতত যারা শইদ হয় তাগেরে লাশ পচেনা, রহমতের ফেরেসতারা কেয়ামত পর্যুন্ত তাগেরে লাশ পওর দ্যায়।’ হতেও তো পারে। নইলে এত বড় ইঁদুর এলো কোত্থেকে? গত তিন মাসে তো এ বাড়ির আশপাশে এত বড় ইঁদুর দেখা যায়নি।
তিন মাস, না তারও বেশি? আঙুলের কড়া গুনে সে হিসাব করে―মার্চের তের তারিখ থেকে মে-র এগার তারিখ। কতদিন হয়? তের থেকে তের তিন মাস, দুই বাদ দিলে দুই মাস আটাশ দিন। অর্থাৎ প্রায় তিন মাস। তিন মাস! পারভিনের অবাক লাগে। চোখের পলকেই এতগুলো দিন কেটে গেল! অথচ তার মনে হয় এই সেদিন সে স্বামী-সন্তানের সঙ্গে এখানে, এই মাছমারা গ্রামে আসে। তারা আসে বাগমারা থেকে। গ্রামের নাম শুনে পারভিনের হাসি পেয়েছিল। বাগমারা থেকে মাছমারা! আকরামউল্লাহ বলেছিল, একটা সময় এখানে বিল ছিল। বেশিদিন আগের কথা নয়, তার দাদার আমলে। তার পৈতৃক বাড়ি তো মাছমারার উত্তরের গ্রাম বেনীপুরে। বেনীপুরের লোকেরা তখন এই বিলে মাছ মারতে আসতো। কত রকমের মাছ যে পাওয়া যেত! মাছ মারতে মারতে বিলের নামই রেখে দিল মাছমারা বিল। পরে যখন বিল ভরাট হয়ে বসতি গড়ে উঠল, মাছমারা বিলের ‘বিল’ বাদ পড়ে থাকল শুধু মাছমারা।
বাগমারা থেকে এসে স্বামী-সন্তানের সঙ্গে পারভিন প্রথমে আকরামউল্লাহর বেনীপুরের বাড়িতেই উঠেছিল। ছিল এক সপ্তাহ। বেনীপুরে ঘনবসতি। বাড়ির পাছায় বাড়ি, ঘরের পাছায় ঘর, লেট্রিনের পাছায় লেট্রিন। এই ঘরে পাদ দিলে ওই ঘরে শোনা যায়। এত মানুষের দঙ্গলে তো আর জেহাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায় না। মোফাজ্জেল হোসেন বলেছিল, জেহাদের কাজ করতে হয় নিরালায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে। রমজান মাসের শেষ দশ দিন মুসল্লিরা যেভাবে মসজিদে এতেকাফে বসে নির্জনে আল্লাহ তায়ালার এবাদত-বন্দেগি করে ঠিক সেভাবে। বেনীপুর নামটাই তো তাগুতি। গ্রামে তাগুতিরা গিজগিজ করছে। প্রকৃত মুসলমান আছে কজন? সবাই তো নামে মুসলমান। তাদের বাপ-দাদা মুসলমান ছিল, সেই সুবাদে তারাও মুসলমান। বাপ-দাদা নামাজ-রোজা করত, সেই সুবাদে তারাও করে। তারা নামাজ পড়ে, আবার হিন্দি সিনেমার নাচ-গানও দেখে। রোজা রাখে, আবার দুর্গাপূজা-যাত্রাপালাও দেখে। তার উপর ভোট দেয় তাগুতি পার্টিকে। তাদের ওসব এবাদত যে আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না, আখেরাতে যে তাদের স্থান হবে জাহান্নামে, তা তারা বুঝতে পারে না।
প্রায় মাস ছয় আগে মোফাজ্জেল হোসেনের কথামতো মাছমারা গ্রামের দক্ষিণে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া আবাদি ভরাট করে বাড়িভিটা তৈরি করে আকরামউল্লাহ। জায়গাটা নির্জন। গ্রামের সর্বশেষ বাড়িটা ভিটা থেকে প্রায় আধ মাইল উত্তরে। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ আবাদি। বর্ষায় ডুবে থাকে গলা পানির নিচে। ধানের মৌসুম ছাড়া গ্রামের কেউ এদিকে আসে না তেমন। পারভিনরা আসার পর তাড়াহুড়ো করে একটা ঘর তুলে নিল আকরামউল্লাহ। উপরে টিনের দোচালা, চারদিকে বাঁশের বেড়া। ভেতরে চারটি কামরা। একটিতে থাকে আকরামউল্লাহর বড় ছেলে চিশতি, একটিতে তার শ্যালক সাফাত, একটিতে বউ আবিদাকে নিয়ে আকরামউল্লাহ এবং বাকি একটিতে গাদাগাদি করে পারভিন, তার স্বামী শফিউল এবং তাদের চার ও সাত বছর বয়সী দুই ছেলে। ঘরের সামনের বারান্দায় শন দিয়ে ছোট্ট যে কামরাটি করা হয় সেটি মোফাজ্জেল হোসেনের জন্য বরাদ্দ। মোফাজ্জেল আসে শহর থেকে। সপ্তাহে একবার। দুদিনের বেশি থাকে না। জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের সামরিক শাখার বিভাগীয় প্রধান সে। আকরামউল্লাহর দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই। জেএমবিতে আকরামউল্লাহর যোগদান তার হাত ধরেই।
সংগঠনিক কাজে বাগমারা এলাকায় প্রায় চার মাস থাকতে হয়েছিল আকরামউল্লাহকে। ফেরি করে আইসক্রিম বিক্রি করত এবং গোপনে সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ করত। থাকত শফিউল আযমের বাড়িতে। থাকা-খাওয়া বাবদ দিতে হতো মাসে এক হাজার টাকা। শফিউলের পেশা ছিল ফেরি করে শাড়ি-কাপড় বিক্রি। সারাদিন গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে সন্ধ্যায় উঠানে পাটি পেতে বসতো দুজন। রান্নাবান্না শেষ করে পারভিনও যোগ দিত। তখন জেহাদের ফজিলত বিষয়ে বয়ান শুরু করে দিত আকরামউল্লাহ। শফিউল ও পারভিন মুগ্ধ হয়ে শুনতো।
চার মাস পর আকরামউল্লাহ যখন চলে গেল, যে শফিউল দুই ঈদের নামাজ ছাড়া সারাবছর মসজিদে যেত না, যে পারভিন বিয়ের পর কোনোদিন এক অক্ত নামাজ পড়েনি, এভাবে কিনা বদলে গেল! পাস করা মাওলানার মতো গ্রামের লোকজনের কাছে ওয়াজ-নসিহত শুরু করে দিল। শফিউলের বাবা-মা নামাজের ধার ধারত না। গাঁ-গ্রামের চাষাভুষা মানুষ তার বাবা, সারাদিন ক্ষেতে-খামারে খেটে মরে, তার মায়েরও দিন যায় সংসার সামলাতেই, ধর্মকর্ম নিয়ে মাথা ঘামানোর এত সময় কই। জেএমবিতে যোগ দিয়ে বাবা-মাকে শফিউল নামাজের তাগাদা দেওয়া শুরু করল, বোরকা ছাড়া মাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে বারণ করে দিল। এসব নিয়ে সংসারে শুরু হলো ঝগড়া-ফ্যাসাদ। তার বাবা-মা যখন প্রায় অতীষ্ঠ, মোজাজ্জেল হোসেনের নির্দেশে সপরিবারে হিযরতে বেরিয়ে পড়ল শফিউল।
মাছমারায় থাকা তো আকরামউল্লাহর বাড়িতে, কিন্তু খাওয়া? আকরামউল্লাহ বলল, ‘প্যাট দেচে যাই খাবেরও দিবি তাই। বাগমারায় যা করিচ্চিলে এটিউ তাই করবে। সেগলে ছাড়াও সংগঠনের কাজ তো আচেই।’ মোফাজ্জেল এসে শফিউল ও পারভিনকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে যায়। বোমা বানানো শিখতে তাদের এক সপ্তাহর বেশি লাগল না। আকরামউল্লাহ ও শফিউল সারাদিন গ্রামফেরি করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে বসে যায় বোমা তৈরির কাজে। রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত চলে বোমা তৈরির কাজ। সপ্তাহ শেষে মোফাজ্জেল এসে নিয়ে যায়। এত বোমা মোফাজ্জেল কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। আকরামউল্লাহ হয়তো জানে, কিন্তু মুখ খোলে না। বউ আবিদার কাছেও না। শফিউল একবার জানতে চেয়েছিল, সে মুখ খোলেনি। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করেনি শফিউল। কেন করবে? আকরামউল্লাহ তার নেতা, সে যা হুকুম করবে তাকে তাই করতে হবে―সংগঠনের এই নিয়ম। প্রশ্ন করা বারণ।
শেষবার মোফাজ্জেল এসে দুটি বন্দুক, পাঁচটি চাপাতি, বোমা তৈরির দশ কেজি সরাঞ্জাম এবং আটটি সুইসাইড ভেস্ট রেখে যায়। সেদিনই শফিউল প্রথম জানতে পারে মোফাজ্জেলকে পুলিশ খুঁজছে। জেএমবির শীর্ষ নেতাদের যে তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ সেখানে তার নাম চার নম্বরে। যাওয়ার সময় মোফাজ্জেল বলে গেল, ‘হামি আর নাই আসপের পারি। পুলিশ হামাক পাগলা হয়ে খুঁজিচ্চে। এক জাগাত লিত্তিদিন আলে ধরা পরে যামো। হামার বদলে আবুবকর আসে মালপত্র লিয়ে যাবি। এটি তোমাগেরে কুনু ঝামেলা হবির লয়। জাগাটা লিরাপদ।’
আকরামউল্লাহও নিজের বাড়িকে নিরাপদ ভেবেছিল। কোথায় অজগ্রাম মাছমারা! বগুড়া শহর থেকে কত দূরে! রাস্তাঘাটের যে হাল, পুলিশ কি এখানে মরতে আসবে? কিন্তু তার ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে, যেদিন মোফাজ্জেল চলে গেল সেদিন রাতেই বাড়ি ঘেরাও করল পুলিশ। রাতভর বন্দুক তাক করে রাখল বাড়ির দিকে, অথচ বাড়ির কেউ একটিবার টের পেল না। কীভাবে পাবে? অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। পুলিশ তো আর জানান দেয়নি যে তারা বাড়ি ঘেরাও করেছে। একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত করেনি।
ফজরের নামাজের অজু করতে দুয়ার খুলে আকরামউল্লাহ যখন উঠানে দাঁড়াল তখন মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পেল। গায়ে কাঁটা দিল তার। সন্তর্পণে কুয়ার পাড়ে কলমিঝোঁপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে ভালো করে ঠাওর করল। বাড়ির চারদিকে নীল পোশাকের বিস্তর মানুষ। নিশ্চয়ই পুলিশ! কলিজার পানি শুকিয়ে গেল তার। পেশাবের বেগ পেয়েছিল খুব। আর ধরে রাখতে পারল না, লুঙ্গিটা ভিজিয়ে দিতে লাগল নিজের অজান্তেই। লুঙ্গি ভেজাতে ভেজাতে একদৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ডাকাডাকি করে সবার ঘুম ভাঙাল। সে বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। শফিউল বলল, ‘মোফাজ্জেল ভাইওক ফোন দ্যান।’ ফোন দিলো আকরামউল্লাহ। মোফাজ্জেল হোসেন বলল, ‘সুইসাইডাল ভেস্ট পরে ল্যাও। তোমাগেরে জন্যি অপেক্ষা করিচ্চে দুদ আর মদুর নওর, অগুনতি হুর আর গেলমান। ফি আমানিল্লে। জান্নাতুল ফেরদৌসোত তোমাগেরে সাতে দেকা হবি।’
হঠাৎ গাড়ির শব্দ উঠল দক্ষিণের মাঠে। চমকে উঠল সবাই। আকরামউল্লাহ বলল, ‘পুলিশের গাড়ি মনে হচ্চে।’ তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে পানির ছটা ঢুকতে লাগল ভেতরে। এমনই দমকা ঝাপটা, বেড়াটা ভেঙে পড়ার উপক্রম। আকরামউল্লাহ দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। বাইরে গিয়ে তো সে আকাশে মেঘ দেখেনি, হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো কোত্থেকে? সন্ত্রস্ত গলায় আবিদা বলল, ‘আল্লাহু আকবার! সবই তার কুদরোত। ঝড়-বিষ্টি দিয়ে তিনি তাগুতি শক্তিক হোটে দবার ব্যবচতা করিচেন।’ শফিউলের চোখ ঘোলা। পরওয়ারদিগারের অসীম কুদরত দেখে তার হুঁশ হারাবার দশা। পাশের কামরায় গিয়ে বেড়ার বড় একটা ফুটোয় চোখ রাখল সে। ট্রাকের মতো বড় বড় দুটি গাড়ি দেখতে পেল। দুই গাড়ি থেকেই পানি মারা হচ্ছে। গাড়ির আশপাশে দাঁড়ানো লোকগুলোর পোশাক দেখে তাদের চিনতে অসুবিধা হলো না তার। চাপা গলায় বলল, ‘সব্বোনাশ! এরা তো দমকল বাহিনীর লোক!’
আবিদার শরীরে ভয়ের কাঁপুনি উঠল। আকরামউল্লাহ বলল, ‘মর্দে মুজাহিদিনেগেরে ইংকা করেই পরীক্কে দেওয়া লাগে, ভয়ের কুনু কারণ নাই।’ স্বামীর কথা শুনে বুকে বল পায় আবিদা। কাঁপুনিটা থেমে আসে। আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে বলে, ‘আল্লার আস্তাত জিহাদে ঝাঁপে পড়ার এডেই তো সময়। হামি জিহাদ করবের চাই।’ আকরামউল্লাহর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বউয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলে, ‘সুবহানাল্লাহ! হামি লেককার বউ পাচি। আকিরাত লিয়ে হামার আর কুনু চিন্তে নাই। একটা কাফেরের কল্লার বদলে যুদি জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব হয়, তা’লে আর লেট করিচ্চো ক্যা আবিদা?’
আবিদার পরনে ছিল ঢোলা মেক্সি। আগে শাড়ি পরত। জেএমবিতে যোগ দেওয়ার পর মেক্সি পরা ধরেছে। কেননা মোফাজ্জেল হোসেন বলেছে, শাড়ি হিন্দুয়ানি পোশাক, মেক্সি সুন্নতি। কিন্তু মেক্সি পরে দৌড়ানো যায় না, দৌড়ের জন্য সেলোয়ার-কামিজ যুুতসই। কাপড়ের বস্তায় তুলে রাখা দুই জোড়া সেলোয়ার-কামিজের এক জোড়া নামিয়ে দ্রুত পরে নিল আবিদা। মোফাজ্জেলের রেখে যাওয়া সবচেয়ে ধারালো চাপাতিটা হাতে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। বউয়ের কপালে আবারও চুমু খেল আকরামউল্লাহ, ‘তোমার মুক নূরের আলোত জ্বলজ্বল করিচ্চে বউ। যাও, নারায়ে তাকবির কয়ে ঝাঁপে পড়ো।’
দরজা খুলে বুভুক্ষু বাঘিনীর মতো জেহাদি জোশে ছুট লাগাল আবিদা। দমকল বাহিনীর কর্মীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই সে একজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথম আঘাতটা করল লোকটার বাহুতে। লোকটা চিৎকার করে উঠল। দ্বিতীয় আঘাতটা করল তার ঘাড়ে। লোকটা হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। তৃতীয় আঘাতটা করল তার মাথায়। লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে গেল। আত্মঘাতী হামলার আশঙ্কায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল পুলিশ-বাহিনী। ফোর্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত এএসপির কমান্ডে সবাই আবার অস্ত্র তাক করে দাঁড়াল। আবিদাকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লেন এএসপি। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল আবিদা।
তখন সকাল প্রায় সাড়ে নয়টা। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখার সদস্যরা, জেলা পুলিশ সুপার এবং আরও দুই প্লাটুন পুলিশ এলো অকুস্থলে। আকরামউল্লাহর ঘর থেকে তখন শুরু হলো মুহুর্মুহু বোমা নিক্ষেপ। জবাবে পুলিশের গুলি। বোমা ও গুলির শব্দে কেঁপে উঠতে লাগল মাছমারা গ্রাম। শত শত মানুষ জড়ো হতে লাগল বাড়িটার চারদিকে। পুলিশের বাধা মানছে না কেউ। হাতমাইকে পুলিশ যতই সাবধান করে মানুষের ভিড় ততই বাড়ে। বাড়বে না? কে কবে এই অজগ্রামে বোমা-গুলির শব্দ শুনেছে? কেউ তো কখনও ধারণাও করতে পারেনি গ্রামের শেষ মাথায় এমন একটা জঙ্গি আস্তানা থাকতে পারে। আদনা আইসক্রিমঅলা আকরামউল্লাহ কিনা তলে তলে এত দূর পৌঁছে গেল!
জনতার ভিড় সামাল দিতে না পেরে অকুস্থলের এক মাইল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে দিল পুলিশ। তবু মানুষের ভিড় কমত না, যদি না স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিতেন। তিনি হাতমাইকে কৌতূহলী জনতাকে ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। খানিকের মধ্যে জনশূন্য হয়ে পড়ল গোটা এলাকা। অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করল যৌথবাহিনী। অপারেশন সান ডেভিল।
বেলা তখন প্রায় এগারোটা। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান জাহিদুল ইসলাম হাতমাইকে ঘোষণা করলেন, ‘ভেতরে কে আছেন আত্মসমর্পণ করুন। আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না আমরা।’ সঙ্গে সঙ্গে আবার শুরু হলো বোমা নিক্ষেপ। গুলি ছুঁড়ে জবাব দিতে লাগল পুলিশ। গুলি ও বোমার পাল্টাপাল্টি চলতে লাগল। বোমা বিস্ফোরণের ধোঁয়া উড়তে লাগল চারদিকে। টানা আধা ঘণ্টা পাল্টাপাল্টি বোমা-গুলির পর ভেতর থেকে বোমা নিক্ষেপ থামল। হাতমাইকে আবারও আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেন জাহিদুল। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেলেন না।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর ঘরের সামনের দরজাটা খুলে গেল। বেরিয়ে এলো পারভিনের দুই ছেলে। দুজনের পরনে হাফপ্যান্ট। খালি গা। দুজন হাত ধরাধরি করে উঠান পার হয়। তারপর হাত ছেড়ে দেয়। ধীর গতিতে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে জেলা পুলিশ সুপারের সামনে এসে দাঁড়ায়। এসপি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভিতরে কজন আছে?’ ছোট ছেলেটি বলে, ‘পাঁচজন’। বড় ছেলেটি বলে, ‘না না, ছয়জন।’ এসপির নির্দেশে দুই কনস্টেল দুজনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিলো।
হাতমাইকে আবারও আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেন জাহিদুল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলেন না। প্রায় দশ মিনিট পর আবার খুলে গেল দরজাটা। প্রথমে বেরিয়ে এলো আকরামউল্লাহ, পেছনে সাফাত, তার পেছনে পাশাপাশি আবিদা ও চিশতি এবং সবার পেছনে শফিউল। উঠানে নেমে পাশাপাশি দাঁড়াল সবাই। বন্দুক তাক করল পুলিশ। ট্রিগারে হাত রাখল। দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল পারভিন। আকরামউল্লাহর ইশারায় সবাই আবার হাঁটা ধরল। পাশাপাশি। গায়ে গা ঠেকিয়ে। উঠান পেরিয়ে তারা কুয়ার পাড়ে উঠল। পাড় থেকে জমিনে নামল। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল পারভিন। মুহূর্তে বিস্ফোরণের ভয়াবহ শব্দে সে কানে আঙুল দিল। শুনতে পেল গুলির শব্দও।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর দরজা খুলে আবার বাইরে এসে দাঁড়াল পারভিন। বিস্ফারিত চোখে দেখল কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে তার স্বামী শফিউল, আকরামউল্লাহ ও সাফাত গড়াগড়ি খাচ্ছে, আবিদার মাথাটা আলের ওপর, শরীরটা জমিনে, চিশতি গড়াগড়ি খেতে খেতে একটা হাত উঁচিয়ে কী যেন বলতে চাচ্ছে।
পারভিনের দৃষ্টি তখন দূরে, আমগাছটার দিকে, যেখানে তার দুই ছেলে দাঁড়িয়ে। কোমরে হাত রেখে তারা ঘরটার দিকে তাকিয়ে। চোখ সরাতে পারে না পারভিন। দৃষ্টি স্থির রেখে সে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। শুনতে পায় মাইকের আওয়াজ, ‘ভেতরে আর কে আছেন আত্মসমর্পণ করুন। কোনো ক্ষতি হবে না আপনাদের।’ পারভিন কিছু শুনতে পায় না। আতমলা থেকে তার চোখ সরে না। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে বসে পড়ে। ছোট ছেলেটা বুঝি তাকে দেখতে পায়। ডান হাতটা উঁচু করে কাকে যেন ইশারায় ডাকছে। কাকে ডাকছে? তাকে? কোমরে বাঁধা সুইসাইডাল ভেস্টে হাত বুলায় পারভিন। যেন গর্ভের সন্তানকে আদর করছে। আবারও শুনতে পায় মাইকের আওয়াজ, ‘জলদি আত্মসমর্পণ করুন। নইলে আমরা গুলি চালাতে বাধ্য হবো।’
পারভিন উঠে দাঁড়ায়। ধীর কদমে হাঁটতে হাঁটতে পড়ে থাকা লাশগুলোর দিকে এগোয়। আকরামউল্লাহর লাশের অদূরে একটা আলের উপর দাঁড়ায়। দুই হাতে ভেস্টটা ধরে সাবধানে বসে। আবারও শুনতে পায় মাইকের আওয়াজ, ‘জলদি আত্মসমর্পণ করুন।’ সে নড়ে না। কীভাব নড়বে? সে তো তখন আ¤্রপালি বা আমরুপালির ঘ্রাণে মত্ত। চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণ নিচ্ছে। দাদির মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। কতদিন হলো মরেছে দাদি, অথচ তার মুখখানা এখনও সে ভুলল না!
পারভিন ভাবে, আচ্ছা, তার দাদি এখন কী করছে কবরে? জীবনে তো কোনোদিন তাকে নামাজ পড়তে দেখেনি। নিশ্চয়ই গজবের ফেরেশতারা কবরে এখন তার মাথায় মুগুর মারছে! বড় বড় সাপেরা তার শরীর পেঁচিয়ে আছাড় মেরে সত্তুর হাত মাটির নিচে দাবিয়ে দিচ্ছে। লেজে পেঁচিয়ে আবার টেনে তুলছে। আবার মারছে আছাড়। বুড়ির চিৎকারে গোরস্তানের মুর্দারা জেগে উঠছে বারবার।
পারভিন আবারও শুনতে পেল মাইকের আওয়াজ, ‘দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন। আমরা কিন্তু গুলি চালাতে বাধ্য হবো।’ সুইসাইডাল ভেস্টে হাত রাখে পারভিন। তাগুতি শক্তির হাতে মৃত্যুর চেয়ে আত্মহত্যা উত্তম। জান্নাত নিশ্চিত। মোফাজ্জেল হোসেন তো আর মিথ্যে বলেনি। কত বড় মুজাহিদ সে। আফগানিস্তানে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা মুজাহিদ। জেহাদের ময়দানে নিজচোখে দেখেছে হাজার হাজার রহমতের ফেরেশতা। সে কি মিথ্যা বলতে পারে? প্রত্যেক মুজাহিদের জন্য নিশ্চয়ই জান্নাতুল ফেরদৌস বরাদ্দ করে রেখেছেন দুই জাহানের মালিক।
প্রায় এক ঘণ্টা পর আবার ভেসে এলো মাইকের আওয়াজ। আবারও একই আহ্বান, ‘দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন।’ ঘাড় উঁচু করে চারদিকে তাকায় পারভিন। তাগুতি শক্তির গোলাম সৈন্যদের দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। মনে মনে বলে, ‘তোমরা ভাবিচ্চো ক্যাংকা করে, কাফেরেগেরে কাচে হামি ধরা দিমো?’ তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে―আচ্ছা, পৃথিবীতে কাফেরের সংখ্যা কত? মোফাজ্জেল হোসেন একদিন বলেছিল, সারা দুনিয়ায় মোট মানুষের সংখ্যা ৭৪০ কোটি, মুসলমানের সংখ্যা ১৬০ কোটি। তার মানে পৃথিবীতে ৫৮০ কোটি মানুষ কাফের! পারভিনের অবাক লাগে। গোটা দুনিয়াটাই তো কাফেরে ভরা! এত এত কাফের দোযখের আগুনে জ্বলবে! দোযখের মালিক কি এতই নিষ্ঠুর? তিনি কেন এত এত মানুষকে কাফের করে রেখেছেন? তার তো অসীম ক্ষমতা। তিনি তো চাইলেই সবাইকে মুসলমান বানিয়ে দিতে পারেন। তিনি তো চাইলেই তার পেয়ারা মুমিনদেরকে সারা দুনিয়ার মসনদের অধিকারী করে দিতে পারেন। কেন করেন না?
কখনও আকাশের দিকে, কখনও আমতলার দিকে তাকিয়ে, কখনো-বা চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ বসে থাকে পারভিন। বসে থাকে টানা দেড় ঘণ্টা। তারপর হঠাৎ আমতলার দিকে তাকিয়ে দুই ছেলেকে আর দেখতে পায় না। বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। কোথায় গেল তারা? মেরে ফেলল না তো! সুইসাইডাল ভেস্টেটা ধরে সে উঠে দাঁড়ায়। আবার ভেসে এলো মাইকের আওয়াজ। আত্মসমর্পণের আহ্বান। ধীর পায়ে সে আকরামউল্লাহর লাশের দিকে এগোয়। আকরামউল্লাহর শরীর থেকে রক্ত ঝরা থেমে গেছে। এক সারি পিঁপড়া তার পিঠ বেয়ে নাড়িভুঁড়ির দিকে নামছে। থুতু জমে গেল পারভিনের মুখে। নিজের অজান্তেই থুতুর দলাটা নিক্ষেপ করল আকরামউল্লাহর মুখে। দলাটা পড়ল আকরামউল্লাহর কানের ফুটোয়।
পারভিন সামনে এগোয়। কয়েক হাত দূরে আবিদার লাশ। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। ভ্রু দুটি কুঁচকানো। কামিজ ছিঁড়ে একটা স্তন বেরিয়ে আছে। বোঁটাটা স্পিøন্টারে উড়ে গেছে। তার লাশ ডিঙিয়ে পারভিন তার স্বামীর লাশের সামনে এসে দাঁড়ায়। চিৎ হয়ে পড়ে আছে শফিউল। নেংটো। লুঙ্গিটা উঠে আছে কোমরে এবং পৌরুষটা কুঁকড়ে আছে। ক্ষতবিক্ষত ডান হাতটা ঝুলে আছে চামড়ার সঙ্গে। বাঁ চোখ থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। গলা খাকারি দিয়ে মুখে থুতু জমা করে পারভিন। দলাটা সজোরে নিক্ষেপ করে শফিউলের গালে। শফিউলের হাঁ করা মুখের উপর পড়ল দলাটা। ঠোঁট দুটো কুঁচকে পারভিন বলল, ‘হারামির বাচ্চা!’
আবার হাঁটা ধরে পারভিন। ধীর পায়ে, মাঠের দক্ষিণ দিকে। আবারও ভেসে এলো মাইকের আওয়াজ, ‘আত্মহত্যা মহাপাপ, দ্রুত আত্মসমর্পণ করুন। আমরা আপনার কোনো ক্ষতি করব না।’ পারভিন থামে না। ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে। দূর থেকে আবারও ভেসে এলো গানের সুর, ‘এখানে আম কুড়াবার ধুম লেগেছে।’ ভেসে এলো, না তার বুকের ভেতর বাজল? পারভিন কান পাতে। কিন্তু না, গানটা আর শুনতে পায় না।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়ায়। ভেস্টে হাত রাখে। দুই হাত বুলায় ভেস্টের ওপর। সেই একইভাবে―গর্ভের সন্তানকে আদর করার ভঙ্গিতে। তারপর দূরের আমগাছটার দিকে তাকাল। দুই হাতের তালুয় মুখ মুছল। আবার ভেস্টে হাত রাখল। সতর্ক হাতে ভেস্টটা খুলে হাতে নিয়ে শফিউলের লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেস্টটা রাখল শফিউলের পেটের ওপর। তারপর দক্ষিণে সরে এসে আমগাছটার দিকে ফিরে দাঁড়াল। দখিনা বাতাসে উড়তে লাগল তার লম্বা চুল। কী শাঁই শাঁই বাতাস! বাতাসে ভেসে আসছে আ¤্রপালি বা আমরুপালির ঘ্রাণ। চোখ বন্ধ করে পারভিন। হাত দুটো ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকে। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে, কিংবা পাখি কিংবা বিমানের ডানার মতো, কিংবা ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মতো সে দু-হাত দুদিকে ছড়িয়ে দেয়। তার বুক ভেঙে কান্না আসে। সে কাঁদতে শুরু করে। দুই গাল বেয়ে ঝরে পড়তে থাকে নোনা অশ্রুর ধারা।

Category:

নিজের প্রজ্বলিত আগুনে নিজেই পুড়ছে বিএনপি

Posted on by 0 comment
53

তারেক জিয়া! ‘হাওয়া ভবন’ খ্যাত এই নেতার নৈতিকতা ও সৎ সাহস থাকলে আইনানুগভাবে দেশে ফিরে এসে সাহসের সাথে মামলা মোকাবিলা করা দরকার। যদি তিনি তা না করেন এবং খালেদা জিয়াও দেরি করতে থাকেন, তবে ঘরোয়া রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে এতিম বিএনপির কপালে নিঃসন্দেহে আরও দুঃখ আছে।

শেখর দত্তঃ ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ কথাটা প্রথম দেশবাসী শোনে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে। ১৯৭৬ সালের ৩০ জুলাই ক্ষমতা পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করা এবং জাতীয় মূলধারার রাজনীতিকে উৎপাটন করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ঘরোয়া রাজনীতি চালু করেন। ঘরোয়া রাজনীতির মধ্যেই তিনি একে একে রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য লাইসেন্স প্রদানের সামরিক ফরমান জারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা, স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ, হ্যাঁ-না ভোটে তথাকথিত নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, নিজস্ব দল গঠন প্রভৃতি করতে থাকেন। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানি আমলে সেনাশাসক আইয়ুব খানও একই লক্ষ্যে ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ কথাটা উচ্চারণ না করে একই কায়দায় হ্যাঁ-ভোট না-ভোট, দল গঠন প্রভৃতি করে অগ্রসর হয়েছিলেন। অদৃষ্টের পরিহাস হচ্ছে এই যে, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর আইয়ুব খানের দল কনভেশন মুসলিম লীগ এবং আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঢাকা এলেও ঘরের ভেতরেই রাজনীতি করতে বাধ্য হয়েছিল। এখনও সেই অদৃষ্টের পরিহাস। পাপ আসলে কাউকে ছাড়ে না। প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এখন জেনারেল জিয়ার দল বিএনপিকেও ঘরের ভেতরেই রাজনীতি করতে হচ্ছে।
আরও একটি পরিহাসের মধ্যে রয়েছে বিএনপি। এটা তো কারোরই অজানা নয় যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সভাপতি বা চেয়ারম্যান দলের কাজ ব্যতিরেকে দীর্ঘদিন যদি বিদেশ থাকেন, তবে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বা চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হয়। খালেদা জিয়া যেহেতু অসুস্থ বলে প্রচার করা হচ্ছে, তাই তা আরও বেশি জরুরি। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, বিএনপির এখন দেশে কার্যত কোনো সভাপতি নেই। হেডকোয়ার্টার কোথায়, ঢাকা না লন্ডন কেউ বলতে পারবেন না। একটু খেয়াল করলেই স্মরণে আসবে যে, দলটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত চলছিল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দিয়ে। পরে অবশ্য ভারমুক্ত হয়ে ওই পদ পেয়েছেন বর্তমান মহাসচিব। এখন বিএনপির চেয়ারপারসন ও এক নম্বর ভাইস চেয়ারম্যান কেউ দেশে নাই। কবে কে আসবেন তাও জানা যায় না। এতদসত্ত্বেও বিএনপি কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করতে পারছে না। এমন সব তেলেসমাতি কা- যে হচ্ছে, তা কি দলের সিনিয়র কোনো নেতার প্রতি তাদের আস্থা নাই বলে না-কি একজনকে ভারপ্রাপ্ত করলে আরেকজন বেজার বা বিক্ষোভ প্রদর্শন করবেন বলে। কে জানে কোনটা সত্য! আসলে বিএনপি দলটি যেন এখন এতিম আর তাই চলছে অদ্ভুত উটের পিঠে! জনতার ভেতর থেকে নয়, বিএনপি দলটি গঠিত হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের মাথাকে মাথায় নিয়ে। আর এখন মনে হচ্ছে মাথাই নেই।
কোনো দলের যদি মাথা চলে যায় বিদেশের ঘরের মধ্যে, আর রাস্তায় যদি তৃণমূল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের পা না পড়ে, তবে অবস্থা যেমনটা হতে পারে, তেমনি অবস্থা হয়েছে বর্তমান দিনগুলোতে বিএনপির। যেন ধানের শীষও নেই আবার ধান গাছের গোড়াও নেই। তাই যে কোনো ইস্যুতে বিএনপির কথাবার্তা ও আচরণে টালমাতাল অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। কে কখন কি বলেন বা বলবেন, তার যেন কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশে না থাকায় কিংবা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন না থাকায় এবং বিদেশে চেয়ারপারসন নীরব-নিশ্চুপ থাকায় বিএনপি আছে শনিরদশায়। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার ক্ষমতা এক ধমকে ছেড়ে দেওয়ার পর এমন অবস্থায় বিএনপির যে দশা হয়েছিল, এখন আবারও পড়েছে সেই অবস্থায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুর কথাই ধরা যাক। রোহিঙ্গা প্রবেশের ইস্যু নিয়ে বিএনপির নেতারা একবাক্যে প্রথমে বলেছেন যে, রোহিঙ্গাদের প্রথমে ঢুকতে বাধা দিয়ে অমানবিক কাজ করেছে সরকার। পরে জনমতের চাপে পড়ে তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়। আর সবশেষে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ৩০ সেপ্টেম্বর হান্নান শাহের মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘যখন মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের পাঠানো শুরু করলো বাংলাদেশের ভেতরে, তখন যদি আমাদের সরকার একটা কঠিন অবস্থান নিতো যে একজন রোহিঙ্গাও ভেতরে ঢুকতে পারবে না,… তবে মিয়ানমার সরকারের সাধ্য ছিল না তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর।’ কেমন ডিগবাজি পাঠক লক্ষ করুন। প্রথমে ছিল প্রবেশ করতে না দেওয়ার অভিযোগ আর এখন সরকারের ওপর প্রবেশের জন্য দোষ চাপাচ্ছে বিএনপি। কোনটা বিএনপির কথা কে জানে!
আরও একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেক নেতাই বলেছেন, কূটনীতিতে সরকার ব্যর্থ। জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস করাতে পারে নি। যে সব দেশ মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে, তাদের কাছে সরকার প্রতিনিধি পাঠাতে পারে নি। ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে মির্জা আব্বাস ভারত সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কারও আমাদের পাশে থাকার দরকার নেই। এখন ইস্যু হলো মিয়ানমার ইস্যু, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ইস্যু।’ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য বিশ্বের সব দেশের সমর্থন ও সহযোগিতার প্রয়োজন আছে না-কি নাই? বিএনপির এক মির্জা বলছেন প্রয়োজন আছে আর এক মির্জা বলছেন নাই। কোনটা বিএনপির কথা, এটা কি এখন সুস্পষ্ট করে বলতে পারবেন কেউ?
বিএনপি এখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২২ সেপ্টেম্বর কাজী জাফর আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘সরকার রোহিঙ্গা সংকট যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। এক্ষেত্রে তারা জাতীয় ঐক্যও তৈরি করতে পারেনি।… এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে।’ একই সভায় বিএনপির থিংকট্যাঙ্কের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা বড় সমস্যা নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়।’ তিনি ‘আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরে’ বৃহৎ শক্তির শক্তি পরীক্ষা তথা ‘আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিকে’ বড় ও প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছেন। একই সভায় ওই দুই বিপরীত প্রান্তের কথা এবং নেতাদের বিশেষত দুই মির্জার কথা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, রোহিঙ্গা নিয়ে সমস্যা সংকট কতটুকু কি, তা নিয়ে বিএনপির ভেতরেই মতদ্বৈততা রয়েছে। নিজেদের মধ্যে মতদ্বৈততা রেখে জাতীয় ঐক্যের কথা বলা আর হাসির খোরাক জোগানো একই।
প্রসঙ্গত, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও বিকল্প ধারা সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমুখরাও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন। কিছু হলেই তারা জাতীয় ঐক্যের কথা তোলেন। এটাই স্বাভাবিক। বিগত নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি-জামাত জোটের সাথে মিলে যারা ভোট বয়কট করেছেন, তাদের মুখে বিএনপির শেখানো বুলি বলাই সংগত। প্রশ্ন হলো, জাতীয় ঐক্যের স্লোগান না তুলে তারা তো প্রথমে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে পারেন। বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় ঐক্যজোটে যদি গণফোরাম, বিকল্প ধারা প্রভৃতি দল যোগ দেয়, তবে তো ষোলোকলা পূর্ণ হয়। বদরুদ্দোজা চৌধুরী তো আগের অপমান গায়ে না মেখে কিছুদিন আগেও বিএনপি জোটের দিকেই পা বাড়িয়েছিলেন। এখন আবার বাইরে এসে এমনটা বলার উদ্দেশ্য কি? জোটে পুরোপুরি যোগ দিলেই তো সবটা চুকে যায়। কেননা যা আছে ভেতরে ভেতরে বা পরোক্ষ, তা প্রকাশ্যে আসে। জনগণের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যায়। আসলে জামাতকে আবারও জাতে তোলার কতই না প্রচেষ্টা!
ভাবতে অবাক লাগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জামাতকে সাথে নিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা বলছেন। অথচ এটা সুস্পষ্ট যে, জামাত দলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এখনও স্বীকার করেনি। মানবতাবিরোধী যুদ্ধবিরোধী কাদের মোল্লার বিচারে ফাঁসি হওয়ার পর পাকিস্তান পার্লামেন্টের বক্তব্য এবং প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধ বাধানোর উসকানি থেকে প্রমাণিত হয়, পাকিস্তানি কানেকশন পূর্বাপর বিএনপি-জামাত জোটের রয়েছে। সর্বোপরি রাজখোর ও অনুপ চেটিয়া গংদের জন্য বাংলাদেশের মাটিকে অভয়ারণ্য করা হয়েছিল যে পাকিস্তানের আইএসের সাথে সংযোগ করে এটাও আজ সুস্পষ্ট। একাত্তরের পরাজিত শত্রু যারা পাকিস্তানের সাথে কানেকশন রেখে বা হাত মিলিয়ে রাজনীতি করতে চায়, যারা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াতে মরিয়া; তারা হয় ‘পাগল’ অর্থাৎ জাতে মাতাল তালে ঠিক অথবা ‘শিশু’ অর্থাৎ এখনও সবটা বুঝে উঠতে পারে নাই। কোনটা বিএনপি তা এখন খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকেই ঠিক করতে হবে!
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আরও বলেছেন, এই ইস্যুতে ‘সরকার ব্যর্থ’ এবং ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া না-কি তাদের যথাযথভাবে আশ্রয় দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল। এদিকে রুহুল কবির রিজভী শরণার্থী শিবির ঘুরে এসে জিয়া ও খালেদা জিয়া আমলের প্রশংসায় গদগদ হয়ে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে বলেছেন, ‘এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে নাই। দিশেহারা রোহিঙ্গারা ছুটোছুটি করছে।’ লক্ষণীয় এই যে, সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসায় সারাবিশ্ব যখন পঞ্চমুখ, তখন বিএনপি এসব কথা বলছে। অথচ এরাই আবার বলছে, যেমন মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষায় ‘রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তার দল রাজনীতি করবে না।’ রাজনীতি তো তারা করছেন। নতুবা রিলিফ নিয়ে ছুটোছুটি দলের নেতারা করছেন কেন? প্রসঙ্গত, বিএনপি নেতারা জিয়া আমলে রোহিঙ্গা শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় গদগদ ভাব দেখে তথ্য-উপাত্ত খুঁজে দেখতে সচেষ্ট হই। দেখলাম ১৯৭৮ সালের ৮ মে একদিনেই কলেরায় ৫০ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছিল।
আর ২৮ মে বার্মা যখন গুনফুম সীমান্তে গুলিবর্ষণ করেছিল তখন কি করেছিলেন তখনকার সেনাশাসক জিয়া। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দ্রুততার সাথে ৭ জুন রেঙ্গুন ছুটে গিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা তাদের সাথে আলোচনা করেছিল। আর এবার! কূটনৈতিক তৎপরতা যথাযথ হওয়াই কয়েক দিনের মাথায় ছুটে এসেছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলের অং সান সু চি’র দফতরের মন্ত্রী কিউ টিন্ট সোয়ে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসানের জন্য মিয়ানমারকে চুক্তির একটি খসড়া বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে। মিয়ানমার শরণার্থী ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে বলেও জানা যায়। সর্বোপরি দুই দেশের একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে। ক্ষুদ্র এ কলামে তখন কূটনৈতিক তৎপরতায় জাতিসংঘ কতটা সক্রিয় ও সরব ছিল আর এখন কতটুকু তা এখানে তুলে ধরা হলো না। সবশেষে এটুকুই বলা যায়, বিএনপির দুই আমলে যদি শরণার্থী সব ফেরত পাঠানোই হয়, তবে দেড় লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে আগে থাকতেই ছিল কীভাবে? কীভাবে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে! বিএনপি আসলে অভিভাবক হারা হয়ে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় রয়েছে। আর তাই কাচের ঘরে বসে ঢিল ছুড়ছে।
বিএনপি আজ আসলেই কতটা হতচ্ছাড়া অবস্থায় আছে তা বুঝা যাবে, এবারের দুর্গাপুজোয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য বিবেচনায় নিলে। ২৯ সেপ্টেম্বর নেত্রী খালেদা জিয়ার শুভেচ্ছা বাণী বহন করে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, দেবী দুর্গা অবির্ভূত হয়েছিলেন পৃথিবীতে অসুরকে পরাজিত করার জন্য, অন্যায়কে পরাজিত করার জন্য, সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। দেবী দুর্গা পরাজিত করেছিলেন অসুরকে, অসত্যকে, অসুন্দর ও অন্যায়কে। সেজন্য দুর্গাপূজা সকলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূজা।’ সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন একজনের কাছে শুনেছি, এমন বক্তব্যই দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। ‘বিশ্বাস করি’ ও ‘সকলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ কথাগুলো কি তিনি মনে থেকে বলেছেন? অতীত কি বলে? এই কথাগুলো কি জামাতসহ ২০-দলীয় জোট বন্ধুদের কানে পৌঁছেছে? নেত্রী খালেদা জিয়া কি দেখেছেন পত্রিকা পড়ে কি বাণী তার মহাসচিব বহন করে নিয়ে গেছেন। উল্লিখিত কথায় সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে আমার খুশি হবারই কথা। কিন্তু খুশি হবেন কি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষেরা! জানি না। তবে এটুকু জানি, আমাদের জাতীয় অবস্থান হচ্ছে দেবী পূজা ও আরাধনার দিকটা হিন্দু সম্প্রদায়ের আর উৎসবের দিকটা সকল জনগণের। মাথা নেই, নেই পায়ের তলায় মাটি। আর তাই বক্তৃতা-বিবৃতিতে সব কিছু হ-য-ব-র-ল বানিয়ে ফেলছে দলটি। এ রকম করতে থাকলে শ্যাম ও কূল দুই-ই হারাবে বিএনপি।
প্রসঙ্গত, কাজী জাফর আহমদের ওই শোকসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন যে, ‘বিএনপি সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দেশপ্রেমিক দল। তাই সরকার বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা চায় না। কোনো কিছুর বিনিময়ে এই দল জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেবে না।’ প্রতিনিয়ত এমন কথা বলা হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। বারবার এমন ধরনের কথা বলার অর্থ হচ্ছে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না প্রবাদের মতো। আসলে বিএনপি প্রতিনিয়ত বুঝাতে চাইছে তারা সমঝোতা চায় কিন্তু সরকারি জোট সমঝোতা চায় না। বিএনপি আসলে মানুষকে বোকা ভাবে। সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি জাতীয় স্বার্থ ঊর্র্ধ্বে তুলে ধরে নির্বাচনে বিএনপিকে না আনতে চাইতেন, তবে বিগত নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করতেন না। আর টেলিফোনে খারাপ ব্যবহার করার পরও পুত্র কোকোর মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে খালেদা জিয়ার বাসার মতো অফিসে যেতেন না।
প্রকৃত বিচারে বিএনপি সমঝোতা চায় না। অস্থির ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিজের নাক কেটে হলেও অবৈধ শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চায়। সার্বিক বিচারে জামাত ও উগ্রবাদীদের সাথে জোট বেঁধে বিএনপি একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চায়। এটা কার না জানা যে, প্রতিশোধ স্পৃহা আর হত্যা-খুনের রাজনীতি থেকে কখনও ভালো ফল আশা করা যায় না। এমন রাজনীতির ফল হচ্ছে, আগুন নিয়ে খেলা এবং নিজের ধ্বংস ডেকে আনারই নামান্তর। সবশেষে বিগত নির্বাচনের সময়ে আর সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে নির্বাচন বয়কট করে নাশকতার পথে গিয়ে, আগুন সন্ত্রাস নিয়ে নিরীহ মানুষ ও পুলিশ মেরে বিএনপি আসলে যে আগুন জ্বালিয়েছে; সেই আগুনেই এখন দ্বগ্ধ হচ্ছে দলটি। যদি তেমনটা না হতো তবে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডন গিয়ে এতদিন চিকিৎসার নামে নীরবে ঘরে বসে থাকতেন না। আর তারেক জিয়াকে পালিয়ে লন্ডন থাকতে হতো না।
সবশেষে এটাই বলি রাজনীতিকদের পালিয়ে বিদেশ চলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহ্যের সাথে খাপ খায় না। ওটা পাকিস্তানি রাজনীতির ধারা। আমাদের ঐতিহ্য হচ্ছে সাহসের সাথে দেশে থেকে যৌক্তিক ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। পাকিস্তানি আমলে আমাদের জাতীয় রাজনীতির মূলধারার নেতারা আত্মত্যাগের সেই পথই আমাদের দেখিয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ১/১১-এর জরুরি আইনের আর্মি ও সুশীল সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বিদেশ থেকে স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন। আর উল্টো দিকে পাকিস্তানি আমলে সেনাশাসক প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা পালিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি হোটেলে কাজ করতেন বলে জানা যায়। তারেক জিয়া এখন কীভাবে অর্থ জোগাড় করে বিদেশে থাকছেন, মা খালেদা জিয়াকে কীভাবে চিকিৎসা করাচ্ছেন এবং হঠাৎ নীরব হয়ে তলে তলে কি করছেন, তা নিয়ে নানা গুজব এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে। এদিকে খালেদা জিয়ার দেশে ফিরে আসা নিয়েও নানা গুজব ধূমায়িত হচ্ছে। খালেদা জিয়া দলীয় নেতা-কর্মীদের এতিম বানিয়ে বিদেশে থেকে যাবেন বলে মনে করি না। শেষ বয়সে এতটা নিষ্ঠুর হবেন বলে মনে হয় না।
কিন্তু তারেক জিয়া! ‘হাওয়া ভবন’ খ্যাত এই নেতার নৈতিকতা ও সৎ সাহস থাকলে আইনানুগভাবে দেশে ফিরে এসে সাহসের সাথে মামলা মোকাবিলা করা দরকার। যদি তিনি তা না করেন এবং খালেদা জিয়াও দেরি করতে থাকেন, তবে নিজেদের সৃষ্ট ঘরোয়া রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে এতিম বিএনপির কপালে নিঃসন্দেহে আরও দুঃখ আছে।

Category:

‘রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমার দোষী সাব্যস্ত’

Posted on by 0 comment

উত্তরণ প্রতিবেদনঃ রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে মিয়ানমার সরকারকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্থায়ী গণ-আদালত গত ২২ সেপ্টেম্বর এই প্রতীকী রায় ঘোষণা করেছে। একই সাথে মিয়ানমারে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে অবিলম্বে দেশটির ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি, মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাব জব্দ, মিয়ানমারের বাইরে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি-সহ মোট ১৭-দফা সুপারিশ করেছেন এই আদালত। মালয়েশিয়াভিত্তিক দ্য স্টার অনলাইনের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত সাত সদস্যের বিচারক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। তারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, কাচিন ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০০ নির্যাতিত মানুষের সাক্ষ্য, ডকুমেন্টারি এবং বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনা করে এই রায় ঘোষণা করেছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ইন্টারন্যাশনাল পার্মানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালে এই বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে গঠন করা এই ট্রাইব্যুনালে গত পাঁচ দিন ধরে টানা শুনানি চলে। প্রধান বিচারক ড্যানিয়েল ফিয়েরেস্টেইন এই রায় পড়ে শোনান। যিনি আর্জেন্টিনার সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা। ফিয়েরেস্টেইন বলেন, মিয়ানমার সরকার গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীকে কাচিন ও মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে। অন্য বিচারকরা হলেনÑ মালয়েশিয়ার জুলাইহা ইসমাইল, কম্বোডিয়ার আইনবিদ হেলেন জার্ভিস, অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মেকুইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক প্রধান জিল এইচ বোয়েরিঙ্গার, ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী নুরসিয়াবানি কাতজাসুংকানা, ইরানের মানবাধিকার আইনজীবী সাদি সদর ও ইতালির সুপ্রিমকোর্ট অব ক্যাসেসনের বর্তমান সলিসিটর জেনারেল নিলো রেসি।
বিচারক গিল এইচ বোয়েরিঙ্গার কয়েকটি সুপারিশ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে মিয়ানমারকে মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস অভিযান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা, কাচিন ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার তথ্য জানতে জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান দলকে অবশ্যই সে দেশে ভিসা এবং সহজে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিপীড়িত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বিলোপ করে মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

Category:

বাংলাদেশে বন্যা-পরবর্তী চাষাবাদ

Posted on by 0 comment

50রাজিয়া সুলতানা: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই নির্দিষ্ট সময়ে কিংবা কখনও কখনও অনভিপ্রেতভাবে বন্যা দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়। চলতি বছরও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে বাংলার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই বাঁচতে শিখেছে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে কৃষিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগও নতুন নয়। বরং সরকার এক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বন্যা-উত্তর কৃষি চাষাবাদের পথ-পরিক্রমা সাজিয়ে দিচ্ছে। ফলে বন্যার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও অল্প সময়ের মধ্যে তৃণমূলের কৃষকরা পুষিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে। সেই সাথে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা সাহায্য-সহযোগিতা, কৃষকদের অনুপ্রাণিতকরণে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নানা কার্যকরী পদক্ষেপ সেই পালে হাওয়া লাগাচ্ছে।
কৃষি প্রধান বাংলাদেশ। এদেশে কৃষক তার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নিরলসভাবে মাঠে কাজ করে। কৃষিতে সে বিনিয়োগ বাড়ায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বন্যার পর এদেশে বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি ও উদার সহায়তার কারণে স্মরণকালের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে কৃষি খাতে।
51এ বছর বাংলাদেশে বন্যা হয়েছে দুই পর্বে। প্রথমত; এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকে আগাম বন্যা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক জায়গাই ভেসে গেছে। মেঘালয় ও ত্রিপুরার পাহাড়ে আর বারাক উপত্যকায় অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে এই বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল। এতে ভেসে গেছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। আর দ্বিতীয় দফা বন্যার কারণ ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে টানা ভারী বর্ষণ। যার চরম শিকার হয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল। ফলে ভেসে গেছে সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জসহ দেশের নানা অঞ্চল।
আবহমানকাল হতেই বন্যার ক্ষতি সীমাহীন। দুর্ভোগ অবর্ণনীয়। তবে এর উল্টো পিঠে আশীর্বাদও আছে। বন্যায় সাথে আসা পলি জমির ওপর পড়ে তাতে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহারের কারণে ক্ষতিকর কৃষি বিষয়সমূহও ধুয়ে যায়। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বন্যার পানিতে জমির উপকারী অণুজীবগুলোও ধুয়ে যায়। সেই সাথে বন্যায় তৃণমূলের মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। বাড়িঘর ভেসে যায়। ভেসে যায় অনেক স্বপ্নও। দেখা দেয় নানা রোগবালাই। অনেক ক্ষেত্রে খাবার পানীয়সহ খাদ্যের অভাব সৃষ্টি হয়। এসব মানবিক দুর্ভোগ-দুর্যোগ মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা সেই কষ্টের লাঘব করেছে। এমন কী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দফতরের ঈদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক বন্যা-ব্যবস্থাপনার অবস্থার তদারকি করা হচ্ছে। এক কথায় প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করেই সোনার বাংলার কৃষি এগিয়ে যাচ্ছে।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে নাবী জাতের রোপা আমন ধান যেমন নাজিরশাইল, বিনাশাইল, লতিশাইল, গান্ধিশাইল, টেপা ও মুকুটশাইল, বিআর-২২, ২৩, ব্রি ধান-৪৬ এসব জাতের চারা দ্রুত রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যার পানি নেমে গেলে বিনাচাষে কাদার ওপর লালশাক, মুলাশাক, পালংশাক, ধনিয়া এসবের বীজ ছিটিয়ে বুনে দিতে হবে। একটু সচেতন হলেই একই জমিতে একাধিকবার এসব ফসল আবাদ করা যায় এবং লাভবান হওয়া যায়। আগাম ফসল পাওয়ার জন্য পলিথিনের ছাউনিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, পাতাকপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো ও বেগুনের চারা তৈরি করে নেওয়া যায়, যাতে পানি নামার সাথে সাথে মূল জমিতে চারাগুলো রোপণ করা যায়। এ ছাড়া বিনাচাষে ভুট্টা, সরষে, গম, আলু, মাষকলাই, খেসারি, মটরশুঁটিও সরাসরি আবাদ করা যায়। রবি ফসলের একটা বিশাল অংশ দখল করে আছে আলু। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে জো থাকা অবস্থায় চাষ ও মই দিয়ে বীজ আলু বপন করতে হবে এবং কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
বর্তমানে ভাসমান শাক-সবজির চাষ বেশ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। পানিতে কচুরিপানা দিয়ে বেড তৈরি করে শাক আবাদ, সবজির চারা উৎপাদন এবং সবজির আবাদও করা যায়। ভাসমান পদ্ধতিতে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার হয় না বলে পণ্যের মানও হয় অনেক ভালো। যেখানে বন্যার পানি দেরিতে নামে সেখানে বন্যামুক্ত উঁচু জায়গায় বীজতলা তৈরি করা দরকার। উঁচু জায়গার অভাবে কলাগাছের ভেলা বা চাটাইয়ের ওপর কাদামাটি দিয়ে ভাসমান বীজতলা তৈরি করে দড়ির সাহায্যে খুঁটি বা গাছের সাথে বেঁধে রাখা যায়। ভাসমান বীজতলায় উৎপাদিত চারা দুই সপ্তাহের মধ্যে উঠিয়ে জমিতে রোপণ করা যায়।
ধান চাষের ক্ষেত্রে নাবি জাতের ধান বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি ধান-৪৬ নাজিরশাইল, বিনাশাইল, লতিশাইল, গান্ধিশাইল, পানিশাইল, মুকুটশাইলসহ স্থানীয় আমন ধানের বীজ ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজতলায় বপন করে চারা তৈরি করতে হবে।  বন্যার পানি সরে যাওয়ার পরপরই বীজতলার চারা জমিতে বপন করতে হবে এবং অনুমোদিত মাত্রায় সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। যদি কোনো কারণে চারা পাওয়া না যায় তা হলে স্থানীয় জাতের আউশ ধান যেমনÑ হাসিকলমি, সাইটা, গড়িয়া, গাইঞ্জা, পরাঙ্গির গজানো বীজ আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিটিয়ে বপন করা যাবে। সোনালি ফসল পাটের ক্ষেত্রে পাট গাছের ডগা কেটে মাটিতে পুঁতে দিলে এগুলো থেকে নতুন ডালপালা বের হয়ে তা থেকে মানসম্মত পাটের বীজ উৎপাদন হবে। বন্যার পানি নেমে গেলে বিনা চাষে গিমাকলমি, লালশাক, ডাঁটা, পালং, পুঁই, ধনে, ভুট্টা, সরষে, মাষকলাই, খেসারি, আলুও আবাদ করা যায়। শিম, লাউ এসব সবজি চারার গোড়ায় পানি এলে চারাগুলো মাটির পাত্রে বা কলার খোলে ভাসিয়ে রেখে পানি সরে গেলে আবার মাটিতে লাগিয়ে দেওয়া যায়।
বন্যার সময় ভাসমান বীজতলায় বা শুকনা জায়গার অভাব হলে টব, মাটির চাড়ি, কাঠের বাক্স, কাটা ড্রাম, প্লাস্টিকের ড্রাম, পুরনো টিন, পলিব্যাগ ও কলার ভেলায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, লাউ ও মরিচের আগাম চারা উৎপাদন করা যায়। তা ছাড়া বসতবাড়িতে উঁচু জায়গায় বা মাচা করেও সবজির চারা উৎপাদন করে পানি সরে গেলে রোপণের ব্যবস্থা করা যায়। বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর চাষ করা যায় বিনা বাধায়।
আবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির মাটি আলগা করে শুকনা ছাই এবং প্রয়োজনে অল্প মাত্রায় ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করে মাটির রস কমানো যায়। বন্যাকালীন সময়ে সংরক্ষিত বীজ রোদে শুকিয়ে ছায়ায় ঠা-া করে আবার সংরক্ষণ করতে হবে। রোপিত ফলের চারার গোড়ার পানি নিকাশের জন্য নালার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে গোড়ায় মাটি দিয়ে উঁচু করে সোজা করে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। গোড়ার মাটি শুকালে পরিমাণমতো সার দিতে হবে।
তুলা ফসলের ক্ষেত্রে বন্যার পর জমিতে জো আসা মাত্রই চাষ ও মই দিয়ে অথবা বিনা চাষে ডিবলিং পদ্ধতিতে তুলা বীজ বপন করতে হবে। প্রয়োজনে পলিব্যাগে বা বীজতলায় তুলা বীজের চারা তৈরি করে নেওয়া যায়। জমি থেকে পানি নেমে গেলে ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। আখের জমি বন্যায় প্লাবিত হওয়ার আগেই গোড়ায় মাটি দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে দিতে হবে। পানির ¯্রােতে আখের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে যথাসময়ে জমির আইলে ধঞ্চের বীজ বুনে দেওয়া ভালো। তাছাড়া পুরাতন পাতার প্রতি ঝাড়ে ৫-৬টি সুস্থ কুশি রেখে অতিরিক্ত কুশি কেটে দিতে হবে। গবাদি পশুকে যথাসম্ভব উঁচু জায়গায় রাখতে হবে। এদের বন্যার দূষিত পানি কিংবা পচা পানি খাওয়ানো যাবে না। বন্যার পানি নামার পরপর মাঠে গজানো কচিঘাস কোনো অবস্থাতেই গবাদি প্রাণিকে খাওয়ানো যাবে না। পুকুরের পাড় ডুবে গেলে ছোট ফাঁসযুক্ত জাল দিয়ে বা বাঁশের বেড় দিয়ে মাছ রক্ষা করতে হবে। পানি নেমে গেলে পুকুরের পাড় মেরামত ও জলজ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। বিঘাপ্রতি ১৫-২০ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হবে। তা ছাড়া মাছের খাবার, সার নিয়মিত ও পরিমিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। জাল দিয়ে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কৌশল

১. বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা আংশিক হয়েছে এমন জমির ক্ষেত্রেÑ
ক. বন্যার পানিতে ভেসে আসা কচুরিপানা, পলি, বালি এবং আবর্জনা যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার করতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ৫ থেকে ৭ দিন কাদাযুক্ত ধানগাছ পরিষ্কার পানি দিয়ে প্রয়োজনে স্প্রে মেশিন দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে।
খ. বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই সার প্রয়োগ করা ঠিক না, এতে ধানগাছ পচে যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার ১০ দিন পর ধানের চারায় নতুন পাতা গজানো শুরু হলে বিঘাপ্রতি ৮ কেজি ইউরিয়া ও ৮ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
২. উঁচু জমিতেÑ যেখানে বন্যার পানি ওঠেনি সেখানে রোপণকৃত বাড়ন্ত আমন ধানের গাছ (রোপণের ৩০ থেকে ৪০ দিন পর) থেকে ২ থেকে ৩টি কুশি রেখে বাকি কুশি সযতেœ শিকড়সহ তুলে নিয়ে অনতিবিলম্বে অন্য ক্ষেতে রোপণ করা যেতে পারে।
৩. নিচু জমিতেÑ যেসব এলাকায় বন্যায় উঁচু জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণে বীজতলা করা সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে ভাসমান অথবা ভাসমান বীজতলা তৈরি করে চারা উৎপাদন করা যেতে পারে।
৪. পানি নামার পরÑ বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ব্রি উদ্ভাবিত আলোক সংবেদনশীল উফশী জাত যেমনÑ বিআর-৫, বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৪৬, ব্রি ধান-৫৪ এবং নাইজারশাইলসহ স্থানীয় জাতগুলো রোপণ করতে হবে। এছাড়া ব্রি উদ্ভাবিত স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত ব্রি ধান-৫৭ ও ব্রি ধান-৬২ রোপণ করা যেতে পারে।
ক. উল্লিখিত জাতগুলো নাবিতে রোপণের ক্ষেত্রে প্রতি গোছায় চারার সংখ্যা ৪ থেকে ৫টি এবং রোপণ দূরত্ব ২০ গুণিতক ১৫ সেন্টিমিটার করতে হবে।
খ. বিলম্বে রোপণের ফলে দ্রুত কুঁশি উৎপাদনের জন্য সুপারিশকৃত টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক ও ইউরিয়া সারের ৩ ভাগের ২ ভাগ জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া রোপণের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে।
৫. পুনরায় বন্যাÑ যেসব এলাকায় পুনরায় বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম (উঁচু ও মধ্যম উঁচু) সেসব জমিতে অঙ্কুরিত বীজ সরাসরি জমিতে ছিটিয়ে বপন করা যায়। সেক্ষেত্রে রোপণ পদ্ধতির চেয়ে ৫ থেকে ৭ দিন আগে ফলন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৬. বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া ধান গাছের যাবতীয় পরিচর্যাÑ যেমন : আগাছা দমন, পোকামাকড় ও রোগাক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা, সুষম পরিমাণে সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. বন্যা-পরবর্তীÑ চারাগাছ সম্পূর্ণভাবে মাটিতে লেগে যাওয়ার সাথে সাথে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ৬০ গ্রাম পটাশ সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করতে হবে।
৮. বন্যা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাÑ বন্যার পরবর্তী সময়ে ধান গাছে মাজরা, বাদামি ও সাদা পিঠ গাছফড়িং, পাতা মোড়ানো এবং পামরি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পোকা বিশেষে হাত জাল, পার্চিং এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
৯. আগাম ফসলÑ দেশের উত্তরাঞ্চলে আগাম শীত আসার কারণে ১৫ সেপ্টেম্বর এবং মধ্য ও দক্ষিণ অঞ্চলে ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমন ধান রোপণ করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে আগাম রবি ফসলের আবাদ করা যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের কোনো হাত নেই। তবে সম্মিলিতভাবে সরকারের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলে আমরা অবশ্যই বর্তমান জোট সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ২০২৪ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে পারব।

লেখক : কৃষিবিদ ও সমাজকর্মী

Category:

৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা প্রদান

Posted on by 0 comment

33উত্তরণ প্রতিবেদন: নমনীয় চুক্তি বা ­তৃতীয় এলওসির আওতায় বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পাবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, রেলপথ, সড়ক, জাহাজ চলাচল, বন্দরসহ অবকাঠামো খাতের ১৭টি অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার। প্রথম দুটি এলওসির (লাইন অব ক্রেডিট) মতো এবারও এই ঋণের বিপরীতে ১ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ আগামী ২০ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এলওসির আওতায় একবারে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার দেওয়া ভারতের যে কোনো দেশকে দেওয়া সর্বোচ্চ ঋণ। এই চুক্তি বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি দুদেশের অর্থনীতি আরও সমন্বিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ভারতের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপির উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে তারা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শফিকুল আযম এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রাসকিনহা এই চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে অরুণ জেটলির বক্তব্য উদ্ধৃত করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন স্বর্ণযুগে অবস্থান করছে। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় তারা বাংলাদেশের পাশে ছিল। আগামীতেও তারা আমাদের পাশে থাকবে বলে আশা করছি। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে ঋণ প্রসঙ্গে কথা বলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি।
তিনি বলেন, গত সাত বছরে বাংলাদেশ ভালো প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অন্যান্য দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের উন্নয়নে আগেও পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। তারই ধারাবাহিকতায় এই বড় অঙ্কের ঋণচুক্তি করা হলো।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় বাংলাদেশের জন্য এই সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় অর্থমন্ত্রীর এবারের সফরে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি করা হলো। এর আগে ২০১০ সালে প্রথম লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয় ভারত। ওই ঋণের আওতায় নেওয়া ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ১২টির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া বাকি প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই ১০০ কোটি ডলারের ২০ কোটি ডলারকে পরবর্তীকালে মঞ্জুরি সহায়তায় রূপান্তর করা হয় এবং ২০১৫ সালে এলওসি ৮০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে উন্নীত করা হয়।
এছাড়া দ্বিতীয় ২০০ কোটি ডলারের এলওসি ঘোষণা করা হয় ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে। এতে বাস্তবায়নের জন্য ১৫টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয় এবং সেগুলো এখন বাস্তবায়নাধীন।
এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য এর আগে রাশিয়ার সাথে ১১৩৮ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। সেই হিসাবে ভারতের এই তৃতীয় এলওসি হচ্ছে বাংলাদেশের করা দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণচুক্তি।

জেটলির আশাবাদ
প্রকল্প বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা এবং জমি অধিগ্রহণ সমস্যা একটি বড় সমস্যা বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি তার বক্তব্যে বলেন, এসব সমস্যার কারণে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে তৃতীয় এলওসি চুক্তির আওতায় নেওয়া প্রকল্পগুলো যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন হয় সে ব্যাপারে ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অরুণ জেটলি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নের সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের দ্রুত অগ্রগতি দেখে তিনি খুবই সন্তুষ্ট। বাংলাদেশের এই উন্নয়নের অংশীদার হতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অর্থমন্ত্রী মুহিতের সাথে বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যা সাম্প্রতিককালে ক্রমবর্ধমান। ভারতের স্বার্থে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং আমরা আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ গভীর করতে, বাংলাদেশের সাথে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে অরুণ জেটলি বলেন, এর ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে রেকর্ড ৩৬টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানির বেশ কিছু বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অন্যান্য দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য একটি মডেলে পরিণত হয়েছে।
অরুণ জেটলি বলেন, তার দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে স্বল্প সুদে ৮০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার চুক্তি করেছে, যা কোনো দেশকে ভারতের দেওয়া সর্বোচ্চ ঋণ এবং এটি হ্রাসকৃত সুদে দেওয়া হয়েছে।
তিনি দুই দেশের এই উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে যোগাযোগকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেন। ভারতীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, সড়ক, রেল, নৌ ও উপকূলীয় জাহাজ চলাচলসহ ১৯৬৫ পূর্ব সংযোগ পুনরুদ্ধারে আমাদের দুই দেশের সরকার গুরুত্বারোপ করেছে। আমার বিশ্বাস, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং দুই দেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ সাহায্য করবে। তিনি বলেন, এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ঢাকায় কার্যালয় স্থাপন করতে যাচ্ছে। এতে প্রতিবেশী দুই দেশের উন্নয়ন অংশীদারিত্ব গতিশীল হবে এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়বে। তিনি বলেন, এসব অগ্রগতি দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসংযোগ ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতারই নিদর্শন।

ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, এর আগে নেওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি পরিলক্ষিত হলেও সেই সমস্যা দূর হচ্ছে। তৃতীয় এলওসি চুক্তির আওতায় নেওয়া প্রকল্পগুলো যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ঋণপ্রাপ্তি যাতে দ্রুত হয় সে ব্যাপারে দুদেশই আন্তরিক। তিনি বলেন, ভারতের সাথে সুসম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই সম্পর্কের কারণে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ ঋণ বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সুসম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ভারত থেকে নেওয়া ক্রেডিট লাইনের প্রথম পর্যায়ের ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ বাস্তবায়ন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। তবে তা প্রক্রিয়াধীন। এবার তৃতীয় ধাপের ঋণ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হবে। এ জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত এ ঋণের অর্থ ব্যয় হবে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। তিনি আরও বলেন, এ ঋণের সুদহার অনেক কম এবং ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখে ভারতের অর্থমন্ত্রী মুগ্ধ বলে জানিয়েছেন। তিনি জনিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অন্য দেশের জন্য মডেল হতে পারে।
চুক্তির আওতায় ১৭টি প্রকল্প
তৃতীয় এলওসির অর্থ দিয়ে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন, পায়রা বন্দরের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার ও তীর সংরক্ষণ, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নতকরণ, বেনাপোল-যশোর-ভাটিয়াপাড়া-ভাঙ্গা সড়ককে চার-লেনে উন্নীত করা, চট্টগ্রামে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, ঈশ্বরদীতে কন্টেনার ডিপো নির্মাণ, কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরি, মংলা বন্দর উন্নয়ন, চট্টগ্রামে ড্রাইডক নির্মাণ, মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত চার-লেনে সড়ক উন্নীত করা, মোল্লারহাটে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর হয়ে সরাইল পর্যন্ত চার-লেন সড়ক নির্মাণ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ১ লাখ এলইডি বাল্ব সরবরাহ প্রকল্প।
ঋণচুক্তির আওতায় এটিই হচ্ছে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বড় ঋণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সাথে ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের (বাংলাদেশের টাকায় যা প্রায় ৯২ হাজার কোটি) ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, আগের দুটি এলওসির মতো তৃতীয় এলওসির শর্ত একই। আগের দুটি এলওসিতে মোট সাড়ে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। ভারতীয় ঋণের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে অর্থ ব্যবহার করছে বাংলাদেশ। কিন্তু আগের সাড়ে ৩০০ কোটি ডলারের মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ডলার। সাত বছর আগে প্রথম ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় বাস্তবায়িত ৮টি প্রকল্পে ধীরগতি দেখা গেছে। সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ভারতীয় প্রথম ঋণে সাত বছর আগে খুলনা-মংলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি শুরু হয়। বর্তমানে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৪ দশমিক ১২ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো এবং এর অগ্রগতি ৮৩ শতাংশ। তবে ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল গেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ ও কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন প্রকল্পের তেমন অগ্রগতি নেই। অন্যদিকে ১২০টা ব্রডগেজ রেল কোচ প্রকল্পের অগ্রগতি ৯৬ শতাংশ। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) আধুনিকায়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ। আশুগঞ্জ-আখাউড়া রেললাইনের সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ৪৩ শতাংশ।

Category: