Blog Archives

সুন্দলপুর ২ নম্বর কূপে পরীক্ষামূলক গ্যাস তোলা শুরু

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সুন্দলপুর গ্যাসক্ষেত্রের ২ নম্বর কূপ থেকে গত ২০ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে বাপেক্স। এখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করছে সরকারি এই সংস্থা।
বাপেক্স কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন এই কূপ থেকে প্রায় ৮ মিলিয়ন (৮০ লাখ) ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী। তবে এই কূপে কী পরিমাণ গ্যাস রয়েছে তা জানতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের হাবীবপুর গ্রামে পড়েছে এই কূপ। সুন্দলপুরের গ্যাসফিল্ডে এর আগে লোহারপুরে ১ নম্বর কূপে ১০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছিল বাপেক্স। সেটি এখন বন্ধ রয়েছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম বলেন, এটি আমাদের দ্বিতীয় মূল্যায়ন কূপ। আমরা আশাবাদী, এই কূপ থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে পারব। তবে কী পরিমাণ এবং কত সময় পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। মাটির নিচে আমরা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছি। আশা করি, অল্প কিছুদিনের মধ্যে তা জানা যাবে।
সুন্দলপুর গ্যাসফিল্ডের প্রকল্প পরিচালক আলমগীর হোসেন জানান, এর আগে ১ নম্বর কূপে পানি নিঃসরণের কারণে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। পরে ওই কূপ থেকে ২ হাজার ২০০ মিটার দূরে হাবীবপুর গ্রামে গত ১০ জানুয়ারি দ্বিতীয় কূপ খনন করা হয়। সেখানে তারা ১ হাজার ৪০০ মিটার খননের পর গ্যাসের সন্ধান পেলেও বেশি গ্যাসের আশায় ৩ হাজার ২৩৫ মিটার গভীরে খননকাজ চালান। কিন্তু ওই গভীরে খননকাজ ফলপ্রসূ না হওয়ায় আবার ১ হাজার ৪০০ মিটার থেকেই গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করেন।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ২০ এপ্রিল আগুন জ্বালিয়ে গ্যাস প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পরীক্ষা শুরু হয়। দুদিন এই পরীক্ষা চলবে। তবে মাঝে ১২ ঘণ্টা বন্ধ রেখে বিভিন্ন ধরনের ডায়ামিটারের পাইপ ব্যবহার করে পরীক্ষা চলবে।
আলমগীর হোসেন বলেন, প্রতিদিন এই কূপ থেকে ৭ থেকে ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করেছেন। এই কূপে কী পরিমাণ গ্যাস আছে তা এখনই জানা না গেলেও ১ নম্বর কূপের চেয়ে এখানে বেশি গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্যাস উত্তোলন শুরুর সময় বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম, উপ-মহাব্যবস্থাপক ও সুন্দলপুর গ্যাসফিল্ডের প্রকল্প পরিচালক আলমগীর হোসেন ছাড়াও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম এবং বাপেক্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল বলেন, আমরা আশা করব, এই গ্যাস এ অঞ্চলের মানুষ যেন ব্যবহার করতে পারে সরকার সে ব্যবস্থা করবে।

Category:

মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ ঘোষণা

Posted on by 0 comment

38উত্তরণ প্রতিবেদন: গত ২৭ এপ্রিল সকাল ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারের মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রকল্পটির উদ্বোধনকালে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, টেলিযোগাযোগ বিভাগ, এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) এবং উপস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের অভিনন্দন জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের আরও সুযোগ এবং বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সুবিধাসংবলিত সেবা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা দিতে দেশে ডিজিটাল ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করে দেওয়া হচ্ছে। এটা থেকে যেন মহেশখালী দ্বীপের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখছে সরকার।
শেখ হাসিনা বলেন, শুধু মহেশখালী নয়, দেশের অন্যান্য দ্বীপ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এমন প্রযুক্তিগত সুবিধা পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। আমরা অল্প দিনের মধ্যেই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করব। সেটা উৎক্ষেপণ হয়ে গেলে আরও সুবিধা আমাদের সামনে আসবে।
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে মহেশখালী উপজেলার বার্মিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রশিদা আক্তার, মহেশখালী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সাবিহা নুর ও মহেশখালী হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদ হোসেনের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করেন।
কোরিয়ার সাথে যৌথভাবে হাতে নেওয়া প্রকল্পটির কাজের মধ্যে রয়েছে পুরো দ্বীপ এলাকায় দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করে সেখানকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তাকে সমৃদ্ধ করা এবং ই-গভর্ন্যান্সসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেনের সঞ্চালনায় ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য দেন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, আইওএম চিফ অব মিশন শরৎ দাশ, স্থানীয় সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক প্রমুখ।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম যাতে অক্ষুণœ থাকে সে জন্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষা করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দক্ষতার সাথে মিলেমিশে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৭ এপ্রিল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩০ বছর উপলক্ষে আয়োজিত দুদিনের পোর্ট এক্সপো উদ্বোধনকালে তিনি এ আহ্বান জানান।
এর আগে সকালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড মহেশখালী’ প্রকল্পের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিচ্ছিন্ন সব এলাকায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হবে।
পোর্ট এক্সপো উদ্বোধনকালে শেখ হাসিনা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম যাতে অক্ষুণœ থাকে, সব সময় নজর রাখতে হবে। দক্ষ, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বন্দর অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য সবাইকে মিলে কাজ করে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর এই বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত, নেপাল, ভুটান বন্দর যাতে ব্যবহার করতে পারে সে সুযোগ করে দিচ্ছি। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি সমৃদ্ধ হবে। এক্ষেত্রে এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সরকারপ্রধান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখান বিশ্বের সব দেশের সাথে যোগাযোগের চমৎকার একটি জায়গা। বন্দরকে উন্নত করা, আধুনিক করার ক্ষেত্রে আমরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। সবক্ষেত্রেই আমাদের দৃষ্টি রয়েছে। বন্দর আধুনিকায়নে গুরুত্ব দিচ্ছি। সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, এক্সপোর মাধ্যমে সুনাম বাড়বে। বাংলাদেশকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই। ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। যে লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, তার আদর্শ নিয়েই সরকার গঠনের পর থেকে কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও দেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরও গতিশীল করাই আমাদের লক্ষ্য। বন্দর আমাদের দেশের জন্য বিশাল সম্পদ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরের নবনির্মিত কারশেডে আয়োজিত দুদিনব্যাপী পোর্ট এক্সপোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং চলমান প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল। অনুষ্ঠানে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি, সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সংসদ সদস্য এমএ লতিফ, মোস্তাফিজুর রহমান, নজরুল ইসলাম ও মমতাজ বেগম।

Category:

১৬ ডিসেম্বরের আগেই মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহ

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: দেশের প্রথম যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট (কৃত্রিম উপগ্রহ) ‘বঙ্গবন্ধু-১’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ হতে যাচ্ছে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের আগেই। বিজয় দিবসে এটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা থাকলেও ওই দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি থাকায় তার আগেই এর উৎক্ষেপণ উদ্বোধন করতে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৭ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকের শুরুতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইটের রেপ্লিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করলে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের তারিখ এগিয়ে আনতে নির্দেশনা দেন।
তারানা হালিম এমপি এ বিষয়ে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হবে এবং প্রধানমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত থেকে এর উদ্বোধন করবেন। সেখান থেকে বাংলাদেশেও ওই উৎক্ষেপণ ও উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুনের প্রথম সপ্তাহে তিনি (তারানা হালিম) ফ্লোরিডায় গিয়ে অনুষ্ঠানের স্থানসহ নানা দিক সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে আসবেন। তারানা হালিম বলেন, আমরা ১৬ ডিসেম্বরের আগেই সম্ভাব্য ৪টি তারিখ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাব পাঠাব। তিনি যে তারিখ নির্ধারণ করে দেবেন সেই তারিখেই ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে। আমাদের ধারণা, পদ্মাসেতুর পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট হবে দেশবাসীর জন্য দ্বিতীয় গর্বের বিষয়। বঙ্গবন্ধুর নামে যে স্যাটেলাইট তা তার কন্যা উদ্বোধন করবেনÑ এটাও দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তারানা হালিম আরও বলেন, এটি পরিচালনার জন্য ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানি গঠনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই কোম্পানির মাধ্যমেই ‘বঙ্গবন্ধু-১’-এর পর ‘বঙ্গবন্ধু-২’ ও ‘বঙ্গবন্ধু-৩’ নামের আরও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। এ কোম্পানির মাধ্যমে স্যাটেলাইট বিষয়ে আরও দক্ষ জনবল প্রস্তুত করা হবে। স্যাটেলাইট নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ইতোমধ্যে তাদের ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে। স্যাটলোইট নির্মাণ, পরীক্ষা ও পর্যালোচনা শেষে এটি বিশেষ কার্গো বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের লঞ্চ সাইট কেপ কার্নিভালে পাঠানো হবে। উৎক্ষেপণের এক মাস আগে থেকে স্পেসএক্সের লঞ্চ ফ্যাসিলিটিতে লঞ্চ ভেহিকল ফ্যালকন ৯-এর ইন্ট্রিগ্রেশনসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শুরু হবে। ইতোমধ্যে স্যাটেলাইট সিস্টেম রিকোয়ারমেন্ট রিভিউ (এসআরআর) এবং প্রিলিমিনারি ডিজাইন রিভিউ (পিডিআর) সম্পন্ন হয়েছে। ভূমি থেকে উপগ্রহটি নিয়ন্ত্রণের জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) নিজস্ব জমিতে দুটি ‘গ্রাউন্ড স্টেশন’ নির্মাণকাজও ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এন্টেনার যন্ত্রপাতি সাইটে পৌঁছে গেছে। অন্যান্য যন্ত্রপাতিও দেশে চলে এসেছে। যে দ্রুতগতিতে কাজ এগোচ্ছে তাতে আমরা আশা করছি নভেম্বরেই ট্রায়ালে যেতে পারব।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের সাথে বিটিআরসির ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইট বিষয়ে মূল কাজ শুরুর চুক্তি সই হয়। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বিটিআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ভূস্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করবে থ্যালেস অ্যালেনিয়া। ফ্রান্সের তোলুজে স্যাটেলাইটটির মূল কাঠামো তৈরি করা হবে। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এই স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুনিকের কাছ থেকে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লট কেনে বাংলাদেশ।

Category:

চক্রান্ত এবং জঙ্গিবাদের নেত্রী খালেদা

Posted on by 0 comment

35স্বদেশ রায়: আমাদের কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিশেষ করে চৈনিক বামপন্থি এবং অতি ডানপন্থি বিশ্লেষকরা একটি বিষয় প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন যে, বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার মৃত্যুর ফলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসেছেন। একি সচেতনভাবে না রাজনৈতিক বিশ্লেষণ জ্ঞানের অভাবে এভাবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে এক কাতারে আনার চেষ্টা হয়েছেÑ তা একটি বড় প্রশ্ন। সহজ চোখে তাকালেই বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু নির্মমভাবে নিহত না হলেও শেখ হাসিনা রাজনীতিতে আসতেন। যেমনটি জওহর লাল নেহরুর দ্বিতীয় মেয়াদ থেকে রাজনীতিতে এসেছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। নিশ্চয়ই এই সহজ সত্যটুকু সকলের বোঝা উচিত, বাংলাদেশের সব থেকে বড় মহিলা কলেজটির নির্বাচিত ভিপি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারেন না। তিনি রাজনীতিতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিজ যোগ্যতায় চলে আসতেন। নিজ যোগ্যতায় যিনি আইয়ুব শাহীর আমলে বকশিবাজারের সরকারি মহিলা কলেজের ভিপি হতে পারেন, তিনি নিজ যোগ্যতায় রাজনীতিতে স্থান করে নিতেন। আর স্থান করে নিতেন এমন একটি পরিবারের সন্তান হিসেবে যিনি তার পিতার রাজনীতির ভিতর দিয়ে একটি জাতির জন্ম দেখেছেন, নিজেও সেই সংগ্রামের অংশ। অন্যদিকে নিজ বাড়িতে ছোটবেলা থেকে সেসব রাজনীতিকদের দেখেছেন যারা নিজ নিজ অবস্থানে মহীরুহ ছিলেন। তিনি কাছের থেকে দেখেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানীকে। এই বিশাল ব্যক্তিত্বের রাজনীতিকদের ছাড়াও তিনি অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন, আবুল মুনসুর আহম্মদ, আতাউর রহমান খান প্রমুখকে। এত বড় রাজনৈতিক পরিম-লে বেড়ে ওঠা এবং দেশের অন্যতম বড় কলেজের ভিপি ভবিষ্যতে রাজনীতিতে স্বাভাবিকভাবে নিজের জায়গা করে নিতে পারবেন না, এমনটি ভাবা মুর্খামী ছাড়া আর কি হতে পারে।
তাই এক শ্রেণির জ্ঞান পাপী না হয় রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞরা তথাকথিত বিশ্লেষণের ভিতর দিয়ে এমনটি দাঁড় করিয়েছেন যে এখন ইকোনমিস্ট পত্রিকার সাংবাদিকও অজ্ঞের মতো লেখেন দুই বেগম এবং সেখানে বলা হয় পিতার ও স্বামীর মৃত্যুর কারণে তাদের রাজনীতিতে আনা হয়। ইকোনমিস্ট পত্রিকার মতো পত্রিকার সাংবাদিকদের এ ধরনের মন্তব্য করার আগে একটু খোঁজখবর নেবেন এমনটিই সবাই আশা করে। তাদের অন্তত এটা জানা উচিত ছিল শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে আনা হয়নি, শেখ হাসিনা যেমন ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তেমনি নিজেই জাতীয় রাজনীতিতে এসেছেন। ১৯৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ পুরুজ্জীবিত করা হলে নানাভাবে নানাজন প্রস্তাব করেন, শেখ হাসিনাকে অন্তত ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বর করা হোক। অন্যদিকে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে রাজনীতি শুরু করার পর জিয়াউর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর লোকরা বেগম জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে।
তাই নতুন প্রজম্মের কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আসা ও বেগম জিয়ার রাজনীতিতে আসার পথ পরিক্রমা এক নয়। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে ছিলেন ছাত্রজীবন থেকে। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তিনি ব্রিটেন থেকে আন্দোলন শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি আওয়ামী লীগের মূল নেতা হিসেবে বাংলাদেশে আসেন। সেক্ষেত্রে বরং কিছু রাজনীতিক ও সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর লোকরা তার রাজনীতিতে আসার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আর স্বয়ং সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তো বাধা ছিলেনই। অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী এ কারণে যে, তারা বুঝতে পারে এরশাদ ক্ষমতা নিলেও রাজপথে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন শেখ হাসিনা শুরু করবেন। জিয়ার আমলের মালেক উকিল-রাজ্জাকের আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এক নয়। আর নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, এরশাদ ক্ষমতা দখল করে ২২ মার্চ আর এরশাদের এই সামরিক শাসনের প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান শেখ হাসিনা ২৬ মার্চ। ২৬ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সামনে তিনি অবিলম্বে সামরিক শাসকের পদত্যাগ দাবি করে তার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। যা ছিল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্যে প্রতিবাদ সভা।
শেখ হাসিনার এই কর্ম পদ্ধতি দেখে তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী বুঝতে পারে, অবিলম্বে এরশাদের বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবেন শেখ হাসিনা। তারা এও বুঝতে পারে, মাঠে যদি প্রতিক্রিয়াশীল কোনো শক্তি না থাকে তা হলে গোটা মাঠ শেখ হাসিনা দখল করে নেবে। তাই মাঠে যাতে সামরিক সরকারের একটি অংশ থাকে এ জন্য তারা খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে এবং তাকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। শুধু যে, এরশাদ ও সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী খালেদা জিয়াকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন তা নয়, ওই সময়ে খালেদা জিয়া যে একজন রাজনীতিক এবং তার জোট যে একটি সামরিক শাসকবিরোধী আন্দোলনের জোট এই বৈধতা দেবার জন্য প্রয়োজন ছিল শেখ হাসিনা ও খালেদ জিয়ার বৈঠক করানো। সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর এই নীল নকশা বাস্তবায়ন করার জন্য সেদিন প্রগতিশীল জোটের যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তাদের ভিতর অন্যতম ছিলেন, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহম্মেদ, সাংবাদিক ফয়েজ আহম্মেদ, রাজনীতিক সাইফ উদ্দিন আহমেদ মানিক, নির্মল সেন প্রমুখ। তারা সেদিন সে কাজে কামিয়াবও হন। যা ছিল বিরোধী রাজনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়ার প্রথম বৈধতার সার্টিফিকেট। এসব ব্যক্তি সেদিন শেখ হাসিনাকে খালেদার সাথে বসতে বাধ্য করেছিলেন বটে, তবে তারা খালেদাকে ১৯৮৬-তে নির্বাচনে আনতে পারেন নি। খালেদাও সেদিন এরশাদের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর কথামতো নির্বাচন থেকে দূরে থাকার জন্য গাজীপুরে একটি ফ্যাক্টরিতে গিয়ে অজ্ঞাতবাসে থাকেন। অন্যদিকে এ দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ঠিক একই কায়দায়, রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে থাকেন। তারা খালেদা যে এরশাদের চক্রান্তকে সফল করেছে সে কথা না বলে উল্টো বলতে শুরু করে শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গেছেন। তাই তিনি আপসকামী আর যিনি এরশাদের কথামতো নির্বাচন থেকে দূরে থাকলেন তিনি হলেন আপসহীন।
বাংলাদেশের মিডিয়া ও বিশ্লেষকরা বেশিরভাগ বামপন্থি না হয় সামরিক শাসকপন্থি। স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি খুবই কম। তাই মিডিয়ার অন্তহীন প্রচারে খালেদা আপসহীন হয়ে ওঠে। কেউ দেখে না এরশাদের কাছ থেকে ভাতা নিয়ে, এরশাদের কথামতো রাজনীতি করছেন তিনি। এভাবেই রাজনীতিতে অজ্ঞ, রাজনৈতিক পরিবেশ যার সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং সত্যি অর্থে বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে যিনি কোনোদিন রাজনীতিতে আসতে পারতেন না তিনিই হলেন খালেদা জিয়া। কারণ, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে জিয়াউর রহমান কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে পারতেন না; বরং সেপ্টেম্বর মাসে হয় তাকে অবসরে পাঠানো হতো না হয় রাষ্ট্রদূত করে বিদেশে পাঠানো হতো। তাই জিয়ার পক্ষে কোনোদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়াও হতো না, আর কামড়াকামড়িতে মৃত্যুর ফলে এভাবে খালেদাও রাজনীতিতে আসতে পারতেন না।
যা হোক, ওই সব রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে ছাই দিয়ে এখন বাস্তব সত্য হিসেবে সামনে এসেছে, শেখ হাসিনা। নিজ যোগ্যতায় আজ দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে বড় নেতা তিনি। অন্যদিকে খালেদা জঙ্গি নেত্রী। যে জঙ্গি নেত্রীর সাথে যোগাযোগ আছে আল-কায়দা, আইএস-সহ সকল আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর। এ ধরনের জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের নেতা হওয়ার পরও কেন খালেদা এখনও রাজনীতিতে আছে। কেন এখনও প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারছেন। খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারছেন তার প্রথম কারণ, শেখ হাসিনা তার পিতার রাজনীতি অনুসরণ করেন বলে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের যা যা শক্র সব কিছুই কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করছেন। রাজনৈতিকভাবেই নির্মূল করার কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনা জানেন, অস্ত্র দিয়ে, প্রশাসন দিয়ে জঙ্গিরা যাতে ক্ষতি করতে না পারে, মানুষ হত্যা না করতে পারে এটা প্রতিহত করা যায়। তবে সমাজ থেকে জঙ্গি নির্মূল করতে হবে রাজনৈতিকভাবে। শেখ হাসিনা তাই বাংলাদেশের মূল জঙ্গি নেত্রী খালেদাকে প্রশাসনের মাধ্যমে নয়, আইনের শাসন ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করছেন বলেই কিন্তু এখনও খালেদা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারছেন। তা ছাড়া খালেদা প্রকাশ্যে রাজনীতি করার আরেকটি সুযোগ পাচ্ছেন পশ্চিমা একটি শক্তির কারণে। তারা সব সময়ই চায় মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ এই দেশটি যাতে অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো অশান্ত থাকে। তারা জানে, যদি তারা খালেদাকে রাজনৈতিকভাবে জীবিত না রাখে তা হলে এ দেশে কোনোক্রমেই অশান্তি সৃষ্টি করা যাবে না। শেখ হাসিনা এই দেশকে এশিয়ার অন্যতম শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এ কারণে তারাও বাঁচিয়ে রাখছে নানাভাবে খালেদাকে। সর্বোপরি তাকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখছে অঢেল অর্থ। আর এই অঢেল অর্থ দিচ্ছে পাকিস্তানি আইএসএস। সে দেশের কোর্টেও বলা হয়েছে পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী বাংলাদেশের নির্বাচনে খালেদা ও তার দলকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করে।
অবশ্য এ বিষয়টি নতুন কিছু নয়, জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তানি আইএসআই’র একজন অফিসার। তার কাজই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে গোলযোগ সৃষ্টি করার পক্ষে কাজ করে যাওয়া। ছাত্রনেতা এসএম ইউসুফের পাঠানো ছাত্রদের ধাওয়া ও কর্নেল অলির অস্ত্রের মুখে তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেও তার সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সবসময়ই যোগাযোগ ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে চিঠি লিখে জিয়াকে জানিয়েছে, তার স্ত্রী ও সন্তানরা নিয়মিত অর্থ সাহায্য অর্থাৎ জিয়ার বেতন-ভাতা সব পাচ্ছে। এসব খবর যুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের কাছে থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে ওই সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। বরং তার পক্ষে সম্ভব হয় মুজিবনগর থেকেই চক্রান্ত শুরু করা। বঙ্গবন্ধুর বিশাল হৃদয়ের সুযোগ নিয়ে পরবর্তী চক্রান্তগুলো আরও দ্রুত করে তারা। বেগম জিয়া সেই চক্রান্তের রাজনীতির উত্তরাধিকার। তাই বাস্তবে বেগম জিয়া চক্রান্ত এবং জঙ্গিবাদের নেত্রী।

Category:

হাতিরঝিলে অ্যাম্ফিথিয়েটার ও মিউজিক্যাল ড্যান্সিং ফাউন্টেন

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: হাতিরঝিল আগেই রাজধানীবাসীর বিনোদনের জনপ্রিয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এবার তাতে যোগ হলো অ্যাম্ফিথিয়েটার ও মিউজিক্যাল ড্যান্সিং ফাউন্টেন। বাংলা নতুন বছর শুরুর আগের দিন গত ১৩ এপ্রিল এই মুক্তমঞ্চ ও বর্ণিল ফোয়ারা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, নাগরিকদের বিনোদনের জন্য এগুলো তার নববর্ষের উপহার।
লেকের পানির ওপর নির্মিত ২ হাজার আসনের অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং মনোরম মিউজিক্যাল ড্যান্সিং ফাউন্টেন হাতিরঝিল প্রকল্পের অধীনে নগরবাসীর বিনোদনে নতুন সংযোজন। ১৩ এপ্রিল গণভবনে এক অনুষ্ঠান থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে স্থাপনা দুটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যারা টেলিভিশন বা ফেসবুক লাইভে এ অনুষ্ঠান দেখছেন, তাদের সবাইকে বাংলা নতুন বছরের আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এগুলোকে দেশবাসীর জন্য ‘নববর্ষের উপহার’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে কর্মরত। এ জীবনযুদ্ধে হিমশিম খাওয়া মানুষের তো মাঝে মাঝে একটু চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন হয়। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতেও সরকার আন্তরিক। তিনি বলেন, জীবন নিয়ে যাদের চিন্তাযুক্ত থাকতে হচ্ছে, সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে, সেখানে তাদের জীবনটাকে একটু সহজ করার চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে যতœবান হতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সেনাপ্রধান আবু বেলাল মুহাম্মদ শফিউল হক। হাতিরঝিল প্রকল্পের পরিচালক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ তার বক্তব্যে জানান, এ মিউজিক্যাল ড্যান্সিং ফাউন্টেন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক এবং ঢাকা ওয়াসার সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অরগানাইজেশন (এসডব্লিউও-পশ্চিম) এ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে।
এ সময় অন্যদের মধ্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি উপস্থিত ছিলেন।

Category:

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন রূপায়ণের দৃঢ় অঙ্গীকার

Posted on by 0 comment

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালিত

33উত্তরণ ডেস্ক: ঐক্যবদ্ধভাবে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখে দিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গত ১৭ এপ্রিল রাজধানীসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালিত হয়েছে। দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের ৪৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঐতিহাসিক এ দিনটি স্মরণে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননেও জাতীয়ভাবে পালিত হয় নানা কর্মসূচি।
দিবসটি পালনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে দলীয়প্রধান হিসেবে নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এর আগে ভোর সাড়ে ৬টায় রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি শুরু হয়। দিবসটি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়াও ফাতেহা পাঠ, বিশেষ দোয়া মাহফিল ও আলোচনার আয়োজন করে।
এদিকে স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননেও জাতীয়ভাবে পালিত হয় ঐতিহাসিক এই দিনটি। মুজিবনগর দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি ছাড়াও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
গঙ্গার মতো তিস্তা চুক্তিও করবে আওয়ামী লীগ
বিএনপি-জামাত জোট সংবিধানে শূন্যতা সৃষ্টি করতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করতে ষড়যন্ত্র করেছিল। বাংলাদেশ নালিশ পার্টি (বিএনপি) নির্বাচনে না গিয়ে নানা রকম নালিশ করে বেড়াচ্ছে। ৫৯৬ জনের বিশাল কমিটি করেছে। আন্দোলনের ডাক দিয়ে সবাই ঘরে বসে থাকে। ভয়ে বাইরে বের হতে পারে না। ৫৯৬ জনের ৯৬ জনও বাইরে বের হয় না। এখন আবার শুরু হয়েছে ভারত কেন আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে, প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান দেয়। দেশের মানুষকে সম্মান দেয়। আসলে তিস্তার পানি নিয়ে নয়, তাদের গাত্রদাহ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে কেন সম্মান দেখানো হলো। গঙ্গার পানিচুক্তি আওয়ামী লীগ করেছে। তিস্তার পানি চুক্তিও আওয়ামী লীগ করবে। নালিশ করে যেনতেন করে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশ পূরণ হবে না। আওয়ামী লীগ জনগণের দল। জনগণের পাশে থাকে। উন্নয়ন করে। জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রীকে জনগণের কাছেই নালিশ করতে হবে। তিনি যতই নালিশ করুন না কেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই ২০১৯ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং ওই নির্বাচনে মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আবারও আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করবে। মুজিবনগর দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এসব কথা বলেন।
মুজিবনগর দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেছেন, বেগম জিয়া আপনি মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হবে না। দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। সরকার কঠোরহস্তে তা দমন করছে। দেশের মানুষও জঙ্গি দমনে সহায়তা করছে। ’৯৬-৯৭ সালে আমরা দেশের সব সন্ত্রাসীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিলাম। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছি। আর কোনো সন্ত্রাসবাদ দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করে আবারও ক্ষমতায় আসবে। সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে। বিএনপিকে ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি বলেন, জিয়াউর রহমান ছিল পাকিস্তানের এজেন্ট। সে মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। দেশে জ্বালাও-পোড়াও করে বিএনপি দেশ ধ্বংস করতে চেয়েছিল, পারেনি। দেশবিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্র দেশের মানুষ প্রতিরোধ করবে। সরকার দেশের উন্নয়ন করছে। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর আস্থাশীল। কোনো ষড়যন্ত্রেই কাজ হবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেশকে পাকিস্তান বানাতে চায় বিএনপি। তারা এখনও সক্রিয়। কিন্তু কোনো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রেই কাজ হবে না।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় মুজিবনগর আ¤্রকাননে গিয়ে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপিসহ দলীয় নেতৃবৃন্দ। ১০টা ৪৫ মিনিটে শেখ হাসিনা মঞ্চের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ওবায়দুল কাদের এমপি। এরপর পুলিশ, বিজিবি, আনসার, স্কাউট, গার্ল গাইড ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করে। কুচকাওয়াজ শেষে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে মুজিবনগর দিবসের আলোচনা সভা শুরু হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি, মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন, মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

Category:

জাটকা সংরক্ষণ : নতুন সম্ভাবনা

Posted on by 0 comment

29রাজিয়া সুলতানা: অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশের নাম জাটকা। পরিযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী ইলিশ পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বড় বড় নদীর উজানে গিয়ে ¯্রােতপ্রবাহে ডিম ছাড়ে। ভাসমান ডিম থেকে রেণু বেরিয়ে এসব এলাকায় কিছুদিন থাকে এবং এখানেই খায় ও বড় হয়। ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে ওই ইলিশ পোনার দৈর্ঘ্যে ১২-২০ সেমি লম্বা হয়, তখন এদের জাটকা বলে। এই জাটকাগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়। পরিণত ইলিশ হওয়ার জন্য জাটকাগুলো ফের সমুদ্রের দিকে পাড়ি জমায়। ওই সময়ে জেলেরা কোমর বেঁধে নেমে পড়ে জাটকা নিধনে। কিন্তু সরকার বর্তমান জাটকা সংরক্ষণ আইন করে তা প্রতিহত করেছে। কারণ ইলিশ উৎপাদন নিশ্চিত করতে জাটকা সংরক্ষণের বিকল্প নেই। সরকার ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করে আইন করেছে।
অর্থনৈতিকভাবে ইলিশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাছ। সুস্বাদু ইলিশের সুনাম বিশ্বব্যাপী। পদ্মার ইলিশের নাম শুনলে অনেকের জিহ্বায় পানি এসে পড়ে। পাশাপাশি ইলিশ উচ্চ উৎপাদনশীল একটি প্রজাতি। বড় আকারের একটি ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে। ইলিশ সারাবছর ডিম পাড়লেও সবচেয়ে কম পাড়ে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। আর সবচেয়ে বেশি ডিম দেয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। ইলিশের জীবনচক্র সমুদ্র ও নদীতেই বিদ্যমান। অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ সমুদ্রে পৌঁছে বড় হয়। প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রজননক্ষম ইলিশ জীবনচক্র পূর্ণ করার জন্য আবার নদীতে ফিরে আসে। বংশবিস্তারের জন্য একটি মা ইলিশ প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরিয়ে নদীতে পাড়ি জমায়।
নিজেদের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে মাছ ধরা অন্যায় নয়, তবে মা ইলিশ ও জাটকা ধরা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কারণ ইলিশ প্রথমত আমাদের জিআই পণ্য, দ্বিতীয়ত বিদেশে রপ্তানির ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশই আসে শুধু ঝকঝকে রূপালি ইলিশ থেকে এবং জিডিপিতে এর অবদান ১ শতাংশ। যদি মা ইলিশ আর জাটকা সংরক্ষণ না করা যায়; তা হলে ধীরে ধীরে ইলিশ ফুরিয়ে যাবে। বর্তমান সরকার মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে এগিয়ে এসে যুগান্তকারী সাফল্য রেখেছেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় কম-বেশি প্রায় সারাবছরই জাটকা পাওয়া যায়। তবে নদীর অববাহিকায় জানুয়ারি-এপ্রিলে বিপুল পরিমাণ জাটকা পাওয়া যায়। যদি জাটকা ধরা বন্ধ রাখা যায় তা হলে ইলিশের সর্বাধিক উৎপাদন হবে। তাই সরকার সাধারণভাবে নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি যেহেতু সারাবছরই জাটকা পাওয়া যায়; তাই সরকার বিধিবদ্ধভাবে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত জাটকা ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জাটকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করতে সরকার ১১ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০১৭ পালন করেছেন। ‘জাটকা ইলিশ ধরবো না, দেশের ক্ষতি করবো না’ এই স্লোগানকে সামনে রেখেই পালিত হয়েছে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ। ইলিশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন বাড়ছে। ইলিশ রক্ষায় কারেন্ট জালসহ অন্যান্য উপকরণ নির্মূলে ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে সারাদেশে এসব জাল পুড়িয়ে ফেলা হবে। এতে ইলিশ উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য আসবে। মৎস্য পরিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৯৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যমান আইন সংশোধন করে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধের পাশাপাশি মা ইলিশ সুরক্ষা আইনটি সঠিকভাবে সংশোধন করা হয়েছে। ফলে ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারছে। ক্রমেই বাড়ছে ইলিশ উৎপাদন। দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশই আসে ইলিশ থেকে আর জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় ৫ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত। এ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, রপ্তানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। সরকার জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের দুর্দিনের কথা ভেবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল দিচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৬ জেলে পরিবারকে ৪০ কেজি হারে ৩৭ হাজার ৭৮৮ টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছে। পাশাপাশি তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ৬১৫টি জেলে পরিবারকে তাদের চাহিদানুযায়ী নানা উপকরণ প্রদান করেছে। জাটকা রক্ষা করতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীতে আইন রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তায় সম্মিলিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ অভিযানে ৫ জেলায় মোট ২৬৫টি মোবাইল কোর্ট ও ৪৮৯টি অভিযান পরিচালনা করে ৮৩৩টি বেহুন্দি জাল, ৩০.৬৯ লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও ৬৮৮টি অন্য জাল জব্দ করা হয়েছে। সেই সাথে ৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করে ৪৪ জনকে জেল দেওয়া হয়েছে।
সরকারের কার্যক্রম উদ্যোগ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের পরই ইলিশ উৎপাদনে রয়েছে যথাক্রমেÑ মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। এর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া বাকি ১০টি দেশেই ইলিশ উৎপাদন কমেছে। শুধু বাংলাদেশেই ইলিশ উৎপাদন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সূত্রমতে, ১৯৮৬-৮৭ সালে দেশে ইলিশ উৎপাদন হতো ১ লাখ ৯৫ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টন। আগামী অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যমতে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও গত বছর ইলিশ পাওয়া গেছে।
ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ভারতে ২০ শতাংশ, মিয়ানমারে ১৫ শতাংশ, আরব সাগর তীরবর্তী দেশগুলো এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলোতে বাকি ৫ শতাংশ ইলিশ ধরা পড়ে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছেন স্বাধীন স্বার্বভৌম সবুজ বাংলা। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চিত করেছেন অধিকারের নীল বাংলা। তার সুযোগ্য নেতৃত্বেই বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের অধিকারে এসেছে। আর এই নীল জলরাশি বাংলাদেশের সুবিশাল মৎস্য ভা-ার হিসেবে পরিগণিত। যেখানে রয়েছে ইলিশের অবাধ বিচরণ। জাটকা আরোহন বন্ধ করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায়ই গত বছর রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। সরকারের উদ্যোগের সাথে সাধারণ মানুষও সচেতন হয়েছেন ইলিশ রক্ষায়। বাজারে গিয়ে জাটকা চোখে পড়লেই নানা প্রশ্ন করেছেন জেলেদের। কেউ কেউ ভয়ও দেখিয়েছেন। কেউবা জাটকা কেনা থেকে বিরত থেকেছেন। এক কথায় সম্মিলিত প্রয়াসেই জাটকা নিধন এই পর্যায়ে এসেছে, যা বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদনে নতুন দিগন্তের সূচনা করছে।

লেখক : কৃষিবিদ, গবেষক এবং সমাজকর্মী

Category:

ইউনূসকে বাঁচাতে জয়কে চাপ

Posted on by 0 comment

40উত্তরণ প্রতিবেদন: মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তদন্ত আটকানোর চেষ্টায় হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের আর্থিক হিসাব নিয়ে তদন্ত শুরুর হুমকি দিয়েছিল বলে খবর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদপত্র।
জয়কে উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ডেইলি কলার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা একাধিকবার তাকে চাপ দেন, যাতে তিনি ইউনূসের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ করার বিষয়ে তার মাকে রাজি করান।
পদ্মাসেতু প্রকল্পে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে ২০১১ সালে বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করে বিশ্বব্যাংক। ওই বছরই বয়সসীমা অতিক্রান্ত হওয়ার কারণ দেখিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ থেকে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েও হেরে যান তিনি। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ নিয়ে ইউনূসের ‘নানা তৎপরতার’ মধ্যে ২০১২ সালের জুনে পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে অর্থায়ন বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ টানাপড়েনের একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংককে ‘না’ করে দিয়ে নিজেদের অর্থে পদ্মাসেতু নির্মাণে হাত দেয় বাংলাদেশ সরকার।
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ইউনূসের নির্ধারিত বয়সের চেয়ে বেশি সময় থাকা বৈধ ছিল কিনা এবং আর্থিক অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ২০১২ সালের মে মাসে তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। ওই তদন্ত ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর থেকে চাপ দেওয়া হয় বলে ডেইলি কলারের প্রতিবেদনের ভাষ্য।
২০১৫ সালে হিলারির ফাঁস হওয়া ই-মেইলেও ইউনূসের জন্য তদ্বিরের বিষয়টি প্রকাশ পায়। ইউনূসকে সরানোর কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চাপ আসার কথা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন।
পদ্মাসেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আটকাতে হিলারি ক্লিনটনের সাথে মুহাম্মদ ইউনূসের যোগসাজশকে দায়ী করে গত ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থায়ন বন্ধের হুমকি এসেছিল, জয়কেও ‘ভয় দেখানো’ হয়েছিল।
শান্তিতে নোবেল পাওয়া ইউনূসের সাথে ক্লিনটন পরিবারের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বহুবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টিঘেঁষা ডেইলি কলারেরই এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তার পদের প্রভাব খাঁটিয়ে ইউনূসকে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের তহবিল জুগিয়েছিলেন।
অন্যদিকে ইউনূস ১ থেকে ৩ লাখ ডলার ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে দান করেছিলেন বলে ডেইলি কলারের দাবি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা জয়কে উদ্ধৃত করে ডেইলি কলারের এবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি বৈধভাবে ১৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, কখনও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু ওই সময় পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ এনে তদন্ত শুরুর হুমকি দেন।
তারা আমাকে বারবার বলেছে, ‘দেখ, ইউনূসের প্রভাবশালী বন্ধু-বান্ধব আছে, আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্লিনটনের বিষয়টা তো সবাই জানে।’ ডেইলি কলার লিখেছে, পদ্মাসেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি দুই দফা হিলারির সাথে বৈঠক করেন। ডেইলি কলার নিউজ ফাউন্ডেশনকে তিনি তখন বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের সাথে ইউনূসের যোগাযোগ আছে বলেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়।
বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপু মনি ডেইলি কলারকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা তাদের পররাষ্ট্র দফতরের কোনো চাপ সে সময় ছিল কিনা, আমি বলতে পারব না। আমি শুধু বলতে চাই, এখানে দুুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, স্টেট ডিপার্টমেন্টের যোগাযোগ এবং দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রত্যাহার।
ইউনূসের বিষয়ে দীপু মনি বলেন, অবশ্যই অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশ সরকারকে, বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে হেনস্থা করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, আমাদের দেশের জন্য, সরকারের জন্য পদ্মাসেতু কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই তিনি সেটা কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।
জয় ডেইলি কলারকে বলেছেন, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের নানা পর্যায় থেকে সে সময় তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
পত্রিকাটি লিখেছে, ভার্জিনিয়ায় বসবাস করায় জয়ের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের প্রায়ই দেখা-সাক্ষাৎ হতো। সাধারণত তাদের মধ্যে বাণিজ্য বা নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও ২০১০ সালের পর তা দ্রুত বদলে যেতে থাকে। তখন তারা কেবল একটা প্রসঙ্গই টেনে আনত, আর তা হলো ইউনূস। মুহাম্মদ ইউনূসকে বাঁচাতে হবেÑ এটা তাদের অবসেশনে পরিণত হয়েছিল, বলেন জয়।
ডেইলি কলার বলছে, এ বিষয়ে তারা গ্রামীণ আমেরিকা ও ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করলেও সাড়া পায়নি।

Category:

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবদান

Posted on by 0 comment

41রায়হান কবির : ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব বাংলার লাঞ্ছিত নিপীড়িত বঞ্চিত-অবহেলিত গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের দৃঢ় সংকল্পে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আদর্শের আনুসারী নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত হয় আওয়ামী লীগ। জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ এ দেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিবেদিত। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে দীর্ঘ জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ভিত্তিমূলে শ্রম অধিকার
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনে গৃহীত নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া মেনিফেস্টোতে ‘শ্রম অধিকার’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়Ñ
‘প্রত্যেক অধিবাসীরই কাজ করার অধিকার অর্থাৎ, সুযোগ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিযুক্ত হওয়ার এবং কাজের গুণ ও পরিমাণ-অনুযায়ী রাষ্ট্র নির্দ্ধারিত উপযুক্ত বেতন পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। সরকারী কর্ম্মচারী, শ্রমিক ও মজুরের সর্ব্বাধিক দৈনিক কার্য্যকাল ও নি¤œতম মজুরী রাষ্ট্র আইনতভাবে নির্দ্দিষ্ট করিবে। সর্ব্বাধিক কার্য্যকাল দিনে ৬ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টার অধিক হওয়া উচিত নয়। বার্ষিক ও সাময়িক ছুটির ব্যবস্থা রাখিতে হইবে।’
১৯৫৩ সালের ৩, ৪ ও ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে চরম বঞ্চনার শিকার তাঁতশিল্পে কর্মরত তাঁত শ্রমিকদের প্রতি তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের অবহেলা ও বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষণা করা হয়। এই কাউন্সিলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এ কাউন্সিল অধিবেশন থেকে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের জমিদার কর্তৃক প্রজা, মালিক কর্তৃক শ্রমিক শোষণের নীতি পরিত্যাগ করার দাবি জানানো হয়। সে সময় মুসলিম লীগ সরকারের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এই কাউন্সিল অধিবেশনে। এরই ধারাবাহিকতায় যৌক্তিক বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট ঘোষিত ঐতিহাসিক ২১-দফা দাবির ১৬নং দফায় বলা হয়Ñ
‘প্রশাসন ব্যবস্থার ব্যয় হ্রাস করতে হবে, উচ্চ ও নি¤œবেতনভুক সরকারী কর্মচারীদের বেতনের হার যৌক্তিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। মন্ত্রীরা তাদের মাসিক বেতন এক হাজার টাকার বেশি গ্রহণ করবেন না।’
গরিব, দুঃখী, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়কে বাংলার আপামর মানুষের দাবিতে পরিণত করতে ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও উপযুক্ত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গঠনতন্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুচ্ছেদে বলা হয়Ñ
‘জনসাধারণের অবস্থার ও জীবন ধারণের মানের উন্নতি করা ও পরিশ্রমের উপযুক্ত মর্য্যাদা ও ন্যায্যমূল্য প্রদানের ব্যবস্থা করা।’
প্রদেশে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার আমল (১৯৫৬-৫৮)
১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগের এ সরকারের সময় প্রথম লেবার রেজিস্ট্রেশন আইন প্রণীত হয়। ফলে সাংবিধানিকভাবে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই সাথে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণে প্রতিষ্ঠা করা হয় অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই এফডিসি, জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন, ওয়াপদা গঠন, ফেঞ্চুগঞ্জে প্রথম সার কারখানা নির্মাণ, সাভার ডেইরি ফার্মের সূচনা, স্থায়ী শিল্প ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সরকারি, আধা-সরকারি বেশ কিছু স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে একটি স্থায়ী আমদানি-রপ্তানি কন্ট্রোলারের অফিস স্থাপিত হয়। গঠিত হয় রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য যথাক্রমে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট, চিটাগাং ডেভলপমেন্ট অথরিটি ও কেডিএ। এছাড়া জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন এবং ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটিও আওয়ামী লীগ সরকারের কৃতিত্ব। কেন্দ্রের বিমাতাসুলভ আচরণ সত্ত্বেও প্রদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ভৌত-অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পের প্রসার এবং কৃষি ও সমবায়সহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে দেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলেই ১৯৫৬ সালে প্রথম আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শ্রমিক সংগঠন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মে দিবস পালিত হয়। ১৯৫৬ সালে মে দিবস সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আইয়ুব খান মে দিবসকে ধর্মীয় লেবাস লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠে। থমকে দাঁড়ায় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রা।
১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের পদক্ষেপ
১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পর ১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ ১১-দফা খসড়া মেনিফেস্টো ঘোষণা করে। ১১-দফা খসড়া মেনিফেস্টোতেও শ্রমিক অধিকার তথা শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি ঘোষিত হয়। এই মেনিফেস্টোর ৭নং দফায় বলা হয়Ñ
‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক-সংস্থার (ওখঙ) গৃহীত সুপারিশ ও কনভেনশনের ভিত্তিতে শ্রমিকদের সকল প্রকার অধিকার ও সুযোগ-সুবিধামূলক আইন প্রণয়ন করিয়া প্রত্যেক শ্রমিকের সুষ্ঠু জীবন-যাপনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। প্রত্যেক শ্রমিকের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করিতে হইবে।’
১৯৬৯ সালে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের সংশোধিত ‘নীতি ও কর্মসূচীর ঘোষণা (মেনিফেস্টো)’-তে শ্রমিকের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পীড়িত থাকাকালীন পূর্ণ বেতনে ছুটির ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বাসস্থানের ব্যবস্থা, শ্রমিকের সন্তানদের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার দাবি উত্থাপন করা হয়।
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে গঠন করেন ‘শ্রমিক লীগ’। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সামরিক আইন জারি করে মে দিবস প্রকাশ্যে পালন করতে দেয়নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ১৯৭০ সালের মে দিবস জাতীয় শ্রমিক লীগ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনকে সাথে নিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রামের অংশ হিসেবে পল্টনে জনসভা ও মিছিলের ভেতর দিয়ে পালন করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়। ইশতেহারে বলা হয়Ñ
‘শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার খর্বকারী সকল শ্রম আইন বাতিল করতে হবে। শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা দানের মাধ্যমেই তাদের কাছ থেকে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি আশা করা যায়।’
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু সরকার (১৯৭২-৭৫)
স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, মেহনতি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। জাতির পিতা যেমন ছিলেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তেমনি তিনি ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর’ জন্য ছিলেন দৃঢ় প্রতীজ্ঞ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু সরকার আমলের শুরুতেই সুদসহ কৃষকদের সব বকেয়া খাজনা ও ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির কর চিরদিনের জন্য বিলোপ করা হয়। নির্যাতনমূলক ইজারাদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। কৃষকের কল্যাণে ৭০ কোটি টাকা বকেয়া সুদ-খাজনা ও কর মওকুফ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ১৬ কোটি টাকার টেস্ট রিলিফ জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করে। দরিদ্র্য চাষিদের ১০ কোটি টাকার ঋণ, ১ লাখ ৯০ হাজার টন সার, ২ লাখ মণ বীজধান দেওয়া হয়। সমবায়ের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা বিতরণের প্রকল্প চালু করা হয়। ফলে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের পথ সম্প্রসারিত হয়।
১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত রাষ্ট্রপতির ১৬নং আদেশ (চঙ-১৬)-এর আওতায় অবাঙালি তথা পাকিস্তানি মালিকানার প্রায় ৮৫ শতাংশ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্র সেগুলোর মালিকানা গ্রহণ করে। এই ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তিগুলো’ জাতীয়করণ আইনের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রায়ত্ত খাত’ হিসেবে অভিহিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (২৬.০৩.১৯৭২-এ) পাট, বস্ত্র, চিনিকল, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয়করণের আইন পাস করে। জাতীয়করণ আইনের আওতায় ৬৭টি পাটকল, ৬৪টি বস্ত্রকল এবং ১৫টি চিনিকল জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয় বিমান সংস্থা ও জাতীয় শিপিং সংস্থাÑ যা পূর্বেও সরকারি মালিকানায় ছিলÑ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অধীনে আনা হয়। এভাবে ১৫ কোটি টাকা মূল্যের স্থায়ী সম্পদ বিশিষ্ট পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বৈদেশিক বাণিজ্য জাতীয়করণ করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয়করণ কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর সরকার হঠাৎ করেই গ্রহণ করেন নি। এটি ছিল ’৭০-এর নির্বাচনের সময় ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তা ছাড়া ছাত্রদের ১১-দফা দাবিতেও দেশের পাট, বস্ত্র, চিনিকল ও ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয়করণের (৫নং দাবি) দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের দেওয়া ঐতিহাসিক ২১-দফা কর্মসূচিতেও পাট শিল্প জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা মে দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনভার গ্রহণের সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে অর্থ ছিল তা দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। তবুও সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার পরিপূরক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কমিশন গঠন করে ১০ স্তর বিশিষ্ট নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করেন। বঙ্গবন্ধু শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে মজুরি কমিশন গঠন করেন। তিনি শ্রমিকদের জন্যও নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালের মে দিবসে শ্রমিকদের মজুরির হার বৃদ্ধি এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের এডহক সাহায্য প্রদানের ঘোষণা দেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি ছিলÑ
‘যে সকল শ্রমিক সরকারি মালিকানাধীন কর্পোরেশন, সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ, রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারি তত্ত্বাবধানের অধীনে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে নিযুক্ত আছেন ও মাসিক ৩৩৫ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন, তাদের সাময়িক ভিত্তিতে এই হারে সাহায্য মঞ্জুর করা হয়েছে :
১. মাসিক মজুরি ১২৫ টাকা পর্যন্তÑ মাসিক ১২৫ টাকা। মাসিক মজুরি ১২৬ টাকা থেকে ২২৫ টাকা পর্যন্তÑ মাসিক ২০ টাকা। এই শ্রেণীভুক্ত শ্রমিকরা সর্বনি¤œ মাসিক ১৫০ টাকা পাবেন।
২. মাসিক মজুরি ২২৬ টাকা থেকে ৩৩৫ টাকা পর্যন্তÑ মাসিক ১৫ টাকা :
ক. এই শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিরা সর্বনি¤œ ২৪৫ টাকা পাবেন। খ. যে সকল ব্যক্তি মাসিক ৩৪৯ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান তাঁদের জন্য মার্জিনাল এডজাস্টমেন্ট করা হবে। এই সুবিধা স্থায়ী, অস্থায়ী, বদলী ও ওয়ার্কচার্জড শ্রমিকরাও পাবেন। সরকারের মালিকানাধীন বা তত্ত্বাবধানাধীন চা বাগানের শ্রমিকরা এই হারে এসব সাময়িক সুবিধা ভোগ করবেন : ক. দুই সদস্যবিশিষ্ট অদক্ষ শ্রমিক পরিবার মাসিক অতিরিক্ত ২০ টাকা পাবেন।
খ. দ্ইু সদস্যবিশিষ্ট অদক্ষ শ্রমিক পরিবার মাসিক অতিরিক্ত ১০ টাকা পাবেন।
১৯৭২ সালের মে দিবসের শ্রমিক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন “বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক, অন্যদিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” সংবিধানে জাতীয় চার নীতির অন্যতম নীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ যুক্ত করা হয়। যার মর্মার্থ হলোÑ শোষণবিহীন সমাজ। জাতির পিতা সংবিধানে মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলাদেশ সংবিধান : অনুচ্ছেদ ১৪ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে মেহনতী মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিকের-এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।
বাংলাদেশ সংবিধান : অনুচ্ছেদ ১৫ কর্মের অধিকার অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করে যুক্তিসংগত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার; যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার।
বাংলাদেশ সংবিধান : অনুচ্ছেদ ৩৪ সকল প্রকার জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধ; এবং এই বিধান কোনভাবে লংঘিত হইলে তাহা আইনত: দ-নীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।
বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে শ্রম অধিদফতরকে ঢেলে সাজান হয়। এসময় শ্রম ও সমাজ কল্যাণবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হয়। বঙ্গবন্ধু শিশু আইন প্রণয়ন করেন। মজুরি পরিশোধ, শিশুশ্রম রোধ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, শ্রমজীবীদের ক্ষতিপূরণ ও স্বার্থ সংরক্ষণবিষয়ক আইনগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করেন। দেশের শ্রমজীবী মানুষ যাতে করে জাতীয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে অংশীদার বলে ভাবতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার পরিচালকদের মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব সংবলিত আইন প্রণয়নের নির্দেশ জারি করা হয়। জেলেদের মাঝে মাছ ধরার আধুনিক সরঞ্জাম, ন্যায্যমূল্যে জাল বোনার সুতা ও নৌকা নির্মাণের জন্য উপকরণ বিতরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাঁত শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁতিদের জন্য রং, সুতা থেকে শুরু করে তাঁতের জন্য যা যা প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সহজলভ্য করেন।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় (১৯৭৫-৯৬)
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর সামরিক শাসকগোষ্ঠী শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে আওয়ামী লীগ গৃহীত পদক্ষেপগুলো একে একে বাতিল করলে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের জীবনে নেমে আসে অত্যাচার-নির্যাতনের খড়গ। বঙ্গবন্ধুর সরকার যেখানে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা, বকেয়া ঋণ ও কর মওকুফ করে দিয়েছিলেন সেখানে ১৫ আগস্ট-পরবর্তীতে খুনিচক্র ক্ষমতায় বসে সেই খাজনা এবং বকেয়া ঋণ ও কর চক্রবৃদ্ধি সুদসহ আদায় করে। নিত্যনতুন করারোপ করে গরিব কৃষক-শ্রমিককে শোষণ করা মোশতাক-জিয়া খুনি সরকারের একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। রেল ভাড়া, লবণ কর, কীটনাশক ঔষধের মূল্য, কৃষির সরঞ্জাম, পাওয়ার পাম্প ও তেলের দাম মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি করা হয়। বৈদেশিক ঋণের দাসত্বের নিগঢ়ে বেঁধে ফেলা হয় গোটা জাতিকে।
বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গৃহীত জাতীয়করণ নীতি বানচাল করার জন্য মুনাফা অর্জনকারী শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানার সাবেক পাকিস্তানি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দান, পুঁজি বিনিয়োগের সিলিং শিথিলকরণ এবং তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক বহু জাতিভিত্তিক সংস্থাসমূহের স্বার্থসংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা থাকে না, নির্বিবাদে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। ফলে এসব শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের জীবনে আসে দুর্বিষহ অত্যাচার-নির্যাতন। তারা আবারও মালিক পক্ষের শোষণ-নিপীড়নের শিকারে পরিণত হয়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৫ জন মানুষ তখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। শতকরা ৫৭ জন কৃষক  ভূমিহীনে পরিণত হয়, বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় যা ছিল মাত্র ৩৭ শতাংশ। প্রায় ১ কোটি কর্মক্ষম যুবক বেকার জীবনে বাধ্য হয়। অন্যদিকে পাঁচ বছরে (১৯৭৫-৮০) বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। গরিব আরও গরিব হতে থাকে, গরিবের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ধনী আরও ধনী হতে থাকে। এ সময় স্বৈরাচার সরকারের ভ্রান্তনীতির ফলে শত শত কল-কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ায় অগণিত শ্রমিক-কর্মচারী বেকারত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯ শ্রমিককে প্রাণ হারাতে হয়।
১৯৭৭ সালের চরম রাজনৈতিক বৈরিতা, জেল-জলুম, অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যে ১ মে দেশব্যাপী মহান মে দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ। এই মে দিবসে শ্রমিক-শ্রেণি তথা মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। শ্রমজীবী মানুষের লক্ষ কোটি কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়।
১৯৮১ সালে ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত গঠনতন্ত্রে কৃষক-শ্রমিকসহ সকল মেহনতি ও অনগ্রসর জনগণের ওপর শোষণ অবসানের জন্য পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শোষণমুক্ত ও সুষম সাম্যভিত্তিক এক সমাজ প্রতিষ্ঠার  কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি বলেনÑ
‘বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই।… … … আমি চাই বাংলার মানুষের মুক্তি। শোষণের মুক্তি। বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন। আজ যদি বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে, তবে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি আপনাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করে মরতে চাই।’
১৯৮২ সালের ১ মে শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ। এ সময় বিভিন্ন শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বৈর-সামরিক শাসনবিরোধী দুর্বার আন্দোলন শুরু করে আওয়ামী লীগ। ’৮৩-র স্বৈরাচার-বিরোধী মুক্তির লড়াইয়ে একাত্ম হয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যপরিষদ। ১৫ দল, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আর শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গড়ে তোলে দুর্বার গণ-আন্দোলন। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঘোষিত ৫-দফা দাবিতে বলা হয়Ñ ‘শ্রমিক, কর্মচারী, কৃষক, ক্ষেতমজুরসহ সকলের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
১৯৮৪ সালের ১৪ অক্টোবর ১৫ দল ও ৭ দল আহূত জাতীয় মহাসমাবেশ হতে গণমানুষের অধিকার ও দাবি প্রতিষ্ঠার ২১-দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। ২১-দফা কর্মসূচিতে কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, শিক্ষকসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের মৌলিক দাবিসমূহ স্থান পায়।
১৯৮৬ সালের ১৬ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগসহ ঐক্যজোট নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মহাসমাবেশের সফল প্রস্তুতির লক্ষ্যে আলোচনায় মিলিত হয় এবং যুগপৎ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশ হতে অধিকারবঞ্চিত সংগ্রামী জনতা দলে দলে ছুটে এসে মিলিত হয় শেরেবাংলা নগরের ঐতিহাসিক জাতীয় মহাসমাবেশে। মহাসমাবেশ থেকে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, জনতা স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়Ñ
‘সরকারী ও বেসরকারী উভয় খাতে শ্রমিকদের শ্রম সংগঠন প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষিত হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারী খাতে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাকল্পে মালিক, শ্রমিক ও অন্যান্য প্রতিনিধি সমন্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনার মাধ্যমে মজুরী নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে।’
১৯৯২ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ঢালাওভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিরোধিতা করা হয়। কাউন্সিলে আদমজী মিল বন্ধ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করা হয়। ১৯৯৪ সালের ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর ‘কৃষক বাঁচাও Ñ দেশ বাঁচাও’ কর্মসূচিকে সামনে নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জেলা ও থানা পর্যায়ে গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক ও থানা নির্বাহী অফিসারের কাছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত কৃষকদের সমস্যা সমাধানে ১১-দফা দাবিনামা পেশ করা হয়। ন্যায্যমূল্যে সারের দাবি জানাতে গিয়ে বিএনপি সরকারের পুলিশের গুলিতে নিহত ১৮ জন নিরীহ কৃষকের রক্তে বাংলার শ্যামল প্রান্তর রঞ্জিত হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে আওয়ামী লীগ।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে শ্রম অধিকার (১৯৯৬-২০০১)
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের এ আমলে শ্রম ও জনশক্তি খাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এ সরকারের আমলে স্থাপিত হয় ১ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭৭টি ছোট-বড় শিল্প-কারখানা। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।
তাঁতবস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেনারসি পল্লী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তাঁতিদের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন ও পুনর্বাসন শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। প্রান্তিক তাঁতিদের চলতি মূলধন সরবরাহের লক্ষ্যে ৫০ কোটি টাকা ব্যয় সংবলিত ক্ষুদ্র কর্মসূচি শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ সময় সর্বপ্রথম তাঁতিদের আমরা ঋণ দেওয়া শুরু করা হয়। অতীতে তাঁতিদের ঋণ দেওয়া হতো না।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী ৬৫ হাজার শ্রমজীবী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শরণার্থী দেশে ফিরে আসে। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু করা হয় বর্গাচাষিদের কৃষিব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা। বাংলাদেশের কৃষক, বর্গাচাষিরা কোনো দিন ব্যাংকের ঋণ পেত না।
শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন কর্তৃক প্রণীত শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরির সুপারিশ বাস্তবায়িত করা হয়। গার্মেন্ট শিল্পে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়। নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক ‘শ্রমনীতি’ প্রণয়ন করা হয়। নিশ্চিত করা হয় শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার। ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্বভার সংশ্লিষ্ট শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের সীমা যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে তাদের দায়িত্বও। ফলে পাঁচ বছরে শিল্প প্রবৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার অর্জিত হয় ১৯৯৭-৯৮ সালে ৮.৫ শতাংশ।
এ সময় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে ৫৭টি শিল্পনগরী স্থাপন করা হয় এবং ১৩টি শিল্পনগরী স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়। ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০০-০১ অর্থবছর পর্যন্ত বিসিক-এর অধীনস্ত নিবন্ধনকৃত শিল্প ইউনিটের আওতায় ৬৪ হাজার ২৪ থেকে ৭২ হাজার ৫৯৫ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডকে পুনর্গঠিত করা হয়। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২টি শিল্প ইউনিট বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে বিতরণ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের এই আমলে পল্লী সমাজকর্মের পরিধি সম্প্রসারিত করতে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩১১টি উপজেলায় কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে পল্লীর দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানরত ভূমিহীন কৃষক, বেকার যুবক, দুস্থ মহিলা, বিদ্যালয়-বহির্ভূত কিশোর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ তাদের স্ব-কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়। দেশের বেকার যুবকদের জন্য লাভজনক ও উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার  প্রতিষ্ঠা করে কর্মসংস্থান ব্যাংক। ১৯৯৬ সালে বেতনসহ চার মাস পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি ঘোষণা করা হয়।
জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদ (২০০৯-১৭)
আওয়ামী লীগ যখনই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে তখনই শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, শ্রমিকরাই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরপরই জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানার শ্রমিকদের মজুরি ও ভাতা প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৬০ বছরে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেমন বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবীদেরও বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে ১৬টি ধাপে সর্বনি¤œ ২ হাজার ৪৫০ থেকে ৪ হাজার ১৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকায় মজুরি স্কেল ও ভাতা/প্রান্তিক সুবিধাদি নির্ধারণ করে পণ্য উৎপাদনশীল রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিক (চাকরির শর্তাবলী) আইন, ২০১২ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
২০১০ সালে দেশের শ্রমঘন ও সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্ট শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি ১ হাজার ৬৬২ থেকে ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৩ হাজার টাকা পুনর্নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। পরবর্তীতে পুনরায় ২০১৩ সালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি ৩ হাজার টাকা থেকে ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫ হাজার ৩০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অন্যান্য সেক্টরেও নি¤œতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিক থেকে শুরু সকল পর্যায়ের শ্রমজীবী মানুষ যাতে স্বচ্ছলভাবে চলতে পারে সে ব্যাপারে জাতীয় মজুরি কমিশন কাজ করছে।
আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার বেকার নারী-পুরুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মে নিয়োজিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় গার্মেন্ট নারী শ্রমিকদের আবাসন তৈরি করা হচ্ছে। কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। চাকরিজীবী মেয়েদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ করা হচ্ছে। শ্রমিকদের জন্য এমনকী গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ এবং ডরমেটারি নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমজীবী মহিলাদের ছোট বাচ্চাদের যাতে বাড়িতে অনিশ্চয়তায় ফেলে রেখে আসতে না হয় তার জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। নারী শ্রমিক ও তাদের শিশুদের কল্যাণে ৩ হাজার ৯৪৬টি কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস পর্যন্ত করা হয়েছে।
সরকার বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা, ২০১০ প্রণয়ন করেছে এবং এই আইনের বিধান স্পষ্টীকরণ ও বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) আইন ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার উদ্দেশে একটি আধুনিক শ্রমনীতি প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়ায় বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৩ সালে জুলাই মাসে মহান জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি সহজীকরণ, শ্রমিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও কারখানার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন-২০১৩) আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হয়নি এমন শিশুকে শ্রমে নিয়োগ এবং অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘শিশুদের জন্য জাতীয় সিএসআর নীতি’ প্রণয়নের লক্ষে সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই নীতি প্রণয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। জাতীয় শিল্প স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি নীতিমালা, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৫, ট্রেডস মার্ক বিধিমালা-২০১৫ প্রণীত হয়েছে।
প্রতিবছর এই তহবিলে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা জমা হবে। এই অর্থ গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করা হবে। শ্রমিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে গঠিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের এই তহবিলে বর্তমানে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এই তহবিল থেকে ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সহ¯্রাধিক শ্রমিককে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা কল্যাণ, গোষ্ঠীবীমার প্রিমিয়াম ও শিক্ষা-বৃত্তি বাবদ প্রদান করা হয়েছে। ইপিজেডস্থ শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং কল্যাণের জন্য ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৪’ শিরোনামে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র নতুন শ্রম আইন নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। ইপিজেডের ২২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়েছে, যারা সিবিএ হিসেবে কাজ করছে।
চা-শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কল্যাণে চা আইন-২০১৫ এবং শ্রমিক কল্যাণ আইন-২০১৫ চূড়ান্ত করা হয়েছে। চা-শ্রমিকদের কল্যাণে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বিল ২০১৬ পাস হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে কোনো শ্রমিক শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম হওয়ার কারণে চাকরি থেকে অবসর, অপসারণ বা অব্যাহতি পেলে তাকে তহবিল থেকে এককালীন অনুদান দেওয়া হবে। কোনো শ্রমিক চাকরিরত অবস্থায় বা অবসর নেওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে মারা গেলে প্রাপ্য অনুদান তার পরিবার পাবে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৪২৬টি তাঁতের বিপরীতে ১৪২ তাঁতিকে ৪৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে এবং সেই সাথে তাঁতিদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গার্মেন্ট শিল্প ও তাঁত শিল্পের মানোন্নয়নে টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্যাশন ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাছাড়া তাঁত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, নরসিংদীতে অবস্থিত প্রশিক্ষণ সেন্টারকে আরও উন্নত করা হয়েছে এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল কোর্স সেখানে চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এই কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে তাঁতি পরিবারের সন্তানদের ১০ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন নতুন ডিজাইন উদ্ভাবনের লক্ষে ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ফ্যাশন ডিজাইন ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং একটি বেসিক সেন্টার স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নরসিংদীতে একটা ফ্যাশন ডিজাইন ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে। আর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে একটি করে মোট ৩টি প্রশিক্ষণ উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে।
মাদারীপুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় তাঁত পল্লী গড়ে তোলা হচ্ছে। সেই সাথে বেনারসি প্রস্তুতের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় ১২০ একর জমিতে তাঁত পল্লী স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কুটির শিল্পের সংস্থার মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের তারাবোতে ক্ষুদ্র তাঁতিদের জন্য প্লট দেওয়া হচ্ছে। রংপুর এবং এর পার্শ্ববর্তী জেলায় তাঁতিদের উন্নয়নে ২০১১-তে রংপুরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বেসিক সেন্টার ও প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনসহ ৫০০ তাঁতিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। গত আট বছরে সারাদেশে তাঁত সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ১৮৯ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
সিলেটের মণিপুরী তাঁত শিল্পের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, নকশা উন্নয়ন, তাঁত বস্ত্র প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে ৬০০ মণিপুরী তাঁতিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করাসহ তাঁতিদের উৎপাদিত বস্ত্র বিপণনের সুবিধার্থে সিলেটের জিন্দা বাজারস্থ ওয়েস্টওলাল্ড শপিং সিটিতে একটি প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। নারী ব্যবসায়ী যাতে গড়ে ওঠে, বিয়োগকারী গড়ে ওঠে সেজন্য সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বিসিক শিল্পনগরীতে ১০ শতাংশ প্লট মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। এসএমই খাত থেকে যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে সেখানেও মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা এবং মেয়েদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বতন্ত্র জামদানি পল্লী স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রায় ৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নারাণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলাধীন তারাবো ইউনিয়নের নোয়াপাড়াতে ২০ একর জমির ওপর ইতোমধ্যে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এই শিল্পনগরীতে মোট ৪০৯টি শিল্প প্লট রয়েছে, ৩৯৯টি প্লট উদ্যোক্তাদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং এখানে ৩৬৩টি জামদানি শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়েছে। তাছাড়া সেখানে একটি হাটকর্নার স্থাপিত হয়েছে।
ইউনেস্কোর উদ্যোগে আজারবাইজানের বাকুতে ১০০টি দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত ইন্টারগভর্নমেন্ট কমিটির অষ্টম সম্মেলনে প্রদর্শিত পণ্যগুলোর মধ্য থেকে ইউনেস্কোর জুরিবোর্ড ৭টি ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের তালিকাভুক্ত করে। যার মধ্যে বাংলাদেশের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং পৃথিবী খ্যাত মসলিনের উত্তরাধিকার জামদানি অন্যতম। ইউনেস্কোর তালিকাভুক্তির পর সরকার জামদানিকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৫ সালে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বিধিমালা’ করে বিসিকের মাধ্যমে আবেদন করে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রথম নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে সনদ পেয়েছে জামদানি। ফলে এখন এর স্বত্ব কেবলই বাংলাদেশের।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদেশে গমনেচ্ছুরা এই ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে পারছেন। দেশে ফিরে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিতে পারছেন। একদিনেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন। কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে ২০১৩ সালে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন প্রণয়ন করা হয়। প্রবাসে মৃত্যু হলে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিবার দেশে ৩ লাখ টাকা এবং বিমান বন্দরে মৃত ব্যক্তির পরিবার লাশ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এ ছাড়া অসুস্থ ও পঙ্গু ব্যক্তিদের জন্য ১ লাখ টাকা প্রদান করা হচ্ছে, বিদেশগামী সকল কর্মীকে বীমা করে দেশের বাইরে আসার বিষয়টিও নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিবাসী কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারই ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ জন্য ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৭’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণের জন্য বোর্ড গঠন করবে সরকার। প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের বীমার আওতায় আনা হবে এবং তাদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী শ্রমিকরা প্রবাসে সম্মানের সাথে কাজ করছেন। প্রবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য ‘প্রবাসী নারীকর্মী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠন করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহনে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশে ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন বেসরকারি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বিধিমালা ২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্মাণ ও মটরযান মেরামত সেক্টরে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশ জীবনবীমা কর্পোরেশনের সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি দুটি আলাদা আলাদা গোষ্ঠী বীমা স্কিম চালু করা হয়েছে।
সরকার মৎস্য আহরণ করে বেঁচে থাকা শ্রমজীবী মানুষের তথা মৎস্যজীবীদের কল্যাণে ‘জাল যার জলা তার’ নীতি বাস্তবায়ন করছে। এজন্য জলমহাল বা উন্মুক্ত জলাশয় লিজ দেওয়ার সময় যেন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা লিজ পান তা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত সারাদেশের প্রায় ১৫ লাখ জেলেকে নিবন্ধন করা হয়েছে। ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু, জলদস্যু এবং বাঘের আক্রমণে প্রাণহানি, কুমির ও সাপের কামড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারকে অনুদান প্রদান করা হচ্ছে।
মৎস্য চাষি, মৎস্যজীবী ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সকল স্তরের মৎস্য চাষিদের এবং ভূমিহীন, বেকারদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ইলিশ মাছের উৎপাদন যাতে বাড়ে তার জন্য ঠিক যে সময় ইলিশ মাছ ডিম দিতে আসে এবং জাটকা যাতে না ধরে তার জন্য জেলেদের ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এসব জেলেদের বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে, বিকল্পভাবে তারা যেমন খাঁচার মধ্যে মাচের চাষ বা অন্যান্যভাবে কিছু করে খেতে পারে সে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে সরকার। বর্তমানে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারছে ৫০ লাখ পরিবার। এই সুবিধা নেওয়া জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই শ্রমজীবী মানুষ।
গৃহকর্মে নিযুক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতি গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের কাজে নিরাপত্তা, শোভন কর্মপরিবেশ, মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারী ও গৃহকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক সমুন্নত রাখা এবং কোনো অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা নিরসনে কাজ কাজ করবে। অনিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এবং নিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অনিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের বছরে একটি উৎসব ভাতা এবং নিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের দুটি উৎসব ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থাৎ কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা)-তেও খাদ্যশস্য ও নগদ টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী ১৯৯১-৯২ সালে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মজুরি চালের মানদ-ে ছিল ৩.২৫ কেজি, যা ২০১০ অর্থবছরে ৮ কেজিতে উন্নীত হয়। আর বর্তমানে শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ৫ কোটি মানুষ আজ নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। যে দারিদ্র্যসীমা বিএনপির আমলে প্রায় ৪৭ ভাগের মতো ছিল, আজ তা ২২ ভাগে নেমে এসেছে। আর এই দারিদ্র্যসীমা থেকে মধ্যবিত্তের স্তরে উঠে আসা জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ হলো এ দেশের শ্রমজীবী মানুষ।

Category:

প্রসারিত হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিগন্ত

Posted on by 0 comment

25মুহাম্মদ জমির: গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়ন জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নেতৃত্বের ইতিবাচক প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে অযথা অপরাজনীতি পরিলক্ষিত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ জোরদারে শেখ হাসিনা সরকারের আন্তর্জাতিক দরকষাকষির চেষ্টাকে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিভ্রান্তিমূলক ব্যাখ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে।
নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক বিস্তৃত পরিম-লের অংশীদার হওয়া সংক্রান্তে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগও গত মাসজুড়ে কিছু সমালোচকের চক্ষুশূল হয়েছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩৬তম আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সফল উদ্বোধন ও সুন্দর পরিসমাপ্তি প্রশংসার পরিবর্তে তথাকথিত সমালোচকের ছিদ্রান্বেষণের শিকার হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান সরকার কানাডা, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ, ভারতের গোয়া, ডাভোস, সুইজারল্যান্ডের মিউনিখ, জার্মানি এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক ও জাতীয় ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করেছে। সন্ত্রাস প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অভিবাসীদের সমস্যা নিরসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সম্পর্কিত বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ও কর্মকা-ে মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের যে সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।
গত অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং-এর সফল সফর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে সরকারের উক্ত পদক্ষেপসমূহেরই প্রতিফলন।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতি যে ধারায় বাস্তবায়িত হচ্ছে তাতে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল এবং দূর প্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকারই প্রতিফলিত হয়। বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরও এ বাস্তবতায় অনুধাবন করতে হবে। এতে বাংলাদেশ-ভারতের ইতিবাচক পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি গভীর ও বিস্তৃত সহযোগিতার যৌথ রূপরেখা অঙ্কিত হয়েছে। গত জুন ২০১৫-তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের পর এর ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ সফর পারস্পরিক স্বাভাবিক সৌজন্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে যে, মোদির বাংলাদেশ সফরকালীন ২২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এ চুক্তিগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং ভারতীয় জালমুদ্রা বিস্তাররোধ সংক্রান্ত চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত। উক্ত সফরে ভারত বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তাসহ বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
শেখ হাসিনার উক্ত সফরে ভারতের সাথে ৩৬টি ‘বাইলেটারেল ইন্সট্রুমেন্ট ইন দ্যা ফরমেট অব এগ্রিমেন্টস’, ‘মেমোরেন্ডাম আব আন্ডারস্ট্যান্ডিংস’ ও ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কয়েকটি ‘লাইন অব ক্রেডিট’ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয় যেগুলো আরও পাঁচ বছরের জন্য আরও অধিক সংখ্যক বর্ডার হাট স্থাপন, তথ্য ও প্রচার বিভাগ, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইসিটি, কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ গবেষণা, ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, জ্বালানি ও খনিজ সেক্টর, প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত (যৌথ প্রশিক্ষণ, তথ্য ও গবেষণা বিনিময়) এবং অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পর্কিত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নতুন দিল্লিতে অবস্থানকালে গত ৮ এপ্রিল ২০১৭-তে এক যুক্ত বিবৃতিতে প্রকাশ করা হয় যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা হয়েছে। উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব, সমতা, আস্থা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে উভয় দেশের সম্পকোন্নয়ন জোরদার ও উভয় দেশের সর্বক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব এ আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল। এ ছাড়াও, এ অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখা, সমন্বিত সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের যৌথ আকাক্সক্ষাও বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়।
এ দিল্লি সফরে দুদেশই সহমত পোষণ করে যে, সন্ত্রাস এ অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান হুমকি এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সন্ত্রাসী নির্মূল, সন্ত্রাসী সংগঠন ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যেসব রাষ্ট্র বা সংগঠন সন্ত্রাস বিস্তারে আর্থিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সন্ত্রাসে সমর্থন জোগায় এবং সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের আস্তানা গাঁড়তে সহযোগিতা করে, তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হবে। সন্ত্রাস নির্মূলে উভয় দেশের এ ঐক্যমত পাকিস্তানকে লক্ষ্য করেই হয়েছে মর্মে বিশ্লেষকগণের অভিমত।
উভয় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় আরও উন্নত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়। সীমান্ত এলাকা দুর্বৃত্তমুক্ত করা এবং সীমান্ত হত্যা শূন্যেও কোঠায় নামিয়ে আনারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা অগ্রণযোগ্য এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখানে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিয়ে করার জন্য ফেরার সময় যুবতী ফেলানীর অনাকাক্সিক্ষত হত্যাকা- বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি স্মর্তব্য। হতাশাজনক হলেও সত্য যে, ফেলানী হত্যাকা-ের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেলেও ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় এখনও ফেলানীর হত্যাকারীদের বিচার হয়নি। এ প্রেক্ষিতে উভয় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় আরও উন্নত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া মানে শুধু চোরাচালানি, মানবপাচার ও মাদকপাচার প্রতিরোধই নয়, মানবাধিকার সমুন্নত রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ ও ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে দুদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে ৩টি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষর করেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে কৌশলগত ও সামরিক ক্ষেত্রে দুদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধির স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সার্বভৌমত্ব ও সমতারভিত্তিতে কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া শক্তিশালী করতে এ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রেক্ষিতে, এই সফরে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ব্যবহারের নিমিত্ত প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের লক্ষ্যে ভারত থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ‘লাইন অব ক্রেডিট’-এর জন্যও একটি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষরিত হয়। এ অর্থ দিয়ে কেবল ভারত নয়, অন্য কোনো দেশ থেকেও সামরিক সরঞ্জামাদি ক্রয় করা যাবে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এ সফর আরও একটি কারণে গুরুত্ব বহন করেÑ বাংলাদেশের একটি বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফরসঙ্গী হয়ে ভারতে যান। তারা ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সাথে পৃথক পৃথক সভায় মিলিত হন। দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আলোচনা হয়। এ ছাড়াও, বাংলাদেশ থেকে কীভাবে ভারতে রপ্তানির বহুমুখী সুযোগ বৃদ্ধি করা যায়, আধাশুল্ক ও শুল্কবিহীন সম্পর্কিত বাধা অপসারণ করা যায় এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি রপ্তানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উত্তোলন করা যায়, বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকিং যোগাযোগ স্থাপন ও ভারতের বিদ্যমান কর কাঠামোর বেড়াজাল সহজতর করা যায় এ বিষয়গুলোও সভাসমূহে আলোচনা করা হয়। সমন্বিতভাবে মালামাল পরিবহনে স্থল শুল্ক স্টেশন ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে দুদেশের মধ্যে ঐক্যমত হওয়ায় ব্যবসাক্ষেত্রে আশার সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসাক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভারতের জন্য পৃথক রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ভারত ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক মর্মে জানা যায়।
রিপোর্টে আরও জানা যায়, পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও বিকিরণ প্রতিরোধ, বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্র, দ্বিপক্ষীয় বিচারিক ক্ষেত্র, ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানক্ষেত্র এবং সিরাজগঞ্জ থেকে দাইখোয়া ও আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত প্রটোকল রুটে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে কারিগরি তথ্যবিনিময় ও সহযোগিতার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন ‘লাইন অব ক্রেডিট’ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও, জ্বালানি ক্ষেত্রসহ নদীপথে খননকাজ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আরও কয়েকটি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষরে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে।
যা-ই হোক, এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি হলেও, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অযৌক্তিক ও অনড় অবস্থানের কারণে তিস্তা নদীর পানিতে ন্যায্য পাওনা আদায়ে বাংলাদেশের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ তিস্তা নদীর পানি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত না হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি চুক্তি হবে মর্মে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা সংক্রান্তে একটি ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যুগ যুগ ধরে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশিদের মধ্যে এই আশাবাদ পর্যাপ্ত আস্থা সৃষ্টিতে সহায়ক নয়। নরেন্দ্র মোদি যেভাবে স্থল সীমানা চুক্তি করাসহ তা বাস্তবায়ন করেছেন, সেরকমভাবে তার পক্ষ থেকে একটি সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভারতের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থে আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির সব চুক্তি ও চেষ্টার সাথে মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়।

অনুবাদ : আনিস মুহম্মদ, কবি-অনুবাদক

Category: