Blog Archives

কবিতা

Posted on by 0 comment

46

Category:

নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত

Posted on by 0 comment

আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?

42পাপড়ি রহমান: ফুটে-ওঠা-ভোর দেখতে দেখতে আমি রুনিদের বাড়িতে পৌঁছে যাই। অনেকদিন বাদে কোনো মফস্বলী-সকাল আমাকে রীতিমতো ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছিল। শান্ত-নীরব-সমাহিত ওই সকালের ভিতর দিয়ে আমাদের অটোরিকশা ধীরে-সুস্থে, প্রায় নিঃশব্দে চলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। থ্রি-হুইলের ওই যান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো একটানা শব্দ সরিয়ে ফেলা যায় নি। আমি সে চেষ্টাও করিনি। বরং ধোঁয়াটে-আলোর ভিতর আমি সত্যিকার অর্থেই মফস্বলী-সকাল দেখায় মগ্ন ছিলাম। আমার এই একাগ্র-মগ্নতাকে গাঢ় করে তুলেছিল রাতের বৃষ্টিপাতে সতেজ হয়ে থাকা রাস্তাগুলো। এঁকে-বেঁকে-যাওয়া পিচঢালা কালো-রাস্তা। ধুলাবালি শূন্য ভেজা-রাস্তা। চড়াই-উৎরাই কম। কোনো কোনো রাস্তার বাঁক পেরুনোর আগেই মনে হচ্ছিল যেন কোনো নদী! নিস্তরঙ্গ-কালো-নদী। যে নদীতে ঢেউ নাই। জলের কোলাহল নেই। কোনোরকম উত্তেজনা নাই। যেন-বা কালো দুধের ওপর ঘন-কালো সর পড়ে আছে। অথচ ওই কালো রাস্তার ধারে আমি সত্যিই এক নদী বয়ে যেতে দেখেছিলাম। বিস্তৃত সেই নদী। আর শ্রাবণের নদী মানেই উন্মত্ত। যৌবন লুটিয়ে দেবার বাসনায় মঞ্জুরিত। তীব্র কামুক আহ্বানে গতি হারা।
ওই যৌবন-মত্ত-নদী বইছিল পথগুলোর ধার ঘেঁষেই। তবুও আমি মতিচ্ছন্নতায় আক্রান্ত হলাম। পূর্বরাতের বৃষ্টিজলে বাসীভাবে ভিজে-থাকা রাস্তাগুলোকেই আমার নদী বলে মনে হলো। নদীটাকে রাস্তা ভেবে আমাদের অটোরিকশা যদি ওই পথে ধাবিত হতো! কিংবা চালককেও যদি আমার মতন মতিচ্ছন্নতায় পেয়ে বসত? আর সে অটোরিকশার গতি ঘুরিয়ে দিত? তা হলে বিপদ ছিল। সর্বোচ্চ বিপদ। ভাগ্যিস, সে তা করে নাই।
কেউ অন্যের মনের-ভাবনা দেখতে পায় না। পাশাপাশি বসে বা হেঁটে বা শুয়ে থেকেও কেউ অন্যের মনোজগত দেখতে পায় না। এটা আমার ওই সময়ই মনে হয়েছিল। এবং আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম। অবশ্য আমিও তাদের মনোজগত দেখতে পাচ্ছিলাম না। এক ধরনের স্বস্তি নিয়ে আমি তাকিয়েছিলাম রুনির দিকে। রুনি আমার ইশকুল-কালের বন্ধু। শুধু রুনি নয়, আমি অটোরিকশা-চালকের দিকেও তাকিয়েছিলাম। এমনকি রুনিদের বাড়ির কেয়ারটেকার মাহবুবের দিকেও।
মাহবুব বসেছে অটোচালকের পাশাপাশি। রুনির পূর্বপুরুষ জমিদার ছিল বিধায় এই বিভাজন। রাজা আর প্রজার সারি এক নয়। আমার পাশে বসে থাকা নীলরক্তধারী-রাজকন্যা-রুনিÑ তবে কি আমিও রাজা সারির?
এ প্রশ্ন হারিয়ে গিয়ে রুনির মনোজগত আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু তা দেখার কোনো উপায়ই আমার জানা ছিল না।
পেছনের সিটে আমি আর রুনি পাশাপাশি। সামনে মাহবুব আর চালক পাশাপাশি। আমাদের চারজনের মাঝে কোনো কাপড়ের পর্দা টানা নাই। চালক আর যাত্রীর বিভাজন স্টিলের গরাদ দিয়ে। যা দেখলেই চোর আর পুলিশের কথা মনে পড়ে। কে এখানে পুলিশ আর কে চোর? উত্তর যা-ই হোক আমরা এখানে কেউ কারও মন পড়তে পারছি না। অথচ চারজনের গন্তব্য একই দিকে।
মাহবুব আমাদের রিসিভ করার জন্য বাস-টার্মিনালে ছিল। পূর্বরাতের ঝড়-জলে সেও হয়তো ভিজেছিল। তাই যদি না-হবে জলের ছিটেফোঁটা কেন তার শরীরে লেগে আছে?
মাহবুব যখন বাসের পেট থেকে আমাদের লাগেজ টেনে আনে, আমি জলচিহ্ন দেখছিলাম। তার পরনের প্যান্টের পায়ের অংশটা ভেজা। পায়ের স্যান্ডেলটাও ভেজা-মলিন দেখাচ্ছিল। এসব নিশ্চয়ই বৃষ্টিপাতের বাসীজলের কারবার।
তখনও আমরা অটোতে চড়ি নাই। আর নদীর সাক্ষাৎ পাই নাই। পেলে হয়তো আমি অন্যকিছু ভাবতাম। রাস্তার বদলে মাহবুবকে না ঠিক মাহবুব নয়, মাহবুবের পায়ের পাতাগুলোকেই আমার নদী মনে হতে পারত। অথচ আমি দিব্যি দেখেছিলাম কালো-পায়ের-পাতায় টলটলে-জল!
কোনো কোনো মানুষের জল-ভেজা-পা শাপলা-ফুলের মতো দেখায়। সতেজ ও পবিত্র। সুগন্ধিযুক্ত। সব শাপলায় তেমন সুগন্ধ থাকে না। যে শাপলাফুল তারাকৃতি হয় তাতে সুগন্ধ বেশি থাকে। আর যেসব শাপলারা ভোর-ভোর ফুটে ওঠে। রোদ্দুরের সামান্য কিরণেই মেলে-রাখা পাপড়িগুলো গুটিয়ে ফেলে। অথচ ফুটন্ত অবস্থায় জলের ঢেউদের হালকা-সুবাসে আমোদিত করে রাখে। ওই ফুলের আমি মনে মনে নাম দিয়েছি তারাশাপলা। লাগেজ-টানার-সময় মাহবুবের ভেজা-পা দেখে আমার তারাশাপলার কথা মনে পড়েছিল। হতে পারে মফস্বলী-ভোরের-শ্রী আর নীরবতায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। ফলে আমার ভাবনায় ফুল-পাখি-প্রজাপতিরা উড়ে এসেছিল।
অটো এসে থামে রুনিদের বাড়ির গেটে। আমি আর রুনি নামি। মাহবুব ফের লাগেজ টানে অথবা ভাড়া মেটায়। আমাদের সামনের বদ্ধ গেট হঠাৎ খুলে যায়। আমি বুঝতে পারি না কে খুলল গেট? না-কি আগেই খোলা ছিল? আমি তখন নদী-রাস্তা-তারাশাপলার বিভ্রান্তিতে। অথবা পদযুগলের ঘাপলায়। মাহবুব তখনও অটোর ভাড়া মেটায়।
বাড়ির ভিতর পা দিয়েই আমার মনে পড়ে যায় আলিবাবা আর চল্লিশ চোর। সেই মন্ত্র চিচিং-ফাঁক। রুনি তো চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, তা হলে গেটটা খুলল কে? না-কি প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া মন্ত্রটি আমিই আওড়ে ছিলাম? কিন্তু রুনিদের বাড়িতে এই প্রথমবার এলাম আমিÑ ওদের মন্ত্র আমি কীভাবে জানব?
নদী আর জল-ভেজা-পথ, তারাশাপলার সৌরভ, বৃষ্টি¯œাত-পদযুগলের মতো ফের আমি রহস্যের ভিতর তালগোল পাকাই।
যাবতীয় বদ্ধ-দুয়ার খোলার-মন্ত্র কী একই না-কি? চিচিং ফাঁক!
গেটের ভিতরে এক টুকরো লন। তাতে বিছিয়ে থাকা সবুজ-ঘাস সাদাটে দেখায়। সকালের আলো এখনও ম্লান। সূর্যের শিশুদাঁত সবে হেসেছে। হয়তো ঘাসেদের রং বদলানো এই আলোতেই সহজ। কিন্তু আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি ঘাসের রং সাদাটে অন্য কারণে। অজস্র পাকা-জামরুল ঘাসের ওপর বিছিয়ে রয়েছে। বাঁদুরের দঙ্গল রাতভর খাওয়া-আধাখাওয়া-আস্ত জামরুল এন্তার ফেলেছে।
লন পেরিয়ে ঘরের দরোজায় যেতে যেতে আলো যেন প্রায় নিভে আসে। মেঘ করলো না-কি ফের? ভেবে আমি ওপরে তাকাই। এক বিশাল বৃক্ষপাতা ঢেলে দাঁড়িয়ে আছে। সেও ফলবতী। এই বৃক্ষ আমি চিনিÑ বিলম্বী!
জামরুল আর বিলম্বীর সাথে ঝুলে আছে কামরাঙা। ঘরের দরোজা সাদা-রঙে-ডুবানো। এবং এই দরোজাও পূর্ববৎ খুলে গেলে আমার ফের মনে পড়েÑ
চিচিং ফাঁক!
খুব অনায়াসে ঘরে প্রবেশ করি আমি। ২০০ বছরের প্রাচীন এক গৃহ। সময় ও ধূলিতে অনুজ্জ্বল-হয়ে-পড়া আসবাবে পরিপূর্ণ!
পারস্য-গালিচার ওপর আলবোলার নল হাতে বসে আছে সুন্দরী-নর্তকী। ওই সালংকারা নর্তকী যেন এক্ষুণি গেয়ে উঠবেÑ পিয়া ঘর আনা। ঝাড়বাতির আলোতে ঝলসে উঠবে তার পরনের ঘাঘরা। ঝমঝমিয়ে বেজে উঠবে পায়ের ঘুঙুর। নৃত্যের তালে-তালে খুলে যাবে নাকের কুন্দনের নথ। আর ঝরে পড়বে খোঁপার তাজাফুল। অথবা ফুলেদের পাপড়ি।

০২
তরজার বেড়ার ঘরে টিনের চৌচালা। সবই সাদা রঙে ডুবানো। সুরকি আর চুনের গুঁড়ার মিশ্রণের ওপর নিপুণভাবে প্রলেপ দেওয়া। ফলে বাইরের উত্তাপ ঘরের ভিতরে কম প্রবেশ করে। চৌচালা-চালের কড়ি-বরগা অনেক উঁচুতে উঠে টিনের আচ্ছাদন নিয়েছে। ওপর থেকে নেমে আসা ভাঁপ-তাপও উঁচুতেই ঝুলে থাকে। প্রায় মরচে-ধরা বৈদ্যুতিক পাখার হাওয়ায় ওই ভাঁপ-তাপ মেঝেতে নামাতে পারে না। মেঝের ওপর প্লাস্টিক-ম্যাট বিছানো। বিবর্ণ-রং ও ভঙ্গুর-চেহারা আড়াল করার প্রয়াস। কিংবা হতে পারে প্রাচীন-জীবনকে নতুনের সাথে একাকার করে রাখা।
মোদ্দাকথা ঘরটা বেশ প্রশস্ত ও আরামদায়ক। এবং আমার পছন্দ হয়ে গেল। বহু পুরাতন আমলের খাট, তাতে নরম বিছানা। খাটের পাশ দিয়ে পার্সিয়ান খাটপোষ পেতে রাখা।
রুনি আর আমার একই বিছানা। যদিও আমি শোওয়া-শোওয়ি শেয়ার করতে পারি না; কিন্তু রুনির বাড়িতে এসে মেনে নিলাম। এর কারণও পেয়ে গেলামÑ এক. এই বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো শোবার ঘর নাই। পেছনের ঘরগুলো কেয়ারটেকার মাহবুবের দখলে। দুই. রুনি এতটাই গুটিয়ে-শুটিয়ে ঘুমায় যে, আমার পাশে কেউ ঘুমাচ্ছে এটা বুঝা যায় না। এটা রুনির অভ্যাস না আভিজাত্য ঠিক ধরতে পারলাম না। অবশ্য অভ্যাসই কালক্রমে আভিজাত্যের অংশ হয়ে ওঠে।
খাটের পায়ের দিকে দেয়াল-ঘেঁষে ড্রেসিং-টেবিল। আর বহু পুরাতন কয়েকটা সোফা এদিক-সেদিক পেতে রাখা। সোফার গদিগুলো খটখটে। দুইটা পুরাতন স্টিলের-দেরাজ। এরাও সাদা রঙে ভরপুর।
মাহবুবের বউ তফুরার সারাক্ষণ তদারকিতে আমাদের দীর্ঘ-পথের ক্লান্তি উবে গেল। এই দম্পতির চারজন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েটার বয়স তের কি চৌদ্দ। নাম মাহি। বয়সের তুলনায় বাড়ন্ত গড়ন। আমার আর রুনির ফুটফরমায়েশের জন্য মাহি ছায়ার মতো লেগে রইল।
খাটের ওপর ঝকঝকে বিছানা। বালিশ-চাদর-বেডকভার। এত ঝাড়া-মোছা সত্ত্বেও ঘর থেকে পুরাতনী গন্ধটা বিলীন হয় নাই।
পারস্য-গালিচার ওপর স্থির বসে-থাকা নারীটির দিকে তাকিয়েও আমি তেমনই ভেবেছি। ধুলা পড়ে ওই নারীটির চেহারাও যেন ধুলাকার হয়ে গেছে। প্রাচীন-ঘর, আসবাব, কুশন-কভার, ঝালর-দেয়া-পর্দা। অথবা বেডকভার জুড়ে সময়ের-ধূলি-পড়া আবছা-গন্ধ! যা আমাকে নতুন কোনো অভিজ্ঞতার ভিতর ছুড়ে ফেলছিল। রুনি আমার মনোভাব বুঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার সম্মুখে আমি ছিলাম নির্বিকার।
আমাদের শোবার ঘরের ভিতরেই বাথরুম। বেশ বড়সড়। প্রাচীন আমলের কমোড। ¯œানের জন্য চৌকোণাকৃতি জায়গা। তাতে জল আটকানোর ব্যবস্থা। একপাশে পুরাতনী বেসিন। বেসিনের ভেতরটা গভীর। রীতিমতো কুঁজো হয়ে মুখ ধুতে হয়। মরচে-ধরা জলকল। ও থেকে কীভাবে জল বেরোয়? আমি বিস্মিত হই।
তফুরা বেশ পরিশ্রমী। বেডকভার তুলে বিছানা ভালো করে ঝেড়েমুছে দেয়। ক্লান্তিতে আমি শুয়ে পড়ি। বিছানায় শুয়ে ওপরে তাকালে দেখিÑ চালটা যে টিনের তা বুঝার উপায় নাই। সাদা-মোটা-কাগজ দিয়ে পুরো ঘরটাই আবৃত। ঘুমের ভিতর ঢুকতে-ঢুকতে আমার মনে হয়Ñ টাঙানো কোনো সাদা-তাঁবুর তলায় শান্ত-¯িœগ্ধ-বিছানায় আমরা ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। এখন রাত কত? আমি বুঝতে পারি না। ঘরের ভিতর কালো-জালের-মতো অন্ধকার ছড়িয়ে রয়েছে। নতুন জায়গা বলে আমি পূর্ব-পশ্চিমও বুঝতে পারি না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারিÑ রুনি অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ওর আপাদমস্তক কোনো কিছুতে ঢেকে রাখা। ফলে ও নারী না পুরুষ সেটিও অনুমান করার উপায় নাই।
তীব্র অন্ধকার খানিকটা চোখে সয়ে এলে আমি ফের রুনির দিকে তাকাই। ওর কোনো নড়াচড়া নাই। যেন কোনো শবদেহ পাশে শুয়ে আছে।
শবদেহ পাশে নিয়েই আমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ খুঁজি। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না। তবুও এটা খেয়াল হয় যে, কোনো বিকট শব্দেই আমার ঘুম ভেঙেছে। এবং এটা ভাবার পরক্ষণেই আমি ফের ধুমধাম আওয়াজ শুনতে পাই। কিসের শব্দ বুঝতে পারি না। কিন্তু এটা বুঝতে পারি ঘরের চাল বেয়ে শব্দ নিচে নামছে। ভয়ে আমি কানের ওপর বালিশ চেপে ধরি। কিন্তু আরও জোরে শব্দ হতে থাকে।
গহীন-অন্ধকারের ভিতর শুয়ে-শুয়ে আমি শব্দ এড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। এতকিছুর পরও রুনির ঘুম ভাঙে না। সে মৃতবৎ শুয়ে থাকে। আর আমি ভয়ের ভিতর সমর্পিত থাকি। আমার সমস্ত শরীর কুলকুল ঘামে ভিজে ওঠে। আমিও কি তবে রুনির মতো মারা যাচ্ছি?
ওই অন্ধকার রাত্রি কখন যে ভোরের দরজা খুলে দেয়Ñ আমি টের পাই না। বেশ বেলায় ঘুম ভাঙলে দেখি রুনি তখনও মরে আছে। ফের বিকট শব্দ হয়। এবং আমার অতি কাছেই। আমি তাকিয়ে দেখি এক বিড়াল।
বিড়াল আমার কাছে চিরকাল ভয়ের উৎস। ছোটকালেই আমরা জানতাম, বিড়াল শতরূপী হয়। যাকে বিড়াল মনে করছি সে আদতে অন্যকিছু। বিড়ালের বেশ ধরে এসেছে। সদ্য দেখা-পাওয়া বিড়ালের সঙ্গে আমার আই কনট্যাক্ট হয়। সে চোখ সরায় না। আমিও চোখ সরাই না। সে কি বিড়াল না বাঘ? তার গায়ে ঘিয়ে আর হলদে ডোরা। আর সে বেশ স্বাস্থ্যবান।
এই ঘরের দরোজা-জানালা সব বন্ধÑ সে ঢুকলো কীভাবে? কিন্তু সে যেমনি এসেছিল তেমনই হাওয়া হয়ে যায়। দিনের আলোতেও আমি ফের ভয় পেতে থাকি।
আমার অ্যালান পোর বিড়ালের কথা মনে পড়ে। আশ্চর্য! ভীতু মনে কত কী যে উদয় হয়। বিদেশি ওই বিড়ালের সঙ্গে বাংলাদেশি বিড়ালকে তুলনা করার কোনো মানে আছে?
বিড়ালটা কখন জানি হাওয়া হয়ে যায়। আর রুনি সামান্য নড়ে ওঠে। গ্রীষ্মকালে সামান্য হাওয়া বইলে নিমপাতা যেভাবে নড়ে ওঠেÑ সেভাবে। আচ্ছা, রুনি কি বিছানায় শোয়ামাত্রই মরে যায়? আর রোদ্দুর চড়তা হলে জীবন ফিরে পায়?
আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?
রুনি কথা বলে ওঠেÑ ‘কি রেÑ যা ঘুমাইলি রাতভর। একটুও নড়িস নাই।’
শুনে আমি অবাক হয়ে যাই।
আমি যেমন গত রাতে রুনিকে মরে যেতে দেখেছি, সেও কি আমাকে তেমনই দেখেছে?
বাথরুমে ঢুকে আমি দরজা বন্ধ করি। এতে করে রুনি ঘরের ভিতর আটকা পড়ে যায়। এ ঘরের বাসিন্দাদের কেউ বাথরুমে গেলে এভাবেই যেতে হয়। তফুরা যে দরজা দিয়ে ঢুকবে সেটাও বন্ধ রয়েছে।
পুরাতন মডেলের কমোড। পুরাতন কল। এমনকি কলের তলায় পেতে রাখা বদনাটাও বহু পুরাতন। রং-জ্বলা-নিষ্প্রভ। আমার বামপাশের দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। জুলাই মাস, ১৯৯৫। আমি চমকে উঠি। জুলাই মাস! তার মানে গত ২০ বছরে এই বাড়িতে কোনো নতুন বছর ঢুকে নাই।
এই বাড়িতে কেউ থাকে না তেমন তো নয়! মাহবুব আর তফুরা বাস করে। ওদের বাচ্চাকাচ্চা। বিদেশ থেকে রুনি আসে। ওর বোন ও ভাইও আসে। তা হলে ১৯৯৫ সাল কেন বাথরুমে ঝুলে আছে? এসব ভাবনার ভিতর আমি কল ছাড়ি। দীর্ঘকাল পর জলের সরু ধারা নামে। আয়রনের আধিক্য হেতু কফিরঙা জল। নাকি রক্ত! আমার শরীর হিম হয়ে আসে। আমি তড়িঘড়ি বদনা হাতে নিতেই ভয়ে কেঁপে উঠি। ধাতব স্পর্শের বদলে নরম ও কোমল অনুভূতিÑ একটা ডোরকাটা বিড়াল শুয়ে আছে। আর আমি তার পিঠে হাত রেখেছি!
০৩
রুনিদের প্রাচীন ঘরটার জানালা গলিয়ে দুদ্দাড় করে মেঘ ঢুকে পড়ে। ফলে ঘরের ভিতরটা ধোঁয়া-ধোঁয়া আর শীতল। বাতি-না জ্বালানো পর্যন্ত কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না। ওই মেঘকক্ষের ভিতর আমি চুপচাপ বসে থাকি। জানালার বাইরের অবিশ্রাম বৃষ্টি আমাকে অবাক করে দেয়। এই শহরে বড় অদ্ভুতভাবে জল ঝরে।
ঝরছে তো ঝরছেই। অক্লান্ত এই ঝরে পড়া। জামরুলগুলো জলে ভিজে টসটসা। পাতাগুলো জলমগ্ন। বিলম্বী গাছটাও অবিরাম ভিজছে। ভিজতে ভিজতে তার বাকল কালচে হয়ে উঠেছে। জলের ঝাপটায় ভিজে একসা কামরাঙা গাছটি। এন্তার বেগুনি-বর্ণ-ফুল ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টি-¯্রােতে। বৃষ্টির প্রবহমান জলে ফুলরাশি ভাসতে দেখে আমার নদীর কথা মনে পড়ে। ফুলনদী! আহা! জলধারা ক্ষীণ হলেও এ তো নদী-ই। ফুলনদীÑ নইলে এত ফুল এর জলে ভেসে যায় কেন?
তুমুল তুফান আর বৃষ্টি। প্রচ- ঝড়ো-হাওয়া। আসমান ভেঙে পড়ছে জলধারা। থইথই শ্রাবণে আমি গৃহবন্দি। অটোরিকশায় আসার পথে নদীতে আমি জল উথলে উঠতে দেখেছিলাম। জল-ভরন্ত নদী আমাকে বলে দিয়েছিল ভরা-শাওন। নইলে ওই নদীকে অমন সোমত্ত দেখাত না! ভরা-বর্ষার সমস্ত চিহ্নই ফুটে রয়েছে এই শহরে। মাহবুবের জল-ভেজা-পা আর পিচরাস্তার ওপর গড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টির দাগ।
রুনিদের জানলায় বসলেই আমি যেন ওই নদীটাকে দেখতে পাই। টিনের-চালে বৃষ্টির-ফোঁটা সংগীত-মুখর হয়ে ওঠে। জল-কণারা জানালার ফিনফিন পর্দায় মুক্তদানার মতো ঝুলে থাকে। মেঘ-থমথমে ঘরের ভিতর আমি হঠাৎ আরও দুটো দেরাজ দেখতে পাই। সাদা-রঙে-চুবানো। এই দুটো কেন আগে দেখিনি?
তফুরাকে জিজ্ঞেস করলে বলেÑ ‘খালাম্মা, এইহানে তো পানির পাম্প।’
ঘরের ভিতর পানির পাম্প! হতেই পারে। ২০০ বৎসর পূর্বে পানির পাম্প ঘরে রাখাই স্বাভাবিক।
ওই দিনও আমি রাতভর ঘুমাতে পারি না। বিদঘুটে শব্দরা আমাকে জাগিয়ে রাখে। হয়তো অ্যালান পোর বিড়ালেরা দলবেঁধে আসে। রুনির শবদেহ তেমনই নিঃসাড়। ভোরের দিকে তন্দ্রার ভিতর থেকে আমি হঠাৎ জেগে উঠে।
খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিলের ওপর সুরকি-চুন-বালি আর কাঠের টুকরা ধসে পড়েছে। আমি অবাক হয়ে দেখিÑ ওই সুরকি আর চুনের স্তূপের নিচে এক বিড়াল লেজ নাড়ছে। কালো আর শাদাতে ডোরাকাটা। এই বিড়ালটিকে আমি আগে দেখিনি। তফুরা ছুটে আসে। মাহবুবও। ওদের মেয়ে মাহি। ওরা ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ওদের চুপসানো মুখাবয়ব দেখি। ঘরের চাল দেখি। তাঁবুর মতো করে টানিয়ে দেয়া মোটা-কাগজটা একদিকে ঝুলে পড়েছে। হয়তো ওই পথেই সুরকি-চুন-বালি-কাঠের স্তূপ নেমেছে।
রুনিকে বিড়াল দেখার কথা বলতেই ও হা হা করে হেসে ওঠে।
‘এটা বিড়ালের কাজ। ঘরের চাল ভেঙে এই চুন-সুরকি-বিড়ালই ফেলেছে।’
বিড়াল কীভাবে অত উঁচু থেকে পড়ার পরও বেঁচে থাকে? আমার বোধগম্য হয় না। রুনিকে বলতেই সে বলেÑ
‘কি যে বলিস না! বিড়ালের হাড্ডি। ওরা সহজে মরে না।’
ওই ভাঙা-আবর্জনাতে আমি সিমেন্টের প্লাস্টারের অংশও দেখেছি। যদি ওসবই আমার বা রুনির মাথার ওপর পড়ত?
তফুরা আর মাহি ওইসব ধস ঝাঁট দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখি তফুরার পা-দুটো ভেজা-ভেজা দেখাচ্ছে। যেন সে এক্ষুণি পা ধুয়ে এসেছে।
তফুরার পদযুগলকে তারা-শাপলার মতো দেখায়। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আবছা-সুঘ্রাণ পাই।
ওই দিনের দুর্ঘটনার পর আমি রুনিদের বাড়ির সর্বত্র বিড়াল দেখি। যখন ডাইনিংয়ে খেতে বসি আমার পায়ের কাছে বিড়াল চলাফেরা করে। বাঘের মতো ডোরাকাটা বিড়াল। তফুরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলেÑ
‘কই খালাম্মাÑবিড়ালউড়াল কিচ্ছু নাই।’
শ্রাবণ-মাসের বৃষ্টি ফের ঘন হয়ে নামে। বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে আমি বিলম্বী গাছটাকেও আর দেখতে পাই না। এমনকি জামরুলের পত্র-শাখাও অস্পষ্ট দেখায়।
মেঘের বড়সড় চাঙর ঝুলে থাকে রুনিদের জানালায়। সেই ধূপছায়া রঙের ভিতর দিয়ে আমি আলোর ছিটেফোঁটাও দেখি না।
টিনের চালে ছোট-বড় নানারকম ফোঁটায় বৃষ্টির সংগীত বেজে চলে। আর মেঘের শরীরে মেঘ ঘনায়। বিজলী চমকালে আমি দেখি, রুনিদের চাল থেকে চুন-সুরকি-কাঠের টুকরা খুলে পড়ছে। চুন-সুরকির স্তূপ জমে ওঠে। আর সেখান থেকে এক বিড়াল মুখ বের করে ডেকে ওঠে!
গাছপালা-বাড়িঘর যাবতীয় কাঁপিয়ে কাছেপিঠেই কোথাও বাজ পড়ে। কিন্তু ওই বিড়াল আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, আমি অন্যদিকে মনোযোগী হই না। ফলে রুনিদের প্রাচীন ঘরটা ধসে পড়ার শব্দও আমার কানে আসে না। হয়তো ওটা বাজ পড়ার শব্দও হতে পারে।
ঝড়ো-হাওয়া প্রচ- দাপট নিয়ে মেঘেদের ঘনঘন ডেকে আনে আর বিজলী চমকায় দুই চক্ষু অন্ধ করে দিয়ে। আমি রুনিকে ডাকার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমার গলা ফুটে কোনো শব্দ বেরোয় না। আমি শুধু অনুভব করি, পানির পাম্প দিয়ে অসংখ্য বিড়াল ওঠানামা করছে। আর বিড়ালদের পদশব্দে একটা প্রাচীন বাড়ি ভেঙে পড়ছে।
আমার হঠাৎ মনে পড়েÑ আমি বিড়ালদের নিয়ে না-ভেবে ওই নদী নিয়ে ভাবতে পারতাম। রুনিদের বাড়িতে আসার সময় যে বরফ-গলা-নদী দেখেছিলাম। আদতে ওটা ছিল একটা সংকেত। আর নদীটা ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লেখক জহির রায়হানের নদী। আমি যদি একবার ওই নদীর কথা রুনিকে বলতাম। মাত্র একবার! ‘বরফ গলা নদীর’ দৃশ্যাবলি নিয়েও যদি একটিবার কথা বলতাম দুজন! তা হলে হয়তো এই ঝড়-জলের তা-ব আমরা এড়াতে পারতাম। আমাদের নিশ্চিত অথচ অপঘাত-মৃত্যুও হয়তো আটকাতে পারতাম। দুঃখের বিষয়, বিদেশি বিড়ালদের নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, ওই নদীর কথা একেবারেই স্মরণ হয় নাই।
ফের তুমুল ঝড় আর বৃষ্টিতে আক্রান্ত হলে আমার আর রুনির যুগপৎ মনে পড়েÑ নদীটার নাম ছিল ‘বরফ গলা নদী’। মফস্বলের নদীগুলোর এমন আজগুবি নামই হয়!

Category:

অব্যাহত সাফল্য অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা সাফল্যগাথা ২০০৯-২০১৬

Posted on by 0 comment

32 33 34 35 36 37 38 39 40 41

Category:

নাসিরনগর এখন স্বাভাবিক

Posted on by 0 comment

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই।  নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সবগুলো মন্দিরে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে মোট ৫০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দেহভাজন অপরাধীদের।

30উত্তরণ প্রতিবেদন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই। সরকার এবং প্রশাসন এলাকার জনসাধারণের আরও নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো মন্দিরে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে মোট ৫০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি মন্দির ও ৩০টি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা। মোতায়েন করা রয়েছে পর্যাপ্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্য। বাড়িঘর মেরামতের জন্য উপজেলা প্রশাসন ৩০ বান্ডিল টিন প্রদান করেছে। এ ছাড়া নানা ধরনের ত্রাণসামগ্রী (শাড়ি, লুঙ্গি, ওষুধ) বিতরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। তবে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১০৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর বেলা ১১টায় নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের দ্বিতীয় পুত্র রসরাজ দাসের (৩০) ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননাকর একটি ছবি পোস্ট করা হয়। এই খবর হরিণবেড় গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন রসরাজ দাসকে ধরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে আসে। পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় আনে এবং ২৯ অক্টোবর রাতেই নাসিরনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কাউছার হোসেন বাদী হয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ৩০ অক্টোবর রসরাজ দাসকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এদিকে, এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে এবং তাদের বাড়িঘরে হামলা হবে জানতে পেরে হরিণবেড় গ্রামের (ধনী-দরিদ্র) অধিকাংশ পরিবার ২৯ অক্টোবর নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়। এই ঘটনায় রসরাজের বিচারের দাবিতে ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা সদরে উত্তেজিত জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে। এমন অবস্থায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত নামে পরস্পরবিরোধী ভিন্ন মতাদর্শের উগ্রপন্থি দুটি ধর্মীয় সংগঠনকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয় নাসিরনগর উপজেলা প্রশাসন। সমাবেশে মুসলিম ধর্মের অবমাননার জন্য রসরাজের ফাঁসির দাবি করে বিক্ষোভ করে ওই দুটি সংগঠনের নেতারা। সমাবেশ শেষে সমাবেশস্থল থেকে একদল যুবক লাঠিসোটা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা চালায়। নাসিরনগরের সবচেয়ে বড় মন্দির নাসিরনগর সদরের মহাকাল পাড়ার সার্বজনীন গৌরমন্দির, শিবমন্দির, দত্তপাড়ার দত্ত বাড়ি মন্দির, হরিণবেড় গ্রামের ঠাকুরপাড়ার ঠাকুর বাড়ি মন্দির, বাড়োয়ারী কালীমন্দির, হরিণবেড় গ্রামের মিলন বালার পারিবারিক মহাদেব মন্দির, গৌরাঙ্গ দাসের বাড়িতে অবস্থানরত দক্ষিণা কালীমন্দিরে হামলা চালায় এবং মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করে। সেই সাথে রসরাজ দাসের বাড়িতে হামলা চালিয়ে রসরাজ দাসের বসতঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। গৌরমন্দিরের পুরোহিত শঙ্কর গোপাল দাসও হামলাকারীদের হামলায় আহত হন। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা ওইদিন বিকেল ৪টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনায় নাসিরনগর উপজেলা সদরের দত্ত বাড়ির মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাসিরনগর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি কাজল জ্যোতি দত্ত বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১ হাজার ২০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন এবং গৌরমন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় উপজেলা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র চৌধুরী বাদী হয়ে অনুরূপ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ দুটি মামলায় তাৎক্ষণিক আটজনকে গ্রেফতার করে নাসিরনগর থানা পুলিশ। সবশেষে উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২৭ ডিসেম্বর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবদুল আহাদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
১ নভেম্বর নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীমের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধি দল নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলের অন্য তিন সদস্য হলেনÑ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য গোলাম রাব্বানী চিনু ও মারুফা আক্তার পপি। এনামুল হক সাংবাদিকদের বলেন, জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এরপর ৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সভায় ১৪ দলের সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম এমপি নাসিরনগরে হামলা রোধে প্রশাসনের যারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এরপর নাসিরনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমদ এবং নাসিরনগর থানার ওসি আবদুল কাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে ৭ নভেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক এমপির জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জড়িয়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা এবং তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর এবং প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জেলা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ৭ নভেম্বর নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নগদ অর্থ ও টিন বিতরণ করা হয়। নাসিরনগর সদরে কাশিপাড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২ পরিবারকে তিন বান্ডিল টিন এবং নগদ ৯ হাজার টাকা, হরিপুর ইউনিয়নের ১৬ পরিবারকে দুই বান্ডিল টিন ও নগদ ৬ হাজার টাকা এবং সদরের আরও ২৩ পরিবারকে দুই বান্ডিল টিন ও নগদ ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। ব্রাহ্মণবড়িয়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ২৯ পরিবারকে নগদ ৫ হাজার টাকা এবং ১০টি মন্দিরে ১০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।
নাসিরনগরে যারা এই হামলা চালিয়েছে তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। তিনি গত ৮ নভেম্বর নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ৯ নভেম্বর পরিদর্শনে আসেন ১৪ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপির নেতৃত্বে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক, অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত, অসীম কুমার উকিল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ১১ নভেম্বর পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি দল। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ঘোষণা করেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারীদের কোনো আইনি সহায়তা দেওয়া হবে না।’
নিরাপত্তা আরও জোরদারের স্বার্থে দিনে রাতে পুলিশি প্রহরার পাশাপাশি বিজিবিও মোতায়েন করা হয় নাসিরনগরে। অতঃপর ১৩ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জেলা প্রশাসক রেজুয়ানুর রহমান বলেন, নাসিরনগরে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।
এদিকে পুলিশের নজরদারিতে থাকা অন্যতম সন্দেহভাজনদের মধ্যে ১৬ নভেম্বর ভোরে নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি আমিরুল হোসেন চৌকিদারকে এবং হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় বাজারের আল-আমিন সাইবার পয়েন্টের দিকে সন্দেহ হয় পুলিশের। পুলিশের ধারণা ছিল, আল-আমিন সাইবার ক্যাফের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলমই রসরাজের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ধর্মীয় অবমাননার ছবিটি পোস্ট করেছিল; কিন্তু সাইবার ক্যাফের দুটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক সফটওয়্যার জব্দ করে সেখান থেকে কাবা শরিফ অবমাননার পোস্ট দেওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ২৭ নভেম্বর রাতে জেলার আশুগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় হরিপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হাজী মো. বিল্লাল হোসেনকে (৩৫) এবং ২৮ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের কালাইশ্রীপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয় জাহাঙ্গীর আলমকে। সে নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রেনু মিয়ার ছেলে। ২৭ নভেম্বর গ্রেফতারের পর হাজী মো. বিল্লাল মিয়া দুটি ট্রাক ভাড়া করে এবং নিজের একটি ট্রাক্টরে সমাবেশে লোকজন নিয়ে আসেন বলে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এই স্বীকারোক্তি দেন। এদিকে রসরাজ এবং তার পরিবারের দাবি, কাবা শরিফ অবমাননার পোস্টটি রসরাজ করেনি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, রসরাজের ব্যবহার করা মোবাইল ফোন থেকে এই ছবি পোস্ট করা হয়নি। তবে জাহাঙ্গীর এবং বিল্লাল বিজ্ঞ আদালতে পৃথক পৃথক জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। জাহাঙ্গীর ফেসবুকের পোস্টটি প্রিন্ট করে প্রচারপত্র আকারে বিলি করেন পুরো হরিণবেড় এলাকায়। অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিল্লাল হোসেন ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেন, ৩০ অক্টোবর সকালে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি আমাকে ট্রাক ভাড়া করতে বলেন। তিনি সহ সুজন ও রুবেল মিলে ট্রাক ভাড়া করেন ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা দেন দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি। বিল্লাল দেন ৩ হাজার এবং মিন্টু, মাহমুদ, নবী, রুবেল ও অন্যরা মিলে দেন বাকি ২ হাজার টাকা।
গত ৩ ডিসেম্বর নতুন তথ্য পেয়েছে বলে জানায় জেলা পুলিশ। নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার কিছুদিন আগে ‘ওয়াসিম বিডি’ নামে একটা ফেসবুক থেকে পবিত্র কাবা শরিফের বিকৃত ছবি আপলোড করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এই পেজটির এডমিনের ব্যাপারে অনুসন্ধানে নেমেছে পুলিশ। ওই চিঠিতে ‘ওয়াসিম বিডি’র এডমিন কারা এবং কাদের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে তা উদঘাটনের জন্য বলা হয়েছে।

সংবাদ পরিবেশন : কবিতা ভূঁইয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

Category:

প্রথমবার অনুষ্ঠিত হলো জেলা পরিষদ নির্বাচন

Posted on by 0 comment

26উত্তরণ ডেস্ক: ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন ও স্থানীয় সরকার পদ্ধতি শক্তিশালী করণে সরকারের আন্তরিক পদক্ষেপে দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো জেলা পরিষদ নির্বাচন। গত ২৮ ডিসেম্বর দেশের ৬০টি জেলায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৬৩ হাজার ১৪৩। এর মধ্যে পুরুষ ৪৮ হাজার ৩৪৩ এবং নারী ভোটার ১৪ হাজার ৮০০। একজন চেয়ারম্যান, পাঁচজন সংরক্ষিত সদস্য এবং ১৫ জন সাধারণ সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠিত হবে। পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের বাকি ৬১ জেলায় নতুন পরিষদ গঠন করবেন ভোটে নির্বাচিতরা।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে
বিজয়ী যারা
আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেনÑ চাঁপাইনবাবগঞ্জে মইনুদ্দিন ম-ল, লক্ষ্মীপুরে সামছুল ইসলাম, নরসিংদীতে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, খুলনায় শেখ হারুনর রশিদ, চাঁদপুরে ওসমান গনি পাটোয়ারী, ঝিনাইদহে কনক কান্তি দাস, শরীয়তপুরে ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার, সিলেটে লুৎফুর রহমান, গোপালগঞ্জে চৌধুরী এমদাদুল হক, মানিকগঞ্জে অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন, কক্সবাজারে মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী, মাগুরায় পঙ্কজ কুমার কু-ু, মো. জাফর আলী, পাবনায় রেজাউল রহিম লাল, রংপুরে ছাফিয়া খানম, বরিশালে মইদুল ইসলাম, বরগুনায় দোলোয়ার হোসেন, মৌলভীবাজারে আজিজুর রহমান, মাদারীপুরে মুক্তিযোদ্ধা মিরাজ উদ্দিন খান, পটুয়াখালীতে মোশাররফ হোসেন, রাজবাড়ীতে ফকির আবদুর জব্বার, কুমিল্লায় আবু তাহের, নোয়াখালীতে ড. এবিএম জাফরউল্লা, ময়মনসিংহে অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান।
জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হলেনÑ জামালপুরে ফারুক আহমেদ চৌধুরী, মেহেরপুরে গোলাম রসূল, রাজশাহীতে মোহাম্মদ আলী সরদার, শেরপুরে হুমায়ুন কবির রোমান, পিরোজপুরে মহিউদ্দিন মহারাজ, চুয়াডাঙ্গায় শামসুল আবেদীন খোকন, সাতক্ষীরায় নজরুল ইসলাম, পঞ্চগড়ে আমানুল্লাহ বাচ্চু, গাইবান্ধায় আতাউর রহমান, নীলফামারীতে জয়নাল আবেদীন, নড়াইলে সোহরাব বিশ্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শফিকুল আলম, সুনামগঞ্জে নুরুল হুদা মুকুট।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতরা হলেনÑ নারায়ণগঞ্জে আনোয়ার হোসেন, গাজীপুরে মো. আখতারুজ্জামান, ঠাকুরগাঁওয়ে সাদেক কোরাইশী, জয়পুরহাটে আরিফুর রহমান রকেট, নাটোরে সাজেদুর রহমান খাঁন, সিরাজগঞ্জে আবদুল লতিফ বিশ্বাস, যশোরে শাহ হাদিউজ্জামান, বাগেরহাটে শেখ কামরুজ্জামান টুকু, ঝালকাঠিতে সরদার শাহ আলম, ভোলায় আবদুল মোমিন টুলু, নেত্রকোনায় প্রশান্ত কুমার রায়, মুন্সিগঞ্জে মো. মহিউদ্দিন, দিনাজপুরে আজিজুল ইমাম চৌধুরী, নওগাঁয় একেএম ফজলে রাব্বি, ফেনীতে আজিজ আহমেদ চৌধুরী, কিশোরগঞ্জে মো. জিল্লুর রহমান, ঢাকায় মো. মাহবুবুর রহমান, হবিগঞ্জে মো. মুশফিক হুসেন চৌধুরী, চট্টগ্রামে এমএ সালাম, টাঙ্গাইলে ফজলুর রহমান খান ফারুক ও ফরিদপুরে মো. লোকমান মৃধা।

Category:

আরাকান এখনও ‘মগের মুল্লুক’

Posted on by 0 comment

উগ্রবাদীদের দমনের নামে সাধারণ রোহিঙ্গাদের জানমাল-সম্ভ্রমের ওপর হামলা মিয়ানমারের ভাবমূর্তিতেও কলঙ্ক লেপন করছে। মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কা-জ্ঞানহীন অভিযানের অবসান হওয়া উচিত।

27রাজীব পারভেজ: বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য অঞ্চলটি কয়েক দশক ধরেই আলোচিত। দেশটির সীমান্তে সম্প্রতি অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ৯ সদস্য। এর পরই সন্ত্রাসী ধরার নামে আরাকানে অভিযানের নাম করে হাজারও নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের বাড়িঘরে দেওয়া হয় আগুন, নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষকে। যা এখনও অব্যাহত। সীমান্তে হামলার জন্য স্থানীয় সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনকে অভিযুক্ত করছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
রোহিঙ্গা কারা!
রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। মিয়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং মংডু, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা এলাকায় এদের বাস। বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এই জনগোষ্ঠীর বসবাস। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস, মগ ও রোহিঙ্গা। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে মগদের। একসময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।
বার্মিজদের দখল
১৭৮৫ সালে বার্মিজরা আরাকান দখল করে। এরপর ১৭৯৯ সালে ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ বার্মিজদের গ্রেফতার এড়াতে এবং আশ্রয়ের নিমিত্তে আরাকান থেকে নিকটবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসে। বার্মার শোষকরা আরাকানের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে এবং একটা বড় অংশকে আরাকান থেকে বিতাড়িত করে মধ্য বার্মায় পাঠায়। যখন ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে তখন যেন এটি ছিল একটি মৃত্যুপুরী। ১৭৯৯ সালে প্রকাশিত ‘বার্মা সা¤্রাজ্য’তে ব্রিটিশ ফ্রাঞ্চিজ বুচানন-হ্যামিল্টন উল্লেখ করেন, ‘মুহাম্মদ (স.)-এর অনুসারীরা’, যারা অনেকদিন ধরে আরাকানে বাস করছে, তাদের ‘রুইঙ্গা’ বা ‘আরাকানের অধিবাস’ বলা হয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, কৃষি কাজের জন্য আরাকানের কম জন-অধ্যুষিত এবং উর্বর উপত্যকায় আশপাশের এলাকা থেকে বাঙালি অধিবাসীদের অভিবাসন করার নীতি গ্রহণ করেছিল ব্রিটিশরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল। আরাকান ও বাংলার মাঝে কোনো আন্তর্জাতিক সীমারেখা ছিল না এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধও ছিল না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জাপানিদের দখল
১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, মিয়ানমারের মিনবিয়া এবং ¤্রক-ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থিরা প্রায় ৫ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। এতে উপ-কমিশনার ইউ য়ু কিয়াও খায়াং-ও নিহত হন, যিনি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানিরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। ফলে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে বৌদ্ধ রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে ব্রিটিশপন্থিদের সাথে বার্মার জাতীয়তাবাদীদেরও সংঘর্ষ হয়। জাপানিদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থি অস্ত্রধারী মুসলমানদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানি শক্তির বিরোধিতা করেছিল, পর্যবেক্ষণে সাহায্য করেছিল মিত্রশক্তিকে। জাপানিরা হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল। এই সময়ে প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গা সংঘর্ষ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। জাপানি এবং বার্মাদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।
যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা
১৯৪৭ সালে রোহিঙ্গারা মুজাহিদ পার্টি গঠন করে, যারা জিহাদি আন্দোলন সমর্থন করত। মুজাহিদ পার্টির লক্ষ্য ছিল আরাকানে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তারা জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। নে উইন তাদের দমনের জন্য দুই দশকব্যাপী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। উল্লেখযোগ্য একটি অভিযান ছিল ‘কিং ড্রাগন অপারেশন’, যা ১৯৭৮ সালে পরিচালিত হয়। ফলে অনেক মুসলমান প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে এবং শরণার্থী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
বার্মিজ জান্তা
প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে বার্মা শাসন করছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা বার্মিজ জাতীয়তাবাদ এবং থেরাভেদা বৌদ্ধ ধর্মীয় মতবাদ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকে। আর এর ফলেই তারা রোহিঙ্গা, চীনা জনগোষ্ঠী যেমনÑ কোকাং, পানথাইদের (চীনা মুসলিম) মতো ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে ব্যাপকভাবে নির্যাতন করে থাকে। কিছু নব্য গণতন্ত্রপন্থি নেতা যারা বার্মার প্রধান জনগোষ্ঠী থেকে এসেছেন তারাও রোহিঙ্গাদের বার্মার জনগণ হিসেবে স্বীকার করেন না। বার্মার সরকার রোহিঙ্গা ও চীনা জনগোষ্ঠীর মতো ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার উসকানি দিয়ে থাকে এবং এই কাজ তারা অতি সফলতার সাথেই করে যাচ্ছে।
রাখাইনে ২০১২ সালের দাঙ্গা
মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম ও বৌদ্ধ রাখাইনদের মধ্যে ২০১২ সালে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা হয়। এতে প্রাণ যায় বহু মানুষের। জীবন বাঁচাতে তখনও বাংলাদেশে পালিয়ে আসে অনেক রোহিঙ্গা। অন্যান্য বার মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছাড়ার বিষয়ে কড়াকড়ি না করলেও এবার তারা রয়েছে সতর্কতায়। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা কড়া পাহারা দিচ্ছেন। যাতে কেউ পালাতে না পারে। অন্যদিকে চলছে গণহত্যা। সর্বশেষ কোনো হিসাব প্রকাশ না করলেও সপ্তাহখানেক আগে দেশটির সরকার বলেছে ৬৯ রোহিঙ্গা অভিযানে নিহত হয়েছে। আর আটক করা হয়েছে তিন শতাধিক। তবে প্রকৃত সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি বলেই আভাস দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
রোহিঙ্গাদের ধর্ম
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মূলত ইসলাম ধর্মের অনুসারী। যেহেতু বার্মা সরকার তাদের পড়াশোনার সুযোগ দেয় না, তাই অনেকেই মৌলিক ইসলামি শিক্ষাকেই একমাত্র পড়াশোনার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। অধিকাংশ গ্রামেই মসজিদ এবং মাদ্রাসা (ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষরা জামাতে এবং মহিলারা বাড়িতেই প্রার্থনা করে থাকে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ‘বিশ্বের সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত জনপদ’ এবং ‘বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু’। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের ফলে তারা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হন। তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ করতে পারে না, জমির মালিক হতে পারে না এবং দুটির বেশি সন্তান না নেওয়ার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অনুসারে, ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে এবং তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং তাদের অধিকাংশের বার্মার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। তাদের ওপর বিভিন্ন রকম অন্যায় ও অবৈধ কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জমি জবরদখল করা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা, ঘরবাড়ি ধ্বংস করা এবং বিবাহের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও উত্তর রাখাইন রাজ্যে গত দশকে বাধ্যতামূলক শ্রমিকের কাজ করা কমেছে, তারপরও রোহিঙ্গাদের রাস্তার কাজ ও সেনাক্যাম্পে বাধ্যতামূলক শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে।
১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘নাগামান’ (ড্রাগন রাজা) অভিযানের ফলে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সরকারিভাবে এই অভিযান ছিল প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেসব বিদেশি অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই সেনা অভিযান সরাসরি বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলছিল। ফলে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটে। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। তারা জানায়, রোহিঙ্গাদের বার্মায় বাধ্যতামূলক শ্রম প্রদান করতে হয়। এ ছাড়া হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের স্বীকার হতে হয়। রোহিঙ্গাদের কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করতে হতো।
২০০৫ সালে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে; কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ
জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া মানুষগুলো সেনাবাহিনী আর স্থানীয়দের নৃশংস হামলা থেকে জীবন বাঁচাতে ছুটছে সীমান্তে। কেউ কেউ রাতের আঁধারে বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে পৃথককারী নাফ নদী পার হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত এলাকা দিয়ে ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। তবে, এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপর রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।
এই সংকট শুরুর পর থেকেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢোকার অনুমতি দিলে এই সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান হবে না। এই সংকট সমাধান করতে হবে মিয়ানমারকে। আর এজন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সাথে একাত্ম হয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য করতে হবে মিয়ানমারকে। তবেই হবে এর সমাধান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, কিছু রোহিঙ্গা মানবিক কারণে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অনেকেই প্রবেশের চেষ্টা করছে। তাদের খাবারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে আবার মিয়ানমারেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনা করে যৌথভাবে কাজ করছে। এ ছাড়া আর কোনো অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাকে নতুন করে নিবন্ধনের চিন্তা আপাতত নেই সরকারের।
যেসব দেশে গণতন্ত্র অব্যাহত নেই, সেসব দেশে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দেবেই দেবে। ধর্মান্ধতা, রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে পাকিস্তানের আজকের নাজুক অবস্থা দৃশ্যমান। আমাদের দেশের মানবতা লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধী ও তাদের প্রশ্রয়দাতারা অতি উৎসাহে রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে জোরগলায় কথা বলছেন। যারা ১৯৭১ সালে মানবতা লঙ্ঘন করেছে, রাজনীতির ফায়দা হাসিল করার জন্য অগ্নিতে মানুষ জীবন্ত দগ্ধ করতে দ্বিধা করে না, তারা মানবতার দোহাই দিলে তা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। বিএনপি দিশাহারা হয়ে পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সম্পর্কে।
এটি ঠিক মিয়ানমার বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তাদের সাথে আমাদের অনেক অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। তবুও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ চুপ থাকতে পারে না। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহল থেকে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টা জাতিসংঘের নজরে আনতে হবে। বাংলাদেশ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা সমস্যার মীমাংসা করেছে। এ সমস্যারও সমাধান হবে, তা মানুষ আশা করতেই পারে। এটি যত না গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমারের জন্য। এর ব্যত্যয় ঘটলে একটি নতুন গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের অভ্যুদয় অধরাই থেকে যাবে।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সেনা অভিযানের ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অভিযানের হাত থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গারা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে দলে দলে পালাচ্ছেন। অনেকেই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিজিবি সদস্যরা মিয়ানমার সীমান্তে তীক্ষè নজর রাখলেও অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ক্ষেত্রে কতটা সাফল্য অর্জিত হবে, তা নিশ্চিত নয়। সমস্যাটা মানবিক হলেও দুটি কারণে বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশে আগে থেকেই অন্তত ৫ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সক্রিয় হলে একদিকে যেমন জাতিগত সংঘাতের ইতি ঘটানো সম্ভব, তেমনি বাংলাদেশও রক্ষা পাবে অনাকাক্সিক্ষত সমস্যা থেকে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুধু অমানবিক নয়, অবিবেচনাপ্রসূত বললেও কম বলা হবে। আমরা রোহিঙ্গাদের এক ক্ষুদ্র অংশের জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদচর্চার বিরোধী। তবে সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে তাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। উগ্রবাদীদের দমনের নামে সাধারণ রোহিঙ্গাদের জানমাল-সম্ভ্রমের ওপর হামলা মিয়ানমারের ভাবমূর্তিতেও কলঙ্ক লেপন করছে। মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কা-জ্ঞানহীন অভিযানের অবসান হওয়া উচিত। উগ্রবাদীদের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে মিয়ানমার সরকার আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলবেÑ এই আশাবাদ রইল।

Category:

শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন

Posted on by 0 comment

গত ২২ ডসিম্বের অনুষ্ঠতি নারায়ণগঞ্জ সটিি র্কপােরশেন নর্বিাচনে নৌকা র্মাকার র্প্রাথী ডা. সলেনিা হায়াৎ আইভী ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট এবং তার নকিটতম প্রতদ্বিন্দ্বী ধানরে শীষ  নয়িে বএিনপরি র্প্রাথী সাখাওয়াত হোসনে খান পয়েছেনে ৯৬ হাজার ৬৭৪ ভোট।

25

নারায়ণগঞ্জে নজিরবিহীন ভোট উৎসবে আইভী জয়ী

উত্তরণ প্রতিবেদন: অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহলের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।
গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতীক নৌকা মার্কার প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৬৭৪ ভোট। এই নির্বাচনে মোট ভোটারের ৬২.৩৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান তার নিজ কেন্দ্রেও পাস করতে পারেন নি।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজির স্থাপনকারী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের এই নির্বাচনকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনের জন্য মডেল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও প্রশংসিত হয়েছে নাসিক নির্বাচন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ভোটগ্রহণের যে নজির স্থাপিত হয়েছে, তাতে বিরোধী দল বিএনপিও এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
ফল ঘোষণার আগে রিটার্নিং অফিসার নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, এই নির্বাচন স্মরণ রাখার মতো শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে (নাসিক) আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়কে জঙ্গি দমন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের সাফল্যে জনগণের খুশির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রের প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নতি করেছে। বাংলাদেশ আজ নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত। জনগণই এই উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে জনগণ সরকারের চলমান উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ
নির্বাচনে জয় লাভের পর গত ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ মহানগরের নেতা-কর্মীদের নিয়ে গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আইভী বলেন, আমি আপনার ¯েœহে সবসময় থাকতে চাই।
মতবিনিময় সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলীয় সরকারের অধীকে নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও অবাধ করা যায়, আওয়ামী লীগ তা প্রমাণ করেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রতিটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করেছে। জনগণ যাকে ভোট দিয়েছে তারাই জিতেছে। তিনি বলেন, পাঁচ সিটি নির্বাচনে তো তারা (বিএনপি) জিতেছে। আওয়ামী লীগ যদি ভোট কারচুপি করে, তা হলে তারা জয়ী হবে কী করে। জনগণ যাকে ম্যান্ডেট দিয়েছে আমরা মেনে নিয়েছি।
নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এতদিন যে অভিযোগ করে আসছে তার উপযুক্ত জবাব নারায়ণগঞ্জবাসী দিয়ে দিয়েছে। সেখানে অত্যন্ত চমৎকার একটা নির্বাচন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই নির্বাচনে আমার একটাই নির্দেশ ছিল, নির্বাচনটা হতে হবে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ। সাধারণ মানুষ ভোটটা যেন সঠিকভাবে দিতে পারে।
বিএনপির আমলে নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা সংবিধান দখল করে মার্শাল ল’ জারি করে রাষ্ট্রপতি সায়েম সাহেবকে অস্ত্র ঠেকিয়ে তাকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছিলেন। ক্ষমতায় এসে হ্যাঁ/না ভোট দিয়েছেন ১৯৭৮ সালে। এরপর ৭৯ সালে দিলেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে শতভাগের ওপর ভোট পড়েছে। এরপর এলো সংসদ নির্বাচন। সেটা ছিল ছক বাঁধা নির্বাচন। আওয়ামী লীগকে কয়টা সিট দেবে, সেটা ঠিক করেই এই নির্বাচন করে তারা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির আমলে ভোট চুরি এত স্পষ্ট ছিল যে মানুষ প্রতিরোধ করল। আন্দোলনে নামল। ’৯৬ সালের ৩০ মার্চ ভোট চুরির দায়ে খালেদা জিয়াকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। এই কথাটা মানুষ ভুলে যায় কেন?

Category:

চারুকলায় ‘জয়নুল উৎসব’

Posted on by 0 comment

22উত্তরণ প্রতিবেদন: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০২তম জন্মদিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে ‘জয়নুল উৎসব’। ২৯ ডিসেম্বর সকালে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শিল্পী হাশেম খান, চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন ও ভারতের শিল্পী যোগেন চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে শিল্পাচার্যের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগসহ চারুশিল্পীরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘জয়নুল সম্মাননা’ দেওয়া হয় শিল্পী হাশেম খান ও ভারতের শিল্পী-অধ্যাপক যোগেন চৌধুরীকে। তারপর ‘জয়নুল শতবর্ষ প্রবন্ধাবলী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। এই আসরে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। ভাস্কর তারক গড়াইয়ের নির্মিত জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। এরপর চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে শুরু হয় ‘জয়নুল মেলা’। বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ পণ্যের মেলা জমে ওঠে নানা বয়সী মানুষের আনাগোনায়।
১২ জানুয়ারি থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে আগামী বছরের ১২ জানুয়ারি শুরু হতে যাচ্ছে পঞ্চদশ ঢাকা 23আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এখন চলছে এই আয়োজনের প্রস্তুতিপর্ব। পঞ্চদশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশসহ প্রায় ৬৭টি দেশের ১৮৬টিরও বেশি ছবির প্রদর্শনী হবে। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, স্টার সিনেপ্লেক্স এবং আমেরিকান সেন্টার মিলনায়তনে এগুলো দেখানো হবে। এশিয়ান কম্পিটিশন, রেট্রোস্পেকটিভ, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিলড্রেনস ফিল্মস, স্পিরিচুয়াল ফিল্মস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মস, নরডিক ফিল্ম সেশন এবং উইমেন্স ফিল্মমেকারস সেকশন-এ চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হবে। এ ছাড়া বিশ্বের ৬৭টি দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার-সমালোচক, সাংবাদিক, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তা, রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদ ও অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদের সদস্যসহ দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উৎসবে অংশ নিয়ে দর্শকদের সাথে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। উৎসবের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা বিষয়ক ‘তৃতীয় ঢাকা আন্তর্জাতিক উইমেন ফিল্ম মেকারস্ কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে এই সম্মেলন থাকবে আগামী ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি। এতে বিভিন্ন দেশের নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী নির্মাতারা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সৈয়দ শামসুল হকের ৮২তম জন্মদিন উদযাপিত
২৭ ডিসেম্বর ছিল সৈয়দ শামসুল হকের ৮২তম জন্মদিন। সদ্যপ্রয়াত এই লেখকের ৮২তম জন্মদিনে ছিল দুটি আয়োজন। ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে’ শিরোনামের আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমিতে। আর বাংলা একাডেমিতে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করে আলোচনা আর কবিতা পাঠের। ওইদিন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠান। যার শুরুতেই সৈয়দ হকের প্রতিকৃতিতে আলোক প্রজ্বলন ও পুষ্পস্তবক অর্পণের সাথে বেজে ওঠে শিল্পী মনিরুজ্জামানের বাঁশির সুর। এরপর নাট্যজন আতাউর রহমানের সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য রাখেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। সৈয়দ শামসুল হকের দুটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর মধ্যে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে কাব্যগ্রন্থ ‘কর্কটবৃক্ষের শব্দসবুজ শাখায়’ এবং অন্যপ্রকাশ থেকে অনুবাদ নাটকের বই ‘শেক্সপিয়রের হ্যামলেট’ প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান অতিথি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে ‘সৈয়দ শামসুল হক সৃজনের জাদুকর : নাট্য নির্দেশকের নিবেদন’ বিষয়ে নাট্যজন আতাউর রহমান, ‘চলচ্চিত্রে সৈয়দ শামসুল হক : বড় ভালো লোক ছিল’ বিষয়ে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াত, ‘জাদুবাস্তবতার পথিকৃৎ সৈয়দ শামসুল হক’ বিষয়ে কথাশিল্পী আনিসুল হক, ‘চিরজীবিত বিশ্ববাঙালি’ আলোচনা করেন কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবিপতœী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা আবৃত্তি করেন হাসান আরিফ, গোলাম সারোয়ার ও আহকামউল্লাহ। নাট্যদল থিয়েটারের পরিবেশনায় সৈয়দ হক রচিত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের পরিবেশনায় ‘ঈর্ষা’র অংশবিশেষ মঞ্চস্থ করে। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা সংগীত পরিবেশন করেন এন্ড্রু কিশোর। সৈয়দ শামসুল হককে নিবেদন করে সমাপনী নৃত্য পরিবেশন করেন পূজা সেনগুপ্ত। সৈয়দ হকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে বিভিন্ন সংগঠন। এর আগে সকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করে আলোচনা, স্মৃতিচারণ, নিবেদিত কবিতাপাঠ ও কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি। সৈয়দ হককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, কবি রবিউল হুসাইন, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ ও কবি সাজ্জাদ কাদির। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সামাদের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত।
সাংস্কৃতিক জোটের সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রাজধানীর ৫টি স্থানে সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘বিজয় উৎসব-২০১৬’ শিরোনামে এ অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৩ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ১৯ ডিসেম্বর। ১৩ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চে সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবের উদ্বোধন করেন একুশের গানের অমর রচয়িতা ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। উৎসবের এবারের স্লোগান ছিল ‘ঐক্য গড়ো বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িকতা হবে শেষ’। রাজধানীতে বিজয় উৎসব চলেÑ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চ, রবীন্দ্র সরোবর কবি রফিক আজাদ মঞ্চ, রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ মঞ্চ, বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজ দনিয়া মঞ্চ ও খোন্দকার নূরুল আলম মঞ্চ মিরপুর। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টি মঞ্চেই চলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
সাংস্কৃতিক বিনিময় উদ্যোগে
ভারত ও বাংলাদেশের দুটি প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয় হাত মিলিয়ে এই প্রথম শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির এক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবেই ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো দুদিনব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উৎসব। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে এর পাল্টা রবীন্দ্রভারতী উৎসব। দুপক্ষের উদ্যোক্তারাই বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যখন যোগাযোগের নানা নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে, তখন এই উদ্যোগ দুদেশের মধ্যে শিক্ষাগত বা সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পথকে প্রশস্ত করবে।

Category:

নির্বাচন কমিশন গঠন : আইনগত বাধ্যবাধকতা

Posted on by 0 comment

সংবিধানের ১১৮ ধারার (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দান করিবেন।”

19অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার: গণতান্ত্রিক দেশে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সরকার পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশেও বর্তমানে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন আছে, যার পাঁচ বছর মেয়াদ আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে শেষ হয়ে যাবে।
নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষে বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ ধারার (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দান করিবেন।
(২) একাধিক নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত হইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাহার সভাপতিরূপে কার্য করিবেন।
(৩) এই সংবিধানের বিধানাবালী-সাপেক্ষে কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে এবং
ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এমন কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন, তবে অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না।
খ) অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রধান নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন, তবে অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না।
(৪) নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।
(৫) সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রিমকোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন। সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।
(৬) কোনো নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।”
উপরোক্ত নিয়োগ পদ্ধতিটি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করিবেন, এক্ষেত্রেও সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ “এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।” তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোনো আদালত সেই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০১২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমান উপরোক্ত আইন বলে নিয়োগ দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন গঠন লক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করেন এবং আলোচনা-সাপেক্ষে ১. সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, ২. সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি মোহাম্মদ নূরুজ্জামান, ৩. বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ৪. বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান।
উপরোল্লিখিতদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করেন। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির নিকট ১০ জনের নাম প্রস্তাব করেন। রাষ্ট্রপতি সেই প্রস্তাবনা থেকে নি¤েœাক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রদান করেন।
১. প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ (০৯.০২.২০১২); ২. নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ (০৯.০২.২০১২); ৩. নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক (০৯.০২.২০১২); ৪. নির্বাচন কমিশনার ব্রিগে. জে. (অব.) জাবেদ আলী (০৯.০২.২০১২); ৫. নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ (১৫.০২.২০১২)।
নির্বাচন কমিশন গঠনকল্পে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছেন, নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনাও করেছেন, এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দল আশা ব্যক্ত করেছেন, রাষ্ট্রপতির এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। পাশাপাশি কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিরূপ মন্তব্যও করে যাচ্ছে, যা মোটেও প্রত্যাশিত নয়।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ৪৮৪টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, ৩২১টি পৌরসভার মধ্যে ৩১১টি পৌরসভা নির্বাচন, ৪ হাজার ৫৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৪৫০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, ১১টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে ১০টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও সর্বশেষ ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।
উল্লেখ্য, জেলা পরিষদ নির্বাচন ব্যতীত স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচনই মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু লক্ষ্যণীয় কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশন গঠন করার পর থেকেই নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার প্রয়াসে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। নির্বাচন কমিশনকে অকার্যকর করার লক্ষ্যে বিরূপ মন্তব্যও করে। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলেও ঘোষণা দেয়। আবার কয়েকটি নির্বাচনে অংশগ্রহণও করে। যেসব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেসব নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ না নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে; কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর আবার চুপসে যায়। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ঢালাওভাবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এর নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলে নির্বাচন বর্জন করাÑ শুধু নির্বাচন কমিশনের সুসংহতকরণেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে নাÑ রাজনৈতিক দলের প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে নির্বাচনকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়, প্রতিহত করতে না পেরে ধ্বংসাত্মক কাজে নেমে পড়ে। হত্যা, গুম, গুপ্তহত্যা, ট্রেন ও রেললাইনে অগ্নিসংযোগ, চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপসহ হিংসাত্মক কাজগুলো করে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে পারে নি। নির্বাচনের আগের দিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের ভোটকক্ষে অগ্নিসংযোগ করে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারেনি।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন শুধু জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনই অনুষ্ঠান করেনি। দেশে প্রথম জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিসহ ভোটার তালিকা করে। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন হওয়ায় একজন ব্যক্তির একাধিক নামে বা একাধিক জায়গায় ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা আমরা জানি, বিএনপি সরকারের সময় নিয়োগকৃত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এমএ আজিজ (২৩.০৫.২০০৫ থেকে ২১.০১.২০০৭)-এর সময় যে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল, তাতে প্রায় দেড় কোটি ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। যা ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। তৎকালীন যে বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
১. বিচারপতি মাহবুবুর রহমান (১৬.০১.২০০৬ থেকে ৩১.০১.২০০৭); ২. স ম জাকারিয়া (১৬.০১.২০০৬ থেকে ৩১.০১.২০০৭); ৩. মাহমুদ হাসান মনসুর (০৪.০৯.২০০৬ থেকে ৩১.০১.২০০৭); ৪. মোদাব্বির হোসেন চৌধুরী (২৭.১১.২০০৬ থেকে ৩১.০১.২০০৭); ৫. মো. সাইফুল আলম (২৭.১১.২০০৬ থেকে ৩১.০১.২০০৭)। তারা মাত্র এক বছরের মধ্যে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ তাদের সময় যে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো ছিল চরম বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ১৩-দফা প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। কিন্তু এই ১৩-দফায় বর্তমান আইন ও বিধিমালার কোনো মৌলিক পরিবর্তন নেই, কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর কিছু ধারাও এই আইনের বিধিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন ২০০৮ সালে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেই গ্রহণ করা হয়েছিল। যেমন একটি দফায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব যোগ্যতার কথা বলা হয়েছেÑ ‘সর্বজন শ্রদ্ধেয়, সৎ, মেধাবী, দক্ষ, সাহসী, প্রাজ্ঞ এবং নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব ও কর্ম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সকল বিচারে দল-নিরপেক্ষ এবং বিতর্কিত নন এমন একজন ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন।’ এত গুণে গুণান্বিত একজন লোক পাওয়া কী সম্ভব? বিধিমালায়ও যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে তা প্রকারান্তরে এভাবে বিধিমালায় আছে।
তা ছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান উর্দি পরে ক্ষমতা দখল করার পর ‘হ্যাঁ/না ভোট’ নামে একটি ভোট করেছিলেন, যা ছিল সারাবিশ্বে আলোচিত এবং তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি একেএম নুরুল ইসলাম, যিনি পরবর্তীতে আরেক সামরিক সরকার এরশাদ সরকারের আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমরা আরও কিছু বিতর্কিত নির্বাচনও দেখেছি, মাগুরা ও ঢাকার তেজগাঁওয়ে জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন। যারা নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে তাদের মনের মতো নিজস্ব ঘরানার লোক বসিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কলঙ্কিত করেছেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে করেছেন বিতর্কিত, নির্বাচন কমিশনকে করেছেন আস্থাহীন, তাদের মুখে একটি স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কথা মানায় না।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি একেএম সাদেকের নেতৃত্বে। যে নির্বাচনে ১৫০টি জাতীয় আসনে কোনো নির্বাচনই হয়নি, নির্বাচনের কোনো কাগজই রেকর্ডে নেই। যে নির্বাচনের পর আন্দোলনের মুখে চার মাসের মাথায় কমিশনের পদত্যাগ ও নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল নতুন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোহাম্মদ আবু হেনা এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবিদুর রহমান (১৬.০৪.১৯৯৬) ও মুশতাক আহমেদ চৌধুরী (১৬.০৪.১৯৯৬)।
দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বাংলাদেশে প্রথম দলীয়ভাবে মেয়র পদে প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থী অংশগ্রহণ করে। প্রায় ৫ লক্ষাধিক ভোটার অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২৭টি ওয়ার্ডে ১৭৪টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন পরিক্রমার ৩৫ দিনের নির্বাচনী প্রচারণায় ও নির্বাচনের দিনেও কোনো রাজনৈতিক দল থেকে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে স্থানীয়ভাবে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি।
১৩১ বছর পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো জেলা পরিষদ নির্বাচন। যদিও এই নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি, তবুও সারাদেশের ৬১ জেলায় সুষ্ঠুভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ দুটি নির্বাচন থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে, বর্তমান সরকার দেশে যে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে পারে। নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই প্রভাবিত হয়নি।
নির্বাচন কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনকে পর্যায়ক্রমে নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও ব্যবহার এবং আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন পরিবর্তন ও সংস্কারের কর্মসূচিকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করার লক্ষে ২০০৭ সাল থেকে রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে সংলাপের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ৭ জুন ২০১১ থেকে ৭ আগস্ট ২০১১ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে সংলাপ চলে। সংলাপের আলোকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অধিকতর সংশোধন করা হয়।
সাংবিধানিক ও আদর্শগতভাবে সুষ্ঠু, অবাধ ও আইনানুগ নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশের নির্বাচন গণতন্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে। এ কাজটি মোটেও সহজ নয়। এই দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনের আরও বহু প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে তা সম্পন্ন করতে হয়। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী, গণমাধ্যম এবং দেশের সকল জনগণই এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত।
নির্বাচন কমিশনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল ছবি ও আঙ্গুলের ছাপসহ ভোটারদের একটি ইলেক্ট্রনিক তথ্যভা-ার প্রতিষ্ঠা করা। মাত্র ১৮ মাসে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নিবন্ধন ও একটি তথ্যভা-ার প্রতিষ্ঠা করা।
এ যাবত সকল কমিশন নিয়োগে সরকারপ্রধানগণের পরামর্শে ও মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ প্রদান করেছেন। সাম্প্রতিককালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ জাতীয় পর্যায়ে একটি বহুল আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছেÑ দৃঢ়চেতা ব্যক্তিকে কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়া, যারা সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। উপরোক্ত বিবেচনায় উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করার জন্য একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি নিয়োগ করার প্রস্তাবনা করা হচ্ছে।
আমরা মনে করি, মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা-সাপেক্ষে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চারজন নির্বাচন কমিশনার সমন্বয়ে একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। যেই নির্বাচন কমিশন বর্তমান কমিশনের অসমাপ্ত কাজসমূহ শেষ করবেন। সারাদেশের প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ভোটারের স্মার্টকার্ড ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, যা ঢাকা শহরে বিতরণ হয়েছে। জানুয়ারি মাস থেকে সারাদেশে বিতরণ করা হবে। স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে বর্তমান ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা আরও স্বচ্ছ হবে এবং আগামী দিনের যে কোনো নির্বাচন হবে আরও অবাধ ও নিরপেক্ষ।

লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Category:

বই উৎসব উদযাপিত

Posted on by 0 comment

17 উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৪ কোটি ২৬ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য ৩৬ কোটি ২১ লাখ নতুন ঝকঝকে পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের হাতে টানা অষ্টমবারের মতো নতুন এই বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার ব্যতিক্রমী উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। ১ জানুয়ারি সকাল ৯টায় রাজধানীর আজিমপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে ‘জাতীয় পাঠ্যপুস্তক উৎসব-২০১৭’ উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে আলাদা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসব শুরু করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবারও আলাদা আলাদা স্থানে পাঠ্যপুস্তক উৎসব পালন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল প্রাঙ্গণে করলেও এবারই প্রথম স্কুলের বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বই উৎসবের আয়োজন করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই উৎসবে যোগ দিয়েছে ঢাকার ৩১টি বিদ্যালয়ের ৫ হাজার শিক্ষার্থী। অন্যদিকে সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এমপি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসুন : প্রধানমন্ত্রী
18প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, সমালোচনা না করে শিক্ষার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসুন। সমালোচনা করেন অথচ মানের মাত্রাটা কী সেই ব্যাখ্যা তো আপনাদের কাছ থেকে এখনও পাইনি। যদি পেতাম তা হলে খুশি হতাম। মনে রাখবেন কোনো কিছুই রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। আগে আপনারা (সমালোচকবৃন্দ) ভলান্টিয়ার সার্ভিস দিন, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কিছু করুন, শিক্ষা দিন। তারপর কথা বলুন। সমালোচনা না করে সরকারকে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
১ জানুয়ারি বই উৎসব উপলক্ষে গত ৩১ ডিসেম্বর সকালে গণভবনে এক অনুষ্ঠানে সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। নতুন বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে গত কয়েক বছরের মতো এবারও উৎসবের আগের দিন বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। সকালে গণভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্কুলপড়–য়া শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, বছরের শুরুতেই নতুন বই হাতে পাওয়ায় লেখাপড়ায় আগ্রহের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার কমে আসছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মান সবসময় পরিবর্তনশীল। বিশ্বের সবকিছু পরিবর্তনশীল। আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাসহ সব ধরনের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে আমাদের শিশুদের মেধা-মননের বিকাশ হয়। শিক্ষার্থীরা সব কিছুতেই পারদর্শী হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি একদিনে সব হয়ে যায় না। সেজন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা চাই সব ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দেবে, এ জন্যই পঞ্চম-অষ্টম শ্রেণিতে পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। অথচ এই দুই পরীক্ষা নিয়েও অনেকে কথা বলেন। তিনি বলেন, পিইসি-জেএসসির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা-ভীতি কমছে। এতে তাদের মধ্যে সাহস জন্মাচ্ছে। দিন দিন রেজাল্টও ভালো হচ্ছে, পাসের হারও বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সময় ছিল যখন ক্লাস থেকে কিছু ছেলেমেয়ে বেছে নিয়ে তাদের প্রস্তুত করা হতো বৃত্তির জন্য। তাদের ভালো টিফিন দেওয়া হতো, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা সেটি পেত না। বৃত্তির জন্য শিক্ষকরা যাদের বাছলেন না, তাদের মধ্যেও তো মেধাবী থাকতে পারে। কেউ বৃত্তি পাবে, বাকিরা বঞ্চিত থাকবেÑ এ পদ্ধতি ঠিক করতেই পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণিতে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাকে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তার সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি জেন্ডার সমতা অর্জনেও কাজ করছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ সত্যিই একটি আনন্দের দিন। আজ আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়েছি। আপনারা জানেন, আমরা সরকার গঠনের পর থেকেই মানুষের মৌলিক অধিকার সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। কারণ আমরা বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আর সেই দারিদ্র্যের মুক্তি ঘটবে যদি আমরা সকলকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারি। আমি মনে করি, শিক্ষাই হচ্ছে দারিদ্র্য মুক্তির মূল ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমরা ২৪৩ কোটি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করেছি। এ বছরও ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৫টি বই প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতগুলো বই একসাথে ছাপানো এবং বিতরণ করা একটি বিশাল ব্যাপার। এমনকি ২০১৪, ২০১৫ এবং ২০১৬ বিএনপির আগুন সন্ত্রাসের মাঝেও আমরা জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনটিতেই সারাদেশের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে সমর্থ হয়েছিলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার এই উদ্যোগ ব্যর্থ করার জন্য ছাপাখানা পুড়িয়ে দেওয়াসহ নানাবিধ ষড়যন্ত্রের কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ঢাকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কয়েকজন শিক্ষার্থীর পাশাপাশি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পুস্তক তুলে দেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তার দুই নাতনি শ্যামা (সায়মা হোসেন পুতুলের মেয়ে) এবং তানিতার হাতে প্রথম শ্রেণির বই তুলে দেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এমপি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে ‘বিশেষ উত্তরীয়’ পরিয়ে দেন শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর হাতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ব্রেইল বই এবং ৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার বই এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি সংবলিত একটি অ্যালবাম প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

Category: