Blog Archives

জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার অপচেষ্টা ব্যর্থ

45

জীবন না মানে পরাভব

উত্তরণ প্রতিবেদন: ১. চট্টগ্রামে গুলিবর্ষণ ॥ কয়েকজন নিহত ও শত শত আহত : ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আটদলীয় জোটের মিছিলে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পুলিশ ও বিডিআর’র গুলিতে ৭ জন নিহত ও ৩০০ আহত হইয়াছে। ৫৪ জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আটদলীয় জোটের দাবি গুলিতে ১১ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করিয়াছেন। শেখ হাসিনা বেলা ২টায় পতেঙ্গা বিমান বন্দর হইতে মিছিল লইয়া লালদীঘি ময়দানের কাছে আসিয়া পৌঁছিলে মেট্রোপলিটন পুলিশের দাঙ্গা দমন বাহিনী ও বিডিআরের প্রচ- টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণে একজন প্রাণ হারায় এবং শত শত আহত হয়। আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালেও ১২ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ তিনজনসহ ৩৬ জনকে বিকেল ৩টার মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হইয়াছে।
২. ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলা : ১৯৮৯-এর ১১ আগস্ট বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বরের বাসভবনে হামলা চালায়। বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখন বাসভবনে ছিলেন। হামলাকারীরা ৭-৮ মিনিট যাবৎ বঙ্গবন্ধু ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালায় ও একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তবে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয় নাই।
৩. আমার প্রাণনাশের জন্য গুলি ছোঁড়া হইয়াছেÑ সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা : ১৯৯১-এর ১১ সেপ্টেম্বর বেলা দেড়টায় টুঙ্গিপাড়া হইতে ঢাকায় ফিরিয়া বেলা আড়াইটায় গ্রীন রোডের কাছে ধানমন্ডি স্কুলে উপনির্বাচনের ভোট প্রদানের পর গ্রীন রোডে পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ভোটের পরিস্থিতি দেখতে যান। গাড়ি হইতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির ওয়াহিদের নেতৃত্বে বিএনপির কর্মীরা গুলিবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণ করিতে শুরু করে। ২০-২৫ রাউন্ড গুলি ও বোমাবর্ষণ শুরু হয়।
৪. যশোর, দর্শনা, কুষ্টিয়া ঈশ্বরদী, নাটোর ও সান্তাহারে জনসভা শেখ হাসিনার অভিযোগ : গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছেÑ বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, ২৩ সেপ্টেম্বর ’৯৪ তারিখে ঈশ্বরদী ও নাটোর রেল স্টেশনে প্রবেশের মুখে তাকে বহনকারী রেলগাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছে। তিনি বলেন, নাটোর স্টেশনে সমাবেশ প- করার জন্য আগে থেকে অসংখ্য বোমা ফাটানো হয়।
৫. শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয় : ১৯৯৫-এর ৭ ডিসেম্বর তারিখে শেখ রাসেল স্কোয়ারের নিকট সমাবেশে ভাষণ দানরত অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়।
৬. শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে তার সমাবেশে গুলিবর্ষণ বোমা হামলা ॥ আহত ২০ জন : ১৯৯৬-এর ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর আকস্মাৎ একটি মাইক্রোবাস হইতে সভামঞ্চ লক্ষ্য করিয়া গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হইলে অন্তত ২০ জন আহত হয়।
৭. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পুত্রকন্যাসহ ৩১ জনকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণার ই-মেইলটির প্রেরক ইন্টার এশিয়া টিভি মালিক শোয়েব চৌধুরী। শেখ হাসিনাকে হত্যা, গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত এবং বিদ্বেষ সৃষ্টির লক্ষ্যে ই-মেইল প্রেরণের অভিযোগে শোয়েব চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
৮. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলের কাছে ও হ্যালিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখেছিল। এই বোমা গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়ে। বোমাটি বিস্ফোরিত হলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত জনসভাস্থল। শনিবার (২২.০৭.২০০০) বেলা সাড়ে ১০টায় শেখ লুৎফুর রহমান ডিগ্রি কলেজ মাঠের এক সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রাখার কথা ছিল।
৯. ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। জঙ্গি সংগঠন হুজি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সেখানে বোমা পুঁতে রাখে, যা গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে। হুজি এই হামলার চেষ্টা করে বলে পরে স্বীকার করে।
১০. শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সিলেটে আলীয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন স্থানে হুজির পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ : ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট গিয়েছিলেন। সেদিন রাত ৮টার দিকে জনসভাস্থল থেকে ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। সেদিন সেখানে সন্ধ্যায় সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা ময়দানে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভা ছিল। আগেই বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টা। হরকাতুল জিহাদ হুজি এই বোমা হামলার দায় পরে স্বীকার করে।
১১. নওগাঁয় শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা : ২০০২-এর ৪ মার্চ যুবদল ক্যাডার খালিদ বিন হেদায়েত নওগাঁয় বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজের সামনে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালায়।
১২. শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়িবহরে হামলা : ২০০২ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপি-জামাত নেতাকর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালায়। ক্ষমতাসীন জোটের এমপির প্রত্যক্ষ মদদে জোট সন্ত্রাসীরা শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট সকাল ১০টায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের হিজলি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার ধর্ষিতা স্ত্রীকে দেখতে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে আসেন। সেখান থেকে যশোরে ফিরে যাওয়ার পথে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে কলারোয়া উপজেলা বিএনপি অফিসের সামনে রাস্তার ওপর জেলা বিএনপির সভাপতি ও তৎকালীন সাংসদ হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও বিএনপি নেতা রঞ্জুর নির্দেশে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা দলীয় অফিসের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাস (সাতক্ষীরা-জ-০৪-০০২৯) রেখে সড়কে বেরিকেড দিয়ে তার গাড়িবহরে হামলা চালায়। ওই হামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান, সাংবাদিকসহ কমপক্ষে একডজন দলীয় নেতাকর্মী আহত হন।
১৩. ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ করে জামাত-বিএনপির ঘাতক চক্র।
১৪. ২০০৪ সালে ২১ আহস্ট গ্রেনেড হামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশস্থলে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতা অল্পের জন্য এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেলেও আকস্মিক এই হামলায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান এবং আরও ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এ ছাড়াও এই হামলায় আরও ৪০০ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি।
১৫. সাব জেলে খাবারে স্লো পয়জনিং-এর মাধ্যমে হত্যা চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তারিখে অন্যায়ভাবে বিনা ওয়ারেন্টে দিনে সেনাবাহিনী সমর্থিত ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেফতার করেছিল। গ্রেফতারের জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে স্থানান্তর করা হয়। সে সময় শেখ হাসিনার খাবারে ক্রমাগত পয়জন দিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। স্লো পয়জনিং-এর কারণে সেখানে আটক থাকাকালে শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ২০০৮ সালের ১১ জুন ১১ মাস কারাভোগের পর শেখ হাসিনা প্যারোলে মুক্তি পান।
১৬. ২০১১ সালে শ্রীলংকার একটি সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চুক্তি করে এবং সেজন্য আগাম পেমেন্টও প্রদান করা হয় শ্রীলংকার সেই সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের আততায়ীদের। সে সময় সেই আততায়ীদের টিম গাড়ি করে কলকাতা বিমান বন্দরে যাবার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা।
১৭. ২০১১ সালে তিন দেশে বসে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দ্বারা শেখ হাসিনাকে হত্যার চক্রান্ত করা হয় : ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার লক্ষ্যে একটি সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যা পরে ব্যর্থ হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে তথ্য ফাঁসে আলোচিত প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস প্রকাশিত সৌদি আরবের এক গোপন বার্তায় দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি লে. ক. শরিফুল হক ডালিম এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন, তিন দেশে বসে এ অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা চলছিল এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সদস্য এতে জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয়, হংকংয়ে বসবাসরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এই পরিকল্পনায় অর্থায়ন করেন বলে গোপন বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশিত নথি অনুসারে, বাংলাদেশে অবস্থিত সৌদি রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (আরবি ২৪ রবিউল আউয়াল, ১৪৩৩ হিজরি) দেশটির পররাষ্ট্র দফতরে আরবি ভাষায় পাঠানো ‘অত্যন্ত গোপনীয়’ ওই নথিতে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ব্যর্থ করে দেয়া এক সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হয়েছিল হংকং, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ায় বসে। নথিতে বলা হয়েছে, তিন দেশ হংকং, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বসে ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা করা হয়, যার সমন্বয় করছিলেন শরিফুল হক ডালিম যিনি তখন আফগানিস্তানে অবস্থান করছিলেন। পাশাপাশি এ ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টায় এ পরিকল্পনায় খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া ও জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে এবং ভারত এজন্য খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকেও অভিযুক্ত করেছে বলে ওই সৌদি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় হংকংয়ে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ অর্থায়ন করেন বলে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, অভিযোগ রয়েছে যে তিনি (ইশরাক আহমেদ) নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ব্যর্থ করে দেয়া ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার কথা প্রকাশ করে।
১৮. ২০১৪ সালের শেষ দিকে প্রশিক্ষিত নারী জঙ্গি দ্বারা মানববোমায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতার জঙ্গি শাহানুর আলম ওরফে ডাক্তার। শনিবার রাতে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার গোয়েন্দাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির এই নেতা আদ্যোপান্ত স্বীকার করেন। রোববার টাইমস অব ইন্ডিয়া, জি-নিউজসহ বেশ কিছু ভারতীয় গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর আসামের কামরূপের আদালতের মাধ্যমে শনিবার রাতেই শাহানুরকে ১৪ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এনআইএ কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা তারা আরও আগেই বর্ধমান বিস্ফোরণের তদন্তকালে ফাঁস করেছিলেন। শুক্রবার গভীর রাতে আসামের নলবাড়ী জেলার লালকুর্চি গ্রাম থেকে শাহানুরকে গ্রেফতার করে আসাম পুলিশ। পরে তাকে এনআইএ কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শনিবার শাহানুরকে আসামের কামরূপ আদালতে তোলা হয়। আদালত তাকে ১৪ দিনের পুলিশি রিমান্ডে দিয়েছেন। অক্টোবর মাসে শাহানুরের স্ত্রী সুজেনা বেগমকে আসামের গৌহাটি থেকে এক ছেলেসহ গ্রেতফার করে পুলিশ। নিরাপত্তা বাহিনীর বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহানুর বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) গুরুত্বপূর্ণ নেতা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা এবং অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘বৃহত্তর ইসলামিক রাষ্ট্র’ গড়ার ষড়যন্ত্র করছিল জেএমবি। সুজেনা বলেছেন, রাজীব গান্ধী হত্যাকা-ের মতো নারী ‘মানববোমা’ ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এজন্য ভারতে দুটি মাদ্রাসায় নারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৫০ জন নারী ও ১৫০ জন যুবককে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। এদের নেতৃত্বে রয়েছে ১৩ জঙ্গি দম্পতি। বাংলাদেশে সেই সময় প্রশাসনের কড়া নজরদারি থাকায় পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। প্রসঙ্গত, ২০১৪-এর ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় এক বিস্ফোরণে শাকিল আহমেদ ও সুবহান ম-ল নামে দুজন নিহত হন। ওই ঘটনায় জেএমবি জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় ঘটনায় জড়িত হিসেবে ১১ জনের তালিকা প্রকাশ করে এনআইএ। এর মধ্যে পল্লী চিকিৎসক শাহানুরও ছিলেন।
১৯. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা করে তাকে হত্যার চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫-এর ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার সময়ে কারওয়ান বাজারে তার গাড়িবহরে বোমা হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশে (জেএমবি) জঙ্গি গোষ্ঠী। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে কারওয়ান বাজার এলাকায় পরপর কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ হয়। বর্ধমান খাগড়াগড় থেকে পালিয়ে আসা জেএমবির জঙ্গিরাই প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে বোমা হামলা চালিয়েছে। এই বোমা হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে কওসর ওরফে বোমা মিজান। তার সঙ্গে রয়েছে হাত কাটা নাসিরুল্লাহ ওরফে সুহেল, তালহা শেখ, সালাউদ্দিন শেখ ওরফে হাফিজুর রহমান ওরফে মাহিন ও রফিক।

Category:

চড়াইয়ের সাদা ডিম ভাঙা দুপুরে

49আঁখি সিদ্দিকী: কী  প্রসঙ্গে ভদ্রলোক কথা তুলছিলেন মনে পড়ছে না। প্রসঙ্গ এর সাথে বিষয়ের মিল ছিল কি না ভাবনা অবান্তর। সেদিনই প্রথম পরিচয়। প্রথম দেখা। তার বাড়িতেও প্রথম আসা। বিকেল ভেঙে তখন গড়িয়ে পড়ছিল প্রায় সন্ধ্যার গায়ে। এগিয়ে এসে বললেন, নদী দেখতে গেলে বসা নয় বেরিয়ে পড়। কি নামে যে ডাকলো লোকটা নিজের ছেলেকে ঠিক বুঝতে পারলাম না। ফুটফুটে এক পিচ্চি দৌড়তে দৌড়তে এসে বলল, এনারা কারা ধুন্দু পটাশ? চুপচাপ ছেলেটি এক কথায় উত্তর দিল আমার বন্ধুরা, বাবা। সোফায় বসতে না বসতেই ঠা-া শরবত নিয়ে এলো খোলা চুলের একজন নারী। মিষ্টি হেসে এগিয়ে দিয়ে বলল, তাড়াতড়ি নেন, বেলা একেবারে পড়ে এলো আপনারা ঘুরে আসুন। আমি গড়ার বড় বোন গড়ি। মানে? আমরা তো হেসেই গড়াগড়ি। তখন বুঝতে পারলাম লোকটি ছেলেটিকে গড়া নামে ডাকছিল। পিচ্চি এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলল, আমি দীপ্র। ধুন্দু পটাশ আমার মামা। মাথায় তখন গড়া-গড়ি ঘুরছে। এটা কারও নাম হতে পারে? বেরিয়ে পড়লাম গড়ার সাথে আমরা কয়জন। রাতেই যে যার মতো বাড়ির সদস্যরা খেয়ে নিচ্ছে। বাড়ির কর্ত্রীর মুখের ভাষার সাথে এই অঞ্চলের এমনকি বাড়ির অন্য সদস্যদের মিল নেই। কি চমৎকার করে কথা বলেন। খাঁটি বাংলা ভাষা। কান জুড়িয়ে যাচ্ছিল। এক হারা শরীরের ছোটখাটো মাথায় চুলহীন পাঞ্জাবি পরা ধীর মানুষটি খেতে বসলেন আমার থেকে দুরের চেয়ারে। এতটা দূরের যে তার আস্তে আস্তে কথাগুলো আরও আস্তে শোনা যাচ্ছিল। আমি চেয়ারটা টেনে কাছে বসতেই তিনি কি যেন বলতে চাইলেন, আবার থেমে গিয়ে খাওয়ায় মন দিলেন। মাথা উঁচিয়ে ‘গড়া’ নামে জোরে ডাক দিলেন, গড়া আসতেই বললেন সব জায়গায় ঘুরিয়েছিস তো মেহমানদের? দক্ষিণ ডিহীতে নিয়ে গিয়েছিলি তো? গড়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে মা’কে পানির গ্লাস টেবিলে কেন দেয়নি বকা দিতে দিতে অন্য রুমে চলে গেল, একটু অস্বস্তি নিয়েই বলতে শুরু করলাম,
Ñ আপনাদের গ্রামটি কিন্তু অনেক সুন্দর!
Ñ আপনার ভালো লাগছে?
Ñ আমি তো অনেক ছোট তুমি করে বলবেন।
Ñ দক্ষিণ ডিহী গিয়েছিলে?
Ñ হ্যাঁ, তবে খুব ভালো লাগেনি…
Ñ কেন?
Ñ সরকারি পদক্ষেপে আদল হয়তো আছে, শ্বাস নেই। তবে শৌচাগারে কেবল আগের সেই ইট পাওয়া গেল।
Ñ হেসে দিয়ে, হ্যাঁ তাই। সংস্কার ভালো তবে অতি সংস্কারে চেহারাই বদলে যায়। তুমি কি জানো? রবীন্দ্রনাথ কখনও এই বাড়িতে আসেন নি!
Ñ হ্যাঁ শুনলাম। তবে দক্ষিণ ডিহীর চেয়ে আলকা গাঁয়ের অন্য কিছু আমায় মনে করিয়ে দেবে, এখানে আমি কোনো একদিন এসেছিলাম?
Ñ উন্মুখ হয়ে জানতে চাইল, কি?
Ñ ঝিমিয়ে পড়া বিকেলের গায়ে ভৈরব নদের কলমিদামের ভেতর ডুবে থাকা হাঁস, তাড়াহুড়ো করে ফেরা খেয়াঘাটের নৌকোয় ঘরে ফেরা মানুষের মুখ, ফণীমনসা, শটিবন, মধুকর ডিঙা, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনালঞ্চের এগিয়ে আসা ভ্যাঁপু, নদের পাড় ধরে হাঁটা বালুপথ, বেঁকে এসে তীরে ওঠা রসগোল্লার দোকানে রস আপ্যায়ন, সন্ধ্যে নামার মুখে কৃষ্ণাদ্বাদশীর জোৎ¯œ্যার নরম গান, ওপারে বিশীর্ণ বটের নিচে থমকে থাকা অন্ধকারের গায়ে লেপটানো নিস্তব্ধতা। বাসকলতার ঘেরা জলসিঁড়ির ঢেউ ছলকে ওঠা সাতটি তারার তিমির, গঙ্গা ফড়িং, কেবল ঘন হয়ে আসা অন্ধকারে চুপ জিরিয়ে নেয়া পথিক, ভ্যানে রেললাইনের পাড় ধরে আসতে আসতে বিজন ঘাস পোকা আর ঝিঁঝিঁর চিৎকার। এই ‘¯্রােত’ নামের বাড়ির গেটে এসে কচি লেবুপাতার নরম সবুজ আলো, মিহি ঘিয়ে রঙের জবা, নাটাফলের গাছ, ধুন্দল বীজ আর শালিক-খন্জনার দৌড়াদৌড়ি মনে করিয়ে দেবে আমায়।
Ñ আনমনে বলে উঠল রেললাইনের ধারে কাঁচপোকারা এখনও খুব করে ডাকে? অনেকদিন যাওয়া হয় না ওদিকটায়। সে অনেকদিন আগের কথা। তখন বোধহয় তোমাদের জন্মও হয়নি। সত্তরের কথা। সবে আমার চাকরি হয়েছে রূপালী ব্যাংকে। এই রেললাইনের ধারে রূপালী ব্যাংক শাখায় আমার পোস্টিং। ঘাসের ভেতর চড়াইয়ের সাদা ডিম ভাঙা দুপুর আসতো বুনোহাঁস সকাল গড়িয়ে। অশ্বথ সন্ধ্যার হাওয়া লাগার আগে অফিস শেষ করে বাড়ি ফেরার পালা। বয়স খুব বেশি নয় বুঝলে?
Ñ হুমম। তারপর।
Ñ নরম ধানগন্ধ ডুব সাঁতার সময় গড়িয়ে পড়ছিল কিশোরীর চাল ধোয়া ভিজে হাতের গড়িয়ে পড়া পানির মতো। হঠাৎ একদিন কাস্টমার প্রায় ফাঁকা দুপুরে ম্যানেজার ডাকলেন আমায়, বললেন ‘বাচ্চু, আপনায় একটা দায়িত্ব দেব, যদিও কাজের চাপ আপনার একটু বেশিই। কিন্তু কী করব, এটি প্রথম চালু হওয়া একটা কাজ। আপনি ইয়ংম্যান আপনি ঠিক সামলে নিতে পারবেন। আমি জিজ্ঞাসুসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে, বরাবরই আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। তো স্যার আমায় নতুন দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন যে এই মাস থেকে সকল শিক্ষকদের বেতন ব্যাংক থেকে ড্র হবে আর সেই কাজটা আমায় করতে হবে, আমাদের এই থানার। তখন খুব বেশি শাখা হয়নি। আর স্কুল-কলেজ মিলে বেশ শিক্ষকদের চাপ নিতে হতে লাগল মাসের প্রথম সপ্তাহ আবার কেউ কেউ দ্বিতীয়, তৃতীয় সপ্তাহে আসেন। নীরবে কাজ আর মাথা গলে মাঝে মাঝে রেললাইনের কু ঝিক ঝিক করা দুপুর দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দিন পার হয়ে গেল। আমি বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। এরকম এক ডানা ঝাপটানো দুপুরে উদোম গ্রীষ্মকাল হবে, কেবল বসন্ত যাই যাই করছে, আমি আলমারিতে ফাইল তুলছি, একটি কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকালাম। এক্সকিউজ মি, আমি একটু বসতে পারি? ফিরে তাকিয়ে চোখ কেমন ঝাঁঝাঁ দুপুরের মতো ঝাঁঝাঁ করে উঠল। চুল, নাসা গ্রীবার সাথে যেন কলকাতার গান বেজে উঠল। বেত শাখের আড়ালে যেন এক হলুদ মাছরাঙা ডেকে উঠল। আমি বসতে বলে হাতের কাজ শেষ করে জানতে চাইলাম কি করতে পারি আপনার জন্য? আর মনে আওড়াতে আওড়াতে লাগলাম “চড়বঃ ফড়হ’ঃ রহাবহঃ ঢ়ড়বসং, ঞযব ঢ়ড়বস রং ংড়সব যিধঃ নবযরহফ, ওঃ’ং নববহ ঃযবৎব ভড়ৎ ধ ষড়হম ঃরসব, ঞযব ঢ়ড়বঃ সবৎবষু ফরংপড়াবৎং রঃ.”
হাতওয়ালা চেয়ারটির ওপর হলুদ পালিশ করা সরু আঙ্গুলের ভাঁজে চিকচিক করছে নীলা পাথর। পেইন্ট করা চিবুকের নিচে জমে আছে মুক্তোঘাম। মসলিন হলুদ রঙের শাড়ির ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল দিনের প্রথম সূর্য। দুপুর রোদের সরষে ক্ষেতের মতো নিস্তব্ধ। খুব আস্তে অথচ সম্পষ্ট গলায় বলল, আমি নলখাগড়া সরকারি কলেজে ফিলোসফি পড়াই। গত দুমাস আসতে পারি নি, আমার বকেয়াসহ এ মাসের বেতন তুলতে চাই। কাঁপা হাতে সব কাজ করে তাকে টাকা বুঝিয়ে দেবার পর চুপ করে খানিকটা সময় বসে রইল। আমি জানতে চাইলাম আর কিছু বাকি আছে? সে বলল না তো!
শানিকদিয়া চর পেরিয়ে বেশ খানিকটা পথে তাকে আসতে হতো। কিন্তু এই অজগাঁয়ে এত সাজ নিয়ে প্রায় রোজ আসতে লাগল। তার অকারণ বসে থাকা আমার টেবিলের সামনে। অস্বস্তিতে গলা ভরে উঠত আমার। আমার কাজের দিকে ঝাউচোখে তাকিয়ে থাকত সে। কখনও এসে মৃদু স্বরে বলে উঠত একটু বসি? আবার কখনও না বলেই বসে পড়ত। একদিন এলো মধূকুপীঘাস রঙা শাড়িতে বাসমতী ধানক্ষেতের পাড় জড়ানো, সবুজ টিপ আর সবুজ পালিশ পেইন্ট করা মুখচ্ছবিতে। মৌরীর গন্ধমাখা ঘাস শরীরে ঘুঘুর ডাক শুনতে পেলাম যেন, আমাকে একটু জল দেবেন? তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিতেই বললাম আপনি কি আমাকে কিছু বলবেন? তার সেই গভীর দিঘি চোখে চোখ রেখে বললাম, বলুন আপনার সব কথা শুনব। সে মাথা নেড়ে ‘কিছু না’ বলল। আমি একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, কিছু না তবে আমার টেবিলের সামনে রোজ এসে বসেন কেন? এদিকে অফিসে পুরুষ-নারী সহকর্মী এমনকি কাস্টমারদের টিকা-টিপ্পনীও খেতে হচ্ছিল, অকারণ। আমি ঝাঁ করে উঠলাম, আপনার তো কাজও থাকে না, তবে? কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত চোখ মেলে কুয়াশা প্রার্থনা সবুজ ক্ষেতটি রেললাইনের শেষ পাইলনের ক্যাবল ছাড়িয়ে চলে গেল। দুদিন খুব ধুপধাপ বেরিয়ে গেল। অফিসে আসার আগে সকালে নাস্তা করতে করতে পত্রিকায় হালকা চোখ বুলিয়ে নেয়া রোজকার অভ্যাস ছিল। স্বভাবশত একটু তাড়াহুড়োই থাকে তখন। একটি সবুজ টিপওয়ালা শ্যামরঙের নারীর ছবির পাশে বড় বড় করে লেখা “নলখাগড়া সরকারি কলেজের দর্শনের শিক্ষক ‘মৌমিতা চৌধুরী’ দীর্ঘদিন মরণব্যধি ক্যানসারে ভুগে গতকাল রাতে দেহত্যাগ করেছেন।” তার স্মরণে স্মরণসভার তারিখও এক সপ্তাহ পরে উল্লেখ আছে। সরু সরু কালো কালো ডালপালা নিয়ে বিপুল বাতাস মশারির মতো ফুলতে লাগল মনের আনাচ-কানাচ। পলাতক খুনির অস্পষ্ট ধোঁয়ার মতো নিজেকে নিজের কাছে লুকিয়ে এক সপ্তাহ অফিস করে পত্রিকায় উল্লেখ করা তারিখে পৌঁছে গিয়েছিলাম নলখাগড়া কলেজের দর্শন বিভাগে। সেখানে গিয়ে বন্ধু হোসেনের সাথে দেখা। বলল বাচ্চু, তুই! আমি বললাম তুই এখানে? বলল, হ্যাঁ দিদি আমার বড় বোনের খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল। দিদি আসতে পারেনি, তাই আমাকে আসতে হলো। জানিস তার কলিগ বলছিল, তার সাজগোজ নিয়ে কলেজে ভীষণ আপত্তি ছিল। সবাই বলত অজগাঁয়ে এত সেজে আসলে ছেলেমেয়েরা বখে যাবে। তো হেসে উত্তর দিত আর ক’দিনই বা আছি, উৎসবে বাঁচি। দর্শন বিভাগ মৌমিতার স্মরণসভা শুরু করে দিয়েছে। পেছনে বড় করে তার গভীর চোখ চেয়ে আছে পোস্টারে। নিচে লেখা “আর ক’দিনই বা আছি, উৎসবে বাঁচি”। থেঁতলানো সিগারেট মাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আলকাগাঁয়ের রেললাইনের ধারে, কাঁচ পোকার চিৎকারে।
Ñ কাকু!
Ñ তোমার চোখ এত গভীর কেন মা? এত মিল চোখে চোখে থাকে?
Ñ গড়া’র মায়ের চেঁচামেচি শোনা গেল। কত রাত হয়েছে খেয়াল আছে? এখন না ঘুমালে সকালের অনুষ্ঠানে কিছুতেই তুমি এটেনটড করতে পারবে না।
Ñ আমার কাছে এসে কাকী বললেন একি মা, তোমার হাত তো শুকিয়ে গেছে, ওঠো ঘুমাতে যাও।
Ñ কাকু, তার  ছোট্ট শরীর নিয়ে কখন উঠে গেলেন, খেয়াল করলাম না।
সকাল হতে না হতেই কাকুর দেখা মিলল না। আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে এলো। বেরিয়ে পড়লাম আমরা।
নিষিদ্ধ চুরুটের গন্ধে প্লাটফরমটি কেমন ককিয়ে উঠল। টেরিকাটা আলো নিয়ে ডুবো চাঁদ নক্ষত্র ছুঁই ছুঁই। আলকাগাঁয়ের ঝাপটায় ট্রেনটির শেষ হুইসেলে আরও একবার কাকুর গলা শুনতে পেলাম, তোমার চোখ এত গভীর কেন?

Category:

আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত করতে হবে

41

রোহিঙ্গা সমস্যা ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

উত্তরণ : রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ : দুটো জিনিস আমার মনে হয় খুব জরুরি। ১. মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে এক ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে এবং যেভাবে ফুটেজ এসেছে, নিউজ মিডিয়া কভার করেছে, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া, সেখানে হয় মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সহায়তায় বা মিয়ানমার বাহিনীর নীরবতায় একটি সংঘর্ষ হয়েছে। সেই সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে রীতিমতো রোহিঙ্গাদের ওখান থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। বের করার ফলে ইতোমধ্যেই ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
প্রথমত; মানবিক বিবেচনায় যেহেতু শিশু ও নারী রয়েছে সেহেতু এখানে তাদের আশ্রয় দেওয়া হলো প্রাথমিক কাজ এবং সেই কাজটা করার জন্য একটা ‘Pro-active Policy’ দরকার। ‘Pro-active Policy’-র মধ্যে বিশেষ করে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আছে, যারা এ ধরনের রিফিউজি কন্ডিশনে কাজ করে তাদের সহায়তা নেওয়া, যা UNHCR থেকে শুরু করে এমন কী ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন যে আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে। সেখানে একটি ‘Pro-active Policy’ করা এবং তাদের জন্য এলাকাটি খুলে দেওয়া উচিত। কারণ তারা যেন দেখে রিপোর্ট করতে পারে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক মিডিয়াকেও সেখানে নিয়ে দেখানো প্রয়োজন। এবং যেসব বর্ণনা আসছে সেই বর্ণনা প্রচার করা প্রয়োজন। এর একটা বড় কারণ হলো Mass Atrocities হয়েছে। তাতে ২ থেকে আড়াই লাখ লোক পালিয়ে এসেছে। যেভাবে পালিয়ে এসেছে একেবারে সবকিছু ছেড়ে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বোঝা যাচ্ছে যে, সেখানে Crime Against Humanity হয়েছে। এখন Crime Against Humanity , ২০১৭-তে হওয়া আর সত্তর দশকে বা নব্বই দশকে যখন এসেছিল, তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।
সত্তর দশকে যখন ৩ লাখ বা ওই পরিমাণ লোক তখনও ওরা বিতাড়িত করেছে, আবার ফেরত গেছে UNHCR-এর মাধ্যমে। নব্বই দশকেও তাই হয়েছে। নব্বই দশকে বা সত্তর দশকে এতগুলো আন্তর্জাতিক লিগ্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ছিল না। এটা এখন হয়েছে। সেটা ইন্টারন্যাশনাল সিভিল কোর্ট থেকে শুরু করে R2P (Responsibility to Protect) সেটা জেনারেল অ্যাসেম্বলি দ্বারা পাস করানো, তার ওপরে যেটা আমরা দেখতে পারছি সেটা হলো একেবারে Crime Against Humanity এমন কী ধর্ষণের ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট যেটা জেনোসাইডাল সেটাও একটা লিগ্যাল ইস্যু তৈরি হয়েছে। সেই হিসেবে একটা Mass Atrocities করে বা  Crime Against Humanity করে বা Ethnic Cleansing এমন কী ডেসমন্ড টুটু বলেছেন, জেনোসাইড ভালো যেই করে পার পাওয়া কোনো সুযোগ নেই। সেটা প্রচার করা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিকভাবে সেটা প্রচার করা প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া, জাতীয় মিডিয়া সব জায়গায় প্রচার করা।
দ্বিতীয়ত; একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। কারণ সত্তর দশকে একবার হয়েছে। নব্বই দশকে একবার হয়েছে। এই যে বারবার তারা করছে এবং Almost তিন জেনারেশন ধরে তারা stateless রয়ে গেছে। সেই জায়গায় আমার মনে হয়, ‘Pro-active Policy’ আমাদের দরকার, পররাষ্ট্রনীতিতে যেটা হয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে আর না হলে জাতিসংঘের মাধ্যমে যেভাবেই হোক। আন্তর্জাতিক সম্মেলন জাতিসংঘের মাধ্যমে হতে পারে, জাতিসংঘের বাইরেও হতে পারে।
এখানে মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে যে রোহিঙ্গা রিফিউজি এসেছে শুধুমাত্র তা নাÑ একাধিক দেশে কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে এমন কী ইউরোপেও আছে। সেই হিসাবে যতগুলো দেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে সব দেশকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন হতেই পারে। কারণ সবার তো একটা চিন্তা-ভাবনা আছে এ বিষয়টির ভবিষ্যৎ কী? সেই আন্তর্জাতিক সম্মেলন একেবারেই যে জাতিসংঘের মাধ্যমে করতে হবে তা না। কারণ জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রসেস করতে হলে অনেক ধরনের আমলাতান্ত্রিকতা থাকে এবং পাঁচ সদস্যের সমর্থন থাকতে হয় ইত্যাদি। সেটাও আমি বাদ দিতে চাচ্ছি না। সেই প্রসেসও চালু করা উচিত, যা ইতোমধ্যে আমাদের সরকার বলেছে তারা জাতিসংঘে উত্থাপন করবে। সেই সাথে জাতিসংঘের বাইরেও এই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। ওখানে যে জিনিসটা হাইলাইটস করা দরকার তা হলো Crime Against Humanity..
এই দুটো ‘Pro-active policy’-এর যদি একটি Humanitarian ধরি, আরেকটি স্থায়ী সমাধান ধরি, তা হলে দ্বিতীয়টার মধ্যে কিছুটা অবস্থান আরও ভালো। যেহেতু ইতোমধ্যে অং সান সু চি’র কারণেই বলতে গেলে একটা ‘কফি আনান কমিশন’ রয়েছে। একটা রিপোর্টও তৈরি হয়েছে এবং সেখানে সুনির্দিষ্ট করা যেতে পারে। অনেকে হয়তো যে শব্দটা বলেছেন, Muslim Community in the Rakhain, মিয়ানমার সরকার বলছে তারা ‘বাঙালি’, সেই শব্দটা রাখেনি; আর আমরা বলছি রোহিঙ্গা সেই শব্দটিও রাখেনি। কিন্তু না রাখলেও শব্দটা তারা মিলিতভাবে রেখেছেন Muslim Community in the Rakhain. এ ব্যাপারে বলাই হয়েছে ঝঃধঃবষবংং. শেক্সপিয়রের সেই কথাÑ ‘নামে কী আসে যায়’ আমার কথাও নামে কী আসে যায়, সমাধান করতে হবে। সেই জায়গায় নাম যারা যেভাবে চায়, আজ বা কাল যে কোনো সময় রাখা যাবে। কিন্তু আমাকে তো প্রথমে তাদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। অধিকার রক্ষা করার ব্যাপারেই সুনির্দিষ্টভাবেই কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট আছে। যেটা অং সান সু চি নিজেই বলেছিলেন যে, তিনি এটা Abide (মেনে চলবেন) করবেন।
কিন্তু দেখা গেল রিপোর্টের পরের দিনই একটা ঘটনা ঘটল। এই যে বিভিন্ন জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী বলা হচ্ছে, সেটা মিয়ানমারের দ্বারা তৈরি কি না সেটাও তো আমরা জানি না। এটা কারা তৈরি করছে? কারণ এ ধরনের পরিবেশে এটা হওয়াটা অস্বাভাবিক না। কারণ যারা বছরের পর বছর Stateless রয়ে গেছে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের মেলিটেন্সি এমন কী সেলফ ডিফেন্স মেলিটেন্সি তৈরি হতে পারে। আমার মনে হচ্ছে, সেখানে বড় আকারে ‘Pro-active Policy’ দরকার। এই কফি আনান কমিশনের রিপোর্টটা আছে এবং সেখানে অনেকে হয়তো বলছে যে একটা দুটি দেশ এখানে আসেনি; কিন্তু আমি মনে করি, বিভিন্ন দূত পাঠাবার মাধ্যমে তাদের বুঝানোর একটা বিষয় আছে এবং হাইলেভেল দূতও যেতে পারে। একাধিক দূতও যেতে পারে। যারা এই বিষয়ে জানেন তাদের নেওয়া যেতে পারে। তাদের সমর্থন না পেলেও অন্তত আমাদের বুঝাতে হবে। কারণ তারা হয়তো বলবে আমরা তো বুঝি না, আমরা তো অন্য সাইটে বুঝেছি। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি মিয়ানমার সরকার একটা ‘Pro-active Policy’ করছে বিভিন্ন জায়গায়। সেই জায়গায় আমরা যদি থেমে থাকি তা হলে যতদিন যাবে তত আমাদের ক্ষতি। আমার মনে হয়, একটা বড় ধরনের ‘চৎড়-ধপঃরাব চড়ষরপু’ দরকার।
এখানে সবকিছু যে বাস্তবায়ন হবে তা না। এখানে একটু বলে রাখি ওই যে, Crime Against Humanity, ওই কারণে আমাদের যুক্তি আরাকানে যেহেতু মিয়ানমার মিলিটারি ফেইল করেছে, To protect the resident। R2P-তে বলাই হচ্ছে Citizen and Non-Citizen। শুধু সিটিজেনের প্রোটেকশন নয়, নন-সিটিজেনেরও কথা বলা হচ্ছে। আমি ধরে নিচ্ছি, তারা নন-সিটিজেন, তারপরও প্রোটেকশন কিন্তু মিয়ানমার সরকারের দায়িত্ব, যেহেতু তারা মিয়ানমারের ভূমিতে থাকে। সেই হিসেবে যেহেতু তারা ব্যর্থ হয়েছে কাজেই আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা ফোর্স আমরা দাবি করতেই পারি। তবে মনে রাখতে হবে, দাবি করলেই সবকিছু রাতারাতি হবে তা নয়। দাবির মাধ্যমেই প্রকাশ পাবে আমরা কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছি এবং সত্তর দশক আর নব্বই দশকের সেই ইতিহাসের মধ্যে থাকতে চাচ্ছি না। এবার বড় ধরনের সমাধান চাচ্ছি। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ বড় আকারের কাজে নেমে পড়লে আন্তর্জাতিকমহলকে পাশে পাবে। ইতোমধ্যে আমরা কিছুটা সাড়া পাচ্ছি। আমেরিকা থেকে কিছুটা পজিটিভ রেসপন্স এসেছে। ডেসমন্ড টুটু থেকে শুরু করে কলকাতায় মিছিল হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ায় মিছিল হয়েছে, মিছিল হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। সেই জায়গায় আমার মনে হয় যদি ভালো স্পেস তৈরি করতে পারে তা হলে আশা করি, তাদের ফেরত যাওয়ার মাধ্যমে একটা স্থায়ী সমাধান হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা বড় আকারে বাড়ানো দরকার, ‘Pro-active Policy’ দরকার।
আরেকটি বিষয়, আমাদের দেশের এনজিওগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। পৃথিবীর অন্যতম এনজিওগুলো বাংলাদেশে রয়ে গেছে। এদের কাজে লাগানো উচিত। তার চেয়ে বড় কথা যেহেতু দু-দুবার আমাদের অভিজ্ঞতা আছে আমরা জানি যে, এটা কীভাবে করতে হবে। সেখানেও একটা বড় পলিসি দরকার। কারণ সেখানেও আর্থিক এবং বিভিন্ন ধরনের সাহায্য অবশ্যই আমাদের দরকার।
উত্তরণ : মিয়ানমার সরকার যে রোহিঙ্গাদের বহিরাগত ঘোষণা করেছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং ঐতিহাসিকভাবে তার কী কোনো ভিত্তি আছে?
ইমতিয়াজ আহমেদ : না, কোনোভাবেই না। এটা তো ওরা যখন সত্তর দশকে ’৭৮-এ যখন ফেরত গেল সেই অ্যারেজমেন্টে তারা নিজেরাই বলেছে যে ওরা ওখানকার বাসিন্দা। ওরা তো দু-দুবার ফেরত নিয়েছে। ফেরত আমি যখন নিই তার মানে কি? স্বাভাবিকভাবেই সে আমার। আমি তো ফেরত নিয়েছি। এই যে ফেরত নিয়েছে, তার সংখ্যা আছে, ঠিকানা আছে এবং তারা যদি ওদের কাগজপত্র নিয়ে যায় তা হলে কিন্তু UNHCR-এ আছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে আছে, সেই হিসেবে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কথা হচ্ছে, যে সমস্যাটা আমরা এখন দেখছি এটা বহু বছরের সমস্যা। সবাই ভালো করে জানে মিয়ানমার সরকার প্রথম দিকে কিছুটা অধিকার দিয়েছিল; কিন্তু আস্তে আস্তে এই অধিকার নিয়ে যাচ্ছে, তারও রেকর্ড আছে।
উত্তরণ : এছাড়া ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের মাঝখান থেকে একাধিকজন মিয়ানমারের মন্ত্রী হয়েছেন; এমপি হয়েছেন, সেক্ষেত্রে এটা কী করে বলেন তারা?
ইমতিয়াজ আহমেদ : সেটা বলে পার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। যদি ওই অবস্থা-ই হতো তা হলে আন্তর্জাতিকমহল এতটা সোচ্চার হয়ে উঠত না। কফি আনান কমিশনও হতো না। কারণ ওখানে বলাই হয়েছে Stateless। একেবারে বলাই হচ্ছে কীভাবে তারা সিটিজেনশিপ পেতে পারে। কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পেতে পারেÑ সবকিছু বলা হচ্ছে। সেই জায়গায় ওই কথা বলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
উত্তরণ : কোনো কোনো দেশি-বিদেশি শক্তি রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তৎপরতায় ইন্ধন দিয়ে প্রকারান্তরে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে, এ ব্যাপারে অভিমত বলুন।
ইমতিয়াজ আহমেদ : আমার মনে হয় না, এই শরণার্থীর মাধ্যমে বাংলাদেশ এক ধরনের ইনস্টাবল বা ওই ধরনের সমস্যায় পড়ে যাবে। বাংলাদেশে বড় ধরনের কনশাসনেস আছে রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে। বড় আকারে মেজরিটি শরণার্থী হলো মুসলমান। সেই হিসেবে একটা সহানুভূতি আছে। জার্নালিস্টরা ভালো বলতে পারবে। জার্নালিস্টরা জানিয়েছে, তারা (রোহিঙ্গা শরণার্থীরা) আমাদের লোকাল লেবেলে এখনও সাপোর্ট পাচ্ছে; সহানুভূতি পাচ্ছে তাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে। এর বড় কারণ হতে পারে তারা মুসলমান, ভাষাগত মিল আছে। আরেকটি জিনিস একাত্তরের কারণে আমাদের মধ্যে শরণার্থীর (ভারত আমাদের তখন সাপোর্ট দিয়েছে, সেহেতু একাত্তরের সাথে শরণার্থীর একটা সম্পর্ক আছে, যার জন্য প্রতিটি বাসায় এক-দুজন শরণার্থী পাওয়া যাবে আত্মীয়-স্বজন মিলিয়ে।) সেই অর্থে শরণার্থীর ব্যাপারে আমাদের সব সময় একটা দুর্বলতা রয়েছে। সব সময় চাই তারা আশ্রয় যেন নিতে পারে। তারপর আশ্রয়ের পর যে সমাধান সেই সমাধানটা যেন হয়। সেই জায়গায় আমার মনে হয় না বাংলাদেশের রাজনীতির অন্য কোনোভাবে নেওয়া। কারণ এ ব্যাপারে বড় কনশাসনেস আছে। আরেকটা বিষয় মনে রাখতে হবে, দু-দুবার কিন্তু তারা এসেছে, থেকেছে আবার চলে গেছে। কোনোবারই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি।
উত্তরণ : রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসা মানবিক বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনও তেমন সাড়া দিচ্ছেন না। আপনার কী মনে হয়?
ইমতিয়াজ আহমেদ : আমার মনে হয় এটা দেখা দরকার দুই পর্যায়ে। একটা হলো স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে। আমি মনে করি, কফি আনান কমিশনের রিপোর্টে যেভাবে আছে সেটাকে অং সান সু চি সরকারকে সেটা ইমপ্লান্টেশন করতে বাধ্য করানো। তাদের সহায়তাই এটা হয়েছে এবং তাদের বলেছেও এটা অনরফব করব। সেই হিসেবে সেই ল্যাঙ্গুয়েজই এটা সমাধান করতে চায় না কেন। আমি যদি ধরেও নিই Muslim Community in the RakhainÑ GB k‡ã Zviv mgvavb Ki‡Z Pv‡”Q, As a Muslim Community হিসেবে ওই জায়গায় প্রথমে একটা লিগ্যাল ইন্সট্রুমেন্ট না হলেও মোরাল ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি হয়েছে এই কফি আনান কমিশনের রিপোর্টটি। যেহেতু কফি আনান কমিশন রিপোর্ট বের করার পর বলতে গেলে সাথে সাথে এ ধরনের রি-অ্যাকশনের। একই সাথে আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাথে এ বিষয়টি পড়ে না যায়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বলতে আমি বুঝাচ্ছি বাংলাদেশের না, মিয়ানামারের যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি মূলত অং সান সু চি’র সাথে আর্মিদের মারামারিটি। এই মারামারি একেবারে সিরিয়াস মারামারি। আর্মির দল স্বাভাবিকভাবে চেষ্টা করছে বুঝাতে যে, অং সান সু চি (has failed to protect) মিয়ানমারের নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ। এখন যদি সু চি রোহিঙ্গাদের পক্ষ নেয় তখন ‘এত বৌড্ডিষ্ট নয়’ এভাবে বলবে। এই জায়গায় অং সান সু চিও বিপদে পড়েছে। তার ওপর সব ফোকাস পড়েছে। সেখানে আমি মনে করি, Focus should be Military. Military এই কর্মকা- শুরু করেছে অন্তত অং সান সু চি একটি কমিশন রিপোর্ট তৈরি করেছে। অনেকে বলছে চোখ দেখানোর জন্য। তাই যদি হয় সেটা তো বের হয়েছে। সেই জায়গায় আমাদের ফেইস হওয়া উচিত। ওখানকার সেনাবাহিনী প্রথমত; ওখানকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, দ্বিতীয়ত; তারা একটা Mass Atrocities মাঝে জড়িত। ওই Mass Atrocities যদি আমি লিগ্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট দেখি তা হলে ওই জায়গায় সেইভ জোন না বললেও অন্তত আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী যেন নিরাপত্তা দিতে পারে। যেহেতু মিয়ানমার সেনাবাহিনী ব্যর্থ।
আজকে যদি মিয়ানমার সেনাবাহিনী ফেইল না করত তারা যদি নিরাপত্তা দিতে পারত সেই হিসেবে তারা যদি এমন একটা ব্যবস্থা করত যেখানে আড়াই লাখ লোককে পালিয়ে আসতে হতো না এপারে। তা হলে আমরা বুঝতে পারতাম, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট প্রফেশনাল। তারা কেবল ইনডিপেনডেন্ট। অনেকে বলে তারাই ইন্ধন জোগাচ্ছে যেহেতু তারা ফেইল করেছে। সেই হিসেবে একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে সেখানে একটা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী তৈরি করা। সেটা আশিয়ান ফোর্স দিয়েও হতে পারে। আশিয়ানের বাইরের ফোর্স দিয়েও হতে পারে এবং তার পরে স্থায়ী সমাধান। স্থায়ী সমাধান তখনই আসবে যখন নাগরিকের বিষয়টি আসবে। এবারও যদি নাগরিক না হন আবার ফেরত গেল আবার দু-এক বছর পর আবার এলো, সেই জিনিসটি যেন না হয়।
উত্তরণ : রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের উপায় কী?
ইমতিয়াজ আহমেদ : আমার মনে হয়, এমনিতেই কিছুটা হয়তো দেরি হয়েছে। তবে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বলেছেন, এক. এদের আশ্রয় আমরা দেব, সেটা যথেষ্ট পজেটিভ। দ্বিতীয়. ইতোমধ্যে বলা হচ্ছে আমরা এটা জাতিসংঘে উত্থাপন করব। এবং পরে সেভ জোনের কথা বলা হচ্ছে। এগুলো স্বাভাবিকভাবে একটা সিগন্যাল দিবে মিয়ানমার সরকারকে। কিন্তু এটাকে বাড়ানো দরকার। আমি মনে করি, একাধিক দূত পাঠানো দরকার বিভিন্ন দেশে। এখন দেখা যাচ্ছে যে, ভারত এবং চীন এই দেশকে আমরা নিয়ে আসতে পারছি এবং মিয়ানমার উল্টো দেখাচ্ছে ওই দুই শক্তি তো আমাদের সাথে। এই জায়গায় আমি মনে করি, যেহেতু দুই দেশেই আমাদের কাছের এবং এই সরকারের সাথে ভারতের সাথেও ভালো সম্পর্ক, চীনের সাথেও ভালো সম্পর্ক, সেহেতু হাইলেভেল ডেলিগেশনে অন্তত বসে একটা ব্রিফ করা, নরেন্দ্র মোদিকে ব্রিফ করা, শি পিন জিংকে ব্রিফ করা। এবং ব্রিফ করে বলা এই হলোÑ এটা বারবার ঘটছে। ফলে একটি ট্রান্সপারেন্ট প্রসেসে এটা করতে হবে।
ওরা (মিয়ানমার) যদি বলে থাকে রোহিঙ্গারা আমাদের দিক থেকে এসেছে এবং ওরা বলছে, ওরা (রোহিঙ্গারা) ওরা এসেছে ৬০০ বছর আগে; ৬০০ বছর আগে বা ১৯৪৭-এর আগে যদি মিয়ানমার এসে থাকে তা হলে যে কোনো আন্তর্জাতিক আইনের তারা ওখানকার বাসিন্দা। সেই বিষয়টি আমরা রক্ষা করতে চাচ্ছি। এখানে যদি তোমরা ট্রান্সপারেন্সির মাধ্যমে আসতে চাও আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এভাবেই ঈৎরসব অমধরহংঃ ঐঁসধহরঃু হয়ে যাবে! আজকে না হয় আমার বর্ডারে হলো, কাল-পরশু তো তোমার বর্ডারে হতে পারে। অন্য বর্ডারে হতে পারে। তখন কি হবে।
এটা যদি আন্তর্জাতিকমহল মেনে নেয় তা হলে ভয়ঙ্কর ব্যাপার। তা হলে যে কোনো লোক তার হিসেবে বলবে, আমি এই ধর্মের লোক চাচ্ছি না বা আমি ওই ভাষার লোক চাচ্ছি না। তখন কী হবে? সেই ব্যাপারে আমি মনে করি, যে কাজটি করা হয়েছে এটাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া এবং এই বাড়ানোর মাধ্যমে তারাও একটা মেসেজ পাবে। Quite Diplomacy-এর সময় আর নেই। কারণ যেহেতু সবার হাতে মোবাইল ফোন, টুইটার, ফেইসবুক, সেই জায়গায় আমি যদি Quite Diplomacy করি তা হলে দেখা যাবে অন্য সাইট একাকে এমনভাবে ব্যবহার করবে তখন কিন্তু আমাদের ভয়েজটা শোনা যাবে না। তখন ওরা ভাববে কিছু শোনা যাচ্ছে না, হৈচৈ করছে না, তা হলে আমাদের এত মাথা ব্যথা কিসের? যাতে মাথা ব্যথা হয় সেদিকে আমাদের নিয়ে যেতে হবে। যার জন্য আমি মনে করি, এটাকে (রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা) আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
উত্তরণ : রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কতটুকু? এ ব্যাপারে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তির আবেদন জানান, বরাবরই তিনি জাতিসংঘ অধিবেশনে অনেক সময় হাতে নিয়ে যান এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কী ভূমিকা প্রত্যাশা করেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ : বিষয়টি বড় আকারে উঠাতে হবে। তার দেশে আড়াই-৩ লাখ, আমি যদি আগেরগুলো ধরি তা হলে ৫ থেকে ৬ লাখ লোক অন্য দেশে বাস করছে। এটা তো বড় একটা unthinkable at refugee situation। এটা তো নাম্বার ওয়ান বিষয় হিসেবে আনতে হবে। তবে ওখানে বলার আগে সে সময়টা এখন থেকে ১৬ তারিখ যদি আমি ধরিÑ তার মধ্যে কার্যক্রমটা না করি, আমাকে ঐড়সবড়িৎশ করতে হবে। হঠাৎ করে একজন যদি শোনে প্রথমবার সে তো চৎবঢ়ধৎবফ না। তবে আগে থেকে যদি ব্রিফ করে তখন জবধপঃরড়হ হিসেবে তারাও একটা স্ট্যান্ড নিতে পারে। সেই জায়গায় যতগুলো দূতাবাস আছে তাদের আমাদের অ্যাকটিভ করতে হবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো এটাকে আরও সিস্টেমেটিক্যাল যারা সরকারে আছেন, বিষয়টি ভালো করে জানেন, তাদের নিয়ে চতুর্মুখী কূটনীতি এবং বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো। কারণ জাতিসংঘে বা নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে যদি এই কাজটা না করি, নিউইয়র্কে এসে প্রথমবার যদি মোদি শোনেন, বা শি জিন পিং শোনেন বা চাইনিজরা শোনেন তখন তারা বলবে আমরা তো কিছুই জানি না, আমরা খোঁজ নেই, পরে জানাব। যার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে পুরো বিষয়টিই আগে থেকে যতগুলো দেশ এমন কী যেহেতু Muslim Country  Rakhainরা বিশেষ করে মেজরিটি অনেকে হিন্দুও আছে। যেহেতু মেজরিটি অনেক মুসলিম দেশ যেমন অ্যাকটিভ। ইন্দোনেশিয়াকে আমরা দেখেছি, তার্কি আমরা দেখেছি, সৌদি আরবকে দেখেছি, সেসব জায়গাতে অ্যাকটিভ করা। আমাকে দুই জায়গায় অ্যাকটিভ করতে হবে। একটি হলো মুসলিম, আরেকটি হলো মানবিক। নন-মুসলিম রয়েছে মানুষ হিসেবে। আশিয়ানের মতো। আশিয়ানে ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া দুই দেশ কিন্তু ওখানে আক্রান্ত, থ্যাইল্যান্ডও ওখানে আক্রান্ত। চতুর্মুখী তৎপর থাকা দরকার, যখন প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে নিয়ে যাবেন তখন যেন অন্তত একটা রেজ্যুলেশন আসে এবং কর্মকা- যেন আসে এবং তার কিছুটা পথ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে আমেরিকা সরকার স্ট্যান্ড নিয়েছে। সেই জায়গায় মনে করি, আমি যদি অপেক্ষা করি আগে উনি বলুক তা হলে আমার মনে হয় না এটা কাজ দেবে। তাই আগে থেকেই কাজটা শুরু করতে হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : আনিস আহামেদ

অনুলিখন : রায়হান কবির

আলোকচিত্রী : আরিফুল ইসলাম সোহেল

 

Category:

শিক্ষা দিবস : শিক্ষার মানোন্নয়নে আওয়ামী লীগ

51রায়হান কবির: ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ নাম না-জানা অনেকেই। তাদের স্মরণে এই দিনকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সামরিক শাসক আইয়ুব খান তৎকালীন শিক্ষা সচিব এসএম শরিফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন। গঠিত এই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। এতে শিক্ষা বিষয়ে যেসব প্রস্তাবনা ছিল তা প্রকারান্তরে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে গিয়েছিল। প্রস্তাবিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সস্তায় শিক্ষা ক্রয় করা যায় বলে যে ভুল ধারণা রয়েছে তা ত্যাগ করতে হবে। এতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও ছাত্র বেতন বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। এই তথাকথিত ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’তে যেসব বিষয় সুপারিশ করা হয়েছিল তার মধ্যে রয়েছেÑ শিক্ষাকে ব্যয়বহুল পণ্যের মতো শুধু উচ্চবিত্তের সন্তানদের স্বার্থে উচ্চ শিক্ষাকে সীমিত করা এবং সাধারণের জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ একেবারেই সংকুচিত করে ফেলা। শিক্ষা ব্যয় পুঁজিবিনিয়োগ হিসেবে দেখে শিক্ষার্থীরা তা বহন করা, যে অভিভাবক বেশি বিনিয়োগ করবেন তিনি বেশি লাভবান হবেন; অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে ‘অবাস্তব কল্পনা’ বলে উল্লেখ; ষষ্ট শ্রেণি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজি পাঠ বাধ্যতামূলক; উর্দুকে জনগণের ভাষায় পরিণত করা; সাম্প্রদায়িকতাকে কৌশলে জিইয়ে রাখার চেষ্টা; ডিগ্রি কোর্সকে তিন বছর মেয়াদি করা ইত্যাদি।
এই কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষè নজর রাখার প্রস্তাব করে। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম করাতে ১৫ ঘণ্টা কাজের বিধান রাখা হয়েছিল। রিপোর্টের শেষ পর্যায়ে বর্ণমালা সংস্কারেরও প্রস্তাব ছিল। ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আইয়ুবের এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
১৯৬০ ও ১৯৬১ সালে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ব-স্ব দাবির ভিত্তিতে জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে আন্দোলন চলতে থাকে। এ আন্দোলন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি বাতিল করে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। ছাত্রদের সাথে সাধারণ মানুষও পিকেটিংয়ে অংশ নেয়। ওই দিন সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে উপস্থিত হন। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছেÑ এ খবর শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু হাইকোর্টের সামনে পুলিশ এতে বাধা দেয়। তখন মিছিলকারীরা সংঘাতে না গিয়ে আবদুল গনি রোডে অগ্রসর হয়। এ সময় পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। ওই দিন পুলিশের গুলিতে বাবুল, মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ শহীদ হন। ওই দিন শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে মিছিলের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। এদিন টঙ্গীতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশের গুলিতে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিকেরও হত্যার খবর রয়েছে। বহু ছাত্র-জনতা পুলিশ ও ইপিআরের নির্যাতন ও গুলিতে সারাদেশে আহত হন।
শিক্ষার মানোন্নয়নে আওয়ামী লীগের অবদান
মূলত আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রত্যেকটি নাগরিকের শিক্ষা অর্জনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে আসছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানে শিক্ষা মৌলিক অধিকার এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য শিক্ষা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদের (ক)-তে বলা হয়েছেÑ ‘রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ স্পষ্ট ঘোষণা করেছে ‘বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী স্থানিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষা লাভের সমান সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা। শিক্ষাকে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পণ্য হিসেবে ব্যবহার না করা।’
১৯৭২ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন নিয়োগ করেন। কুদরত-ই-খুদা কমিশন দেড় বছর কঠোর পরিশ্রম করে ব্যাপক জরিপ ও পর্যালোচনাভিত্তিক বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে একটি রিপোর্ট ১৯৭৪ সালের ৩০ মে সরকারের নিকট দাখিল করেন। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষানীতি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ বঙ্গবন্ধুই নিয়েছিলেন। কমিশন রিপোর্টের অপেক্ষা না করে তিনি কতিপয় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মার্চ ’৭১ থেকে ডিসেম্বর ’৭১ পর্যন্ত সময়কালের ছাত্রদের সকল বকেয়া টিউশন ফি মওকুফ করেন; শিক্ষকদের ৯ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন; আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণ করেন এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী পদক্ষেপ হচ্ছে তিনি দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন। এর ফলে ১ লাখ ৬৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি সরকারি হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার ৯০০ কলেজ ভবন ও ৪০০ হাই স্কুল পুনর্নির্মাণ করেন। বঙ্গবন্ধুর আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হচ্ছে জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্বায়ত্তশাসন প্রদান। বঙ্গবন্ধু অফিস-আদালতে বাংলা প্রচলনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। সেনাবাহিনীসহ সকল অফিসে বাংলা চালু করা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা একাডেমিতে সাঁটলিপি, মুদ্রাক্ষর ও নথি লেখার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়। জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে তিনি বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন।
শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মেয়াদ (১৯৯৬-২০০১)
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলে অন্যান্য খাতের ন্যায় শিক্ষা খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। আওয়ামী লীগের শিক্ষা-দর্শন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষার মান্নোনয়ন ঘটে। এ সময় একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রণীত হয়। শিক্ষা খাতে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ। সাক্ষরতার হার বিএনপি আমলের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়। দেশে এই প্রথম একটি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়, দুটি নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, দুটি নতুন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, ৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিপুল সংখ্যক নতুন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগই প্রথম দেশে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বাঙালি জাতির গর্ব ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে। মাতৃভাষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষায় পারদর্শিতা অর্জনে ২০০১ সালের মার্চে ঢাকায় স্থাপিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। শিল্পী-সাহিত্যিকদের কল্যাণে গঠন করা হয় শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট।
শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদ (২০০৯-১৭)
২০০৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর অন্যান্য সকল খাতের মতোই পিছিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ২০০১-এ বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় শিক্ষার হার ৬৫ থেকে ৪৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল। আর সেখানে বর্তমান শিক্ষার হার বৃদ্ধি করে ৭১ শতাংশে উন্নীত করেছে। গত আট বছরে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে সর্বমোট প্রায় ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ ১ হাজার ১২৬টি বই বিতরণ করা হয়েছে। ২৬ হাজার ১৩৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ ও শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করা হয়েছে। ১ কোটি ৭৩ লাখ ছেলেমেয়ে বৃত্তি পাচ্ছে এবং ইতোমধ্যেই ১ কোটি ৩০ লাখ মায়ের হাতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ৩৫ হাজার ৫০০টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। মিডডে মিল চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে শতভাগ শিশুর ভর্তি, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষার প্রবর্তন, ঝরে পড়ার হার হ্রাস, ছাত্রীদের অনুপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন একই দিনে প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষা হয়। ৬০ দিনের মাথায় প্রত্যেকটা এসএসসি, এইচএসসি ফল প্রকাশ পায়। একই তারিখে হয়। ক্লাস শুরু হয় ১ জানুয়ারি। দেশের প্রায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান, কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা, প্রতি উপজেলায় একটি করে বিদ্যালয়কে মডেল বিদ্যালয়ে পরিণত করার কার্যক্রম চলছে। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন, ভর্তি পরীক্ষা, পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রভৃতি কার্যক্রম জনগণের প্রশংসা অর্জন করেছে। ১ হাজার কোটি টাকার স্থায়ী তহবিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়ক ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষকদের পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা, ট্রেনিং ও দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা সেশন জটমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
মোটকথা ১৯৬২-৬৪ সালের শিক্ষা আন্দোলনের মৌল চেতনা এবং একটি কল্যাণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম যতটুকুই বাস্তবায়িত হয়েছে তা আওয়ামী লীগ আমলেই হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ, প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, সার্বজনীন শিক্ষার অধিকার, একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণের মধ্য দিয়ে ধনী-গরিব সকলের জন্য শিক্ষাগ্রহণের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি, বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রদান, চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, সেশন জটমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি সবই অর্জিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

Category:

১০ জঙ্গিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদ-ের রায়

53উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার একটিতে দোষী সাব্যস্ত করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) ১০ জঙ্গিকে গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আরেক মামলায় ৯ জঙ্গির ২০ বছর করে কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২০ আগস্ট ঢাকার ২নং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মমতাজ বেগম এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় হুজির সদস্য ১০ জঙ্গির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গুলি চালিয়ে দ- কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য চারজনকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ- ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১০ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনের এ দুই মামলায় চার্জশিটভুক্ত ২৫ আসামির মধ্যে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে অন্য একটি মামলায়। এ কারণে তার নাম এই মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিস্ফোরক আইনের মামলায় ৯ জনকে ২০ বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
যারা দ-িত
১৭ বছর আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার জনসভার কাছে বোমা পুঁতে রাখার ঘটনায় দায়ের হওয়া বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় মৃত্যুদ-ে দ-িতরা হলেনÑ ওয়াসিম আক্তার ওরফে তারেক ওরফে তারেক হোসেন ওরফে মারফত আলী, রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম ওরফে রাশেদুজ্জামান খান ওরফে শিমন খান, ইউসুফ ওরফে মোসহাব মোড়ল ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই ও মাওলানা আ. রউফ ওরফে মুফতি আ. রউফ ওরফে আ. রাজ্জাক ওরফে আবু ওমর। ১৪ বছর সশ্রম কারাদ-প্রাপ্তরা হলেনÑ মেহেদী হাসান, আনিসুল ইসলাম, মহিবুল্লাহ ও সারোয়ার।
খালাস পেয়েছেন খন্দকার মো. কালাম উদ্দিন শাকের, আরিফ হাসান সুমন, মুন্সি ইব্রাহিম, শাহনেওয়াজ, লোকমান, এনামুল হক, মিজানুর রহমান, মাওলানা সাব্বির, মাহমুদ আজহার ও আবুল হোসেন।
বিস্ফোরক আইনের মামলায় ২০ বছর কারাদ-প্রাপ্ত আসামিরা হলেনÑ ইউসুফ ওরফে মোসহাব ওরফে আবু মুসা (পলাতক), আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস, মেহদী হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদ, ওয়াসিম আক্তার ওরফে তারেক হোসেন, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাহমুদ আজহার ওরফে মামুনুর রশিদ, রাশিদ ড্রাইভার ওরফে মো. আবুল কালাম ওরফে শিমন খান, শাহনেওয়াজ ওরফে মো.আজিজুল হক ও শেখ মো. এনামুল হক (পলাতক)। বেকসুর খালাস পেয়েছেন হাসমত আলী কাজী, আবুল হোসেন খোকন, মুন্সী ইব্রাহিম ও লোকমান।
মামলায় চার্জশিটভুক্ত ৮৩ জনের মধ্যে ৬৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান আদালতে চার্জশিট দেন। সেখানে ১৬ জনকে আসামি করা হয়। পুনঃতদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ২৯ জুন নতুন করে ৯ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
গোপালগঞ্জের আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিলের আগে সেখানকার আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ৪১ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে গুরুত্ব বিবেচনায় মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে মামলা দুটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
২০০০ সালের ২২ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া সফর উপলক্ষে কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে জনসভার প্যান্ডেল তৈরির সময় একটি শক্তিশালী বোমা পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর একটি দল ৭৬ কেজি ওজনের বোমাটি উদ্ধার করে। পরদিন ২৩ জুলাই ৪০ কেজি ওজনের আরও একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। সেদিনই কোটালীপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন একটি মামলা করেন।
অন্যদিকে, ২০০০ সালের ২৫ জুলাই গোপালগঞ্জের বিসিক এলাকায় মুফতি আবদুল হান্নানের সোনার বাংলা নামে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামক সাবান কারখানায় তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় গোপালগঞ্জ থানায় বিস্ফোরক আইনে আরেকটি মামলা করে পুলিশ।

Category:

বঙ্গবন্ধু ‘আমি’ দিয়েই স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছিলেন

34

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদ এমপি

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা, বিতর্ক। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৯ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি প্রথম আলোর মুখোমুখি হন। তার বাসভবনে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো : রায়ে ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’ বিতর্কে অনেকের মতে বঙ্গবন্ধুকে আদৌ ইঙ্গিত করা হয়নি। আপনি কীভাবে দেখেন?
তোফায়েল আহমেদ : এ বিষয়টি আদৌ রায়ের জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল না। অহেতুক ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’ নিয়ে একটা বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন ড. কামাল হোসেন আপনাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেই বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সই করা সংবিধান ‘আমরা’ দিয়ে শুরু হয়েছে। সেটা তো আছেই, কিন্তু তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, বঙ্গবন্ধু ‘আমি’ দিয়েই তার স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছিলেন। তার ৭ই মার্চের ভাষণে, ‘আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি, আমি প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না’র মতো অনেক বাক্য রয়েছে।
প্রথম আলো : কিন্তু রায়ে এই ‘আমি’কে খাটো করা হয়নি। বরং আমাদের মনে হচ্ছে, বিএনপি একটা অসূয়াপ্রসূত প্রতিক্রিয়া দেখানোয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন আপনারা।
তোফায়েল আহমেদ : আমি আপনার সঙ্গে দ্বিমত করব। তার কারণ, রায়ে যেভাবে ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেখানে কিন্তু ওই যে ‘আমি’কে আমি যেভাবে চিত্রিত করেছি, তার প্রতিফলন নেই।
প্রথম আলো : মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড শেখ মুজিবের আলোচনার নথি লিপিকার লিখেছিলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘আমার পানি’, ‘আমার মাটি’ ইত্যাদি বলেছেন।
তোফায়েল আহমেদ : হোয়াইট হাউসে আমি তো সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ওই বৈঠকের ‘আমি’র ব্যবহার লক্ষ করুন। ফোর্ডকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে। আমি আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতা চাই।’ তখন ফোর্ড একটি শর্ত আরোপ করার মতো প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন, ‘দুঃখিত মি. প্রেসিডেন্ট, শর্ত মেনে আমি আমার জনগণের জন্য কোনো সাহায্য নেব না। সত্তরের নির্বাচনে কী বলেছেন?’
প্রথম আলো : সংবিধানের প্রস্তাবনায় কিন্তু।
তোফায়েল আহমেদ : শেষ করতে দিন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি আপনাদের জন্য জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করতে পারি, আমি যদি বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি, আমি যদি আমার জীবন-যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি, আমি কি আপনাদের কাছে ভোট চাইতে পারি না?’ সুতরাং এই ভোটটা ‘আমি’কে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই ‘আমি’ আমাদের জন্য স্বাধীনতা ও সংবিধান এনেছিলেন।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় ঠিকই বারবার ‘আমরা’ কথাটি আছে, কিন্তু সেই ‘আমরাত্ব’র ভিত্তি কী, সেটা আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। ‘আমরা’ অর্থাৎ জনগণ থেকেই ‘আমি’ এসেছে, কিন্তু একটি পর্যায়ে এসে ‘আমরা জনগণ’ এক হিমালয়স্পর্শী ‘আমি’তে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। একটিমাত্র বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল সাড়ে ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠ। আমাদের সংবিধান ছাব্বিশে মার্চের প্রথম প্রহরের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ওপর দাঁড়ানো। সেখানে কী আছে? স্বাধীনতার ঘোষণার প্রথম বাক্যটাই শুরু এভাবে, ‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা।’… ‘আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে…।’ জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান শুধু বঙ্গবন্ধুকেই বিশ্বাসঘাতক এবং বিনা শাস্তিতে এবারে আর তাকে যেতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দিয়েছিলেন। সুতরাং, রায় সমালোচনার যোগ্য এই কারণে যে সেখানে এই ‘আমি’কে খাটো করার ইঙ্গিত আছে। আরও দুঃখ লাগে, ড. কামাল হোসেন যখন ‘আমরা জনগণ’ বলে খ-িত বক্তব্য দেন, সংবিধানেই যে ‘আমি’র স্বীকৃতি আছে, তার উল্লেখ করতে তার স্মৃতিবিভ্রম ঘটে। আর এর ফলে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত প্রতিপক্ষরা তৃপ্তি বোধ করেন।
প্রথম আলো : কিন্তু রায়ে বঙ্গবন্ধুকে বারবার জাতির জনক বলা হয়েছে। তাতে আপনি যেভাবে ‘আমি’কে চিত্রিত করেছেন, তা স্বীকৃতি লাভ করেছে। ‘আমিত্ব’ চলতি নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। বলছিলাম, বিএনপির প্রতিক্রিয়া।
তোফায়েল আহমেদ : ১ তারিখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ কোনো কথা বলেনি। ৯ তারিখ পর্যন্ত আমরা কোনো প্রতিক্রিয়া দিইনি। যদিও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এবং ব্যানানা রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে এবং তা ঠিকই আছে। কিন্তু বিএনপি এত উৎফুল্ল কেন? বিএনপি বলতে শুরু করল, লজ্জা থাকলে আওয়ামী লীগের পদত্যাগ করা উচিত। অবশ্য এটা তাদের জন্যই খাটে। লজ্জা থাকলে জিয়ার তথাকথিত আদর্শ ছেড়ে তাদেরই পদত্যাগ করা উচিত। এই রায় নিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের যে কথাবার্তা, সেসব মিলিয়ে আমরা কথা বলতে বাধ্য হয়েছি। বিএনপির প্রতিক্রিয়া আমাকে অবাক করেছে। আমরা অপেক্ষা করেছিলাম জাতীয় সংসদের জন্য। সংসদেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চেয়েছিলাম। অতীতে আমরা কখনোই কোনো প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ বা রায় নিয়ে এতটা বিতর্ক হতে দেখিনি। পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের পরও এমনটা দেখা যায়নি। প্রধান বিচারপতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি, কোনো প্রধান বিচারপতি আজ পর্যন্ত এত বেশি কথা বলেন নি। সেদিন তিনি বলেছেন, ‘আমাকে মিসকোট করা হয়েছে।’ মিডিয়াকে অনুরোধ করেছেন, যাতে মিসকোটের ঘটনা আর না ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মিসকোটের সুযোগ মিডিয়া কীভাবে পেল? কথা যদি বেশি বলা না হতো, তা হলে? কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা স্পষ্ট করে না বললেই মিসকোটের আশঙ্কা তৈরি হয়। আমি জানি না, মিডিয়া মিসকোট করেছে কি না। তবে সেটা ঘটে থাকলে মিডিয়াকে কতটা দোষ দেওয়া যায় আর অস্পষ্টতা বা অপ্রাসঙ্গিকতা কতটা দায়ী, সেটাও একটা বিবেচনার বিষয়।
প্রথম আলো : ওই দিনই আদালত থেকে বেরিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আমাকে বলেছিলেন, মিডিয়া তাকে মিসকোট করেছে। প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের পরও যে প্রতিক্রিয়া হয়নি, তার থেকে বেশি বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। এখন যেভাবে হুমকির কথা বলা হচ্ছে, সেভাবে বলেন নি।
তোফায়েল আহমেদ : না, হুমকি নয়। অ্যাটর্নি জেনারেল যেটা আপনাকে বলেছেন, এটাই তো বাস্তব কথা। তিনি যদি বলেই থাকেন প্রতিক্রিয়া হয়নি, সেটা বলাই তো অসমীচীন। কারণ, পাকিস্তানের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পেছনে সামরিক বন্দুক রাখা। আবার প্রতিক্রিয়া হয়নি, মানে কী। নওয়াজ শরিফ বলেছেন, রায়ের কারণে একাত্তরের মতো পাকিস্তান আবার ভেঙে যাবে। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ শরিফের ছেলে-মেয়েদের নাম এসেছে এবং সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে যে তদন্ত হয়েছে, তাতে বিচারকেরা আইএসআই ও এমআইর (মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) দুজন কর্মকর্তাকে রেখেছেন। এখন অবস্থাটা বুঝুন। বিশ্বের কোনো সভ্য দেশের সুপ্রিমকোর্ট কি ভাবতে পারেন, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিতে বিচারকেরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দুজন কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। আমি তো বলব, এটা সমগ্র বিশ্বের বিচার বিভাগের জন্য একটি লজ্জা। সুতরাং যদি কোনো উদাহরণ দিতে হয়, তাহলে পাকিস্তানের নাম নিতে হবে কেন? পাকিস্তানের মানবাধিকারনেত্রী আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন, পাকিস্তানের দুটি জায়গার বিচার হয় নাÑ একটি সেনাবাহিনী, অন্যটি সুপ্রিমকোর্ট। অথচ পাকিস্তানের কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আজ পর্যন্ত তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেন নি।
প্রথম আলো : কিন্তু এটাও সত্য, আদালত রেফারেন্সের ভিত্তিতেই চলে। যেমন পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে বিচারপতি খায়রুল হক শতাধিকবার পাকিস্তান শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
তোফায়েল আহমেদ : সেটা কোনো উপযুক্ত প্রসঙ্গে হতে পারে। যেমন আমরা বলি, শুধু পাকিস্তানেই সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল রয়েছে।
প্রথম আলো : শুধুই পাকিস্তানে, তা নয়। আরও অনেক দেশে রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ : তা রয়েছে। কিন্তু বড় দেশে নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কোনো বড় দেশেই সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল নেই।
প্রথম আলো : আমরা তর্কটা একটা ত্রুটিপূর্ণ জায়গা থেকে করছি। কারণ, অপসারণ প্রক্রিয়ার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্ত কীভাবে হবে? ভারতেও সংসদীয় ভোটাভুটিতে অপসারণ প্রস্তাবের ভাগ্য চূড়ান্ত হলেও যে তদন্ত হয়, তার তিন সদস্যের কমিটির দুজনই সুপ্রিমকোর্টে কমরত বিচারক।
তোফায়েল আহমেদ : সে রকমের একটা জায়গায় তো আমরা যেতে পারতাম। কিন্তু আমরা তো সে সুযোগ পেলাম না। তদন্ত কমিটির একটা খসড়া তৈরির মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা হলো। তদন্তের আইন না হওয়ার কারণে ষোড়শ সংশোধনী তো পূর্ণতাই পায়নি। সুতরাং যে শিশুটি এক অর্থে মাতৃজঠরে রয়ে গেছে, সে পৃথিবীতে এসে ভালো কি মন্দ করবে, তার একটা বিচার হয়ে গেল। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের কাজটা কী? তার একমাত্র কাজ কিন্তু তদন্ত করা। অপসারণ করার এখতিয়ার সংবিধান তাদের দেয়নি, এটা নির্বাহী বিভাগের হাতেই তাদের রাখতে হলো।
প্রথম আলো : প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ব্যতিরেকে তারা কারও আচরণ তদন্ত করতেও স্বাধীন নন, আবার সেখানে সংসদের একজন সদস্যের (প্রধানমন্ত্রী) সিদ্ধান্তকে তারা আস্থায় নিলেন, আর ৩০০ জনের ওপর অনাস্থা ব্যক্ত করলেন। তারা বললেন, এতেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত থাকবে। আপনি কীভাবে দেখছেন?
তোফায়েল আহমেদ : আপনি একটি সুন্দর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর আছে। এখন সংরক্ষিত আসন নিয়ে ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। যদিও মহিলা আসন সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য রয়েছে।
প্রথম আলো : এখানেও একটা মিসকোট দেখি, রায়ে আছে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা বিচারক অপসারণের প্রক্রিয়ায় ভোট দেন না। অথচ বলা হচ্ছে, নারীদের অবজ্ঞা করা হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ : আসলে এটি একটি ব্যবস্থার অংশ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও কিন্তু পরোক্ষ ভোটে মহিলা এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন আপনি যদি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে মান কিংবা যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্ন তোলেন, তা হলে কিন্তু আমরাও ভিন্ন যুক্তি দিতে পারি। তারা একটি উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত ৩০০ সদস্যের দ্বারা নির্বাচিত। আমাদের বিচারকেরা রাষ্ট্রপতির দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত। জাপানের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে প্রধান বিচারপতির নির্বাচন এখন বাংলাদেশে চালু করা যায় কি না, তা মনে হচ্ছে ভাবনার বিষয়। এখন মূল বিষয় হলো, একজন প্রধান বিচারপতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়। এখন তিনি আবার ১১৬ অনুচ্ছেদের দিকেও নজর দিচ্ছেন।
প্রথম আলো : এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থানে একটি ভয়ানক অসংগতি রয়েছে। বিচারক অপসারণ-সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে আপনারা মূল সংবিধানে ফিরতে চেয়েছেন। আবার প্রধান বিচারপতি যখন ১১৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে মূল সংবিধানে ফিরতে চাইছেন, তখন আপনারা এর বিরোধিতা করছেন। এটা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পরিহাস কি না?
তোফায়েল আহমেদ : প্রধান বিচারপতি যেভাবে সংসদকে ছোট করতে চেয়েছেন, তাকে অপরিপক্ব ও অকার্যকর হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, সেটা তো জনমনে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ ক্ষমতার মালিক, সেই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি আমরা। সুতরাং আপনি যা-ই বলুন, সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা বিশ্বের প্রায় সব উন্নত গণতন্ত্রে দেখা যায়।
প্রথম আলো : শ্রীলংকায় প্রধান বিচারপতিকে অপসারণ বিশ্বে নিন্দা কুড়িয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ : তা হোক। আবার আমরা তো এটাও দেখি, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল কোথায় আছে, তার সপক্ষে যুক্তি খাড়া করতে লেসেথোর মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের উদাহরণ দেওয়া হয়। যেসব দেশের জনসংখ্যা ২-১ লাখ। সেসব দেশের উদাহরণ হাজির করতেও আপনাদের বাধে না। আবার শ্রীলংকার কথা বললে তার গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এটা তো একটা স্ববিরোধিতা। আমি প্রধান বিচারপতির প্রতি বিনয়ের সঙ্গে একটা কথা বলব, সুপ্রিমকোর্টের একজন সাবেক বিচারক সম্পর্কে তিনি কী করে চিঠি দিলেন যে দুদক তার দুর্নীতির প্রমাণ পেলে তিনি যে রায় দিয়ে গেছেন, সেই রায়গুলো বিতর্কিত হবে।
প্রথম আলো : একটা যুক্তি হয়তো এই হতে পারে, আলোচ্য বিচারকের ক্ষেত্রে ওই চিঠি অগ্রহণযোগ্য হলেও ভবিষ্যতে নির্বাহী বিভাগ কোনো স্বাধীন বিচারকের রায়ে ক্ষুব্ধ হওয়ার বশবর্তী হয়ে অবসরকালীন জীবনে হয়রানি করতে পারেন।
তোফায়েল আহমেদ : না, এর সঙ্গে আমি একমত নই। দুদক একজন কর্মরত মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারে। পাকিস্তানেও তো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। তাহলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত না করা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
প্রথম আলো : কিন্তু তিন-চার মাস পর সুপ্রিমকোর্ট তার অবস্থান বদলেছেন। দুদক যে তথ্য চেয়েছে, সেটা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং পুনর্বিবেচনার বিষয়টি আপনাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে।
তোফায়েল আহমেদ : সেটা আমার জানা নেই। তবে সেই চিঠি দেওয়া ভুল হলে তা কি প্রত্যাহার করা হয়েছে? আমি সেই চিঠির ভিত্তিতেই মন্তব্য করছি। এ কথার যুক্তি কী যে দুর্নীতির তদন্ত হলে তার রায় বিতর্কিত হবে? তাহলে কোনো কর্মরত বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে না? আর উঠলে, আর তদন্ত হলেই কি তার দেওয়া রায়গুলো বিতর্কিত হবে? তার মানেটা দাঁড়াল, বিচারক হলেই হলো, তিনি কর্মরত থাকুন আর অবসরে যান, তাদের কোনো বিচার হতে পারবে না। আপনি যে তদন্তের কথা বলছিলেন, আমরা সেখানে প্রধান বিচারপতিকে রেখেও তদন্ত কমিটি করতে পারতাম।
প্রথম আলো : কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হকের করে দেওয়া একটা খসড়া আপনারা আদালতে দিয়েছেন। সেখানে ছিল, প্রাথমিক তদন্ত কমিটির ১০ জনই সাংসদ থাকবেন। সেটা আদালতকে উদ্বিগ্ন করেছে।
তোফায়েল আহমেদ : কিন্তু তা চূড়ান্ত কিছু ছিল না। খসড়া ছিল মাত্র।
প্রথম আলো : সংসদের আসন্ন অধিবেশনে আমরা এ বিষয়ে ঝড় আশঙ্কা করছি। কিন্তু কোনো গঠনমূলক সাংবিধানিক সংস্কারের দিকে আপনারা যাবেন, তা ধারণা করা যায় না।
তোফায়েল আহমেদ : মূল সংক্ষিপ্ত রায়ের পর আমি নিজেই সংসদে বক্তৃতা দিয়েছি, তখন গঠনমূলকভাবে আলোচনা করেছি, এবারও তা-ই হবে।
প্রথম আলো : সংবিধান ও কার্যপ্রণালিবিধিতে বিচারকদের আচরণ নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ : আমরা সেখানে গঠনমূলক আলোচনা করব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, ১০ জন অ্যামিকাস কিউরি বা আদালতের বন্ধু হলেন, তারা কারা? টিএইচ খান জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী ছিলেন। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ভিন্ন দলে গিয়ে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছেন। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর একজন সমালোচক।
প্রথম আলো : কিন্তু ড. কামাল হোসেন স্বেচ্ছায় আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন নি, বাধ্য হয়েছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ : তিনি স্বেচ্ছায় দল ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে গণফোরাম গঠন করেছিলেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা বলে দাবি করেন। কিন্তু ৯৬ অনুচ্ছেদের বিরোধিতা করেন। এসব আমাদের ব্যথিত করে। রোকনউদ্দিন মাহমুদ হাইকোর্টে বলেছেন এক কথা, সুপ্রিমকোর্টে আরেক কথা। এজে মোহাম্মদ আলী বিএনপির অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তার সেই দুঃসহ দৌড় গোটা জাতি ভুলতে পারেনি। আমরা যখন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের অবৈধভাবে প্রধান উপদেষ্টা হওয়াকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, তখন তিনি দৌড়ে গিয়ে প্রধান বিচারপতিকে দিয়ে বিচার স্তব্ধ করিয়েছিলেন। হাসান আরিফ বিএনপির অ্যাটর্নি জেনারেল, ওয়ান-ইলেভেনে উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা বিএনপি ঘরানার লোক। বিএনপির সময় তিনি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। যারা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ, তারা কেউ কি আদালতের বন্ধু হতে পারলেন না? আসলে ষোড়শ সংশোধনীর বিরুদ্ধাচরণ করার চিন্তা থেকেই বন্ধু বাছাই করা হয়েছে। ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম গর্ব করে বলেন, তারা সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা। তারা কী করে বাহাত্তরের বিধানের বিরোধিতা করতে পারেন।
প্রথম আলো : শুধু প্রধান বিচারপতি নন, সব বিচারকই আলাদাভাবে ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, এই অনুচ্ছেদটির কারণেই বিচারকদের অপসারণের ভার সংসদের কাছে রাখা যায় না। কারণ, বাংলাদেশে সংসদ ও সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
তোফায়েল আহমেদ : ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। শিখতে গিয়েছিলাম। ক্ষমতাসীন দল কয়েকজন সংসদ সদস্যকে কিনেছিল। পরে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাওয়ের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিচারিক আদালতে তিনি দ-িতও হয়েছিলেন। এটা বন্ধ করতেই ৭০ অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে। এর প্রয়োগ শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনাস্থা প্রস্তাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে। এই যে এবারের বাজেট হলো, আমাদের দলীয় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা দলীয় সংসদ সদস্যরা করেন নি? বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা। তিনি মন্ত্রিসভা, সংসদ ও দলের নেতা।
প্রথম আলো : এবং তা এতটাই নিরঙ্কুশ যে সুপ্রিমকোর্টসহ সব সাংবিধানিক সংস্থার সাংবিধানিক পদধারীদের নিয়োগে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই দেন। ক্ষমতার পৃথককরণ বলতে এ রাষ্ট্রে কিছু নেই!
তোফায়েল আহমেদ : সেটা যদি হয়, তা হলে প্রধানমন্ত্রী থেকেও বেশি শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাবেন প্রধান বিচারপতি। কারণ, তিনি সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবেন। আবার এখন ১১৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা নিয়ে নিতে চাইছেন। তার মানে অধস্তন আদালতের সব বিচারকের ওপর তারই একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রথম আলো : ভুল করছেন, এটা ব্যক্তি প্রধান বিচারপতির বিষয় নয়, ক্ষমতাটা পাবেন সুপ্রিমকোর্ট। বাহাত্তরের সংবিধানে তা-ই লেখা ছিল।
তোফায়েল আহমেদ : সুপ্রিমকোর্ট লেখা হলেও বাস্তবে এবং কার্যত প্রধান বিচারপতিই এই ক্ষমতা অনুশীলন করবেন। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে সাতজন বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে প্রধান বিচারপতি ছাড়া আর কোনো বিচারকের বক্তব্য প্রতিদিন খবরের কাগজে প্রকাশ পাচ্ছে? আর কোনো বিচারক বিচারকার্য পরিচালনার সময় বিচারবহির্ভূত প্রসঙ্গে অহরহ মন্তব্য করেন? আর কে প্রম্পট করেন? একমাত্র প্রধান বিচারপতি। আপনি প্রধানমন্ত্রীকে দেখালেন? ১১৬ অনুচ্ছেদ তার হাতে গেলে তিনি হবেন নাথিং বাট আ গড। অন্য বিচারকেরা কেউ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু এ রকম হস্তক্ষেপ করেন না। যদি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তা হলে তার বিচার করবে কে?
প্রথম আলো : তখন তিনি কাউন্সিলে বসবেন না।
তোফায়েল আহমেদ : তাকে বাদ দিয়ে যে তিনজন বসবেন, তারা কি প্রধান বিচারপতির বিচার করতে পারবেন? তারা কি তার বিরুদ্ধে অপসারণের সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন? তারা কি প্রধান বিচারপতির দুর্নীতির তদন্ত করতে পারবেন? বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা যেটা দেখছি, প্রধান বিচারপতি যদি কোনো একটি বিষয়ে নির্দেশনা দেন, তখন তার ফল কী দাঁড়াবে? বিচার বিভাগ নিয়ে অহেতুক সমালোচনার লোক আমি নই। গণপরিষদে আমারও দস্তখত রয়েছে। বয়সের হিসাবে অনেক বিচারকই তখন স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এখন যে রাষ্ট্রপতি আমাদের দ্বারা নির্বাচিত, তার দ্বারা যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত, এখন তাদের কাছে আমরা হলাম অপরিপক্ব। আর তারা হলেন পরিপক্ব। এসব আমাদের ব্যথা দেয়। কষ্ট দেয়।
প্রথম আলো : কিন্তু রায়ে সংসদ সদস্যদের নয়, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অপরিপক্ব বলা হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ : আরে, এটাই তো অত্যন্ত খারাপ কথা। বিশ্বের যেখানেই এই ব্যবস্থা আছে, তাদের সংসদগুলো পরিপক্ব, এই মানদ-ের ভিত্তি কী?
প্রথম আলো : কিন্তু প্রধান বিচারপতি নিজেদের একটা সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, বিচার বিভাগ অপেক্ষাকৃত উত্তম। পানির ওপরে নাক উঁচু করে রেখেছেন।
তোফায়েল আহমেদ : এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, দেশটি একটি অকার্যকর দেশ। নির্বাহী বিভাগ ব্যর্থ। সংসদ ব্যর্থ। সুপ্রিমকোর্ট ডুবুডুবু অবস্থায় মাথা উঁচু করে আছে। আর এটা সর্বোচ্চ আদালত কখন উচ্চারণ করেছেন? যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন উচ্চতায় উঠেছে, যা আমরা আগে কখনও দেখিনি। আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্বের সব জায়ান্ট অর্থনৈতিক গুরু স্বীকার করছেন। তেমন একটি অবস্থায় প্রধান বিচারপতি কী করে এমন পর্যবেক্ষণ দিতে পারেন? তারা বলছেন, সংসদের কাছে অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হলে তা হবে আত্মঘাতী। কারণ, সংসদ যথেষ্ট পরিপক্ব নয়।
প্রথম আলো : অর্থনীতির উন্নতি আর রাজনীতির উন্নতি এক নয়। আপনার কেন মনে হয়, আমাদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট পরিপক্বতা অর্জন করেছে?
তোফায়েল আহমেদ : আমরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এখানে আমরা সবাই পোড়-খাওয়া সাংসদ নই। অনেক নবীন আছেন। আমি নিজেও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আমি দাবি করি না। আমি প্রতিনিয়ত শেখার চেষ্টা করছি। আপনি কি এই দাবি করবেন যে যারা সুপ্রিমকোর্টের বিচারকের আসনে রয়েছেন, তারা সবাই পরিপক্ব? যারা সুপ্রিমকোর্টে বিচারক হিসেবে নিয়োগলাভ করেছেন, তারা আমাদের একেবারে অপরিচিত নন। রাজনীতির বিষয় এখানে টানা ঠিক নয়। তদুপরি আমরা তা উপেক্ষাও করতে পারি না। বিএনপির সময় ৯ জন বিচারক প্রধান বিচারপতির সুপারিশ সত্ত্বেও নিয়োগ পাননি। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী তাদের একজন। আবার প্রধান বিচারপতি সৌভাগ্যবান। বিএনপি তাকে স্থায়ী বিচারক পদে নিয়োগ দিয়েছিল। জেনারেল এরশাদের আমলে বয়স কমিয়ে প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনকে অপসারণ করা হয়েছিল। আবার বয়স বাড়িয়ে বিচারপতি কেএম হাসানকে বিএনপি প্রধান উপদেষ্টা পদে যোগ্য করে তুলেছিল।
প্রথম আলো : এখন আপনারা প্রধান বিচারপতিকে অপসারণে চাপ সৃষ্টি করছেন?
তোফায়েল আহমেদ : না, আমরা কোনো চাপ প্রয়োগ করতে যাব না। খেয়াল করবেন, আমরা কিন্তু রায় নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছি না। আমরা কথা বলছি তার পর্যবেক্ষণ নিয়ে। যে পর্যবেক্ষণ অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত ও অযাচিত, যা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা দিয়ে যে কত খারাপ হয়েছে এবং বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অপসারণ ব্যবস্থা সংসদের কাছে রাখা যাবে না ভালো কথা, আপনারা নিয়ে নেবেন। কিন্তু এত কথা কেন? আমি শুধু এটুকুই বলব, কেউ যাতে মিসকোটের সুযোগ না পায়, সে জন্য প্রধান বিচারপতির উচিত সতর্ক হওয়া।
প্রথম আলো : পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ সংশোধনীতেও অনেক পর্যবেক্ষণ ছিল। কিন্তু তা আপনাদের খুশি ও বিএনপিকে অখুশি করেছিল। আপনারা রায় মেনে সংবিধান ছাপিয়েছিলেন। আর এখন কত ওজর-আপত্তি।
তোফায়েল আহমেদ : কিন্তু আমরা আমাদের খুশি হওয়া প্রকাশ করিনি। আমরা বিএনপির মতো আনন্দ উৎসব করিনি। মিষ্টি বিতরণ করিনি। এই রায়ের পর মিষ্টি খাওয়া থেকে শুরু করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। আমরা পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের পর বিএনপিকে নিষিদ্ধ করার দাবি করিনি।
প্রথম আলো : জিয়াকে নোংরা রাজনীতির ধারক-বাহক বলার পরও বিএনপির কথিত মিষ্টি খাওয়াকে আপনারা স্বাগত জানাতে পারতেন।
তোফায়েল আহমেদ : এটা বিএনপির অজ্ঞতা। মওদুদ আহমদসহ যারা বক্তব্য দেন, তারা অবশ্য জানেন, জিয়ার সরকার অসাংবিধানিক ছিল। মওদুদ নিজেও তার বইয়ে লিখেছেন। কিন্তু তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হলো, আমাদের যা বিরুদ্ধে গেছে, তা তাদের উৎফুল্ল করেছে।
প্রথম আলো : কিন্তু তাদের অজ্ঞতার ওপর আপনার এত আস্থা কেন? এমন তো হতে পারে, যা অবৈধ শাসন, সেটাই হয়তো সত্য।
তোফায়েল আহমেদ : আমার মনে হয়, তারা যখন রায়কে ঐতিহাসিক বলেছিল, তখন তারা রায়টি পড়েনি। ইদানীং দেখবেন, বিএনপির উৎসাহে ভাটির টান লেগেছে। উঁচু গলা নিচু গলায় পরিণত হচ্ছে। আপনিই তো খন্দকার মাহবুবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর তিনি বলেছেন, রায়ে একদিকে জিয়াকে অবৈধ শাসক বলা, অন্যদিকে তার আমদানি করা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল রেখে দেওয়ার মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে।
প্রথম আলো : মন্ত্রিসভার কোনো কোনো সদস্যের রূঢ় ও আদালত অবমাননাকর মন্তব্য প্রমাণ দিচ্ছে যে অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে থাকা নিরাপদ নয়।
তোফায়েল আহমেদ : যে যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তাদের নিজস্ব। তবে আমি মনে করি, আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন। বিচার বিভাগের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। তাদের রায় নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করিনি। প্রধানমন্ত্রীও সুপ্রিমকোর্টের যে মূল রায়, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি। যেদিন বিষয়টি মন্ত্রিসভায় আলোচিত হয়েছিল, সেদিন আমাদের প্রধানমন্ত্রী রায়ের বিষয়ে একটি মন্তব্যও করেন নি।
প্রথম আলো : কিন্তু ২১ আগস্টের আলোচনা সভায় তিনি কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন।
তোফায়েল আহমেদ : না, আপনি ভুল করছেন। রায় নিয়ে নয়, পাকিস্তান প্রসঙ্গে বিচারকার্যের বাইরে প্রধান বিচারপতি ব্যক্তিগতভাবে যে মন্তব্য করেছেন, তিনি তার উত্তর দিয়েছেন এবং সেটা তিনি সঠিকভাবে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদেরও বলেছেন, রায় ভালোভাবে পড়তে। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মুনিরের একটি বই হলো জিন্নাহ টু জিয়া। জিয়া মানে জিয়াউল হক। সেই বইয়ে তিনি সামরিক শাসনকে বৈধ শাসন বলেছিলেন। ডকট্রিন অব নেসেসিটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। সেই পাকিস্তানের সঙ্গে আপনি তুলনা করেন কীভাবে। এটাই তো আমাদের দুঃখ। এই দুঃখ ও আক্ষেপের একটা প্রতিফলন সেদিন তার বক্তৃতায় ঘটেছে।
প্রথম আলো : কিন্তু সমালোচকদের মতে, সেখানে পরিমিতিবোধের বিরাট ঘাটতি ছিল।
তোফায়েল আহমেদ : না, আমি তা মনে করি না। তিনি যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল বক্তব্য রেখেছেন। আমরা পাশে থেকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বক্তৃতা শুনেছি। তিনি দেশের মানুষের কথা বলেছেন।
প্রথম আলো : সংসদে আলোচনার রূপরেখাটা কী হতে পারে, বিকল্প কোনো সংস্কারের দিক নিয়ে আলোচনা?
তোফায়েল আহমেদ : দেখুন, রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ নিয়ে তো আলোচনা হবেই। সর্বোচ্চ আদালত যখনই কোনো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রায় লিখেন, তখন একটি সমাজের সংবেদনশীলতা ও বাস্তবতা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রতীয়মান হয় যে এই বেঞ্চের অন্য বিচারকেরা তার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ বিষয়ে একেবারেই নিস্পৃহ ছিলেন। কারণ, ‘আমি’ ও ‘আমরা’র মতো কিছু বিষয় রয়েছে, যা শুধু প্রধান বিচারপতিই লিখেছেন। আমি তো বলব, ‘আমিত্ব’-এর যে সমালোচনা তিনি করেছেন, সেই ‘আমিত্ব’-এর বহিঃপ্রকাশ তার নিজের দেওয়া পর্যবেক্ষণেও ঘটেছে। এই পার্লামেন্ট জিয়া ও এরশাদের পার্লামেন্ট নয়। যেখানে শাহ আজিজ ও মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এটা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সার্বভৌম পার্লামেন্ট।
প্রথম আলো : আমরা প্রমাণ দিতে পারি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক্করণে আপনারা বিশ্বাসী নন। তার প্রমাণ জিয়ার করা সর্বাধিক ফরমান বিচার বিভাগে এখনো টিকে আছে।
তোফায়েল আহমেদ : যেমন?
প্রথম আলো : ৯৯ অনুচ্ছেদ, অবসরের পর বিচারকেরা প্রজাতন্ত্রের চাকরি নিন, সেটা বাহাত্তরে ছিল না, এমনকি বঙ্গবন্ধু এতে ’৭৫ সালেও হাত দেননি। অথচ জিয়া ফরমান দিয়ে এটা করেছেন যে তারা অবসরে গিয়েও সরকারের সংশ্রবে কাজ করবেন। এভাবে জিয়া বিচারকদের প্রলুব্ধ করেন।
তোফায়েল আহমেদ : আপনার লেখা ধরেই বলি, এই ৯৯ অনুচ্ছেদে জিয়ার ফরমানের মার্জনা বর্তমান প্রধান বিচারপতিই করেছিলেন। অথচ তিনি যখন পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে আপিল বিভাগে কনিষ্ঠ বিচারক ছিলেন, তখন তিনি ৯৯ অনুচ্ছেদ মার্জনা না করতে একমত হয়েছিলেন। তাহলে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কী করে লেখা হলো, সুপ্রিমকোর্ট যাকে অসাংবিধানিক বলল, সংসদ তাকে পরে গ্রহণ করেছে। এটা শুধু তথ্যগত অসংগতি নয়, আমি তো বলব, এটা রায়ের সমন্বয়হীনতারও সাক্ষ্য বহন করছে। এখন আপনিই বলুন, সংসদকে অহেতুক দায়ী করার এ রকম বিষয় যা রায়ে আছে, তা কেন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এক্সপাঞ্জ হবে না? না হলেই বরং বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে।
প্রথম আলো : অন্য বিচারকও ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাই সংসদের প্রতি আস্থাহীনতা শুধু প্রধান বিচারপতি দেখিয়েছেন, তা সত্য নয়।
তোফায়েল আহমেদ : এটা একটা অবাস্তব কথা। ৭০ অনুচ্ছেদ যদি না-ও থাকে, আর দল যদি একটা সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে কে যাবে দলের বিরুদ্ধে? বাহাত্তরে আলাপ করেই ড. কামাল ৭০ ও ৯৬ অনুচ্ছেদ রেখেছিলেন। এখন তারা আদালতের বন্ধু হয়ে গেছেন। আমরা স্ববিরোধিতায় ভুগি না।
প্রথম আলো : অবশ্যই আপনারা স্ববিরোধিতায় ভোগেন, উদাহরণ দিই। ২০১৩ সালের আদালত অবমাননা আইন পুরোটা বাতিল হলো, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ চাইলেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তা করলেন না। অথচ আপনারা নীরব থাকলেন। এখন আপনাদের শ্রেণিস্বার্থে লেগেছে বলেই কি উচ্চকিত?
তোফায়েল আহমেদ : না, এটা মোটেই ঠিক নয়। বাংলাদেশে বাক্স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার স্বাধীনতাও আছে। তাই এগুলো মোটেই সঠিক কথা নয়।
প্রথম আলো : দায়িত্বশীলরা অনেক অযথাযথ ও অসংসদীয় কথা বলেন। এর প্রাধান্য দেখতে পান না? তা প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সাংসদদের বিচলিত করে কি?
তোফায়েল আহমেদ : না, প্রাধান্য নয়। আমরা শক্ত ভাষায় কথা বলি কিন্তু তা সংসদীয়। বিএনপি সংসদে থাকতে মহিলা এমপিরা যা ইচ্ছা তা-ই বলতেন। আপনার এই অযাচিত প্রশ্নের কোনো মানে হয় না। কারণ, সবার কথা একরকম নয়। কথা বলার একেক রকম একটি ভঙ্গিমা ও আর্ট আছে।
প্রথম আলো : আচ্ছা, ২০১১ সালে কেন আপনারা ১৫০ অনুচ্ছেদে এটা পাস করলেন যে নি¤œ আদালত পাকিস্তানি কায়দায় চলবে?
তোফায়েল আহমেদ : এই প্রশ্নের উত্তর আইনমন্ত্রী ভালো দিতে পারবেন। তবে আমরা ১৫০ অনুচ্ছেদে নি¤œ আদালত বিষয়ে যেটা বলেছি সেটা হলো, সংবিধান প্রণয়নের আগের মতো চলা। পাকিস্তানি কায়দায় নয়। আর আমরাই তো পৃথক্করণের পথে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি। পৃথক্করণের বিল আমরাই পাস করেছি। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনামতে প্রথমবারের মতো সুপ্রিমকোর্টকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রথম সরকারের আমলেই দিয়েছিলেন।
প্রথম আলো : অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাহাত্তরে ফিরিয়ে নিতে সুপ্রিমকোর্টের অন্তত ছয়জন প্রধান বিচারপতি অভিন্ন মত দিয়েছেন। আপনি কী বলবেন?
তোফায়েল আহমেদ : আমি মনে করি, এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেল যথাযথ অভিমত দেওয়ার জন্য উপযুক্ত। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল তাদের হাতে গেছে, এখন যদি এই ক্ষমতাও সম্পূর্ণরূপে বিচার বিভাগের কাছে চলে যায়, তা হলে সেটা জাতীয় প্রশাসনে একটা ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রথম আলো : কিন্তু এটা অবিশ্বাস্য যে স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর লিখবেন, আমরা পাকিস্তানের মতো চলব। নি¤œ আদালতের ৪টি অনুচ্ছেদকে অকার্যকর করে বলবেন, যথাশিগগির বাস্তবায়ন করবেন।
তোফায়েল আহমেদ : এটা পাকিস্তানের সঙ্গে মেলাবেন না।
প্রথম আলো : কিন্তু কথাটার মানে তা-ই দাঁড়ায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলবেন, আপনারা গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দাবি করবেন, তা হলে সংবিধানের আগে কেন ফিরব?
তোফায়েল আহমেদ : এভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে মেলাবেন না। আমাদের সংবিধান আসার আগে যেখানে ছিলাম, আমরা সেখানে ফিরতে চেয়েছি। পাকিস্তানে পুলিশ বাহিনী আছে। আমাদের দেশেও পুলিশ আছে। তাদের ভালো-মন্দ যদি মিলিয়ে দেখেন, সেটা ভিন্ন কথা। এর সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো মিল নেই।
প্রথম আলো : ভারতসহ সব উন্নত গণতন্ত্রে অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা শতভাগ সুপ্রিমকোর্টের কাছে ন্যস্ত। যে যুক্তিতে মূল ৯৬ অনুচ্ছেদে থাকা সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা স্বীকার করেন, সেই যুক্তি থাকতেও মূল ১১৬ অনুচ্ছেদমতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাতিলের যুক্তি অস্বীকার করেন। বড় পরিহাস, তাই না?
তোফায়েল আহমেদ : আমরা অস্বীকার করি না।
প্রথম আলো : আপনারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাতিল চান না। এখানে বাহাত্তরে ফিরতে চান না।
তোফায়েল আহমেদ : কতগুলো জায়গা আছে, যেখানে আমরা বাহাত্তরে ফিরতে পারি না। যেমন বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম।
প্রথম আলো : এসব বিষয়ে বিএনপির বিরোধিতার রাজনীতিটা না হয় বুঝলাম কিন্তু অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে কেন আমরা বাহাত্তরে ফিরব না?
তোফায়েল আহমেদ : জাতির পিতা মূল ৩৮ অনুচ্ছেদে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। আপনি আমাদের দুষছেন, সুপ্রিমকোর্ট এত বড় বড় রায় দিলেন, এখানে নীরব থাকলেন।
প্রথম আলো : সেটা রাষ্ট্রধর্মের বিষয়ে বলতে পারেন। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতিসংক্রান্ত মূল ৩৮ অনুচ্ছেদ তারা মার্জনা করেন নি। আমরা তাই লিখেছি, রায়ের ফলে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আপনারাই ২০১১ সালে রায় অনুসরণ না করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি রাখলেন, মূল ৩৮ অনুচ্ছেদ কর্তন করলেন। জামায়াতকে জীবন দিলেন।
তোফায়েল আহমেদ : আমরা রাষ্ট্রীয় মূল চার নীতি ফিরিয়ে এনেছি। জিয়াউর রহমান এটা বাতিল করেছিলেন।
প্রথম আলো : সেটা একটা অগ্রগতি। কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ও সেক্যুলারিজম একসঙ্গে যায় কি?
তোফায়েল আহমেদ : সংবিধানে যা-ই থাক, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
প্রথম আলো : প্রধান বিচারপতি ছাড়া রায়দানকারী অন্তত চারজন বিচারক চতুর্থ সংশোধনীকে (একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা) মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলেছেন। কী বলবেন? ঐতিহাসিক ভুল?
তোফায়েল আহমেদ : না, মোটেই না। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতির পিতা জাতীয় ঐক্য গড়তে একটি ভিন্নতর রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আজ যে উচ্চতায় দেশকে নিয়েছেন, তেমন স্বপ্নই তিনি দেখেছিলেন। তার সঙ্গে অন্য কোনো সিস্টেম তুলনীয় নয়। এই কারণে তাকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়নি। আপনার লেখাতেই আছে, খুনি ফারুককে বাহাত্তর-তিয়াত্তরে মার্কিন দূতাবাসে দেখা যায়।
প্রথম আলো : বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আপনাদের কী কথা হলো?
তোফায়েল আহমেদ : আমরা সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছিলাম। ছাত্রজীবন থেকে রাষ্ট্রপতি আমার অতি আপন লোক। আমির হোসেন আমুর সঙ্গেও সেভাবে তার সখ্য। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর একত্রে কারা নির্যাতন সয়েছি। সেখানে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে…।
প্রথম আলো : প্রধান বিচারপতি প্রসঙ্গও ছিল নিশ্চয়।
তোফায়েল আহমেদ : কোনো একটি সমস্যা কেউ সৃষ্টি করতে চায় না। সামনে নির্বাচন। আমরা একটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে চাই। প্রধান বিচারপতির যেসব পর্যবেক্ষণ অপ্রয়োজনীয়, আইনমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সে মতে যদি বাদ পড়ে, তাহলে তো আর সমস্যা থাকে না। আইনমন্ত্রী নিজেও একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ, তিনি এ বিষয়ে আমাদের মুখপাত্র। তিনি যেভাবে বলছেন, সেভাবেই আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত। আপনি জানবেন, প্রধান বিচারপতি এফকে মুনিমের কোর্ট বয়কট হয়েছিল। আমরা সেই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা চাই না। আমি মনে করি, যিনি প্রধান বিচারপতি, তারও অবসরের সময় এসে গেছে। আশা করব তিনি সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেবেন। সংসদে যখন কোনো অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার ঘটে, তখন স্পিকার তা এক্সপাঞ্জ করেন। আপিল বিভাগের রুলসেও আছে, তা ছাড়া বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী ও বিচারপতি এমএ মতিনও বলেছেন, সুতরাং বিষয়টি সেই পথেই যাওয়া উচিত। তাদের কেউ এটাও স্বীকার করেছেন যে কিছু বিষয়ের কোনো দরকার ছিল না।
প্রথম আলো : ৯৭ অনুচ্ছেদ নিয়ে কোনো চিন্তা? সত্যি কি না?
তোফায়েল আহমেদ : কেউ যদি এক্সট্রিম কিছু করতে চান বা কারও বিরুদ্ধে যদি তেমন কোনো বিষয় থাকে, যেটা ৯৭-এ পরিষ্কার লেখা আছে, যদি কেউ অসুস্থ হন, (তিনি ৯৭ অনুচ্ছেদ পড়ে শোনান)।
প্রথম আলো : বাহাত্তরে এটা আমরা ভারতের ১২৬ অনুচ্ছেদ থেকে এনেছি। তবে কর্মে প্রবীণতমকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করার কথাটি ভারতে নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু সেটা যুক্ত করেছিলেন। এখন শুনছি সেটা ছেঁটে ফেলা হবে। বিলের খসড়া তৈরির বিশ্বাসযোগ্য খবর পাচ্ছি।
তোফায়েল আহমেদ : কেউ ইচ্ছা করলেই তা হয় না। এ রকম কোনো চিন্তাভাবনা নেই। প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিমকোর্টের যারা বিচারক রয়েছেন, সবার প্রতি আমরা সম্মান প্রদর্শন করি। আমি এভাবে দেখি, আমার কাজে কোনো ভুল হলে তা শোধরাতে ক্ষতি কী। তাই যেটুকু অপ্রাসঙ্গিক, সেগুলো বাদ দেওয়া উচিত বলে মনে করি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ : ধন্যবাদ।

Category:

রিফিউজি থেকে নায়ক রাজ রাজ্জাক

55মাসুদ পথিক: উত্তম কুমার ছিল তার আদর্শ। উত্তম কুমার তখন জীবিত ও খ্যাতির চূড়ায়। তো উত্তম ভক্ত। সিনেমা যষপ্রার্থী আবদুর রাজ্জাকের মুম্বাই যাওয়ার কথা। তা না গিয়ে তিনি এলেন শরণার্থী হয়ে ঢাকায়। ঢাকা তখন একটি প্রাদেশিক রাজধানী। সিনেমা বলতে তখন তেমন প্রসার হয়নি ঢাকা ইন্ডাস্ট্রির। হাঁটিহাঁটি পা পা করছে কেবল। এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় এসে ক্যারিয়ার গড়লেন তিনি। মূলত, এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়াই তার লক্ষ্য ছিল। তুখোড় এন্ট্রারপ্রেনিউর ছাড়া এমন ঝুঁকি নেওয়া খুবই কঠিন। রাজ্জাক তা নিলেন, জয় করলেন। হলেন রিফিউজি থেকে নায়ক রাজ রাজ্জাক।
আবদুর রাজ্জাক (২৩ জানুয়ারি ১৯৪২-২১ আগস্ট ২০১৭) ছিলেন একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশি চলচ্চিত্র অভিনেতা, যিনি নায়ক রাজ রাজ্জাক নামে সুপরিচিত। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালী’র সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে নায়ক রাজ উপাধি দিয়েছিলেন।
১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজ্জাক পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার টালিগঞ্জে (নাকতলা, দক্ষিণ কলকাতা, ভারত) জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বরসতী পূজা চলাকালীন মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য তার গেম টিচার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে বেছে নেন নায়ক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় চরিত্রে। শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয় দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা। ১৯৬৪ সালে ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়ে তিনি শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আসেন।
প্রথম দিকে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেন। পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি আবদুল জব্বার খানের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান।
১৯৬৬ সালে ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগড় লেন’ চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। তিনি জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে এবং সত্তরের দশকেও তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অভিনয় জীবনে তিনি বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা এবং বড় ভালো লোক ছিল-সহ মোট ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
গত ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। রাজ্জাকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলা চলচ্চিত্রের একটি সোনালি অধ্যায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে যাদের হাত ধরে এ দেশে চলচ্চিত্র দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল এক নাম রাজ্জাক। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের হৃদয়। যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র বেঁচে থাকবে ততদিন নায়ক রাজ আমাদের অন্তরে চিরসবুজের মতো বেঁচে থাকবেন।

Category:

শেখ হাসিনা প্রণীত ও সম্পাদিত গ্রন্থ

33

বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় তিনি এ উপ-মহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি। রাজনীতির বাইরেও তিনি একজন ভালো লেখক। উত্তরণ-এর পাঠকদের জন্য বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহের তালিকা তুলে ধরা হলোÑ

উত্তরণ ডেস্ক:

১.    ওরা টোকাই কেন? (আগামী প্রকাশনী, ১৯৮৯)
২.    বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৩)
৩.    দারিদ্র্য দূরীকরণ : কিছু ভাবনা, (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৩)
৪.    আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম (১৯৯৬)
৫.    People and Democracy (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭)
৬.    আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৮)
৭.    বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানÑ সম্পাদনা : শেখ হাসিনা ও বেবী মওদুদ (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৮)
৮.    বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন (সময় প্রকাশন, ১৯৯৯)
৯.    সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র (অনুপম প্রকাশনী, ১৯৯৯)
১০.    আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন (২০০১)
১১.    বিপন্ন গণতন্ত্র, লাঞ্ছিত মানবতা (আগামী প্রকাশনী, ২০০২)
১২.    সহেনা মানবতার অবমাননা (আগামী প্রকাশনী, ২০০৩)
১৩.    Living with Tears (আগামী প্রকাশনী, ২০০৪)
১৪.    Democracy, Poverty Elimination and Peace  (আগামী প্রকাশনী, ২০০৫)
১৫.    সাদা কালো (আগামী প্রকাশনী, ২০০৭)
১৬.    শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১ম ও ২য় খ-  (মাওলা ব্রাদার্স, ২০১০)
১৭.    সবুজ মাঠ পেরিয়ে (মওলা ব্রাদার্স, ২০১১)
১৮.    THE QUEST FOR VISION 2021 [two volumes] (মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১)
১৯.    শেখ মুজিবÑ আমার পিতা (আগামী প্রকাশনী, বইমেলা ২০১৫)
২০.    নির্বাচিত প্রবন্ধÑ শেখ হসিনা (আগামী প্রকাশনী, ২০১৭)

Category:

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের নতুন অধ্যায় রচিত

57 আরিফ সোহেল: শেষমেষ কুলিন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশেও এসেছে; অনুষ্ঠিত হয়েছে টেস্ট সিরিজও। যেখানে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে শুধুই সমতার সাতকাহন। এক সিরিজেই একদিকে বয়ে গেছে উৎসব-উদযাপনের আনন্দময় ঝরনাধারা; উল্টো পিঠে দেখেছে  হতাশার অমানিশার অন্ধকারও। ঢাকায় অসাধারণ জয়ে উদ্বেলিত বাংলাদেশ চট্টগ্রামে দেখেছে সমুদ্রসম কষ্টের পরাজয়। তারপরও বলতে দ্বিধা নেইÑ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের এক নতুন অধ্যায় রচিত করেছে বাংলাদেশ।
প্রেক্ষাপট ঢাকা টেস্ট। সাব্বির রহমান শূন্যে ভাসছেন। স্টাম্প নিয়ে বাতাসে উড়ছেন মুশফিকুর রহিম। মুষ্টিবদ্ধ হাতে সাকিবীয় স্টাইল। মাটিতে পড়ে থাকা স্মারক উইকেট তুলে নিতে ব্যস্ত কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া স্পিনার তাইজুল ইসলাম। প্রেসিডেন্ট বক্সে লাল-সবুজের পতাকা হাতে হাস্যোজ্জ্বল ক্রিকেটবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা টেস্টে এমন  অবিস্মরণীয় বিজয়ের রোমাঞ্চিত আবহ সরাসরি উপভোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, গ্যালারিতে দর্শক এবং দেশবাসী।  ৩০ আগস্ট মিরপুর শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এই ছিল শেষ বিকেলে রোমাঞ্চকর চিত্রপট।
বিজয় সিক্ত মাঠের হল্লা শেষ। শেষ ক্রিকেটীয় আনুষ্ঠানিকতাও। ঠিক সেই মুহূর্তে বিজয়ী ক্রিকেটারদের অভিনন্দিত করতে ছুটে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ¯েœহ-মমতা জড়ানো কণ্ঠে কথা বলেছেন সাকিব-তামিম-মুশফিকদের সাথে। তুলেছেন ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো ছবিও। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলা দেখতে প্রধানমন্ত্রীর মাঠে ছুটে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও তিনি সময়-সুযোগ-উপলক্ষ পেলেই মাঠে ছুটে গিয়েছেন ক্রিকেটারদের উৎসাহিত করতে; বিজয়ের আনন্দে শামিল হতে। শুধু মাঠে গিয়ে নয়; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি ম্যাচেরই খোঁজ রাখেন, জয়ী হলে দলকে অভিনন্দন জানান। প্রথম টেস্টের পর মার্কিন সংবাদমাধ্যম হাফিংটন পোস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী নারী উল্লেখ করে লিখেছেÑ ‘বিজয়ের মুহূর্তে সঠিক সময়ে মাঠে গিয়ে দলের সবাইকে উৎসাহিত করা শেখ হাসিনার পুরনো অভ্যাস।… এখন শেখ হাসিনার চেয়ে সুখী আর কেউ নন।’
58অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্ট সিরিজের প্রথম টেস্টটি ছিল সাকিব-তামিমের ৫০তম ম্যাচ। অনেকেই চেয়েছিলেন তাদের কাছে বাড়তি কিছু। সেই বাড়তি কিছুই দুজনই করে দেখিয়েছে; বাংলাদেশ পেয়েছে ঐতিহাসিক জয়। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে ২০ রানে। তামিম টেস্টের দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৭১ ও ৭৮ রান করেন তার হাফ সেঞ্চুরির টেস্ট সমৃদ্ধ করেছেন। আর সাকিব দুই ইনিংসে ১০ উইকেটের সাথে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করে অভাবিত বিজয় নিশ্চিত করেছেন। স্মিথের দুরন্ত ব্যাটিংয়ের সাথে ওয়ার্নারের সেঞ্চুরিতেও শেষ রক্ষা হয়নি অস্ট্রেলিয়ার। বাংলাদেশের তিন স্পিনার সাকিব, তাইজুল ও মিরাজ অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন ২৪৪ রানে। ২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্টে বাংলাদেশের নিশ্চিত জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ১১ বছর পর অস্ট্রেলিয়া হেরেছে ঠিক যখন তারা বিশ্ব আঙিনায় র‌্যাংকিংয়ের অন্যতম সেরা দল। স্পিনস্বর্গ হিসেবে স্বীকৃত ‘হোম অব ক্রিকেট’ খ্যাত মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গত বছর অক্টোবরে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।
এটি ছিল বাংলাদেশের ১০১তম টেস্ট ম্যাচ এবং সকল ফরম্যাট মিলিয়ে ৫০০তম ম্যাচ। সেই ম্যাচে ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্টে খেলতে নেমে সাকিব প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ইতিহাসে চতুর্থ বোলার হিসেবে ৫ উইকেট নেওয়ার মাইলফলক সৃষ্টি করেছেন। এর আগে এই গৌরবের ক্রিকেটার হলেন শ্রীলংকার অফস্পিনার মুত্তিয়া মুরলিধরন, রঙ্গনা হেরাথ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার ডেল স্টেইন।
৪-৮ সেপ্টেম্বর জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। ঢাকার মতো এখানেও ম্যাচের নিষ্পত্তি চার দিনেই। সিরিজের ট্রফির পাশে নাম খোদাই করে লেখা ‘বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া’। চট্টগ্রামেও জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে করা ৩০৫ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়ার ৩৭৭ রান; মানে ৭২ রানের লিডই এগিয়ে দিয়েছে সফরকারীদের। দ্বিতীয় ইনিংসে কিছু অযাচিত শটের সাথে নাথান লিয়নের অসাধারণ বোলিংয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন সমাধিতে পরিণত হয়েছে। ১৫৭ রানেই গুটিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। ৮৬ রানের টার্গেট টপকে যেতে অস্ট্রেলিয়াকে ৩ উইকেটের বেশি খোয়াতে হয়নি। অস্ট্রেলিয়া চট্টগ্রামে ৭ উইকেটের ব্যবধানে জিতে সিরিজে সমতায় ফিরেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এই ড্র; অনেক বড় অর্জন। সিরিজে নিরঙ্কুশ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্টে নাকাল হওয়ার পর চট্টগ্রামে উল্টো সিরিজ বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে নামতে হয়েছে।
প্রায় ১১ বছর পর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল। সফরকারীদের বার্তা ছিল ‘বাংলাদেশ’ কিন্তু দেশের মাটিতে দুর্দান্ত। মুচকি হেসে অস্ট্রেলিয়ানরাও মিডিয়ায় বাংলাদেশকে সমীহ জাগানিয়া বললেও; অন্তরে সাকিব-তামিম-মুশফিক-মিরাজদের উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু এটা যে দিবাস্বপ্ন অস্ট্রেলিয়ানের; তা বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট শুরুর পরই। সেই কারণেই সিরিজ ১-১ শেষ হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ বলেছেন, ‘আরও ক্রিকেট খেলতে চাই বাংলাদেশের সাথে। আবার খেলতে পারলে খুব ভালো হবে। ১১ বছর অনেক লম্বা সময়। ওরা যেভাবে খেলেছে, অসাধারণ। প্রথম টেস্টে হারিয়েছে, এখানেও চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। ওদের সাথে আবার খেলার সুযোগ পেলে, সেটা খুব ভালো হবে।’
জয়ে দাপটে সমুজ্জ্বল বাংলাদেশ ২০১৫ বিশ্বকাপ-পরবর্তী অধ্যায়ে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ে উদ্ভাসিত হয়েছিল। এবার আরেক পরাশক্তিকে মাটিতে নামিয়ে আনার গল্প। দুই বছরের মাথায় অস্ট্রেলীয় কৌলীন্য বাংলাদেশের স্পর্ধিত আঘাতে আজ চূর্ণ-বিচূর্ণ। এর চেয়ে দারুণ এক সিরিজ কি আর হতে পারে!

Category:

কবিতা

32

Category: