Blog Archives

শোকের মাস আগস্ট : আওয়ামী লীগের কর্মসূচি

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-30-41 PM১ আগস্ট : শোকের মাসের প্রথম প্রহরে (৩১ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট) ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর অভিমুখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের আলোর মিছিল। সকাল ১০টায় শিল্পকলা একাডেমিতে আওয়ামী যুবলীগের মাসব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক সংবাদচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন। দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ তাঁতী লীগ ঢাকা মহানগর (উত্তর)-এর উদ্যোগে কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিল। বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ কৃষক লীগের রক্তদান কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি।
৩ আগস্ট : সকাল ১১টায় গুলশান-২’এ বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে মানববন্ধন।
৪ আগস্ট : সকাল ১১টায় শহীদ শেখ কামালের জন্মদিন উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচনা সভা।
৫ আগস্ট : সকাল ৮টায় আবহানী ক্লাব প্রাঙ্গণ এবং সকাল ৯টায় বনানী কবরস্থানে শহীদ শেখ কামালের জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। সকাল ১০টায় শিল্পকলা একাডেমিতে  আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।
৬ আগস্ট : বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা শাখা, উপজেলায় মানববন্ধন ও স্মারকলিপি পেশ।
৭ আগস্ট : বঙ্গমাতা শহীদ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মহিলা শ্রমিক লীগের বনানী কবারস্থানে সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্বলন।
৮ আগস্ট : সকাল ৮টা ৩০ মিনেটে বঙ্গমাতা শহীদ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের শ্রদ্ধার্ঘ্য অপর্ণ, কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আলোচনা সভা। সকাল ১০টায় শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের আলোচনা সভা। বিকেল ৪টায় শিল্পকলা একাডেমিতে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে মহিলা আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা। বাদ আছর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল।
৯ আগস্ট : বিকেল ৩টায় জাতীয় জাদুঘর অডিটরিয়ামে জাতির পিতার ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের আলোচনা সভা।
১০ আগস্ট : বিকেল ৫টায় সুপ্রিমকোর্ট মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আলোচনা সভা।
১১ আগস্ট : বিকেল ৪টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের আলোচনা সভা।
১২ আগস্ট : বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা।
১৩ আগস্ট : সকাল ১০টায় মহানগর নাট্যমঞ্চে বাংলাদেশ আওয়ামী যুব লীগের আলোচনা সভা। স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে তিনব্যাপী বঙ্গবন্ধু ভবনে আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
­­১৪ আগস্ট : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রক্তদান কর্মসূচি।
১৫ আগস্ট : সূর্য উদয়ক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সংগঠনের সকল স্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা অর্পণ এবং শোক মিছিলসহ আগমন এবং শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল। সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। টুঙ্গিপাড়ার কর্মসূচিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। এই কর্মসূচিতে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও উপস্থিত থাকবেন। বাদ জোহর দেশের সকল মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। সুবিধামতো সময়ে মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা, উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা। দুপুরে অস্বচ্ছল দুস্থ মানুষের মাঝে খাদ্য বিতরণ। বাদ আছর  মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।
১৬ আগস্ট : জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি।
১৭ আগস্ট : জাতীয় প্রেসক্লাবে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের ২০০৫ সালে সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন। বিকেল ৩টায় স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের উদ্যোগে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশ। সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল। বিকেল ৪টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বাংলাদেশ তাঁতী লীগের আলোচনা সভা।
১৮ আগস্ট : বিকেল ৪টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের আলোচনা সভা।
১৯ আগস্ট : বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে মহিলা শ্রমিক লীগ শোক র‌্যালি।
২১ আগস্ট : কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ বেদীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং আলোচনা সভা। বিকেল ৫টা ২১ মিনিটে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে গ্রেনেড হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং গ্রেনেড হামলায় শহীদ স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কুদ্দুস পাটোয়ারীর পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ। বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ, বাংলাদেশ তাঁতী লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের উদ্যোগে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।
২২ আগস্ট : বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রাঙ্গণে জাতীয় শ্রমিক লীগের আলোচনা সভা।
২৩ আগস্ট : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচনা সভা। জাতীয় প্রেসক্লাবে বেগম আইভি রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা।
২৪ আগস্ট : সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটে প্রয়াত বেগম আইভি রহমানের স্মরণে বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। এতে অংশগ্রহণ করবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দ। যুব মহিলা লীগের উদ্যোগে বনানী কবরস্থানে দুস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ কৃষক লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আলোচনা সভা।
২৫ আগস্ট : কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের আলোচনা সভা।
২৬ আগস্ট : ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে তাঁতী লীগের শোক দিবসের আলোচনা সভা। ২১ আগস্ট স্মরণে সাংগঠনিক জেলাসমূহে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচনা সভা। জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ কৃষক লীগের আলোচনা সভা।
২৭ আগস্ট : বিকেল ৫টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের আলোচনা সভা। ২১ আগস্ট স্মরণে সাংগঠনিক থানাসমূহে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচনা সভা। কেরানীগঞ্জস্থ নূপুর কমিউনিটি সেন্টারে বাংলাদেশ কৃষক লীগ ঢাকা জেলা দক্ষিণের আলোচনা সভা।
২৮ আগস্ট : সাভার পৌরসভায় বাংলাদেশ কৃষক লীগ ঢাকা জেলা উত্তরের উদ্যোগে আলোচনা সভা।
৩০ আগস্ট : বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা মহানগর (উত্তর ও দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা।
৩১ আগস্ট : বিকেল ৪টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আলোচনা সভা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা এমপি। সকাল ১০টায় শিল্পকলা একাডেমিতে আওয়ামী যুবলীগের মাসব্যাপী ঘোষিত কর্মসূচিসমূহের সমাপনী অনুষ্ঠান।

Category:

দিনপঞ্জি : জুলাই ২০১৭

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-28-21 PM ২ জুলাই
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সাথে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী তার সুইডেন সফর এবং জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ বাজেট পাস সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।

৪ জুলাই
* উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল হতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত ‘জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫’ এর প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে সে দেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে উভয় দেশ সমস্যা সমাধান করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উ থাউং তুন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সাথে দেখা করতে গেলে তিনি বলেন, আমরা দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যা সমাধান করব।

৫ জুলাই
* মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা ও সশস্ত্র বাহিনী মিলে যেভাবে লড়ছে, তাতে বাংলাদেশে কোনোভাবে জঙ্গিবাদের স্থান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা সেনানিবাসে পিজিআর সদর দফতরে বাহিনীর ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে তিনি এ আশাবাদ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকা- এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও বাংলাদেশ সফলভাবে তা মোকাবেলা করছে। সকলে মিলেই কিন্তু এই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে অত্যন্ত সফলতা অর্জন করেছি। যা বিশ্বব্যাপী একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
৬ জুলাই
* সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলেই উন্নয়ন সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ২০০৯ ও ২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আছে। সরকারের ধারাবাহিকতা আছে বলেই আট বছরে দেশের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। ধারাবাহিকতা না থাকলে উন্নয়ন করা যায় না। দেশে গণতন্ত্রের সুস্থ ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলে দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। গণভবনে আয়োজিত যুব মহিলা লীগের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

৭ জুলাই
* আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি মহল দেশে-বিদেশে নানা চক্রান্ত করছে। এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চক্রান্ত চলছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ফুট ওভারব্রিজ উদ্বোধনকালে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন। মন্ত্রী নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আওয়ামী লীগে সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলছে, কোনো জামাত-শিবির যেন দলে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

৮ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের চলমান উন্নয়ন-অগ্রগতির স্বার্থেই জনগণ সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আবারও আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের উন্নয়ন হয়, দেশ সব দিক থেকে এগিয়ে যায়। আর বিএনপিসহ অন্যরা ক্ষমতায় এলেই দেশে দুঃশাসন চালায়, দুর্নীতিতে দেশকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে, জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করে দেশকে পিছিয়ে দিয়ে যায়। তাই দেশের জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কাকে চায়। আর বর্তমান সরকার যেসব মেগা প্রকল্প নিয়েছে তা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগকে আরেক টার্ম সরকারে থাকা দরকার। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের চেহারাই পাল্টে যাবে। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলবই। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন উল্লেখ করে আরও বলেন, আগামী ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হবে। আমরা চাই জনগণের ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে।

১১ জুলাই
* স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান চরমপত্রের উপস্থাপক এমআর আখতার মুকুল, চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত, কণ্ঠশিল্পী তিমির নন্দী, ফকির আলমগীরসহ মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা আরও ৫৮ জন শব্দসৈনিককে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৪৪তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই শব্দসৈনিকদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

8-1-2017 9-28-33 PM১২ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার উন্নয়নের মহাসড়কে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জনগণকে এগিয়ে চলার শক্তি জোগাচ্ছে। উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ১৬ কোটি মানুষের আস্থা ও সমর্থনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ২০৪১ সালের আগেই উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে তিনি প্রস্তুত। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা।

১৮ জুলাই
* চার বছর আগে মিরপুরের পল্লবীতে নির্মম নির্যাতনের পর শিশু গৃহকর্মী আদুরিকে মৃত ভেবে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই আদুরির মামলার রায়ে গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদ- ও ১ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন ঢাকার ৩ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার।

১৭ জুলাই
* নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত রোডম্যাপের বাস্তবায়ন দেখে আওয়ামী লীগ মন্তব্য করবে বলে জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নেতাদের সাথে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

১৯ জুলাই
* লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট বা বৈধ কোনো কাগজ নেই। তারেক রহমান ব্রিটিশ সরকারের কাছে তিন বছর আগে তার পাসপোর্টটি জমা দেন। ওই পাসপোর্টটি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে এখন সরকারের কাছে আছে। এ ছাড়া তারেকের অভিবাসন স্ট্যাটাস বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে নেই। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য দেন।

২২ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ধর্মাবলম্বী মানুষ যাতে শান্তিতে বসবাস করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে সে জন্য হজযাত্রীদের দোয়া করতে বলেছেন। আওয়ামী লীগ কখনোই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেনি; বরং ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর অবৈধ সেনাশাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে বারবার ধর্মকে হাতিয়ার করেছেন। রাজধানীর কুর্মিটোলা বিমানবন্দর এলাকার আশকোনা হজ ক্যাম্পে এ বছরের হজ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

২৩ জুলাই
* নতুন প্রজন্ম যাতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে, সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে ১৯৭১ সালের গণহত্যা সংক্রান্ত অ্যালবাম থাকা আবশ্যক এবং তাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। বঙ্গভবনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের কাছ থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার ওপর স্মারক ডাকটিকিট অ্যালবাম’ গ্রহণকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

২৪ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প যেন এক্ষেত্রে পিছিয়ে না থাকে। বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি রয়েছে। আর আমরা বিজয়ী জাতি। তাই বাঙালির এই বিজয় সর্বক্ষেত্রে বজায় রাখতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক ও আন্তর্জাতিকমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৫ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখতে এ কথা বলেন।

২৫ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দেয়ার লক্ষ্যে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা যে সিদ্ধান্ত নেই, সেটা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের ওপর বর্তায়। তাই আপনাদের আন্তরিকতা, কর্মদক্ষতা, যোগ্যতাই পারে এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান পাল্টে দিতে। কাজেই আপনারা সেভাবেই কাজ করবেন। আর সরকারি সেবা গ্রহণে মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতাই একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনকালে শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে জনসচেনতা সৃষ্টি করতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, করাপশন (দুর্নীতি) দূর করতে হবে আমাদের। কারণ কোনো কাজ করতে গেলে সেখানে যদি করাপশন হয়, আর সেটুকইি যদি খেয়ে ফেলে তা হলে আমার উন্নয়নের ছোঁয়াটা গ্রাম-বাংলায় বা কোথাও লাগবে না। কাজেই এ ব্যাপারে আপনাদের জনসচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে এবং নিজেদের এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। আর দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য কাজ করবেÑ এটাই যেন সবার লক্ষ্য হয়।

২৬ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান এবং এটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই কাজ করছে। তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত সোফি অবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি আরও বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই কাজ করছে। বৈঠকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত নির্বাচন কমিশনের স্মার্টকার্ড প্রকল্পের প্রশংসা করে বলেন, এই প্রকল্পটি ফরাসি প্রতিষ্ঠান ওবের্থার টেকনোলজিস (ওটি)’র সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য সোফি প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন।

২৭ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা আছে বলেই মানুষ উন্নয়নের ছোঁয়া পাচ্ছে। বিশ্বনেতারা এখন আর বাংলাদেশকে করুণার চোখে দেখেন না; বরং মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেন। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের সুফল উপভোগ করার কারণে দেশবাসী আবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গণভবনে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা এবং পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভাসহ নানা আয়োজনে রাজধানীসহ সারাদেশে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়।

২৮ জুলাই
* আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, দল ভারী করার জন্য খারাপ লোককে দলে ভেড়াবেন না। কোনো সন্ত্রাসী, ইয়াবাসক্ত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাউকে সদস্য করবেন না। নিজে ভালো কিন্তু আশপাশের লোক খারাপ হলে আপনাকে ডুবিয়ে দেবেÑ এমন লোক থাকলে তাদের পরিহার করুন; নয় সংশোধন করুন, না হলে সংগঠন থেকে বের করে দিন। পরিষ্কার কথা, পকেট কমিটি করা বাদ দিন, ত্যাগী কর্মীদের কোণঠাসা করে নিজের আত্মীয়স্বজন দিয়ে পকেট কমিটি করা চলবে না। মন্ত্রী বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কের পায়রা নদীর ওপর পায়রা সেতুর (লেবুখালী সেতু) নির্মাণকাজ পরিদর্শন এবং প্রস্তাবিত শেখ হাসিনা সেনানিবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় লেবুখালীতে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সদস্য সংগ্রহ অভিযান উদ্বোধন উপলক্ষে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এ কথা বলেন।

২৯ জুলাই
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের উন্নয়ন সহযোগী ১২টি দেশের সহযোগিতায় ১০০ বছর মেয়াদি ‘হান্ড্রেড ইয়ার বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান (বিডিপি)-২১০০’ নামে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত এই পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় সমতল, পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া হয়েছে। এতে ১০০ বছরে পানির প্রাপ্যতা, তার ব্যবহার এবং প্রতিবেশগত বিষয়সমূহ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে তিন দিনব্যাপী ‘ওয়াটার সামিট-২০১৭’ এর উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রাজধানী ঢাকায় নতুন খাল খনন, পুরনো খাল সংস্কার, জলাধার সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বিভাগীয় সদরগুলোতে ভূ-উপরিস্থিত নিরাপদ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এসডিজির নির্ধারিত সময়সীমা ২০৩০ সালের আগেই আমরা শতভাগ মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করতে চাই। তবে ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ২০২১ সালের মধ্যেই সকলের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে পারব।

৩০ জুলাই
* বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডন মিশন নিয়ে সরকার ও দলের যৌথ উদ্যোগে জোরালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। তিনি বলেছেন, আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুড়তে চাই না। বিষয়টা টুইটার-ফেসবুকে এসেছে। এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। দলের সম্পাদকম-লীর বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের কাছে মনে হয়, আগামী নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিএনপি এখন বিদেশে বসে ষড়যন্ত্রের চোরাগলি খুঁজে বেড়াচ্ছে। ষড়যন্ত্রের চোরাগলি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পথ খুঁজছে। বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপিকে ভাবছে না দাবি করে তিনি বলেন, বিএনপির অতীত হচ্ছে দুঃশাসন ও হাওয়া ভবন। বর্তমান অবস্থান হচ্ছে নালিশ আর কান্নাকাটি।
গ্রন্থনা : আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

Category:

১৭ আগস্ট ২০০৫ : বিএনপি-জামাতের মদদে সিরিজ বোমা হামলা

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-25-07 PM সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: ১৭ আগস্ট ২০০৫, সকাল ১১টায় জামাত-বিএনপি জোট সরকারের সময় দেশের ৬৩ জেলায় (মুন্সিগঞ্জ বাদে) সিরিজ বোমা হামলা চালায় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবির জঙ্গিরা। দেশের ৩০০টি স্থানে মাত্র আধাঘণ্টার ব্যবধানে একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছিল জেএমবি। এতে দুজন নিহত ও দুশতাধিক লোক আহত হয়। সিরিজ বোমা হামলার স্থান হিসেবে জঙ্গিরা হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, বাংলাদেশে থাকা মার্কিন দূতাবাস, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেসক্লাব ও সরকারি-আধাসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেছে নেয়। হামলার স্থানসমূহে জেএমবির লিফলেট পাওয়া যায়। লিফলেটগুলোতে বাংলাদেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাসহ বিচারকদের প্রতি হুমকি বার্তা পাঠানো হয়।
জেএমবি’র প্রথম নাশকতার শুরু ২০০১ সালে। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস মাঠে বোমা হামলা চালায় তারা। এতে তিনজন নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হন। এরপর ২০০২ সালের ১ মে নাটোরের গুরুদাসপুরে কিরণ সিনেমা হলে ও ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ৪টি সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা ঘটালেও তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের টনক নড়েনি।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং চারদলীয় জোট সরকারের প্রভাবশালী কয়েক মন্ত্রী-এমপি-নেতার প্রত্যক্ষ মদদেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল কুখ্যাত জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই। স্বঘোষিত আঞ্চলিক শাসন জারি করে জেএমপি রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁর আত্রাই-রাণীনগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। জিয়া পরিবারের সাথে বাংলাভাইয়ের সম্পর্কের গভীরতা এতটাই বেশি ছিল যে, প্রকাশ্যেই তারেক রহমানকে মোবাইল ফোনে সম্বোধন করত ‘মামা’ বলে। উইকিলিকসের ফাঁস করা বার্তায় দেখা যায়, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের তখনকার চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স জুডিথ চামাসকে এ কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকী।
8-1-2017 9-25-44 PMএমনকি বাংলাভাই নিজে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়ে তার কর্মকা- সম্পর্কে জানান দিলেও তখন সরকার জঙ্গি তৎপরতার উপস্থিতি পুরোপুরি অস্বীকার করে। বেগম খালেদা জিয়া নিজেই বলেছেন, ‘বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।’ প্রতিবাদ করলেও অনেক গণমাধ্যম শেখ হাসিনার কথায় শুরুতে কান দেয় নি। জঙ্গিদের পেছনে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতাদের সমর্থন থাকায় একপর্যায়ে বাংলাভাইয়ের মিছিল করতে সরকারি ও বেসরকারি জিপ, কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল পাঠানোর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। পুলিশকে দিতে হয়েছে বাংলাভাইয়ের কর্মসূচিতে নিরাপত্তা। তবে বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে জঙ্গিদের আড়াল করার খালেদা জিয়ার চেষ্টার কিছুদিন পরই ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে জেএমজেবি ও জেএমবি তাদের সরব উপস্থিতির জানান দেয়। এ ঘটনাটি জাতিকে স্তম্ভিত ও বিস্মিত করে।
সিরিজ বোমা হামলার পর আবার শুরু হয় ধারাবাহিক হামলা। তারই জের ধরে ওই বছরই ৩ অক্টোবর চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের জেলা আদালতে বিচার কাজ চলাকালে বেলা ১২টায় আবার একযোগে বোমা হামলা চালানো হয়। এজলাসে ঢুকে বিচারককে লক্ষ্য করে বোমা ছুড়ে মারা হয়। তিন জেলা আদালতে প্রতি জেলায় ৩টি করে মোট ৯টি বোমা ছোড়া হয়। এর মধ্যে ৫টি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বাকিগুলো অবিস্ফোরিত থাকে। এর ১৫ দিন পর ১৯ অক্টোবর সিলেটের দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীকে হত্যা করতে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু বোমার আঘাতে মারাত্মক আহত হন। এর মাসখানেক পরেই ১৫ নভেম্বর বহুল আলোচিত ঝালকাঠি শহরের অফিসার পাড়ায় জাজেস কোয়ার্টারের সামনে বিচারকদের বহনকারী মাইক্রোবাসে শক্তিশালী বোমা দিয়ে হামলা চালানো হয়। বোমা বিস্ফোরণে ঝালকাঠি জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে নিহত হন। অল্পের জন্য রক্ষা পান আরেক বিচারক আবদুল আউয়াল। এ বছরই ৩০ নভেম্বর গাজীপুর ও চট্টগ্রাম আদালতে পৌনে এক ঘণ্টার ব্যবধানে আত্মঘাতী জঙ্গিরা গায়ে বোমা বেঁধে হামলা চালায়। এতে দুই জঙ্গিসহ ৯ জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। ২ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা আদালতে আবারও চায়ের ফ্ল্যাক্সে করে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে সাতজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়। জেএমবি সাড়ে চার বছরে (সেপ্টেম্বর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৫) দেশে ২৬টি হামলা চালায়। এসব ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং প্রায় ৮০০ জন আহত হন। একই সময়কালে হরকাতুল জিহাদও (হুজি-বি) বেশ কয়েকটি নাশকতামূলক হামলা চালায়। সব মিলিয়ে তখন দেশে সৃষ্টি হয় এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।
বর্তমান সময়ে ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গিদের নারকীয় সন্ত্রাসী হামলায় দেশি-বিদেশি নিরপরাধ ২৬ জনসহ চার পুলিশ নিহত হয়েছেন। সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকার মিরপুরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দক্ষতার সাথে সকল ষড়যন্ত্রকে প্রতিহিত করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জঙ্গি দমনে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদের স্থান থাকতে পারে না। এ দেশের মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে অসাম্প্রদায়িক এবং জঙ্গিবাদবিরোধী। মুষ্টিমেয় কতিপয় বিপথগামী ব্যক্তি আমাদের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নষ্ট করতে পারবে না। সকলের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একটি নিরাপদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

Category:

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা: রক্তপিপাসু বিএনপি-জামাত জোটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-20-06 PMরায়হান কবির: স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাতের বর্বরোচিত হত্যাকা-ের পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘাতকের ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় নৃশংস আরেকটি হত্যাকা-। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় বর্বরোচিত ও বহুল আলোচিত গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জনের নির্মম মৃত্যু হয়। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের প্রথমসারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এ ঘৃণ্য হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হন, তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রেনেডের স্পিøন্টারের আঘাতে আহত হন কয়েক শতাধিক মানুষ।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট : ২০০৪ সালের সারাদেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২১ আগস্ট বিকেলে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকেল ৫টায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন।
এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহতরা হলেনÑ সাবেক রাষ্টপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমান, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।
শুধু গ্রেনেড হামলায় নয়, বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য তার গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয় ছয় রাউন্ড গুলি। গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গাড়িতে তোলার সময় গুলিতে নিহত হন তার ব্যক্তিগত সহকারী মাহবুব আলম। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেট প্রুফ গাড়িটি। গ্রেনেড হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মক আহত হন তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
গ্রেনেডের স্পিøন্টারের আঘাতে আহত হন আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতাকর্মী। আহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অনেকে এখনও স্পিøন্টারের আঘাত নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছেন। সেদিন যারা আহত হয়েছিলেন তাদের অনেককেই সারাজীবন গ্রেনেডের স্পিøন্টার বহন করে চলতে হবে। কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব নিয়েই বেঁচে আছেন।
বস্তুত জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পাশাপাশি দলের প্রথমসারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এ ঘৃণ্য হামলা চালানো হয়। বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়।
গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মতিঝিল থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে এই মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলাটি তদন্তের ভার পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।
মামলার আসামি : চার্জশিটে অভিযুক্ত ৫২ জনের মধ্যে ১৯ জন পলাতক, ৮ জন জামিনে রয়েছে এবং বাকিরা বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসি হয়। মামলার আরেক আসামি মুফতি হান্নানের ফাঁসি হয়েছে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায়।
মামলার আসামি বিএনপি-জামাত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু কারাগারে রয়েছে। এ মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী এবং সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তাÑ সিআইডি’র সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডি’র সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদ জামিনে রয়েছে।
পলাতকদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়েছে লন্ডনে, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ মধ্যপ্রাচ্যে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ কলকাতা, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আমেরিকায়, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোরসালীন ও তার ভাই মহিবুল মুত্তাকিন ভারতের একটি কারগারে এবং মওলানা তাজুল ইসলাম দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। জঙ্গি নেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর ও মওলানা লিটন ওরফ জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, ডিএমপি’র তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (পূর্ব) ও ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) মো. ওবায়দুর রহমান এবং খান সৈয়দ হাসানও বিদেশে অবস্থান করছে। তবে আসামি হারিছ চৌধুরীর অবস্থান জানা যায়নি। পলাতকদের মধ্যে আরেক আসামি মওলানা তাজউদ্দিন আটক সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই।
গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটজন আসামি। তারা হলেনÑ মুফতি হান্নান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান সুমন ও রফিকুল ইসলাম সবুজ। তবে মামলায় জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবির সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন আসামির সংখ্যা ৪৯, যাদের মধ্যে তারেক রহমানসহ পলাতক রয়েছেন ১৮ জন।
গত ৩০ মে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা হয়েছে। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওই মামলায় এ পর্যন্ত ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে মামলার আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষী গ্রহণ চলছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকা-ের বিচারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু তাই নয়, এই হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন আসামিপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ হবে। শিগগিরই বিচারকাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও জজ মিয়া নাটক : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরদিন রাজধানীর মতিঝিল থানায় ২২ আগস্ট হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়। প্রথম দফায় মতিঝিল থানার এসআই আমীর হোসেন আর দ্বিতীয় দফায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শামসুল ইসলাম মামলার তদন্ত করেন। মামলা তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান তড়িঘড়ি করে মামলা সিআইডি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। মামলা চলে যায় সিআইডিতে। বাবরের নির্দেশে শুরু হয় মামলা তদন্তের নামে প্রহসন। প্রথম দফায় মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএনপি-জামাতের আশীর্বাদপুষ্ট সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমানকে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েই তিনি ঢাকার ৫৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোখলেছুর রহমান, শৈবাল সাহা পার্থ, আব্বাসসহ ২০ জনকে পরিকল্পিতভাবে গ্রেফতার করেন।
এরপর গ্রেনেড হামলা মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান জজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে সোজা মালিবাগ সিআইডি অফিসে নেওয়া হয়। সে ছিল সামান্য দিনমজুর। জজ মিয়ার পুরো পরিবারকে আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার লোভ দেখায় সিআইডি। প্রথম দিকে সিআইডির প্রস্তাবে রাজি হয়নি জজ মিয়া। এরপর জজ মিয়ার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। সিআইডির কথামতো না চললে জজ মিয়াকে কমপক্ষে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে। ফলে সারাজীবন জেলের অন্ধকারে থাকতে হবে। এ জীবনে আলোর মুখ দেখা হবে না। এমন ভয় দেখানো হয় জজ মিয়াকে। সর্বশেষ এতেও রাজি না হলে জজ মিয়াকে চোখ বেঁধে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যায় জজ মিয়া। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে জজ মিয়া সিআইডির কথামতো রাজি হয়।
এমন চাপের মুখে জজ মিয়া আদালতে গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়। জজ মিয়াকে গ্রেফতারের পরদিন ২০০৫ সালের ১০ জুন গুলশান থানায় তদন্তাধীন থাকা এক ব্যবসায়ী হত্যার পুরনো মামলায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার হয় দুই ভায়রা আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলাম। তাদেরও গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এ দুজনকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন সিআইডির আলোচিত তিন কর্মকর্তা।
এমন জবানবন্দিকে পুঁজি করেই ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর ১৫ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে ১১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিলের অনুমতি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চার্জশিটের অনুলিপি দেয় সিআইডির এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান।
মুন্সী আতিকের তদন্ত নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রশ্ন তুললে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রশীদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবদুর রশিদ ও ঢাকা মেট্রোর ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সুপারভাইজার (এসএস) এসপি রুহুল আমিন মামলা তদন্তের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন। মামলার তদন্ত নিয়ে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটির পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীরকে। তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে জজ মিয়া নাটকসহ চাঞ্চল্যকর কাহিনি। ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে এই মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলাটি তদন্তের ভার পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।
পাকিস্তানি আর্জেস গ্রেনেড এবং বিএনপি-জামাত ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পরিকল্পনা : গ্রেনেড হামলা মামলায় সিআইডির তদন্তে উদঘাটিত হয় একের পর এক সত্য। হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেড ছিল পাকিস্তানি। তৎকালীন  বিএনপি-জামাত জোট সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে নেওয়া ১৫টি গ্রেনেড দিয়ে ওই দিন শেখ হাসিনার জনসভায় হামলা চালানো হয়। হাওয়া ভবনে ওই হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বৈঠক হয়। হাওয়া ভবনে বিএনপি চেয়ারপারসনের পুত্র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর নূর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, আবদুস সালামসহ বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতা এবং মুফতি হান্নানসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের বৈঠকে গ্রেনেড হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে যা মুফতি হান্নাসহ অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে।
মুফতি হান্নান তার জবানবন্দিতে গ্রেনেড হামলার জন্য দায়ী করেন বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, আবদুস সালাম পিন্টু, তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে।
স্বীকারোক্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রথম বৈঠক হয় হাওয়া ভবনে। সেই বৈঠকে ছিলেন তারেক রহমান, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফজ্জামান বাবর, আল মারকাজুল ইসলামের নায়েবে আমির আবদুর রশিদও।
পরদিন আরেকটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে হামলার সিদ্ধান্ত হয়। এই বৈঠকে পুলিশ ও গোয়েন্দারা সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।
তৃতীয় বৈঠকটি হয় মিন্টো রোডে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সরকারি বাসভবনে। এরপর সর্বশেষ বৈঠকটি হয় হামলার তিন দিন আগে। ১৮ আগস্টের ওই বৈঠকটি হয় বিএনপি আমলের শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায়। সেখানে পিন্টুর ছোট ভাই তাজউদ্দীন ও তার আত্মীয় আবু তাহের ছাড়াও ছিলেন হরকাতুল জিহাদের আমির আবদুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ, প্রধান কমান্ডার জাহাঙ্গীর বদর জান্দাল ও সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান উল্লাহ কাজল। বৈঠক চলাকালে ৩টি কালো গাড়ি যায় ওই বাসায়। এর একটিতে ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। অন্য দুটি গাড়ি থেকে নামেন আরও দুজন। বৈঠক চলাকালে একটি সবুজ রঙের ব্যাগ থেকে দুটি প্যাকেট বের করেন বাবর। এর প্রতিটিতে ৫টি করে ১০টি এবং আরও দুটি খোলাসহ মোট ১২টি গ্রেনেড ছিল। গ্রেনেড হামলায় অবিস্ফোরিত একটি গ্রেনেড পরীক্ষা করে তৎকালীন দায়িত্বরত র‌্যাব কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, গ্রেনেডটি জার্মানির তৈরি। যা আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গি অধ্যুষিত দেশে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে পড়ে থাকা গ্রেনেডটির গায়ে লেখা ছিলÑ ‘URGES-84, Made in Germany’ এবং ‘গ্রেনেডটি মিলিটারি ভার্সন’।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশে বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতেই পাকিস্তান থেকে আর্জেস গ্রেনেড আনা হয়েছিল। ২১ আগস্টের পর সারাদেশ থেকে ৭৫টি ৮৪ মডেলের আর্জেস গ্রেনেড গ্রেনেড উদ্ধার হয়, যা পাকিস্তানের তৈরি অধিক উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক। যার মধ্যে একটি গ্রেনেড ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর এক খুনির সেলের সামনে থেকে কারা কর্তৃপক্ষ ও লালবাগ থানা পুলিশ উদ্ধার করে। শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলায় মারা গেলে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কারাগারের মূল ফটক উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
গ্রেনেড হামলা পরিকল্পনার বৈঠকে তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাররের দেওয়া হামলায় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সহযোগিতার যে আশ্বাস দেওয়া হয়, তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটায় তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের প্রশাসন। যার প্রমাণ মেলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরদিন ২২ আগস্ট দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়Ñ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উল্টো দিকের বহুতল ভবন ‘সিটি ভবনের’ ছাদ থেকে পুলিশের সহায়তায় এই গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। সিটি ভবনের ছাদ থেকে যখন কয়েকজন জঙ্গি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তখন ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যরা তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
তৎকালীন সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ সভাস্থলে নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢাকা মহানগর পুলিশের পূর্ব বিভাগের ডিসি, এডিসি, এসি ও ওসির নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যাপারে নিয়ম অনুযায়ী তদারকি করার কথা। কিন্তু তারা কোনো তদারকি করেছেন এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা পাননি। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০০ কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও সদস্য মোতায়েন ছিল। গ্রেনেড হামলার সময় তাদের কারও আগ্নেয়াস্ত্র থেকেই এক রাউন্ড গুলিও বর্ষণ করা হয়নি। কর্তব্যরত পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সদস্যরা গ্রেনেড হামলা শুরুর পরপরই দায়িত্ব-কর্তব্য ফেলে দিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এমনকি বহুতল ভবনের ছাদের (রুফটের) সকল স্থানে পুলিশ ডিউটি দেওয়া হয়নি। দু-তিনটি ছাদে যাদের ডিউটি দেওয়া হয়েছিল তারাও গ্রেনেড হামলার শব্দ শুনে ছাদ থেকে পালিয়ে অন্যত্র দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, গ্রেনেড হামলার আগে সভাস্থলের আশপাশে ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়নি। এমনকি গ্রেনেড হামলার পাঁচ দিন পরও সভাস্থলে ডগ স্কোয়ার্ডকে নেওয়া হয়নি। গ্রেনেড হামলার পর একাধিক অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধারের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ ছিল না। আততায়ীরা এসব ঘটনায় সম্পূর্ণ নিরাপদে নির্বিঘেœ গ্রেনেড হামলায় হতাহত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পেরেছে।

Category:

বঙ্গবন্ধু-পরিবার ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর

Posted on by 0 comment

আরেক দিক থেকে ভাবতে গেলে বলতে হয়Ñ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে ক্রীড়া পরিবার ভাবতে পারাটা বেশ বিরল ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধু-পরিবার বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত একমাত্র উদাহরণও।

8-1-2017 9-15-39 PM   আরিফ সোহেল: রক্ত¯œাত আগস্ট মাস। এই মাস এলেই ভেসে ওঠে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবার-পরিজনের মুখাবয়ব। বাংলা ও বাঙালির নিখাদ আপনজন বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের জন্য লড়াই করতে গিয়ে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন নির্জন কারাগারে। বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য, শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতন মুক্ত করার জন্য যিনি ‘রাজনীতি’ বেছে নিয়েছেনÑ সেই মহৎ মানুষটি ও তার পরিবারের সদস্যদের রয়েছে ক্রীড়াঙ্গনে বর্ণাঢ্য পদচারণা; রয়েছে স্বর্ণোজ্জ্বল অতীত, রয়েছে ক্রীড়ার প্রতি অনুরাগ আর অবদানের অসংখ্য স্বাক্ষর। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র অর্জনে যে পরিবারটির সংগ্রাম-ত্যাগ-অবদানের কথা জাতির সামনে সুস্পষ্টÑ সেই পরিবারটিই বাংলাদেশের একটি বৃহৎ ‘ক্রীড়া-পরিবার’।
আরেক দিক থেকে ভাবতে গেলে বলতে হয়Ñ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে ক্রীড়া পরিবার ভাবতে পারাটা বেশ বিরল ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধু-পরিবার বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত একমাত্র উদাহরণও। বিস্মিত হওয়ারই বিষয়, এক পরিবারে এতজন ক্রীড়াবিদ-ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব! যারা কি না এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক একটি বাতিঘর!
স্বাধীনতার আগে ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানও ছিলেন একজন পরিচিত ফুটবলার। বঙ্গবন্ধু নিজেও ছিলেন কৃতী ফুটবলার; খেলতেন হকি, ভলিবলও। খেলাধুলার অনুরাগের পাশাপাশি ক্রীড়া-উন্নয়নে ছিল তার বিশেষ নজর। আপাদমস্তক ক্রীড়াপ্রাণ বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল এ আঙিনায় যেন পিতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। মেজ ছেলে শেখ জামাল ছিলেন ফুটবল ও ক্রিকেট খেলোয়াড়। এদিকে শেখ কামালের সহধর্মিণী মেধাবী ক্রীড়াবিদ সুলতানা কামালের নাম যেন ক্রীড়াঙ্গনের সবুজ মাঠের প্রতিটি ঘাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে। তারা সবাই আজ ফ্রেমবন্দি। কিন্তু জীবনের বাঁকে বাঁকে তারা এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন করেছেন সমৃদ্ধ।
ক্রীড়াপ্রাণ বঙ্গবন্ধু-কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়। যিনি ক্রীড়াবিদ না হয়েও ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আপনজন, দায়িত্বশীল অভিভাবক, নিবেদিতপ্রাণ দর্শকÑ ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্র পরিচালনাকালেই বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনের বড় অর্জনগুলো স্পর্শ করেছে। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে ওয়ানডে ও 8-1-2017 9-15-52 PMটেস্ট মর্যাদা কিংবা ফুটবলে সাফের স্বর্ণ বিজয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম জড়িয়ে রয়েছে। জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট, টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট, এসএ গেমস ও বাংলাদেশ গেমস আয়োজনের মতো ঘটনার সঙ্গে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অনুষ্ঠিত চতুর্থ রোলবল বিশ্বকাপের আসরে ছুটে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতার ছোট মেয়ে শেখ রেহানারও ক্রীড়ার প্রতি রয়েছে বিশেষ উৎসুক্য। তাকেও বড় আয়োজনে দর্শকসারিতে সরব দেখা গেছে। কখনও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, কখনও সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল কিংবা মুজিব ববিকেও স্টেডিয়ামে মাঝে মধ্যে দেখা যায়।

বঙ্গবন্ধুর পিতা ফুটবলার শেখ লুৎফর রহমান
বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান পেশাগত জীবনে সেরেস্তাদার হলেও খেলাধুলার প্রতি তার ছিল বিশেষ অনুরাগ। তিনি গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাবের ফুটবল টিমের অধিনায়কও ছিলেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তিনি ক্লাবটির সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেন। ফুটবল খেলাতে শেখ লুৎফর রহমান বিশেষ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেনÑ “আমার আব্বাও ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম ও আমার টিম যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুল টিম খুব ভাল ছিল। মহকুমায় যারা ভাল খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম।” তিনি আরও বলেছেন, “অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না। খেলোয়াড়দের বাইরে থেকে আনত। সবাই নামকরা খেলোয়াড়। বৎসরের শেষ খেলায় আব্বার টিমের সাথে আমার টিমের পাঁচ দিন ড্র হয়। আমরা তো ছাত্র; এগারজনই রোজ খেলতাম, আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত।”

ক্রীড়াবিদ-ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষক বঙ্গবন্ধু
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী ও ক্রীড়াবিদ। রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুর সামনে খেলোয়াড় শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিয়ার হয়তো খুব দীর্ঘ নয়। তবে ক্রীড়াঙ্গন নিয়েই যাদের চিন্তা-চেতনা তাদের কাছে ক্রীড়া সংগঠক শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্য অম্লান। হয়তো সে কারণেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা আজও চিরভাস্বর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আত্মজীবনীতেই বলছেন, “ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভাল ব্রতচারী করতে পারতাম।” শৈশব-কৈশোরে তার খেলাধুলার প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি অন্যত্র বলেছেন, “ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতাম।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলজীবন থেকেই সক্রিয়ভাবে খেলাধুলায় অংশ নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ভলিবল, বাস্কেটবল ও হকিও খেলতেন। তিনি স্কুল ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। তার উদ্যোগই ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মিশন স্কুলে গড়ে উঠেছিল ফুটবল ও ভলিবল দল। স্কুলজীবনে বঙ্গবন্ধুর বিরামহীন ক্রীড়াচর্চা ক্রমান্বয়ে তাকে পরিপক্বতার দিকে নিয়ে যায়। একসময় তিনি প্রাদেশিক পর্যায়ের ফুটবল দলেও জায়গা করে নেন। ১৯৪০ সালের শুরুতে তিনি রাজধানী ঢাকায় ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। নিয়মিত খেলার সুযোগ না থাকলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪১ থেকে আমৃত্যু ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে বগুড়ায় একটি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন  করা হয়েছিল। এই টুর্নামেন্টে তার নেতৃত্বে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে বাস্কেটবলও খেলেছেন। রাজনীতির কারণে মাঠকে একটু দূরে ঠেলে দিলেও ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালেও কখনও কখনও তিনি প্রাণের টানে চলে যেতেন ক্লাব প্রাঙ্গণে।
8-1-2017 9-16-02 PMদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সরকার আমলেই ক্রীড়াঙ্গনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি ক্রীড়াঙ্গনের কিশোর-যুবকদের সম্পৃক্ত করার তাগিদ অনুভব থেকেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমকে নিজ থেকে খতিয়ে দেখতেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে (তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে) একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল প্রতিযোগিতা মাঠে গড়ায়। স্বাধীনতা-উত্তর ক্রীড়াঙ্গনের এই অভিযাত্রা প্রথম ম্যাচটি উদ্বোধন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে তিনি ১৯৭২ সালে গঠন করেনÑ ‘ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা’। ওই সময়ে এই সংস্থাটি শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অধীনে পরিচালিত হতো। পরে ক্রীড়াঙ্গনের আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদের পাস হয় বাংলাদেশ স্পোর্টস কাউন্সিল অ্যাক্ট। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার তার পরিকল্পনা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। এক কথায় রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
শেখ কামাল এক অনন্য ক্রীড়াব্যক্তিত্ব
বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু-সন্তান শেখ কামাল ছিলেন একজন অতুলনীয় ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব। তিনিই প্রথম এ দেশে আধুনিক ধারার ক্লাব ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু ক্লাব প্রতিষ্ঠা নয়Ñ শেখ কামাল বিদেশি কোচ এনে শক্তিশালী আবাহনী দল গঠন করে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেন। সেই আবাহনী আজও বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ক্লাব; সেই আবাহনীর অগ্রযাত্রা আজও অব্যাহত আছে। এরই ধারাবাহিতকতায় ‘আবাহনী লিমিটেড’ গঠনের মাধ্যমে শেখ কামালের রেখে যাওয়ার স্বপ্ন আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ ক্রীড়াপ্রাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরামহীনভাবে করে যাচ্ছেন।
শুধু ফুটবল নয়, ক্রীড়াব্যক্তিত্ব শেখ কামাল বাস্কেটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও অ্যাথলেটে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ঢাকা ক্রিকেট লিগের চ্যাম্পিয়ন আবাহনী ক্রীড়া চক্র ও একই সালে বাস্কেটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স দলের খেলোয়াড় ছিলেন শেখ কামাল। একই বছর সলিমুল্লাহ হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হয়েছিলেন দ্রততম মানব। এবং তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ব্যাডমিন্টনের দ্বৈতে রানার্সআপও হয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা মেট্রোপলিশ ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। শেখ কামাল আবাহনী ক্রীড়া চক্রের হয়ে ফুটবল এবং ক্রিকেট খেললেও বাস্কেটবল খেলেছেন বাবার প্রিয় ক্লাব ওয়ান্ডারার্সের হয়ে। তার নেতৃত্বে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাস্কেটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। শেখ কামাল রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়ার পরও খেলাধুলাই তার কাছে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল।
আজ শেখ কামাল নেই। তারপরও আবাহনী ক্রীড়া চক্র তার নামকে বুকে ধারণ করে ক্রীড়াঙ্গনে জ্বলজ্বল করছে। আর শেখ কামালের হাতেগড়া আবাহনীকে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকা অবস্থায় কিংবা বাইরে থাকার সময়ও, অর্থাৎ সবসময়Ñ শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন।
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেখ কামালের পাশাপাশি শেখ জামালকে আবাহনীর সাথে জড়িত করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম অগ্রপথিক শেখ কামালসহ ক্লাবের সঙ্গে জড়িত অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তার হাত ধরেই স্বাধীনতার গৌরবজনক সাফল্যের পর আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করে আবাহনী। ক্রিকেটার শেখ কামাল একজন পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও রান করতে পারতেন। তিনি বল হাতে ওপেনিং করেছেন জাহাঙ্গীর শাহ বাদশার সঙ্গে। শেখ কামাল ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য। তবে শুধু ক্রিকেট নয়Ñ সেখানে তিনি ফুটবল ও বাস্কেটবল দলেও ভূমিকা রেখেছেন। এবং একজন অ্যাথলেট হিসেবে শেখ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অংশ হয়ে আছেন।
চ্যাম্পিয়ন সুলতানা কামাল
১৯৭৩ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল জাতীয় দলের ক্রীড়াবিদরা। সে দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন সুলতানা কামাল খুকি। ওই আসরে যাবার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু সুলতানা কামাল খুকিকে বললেন, ‘বাঙালীর মান রাখতে পারবি তো?’ খুকির সাহসী উত্তর ছিলÑ ‘পারব।’ খুকি ওই আসরে লংজাম্প ইভেন্টে দ্বিতীয় হন তিনি। এটাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে প্রথম কোনো পদক জয়। ফলে এটাই হয়ে দাঁড়ায় রেকর্ড। তিনি দেশে ফেরার পর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু খুকিকে বাহবা দিয়েছিলেন। খুকি তখনও 8-1-2017 9-16-15 PMবঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ হননি। খুকির বড় ভাই বাবুল ছিলেন শেখ কামালের বন্ধু। তার মাধ্যমেই পরিচয়। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠনতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখাদেখি। ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহ দুজনেরই। তাই একে একে দুই মিলে যায় একসময়ে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ১৯৭৫ সালেও হার্ডলসে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন খুকি।
খুকি শুধু একজন ভালো অ্যাথলেটই ছিলেন না, ছিলেন দক্ষ সংগঠকও। মেয়েরা যেন খেলাধুলায় মন ঢেলে দেয়, সে জন্য রীতিমতো কাউন্সিলিংও করাতেন তিনি। ১৯৬৬ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের লংজাম্পে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক জেতেন স্কুলপড়–য়া খুকি। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অলিম্পিক গেমসে লংজাম্পে নতুন রেকর্ড গড়ে চ্যাম্পিয়ন হন খুকি। ১৯৭০ সালে অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে মেয়েদের মধ্যে সেরা হন তিনি। ১৯৭৩ সালে ১০০ মিটার হার্ডলসেও জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন সুলতানা কামাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাথলেটিক্সে প্রথম নারী ‘ব্লু’ সুলতানা কামাল খুকি। অ্যাথলেটিক্সের ‘গোল্ডেন গার্ল’ সুলতানা কামাল রোকেয়া হল ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পাকিস্তান প্রাদেশিক গেমসেও রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন সুলতানা কামাল।

ক্রীড়াবিদ শেখ জামাল
বঙ্গবন্ধু পরিবারের আরেক সদস্য শেখ জামালের নামও আলো ছড়াচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনে। কারণ, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালও ছিলেন খেলোয়াড়। ফুটবল ও ক্রিকেটের প্রতি তার ছিল বিশেষ ঝোঁক। তিনি প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে আবাহনী ক্রীড়া চক্র ও আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবে খেলেছেন। ক্রীড়াপ্রাণ শেখ জামাল ১৯৭২ সালে আবাহনী ফুটবল দলেও ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ঢাকা ফুটবল লিগে খেলেছিলেন। তোফাজ্জল হোসেন স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে তিনি ‘শেখ জামাল একাদশ’-এর হয়ে খেলেছেন। সে বছর ‘শেখ জামাল একাদশ’ দলটি শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছিল। শেখ জামাল আবাহনী ক্রীড়া চক্রে ক্রিকেটও খেলতেন। তার নামে গড়ে উঠেছে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব।

Category:

তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩।

8-1-2017 9-11-18 PMতথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু: সেই মধুমতি পাড়ের স্বপ্নময় এক কিশোর থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠা। হয়ে ওঠা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন তো সিনেমার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয়। অথচ রাজনীতির এ মহানায়কের জীবনী নিয়ে আজও বাংলা ভাষায় কোনো পূর্ণাঙ্গ কাহিনিচিত্র নির্মিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নতির প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা এফডিসি’র প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার হাত ধরেই এফডিসি (ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেন। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয় নেতাকে নিয়ে চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। যেমনÑ মহাত্মা গান্ধী, লেনিন, চে-গুয়েভারা, আব্রাহাম লিংকনের মতো অনেককে নিয়ে বায়োপিক সিনেমা নির্মিত হয়েছে।
১৯৭১-এর আগে-পরে ছিল না এত টিভি চ্যানেল কিংবা উন্নত প্রযুক্তি। মোটের ওপর আশা ভরসা ছিল বিটিভি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা ভিডিওর মাধ্যমে যতটুকু দেখতে পাই তার সবটাই মূলত সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিংবা তার প্রাত্যহিক রাজনৈতিক কর্মকা-। তবে অল্প কিছু কাজ হয়েছে তাকে নিয়ে যেগুলোতে তার আদর্শ, অর্জন, স্বপ্ন ইত্যাদি ফুটে উঠেছে বেশ স্পষ্টভাবে।
রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল : বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩। চলে এলেন বাংলাদেশে। শুরু করলেন ডকুমেন্টারি নির্মাণের কাজ। অসাধারণ এ কর্মে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবন, তার প্রাত্যহিক কর্মকা-, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিবিধ বিষয়। প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক, যে সময় আমাদের মহান বিজয় দিবসের প্রথম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। সেই সাথে এ দিনটি অন্য একটি কারণে মহিমান্বিত। আর তা হলো, এদিন বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর করা হয়। শুরুর দিকে সেই নতুন সংবিধানের আলোকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের দুর্লভ মুহূর্ত ধারণ করা হয়েছে। এই ডকুমেন্টারিতে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের উপস্থিতি। প্রায় সকল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতির কারণে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমার ছোট ছেলে জন্মানোর পর থেকেই আমি বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছি। সে আমাকে তেমন একটা কাছে পায় নি। ফলে সে সবসময় আমাকে হারানোর ভয়ে থাকে, তাই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে।’ অবশ্য, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাত থেকে রাসেলের আর বাবাকে হারানোর ভয় নেই। সে বাবার সাথেই আছে সেই সময় থেকে। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নাস্তা শেষ করে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা, সংবিধান কার্যকর উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মানে পার্টিতে যোগদান এবং বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ফুটেজ সংযোজিত হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। সেই সাথে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় যেমনÑ ১৯৭১-এ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানি আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ, নতুন প্রণীত সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির জনক’ উপাধি, বাঙালি জাতির গর্বের বিষয়Ñ এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এ মহান ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি গ্রামেই থাকবেন তার ছেলে ও নাতি-নাতনী নিয়ে, ঢাকায় আসবেন না। একদম শেষ অংশে ধারাভাষ্যকার সংশয় প্রকাশ করেন, তার বাবার এই স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না। কারণ এই ব্যক্তি তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এ দেশের জন্য।
বাংলাদেশ! : ১৯৭২ সালে আরেকটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ!’ যেটি প্রযোজনা করেছিলেন এবিসি টিভি। এটি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত হয়। এখানে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ায় দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা দেন তার প্রথম লক্ষ্য এ দেশের মানুষের অন্ন সংস্থান করা, তাদের ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যুদ্ধকালীন বিজয় লাভের সন্ধিক্ষণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানকে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। একই সাথে তিনি অন্য দেশের সাথেও সম্পর্ক স্থাপনের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেনÑ তার লক্ষ্য জোটনিরপেক্ষ, স্বাধীন, পররাষ্ট্রনীতি। মার্কিন সাংবাদিক হাওয়ার্ড টাকনার এবং পিটার জেনিংসের সাথে সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তার এসব পরিকল্পনার কথা। এই প্রামাণ্যচিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা।
ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ : কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট যুদ্ধের ঠিক পরপর ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যা ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের মুহূর্ত, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা, বিচার প্রক্রিয়া, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণসহ যাবতীয় বর্বরতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বেশ ভালোভাবেই। একই সাথে তার রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য কারাগারবাস, রাজনৈতিক আদর্শ, বিশ্বনেতাদের প্রসঙ্গ যাদের তিনি অনুপ্রেরণার উৎস মানেন, সেসব বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারেই প্রথম বঙ্গবন্ধু জানান যে, বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ। তিনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াতে আহ্বান জানান এ আলাপচারিতায়।
দ্য স্পিচ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং এর বিশ্লেষণ নিয়ে আরেকটি তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য স্পিচ’। পরিচালনায় ছিলেন ফখরুল আরেফিন। এই ভাষণ বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময়। কারণ এর মাধ্যমেই স্বাধীনতাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে সামরিক শাসন জারি ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি জাতির উদ্দেশ্যে এমন বিস্তৃত খোলামেলা ভাষণ দেওয়া দুরূহ ব্যাপার। আরও দুঃসাধ্য সেটি ভিডিও করা এবং যুদ্ধদিনে সংরক্ষণ। ‘দ্য স্পিচ’ প্রামাণ্যচিত্রে সেই ইতিহাসটা তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রামাণ্যচিত্রে আমরা জানতে পারি কীভাবে শুরু হলো ভাষণ ভিডিও করার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং কঠোর গোপনীয়তায় সংরক্ষণ, যা পরবর্তীতে আমাদের ইতিহাসভিত্তিক উপাদানে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করেছে। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়েছে তাদের ঐ সময়কার কর্মকা- সম্পর্কে জানতে। যেমনÑ মূল পরিকল্পনাকারী তৎকালীন এমএনএ (মেম্বার অফ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) আবুল খায়ের, ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম)-এর ক্যামেরাম্যান আবুল খায়ের এবং এমএ মোবিন।
তা ছাড়া আবদুুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’, তারেক মাসুদের গান, বিশ্বজিৎ সাহার ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ প্রসংশিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির কারণে এবং ভালো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ১৫ আগস্টের নির্মমতার ওপর কোনো সম্পূর্ণ সিনেমা নির্মিত হয়নি, যা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এখন বোধকরি সময় এসেছে ‘বঙ্গবন্ধু ও তার শহীদ পরিবার’-এর ওপর উন্নতমানের তথ্যচিত্র ও পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের। আশা করি তা আমরা অচিরেই দেখতে পাব।

Category:

একটি মুখের হাসির জন্য

Posted on by 0 comment

ইমদাদুল হক মিলন:

8-1-2017 9-07-49 PMআপনে আসছেন কই থিকা?
বারবাড়ির সামনে দুটো জামগাছ। জামগাছের গা ঘেঁষে পাটখড়ির বেড়া। বারবাড়ির সঙ্গে ভেতর বাড়ি আলাদা করার জন্য এই ব্যবস্থা।
শিরিন দাঁড়িয়ে আছে বেড়ার সামনে। অচেনা মানুষের গলা শুনে মাথায় ঘোমটা দিয়েছিল। এখন একপলক মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে অকারণেই ঘোমটা আরেকটু টেনেটুনে ঠিক করল।
সকাল দশটা-এগারোটার রোদ বেশ ভালোই তেজালো হয়েছে। জামগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েও গরম খুব একটা কম লাগছিল না ইউসুফের। কিন্তু গরমের তোয়াক্কা করল না সে। হাসিমুখে বলল, আমি এসেছি ঢাকা থেকে।
চান কারে?
এটা নাসিরের বাড়ি না? মুক্তিযোদ্ধা নাসির হোসেন? স্বাধীনতার পরপর শুনেছিলাম এলাকার সবাই তাকে নাসির কমান্ডার নামে চেনে। যদিও সে কমান্ডার ছিল না। ছিল সাধারণ একজন মুক্তিযোদ্ধা।
ইউসুফের কথা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শিরিন। কোনো রকমে বলল, আপনে এত কথা জানলেন কেমনে?
আমরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মানে সহযোদ্ধা ছিলাম। যদিও নাসির বয়সে আমার চে’ ছোট। মুক্তিযুদ্ধের সময় একুশ-বাইশ বছর বয়স ছিল। দুর্দান্ত সাহসী, টগবগে দুর্ধর্ষ ধরনের তরুণ। মৃত্যুভয় কাকে বলে জানত না। গোয়ালিমান্দ্রার অপারেশনে দারুণ সাহস দেখিয়েছিল নাসির। যে কোনো অপারেশনে যেতে একপায়ে খাড়া। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে দু-তিনবার। লোকে নাসিরকে কমান্ডার বলত, আসলে কমান্ডার ছিলাম আমি। আমার নাম ইউসুফ, ইউসুফ মির্জা।
নামটা শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল শিরিন, দিশেহারা হলো। কন কী? আপনে ইউসুফ ভাই? আপনের কথা কত শুনছি তার কাছে। আসেন ভিতরে আসেন।
শিরিনের পিছু পিছু ভেতর বাড়িতে ঢুকল ইউসুফ।
বাড়িটি অতি দীনদরিদ্র ধরনের। দোচালা জীর্ণ একখানা টিনের ঘর, রান্নাচালা আর একচিলতে উঠোন। উঠোনের একপাশে ভাঙাচোরা হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়ের লাগোয়া পাতিলেবুর ঝাড়। 8-1-2017 9-07-40 PMরান্নাচালার ওদিকটায় লাউ কুমড়ো শসা ঝিঙের মাচান। দোচালা ঘরটার পেছনে দু-তিনটে আম আর একটা তেঁতুল গাছ। গাছগুলো জড়াজড়ি করে আছে বলে বাড়িটা বেশ ছায়াময়। উঠোনের একটা দিকে শুধু রোদ পড়েছে। সেই রোদে তারে শুকাতে দেয়া হয়েছে বারো-তেরো বছর বয়সী একটি মেয়ের ছিটকাপড়ের জামা। কয়েকটা হাঁস-মুরগি চরছে ওদিকপানে।
বাড়ি দেখে মনটা খারাপ হলো ইউসুফের।
শিরিন তখন ঘরে ঢুকে হাতলঅলা পুরনো একখানা চেয়ার এনেছে। উঠোনের ছায়ায় চেয়ার রেখে বলল, বসেন।
চেয়ারে বসতে বসতে ইউসুফ বলল, কিন্তু পাগলটা কোথায়? ইস কতদিন পর দেখা হবে! আটাশ-ঊনত্রিশ বছর তো হবেই! স্বাধীনতার পরপর প্রায়ই দেখা হতো। তখনও যুদ্ধের উন্মাদনা কাটেনি, অস্ত্রটস্ত্র জমা দেই নি। তারপর আস্তে আস্তে ঠা-া হয়ে গেল সব। আমরা একেকজন ভেসে গেলাম একেক দিকে। নাসির বিক্রমপুরের ছেলে, সে চলে এলো বিক্রমপুরে, গ্রামেই সেটেল করল। আমি চলে গেলাম ইংল্যান্ডে। বিয়েশাদি করে লন্ডনে থেকে গেলাম। দেশে দু-চারবার আসা হয়েছে; কিন্তু পুরনো বন্ধুদের কারও সঙ্গেই তেমন যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।
ইউসুফ একটু থামল। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল। এবার আমি দেশে এসেছি এই একটাই উদ্দেশে। পুরনো সব বন্ধুকে খুঁজে খুঁজে বের করব, তাদের সঙ্গে দেখা করব। বয়স হয়ে যাচ্ছে, থাকি বিদেশে, কোনোদিন হার্ট অ্যাটাক-ফেটাকে শেষ হয়ে যাব, এই জীবনে কারও সঙ্গে আর দেখাই হবে না।
শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে শিরিন। ইউসুফ তার দিকে তাকাল না। পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে বলল, নাসির যে বাড়ি নেই তা আমি বুঝেছি। কোথায় গেছে বলতে পারবেন? একটু যদি খবর দেয়া যায়…
কথা শেষ না করে শিরিনের দিকে তাকিয়েছে ইউসুফ, তাকিয়ে বুকে কী রকম একটা ধাক্কা খেল। সিগ্রেটে টান দিতে ভুলে গেল, চোখে পলক ফেলতে ভুলে গেল।
মুখ নিচু করা শিরিনের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।
যা বোঝার বুঝে গেল ইউসুফ। শিরিনের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে বসে রইল। ফাঁকা শূন্য গলায় একসময় বলল, কবে?
আঁচলে চোখ মুছে শিরিন বলল, আইজ দেড় বচ্ছর।
ও আমার চে’ কত ছোট! এই বয়সেই…
কথা শেষ করে উদাস হয়ে গেল ইউসুফ। খানিক আগের উচ্ছ্বল আবেগে ভর্তি কথা বলতে পছন্দ করা মানুষটি যেন আর নেই। এখন যে বসে আছে শিরিনের সামনে সে যেন অন্য কেউ। হতাশ ম্লান, আচমকা শোকে পাথর হওয়া একজন মানুষ।
একসময় বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইউসুফ। কত আশা করে এবার দেশে এসেছিলাম, সবার সঙ্গে দেখা করব। নাসিরের বাড়ি বিক্রমপুরের কোন গ্রামে তা বেশ ভালোই জানা ছিল, যুদ্ধের সময় একবার এসেছিলাম। এতগুলো বছর কেটে গেছে, সবকিছু একেবারেই বদলে গেছে, তারপরও বাড়ি চিনতে ভুল হয়নি। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই আসতে পেরেছি। নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর একটা পরীক্ষা নিচ্ছিলাম যে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে দেখি নাসিরের বাড়িটা বের করতে পারি কি-না। পারলাম ঠিকই; কিন্তু যার জন্য আসা সে-ই নেই।
আঁচলে আবার চোখ মুছল শিরিন, নাক টানল।
আনমনা ভঙ্গিতে সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, কী হয়েছিল?
লানছে ক্যানসার হইছিল। বেদম সিগ্রেট খাইত। ক্যানসার ধরা পড়নের পরও থামে নাই।
কাজ কী করত?
আমগ গেরামের পেরাইমারি ইসকুলের মাস্টার আছিল।
ততক্ষণে দুজন মানুষই কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কথাবার্তার আড়ষ্টতা কেটে গেছে শিরিনের। থমথমে গলায় বলল, বহুত কষ্ট পাইয়া মরছে। ক্যানসারের চিকিস্যায় বেদম টেকা লাগে। এত টেকা আমরা পামু কই? ইসকুলের ফান্ড থিকা টেকা দিছে, ছাত্র-ছাত্রীরা চান্দা কইরা টেকা দিছে, তাও তেমুন চিকিস্যা করাইতে পারি নাই।
এই ধরনের অসুখে কিছু অবশ্য করারও থাকে না।
হাতের সিগ্রেট শেষ হয়ে গিয়েছিল, পায়ের সামনে ফেলে জুতো দিয়ে ডলে ডলে নেভাল ইউসুফ। শিরিন বলল, নিজে তো মরছেই আমগও মাইরা থুইয়া গেছে।
কথাটা বুঝতে পারল না ইউসুফ। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল।
শিরিন বলল, এমতেই গরিব মানুষ আমরা, জমাজমি যা অল্পবিস্তর আছিল হেই হগল বেবাক গেছে তার চিকিস্যায়। সরকারি ইসকুলের মাস্টারগ আইজকাইল ভালো অবস্তা। তারা মইরা গেলে সরকার থিকা ভালো টেকাই পায়। আমরাও পাইছি। হেই হগল বেবাগ গেছে দেনা শোধ করতে। অহন আমরা পথের ফকির। কিচ্ছু নাই। খালি এই বাড়িডা, ভাঙাচুরা ঘরডা।
আপনার সংসার তা হলে চলে কী করে?
কোনো রকমে চলে। একজন মাত্র দেওর আমার, সে থাকে ঢাকায়। সে মাসে মাসে কিছু টেকা দেয়। দুই ভাই আছে, তারা দেয় কিছু। বইনরা দেয় যহন যা পারে। আমগ বিক্রমপুর হইল ধনী মাইনষের দেশ। তয় আমগ আত্মীয়-স্বজন কেঐ ধনী না। বেবাকতেই গরিব। কে কারে টানব, কন? দূরের আত্মীয় বড়লোক যারা আছে তারা কেঐ খবর লয় না। সাহাইয্যের লেইগা গেলে কুত্তা-বিলাইয়ের লাহান খেদাইয়া দেয়।
বাড়ির দশা দেখে আর শিরিনের কথাবার্তা শুনে নাসিরের ফেলে যাওয়া সংসারের অবস্থাটা পুরোপুরিই বুঝেছে ইউসুফ। বুঝে মন খুবই খারাপ হয়েছে তার। আহা কী অসহায়, হতদরিদ্র সংসার এক মুক্তিযোদ্ধার! হয়তো এরকম দশা আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার সংসারের। কে তাদের খবর রাখে!
গাছপালার দিকে তাকিয়ে ম্লান গলায় ইউসুফ বলল, আপনাদের বাচ্চাকাচ্চা?
একটা মাইয়া। অহনও ছোড। তেরো-চৌদ্দ বচ্ছর বয়স।
এত কম বয়সী মেয়ে…
কথাটা শুনে শিরিন একটু লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, আমগ বিয়া হইছিল দেরিতে। বিয়ার দুই বচ্ছর পর একটা পোলা হইয়া মরল। তার চাইর-পাঁচ বচ্ছর পর হইল মাইয়াটা।
কোথায় সে? তাকে যে দেখছি না!
ইসকুলে গেছে। দোফরে আইসা পড়ব। আইজ হাফ ইসকুল।
নাম কী মেয়েটার? কোন ক্লাসে পড়ে?
নাম হইল দোয়েল। পড়ে কেলাস সেভেনে।
দোয়েল নামটা শুনে খুব ভালো লাগল ইউসুফের। মুগ্ধ গলায় বলল, বাহ্। খুব সুন্দর নাম তো! দোয়েল। বাংলাদেশের জাতীয় পাখির নাম। নিশ্চয় নাসির রেখেছিল!
হ সে-ই রাখছে। বহুত আদর করতো মাইয়াটারে। মাইয়াটা আছিল তার জান।
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে শিরিন বোধহয় একটু ক্লান্ত হয়েছে। ঘরের লেপাপোছা পৈঠায় নরম ভঙ্গিতে বসল। আপনে আইছেন এতুক্ষুণ হইল, এককাপ চাও আপনেরে খাওয়াইতে পারলাম না। ঘরে চাপাতা চিনি কিচ্ছু নাই।
ইউসুফ ব্যস্ত গলায় বলল, আমাকে নিয়ে ভাববেন না। চায়ের অভ্যাস তেমন নেই আমার।
তয় দোফরে কইলাম ভাত খাইয়া যাওন লাগব। কই মাছ দিয়া ভাত খাওয়াইতে পারুম। তিন-চাইরডা কই মাছ জিয়াইন্না আছে।
এমন আন্তরিক গলায় কথাটা বলল শিরিন, শুনে আবেগে বুকটা ভরে গেল ইউসুফের। এই তো চিরকালীন বাঙালি নারী। অতিথির সেবায় দরিদ্র সংসারের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদও ব্যয় করতে পারে। দু-চারটা কই মাছ আর একজন মানুষের একবেলার ভাত কি কম মূল্যবান এই সংসারে!
ইউসুফ মুগ্ধ গলায় বলল, আপনি এতটা আন্তরিকতা নিয়ে বলেছেন তাতেই আমি খুশি। ভাত খাব না। আর কিছুক্ষণ বসেই চলে যাব।
ইউসুফ আবার একটা সিগ্রেট ধরাল।
শিরিন বলল, ভাই, আপনের ছেলেমেয়ে কয়জন?
দুটো ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটা ছোট। ছোট মানে দোয়েলের চে’ অনেক বড়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এ বছরই বিয়ে দেব ভাবছি।
শুনে মন খারাপ করা গলায় শিরিন বলল, আমার মাইয়াটারে তো মনে হয় বিয়াই দিতে পারুম না।
ইউসুফ চমকাল। কেন?
মাইয়াটার কপাল খারাপ। এমতেই গরিব ঘরের মাইয়া, বাপ নাই। তার ওপরে আইজ চাইর মাস ডাইন গালে একটা টিউমার হইছে।
কী?
হ। পয়লা পয়লা ছোডই আছিল জিনিসটা, দিনে দিনে বড় হইছে। অহন মুরগির আন্ডার সমান।
বলেন কী? ডাক্তার দেখান নাই?
ভালো ডাক্তার কই থিকা দেখামু কন? আমগ গেরামের কাশেম ডাক্তাররে দেহাইছি। সে কয় এই হগল চিকিস্যা দ্যাশগেরামে হয় না। টাউনে নিয়া অপরেশন করান লাগব। অপরেশনে অনেক টেকা লাগব। এত টেকা আমি কই পামু কন?
ইউসুফ চুপ করে রইল।
শিরিন বলল, আমার মাইয়াডা অর নামের লাহানই আছিল। দোয়েল পাখির লাহান স্বভাব। এক মিনিট থির হইয়া থাকতে পারত না। এইমিহি যাইতাছে ওইমিহি যাইতাছে। কথায় কথায় খিলখিল কইরা হাসতাছে। টিউমার হওনের পর মাইয়াডা আমার বদলাইয়া গেছে। দৌড়াদৌড়ি ছটফটানি বন্ধ হইয়া গেছে, হাসি বন্ধ হইয়া গেছে। মাইয়াডা আর অহন হাসেই না। টিউমারের বেদনায় রাইত দোফরে উইঠা মাঝে মাঝে কান্দে। ইসকুলে যায় ওড়না দিয়া মুখ ঢাইকা। টিউমারডা য্যান কেঐ দেখতে না পায়।
কথা বলতে বলতে আবার চোখে পানি আসে শিরিনের। চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, কাশেম ডাক্তার কইছে অপরেশন না করলে এই টিউমার থিকা ক্যানসার হইতে পারে। ক্যানসার হইলে বাপের লাহান মাইয়াডাও যাইব।
প্রথমে নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে বুকে এক ধাক্কা খেয়েছে ইউসুফ, এখন দোয়েলের কথা শুনে আরেক ধাক্কা খেল। বুকটা হু হু করতে লাগল তার। এতকাল পর এ কোন দুঃখ হতাশার মধ্যে এসে পড়ল সে! কী স্বপ্ন দেখে এসেছিল, কী হলো তার পরিণতি!
না এই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থাকতে আর ভালো লাগছে না। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরে পড়তে পারলেই ভালো।
আচমকাই যেন তারপর উঠে দাঁড়াল ইউসুফ। আমি তা হলে আসি এখন।
ইউসুফের আচরণে বেশ অবাক হলো শিরিন। সেও উঠে দাঁড়াল। আর একটু বসবেন না? বসেন আরেকটু। মাইয়াটা আসুক। বাপের মুখে কত গল্প শুনছে আপনের। আপনেরে দেখলে খুব খুশি হইব।
ইউসুফ বিনীত গলায় বলল, না। আমার সময় নেই। তা ছাড়া ওইটুকু মেয়ের ওই কষ্টের মুখ আমি দেখতেও চাই না। নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে যে দুঃখ পেয়েছি সেই দুঃখ সামলাতে পারব কিন্তু দোয়েলের মুখ দেখে যে দুঃখ পাব তা সামলাতে পারব না। সে আসার আগেই চলে যেতে চাই।
পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল ইউসুফ। গুনে গুনে পাঁচশ’ টাকার দশটা নোট মুঠো করে দিল শিরিনের হাতে। এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে। এটা রাখুন। দোয়েলের চিকিৎসা করাবেন।
একসঙ্গে এতগুলো টাকা অনেকদিন চোখে দেখেনি শিরিন, সে বেশ দিশেহারা হলো। প্রথমে চোখ দুটো চঞ্চল হলো তার, তারপর পানিতে ভরে গেল। কান্নাকাতর কৃতজ্ঞ গলায় বলল, আল্লায় আপনের ভালো করুক ভাই। আল্লায় আপনের ভালো করুক।
ইউসুফ আর কোনো কথা বলল না। হন হন করে হেঁটে বারবাড়ির দিকে চলে গেল।

দুই
আজ শুক্রবার।
দোয়েলের স্কুল নেই। যেদিন স্কুল না থাকে দোয়েল একটু বেলা করে ওঠে। আজও তাই উঠেছে। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসেনি, বেতের সাজিতে মুড়ি আর ছোট্ট একটা আখিগুড়ের টুকরো নিয়ে বসেছে। দরজার সামনে বসে উদাস হয়ে গুড়-মুড়ি খাচ্ছে।
গাছপালার ফাঁক-ফোকড় দিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে উঠোনে। সেই রোদে হাঁস-মুরগিগুলো খুদকুড়ো খাচ্ছে। শিরিন ব্যস্ত হয়েছে সংসারের কাজে। এইমাত্র উঠোন ঝাড় দিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। দুদিন ধরে মনটা একটু ভালো শিরিনের। স্বামীর বন্ধু ইউসুফ মির্জা আসার পর, সে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে যাওয়ার পর থেকে শরীরের গতি যেন বেড়ে গেছে তার। হয়তো মেয়েটার অপারেশনের একটা কিছু ব্যবস্থা এবার করা যাবে। কাশেম ডাক্তারের কাছে গিয়েও কথাও বলে এসেছে কাল। এই টাকায় হবে না, টাকা আরও লাগবে। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় করা যায়, গ্রামের কাকে কাকে ধরলে, কোন আত্মীয়র কাছে গেলে টাকা দু-চারশ’ করে পাওয়া যাবে এইসব ভেবেছে কাল অনেক রাত পর্যন্ত। সবমিলিয়ে দশ-বিশ জন লোকও যদি পাশে দাঁড়ায়, টাকা যা উঠবে, কাজ হয়ে যাবে। ওই যে কথায় আছে না, দশের লাঠি একের বোঝা।
আর যদি এভাবে না হয় তা হলে আর একটা বুদ্ধি আছে। এই বুদ্ধিটাও কাশেম ডাক্তারই দিয়েছেন। ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর চিঠিপত্র কলামে ‘আমার মেয়ের মুখের হাসি ফিরিয়ে দিন’ বা এই জাতীয় শিরোনাম দিয়ে কয়েকটা চিঠি লিখতে হবে। পাঁচ-দশটা চিঠি লিখলে দুয়েকটা চিঠি ছাপা হবেই। সেই চিঠি পড়ে দেশের দয়াবান মানুষরা কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে দোয়েলকে সাহায্য করতে। এইভাবে অনেক অসহায় মানুষের উপকার হয়। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে শুনলে আর কেউ না হোক মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত সাহায্য করবেন। দেশে বিত্তবান মুক্তিযোদ্ধাও তো কম নেই।
আশ্চর্য ব্যাপার, গত চার মাসে এইসব বুদ্ধি কারও মাথায় আসেনি। ইউসুফ মির্জা এসে যেন ঘোরতর অন্ধকারে মোমের আলো জ্বেলে দিয়ে গেলেন। এখন চারদিকে হয়তো আরও একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠবে।
আহা, সেই মানুষটার সঙ্গে দোয়েলের দেখা হয়নি। সে স্কুল থেকে ফেরার আগেই চলে গেছেন তিনি। বাবার মুখে কত গল্প একদিন শুনেছে এই মানুষের, তাদের বাড়ি এসে ঘুরেও গেলেন এত বছর পর, দোয়েলকে না দেখেই তার চিকিৎসার জন্য অতগুলো টাকা দিয়ে গেলেন অথচ দোয়েলের সঙ্গে তার দেখাই হলো না। হয়তো কোনোদিন হবেও না। কারণ তিনি বাংলাদেশে থাকেনই না।
আজকের সকালটা এসব ভেবেই কাটিয়েছে দোয়েল। তারপর ভেবেছে টিউমারের কথা। যদি টাকা জোগাড় করে সত্যি সত্যি অপারেশন করা যায়, তা হলে একদমই আগের মতো হয়ে যাবে তার মুখ। আগের মতো খিলখিল করে হাসতে পারবে, কথা বলতে পারবে। মুখে কোনো দাগ থাকবে না, মুখটা হয়ে যাবে আগের মতো নিখুঁত সুন্দর। যে কেউ সেই মুখ দেখে বলবে, বাহ্ কী সুন্দর চেহারা মেয়েটির! কী মিষ্টি মুখ!
নাকি অপারেশনের দাগ থেকে যাবে গালে! টিউমার থাকবে না ঠিকই, টিউমারের চিহ্ন, কাটা দাগ থেকে যাবে!
তা হলে আর লাভ হলো কী? মুখে বড় একটা খুুঁত তো তার থেকেই গেল?
আবার একটা ভয়ের কথাও বলেছেন কাশেম ডাক্তার। এই ধরনের টিউমার থেকে অনেক সময় ক্যানসার হয়। যদি তেমন হয় তা হলে আর মুখের দাগ হাসিটাসি নিয়ে ভেবে কী লাভ! ক্যানসার হলে বাঁচার আশা নেই। বাবার মতো ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে।
এসব ভেবে বিষণœ মুখে বারবাড়ির দিকে এসেছে দোয়েল, লম্বা চওড়া, সুন্দর পোশাক জুতো পরা একজন ¯িœগ্ধ মুখের মানুষ এসে দাঁড়াল তার সামনে। মানুষটার হাতে সুন্দর একটা শপিংব্যাগ, ব্যাগের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে বেশ দামি ধরনের কয়েকটি প্যাকেট। দেখে বোঝা যায় খাবারের প্যাকেট। বিদেশি বিসকিট চকলেট এসব হবে। আর মানুষটার গা থেকে কেমন একটা বাবা বাবা গন্ধ আসছিল।
বাইরের যে কোনো মানুষের সামনে দোয়েল এখন তার মুখটা ঢেকে রাখে। মুখের ওই বিশ্রী টিউমার সে কাউকে দেখাতে চায় না। হঠাৎ লম্বা হয়ে ওঠা টিংটিংয়ে মেয়েটির ওড়না ব্যবহারের দরকার হয় না, তবু মুখ ঢাকার জন্য ওড়না পরে সে।
গলার কাছে ওড়না এখনও আছে কিন্তু মুখ ঢাকার কথা মনে হলো না দোয়েলের। দুঃখী বিষণœ মুখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই মানুষটিও দোয়েলের মতো করেই তাকিয়েছিল তার দিকে। তবে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই হাসিমুখে মায়াবী গলায় কথা বলে উঠল, তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তুমিই দোয়েল। দোয়েল ছাড়া এত সুন্দর, মিষ্টিমুখ আর কোনো মেয়ের হবে!
বলেই গভীর মমতায় দোয়েলের চিবুকের কাছটা ধরল। সেদিন তোমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেছি, দুটো দিন এজন্য কষ্ট পেয়েছি। সে কারণেই আবার এলাম।
রান্নাঘরের দিক থেকে ইউসুফের গলা বুঝি শুনতে পেয়েছিল শিরিন, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো। ইউসুফকে দেখে মাথায় ঘোমটা দিল। ব্যস্ত গলায় বলল, আপনে আসলেন কখন?
একহাত দোয়েলকে জড়িয়ে ধরে ইউসুফ বলল, এই তো এক্ষুণি।
আসেন, আসেন।
সেদিনকার মতো আজও ছুটে গিয়ে ঘর থেকে চেয়ার আনল শিরিন। আঁচলে চেয়ার মুছে বলল, বসেন ভাই, বসেন।
চেয়ারে বসে শপিংব্যাগটা দোয়েলের হাতে দিল ইউসুফ। এটা তোমার জন্য। এখানে মজার মজার বিসকিট চকলেট ক্যান্ডি আছে। এগুলো ঘরে রেখে এসো।
কিন্তু মানুষটার কাছ থেকে সরে যেতে ইচ্ছে করছে না দোয়েলের। কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর দূর কোনো পরদেশ থেকে যেন ফিরে এসেছেন বাবা। চোখের আড়াল হলেই বুঝি দোয়েলকে ছেড়ে আবার উধাও হয়ে যাবেন।
তবু ঘরে গিয়ে চৌকির ওপর শপিংব্যাগটা রেখে এলো দোয়েল। কাছে আসতেই তাকে বুকের কাছে টেনে নিল ইউসুফ। গভীর মমতায় আঙ্গুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার টিউমারটা। বিশাল এক ভরসা দেয়া গলায় বলল, এ এমন কিছু টিউমার না! সামান্যই। ছোট্ট একটা অপারেশন লাগবে।
ইউসুফের এই কথাটা যেন শুনতে পেল না শিরিন। বলল, আইজ কইলাম ভাত না খাইয়া যাইতে পারবেন না। আমি অহনই ভাত চড়াইতাছি। কই মাছ চাইরটা আছে।
ইউসুফ ¯িœগ্ধ মুখে বলল, তা না হয় খেলাম। কিন্তু আপনি যদি রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে যান তা হলে কথা বলব কখন? আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
শিরিন কথা বলবার আগেই দোয়েল বলল, তাইলে চেরটা রান্ধনঘরের সামনে লইয়া যাই। মায় রানল আর আপনে কথা কইলেন।
দোয়েলের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল ইউসুফ। বাহ্! এই মেয়ে তো খুব সার্প। ভাবী, আপনি সব গোছগাছ করে বসুন, আমি চেয়ার নিয়ে ওখানে আসব। এই ফাঁকে দোয়েলের সঙ্গে একটু গল্প করি।
আচ্ছা।
শিরিন ব্যস্তভঙ্গিতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ইউসুফ আবার হাসিমুখে তাকাল দোয়েলের দিকে। আমি কি তোমার সামনে একটা সিগ্রেট খেতে পারি মা?
দোয়েল মাথা নাড়ল।
সিগ্রেটের গন্ধে তোমার খারাপ লাগবে না তো?
না। বাবায় অনেক সিগারেট খাইত। বাড়িত থাকলে সবসময় থাকতাম বাবার লগে লগে। বাবার সিগারেটের গন্ধ আমার ভালো লাগত। বাতাসে সিগারেটের গন্ধ পাইলেই আমি বুঝতাম বাবায় আসতাছে।
ইউসুফ কথা বলল না। পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। তারপর আচমকা বলল, আমি সেদিন ইচ্ছা করেই তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই নি, জানো?
দোয়েল অবাক হলো। ক্যান?
আমি যে তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসিনি। একদম খালি হাতে এসেছিলাম, এজন্য।
কিন্তু আপনের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। রাত্রে অনেকক্ষণ ঘুম আসে নাই। খালি আপনের কথা চিন্তা করছি। বাবার কাছে আপনের কথা শুনছি তো! আপনেরে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল।
সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, ভাবীর মুখে তোমার নাম শুনে তোমাকেও খুব দেখার ইচ্ছা হয়েছিল আমার। যে মেয়ের নাম দোয়েল, তাকে না দেখে আমি যাব কেন? কিন্তু যখনই তোমার টিউমারের কথা শুনলাম, মনটা এত খারাপ হলো। ফুলের মতো একটি মেয়ের মুখে টিউমার! টিউমারের জন্য সে হাসতে পারছে না, এসব ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল তোমার মুখটা আমি সহ্য করতে পারব না, আমার বুকটা ফেটে যাবে। অত কষ্ট পাওয়ার চে’ তোমাকে না দেখে চলে যাওয়াই ভালো।
ইউসুফ আবার সিগ্রেটে টান দিল। কিন্তু যেতে যেতে আমি তোমার কথা খুব ভাবলাম। তোমার বাবার কথা ভাবলাম, নিজের কথা ভাবলাম। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। কত বড় অপারেশনে যোগ দিয়েছি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আর আজ ছোট্ট একটা মেয়ের বিপদের কথা জেনেও আমি তার সঙ্গে দেখা না করে পালিয়ে যাচ্ছি! এসব ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হলো, জানো? নিজেকে কাপুরুষের মতো মনে হলো। অথচ আমি তো তা নই, আমি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে আমি পালিয়ে যাব কেন?
ইউসুফের কথার অনেকটাই বুঝতে পারছিল না দোয়েল। কিন্তু তার খুব ভালো লাগছিল শুনতে। অপলক চোখে ইউসুফের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
সিগ্রেটে টান দিয়ে, উঠোনের হাওয়ায় ধোঁয়া ছেড়ে ইউসুফ বলল, এজন্য ঢাকায় ফিরে গিয়ে বড় বড় কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করলাম আমি, কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। ভাবীর মুখে তোমার টিউমারের কথা যতটা শুনেছি ততটাই বললাম তাদের।
তার টিউমারের ব্যাপারে ঢাকার বড় ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছে ইউসুফ, হাসপাতালে কথা বলেছে শুনেই বিষণœ মুখটা উজ্জ্বল হলো দোয়েলের। গভীর আগ্রহের গলায় বলল, ডাক্তাররা কী কইল?
বড় ডাক্তাররা রোগী না দেখে কিছু বলেন না। তবু আমার মুখ থেকে যতটা শুনেছেন, বললেন, এটা তেমন সিরিয়াস কিছু ব্যাপার না।
একটু থামল ইউসুফ। সিগ্রেটে টান দিল। তোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে গিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে যখন কথা বলছি, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন আমার কী মনে হচ্ছিল জানো, মনে হচ্ছিল আমি যেন একাত্তর সালে ফিরে গেছি। আমাকে যেন একটা যুদ্ধে নামতে হবে। আমি যেন সেই যুদ্ধের রসদ জোগাড় করছি।
বলেই সরল মুখ করে হাসল ইউসুফ। তোমাকে এসব বলতে খুব ভালো লাগছে।
সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে পায়ের কাছে ফেলল ইউসুফ। জুতোয় ডলে সিগ্রেট নেভাল। বলল, তারপর বুঝলে মা, যুদ্ধের পুরো প্রিপারেশন নিয়ে তোমাদের বাড়ি এলাম।
মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে দোয়েলের কানের কাছে নিয়ে গেল ইউসুফ। কেন এসেছি জানো? তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমাকে নিয়ে যাওয়া মানেই যুদ্ধটা আমি শুরু করলাম।
দোয়েল অবাক গলায় বলল, কোথায় নিয়া যাইবেন আমারে?
ঢাকায়। হাসপাতাল রেডি করে এসেছি, ডাক্তার রেডি করে এসেছি। আজ ঢাকায় পৌঁছেই সেই হাসপাতালে নিয়ে যাব তোমাকে। ডাক্তাররা আগে তোমার টিউমার পরীক্ষা করবেন। তারপর অপারেশন।
শুনে আনন্দ উত্তেজনায় বুক ভরে গেল দোয়েলের। ইচ্ছে হলো এখনই রান্নাঘরে দৌড়ে গিয়ে খবরটা মাকে দিয়ে আসে। তা করল না দোয়েল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, অপারেশন করলে পুরা ভালো হইয়া যামু আমি?
হ্যাঁ। পুরো ভালো হয়ে যাবে।
আগের মতো হাসতে পারুম?
অবশ্যই পারবে।
মুখে কোনো দাগ থাকব না?
না, একটুও দাগ থাকবে না। কারণ তোমাকে করা হবে বেশ দামি অপারেশন। কসমেটিক সার্জারি। কসমেটিক সার্জারিতে কোনো দাগ থাকে না। অপারেশনের পর মুখ দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তোমার মুখে একটা টিউমার ছিল।
এবার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না দোয়েল। দৌড়ে মা’র কাছে গেল। জোয়ার জলের মতো কলকল করে মুহূর্তে ইউসুফের মুখে শোনা সব কথা বলে দিল।
শিরিন তখন চুলোয় ভাত বসিয়ে কই মাছ কুটতে বসেছে। সব শুনে গভীর আনন্দে স্তব্ধ হয়ে গেল। কাজ করতে ভুলে গেল।
দোয়েল ততক্ষণে আবার ছুটে এসেছে ইউসুফের কাছে। ভয় মেশানো উত্তেজিত গলায় বলল, অপরেশন করলে ব্যথা পামু না আমি?
দুহাতে দোয়েলকে বুকের কাছে টেনে আনল ইউসুফ। না, একটুও ব্যথা পাবে না। তুমি তো টেরই পাবে না অপারেশানটা কখন হলো। আচ্ছা শোনো, তুমি কি ইনজেকশনে ভয় পাও?
মুখের মজাদার ভঙ্গি করে দোয়েল বলল, না। একবার পা মচকাইয়া গেছিল। তখন বাবায় কাশেম ডাক্তারের কাছে নিয়া ইনজেকশন দেওয়াইয়া আনছিল। একটুও ব্যথা পাই নাই। খালি মনে হইল একটা পিঁপড়ার কামড়।
তা হলে তো কথাই নাই। অপারেশনের আগে একটা ইনজেকশন দেবে তোমাকে। তুমি ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুম থেকে উঠে দেখবে টিউমারটা নেই। তুমি সেই আগের দোয়েল হয়ে গেছ।
শুনে কী যে মুগ্ধ হলো মেয়েটি! হাসার চেষ্টা করল কিন্তু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসতে পারল না। দেখে বুকটা হুহু করে উঠল ইউসুফের। হয়তো কষ্টটা কাটাবার জন্যই উঠে দাঁড়াল সে। বলল, কী হলো দোয়েল, তোমার জন্য যে এত খাবার আনলাম, খাচ্ছ না কেন?
পরে খামু নে।
না এক্ষুণি খাও। যাও, প্যাকেট খুলে দেখ যেটা ভালো লাগে নিয়ে এসো। তুমি খাবে আর ভাবীর সঙ্গে কথা বলব আমি।
তাইলে চেয়ারটা আমি রান্ধনঘরের সামনে নিয়া দেই?
তুমি দেবে কেন? আমিই তো নিতে পারি। কিন্তু চেয়ার এখন নেব না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলব।
আইচ্ছা।
দোয়েল ঘরে ঢোকার পর ইউসুফ এলো রান্নাঘরের সামনে। শিরিনকে বলল, মেয়ের মুখে তো সবই শুনেছেন। তবু আবার বলি, আপনাদের দুজনকে আমি ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। দোয়েলের চিকিৎসাটা করাতে চাই।
শুনে আবেগে কথা বলতে পারল না শিরিন। মাছ কুটতে কুটতে ইউসুফের দিকে তাকাল। গভীর কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো ছলছল করছে তার। কোনো রকমে বলল, কী কমু ভাই, কন! খালি এটুকু কইতে পারি, আপনে মানুষ না, আপনে ফেরেশতা।
ইউসুফ কিছু বলবার আগেই ওয়েফার ধরনের লম্বা দুটো বিসকিট হাতে দোয়েল এসে দাঁড়াল তার পাশে। কামড়ে কামড়ে বিসকিট খেতে লাগল। খাওয়ার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল স্বাভাবিক মানুষের মতো খেতে পারছে না সে। অসুবিধা হচ্ছে।
একপলক দোয়েলকে দেখে শিরিনের দিকে তাকাল ইউসুফ। ভাত খেয়েই রওনা দিতে চাই। আপনি সেইভাবে ব্যবস্থা করুন ভাবী।
দোয়েলকে বলল, কাপড় চোপড় গুছিয়ে নাও। আজই ঢাকায় নিয়ে যাব তোমাদেরকে। এখান থেকে সরাসরি হাসপাতালে।
শুনে শিরিন এবং দোয়েল দুজনেই দিশেহারা হলো।
শিরিন বলল, আইজই যাওন লাগব! তা হলে এই দিকে কী ব্যবস্থা করুম? বাড়িঘর হাঁস-মুরগি এইসব কে দেখব?
ইউসুফ বলল, পাড়া-প্রতিবেশী কাউকে বলুন। একজন এমন কাউকে যদি পাওয়া যায়, যতদিন দরকার বাড়িতে থাকল। তার খাওয়া খরচের টাকা আমি দিয়ে যাব।
দোয়েল লাফিয়ে উঠে বলল, ওমা, হাসু ফুপুরে থুইয়া যাও। তার তো কোনো বাড়িঘর নাই, সংসার নাই। এহেকদিন এহেক বাড়িতে থাকে। অহন আছে বেপারি বাড়িতে। আমি গিয়া তারে ডাইকা লইয়াহি। টেকা দিলেই দেখবা খুশি হইয়া থাকব।
শিরিন কথা বলবার আগেই ইউসুফ বলল, যাও মা, ডেকে নিয়ে এসো।

তিন
দুপুরের পরপর বাড়ি থেকে বেরুল তিনজন মানুষ।
হাসুকে বাড়িতে রেখে বেশ সহজেই সব ব্যবস্থা করা গেছে। মহিলাকে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে এসেছে ইউসুফ। ওতেই মহাখুশি সে। তাছাড়া ঘরে চাল ডাল যা আছে একজন মানুষের বেশ কিছুদিন চলবে। ততদিনে দোয়েলের অপারেশন করিয়ে ফিরে আসতে পারবে শিরিন।
গ্রামের পথে দোয়েলের হাত ধরে হাঁটছে ইউসুফ। দোয়েল শিরিনের জামা-কাপড়ের ছেঁড়াখোড়া রেকসিনের ব্যাগটা তার হাতে। বেশভূষার সঙ্গে ব্যাগটা একদমই মানাচ্ছে না। কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা করছে না ইউসুফ। উচ্ছ্বসিত গলায় দোয়েলের সঙ্গে কথা বলছে। তোমাদেরকে নিয়ে আরও অনেক প্ল্যান আছে আমার। উত্তরায় আমার একটা ছয়তলা বাড়ি আছে। নিচে গাড়ি রাখার জায়গা আর পাঁচতলায় দশটা ফ্ল্যাট। ন’টা ভাড়া দেয়া, একটা আমার জন্য। দেশে এলে ওই ফ্ল্যাটটায় আমি থাকি। অপারেশনের পর তুমি আর তোমার মা থাকবে আমার ফ্ল্যাটে। বাড়ি ভাড়ার টাকা থেকে তোমাদের খরচ দেয়া হবে। আমি সব ব্যবস্থা করব। উত্তরায় অনেক ভালো ভালো স্কুল আছে। সেখানকার একটা স্কুলে ভর্তি করে দেব তোমাকে। এই মুহূর্ত থেকে তোমাদের দুজনের দায়িত্ব আমার।
ইউসুফ এবং দোয়েলের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা শুনছিল শিরিন, চোখে পানি আসছিল তার।
বড় রাস্তায় একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। ইউসুফকে দেখেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে এলো ড্রাইভার। হাত থেকে ব্যাগটা নিল।
দোয়েল উত্তেজিত গলায় বলল, আমরা এই গাড়িতে কইরা যামু?
হ্যাঁ। গাড়িটা আমারই।
তারপর শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, উঠুন ভাবী।
মাইক্রোবাসের পেছন দিককার সিটে বসল শিরিন, সামনের দিকে দোয়েল আর ইউসুফ। গাড়ি যখন চলতে শুরু করেছে, ইউসুফ বলল, জানো দোয়েল, এই মুহূর্তে যুদ্ধের সময়কার একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে আমার।
আনন্দে বিভোর হওয়া গলায় দোয়েল বলল, কোন গান?
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
এই গানটা আমি জানি। বাবার মুখে কত শুনছি।
আলতো করে দোয়েলের গালটা একটু ছুঁয়ে দিল ইউসুফ। আজ এতকাল পর মনে হচ্ছে আর একটা যুদ্ধ যেন তোমাকে নিয়ে শুরু করলাম। তোমার মুখের হাসি ফিরিয়ে দেয়ার যুদ্ধ। আগের যুদ্ধটার মতো এই যুদ্ধেও জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

Category:

ঐশ্বরিক আগুন : বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-05-33 PMরাজীব পারভেজ: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ। দেশি-বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক, এমনকি শত্রুরাও উচ্চ প্রশংসা করেছেন তার ব্যক্তিত্ববোধ ও নেতৃত্বের। ৫৫ বছরের বর্ণাঢ্য ঐতিহাসিক রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হয়ে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে একান্ত কাছে থেকে যারা দেখেছেন তাদের সকলেরই রয়েছে তার সম্পর্কে আলাদা একরকমের মূল্যায়ন ও অনুভূতি। বঙ্গবন্ধু জীবিতকালে এবং ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সারাবিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার কিছু অংশবিশেষ তুলে ধরতেই আজকের এই নিবন্ধে।
প্রয়াত ভারতীয় বিজ্ঞানী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালামের ভাষায় বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেন ‘ঐশ্বরিক আগুন’ এবং তিনি নিজেই সে আগুনে ডানা যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে. এন. দীক্ষিত বলেন, ‘প্রথম সরকারপ্রধান জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশে বাংলাদেশের পৃথক জাতিসত্তায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।’ তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সংকট গভীর হওয়ায় মুজিব উপলব্ধি করেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ব্যাপক সমর্থনের ওপরই কেবল তার সংগ্রামের সাফল্য নির্ভরশীল নয়; বরং এক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক ও আনুষঙ্গিক সমর্থন প্রয়োজন।’ তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ মুজিব এ উপমহাদেশে স্বতন্ত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয়ে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।’
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে স্বদেশে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করেন। তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণের নিকট স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তিনি তাদের তা এনে দিয়েছেন। ভারত অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশকে মুক্ত করবে, মুজিবকে মুক্ত করবে এবং সবশেষে শরণার্থীদের তাদের ভিটেমাটিতে পাঠিয়ে দেবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিশ্রুতিও আমরা পালন করেছি।’
১৭ মার্চ, ১৯৭২ সালে ভারত বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করে। এ উপলক্ষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন ঢাকায়। ১৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও সুখের দিন বটে। কারণ আজ শেখ মুজিবের জন্মদিন। তিনি হলেন এ দেশের মুক্তিদাতা। শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের বন্ধু।’
বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর শুনে ইন্দিরা গান্ধী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘শেখ মুজিব নিহত হবার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তার অনন্য সাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।’
বিগত বিংশ শতাব্দীর জীবন্ত কিংবদন্তি কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হিমালয়কে দেখেনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি ছিলেন হিমালয়ের সমান। সুতরাং, হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি।’ প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর শুনে কাস্ট্রো বলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’
বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এতটাই দুঃখ পেয়েছিলেন যে, তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমারই দেওয়া ট্যাংক দিয়ে আমার বন্ধু মুজিবকে হত্যা করেছ! আমি নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছি।’
সেনেগালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদু দিউফ বঙ্গবন্ধুকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। ১৯৯৯ সালে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এ আফ্রিকান নেতা বলেছিলেন, ‘আপনি এমন এক মহান পরিবার থেকে এসেছেন, যে পরিবার বাংলাদেশকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা উপহার দিয়েছে। আপনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনার দেশের জনগণ যথার্থই বাংলাদেশের মুক্তিদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছিল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতির জনকের ন্যায় নৃশংস হত্যার শিকার শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামা উপমহাদেশের এ মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তার স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।’ তিনি বলেন, ‘মুজিবুর রহমান রাজবংশের সন্তান নন, তিনি পাশ্চাত্যের বিলাসী উচ্চ শিক্ষাও গ্রহণ করেন নি। তিনি ছিলেন এক নিভৃত পল্লীর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সাধারণ মানুষ।’ জনাব গামা বলেন, ‘শেখ মুজিব বুদ্ধিজীবী ও শ্রমজীবী উভয় শ্রেণির মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। বাংলার মানুষ তাদের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত, বাগ্মী বা প্রাণবন্ত নেতার সাক্ষাৎ পেলেও তার মতো সফল নেতা কেউ ছিলেন না। তিনি বাঙালি জাতির স্বপ্নপূরণ করেছেন, তাদের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।’
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করলেও ইতিহাসই তার প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ফলে তার এককালীন ঘোরতর শত্রু তাকে মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে অভিহিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক পাকিস্তানি অফিসার মেজর জেনারেল তোজাম্মেল হোসেন মালিক পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘পাকিস্তানে তাকে ব্যাপকভাবে এই অপবাদে চিত্রিত করা হলেও, বস্তুত মুজিব দেশদ্রোহী ছিলেন না। নিজ জনগণের জন্য তিনি ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক।’ আরেকজন সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তার মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ৭ই মার্চের ভাষণের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তার ‘পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল আশাব্যঞ্জক বাণী শ্রবণ শেষে মসজিদ অথবা গির্জা থেকে তারা বেরিয়ে আসছেন।’
তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার হবেÑ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এ ঘোষণার পর গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে বাড়াবাড়ি করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে।’
বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর এ জনপ্রিয়তার কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পর্যন্ত আশঙ্কা করেন ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের জন্য নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এ কারণে পাকিস্তানকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়, ‘শেখ মুজিবকে ফাঁসি অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দি করে রাখা হলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে।’ ১১ জন মার্কিন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।’ হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজি এবং গতিশীল নেতা আগামী ২০ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।’
১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল আর্থার কে ব্লাড পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক গোপন নথিতে লিখেছিলেনÑ ‘মুজিব সারাজীবনই একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০ বছর তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানি জেলে, যার চূড়ান্ত পরিচয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। মানুষ মুজিবকে ছাঁচে ফেলা কঠিন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি আত্মবিশ্বাসী, শান্ত, চমৎকার। বেশ ঘুরেছেন তিনি এবং শাহরিক। মঞ্চে তিনি জ্বালাময়ী বক্তা। মুষলধারায় বৃষ্টির মধ্যেও তার বক্তৃতা সাধারণকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে। দলীয় নেতা হিসেবে কঠিন এবং কর্তৃত্বপরায়ণ, অনেক সময় একগুঁয়ে। বাঙালিদের অভিযোগের কথা বলতে গেলে তিনি হয়ে পড়েন স্বতঃস্ফূর্ত এবং আবেগপ্রবণ।’
সাবেক ইরাকি প্রেসিডেন্ট প্রয়াত নেতা সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। তাই তিনি অমর।’ ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বলেন, ‘আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।’ নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট বলেন, ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’

Category:

মুক্তিযুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও একটি স্যুভেনিরের কথা

Posted on by 0 comment

অনেক রক্ত, অনেক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরে আমরা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করি। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বাঙালি জাতির আকাক্সক্ষা পূর্ণতা লাভ করে।

8-1-2017 9-02-28 PM মোহাম্মদ জমির: উন্নয়ন ও অগ্রগতির সূচক বিবেচনায় নিলে দারুণ এক সময় কাটাচ্ছে বাংলাদেশ। টানা দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে আছে দেশ।
বঙ্গবন্ধুর কন্যার দৃঢ়তায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। শেখ হাসিনার সরকার মুদ্রার রিজার্ভে রেকর্ড করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে একের পর এক মাইলফলক অতিক্রম করছে। এগুলো বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমুখী যে গণতন্ত্র তারই সুফল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নেও সরকারি দল কাজ করছে। গত আট বছরে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হয়েছে। একাত্তরের দেশি ঘাতকরা একের পর এক সাজার মুখে পড়ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী দেশে-বিদেশে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। এবারই আমরা প্রথমবারের মতো দেখলাম দেশজোড়া পালিত হয়েছে জাতীয় গণহত্যা দিবস। আগের সাড়ে চার দশকে ২৫ মার্চ কালরাত এভাবে মর্যাদা পায়নি। মার্চ থেকে ডিসেম্বরÑ এই মাসগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আরও নানা ঘটনার জন্য ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একাত্তরের এমনই এক এপ্রিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রধান করে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার শপথ নেয়, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বীকৃত হয়Ñ এভাবে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি আরও মজবুত হয়।
8-1-2017 9-02-18 PMঅনেক রক্ত, অনেক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরে আমরা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করি। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বাঙালি জাতির আকাক্সক্ষা পূর্ণতা লাভ করে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ পরিচালনা করা বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য ছিল কঠিন এক লড়াই। এ যেন এক যুদ্ধে জয়লাভ করে আরেক যুদ্ধের মুখে পড়া। এজন্যই বলা হয়ে থাকে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানি হানাদাররা আসলে পুরো বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। পাকবাহিনীর দানবীয় আগ্রাসন আর গণহত্যায় ৫৫ হাজার বর্গমাইল জুড়েই ছিল লাশের গন্ধ। প্রায় সব ধরনের অবকাঠামো ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত। সরকারের জনপ্রশাসন বলুন, জনবল বলুনÑ সব কিছুতেই ছিল হীনবল একটা দশা। এ পরিস্থিতির মধ্যে কাজ শুরু করে বঙ্গবন্ধু সরকার।
সাড়ে চার দশকের বেশি সময় আগের সেই সময়ে আমি লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরে আসি। এখানে উল্লেখ করতে হয়, একাত্তরে আমি লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় জানুয়ারির শেষ দিকে যোগ দেই নব্য যাত্রা করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় বাহাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর তথা প্রথম বিজয় দিবসে ইংরেজি ও বাংলায় স্যুভেনির প্রকাশ করা হবে। এটাই ছিল বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পদক্ষেপ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধকালের বাংলাদেশকে তুলে ধরা হবে। আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই নতুন রাষ্ট্র কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, তা-ও থাকবে স্যুভেনিরের মধ্যে।
এর জন্য বঙ্গবন্ধু একটি সম্পাদনা পর্ষদ গঠন করেন। যার প্রধান ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। এতে আরও যুক্ত ছিলেন কেজি মুস্তাফা, আবদুল গাফফার চৌধুরী, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম পাটোয়ারি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল এই কমিটিতে থাকার। স্যুভেনিরের নকশা ও অলঙ্করণ সাব-কমিটির প্রধান ছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। এতে আরও ছিলেন খ্যাতিমান শিল্পী কালাম মাহমুদ, কাইয়ুম চৌধুরী ও রফিকুননবী।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই স্যুভেনিরে এমন সব লেখা থাকবে, যাতে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানের বিভিন্ন দিক উঠে আসবে। এতে ৯টি লেখা ছিল। আর ছিল একটি সারণি। যাতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিবিধ উপাত্ত উঠে আসে।
এতে যারা লিখেছিলেন, তারা হচ্ছেনÑ ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, ডিপি ধর (ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা), সরদার ফজলুল করিম, বিকে জাহাঙ্গীর, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম পাটোয়ারি, কেজি মুস্তাফা। এই গুণী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আমার একটি লেখাও প্রকাশিত হয়েছিল।
সম্পাদক পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রকাশনা বাহাত্তরের নভেম্বরের শুরুর দিকে প্রস্তুত করে ফেলতে হবে। যাতে প্রথম বিজয় দিবসের আগেই দেশের ভিনদেশি দূতাবাস ও বিদেশে বন্ধু-রাষ্ট্রগুলোর কাছে পৌঁছানো যায়। নতুন নতুন দেশে যাত্রা করা বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোয়ও এটি পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত হয়। যাতে বিদেশে বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরা যায় সহজেই। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোর কাছেও স্যুভেনিরটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তারা বিধ্বস্ত একটি নবীন রাষ্ট্র কীভাবে উঠে দাঁড়াবে, তার রূপরেখা বুঝতে চেষ্টা করছিল।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা নিয়েই সম্পাদনা পর্ষদ আমাকে যে লেখা তৈরির গুরুদায়িত্ব দেয়, তার শিরোনাম ছিলÑ ‘রিকনস্ট্রাকশন অব বাংলাদেশ’। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এক লেখা। কারণ ৯ মাস পাকিবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, গণহত্যা পাড়ি দিতে হয়েছে এই দেশকে। রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামো, রেকর্ড, পরিকাঠামোÑ সবকিছুই মারাত্মক ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। তাই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা দুরূহ একটি ব্যাপার ছিল।
8-1-2017 9-02-38 PMএসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আমার রচনায় তুলে ধরেছিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরেছিলাম। স্বাধীনতা সুরক্ষা ও তার সুফল জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দিতে করণীয় কী, কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ তার বিবরণ তুলে ধরেছিলাম। যাত্রার কয়েক মাসের মধ্যেই আসলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। সংকট উত্তরণে বঙ্গবন্ধু সরকার দারুণ সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, বিহার, মধ্য প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাই কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) পরিসংখ্যান মতে, ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে ৬ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন শরণার্থী ছিল। আর ৩ দশমিক ১৩ মিলিয়ন শরণার্থী প্রতিবেশী দেশের আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের ফেরাতে বঙ্গবন্ধু সরকারকে একদিকে পরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে হয়েছে, অন্যদিকে তাদের ত্রাণ সহায়তাও দিতে হয়েছে। এর মধ্যে আবার যারা অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী তাদের জন্য সরকারকে আলাদা করে নজর দিতে হয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট দ্রুত মেরামত ও নির্মাণে নামতে হয়। কারণ জনসাধারণের যোগাযোগ অবকাঠামো না থাকলে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতে ধস নামার শঙ্কা থাকে। কৃষির ক্ষতি পূরণে দ্রুততার সঙ্গে শস্যাগার সংস্কারে হাত দিতে হয়। কৃষি, শিল্প-কারখানা তো বটেই, এমনকি গৃহস্থালি কাজের উপাদান-উপকরণের চাহিদা মেটাতে আলাদা করে উদ্যোগ নিতে হয় সেই সরকারকে। খাদ্য ঘাটতি, বস্ত্রের চাহিদা মেটানো ছিল তাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। কারণ পাকিস্তান সরকার আমাদের অর্থনীতিকে সবসময় পর্যুদস্ত করে রেখেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ভূখ-ের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তৎকালীন অর্থ মূল্যমান অনুযায়ী ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। প্রাণহানি, ধর্ষণ, গণহত্যাÑ শারীরিক, মানসিক সব ক্ষতি হিসাবে ধরলে এই অঙ্ক আরও বেড়ে যাবে। এ ধরনের ক্ষতির মুখে পড়া একটি দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার যে ভূমিকা পালন করেছে, তার প্রশংসা না করে কিন্তু উপায় নেই।
আজকে রাষ্ট্রীয় যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, বিশ্বজোড়া প্রশংসা কুড়াচ্ছে, তার বেশিরভাগ দেখা যায় জাতির পিতার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান। পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনÑ এ দুটি বিষয় সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে হয়েছে। এ ধরনের কাজ কিন্তু অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
তখনকার সরকার যাদের ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সহায়তা করেছে তার মধ্যে আছেÑ কৃষক, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার। তাদের সবাই মুক্তিযুদ্ধের সময় যন্ত্রাদি, দোকানপাট হারিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষক উভয় গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের দায়-দায়িত্বও সরকারকে নিতে হয়েছে। এতিম ও নির্যাতিত নারীদের বাড়িঘর করে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এই সেবা পুনরায় নিশ্চিত করতে কাজ করতে হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিতে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সংস্কার করতে হয়েছে দ্রুততার সঙ্গে।
মহামারি প্রতিরোধে গ্রামাঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিতে বঙ্গবন্ধু সরকারকে তখন আলাদা করে নজর দিতে হয়েছে। এসব কাজের জন্য সরকারকে ১৯৭২ সালের জুন মাসের মধ্যে ১০৭ দশমিক ৩১ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হয়েছে। এগুলো ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম ধাপের কাজ।
দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় জুন মাসের শেষে। যার সূচনালগ্ন আসলে নতুন অর্থবছর। তখন কিন্তু শরণার্থীদের দেশে ফেরার গতি আরও বেড়েছে। ফলে নতুন জাতীয় বাজেটে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিতে আরও জোর দিতে হয়েছে। এর জন্য বাড়িঘর নির্মাণ, পুনর্বাসন ও যুদ্ধে নিঃস্ব জনতাকে আর্থিক সহায়তা করতে হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্প খাত প্রভূত ক্ষতির শিকার হয়। এই ক্ষতি মিটিয়ে আবার এগুলোকে সচল করতে অনেক কর্মসূচি নিতে হয় সরকারকে। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, শুধু পরিবহন খাত (সড়ক, রেল, বেসামরিক বিমান ও অভ্যন্তরীণ নৌযান এবং বন্দর) মুক্তিযুদ্ধে ১২২ দশমিক ৬৫ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়। এগুলোর সংস্কারে সরকারকে দ্রুতই ব্যবস্থা নিতে হয়। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্জন ছিল এক কথায় অসাধারণ।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, আমরা যে স্যুভেনির করেছিলাম তাতে মুক্তিযুদ্ধে ভগ্নপ্রাপ্ত অচল হয়ে যাওয়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ছবি দেওয়া হয়। আবার আরেক ছবি দেওয়া হয়, যেখানে ভারতীয় প্রকৌশলীদের সহায়তায় এটি সংস্কার করা হয়েছে। এটি আসলে দ্রুতগতিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের প্রতীকী চিত্র হিসেবে দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু সরকার বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎসেবা আবার ফিরিয়ে আনে। ঈশ্বরদী, উলন ও খিলগাঁও সাবস্টেশন মেরামত করা হয়। দ্রুতই সিদ্ধিরগঞ্জ, ভেড়ামারা, রূপগঞ্জ, দিনাজপুর ও মেহেরপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল হয় এবং এগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হয়।
কৃষি খাতের প্রসঙ্গ নিয়ে বলি। আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শমতে বঙ্গবন্ধু সরকার পরিস্থিতি উন্নয়নে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক জোগানে মনোযোগ দেয়। কৃষকরা যাতে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপি সার ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে তার জন্য উদ্যোগ নেয় সরকার। এই সময়ে উন্নতমানের বীজ ও বালাইনাশক আমদানি করা হয়। প্রায় ২৪ হাজার টন ইরি-২০ ও ৮০০ টন ইরি-৮ এর বীজ আনা হয় জরুরিভিত্তিতে। এগুলো কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
এ কারণে ১৯৭২ সালে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা যতটা ছিল, বাস্তবে তা অনেকটাই প্রতিরোধ করা গেছে। বঙ্গবন্ধু সরকার বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র সব ধরনের শিল্প খাতের সমন্বয় সাধন করতে সক্ষম হয়। এ কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি দ্রুতই ইতিবাচক পথে যেতে থাকে।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ জন্মের পাঁচ দশকের কাছে এসে যে অগ্রগতি সাধন করেছে, তার পেছনে বঙ্গবন্ধু সরকারের সুদক্ষ কর্মযজ্ঞ আসলে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এর স্বীকৃতি কিন্তু আজকাল বৈশ্বিক পর্যায়ের বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে এবং জগদ্বিখ্যাত অর্থনীতিবিদরা পর্যন্ত দিচ্ছেন।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও প্রধান তথ্য কমিশনার

Category:

কবিতা

Posted on by 0 comment

33 32 34

Category: