Blog Archives

হাসিখুশি রসরাজ ও তার পরিবার

46উত্তরণ ডেস্ক: ঠাকুর! আমি কিছু জানি না। আমি শুধু ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি। ঠাকুর! আমি কিছু জানি না! উঠানে বিছানো সরষে গাছের ওপর বসে উত্তরণ প্রতিনিধির কাছে এভাবেই তার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন বিনা অপরাধে ৮০ দিন কারাভোগের পর গত ১৭ জানুয়ারি দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া রসরাজ দাস। রসরাজ বলেন, আমাকে রিমান্ডে নিয়ে যাওয়ার পর ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননা ছবি পোস্ট দেওয়ার কথা জানতে পারি। এক প্রশ্নের জবাবে রসরাজ দাস বলেন, আমার এমন কোনো শত্রু নেই যে এই কাজ করতে পারে। আমি জাল বেয়ে জীবনযাপন করি। একান্ত আলাপচারিতায় রসরাজের মা নমিতা রানী দাস বলেন, আমার ছেলে ফিরা পাইছি আমি আর ঠাকুরের কাছে কিছু চাই না। রসরাজের বড় ভাই দয়াময় দাস বলেন, সামাজিকভাবে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আর রসরাজকে এখনও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ফেসবুক সম্পর্কে জানতে চাইলে রসরাজ দাস বলেন, আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না। তবে ফেসবুকে ছবি দেখার জন্য আমি আমার চাচাতো ভাইকে একটি ফেসবুক আইডি খুলে দিতে বলেছিলাম। গত ২৯ অক্টোবর ২০১৬ আমি বিলে মাছ ধরছিলাম। এমন সময় একদল লোক এসে আমাকে মারধর করে ধরে নিয়ে যায় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। চড়-থাপ্পড় কিল-ঘুষি দিয়ে মারতে মারতে ইউনিয়নে নিয়ে যাওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি কারাগারে। এর বেশি আমি আর কিছু জানি না।
উল্লেখ্য, ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের অবমাননাকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের মামলায় ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের দ্বিতীয় পুত্র রসরাজ দাসকে (৩০) গ্রেফতার করে নাসিরনগর থানা পুলিশ। এরপর গত ৮ নভেম্বর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে রসরাজের জামিনে শুনানি হয়। ওই সময় আদালত তার জামিন না মঞ্জুর করেন। ১৬ জানুয়ারি শুনানি শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন পুলিশে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করা পর্যন্ত সময়কালের জন্য বসবাসের জামিন মঞ্জুর করেন। মুক্তি পাওয়ার পর ফিরে এসেছে হরিণবেড় গ্রামে তার নিজ বাড়িতে। দীর্ঘ আলাপচারিতায় হাসিখুশি রসরাজ ও তার পরিবার। তাকে জামিন ও মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে যারা সহযোগিতা করেছেন সবার কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রসরাজ। রসরাজ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা আনীত অভিযোগ থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন করেন।
Ñকবিতা ভূঞা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

Category:

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুন মামলার রায় : ২৬ জনের ফাঁসি

45উত্তরণ প্রতিবেদন: নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামিকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। দুই মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে বাকি ৯ জনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদ-। নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন গত ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টা ৫ মিনিটে জনাকীর্ণ আদালতে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিহতদের স্বজনরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে বলে আশা রাষ্ট্রপক্ষের। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু আমরা চাই, এই রায় দ্রুত কার্যকর হোক। হাইকোর্টে যাতে এই রায় বহাল থাকে। চন্দন সরকারের মেয়ে সুস্মিতা সরকারও রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও বলেন, আসামিদের সাজা দ্রুত কার্যকর হোকÑ এটাই তাদের চাওয়া।
তিন বছর আগে নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দেওয়ার ওই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়।
আসামিদের অপরাধের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ অংশ বাদ দিয়ে কেবল সাজাপ্রাপ্তদের নাম ও দ-ের পরিমাণ পড়ে শোনান তিনি। রায় ঘোষণা শুরুর আগে বিচারক বলেন, সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হলেও রায়ের ফলাফল এক ও অভিন্ন। কেবল একটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হলে ‘স্বাভাবিকভাবে’ অন্যটি চলে আসবে। বিচারক বলেন, সাতজনকে অপহরণ, খুন, লাশ গুম, ষড়যন্ত্র ও আলামত নষ্টের অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে’ প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় দেওয়া হচ্ছে।
দ-প্রাপ্ত উপস্থিত ২৩ আসামি হলেন : মামলার প্রধান আসামি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি নূর হোসেন (মৃত্যুদ-), র‌্যাব-১১ এর সাবেক ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ (মৃত্যুদ-), মেজর আরিফ হোসেন (মৃত্যুদ-), লে. কমান্ডার মাসুদ রানা (মৃত্যুদ-), এসআই পূর্ণেন্দু বালা (মৃত্যুদ-), হাবিলদার এমদাদুল হক (মৃত্যুদ-) কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন (মৃত্যুদ-), আরওজি-১ আরিফ হোসেন (মৃত্যুদ-), ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া (মৃত্যুদ-), ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন (মৃত্যুদ-), সিপাহী আবু তৈয়ব (মৃত্যুদ-), আসাদুজ্জামান নূর (মৃত্যুদ-), নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল (মৃত্যুদ-), আলী মোহাম্মদ (মৃত্যুদ-), মিজানুর রহমান দীপ (মৃত্যুদ-), রহম আলী (মৃত্যুদ-), আবুল বাশার (মৃত্যুদ-), কনস্টেবল বাবুল হাসান (১০ বছর), ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন (১০ বছর), সৈনিক নুরুজ্জামান (১০ বছর), আবুল কালাম আজাদ (১০ বছর), এএসআই বজলুর রহমান (৭ বছর) ও হাবিলদার নাসির উদ্দিন (৭ বছর)।
দ-প্রাপ্ত পলাতক ১২ আসামিরা হলেন : নূর হোসেনের সহযোগী বর্তমানে ভারতের কারাগারে আটক সেলিম (মৃত্যুদ-), সানাউল্লাহ ওরফে সানা (মৃত্যুদ-), নূর হোসেনের ম্যানেজার শাহ্জাহান (মৃত্যুদ-), জামাল উদ্দিন (মৃত্যুদ-), সার্জেন্ট এনামুল কবীর (মৃত্যুদ-), সৈনিক আবদুল আলিম (মৃত্যুদ-), সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী (মৃত্যুদ-), সৈনিক আল আমিন শরীফ (মৃত্যুদ-), সৈনিক তাজুল ইসলাম (মৃত্যুদ-), কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান (১০ বছর), কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (১০ বছর), এএসআই কামাল হোসেন (১০ বছর)।
জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আসামিদের বিচার শুরু করেন। ৩৮টি কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৬৪ জনের সাক্ষ্য শুনে আদালত, যাদের মধ্যে ৬০ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেন। দুপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ৩০ নভেম্বর বিচারক ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রায়ের জন্য দিন ঠিক করে দেন।
সাত খুন : ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। একই সময়ে একই স্থানে আরেকটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার চালককে অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকায় শীতলক্ষ্যা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকের পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন; প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নিহত ৭ জন : নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম।

Category:

গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী জাহাঙ্গীর আলম গ্রেফতার

আবদুল আউয়ালসহ শীর্ষ জঙ্গিদের সংস্পর্শে এসে রাজীব গান্ধীও ভয়ঙ্কর জঙ্গি রূপে আবির্ভূত হয়। গুলশান হামলায় জড়িতদের মধ্যে একমাত্র রাজীব গান্ধীকেই জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।

43উত্তরণ ডেস্ক: গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে জীবিত এক পরিকল্পনাকারী সরকারের হাতে এখন। রাজীব গান্ধী ছিল ফাঁসিতে মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও তার জামাই আবদুল আউয়ালের পাঁচক। সে গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলা ছাড়াও অন্তত ২২ হত্যার সাথে জড়িত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে সে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। গুলশান হামলায় যারা অংশ নিয়েছিল তাদের দুজনকে নিয়োগ দিয়েছিল সে। হামলার সময় বসুন্ধরার বাসায় বসে পুরো ঘটনা মনিটরিং করে। এরপর সেখান থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পালিয়ে মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় আত্মগোপন করে। গ্রেফতারের পর রাজীব গান্ধীর কাছ থেকে বেরিয়ে আসছে গুলশান হামলাসহ বহু নৃশংস হত্যাকা-ের চাঞ্চল্যকর অজানা সব তথ্য।
গত ১৪ জানুয়ারি ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, ১৩ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টায় টাঙ্গাইল জেলার এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে (৩২) গ্রেফতার করা হয়। জাহাঙ্গীর আলম রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ ওরফে শান্ত ওরফে টাইগার ওরফে আদিল ওরফে জাহিদ নামেও পরিচিত। তার পিতার নাম মরহুম মাওলানা ওসমান গণি। মা রাহেলা বেগম। বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানাধীন পশ্চিম রাঘবপুরের ভূতমারা গ্রামে। শুভ নামে তার একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। ২০১৫ সালে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে হিজরত করে রাজীব। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছে সে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব গান্ধী গুলশান ও শোলাকিয়া হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পুলিশের অভিযানে নিহত জঙ্গি নেতা ও গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী এবং মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম ওরফে মারজানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাজীব। এ দুজনের সাথে গুলশান হামলার পরিকল্পনায় রাজীব সরাসরি জড়িত। সে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা। উত্তরবঙ্গের সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিল।
তারই সার্বিক পরিকল্পনায় জাপানি নাগরিক হোসি কুনিও হত্যা, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ারদার, পাবনার পুরোহিত নিত্যরঞ্জন পা-ে, রংপুরের মাজারের খাদেম রহমত আলী, কুষ্টিয়ার চিকিৎসক সানাউর, পঞ্চগড়ের পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর, দিনাজপুরের হোমিও চিকিৎসক ধীরেন্দ্র নাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা, শিয়া মসজিদে হামলা ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীসহ অন্তত ২২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হত্যাকা-ে রাজীব সরাসরি অংশ নিয়েছিল। বাকিগুলোতে অংশ না নিলেও সার্বিক পরিকল্পনা ও হত্যাকা- বাস্তবায়নে নানাভাবে হত্যাকারীদের সহযোগিতা করে।
রাজীব গান্ধী গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হওয়া মো. খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধন ও মো. শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশকে নব্য জেমএবিতে যোগদান করিয়েছিল। পরে তাদের গুলশান হামলার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছিল। সার্বিক পর্যালোচনা করে এ দুজনকে গুলশান হামলার জন্য বাছাই করেছিল রাজীব।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতে হামলাকারীদের একজন শফিউল ইসলাম ওরফে ডনকেও সেই নব্য জেএমবিতে যোগদান করিয়েছিল। তাকেও প্রশিক্ষিত করে হামলায় অংশগ্রহণ করিয়েছিল।
গুলশান হামলার এক সপ্তাহ আগ থেকে রাজীব স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ই ব্লকের ই-৩ নম্বর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি গিয়াস উদ্দিন আহমেদের বাড়িতে অবস্থান করছিল। বাড়িটি গুলশান হামলার অপারেশনাল হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাড়িটিতে হামলাকারীদের থাকার জন্য ভাড়া করে দেন এই মামলায় কারাবন্দি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিম। এ বাড়িটি থেকে বেরিয়ে গিয়েই হামলাকারীরা হলি আর্টিজানে হামলা চালায়। রাজীব সেই বাড়িতে অবস্থান করে গুলশান হামলার সার্বিক বিষয় সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে ও মনিটরিং করে। হামলা চালানোর পর রাজীব ওই বাড়ি থেকে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় চলে যায়।
গুলশান ও শোলাকিয়াসহ অনেক হামলার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে গত বছর ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার পালানোর সময় গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যানের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে। জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে রাজীব গান্ধীর নাম।
মনিরুল ইসলাম জানান, নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়ার আগে রাজীব গান্ধী জেএমবির শূরা সদস্য ডা. নজরুল ইসলামের সহযোগী ছিল। সে মূলত ২০০৪ সালে জেএমবিতে যোগ দেয়। ওই সময় সে ফাঁসিতে মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমানের মেয়ের জামাই আবদুল আউয়ালের পাঁচক ছিল। আবদুল আউয়াল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় (মুন্সিগঞ্জ বাদে) যুগপৎ বোমা হামলার বগুড়ার দায়িত্বে ছিলেন। জাহাঙ্গীর তার পাঁচক হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি বাইসাইকেলে জাহাঙ্গীর জঙ্গিদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করার কাজে জড়িত ছিল। জেএমবির যুগপৎ হামলায় আবদুল আউয়ালের নাম প্রকাশ পেলেও এতদিন গোপনেই ছিল রাজীব গান্ধীর জড়িত থাকার বিষয়টি। দীর্ঘদিন জঙ্গিদের সাথে কাজ করায় রাজীবের সাংগঠনিক তৎপরতা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, ভারতে অবস্থানরত মানিক ও মামুনুর রশিদ রিপনের সাথেও তার যোগাযোগ ছিল।
২০১১ সালে জেএমবি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। ওই সময় রিপন-মানিকের সাথে রাজীব কাজ করত। ২০১৪ সালের পর নব্য জেএমবির গঠন হলে রাজীবের যোগাযোগ হয় তামিম চৌধুরীর সাথে। সে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়।
আবদুল আউয়ালসহ শীর্ষ জঙ্গিদের সংস্পর্শে এসে রাজীব গান্ধীও ভয়ঙ্কর জঙ্গি রূপে আবির্ভূত হয়। গুলশান হামলায় জড়িতদের মধ্যে একমাত্র রাজীব গান্ধীকেই জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া গুলশান হামলার সাথে জড়িত আরও তিনজন পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট অন্যতম। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন, স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের উপ-কমিশনার প্রলয় কুমার জোয়ারদার, কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান ও মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
গত বছরের ১ জুলাই রাত সাড়ে ৮টায় জঙ্গিরা গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালায়। এ সময় বাধা দিতে গিয়ে নিহত হন বনানী থানার ওসি ও ডিবির সহকারী এক কমিশনার। এরপর জঙ্গিরা রেস্তোরাঁর ভেতরে ১৭ বিদেশি ও তিন বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরদিন সকালে জিম্মিদের উদ্ধার করে অভিযান চালায় সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা। অভিযানে গুলশান হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাসটিকার ছাত্র মীর সামেহ মোবাশ্বের, মোনাশ ইউনিভার্সিটির মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র নিবরাস ইসলাম এবং বগুড়ার শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল নিহত হয়। অভিযানে রেস্তোরাঁর পাঁচক সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন। তিনিও সন্দেহভাজন জঙ্গি ছিলেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা। পরবর্তীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রেস্তোরাঁর আরেক কর্মী জাকির হোসেনের মৃত্যু হয়। হলি আর্টিজানে হামলার সাথে জড়িতদের মধ্যে ১৩ জন বিভিন্ন সময় পুলিশের অভিযানে নিহত হয়। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় গুলশান হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ডের একজন নুরুল ইসলাম মারজান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুলশান হামলায় জড়িত পলাতকদের মধ্যে অন্যতম বাশারুজ্জামান চকলেট ও সাগর। সাগর গুলশান হামলায় ব্যবহৃত ভারত সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্রের চালানটি গ্রহণ করে। পরে তা ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছে দেয়। আর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বাশারুজ্জামান চকলেট মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফায় হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করে। টাকাগুলো গুলশান হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। বাশারুজ্জামানের স্ত্রী শায়লা আফরিন, মারজানের স্ত্রী প্রিয়তি ও তানভীর কাদেরীর স্ত্রী আবেদাতুন ফাতেমা এবং তার ছেলে আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেফতারের পরেও এমন তথ্য দিয়েছে।

Category:

উপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে উঠে আগামী দিনে নেতৃত্ব দিতে হবে

ছাত্রলীগ সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ এই দেশের প্রতিটি অর্জনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্রলীগের কত কর্মী মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন এই কথা মনে রাখতে হবে। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই ছাত্রলীগের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। কেননা ছাত্রলীগের ইতিহাসই হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস।

41উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের মাটিতে কোনো জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের স্থান হবে না। এর সাথে যারা জড়িত হবে তাদের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করে বিপথে চালিত করছে তাদেরও বিচার হবে। আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারীদের যারা মদত দেয়, লাখো শহীদের রক্ত¯œাত জাতীয় পতাকা তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলÑ বাংলার মাটিতে তাদেরও বিচার হতেই হবে।
গত ২৪ জানুয়ারি রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ছাত্রলীগকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, প্রতিটি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর প্রতি আমার নির্দেশ, তোমাদের নিজ নিজ এলাকায় যারা নিরক্ষর মানুষ আছে তাদের খুঁজে বের করে অক্ষর দান করবে। যাতে দেশের কোনো মানুষ নিরক্ষর না থাকে। আর রাজনীতির পাশাপাশি তোমাদের প্রধান লক্ষ্যই থাকবে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের গড়ে তোলা। কারণ তোমাদেরই আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে। আদর্শ-নীতি নিয়ে দেশ সেবার ব্রত নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি। যেহেতু ছাত্রলীগের নীতি হচ্ছে শিক্ষা শান্তি প্রগতি। কাজেই শিক্ষার আলো জ্বেলে প্রগতির পথ বেয়ে শান্তির পথ হয়ে প্রগতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দেশকে আমরা প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমরা আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছি। এটা যেন থেমে না যায়। তার জন্য ছাত্রলীগের প্রত্যেকটি নেতাকর্মীকে নিজেকে তৈরি করতে হবে। এই দেশ এই রাষ্ট্র পরিচালনায় একদিন তোমাদের মধ্য থেকেই কেউ না কেউ উঠে আসবে। কিন্তু সে সময় যেন আর পিছনে ফিরে যেতে না হয়। আমরা যেন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনই বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ নিয়ে সততা নিয়ে সংগঠন করার শপথ গ্রহণ করান সারাদেশ থেকে আগত ছাত্র নেতাদের।
ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইনের সঞ্চালনায় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি ও আরেক সভাপতি এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। এ সময় মঞ্চে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত জীবিত থাকা ছাত্রলীগের অধিকাংশ সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকই উপস্থিত ছিলেন। দলের এসব সাবেক নেতাদেরও ক্রেস্ট ও উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে সম্মান জানায় ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব।
বিকেল সাড়ে ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন তখন পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাত্রনেতাদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। প্রথমেই জাতীয় সংগীতের তালে তালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী, আর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উত্তোলন করেন সংগঠনের পতাকা। মঞ্চে উপবিষ্ট হওয়ার পরপরই ছাত্রলীগের থিম সংয়ের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত ‘পুরানো সেই দিনের কথা বলবে কী রে আয়’ গানের সাথে কণ্ঠ মেলান প্রধানমন্ত্রী নিজেও। এরপর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট ও উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। মঞ্চে উপবিষ্ট ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতাদের পরিচয় এবং তাদের ক্রেস্ট ও উত্তরীয় দিয়ে সম্মান জানানোর পরই শুরু হয় আলোচনা পর্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ অন্ধকার থেকে এখন আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। দেশ আজ সব দিক থেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই আলো ও প্রগতির পথে অগ্রযাত্রা যাতে থেমে না যায় সেজন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজেদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বসভায় আজ বাংলাদেশের যে মর্যাদা সৃষ্টি হয়েছে তাও সমুন্নত রাখতে হবে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নিয়েও অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু নিজস্ব অর্থায়নে যদি আমরা পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারি, তবে আমরা বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে পারব না কেন? আমরা প্রমাণ করেছি, আমরাই পারি। আমরাই পারব দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধশালী বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে। সেই আত্মবিশ্বাস আমাদের রয়েছে।
ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীদের বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধন-সম্পদ চিরদিন থাকে না। আদর্শ ও নীতি নিয়ে দেশকে কিছু দিতে পারাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। একমাত্র শিক্ষায় পারে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। আর ছাত্রলীগের নীতিই হচ্ছেÑ ‘শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি’। এটা মনে রেখেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। আমি নিজের ছেলে-মেয়েদেরও একটাই সম্পদ দিয়েছিÑ তা হলো শিক্ষা। শিক্ষাকে কেউ কোনোদিন হাইজ্যাক করতে পারবে না, কেড়ে নিতে পারবে না। শিক্ষা থাকলে সেটাই হবে তাদের চলার পাথেয়। অশিক্ষিতের হাতে দেশ পড়ে কী দূরাবস্থা হয়, ’৭৫ সালের পর থেকে দেশের মানুষ তা দেখেছে।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, খালেদা জিয়া যখন হুমকি দিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমি তখন ছাত্রলীগের হাতে কাগজ-কলম তুলে দিয়েছিলাম। তিনি বলেন, জাতির পিতা স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন। বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় আমরা যে মর্যাদা পেয়েছি সেই মর্যাদা আমাদের সমুন্নত রাখতে হবে। আমরা বিজয়ী জাতি। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা পারব এই বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। এটা আমরা পারব। এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমাদের চলতে হবে। পারব না এই কথা নয় বলেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২১ সাল আমাদের রূপকল্প ঘোষণা দিয়েছিলাম। এখন বাংলাদেশ নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে আছে। বাংলাদেশ নি¤েœ থাকবে না, ঊর্ধ্বে উঠবে। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ করতে পারব। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হবে। সেভাবেই আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলব। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হবে একটি শান্তির বাংলাদেশ। সেভাবে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই। জাতির পিতা বলেছিলেন বাংলাদেশ হবে সুইজারল্যান্ড অব দ্য ইস্ট। অর্থাৎ প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হিসেবে তিনি বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আমাদের এই সুযোগ আছে। আজকে আমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ এই বাংলাদেশকে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব। এ সময় তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, বঙ্গবন্ধু যদি আর মাত্র ১০টি বছর বেঁচে থাকতেন তবে বাংলাদেশ আগেই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠত।
ছাত্রলীগ সংগঠনকে আরও সুসংগঠিত করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্রলীগ এই দেশের প্রতিটি অর্জনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্রলীগের কত কর্মী মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন এই কথা মনে রাখতে হবে। প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই ছাত্রলীগের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। কেননা ছাত্রলীগের ইতিহাসই হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস। সেই ঐতিহ্য সামনে নিয়ে ছাত্রলীগকে গড়ে তুলে দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করবেÑ এটাই আমি চাই। আমাদের বয়স হয়েছে। আজকে যারা তরুণ ও ছাত্র তারা আগামী দিনের প্রজন্ম। যাদের হাতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব উঠবে। তাদের আদর্শ নীতিতে নিজেদের তৈরি করতে হবে। দেশ সেবার ব্রত নিয়ে বাংলার জনগণের জন্য কাজ করতে হবে।

Category:

নেতা-কর্মীদের আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশ

দলীয় কার্যালয়ে বৈঠকে শেখ হাসিনা
39উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তিন বছর পূর্ণ করে সরকার চার বছরে পা রেখেছে। আগের নির্বাচনে আমরা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তার অধিকাংশই পূরণ করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি কাজ করেছি। সামনের নির্বাচনের আর বেশি বাকি নেই। এখনকার ‘কঠিন পথ’ পাড়ি দিতে অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে হবে। এখন থেকেই নির্বাচনের কাজ করতে হবে। আমাদের আগামী নির্বাচনী ইশতেহার ঠিক করব। সেগুলো আমাদের এখনই চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
গত ১৪ জানুয়ারি বিকেলে ধানমন্ডিতে তার কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় এবং সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাদের সাথে মতবিনিময়ের সময় সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামী নির্বাচনের জন্য দলীয় ইশতেহার তৈরির লক্ষ্যে বিষয়ভিত্তিক আলাদা আলাদা সেল গঠন করতে তিনি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের নির্দেশও দিয়েছেন।
নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলার পাশাপাশি নিজের কার্যালয়ের সবকিছুর বিষয়ে খোঁজখবরও নেন প্রধানমন্ত্রী। কার্যালয় ঘুরে দেখেন এবং স্টাফদের সাথেও কুশলবিনিময় করেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের তিন বছর পার হয়েছে, আমরা চার বছরে পা রেখেছি। সামনে আরও কঠিন সময় মোকাবিলা করতে হবে। তবে আত্মবিশ্বাসের সাথে চলতে হবে, সততা নিয়ে কাজ করতে হবে। মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে হবে, মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করতে হবে।
বিএনপি ক্ষমতায় এলেই দেশে খুন-খারাবি বেড়ে যায়। আর আওয়ামী লীগ এলেই উন্নয়ন হয়। তিন বছরে যে কাজ করার কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি কাজ আমরা করেছি। আওয়ামী লীগ যা বলে, তা-ই করে। দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সাথে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে হবে।
২০২১ সাল পর্যন্ত ইতোমধ্যে আমরা কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। অনেক কিন্তু হয়ে গেছে। ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে কী কী করণীয় এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বের যেখানেই যাই অন্য দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানরা বাংলাদেশের ‘দ্রুত উন্নয়ন’ কীভাবে হলো তা জানতে চান।
তিনি বলেন, আমি আমার বাবাকে দেখেছি, বাবার কাছ থেকে শিখেছি। মাকে দেখেও শিখেছি। আমার মাকেও দেখেছি তিনি অনেক আত্মত্যাগ করেছেন। কিন্তু কখনোই তিনি কোনো জিনিসের জন্য আফসোস করেননি। বরং এই দলের জন্য তিনি নিজের গহনাটি পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। সব সময়ই আমার বাবার পাশে পাশে থেকেছেন। প্রতিটি কাজেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে সহযোগিতা করেছেন। কাজেই আমিও তো সেই পরিবার থেকে এসেছি। আমাদের কাজই হচ্ছে দেশের মানুষের জন্য কাজ করা।
কেন্দ্রীয় ও উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠক : সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাদের সাথে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী দলের কেন্দ্রীয় ও উপদেষ্টাদের সাথেও আলাদা বৈঠক করেন।
সন্ত্রাস ও গুপ্তহত্যার পথ ছেড়ে গণতন্ত্রে ফিরে আসুন
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তৃতীয় বছর পূর্তির দিন গত ৫ জানুয়ারি সারাদেশে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পালন করেছে আওয়ামী লীগ। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সংগঠনের সকল জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ ও বিজয় শোভাযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হয়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে দুটি পৃথক সমাবেশে জনতার ঢল নামে। এ সমাবেশ দুটি থেকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা সন্ত্রাস-নাশকতা-গুপ্তহত্যা ও জঙ্গিবাদের পথ ছেড়ে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে নেতৃবৃন্দ জনগণকে সাথে নিয়ে সন্ত্রাস-নাশকতা-জঙ্গিবাদ রুখে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আন্দোলনের নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য খালেদা জিয়াকে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, সব দিক থেকে ব্যর্থ হয়েও ষড়যন্ত্রের পথ থেকে সরে আসেনি একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের পেতাত্মা ও তাদের দোসর বিএনপি; কিন্তু দেশের জনগণ আর কোনো দিন কাউকে গণহত্যা চালাতে দেবে না, উন্নয়ন-অগ্রগতির চাকা স্তব্ধ হতে দেবে না।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি হাজী আবুল হাসনাতের সভাপতিত্বে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপদেষ্টাম-লীর সদস্য মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু, প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, একেএম এনামুল হক শামীম, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এমপি, যুবলীগের ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাট প্রমুখ। সমাবেশ পরিচালনা করেন দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ।
এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহ এমপির সভাপতিত্বে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি এমপি, জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রোকেয়া সুলতানা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা এমপি, আসলামুল হক আসলাম এমপি, কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
বিএনপি এখন গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি-জামাত এখন গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। আসলে মানুষ হত্যা করা বিএনপি-জামাতের চরিত্র। তারাই তো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিয়েছিল। তাই তাদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমরা জানি না, ওদের (বিএনপি-জামাত) আরও কী পরিকল্পনা আছে। গত ৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের এক যৌথসভায় সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চরিত্রটাই হচ্ছে অপরাধীদের মদত দেওয়া, লালন-পালন করা।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, জনগণের কাছে যেতে হবে। নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে সরকারের উন্নয়ন ও সফলতাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সাথে বিএনপি-জামাত জোটের নাশকতা-সন্ত্রাস, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা এবং জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকা-গুলোও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে জনসচেনতা সৃষ্টি করতে হবে।
৪ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ
অবশেষে আওয়ামী লীগের চার সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি বিকেলে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি সহযোগী সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে আগামী ৪ মার্চ মহিলা আওয়ামী লীগ, ১১ মার্চ যুব মহিলা লীগ, ১৯ মার্চ তাঁতী লীগ ও ২৯ এপ্রিল আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করেন। এক যুগেরও বেশি সময় পর এসব সংগঠনের সম্মেলন হতে যাচ্ছে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান এমপি, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা এমপি, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপ-দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে বর্তমানে ৭টি সহযোগী সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৩ সালের ১২ জুলাই মহিলা আওয়ামী লীগ, ২০০৪ সালের ১৫ মার্চ যুব মহিলা লীগ, ২০০০ সালের ২০ জুলাই আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ এবং ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট তাঁতী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় কাছাকাছি সময়ে সম্মেলন অনুষ্ঠানের পর ২০১২ সালের ১১ জুলাই স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ১৪ জুলাই যুবলীগ এবং ১৯ জুলাই কৃষক লীগ আরেক দফা কেন্দ্রীয় সম্মেলন করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করে।
খুলনা বিভাগের প্রতিনিধি সভা
খুলনা বিভাগের বিশেষ প্রতিনিধি সভার মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। গত ১৯ জানুয়ারি বেলা ১১টায় নগরীর একটি ক্লাবে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এ ধরনের সভা এই প্রথম। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বিভাগে এই প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সভায় প্রধান বক্তা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি বলেন, বিএনপি সরকার আমলে ১২৯টি মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের উত্থান হয়েছিল। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ওই সব সংগঠন জঙ্গি কর্মকা- পরিচালনা করেছে। উন্নয়নের কোনো কাজ তারা দেশের জন্য করেনি। আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার যখন দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তখন তাদের গাত্রদাহ হচ্ছে। তারা দেশকে নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতেও দ্বিধাবোধ করছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সভাপতিম-লীর সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য। এ ছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন, কেন্দ্রীয় সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এমপি, এসএম কামাল হোসেন, পারভীন জামান কল্পনা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুন রশীদ, মহানগর সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক এমপি, জেলা সাধারণ সম্পাদক এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা এমপি, নগর সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান এমপি, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এমপি, খুলনা বিভাগের সংসদ সদস্যরা, খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন।
রংপুর বিভাগীয় কর্মী সভা
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করবে। উন্নয়নমূলক কোনো কাজে সরকার অংশগ্রহণ করবে না। আমরা প্রমাণ করব, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো মডেল নির্বাচন। গত ২৯ জানুয়ারি রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগীয় কর্মী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
সার্চ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার প্রতি আওয়ামী লীগের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ করার পর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও মির্জা ফখরুল খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি যখন সার্চ কমিটি দিলেন তখন তারা বেজার হলেন। সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির মধ্যেও দ্বিমত রয়েছে।
দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখন থেকে ভাষণ কম অ্যাকশন বেশি। মঞ্চে বিশেষণ ও বক্তা কমান। নেতাদের সকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ঘুম থেকে ওঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সুশৃঙ্খল আওয়ামী লীগ চাই। এখন বিলবোর্ডে বাড়াবাড়ি নেই। কোনো নেতার ছবি নেই। এখন পোস্টার-বিলবোর্ডসহ সব ধরনের প্রচারণায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি থাকবে।
তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার মতো মানুষের ভালোবাসা অর্জন করুন। রাজনীতিক জীবনে মানুষের ভালোবাসা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। তিনি নিজের উদাহরণ টেনে বলেন, আদর্শের রাজনীতি করলে একদিন না একদিন মূল্যায়ন পাবেন। ত্যাগের মূল্যায়ন হবে। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মূল্যায়ন করে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগে দিন দিন নেতা বাড়ছে কর্মী কমছে। তাই কর্মী বাড়াতে হবে। নেতা উৎপাদনের কারখানা দরকার নেই, কর্মী উৎপাদনের কারখানা দরকার।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপির সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন উপদেষ্টাম-লীর সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন, চৌধুরী খালেকুজ্জামান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমান এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এমপি, বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, অর্থবিষয়ক সম্পাদক টিপু মুন্সী এমপি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মির্জা আজম এমপি, এসএম কামাল হোসেন, হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে পল্টু, বাসেত ও মুকুল বোস
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পেলেন প্রবীণ নেতা মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট বাসেত মজুমদার। আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিল কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তাদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন প্রদান করেছেন।
এরপর গত ৩০ জানুয়ারি মুকুল বোসকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৪১-এ।
আবদুল বাসেত মজুমদার বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান। ১৯৬৬ সাল থেকে আইন পেশা শুরু করেন তিনি। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান, সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও দু-দুবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সিনিয়র আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার।
অন্যদিকে মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রবীণ এই রাজনীতিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সাথে তিনি যুক্ত। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুকুল বোস বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

Category:

যুধিষ্ঠিরের কুকুর

ঠিক ঐ জায়গাটায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। হয়তো ঘুমায়। কিংবা চোখ বুজে ঝিমায়। হয়তো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পায় না বলে মাথাটা বুকে গুঁজে সারাক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকে। গায়ে মশা-মাছি বসলেও নড়েচড়ে না। গাড়ির তীক্ষè হর্নেও সচকিত হয় না।

34স্বকৃত নোমান: যুধিষ্ঠির বললেন, এই কুকুর আমার ভক্ত, একেও আমার সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করি। ইন্দ্র বললেন, যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না। যুধিষ্ঠির বললেন, নিজের সুখের জন্য আমি এই কুকুরকে ত্যাগ করতে পারি না।
মহাভারত। মহাপ্রস্থানিকপর্ব

খামারবাড়ি মোড়ে নেমে ইন্দিরা রোড ধরে ফার্মগেটের দিকে হাঁটা ধরলে দেখা যাবে একটা কাঁচাবাজার। বাজারের ঠিক মাঝখানে ফুটপাথের ছোট্ট ঐ বটগাছটার নিচে রাস্তার ওপর সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনের কাছে দেখা যাবে মোটাসোটা একটা কুকুর শুয়ে। এমন স্বাস্থ্যবান কুকুর শহরে খুব কমই দেখা যায়। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট খেয়ে খেয়ে হয়তো শরীরটার এই কন্ডিশন করেছে। হয়তো সে অলস। খাবারের জন্য সারাক্ষণ ছুটে বেড়ানো পোষায় না তার। কিংবা এমনও হতে পারে, তার শরীরে দুরারোগ্য কোনো ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। নইলে এমন বেখাপ্পা টাইপের মোটা হবে কেন। খেলে কি এত মোটা হয়? বাজারে আরও যেসব কুকুর আছে তারা কি কম খায়? তারা তো তার মতো এত মোটা নয়।
ঠিক ঐ জায়গাটায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। হয়তো ঘুমায়। কিংবা চোখ বুজে ঝিমায়। হয়তো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পায় না বলে মাথাটা বুকে গুঁজে সারাক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকে। গায়ে মশা-মাছি বসলেও নড়েচড়ে না। গাড়ির তীক্ষè হর্নেও সচকিত হয় না। এসব নাগরিক কোলাহলে সে অভ্যস্ত। মাঝে মধ্যে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট নিয়ে কুকুরের দলের কামড়াকামড়ি লেগে গেলে মাথাটা তুলে এক পলক দেখে নেয়, তারপর যথারীতি বুকের কাছে মাথাটা গুঁজে নেয়। ভাবে, এ আর এমন কী। এমন কামড়াকামড়ি তো প্রায়ই লাগে। বাজারের অন্য কুকুরগুলো তার ধারেকাছে ঘেঁষে না খুব একটা। তার সঙ্গে মেশে না। কেউ তাকে ঘাঁটায়ও না। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ এসে তার গা শোঁকে। মরে গেছে না বেঁচে আছে হয়তো বোঝার চেষ্টা করে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ে, হাই তোলে, গা চুলকায়। তারপর ধীরপায়ে চলে যায়।
কুকুরটি খায় কখন কেউ দেখে না। সারাদিনে আদৌ কিছু খায় কিনা কেউ জানে না। সে তো মানুষ নয়। ফুটপাথে আর পার্কে যেসব মানুষ থাকে তাদের খাওয়া না-খাওয়া নিয়েই তো কারও মাথাব্যথা নেই। সে তো তুচ্ছ একটা কুকুর, তার খাওয়া না-খাওয়া কেউ কি আর খেয়ালে রাখে? হয়তো সে খায়। রাতে বাজারের উল্টোদিকের সানমুন রেস্টুরেন্টের যে উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে জমা হয়, শেষ রাতে, অন্য কুকুরেরা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে ধীরেসুস্থে উঠে পেট ভরে খেয়ে নেয়। সারাদিন আর কিছু খায় না। প্রয়োজন পড়ে না। কোনো কোনো রাত আবার না খেয়েই কাটিয়ে দেয়। বিশেষত বৃষ্টির রাতগুলোতে। বেদখল যাত্রী ছাউনির বেঞ্চিটার নিচে সারারাত বেঘোরে ঘুমায়। বৃষ্টি থামলে আবার আগের জায়গায় এসে শুয়ে পড়ে। এক শোয়াতেই দিন কাবার।
একটা কুকুর দিনের পর দিন একই জায়গায় শুয়ে থাকার ব্যাপারটা কেউ ঠিক খেয়াল করেনি। হয়তো করেছে। কিন্তু এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এটা কি মাথা ঘামানোর মতো ব্যাপার? মানুষের কত কাজ, কত ব্যস্ততা। দিন-রাত মানুষ ছুটছে… ছুটছে। একটা কুকুরের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় কোথায়।
ঘামায় শুধু একজন, বটগাছের নিচে ফুটপাথের এক পাশে বসা কাশিরাম মুচি। রোজ ভোরে বাক্স-পেটরা ঝাড়মোছ দিতে দিতে কুকুরটির দিকে তাকিয়ে সে বলে, কী খবর মোটকু? আছিস কেমন? কুকুরটি তখন কান দুটো নাড়া দেয়। মাথাটা তুলে একবার ঘেউ করে ওঠে। ওটাই তার সাড়া। তারপর আবার মাথাটা গুঁজে নেয়। কেউ সারাদিন মোটকু মোটকু বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও মাথাটি আর তুলবে না। বহুদিন ধরে কাশিরামের ঐ জিজ্ঞাসাটা শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত। কথাটা তার কানে গেলেই বুঝতে পারে গলাটা কার। সাড়া দেওয়াটা তখন তার কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর রোজ রোজ ঐ কথা দুটি বলাটা কাশিরামের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। একদিন জিজ্ঞেস না করলে তার মনে হয় দিনটা আজ ভালো যাবে না। কাস্টমার জুটবে না। পুলিশের ঠ্যাঙানি খাবে।
দিনের বেশিরভাগ সময় কাশিরামের চোখ দুটো বলতে গেলে কুকুরটার ওপরই থাকে। শহরের ব্যস্ততম এলাকা ইন্দিরা রোড। কাস্টমার লেগেই থাকে, নাক চুলকানোরও ফুরসত নেই। বেশিরভাগই স্যু। স্যান্ডেল খুব কমই আসে। এলেও সেই পালিশের কাজ। সেলাই-টেলাই দিতে হয় না তেমন। ঢাকা শহরে বড় লোকদের কারবার, কে আসে ছেঁড়া জুতো নিয়ে। জুতোয় ব্রাশ করতে করতে কাশিরামের হাত আর মাথা সমানতালে দোলে, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে কুকুরটার দিকে। ব্রাশ করার সময় কুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকাটাও তার অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ওদিকে চলে যায়। অন্যদিকে ফেরালেও মুহূর্তে আবার আগের জায়গায় এসে স্থির হয়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রায়ই যুধিষ্ঠিরের কুকুরের কথা মনে পড়ে তার। ছোটবেলায় মাস্টারের মুখে শুনেছিল যুধিষ্ঠিরের কুকুরের কথা। এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
রাতে বাসায় ফেরার জন্য যখন বাক্স-পেটরা গোছায়, শেষবারের মতো কুকুরটার দিকে তাকায় কাশিরাম। তখন বলতে ইচ্ছে করে, কীরে মোটকু, খাবি না? মাঝে মধ্যে বলেও। কুকুরটা তখন সাড়া দেয় না। কেন দেয় না? কাশিরামের চলে যাওয়াটা হয়তো সে মেনে নিতে পারে না। তাই অভিমান করে থাকে।
কুকুরটার প্রতি কাশিরামের মনে আসলে এক ধরনের মায়া জন্মে গেছে। জন্মানোটাই স্বাভাবিক। কতদিন ধরে দেখছে। কতদিন একসঙ্গে আছে। একসঙ্গেই তো। ফুটপাথের বটতলা থেকে ডাস্টবিনের কতটুকুই বা দূরত্ব। বছর তিন আগে সে যখন এই বটতলায় বাক্স-পেটরা নিয়ে বসে, তখন থেকেই কুকুরটাকে দেখছে। তখন বয়স কম ছিল কুকুরটার। স্বাস্থ্যও এমন ছিল না। তেলতেলে টানটান শরীর। সারাবাজার দাপিয়ে বেড়াত। কামড়াকামড়িতে বাজারের অন্য কুকুরগুলো তার সঙ্গে পেরে উঠত না। সারাক্ষণ কেবল খাই খাই করত। জিবটা বের করে রাখত হরদম। খাবারের বাছবিচার ছিল না। খাওয়ার উপযোগী সামনে যা পেত তা-ই মুখে তুলে নিত। আর কতক্ষণ পরপর ডাস্টবিনটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক ঠ্যাং তুলে মূত্রথলিটা খালি করত। হেগেও দিত মাঝে মধ্যে। কাশিরামের তখন রাগ উঠত খুব। মনে পড়ে যেত শৈশবে স্কুলমাস্টারের মুখে শোনা ইন্দ্রের সেই বাণীÑ যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না। ঘৃণায় তখন তার নাক-চোখ-মুখ কুঁচকে যেত। সামনে পুরনো স্যান্ডেল-জুতো যা পেত কুকুরটার উদ্দেশে ছুড়ে মারত। শালা বেজন্মা! হাগার আর জায়গা পেলি না! একদিন তো আস্ত হাতুড়িটা ছুড়ে মারল মাথা বরাবর। কুকুরটা কুঁইকুঁই করে ছুট দিল রাস্তার উল্টোদিকে। অল্পের জন্য বাসের চাকার নিচে পড়ল না। স্প্রিডব্রেকারটা না থাকলে চ্যাপ্টা হয়ে যেত নিমেষে। তারপর বেশ কদিন কুকুরটাকে আর দেখা গেল না। কাশিরাম ভাবল, মরেটরে গেল নাকি! না মনে হয়। কুকুরের প্রাণ, এত সহজে কি মরবে! ভয়ে হয়তো এলাকা ছেড়েছে। কিংবা বাজারেই আছে, ভয়ে কাশিরামের আশপাশ ঘেঁষছে না।
কদিন পর সানমুন রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা করে ফেরার পথে কাশিরাম দেখল, রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথে দুটো কুকুর পাছার সঙ্গে পাছা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। জিব বের করে দিয়ে হাঁপাচ্ছে। চোখে ভীতির ছাপ। ভালো করে ঠাওর করে দেখল কাশিরাম, দুটোর একটি ঐ কুকুরটা, যার মাথায় সে হাতুড়ি ছুড়ে মেরেছিল। দ্রুত সে চোখ সরিয়ে নিল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল তাকে কেউ দেখছে কিনা। ভারী লজ্জার ব্যাপার। কুকুর হলে কী হবে, ব্যাপারটা তো মানুষের মতোই। এমন একটা ন্যাকেড দৃশ্যের দিকে সে তাকিয়ে, লোকে দেখলে কী ভাববে তাকে। মুখে হাসির একটা রেখা ফুটিয়ে দ্রুত সে নিজের জায়গায় এসে বসে পড়ল। কিন্তু চাইলেই কি চোখ ফিরিয়ে রাখা যায়? রাস্তার লোকজন ঐ দৃশ্যের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। প্যান্ট-শ্যুট আর টাই পরা এক ভদ্রলোক তো ওদিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে এক বাদামঅলার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে লেগেছিল। অল্পের জন্য পড়েনি। তা ছাড়া স্কুল ছুটি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি ফিরছে। তাদেরও চোখও এড়াচ্ছে না দৃশ্যটি। লেগুনার পুচকে কন্ডাক্টররা হুই-হাই করে মজা লুটছে।
কাশিরামের মাথায় তখন রাগ ওঠে। শালা কুত্তার বাচ্চা কুত্তারা লাগানোর আর জায়গা পেল না। পেছন থেকে এক সবজিঅলা বলে উঠল, সিটি কর্পোরেশন কী ছিঁড়তাছে বইসা বইসা। কুত্তাগুলো মারার ব্যবস্থা করে না ক্যান? কথাটা শুনে কাশিরামের রাগ গেল আরও চড়ে। কোত্থেকে একটা বাঁশের টুকরো কুড়িয়ে এনে এক ছুটে রাস্তা পার হয়ে কুকুরটার মাথায় মারল জোরসে বাড়ি। কিন্তু বাড়িটা মাথায় লাগল না, লাগল জায়গামতো, দুই পাছার ঠিক মাঝ বরাবর। দীর্ঘ সময়ের গিট্টু এক বাড়িতেই গেল ছুটে। মুক্তি পেয়ে সুখক্লান্ত প্রাণী দুটো দুদিকে ছুট লাগাল।
ডাস্টবিনটার কাছে কুকুরটা আসন নেওয়ার বছরখানেক পরের কথা। দেশজুড়ে তখন সন্ত্রাসীদের টার্গেট কিলিং চলছে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম রঞ্জিত হতে লাগল রক্তে। লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, ইমাম, বিদেশি, পুরোহিত, যাজক চাপাতির বলি হতে লাগল। জনসমাগমে মানুষের কল্লা ফেলে দিচ্ছে ঘাতক, কেউ এগিয়ে আসছে না আক্রান্তকে বাঁচাতে। কে চায় চাপাতির বলি হতে। কে চায় ঘাতকদের টার্গেট হতে। পুলিশের সামনে লাশ ফেলে দিচ্ছে, হামলা হচ্ছে খোদ পুলিশের ওপরও, আর পাবলিক তো পাবলিক।
সেদিন সকালে কুকুরটা ছিল সানমুন রেস্টুরেন্টের সামনে। মানুষের গাদাগাদি রেস্টুরেন্টের ভেতরে। ম্যাসিয়ার নাশতা দিয়ে কুলিয়ে উঠছে না। সকাল আটটা। অফিসের সময় হয়ে আসছে। সবাই ব্যস্ত। নাশতার জন্য ম্যাসিয়ারকে তাড়ার পর তাড়া দিচ্ছে কাস্টমাররা। গ্যাসের চুলার নিচে বসে নেহারির হাড্ডি চিবুচ্ছিল কুকুরটা। রেস্টুরেন্টে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে গিয়ে এক কাস্টমারের চোখ আটকে গেল সেদিকে। নাক-মুখ কুঁচকে স্বগতোক্তি করল, বিচ্ছিরি পরিবেশ। ম্যানেজারের কান এড়াল না কথাটা। কুকুরটা দেখে তার মেজাজও গেল চড়ে। চেয়ার থেকে ওঠে সিঙ্গারা ভাজার লম্বা ডাঁটঅলা চাকনিটা হাতে নিয়ে কুকুরটাকে দিল ধাওয়া। হাড্ডিটা ফেলে এক ছুটে রাস্তায় উঠে এলো কুকুরটা। তখন, ফুটপাথে যে লোকটা চিতই পিঠা বেচে, চুলা থেকে একটা জ্বলন্ত লাকড়ি বের করে ছুড়ে মারল তার দিকে। লক্ষচ্যুত হলো। হবে না? কুকুর বড় সেয়ানা প্রাণী। পিঠাঅলার হাতটা ওপরে উঠতে দেখেই সে দিল ছুট। লাকড়িটা পড়ল গিয়ে এক পথচারীর পায়ের কাছে।
আর ওদিকে তখন হুলুস্থূল। খামারবাড়ি মোড়ের দিক থেকে একটা লোক ছুটছে ফার্মগেটের দিকে। পরনে প্যান্ট, গায়ে সাদা গেঞ্জি, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। তাকে ধাওয়া করছে দুই তরুণ। একজনের মুখে চাপদাড়ি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। আরেকজনের ক্লিনশেভ মুখ, পরনে প্যান্ট-শার্ট। দুজনের পিঠে দুটো কালো ব্যাগ। দুজনের হাতেই ধারালো চাপাতি। বাক্স-পেটরা ঝাড়মোছ দিচ্ছিল কাশিরাম। তরুণ সূর্যের আলোয় চাপাতিটা চিকিয়ে উঠতে দেখে বুকটা ধপ করে উঠল তার। কদিন আগেও পাবনায় এক পুরোহিতকে গলা কেটে মেরেছে। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান পুরোহিতকেও হুমকি পাঠিয়েছে। বাক্স-পেটরা ফেলে সেও দিল ছুট। পথচারীরা যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। রাস্তার মোড়ে ডিউটিরত কনস্টেবলটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়েছে। সবজিঅলা, মুরগিঅলা, মুদিঅলা, পানঅলা, সিগারেটঅলা, পিঠাঅলা, বাদামঅলা আর চানাচুরঅলারাও পালাচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে লোকটা যখন ডাস্টবিনটার সামনে এলো, পেছন থেকে দুই চাপাতিঅলার একজন তার ঘাড়ে মারল এক কোপ। ঘাড়ে না লেগে কোপটা লাগল পিঠে। কুকুরটা তখন বটগাছের অদূরে যাত্রী ছাউনির বেঞ্চিটার তলায়। সহসা তুমুল শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে বিজলির গতিতে ছুটে এলো অকুস্থলে। তাকে ছুটে আসতে দেখে দুই চাপাতিধারীর একজন ছুট লাগাল রাস্তার উল্টোদিকে। আক্রান্তের ঘাড় লক্ষ্য করে ততক্ষণে দ্বিতীয় কোপটা চালিয়ে দিল আরেকজন। ধড়-মু-ু আলাদা হয়ে যেত, যদি না চাপাতিধারীর পা-টা কামড়ে ধরত কুকুরটা। আক্রান্ত লোকটি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তায়। রক্তে ভিজে যেতে লাগল তার সাদা গেঞ্জি। কুকুরের কবল থেকে ছাড়া পেতে চাপাতিটা ঘাতক চালিয়ে দিল কুকুরটার পিঠে। কিন্তু কোপটা পড়ল গিয়ে মাটিতে। পা ফসকে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে। চাপাতিটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে। কুকুরটা তখন তার বুকে চড়ে বসে কামড়ে ধরল তার থুতনিটা। কুকুরটাকে এক ঝটকায় বুক থেকে সরিয়ে দ্রুত ওঠে বসল ঘাতক। এবার কুকুরটা কামড়ে ধরল তার পা। দু-হাতে ভর দিয়ে দাঁড়াল ঘাতক। তারপর দিল ছুট। কুকুরটা গলাফাটানো শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে তার পেছনে ছুটতে লাগল।
ফার্মগেট ওভারব্রিজের কাছে গিয়ে কুকুরটা থামে। ঘাতককে খোঁজে। পায় না। ওদিকে তো মানুষ আর মানুষ। ঘাতক মিশে গেছে মানুষের ভিড়ে। কুকুরটা এক ছুটে আবার আহত রক্তাক্ত লোকটার কাছে ফিরে এলো। লোকটা তখনও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মরেনি। পলায়নরত পথচারীরা এবার থামে। এগিয়ে আসতে থাকে অকুস্থলের দিকে। বটগাছের আড়াল থেকে কাশিরামও বেরোয়। সবজিঅলা, মুরগিঅলা, মুদিঅলা, পানঅলা, সিগারেটঅলা, পিঠাঅলা, বাদামঅলা আর চানাচুরঅলারাও এগিয়ে আসতে থাকে।
খানিকের মধ্যে আহত লোকটার চারদিকে লেগে গেল মানুষের ভিড়। এক পথচারী পকেট থেকে মোবাইল বের করে আহতের ছবি তুলে নিল ঝটপট। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ছুটে এলো কনস্টেবলও। তার আনকোরা পোশাক অথবা হাতের জালিবেতটা দেখে কিনা কে জানে, হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে উঠল কুকুরটা। কনস্টেবল বেতটা উঁচিয়ে তাকে শাসাল। তাতে আরও জোরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল কুকুরটা।
মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে ক্রমে। কুকুরটা তখন ডাস্টবিনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, পুব দিকে ফিরে, জনতার দিকে বাঁ ঠ্যাংটি উঁচু করে পেশাব করতে লাগল। ছরছর শব্দে সে মূত্রথলি খালি করতে থাকে। তার পেশাবের বেগ পেয়েছে খুব।

Category:

খালেদা জিয়াকে অগ্নিসন্ত্রাসের জবাব দিতে হবে

33উত্তরণ প্রতিবেদন: রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা মিলনায়তনে গত ১৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের এক অনুষ্ঠানে এসে দুর্বিষহ কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদলেন আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ। পুড়ে যাওয়া-পরবর্তী তাদের যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন সংগ্রামের কথা আবেগতাড়িত করেছেন শ্রোতাদেরও। ২০১৪ সালের আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামাত জোটের ভয়াল ও বীভৎস্য সহিংসতার দুঃসহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে পুড়ে যাওয়া মানুষরা নিজেরা কাঁদলেন এবং শ্রোতাদেরও কাঁদালেন।
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-পরিষদের আয়োজনে বিএনপি-জামাতের ভয়াল তা-ব ও অগ্নিসন্ত্রাসের খ-চিত্র প্রদর্শন শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে খালেদা জিয়াই সংলাপের পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছিলেন। যারা গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করেন তাদের আগুন সন্ত্রাসে পঙ্গু হওয়া মানুষের আহাজারি, আর্তনাদের জবাব দেবে কে? তারা গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য মায়াকান্না করছেন, নাকি গণতন্ত্র হত্যার জন্য মায়াকান্না করছেন? দেশবাসীকে এদের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
বগুড়ার ট্রাকচালক পটল মিয়া তার পুড়ে যাওয়ার স্মৃতি বর্ণনা করে বলেন, আমার আপন ভাইও যদি এই অপরাধ করে থাকে, তবে তারও যেন কঠিন শাস্তি হয়। রিকশাচালক অমূল্য চন্দ্র বর্মণ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, পঞ্চগড় থেকে পেটের দায়ে নারায়ণগঞ্জ এসে রিকশা চালানো শুরু করি। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার সময় তেজগাঁওয়ে আমাকে পেট্রলবোমা মেরে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ী রেজাউল করিম জানান, চট্টগ্রামে আলু নিয়ে যাওয়ার সময় বগুড়ার মহাস্থানগড়ে ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। আগুন লাগানোর পর ট্রাক থেকে যেন বের হতে না পারি সেই ব্যবস্থাও করে সন্ত্রাসীরা। আমার হাত, মাথা, শরীর পুড়ে যায়। আমি এই তা-বের বিচার চাই।
এ ছাড়া কক্সবাজার থেকে যশোরে ঘরে ফেরার সময় শিশু মায়শা ও তার বাবা পেট্রলবোমায় পুড়ে মারা যান। অনুষ্ঠানে মায়শার মা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, চোখের সামনে শিশুসন্তান ও স্বামীকে পুড়ে যেতে দেখেছি। আমাদের কী অপরাধ ছিল? আমার সন্তান বাঁচার জন্য কাঁদছিল; কিন্তু আমি বাঁচাতে পারিনি। তিনি বলেন, আমার মায়শার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবে। আমি ডাক্তার মায়শার মা হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম, মৃত মায়শার মা হয়ে বাঁচতে চাইনি। আমি ১৬ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে এর বিচার চাই। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে তিনি বলেন, যারা গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করেন তাদের আগুন সন্ত্রাসে পঙ্গু হওয়া মানুষের আহাজারি, আর্তনাদের জবাব দেবে কে? নির্বিচারে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার জবাবইবা কে দেবে?
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএফইউজের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ও অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার শিকার নায়েক দুলু মিয়া, নিহত মাইশার মা মারুফা খাতুন, পিয়ারুল ইসলাম, ট্রাকচালক পটল মিয়া, আলু ব্যবসায়ী রেজাউল করিম, কাভার্ডভ্যান চালক মিষ্টি মিয়া ও রিকশাচালক অমূল্য চন্দ্র বর্মণকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

Category:

সবজি উৎপাদনে রেকর্ড : রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা

31রাজিয়া সুলতানা: দেশে-বিদেশে সব জায়গাতেই সচেতন মানুষের কাছে শাক-সবজি এখন অমূল্য সম্পদ। অনেকেই খাবার তালিকা থেকে ভাত-মাছ-মাংস সরিয়ে সুস্থ থাকতে আস্থা রাখছেন সবজির ওপর। ক্রমাগত বাড়ছে সবজিপ্রেমীর সংখ্যা। কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার সাথে অনুকূল আবহাওয়া শাক-সবজি উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করছে। সবজি চাষে কৃষক অধিকতর মনোযোগী হয়ে ওঠায় বাড়ছে চোখ ধাঁধানো উৎপাদনও। যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও রপ্তানিপণ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে শাক-সবজি রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে, বাম্পার ফলনের ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা মিটানোর পরও পৃথিবীর ৫০টির দেশে সবজি রপ্তানি হচ্ছে। শুধু সবুজ শাক-সবজি রপ্তানি করেই বাংলাদেশ আয় করছে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। সবজি উৎপাদনে সবার ওপরে চীন। তারপরই রয়েছে ভারতের নাম। প্রতিবছরই বাড়ছে বাংলাদেশে শাক-সবজির উৎপাদন। এক কথায় শাক-সবজি উৎপাদনে নতুন রেকর্ড অর্জনের মহাসড়কে পা রেখেছে বাংলাদেশ। এক কথায় শাক-সবজি উৎপাদন বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
একসময় মুখরোচক শাক-সবজির জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নতুন জাত উদ্ভাবনের কারণে টমেটো, লাউ, কপি বা নানা রকমের শাক-সবজি সারাবছর পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও নতুন জাতের বীজ উদ্ভাবন করেছে। ফলে এখন সারাবছরই প্রায় ২০ থেকে ২৫ জাতের সবজি ক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছে এ দেশের মানুষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের শাক-সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। আবার এসব শাক-সবজির ৯০ শতাংশ বীজ দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৪০ বছরে বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন বেড়েছে কমপক্ষে ৫ গুণ। বাংলাদেশে রবি মৌসুমে; বিশেষ করে নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সবজি উৎপাদন হচ্ছে। ফলে দেশের চাহিদা মিটানোর পরও বিপুল পরিমাণ শাক-সবজি বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে।
আর্থিক দিক বিবেচনা করে ফসলের চেয়ে কৃষকের মনোযোগ এখন শাক-সবজি উৎপাদনেই বেশি। কৃষি জমির পরিমাণ না বাড়লেও গত এক দশকে বাংলাদেশে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। চাহিদা এবং রপ্তানির বিষয়টি মাথায় রেখে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রবি মৌসুমে ৫ দশমিক ২৮ লাখ হেক্টর জমিতে সবজি উৎপাদন করা হবে। ২০১৫ সালে ২ দশমিক ৩৫ লাখ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছিল। ২০১৬ রবি মৌসুমে ৫ দশমিক ১০ লাখ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছিল।
দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার কম-বেশি সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। জমির পাশের উঁচু স্থান, আইল, বাড়ির উঠান, এমনকি টিনের চালাতেও এ দেশের কৃষকরা সবজির চাষ করছেন। এমনও দেখা গেছে, ফল বাগান ও বাড়ির রাস্তার পাশের উঁচু গাছের মধ্যেও মাচা করে সবজির চাষ করছেন অনেক কৃষক। এমন অনেকে বাড়ির ছাদে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি উৎপাদন করছেন। ফলে কৃষি জমির পরিমাণ কমলেও সবজি চাষের এলাকা বেড়েছে। এ ছাড়া নদী ও জলাশয়ে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজির উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।
বিষমুক্ত সবজি চাষ করতে কৃষি বিভাগের বিষমুক্ত থেরাপির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা ব্যবহার করছেন তাদের নিজস্ব পদ্ধতি। আর এতেই বাজিমাত। কৃষকের কীটনাশক ক্রয় করার টাকা যেমন বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি ভোক্তারাও পাচ্ছেন বিষমুক্ত সবজি। প্রথম দিকে কীটনাশকের অপপ্রয়োগ সম্পর্কে উত্তরের কৃষক এতটা সচেতন না হলেও এখন এর ক্ষতিকারক দিক জেনে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বিদেশে বাংলাদেশের শাক-সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে যেসব দেশে বাংলাভাষীরা বসবাস করছেন, সেসব দেশে বাংলাদেশের সবজির চাহিদা বেশি। দেশের রপ্তানিকৃত সবজির প্রায় ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে এবং বাকি ৪০ শতাংশ ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে যায়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ৬৫০ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকার সবজি রপ্তানি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হচ্ছেÑ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান ও মধ্যপ্রাচ্য। রপ্তানিযোগ্য সবজির মধ্যে রয়েছেÑ করলা, কাঁকরোল, টমেটো, পেঁপে, বেগুন, ঢেঁড়স, লাউ, কচুর লতি, কচুরমুখি, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, কাঁঠাল, শসা, চিচিঙ্গা, লালশাক, পুঁইশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁচামরিচ, পটল ও ঝিঙা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া প্রক্রিয়াজাত সবজির মধ্যে ডাঁটা, কচুরলতি, শিমের বিচি, কাঁচকলা, কলার ফুল, কচুশাক ও কাঁঠালের বিচি ইত্যাদি।
উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা হচ্ছে চলতি মৌসুমে সবজির বড় আমদানিকারক ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি পর্যবেক্ষক দল শীতকালীন সবজি উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ স্বচক্ষে দেখতে বাংলাদেশ সফর করে গিয়েছে। বাংলাদেশের সবজি উৎপাদন এবং গুণগতমান নিয়েও তারা প্রশংসা করেছেন, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
লেখক : কৃষি গবেষক এবং সমাজকর্মী

Category:

জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

26

বর্তমান সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তি

উত্তরণ ডেস্ক: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় দেশবাসী,
আসসালামু আলাইকুম।

সবাইকে নতুন ইংরেজি বছরের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
আজ ১২ই জানুয়ারি। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে আজকের দিনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি তৃতীয়বারের মতো শপথ গ্রহণ করি।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদের তৃতীয় বছর পূর্তিতে দেশবাসীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যিনি ২৪ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, জেল-জুলুম এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন স্বাধীন-স্বার্বভৌম বাংলাদেশ।
স্মরণ করছি ৩রা নভেম্বর জেলখানায় নিহত জাতীয় চারনেতাÑ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদকে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, স্বজন হারানো পরিবার ও একাত্তরে নির্যাতিত দুই লাখ মা-বোনের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা। মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই সালাম।
গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ঘৃণ্য হত্যাকা-ের শিকার আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, আমার তিন ভাইÑ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ও ১০ বছরের শেখ রাসেল, কামাল ও জামালের নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা ও রোজী, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র সহোদর শেখ নাসের, বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জামিলসহ সেই রাতের সকল শহীদকে।
স্মরণ করছি, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ শহীদ ২২ নেতাকর্মীকে।
স্মরণ করছি বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় নির্মম হত্যাকা-ের শিকার সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার, মঞ্জুরুল ইমাম, মমতাজউদ্দিনসহ ২১ হাজার নেতাকর্মীকে।
স্মরণ করছি সম্প্রতি নিহত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনকে। দশম সংসদের যে সকল সংসদ সদস্য ইন্তেকাল করেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

প্রিয় দেশবাসী,
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার টানা আট বছর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে নবম বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে।
আপনারা এই দীর্ঘ সময় ধরে আমাকে এবং আমার সরকারকে আপনাদের সেবায় নিয়োজিত থাকার সুযোগ দিয়েছেন। এ জন্য আমি আপনাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আপনাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছিÑ সে বিচারের ভার আপনাদের ওপরই রইল। তবে আমি এটুকু দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, দেশের এবং দেশের মানুষের উন্নয়ন এবং কল্যাণের জন্য আমরা আমাদের চেষ্টার ত্রুটি করিনি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিপুল জনসংখ্যার এদেশে সম্পদের পরিমাণ সীমিত। দীর্ঘকাল দেশে কোনো আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়নি। বহু সমস্যা পুঞ্জিভূত হয়ে পাহাড়-সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মোকাবিলা করতে হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরুদ্ধ পরিবেশ। বৈশ্বিক বৈরী অর্থনৈতিক অবস্থাও উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বারবার।
কিন্তু সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের সর্বজনীন মডেল। দ্রুত সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বব্যাংক মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করছে।
আট বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ।

প্রিয় দেশবাসী,
অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। যা জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম এবং ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩২তম। ধারাবাহিকভাবে ৬.৫ শতাংশ হারে প্রবৃৃদ্ধি ধরে রেখে পুরো বিশ্বকে আমরা তাক লাগিয়ে দিয়েছি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১১ শতাংশ। আগামী বছরের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৪ শতাংশ। অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকের অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার এবং নি¤œ-আয়ের দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গেছি।
প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। জনগণের মাথাপিছু আয় ২০০৫-০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে আজ ১ হাজার ৪৬৬ ডলার হয়েছে।
দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৪১.৫ শতাংশ। এখন তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২২.৪ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ২৪.২৩ থেকে ১২ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৫-১৬ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনা।
একদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেমন বেড়েছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকায় মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে। ২০০৯ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল ডাবল ডিজিটে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৫.০৩ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ১০.৫২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.২৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমরা জাতীয় রপ্তানি নীতি ঘোষণা করেছি এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ শক্তভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে ৩২ বিলিয়ন ডলারেরও ওপর।
বিগত আট বছরে দেশ-বিদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। গত বছর রেকর্ড ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। ৫ কোটি মানুষ নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।
সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। ২০০৯ সালে আমরা যখন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেই, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৫৩০০ মেগাওয়াট। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
২০২১ সালের মধ্যে আমরা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে চাই। সেই লক্ষ্যে ২৪০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। কয়েকটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু করেছি।
আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আমরা পরিবেশ সুরক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং প্রত্যন্ত চরাঞ্চলসহ সারাদেশে প্রায় ৪৫ লাখ সোলার হোমসিস্টেম বসানো হয়েছে। মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ উৎপাদন করা হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে। আমরা পরমাণু ক্লাবে যুক্ত হতে যাচ্ছি। পাবনার রূপপুরে ২০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। আমাদের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। আট বছরে দেশে কৃষি খাতের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ এখন খাদ্য-উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে।
আট বছরে প্রায় ৪০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার কৃষি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বর্গাচাষিদের জন্য কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে বিনা জামানতে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করেছি।
১৯৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও দুস্থ নারী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি চালু করেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অধীনে চলতি বছর ১৪২টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ কর্মসূচি বাবদ ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৬৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চলতি অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
হিজড়া এবং বেদে সম্প্রদায়ের জন্য ৬০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। চা-শ্রমিকদের জন্য অনুদান ১০ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ কোটি করা হয়েছে।
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ১০০টি শাখা উদ্বোধন করা হয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং গৃহায়ন কর্মসূচিসহ অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ২ লাখ ৮০ হাজার পরিবার পুনর্বাসন করা হবে।
গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে ৫০ লাখ পরিবারকে প্রতিকেজি ১০ টাকা মূল্যে চাল সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রিয় দেশবাসী,
আমাদের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০১০ সালে আমরা মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচি শুরু করি।
এ বছর ৪ কোটি ২৬ লাখ ৫৩ হাজার ৯২৯ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৫টি বই বিতরণ করা হয়েছে। গত আট বছরে সর্বমোট প্রায় ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ ১ হাজার ১২৮টি বই বিতরণ করা হয়েছে। বিশ্বে বিনামূল্যে বই বিতরণের এমন নজির নেই।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথম শ্রেণি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ১ কোটি ৭২ লাখ ৯৩ হাজার ১১৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মেধাবৃত্তি ও উপবৃত্তি বিতরণ করা হয়েছে। আমরা ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছি। একই সঙ্গে এসব বিদ্যালয়ের ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারি করা হয়।
২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩১ হাজার ১৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে।
বিদ্যালয়বিহীন ১ হাজার ১২৫টি গ্রামে নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৩৬৫টি কলেজ সরকারি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যেসব উপজেলায় সরকারি স্কুল বা কলেজ নেই, সেসব উপজেলায় একটি করে স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ করা হবে। দেশের ৩১৫টি উপজেলায় কোনো সরকারি স্কুল ছিল না। ইতোমধ্যে ১১৩টি উচ্চ বিদ্যালয় সরকারিকরণের সম্মতি প্রদান করা হয়েছে। আরও ২০২টি বিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে সরকারি করা হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ঝড়েপড়ার হার হ্রাস পেয়েছে। ২০০১-এ বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় গিয়ে শিক্ষার হার ৬৫ থেকে ৪৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল। বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।
একই সময়ে বেসরকারি খাতে ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৯টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৬টি। টেক্সটাইল এবং ফ্যাশন ডিজাইনসহ বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে দুটি নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন পাস করা হয়েছে।
যেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেসব জেলায় একটি করে সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে প্রথম পর্যায়ে ১০০টি উপজেলায় ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপনের কার্যক্রম চলছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৮৯টি উপজেলায় আরও ৩৮৯টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন করা হবে।
কিশোরগঞ্জ, মাগুরা, মৌলভিবাজার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় একটি করে মোট ৪টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। আরও ২৩টি জেলায় বিশ্বমানের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগীয় সদরে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে।
সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ এবং রংপুর বিভাগীয় সদরে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে।
ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগে ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হবে। ৮টি বিভাগীয় শহরে ৮টি মহিলা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী,
আমরা স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছি। দরিদ্র্য মানুষকে বিনামূল্যে ৩০ পদের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
৬৪টি জেলা হাসপাতাল ও ৪২১টি উপজেলা হাসপাতাল থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আমরা একটি যুগোপযোগী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করেছি। আট বছরে ১২ হাজার ৭২৮ জন সহকারী সার্জন এবং ১১৮ জন ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ১৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রায় সাড়ে ১২ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
৩ হাজার মিডওয়াইফারি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের প্রায় সকল শিশুকে টিকাদান কর্মসূচি এবং সব মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশনের আওতায় আনা হয়েছে।
মাতৃমৃত্যু প্রতি হাজারে ১.৮ জনে এবং শিশু মৃত্যু ২৯ জনে হ্রাস পেয়েছে। গত আট বছরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ২৪টি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শয্যা বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে উন্নত যন্ত্রপাতি ও অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়েছে।
২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকালে দেশে মোট সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ছিল ১৪টি, যা বর্তমানে ৩৬টিতে উন্নীত হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৯টি। সরকারি-বেসরকারি মিলে ডেন্টাল কলেজের সংখ্যা ২৮টি।
আমার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের ঐকান্তিক আগ্রহ এবং নিরলস প্রচেষ্টায় অটিজমের মতো মানবিক স্বাস্থ্য সমস্যাটি বিশ্বসমাজের দৃষ্টিতে আনা সম্ভব হয়েছে। অটিস্টিক শিশুদের সুরক্ষায় ২২টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
অচিরেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ১ লাখ পরিবারের মধ্যে স্বাস্থ্যকার্ড বিতরণ করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সব দরিদ্র পরিবারের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী,
আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
৪৮টি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকায় হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল-বিশ্বরোড বহুমুখী উড়াল সেতু, মিরপুর-বিমানবন্দর জিল্লুর রহমান উড়াল সেতু, বনানী ওভারপাস, মেয়র হানিফ উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
মেট্রোরেল নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন চালু হয়েছে। নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা সড়ক এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক চার-লেনে উন্নীত করা হয়েছে। চন্দ্রা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং ঢাকা-সিলেট চার-লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে।
যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত দেশের প্রথম আট-লেনের মহাসড়ক চালু করা হয়েছে। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা এবং দ্বিতীয় গোমতি সেতু নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হবে।
আওয়ামী লীগ সরকার রেলওয়েকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুতগতিসম্পন্ন এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করা হয়েছে। ইলেকট্রিক ট্রেন ও পাতাল ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
নতুন ২০টি মিটারগেজ এবং ২৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ, ১২০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী গাড়ী, ১৬৫টি ব্রডগেজ ও ৮১টি মিটারগেজ ট্যাংক ওয়াগন, ২৭০টি মিটারগেজ ফ্লাট ওয়াগন এবং ২০ সেট মিটারগেজ ডেমু সংগ্রহ করা হয়েছে।
আরও ২০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহের জন্য প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। সকল জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা হবে।
সরকার নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে যাত্রী পরিবহনের জন্য ৪৫টি নৌযান নির্মাণ ও চালু করেছে। দুটি যাত্রীবাহী জাহাজ ও ৪টি সি-ট্রাক জাতীয় নৌ পরিবহনে সংযুক্ত হয়েছে। নৌপথের নাব্য বৃদ্ধি করতে ১৪টি ড্রেজার কেনা হয়েছে। আরও ১৭টি ড্রেজার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন আছে। ৪টি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা ও বরিশাল নদীবন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
কাঁচপুর, সন্দ্বীপ ও কুমিরায় নৌযানের ল্যান্ডিং সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
একসময়ের মৃতপ্রায় মংলা বন্দর আমাদের সরকারের সময়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীতে পায়রা সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার ফলে ঐ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাচ্ছে। পায়রা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
২০০৯ সালের আগে দেশে স্থলবন্দরের সংখ্যা ছিল ১২টি। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৩টি কার্যকর ছিল। আমরা তামাবিল, বাংলাবান্ধা, সোনাহাট, আখাউরা, বিলোনিয়াসহ আরও ১১টি স্থলবন্দর স্থাপন করেছি।
আমরা বাংলাদেশ বিমানের জন্য ছয় সুপরিসর উড়োজাহাজ সংগ্রহ করেছি। ২০১৮ সাল নাগাদ আরও ৪টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।
পদ্মা সেতুর অপর প্রান্তে মাদারীপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণের সমীক্ষার কাজ শিগগিরই শুরু হবে।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। পর্যটন খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটন পুলিশ গঠন করা হয়েছে।
কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, জাফলংসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে।
গত আট বছরে আমাদের নিরলস প্রচেষ্টায় ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। ৫ হাজার ২৭৫টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার এবং ৮ হাজার ২০০ ই-পোস্ট অফিস থেকে জনগণ ২০০ ধরনের ডিজিটাল সেবা পাচ্ছেন। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন মোবাইল সিম গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি। ইন্টারনেট গ্রাহক প্রায় ৬ কোটি। চলতি বছরের মধ্যেই মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে কাজ চলছে।
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর এবং যশোরে হাই-টেক পার্ক স্থাপন করা হচ্ছে। বিভাগীয় শহরে সিলিকন সিটি স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।
২৫ হাজার ওয়েবসাইট নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েব পোর্টাল ‘তথ্য বাতায়ন’ চালু করেছি, যা আন্তর্জাতিকভাবে পুুরস্কৃত হয়েছে।
আমাদের সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ ও বিস্তৃতির জন্য সবচেয়ে উদার নীতি গ্রহণ করেছে। বিনিয়োগবান্ধব কর্মসূচির কল্যাণে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ২২৩ কোটি ডলার। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের শেষ বছর ২০০৬ সালে যা ছিল মাত্র ৪৫.৬ কোটি ডলার।
সোনালি আঁশ পাটের ব্যবহার ও বাণিজ্য বাড়াতে পাট আইন ২০১৬ পাস করা হয়েছে। পাটনীতি ২০১৬ এবং বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠান আইন ২০১৬ এবং বস্ত্রনীতি ২০১৬ প্রণয়নের কাজ চলছে।
শিল্পায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। এতে ১ কোটির বেশি লোকের কর্মসংস্থান হবে।
আমাদের সরকার মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমরা দেশে সর্বপ্রথম জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালাসহ তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন ও তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছি।
বেসরকারি খাতে ৪৪টি টেলিভিশন, ২২টি এফএম রেডিও এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আমরা বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে সরকার থেকে ৫ কোটি টাকার সিডমানি, ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার অনুদান এবং ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছি। সাংবাদিকদের সহায়তায় এ পর্যন্ত ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করেছি। কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমরা স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নিয়েছি। কয়েক ধাপে উপজেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচন হয়েছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরেই সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। অনেক আগেই বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশ জেন্ডার সমতায় দক্ষিণ এশিয়ায় দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে নারীর অবস্থানের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
জাতীয় সংসদকে সকল কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছি। বিরোধী দলকে ধন্যবাদ, তারা বিভিন্ন বিষয়ে তাদের অভিমত দিচ্ছেন, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
সামরিক-অসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১২৩ ভাগ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পদমর্যাদা বৃদ্ধি ও ব্যাপক পদোন্নতির সুযোগ করে দিয়েছি।
জাতির পিতা প্রণীত ১৯৭৪ সালের প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে আর্মড ফোর্সেস গোল-২০৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীকে অত্যাধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।
পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনীর ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়েছে।

প্রিয় দেশবাসী,
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমরা পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করেছি।
আমাদের মেয়েরা এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত নারী ফুটবল চাপিম্পয়নশিপ প্রতিযোগিতায় আমাদের মেয়েরা এই প্রথমবারের মতো রানার্স-আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। জাতীয় নারী ক্রিকেট দল জায়গা করে নিয়েছে আগামী বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে।
শারীরিক এবং মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন ছেলেমেয়েরা ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য দেখিয়ে চলেছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছেন। আমরা এমডিজি অর্জন করেছি। বাংলাদেশ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড এবং আইটিইউ-এর ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি’ পুরস্কার পেয়েছে।
আমরা জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এসডিজির ৫৬টি লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আমরা শান্তি এবং সহ-অবস্থানে বিশ্বাসী। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’।
এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন পথ রচনায় সক্ষম হয়েছি।
আলোচনার মাধ্যমে আমরা ভারতের সঙ্গে স্থলসীমানা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছি। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমারও শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছি। এর ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় সমুদ্রসম্পদ আহরণের পথ সুগম হয়েছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখবে। কক্সবাজারে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি। সেখানে সী অ্যাকুরিয়াম তৈরি করা হবে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

প্রিয় দেশবাসী,
দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একটি গোষ্ঠী ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করার অপচেষ্টা করছে।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্মের নামে যারা মানুষ হত্যা করে তারা ইসলামের বন্ধু নয়, শত্রু। ইসলাম কখনও মানুষ হত্যা সমর্থন করে না।
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ তবে ধর্মান্ধ নয়। হাজার বছর ধরে এ দেশের মাটিতে সকল ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শান্তিতে বসবাস করে আসছেন। যারা এই ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তাদের ঠাঁই বাংলার মাটিতে হবে না।
আমি দেশের সকল ইমাম, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, স্থানীয় মুরুব্বি, আনসার-ভিডিপি সদস্য এবং অভিভাবককে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
বিশেষ করে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান, আপনাদের সন্তানের প্রতি নজর রাখুন। তাদের এমনভাবে পরিচালিত করুন, যাতে তারা ভুল পথে পা না বাড়ায়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ অব্যাহত আছে।

প্রিয় দেশবাসী,
আমরা চলতি মেয়াদের তিন বছর অতিক্রম করলাম। আমাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জনগণের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।
আপনারা জানেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমরা অবৈধ পথে ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করেছি।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনকালীন একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম।
কারণ আমরা সব সময়ই সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। সংবিধানের আওতায় আমরা সব ধরনের ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিলাম। এমনকি বিএনপি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক, তাও আমরা দিতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি বরং উনি সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেন।
পেট্রলবোমা, অগ্নিসংযোগ ও বোমা হামলা করে মানুষ হত্যায় মেতে উঠলেন। শতাধিক মানুষ হত্যা করলেন। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ধবংস করলেন।
বিএনপি জোট নির্বাচন বর্জন করলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দল এবং প্রার্থীর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠুভাবে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের সময় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত ছিল। সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।
৯২ দিন পার্টি কার্যালয়ে আরাম-আয়েশে অবস্থান করে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আন্দোলনের নামে বিএনপি নেত্রী আবার জ্বালাও-পোড়াও-সন্ত্রাসী কর্মকা- উসকে দেন।
এ তিন মাসে বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীদের হাতে ২৩১ জন নিরীহ মানুষ নিহত এবং ১ হাজার ১৮০ জন আহত হন। তারা ২ হাজার ৯০৩টি গাড়ি, ১৮টি রেলগাড়ি ও ৮টি লঞ্চে আগুন দেয়। ৭০টি সরকারি অফিস ও স্থাপনা ভাঙচুর এবং ৬টি ভূমি অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
দেশবাসী তাদের এই সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রত্যাখ্যান করেছেন। জনগণ এ ধরনের কর্মকা-ের পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা আশা করি, সকল রাজনৈতিক দল মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে গঠিত নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখবেন।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে সহায়তা করবেন।

প্রিয় দেশবাসী,
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা থেকে শুরু করে এ দেশের যত উল্লেখযোগ্য অর্জন, তার সবগুলো এনেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। জাতির পিতা আমাদের মাথা নত না করতে শিখিয়েছেন। আমরা সকল বাধা-বিঘœ অতিক্রম করে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করব।
আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যদা অর্জন করেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একমাত্র আওয়ামী লীগই পারবে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে।
আসুন, দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়নে নিজেদের নিয়োজিত করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত-সমৃদ্ধ, সুন্দর এবং বাসযোগ্য বাংলাদেশ উপহার দেই।
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে এই প্রার্থনা করছি।
সবাইকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ।

খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

Category:

কবিতা

25 24

Category: