Blog Archives

সময় এখন বাংলাদেশের

Posted on by 0 comment
9

৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বাজেট

আফরাফ সিদ্দিকী বিটু : উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা অব্যাহত রাখার স্বপ্ন দেখিয়ে ঘোষণা করা হলো আগামী অর্থবছরের বাজেট। ‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’Ñ এমন স্লোগানকে সামনে রেখে বিশাল ব্যয়ের প্রাক্কলন দেখানো হয়েছে প্রস্তাবিত এই বাজেটে। গত ১ জুন বেলা দেড়টায় জাতীয় সংসদে আকার বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার বাজেট ঘোষণা দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি।
ব্যয় পরিকল্পনা : আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে হয়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা ৮৩ হাজার কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশ বেশি। নতুন বাজেটে অনুন্নয়নমূলক ব্যয় ২ লাখ ৩৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা। আগের বাজেটে যা ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে অনুন্নয়ন রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। আগের বাজেটে এডিপির আকার ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
আয়ের লক্ষ্যমাত্রা : নতুন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আসবে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। শুধু এনবিআরের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এনবিআর-বহির্ভূত কর ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। কর ছাড়া আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। আয় ও মুনাফার ওপর কর থেকে আসবে ৮৬ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট থেকে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। ভ্যাট থেকে আয় আসবে ৯১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা, যা আগের বাজেটের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ বেশি। আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক থেকে ৩০ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে আসবে ৩৮ হাজার ২১২ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করতে গিয়ে মুহিত বলেন, যুগোপযোগী করনীতি, দক্ষ কর ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়ীসহ সকল স্টেকহোল্ডারের মাধ্যমে এনবিআর এ রাজস্ব আদায় করতে পারবে। তিনি দাবি করেন, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

উন্নয়ন বরাদ্দ
প্রস্তাবিত বাজেটটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ১৪তম বাজেট। এই বাজেটে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ রাখা হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, কৃষিতে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, স্বাস্থ্য ৬ দশমিক ১ শতাংশ, জনপ্রশাসন ৩ দশমিক ১ শতাংশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ, অন্যান্য খাতে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংশোধিত বাজেট
নতুন বাজেট পেশের সাথে চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। চলতি বছরের জন্য ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হলেও তা সংশোধন করে ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকায় কমিয়ে আনা হয়। এই বাজেটের সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা।

কৃষি খাতে বেড়েছে বরাদ্দ ও ভর্তুকি
কৃষি খাতে জাতীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আগের বছরের চেয়ে ৩ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নতুন বছরের জন্য ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করেন। আগের বছরের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী কৃষি খাতের বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা।

শিশু বাজেট পেল ৬ মন্ত্রণালয় ৭ বিভাগ
২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য ৫৬ হাজার কোটি টাকার পৃথক শিশু বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নতুন বাজেটে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে বরাদ্দ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এবার ৬টি মন্ত্রণালয় ও ৭টি বিভাগের জন্য অর্থমন্ত্রী এ বাজেট প্রস্তাব করেন।
বাজেট বক্তৃতায় ‘বিকশিত শিশু : সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাজেট প্রতিবেদনে শিশু বাজেটকে শিশুবান্ধব বাজেট, শিশু সংবেদী বাজেট বা শিশুমুখী বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি এ বছর তৃতীয়বারের মতো শিশুকেন্দ্রিক বাজেট উপস্থাপন করেন। এবার শিশু বাজেটে অন্তর্ভুক্ত নতুন বিভাগগুলো হলোÑ জননিরাপত্তা বিভাগ এবং আইন ও বিচার বিভাগ। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে এ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে শিশু বাজেট দেওয়া হয়। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ হলোÑ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগ।
এ বছর তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে শিশু বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭-এর সংশোধিত বাজেটের সাথে তুলনা করলে ২০১৭-১৮ সালে শিশুদের জন্য নির্বাচিত ১৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের বাজেট বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে শিশুকেন্দ্রিক বাজেট ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়, প্রবৃদ্ধির হার হিসাবে যা ২১ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হারের (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করেন, তাতে তিনি প্রবৃদ্ধির এই আশা প্রকাশ করেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন, এ বছর প্রবৃদ্ধির হার হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বিবিএস যে সাময়িক হিসাব দিয়েছে তাতে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তাই আগামী অর্থবছরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদী। পাশাপাশি এবার মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশে বেঁধে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

‘কর বাহাদুর’
দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পরিবারের সকল সদস্য কর দিলে সে পরিবারকে ‘কর বাহাদুর’ পরিবার ঘোষণার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আসছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, সৎ করদাতাদের উৎসাহিতকরণে এবং নতুন নতুন করদাতাকে করের আওতায় আনার লক্ষ্যে ট্যাক্স কার্ডের ব্যাপ্তি সম্প্রসারণ করে এ বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১৪১টি সম্মানসূচক ট্যাক্স কার্ড প্রদান করা হয়েছে।

বিড়ি উৎপাদন বন্ধ!
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে এ দেশ থেকে বিড়ি উৎপাদন বন্ধ করে দেব। দেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিনোদনের অনেক উপাদান পৌঁছে গেছে। এ ছাড়া, বিড়ি শিল্পে যে শ্রমিক আগে ছিল এখন তার ৯০ শতাংশই আর নেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ধূমপানজনিত চিকিৎসা ব্যয় বিবেচনায় এই খাত টিকিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এসব বিবেচনায় বিড়ির বিদ্যমান ট্যারিফ মূল্য বিলুপ্তির পাশাপাশি ফিল্টারবিহীন ও ফিল্টারযুক্ত বিড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কহার যথাক্রমে ৩০ ও ৩৫ শতাংশে কোনো পরিবর্তন করা হবে না। তবে ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা প্যাকেটের মূল্য হবে ১৫ টাকা এবং ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকার মূল্য হবে ১৫ টাকা।

11ই-টিকেটিং
বাস, রেলওয়ে, নৌ-যান ও চুক্তিবদ্ধ বেসরকারি বাসে জনগণের যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য করতে ই-টিকেটিং সিস্টেম প্রচলনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় জানান।

কর্মদক্ষতা প্রণোদনা ও পুরস্কার নীতিমালা
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে করদাতাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও উত্তম চর্চার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর কর্মকর্তাদের কাজে অধিক স্বচ্ছতা আনয়ন এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও কর ফাঁকি উদঘাটনে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে এনবিআর কর্তৃক শীঘ্রই একটি কর্মদক্ষতা প্রণোদনা ও পুরস্কার নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

পিপিপি প্রকল্পে ৪৫ প্রকল্প
অবকাঠামো নির্মাণে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ৪৫টি প্রকল্প পিপিপি কর্তৃপক্ষের পাইপলাইনে রয়েছে। যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ হবে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৯টি প্রকল্পের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ১৩টি প্রকল্প প্রকিউরিমেন্ট পর্যায়ে রয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা
প্রতিবছর অর্থনীতিতে যে শ্রমিক যুক্ত হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে সরকার জনগণের দক্ষতা উন্নয়ন করতে চাইছে। এজন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০ পৃষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) স্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিকমানের দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে পৃথক করা হবে।

৩৯২টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হবে
বর্তমানে ১৩ হাজার ৩৩৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। আরও ৩৯২টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া মাতৃ-স্বাস্থ্য ভাউচার কর্মসূচি সম্প্রসারণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

যমুনা সেতুর সমান্তরালে হবে রেলসেতু
যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে জাইকা অর্থায়নে একটি রেলসেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে করিডরকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুলনা-দর্শনা সেকশন ডাবল লাইনে উন্নীত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধীদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স
সাভারে ১২ একর খাস জমির ওপর আন্তর্জাতিকমানের প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি বিভাগীয় শহরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য একটি করে রিসোর্স কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সম্ভব সকল ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

বিভাগীয় শহরে ড্রাইভার ট্রেনিং সেন্টার
যানজট নিরসন এবং দুর্ঘটনা রোধে গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এজন্য প্রতিটি বিভাগীয় শহরে নতুন ড্রাইভার টেস্টিং এবং ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ২৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা
আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে ২৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেটের ৬ শতাংশ। বর্তমান সরকারের শাসনামলে প্রতিটি বাজেটেই সামাজিক নিরাপত্তা খাত গুরুত্ব পেয়ে আসছে। চলতি অর্থবছর অর্থাৎ, ২০১৬-১৭ সালে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৯ হাজার ২৯১ কোটি টাকা, যা উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৮০ কোটি টাকা। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা নারী, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে, দরিদ্র মা, কর্মজীবী মায়েদের মাসিক ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১০ হাজার ফ্ল্যাট
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণ, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণে আমাদের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। পাশাপাশি অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের উন্নত আবাসন সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সারাদেশে ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনাও আমরা গ্রহণ করেছি। মুহিত বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে গণহত্যা-নির্যাতন, বধ্যভূমি, গণকবর চিহ্নিতকরণ, এ সংক্রান্ত তথ্যভা-ার তৈরি, প্রদর্শনী এবং প্রকাশনার লক্ষ্যে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও আমরা গ্রহণ করব।
একই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি ১০ হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা দেওয়া হবে বলে বাজেটে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সরকারের নানামুখী কার্যক্রম রয়েছে। এসব কার্যক্রমের বিপরীতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। প্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি হওয়া তথ্যভা-ার ব্যবহার করে সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। নতুন করে প্রতিটা বিভাগীয় শহরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য একটি করে ‘রিসোর্স কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা এবং সম্ভব সকল ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তির উপকারভোগীর সংখ্যা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৫ হাজার করে মোট ১০ হাজার বাড়ানো হয়েছে।
অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ লাখ ২৫ হাজার এবং মাসিক ভাতার পরিমাণ ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে।

বাড়ছে অন্যান্য ভাতার হার ও উপকারভোগীর সংখ্যা
প্রস্তাবিত বাজেটে ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্তরা জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৬০০ টাকা করে পাবেন। একই সাথে উপকারভোগীর সংখ্যা বর্তমানের ৩১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩৫ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ভাতা ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৬০০ টাকা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছর থেকে তারা এ হারে ভাতা পাবেন। আর বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা নারী ভাতাভোগীর সংখ্যা ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ১২ লাখ ৬৫ হাজার করা হয়েছে।
ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির বরাদ্দ ২০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিশেষ ভাতা খাতে বরাদ্দ ২ কোটি ৩৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১১ কোটি ৩৫ লাখ করা হয়েছে। বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বিশেষ/বয়স্ক ভাতার খাতে বরাদ্দ ৬ কোটি ৩২ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২৭ কোটি টাকা করা হয়েছে।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং খাদ্যদ্রব্যাদির পরিবর্তে জনপ্রতি এককালীন নগদ ৫ হাজার টাকা প্রদান করবে।
দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা উপকারভোগীর সংখ্যা আরও ১ লাখ বাড়িয়ে ৬ লাখে উন্নীত করেছে।
কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মায়েদের মাতৃত্বকাল ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা ২০ হাজার বাড়িয়ে ২ লাখ করা হয়েছে।

হাওর এলাকার জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
অর্থমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক বন্যা ও দুর্যোগে হাওর এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এ এলাকার প্রকৃত দুস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত ৩ লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল প্রদানের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাসিকভিত্তিতে নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য মোট ৫৭ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দও ইতোমধ্যে প্রদান করা হয়েছে।
ইজিপিপির আওতায় ৯১ হাজার ৪৪৭ উপকারভোগীকে ৮২ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ঋণ আদায় স্থগিতকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রেয়াত হারে নতুন ঋণ প্রদান এবং ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের রূপকল্প অর্জনে সুশাসনের ধারা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। গড়ে তুলতে হবে কার্যকর মানব-মূলধন মজুদ। কণ্টকমুক্ত রাখতে হবে ব্যক্তি খাত বিকাশের পথকে। তদুপরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে জানিয়ে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ আগামী ২০২১ সালের আগেই বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশা করছি। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন ১১২১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত ১১১২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৪২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার আওতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে রামপাল, মাতারবাড়ী, পটুয়াখালীর পায়রায় এবং বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের আর্থিক সহায়তায় মহেশখালীতে ৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। মন্ত্রী বলেন, সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রায় ১০ হাজার কিমি নতুন সঞ্চালন লাইন এবং প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কিমি নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। পাশাপাশি, সিস্টেম লস হ্রাস, লোড ম্যানেজমেন্ট এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের মধ্যে আরও ২ কোটি প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পরিকল্পনাও আমরা গ্রহণ করেছি।

৭ মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ ৩০ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা
পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ, মেট্রোরেল ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সাত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এসব প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ১৫ হাজার ৪৯৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগামী অর্থবছরের বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় দ্বিগুণ। গত ১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় আলাদা করে মেগা প্রকল্পের জন্য বাজেট উপস্থাপন করেন নি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) উপস্থাপন করা হয়। আগামী অর্থবছর একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ প্রকল্পে এবার দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ১৮৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।  চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে এ প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার ৬৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (মেট্রোরেল) অনুকূলে আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৪২৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ারড পাওয়া প্রজেক্টে ২ হাজার ২২০ কোটি টাকা। পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে বরাদ্দ ৭ হাজার ৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের নিকটে ঘুমধুম পর্যন্ত সিংগেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পে ১ হাজার ৫৬১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। চলতি মেয়াদের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় কয়েকটি প্রকল্পের অগ্রগতি দৃশ্যমান করতে চায় সরকার। ফলে এডিপির বড় অংশ চলে যাচ্ছে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে।
তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য কর্পোরেট কর হার ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ শিল্পের কর হার ২০ থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে খাতটির উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে এই প্রস্তাব রেখেছেন। তবে একই সাথে তিনি এ খাতের উদ্যোক্তাদের মুনাফা কেড়ে নেওয়ার অন্যতম অস্ত্র হিসেবে পরিচিত উৎসে করহারে অনমনীয় মনোভাব দেখানো হয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে উৎসে করহার কমানোর দাবি সত্ত্বে¡ও সেটি আমলে না নিয়ে বর্তমানে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ হার বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পোশাক খাতের যেসব কোম্পানি করদাতার কারখানা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে বা পাবে এমন উদ্যোক্তাদের কোম্পানি করহার আরও ১ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণেরও প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।

স্বল্প আয়ের মানুষের ফ্ল্যাট
নাগরিকদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের আওতায় পিপিপিতে তৈরি করা হবে ৬২ হাজার ফ্ল্যাট, কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্পের আওতায় জিটুজি পদ্ধতিতে ১০ হাজার ৯৪৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। আর ঢাকার কড়াইল-লালাসরাই ও মহাখালীতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ৪ হাজার ৬৬২টি ফ্ল্যাট এবং মিরপুরে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনের স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণ, চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে বহুতল বাণিজ্যিক-কাম-আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মাথাপিছু বরাদ্দ বেড়েছে ২ হাজার ৭৬৪ টাকা
দেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে বাজেট মোটেই বড় নয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মাথাপিছু বরাদ্দ বেড়েছে ২ হাজার ৭৬৪ টাকা। এ সময়ে মাথাপিছু মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৫ হাজার ১৬ টাকা। চলতি বছরে যা ছিল ২২ হাজার ২৫২ টাকা।

13দেশে টাকা পাঠালে অনেক প্রণোদনা
প্রবাসী আয় বাড়াতে একগুচ্ছ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ প্রবাসী আয় পাঠানোর ব্যয় হ্রাস, বিদেশে কর্মরত ব্যাংকের শাখা ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোকে রেমিট্যান্স পাঠানোয় দক্ষ করে তোলা, প্রবাসীরা যেসব দেশে কর্মরত সেসব দেশের স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সাথে এ দেশের ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ড্রয়িং ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোয় উদ্বুদ্ধকরণের উদ্যোগ গ্রহণ।

৫০ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা
সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৮ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও ২৭ লাখ টন খাদ্যশস্য বিতরণ এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে বছরের পাঁচ মাস স্বল্প আয়ের ৫০ লাখ পরিবারকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে খাদ্য সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। পাশাপাশি, খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণে পরিবীক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করব।

পদ্মাসেতুতে বরাদ্দ সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা
পদ্মা বহুমুখী সেতুতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চলতি ২০১৬-১৭ সালের অর্থবছরে এ প্রকল্পে বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল ৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে চলতি বছরে ব্যয় হয় ৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা।
১ জুন বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বলেন, পদ্মাসেতু প্রকল্পের ৪১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী বছরের ডিসেম্বরে নির্ধারিত সময়েই বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পদ্মার মূলসেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ৪৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, কাজ হয়েছে ৩৭ শতাংশ। প্রায় ১৩ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে।

তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নে বরাদ্দ ৩৯৭৪ কোটি টাকা
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে গত বাজেটের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দ্বিগুণেরও বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে এককভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছর থেকে ২ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা বেশি। গত অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা।

Category:

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার

Posted on by 0 comment

38সাইদ আহমেদ বাবু: সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত হলো প্রথম আরব ইসলামিক আমেরিকান সম্মেলন। গত ২০ মে থেকে দুদিনব্যাপী এই সম্মেলনে ৫৫টি মুসলিম দেশসহ যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণ করে। মুসলিম দেশগুলোর প্রাধান্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অংশগ্রহণ করায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই সম্মেলন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ৫৬ জন আরব ও মুসলিম নেতা ইতিহাসের প্রথম এ ধরনের সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।
শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানকারীদের মধ্যে ছিলেন কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব-আমিরাতের আমির, বাহরাইনের বাদশাহ, ব্রুনাইয়ের সুলতান, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বেনিন, লেবানন, মৌরিতানিয়া, তিউনেশিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক ও নাইজারের প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, আলজেরিয়া পার্লামেন্টের চেয়ারম্যান ও উগান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আরব ইসলামিক আমেরিকান সম্মেলন করার উদ্যোগ নেয়।
শীর্ষ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য বলা  হচ্ছেÑ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা, সহিষ্ণুতা ও সৌহার্দ্যরে সম্প্রসারণ এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টা জোরদার করা। বৈশ্বিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সম্মেলনকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
এ সম্মেলনের শেষের দিকে বিশ্ব নেতারা একত্রিত হয়ে রিয়াদে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে গ্লোবাল সেন্টারের উদ্বোধন করেন।
মুসলিম দেশগুলোর জন্য এ শীর্ষ সম্মেলন তখনই ফলদায়ক হবে যখন মুসলিম নেতৃত্ব তাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে এই অঞ্চলের সমস্যাগুলো একতাবদ্ধভাবে সমাধান করে সম্ভাবনাসমূহকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু ঐক্য সৃষ্টির বদলে যদি এ সম্মেলন মুসলিম বিশ্বের মধ্যে  বিভাজন সৃষ্টি করে, তা হলে পুরো চেষ্টাটি ব্যর্থ হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করে।
প্রসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে তার প্রমাণ ট্রাম্পের সফরের প্রথম দিনই মিলেছে। এদিন সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্র তার এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র চুক্তি সই করেছে। ৩৫ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সহযোগিতা সৌদি আরব এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে নিরাপত্তা দেবে, বিশেষ করে ইরানের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে এবং ইরান সম্পর্কিত যে হুমকি সৌদি আরবের সীমান্তের চারদিকে অবস্থান করছে সেই বিষয়ে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়ের মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সফরকে যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব ইসলামি দেশগুলোর সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। সৌদি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে রেওয়াজ অনুযায়ী ঐতিহ্যবাহী নাচে অংশ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা দিয়েছেন সৌদি রাজা সালমান বিন আবদুল আজিজ। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ট্রাম্পকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ আল সৌদের নামে চালু করা পদকটি সৌদি আরবের বন্ধুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বিদেশি নাগরিকদের দেওয়া হয়। এর আগে যেসব বিদেশি ব্যক্তিত্ব এই পদক পেয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জর্জ ডব্লিউ বুশ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
নানান জটিলতা পেরিয়ে বিশ্বের সব থেকে শক্তিধর রাষ্ট্রের শীর্ষপদে আসীন হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের মুখে বহুবার শোনা গেছে মুসলিমবিরোধী মন্তব্য। মুসলিমদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারির হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনিই প্রথম বিদেশ সফর করলেন মুসলিম অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব থেকে। সৌদি বাদশাহ সালমানের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার সময়ই ট্রাম্পপক্ষীয় ব্যক্তিরা বলেছিলেন, ট্রাম্পের এই সফরের উদ্দেশ্য তার বর্তমান ইসলামবিরোধী ভাবমূর্তি পাল্টে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ঠিকঠাক করা।
সফরের দ্বিতীয় দিনে ৪০টি মুসলিম দেশের নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন ট্রাম্প।
এদিন সৌদি আরবের রাজধানী শহর রিয়াদে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশ্বের সমস্ত মুসলিম নেতাদের উদ্দেশে বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। এর পাশাপাশিই তিনি বলেছেন, মৌলবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোকেও একসাথে কাজ করতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বলেছেন, জঙ্গিদের আক্রমণে বিধ্বস্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশ। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের জন্য কেন একটি ধর্মের মানুষ বিশ্বের নজরে খারাপ হবে? এটি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে কিংবা কোনো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি শুধু সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই।
এই লড়াইয়ে সমস্ত ধর্মের মানুষকে একজোট হওয়ার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মুসলিমদের ও এই জোটে শামিল হওয়ার কথা বলেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস দমনের জন্য সব সময়ই সব দেশকেই সাহায্য করবে। সব দেশ জোটবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করলে সন্ত্রাসবাদীদের নির্মূল করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, কোনো দেশের উচিত নয় জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া। সন্ত্রাসবাদীরা যাতে তাদের দেশে জায়গা না পায়, তা নিশ্চিত করতে বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ভারত, রাশিয়া, চীন ও অস্ট্রেলিয়া সন্ত্রাসবাদের শিকার, যেমন শিকার আমেরিকা ও ইউরোপও। এসব দেশে বারবার বর্বর হামলা ঘটনা ঘটেছে। অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সয়েছেন এসব দেশের মানুষরা।
তবে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম দেশগুলোকে সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে নিজ নিজ ভূমিকা পালন করতে বলেছেন তিনি। তার কথায়, সন্ত্রাসবাদ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এখান থেকেই শান্তি শুরু হতে পারে। আর সে জন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে আমরা সন্ত্রাসকে পরাস্ত করে তার জঘন্য আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করতে পারি।
মুসলিম দেশগুলোর প্রতি তার আহ্বান, সন্ত্রাস দমনে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সন্ত্রাসের পতাকা বহনকারীদের নিজের দেশে জায়গা দেবেন না। জঙ্গিরা যাতে তাদের মাটিতে ঘাঁটি না গাড়তে পারে, তা নিশ্চিত করা এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের দায়িত্ব।

বিশ্বে শান্তি স্থাপনে শেখ হাসিনার ৪ প্রস্তাব
আরব ইসলামিক আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়ে বিশ্বে শান্তি স্থাপনে তার ৪টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মুসলিম প্রধান অর্ধশতাধিক দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাদরে গ্রহণ করে বাংলাদেশে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শেখ হাসিনার প্রস্তাব প্রথমত; আমাদের অবশ্যই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত; সন্ত্রাসী ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর প্রতি অর্থের জোগান বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত; ইসলামি উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি দূর করতে হবে। আর চতুর্থত; সংলাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংকটগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বের করতে হবে, যাতে সকল পক্ষই তাদের নিজ নিজ সাফল্যের দিকটি নিশ্চিত করতে পারে।
আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলন আয়োজন করেছে সৌদি আরব। আর সে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্ব ফোরামে এসব প্রস্তাব তুলে ধরলেন শেখ হাসিনা।

Category:

মেট্রোরেল নির্মাণে ৩ চুক্তি সই

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: মেট্রোরেলের ডিপো এলাকার পূর্ত কাজ এবং উত্তরা (উত্তর) থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ভায়াডাক্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণে ৩টি চুক্তি সই করেছে সরকার। গত ৩ মে রাজধানীর একটি হোটেলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির উপস্থিতিতে মেট্রোরেলের প্রকল্প পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন এবং নির্মাণকারী দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তোয়াত চাই সুথি রাপা চুক্তিতে সই করেন। প্রকল্পের প্যাকেজ ২, ৩ ও ৪-এর আওতায় এসব স্থাপনা নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্যাকেজ-২ এর চুক্তি মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় ডিপো এলাকার পূর্ত কাজ করা হবে। ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড এবং সিনোহাইড্রো কর্পোরশন লিমিটেড জেভির সাথে এই চুক্তি হয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা লাগবে; এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দেবে জাইকা। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা জোগাবে সরকার। গত ২৮ এপ্রিল ভূমি অধিগ্রহণের বিশেষ বিধান রেখে মেট্রোরেল সংক্রান্ত আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ২০১২ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) এ প্রকল্প অনুমোদন পায়। মেট্রোরেল প্রকল্প পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এই প্যাকেজের আওতায় নির্মাণ হবে স্টাবলিং ইয়ার্ড (বিরতিতে ট্রেন রাখার স্থান), ট্রেন মেরামত ও ওভারহোলের মালামালের গুদাম, প্রধান ওয়ার্কশপ, অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার, ট্রেন ইন্সপেকশন, জেনারেটর ও ইলেকট্রিক্যাল ভবন, ট্রেন ওয়াশ স্থাপনা, ম্যানুয়াল ট্রেন ওয়াশিং, বহুতল কার পার্কিং ও গ্রিন স্পেস।
এ ছাড়া প্যাকেজ ৩ ও ৪-এর আওতায় উত্তরা নর্থ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এই দুই প্যাকেজের চুক্তিমূল্য প্রায় ৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। এই দুই প্যাকেজের কাজের জন্য চুক্তি হয়েছে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেডের সাথে। চুক্তি সইয়ের পর সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এই প্রকল্প ৮টি প্যাকেজ বাস্তবায়িত হচ্ছে, প্যাকেজ ২, ৩, ৪-এর চুক্তি স্বাক্ষর হলো। ঘোষণা আগামী ২০১৯ সালে মেট্রোরেলের বাণিজ্যিক পরিচালনা শুরু সম্ভব হবে কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হলি আর্টিজান ঘটনার পর মেট্রোরেলের কাজ কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। তাদের সাতজন কনসালটেন্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হওয়ায় গতি স্থিমিত হয়ে যায়। প্রায় ছয় মাসের মতো পিছিয়ে গেছি। এখন আবার পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। এখন থেকে কাজে কোনো বিঘœ ঘটবে না বলেও জানান তিনি।

Category:

রাজধানীবাসীর গতি বাড়িয়ে দেবে মেট্রোরেল

Posted on by 0 comment

46তন্ময় আহমেদ: যানজট নিরসনে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর একটি মেট্রোরেল প্রকল্প। রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে ‘ম্যাস র‌্যাপিড ট্রান্সপোর্ট’ বা সংক্ষেপে এমআরটি-র কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এটি পুরো শহরের ট্রাফিক সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনবে। সে লক্ষ্য নিয়েই পুরোদমে চলছে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ।
ছয় লাইনের ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পটি প্রায় ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও প্রস্থ ১৮০ মিটার এবং এর ১৬টি এলিভেটেড স্টেশন থাকবে। পুরো লাইনে থাকবে ইলেকট্রিক লাইট। উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রতি ৪ মিনিট বিরতিতে ট্রেন ছাড়বে। বর্তমানে যেখানে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময়েও পৌঁছানো কঠিন, সেখানে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মাত্র ৩৮ মিনিটেই উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছে যাওয়া যাবে। ২০১৯ সালের মধ্যে উত্তরা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত মেট্রোরেলে চড়তে পারবেন মানুষ। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ট্রেন চলবে মতিঝিল পর্যন্ত।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় এমআরটি লাইন ৬-এর কাজ চলছে, যে প্রকল্পের নাম ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ডিএমআরটিডিপি)। জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্পটি। মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে প্রকল্প সাহায্য ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং জিওবি : ৫ হাজার ৩৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
সুষ্ঠু বাস্তবায়নের স্বার্থে প্রকল্পটিকে ৮টি কন্ট্রাক্ট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। প্যাকেজ ১-এর আওতায় ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন, প্যাকেজ ২-এর আওতায় ডিপো এলাকায় সিভিল অ্যান্ড বিল্ডিং ওয়ার্কস, প্যাকেজ ৩-এর অধীনে ডিপো থেকে পল্লবী পর্যন্ত ভায়াডাক্ট অ্যান্ড স্টেশন নির্মাণ, প্যাকেজ ৪-এর অধীনে পল্লবী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ভায়াডাক্ট এবং স্টেশনসমূহ নির্মাণ, প্যাকেজ ৫-এর আওতায় আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ভায়াডাক্ট এবং স্টেশন নির্মাণ, প্যাকেজ ৬-এর অধীন কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ভায়াডাক্ট এবং স্টেশন নির্মাণ, প্যাকেজ ৭-এর আওতায় মেট্রো সিস্টেমের সব ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল কাজ ও প্যাকেজ ৮-এর অধীন ডিপো ইকুইপমেন্ট এবং ১৪৪টি কোচ সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ট্রেন থাকবে ২৪ সেট। প্রতিসেটে ৬টি কোচ থাকবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের এলাইনমেন্ট হচ্ছে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে শুরু হয়ে পল্লবী-রোকেয়া সরণির পশ্চিম পাশ দিয়ে খামারবাড়ী হয়ে ফার্মগেট-হোটেল সোনারগাঁও-শাহবাগ-টিএসসি-দোয়েল চত্বর-তোপখানা রোড দিয়ে মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত। রুটটি সম্পূর্ণ এলিভেটেড (উড়াল পথ)। এ লাইনের ১৬টি স্টেশন হচ্ছেÑ উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয় এবং মতিঝিল। প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে মেট্রোরেল-৬।
মেট্রোরেল চলাচল করবে উড়াল পথে। তাই রাস্তার বিভাজকের ওপর থাকবে পিয়ার। আর ফুটপাথের ওপর থাকবে স্টেশন। অর্থাৎ ওপর দিয়ে মেট্রোরেল চলবে আর নিচ দিয়ে সড়ক পথে চলবে অন্যান্য যানবাহন।
এদিকে নিচ দিয়ে চলাচলের সুবিধার্তে প্রয়োজন অনুসারে রাস্তা প্রশস্ত করা হবে যাতে ভোগান্তি নিরসন হয়। সহজেই যানবাহন চলাচল ও পথচারীদের চলার পথও মসৃণ হয়। এ পদক্ষেপ প্রাথমিকভাবে মিরপুর ডিওএইচএস গেট থেকে মিরপুর-১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্ত ও উন্নয়ন করা হবে। ১১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক প্রশস্ত করা হবে। মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ কাজের সময় দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেওয়ার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পথচারীদের ফুটপাথ ব্যবহারের সুবিধাসহ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও উন্নত করা হবে।
রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে নতুন করে আরও দুটি মেট্রোরেলের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। যার একটি শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যাবে। আবার বসুন্ধরার পাশ দিয়ে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত আরেকটি লাইন যাবে ১০ কিলোমিটার। যা পুরোটাই হবে এলিভেটেড। আর বসুন্ধরার পাশ দিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যে লাইন যাবে তার ১৬ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল ফরমেটে। অর্থাৎ, রেল চলবে মাটির নিচ দিয়ে।
অন্য লাইনটি হবে হেমায়েতপুর থেকে গুলশান হয়ে নতুনবাজার-ভাটারা পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার। এ লাইনটির একাংশ হবে মাটির নিচ দিয়ে।
ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিটে (এমআরটি লাইন-১) বিমানবন্দর থেকে ৯টি স্টেশন হবে। এগুলো হলোÑ খিলক্ষেত, কুড়িল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা গেট, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর। আর কুড়িল থেকে পূর্বাচলের দিকে ১০ কিলোমিটার লাইন ওপর দিয়ে এলিভেটেড আকারে যাবে। এর সম্ভাব্য স্টেশন হলোÑ বসুন্ধরা, মাস্তুল, পূর্বাচল, পশ্চিম পূর্বাচল সেন্টার ও পূর্বাচল টার্মিনাল।
বিমানবন্দর-কমলাপুর মেট্রোরেলের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। মূল সম্ভাব্যতা যাচাই করছে জাপানভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা।

Category:

দেশরত্ন শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

Posted on by 0 comment

3অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম : বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে দুটি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যার প্রথমটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্তি লাভ করে লন্ডন ও নতুন দিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। দ্বিতীয়টি হলো, ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর ছয় বছরের নির্বাসন শেষে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে একটি আধুনিক স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলেছিলেন। ’৭১-এর শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য পরাজিত পাকিস্তানের এ দেশীয় গোলামরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বেনামি পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছিল। সে সময় বিদেশে থাকায় দৈবক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে গিয়েছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সৌজন্যে তারা দিল্লিতে আশ্রয় লাভ করেছিলেন।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়। বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধ হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র স্থাপনে যে দল নেতৃত্ব দিয়েছিল সে দলটির নাম-নিশানা মুছে দেবার জন্য এমন কোনো পন্থা নেই যা অনুসৃত হয়নি। ঐ প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫-এর ট্র্যাজেডির পর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয় ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সেই কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এটা ছিল আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের কারণেই শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, যার সুদূরপ্রসারী সুফল আজও বাংলাদেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
১৯৮১ সালের ১৭ মে অপরাহ্নে শেখ হাসিনা তার নির্বাসন জীবন শেষে দিল্লি থেকে বিমানযোগে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। তখন গ্রীষ্মকাল, অঝোর ধারায় বর্ষা নামল, মনে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রকৃতি অঝোর ধারায় ক্রন্দনরত। বিমানবন্দর ঘনবর্ষণেও লোকে লোকারণ্য। শেখ হাসিনা, পিতা-মাতা, ভাই, নিকট আত্মীয় পরিজনহীন ঢাকায় নামলেন অশ্রুসিক্ত হয়ে। কিন্তু তার ছয় বছরের রুদ্ধ আবেগকে তিনি সংবরণ করতে পারলেন না, তিনিও প্রকৃতি ও জনতার অশ্রান্ত ক্রন্দনে শামিল হয়ে একটি ট্রাকে উঠলেন। বিমানবন্দর থেকে বনানী গোরস্তান, সেখানে সারি সারি শুয়ে আছেন মা, ভাইয়েরা, তাদের স্ত্রী, আত্মীয় পরিজন ও তিন জাতীয় নেতা। কবরগুলো তখনও বাঁধানো বা ঠিকমতো চিহ্নিত করা হয়নি। পঁচাত্তরের খুনিরা বঙ্গবন্ধুর কবর ঢাকাতে হতে দেয়নি। তার লাশ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে গেছে এবং তড়িঘড়ি যেনতেন প্রকারে দাফন করেছে। ফলে দেশের মাটিতে নেমে শেখ হাসিনা একসঙ্গে বাবা-মা ও ভাইদের কবর দেখতে পান নি। বনানী গোরস্তানে সেই বর্ষাসিক্ত বিকেলে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। মা ও ভাইদের কবরে আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগলেন শেখ হাসিনা। তিনি তার এতদিনকার সঞ্চিত বেদনা ও কান্নার ¯্রােতে ভেসে গেলেন। বনানী থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ, সেখানে এই অক্লান্ত বৃষ্টির মধ্যে শেখ হাসিনার জনসভা। এক শোকার্ত জনসমুদ্রে অশ্রু ভারাক্রান্ত শেখ হাসিনা যা বললেন তার মর্ম এই যে, যে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে তার পিতা সপরিবারে জীবন দিয়ে গেছেন সেই দেশের মানুষের মুক্তির জন্য তিনি নিজেকে উৎসর্গ করলেন। ঐ কথাগুলো বলতে বলতে বারবার তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। প্রকৃতির কান্না, জনতার কান্না হাসিনার কান্নার সাথে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।
শেখ হাসিনা যখন নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে আসেন তখন ঢাকায় তার নিজের বাড়িঘর বলতে কিছু ছিল না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ৩২নং ধানমন্ডির যে বাড়িটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাড়ি, সেটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বঙ্গবন্ধু পরিবারের রক্তে রঞ্জিত এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরী। ১৯৮১ সালে ১৭ই মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পরও বঙ্গবন্ধু ভবনের অধিকার ফিরে পাননি, সে বাড়ি তখনও ক্ষমতাসীন সরকারের দখলে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলেও ধানমন্ডি বা টুঙ্গিপাড়ার বাড়ি দুটি সরকার সিল করে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধুর কবরে কাউকে যেতে দেওয়া হতো না। শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ও টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির অধিকার ফিরে পান জুলাই মাসে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের শাসনামলে।
আশির দশকে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রায় দেড় দশক শেখ হাসিনাকে প্রথমে সামরিক স্বৈরাচার এবং স্বৈরাচারের উত্তরসূরিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠন ও তাতে নেতৃত্ব প্রদান করতে হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেন। প্রায় ২০ বছর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল ক্ষমতায় আসে কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান তখন নেই, তাদের নেতৃত্বের অভাব পূরণ করতে হয় শেখ হাসিনাকে প্রায় এককভাবে। পরিবার-পরিজনহারা শেখ হাসিনা দেড় দশকের অবিরাম প্রয়াসে সমস্ত ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল ছিন্ন করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দেশ এক দীর্ঘস্থায়ী প্রলয়ঙ্করী বন্যার কবলে পড়ে, হাসিনা সরকার সাফল্যের সাথে সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করে এবং নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্যের দাম পুরো শাসনামলে স্থিতিশীল রাখে। এটা ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ প্রায় দুই দশক বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের নাম-নিশানা মুছে ফেলে দেওয়া হয়েছিল সুপরিকল্পিত উপায়ে, শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। দুই দশকজুড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, শেখ হাসিনার শাসনামলে তার অবসান ঘটে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়। টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে বিশেষ বিশেষ দিনে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর কবরের ওপর যথাযোগ্য সৌধ স্থাপিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ হয়ে ওঠে জাতীয় তীর্থক্ষেত্র।
শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, ১৯৯৯-২০০০ সাল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন এবং ইউনেস্কো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা।
১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলকাতায় আন্তর্জাতিক ‘বইমেলা’ উদ্বোধন করেন। সে বছর কলকাতায় আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশ ছিল ‘থিম কান্ট্রি’। একই বছর বিশ্বভারতী শেখ হাসিনাকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে এবং একই সাথে শেখ হাসিনা নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়া সফর করেন। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন এবং নজরুলের চুরুলিয়া একই সাথে সফর ছিল এক বিরল সাংস্কৃতিক ঘটনা। ঢাকার সাত মসজিদ রোডে যে জমিটির ওপর ছায়ানট সাংস্কৃতিক ভবন স্থাপিত হয়েছে সেই জমিটি শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলেই বরাদ্দ করা হয়েছিল। নজরুল জন্মশতবর্ষে ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে কলকাতা, শান্তিনিকেতন, দিল্লি, লন্ডন এবং ফ্লোরিডায় মহাসমারোহে নজরুল জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পেছনে বাংলাদেশের জাতীয় কমিটির নেপথ্য সাহায্য, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যে কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন শেখ হাসিনা। সর্বোপরি ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন ‘নজরুল সমাধি সৌধে’র নকশা অনুমোদন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যার নির্মাণকাজ শেষ হয় ১০ বছর পর। ২০০৯ সালে নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর আগে শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। শেখ হাসিনার একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ৩২নং ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধুর ভবনটিকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর এবং জাতির উদ্দেশে তা উৎসর্গ করা। শেখ হাসিনার আরেকটি ঐতিহাসিক কাজ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ দুটির পা-ুলিপি উদ্ধার, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও প্রকাশনা। বঙ্গবন্ধুর রচনাবলী প্রকাশনার মাধ্যমে শেখ হাসিনা পিতার এক অজানা দিক জাতির সামনে তুলে ধরেছেন এবং তা অনূদিত হয়ে বিশ্বময় প্রচারিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর আরও কিছু রচনা এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী প্রকাশের অপেক্ষায়। ১৯৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। তার ৩৫ বছর পর ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আবার বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া তিনি এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাফতরিক ভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করে। বর্তমানে জাতিসংঘের ব্যবহৃত ভাষা হলো ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, চায়নিজ প্রভৃতি। জনসংখ্যার দিক থেকে বর্তমান পৃথিবীতে বাংলা ভাষার স্থান চতুর্থ। সুতরাং তৃতীয় বিশ্বের কোনো ভাষাকে যদি জাতিসংঘের ব্যবহারের জন্য নির্বাচন করতে হয়, তা হলে বাংলা ভাষার দাবি অগ্রগণ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বসভায় বাংলাভাষা ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব জাতিসংঘ কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা এবং ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা।
২০০৮ সাল থেকে পুনরায় শেখ হাসিনা পরপর দুবার বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন অর্থাৎ এ পর্যন্ত তিনি তিনবার বাংলাদেশের সরকার পরিচালনা করছেন। তার সরকারের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তার হারানো গৌরব ফিরে পায়। বাংলাদেশ একটি উন্নততর আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ। একসময়কার তলাবিহীন ঝুড়ি নামে অভিহিত বাংলাদেশ আজ খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশে শিক্ষার হার ক্রমবর্ধমান। সরকার গত আট বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ বই বিতরণ করেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ঐ পর্যায়ে ছাত্রদের অপেক্ষা ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি, যা বাংলার পশ্চাৎপদ নারী সমাজে অগ্রগতির সূচক। নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিপুল অর্জনও শেখ হাসিনার কৃতিত্ব। যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ মহাসড়ক বর্তমানে চার-লেনে উন্নীত এবং কক্সবাজার টেকনাফ উপকূলে ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে যানজট নিরসনের জন্য অনেকগুলো ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। প্রতিটি জেলা শহরে মেডিকেল কলেজ এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। মোটকথা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে হাসিনা সরকারের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবার পথে।
তবে ১৯৮১ সালে পাঁচ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় সাফল্য পাকিস্তানের লেজুড়বৃত্তির পথ থেকে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহ্যের পথে ফিরিয়ে আনা। যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে গিয়েছিলেন, পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর সে জাতিকে পুনরায় পশ্চাৎগামী করে তোলা হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বর্তমান সময় অবধি বিরোধী ও সরকারি দলের নেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্জাগরণে যে সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন তা বাস্তবিকই তুলনারহিত। প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি প্রদান, এ দুটি ঐতিহাসিক কর্তব্য সম্পাদন শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কারও দ্বারা সম্ভবপর হতে পারত বলে মনে হয় না। শেখ হাসিনার এই দুটি অবিসংবাদিত কীর্তি বাঙালি জাতির কলঙ্কমোচন এবং জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি হুমকি ও হত্যার চক্রান্ত এবং আন্তর্জাতিক চাপ কোনো কিছুই তাকে টলাতে পারে নি। এ ছাড়াও যে অপরিসীম ধৈর্য ও সাহসের সাথে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মদদপুষ্ট সশস্ত্র জঙ্গিবাদের মোকাবিলা করে যাচ্ছেন তার নজির বিরল। যদি ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে না আসতেন তা হলে আজ বাংলাদেশের অবস্থা কি হতো বলা কঠিন। হয়তো বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো এবং বাংলাদেশের স্থল ও জলসীমা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হতো না।
শেখ হাসিনার তিন দফা প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের সাথে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করে বাংলাদেশের স্থলভূমির প্রায় সমপরিমাণ এলাকা অর্জন, ভারতের সাথে ছিটমহল সমস্যার সমাধান এবং ছিটমহলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করে তাদের নাগরিক পরিচয় প্রদান এবং চূড়ান্তভাবে স্থলসীমানা নির্ধারণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর এবং দেশত্যাগী পার্বত্য চট্টগ্রামের শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা। জাতিসংঘে শেখ হাসিনা উপস্থাপিত বিশ্বশান্তির মডেল আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
একুশ শতকে বাংলাদেশকে ডিজিটাল যুগে রূপান্তর শেখ হাসিনার অন্যতম উল্লেখযোগ্য কীর্তি। ইন্টারনেট সুবিধা উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করা। বাংলাদেশে ৪ কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে। মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪ কোটির ওপর। মোটকথা ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর কথার কথা নয়, বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ। বাংলাদেশে মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ক্রমশ কমে আসছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু অন্তত ১০ বছর বেড়ে গেছে। গুচ্ছগ্রাম এবং আবাসন প্রকল্পের ফলে হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সকল নানামুখী সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘের চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে অভাবনীয় সংযোগ সাধিত হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে স্যাটেলাইট টেলিভিশন, মোবাইল থ্রি-জি, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও এবং অনলাইন সংবাদপত্রের সংখ্যা আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের ‘তথ্যে প্রবেশাধিকার’ প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুৎ এবং টেলিভিশন পৌঁছে গেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন প্রথম সারিতে। গার্মেন্ট রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রিজার্ভে বাংলাদেশ এখন সর্বকালের রেকর্ড স্থাপন করেছে। মোটকথা বাংলাদেশ দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করলে ২০১৭ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ যে অবস্থানে পৌঁছেছে তা সম্ভবপর হতো কি-না সন্দেহ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবেÑ এটাই বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিক কামনা।

লেখক : প্রফেসর ইমিরেটরস

Category:

দেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: দেশের জনসংখ্যা বেড়ে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। চলতি বছর জানুয়ারি পর্যন্ত হিসাব করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দেশে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১০ লাখ এবং নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার। জরিপের তথ্যানুযায়ী দেশে পাঁচ বছরের ব্যবধানে চার বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। মাতৃমৃত্যু হারও কমেছে। গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ৬ বছর। সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ। তবে এক থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুমৃত্যুর হার গত তিন বছরেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিহাজারে মৃত্যুহার ৯ জনে স্থির রয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার বাড়েনি পাঁচ বছরেও। তা ছাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তর।
গত ২৯ মে শেরেবাংলা নগরস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘মনিটরিং দ্যা সিচ্যুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি)’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কেএম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইএমইডি বিভাগের সচিব মফিজুল ইসলাম। প্রকল্প পরিচালক একেএম আশরাফুল হক ছাড়াও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনে জন্ম, মৃত্যু, গড় আয়ু, বিবাহ, তালাক, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুতের সুবিধা, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সর্বশেষ তথ্য দেওয়া হয়েছে। সাধারণত আদমশুমারি করা হয় ১০ বছর পরপর। এর মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিবছর জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তর সংক্রান্ত তথ্য নমুনা জরিপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে হালনাগাদ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে ধর্মভিত্তিক বিভাজনে দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১২ সালে ছিল ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৪ সালে এটি ছিল ৮৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ। বাকিরা অন্য ধর্মাবলম্বী। সে হিসাবে মুসলমানের সংখ্যা কখনও বেড়েছে, কখনও কমেছে।
অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমীর হোসেন ও আইসিডিডিআর-বি’র গবেষক ড. আবদুর রাজ্জাক। ড. আবদুল রাজ্জাক বলেন, প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। তবে মাইগ্রেশনের হার অনেক বেড়েছে। তারা কেন তাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যাচ্ছে তার বিবরণ থাকা প্রয়োজন। কেননা বাংলাদেশে অন্যান্য অনেক কারণের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণেও মানুষ তাদের স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রজনন হার : প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে দেশের স্থূল জন্মহার ১৮ দশমিক ৭ উল্লেখ করা হয়েছে, যা ২০১২ সালের ছিল ১৮ দশমিক ৯। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে দেশের জন্ম হার কমেছে মাত্র ১ শতাংশ।
মরণশীলতা : ২০১৬ সালে দেশের প্রতিহাজারে মরণশীলতা ৫ দশমিক ১, যা পল্লী এলাকায় ৫ দশমিক ৭ এবং শহর এলাকায় ৪ দশমিক ২। ২০১২ সালে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৩। শিশুমৃত্যু হার ২০১২ সালে প্রতিহাজার জীবিত জন্মের ক্ষেত্রে ৩৩, এই হার ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ২৮। এক থেকে চার বছর বয়সি শিশুমৃত্যুর হার ২০১২ সালে ছিল ২ দশমিক ৩, যা ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ১ দশমিক ৮। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে এক থেকে চার বছর বয়সি শিশুমৃত্যুর হার ২২ শতাংশ কমেছে। মাতৃমৃত্যু হারও কমে এসেছে। ২০১২ সালে মাতৃমৃত্যু হার ছিল ২ দশমিক শূন্য ৩, যা ২০১৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৮। গত পাঁচ বছরে গড় আয়ুষ্কাল ২ দশমিক ২ বছর বেড়েছে। গড় আয়ু হয়েছে ৭১ দশমিক ৬ বছর। পুরুষের (৭০.৩ বছর) তুলনায় মহিলাদের গড় আয়ু (৭২.৯ বছর) বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

Category:

কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়া অন্য দলের কাউকে আওয়ামী লীগের সদস্য করা যাবে না : ওবায়দুল কাদের

Posted on by 0 comment

52উত্তরণ প্রতিবেদন: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের দলে নেওয়া যাবে না। গত ২২ মে দুপুরে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকম-লীর জরুরি সভা শেষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, অন্য কোনো দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করতে চাইলে তার যোগদানের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া কারও যোগদান স্বীকৃত হবে না। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদকরা যার এলাকা অনুযায়ী এ বিষয়গুলো মনিটরিং করবেন।
এর আগে ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, ডা. দীপু মনি এমপি, জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, আবদুর রহমান এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল এমপি, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
তৃণমূলে সাংগঠনিক তৎপরতা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে তৃণমূলের সাথে মতবিনিময় সভা, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কর্মিসভা, প্রতিনিধি সভা ও বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তৃণমূল পর্যায়ের এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
গত ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে নগরীর পাঁচলাইশে কিং অব চিটাগাং কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপিসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গত ২২ মার্চ সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগীয় কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কর্মী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল কাদের এমপি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে বিভাগীয় কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি বাগেরহাট খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে এক কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৯ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে জেলা স্টেডিয়ামে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজনে কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি রংপুর জিলা স্কুল মাঠে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগীয় কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি। এ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বছরের শুরুতেই গত ১৯ জানুয়ারি খুলনা বিভাগের বিশেষ প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সভাপতিম-লীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য।
এ ছাড়াও তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সমন্বিত কর্মোদ্যোগ বৃদ্ধি করতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাথে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট জেলার দলীয় সংসদ সদস্যদের বেশ কয়েকটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে এ কর্মসূচির আওতায় গত ৪ মে সাতক্ষীরা, ২৭ এপ্রিল নীলফামারী, ২৪ এপ্রিল যশোর এবং ২৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট জেলার দলীয় সংসদ সদস্যের সাথে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

Category:

আওয়ামী লীগের ১৭ বিভাগীয় উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব নিয়োগ

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: আওয়ামী লীগের ১৭ বিভাগীয় উপ-কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব মনোনয়ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গঠনতন্ত্রের ২৫(১)(চ) ধারা মোতাবেক আওয়ামী লীগ সভাপতি এই মনোনয়ন দেন।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান। সদস্য সচিব হয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা টিপু মুন্সী এমপি। আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে খ্যাতনামা কূটনীতিক অ্যাম্বাসেডর জমিরকে। আইন বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সদস্য সচিব করা হয়েছে সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপিকে।
কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন ড. মির্জা এমএ জলিল আর সদস্য সচিব হয়েছেন কেন্দ্রীয় নেত্রী ফরিদুন্নাহার লাইলী। তথ্য ও গবেষণা উপ-কমিটিতে চেয়ারম্যান হয়েছেন অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান খান, সদস্য সচিব হয়েছেন অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন। ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী, সদস্য হয়েছেন সুজিত রায় নন্দী। দফতর উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন প্রফেসর ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, সদস্য সচিব হয়েছেন ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।
ধর্মবিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন খন্দকার গোলাম মওলা নকশবন্দী, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান পুনর্বার হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, সদস্য সচিব হয়েছেন ড. হাছান মাহমুদ এমপি। বন ও পরিবেশ উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন প্রফেসর খন্দকার বজলুল হক, সদস্য সচিব হয়েছেন দেলোয়ার হোসেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন প্রফেসর ড. হোসেন মনসুর, সদস্য সচিব হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর।
এ ছাড়া মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন অধ্যাপিকা সুলতানা শফি, সদস্য সচিব ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন রাশিদুল আলম, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন মোজাফফর হোসেন পল্টু, সদস্য সচিব হারুনুর রশীদ, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন প্রফেসর ড. আবদুল খালেক, সদস্য সচিব শামসুন নাহার চাঁপা, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, সদস্য সচিব আবদুস সাত্তার এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. রুহুল হক এমপি ও সদস্য সচিব হয়েছেন ডা. রোকেয়া সুলতানা।
বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ গঠন
‘বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ’ নামে নতুন একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি গত ২১ মে সংগঠনটির নাম ঘোষণা করেছেন। অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন আহ্বায়ক, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি ও অ্যাডভোকেট আবদুল বাছেদ মজুমদারকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপিকে সংগঠনটির সদস্য সচিব নির্বাচিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা করে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করবেন। এই কমিটি আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবে। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ তার আগে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দেশের সিনিয়র আইনজীবীদের সাথে ২১ মে বিকেলে ওবায়দুল কাদের এমপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিনিয়র আইনজীবী নেতাদের পরামর্শক্রমে ঐক্যবদ্ধভাবে একক সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ’ গঠন করা হয়।

Category:

বাহারি মৌসুমি ফলের প্রাচুর্যে ভরপুর বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

61রাজিয়া সুলতানা: প্রচ- দাবদাহে অতিষ্ঠ নাগরিক জীবন। ঋতু চক্রের আবর্তে হাজির গ্রীষ্মকাল। তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত প্রাণ। তীব্র গরমÑ কাঠ ফাটা রোদ পেছনে ফেলে লোভাতুর চোখ খুঁজে ফিরে বৈচিত্র্যময় মৌসুমি ফল। কঠিন গ্রীষ্ম; কিন্তু এটাই যে মধুমাস। রোদ-ঝড় সরিয়ে প্রিয় বাংলাদেশ এ সময় সুরভিত হয়ে ওঠে বাহারি রঙের মৌসুমি রসালো ফলে। এ বছর তাপমাত্রার সাথে বিপুল মৌসুমি ফলের প্রাচুর্যে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। আম-কাঁঠাল-লিচু-জাম-আনারসের ঢালি নিয়ে এসেছে মধুমাস।
বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন মৌসুমভিত্তিক। গ্রীষ্মম-লীয় আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ ফলেরই উৎপাদন হয় মধুমাসে। মধুমাস বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের সাথে আষাঢ় ও শ্রাবণে বাংলাদেশের মোট ফল উৎপাদনের ৫৪ শতাংশই উৎপাদিত হয়। বাকি আট মাসে ৪৬ শতাংশ ফলের উৎপাদন হয়। মধুমাসে উৎপাদিত ফলগুলোর মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু,  বাঙ্গি, তরমুজ ও আনারস অন্যতম। বছরের অন্য সময় কুল, তাল, আমড়া, জাম্বুরা, আতা-নোনা, আমলকী, বেল, সফেদা, জলপাই, ডালিম, কামরাঙ্গা ইত্যাদির ফলন হয়। তবে ফল হিসেবে কলা সারাবছরই পাওয়া যায়। বিদেশি হলেও কমলা-আঙুর বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে।
ভারত মহাদেশে আম চাষ করা হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার বছর ধরে। ৬ হাজার বছরের ইতিহাস-সমৃদ্ধ আম বর্তমানে ৩৫ রকম স্বাদ, গন্ধ, রস ও জাতের পাওয়া যায়। তবে চাষাধীন ও বন্য মিলে প্রায় ৩ হাজার প্রজাতির আমের কথা প্রচলন রয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে গোপালভোগ, মালভোগ, ল্যাংড়া, আ¤্রপালী, ফজলি, সুন্দরী, ভবানী, চম্পা, দাউনিয়া, সুরম্পা, বৈশাখী, পাঞ্চাছন্দ, সরঙ্গম, সিঁদুরকোটা, বউভোলানি, হিমসাগর, কাজলি, কলাবতী, কাঁচামিঠা, বিবিপছন্দ ইত্যাদি প্রধান। অপরিসীম গুরুত্ব, অর্থনৈতিক বিকাশ ও বিনিয়োগ-বাণিজ্যের সম্ভাবনা বিবেচনায় দেশব্যাপী বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকার আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। আম পুষ্টিগুণ বিচারেও অত্যন্ত উচ্চ শিখরে। প্রচুর ক্যারোটিন, ভিটামিন সি ও ক্যালোরি আছে পাকা ও কাঁচা আমে। পাশাপাশি আমের ঔষধি গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। পাকা আম ল্যাকজেটিভ, রোচক ও টনিক বা বলকারক, লিভার বা যকৃতের জন্য খুবই উপকারী। রাতকানা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে পাকা এবং কাঁচা, উভয় প্রকার আমই মহৌষধ। রক্ত পড়া বন্ধকরণে আমগাছের বিভিন্ন অঙ্গের রস উপকারী। আমের কচি পাতার রস দাঁতের ব্যথা উপশমকারী। আমের শুকনো মুকুল পাতলা পায়খানা, পুরাতন আমাশয় এবং প্র¯্রাবের জ্বালা-যন্ত্রণা উপশম করে। গাছের আঠা পায়ের ফাটা ও চর্মরোগে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। জ্বর, বুকের ব্যথা, বহুমূত্র রোগের জন্য আমের পাতার চূর্ণ ব্যবহৃত হয়।
আম চাষ কিছুদিন আগেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের ২২টি জেলাতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে ব্যাপক আম চাষ হচ্ছে। ফসলের চেয়ে বেশি লাভজনক হওয়ায় আম চাষ ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণের লবণাক্তসহ পার্বত্য এলাকার খাগড়াছড়ি, কাপ্তাই ও বান্দরবান এলাকায়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর দেশে নতুন করে ৮ হাজার হেক্টর জমি আম চাষের আওতায় আসছে। এবং বছরে উৎপাদন বাড়ছে ৫০ হাজার টন। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যানুসারে বাংলাদেশ বছরে ১০ লাখ টন আম উৎপাদন করে বিশ্বের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী দেশের অষ্টম স্থান দখল করে নিয়েছে। আম উৎপাদনের এই বিস্ময়কর সফলতা থেকে বলা যায়, দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আম হতে পারে অন্যতম প্রধান রপ্তানিজাত পণ্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে উৎপাদিত আমের চাহিদা মেটানোর পরও ৫০ শতাংশ উদ্বৃত্ত আম রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। সরকার তাই কন্ট্রাক ফার্মিংয়ের মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের লক্ষ্যে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে ১৭৫ টন আম ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে রপ্তানিও করেছে, যা উন্মোচন করেছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
অত্যন্ত সাধারণ তবে অন্যতম জনপ্রিয় ফলের মধ্যে কালোজাম উল্লেখযোগ্য। যাকে উপজীব্য করে কবি মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেনÑ ‘পাকা জামের মধুর রসে রঙ্গিন করি মুখ’। অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের ফল জামের পুষ্টিগুণ আমের থেকে কম নয়। রয়েছে ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, লৌহ ও ক্যালসিয়াম। তা ছাড়া জামের কচি পাতা পেটের পীড়া নিরাময়ে সাহায্য করে। জামের বীজ থেকে প্রাপ্ত পাউডার বহুমূত্র রোগের ঔষধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। পাকা জাম সৈন্ধব লবণ মাখিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা রেখে চটকিয়ে ন্যাকড়ার পুঁটলি বেঁধে টানিয়ে রাখলে যে রস বের হয়, তা পাতলা দাস্ত, অরুচি বমিভাব দূর করে। জাম ও আমের রস একত্রে পান করলে বহুমূত্র রোগীর তৃষ্ণা প্রশমিত হয়।
দরিদ্র থেকে শুরু করে ধনকুবেরও জাতীয় এবং জনপ্রিয় ফল কাঁঠাল পছন্দ করেন। যার উৎপত্তিস্থল ভারতের পশ্চিমঘাট হলেও বাংলাদেশে প্রায় সব জেলাতেই উৎপন্ন হয়। এটি উদ্ভিদ জগতের সর্ববৃহৎ ফলের একটি; যা ৫০ কেজি পর্যন্তও হতে পারে। প্রচুর শর্করা, আমিষ ও ক্যারোটিন রয়েছে এ ফলটিতে। কাঁঠালের শাঁস ও বীজ বলবর্ধক। কাঁঠালের পোড়া পাতার ছাইয়ের সাথে ভুট্টা ও নারিকেলের খোসা একত্রে পুড়িয়ে নারিকেল তেলের সাথে মিশিয়ে ঘা বা ক্ষতস্থানে ব্যবহার করলে তা প্রশমিত হয়। কাঁঠালের শিকড়ের রস জ্বর ও পাতলা পায়খানা নিরাময় করে।
মধুমাসের অল্প দিনের ফল লিচু। উনিশ শতকের শুরুর দিকে চীনে লিচুর আদিজন্ম। কালের পাখায় চড়ে লিচু এখন বাংলাদেশের সর্বত্রই জন্মে। তবে উন্নতমানের ফল উৎপন্ন হয় দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে। অনন্য বৈশিষ্ট্য ও বিচিত্র স্বাদের রসে ভরপুর টসটসে লালচে মাংসল লিচু সপ্তাহখানেকের মধ্যেই উধাও হয়ে যায়। তাই এর মধ্যেই বাঙালির অসাধারণ লিচুর নিবেদিত প্রাণ গৌরবময় স্বাদ আস্বাদন করে নিতে হয়। লিচুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও খাদ্যশক্তি রয়েছে। বোলতা, বিছে কামড়ালে লিচু পাতার রস ব্যবহার করা হয়। কাশি, পেটব্যথা, টিউমার এবং গ্লান্ডের বৃদ্ধি দমনে লিচু খুবই কার্যকর। চর্মরোগের ব্যথায় লিচুর বীজ ব্যবহৃত হয়। পানিতে সিদ্ধ লিচুর শেকড়, বাকল ও ফুল গলার ঘা সারায়। কচি লিচু শিশুদের বসন্ত রোগে এবং বীজ অম্ল ও ¯œায়ুবিক যন্ত্রণার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকল ও শিকড়ের ক্বাথ গরম পানিসহ কুলি করলে গলার কষ্ট উপশম হয়।
পেয়ারা সুদূর আমেরিকা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসেছিল। আর এখন শহর থেকে গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই পেয়ারা গাছ দেখা যায়। বতর্মানে বাংলাদেশে প্রায় ৫০টির মতো জাত আছে। যার অধিকাংশ চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে জন্মায়। পাওয়া যায় জুলাই-সেপ্টেম্বর। তবে কৃষিবিদদের অবদানের ফলে প্রায় সারাবছরেই পাওয়া যায় ফলটি। সহজলভ্য ফলটিতে যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা যদি এ দেশের মানুষ মূল্যায়ন করত তা হলে আর ভিটামিন সি অভাবজনিত রোগ বাঙালিদের হতো না। আরও রয়েছে এর ঔষধি গুণ। শিকড়, গাছের বাকল, পাতা এবং অপরিপক্ব ফল কলেরা, আমাশয় ও অন্যান্য পেটের পীড়া নিরাময়ে ভালো কাজ করে। ক্ষত বা ঘা-এ থেঁতলানো পাতার প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। পেয়ারার কচি পাতা চিবালে দাঁতের ব্যথা উপশম হয়।
কুল যা এড়ানো যায় না। কারণ ভ্যান থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, শহর থেকে গ্রামে যার রয়েছে একক আধিপত্য। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি-মার্চে সেটি আসলে খুবই সুদৃশ্য, সুস্বাধু ফল বরই যা কুল বলে আখ্যায়িত। শুধু খেতেই ভালো নয়, এতেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। তা ছাড়া কুল ও কুলের পাতা বাটা বাতের জন্য উপকারী। ফল রক্ত পরিষ্কার এবং হজম সহায়ক। পেটে বায়ু ও অরুচি রোধে ফুল থেকে ওষুধও তৈরি হয়।
বিভিন্ন সুস্বাদু ও রসালো মৌসুমি ফল আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলের আওতায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১.৬৬ শতাংশ হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের প্রায় ১০ শতাংশই আসে ফল থেকে। এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ফল চাষের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। এ দেশে ৬০ থেকে ৭০টি ফলের চাষ হলেও উৎপাদিত ফলের ৫৪ শতাংশ পাওয়া যায় বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে। অবশিষ্ট ৪৬ শতাংশ ফল পাওয়া যায় বছরের বাকি আট মাসে।
মৌসুমি ফল মানব স্বাস্থ্যর জন্য অত্যন্ত উপকারী, যা ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি। তবে ফলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলোÑ এটি রান্না ছাড়াই সরাসরি ভক্ষণ করা যায়। অন্যভাবে বলা যায় যে ফলই সবচেয়ে নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত উৎকৃষ্ট খাবার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এখন আর সে অবস্থা নেই। ফল হাতে নিলে বিষের ভয়ে কেঁপে ওঠে বুক। আল্লাহ সৃষ্ট কোনো ফলেই ক্ষতি নেই। কিন্তু মানুষরূপী অমানুষের কার্যকলাপ সম্পন্ন সকল কিছুই ক্ষতিকারক। কৃষির অগ্রগতির সাথে সাথে ফলের উৎপাদন বেড়েছে বহুগণ। পরিবর্তন এসেছে স্বাদ, গন্ধ, পুষ্টিতেও। সমস্যা যেখানে তা হলো সংরক্ষণের অভাব এবং অভাব ন্যায্য মূল্যের। তা ছাড়া মৌসুমি ফলগুলোর স্থায়িত্ব খুবই অল্প সময়। তাই কৃষকরা ফলকে আগাম পাকিয়ে বেশি লাভবান হতে চায়। তাই মেশায় বিষাক্ত কার্বাইড। আর যাতে না পচে তাই মেশায় ফরমালিন, মিষ্টি হওয়ার জন্য স্যাকারিন, আর আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য মেশানো হচ্ছে কাপড়ের রং। ব্যাস মধুমাস স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। মৌসুমি ফলের প্রাচুর্যতা অনেক; কিন্তু ভোক্তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে।
লেখক : গবেষক, লেখক এবং সমাজকর্মী

Category:

আবারও আগামী নির্বাচনে দলকে জয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে

Posted on by 0 comment
17

আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় নেতা-কর্মীদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সব অর্জন ও উন্নয়নমূলক কর্মকা- জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে তৃণমূল নেতাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, নৌকা বাংলার জনগণের মার্কা, গ্রামগঞ্জের মার্কা। নৌকায় ভোট দিয়ে দেশের মানুষ স্বাধীনতা ও ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। নৌকা ছাড়া এ দেশের মানুষের উন্নতিও সম্ভব নয়। দেশের জনগণকে বোঝাতে হবে যখনই নৌকা ক্ষমতায় এসেছে তখনই দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি হয়েছে। আর বিএনপি ক্ষমতায় এলেই তো জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও লুটপাট করবে। ক্ষমতায় থাকতে এরা সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু দিতেও পারে নি। ক্ষমতা উপভোগ করেছে। এরা ক্ষমতায় এলেই দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যায়। এসব কথাও জনগণকে জানাতে হবে।
গত ২০ মে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন চত্বরে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের পর প্রথম আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলকে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের দুঃখী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে যে পর্যন্ত না বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমে দুঃখী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে। তাই একদিকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- প্রচার করতে হবে, অন্যদিকে বিএনপি কী করেছে তাদের সেসব অপকর্মগুলোও জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে।
দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কী পেলাম আর কী পেলাম না, সেটি বড় কথা নয়। দেশের মানুষকে কী দিতে পারলাম সেটিই সবচেয়ে বড় কথা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগকে কাজ করতে হবে। আগামী নির্বাচনে দলের উন্নয়নমূলক কর্মকা- তুলে ধরে দলের জন্য ভোট অর্জন করতে দলের সকল নেতাকর্মীকে প্রত্যেক ভোটারের কাছে পৌঁছতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের যে উন্নয়ন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে ২০০৮ সালের পর আবার ২০১৫ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারার কারণেই। কাজেই দেশের এ উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হলে দলকে আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনতে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের একযোগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যেতে হবে।
নিজস্ব গ্রুপ ও দল ভারী করার স্বার্থে আবর্জনা দলে টেনে না আনার নির্দেশ দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমার কাছে তথ্য আছে, দল ভারীর জন্য অন্য দল থেকে সুবিধাবাদীদের দলে টানা হচ্ছে, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মনে রাখবেন, এরা দলে ঢোকে কমিশন খাওয়ার লোভে। দলে ঢুকে এরা এত বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় যে এদের কনুয়ের গুঁতায় আমার দলের নিবেদিতরা টিকতে পারে না। ক্ষমতা ভোগের কোনো বস্তু নয়, ক্ষমতা দায়িত্ব পালনের। প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের কল্যাণে কাজ করে যেতে হবে। কোনো বিশ্রাম নেই। আর আগামীতে নৌকার প্রতীক যাদের দেব, সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার পক্ষে কাজ করতে হবে। কেউ অন্য কাউকে সমর্থন দেবেন না। আর সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সব জেলার নেতাকে বছরান্তে সাংগঠনিক রিপোর্ট দিতে হবে।
২২ ও ২৩ অক্টোবর জাতীয় সম্মেলনের সাত মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত এ বিশেষ বর্ধিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও জাতীয় পরিষদ সদস্য, দলীয় মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, জাতীয় সংসদ সদস্য, ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা ও মহানগর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, দফতর ও উপ-দফতর, প্রচার ও প্রকাশনা, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা এবং তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদকরা সভায় যোগ দেন।
সব ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ শেষে বর্ধিত সভায় উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। বৈঠকের শুরুতেই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপির সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র উন্মোচন এবং নিজের সদস্যপদ নবায়ন করেন। সদস্যপদ নবায়নের জন্য নির্ধারিত ফি ২০ টাকা হলেও শেখ হাসিনা ৫০০ টাকা দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া এবং সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ফারজানা বেগমকে সদস্য করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। এরপর দলের প্রতিটি সাংগঠনিক জেলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া ল্যাপটপ হস্তান্তর করেন শেখ হাসিনা। এরপর আট বিভাগের আট জেলার নেতাকে বর্ধিত সভায় বক্তব্য রাখার সুযোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। বর্ধিত সভায় আগত সব তৃণমূল নেতার হাতে একটি ব্যাগে দলের গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র ছাড়াও বর্তমান সরকারের উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সফলতার বিবরণ সংবলিত একটি বুকলেট এবং বিএনপি-জামাত জোটের অগ্নিসন্ত্রাসের বিভিন্ন ভিডিও সিডি দেওয়া হয়।
এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বিএনপির মধ্যে কোনো মানবতাবোধ নেই। এদের রাজনীতিই লুটে খাওয়া ও মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি। বিএনপির সময় দুর্নীতিতে দেশ পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠুভাবে চলতে দেয় নি তারা। কেবল দলীয়করণ ও দুর্নীতি করেছে। দলীয়করণ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিই তাদের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় এলে আবারও দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, দুর্নীতি-লুটপাট ফিরে আসবে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের দুঃশাসনের পাশাপাশি আন্দোলনের নামে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এ জোটের দেশব্যাপী সন্ত্রাস-নৈরাজ্য ও মানুষ পুড়িয়ে মারার বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, কীভাবে অত্যাচার-নির্যাতন তারা করেছে, সেগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত।
তিনি বলেন, তারা (বিএনপি) ক্ষমতায় আসতে চায়! তারা ক্ষমতায় এলেই তো জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও লুটপাট করবে। ক্ষমতায় থাকতে এরা সন্ত্রাস ও দেশকে পিছিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু দিতেও পারে নি। ক্ষমতা এরা উপভোগ করেছে। তিনি বলেন, বেশ কয়েকবারই তো বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ারাও ক্ষমতায় ছিলেন। তারা দেশের উন্নতি করতে পারেন নি কেন? আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই কেবল দেশের উন্নতি হয়Ñ এটাও তো বারবারই প্রমাণিত হয়েছে।
দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এ দেশের প্রতিটি মানুষ অন্ন পাবে, আশ্রয় পাবে, উন্নত জীবন পাবে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি নেতাকর্মীর দায়িত্ব হচ্ছে জাতির পিতার সে স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা। তাই এ দেশের দুঃখী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হওয়ার আগ পর্যন্ত এ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে এবং জনগণকে সেই কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছানো অবধি দেশকে সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য।
’৭৫-পরবর্তী সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বলে তারা তিনবার ক্ষমতায় ছিল। জাতীয় পার্টি বলে তারা একবার ক্ষমতায় ছিল। তারা ক্ষমতায় থাকার কথা বলে; কিন্তু তারা ক্ষমতায় থাকতে দেশের কোনো উন্নতি হয়নি কেন? আওয়ামী লীগ যদি দেশের এত উন্নয়ন করতে পারে তবে তারা পারে নি কেন? তাদের উদ্দেশ্য হলো লুটপাট করে খাওয়া আর সম্পদের পাহাড় গড়া। তা না হলে ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি ছাড়া যাদের ঘরে কিছুই ছিল না, তারা এত কোটি কোটি টাকা আর বিশাল লঞ্চবহরের মালিক হয় কীভাবে?
পাকিস্তানের আইয়ুব খানের মতোই জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে মুক্তিযুদ্ধ করাকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারা পাকিস্তানিদের তোষামোদ করে। বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে।
জনগণের কল্যাণে আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকা- তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে হাজারও মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কাজ চলছে। একটি পরিবার যদি ২০০ টাকা জমাতে পারে তা হলে সরকার তাকে আরও ২০০ টাকা দিচ্ছে, যাতে তার ৪০০ টাকা সঞ্চয় হয়। যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যেন কোনো অনিয়ম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ঘোষিত সাম্প্রতিক ভিশন-২০৩০ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী একটি ভালো জিনিস শিখেছেন বহু যুগ পরে। এত যুগ পরে তাদের মাথায় এলো, তারা ভিশন-২০৩০ দিয়েছে। তবে বড় কথা হচ্ছে মানুষই মানুষের কাছে শেখে। তারা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছে। নকল করে হয়তো পরীক্ষায় পাস করা যায়; কিন্তু দেশের জনগণের দায়িত্ব এটা বিবেচনা করার। প্রবাদে আছেÑ ‘চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড় ধরা’। তিনি বলেন, বিএনপি হত্যা ও সহিংসতার পথ ছেড়ে জাতির সামনে একটা বিষয় তুলে ধরেছে, তবুও ভালো। খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ যে এতদিন পরে হলেও ভিশন-২০৩০ এর মতো পরিকল্পনা ঘোষণা করতে পেরেছেন।

অনুপ্রবেশকারীরা দলের আবর্জনা
পরে সমাপনী বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুপ্রবেশকারীদের দলের আবর্জনা হিসেবে আখ্যা দিয়ে এদের দলের ঠাঁই না দেওয়ার নির্দেশ দেন। যারা দলে অনুপ্রবেশ ঘটাবে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পরে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ, গ্রুপিং, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সাথে নেতা-কর্মীদের দূরত্ব, দলের কিছু শীর্ষ নেতার বক্তব্যের নেতিবাচক প্রভাব, সহযোগী সংগঠনের সাথে সমন্বয়হীনতাসহ নানা অসংগতির কথা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন তৃণমূল নেতারা।
সূত্র জানায়, তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য শোনার পর সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সার্ভে করার কথা উল্লেখ করে বলেন, বহু জায়গায় আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন করেছে, নানা অপরাধ করেছে তাদের দলে নেওয়া হয়েছে। গ্রুপিং ভারী করার জন্য অনেকে তাদের দলে নিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, অনুপ্রবেশকারীরা দলে এসেছে কেন? ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে যারা জ্বালাও-পোড়াও করেছে, তাদের অনেকেও দলে এসেছে। অনেকে দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় দলে যোগদানের পর অনেকে আমাদের নেতা-কর্মীদের হত্যা পর্যন্ত করেছে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু-কন্যা আরও বলেন, গ্রুপিংয়ের স্বার্থে, দল ভারী করার স্বার্থে এ সমস্ত আবর্জনা দলে স্থান দেওয়া যাবে না। ক্ষতিকর এসব অনুপ্রবেশকারীদের দলে ভেড়ানো নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, কার মাধ্যমে আসছে, এখানে নামটা না বলি। তারা যদি এ পথ না ছাড়েন তবে তারা কিন্তু নেতৃত্ব পাবেন না। এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা করতালি ও হর্ষধ্বনির মাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সাথে নেতা-কর্মীদের দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলে সকলে মিলেমিশে কাজ করাও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলে দলের মনোনয়ন নিয়ে জালিয়াতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়েও সবাইকে সতর্ক করেন। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষরসহ তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে পাঠানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী দিনে নির্বাচনে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা উল্লেখ করে তিনি এ অভিযানকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, জেলার নেতারা উপজেলায়, উপজেলার নেতারা ইউনিয়নে এবং ইউনিয়নের নেতারা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে যাবেন। এভাবে সদস্য সংগ্রহ করবেন।
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারের উন্নয়ন, বিগত সময়ে বিএনপি-জামাতের আন্দোলনের সময়কার সহিংসতা, অন্যান্য সরকারের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নে দলের নিজস্ব অফিস থাকতে হবে। তার তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টার দেওয়া ল্যাপটপ অফিসের কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, এসব ল্যাপটপকে ডাটাবেজ ও যোগাযোগের জন্য যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। সবার সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করতে হবে।

আগামী নির্বাচনে বিজয়ের বিকল্প নেই
বর্ধিত সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের বিকল্প নেই। আমাদের ভোটে জিততে হলে জনগণের সাথে ভালো আচরণ করার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার উন্নয়নকে মিনিংফুল করতে হবে। আর একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এ বর্ধিত সভার মাধ্যমেই শুরু হলো।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগকে স্মার্ট, আধুনিক, সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী নির্বাচন মোকাবেলা করতে হবে। আসুন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আদর্শ ও বিশ্বাসের সমন্বয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাই, এ হোক আজকের শপথ। তিনি বলেন, রাজনীতির রোল মডেল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও উন্নয়নের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা বিশ্বের ১০ জন শক্তিধর নেতার মধ্যে অন্যতম।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমাদের কমিটমেন্ট আছে। উন্নয়ন করতে হবে। সেই উন্নয়ন যেন সঠিকভাবে হয়, সে জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার তিন বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে, অতীতে ২৮ বছরে কোনো সরকারই সে উন্নয়ন করতে পারে নি। তাই আগামী দিনে শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা প্রয়োজন। এ জন্য আমাদের জিততে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

Category: