Blog Archives

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা : সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: বহুল আলোচিত বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সরকার পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ গত ৩০ মে শেষ হয়েছে। সর্বশেষ সাক্ষী ছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল কাহার আকন্দ। আগামী ১২, ১৩ ও ১৪ জুলাই আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির দিন ঠিক করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন আত্মপক্ষ শুনানির দিন ধার্য করেন।
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই নৃশংস হামলায় ২৪ জন নিহত ও পাঁচ শতাধিক লোক আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পতœী আইভি রহমান। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অন্যান্য নেতা এই গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যান। এতে অল্পের জন্য শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচ- শব্দে তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ঘটনায় পরদিন ২২ আগস্ট মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পুলিশের তদন্তের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্তের দায়িত্ব পায়। পরে মামলাটি যায় সিআইডিতে। ২০০৮ সালের ১১ জুন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল কাহার আকন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।
মামলার সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, চার্জশিটে অভিযুক্ত ৫২ জনের মধ্যে ১৯ জন পলাতক, ৮ জন জামিনে রয়েছেন এবং ২২ জন রয়েছেন বিভিন্ন কারাগারে। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসি হয়। মামলার অন্য দুই আসামি হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে।
মামলার আসামি বিএনপি-জামাত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী এবং সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তাÑ সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডির সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদ জামিনে রয়েছেন।

Category:

আওয়ামী লীগের ৬৮ বছর ও বাঙালির হিরণ্ম অর্জন

Posted on by 0 comment
29

৬৮ বছরের সংগ্রামী অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে, রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী আওয়ামী লীগ অতীতে কখনই ইতিহাস নির্ধারিত ভূমিকা পালনে পিছপা হয়নি।

অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন: সংগ্রাম-গৌরবের পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৬৮ বছর অতিক্রম করতে চলেছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনের ‘রোজ গার্ডেন’-এ এক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠলগ্নে এই দলের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দলীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা গ্রহণের মাধ্যমে ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। জন্মলগ্ন থেকে অদ্যাবধি এই দল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক অগ্রগতিসহ বাঙালির যা কিছু অর্জন সবই সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে।
সাম্প্রদায়িক ও অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি পৃথক ভূ-খ- নিয়ে কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠিত হয়। এই দুই অংশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি নৃতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে কোনো মিল ছিল না। অচিরেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেÑ রাষ্ট্রভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রশ্নে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ, সংস্কৃতিসেবী, বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ। এরই পটভূমিতে তরুণ সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণায় আত্মপ্রকাশ করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। এই ছাত্র সংগঠনই বাঙালির সকল জাতীয় আন্দোলনে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে আসছে।
একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া সাধারণ মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়Ñ এ উপলব্ধি থেকেই বাঙালির অধিকার আদায়ের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষে আওয়ামী লীগকে একটি শক্তিশালী ও গণমুখী দল হিসেবে গড়ে তোলেন।
১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন ১৯৫২ সালে গণজাগরণে পরিণত হয়। অব্যাহত রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার সংগ্রামী জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান কারাভ্যন্তরে থেকে ভাষা আন্দোলনে পালন করেন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে বলেছেনÑ ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করতে পারলে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খল আবার পরতে হবে। মাতৃভাষার অপমান কোন জাতি সহ্য করতে পারে না।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ-১৯৭)
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বীর শহীদদের আত্মদানের ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলন যৌক্তিক বিজয় অর্জন করে। ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়। তিন জাতীয় নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট বিজয় লাভ করে। কুটিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও বিভেদ সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় দুই বছরের (৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ থেকে ৭ অক্টোবর ১৯৫৮) আওয়ামী লীগ শাসন এবং কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের এক বছর (১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ১৯৫৭) শাসন সৃষ্টি করে গণতন্ত্র বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ সময় আওয়ামী লীগ সরকার ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি ঘোষণাসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে।
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে বঙ্গবন্ধুসহ সকল নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্র ছাত্রসমাজ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ দুই দশকের বঞ্চনা, ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ১৯৬৫ সালে সংঘটিত পাক-ভারত যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির ৬-দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। ৬-দফার পক্ষে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। ১৯৬৮ সাথে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে ৬-দফাভিত্তিক ১১-দফা আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। পতন ঘটে আইয়ুব স্বৈরশাহীর।
জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে নতুন সামরিক জান্তা সার্বজনীন ভোটাধিকার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিণত হন গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে।
নির্বাচনে সকল পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। লক্ষ কোটি মানুষ স্বাধিকারের দাবিতে সমুদ্র গর্জনে রাজপথে নেমে আসে। স্বাধিকার আন্দোলন পরিণত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামে। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
২৫শে মার্চ কালরাতে পাকহানাদার বাহিনী বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এক অধিবেশনে মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করেন। একই সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে গঠন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর বলে খ্যাত মেহেরপুর জেলায় বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে।
দীর্ঘ ৯ মাস লড়াই-সংগ্রামের পর ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও তিন লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। শুরু হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সংগ্রাম। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দেশ গড়ার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, কল-কারখানা ও ক্ষেত-খামারের উৎপাদন, ১ কোটি উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুসহ জনগণকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সকল কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের কারণে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ভারতীয় মিত্রবাহিনী স্বদেশে ফিরে যায়। মাত্র ৯ মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একটি সংবিধান উপহার দেয়। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে, সদস্যপদ অর্জন করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার। মাত্র সাড়ে তিন বছরে ধ্বংসস্তূপ থেকে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। কায়েম হয় অন্ধকারের রাজত্ব। শুরু হয় হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি।
খুনি মোশতাকের অপসারণের পর অস্ত্র হাতে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে। এ সময় আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার-নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জেনারেল জিয়া দেশে চালু করেন ‘কারফিউ গণতন্ত্র’। গণভোট ও নির্বাচনের নামে ভোটব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়। পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদ জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।
১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী নবতর আন্দোলনে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেয়। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তীব্র আন্দোলনে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। মানুষ আশায় বুক বাঁধে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ যাতে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় না আসতে পারেন সেই লক্ষ্যে শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র।
জামাতের সাথে গড়ে ওঠে বিএনপির গোপন আঁতাত। ষড়যন্ত্র ও আঁতাতের অংশ হিসেবে বিএনপি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয়। আবারও জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় বিএনপি। জনগণের ওপর নেমে আসে তীব্র রাজনৈতিক নিপীড়ন ও দমননীতি। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য খালেদা সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মানুষ গর্জে ওঠে। খালেদা জিয়া পদত্যাগে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। ২১ বছরের দুঃসহ স্বৈরশাসনের অবসান হয়।
শেখ হাসিনার সরকার জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সরকারের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। এ সময় গঙ্গা পানি চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সামাজিক ক্ষেত্রে অর্জিত হয় চমকপ্রদ সাফল্য। খাদ্য ঘাটতির দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় ২১শে ফেব্রুয়ারি অর্জন করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব। আওয়ামী লীগের এই পাঁচ বছরের শাসন আমল জাতীয় জীবনের এক স্বর্ণালি অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম একটি নির্বাচিত সরকার তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বিএনপি-জামাত জোটের যোগসাজসে কারচুপির মাধ্যমে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনিবার্য বিজয়কে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যা-নির্যাতন, মেয়েদের ওপর পাশবিক নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে বাংলাদেশকে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ বছরে শাসন আমলে বাংলাদেশের সামনে যে অমিত সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, বিএনপি-জামাতের দুঃশাসনে সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করার জন্য হয় গভীর ষড়যন্ত্র। তারই অংশ হিসেবে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হয়। নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। সরকারি মদদে উগ্রসাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়। বিএনপি-জামাত জোটের সর্বগ্রাসী লুটপাট ও অপশাসনের কারণে ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
শেখ হাসিনার আপসহীন সাহসী ভূমিকা এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ষড়যন্ত্রকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। অবশেষে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়। আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ঘোষণা করে। দিনবদলের সনদ ‘রূপকল্প-২০২১’-এর পথ ধরে দেশ পৌঁছে যায় উন্নয়নের মহাসড়কে। এ সময় জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জনগণের ভোটে আওয়ামী লীগ পুনরায় নির্বাচিত হয়। এ বিজয়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের গতিকে চলমান রাখা সম্ভব হয়েছে। সন্ত্রাস, অবরোধ, জঙ্গিবাদের সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা ঘোষণা দিয়েছেন ‘রূপকল্প-২০২১’-এর ধারাবাহিকতায় ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ জনপদ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নি¤œমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নে শীর্ষ পাঁচ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মানুষের মাথাপিছু আয় আজ ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার। মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭১.৭ বছর। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ আজ খাদ্য উদ্বৃত্তের বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
দেশপ্রেমের মহান ব্রত নিয়ে সকল বাধা-বিপত্তি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, নাশকতা মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সারাদেশে উন্নয়নের যে মহাযজ্ঞ চলছে তার সাথে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে দলের নেতা-কর্মীদের আজ দায়িত্ব নিতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত বিশাল কর্মী বাহিনীই আওয়ামী লীগের মূল শক্তি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘এই সংগঠন সঠিক নেতৃত্ব ও ত্যাগী কর্মী বাহিনী এবং জনসমর্থন পেয়েছে বলেই গৌরবের সাথে শত ষড়যন্ত্র, বাধা অতিক্রম করে বিজয় অর্জন করেছে, স্বাধীনতা এনেছে, পৃথিবীর বিপ্লবের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’
৬৮ বছরের সংগ্রামী অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে, রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী আওয়ামী লীগ অতীতে কখনই ইতিহাস নির্ধারিত ভূমিকা পালনে পিছপা হয়নি। আগামীতেও বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দল গৌরবের পতাকা বহন করে দেশকে নিয়ে যাবে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের স্বপ্নযাত্রায়। আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের প্রতি আবেদনÑ আসুন আমরা শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রাখিÑ তার হাতকে শক্তিশালী করি। তিনিই আমাদের নিয়ে যেতে পারবেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায়।

লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Category:

কবিতা

Posted on by 0 comment

33(C) 32(C)

Category:

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

Posted on by 0 comment

25উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ মে কক্সবাজারে দেশের সর্ববৃহৎ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করেছেন। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের পাড় দিয়ে চলে যাওয়া এই ৮০ কিমি দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সড়ক পথটি চার-লেন করার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিতে কক্সবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটিও চার-লেন করার ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মেরিন ড্রাইভওয়ে ’৭৫-এর পর থেকে দীর্ঘদিন অবহেলিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য অবলোকনে শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই করবে না; বরং এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত এই মেরিন ড্রাইভটি নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস আগেই নির্মাণকাজ শেষ করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে সংসদ সদসবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও আমন্ত্রিত অতিথিবর্গসহ সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথাও তার ভাষণে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কক্সবাজার এয়ারপোর্টে যাতে প্রতিসপ্তাহে ঢাকা থেকে অন্তত একটা ফ্লাইট আসতে পারে আপাতত সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে একটি আধুনিক-উন্নত বিমানবন্দর হিসেবেই গড়ে তোলা হবে। সেই প্রকল্পও আমরা শুরু করেছি। আপাতত একটি টার্মিনাল ভবন থেকে শুরু করে সবকিছুর কাজ আমরা শুরু করব। তিনি বলেন, আর যেসব মানুষ এ এলাকায় থাকতÑ আপনারা জানেন, প্রায় ৪ হাজারের মতো মানুষ তাদের জন্য আমরা আলাদাভাবে নদীর (কর্ণফুলী) ওপারে আমরা ঘরবাড়ি ও ফ্লাট তৈরি করে দিচ্ছি। এদের অধিকাংশই শুঁটকি তৈরি করেন, শুঁটকি বিক্রি করেন। তাদের জন্য সেখানে শুঁটকির হাটও করে দেওয়া হবে। শুঁটকি মাছ শুকানোসহ তাদের বাসস্থানেরও জায়গা করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সেই উন্নয়নের কাজও চলছে এবং নদীর ওপরে শীঘ্রই ব্রিজ বানানো হবে। এখানকার মানুষগুলোকে সেখানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি আমরা বিমানবন্দরের জন্য নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করব এবং রানওয়েটাকেও আরও প্রশস্ত ও দীর্ঘ করা হবে। এটা যেহেতু আন্তর্জাতিক এয়ার রুটে পড়ে তাই ভবিষ্যতে যে কোনো দেশ থেকে এখানে এসে যেন বিমান রিফ্যুয়েলিং করতে পারে তার ব্যবস্থাও করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এই মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের জন্য আমাদের সেনাবাহিনী যে কষ্ট করেছে, তারা সেই ২০১০ সালে যখন কাজ শুরু করল, এখানে কাজ করতে গেলে তো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই কাজ করতে হয়। এখানে কাজ করতে গিয়েই পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে আমাদের সেনাবাহিনীর ছয় সদস্য জীবন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর পর দেশসেবার সুযোগ লাভের পর থেকেই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নের জন্য। তিনি বলেন, কক্সবাজার সবসময়ই অবহেলিত ছিল, এত সুন্দর আমাদের একটা সমুদ্র সৈকত। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসে। কাজেই এ অঞ্চলটাকে আরও সুন্দরভাবে ও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলাটা আমাদের কর্তব্য বলেই আমরা মনে করি।

Category:

বিএনপির ‘ভীষণ’ এবং খালেদার মিশন

Posted on by 0 comment

26নূহ-উল-আলম লেনিন: গত ১০ মে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভিশন-২০৩০ শীর্ষক একটি মূষিক প্রসব করেছেন। পর্বত যেমন মূষিক প্রসব করে, এটিও তেমনি। আমাদের মুক্ত গণমাধ্যম, বিশেষ করে বহু সংখ্যক টেলিভিশন চ্যানেল খালেদার ভাষণে সেই  ভিশনটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে। দেশের পাবলিক খালেদা জিয়ার ‘ভীষণ’ শুনে উদ্বাহু নৃত্য করবে বলে চ্যানেলগুলো যে রকম ধারণা দিয়েছিল, কার্যত কয়েক দিনের মধ্যেই ফুটো বেলুনের মতো তা সে ধারণা শূন্যে মিলিয়ে গেছে। কী আছে ঐ ভিশনে? আওয়ামী লীগের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া কেন? আসলে নতুন কোন্ মিশন নিয়ে নেমেছেন খালেদা জিয়া? প্রায়শ আমাদের এসব প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে।
কোনো বিদ্বিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি না নিয়েই বলা যায়, বিএনপির ভিশন-২০৩০ হচ্ছে জনতুষ্টিবাদী (চড়ঢ়ঁষরংঃ) কিছু বাগ্ধারা এবং স্ব-বিরোধী কথামালা। নিঃসন্দেহে পরিবেশনার কায়দায় অর্থাৎ, ভাষা ও বাক্যবিন্যাসে নতুনত্ব আছে, চমৎকারিত্ব আছে। যেমনটি আমরা বলে থাকি নতুন বোতলে পুরনো মদ। যেমনÑ ‘ওয়ান ডে ডেমোক্রেসি’ (৩নং দফা), ‘ঈধপংঁং গঠন’ (৯নং দফা), ‘জধরহ-ইড়ি ঘধঃরড়হ’ (১০নং দফা) এবং ‘সুনীতি, সুশাসন এবং সু-সরকারের (৩এ) সমন্বয়’ (১১নং দফা), ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ (১৪নং দফা), ‘নতুন এক সামাজিক চুক্তিতে (ঝড়পরধষ ঈড়হঃধপঃ) পৌঁছাতে’ (১৬নং দফা) ইত্যাদি। ৪৮ পৃষ্ঠার (এর মধ্যে আবার ৭ পৃষ্ঠা ব্ল্যাংক) এই ভিশন দলিলটি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ঝানু (এক বা একাধিক) রাষ্ট্রবিজ্ঞানী/ অর্থনীতিবিদ/ সমাজবিজ্ঞানীর এবং পতিত বামচারীদের লেখা, তা এর ভাষা এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ব্যবহৃত ‘কোনোটেশন’-এর বহুল ব্যবহার দেখলেই বোঝা যায়। ভিশনের পাঠিকা বা ঘোষিকা, যিনি মাধ্যমিকের সিঁড়ি ভাঙতে গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়েন তার পক্ষে উচ্চতর রাষ্ট্র বা সমাজবিজ্ঞানের এতসব তাত্ত্বিক বিশেষণ ও পরিভাষা বোঝার প্রশ্নই ওঠে না। খালেদা জিয়া যদি ইনক্লুসিভ সোসাইটি বা জন লক, হবস ও রুশো প্রমুখ মনীষী রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীর ঝড়পরধষ ঈড়হঃধপঃ-এর তত্ত্বই বুঝতেন বা জানতেন, তা হলে বাঙালি জাতিকে সাংঘর্ষিক রাজনীতির জন্য যে বিপুল মূল্য দিতে হয়েছে, তা হতো না।
বিএনপির থিংক ট্যাংক এবং স্বয়ং খালেদা জিয়া বাঙালি জাতিকে এতটা বোকা ভাবলেন কী করে? যারা ‘সকল মত ও পথকে নিয়ে’ ‘জধরহ-ইড়ি ঘধঃরড়হ’ গড়তে চান, যারা ‘জনগণের বৃহত্তর সম্মিলনের মাধ্যমে ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ এবং ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি’ অবসানের লক্ষ্যে ‘নতুন এক সামাজিক চুক্তিতে’ (ঝড়পরধষ ঈড়হঃধপঃ) পৌঁছতে চান, তারা যখন বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটাতে চায়।’ (১২নং দফা, পৃষ্ঠা ৭) তখনই তো পরিষ্কার হয়ে যায়, ঘোষিত ভিশন-২০৩০ আসলেই একটা চরম ধাপ্পাবাজি। এটা যে ভিশন নয়, প্রকৃতই ‘ভীষণ’ তা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সামাজিক বিভাজন’ দূর করার উদ্ভট এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অভিলাষ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বেনামে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর গোপন অভিসন্ধি থেকে ’৭২-এর সংবিধান থেকে সামরিক ফরমানবলে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা কেটে দেয়।
যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, যে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি ভাবাদর্শের বিপরীতে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি, যার জন্য ত্রিশ লক্ষ মানুষ আত্মদান করেছেনÑ শহীদ হয়েছেন, খুনি ও নব্য পাকিস্তানি মতানুসারী জিয়া এক কলমের খোঁচায় সংবিধান থেকে তা কেটে দিয়ে কেবল মুক্তিযুদ্ধের সাথে বেইমানি করে নি, তথাকথিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নামে দেশবাসীকে নতুন করে বিভক্ত করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত জিয়ার সামরিক শাসন ও সংবিধান সংশোধনকে বে-আইনি ঘোষণা করেছে এবং নবম জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার ’৭২-এর জাতীয় চার নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন বিএনপি ও খালেদা জিয়া এরপরও যদি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ কথা বলেন, তা হলে তা কেবল সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধীই নয়, এ থেকে বিএনপির জাতিকে বিভক্ত করার পুরনো অভ্যাস এবং বেনামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গোপন অভিলাষই প্রকাশ হয়ে পড়েছে। চমৎকার সব কথার আড়ালে ‘থলের বিড়ালটি’ বেরিয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির আসল হোতা যে বিএনপি তা কি নতুন করে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের’ রাজনীতির শুরু তো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ভেতর দিয়ে। বিএনপি যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করত তা হলে হয়তো দেশের ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতো। তারা বিচার তো করেই নি, ১৯৯৬-২০০১ সালে শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার যে বিচার কার্যক্রম শেষ করে এনেছিল, যুদ্ধাপরাধী জামাতকে সাথে নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে খালেদা জিয়া সেই বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। কী ঘটেছিল ২০০১-এ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিএনপি-জামাত শাসনামলে, দেশবাসী কি তা ভুলে গেছে? ২০০১-এর নির্বাচনের পর হাজার হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থককে হত্যা-নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন তথা এথনিক ক্লিনজিং, গণধর্ষণ (পূর্ণিমা, মাহিমা, ফাহিমা-এর কথা কি আমরা ভুলে যাব?) এবং পরবর্তীতে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যা, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার সভাস্থলে গ্রেনেড বৃষ্টি ও নারী নেত্রী বেগম আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মীর হত্যাকা-, এসব কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের জাজ্বল্যমান প্রমাণ নয়? জঙ্গিবাদের উত্থান, বাংলাভাইকে প্রশ্রয় দান বাংলাদেশকে যেভাবে রক্তাক্ত করেছিল তা জাতি কোনোদিন বিস্মৃত হবে না। হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং প্রায় লক্ষাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করেছিল বিএনপি-জামাত জোট। এতসব অপরাধ ও সহিংস কার্যাবলীর জন্য দায়ী বিএনপি যদি এই ভিশন ঘোষণাকালে অতীতের এসব ঘটনার দায় শিকার করে জাতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করত, ভুল স্বীকার করত, তা হলে হয়তো দেশবাসী খালেদার ঝড়পরধষ ঈড়হঃধপঃ তত্ত্ব, ইনক্লুসিভ সোসাইটি গড়ার বাগাড়ম্বর এবং রঙিলা (জধরহ-ইড়ি ঘধঃরড়হ) জাতিত্ব সৃষ্টির ঘোষণাকে ধাপ্পাবাজি মনে করত না। দেশবাসী আশ্বস্ত হতো দেশের একটি বড় দল হিসেবে বিএনপি বুঝি সত্যি সত্যি নিজেকে পরিবর্তন করেছে এবং দায়িত্বশীল দল হিসেবে নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু না, স্বভাব যায় না ম’লে। আসলে বিএনপির, খালেদার মূলগত কোনো পরিবর্তন হয় নি। হবেও না।
আওয়ামী লীগ কেন এই স্ব-বিরোধী বাগাড়ম্বরপূর্ণ এবং প্রতারণামূলক ভিশনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, আশা করি উল্লিখিত আলোচনায় তা স্পষ্ট হয়েছে।
আমরা বলেছি, ভিশন ২০৩০-এ নতুন কোনো চমৎকারিত্ব নেই। এখানে অনেকগুলো ইস্যু আছে যা গতানুগতিক এবং অতীতের ধারাবাহিকতা। আমরা তাই অন্তঃসারশূন্য এবং কথার ফুলঝুরিতে বোঝাই বিএনপির এই ভিশন-২০৩০ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
তবে বিএনপি যে বলেছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে ভারসাম্য আনবে, সে ব্যাপারে আমাদের জিজ্ঞাসা, তিন দফায় ক্ষমতায় ছিলেন (তার মধ্যে দু’দফা সংসদীয় সরকার) তখন কেন ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ আনলেন না? সংবিধানের যে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল’ বলে বিএনপি নসিহত করছে, সেই সংশোধনী বিল তো বিএনপি-ই উত্থাপন করেছিল? মনে পড়ে এরশাদ স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখার অঙ্গীকার ভুলে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন না করার পাঁয়তারা করছিল, তখন আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সংবলিত একটি বেসরকারি বিল উত্থাপন করেছিল। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী প্রসঙ্গে তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ উত্থাপিত বিলটিও আলোচনার জন্য উত্থাপন করা হোক। শেখ হাসিনার প্রস্তাব শুনলে দুটি বিল আলোচনা করে গ্রহণ-বর্জনের ভেতর দিয়ে সর্বোত্তম সংশোধনী গ্রহণ করা যেত। খালেদা-বিএনপি তাতে রাজি হননি। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কেন্দ্রিভবন নিয়ে যিনি ভাষণ দেন, তাকে যদি প্রশ্ন করা যায়, এই কেন্দ্রিভবন তো আপনারই সৃষ্টি, আগে কেন পরিবর্তন করলেন না। দ্বিতীয়ত; আপনি যদি গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকেন, তা হলে আপনার দল বিএনপির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কীভাবে থাকেন? আপনার হাতে দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা রেখেছেন কেন? চার শতাধিক সদস্যের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা কস্মিনকালেও হয় না কেন? দলীয় কর্মকর্তা নির্বাচিত না করে ‘নিয়োগ’ করেন কোন্ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অনুসরণ করে? দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বা দিয়ে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজের দুর্বৃত্ত ও দ-প্রাপ্ত আসামি অর্বাচীন পুত্রকে ‘জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান’ করেন কোন মহৎ ‘গণতান্ত্রিক’ নজির স্থাপনের জন্য? এখানেও একই চালাকি ও ধাপ্পাবাজি।
ভিশন-২০৩০-এ বিএনপি ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪’ বাতিল (২৪নং দফা) ‘ন্যায়পাল’-এর পদ সৃষ্টি (২১নং দফা) প্রভৃতি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে। বিএনপির ২০০১ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও এই অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে তারা এর কোনোটিই বাস্তবায়িত করেনি। ওই নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, দারিদ্র্য নিরসন, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ, আইনের শাসন কায়েম, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন প্রভৃতি নানা প্রতিশ্রুতি ছিল। সেসব গালভরা প্রতিশ্রুতির কী পরিণতি হয়েছিল, দেশবাসী তার অর্জিত অভিজ্ঞতায় তা বুঝতে পেরেছে। খালেদার গুণধর দুই পুত্রের দুর্নীতি, হাওয়া ভবনে ক্ষমতার এবং লুটপাটের বিকল্প কেন্দ্র গড়ে তোলা, পাঁচ বছরের শাসনামলের চার বছরই দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া, ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি না করে খালেদা পুত্রের বিদ্যুতের খুঁটির ব্যবসা অর্থাৎ, লক্ষ লক্ষ খাম্বা স্থাপনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট, কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকের টাকা লুটপাট এবং মানি লন্ডারিং (যার জন্য খালেদার পুত্রদ্বয় ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর সরকার কর্তৃক অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে) প্রভৃতির মাধ্যমে দেশকে এক অতল অন্ধকারে টেনে নামিয়েছিল। দেশ পরিণত হয়েছিল মৃত্যু উপত্যকায়। খালেদা জিয়া তার হারানো রাজত্ব ফিরে পাওয়া, ক্রাউন প্রিন্স দ-প্রাপ্ত দুর্বৃত্ত পুত্র তারেক রহমানকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা এবং যুদ্ধাপরাধী জামাতকে পুনর্বাসিত করার মিশন থেকেই যে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ এই ভীষণ ও মিশনকে বাংলার মাটিতে কার্যকর হতে দেবে না।

Category:

জননী ও পুত্রেরা

Posted on by 0 comment

41খালিদ মারুফ: ধরে নেই এই গল্প প্রকল্পের প্রধান দুটি চরিত্রের নাম রফিক ও শফিক। তারা একই মায়ের গর্ভজাত, এমনকি তারা যমজ। তিন মিনিটের ব্যবধানে মায়ের জরায়ু ফুঁড়ে তারা ভূমিষ্ট হয়েছিল ধরণীর দিকে মুখ রেখে, অন্যেরা যেভাবে জন্মায়। প্রথমে রফিক, তারপর শফিক। তবে কে যে আগে আর কে পরে সেটা নিয়ে আঁতুড়ঘরের ধাত্রীদের মধ্যে কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও বাড়ন্ত সময়টাতে যখন রফিক শফিকের চেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল তখন সবাই নিশ্চিত হলো যে, রফিকই বড়। তারা তাদের মায়ের গর্ভে এসেছিল সেই মহা খুনের বছরটিতে। তাই হয়তো তাদের জন্মের পর আর দেশে খুন-খারাবি থামে নাই। তবে ছোটবেলা থেকে তারা এতটাই শান্তশিষ্ট যে তাদের নিয়ে সেই নাবালক অবস্থার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময়গুলি পাড়ি দেবার পর তাদের মায়ের আর বিশেষ দুশ্চিন্তা হয় নাই। এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিয়ের বয়েস কিছুটা পেরিয়ে গেলেও তাদের বিবাহ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্যও হয় নাই। এ নিয়ে মহল্লার লোকেরা যখন তাদের মায়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছে, ‘কি! রফিক-শফিকের মা, ছেলেদের কি বিয়ে-শাদি করাবা না?’ তখন তাদের মা মুখটাকে কিছুটা ডানে কিংবা বাঁয়ে ঘুরিয়ে নরম স্বরে জবাব দিয়েছে, ‘পাত্রী মেলা ভার।’ তা ছাড়া যেহেতু তারা যমজ তাই সবার মত হলো তাদের বিবাহটাও হওয়া চাই একই সাথে।
গত বছর তাদের মাকে এই দুরারোগ্য ব্যাধিটাতে পেয়ে বসবার আগে চুনকুটিয়ার কাজি বাড়ির আকরাম কাজির জ্যেষ্ঠ কন্যাটিকে তার মা অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মেয়েটার রূপ-গুণের কথা মাথায় রেখে রফিকের জন্য চূড়ান্ত করে রেখেছে। রণজিৎ কর্মকারের দোকান থেকে তার মায়ের একটা স্মৃতিবহ পুরনো আংটিকে ঘষে ধুয়ে তার ওপর আরবি আলিফ-লাম-মীম অক্ষর তিনটি খোদাই করে বিরাট একঝুড়ি পান আর বারো প্যাকেট মিষ্টি সহযোগে তাদের বংশের লোকেরা গিয়ে সেই আংটি পরিয়ে এসেছিল মেয়েটার মধ্যমায়। কেননা হাসি মুখের শ্যাম সুন্দরী সেই কনের অনামিকায় আংটিটা খুবই ঢলঢলে হয়ে যাচ্ছিল। পক্ষান্তরে মধ্যমায় সেটা মানিয়ে গিয়েছিল দারুণভাবে। কথা ছিল দ্রুতই শফিকের জন্য কন্যা নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে একসাথে মহাসমারোহে তাদের দুই সহোদরের বিবাহ হবে। আর এই অবসরে ছয় মাস বাকি থাকা ¯œাতক চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা সম্পন্ন করে নেবে মেয়েটা। যেহেতু শফিকের জন্য কন্যা এখনও নির্বাচন করা যায় নাই, তাই রফিকের প্রচ- ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে সেদিন চুনকুটিয়ার সেই বাড়িতে যায় নাই।
বারো মাসই কাঠের বাটওয়ালা ছাতা বহনকারী তাদের এক দূরাত্মীয়, মেয়েটার একটা ছবি সরবরাহ করেছিল রফিককে। এই যুগে এমন আকারের ছবি পাওয়া দুষ্কর। ছবি দেখে রফিকের শৈশবে লুকিয়ে পড়া একশ বছর আগেকার উপন্যাসের নায়িকাদের কথা মনে পড়েছিল। এটা নিজে তোলা নিজের ছবি নয়। স্টুডিওতে গিয়ে তোলা ছবি। পাসপোর্ট মাপের নয়, আবার সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ড সাইজেরও নয়। নিমতলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার সময় যখন মাঝবয়েসি ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় লোকটা ছবিটা হস্তান্তর করছিল। রফিক তখন মধ্য কার্তিকের আধা শীত আধা গরমেও ঘেমে গায়ে থাকা মোটা কাপড়ের শার্টটাকে ভিজিয়ে ফেলেছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে রফিক যখন বুঝতে পারল ছবিটা তার বুক পকেটে রাখা সংগত হবে না, তখন সে সেটাকে দ্রুতই হাতের চাপে ফেলে মাঝামাঝিতে একটা ভাঁজ দিয়ে মানিব্যাগের প্রধান পকেটটাতে রেখে সোজা ফিরে গিয়েছিল নিজের ঘরে। যাবার সময় তার মনে হয়েছিল ছবিটাকে ওইভাবে ভাঁজ করে মানিব্যাগে রাখা ঠিক হয় নাই। প্রাণহীন কাগুজে ফটোগ্রাফটাকে একটা সচেতন সত্তা বলে মনে হচ্ছিল তার। সে একবার ভাবলো মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকবে, পরক্ষণেই তার মনে হলো কেউ যদি হাতে মানিব্যাগ দেখে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কিরে রফিক! মানিব্যাগে কী?’ তা হলে একটা বিব্রতকর কা- ঘটে যেতে পারে, সেই ভাবনা থেকে মানিব্যাগে যাতে খুব বেশি চাপ না লাগে সেজন্য রফিক তাঁর পাছার মাংসপি-কে যতটা সম্ভব নরম করে দ্রুতই ঘরে ফিরে গেল।
ঘরে ফিরে সে দেখল তার সহোদর শফিক এই অসময়ে খাটের কোণে শুয়ে আছে। কী এক সংকট থেকে রফিক ছবিটা হাতে নিয়ে দেখা থেকে বিরত হলো। মনে হলো ছবিটাকে কোনোক্রমে বের করে টেবিলের নিচে কোনো একটা বইয়ের মধ্যে রেখে দেবে সে। সেটাও করল না। শফিকের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো সে জেগেও থাকতে পারে তাই ছবিটাকে সে মানিব্যাগে রেখেই হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তারপর ধাতস্থ হয়ে সে যখন বুঝল শফিকের কাছে বিষয়টা গোপন না করলেও চলে, তখন তার মায়ের ঘর থেকে ডাক পড়ল। তার মায়ের পীড়া ক্রমশ বেড়ে চলছে। তাদের মা এতখানি প্রৌঢ়া নন, তবে কলজে পচা রোগে পড়ার পর থেকে সে বুড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই তার কান্তিময় মুখ থেকে লাবণ্য খসে গিয়ে বলিরেখা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। মায়ের ঘরে ঢুকে রফিক তাঁর মাকে পেল ঘুমন্ত অবস্থায়। ঘুমন্ত মায়ের দিকে তাকিয়ে নির্বাক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বায়েজীদ বোস্তামীর শিক্ষাকে মাথায় রেখে পায়ে পায়ে মায়ের শিয়রে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ। তবে সারারাত নয়। ফিরে এসে শফিকের পাশে ঘুমিয়ে সে ‘সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। শফিকের জন্য কন্যাও ঠিক হবে আর সুস্থ হয়ে উঠবে তাদের মাও এবং তারপর…।’ এইসব সুখস্বপ্ন দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তৎপরবর্তী দিনগুলো অর্থাৎ মধ্য কার্তিক থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মাকে নিয়ে অনবরত রাজধানীর সব বড় বড় ডাক্তার বৈদ্য আর দূর-দূরান্তের ওঝার বাড়িতে ছুটে যেতে লাগল। এই সংকটকালে চাপা পড়ে গেল রফিক-শফিকের বিবাহের আয়োজনও।
সবাই জেনে গেছে এই কলজে পচা রোগে মানুষ কিছুতেই আর বেঁচে থাকে না, তিন মাস-চার মাস অধিক ছয় মাস। এই দিনগুলোতে তারা যেখানেই যায় সবাই জানিয়ে দেয়, ‘তোমাদের মা আর কিছুতেই বাঁচবেন না।’ তারপর রফিক-শফিক বিয়ে শিকেয় তুলে মাকে সারিয়ে তোলবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। ইত্যবসরে পিজি হাসপাতালের সবচেয়ে প্রবীণ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডও তাদের জানিয়ে দেয়: মানুষের পচা কলজে সারিয়ে তোলা কিংবা উপড়ে সেখানে নতুন কলজে প্রতিস্থাপন বিদ্যা এখনও তাদের অজ্ঞেয়।
মাঘের শেষে এসে তারা জানতে পারে বুড়িগঙ্গার ওই পারের মুখ ঢেকে রাখা সেই তান্ত্রিক, যাদুকর ও চিকিৎসকের কথা। ক্যানসারকেও সে সারিয়ে তোলে নিজের আবিষ্কৃত চিকিৎসায়। তার খবর রফিক-শফিকের কানে এসে পৌঁছায় সেই কনকনে ঠা-ার রাতটিতে। রাতটা কোনোভাবে কেটে যেতেই কুয়াশা মাথায় করে তারা বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে এপারে এসে তান্ত্রিককে খুঁজতে থাকে। সারাদিন খোঁজাখুঁজির পর, পুনরায় কুয়াশা এসে চারপাশের আলোকে ম্লান করে দেবার কিছুক্ষণ পূর্বে, শাঁখারি বাজারের রাস্তাটার সামনে, জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে নানারকম বন্যপ্রাণীর শরীর নানা কসরতে পুড়িয়ে ছাই কিংবা তেলে পরিণত করা নানা মরণব্যাধির দাওয়াই বেচতে থাকা অবস্থায় তারা সেই তান্ত্রিককে দেখতে পায়। তান্ত্রিক ও চিকিৎসক সেই স্বল্পালোকে পেতলের হাতলওয়ালা ছোট ধারাল ছোরাটা দিয়ে সকলের সামনে চাঁনখারপুল থেকে যাওয়া এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর পিঠ থেকে ফুলে সুপারির মতো হয়ে ওঠা টিউমারটাকে কেটে হাতে নিয়ে সমবেতদের প্রদর্শন করে। তারপর সেটা তার ধাতব বাটিটার মধ্যে জমে থাকা লাল জারকে টুপ করে ছেড়ে দেয়। সবাই বিস্ফোরিত নেত্রে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে। রফিক-শফিক দুই ভাই সামনে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। তারা দেখে, যে লোকটার পিঠ থেকে এইমাত্র সকলের সামনে টিউমারটা কেটে নেওয়া হলো সে নির্বিকার ভঙিতেই বসে আছে। এমন কি তান্ত্রিক তাকে প্রশ্ন করে, ‘কি! ব্যথা পেয়েছো?’ নির্বিকার ধুলোমাখা মুখটা উত্তর দেয়, ‘না’। রক্ত বেরুতে থাকা জায়গাটাতে সে তখন একদলা পিচ্ছিল ভেষজ ঘষে দিতে দিতে আবার প্রশ্ন করে, ‘কি! ব্যথা করছে?’ দাঁতে দাঁত চেপে ভাঙারি ব্যবসায়ী বলে, ‘না। একদমই না।’ হাতে রক্তমাখা ছুরিটা নিয়ে এবার সে দর্শক সারির সামনে চলে আসে। ‘কী! আর কী দেখতে চান?’ বলে হুঙ্কার দিয়ে অতৃপ্তদের লজ্জা ভেঙে দেয়। অতৃপ্তরা মানিব্যাগে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। প্রথমে লজ্জা ভাঙা একজন মুঠোয় চেপে রাখা দুমড়ানো অথচ চকচকে লাল পঞ্চাশ টাকার একটি নোট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমায় দিন এক শিশি।’ অতৃপ্ত লোকটা যতটা সম্ভব অনুচ্চস্বরে বলে কথাটা। যাদুকর চিকিৎসক বিকট চিৎকারে একটি শিশি তার হাতে পৌঁছে দিতে দিতে সেই তেলের ব্যবহার বিধি ঘোষণা করে, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশ্ন ফোলা থাকা অবস্থায় একবার শুধু মালিশ করে নিতে পারলেই হলো, বাকিটা বোঝা যাবে সেইদিন রাতেই।’ রফিক-শফিক দুই ভাই কিয়ৎক্ষণের জন্য নিজের পীড়িত মাকে ভুলে তাদের সমাগত বিবাহের রাতটি নিয়ে ঈষৎ চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরক্ষণেই দুই ভাই পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে যাদুকরের চিকিৎসার আসর শেষ হবার অপেক্ষা করে। যতেœ পাতা মাদুরের ওপর সার করে রাখা শিশিগুলো একটা একটা করে শেষ হয়ে গেলে যাদুকর চিকিৎসক হাত তুলে সবাইকে বিদায় জানায়। যাদের ভাগ্যে আজ আর শিশি জুটলো না তাদের পরবর্তী কোনো একদিনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওপরের দিকে হাতজোড় করে মাথাটাকে সম্পূর্ণই গায়ের চাদরে ঢেকে নেয়।
সবাই বিদায় হয়। সে চোখ খুলে তখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যমজদের দেখতে পায়। সে ভেবেছিল সবাই চলে গেছে, তাই মুখ তুলবার সময় মুখের কাপড় আর ঠিক করে নাই। রফিক-শফিক তার অনাবৃত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটার নাক নাই। নাকের বদলে সেখানে রয়েছে গাঢ় অন্ধকারময় একটি গর্ত। হয়তো গর্তটার শেষ দিকে নিঃশ^াস ছাড়বার মতো রন্ধ্র রয়েছে এক বা একাধিক, তবে সে রন্ধ্র রফিক কিংবা শফিক কারও চোখেই পড়ে না। তারা চোখ নামিয়ে নিলে সে তার বাক্স-পেটরাগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে রফিক-শফিকের কাছে তাদের মতলব জানতে চায়। প্রায় হাতজোড় করা ভঙ্গিমায় তারা তাকে জানায়, কোনো বিশেষ মতলব নয়; বরং এক কঠিনতম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা এসেছে তার কাছে। তারা তাদের মায়ের কলজে পচা রোগ এবং ইতোপূর্বে নেওয়া সকল ব্যর্থ চিকিৎসার বর্ণনা দেয়। নাকহীন তান্ত্রিক এবার তার বাক্স-পেটরার ওপর চড়ে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে বলে, ‘এই রোগেরও চিকিৎসা আছে।’ এমনকি তা আরোগ্য হতে পারে তার তৈরি তেলেই। রফিক-শফিক আনন্দ আর আশায় নিজেদের পায়ের শক্তি হারিয়ে ধপ করে বসে পড়ে চিকিৎসকের পায়ের কাছে। এক সাথে চারটি হাত ওপরে তুলে সমস্বরে বলতে থাকে, ‘দিন! সেই তেলের শিশিটা আমাদের দিন!’ যাদুকর চিকিৎসক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, সে তেল প্রস্তুত করা কিছুটা কষ্টসাধ্য, যমজেরা আবারও সমস্বরে ‘কেন? কীভাবে? কী দিয়ে? কী পুড়িয়ে বানায় সে তেল আমাদের বলুন। আমরাই যোগাড় করে দেব সেইসব। যত দূরবর্তী আর কষ্টসাধ্যই হোক না কেন মায়ের কলজে পচা রোগ সারাবার জন্য আমাদের সেখানে যেতেই হবে। বলুন আপনার কী চাই?’ যাদুকর আবার নিজের নাকহীন বীভৎস মুখ উন্মুক্ত করে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, ‘শান্ত হও!’ সেই তেল বানাবার অধিকাংশ উপাদানই আমার কাছে রয়েছে, কেবল একটি উপাদান হলেই তেল তৈরিতে আর কোনো বাধা থাকছে না, যমজেরা এবার কাতর স্বরে বলে, ‘কী? কী সেটা? বলুন আমাদের।’
‘যা প্রয়োজন সেটা হলো : জীবিত মানুষের দেহের এক টুকরো ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, হাত কিংবা পা হলেই বেশি সুবিধা হয়।’ বলে সে অদৃশ্য নাসারন্ধ্র থেকে তপ্ত নিশ^াস ছুড়ে দেয় যমজদের মুখে। যমজেরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তে ভেবে নেয়, এটা বাঘিনীর দুধ কিংবা দুধরাজের মাথার মণি নয় তাই এটা নিশ্চয় এমন কঠিন কিছুও নয়। যাদুকর তার অস্থাবরের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিতে নিতে বলে, ‘সেটা জোগাড় হলেই চলে এসো, আমি তোমাদের মায়ের কলজে পচা রোগের দাওয়াই তৈরি করে দেব।’
রফিক-শফিক দুই ভাই অনুজ্জ্বল ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রিকশার ফাঁক গলে যাদুকরের হারিয়ে যাওয়া দেখে উৎফুল্ল বদনে হাওয়ার গতিতে দুর্গন্ধযুক্ত বুড়িগঙ্গার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে আসা গাঢ় শীতল বাতাসে নৌকোর জন্য অপেক্ষা করে। স্বল্প বিরতিতেই তারা একটি নৌকোর ছেড়ে যাবার তোড়জোড় লক্ষ করে সেটাতে চড়ে দাঁড়ায়। নৌকোয় দাঁড়িয়ে তারা সোজা উত্তর দিকে তাকিয়ে প্রথমে পানি শোধনাগারের সুউচ্চ বুরুজটা দেখতে পায়। তারা বুরুজের ঠিক পেছনে পাঁচ দিন বয়েসি লাজুক চাঁদটাকে লুকিয়ে থাকতে দেখে। চোখ নামিয়ে যমজেরা বুড়িগঙ্গার পীত বর্ণের বুকে চাঁদের ছায়া দেখতে চায়। তারা চাঁদের কোনো ছায়া বুড়িগঙ্গার ওপরে খুঁজে পায় না; বরং বুড়িগঙ্গার ওপর তারা ধোঁয়ার উড়াউড়ি দেখে। যমজেরা হাই তোলে একসাথে, তাদের মুখগহ্বর থেকেও গাঢ় ধোঁয়া বেরিয়ে যায়, তাদের মনে পড়ে প্রতিদিনই শীত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। তীরে এসে পাটনি নৌকোটাকে ঘুরিয়ে নোঙর করে বৈঠা পায়ে চেপে দুই হাতে আরোহীদের দেওয়া পয়সা মিলিয়ে নিতে থাকে। রফিক-শফিক নামে সবার শেষে। নামার সময় হঠাৎই পাটনির পায়ের তলায় আটকে রাখা বৈঠাটা নড়েচড়ে ওঠে। পাটনি সতর্ক হয়ে সেটাকে সামলে নিতে বাম হাতটা নিচে নামায়। তাদের সামনে থাকে কেবল তার মেলে রাখা শীর্ণ ডান হাতখানা। যমজেরা লোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই হাতখানার দিকে। বৈঠা সামলে পাটনি দু’হাত মুক্ত করে তর্জনী নাড়িয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে, ‘কী দ্যাখতাছেন? ট্যাকাডা দিয়া নামেন! উফ্! ঠা-ায় জইমা যাইতাছি।’ বলে তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরায়। রফিক-শফিকেরা তার হাতের তলায় দুটি ধাতব মুদ্রা রেখে নেমে আসে। বাড়িতে ফেরার হাঁটা রাস্তায় তারা গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না কারও সাথে। ফিরে এসে ঘুমন্ত অথবা অচেতন মায়ের শিয়রে অবনত বদনে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
ঝলসানো মানব প্রত্যঙ্গের সন্ধানে এদিক-সেদিক এমনকি দিগি¦দিক ঘুরে ঘুরে তাদের দিন কেটে যেতে থাকে। যদিও তান্ত্রিকের চাওয়া হলো জীবিত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, তবু তারা একদিন সকালে চিতাখোলা মহাশ্মশানে এসে দাঁড়ায়, সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা শ্মশানের ফাঁকা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দূর আকাশে চিল আর শকুনের উড়ে যাওয়া দেখে। উলুধ্বনি দিয়ে বাঁশের খাটিয়ায় চড়ে কোনো লাশ তখনও এসে পৌঁছায় না। শফিক অধৈর্য হয়ে ওঠে। বলে, ‘চলো আমরা চলে যাই, তুমি কি বুঝতে পারছো না প্রতিদিন মরার মতো এত হিন্দু আর নেই আমাদের কেরানীগঞ্জে?’ রফিক বুঝতে পারে। তবুও সে আরও কিছুটা সময়, অন্তত সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। এবং সন্ধ্যায় যখন তারা ফিরে আসার উপক্রম করে, তখন লাশবাহী একটি ফ্রিজার ভ্যান হুইসেল বাজিয়ে শ্মশানের উঁচু-নিচু প্রান্তরে ঢুকে পড়ে বালিতে আটকে যায়। মাত্র চার-পাঁচজন লোক এসেছে লাশটা নিয়ে। তাদের পোশাক দেখে বোঝা যায় না তারা কোন ধর্মের আর উলুধ্বনির তো প্রশ্নই আসে না। যারা এসেছে তারা নিশ্চয়ই মৃতের আত্মীয়-স্বজন এমনকি ছেলে-পুলেও হতে পারে। যদিও রফিক-শফিক কেউই তাদের মুখে স্বজন হারাবার বেদনা দেখতে পায় না। দ্রুতই ফ্রিজার ভ্যানের দরজা খুলে তারা লাশটাকে টেনে নামায়। সচকিত হয়ে যমজেরা তাদের দিকে এগিয়ে আসে, ডানে-বাঁয়ে তারা কোনো স্তূপাকার কাঠ-খড়ি কিংবা এমন কোনো দাহ্য দেখতে পায় না। কাপড়ে জড়ানো লাশটাকে নিয়ে আসা স্বজনেরা শ্মশানের শেষ প্রান্তে নতুন ওঠা পলেস্তারাহীন ইটের ছোট দালানটার দিকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে থাকে। রফিক-শফিকও দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পেছন পেছন এগিয়ে যায়। নতুন দালানটার একপাল্লার স্টিলের দরজাটা খুলে গামছা কাঁধে একজন প্রৌঢ় বেরিয়ে আসেন। সমাগতদের অভ্যর্থনাসূচক নমস্কারে তোলা তার হাত দুটির কাঁপুনি চোখে পড়ে রফিক-শফিকের। তারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে, প্রৌঢ় লোকটা ইটের গায়ে লাগানো সুইচ টিপে দেয়। জ্বলে ওঠে হলুদ আলো। আর সামনে বেকারির চুল্লির মতো একটা চুল্লির দরজা খুলে সেখান থেকে লাশের চেয়ে কিঞ্চিৎ বড় আকারের একটি ট্রে বেরিয়ে আসে। সবাই মিলে ট্রের ওপর তুলে দেয় শবদেহটাকে। প্রৌঢ় আবার সুইচ টিপে দেয়। ট্রেটা ঢুকে যায় চুল্লির পেটে। লাশের সাথে আসা এক মাঝবয়েসির চোখে এবার অশ্রু টলটল করে। একজন তার পিঠে হাত রাখে। এরই মধ্যে প্রৌঢ় চুল্লির পেছনে গিয়ে আবার ফিরে আসে। হাতে করে নিয়ে আসে একটি অ্যালুমিনিয়ামের ছোট পাত্র। চোখ টলটল করতে থাকা লোকটা পাত্রটা হাতে নিয়ে ভালো করে পাত্রের ভেতরে তাকিয়ে বলে, ‘একি! এ যে কেবল ছাই, আমার পিতার নাড়িভুঁড়ির অংশ কোথায়? কী দিয়ে আমরা তাঁর আত্মাকে মুক্ত করব?’ প্রৌঢ় জবাব দেয়, ‘বাবাজি, এ ব্যবস্থায় ছাই ছাড়া অন্য কিছু পাবে না, এটাই নাও, এগুলোই বরং ঢেলে দিও দূষিত বুড়িগঙ্গায়, আমি তোমার পিতার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করব।’ বলে দক্ষিণার জন্য তার কম্পিত হাত দুটো প্রসারিত করে। শফিক আরও বিরক্ত হয়ে রফিকের বাহু ধরে টেনে বের করে আনে। গজগজ করে বলতে থাকে, ‘কেন আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি? আমাদের প্রয়োজন জীবিত মানুষের প্রত্যঙ্গ, চাইলে আমরা সেটা নিজেরাও ঝলসে নিতে পারি। চলো এখানে আর সময়ক্ষেপণ নয়।’ হতাশ রফিক সহোদরের পায়ের গতির সাথে পা মিলিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আলোও জ্বলে গেছে চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে তারা তাদের বাড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে চুনকুটিয়ার মোড়ে এসে থামে। কোথাও বসবে বলে একটি যুৎসই জায়গার জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।
‘আরে মিয়া, আপনাদের যে কোনো খবরই নাই!’ রফিকের অদেখা বাগদত্তার ছবি সরবরাহকারী দূরাত্মীয় তার ডান হাতের ছাতাটা বাঁ-হাতে নিয়ে ‘কি সৌভাগ্য আমার! আপনাদের দুই ভাইকে পেয়ে গেলাম একই সাথে, সবই তার ইচ্ছে। চলেন! চলেন! রাস্তার ওপাশে চলেন!’ বলে একটি চায়ের দোকান নির্দেশ করে শফিকের হাত ধরে রাস্তা পার হতে থাকে। দোকানের বেঞ্চে এক সারিতে পাশাপাশি বসে নিজেই চায়ের ফরমাশ দিয়ে বলে চলে, ‘ছোট ভাইয়ের জন্য কন্যা চূড়ান্ত হয় নাই বুঝি, চিন্তা করবেন না দ্রুতই হয়ে যাবে। আর আপনাদের ঘরের হবু লক্ষ্মীর তো পরীক্ষা শেষ হইছে। তাড়াতাড়িই সে ফিরবে চট্টগ্রাম থেকে। ফিরলে আর দেরি কইরেন না, জানেনই তো! শুভ কাজে দেরি করতে নেই।’ এই কথা বলে সে তার দুই পাশে বসা দুই ভাইয়ের দিকে তাকায়, তাদের চোখে মুখে কোনো চাঞ্চল্য নেই দেখে একটু যেন দমে যায় লোকটা, ‘ভাই কোনো সমস্যা?’ হ্যাঁ! সমস্যা বলে রফিক তাকে তাদের সমস্যার একটি নাতিদীর্ঘ বিবরণ দেয়। সব শুনে ছাতার বাটে দু’হাত রেখে বিজ্ঞচিত নীরবতা শেষ করে দূরাত্মীয় বলে ওঠে, ‘ভাববেন না! একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কাল আবার আইসেন এইখানে, এই সময়ে, দেখি কী রাস্তা বের করতে পারি!’
পরদিন সকালবেলা রফিক-শফিক ঘুমন্ত থাকতেই ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তাদের ঘরে। টেনে দুই ভাইকেই বিছানা থেকে তোলে। ‘আরে মিয়া আপনারা দেখি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছেন, ওই দিকে আপনাদের চিন্তায় আমি সারারাত ঘুমাইতে পারি নাই। শফিককে সরিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ে সেও। টিভিটার দিকে চেয়ে বলে, ‘আরে আপনাদের ঘরে তো টিভিও আছে দেখতেছি, তয় টিভিটুভি আপনারা খুব একটা দেখেন না মনে হয়, যাই হোক উপায় আমি খুঁজে বাইর করছি, জীবন্ত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ পেতে আপনাদের আর যেখানে-সেখানে ঘুরতে হবে না, আমি একটা ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি, ঠিকঠাক তার কাছে গিয়ে ঘটনাটা বুঝিয়ে বললেই কিছু টাকার বিনিময়ে সেই ব্যবস্থা করে দিবে।’ এইসব বলে সে মানুষের মাংসখেকো খোরশেদ ডোমের ঠিকানা বাতলে দেয় তাদের। ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে যমজদের ধাতস্ত হতে সময় লাগে। চোখ রগড়ে তারা পুনরায় খোরশেদ ডোমের ঠিকানা ভালো করে বাতলে নেয়। দূরাত্মীয় তাড়া দেয়, ‘দেরি করবেন না, এক্ষুণি রওনা হন, আশা করি আজকের সন্ধ্যার আগেই আপনারা পেয়ে যাবেন আপনাদের মায়ের কাক্সিক্ষত দাওয়াইয়ের প্রধান উপাদান, রওনা হন! রওনা হন!’ বলে সে আবার তার ছাতাটাকে হাতবদল করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। রফিক-শফিক তড়িঘড়ি করে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে অভুক্ত পেটেই বেরিয়ে পড়ে। তবে সকালে বেরুলেও রাস্তার দীর্ঘ জ্যাম পাড়ি দিয়ে ঢাকার প্রধান লাশকাটা ঘর খুঁজে পেতে তাদের দুপুর হয়ে যায়।
সেখানে পৌঁছে তারা দেখে, লাশকাটা ঘরের বিশাল দরজার দুইপাশে বিষণœ শোককাতর মানুষেরা বসে আছে লম্বা সারি করে। হয়তো তারা অপেক্ষায় আছে কাটাছেঁড়া গলিত অর্ধগলিত প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায়। লাশকাটা ঘরের সামনে, আশপাশের লোকজনের কাছে তারা খুঁজতে থাকে মানুষখেকো খোরশেদ ডোমকে। কেউ বলে চিনি না, কেউ বলে ‘আছে হয়তো আশপাশে, খুঁজলে পাবেন, খুঁজে দেখেন।’ বেলা বাড়তে বাড়তে এবার গড়িয়ে যাবার উপক্রম, খোরশেদ ডোমকে তবু তারা খুঁজে পায় না। সেই সময়ে ত্রাতা হয়ে আসে এক চপল কিশোর, নিজ থেকেই জানতে চায়, ‘কী? খোরশেদেরে খুঁজেন ক্যান? তামাক লাগবো? লাগলে আমারে কন আইনা দিতাছি।’ রফিক-শফিক তাদের মোলায়েম কণ্ঠকে আরও কোমল করে জানায়, ‘না! তামাক নয় তাদের খোরশেদকেই দরকার।’ ‘আইচ্ছা বুচ্ছি বুচ্ছি, আইয়েন, আমার লগে আইয়েন!’ বলে কিশোর তাদের দুই ভাইকে নিয়ে যায় পানির মোটরওয়ালা গুদামঘরে। অন্ধকার ঘরের দরজায় কিছুক্ষণ করাঘাত করতেই পিঠের সাথে লেগে থাকা পেট নিয়ে শীর্ণকায় খোরশেদ দরজা খুলে দেয়। ‘মামা, এই দুইজন সেই সক্কাল থেইকা তোমারে বিসরাইতাছে।’ বিরক্ত খোরশেদ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে, ‘না, মাল নাই, বিসরাইয়া লাভ নাই, আপনেরা যান গা!’ বলে দরজা লাগানোর উপক্রম করতেই রফিক-শফিক তাকে ঠেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে সেই গুদামঘরে। ঘরের বোটকা গন্ধের দিকে খেয়াল না দিয়ে তারা খোরশেদের হাত চেপে ধরে। বলে, ‘শুনুন, আপনি আমাদের একজন অতি প্রিয় ভাই। আমাদের একটা বিহিত করে দিন, আমরা যতটা সম্ভব আপনাকে খুশি করে দেব।’ খোরশেদ কিছুটা নরম হয়ে নিজের কাঁচাপাকা দাড়িগুলো ভালোরকম চুলকে নিয়ে তাদের বসতে বলে, যমজেরা বসলে এবার সে একে একে তামাক সাজবার সকল উপাদান বের করে তামাক সাজতে থাকে। হাতের তলায় তামাকের দলা নিয়ে একটা কৌটা থেকে তর্জনীর মাথায় লাল পুডিংয়ের মতো বস্তু লাগিয়ে সেটা তামাকে মেখে হাতের তলায় পিষতে থাকে, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘কন তো এইডা কী দিলাম?’ যমজেরা উত্তর দেয় ‘জানি না ভাই’ শব্দ করে হেসে খোরশেদ জানায়, ‘এইডা হইলো পেরেম কইরা বিষ খাইয়া মরা এক ছেরির হাডের ভিতরের রক্ত। চিপড়াইয়া বাইর করছি। এইডাতে নেশাডা জমে ভালা।’ বলে সবগুলো ধাপ একে একে শেষ করে জ্বলন্ত কলকিটায় বিকট টান দেয় খোরশেদ ডোম। টানের প্রচ-তায় কলকির মুখের আগুন লাফিয়ে জ্বলে উঠে ঘর আলো করে দেয়। খোরশেদ ডোমের গলার সবগুলো শিরা-উপশিরা জেগে ওঠে একসাথে। ইটখোলার চুল্লির মতো ধোঁয়া ছাড়ে খোরশেদ, একই প্রক্রিয়ায় বিরতিহীন আরও কয়েকটা টান দেয় সে। তারপর কালসিটে পড়া হাতের তালুতে কলকে উপুড় করে ভালো করে পরখ করে নেয় তামাকের কোনো কনা পুড়তে বাকি রয়ে গেল কিনা।
শান্ত হয়ে খোরশেদ এবার বলে, ‘চিন্তা কইরেন না, আইজকাই ব্যবস্থা কইরা দিমু। আগে হইলে একটু দেরি লাগতে পারতো, তয় অক্ষণ আর দেরি হইবো না। পোড়া লাশ আইতাছে সোতের লাহান। পেত্তেকদিন একশ দুইশ একটার থেইকা হাত কিংবা পাও একটা কাইটা বাইর কইরা দিমুনি, রফিক বলে ভাই আমাদের তো জীবন্ত মানুষের প্রত্যঙ্গ চাই।’ ‘অসুবিধা নাই, তয় টেকা কিন্তু যেইডা কইছেন ওইডাই দিতে হইবো কম হইলে চলবো না। শ্যাষ রাইতে কুমিল্লায় বাস পুড়ছে বিরাট একখান। অল্প কয়ডা বাদ দিলে প্রায় সবগুলানই মরছে শুনছি। আমার লগে যাইবেন, দরজার বাইরে খাড়াইয়া থাকবেন, আমি ভিতর থেইকা ডাক দিলে আপনেরাও ভিতরে যাইবেন। আমি খোরশেদ হারাম খাই না। আপনাগোরে দেহাইয়া জ্যান্ত শইল থেইকাই কাইটা দিমু। লইয়া যাইবেন।’ ‘আচ্ছা। তাই হবে! তাই হবে!’ বলে যমজেরা সায় দেয়। খোরশেদ আবার বলে, ‘দরজার এক্কেরে সামনে থাইকেন, আমি ভিতরের থেইকা ডাক দিলে আপনাগোর য্যান ঢুকতে দেরি না অয়।’ আর শুনেন, ‘লগে একটা ব্যাগ রাইখেন। লুকাইয়া নিতে অইবো। মরা হউক আর জ্যাতা। মাইনসের হাত-পাও। তা কি দেহাইতে দেহাইতে লইয়া যাইবেন?’ খোরশেদের গলায় এবার কতকটা যেন হুকুম ছড়িয়ে পড়ে। যমজেরা আবারও ‘তাই হবে, তাই হবে’ বলে সায় দেয়।Ñ ‘এইবার বাইরাইয়া গিয়া লাশকাটা ঘরের সামনে খাড়ান।’
রফিক-শফিক বেরিয়ে এসে লাশকাটা ঘরের সামনের দোকানগুলোতে একটি ব্যাগ খুঁজতে থাকে। সকল দোকানিই তাদের পাউরুটি ঝুলিয়ে রাখা স্বচ্ছ পলিথিন দেখিয়ে বলে ‘চাইলে এর একটা নিতে পারেন।’ ওতে তাদের চলবে না। তাদের চাই এমন ব্যাগ যা দেখে বোঝার উপায় থাকবে না ব্যাগের ভেতর কী আছে। খুঁজতে খুঁজতে তারা একটি কাগজের হাতল ছিঁড়ে যাওয়া চাররঙা শপিং ব্যাগ পেয়ে যায় রাস্তার ওপর। ধুলো ঝেড়ে সেটাকেই হাতে নিয়ে তারা এসে দাঁড়ায় অপেক্ষমাণদের সামনে প্রায় দরজা লাগোয়া জায়গাটাতে। এমন জায়গায় দাঁড়াতেই খেকিয়ে ওঠে একজন, ‘কি! লাশ নিতে আইছেন? সইরা খাড়ান, আগে আমগো লাশ পরে আপনাগোর। লাশ বাইর করন এত সোজা না। গত পরশু সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়িতে পুইড়া মরছে। টেকা দিয়া আইজ দুইদিন এইহানে বইসা আছি লাশের খোঁজ নাই। সইরা খাড়ান মিয়া। আগে আমগোর লাশ পরে, অন্য কতা।’ ‘না মানে লাশ নয় আমরা আসলে, আমতা আমতা করতে থাকা রফিকের ওপর লোকটা আবারও খেকিয়ে উঠতে চায়। শফিক মধ্যস্থতা করে জানিয়ে দেয় ভেতর থেকে কেউ একজন তাদের ডেকে নেবে। এক মুহূর্তের কাজ। তারা কোনো লাশ গ্রহণ করতে আসে নাই। এবার লোকটা বলে ‘তাইলে অন্য কতা, বহেন বহেন, আমগো লগে বহেন।’ সেইখানে তাদের সাথে বসে রফিক-শফিকের সময় কাটতে থাকে। আধাঘণ্টা একঘণ্টা করে দুই ঘণ্টা কেটে যায়। দরজায় একটু শব্দ হতেই নড়েচড়ে বসে রফিক-শফিক। লোকটা তাদের বলে ‘লাভ নাই, এমন কথা সবাইরেই দেয় ওরা, তয় রাহে না।’ সূর্যের ক্ষীণ আলোয় তাদের সামনে এতক্ষণ ধরে থাকা নারিকেল গাছটির পাতার ছায়ার নড়াচড়া হালকা হয়ে যেতে থাকে। তারা বুঝতে পারে দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। তাদের পীড়িত মায়ের কথা মনে পড়ে। তারা আরও অধৈর্য হয়ে মাঘের শেষ দিককার এই বিকেলেও ঘেমে উঠতে থাকে।
হঠাৎ কচ করে আওয়াজ হয়ে তাদের পেছনের দরজাটা ঈষৎ ফাঁকা হয়ে যায়। খোরশেদ তার পোড়া চেহারাটা বের করে চোখের ইশারায় তাদের ডেকে নেয়। যমজেরা ভেতরে ঢুকে তীব্র ঠা-া অনুভব করে। বিরাট ঘরের দুইপাশে বড় বড় আলমারি। তাদের চোখে-মুখে ভয় খেলে যায়। খোরশেদ কথা বলে, চারকোনা বদ্ধ ঘরে তার কথা প্রতিধ্বনিত হয়। ‘আর কইয়েন না, সামনে তো যান নাই, দ্যাখলে বুঝতেন, কী পরিমাণ বডি আইছে! সব পোড়া, মরা গুলানরে টাইন্যা টাইন্যা এতক্ষণ ধইরা আলমারিতে পুরাইছি। আর জ্যান্ত টাইন্যা লাশ ঘরে আনা কী এত সোজা। হ্যাগোর সব আত্মীয়-স্বজন আইসা পড়ছে। পুলিশ, সাংবাদিক আরও কত কী!’ বলতে বলতে সে খাটিয়ার ওপর সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা একটা ঝলসানো শরীরের কাছে নিয়ে যায় তাদের।Ñ ‘তয় আপনাগোর কপাল ভালা। এই বেডির খোঁজ লইতে এহনও কেউ আহে নাই। ডাক্তারেও বুঝছে কিছুক্ষণের মদ্যেই মরবো। তাই হ্যার দিকে আর চোউখ দেয় নাই। সুযোগ বুইঝা আমি টাইন্যা লইয়া আয়া পড়ছি।’
হিমঘরে রফিক তার সহোদর শফিকের হিম হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকায়। চাকাওয়ালা লোহার খাটে শোয়ানো মেয়েটার চুলগুলো ঝুলে পড়ে মেঝে ছুয়ে আছে। আগুন তার শরীর পোড়ালেও চুলগুলো কী এক রহস্যবলে অক্ষত রয়ে গেছে। তাদের দুই ভাইয়ের জন্য তাদের মা এমন লম্বা চুলের মেয়েই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। চুনকুটিয়ার কাজি বাড়ির মেয়েটার চুলও নাকি এমনই লম্বা ছিল বলে জেনেছিল রফিক। এসব ভাবনার সময় নয় এখন। খোরশেদ তার চকচকে ধারাল ছুরিটা হাতে দাঁড়িয়েছে খাটের ওপর পাশে, ‘কন, হাত দিমু, না পাও?’ বলে মেয়েটার ঢেকে রাখা মুখের কাপড় টেনে সরিয়ে ফেলে। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে দুই ভাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘কী? আপনেরা ভাবতাছেন মরা? মরা না, জ্যান্তই আছে,’ বলে খোরশেদ টান দিয়ে ঢেকে রাখা কাপড়টা মেয়েটার বুকের নিচ পর্যন্ত নামিয়ে আনে। ‘কী? দেখতাছেন না, বুক যে ওঠা-নামা করতাছে?’ দুই ভাই তবুও বাকরুদ্ধ। পুড়ে ঝলসে গেলেও কুমারীর বুকের ঔদার্য্য ম্লান হয় নাই এতটুকু। ফুটে থাকা পোড়া বাম স্তনটির নিচে ছুরি দিয়ে খোঁচা মেরে খোরশেদ বলে, ‘দেহেন মিয়া, কেমনে রক্ত বাইরায়, মরার শৈল দিয়া রক্ত এমনে বাইরায় না, বিশ^াস না করলে রক্ত হাতে মাইখা দেহেন এক্কেবারে গরম।’ খোরশেদ সে রক্ত নিজের হাতে মেখে স্বল্পালোকিত ঘরে হাত উপরে তুলে দেখায়, ‘ব্যাগ লইছেন তো’। নিঃশব্দে শফিক তার হাতে থাকা ব্যাগ উঁচিয়ে ধরে, ‘এই ব্যাগে হইবো না। হাত পাও পুড়ছে বেশি, পোড়া জায়গা দিয়া এহনও রস পড়তাছে।’ ‘আইচ্ছা’ বলে খোরশেদ কাপড়ের নিচে হাত দিয়ে মেয়েটার পরনে থাকা পোড়া পা’জামার কিয়দংশ ছিঁড়ে নেয়। ‘আপনাগোরে ডাইন হাতটাই দেই, আর আমি লই বাঁয়ের ডা। মাইনষের মাংসের স্বাদই আলাদা। আর এই বয়েসি মায়া মানুষ হইলে তো আর কতা নাই। ভাইবেন না আমি কাঁচা খাই। ভালো কইরা রাইন্দা মাসে এক-দুইবার খাই। তয় কোত্থেইকা য্যান মাইনসে আইজ কাইল জাইনা যাইতাছে। খোরশেদ ডোমে নাকি মানুষ খায়, হি! হি! হুনেন নাই আপনেরা?’ এইসব বলার অবসরে খোরশেদ ডোম তার অর্জিত দক্ষতায় নির্বিকার মুখে পা’জামার অর্ধপোড়া সাদা কাপড়ে চেপে কনুই থেকে মেয়েটার ডান হাতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ‘দ্যান ব্যাগটা দ্যান’ বলে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে কর্তিত হাতটা সেটার মধ্যে পুরে দিতে দিতে বলে, ‘সইরা খাড়ান, প্লেট বাইয়া রক্ত নামতাছে, গায়ে মাখবো, এই মাইয়ার শইলে এত রক্ত কেন?’ বলে নিজেই ওপাস থেকে সরে খাটের এপাশে তাদের সামনে এসে মুখে দারুণ হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘দ্যান ট্যাকাটা দ্যান।’ রফিক-শফিক তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো সবগুলো টাকা তার হাতে দিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে পড়ে।
এবার তাদের খুঁজে বের করতে হবে সেই তান্ত্রিককে। বাইরে বেরিয়ে দেখে সন্ধ্যা নেমে গেছে। লাশঘরের সামনের জায়গাটা হেঁটে পাড়ি দিয়ে তারা নাজিমুদ্দিন রোডে এসে দাঁড়ায়। রিকশার পেছনে রিকশা, গাড়ির বাম্পারে গাড়ি লেগে স্তব্ধ হয়ে আছে সমগ্র রাস্তা, যতদূর চোখ যায়। রিকশার ফাঁক গলে রাস্তাটা পাড়ি দিয়ে তারা হাঁটতে থাকে দুরন্ত গতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে যায় সেদিনের সেই জায়গায়। শাঁখারি বাজার রাস্তার মুখে জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে তান্ত্রিকের আজকের মজমাটা জমে উঠেছে আরও বৃহৎ পরিসরে। তাকে ঘিরে টাকার বৃষ্টি নামিয়েছে জড়ো হওয়া অতৃপ্তের দল। প্রত্যেকের চাই একটা করে শিশি, সকলেরই চাই। নুয়ে পড়া শিশ্ন তাদের জাগাতেই হবে। আজ রাতের মধ্যেই। ভিড় ঠেলে ব্যাগ হাতে রফিক-শফিক সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তান্ত্রিকের চোখে চোখ পড়ে তাদের। তান্ত্রিকের কথার গতি কমে যায়। আজ আর শিশি বিক্রি হবে না বলে সজোরে তালি বাজিয়ে সেদিনের মতো সকলকে বিদায় নিতে বলে সে। তার হুকুমে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায় দ্রুতই। সবাই চলে গেলে তান্ত্রিক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয় নিজের হাতে। ঘুরে রাস্তার দিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতর হাত দিয়ে সে বুঝতে পারে, যমজেরা সঠিক জিনিসই নিয়ে এসেছে। ‘চলো, সামনেই আমার আস্তানা, বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি সব কিছু প্রস্তুত করে রেখেছি। এটার জন্যই ছিল আমাদের অপেক্ষা। চলো! আর অপেক্ষা নেই’ বলে তার ঝোলাটাকে কাঁধে নিয়ে সে হাঁটতে থাকে। পীড়াগ্রস্ত জননীর যমজ পুত্রেরাও হাঁটতে থাকে তার পেছনে। নদীর ধারে এক ঝুপড়িতে ঢুকে পড়ে তান্ত্রিক। তারাও ঢুকে পড়ে, ঝুপড়ির মধ্যে এক বৃহদাকার কাঠের বাক্সের ওপর ঝোলা নামিয়ে তাদের দিকে পেছন ফিরে খুটখাট শব্দ করে কী যেন করতে থাকে। রফিক-শফিক বুঝতে পারে তাদের দাওয়াই তৈরি হচ্ছে, কাজের মাঝে পেছনে না ফিরেই তান্ত্রিক কাগজে মুড়ে ছোট্ট একটা কী যেন রফিকের হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা রাখ!’ রফিক তার প্যান্টের ঝুল পকেটে গুঁজে রাখে সেটা। স্বল্পক্ষণেই দাওয়াই তৈরি শেষ হয়। মুখের দিকে লম্বা, একটি মাঝারি আকৃতির শিশি তান্ত্রিক তাদের হাতে দিয়ে বলে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই, এই রক্তবর্ণ তেলের দুটি ফোঁটা তোমাদের মায়ের কানের ফুটো দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের মা আগের মতোই হাঁটবে, চলবে, হাসবে, রান্না করবে, ঠিক আগের মতোই, যাও দেরি করো না!’
রফিক-শফিক তান্ত্রিকের পায়ের ধুলো হাতে নিয়ে মাথায় মেখে, হাওয়ার গতিতে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে মায়ের শিয়রে এসে দাঁড়ায়। মনে মনে বলতে থাকে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই।’ ‘মা’ ‘মা’ বলে দুটি ছোট্ট ডাক দিতেই তাদের মা সাড়া দেয়, শিয়র থেকে তারা খাটের পাশে এসে দাঁড়ায়। ধরাধরি করে তারা তাদের মাকে তুলে বসায়। রফিক খাটে উঠে মায়ের পেছনে বসে নিজের স্ফীত বক্ষকে দেয়াল করে সেখানে মায়ের পিঠ ঠেকিয়ে কাঁধ ধরে বসে। শফিক এবার দাওয়াইয়ের শিশির ছিপি খোলে। ঘরময় এক অপরিচিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মা চোখ খোলে। এদিক-ওদিক তাকায়, কথা বলে, ‘আমার প্রিয় পুত্রেরা, তোমাদেরকে আমি এই ঘরেই প্রসব করেছিলাম, আজ তোমাদের আঁতুড়কালীন গন্ধ এই ঘরে আবার ফিরে এসেছে।’ রফিক ছিপি খোলা শিশির মুখ উপুড় করে মায়ের মাথাটা কাত করে ধরে এক ফোঁটা তেল কানের ছিদ্র বরাবর ঢেলে দেয়, প্রথমে ডান কান তারপর বাম কান, মুহূর্তে তাদের মা যেন খানিকটা সজীব হয়ে ওঠে।
‘আমার পুত্রেরা, তোমরা কি তোমাদের মায়ের বুক বেয়ে নামা শাল দুধের ঘ্রাণ কিংবা স্বাদ স্মরণ করতে পারবে?’ রফিক-শফিক মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, না! তাদের মা বলে, ‘আমি পারছি, শাল দুধের গন্ধ আমার সারা শরীরে, আমার আবার জন্মাবার সময় হয়েছে। আমি আমার মায়ের শরীরের গন্ধ পাচ্ছি’ বলতে বলতেই মায়ের কান, নাক-মুখ দিয়ে রক্তের ধারা বেয়ে নামে। এ দৃশ্য দেখে রফিক-শফিক খেই হারিয়ে ফেলে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। শফিক মনে করিয়ে দেয়, তান্ত্রিক আরও কী একটা ছোট জিনিস কাগজে মুড়ে রফিকের হাতে দিয়েছিল, রফিক পকেট হাতড়ে সেটা বের করে। মুড়ে রাখা কাগজ খুললে তাঁর হাতের তালুতে একটা আংটি চকচক করে ওঠে, তার মা বলে, ‘কী ওটা? আমার হাতে দাও!’ হাতে নিয়ে মা সেটা তার ঘোলা চোখ দিয়ে দেখতে থাকে, বলে ‘চিনতে পারছো? এই তো সেই আংটি যা বিবাহের সময়ে আমার মা আমার অনামিকায় পরিয়ে দিয়েছিল।’ তাদের মা আর কোনো কথা বলে না। হাতের মুষ্টি শক্ত করে এক হাতে শফিকের তর্জনি অন্য হাতে আংটিটা নিয়ে হেলান দিয়ে থাকা তার অপর পুত্রের বুকের ডানপাশে মাথা বাঁকিয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে।

Category:

৬-দফা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি

Posted on by 0 comment

34পাকিস্তান-আন্দোলনের সময়ে জনমনে আশা সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ইত্যাদি সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেই সম্ভাবনা মানুষ আর উপলব্ধি করতে পারেনি।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: দীর্ঘকাল ধরে নানা ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার শর্ত তৈরি হয়ে আসছিল। শেষ পর্যায়ে যে ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জাতীয় চেতনা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নাম নিয়ে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিকশিত ও কার্যকর হয়েছিল, তা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে অবলম্বন করে সূচিত ও পরিচালিত ৬-দফা আন্দোলন। সেই সময়টাতে পূর্ব বাংলায় একটি উদীয়মান জাতির আশা-আকাক্সক্ষা ও কাঁচা আবেগ উদ্দীপ্ত হয়েছিল নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের উপলব্ধি ও কল্পনাকে অবলম্বন করে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ দেখা দিয়েছিল তৎকালীন রাজনীতি ও ৬-দফা আন্দোলনের অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়েই। ৬-দফা ও তার অনুকূলে পুস্তিকা, প্রচারপত্র, ঘরোয়া আলোচনা ও জনসভার মাধ্যমে জনসমর্থন লাভ; ৬-দফার প্রতি বিভিন্ন দলের ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া; ৬-দফার বাস্তবায়ন ও জনজীবনের প্রধান সমস্যাবলির সমাধান অন্যথায় সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলন, আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারের চরম দমননীতি এবং মামলা-মোকদ্দমা ও জেল-জুলুম দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা, সমাজের স্তরে স্তরে সরকারি দলের জুলুম-জবরদস্তি, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এনএসএফ) জুলুম-জবরদস্তি ও গু-ামি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে শেখ মুজিবের মুক্তি ও সংবর্ধনা সভায় ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব লাভ, ১৯৭০-এ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন, নির্বাচনের পর জাতীয় পরিষদের অধিবেশন না ডাকা এবং শেষে ডেকে স্থগিত ঘোষণা করা, একাত্তরের মার্চের সর্বাত্মক জাতীয় অভ্যুত্থান ও ৭ই মার্চের জনসভায় শেখ মুজিবের অমর ভাষণ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের শীর্ষ পর্যায়ের সেনাপতিদের সাথে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতাতের সাথে এবং ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপলস পার্টির নেতাদের সাথে বৈঠক ইত্যাদি সকল ঘটনার মর্মে ছিল ৬-দফা। শেষে প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট ও গণহত্যা এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভারতের সহায়তা নিয়ে প্রায় ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছিল নানা দলের তৎপরতা। তখনকার দ্বিকেন্দ্রিক বিশ্ববাস্তবতাও ছিল ভিন্ন। বলা বাহুল্য, এসব ঘটনার বিবরণ দিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তৎকালীন রাজনীতি ও ৬-দফা আন্দোলনের পরিচয় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। আমার এই লেখা এ বিষয়ে কিছু ঘটনার উল্লেখ ও কিছু প্রাসঙ্গিক মন্তব্য মাত্র।
পাকিস্তান-আন্দোলনের সময়ে জনমনে আশা সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ইত্যাদি সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেই সম্ভাবনা মানুষ আর উপলব্ধি করতে পারেনি। সরকারের অসামর্থ্য, সরকারি দলের দুর্নীতি ও জুলুম-জবরদস্তি মানুষকে বিরাটভাবে হতাশ করেছিল।
পাকিস্তানের সংবিধান রচনার প্রয়াস এবং সংবিধানের বাস্তবায়ন সফল হয়নি। প্রথমে সংবিধানের মূলনীতি নির্ধারণের জন্য গণপরিষদ থেকে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই ঢাকায় তার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন আরম্ভ হয়। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ-বিরোধী সব দল ও গ্রুপ থেকে পাল্টা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রভাষা, স্বায়ত্তশাসন, রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসন পদ্ধতি ইত্যাদি সব বিষয় নিয়েই চলে বিতর্ক। তাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই বিকাশ ঘটে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে প্রথম যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে বাঙালি স্বার্থ ক্ষুণœ হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশকে একীভূত করে এক প্রদেশ করা হয়। এটা ছিল সেখানকার জনগণের ইচ্ছের বিরোধী। পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ৫৬ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সংখ্যাসাম্য অবলম্বন করার বিধি সংবিধানে গৃহীত হয়। যে স্বায়ত্তশাসনের জন্য পূর্ব বাংলায় এত আন্দোলন হয়েছিল সেই স্বায়ত্তশাসন অস্বীকৃত ছিল ১৯৫৬ সালের সংবিধানে। আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন ওই সংবিধানের সমর্থনে দৃঢ়তার সাথে কাজ করেছিলেন। তারপরেও ঐ সংবিধান চলেনি। ওই সংবিধান অবলম্বন করে কোনো নির্বাচনও পাকিস্তানে হয়নি। নির্বাচনের আগেই সামরিক আইন জারি হয়েছে।…
১৯৫৮ সালের ৬ অক্টোবর প্রধান সেনাপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হন। এটা কেবল আইয়ুব খানের কিংবা সেনাপতিদের ক্ষমতালিপ্সার কারণেই ঘটেনি। ক্ষমতালিপ্সা ছিল।
সামরিক আইন ও জেনারেলদের নিয়ে গঠিত সরকার সুশৃঙ্খল, সুদৃঢ় ও অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। আইয়ুব সরকার প্রথমেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালায়। তাতে পাকিস্তানের দুই অংশের ৩০৩ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা চাকরি থেকে অপসারিত হন। রাজনৈতিকমহলে ব্যাপক ধরপাকড় চলে অন্যসব নেতার সাথে শেখ মুজিবও তখন কারারুদ্ধ হন এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ব্যবসায়িক মহলেও চালানো হয় অভিযান। এতে সারাদেশে বিরাজ করে আতঙ্ক। প্রশাসনকে যোগ্য ও সক্রিয় করার এবং দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য গ্রহণ করা হয় নানা ব্যবস্থা।
আইয়ুব সরকার অত্যন্ত কর্মতৎপর ছিল এবং সাড়ে ১০ বছরের মধ্যে উন্নয়নমূলক অনেক কাজ করে। সরকারের মূল নীতি ছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি বা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করা। স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি সংস্কৃতি ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তাতে বাধা পেয়েছে। পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র করার কোনো আগ্রহ বা নীতি আইয়ুব সরকারের ছিল না। তবে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের গঠনকর উপাদান হিসেবে মুসলিম সংস্কৃতির ও মুসলিম ঐক্যের কথা বলা হয়েছে এবং ভারত-বিরোধী প্রচার সব সময় চালানো হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সাধারণ এতে পাকিস্তানবাদী শক্তির প্রতি রুষ্ট হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সহায়তা গ্রহণে সরকার উদ্যোগী ছিল এবং তাতে সফলও হয়েছিল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখন পূর্ববর্তী যে কোনো সরকারের আমলের তুলনায় বেশি হয়েছে, আর পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যও আগের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে ক্রমাগত এর প্রবল প্রতিবাদ হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য আইয়ুব খানকে আয়রনম্যান অব এশিয়া বলে প্রশংসা করেছে।
আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন এবং এক বছরের মধ্যেই তার প্রতিবেদন ও সুপারিশ অনুমোদন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের প্রতিবাদের ও আন্দোলনের অন্ত ছিল না। আন্দোলনের মধ্যে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে কয়েকজন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারালে আন্দোলনের চাপে সরকার বাধ্য হয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্টকে স্থগিত ঘোষণা করতে। শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রবর্তন ও সেই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকার গঠনের দাবিও ক্রমাগত উত্থাপিত হয়েছে। তা ছাড়া ছিল জনজীবনের সাময়িক নানা দাবি। সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন তখন অনেক পিছিয়ে ছিল। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন আর ছাত্রদের আন্দোলন তখন একাকার হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথাও তখন প্রবলভাবে উচ্চারিত হতে থাকে। সে অবস্থায় আইয়ুব খান পর্যায়ক্রমে সামরিক আইন তুলে নিতে বাধ্য হয়। গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রদানের ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতিও তিনি দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, এই বৈষম্য গত ১৮ বছরে সৃষ্টি হয়েছে, আগামী ১৮ বছরে এর অবসান ঘটানো হবে। এতে উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি, বেড়েছে। দাবি তোলা হয়েছে তখনই বৈষম্য দূর করার। পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোতে বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশের দাবির সাথে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার দাবি যুক্ত হওয়ার ফলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টি হয়। গণতন্ত্রের আবেগ সব সময় ছিল। এর মধ্যে ছিল সরকারের ও সরকার-দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ও জুলুম-জবরদস্তির অভিযোগ। আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে কোনো কর্মসূচি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য ঘোষিত হয়নি। বলা যায়, সরকার উৎখাতের এক রকম অস্থির আবেগ ও পরিকল্পনাহীন আন্দোলন চলছিল। ক্রমেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে।…
১৯৬৩ সালে সরকার মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতির নির্বাচন অনুষ্ঠান আরম্ভ করে। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে সকল পর্যায়ের নির্বাচন সম্পন্ন হয়। সকল পর্যায়েই মুসলিম লীগ কনভেনশন বিরাট সংখ্যাধিক্য নিয়ে জয়ী হয় এবং আইয়ুব খান হন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এতে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), নেজামে ইসলাম ইত্যাদি সব দলের নেতা-কর্মীরাই রাজনৈতিক হতাশার মধ্যে পড়ে যায়।…
আইয়ুব শাসনের কালে আগাগোড়াই বিরোধীদলীয় আন্দোলনে নেতৃত্বের দুর্বলতা অনুভূত হয়। শেরেবাংলা (মৃত্যু-১৯৬২), সোহরাওয়ার্দী (মৃত্যু-১৯৬৩) ও নাজিমউদ্দিনের (মৃত্যু-১৯৬৪) মৃত্যুর পর নেতৃত্বের শূন্যতা অনুভূত হতে থাকে। উন্নত নেতা ও নেতৃত্ব, দূরদর্শী রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সাফল্যসম্ভব নেতৃত্বের চাহিদা তখন তীব্র হতে থাকে। সে অবস্থায় সময়ের চাহিদা উপলব্ধি করে ফেব্রুয়ারিতে ১৯৬৬ সালের প্রথম দিকে ৬-দফা কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগকে অবলম্বন করে জাতির সামনে উপস্থিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।
৬-দফা দাবির প্রত্যক্ষ পটভূমিতে রয়েছে আইয়ুব শাসনামলের গণতন্ত্রহীনতা এবং আগে থেকে চলে আসা অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ। পাকিস্তানি সংস্কৃতি ও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির কার্যক্রম চালিয়ে আইয়ুব সরকার পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত-সমাজকে ও ছাত্র-তরুণদের বিক্ষুব্ধ করেছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্কিত তথ্যাদি ক্রমেই বেশি করে উদঘাটিত ও প্রচারিত হচ্ছিল। মৌলিক গণতন্ত্র নামে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা আইয়ুব প্রবর্তন করেছিলেন, তাতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ (কনভেনশন) ছাড়া অন্য কোনো দলের পক্ষে ক্ষমতা লাভ অসম্ভবÑ এটা ছিল আওয়ামী  লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রভৃতি দলের বক্তব্য। সরকার পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের অন্তরগরজ থেকে ৬-দফার প্রণয়ন ও প্রচার। তবে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা লাভই নয়, ৬-দফার লক্ষ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের সাথে পাকিস্তানের জন্য প্রস্তাবিত ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংঘ রূপে গড়ে তোলা ছিল ৬-দফা কর্মসূচির ঘোষিত লক্ষ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফার ১৯ সংখ্যক দফাটির স্পষ্টতর ও কিছুটা সম্প্রসারিত রূপ হলো ১৯৬৬ সালের আওয়ামী লীগের ৬-দফা। যুক্তফ্রন্টের ওই দফাটিতেও লাহোর প্রস্তাবকেই ভিত্তি ধরা হয়েছিল। ৬-দফায় সাংবাদিক বিষয় ছাড়া আর কোনো বিষয়ই স্থান পায়নি। যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের ৬-দফা আন্দোলন দ্বারা সাম্প্রদায়িকতাবাদী শক্তি সম্পূর্ণ পরাজিত হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, পরাজিত হওয়া আর নিঃশেষ হওয়া এক কথা নয়। কোনো ধর্ম বা আদর্শকে নিঃশেষ কি করা যায়?
১৯৬৩-৬৪ সালে মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতির নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং আইয়ুব খান ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীর ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনের পর মুসলিম লীগকে (কনভেনশন) খুব শক্তিশালী দেখা যায়। তখন আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) প্রভৃতি দলের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দেয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘটিত হয় ভারতের সাথে পাকিস্তানের ১৭ দিনের যুদ্ধ। মস্কোর মধ্যস্থতায় তাসখন্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সাথে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বৈঠকের ও তাসখন্দ ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধকালে আইয়ুব খান জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তানের সকল অংশের জনগণের সমর্থন লাভ করেছিলেন। এতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ে। তাসখন্দ ঘোষণা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধকালে নিরাপত্তার অভাব অনুভূত হয়। সে অবস্থায় শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের মাধ্যমে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন ৬-দফা কর্মসূচি। ৬-দফায় ছিলÑ
১. দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনই হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব, সরকার হবে পার্লামেন্টারি ধরনের। আইন পরিষদের ক্ষমতা হবে সার্বভৌম এবং পরিষদ নির্বাচিত হবে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের ভোটে।
২. কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। যথাÑ দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।
৩. মুদ্রার ব্যাপারে নি¤œলিখিত দুটির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারেÑ (ক) সমগ্র দেশের জন্য দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে। অথবা, (খ) বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্য কেবল একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভের পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক ও অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।
৪. ফেডারেশনের অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো রূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সবরকম করের একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
৫. (ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে। (খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাষ্ট্রগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমাহারে অথবা সর্বসম্মত কোনো হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে। (ঘ) অঙ্গরাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্যাদির চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর জাতীয় কোনো বাধা-নিষেধ থাকবে না। (ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
৬. আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন আধা-সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
এই কর্মসূচি যৌক্তিক শৃঙ্খলা অবলম্বন করে লেখা এবং ভাষাগত দিক দিয়ে সুলিখিত। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের সমস্য এতে বিবেচনা পায়নি। এটা সম্পূর্ণ পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি ধনিক-বণিক-আমলাদের আশা-আকাক্সক্ষাভিত্তিক।…
১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ একদলীয় উদ্যোগে ৬-দফার দাবিতে হরতাল আহ্বান করে। ৬-দফার সাথে তখনকার জনপ্রিয় অনেক দাবি হরতালের প্রচারপত্রে ও প্রাচীরপত্রে উল্লেখ্য করা হয়েছিল। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেদিন আওয়ামী লীগের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু সরকার জনগণের ওই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে সহ্য করতে পারেনি। পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর গুলিতে সেদিন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে বেশ কিছু লোককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ৬-দফার প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের তুলনাহীন সমর্থন প্রমাণিত হয়। আর সেদিনই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে জনমনে দৃঢ় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। পরে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৭ জুনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং শেখ মুজিব ও শহীদদের সম্পর্কে নানারকম কটূক্তি করা হয়। এতে সরকারের প্রতি জনগণের ঘৃণা বাড়ে। ৭ জুনের পরে আওয়ামী লীগের ওপর সরকারের নির্যাতন দ্রুত বেড়ে চলে। শেখ মুজিব, তাজউদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাকর্মীকে তখন কারারুদ্ধ রাখা হয়। রাজনৈতিক নিপীড়নের সে এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। তবু আন্দোলনের ধারা থেমে থাকেনি। প্রগতিশীল দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কোনো না কোনো প্রকার আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসে গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আড়াই বছর ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে অন্ধকারময় সময়।
১৯৬৭ সালের শেষে আইয়ুব সরকার নৌবাহিনীতে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সিভিল সার্ভিসের দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে একটি মামলা দেয়। গণ-অভ্যুত্থানের ফলে এই মামলা উঠে যাওয়ার পর শেখ মুজিব এই মামলাকে ‘ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। রমনা রেসকোর্স ময়দানে যে সংবর্ধনা সভায় তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব দেওয়া হয়েছিল, তাতেই তিনি এ কথা বলেছিলেন। আসলে লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেনের উদ্যোগে নৌবাহিনীর কিছু সৈনিক ও দুজন সিভিল সার্জেন্ট ৬-দফা আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন পূর্ব বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে গোপনে দু-চারটা বৈঠক করে কিছু আলোচনা করেছিলেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সেটি ধরে ফেলে এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের মামলা করে। কিছুদিন পরে ৬-দফা আন্দোলনের নেতা, আওয়ামী লীগের সভাপতি কারারুদ্ধ শেখ মুজিবকে ওই মামলার আসামি করা হয়। প্রচার করা হয় যে, শেখ মুজিব আগরতলা গিয়ে বিচ্ছিন্নতার ষড়যন্ত্র করে এসেছিলেন। সেজন্য সরকার এই মামলাকে অভিহিত করেছিল ‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বলে। মামলার নাম প্রথমে ছিল স্টেট ভার্সাস লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেন অ্যান্ড বাদার্স, পরে করা হয় স্টেট ভার্সাস শেখ মুজিব অ্যান্ড আদার্স। তখন ষড়যন্ত্রের অভিপ্রেত জবানবন্দি আদায় করার জন্য আসামিদের ওপর কঠোর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, একজন আসামির গুহ্যদ্বার দিয়ে গরম ডিম ঢোকানো হয়েছিল এবং তার নখের ভেতর সুই ঢোকানো হয়েছিল। মামলা ও নির্যাতনের খবরে পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলে ও সকল শহরে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ ও ক্ষোভ এবং শেখ মুজিব, মোয়াজ্জেম হোসেন ও অন্য আসামিদের প্রতি সীমাহীন সহানুভূতি দেখা দেয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করে এবং শেখ মুজিব, মোয়াজ্জেম হোসেন ও অন্য আসামিদের প্রতি সমর্থনে ও গভীর মমতায় ঐক্যবদ্ধ হয়। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তখন অভাবনীয় হয়ে ওঠে। ৬-দফা আন্দোলনের কারণেই শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয়েছিল এবং এর জন্যই সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগ রমনার রেসকোর্স ময়দানে জনসভা করে তাকে সংবর্ধনা দিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব দেওয়া হয়েছিল। শেখ মুজিবের জীবনে সবচেয়ে গৌরবময় সময় ছিল ৬-দফা আন্দোলনের সময়। বাংলাদেশের জনগণের জীবনেও ছিল যুগান্তকারী জাগরণের সময়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন তখন ছিলেন শেখ মুজিবের সার্বক্ষণিক সহযোগী। ছাত্রলীগের সক্রিয়তা ছিল অবর্ণনীয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ইসলামাবাদে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠক করেছিলেন।…
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের দুই গ্রুপ এবং ডাকসু ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তার আগে মুসলিম লীগ (কনভেনশন) আওয়ামী লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি দল মিলে গঠন করেছিল ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি’। এই কমিটিও হরতাল ডেকে ও অন্যান্য কর্মসূচি গ্রহণ করে গণ-অভ্যুত্থানকে ব্যাপক ও গভীর করে তুলেছিল। এর মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ জাতীয় (পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক) মুক্তির ১১-দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। তাতে পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত ও জাতীয় ধনিকদের দাবি-দাওয়া এবং আওয়ামী লীগের ৬-দফাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ১১-দফা বাস্তবায়নের দাবিতে মিছিল করা হচ্ছিল। মিছিলে পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্র ইউনিয়নের সুপরিচিত কর্মী আসাদুজ্জামান শহীদ হন। ২০ জানুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রদের মধ্যে নবকুমার ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান শহীদ হয়। তখন গণ-অভ্যুত্থান ক্লাইমেক্সে পৌঁছে। পুলিশরাও তখন বন্দুক হাতে জনতার কাতারে শামিল হয়।…
গণ-অভ্যুত্থানের অবসান ঘটে অবস্থার চাপে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পদত্যাগ, মার্শাল ল’ জারি, প্রধান সেনাপতি ইয়াহিয়ার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট হওয়া দ্বারা। ক্ষমতায় এসেই ইয়াহিয়া একদিকে ধরপাকড় করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং অপরদিকে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সমুদ্র উপকূল এলাকায় এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। দেশি-বিদেশি প্রচার মাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল যে ঝড়ে ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখের বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটেছে।…
মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, মোজাফ্ফর আহমদ ও সরকারবিরোধী সব দলের নেতারা তখন সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলতে থাকেন। কিন্তু শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন সাংবাদিক সম্মেলন করে এবং পত্রিকায় দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে যথাসময়ে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত পূর্ব ঘোষিত তারিখেই জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ‘ইয়াহিয়া ঘোষিত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী’ অনুষ্ঠিত হয়। কেবল সাইক্লোন উপদ্রুত এলাকায় নির্বাচন কয়েকদিন পরে অনুষ্ঠিত হয়।
পরের ঘটনাবলি সব সময় সর্বত্র আলোচিত হয়। তারপরও অনেক কথা স্মরণ করার ও আলোচনা করার দরকার আছে। কিন্তু বক্তব্য আর দীর্ঘ করতে চাই না। ৬-দফা আন্দোলন চলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে অপারেশন সার্চলাইট আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এর মধ্যে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের অমর ভাষণ। এই বিস্ময়কর সুন্দর ভাষণের পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল সেদিনের ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং সময়ে দাবি। ৭ই মার্চের ভাষণ তিনি শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ বলে, জয় বাংলার পরে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেন নি।
৬-দফা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে এই আন্দোলনের গৌরবের দিকগুলোর সাথে এর সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। সংগ্রামের মধ্যে নেতৃত্বের চরিত্র ও জনচরিত্র বিচার করতে হবে। উন্নত ভবিষ্যতের জন্য অতীতের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে হবে এবং অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতির পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় তার জন্য চেষ্টা করতে হবে।
[সংক্ষেপিত]

Category:

চলচ্চিত্রের উদ্ভব ও বিকাশ

Posted on by 0 comment

7নূহ-উল-আলম লেনিন:  বিশ্ব ইতিহাসে চলচ্চিত্র ১২১ বছর অতিক্রম করেছে। চলচ্ছবি (Motion Picture) ধারণ করার ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। মানুষ ও প্রকৃতির বা যে কোনো অবজেক্টের স্থিরচিত্র ধারণ করার ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছিল আরও আগে। কিন্তু স্থিরচিত্র দিয়ে আমাদের চোখের সামনে চলমান জীবন বা কোনো বস্তুর গতিময় অস্তিত্বকে জীবন্ত তুলে ধরা সম্ভব ছিল না। গতিময় বা চলিষ্ণু দৃশ্যাবলীকে ধারণ করার জন্য Motion Picture আবিষ্কার পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
‘চলচ্ছবি’-র ক্যামেরা আবিষ্কার হলেও তার সময়সীমা ছিল মাত্র এক মিনিট। ছবিটিতে মানুষ প্রকৃতি বা বস্তুর নড়াচড়া ও কর্মকা- ধারণ করা গেলেও সেগুলো ছিল নিঃশব্দ। পরবর্তীতে রিল আকারে প্রতি মিনিটকে পরস্পর সংযুক্ত করে ছবির দৈর্ঘ্য ইচ্ছেমতো প্রলম্বিত হয়। রিল সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত এক মিনিটের এই শব্দবিহীন বা নির্বাক চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা ছিল ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। উন্নত প্রযুক্তি এবং যন্ত্র-কৌশল আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সবাক চলচ্চিত্র বা সিনেমার অগ্রযাত্রা শুরু হয় তখনই।
চলচ্চিত্রকে বিনোদনের মাধ্যম এবং শিল্প (Industry) হয়ে উঠতেও অনেকগুলো পর্যায় পার হতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চলচ্চিত্র স্টুডিও নির্মিত হয় ১৮৯৭ সালে। প্রথম স্থায়ী সিনেমা হল চালু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ১৯০৫ সালে। সেখানে প্রদর্শিত সিনেমাটির নাম ‘The Nickelodeon’। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ১৯১৪ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। সিনেমা ক্রমশ একটি লাভজনক শিল্পে রূপান্তরিত হয়।
সূচনায় সিনেমার জগৎ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও অচিরেই ঔপনিবেশিক ভারতেও সিনেমা প্রদর্শন এবং চিত্র নির্মাণ শুরু হয়।
সেই উনিশ শতকের শেষ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৯৭-৯৮) ভারতের কলকাতা ও বোম্বে শহরে চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং ক্যামেরার কাজ শুরু হয়। কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নয়, সমগ্র আফ্রো-এশীয় অঞ্চলেই আমাদের মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রামের হীরালাল সেন ছিলেন প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রকার। তিনি ছিলেন একাধারে প্রথম মোশন পিকচার ক্যামেরাম্যান, চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, প্রদর্শক, আমদানিকারক, চলচ্চিত্র সংগঠক এবং শিক্ষক। ১৮৯৮ সালেই তার নির্মিত এবং আমদানিকৃত ছায়াছবি কলকাতায় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়। তিনিই প্রথম উপমহাদেশে বিজ্ঞাপনচিত্র, রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, তথ্যচিত্র এবং সংবাদচিত্রের জনক। বাংলা চলচ্চিত্রের এবং উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি চির-স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে দেশভাগের আগে থেকেই বিভিন্ন হলে সিনেমা প্রদর্শন চলছিল। পর্যলোচনা করলে এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুর পর্বটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্বে, ১৯২৭ সালে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে। জগন্নাথ কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্তকে দেওয়া হয় ছবি নির্মাণের দায়িত্ব। ছবিটির নাম সুকুমারী। ১৯২৮ সালে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। অম্বুজ কুমার গুপ্তের নির্মিত দ্বিতীয় ছবি ‘দ্য লাস্ট কিস’ বা ‘শেষ চুম্বন’। প্রদর্শিত হয় ১৯৩১ সালে ‘মুকুল সিনেমা হলে’। তারপর দীর্ঘ বিরতি। বাণিজ্যিক বা অন্যভাবে ঢাকায় আর ছবি নির্মাণ হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকা সফরে এলে তার সফরের ওপর একটি তথ্যচিত্র ‘ইন আওয়ার অব মিডস্ট’ তৈরি করেন নাজির আহমেদ। ১৯৫৪ সালে তিনি আরেকটি প্রামাণ্য চিত্র ‘সালামত’ তৈরি করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয় কাহিনিচিত্র নির্মাণ। এটি ছিল ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের দ্বিতীয় পর্ব, যা আজও অব্যাহত আছে। আবদুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। ছবিটি ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায়। তবে এই চলচ্চিত্রটির এডিটিং ও অন্যান্য স্টুডিও সুযোগ-সুবিধার জন্য নির্ভর করতে হয় লাহোরের ওপর। আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ মুজিবের উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে ঢাকায় প্রথম ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি)’ নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ফিল্ম স্টুডিও স্থাপিত হয়। এর ফলে ষাটের দশকজুড়ে ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ দ্রুত বিকশিত হয়।
ষাটের দশক উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা যেতে পারে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত, ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি ছায়াছবি এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হতো। পশ্চিমবঙ্গ, ভারতে যেমন, তেমনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানেও উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র-অপর্ণা, বিশ্বজিৎ-সাবিত্রী (অন্য কেউও হতে পারে) জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশেও শুরুটা আশাপ্রদ ছিল। এখানে সপরিবারে দেখার মতো বাণিজ্যিক কাহিনিচিত্র তৈরি হতে থাকে। তখনকার বাস্তবতায় এখানেও শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জনপ্রিয় জুটি গড়ে ওঠে। শিল্পমানের দিক থেকেও বাংলাদেশের ছবি ফেলনা ছিল না। প্রতিভাবান সব চলচ্চিত্র নির্মাতার আবির্ভাব হয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত, পরিশীলিত রুচি এবং বৈদগ্ধ্যের অধিকারী বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র নির্মাতাÑ আব্দুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, সালাহউদ্দিন, এহতেশাম, জহির রায়হান, কলিম শরাফী, সুভাষ দত্ত, বেবী ইসলাম, মহীউদ্দিন, মুস্তাফিজ, কাজী জহির, খান আতাউর রহমান প্রমুখ বাংলা চলচ্চিত্রের একটা চমৎকার ঐতিহ্য গড়ে তোলেন।

Category:

রোজার শেষে আসছে ঈদ

Posted on by 0 comment

22সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: রোজা মুসলিম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম, আত্মশোধনের ক্ষেত্রে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষ রোজার শেষে নিষ্পাপ, নির্দোষ, নির্ভেজাল স্বচ্ছ জীবন লাভ করে থাকে ঈদুল ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে। সারাবছরে তার দেহে ও প্রাণে জমে ওঠা নানা রোগ, শোক, কুস্বভাব, কৃপ্রবৃত্তি, কুদৃষ্টি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ ও সংযম সাধনের মাধ্যমেই রোজা ও ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য নিহিত। প্রকৃত প্রস্তাবে সুষ্ঠু ও ধর্মীয়ভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই মুসলিম নর-নারী লাভ করে প্রকৃত সাফল্য। রোজা সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক সমতা, ন্যায়ভিত্তিক মানবিক চেতনা, মানুষে মানুষে পারস্পরিক সহানুভূতি-সহমর্মিতা ও উদার ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির মহত্তম প্রেরণা জোগায়। ইসলামের প্রতিটি বিধানই মানুষের কল্যাণ, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা-সৌহার্দ্য সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত করে। আরবি ‘রমজ’ শব্দ থেকে রোজা শব্দের উৎপত্তি। ‘রমজ’ অর্থ পোড়ানো বা জ্বালানো। আগুনে পুড়িয়ে কোনো ধাতুকে যেমন নিখাদ করা হয়, রোজাও তেমনি। রোজা মানুষের অসৎ প্রবৃত্তিকে নাশ করে সুপ্রবৃত্তির বিকাশ ঘটায়। রোজার উদ্দেশ্য মানুষকে প্রকৃত মানুষ (ইনসানে কামিল) করে তোলা, মানবিক মহৎ গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমেই প্রকৃত মানুষ বা ইনসানে কামিল হওয়া সম্ভব। মানুষকে সে ধরনের উন্নত চরিত্র বিশিষ্ট মানবিক সত্তায় পরিণত করাই রোজার উদ্দেশ্য। সামাজিক পরিবেশ সুস্থ-স্বাভাবিক ও সর্বপ্রকার কলুষতামুক্ত করার জন্য রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজের মানুষ যদি নিষ্ঠার সাথে রোজাব্রত পালন করে তা হলে সমাজে অন্যায়-অশান্তি ও অপরাধমূলক কাজ সংঘটিত হতে পারে না। তাই সমাজ সংস্কার বা সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রোজার বিধান অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে যে কোনো মুসলিম সমাজে অসামাজিক ও অপরাধমূলক কাজ তুলনামূলকভাবে কম হয়। সমবেতভাবে ইফতার করার ফলে পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে। এ সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ (স.) রোজাদারদের ইফতার করানোর ব্যাপারে সকলকে উৎসাহিত করেছেন। রোজা ব্যক্তি মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস, আমল-আখলাক, আচার-আচরণ, ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক জীবনধারায় এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন নিয়ে আসে। মানুষকে তার পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে তার মানবিক বোধ ও সত্তাকে জাগ্রত করে। রোজা ব্যক্তি জীবনে যে প্রভাব বিস্তার করে, সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক জীবন-ব্যবস্থায়ও তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। রোজা ব্যক্তি জীবনে যেরূপ বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনে সামাজিক জীবনধারায়ও তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।
রোজাদারের মনে সব সময় এক পবিত্র অনুভূতি জাগ্রত হয়, যা তাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবে রমজানে মানুষের সামগ্রিক জীবন ধারায় ও সমাজ-পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। রোজা যে পবিত্রতা ও সংযমের শিক্ষা দেয়, সে কারণে সামগ্রিকভাবে সমাজ-জীবনে এক ধরনের ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ সুন্দর অনাবিল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রমজানে প্রত্যেকটি ভালো কাজের জন্য ৭০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত অধিক সওয়াব। তাই এ মাসে রোজাদারগণ রমজানের রাতগুলো যথাসম্ভব বেশি বেশি ইবাদতের মধ্যে মশগুল থাকেন। রমজান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন যেমন বদলে দেয়, তেমনি সামাজিক পরিবেশ পাল্টে দিয়ে এক অনবদ্য পবিত্র ভাবধারায় জীবনকে নতুনভাবে উজ্জীবিত ও সমাজ-পরিবেশকে সুন্দর করে তোলে। আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও তার প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রদর্শনের দ্বারা রোজাদাররা পুরো রমজান মাস কঠোর সংযম ও সাধনায় অতিবাহিত করার ফলে এ মাসে আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারা ও সামগ্রিক সমাজ পরিবেশে আমূল পরিবর্তন ঘটে। রোজা আমাদের জীবন ও সমাজকে পবিত্রতার চাদরে আচ্ছাদিত করে দেয়। রোজা মানুষের জীবন ও পরিবেশ বদলে দেবার এক অসাধারণ শক্তি রাখে বলেই রোজার প্রভাব আমাদের জীবন ও সমাজে সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনেও রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রমজানে সদাকাতুল ফির্ত আদায় করা হয়। জাকাত-ফিতরা-সদকা ইত্যাদি কোনো দান বা করুণা নয়, এসবই ধনীর বিত্তে গরিবের ন্যায্য অধিকার। জাকাত, ফির্ত, সদকা দারিদ্র্য বিমোচনের নিশ্চিত গ্যারান্টি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যথাযথভাবে গরিব ও অভাবীদের মধ্যে এগুলো বিতরণের ব্যবস্থা করলে সারাদেশের দারিদ্র্য একপর্যায়ে অবশ্যই দূর হবে। সুসংগঠিতভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টনের ব্যবস্থা করে স্ব-স্ব এলাকার দারিদ্র্য বিমোচনে যথার্থ ভূমিকা রাখলেও ইপ্সিত ফল পাওয়া সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে, কোনো মুসলিম সমাজে দারিদ্র্য কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না এবং ভিক্ষুকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জীবিকা সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে না। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করেছে। রমজানে এ বিধান পালন করে সমাজের দরিদ্র, অসহায় মানুষের সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
ঈদ মানব সমাজের ধনী-গরিব ব্যবধান ভুলিয়ে দেওয়ার একটি দিন। ঈদের দিনে সবাই সমান। রোজার শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদ রোজারই অংশ। রোজা পালনের ফলে মুমিন ব্যক্তি যে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হয়, তার শুকরিয়া হিসেবে ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদের আনন্দে নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ, গরিব-দুঃখী, রাজা-প্রজা, মালিক-শ্রমিক সকল শ্রেণির মানুষ একত্রে শরিক হয়। একসঙ্গে সকলে ঈদের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে সৃষ্টি হয় এক অসাধারণ সাম্য-সহমর্মিতা ও উদার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ। বস্তুগত জাগতিক প্রাচুর্য, ঐশ্বর্য ও ধন-সম্পদের মোহ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রেখে মানুষের অন্তরকে বিকশিত নির্মল উজ্জ্বল ও সুন্দর করে তোলাই সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য আর ঈদ-উৎসবের মাহাত্ম্য। ঈদ মানুষের মধ্যে ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন সৃষ্টি করে। ভেদাভেদহীন সমাজ তৈরির বিষয়টি পবিত্র ঈদ উৎসবের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এভাবে যে সামাজিক সাম্য-সমতা-সহমর্মিতা ও উদার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা কি শুধু ঈদের দিনের জন্যই? মূলত ইসলামে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই, মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে সকল মানুষ এক ও অভিন্ন। সব মানুষ এক আদমের সন্তান। রোজা ও ঈদের শিক্ষার আলোকে বৈষম্যহীন, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, কল্যাণময়, ন্যায়ানুগ মানবিক উদার সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া মুসলিম মিল্লাতের কর্তব্য। আসন্ন রমজান ও ঈদের উৎসবকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না করে আমরা রোজা ও ঈদের প্রকৃত শিক্ষার বাস্তব রূপদানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠবে। রমজানের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে ও তাৎপর্যম-িত হয়ে উঠবে এবং সেদিনই আমরা জাতীয় কবির অমর গাঁথাÑ ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’ সকলে সমবেত কণ্ঠে প্রাণভরে গেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠব, ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে সকল প্রাণে, সমাজে, আকাশে-বাতাসে, বিশ্ব চরাচরে সর্বত্র।

Category:

নিত্যপণ্যে কোনো ভ্যাট থাকছে না

Posted on by 0 comment

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রস্তাবিত বাজেটে ১২৭ পণ্য ও সেবা খাতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা থাকছে। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ নিত্যপণ্য ক্রয়ে কোনো ভ্যাট থাকছে না। ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত মৌলিক খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছেÑ চাল, ডাল, ডিম, ফল, তরল দুধ, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচ, মাংস, মুড়ি, চিড়া, আলুসহ সব ধরনের সবজি।
সকল প্রকার কৃষিজ পণ্য, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু, পশুর মাংস, মাছ, ফলমূল, শাকসবজি, ভোজ্যতেল, চিনি, গুড়, লবণ, তুলা, পাট, রেশম সুতাসহ ৫৪৯টি পণ্য মূসকের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ৯৩ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন সেবা, জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সব অস্থায়ী হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাদ্যদ্রব্য সরবরাহকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ যেসব হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করে, তাতেও ভ্যাট হবে না। এ ছাড়া 63বাণিজ্য সুরক্ষার জন্য আমদানি পর্যায়ে ১ হাজার ৬৬৬টি এইচএস লাইনের আওতায় বিদ্যমান সব পণ্যে সম্পূরক শুল্কারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি, গবাদিপশু ও মৎস্য চাষ খাত সংশ্লিষ্ট ৪০৪টি ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ভ্যাট আদায়ের মাধ্যমে ৯১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করছেন মুহিত, যা এনবিআরের মাধ্যমে তার ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ পরিকল্পনার ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
জীবন রক্ষাকারী প্রায় সব ওষুধে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ কার্যক্রমকে মূসকের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ কার্যক্রমে ৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি। কৃষিকাজে ব্যবহৃত উপকরণ, যেমনÑ বীজ, সেচসেবা, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি মূসকের আওতার বাইরে। ডেইরি, ফাউড্রি, পাটশিল্পের কাজে ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতিতে মূসক অব্যাহতি সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

দাম কমবে
বাজেটে শুল্কহার হ্রাস ও কর রেয়াতির প্রস্তাব করায় বেশ কিছু পণ্য ও যন্ত্রপাতির দাম কমতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ চাল, ডাল, ডিম, ফল, মাছ, মাংস, মধু, তরল দুধ, লবণ, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচ, মাংস, মুড়ি, চিড়া, চিনি, আলুসহ সব ধরনের শাক-সবজিসহ প্রায় ৫৪৯টি পণ্যের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া কলা, খেজুর, ডুমুর, আনারস, পেয়ারা, আম, গাব, লেবু জাতীয় ফল, আঙ্গুর, তরমুজ, আপেল, নাশপাতিসহ যে কোনো ফল, গোলমরিচ, ভ্যানিলা, দারুচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল, জৈত্রী, এলাচ, মৌরী, ফেনেল, ধনিয়া, জিরা, আদা, জাফনার, হলুদ, তেজপাতা, কারি, মসলা, গম, মেসলিন; রাই, বার্লি, জই, ভুট্টা, ধান, সব ধরনের চাল, মুড়ি, সোরঘাম শস্য, বাজরা, ক্যানারাই বীজও ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় রয়েছে। ভ্যাট না থাকায় খরচ বাড়বে না দেশের মধ্যে (সরবরাহ) অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের মাধ্যমে পরিবহন সেবা, ভাড়াকৃত পরিবহন ছাড়া ট্যাক্সি, বাস, মিনিবাস, লঞ্চ, স্টিমার, ফেরির মাধ্যমে পরিবহন সেবারও। এয়ারলাইন্স (চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়া প্রদানকারী সংস্থা ব্যতীত) ও খাদ্যশস্য পরিবহন সেবাদাতাদেরও বাড়বে না খরচ। কৃষি পণ্যের মধ্যে বীজ, সব ধরনের সেচসেবা, বীজ সংরক্ষণ সেবা, মৎস্য, জলজপ্রাণী ও জলজসম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত সেবা। সিলিন্ডার ক্যাপাসিটি ভেদে কমবে হাইব্রিড গাড়ির দাম। এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশে সংযোজিত ও উৎপাদিত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব ও ফোনের দাম কমবে। প্রস্তাবিত বাজেটে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ট্যাব উৎপাদনে ব্যবহার হয় এমন প্রায় ৫০টি পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়ে অভিন্ন ১ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৯৩ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং গণপরিবহন সেবা, জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, ও প্রশিক্ষণের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি বাণিজ্যের লক্ষ্যে রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজ, এসি, পামওয়েল, সয়াবিন তেল ও এলপিজি সিলিন্ডার স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমবে।

মো. আবদুস শুকুর ইমন

Category: