Blog Archives

বঙ্গবন্ধু : ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ

Posted on by 0 comment

দিনটি ১৯ জুন ১৯৬৮ সাল। আগরতলা মামলার প্রথম দিন। এক নম্বর আসামি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষ আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। লক্ষ করলেন তার সামনে তার দিকে পিঠ দিয়ে অনেক সাংবাদিক বসে আছেন। একেবারে তার সামনে সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ। বঙ্গবন্ধু তাকে নাম ধরে ডাকলেন।

8-1-2017 8-52-48 PMসৈয়দ বদরুল আহসান: ‘বাংলাদেশে থাকতে হলে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে কথা বলতে হবে।’ কথাগুলো বললেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখনও তিনি বঙ্গবন্ধু হন নি। তখনও জাতির পিতা হন নি। তখনও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় নি।
দিনটি ১৯ জুন ১৯৬৮ সাল। আগরতলা মামলার প্রথম দিন। এক নম্বর আসামি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষ আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। লক্ষ করলেন তার সামনে তার দিকে পিঠ দিয়ে অনেক সাংবাদিক বসে আছেন। একেবারে তার সামনে সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ। বঙ্গবন্ধু তাকে নাম ধরে ডাকলেন। কোনো উত্তর নেই। আবার ডাকলেন। কোনো উত্তর নেই। তৃতীয়বার একটু উচ্চৈঃস্বরে ডাকলেনÑ ‘এই ফয়েজ।’ ফয়েজ আহমদ হাল্কা ও স্বল্প জবাব দিলেনÑ ‘এখানে কথা বলা যাবে না, মুজিব ভাই। গোয়েন্দারা আছে।’
এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর উপরের সেই সাহসী উক্তি। এই ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছিল না তার কোনো ভয়। ছিল অগাধ আত্মবিশ্বাস। সেই আগরতলা মামলা চলাকালে এক বিদেশি সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেনÑ ‘আপনার কি মনে হয়Ñ আপনার ভবিষ্যৎ কী?’ একটু মুচকি হেসে বঙ্গবন্ধু বললেনÑ ‘ণড়ঁ ষরংঃবহং ঃযবু পধহহ’ঃ শববঢ় সব যবৎব সব সড়ৎব ঃযধহ ংরী সড়হঃয’ং Ñ ওরা এখানে আমাকে ছয় মাসের বেশি রাখতে পারবে না।’ এক মাস বেশি লেগেছিল। সপ্তম মাসে বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়েছিলেন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯-এ।
8-1-2017 8-52-32 PMব্যক্তি মুজিবের ছিল অদম্য সাহসÑ সীমাহীন আত্মবিশ্বাস। গোটা যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে। বন্দী অবস্থায় দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেনÑ ১৯৬৮ ও ১৯৭১-এ। ভয় তার মনে প্রবেশ করেনি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম চলছে আর তিনি সুদূর মিয়াওয়ালী কারাগারে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেনÑ কোনো পত্রিকা নেই পড়বার, রেডিও নেই শুনবার। তবুও সাহস হারান নি।
এই ছিল আমাদের শেখ মুজিবুর রহমানÑ আমাদের শেখ সাহেবÑ আমাদের বঙ্গবন্ধু।
তিনি মানুষের নাম ভুলতেন না। ২০ বা ৩০ বছর পার হয়ে গেছে কোনো বন্ধু অথবা ব্যক্তির সাথে শেষ দেখা হওয়ার পর। তবুও তার স্মৃতিশক্তি রয়েছে প্রকট। প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তীর সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল অনেক দিনেরÑ সেই ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। সেই বছরের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে সেই যোগাযোগ আর থাকেনি। ২৫ বছর পর ১৯৭২ সালে, নিখিল চক্রবর্তী এসেছেন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায়। বঙ্গভবনের দরবার হলে একবারে পেছনের সারিতে তিনি বসলেন। তার মনে একটি কথাÑ আমার এই পুরনো বন্ধু আমাকে চিনবে নাÑ চিনবার কারণও নেই।
বঙ্গবন্ধু দরবার হলে প্রবেশ করলেনÑ চারদিকে তাকালেন। একসময় তার দৃষ্টি সেই ভারতীয় সাংবাদিকের দিকে নিক্ষেপ করলেন।
‘তুই নিখিল না?’Ñ নিখিল চক্রবর্তী অভিভূত। এত বছর পর আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন? তার প্রশ্ন বঙ্গবন্ধুর কাছে। ‘আপনি কি রে? তুই গেল কোথায়?’ বঙ্গবন্ধুর উত্তর। বঙ্গবন্ধু নিখিল চক্রবর্তীকে জড়িয়ে ধরলেন।
এই ছিলেন ব্যক্তি মুজিব। কোনো অহঙ্কার নেইÑ মানুষের থেকে কোনো দূরত্ব নেই। মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাতে চেয়েছেন। সেই লক্ষে তার গোটা রাজনৈতিক জীবন কেটেছে গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে পায়ে হেঁটেÑ কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক সবার সঙ্গে কথা বলে। কথা বলতে তিনি ভালোবাসতেনÑ অন্যের কথা শুনতে ভালোবাসতেন।
মানুষটি ছিলেন উদারমনাÑ অসাম্প্রদায়িক। যে মুজিব তার রাজনৈতিক জীবন মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মধ্য দিয়ে শুরু করেছিলেন, সেই মুজিব রূপান্তরিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুতেÑ স্বাধীন বাংলার স্থপতিতেÑ সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বে।
তার রাজনীতি সেই ইতিহাসটিই তুলে ধরে। তিনি সেই ৬-দফার মধ্য দিয়ে কেবল বাংলাদেশের স্বাধিকার ও পরবর্তীতে স্বাধীনতাই চান নিÑ চেয়েছিলেন গোটা পাকিস্তানকে নতুন অসাম্প্রদায়িক ফেডারেল (ঋবফবৎধষ) আঙ্গিকে ঢেলে সাজাতে। ৬-দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬-দফার লক্ষ্য ছিল ঐ এক-দফাÑ বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই সত্যটি আরও বেশি করে আমরা অনুধাবন করি যখন তিনি সেই মার্চ ১৯৭১-এর আলোচনার শেষ ভাগে পাকিস্তানি শাসকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন যে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে একটি ঈড়হভবফবৎধঃরড়হ-এ পরিণত করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস বরাবরই ছিল সাংবিধানিক এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে। ৬-দফা তারই প্রমাণ। মার্চ ১৯৭১-এ যে আলোচনা তিনি তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে চালিয়ে যান সেখানে তার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি সব সময় অবাধ নির্বাচনের কথা বলেছেনÑ জনগণের আস্থাকে তার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
আপস তিনি কখনও করেন নি। সবার সঙ্গে কথা বলেছেন, সবার মতামত নিয়েছেন এবং সেই মতামতের ভালো দিক তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির একটি বড় উদাহরণ তার ৭ই মার্চের ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা করেন নিÑ তবে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। তিনি টউও (টহরষবঃবৎফ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব)-এর দিকে পা বাড়ান নি। তার সামনে রোডেশিয়ার ইয়ান স্মিথ-এর ১৯৬৫ সালের উদাহরণ ছিল। ছিল বায়াফ্রার অজুবওযুর ১৯৬৭-এর কাহিনি। দুজনের একজনও সফল হননি।
আর বঙ্গবন্ধু তো ছিলেন নির্বাচিত নেতাÑ সংখ্যাগুরু দলের নেতা। তিনি তো আর হঠকারী রাজনীতি কখনও করেন নি। তিনি কেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হবেন? এই মূল্যবোধগুলো তার রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বরাবরই কাজ করেছে। পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাস ছিল বঙ্গবন্ধুর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাস। নিয়মতান্ত্রিক পথে পাকিস্তান যায় নিÑ তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা দেখ দিল।

Category:

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব : লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও পরিপ্রেক্ষিত

Posted on by 0 comment

8-1-2017 8-47-28 PM  ড. হারুন-অর-রশিদ: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৬-দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টোর যোগসাজশে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তার বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ, ’৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দুদিন পূর্বে ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক স্থগিত ঘোষণা, প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২-২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও নির্দেশে কার্যত পূর্ব বাংলার প্রশাসন পরিচালনা, রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং তাতে সমগ্র বাঙালির উদ্দেশে শত্রুর বিরুদ্ধে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা’র আহ্বান ও 8-1-2017 8-47-49 PM‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রামÑ স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’ ঘোষণা, পূর্বে ২ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বটতলায় (কলাভবন প্রাঙ্গণ) ছাত্র-জনতার বিপুল সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা প্রদর্শন, ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পল্টনের সভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ লাখো বাঙালির কণ্ঠে রাজপথে উচ্চারিত ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ স্লোগান, ১৯ মার্চ ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনতার প্রতিরোধ, ২৩ মার্চ সমগ্র পূর্ব বাংলায় ‘পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে’ পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ২৫ মার্চ রাত থেকে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নির্বিচার গণহত্যা শুরু, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা, ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে ছয় সদস্য বিশিষ্ট ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন ও আওয়ামী লীগ থেকে ’৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃক ‘স্বাধীনতার সাংবিধানিক ঘোষণা’, ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় সরকারের প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ, ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়, বিশে^র মানচিত্রে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণÑ এসবই ছিল বাংলাদেশ সৃষ্টির বিপ্লবের প্রধান ঘটনা।
বাংলাদেশ বিপ্লব ’৭১-এর তিন বছর পর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু নতুন যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনে উদ্যোগী হন, একে তিনি ‘This is our second revolution’ বা ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বলে আখ্যাত করেন।

দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি
দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির মধ্যে দুটি দিক ছিল সরকার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্মসূচি এবং আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি। প্রথমত ছিল সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন, একটি জাতীয় দল গঠন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করা, জেলা প্রশাসনের দায়িত্বে জনগণের প্রতিনিধি বা গভর্নর, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং দ্বিতীয়ত সমবায়ভিত্তিক কৃষি উৎপাদন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, গ্রামে মাল্টিপারপাস বা বহুমুখী কো-অপারেটিভস, পল্লী অঞ্চলে ‘হেলথ কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা, পরিকল্পিত পরিবার এবং শিক্ষার প্রসার ইত্যাদি।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির স্থলে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। বঙ্গবন্ধু হলেন রাষ্ট্রপতি আর ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী হন সরকারের প্রধানমন্ত্রী। পরিবর্তিত সংবিধানের আওতায় ৬ জুন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দল, সরকারি-বেসরকারি এবং সামরিক অন্যান্য বাহিনীর কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্য নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিবিশেষকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ নামে একটি জাতীয় দল গঠন করা হয়। ২১ জুন সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করে পূর্বের ১৯টি জেলার স্থলে ৬১টি জেলা সৃষ্টি করা হয়। ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু ৬১ জেলার প্রতিটির জন্য একজন করে গভর্নর নিয়োগদান করেন।

দ্বিতীয় বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিত
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিজের ওপর নেন। স্বল্প সময়ের পরিসরে বঙ্গবন্ধু সরকার যুগান্তকারী সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের দেশে ফেরত পাঠানো,  মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে-বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা, কয়েক লক্ষ নির্যাতিতা মা-বোনদের পুনর্বাসন, পাকিস্তানে আটকেপড়া কয়েক লক্ষ বাঙালিকে দেশে ফেরত আনা, ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতু মেরামত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন, চট্টগ্রাম ও চালনা সমুদ্র বন্দর থেকে মাইন অপসারণ, নতুন রাষ্ট্রের জন্য সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনীসহ প্রতিরক্ষা বাহিনী পুনর্গঠন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ১০ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য বিশে^র অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন, মুক্তিযুদ্ধকালীন রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার স্থলে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠন সংবিধানে নিষিদ্ধ ঘোষণা, ১৫ মাসের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান (১৯৭৩), শিক্ষাব্যবস্থাকে বিজ্ঞানভিত্তিক, গণমুখী ও যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন, বিশ^বিদ্যালয়ের কালাকানুন বাতিল করে ১৯৭৩-এর গণতান্ত্রিক আদেশের আওতায় স্বায়ত্তশাসন প্রদান, ৪০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও কয়েক লক্ষ শিক্ষককে সরকারি মর্যাদা দান, ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ব্যবস্থা, বাংলাদেশের জন্য শতাধিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা হত্যা, খুন, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন ইত্যাদির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করেছে, তাদের বিচারের উদ্দেশে ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ (বিচার) ট্রাইব্যুনাল আইন পাস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, সম্পদের ওপর অবাধ ব্যক্তি মালিকানার অবসান এবং দ্রুত আত্মনির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালেই দেশের সকল ব্যাংক-বীমা, পাট ও বস্ত্রকলসহ বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করেন। পুঁজির ঊর্ধ্বতম সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ এবং জমির ঊর্ধ্বসীমা পরিবার পিছু ১০০ বিঘা নির্ধারণসহ ভূমি সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তবে বঙ্গবন্ধু সরকারকে এক চরম বৈরী অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিলেও মুক্তিযুদ্ধকালে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এরপরও অনেকের কাছে থেকে যায়। সশস্ত্র ডাকাতি, লুটতরাজ, ছিনতাই, পরিত্যক্ত বাড়িঘর দখলের মতো সমাজবিরোধী কর্ম চলতে থাকে। উপর্যুপরি বন্যা, খরা ইত্যাদি কারণে দেশে খাদ্য সংকট সৃষ্টি, বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে তা মোকাবেলায় গৃহীত প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচের মধ্যে পড়ে বিপন্ন হওয়া ও পরিশেষে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে বহু লোকের প্রাণহানি, আরব-ইসরাইল যুদ্ধের (১৯৭৩) কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব, কালোবাজারি-মজুদদারি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ইত্যাদি পরিস্থিতি মোকাবেলা স্বাভাবিক অবস্থায়ও যে কোনো সরকারের জন্য খুবই কঠিন। এসবের ওপরে ছিল রাজনৈতিক সংকট এবং তা-ই ছিল সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাধীনতার পর বাম নামধারী চীনপন্থি কিছু গোপন সংগঠন, যেমন সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি, আবদুল হকের (যশোর) পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট), মোহাম্মদ তোয়াহা, আলাউদ্দিন, সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল মতিন, টিপু বিশ্বাস, অহিদুর রহমান প্রমুখের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন তথাকথিত কমিউনিস্ট গ্রুপ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’ এবং বঙ্গবন্ধু সরকারকে রুশ-ভারত কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া ‘অবৈধ সরকার’ বলে গোপনে প্রচারণা চালাতে থাকে। এদের কেউ কেউ দেশ যে স্বাধীন হয়েছে, তা-ই স্বীকার করতে চায় নি। এরা সংসদীয় রাজনীতিতে আদৌ বিশ্বাসী ছিল না। এরা সে সময়ে ভারতের পশ্চিম বাংলাজুড়ে চারু মজুমদারের নকশালবাড়ী আন্দোলন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে দেশের অভ্যন্তরে মুক্তাঞ্চল সৃষ্টির চেষ্টাসহ সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখলের উগ্র হঠকারী রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করে গোপন সশস্ত্র তৎপরতা চালাতে থাকে। থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, বাজার ও ব্যাংক লুট, পাটের গুদামে আগুন, রেললাইনের স্লিপার উপড়ে ফেলা, শ্রেণি-শত্রু খতমের নামে মানুষ হত্যা, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সংসদ সদস্যদের হত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে তারা কার্যত সরকারের বিরুদ্ধে একটি অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ১৯৭৩ সালে পাঁচ মাসেই এদের হাতে ৬০টি থানা আক্রান্ত ও সকল অস্ত্র লুট হয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ঠেকাতে ব্যর্থ হয় বটে, তবে স্বাধীনতার পরেও তাদের বাংলাদেশ-বিরোধী অপতৎপরতা অব্যাহত থাকে। তারা নতুন এই রাষ্ট্র এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
তবে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের সাড়ে ১০ মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের সাবেক ও তখনকার নেতৃত্বের একটি অংশ কর্তৃক ‘শ্রেণি-সংগ্রাম’, ‘সামাজিক বিপ্লব’ ইত্যাদি রোমাঞ্চকর স্লোগান আর ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার নামে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলÑ জাসদ-এর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের রাজনৈতিক ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের কারণেই একমাত্র জাসদ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধিতায় নতুন এই দল গঠন সম্ভব হয়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক দলসমূহ স্বাধীন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকায় সেসব দলের কর্মী-সমর্থকদের অনেকে সরকারের বিরোধিতায় জাসদের ব্যানারে সমবেত হয়। ১৯৭৪ সালে জাসদ আওয়ামী লীগ সরকারকে সশস্ত্র পন্থায় উৎখাত করতে সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত হয়। বলা যায়, এরই অংশ হিসেবে ঐ বছর ১৭ মার্চ জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের মতো আত্মঘাতী কর্মসূচি গ্রহণ করে। এভাবে জাসদের হঠকারী রাজনীতি ও চরম ভারত-বিরোধিতা একদিকে যেমন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, অন্যদিকে  রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। একই সময়ে পৃথকভাবে হলেও, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী)-এর মুখপত্র ‘হক কথা’ ভারত ও বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধিতায় চরম বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণায় লিপ্ত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। চারজন সংসদ সদস্যসহ কয়েক হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকা-ের শিকার হন। জাতীয় জীবনে উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের সংবিধানে জরুরি অবস্থার কোনো বিধানই ছিল না। অবনতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী আইন পাস করে তা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এমনই রাজনৈতিক পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু তার দ্বিতীয় বিপ্লবের সূচনা করেন।

দ্বিতীয় বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’ অর্থাৎ, যুগযুগ ধরে শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত, নির্যাতিত গণমানুষের কল্যাণ, ‘বাংলার দুঃখী মানুষকে পেট ভরে খাবার দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গঠন’, সকল নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে দেশের উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীল হওয়া, এ লক্ষ্যে রাজনীতিক, সামরিক-বেসামরিক আমলা, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে একযোগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ‘বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত’, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল আদর্শ (Core Values) জাতীয় চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা যে কোনো মূল্যে সমুন্নত রাখা, সাম্প্রদায়িকতার বীজ বাংলার মাটিতে আর কোনোদিন যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা, হত্যা, খুন, নাশকতামূলক কর্মকা- কঠোর হস্তে দমন করে জনজীবনে নিরাপত্তা বিধান, চোরাকারবার-মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো, উচ্চ পর্যায় থেকে নি¤œ পর্যায় পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন, সমাজের জ্ঞানী-গুণীজনদের ‘পুল’ গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সম্পৃক্ত করা ইত্যাদি।
বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণের পর দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য হ্রাস পায়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক কথায় দেশের সামগ্রিক অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি ঘটতে থাকে।
বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির পেছনে দেশের উদ্ভূত সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন আশু লক্ষ্য ছিল বটে, তবে তা কিছুতেই একমাত্র বিবেচ্য ছিল না। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক মুক্তি উভয়ই ছিল বঙ্গবন্ধুর মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম সফল হলে এবার জনগণের সার্বিক মুক্তির সংগ্রাম নতুন করে শুরু হয় এবং যা এখনও চলমান। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।’ এ জন্য তিনি বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর অনেক নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাই তার দ্বিতীয় লক্ষ্য অর্জনে এ পর্যায়ে তিনি আত্মনিবেদন করেন। এ জন্য আবশ্যক ছিল সার্বিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। বঙ্গবন্ধুর কথায়, ‘উই হ্যাভ টু মেইক এ কমপ্লিট চেইঞ্জ’ অর্থাৎ, সিস্টেম পরিবর্তন। বঙ্গবন্ধু তার অভিজ্ঞতায় 8-1-2017 8-48-23 PMএও উপলব্ধি করেন, ‘কলোনিয়াল পাওয়ার এবং রুল নিয়ে দেশ চলতে পারে না। নতুন স্বাধীন দেশ স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে।’ অতএব, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব ছিল ‘সিস্টেম চেইঞ্জ’। নিজ হাতে অগাধ ক্ষমতা লাভ কোনো অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল না। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন এবং প্রদত্ত ভোটের ৭৩.১৭ শতাংশ পেয়ে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনায় তিনি বিপুল গণম্যান্ডেট লাভ করেছিলেন। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতির পিতা। তার প্রতি জনগণের সমর্থন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। তাই নতুন করে তার হাতে ক্ষমতার কোনো আবশ্যকতা ছিল না। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ছিল তার জীবনের দ্বিতীয় লক্ষ্য অর্থাৎ, জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক মুক্তি অর্জনের সোপান।
ঘটনাক্রমে বা দৈবাৎ বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করেন নি। তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টিরও অনেক পূর্ব থেকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেই পাকিস্তান আমলেই গণতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আওয়ামী লীগের অন্যতম লক্ষ্য বা কর্মসূচি ছিল। জেলা পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা নির্বাচিত পরিষদের ওপর ন্যস্ত করা এবং মহকুমাসমূহকে জেলায় রূপান্তরিত করা ১৯৭০ সালেই আওয়ামী লীগের গৃহীত কর্মসূচি। অতএব, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির অনেক কিছুই তার রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা ও বিশ্বাস থেকে গ্রথিত।
১৯৭২-৭৪ এই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের আচরণ আদৌ গণতন্ত্রসম্মত ছিল নাÑ তা ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এক কথায়, গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করাই যেন ছিল তাদের কর্মকা-ের একমাত্র উদ্দেশ্য। উদ্ভূত অবস্থায় অনেক চিন্তা-ভাবনা শেষে বঙ্গবন্ধুকে একটি জাতীয় দল গঠনে অগ্রবর্তী হতে হয়। এরপরও বঙ্গবন্ধু একটি জাতীয় দলের ব্যবস্থাধীনে নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীর বিধানসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যবস্থা রাখেন। বঙ্গবন্ধু তার দ্বিতীয় বিপ্লবকেও একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখেন। তার ভাষায়, ‘এটা একটা নতুন এক্সপেরিমেন্ট। এখন দেখা দরকার, এর ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের জনগণের কতটা মঙ্গল করতে পারব। এবং যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করেছি, এর মাধ্যমে তার বাস্তবায়নে কতটা কৃতকার্য হব।’ বঙ্গবন্ধু দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করেন, ‘এই সিস্টেম ইনট্রোডিউস করে যদি দেখা যায় যে, খারাপ হচ্ছে, অলরাইট, রেকটিফাই ইট। কেননা, আমার মানুষকে বাঁচাতে হবে। আমার বাংলাদেশে শোষণহীন সমাজ গড়তে হবে।’
তাই, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্ত আত্মনির্ভর উন্নত-সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদাবান দেশ ও জাতি গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করাই যে ছিল বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের মূল লক্ষ্য, তা স্পষ্ট।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ভাইস চ্যান্সেলর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ও জাতীয় পুনর্গঠন

Posted on by 0 comment

“কোনো ‘ভুঁড়িওয়ালা’ এ দেশে সম্পদ লুটতে পারবে না। গরিব হবে এই রাষ্ট্র ও সম্পদের মালিক, শোষকরা হবে না। এই রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না। এই রাষ্ট্রের মানুষ হবে বাঙালি। তাদের মূলমন্ত্র ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’।”

PMনূহ-উল-আলম লেনিন: স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উন্নয়ন-দর্শন নিয়ে সাম্প্রতিককালে তেমন একটা আলোচনা হয় না। গত শতাব্দীর ন’য়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রের পতন এবং বিশ্বায়িত ধনতন্ত্রের নতুন উত্থান এক অভিনব পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। মার্কসবাদী বা কমিউনিস্ট আদর্শের সমাজতন্ত্রী না হলেও বঙ্গবন্ধু তার নিজস্ব বীক্ষায় একটি শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি যে ‘সমাজতন্ত্র’ তা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না। বঙ্গবন্ধু মানুষে মানুষে ভেদ-বৈষম্যহীন সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন প্রায় সব দেশই, এক ধরনের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। এর মূলে কাজ করেছে তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের মিথে বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধুও তার ব্যতিক্রম নন। প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশ সমাজতন্ত্রকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় নীতি বা লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
এটা কোনো অন্যায় বা হুজুগী ব্যাপার ছিল না। ঔপনিবেশিক পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বের হয়ে আসা পশ্চাৎপদ প্রতিটি দেশই দ্রুত উন্নয়ন এবং সমাজের হতদরিদ্র, শোষিত-বঞ্চিত মেহনতি মানুষের জীবনে সমৃদ্ধির স্বপ্ন রূপায়নের জন্য সমাজতন্ত্রকেই সর্বোত্তম পথ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের তথা সমাজতন্ত্রের পতন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়নের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করে। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগও এতদিনের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং উন্নয়ন-কৌশল বদলাতে বাধ্য হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সেই পরিবর্তিত পথেই দেশের উন্নয়ন রথ এগিয়ে নিচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থার পতন এবং বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের একেশ্বর হয়ে ওঠার পর বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন কতটা প্রাসঙ্গিক? বঙ্গবন্ধু কী স্বপ্নাচারী এবং ইউটোপীয়ার পেছনে ছুটেছেন? তার সোনার বাংলার স্বপ্ন অথবা ভেদ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শ কী অবাস্তবÑ অচল হয়ে পড়েছে?
আমাদের বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক দর্শন এখনও প্রাসঙ্গিক। জাতীয় অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং একটি উন্নত-সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের বর্তমান নীতি-কৌশল মূলত ঠিক থাকলেও, বঙ্গবন্ধুর দর্শন থেকে তার বিচ্যুত হওয়ার অবকাশ নেই।
আমাদের সংবিধানেই বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। ‘জনগণ’ বলতে স্বভাবতই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকেই বোঝায়। যতক্ষণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গরিব থাকবে, হতদরিদ্র থাকবে, ততক্ষণ তত্ত্বগতভাবে তারাই প্রজাতন্ত্রের মালিক। পক্ষান্তরে, জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা তো অপরিবর্তনীয় থাকে না। দারিদ্র্যমুক্ত একটা সমাজ গড়ে উঠলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, দরিদ্র অবস্থা থেকে বেরিয়ে এলে, স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানার চরিত্র এবং রূপও বদলে যায়। বঙ্গবন্ধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ‘রাষ্ট্র ও সম্পদ’-এর মালিক হবে ‘গরিব জনগণ’ বলেছেন। গরিব তো চিরদিন গরিব থাকবে না। বঙ্গবন্ধু এই গরিবানা হটানোর জন্যই সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। বস্তুত, বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিধৃত হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু বারবার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। দুঃখী মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন তথা তাদের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে না পারলে দুঃখী মানুষ তো দুঃখীই থেকে যাবে। জীবনের এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হলেই কেবল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। এই যে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার প্রত্যয়টি কী অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে? নিঃসন্দেহে, এর জবাব হবে ‘না’। আমাদের সংবিধানে দ্বিতীয় ভাগের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ এবং ১৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের কর্তব্য এবং নাগরিকজনের অধিকারসমূহ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেসব কার্যকর হলেই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। এ ছাড়া সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে যেসব অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, সেসব অধিকারই পরিবর্তনের জন্য মানুষের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নি¤œলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়Ñ
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার…
(গ) যুক্তিসংগত বিশ্রাম…
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার…।”
অতীতের সামরিক শাসকরাও সংবিধানের অনেক কিছু কাটছাঁট এবং সংশোধন করলেও দ্বিতীয় ভাগের এই অনুচ্ছেদগুলোতে হাত দেয়নি। বস্তুত, এই অনুচ্ছেদে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গিই অভিব্যক্ত হয়েছে।
8-1-2017 8-43-25 PMসংবিধানে প্রতিফলিত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন যাতে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে লক্ষ্যে ১৯৭২-৭৩ সালেই বঙ্গবন্ধু অনেকগুলো ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সারা বিশ্বব্যাপী জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের তীব্র জোয়ার এবং কোথাও ‘সমাজতন্ত্রের’ উন্নয়ন মডেল, কোথাও ‘মিশ্র অর্থনীতি’ এবং কোথাও ‘অপুঁজিবাদী বিকাশের’ উন্নয়ন মডেল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সর্বোপরি গোটা ষাটের দশকের গণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে জনগণের অভিব্যক্ত আশাবাদ ছিল বঙ্গবন্ধুর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নীতি-পদক্ষেপের মূল প্রেরণা।
উল্লিখিত পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশে সকল ব্যাংক-বীমা এবং পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ করেন। পাকিস্তানের মতো অবাধ পুঁজিবাদী বিকাশের পথ রুদ্ধ করার জন্য পুঁজির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেন। গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জমির সিলিং ১০০ বিঘায় সীমিত করা হয় এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়।
একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠন, ভারত প্রত্যাগত ১ কোটি উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় প্রভৃতি বহুমুখী কাজের চাপ, অন্যদিকে ১৯৭৩ সালে বিশ্বব্যাপী তৈল সংকটের অভিঘাতে বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে ‘মানব সৃষ্ট’ দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা প্রভৃতি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই বঙ্গবন্ধুকে দেশ এগিয়ে নিতে হচ্ছিল।
মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু যে বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সৃষ্টি করেছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল দেশকে দ্রুত শিল্পায়ন এবং গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বহুদলীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে থেকেই বঙ্গবন্ধু এসব অর্থনৈতিক সংস্কার সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন। তবে এ কথাও সত্য তৎকালীন বাস্তবতায় এই বিশাল রাষ্ট্রায়ত্ত খাত, ব্যাংক-বীমা ও কল-কারখানা লাভজনকভাবে পরিচালনার মতো দক্ষ লোকবল আমাদের ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শের প্রতি আস্থা থাকলেও আওয়ামী লীগের নিজস্ব সৎ আদর্শবাদী দক্ষ দলীয় ক্যাডার ছিল না। এই বাস্তবতা বঙ্গবন্ধু জানতেন। ফলে বারবার ব্যক্তি মালিকানায় পুঁজির সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে হয়েছিল। এক পর্যায়ে পুঁজির সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হলেও, শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সীমার সিলিংও উঠিয়ে দিতে হয়।
বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতি-পদক্ষেপগুলো বানচাল করার উদ্দেশে একদিকে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিগুলো, অন্যদিকে চীনের অনুসারী উগ্র বামপন্থি, মওলানা ভাসানীর ন্যাপ এবং জাসদ প্রভৃতি দল কল-কারখানায় অগ্নিসংযোগ, চুরি, ডাকাতি, হত্যা-খুন-সন্ত্রাস প্রভৃতির মাধ্যমে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে। রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিলগুলোর পরিচালনায় সাবেক মালিক বা আমলাদের নিয়োগ করলে তারাও দুর্নীতি ও সাবোটাজের মাধ্যমে পুরো জাতীয়করণকৃত খাতকেই অলাভজনক ও স্থবির করে তোলে। স্বভাবতই এর সাথে যুক্ত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুমুখী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশ সফর করতে এসে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করতে দ্বিধা করে নি।
সে সময় বিশ্বব্যাংকের দুই কর্মকর্তা জাস্ট ফাল্যান্ড এবং জে আর পারকিনসন বাংলাদেশকে নিয়ে উপহাস করে বলেছিলেন, বাংলাদেশের যদি উন্নয়ন সম্ভব হয়, তা হলে পৃথিবীর যে কোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভব। অর্থাৎ, তাদের কথার নিহিতার্থ হলো বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবিতাবস্থায়ই কিসিঞ্জার ও ফাল্যান্ড পারকিনসনদের কথা মিথ্য প্রমাণিত হয়। প্রচ- প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও বন্যাজনিত কারণে ধান উৎপাদন ১ কোটি ২০ লাখ টন থেকে কমে ৯৯ লাখ টনে নেমে এসেছিল। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরেই (বন্যা ও দুর্ভিক্ষাবস্থার মধ্যেই) ধানের উৎপাদন পূর্বের স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন প্রচলিত ব্যবস্থায় দেশকে দ্রুত কাক্সিক্ষত উন্নতি পথে এগিয়ে নেওয়া এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো দুরূহ। সাবোটাজ, ধ্বংস, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বয়ম্ভরতা অর্জন, সর্বোপরি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হলে গোটা ব্যবস্থারই পরিবর্তন দরকার। সে কারণেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। সমাজের কল্যাণকামী, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিকে এক প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয় পুনর্গঠনের মহাকর্মযজ্ঞের সূচনা করেছিলেন। অনেকেই বিষয়টিকে আক্ষরিক অর্থে ‘একদলীয় শাসন’ হিসেবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ‘বাকশাল’ নামে যে জাতীয় ঐক্যের প্লাটফরম করেন, সেখানে সর্বস্তরের জনসাধারণ, বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, অতীতের ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক নিয়ম-রীতি ভেঙে দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনীর সদস্য, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, শ্রমিক, কৃষক, নারী-পুরুষÑ সবাই যেন জাতি গঠনের কাজে অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং সকলের মেধা-শ্রম যেন জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগে, সে জন্যই এই নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। সিভিল প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা সচিবগণ এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ ও উপ-প্রধান জেনারেল জিয়াসহ অনেকেই জাতীয় দল বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সমগ্র দেশে একটা অভিনব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।
বঙ্গবন্ধুর জবানীতেই শোনা যাক কেন এই পরিবর্তন? বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলাম? সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য।…
আমি কেন ডাক (দ্বিতীয় বিপ্লবের) দিয়েছি? এই ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানী আমলের যে শাসনব্যবস্থা, তা চলতে পারে না। একে নতুন করে ঢেলে সেজে গড়তে হবে। তা হলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে, না হলে আসতে পারে না। আমি তিন বছর দেখেছি। দেখেশুনে আমি স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছি এবং তাই জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে শাসনতন্ত্রের মর্মকথা।”
কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বাস যে গ্রামে, সেই গ্রামীণ অর্থনীতির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য ‘বাধ্যতামূলক গ্রাম সমবায়’ চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, তাতে গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না।… পাঁচ বৎসরের প্ল্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে একটি করে কো-অপারেটিভ হবে।… জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু তার ফসলের অংশ সবাই পাবে। প্রত্যেকটি বেকার প্রত্যেকটি মানুষÑ যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে এই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলি বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে।” বঙ্গবন্ধুর গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং বাধ্যতামূলক গ্রাম সমবায়ের ধারণা (ঈড়হপবঢ়ঃ)-এর ওপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট বামপন্থি অর্থনীতিবিদ ড. নজরুল ইসলাম তার গবেষণায় বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হলে এবং পর্যায়ক্রমে গ্রাম সমবায় গঠিত হলে, আমরা যা অনুমান করি, তার চেয়েও অনেক সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হতো। তার মতে, বঙ্গবন্ধুর এই উদ্যোগ সফল হলে কেবল গ্রামজীবনের পুনর্গঠনই নয়, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থারই মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হতো। রাষ্ট্রের মালিক হবে ‘গরিব মানুষ’ বা সংবিধানের ভাষায় ‘জনগণ’, তা কার্যকর হতো। হয়তো এটা বিশ্বে একটা ‘নতুন মডেল’ হিসেবে পরিগণিত হতো।
আমাদের এসব অনুমান নিছক তত্ত্বকথা নয়। “মোট জাতীয় আয় ও মাথাপিছু জাতীয় আয়ের বিবেচনায় ১৯৭২ সালে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের অবস্থান বাংলাদেশের সমতুল্যই ছিল। ৬ গুণ বেশি জনসংখ্যার কারণে মালয়েশিয়ায় মাথাপিছু জাতীয় আয় বাংলাদেশের ২৮০ ডলারের বিপরীতে যদিও ৫০০ ডলার ছিল; কিন্তু উভয় দেশের মোট জাতীয় আয় ছিল প্রায় সমান, ১০৩৩ ডলার। বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত উন্নয়ন নীতি-কৌশলের কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ উন্নয়ন-দৌড়ে নিঃসন্দেহে আজকের মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের সমকক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে অনেক আগেই একটি মধ্যমানের উন্নত দেশে পরিণত হতো।”
কিন্তু বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধু সে সুযোগ পান নি। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা সে সুযোগ দেয় নি। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে পাকিস্তান ও পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের অনুসারী শক্তিগুলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে। তারা এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। খুনি মোশতাক-জিয়া চক্র এবং পরবর্তী সামরিক স্বৈরশাসক, খালেদা-নিজামীর বিএনপি-জামাত জোট পৈশাচিক আক্রোশে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশকে কার্যত পাকিস্তানের মতোই একটি ধর্ম-সাম্প্রদায়িক অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করেছে। এদের সম্মিলিত চক্রান্ত, লুটপাট, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার কারণে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন রূপায়ণ পিছিয়ে গেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী আদর্শের বিজয় অনিবার্য। যতদিন সমাজে দারিদ্র্য থাকবে, ধনী-দরিদ্রে, শোষক-শোষিত সমাজ বিভক্ত থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও উন্নয়ন দর্শন প্রাসঙ্গিক থাকবে। পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায়, বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণ এবং ‘দুঃখী মানুষের মুখে’ হাসি ফোটাতে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। দারিদ্র্য হার ২২ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন। জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো বহুলাংশে পূরণ করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ভিক্ষুকের জাতির কোনো সম্মান থাকে না।’ জননেত্রী শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির ‘ভিক্ষুক’ অভিধাই নয়, পরনির্ভরশীলতার অভিশাপ থেকেও জাতিকে মুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধু বারবার ‘আত্মনির্ভরশীল’ অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলেছেন। বিশেষত খাদ্যে স্বয়ম্ভরতার কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর সময়ের জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। বিদেশ-নির্ভরতার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আজ বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছে। বঙ্গবন্ধু সম্পদ সৃষ্টি ও সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ এখন সম্পদশালী দেশে পরিণত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা দিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার দৃঢ় পদক্ষেপে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অর্থনীতিতে ব্যক্তি মালিকানার অবাধ বিকাশের সুযোগ, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লেষণ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন যত প্রকট ও অসহনীয় হয়ে উঠুক না কেন, সংবিধানের এসব মৌলিক নীতিমালা ও অঙ্গীকারের কোনো পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না। সময়ের এবং বাস্তবতার কারণে উন্নয়ন কৌশল পরিবর্তন স্বাভাবিক বটে। তবে আমাদের মতে, উন্নয়ন কৌশল ও মালিকানার ধরনে পরিবর্তন সত্ত্বেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৌলিক চিন্তাধারা, আদর্শ এবং উন্নয়ন-দর্শন কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়, আজও বাঙালি জাতির এগিয়ে যাওয়ার দিগদর্শন হিসেবে চির অম্লান হয়ে আছে। জাতির পিতার জীবনের দুটি ব্রত ছিল। একটি বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, অন্যটি স্বাধীনতার সুফল যাতে মানুষ পায় সে লক্ষ্যে অর্থনৈতিক মুক্তি তথা একটি উন্নত-সমৃদ্ধ এবং ভেদ-বৈষম্যমুক্ত সমাজ নির্মাণ। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য দেশকে সম্পদশালী করা এবং সেই সম্পদের মালিক যাতে গরিব-দুঃখী মানুষ হতে পারে, তা নিশ্চিত করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবন-দর্শনের মোদ্দা কথা। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই কর্তব্যভার পালন করাই হচ্ছে বর্তমান সরকারের ব্রত।

Category:

ভরা থাক স্মৃতি সুধায়

Posted on by 0 comment

“কত কথা পুষ্প প্রায়
বিকশি তুলিতে চায়
কত অনুরাগে”…

8-1-2017 8-36-30 PM 8-1-2017 8-36-43 PMগীতালি দাশ গুপ্তা: তা কি করে সম্ভব? মাতৃত্বের অসীম অফুরন্তÑ অতলান্ত ভা-ার কী একসঙ্গে বিকশিত করা সম্ভব? তা সম্ভব নয়। আজ মাত্র কয়েকটি স্মৃতির মালা দিয়ে আমার কাকীমা মাননীয়া ফজিলাতুন্নেসার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আর এ স্মৃতির মালা গাঁথার জন্য আমাকে চলে যেতে হচ্ছে ৪৫-৪৬ বছর পেছনে। যে কথা এতদিন নিজেকে বলেছি, অন্যকে জানাবার বা বলবার সুযোগ পাইনি, সে কথা জানাবার সুযোগ আজ আমার দ্বারপ্রান্তে। আমি অভিভূত। আজ আমি প্রলোভিতও বটে। তাই সুযোগের অপব্যবহার করতে ইচ্ছে হলো না। আমার জাগ্রত আত্মার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। মহর্ষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেনÑ “দিনগুলি প্রতি প্রাতে খুলিতেছে জীবনের নতুন অধ্যায়।” শ্রদ্ধেয় ফজিলাতুন্নেসা, যাকে আমি ‘কাকীমা’ বলে সম্মান করেছি শেষ দিনটি পর্যন্ত, সেই ‘কাকীমা’ই আমার রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন অধ্যায়ের’ প্রত্যক্ষজন। আত্মিক বর্ণাঢ্যে তিনি ছিলেন মহীয়সী ও ঐশ্বর্যময়ী।
১৯৭২ সাল। প্রথম পরিচয় ছোট্ট রাসেলের পড়ার কারণে। তারিখটি আজ মনে নেই। এক সকালে সে সময়ের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন মহসীন কাকা (মো. মহসীন সাবেক এমপি, খুলনা)। তার স্ত্রী শ্রদ্ধেয়া রওশন আরা মহসীন আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িতে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। বয়স কম, ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়ে 8-1-2017 8-37-13 PMআপন পড়ার ও অন্যান্য খরচ চালাচ্ছি। আজ মনে হয়, সেদিন ঠিকমতো বুঝতে পারিনি, রওশন কাকীমার সাথে কোথায় যাচ্ছি, কার বাড়িতে যাচ্ছি। ‘বোধের’ অভাব বোধটুকু আজ আমাকে বেশ লজ্জা দিচ্ছে।
রওশন কাকীমা তার গাড়িতে আমাকে নিয়ে গেলেন। ৬টি তারা খচিত গেট পার হয়ে আমরা ভেতরে ঢুকে গেলাম। একটু হেঁটে সামনে আসতেই ডান দিকে একটি দরজা, তারপর সেই দরজায় ঢুকেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। নেটের দরজা ঠেলে মাঝের ঘরে ঢুকলাম। কালো হাতলছাড়া ৬টি চেয়ার টেলিভিশনের দিকে মুখ করে রাখা, তার পেছনে খাবার টেবিল। মনে মনে যে জিনিসটি লালন করে গিয়েছিলাম, সে জিনিসটি নিমেষে কেটে গেল। রওশন কাকীমার বাড়ির আসবাবপত্র এ বাড়ির থেকে ঢের উন্নত। কাজেই আমার মনেই হলো না এটা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। ঘরের মেঝেতে নেই কোনো কার্পেট, নেই মনোহরণ সোফাসেট বা বিলাসবহুল জলখাট। দরজার পাশে দেয়ালের গা ঘেঁষে ছিল শুধু একটা অ্যাকোরিয়াম। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম আর টিউশনি বাড়াব না। কেননা মহসীন কাকার তিন মেয়েকে পড়াতাম ১৯৭০ সাল থেকে। ১৯৭২ সালে ওরা ছিল যথাক্রমেÑ দশম (মনি), অষ্টম (মীনা) ও পঞ্চম (রীনা) শ্রেণির ছাত্রী। পঞ্চম শ্রেণির রীনা ছিল ইংলিশ মিডিয়ামের। সুতরাং ওদের নিয়ে ছিলাম খুব ব্যস্ত। তারপর আমার নিজের পড়াশোনা। তাই রওশন কাকীমাকে আমি আমার অপারগতার কথা জানিয়ে বলেছিলাম, ‘কাকীমা আমার তো সময় হবে না। কীভাবে আমি আবার নতুন টিউশনি নেব?’
কাকীমা বললেন, ‘গীতালি তোমাকে আমি নিয়ে যাব, আর তোমাকে নিয়ে যেতেই হবে। কোথা থেকে ডাক এসেছে তুমি বুঝতে পারছ না? প্রধানমন্ত্রীর বাসা থেকে। তুমি চল সেখানে গিয়ে যা বলার তুমি বলবে।’ এ মন নিয়েই সেদিন গিয়েছিলাম ৩২নং সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বাসায়। যা আজ বাঙালি জাতির তীর্থক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে।
দোতলায় কিছুক্ষণ বসার পর যিনি বেরিয়ে এলেন তাকে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেছি। কী সাধারণ! কোনো বিলাসিতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। পরনে ছিল হালকা ক্রিম কালারের পাড়ওয়ালা তাঁতের শাড়ি। শাড়িটি কুচি দিয়ে পরা। মাথায় ঘোমটা, হাতে দু’গাছা চুড়ি। মুখে পান। হাসতে হাসতে রওশন কাকীমাকে বললেন, ‘ভাবী আসছেন।’ দুজনেই আদাব দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। রওশন কাকীমা উত্তর দিলেন, ‘এই যে, আমার মেয়েদের টিচার গীতালি, ওর কথাই শুনেছেন আমার ভাই মোর্শেদের মুখে।’ আমি অবাক বিস্ময়ে তখনও দাঁড়িয়ে আছি। আমি অভিভূত। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে এসেছেন। বললেন, ‘গণভবনে ছিলাম। আপনে আসবেন তাই সকালেই চইল্যা আসছি। রাসেলকে নিয়ে আসছি।’ আমি তখনও মাতৃত্বের অসাধারণ রূপ দেখছি। শরৎ চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত (১ম পর্ব) উপন্যাসে অন্নদা দিদিকে প্রথম দেখে শ্রীকান্তের মনে হয়েছিল ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নি। এইমাত্র তপস্যা ছাড়িয়া উঠিয়া আসিলেন।’ এমন কথা আমি বলতে বা চিন্তা করতে পারিনি, কেননা আমি লেখিকা নই। তাই আটপৌরে চিন্তাই আমাকে মুগ্ধ করেছে সেদিন, তা হলো ‘মা’-এর মতো অসাধারণ!
আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, ‘বসেন।’ পিছন ফিরে কাকে যেন ডাকলেন, ওর নামটা ছিল রমা। বললেন, ‘ভাইয়াকে নিয়ে আয়। বল নতুন টিচার এসেছে ভাইয়ার।’
একটু পরে ছোট্ট রাসেল হাসি হাসি মুখে রমার সাথে বেরিয়ে এলো। বয়স ছয় কী সাড়ে ছয়, পরনে ছিল আকাশি রঙের ঘুমের পোশাক। মাথার চুল ছোট করে কাটা। কিছু কপালের ওপরে এসে পড়েছে, সিঁথির বালাই নেই। এসে আমার পাশের চেয়ারটাতে বসল। রমার হাতে একটা স্কুলব্যাগ, রমা ব্যাগটা টি-টেবিলের ওপর রেখে দাঁড়িয়ে রইল উৎসুক চোখে। হয়তো বা নতুন ছাত্র ও নতুন টিচারের অবস্থা বোঝার জন্য। ব্যাগ থেকে বই বের করে নিলাম আমি নিজেই। বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখছি। দু-একটি প্রশ্ন ছিল সেদিন। যেমনÑ নাম, ক্লাস, কী কী করতে পারে? ইত্যাদি ইত্যাদি। ১০-২০ মিনিট পর রাসেলকে ছেড়ে দিলাম। ও হাসি হাসি মুখে ভেতরে চলে যাচ্ছিল।
এর মধ্যে রাসেলের মা শ্রদ্ধেয়া ফজিলাতুন্নেসা বলে উঠলেন, ‘টিচারকে সালাম দিয়ে যাও।’ ও সালাম দিয়ে চলে গেল।
চা ও জল খাবার এলো। রওশন কাকীমাকে ও আমাকে খেতে বললেন। এ সময় আরও কথা হলো। সেগুলো এখানে আর না-ই বললাম।
এরপর রোজ যাতায়াত শুরু। বেগম ফজিলাতুন্নেসা, যিনি পরবর্তীতে ‘বঙ্গমাতা’ নামে বাংলার মানুষের কাছে সমাদৃতÑ শ্রদ্ধাসিক্ত হয়েছিলেন, সে আমার মাতৃসমা ‘কাকীমা’ হয়ে গেলেন। তিনি কেবল কাকীমাই নন, আমি যেন কবে থেকে তার পাঁচ ছেলেমেয়ের সারিতে ঠাঁই পেয়ে গেলাম। তিনি কখন যে আমাকে এত কাছে নিলেন, টেরও পাই নি। আমার প্রতি ও বাড়ির প্রত্যেকটি লোকের বিশ্বাস ও ভালোবাসায় আমি ¯œাত, বিস্মিত ও অভিভূত।
কাকীমার আচরণে আমি মাঝে মাঝে বিস্মিত হয়ে যেতাম। আমার মনে হয় হাসুআপা (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) যখন থাকতেন না বা যেদিন বাসায় আসতেন না, সেদিন যদি কিছু প্রয়োজন বা কথা থাকত তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন। আমার বুদ্ধিতে যেটুকু আসত আমি বলতাম। আমার প্রতি গভীর বিশ্বাস, মমত্ববোধ আর অপত্য ¯েœহ শেষ দিনটি পর্যন্ত আমাকে আপ্লুত করে রেখেছে। তার এই ভালোবাসা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। আমার ব্যক্তিগত অনেক কথা আমি কাকীমাকে বলেছি। তার কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছি। ভুল করলে বুঝিয়ে দিয়েছেন আপন মমতায়। এই কাকীমা সম্পর্কে আমাকে লিখতে বলা হয়েছে। বড় শক্ত কাজ। কথার বেড়াজালে তা প্রকাশে আমি অক্ষম। তবুও দু-চারটি ঘটনার ছবি আঁকার ব্যর্থ চেষ্টা করছি।
রোজ পড়াতে যেতে হতো রাসেলকে। পড়াতে পড়াতে একটা সময় এসেছিল সপ্তাহের একটি দিনও ছুটি থাকবে না আমার। না না, বাড়ির লোকের কাছে থেকে নয়, আমার বুঁচু রাসেলের কাছ থেকে। ওকে আদর করে আমি বুঁচু ডাকতাম। তাই কাকীমাকে গোপনে জানাতাম, কাকীমাও গোপনে মাঝে মাঝে নিজের কাঁধে দোষ নিয়ে আমাকে ছুটির ব্যবস্থা করে দিতেন। এমনি একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, গোপনে কাকীমাকে জানিয়ে পড়ার ঘরে ঢুকেছি, রাসেল জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘কাল আপনি আসবেন না কেন?’ চোখে-মুখে বিরক্তির চিহ্ন। আমি বললাম, ‘কেন আসব না?’ ও মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিল ‘মাকে কি বললেন তবে?’ বিপদ আসন্ন বুঝতে পারলাম। ঠিক সে মুহূর্তে কাকীমা এলেন। আমরা সেদিন জামালের ঘরে। এসেই কাকীমা জামালের জিনিস খোঁজার ভান করে বললেন, ‘জামাল যে কোথায় কী রাখে, কিছু পাওয়া যায় না।’ এরপর টেবিলের কাছে এসে বললেন, ‘তোরা পড়িস না? খালি ঝগড়া করিস, কি হইছে বল।’ আমি বললাম, ‘কাকীমা আপনাকে আমি কী বলেছি যে কাল আসব না?’ কাকীমা বুঝতে পেরে হেসে বললেন, ‘তুই বলবি ক্যান আমিই তো তোরে আসতে না করলাম। কাইল আমরা একটু বাইরে যাব।’ রাসেল বলে উঠল, ‘আমি যাব না।’
‘ক্যান তুই যাবি না? তুই আর আমিই তো যাব।’ কাকীমা বলে উঠলেন। পরের দিন কাকীমা আমার জন্য রাসেলকে নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন। এর পরের দিন যখন পড়াতে গেলাম, রাসেল আমাকে সব খবর না দিয়ে থাকতে পারত না। সমবয়সী বন্ধুর মতো ভাব ছিল আমাদের দুজনের।
মনে পড়ে, আমার ¯œাতকোত্তরের ফল প্রকাশ পেয়েছে, আমি খুব খুশি। ভাবলাম পড়াতে যাব না। কিন্তু যখন সময় এলো কোন এক অদৃশ্য টান ভিতরে অনুভব করলাম। লালমাটিয়ায় মহসীন কাকার মেয়েদের পড়িয়ে, রাসেলকে পড়াতে এলাম। দরজাতেই কাকীমাকে পেলাম। কাকীমা হাসিমুখে নেটের দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘আইছিস আয়।’ আমি চট করে তাকে প্রণাম করতেই বলে উঠলেন, ‘কি রে পরীক্ষার রেজাল্ট বাইরাইছে?’ আমি হাসি মুখে মাথা নাড়ালাম। ‘ভালো হইছে তো রেজাল্ট?’ আমি হেসে বললাম, ‘সেকেন্ড ক্লাস আছে।’ আমার মা যেমন রেজাল্ট শুনে খুশি হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি আমি কাকীমার মুখে সেই খুশি আর তৃপ্তি দেখেছিলাম। মনে হলো তারই এক মেয়ে পাস করেছে। তিনি রাসেলকে ডাকলেন, বললেনÑ ‘তোর আপা এমএ পাস করেছে, ওরে মিষ্টি খাওয়া।’ সেদিন শুধু মিষ্টিই নয়, আরও প্রাপ্তি যোগ ছিল। কাকা (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু) রাতে ঘরে ফেরার সাথে সাথেই কাকীমা তাকে খবরটা পৌঁছে দিয়েছিলেন। তক্ষুণি কাকা পড়ার ঘরে এসে দাঁড়ালেন। আমি উঠে প্রণাম করার আগেই রাসেল খুশি ভরে আমার পাসের খবর দিল। কাকা উচ্ছ্বাস ভরে বলে উঠলেন, ‘মাস্টার খুব খুশি হইছি তোর পাসে। এবার তোর কাকীমাকে বল, তোকে একটা চাকরি দিতে। তোর কাকীমার হাতে চাকরি আছে একটা’ বলেই আমার মাথায় হাত রেখে তার আবেগ আর উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আশীর্বাদ করলেন। একটু পরে কাকীমা এলেন, হাতে একটি প্যাকেট। প্যাকেটটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘মাগো তোর এমএ পাসের জন্য এই শাড়িটা।’ আমি বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। খুশিতে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল সেদিন। সে মুহূর্তে কী মনে হয়েছিল মনে পড়ে না। তবে আজ মনে হচ্ছে, এই তো বাঙালির চিরন্তন ‘মাতৃমূর্তি’। আজও সেই শাড়িটি আমার কাকীমার ¯েœহসিক্ত আশীর্বাদের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
একদিন আমি আর রাসেল জামালের ঘরে ঢুকেছি, দরজা ভেজানো। খানিক পরে কাকীমা ঘরে ঢুকলেন। তখন আমরা দুজনে ‘ক্রশ ও শূন্যের’ খেলা খেলতে শুরু করেছি। কাকীমা ঘরে ঢুকতেই বুঝতে পেরেছেন আমরা খেলছি। কাকীমা বলে উঠলেন, ‘কি করছিস তোরা? খেলছিস? এই মাত্র না তোরা পড়তে ঢুকলি? আগে পড় পরে খেলবি।’ এ কথা বলে কাকীমা চলে গেলেন। আমি তো সত্যি সত্যি লজ্জায় একেবারে জড়সড় হয়ে গেলাম। একটা অপরাধবোধ নিয়ে রাসেলকে বললাম, ‘বুঁচু (আমি আদর করে এ নামে ডাকতাম) আর খেলব না। কাকীমা কী বলে গেলেন শুনেছ? আমার কতটা খারাপ লেগেছে বুঝতে পার? কতটা লজ্জা পেলাম বলো তো?’ আমি কিন্তু এ কথা সত্যি সত্যিই ওকে বলেছি। সঙ্গে সঙ্গে আমার বুঁচু খেলার খাতাটা বন্ধ করে বই খুলে পড়তে বসল। আমি পড়া শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি কাকীমা একা একা টেলিভিশন দেখছেন। আমি আস্তে আস্তে তার কাছে গিয়ে বসি। একটু সময় নিয়ে, লজ্জিতভাবে বলে ফেললাম, ‘কাকীমা, রাসেল আগে খেলতে চাইল, তাই খেলছিলাম। তা না হলে ও তো পড়বে না।’
কাকীমা হেসে বললেন, ‘দূর পাগল, আমি কি তোর পড়া দেখতে গেছি? আমি এমনি তোদের কাছে গেছি। তোর যেভাবে খুশি পড়াবি। আমি পড়া দেখতে যাই নাই রে। রাসেলের পড়ার দায়িত্ব তোর, তুই যা ভালো বুঝবি তাই করবি।’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সত্যি সেদিন যে আমার কী অবস্থা হয়েছিল তা কাউকে বোঝানো যাবে না। অথচ কাকীমা কত অবলীলায় এটার সমাধান করে দিলেন। পরবর্তীতে আমি কাকীমাকে বলেছি, ‘আপনি মাঝে মাঝে আমাদের পড়ার ঘরে আসবেন। আপনি এলে পড়াতে সুবিধা হবে।’
আর একদিন, আমি বুঁচুকে ৫টি অঙ্ক দিয়েছি করার জন্য। অঙ্কে ছিল ওর ভীষণ অনীহা। ৫টা অঙ্ক দেবার পর সে যখন অঙ্কগুলো করেছিল, তখন একটা অঙ্ক আমার সাহায্য নিয়ে করছিল বলে আমি আরও একটা অঙ্ক দিয়েছিলাম। এতে বুঁচু ক্ষেপে গিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। একটু পরে দেখি সে কাকীমাকে সঙ্গে করে পড়ার ঘরে এলো। ঘরে ঢুকেই কাকীমা খুব রাগের সুরে আমাকে বললেন, ‘কি রে তুই না-কি রাসেলকে ৫টা অঙ্ক করার কথা বলে ৬টা অঙ্ক দিছিস?’ বলেই আমাকে একটা চোখ টিপ দিলেন। এরপর বললেন, ‘এ রকম আর করবি না কখনও।’ আমিও মুখ ভার করে মন খারাপ করে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। আমার বিচার করে কাকীমা ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। যদিও এ বিচারে আমার আদরের বুঁচুর আমার জন্য কষ্ট হয়েছিল, তাই সে ৬টা অঙ্কই সেদিন করেছিল। বাসায় ফেরার পথে যথারীতি কাকীমার সাথে দেখা করতে গেলামÑ উনি হেসে আস্তে করে বললেন, ‘তোর নামে আমার কাছে নালিশ করেছে।’ আমি হেসে বুঝিয়ে দিলাম আমি বুঝতে পেরেছি। কাকীমা হয়তো ভেবেছিলেন আমি কষ্ট পেয়েছি বা কিছু মনে করেছি। তাই সহজে আমাকে বলে দিলেন। এমনই ছিলেন তিনি। ঠিক মায়ের মতো।
8-1-2017 8-36-57 PMআমি এ ক’বছরে তার বাড়িতে কোনো বিউটিশিয়ান বা সাজসজ্জার লোক দেখতে পাই নি। অনেকগুলো বিয়েতে তাকে আমি দেখেছি, যেমনÑ রাজ্জাক কাকুর (আবদুর রাজ্জাক এমপি) বিয়েতে উনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন, এক টেবিলে খেতে বসিয়েছেন, আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তবে তিনি বাসায় গেছেন। তার পোশাকে ছিল আভিজাত্যের মহিমাÑ বিলাস বৈভব নয়। একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়ে অন্তরে ও বাইরে ছিলেন ¯েœহময়ী মা ও প্রেয়সী। আমার মনে হয়, মধ্যযুগের কবি ভারত চন্দ্রের ‘ঈশ্বরী পাটনী’র মতো তারও যেন একমাত্র কামনাÑ ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’
আমি তার ভেতরে দেখেছি শাশ্বত বাঙালি নারীমূর্তি। যে একাধারে কন্যা-জায়া-প্রেয়সী-গৃহিণী ও সর্বোপরি একজন মা। আমার বিশ্বাস, এ বক্তব্যের সাথে যারা তার সাথে একান্তভাবে মিশেছেন তারাও একমত হবেন।
কাকীমাকে মাঝে মাঝে আমার সাথে অভিনয় করতে হতো। দু-একটি ঘটনা আমি আগে বলেছি। রাসেলের যখন পড়তে ইচ্ছে করত না তখন পড়ার জন্য জোর করলেই বলত, ‘কাল থিকা আপনি আর আসবেন না, আমি আপনার কাছে আর পড়ব না।’ আমিও ওর মতো মুখের ভাব করে বলতাম, ‘আচ্ছা আর আসব না। তবে আজ যখন আসছি তখন কষ্ট করে একটু পড়। কাল থেকে আর আসব না।’ সেও বলত, ‘আসবেন না।’ দুজনেই চুপ। পড়াবার চেষ্টা চলত আমার। এর মাঝে রমা বা ফরিদ চা-খাবার দিয়ে যেত। ওদের আমি সিরিয়াসভাবে বলতাম, ‘আমি খাব না, খাবার নিয়ে যাও। কাল থেকে তোমাদের আর খাবার দিতে হবে না।’ ওরা সবাই আমার অভিনয় ধরে ফেলে বলত, ‘আপা আইজ খান রাগ করবেন না। আপনি না খাইলে ভাইয়া তো কষ্ট পাবে।’ এরপরের ঘটনা আরও মজার ছিল। আসার সময় আমি সেই সিরিয়াস মুখ করে কাকীমাকে গিয়ে বলতাম, ‘কাকীমা কাল থেকে আর পড়াতে আসছি না, আজই শেষ।’ বলেই কাকীমাকে একটা প্রণাম করে ফেলতাম। রাসেল এ সময় কাকীমার শাড়ির ভেতরে লেপটে থাকত। কাকীমাও তার অভিনয়ের অংশটুকু খুব সুন্দরভাবে অভিনয় করে বলতেন, ‘কেন আসবি না, কি হইছে?’ আমি উত্তর দিতাম, ‘আমাকে কাল থেকে আসতে বারণ করা হয়েছে।’ তিনি উত্তরে বলতেন ‘কী করব বল? যখন না করেছে তখন আসবি না। তবে মাঝে মাঝে আমাদের সাথে দেখা করতে আসিস।’ ব্যাস শাড়ির ভেতর থেকে রাসেল কাকীকে ঠেলত আর বলত, ‘মা আসতে বল কালকে, আসতে বল।’ কাকীমা বলতেন, ‘গীতালি আসলে পড়বি তো, না কি?’ অপূর্ব অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সমাধান হয়ে গেলে সে মূহূর্তের নাটক। পরের দিন আবার পড়া চলতÑ আবার যাওয়া-আসা হতো।
এক সকালে পড়াতে বসে রমাকে ডাকছি আমি (রমা রাসেলের দেখাশোনা করত)। কাকীমা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘রমা রে ডাকস ক্যান?’ কাকীমা আসায় আমি অস্বস্তিবোধ করছি দেখে রাসেল বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, ‘এই খাবারের প্লেটগুলো টেবিল থেকে নেয় না কেন?’ কাকীমা সঙ্গে সঙ্গে প্লেটগুলো সরাবার জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি নিতেছি।’ আমি বাধা দেওয়াতে তিনি বললেন, ‘নিজের ঘরের কাজে লজ্জা কী?’ পরে বলে ফেললেন, ‘আমার ঘরে পরার স্যান্ডেলটা ছিঁড়ে গ্যাছে তাই সারতে পাঠাইছি রমাকে। দেখিসনা আমি খালি পায় হাঁটছি।’ এই বলে পা দেখালেন। একটু পর রমা স্যান্ডেল সারিয়ে নিয়ে এলো। তিনি স্যান্ডেলে পা ঢুকিয়ে বললেন, ‘একটু হিল ছাড়া স্যান্ডেল পরতে পারি না। হাঁটতে কষ্ট হয়।’ দেখলাম এক থেকে দেড় ইঞ্চি হিল স্যান্ডেলের। একটু চিন্তা করলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী সম্পর্কে কিছু উদঘাটন অতি সহজেই করা যাবে।
সংসারের সমস্ত দিকে ছিল কাকীমার খেয়াল। প্রতিটি লোকের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন। আমি দু-একদিন বিরক্তভাব দেখেছি মাত্র। যে কোনো কথা বা কাজ অতি গুরুত্বের সাথে শুনতেনÑ ভাবতেন। সবাইকে ভাই বা আপা বলে ডাকতেন। ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। তার ব্যবহারে কেউ কষ্ট পেয়েছে বলে আমার মনে হয় না।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় মশার জন্য ধূপ আর নারিকেলের ছোবড়া জ্বালাতেন। একদিন এক ভদ্র মহিলা বলেছিলেন, ‘ভাবী আপনি কি হিন্দু যে রোজ ধূপ জ্বালান?’ হাসি মুখে কাকীমা উত্তর দিলেন, ‘ভাবী আমাদের পূর্ব পুরুষ তো হিন্দুই ছিল। আমরা তো পরে মুসলমান হয়েছি। আর ধূপের কথা বলছেন? এটা তো মশা দূর করার মহৌষধ।’ সেদিন তিনি ঐ ভদ্র মহিলার সাথে আর কোনো তর্ক করেন নি। অদ্ভুত ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। সব বুঝতে পারতেন; কিন্তু তর্কে যেতেন না কারও সাথে। আমি তার অনেক কথার সঙ্গী হয়েছি, তাতে আমার বুঝতে মোটেও অসুবিধে হয়নি যে, কাকীমাÑ কাকার জন্য, সন্তানের জন্য, আত্মীয়ের জন্য বা পরিবারের সবার জন্য কতই না চিন্তা করতেন। আমিও তার বাইরে ছিলাম না। আমি তার চিন্তার ভেতরের একজন অংশীদার ছিলাম। এমনই হাজারও কথা রয়েছে আমার আর কাকীমার।
প্রতিদিন রাতে আমার পড়ানো শেষ হলে কাকীমার কাছে এসে দাঁড়াতাম। অথবা কাকীমা নিজেই খোঁজ নিয়ে যেতেন পড়া শেষ হয়েছে কি-না। মাঝে মাঝে প্রয়োজনে সকাল বা দুপুরে পড়াতে যেতাম। আমার তো ছুটি ছিল না। না পড়ালেও নিত্য ছিল আনাগোনা। কেননা আমার ছাত্রটি চাইত রোজ আমি যাই। আর ওর কষ্ট দেখে আমারও ভালো লাগত না। সুতরাং, যত কাজই থাক হাজির হতাম। অন্যথায় কী করতাম আগেই বলেছি।
মুন্সি (মুন্সি মারা গেছে, ওর আত্মার শান্তি কামনা করছি) ছিল কাকীমাদের পুরনো ড্রাইভার। শুনেছি রেহানার জন্মের সময় থেকেই সে এ বাড়ির ড্রাইভার। কাজেই আমি যখন পড়া শেষে কাকীমার কাছে এসে দাঁড়াতাম তখন কাকীমা, রমা, আবদুল বা ফরিদকে (ফরিদ মারা গেছে, ওর আত্মার শান্তি কামনা করছি) ডেকে বলতেন, ‘আপাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। মুন্সিকে বলো।’ কখনও কখনও কাকীমাÑ ডলি আপা (রাফিয়া আক্তার ডলি), হানিফ ভাই (ঢাকার মেয়র ছিলেন), অথবা মহিউদ্দিন ভাইকে (যিনি বঙ্গবন্ধুর বডিগার্ড ছিলেন) অনুরোধ করতেন আমাকে বাসায় পৌঁছে দেবার জন্য। যদি কখনও মুন্সি বা অন্যরা না থাকতেন তবে যে জিনিসটি হতো সেটিতে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। কাকীমা নিজে অত রাতে আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যেতেন। এই পৃথিবীতে এমন নজির আছে কি-না আমার জানা নেই। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী যে কি-না তার ছেলের গৃহশিক্ষককে বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন। এখন হয়তো এটা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। কিন্তু এটাই সত্য। আমার এই মাতৃসমা কাকীমা একদিন নয়, বহুদিন আমাকে পৌঁছে দিয়েছেন বাসায়। মুন্সিকে তিনি বিশ্বাস করতেন বলেই আমাকে তিনি তার সাথে ছেড়েছেন। যখন অন্য ড্রাইভার গাড়ি চালাত তখন তিনি সবসময় নিজে সঙ্গে থাকতেন। এ যেন মা-মেয়েকে নির্বিঘেœ পৌঁছে দিচ্ছেন। এটাও যেন তার বহু কর্তব্যের মধ্যে একটি।
আমি আমাকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি ঠিকই, তবে বুকের গভীরে যে ব্যথা লালন করছি, তার যন্ত্রণা বড় বেশি। সেই ক্ষত কাউকে বোঝানো যাবে না, দেখানো যাবে না। এই অক্ষমতা মনে হয় আমার একার নয়, যারা আমার কাকীমা ফজিলাতুন্নেসার সাথে মিলেছেন তাদের সবার। তাই আজ অপকটে স্বীকার করে বলছি, মায়ের মূর্তি কথা দিয়ে গড়তে আমি অক্ষম। সে মূর্তি গড়ার কারিগর হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। এই মাকে অনুভব করতে হয় হৃদয়ের গভীরে, নিমগ্ন চিন্তার ভেতর দিয়ে।
তবুও শেষ চেষ্টায় বলাÑ

বাংলার আকাশের দিকে তাকাও
অজ¯্র তারার মাঝে তাকে দেখবে,
বাংলার মাটির দিকে তাকাও,
দেখ, মা আর মাটি একাকার হয়ে আছে।
প্রকৃতির দিকে তাকাও,
মায়ের হৃদয় স্পর্শ আর গন্ধ খুঁজে পাবে।
আমাদের দিকে তাকাও,
দেখ, সন্তানের অন্তরে তিনি অধিষ্ঠিতা।

পাদটীকা : গীতালি দাশ গুপ্তার পৈতৃক বাড়ি মাদারীপুর। ১৯৬৫ সালে বরিশালের সারস্বত উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৯ সালে মাদারীপুর নাজিমউদ্দিন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ¯œাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৭৩ সালে আমরা একসাথেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি। গীতালি ১৯৭২-এর আগস্ট থেকে ১৯৭৫-এর ১৪ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র রাসেলের গৃহশিক্ষক ছিলেন। ১৪ আগস্ট ’৭১, রাত ১১.৩০ মিনিট পর্যন্ত তিনি ৩২নং-এর বঙ্গবন্ধু ভবনে ছিলেন। পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন সরকারি কলেজের শিক্ষকতা করে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে থাকেন।
আমাদের সতীর্থ গীতালি বছর তিনেক আগে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তার সাথে পুরনো দিনের অনেক স্মৃতিচারণ হয়। গৃহশিক্ষকতার সুবাদে বঙ্গবন্ধুর পরিবার, বিশেষত বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ও রাসেলকে ঘিরে তার স্মৃতির কথা বলেন। আমরা (আমার স্ত্রী ও সতীর্থ কাজী রোকেয়া সুলতানা এবং আমি) তার স্মৃতিকথা শুনেছি আর আবেগতাড়িত হয়ে চোখের জল ফেলেছি। গীতালি তার পিসতুতু ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. হিরণ¥য় সেনগুপ্তের বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার কোয়ার্টারে আবার কখনও কখনও জ্যাঠু বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ফণীভূষণ মজুমদারের ৩৩ মিন্টু রোডের বাসায় থাকতেন। বেগম মুজিব গীতালিকে বিভিন্ন সময়ে, রাতে এই দুই বাসায় নিজে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। মাঝে মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হলেও সংগত কারণেই শেখ হাসিনা গীতালিকে তেমন একটা জানতেন না। গীতালির হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিচারণ শুনে আমি তাকে তা লিখতে অনুরোধ করি। গীতালি উত্তরণ-এর আগস্ট সংখ্যার জন্য উপরের সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি সিডনি থেকে পাঠিয়েছেন। গীতালির বাবা শ্রী হেমচন্দ্র দাশগুপ্ত এবং মা শ্রীমতি রাণী দাশগুপ্ত। এই লেখার শেষে উদ্ধৃত কবিতা গীতালির রচিত।
সম্পাদক

Category:

আমার মা: বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

Posted on by 0 comment

8-1-2017 8-31-59 PMশেখ হাসিনা: এই আগস্টে আমার মায়ের যেমন জন্ম হয়েছেÑ আবার কামাল, আমার ভাই, আমার থেকে মাত্র দুবছরের ছোট, ওরও জন্ম এই আগস্টে। ৫ই আগস্ট ওর জন্ম।
নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস যে, এই মাসেই, ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে আমার মাকে। আমি আজকের দিনে আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ১৫ আগস্ট যাঁরা শাহাদাতবরণ করেছেনÑ আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, কামাল, জামাল, রাসেল, কামাল-জামালের নবপরিণীতা বধূ, সুলতানা ও রোজী, আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসের, আমার ফুপা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ১৩ বছরের মেয়ে বেবী, ১০ বছরের আওরাফ, ৪ বছরের নাতি সুকান্ত, সুকান্তের মা এখানেই আছেন। আমার বাবার সামরিক সচিব কর্নেল জামিল, যিনি ছুটে এসেছিলেন বাঁচাবার জন্য।
এই ১৫ আগস্টে একই সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, এভাবে পরিবারের এবং কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারসহ প্রায় ১৮ জন সদস্যকে। আমি আজকের দিনে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
এই হত্যাকা- ঘটেছিল কেন? একটাই কারণ, জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়ে সেই যুদ্ধ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শাহাদাতবরণ করেছেন আমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
পৃথিবীর ইতিহাসে কত নাম-না-জানা ঘটনা থাকে। আমার মায়ের স্মৃতির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে যে, আজকে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, স্বাধীন জাতি; কিন্তু এই স্বাধীনতার জন্য আমার বাবা যেমন সংগ্রাম করেছন, আর তাঁর পাশে থেকে আমার মা, আমার দাদা-দাদি সব সময় সহযোগিতা করেছেন।
আমার মায়ের জন্মের পরই তাঁর পিতা মারা যান। তাঁর মাত্র তিন বছর বয়স তখন। আমার নানা খুব শৌখিন ছিলেন। তিনি যশোরে চাকরি করতেন। সব সময় বলেছেন, “আমার দুই মেয়েকে বিএ পাস করাব।”
সেই যুগে টুঙ্গিপাড়ার মতো অজপাড়াগাঁয়ে ঢাকা থেকে যেতে লাগত ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা। সেই জায়গায় বসে এই চিন্তা করা, এটা অনেক বড় মনের পরিচয়। তখনকার দিনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। মা মিশনারি স্কুলে কিছু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু তারপর আর বেশিদিন স্কুলে যেতে পারেন নি, স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল বলে। আর ঐ এলাকায় স্কুলও ছিল না। একটাই স্কুল ছিল, জিটি স্কুল। অর্থাৎ গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া স্কুল। যেটা আমাদেরই পূর্বপুরুষদেরই করা। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইলের ওপর, প্রায় দেড় কিলোমিটারের কাছাকাছি। দূরে কাঁচা মাটির রাস্তা। একমাত্র কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে অথবা নৌকায় যাওয়া যায়। কিন্তু মেয়েদের যাওয়া ছিল একদম নিষিদ্ধ।
বাড়িতে পড়াশোনার জন্য প-িত রাখা হতো। মাস্টার ছিল আরবি পড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার মায়ের পড়শোনার প্রতি অদম্য একটা আগ্রহ ছিল। মায়ের যখন তিন বছর বয়স তখন তাঁর বাবা মারা গেলেন। আপনারা জানেন যে, সে সময় বাবার সামনে ছেলে মারা গেলে মুসলিম আইনে ছেলের ছেলেমেয়েরা কোনো সম্পত্তি পেত না। আমার মায়ের দাদা তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর দুই নাতনিকে তাঁর নিজেরই আপন চাচাতো ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে যান এবং সমস্ত সম্পত্তি দুই নাতনির নামে লিখে দিয়ে আমার দাদাকে মোতাওয়াল্লী করে দিয়ে যান।
এর কিছুদিন পর আমার নানিও মারা যান। সেই থেকে আমার মা মানুষ হয়েছেন আমার দাদির কাছে। পাশাপাশি বাড়িÑ একই বাড়ি, একই উঠোন। কাজেই আমার দাদি নিয়ে আসেন আমার মাকে। আর আমার খালা দাদার কাছেই থেকে যান।
8-1-2017 8-32-12 PMএই ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায়, শ্বশুর-শাশুড়ি দেবর-ননদের সঙ্গেই তিনি বেড়ে ওঠেন ছোটবেলা থেকেই। উনার ছোটবেলায় অনেক গল্প আমরা শুনতাম। আমার দাদা-দাদির কাছে, ফুপুদের কাছে। বাবা রাজনীতি করছেন, সেই কলকাতা শহরে যখন পড়াশোনা করতেন তখন থেকেই। মানবতার জন্য তাঁর যে কাজ এবং কাজ করার যে আকাক্সক্ষা, যার জন্য জীবনে অনেক ঝুঁকি তিনি নিয়েছেন। সেই ১৯৪৭-এর রায়টের সময় মানুষকে সাহায্য করা, যখন দুর্ভিক্ষ হয় তখন মানুষকে সাহায্য করা। সব সময়, স্কুলজীবন থেকেই তিনি এভাবে মানুষের সেবা করে গেছেন।
আমরা দাদা-দাদির কাছেই থাকতাম। যখন পাকিস্তান হলো, আব্বা তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। সে সময় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আন্দোলন করলেন। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হলেন। প্রথম ভাষা আন্দোলন, ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট ডাকা হলো। সেই ধর্মঘট ডাকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গ্রেফতার হলেন। এরপর ১৯৫৯ সালে ভুখা মিছিল করলেন, তখনও গ্রেফতার।
বলতে গেলে, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে ৩-৪ বার তিনি গ্রেফতার হন। এরপর ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে যখন গ্রেফতার করা হয়, আর কিন্তু তাঁকে ছাড়েনি। সেই ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দী ছিলেন এবং বন্দিখানায় থেকে ভাষা আন্দোলনের তিনি সব রকম কর্মকা- চালাতেন। গোপনে হাসপাতালে বসে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হতো।
মা শুধু খবরই শুনতেন যে, এই অবস্থাÑ কাজেই স্বামীকে তিনি খুব কম সময় কাছে পেতেন। যদি আমাদের জীবনটার দিকে ফিরে তাকাই এবং বাবার জীবনটা যদি দেখি, কখনও একটানা দুটি বছর আমরা কিন্তু বাবাকে কাছে পাইনি। কাজেই স্ত্রী হিসেবে আমার মা ঠিক এভাবে বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু কখনও কোনোদিন কোনো অনুযোগ-অভিযোগ তিনি করতেন না। তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর স্বামী দেশের জন্য কাজ করছেন, মানুষের জন্য কাজ করছেন। যে কাজ করছেন তা মানুষের কল্যাণের জন্য করছেন।
মায়ের দাদা যে সম্পত্তি দিয়ে গেছেনÑ প্রচুর জমিজমা। জমিদার ছিলেন, সব সম্পত্তি মায়ের নামে। এ থেকে যে টাকা আসত, আমার দাদা সব সময় সে টাকা আমার মায়ের হাতে দিয়ে দিতেন। একটি টাকাও মা নিজের জন্য খরচ করতেন না, সব জমিয়ে রাখতেন। কারণ জানতেন যে, আমার বাবা রাজনীতি করেন, তাঁর টাকার অনেক দরকার। আমার দাদা-দাদি সব সময় দিতেন। দাদা সব সময় ছেলেকে দিতেন। তারপরও মা তাঁর ঐ অংশটুকুÑ বলতে গেলে নিজেকে বঞ্চিত করে টাকাটা বাবার হাতে সব সময় তুলে দিতেন। এভাবেই তিনি সহযোগিতা শুরু করেন।
তখন কতই-বা বয়স! পরবর্তীতে যখন ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন হয়, সে নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচনী কাজে সবাই সম্পৃক্ত, আমার মাও সে সময় কাজ করেছেন। নির্বাচনে জয়ী হবার পর আব্বা আমাকে নিয়ে আসেন। আব্বার ইচ্ছা ছিল আমাদেরকে ভালোভাবে স্কুলে পড়াবেন। এরপর উনি মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। আবার মন্ত্রিসভা ভেঙে গেল। আমার এখনও মনে আছেÑ তখন আমরা খুব ছোট, কামাল-জামাল কেবল হামাগুড়ি দেয়Ñ তখন মিন্টু রোডের তিন নম্বর বাসায় আমরাÑ একদিন সকালবেলা উঠে দেখি মা খাটের ওপর বসে আছেন চুপচাপ, মুখটা গম্ভীর। আমি তো খুবই ছোট, কিছুই জানি না। রাতে বাসায় পুলিশ এসেছে, বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।
মা বসা খাটের ওপরে, চোখে দুফোটা অশ্রু। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা কই?”
বললেন, “তোমার বাবাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে।”
চোখের সামনে থেকে এই প্রথম গ্রেফতার। ১৪ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। মা কোথায় যাবেন? কেবল ঢাকায় এসেছেন, খুব কম মানুষকে চিনতেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ঐ বাসায় মানুষে গমগম করত। কিন্তু ঐদিন সব ফাঁকা! আমার আব্বার ফুপাতো ভাই, আমার এক নানা, তাঁরা এলেন। বাড়ি খোঁজার চেষ্টা। নাজিরাবাজারে একটা বাড়ি পাওয়া গেল। সে বাসায় আমাদের নিয়ে উঠলেন মা।
এভাবেই একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। কিন্তু একটা জিনিস আমি বলব যে, আমার মাকে আমি কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। কখনওÑ যত কষ্টই হোকÑ আমার বাবাকে বলেন নি যে, তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা চলে আস বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও। কখনও না।
সংসারটা কীভাবে চলবে সম্পূর্ণভাবে তিনি নিজে করতেন। কোনোদিন জীবনে কোনো প্রয়োজনে আমার বাবাকে বিরক্ত করেন নি। মেয়েদের অনেক আকাক্সক্ষা থাকে স্বামীদের কাছ থেকে পাবার। শাড়ি, গহনা, বাড়ি, গাড়ি, কত কিছু!
এত কষ্ট তিনি করেছেন জীবনে; কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলেন নি। চান নি। ১৯৫৪ সালের পরও বারবার কিন্তু বাবাকে গ্রেফতার হতে হয়েছে। তারপর ১৯৫৫ সালে তিনি আবার মন্ত্রী হন। তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচন করে জয়ী হন, মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। আমরা ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডে এসে উঠি।
আমরা বাংলাদেশের ইতিহাস দেখলে দেখব, সবাই মন্ত্রিত্বের জন্য দল ত্যাগ করে। আর আমি দেখেছি আমার বাবাকে যে, তিনি সংগঠন শক্তিশালী করবার জন্য নিজের মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেন। ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন।
কোনো সাধারণ নারী যদি হতেন তা হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করতেন, স্বামী মন্ত্রিত্ব কেন ছেড়ে দিচ্ছেন সে জন্য। এই যে বাড়ি-গাড়ি এগুলো সব হারাবেন, এটা কখনও হয়তো মেনে নিতেন না। এ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি হতো, অনুযোগ হতো। কিন্তু আমার মাকে দেখিনি এ ব্যাপারে একটা কথাও তিনি বলেছেন। বরং আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাই সমর্থন করতেন।
সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনি চলে গেলেন ছোট্ট জায়গায়। এরপর আব্বাকে টি-বোর্ডের চেয়ারম্যান করলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তখন আমাদের সেগুনবাগিচায় একটা বাসায় থাকতে দেওয়া হলো। এরপরই এলো মার্শাল ল’। আইয়ুব খান যেদিন মার্শাল ল’ ডিক্লেয়ার করলেন আব্বা করাচিতে ছিলেন। তাড়াতাড়ি চলে এলেন, ঐ দিন রাতে ফিরে এলেন। তারপরই ১১ তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ, ১২ তারিখে আব্বাকে গ্রেফতার করা হলো। আমার দাদি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে যে নগদ টাকা ছিল, আমাদের গাড়ি ছিল, সব সিজ করে নিয়ে যাওয়া হলো।
অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমার মাকে দেখেছি সে অবস্থা সামাল দিতে। মাত্র ৬ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। মালপত্তর নিয়ে রাস্তার ওপর আমরা ছোট ছোট ভাইবোন। তখন রেহানা খুবই ছোট। একজন একটা বাসা দিল। দুই কামরার বাসায় আমরা গিয়ে উঠলাম। দিনরাত বাড়ি খোঁজা আর আব্বার বিরুদ্ধে তখন একটার পর একটা মামলা দিচ্ছে। এই মামলা-মোকদ্দমা চালানো, কোর্টে যাওয়া এবং বাড়ি খোঁজা, সমস্ত কাজ আমার মা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে করতেন।
আওয়ামী লীগের এবং আব্বার বন্ধু-বান্ধবরা ছিলেন। আমার দাদা সব সময় চাল, ডাল, টাকা-পয়সা পাঠাতেন। হয়তো সে কষ্টটা অতটা ছিল না। আর যদি কখনও কষ্ট পেতেন মুখ ফুটে সেটা বলতেন না।
এরপর সেগুনবাগিচায় দোতলা একটা বাসায় আমরা উঠলাম। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর অসুখ-বিসুখ হলে তাকে সাহায্য করা, যারা বন্দী তাদের পরিবারগুলো দেখা, কার বাড়িতে বাজার হচ্ছে না সে খোঁজখবর নেওয়া। এগুলো করতে গিয়ে মা কখনও কখনও গহনা বিক্রি করেছেন। আমার মা কখনও কিছুতে না বলতেন না।
আমাদের বাসায় ফ্রিজ ছিল। আব্বা আমেরিকা যখন গিয়েছেন ফ্রিজ নিয়ে এসেছেন। মা সেই ফ্রিজটা বিক্রি করে দিলেন। আমাদের বললেন, “ঠা-া পানি খেলে সর্দি-কাশি হয়, গলা ব্যথা হয়, ঠা-া পানি খাওয়া ঠিক না। কাজেই এটা বিক্রি করে দিই।”
কিন্তু এটা কখনও বলেন নি যে, আমার টাকার অভাব। সংসার চালাতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাহায্য করতে হচ্ছে, কে অসুস্থ তাকে টাকা দিতে হচ্ছে।
কখনও অভাব কথাটা মায়ের কাছ থেকে শুনিনি। এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেন নি। আমাদের কিন্তু কোনোদিন বলেন নি, আমার টাকা নেই, বাজার করতে পারলাম না। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছেন; আচার দিয়ে বলেছেন, “প্রতিদিন ভাত ভালো লাগে নাকি? আজকে আমরা গরিব খিচুড়ি খাব, এটা খেতে খুব মজা।”
আমাদের সেভাবে তিনি খাবার দিয়েছেন। একজন মানুষ, তাঁর চরিত্র দৃঢ় থাকলে যে কোনো অবস্থা মোকাবেলা করার মতো ক্ষমতা ধারণ করতে পারেন।
অভাব-অনটনের কথা, হা-হুতাশ কখনও আমার মায়ের মুখে শুনিনি। আমি তাঁর বড় মেয়ে। আমার সঙ্গে আমার মায়ের বয়সের তফাত খুব বেশি ছিল না। তাঁর মা নেই, বাবা নেই, কেউ নেই। বড় মেয়ে হিসেবে আমিই ছিলাম মা, আমিই বাবা, আমিই বন্ধু। কাজেই ঘটনাগুলো আমি যতটা জানতাম আর কেউ জানত না। আমি বুঝতে পারতাম। ভাইবোন ছোট ছোট, তারা বুঝতে পারত না।
প্রতিটি পদে তিনি সংগঠনকে, আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছেন। তবে প্রকাশ্যে আসতেন না। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন, “আমি আইয়ুব খানকে ধন্যবাদ দিই।”
“কেন?”
আব্বা ১৯৫৮ সালে অ্যারেস্ট হন। ডিসেম্বর মাসে হেবিয়াস কর্পাস করে মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নিজে এসে মামলা পরিচালনা করেন। তখন তিনি জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু ইমবার্গো থাকে যে, উনি ঢাকার বাইরে যেতে পারবেন না। রাজনীতি করতে পারবেন না। সব রাজনীতি বন্ধ।
ঐ অবস্থায় আব্বা ইন্সুরেন্সে চাকরি নেন। তখন সত্যি কথা বলতে কী, হাতে টাকা-পয়সা, ভালো বেতন, গাড়ি-টাড়ি সব আছে। একটু ভালোভাবে থাকার সুযোগ মায়ের হলো। তিনি ঠাট্টা করে বলতেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় আইয়ুব খান এনে দিয়েছিল। উনি চাকরি করেছেন, আমি স্থিরভাবে জীবনটা চালাতে পেরেছি।”
ঐ সময় ধানমন্ডিতে দুটো কামরা তিনি করেন। ১৯৬১ সালের অক্টোবরে আমরা ধানমন্ডি চলে আসি। এ বাড়িটা তৈরি করার সময় লেবার খরচ বাঁচানোর জন্য আমার মা নিজের হাতে ওয়ালে পানি দিতেন, ইট বিছাতেন। আমাদেরকে নিয়ে কাজ করতেন।
বাড়িতে সব কিছুই ছিল। আব্বা তখন ভালো বেতন পাচ্ছেন। তারপরও জীবনের চলার পথে সীমাবদ্ধতা থাকা বা সীমিতভাবে চলা, সব কিছুতে সংযতভাবে চলাÑ এই জিনিসটা কিন্তু সব সময় মা আমাদের শিখিয়েছেন।
এরপর তো দিনের পর দিন পরিস্থিতি উত্তাল হলো। ১৯৬২ সালে আবার আব্বা গ্রেফতার হলেন, ১৯৬৪ সালে আবার গ্রেফতার হলেন। আমি যদি হিসাব করি কখনও দেখিনি দুটো বছর তিনি একনাগাড়ে কারাগারের বাইরে ছিলেন। জেলখানায় থাকলে সেখানে যাওয়া, আব্বার কী লাগবে সেটা দেখা, তাঁর কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়া, মামলা-মোকদ্দমা চালানোÑ সবই কিন্তু মা করে গেছেন। সব।
পাশাপাশি সংগঠনের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ তাঁর ছিল। বিশেষ করে ছাত্রলীগ তো তিনি নিজের হাতেই গড়ে তোলেন। ছাত্রলীগের পরামর্শ, যা কিছু দরকার তিনি দেখতেন।
১৯৬৪ সালে একটা রায়ট হয়েছিল। আব্বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই সময় হিন্দু পরিবারগুলোকে বাসায় নিয়ে আসতেন, সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাদের শেল্টারের ব্যবস্থা করতেন। ভলান্টিয়ার করে দিয়েছিলেন রায়ট থামাবার জন্য। জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আমার বাবা করেছেন, আদমজীতে বাঙালি-বিহারি রায়ট হলো, সেখানে তিনি ছুটে গেছেন। প্রতিটি সময় এই যে কাজগুলো করেছেন, আমার মা কিন্তু ছায়ার মতো তাঁকে সাহায্য করে গেছেন। কখনও এ নিয়ে অনুযোগ করেন নি। এই যে একটার পর একটা পরিবার নিয়ে আসতেনÑ তাদের জন্য রান্নাবান্না করা খাওয়ানোÑ সব দায়িত্ব পালন করতেন। সব নিজেই করতেন।
এরপর দিলেন ৬-দফা। ৬-দফা দেবার পর তিনি যে সারা বাংলাদেশ ঘুরেছেন, যেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানে মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন। আবার মুক্তি পেয়েছেন, আবার আরেক জেলায় গেছেন। এভাবে চলতে চলতে ১৯৬৬ সালের ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলো। তারপর তো আর মুক্তি পাননি। এই কারাগার থেকে বন্দী করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল। পাঁচ মাস আমরা জানতেও পারিনি তিনি কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না!
সে সময় আন্দোলন গড়ে তোলা, ৭ জুনের হরতাল পালনÑ আমার মাকে দেখেছিÑ তিনি আমাদেরকে নিয়ে ছোট ফুপুর বাসায় যেতেন, কেননা সেখানে ফ্ল্যাট ছিলÑ ওখানে গিয়ে নিজে পায়ের স্যান্ডেল বদলাতেন, কাপড় বদলাতেন, বোরকা পরতেনÑ একটা স্কুটারে করে, আমার মামা ঢাকায় পড়তেন, তাঁকে নিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন, আন্দোলন চালাবে কীভাবে তার পরামর্শ নিজে দিতেন।
তিনি ফিরে এসে আমাদের নিয়ে বাসায় যেতেন। কারণ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সব সময় নজরদারিতে রাখত তাঁকে। কাজেই গোয়েন্দাদের নজরদারি থেকে বাঁচাতে তিনি এভাবেই কাজ করতেন। ছাত্রদের আন্দোলন কীভাবে গতিশীল করা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং এ হরতালটা যেন সফল হয়, আন্দোলন বাড়ে, সফল হয়Ñ তার জন্য তিনি কাজ করতেন। কিন্তু কখনও পত্রিকায় ছবি ওঠা, বিবৃতি এসবে তিনি ছিলেন না।
একটা সময় এলো ৬-দফা, না ৮-দফা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেতারা চলে এলেন। আমাদেরও অনেক বড় বড় নেতারা চলে এলেন। কারণ আওয়ামী লীগ এমন একটা দল যে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা সব সময় ঠিক থাকেন; কিন্তু নেতারা একটু বেতাল হয়ে যান মাঝে মাঝে। এটা আমার ছোটবেলা থেকেই দেখা।
এই সময়ও দেখলাম ৬-দফা, না ৮-দফা। বড় বড় নেতারা এলেন করাচি থেকে। তখন শাহবাগ হোটেল, আজকে যেটা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়Ñ আমার মা মাঝে মাঝে আমাকে পাঠাতেন যে, যা, একটু নেতারা আসছেন, তাদের স্ত্রীরা আসছেন, তাদের খোঁজখবর নিয়ে আয়, আমার সঙ্গে কে কে আছে দেখে আয়।
মানে একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসা আর কী! তো আমি রাসেলকে নিয়ে চলে যেতাম। মায়ের কাছে এসে যা যা ব্রিফ দেওয়ার দিতাম। তা ছাড়া মায়ের একটা ভালো নেটওয়ার্ক ছিল ঢাকা শহরে। মহানগর আওয়ামী লীগের গাজী গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে কখন কী হচ্ছে সমস্ত খবর আমার মায়ের কাছে চলে আসত। তখন তিনি এভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মফস্বল থেকেও নেতারা আসতেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন।
কারণ রাজনৈতিকভাবে তিনি যে কত সচেতন ছিলেন সেটা আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কাজেই সেই সময় ৬-দফা থেকে এক চুল এদিক-ওদিক যাবেন না এটাই ছিল তাঁর সিদ্ধান্ত। এটা আব্বাকে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নেতারা সব উঠেপড়ে লাগলেন, “৮-দফা খুবই ভালো, ৮-দফা মানতে হবে।”
আমার নিজের অভিজ্ঞতা আছেÑ আমি তখন কলেজে পড়ি, তারপর আমি ইউনিভাসির্টিতে চলে গেলামÑ সে সময় আমাদের নামি-দামি নেতারা ছিলেনÑ কেউ কেউ বলতেন, “তুমি মা কিছু বোঝ না।”
আমি বলতাম, “কিছু বোঝার দরকার নেই, আব্বা বলেছেন ৬-দফা, ৬-দফাই দরকারÑ এর বাইরে নয়।”
আমার মাকে বোঝাতেন, “আপনি ভাবি বুঝতে পারছেন না।”
তিনি বলতেন, “আমি তো ভাই বেশি লেখাপড়া জানি না, খালি এটুকুই বুঝি, ৬-দফাই হচ্ছে বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ। এটা উনি বলে গেছেন, এটাই আমি মানি। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।”
এভাবে তাঁরা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের বাসায় ওয়ার্কিং কমিটির তিন দিনের মিটিং। রান্নাবান্নায় তখন তো এত ডেকোরেশন ছিল নাÑ অত টাকা-পয়সা পার্টির ছিল না। আমার মা নিজের হাতেই রান্না করে খাওয়াতেন। আমরা নিজেরাই চা বানানো, পান বানানো, এগুলো করতাম। তখন আবার পরীক্ষার পড়াশোনা। পরীক্ষার পড়া পড়ব না বক্তৃতা শুনব! একটু পড়তে গিয়ে আবার দৌড়ে আসতাম ‘কী হচ্ছে কী হচ্ছে’Ñ চিন্তা যে, ৮-দফার দিকে নিয়ে যাবে কি না। কিন্তু সেখানে দেখেছি আমার মায়ের সেই দৃঢ়তা।
মিটিংয়ে রেজুলেশন হলো যে, ৬-দফা ছাড়া হবে না। নেতারা বিরক্ত হলেন, রাগ করলেন। অনেক কিছু ঘটনা আমার দেখা আছে। মা আব্বার সঙ্গে দেখা করতে যখন কারাগরে যেতেন, তখন সব বলতেন। আমার মায়ের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। আমরা মাঝে মাঝে বলতাম, তুমি তো টেপরেকর্ডার। মা একবার যা শুনতেন তা ভুলতেন না।
আমাদের কতগুলো কায়দা শিখিয়েছিলেন যে, জেলখানায় গিয়ে কী করতে হবেÑ একটু হৈচৈ করাÑ ঐ ফাঁকে বাইরের সমস্ত রিপোর্টগুলো আব্বার কাছে দেওয়া এবং আব্বার নির্দেশটা নিয়ে আসাÑ তারপর সেটা ছাত্রদের জানানো। স্লোগান থেকে শুরু করে সব কিছুই বলতে গেলে কারাগার থেকেই নির্দেশ দিয়ে দিতেন। সেভাবেই কিন্তু মা ছাত্রলীগকে কাজে লাগাতেন।
১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে উনাকে নিয়ে গেল ক্যান্টনমেন্টে। আমরা কোনো খবর পেলাম না। তখন মায়ের যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যখন দেয়, তখন কিন্তু আমার মাকেও ইন্টারগেশন করেছে যে, তিনি কী জানেন এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। উনি খুব ভালোভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “স্বাধীনতা আমাদের দরকার।”
আমার মনে আছেÑ ভুট্টোকে যখন আইয়ুব খান তাড়িয়ে দিল মন্ত্রিত্ব থেকেÑ ভুট্টো চলে এলেন তখনকার দিনের ইস্ট পাকিস্তানেÑ এসেই ছুটে গেলেন ৩২ নম্বর বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। আমাদের বসার ঘরটার নিচে যে ঘরটা আছে, ওখানে আগের দিনে এ রকম হতো যে, ড্রয়িং রুম, এরপর ডাইনিং রুম, মাঝখানে একটা কাপড়ের পর্দা। মাÑ যখন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা আসতেনÑ পর্দাটা টেনে ভেতরে বসে কথা বলতেন।
বলতেন, “আমি পর্দা করি।”
আমাদের বলতেন, “ওদের সঙ্গে থাকব না, দেখা করব কেন?”
আমার আব্বা যে মিনিস্টার ছিলেন, এমপি ছিলেন, এমএলএ ছিলেন, করাচিতে যেতেনÑ আমার মা কিন্তু জীবনে একদিনও করাচিতে যাননি, কোনোদিন যেতে চানও নি। উনি জানতেন, উনিই বেশি আগে জানতেন যে, এদেশ স্বাধীন হবে। এই যে স্বাধীনতার চেতনায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করা, এটা মায়ের ভিতরে তীব্র ছিল। একটা বিশ্বাস ছিল।
আগরতলা মামলার সময় আব্বার সঙ্গে প্রথম আমাদের দেখা জুলাই মাসে। যখন কেস শুরু হলো, জানুয়ারির পর জুলাই মাসে প্রথম দেখা হয়, তার আগ পর্যন্ত আমরা জানতেও পারিনি। ঐ জায়গাটা আমরা মিউজিয়াম করে রেখেছি। ক্যান্টনমেন্টে যে মেসে আব্বাকে রেখেছিল, যেখানে মামলা হয়েছিল, সেখানেও মিউজিয়াম করে রাখা হয়েছে।
এরপর আমাদের নেতারা আবারও উঠেপড়ে লাগলেনÑ আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকলেন, সেখানে যেতে হবে, না গেলে সর্বনাশ হবে। মা খবর পেলেন। আমাকে পাঠালেন। বললেন, “আমার সঙ্গে কথা না বলে কোনো সিদ্ধান্ত যেন উনি না দেন।”
আমাদের বড় বড় নেতারা সবাই ছিলেন, তারা নিয়ে যাবেন। আমার আব্বা জানতেন, আমার উপস্থিতি দেখেই বুঝে যেতেন যে, মা কিছু বলে পাঠিয়েছেন। মা খালি বলে দিয়েছিলেন, আব্বা কখনও প্যারোলে যাবেন না, যদি মুক্তি দেন তখন যাবেন। সে বার্তাটাই আমি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলাম। আর তার জন্য আমাদের নেতারা বাসায় এসে বকাঝকাÑ “তুমি কেমন মেয়ে, তুমি চাও না তোমার বাবা বের হোক জেল থেকে?”
ভাবীকে বলতেন, “আপনি তো বিধবা হবেন।”
মা শুধু বলেছিলেন, “আমি তো একা না, এখানে তো ৩৪ জন আসামি, তারা যে বিধবা হবে এটা আপনারা চিন্তা করেন না? আমার একার কথা চিন্তা করলে চলবে? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ৩৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই তো বিবাহিত। মামলা না তুললে উনি যাবেন না।”
তাঁর যে দূরদর্শিতা, রাজনীতিতে, সেটাই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছে। কারণ সেদিন যদি প্যারোলে যেতেন আব্বা, তা হলে কোনোদিনই আর বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, এটা হলো বাস্তবতা। এরপর অসহযোগ আন্দোলনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি দেখেছি মায়ের দৃঢ় ভূমিকা।
৭ মার্চের ভাষণের কথা বারবারই আমি বলি। বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা লিখে দিয়েছেন, “এটা বলতে হবে ওঠা বলতে হবে।” কেউ কেউ বলছেন, “এটাই বলতে হবে, না বললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।” এ রকম বস্তা বস্তা কাগজ আর পরামর্শ!
গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে যেতে হলে আমার মা কিন্তু আব্বাকে বলতেন, “কিছুক্ষণ তুমি নিজের ঘরে থাক।”
তাঁকে ঘরে নিয়ে তিনি একটা কথা বললেন যে, “তোমার মনে যে কথা আসবে তুমি সে কথা বলবা। কারণ লাখো মানুষ সারা বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছে, হাতে বাঁশের লাঠি, নৌকার বৈঠা নিয়ে।”
আর এদিকে পাকিস্তানি শাসকরাও অস্ত্র-টস্ত্র নিয়ে বসে আছে এই বলে যে, বঙ্গবন্ধু কী নির্দেশ দেন। তারপর মানুষগুলোকে আর ঘরে ফিরতে দেবে না, নিঃশেষ করে দেবে, স্বাধীনতার স্বাদ বুঝিয়ে দেবে। এটাই ছিল পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত!
আর সেখানে আমাদের কোনো কোনো নেতা বলে দিলেন যে, এখানেই বলে দিতে হবে যে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। কেউ বলে, এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে।
মা বাবাকে বললেন, “সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল-জুলুম খেটেছÑ দেশের মানুষকে নিয়ে যে স্বপ্ন!”
কীভাবে স্বাধীনতা এনে দেবেন সে কথাই তিনি ঐ ভাষণে বলে এলেন। যে ভাষণ আজকে সারাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণÑ আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যত ভাষণ আছেÑ যে ভাষণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছেÑ সে ভাষণের শ্রেষ্ঠ ১০০টি ভাষণের মধ্যে এ ভাষণ স্থান পেয়েছেÑ যে ভাষণ এ দেশের মানুষকে প্রেরণা দিয়েছিল।
এরপর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যখন তিনি এলেনÑ ফোনে বলেছিলেনÑ খসড়াটা ইপিআর-এর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চলে যাবেÑ ব্যবস্থাটা সবই করা ছিল, সবই উনি করে গিয়েছিলেন। জানতেন যে, যে কোনো সময় তাঁকে গ্রেফতার বা হত্যা করা হতে পারে। মা সব সময় জড়িত আমার বাবার সঙ্গে, কোনোদিন ভয়ভীতি দেখিনি। যে মূহূর্তে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, তারপরই সেনাবাহিনী এসে বাড়ি আক্রমণ করল, উনাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। পরের দিন এসে আবার বাড়ি আক্রমণ করল, আমার মা পাশের বাসায় আশ্রয় নিলেন।
তারপর এ-বাসা ও-বাসা করে মগবাজারের একটা বাসা থেকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হলো। ১৮ নম্বর রোডের একতলা বাসায় রাখা হলো। খোলা বাড়ি। কিছু নেই, পর্দা সেই। রোদের মধ্যে আমাদের পড়ে থাকতে হয়েছে, দিনের পর দিন। মাকে কিন্তু কখনও ভেঙে পড়তে দেখি নি। সব সময় একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, সাহস ছিলÑ সে সাহসটাই দেখেছি।
এরপর যেদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর সারেন্ডার করে, আমরা কিন্তু সেদিন মুক্তি পাইনি, আমরা পেয়েছি একদিন পরে, ১৭ ডিসেম্বর। এখানে একটা ছবি দেখিয়েছে, মা দাঁড়িয়ে আছেন মাঠের ওপর। মানুষের সঙ্গে হাত দেখাচ্ছেন, ওটা কিন্তু বাঙ্কার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ বাড়িতে মাটির নিচে বাঙ্কার করেছিল। কাজেই ঐ বাঙ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে যখন ইন্ডিয়ান আর্মি এসে পাকিস্তান আর্মিকে স্যারেন্ডার করে নিয়ে গেল, হাজার হাজার মানুষ ওখানে চলে এলো, মা হাত নেড়ে দেখাচ্ছেন।
সারেন্ডার করার সময় গেটে যে সেন্ট্রি ছিল, আমরা ভেতরে বন্দী, আমরা তো বের হতে পারছি না, জানালা দিয়ে মা হুকুম দিচ্ছেন। ঐ সিপাহীটার নামও জানতেন। বলছেন যে, “হাতিয়ার ডাল দো।”
ঐ যে ‘হাতিয়ার ডাল দো’ প্রচার, তখন তিনি জানতেন। বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ‘জ্বি মা জ্বি’ বলে অস্ত্রটা নিয়ে বাঙ্কারে চলে গেল। কাজেই উনার যে সাহসটা তা ঐ সময়েও ছিল। ঐ দিন রাতেও আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, যেভাবে হোক আমরা বেঁচে গেছি।
আমার মায়ের যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার পর তিনি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বৌ হিসেবে বিলাসী জীবনযাপনে ফিরে যান নি। ঐ ধানমন্ডির বাড়িতে থেকেছেন। বলেছেন, “না, আমার ছেলেমেয়ে বেশি বিলাসিতায় থাকলে ওদের নজর খারাপ হয়ে যাবে, অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে।”
উনার জীবনে যেভাবে চলার ঠিক সেভাবেই উনি চলেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর যেসব মেয়েরা নির্যাতিত ছিলÑ নির্যাতিত মেয়েদের সাহায্য করা, তাদেরকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া, সব করতেন। বোর্ডের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের যখন ব্যবস্থা হয়, ঐ মেয়েদের যখন বিয়ে দিত, মা নিজেও তখন উপস্থিত থেকেছেন। নিজের হাতে নিজের গহনা দিয়েছেনÑ আমার গহনাও অনেক দিয়ে দিয়েছিলাম। বলতাম, “তুমি যাকে যা দরকার তা দিবা।”
তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন। আমাকে একদিন বললেন, মাত্র ১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে তাকে যেভাবে অত্যাচার করেছে, তা দেখে তার খুব মন খারাপ হয়েছে। এভাবে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো, মানুষকে কখনও না না-বলাÑ যে এসে যা চেয়েছে হাত খুলে তা দিয়ে দিয়েছেনÑ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। দেশের কথাই সব সময় চিন্তা করেছেন।
আমি অনেক স্মৃতির কথা বললাম এ কারণে যে, আমি মারা গেলে অনেকেই হয়তো অনেক কিছু জানবে না। কাজেই এই জিনিসগুলো জানাও মানুষের দরকার। একজন যখন একটা কাজ করে তার পেছনে যে প্রেরণা-শক্তি-সাহস লাগে, মা সব সময় সে প্রেরণা দিয়েছেন। কখনও পিছে টেনে ধরেন নি যে, আমার কী হবে কী পাব। নিজের জীবনে তিনি কিছুই চান নি, আমি বলতে পারব না যে, কোনোদিন তিনি কিছু চেয়েছেন। কিন্তু দেশটা স্বাধীন করা, দেশের মানুষের কল্যাণ কীভাবে হবে সে চিন্তাই তিনি সব সময় করেছেন। স্বাধীনতার পর অনেক সময় আব্বার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তখন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, কী ভয়াবহ পরিস্থিতিÑ তখন সেই অবস্থায়ও তিনি খোঁজখবর রাখতেন। তথ্যগুলো আব্বাকে জানাতেন।
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন। যখন ঘাতকরা আমার বাবাকে হত্যা করল, তিনি তো বাঁচার আকুতি করেন নি। তিনি বলেছেন, “ওনাকে যখন মেরে ফেলেছ আমাকেও মেরে ফেল।”
এভাবে নিজের জীবনটা উনি দিয়ে গেছেন। সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন!
আমরা দুই বোন থেকে গেলাম, বিদেশে চলে গিয়েছিলাম মাত্র ১৫ দিন আগে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এভাবে বেঁচে থাকা যে কী কষ্টের! যারা আপনজন হারায় শুধু তারাই বুঝে।
আমি সকলের কাছে দোয়া চাই। আমার মায়ের যে অবদান রয়েছে দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং দেশকে যে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, এ দেশের মানুষ ও আব্বার সঙ্গে একই স্বপ্নই দেখতেন যে, এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাবে, ভালোভাবে বাঁচবে, গরিব থাকবে নাÑ আব্বা যে এটা করতে পারবেন এ বিশ্বাসটা সব সময় তাঁর মাঝে ছিল। কিন্তু ঘাতকের দল তো তা হতে দিল না।
কাজেই সে অসমাপ্ত কাজটুকু আমাকে করতে হবে আমি সেটাই বিশ্বাস করি। এর বাইরে আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তবে আমার মায়ের সারাজীবন দুঃখের জীবন। আর সেই সঙ্গে মহান আত্মত্যাগ তিনি করে গেছেন। আমি তাঁর জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই। ১৫ আগস্ট যাঁরা শাহাদাতবরণ করেছেন, সকলের জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তাঁকে বেহেস্ত নসিব করেন।
সবাইকে ধন্যবাদ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

[৮ আগস্ট, ২০১৬ ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তাঁর মাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ]

Category:

বেদনাবিধুর ১৫ আগস্ট : জাতীয় শোক দিবস

Posted on by 0 comment

8-1-2017 8-24-52 PMবাঙালি জীবনের শোক ও বেদনার মাস আগস্ট। ১৫ আগস্ট রক্তের আখরে লেখা একটি নিদারুণ মর্মন্তুদ দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক। বাঙালি জাতির পিতা। আধুনিক সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সারথি। তাই ১৫ আগস্ট বাঙালি জীবনের সবচেয়ে মর্মবেদনার দিনÑ বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবস।
বিশ্বাসঘাতকরা সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, একসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করতে মেতে উঠেছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞে। নিষ্ঠুরভাবে একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র 8-1-2017 8-25-27 PMশেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, ভগ্নিপতি পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, আবদুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে।
জার্মানিতে অবস্থান করায় সৌভাগ্যবশত প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সে সময় স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার সাথে দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনা। শেখ রেহানাও ছিলেন বড় বোনের সাথে।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বেরিয়ে আসে ওই ভয়াল রাতে বর্বরোচিত ঘটনার ভয়াবহ চিত্র। শিশুপুত্র রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ঘুমাচ্ছিলেন দোতলায় তার বেডরুমে। শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামাল তিনতলায়, শেখ জামাল, তার স্ত্রী রোজি জামাল এবং বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের ঘুমিয়েছিলেন দোতলায়। বাড়ির নিচতলায় নিরাপত্তারক্ষী, কাজের ছেলেসহ সবাই ডিউটিতে ছিলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী খুনিরা ৩টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ভোর ৫টার মধ্যেই তিন টার্গেট ঘেরাও করে ফেলে। আত্মস্বীকৃত খুনি মেজর ফারুক যখন রক্ষীবাহিনীকে ঠেকাতে ব্যস্ত, ততক্ষণে সব টার্গেটে বিভিন্ন গ্রুপের ঝটিকা অপারেশন শুরু হয়ে যায়। ১২টি ট্রাক ও কয়েকটি জিপে করে আক্রমণকারী ল্যান্সার ও আর্টিলারির প্রায় ৫০০ জন রাইফেলস ট্রুপস আশপাশে ছেয়ে যায়। খুনিদের প্রধান টার্গেটই ছিল ৩২ নম্বর রোডের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। খুনি মেজর মহিউদ্দিন, মেজর হুদা, মেজর পাশা, মেজর নূরের নেতৃত্বে আউটার ও ইনার দুটি বৃত্তে ঘেরাও করে ফেলে ওই বাড়িটি। আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে রাষ্ট্রপতির বাসভবনে আক্রমণ শুরু হয়ে যায়। প্রথমে গেটে ঢুকতে গিয়েই গোলাগুলির সূত্রপাত হয়। তারপর তা প্রবল আকার ধারণ করে। প্রহরারত পুলিশ গার্ডরা 8-1-2017 8-25-36 PMঅবিরাম গুলি চালিয়ে সেনাদের আক্রমণে বাধা দিতে থাকে। এ সময় বঙ্গবন্ধু নিচের বারান্দায় বেরিয়ে আসেন এবং পুলিশদের ফায়ার বন্ধ করতে বলেন। এতে আক্রমণকারী সৈন্যরা বিনা বাধায় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশের সহজ সুযোগ পেয়ে যায়।  ওই সময় সামরিক বাহিনীতে ঊর্ধ্বতন পদে থাকা লে. কর্নেল (অব.) এমএ হামিদ পিএসসির লেখা ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু যখন গোলাগুলির মধ্যে আক্রান্ত ছিলেন, তখন তিনি বাসা থেকে বিভিন্ন দিকে ফোন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কেউ ফোন ধরছিল না। তিনি তার মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল জামিল উদ্দিনকে ফোনে পেয়েছিলেন। তাকে বলেন, ‘জামিল তুমি তাড়াতাড়ি আসো। আর্মির লোক আমার বাসায় আক্রমণ করেছে। শফিউল্লাকে ফোর্স পাঠাতে বলো।’ জামিল ফোন পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে তার প্রাইভেট লাল কার হাঁকিয়ে ছুটে যান ৩২ নম্বরে, কিন্তু সৈন্যদের গুলিতে বাসার কাছেই নিহত হন তিনি। অনেক চেষ্টার পর সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাকে পেয়ে যান বঙ্গবন্ধু। তাকে বলেন, ‘শফিউল্লাহ, আমার বাসা তোমার ফোর্স অ্যাটাক করেছে। কামালকে হয়তো মেরেই ফেলেছে। তুমি তাড়াতাড়ি ফোর্স পাঠাও।’ জবাবে শফিউল্লাহ বলেন, ‘স্যার, ক্যান ইউ গেট আউট, আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং।’ এরপর ফোনে আর তার সাড়া পাওয়া যায়নি। শফিউল্লাহ ফোনে গুলাগুলির শব্দ শুনতে পান। তখন ভোর আনুমানিক ৫টা ৫০ মিনিট। কিন্তু শফিউল্লাহ রাষ্ট্রপতির সাহায্যার্থে একটি সৈন্যও মুভ করাতে পারলেন না। ইতিহাসের নির্মম হত্যাকা- সংঘটিত হওয়ার পর রেডিওতে ভেসে আসল খুনি মেজর ডালিমের পৈশাচিক ঘোষণাÑ ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’। এমন ঘোষণা শুনে হতভম্ব বাংলাদেশ, শোকে মুহ্যমান বাঙালি জাতি। ওই ভয়াল মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী  হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে আবদুর রহমান শেখ ওরফে রমা এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনাকারী আদালতে। আবদুর রহমান রমার বর্ণনায়, ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বেগম মুজিব দরজা খুলে বাইরে আসেন এবং বলেন, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। তিনতলায় শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামাল ঘুমিয়েছিলেন। শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজি এবং বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের ঘুমিয়েছিলেন দোতলায়। বঙ্গবন্ধু, বেগম মুজিব এবং শেখ রাসেল দোতলায় একই রুমে ঘুমিয়েছিলেন। বাড়ির নিচতলায় পিএ মুহিতুল ইসলামসহ অন্যরা ডিউটিতে ছিলেন। বেগম মুজিবের কথা শুনে তাড়াতাড়ি লেকের পাড়ে গিয়ে দেখি কিছু আর্মি গুলি করতে করতে আমাদের বাড়ির দিকে আসছে। আবার বাসায় ঢুকে দেখি রিসেপশন রুমে পিএ মুহিতুলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন। পেছনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় গিয়ে দেখি বেগম মুজিব ছোটাছুটি করছেন। তিনতলায় গিয়ে কামাল ভাইকে উঠাই। তাকে বলিÑ আমাদের বাসায় আর্মিরা আক্রমণ করেছে। কামাল ভাই তাড়াতাড়ি শার্ট-প্যান্ট পরে নিচে নেমে যান। সুলতানাকে নিয়ে আমি দোতলায় আসি। একইভাবে জামাল ভাইকে উঠাই। তিনিও তাড়াতাড়ি শার্ট-প্যান্ট পরে তার মা’র রুমে যান। সঙ্গে তার স্ত্রীও যান। এ সময় বাইরে প্রচ- গোলাগুলির শব্দ হচ্ছিল। একপর্যায়ে কামাল ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনতে পাই। একই সময় বঙ্গবন্ধু দোতলায় এসে রুমে প্রবেশ করেন এবং দরজা বন্ধ করে দেন। গোলাগুলি এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে আবার বাইরে এলে আর্মিরা তার বেডরুমের সামনে তাকে ঘিরে ফেলে। আর্মিদের লক্ষ্য করে অমিততেজি বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’ খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যায়। সিঁড়ির দুই তিন ধাপ নামার পরে নিচের দিক থেকে ক’জন আর্মি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। গুলি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন। আমি তখন আর্মিদের পেছনে ছিলাম। খুনিরা আমাকে জিজ্ঞাস করেÑ তুমি কি কর? উত্তরে আমি বলি, বাসায় কাজ করি। তারা আমাকে ভেতরে যেতে বলে। আমি বেগম মুজিবের রুমের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানে বেগম মুজিবকে বলি, বঙ্গবন্ধুকে আর্মিরা গুলি করেছে। বাথরুমে শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজি, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব ও বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের এবং আমি আশ্রয় নিই। শেখ নাসের ওই বাথরুমে আসার আগে তার হাতে গুলি লাগে। তার হাত থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল। বেগম মুজিব শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তার রক্ত মুছতে থাকেন। এরপর আর্মিরা দোতলায় আসে এবং দরজা পিটাতে থাকলে বেগম মুজিব দরজা খুলে দেন। আর্মিরা রুমের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং শেখ নাসের, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব এবং আমাকে নিচের দিকে নিয়ে যায়। সিঁড়িতে বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে বলেন, আমি যাব না। আমাকে এখানেই মেরে ফেল। আর্মিরা তাকে দোতলায় তার রুমের দিকে নিয়ে যায়। একটু পরেই ওই রুমে গুলির শব্দসহ মেয়েদের আর্তচিৎকার শুনতে পাই। আর্মিরা শেখ নাসের, রাসেল ও আমাকে নিচতলায় এনে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে সাদা পোশাকে এক পুলিশের লাশ দেখতে পাই। নিচে শেখ নাসেরকে লক্ষ্য করে আর্মিরা জিজ্ঞেস করে, তুমি কে? পরিচয় দিয়ে তাকে নিচতলায় বাথরুমে নিয়ে যায়। একটু পরে গুলির শব্দ ‘ও মাগো’ বলে চিৎকার শুনতে পাই। বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেল মা’র কাছে যাবে বলে তখন কান্নাকাটি করছিল এবং পিএ মুহিতুল ইসলামকে ধরে বলছিল, ‘ভাই আমাকে মারবে না তো?’ এ সময় এক আর্মি শেখ রাসেলকে বলে, ‘চল তোমার মা’র কাছে নিয়ে যাই।’ তাকেও দোতলায় নিয়ে যায়। একটু পরেই আর্তচিৎকার ও গুলির শব্দ শুনতে পাই। লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় সেলিমের হাত ও পেটে দুটি গুলির জখম দেখলাম। দেখলাম কালো পোশাক পরিহিত আর্মিরা আমাদের বাসার সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। ডিএসপি নুরুল ইসলাম ও পিএ মুহিতুল ইসলামকে আহত অবস্থায় দেখি। এরপর আমাদের বাসার সামনে একটি ট্যাঙ্ক আসে। ট্যাঙ্ক থেকে কয়েকজন আর্মি নেমে বাড়ির ভেতরের আর্মিদের লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করে, ভেতরে কে আছে? উত্তরে ভেতরের আর্মিরা বলে, ‘অল আর ফিনিশড’।
‘ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে’ : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের চার নম্বর সাক্ষী ১৫ আগস্ট ৩২ নম্বর বাড়িতে কর্তব্যরত হাবিলদার (অব.) কুদ্দুস সিকদার ১৯৯৭ সালের ২৮ জুলাই     আনিস আহামেদ: আদালতে তার জবানবন্দিতে বলেন, ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট রোজ শুক্রবার আনুমানিক ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আমরা পৌঁছাইয়া আমি ও আমার সঙ্গীয় গার্ডরা বিউগলের সুরে সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করিতে থাকি। এ সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দক্ষিণে লেকের দিক হইতে লাগাতার গুলি আসিতে থাকে। তখন আমি এবং আমার গার্ডসহ দেওয়ালের আড়ালে লাইন পজিশনে যাই। গুলি বন্ধ হওয়ার পর পাল্টা গুলি করার জন্য আমার পূর্ববর্তী গার্ড কমান্ডারের নিকট গুলি খোঁজাখুঁজি করিতে থাকি। এ সময় কালো ও খাকি পোশাকধারী সৈনিক হ্যান্ডস আপ বলিতে বলিতে গেটের মধ্য দিয়ে বাড়িতে ঢোকে। তখন ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা, মেজর নূর ও মেজর মহিউদ্দিনকে (ল্যান্সারের) গেইটে দেখি। তারপর ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বারান্দায় আসিয়া সেখানে কামালকে দাঁড়ানো দেখিয়াই ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা হাতের স্টেনগান দ্বারা শেখ কামালকে গুলি করে। শেখ কামাল গুলি খাইয়া রিসিপশন রুমে পড়িয়া যায়। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা পুনরায় শেখ কামালকে গুলি করিয়া হত্যা করে। ইহার পর ক্যাপ্টেন বজলুর হুদা ও মেজর নূর বাড়ির পুলিশের ও কাজের লোকদের গেটের সামনে লাইনে দাঁড় করায়। ইহার পর 8-1-2017 8-25-48 PMমেজর মহিউদ্দিন তাহার ল্যান্সারের ফোর্স লইয়া গুলি করিতে করিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দোতলার দিকে যায়। তারপর ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর কয়েকজন ফোর্স লইয়া বাড়ির বারেন্দা দিয়া দোতলার দিকে যায়। এ সময় আমাদেরও তাহাদের সাথে যাইতে হুকুম দিলে আমি তাহাদের পিছনে পিছনে যাই। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর সিঁড়ি দিয়া চৌকির (ংষধঢ়) ওপরে গেলে মেজর মুহিউদ্দিন ও তাহার সঙ্গীয় ফোর্স বঙ্গবন্ধুকে নিচের দিকে নামাইয়া আনিতে দেখি। আমি ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূরের পিছনে দাঁড়ানো ছিলাম। এ সময় মেজর নূর ইংরেজিতে কি যেন বলিলেন। তখন মুহিউদ্দিন ও তাহার ফোর্স এক পাশে চলিয়া যায়। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘তোরা কি চাস’। এরপরই ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর হাতের স্টেনগান দ্বারা বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির মধ্যে পড়িয়া মৃত্যুবরণ করেন। তখন বঙ্গবন্ধুর পরণে একটা লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, এক হাতে সিগারেটের পাইপ, অন্য হাতে দিয়াশলাই ছিল।

১৫ আগস্ট নিহতদের সুরতহাল ও দাফন-কাফন
আর্টিলারি স্টেশন স্টাফ অফিসার মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ বর্ণনা করেছেন, ১৯৭৫-এর ১৬ আগস্ট রাত ৩টায় ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডারের আদেশে আমি প্রয়াত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি যাই। স্টেশন কমান্ডার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। মেজর বজলুল হুদা ও তার লোকজন পাহারা দিচ্ছিলেন বাড়িটি। হুদা আমাকে প্রথমে বাধা দিলেও পরে ঢোকার অনুমতি দেন।
সড়ক নম্বর ৩২, শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি : সবগুলো লাশ সিঁড়ির গোড়ায় আনা ছিল। রাখা হলো কাঠের কফিনে। বরফ আনা হয়েছিল। রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রথম তলার দেয়াল, জানালার কাচ, মেঝে ও ছাদে। বাড়ির সব বাসিন্দাকেই খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে যায়। খোসাগুলো মেঝেতে পড়া ছিল। কয়েকটি জানালার কাচ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র, গিফট বক্স ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিয়েগুলোর উপহারের প্যাকেট। পবিত্র কোরআন শরিফও মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলাম।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে যে সমতল জায়গাটা তার তিন-চার ধাপ ওপরে একেবারে কাছ থেকে গুলি করে শেখ মুজিবকে খুন করা হয়। তার তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। শেখ মুজিব সব সময় চশমা পরতেন এবং তার ধূমপানের অভ্যাস ছিল। তার চশমা ও তামাকের পাইপটি সিঁড়িতে পড়া ছিল। পরনে চেক লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি। চশমার একটি গ্লাস ভাঙা। রক্তে পাঞ্জাবির রং ছিল গাঢ় লাল। একটি বুলেট তার ডান হাতের তর্জনীতে গিয়ে লাগে এবং আঙ্গুলটি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শেখ কামাল : কামালের বুক ও তলপেটে ৩ থেকে ৪টি বুলেট বিদ্ধ হয়। তার পরনে ছিল ট্রাউজার। নিচতলায় তাকে খুন করা হয়।
টেলিফোন অপারেটর : তাকে নিচতলায় খুন করা হয়।
শেখ নাসের : শেখ নাসেরকে খুন করা হয় বাথরুমের কাছে। তার হাত উড়ে গিয়েছিল। গুলিতে তার দেহের বেশ কিছু স্থান ছিল ক্ষত-বিক্ষত। তার গায়ে কোনো পোশাক ছিল না। এবং লাশ বিছানার চাদরে মোড়ানো ছিল।
বেগম মুজিব : বেগম মুজিবকে বুকে ও মুখম-লে গুলি করা হয়। তার পরনে ছিল সুতি শাড়ি এবং কালো রঙের ব্লাউজ। গলায় মাদুলি বাঁধা একটি সোনার নেকলেস। কনিষ্ঠা আঙ্গুলে ছোট্ট একটি আংটি। তখনও তার পায়ে ছিল একটি বাথরুম স্লিপার।
সুলতানা কামাল : সুলতানা কামালের বুক ও তলপেটে গুলি লাগে। পরনে ছিল শাড়ি ও ব্লাউজ।
শেখ জামাল : শেখ জামালের মাথা চিবুকের নিচ থেকে উড়ে গিয়েছিল। পরনে ট্রাউজার। ডান হাতের মধ্যমায় ছিল একটি মুক্তার আংটি। সম্ভবত এটি ছিল তার বিয়ের আংটি।
রোজি জামাল : তার মুখটি দেখাচ্ছিল বিবর্ণ, মলিন। মাথার একাংশ উড়ে গিয়েছিল। তার তলপেট, বুক ও মাথায় গুলি করা হয়। পরনে ছিল শাড়ি ও ব্লাউজ।
শিশু রাসেল : সম্ভবত আগুনে তার পা ঝলসে যায়। মাথা উড়ে গিয়েছিল। পরনে ছিল হাফপ্যান্ট। লাশ একটি লুঙ্গিতে মোড়ানো ছিল। মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো ছিল সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জামাল ও কামালের বিয়ের অনেক উপহার সামগ্রী এবং গিফট প্যাকেট। কিছু বাক্স ছিল ফাঁকা। কামালের কক্ষে রুপার তৈরি অনেক জিনিসপত্র দেখা যায়। সিঁড়িতে ছিল আল্পনা আঁকা। অভ্যর্থনা কক্ষটি ছিল নোংরা। আমি ওপরতলা থেকে শুনলাম নিচতলায় হুদা চিৎকার করছেন। তিনি এ বাড়ি থেকে কিছু জিনিসপত্র চুরি করায় কয়েকজন সিপাহিকে গালাগাল দিচ্ছিলেন।
সড়ক নম্বর ১৩/১, ধানমন্ডি, শেখ মণির বাড়ি : মণি ও তার সন্তানসম্ভাবা স্ত্রীকে তাদের এই বাড়িতে খুন করা হয়। তাদের বাড়ির দিকে ‘সেনাবাহিনীর গাড়ি’ আসতে দেখে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব ছেড়ে সরে যান। বাড়িটি ছিল আংশিক তছনছ করা। মেঝেতে স্পষ্ট রক্তের দাগ। মাঝের টেবিলে একটি অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে কিছু ভিজানো চিঁড়া।
৩৭ মিন্টো রোড, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়ি : মন্ত্রীর বাড়িটি ছিল ফাঁকা। ড্রয়িং রুমজুড়ে দেখা গেল জমাট বাঁধা রক্ত। বাড়ির নিরাপত্তা পুলিশ আগেই পালিয়ে গিয়েছিল! সেরনিয়াবাত ও শেখ মণি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে সংগ্রহ করা হয়। লাশগুলো ছিল বিকৃত। তাপ ও আর্দ্রতা লাশের ক্ষতি করে। লাশ থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল। বনানী কবরস্থানে দাফনের জন্য আমরা লাশগুলো সেনানিবাসে নিয়ে এলাম। শেখ মুজিবের লাশ ছাড়া ৩২ নম্বর সড়কের অন্য সবার লাশও আরেকটি ট্রাকে করে সেখানে আনা হয়।
দাফন : আগস্ট মাসের তাপ ও আর্দ্রতায় কিছু লাশ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে কোনো ফ্যান ছিল না। ৩২ নম্বরের লাশগুলোতে বরফ দেওয়া ছিল। ফলে সেগুলোর অবস্থা ছিল অপেক্ষাকৃত ভালো। সিপাহিদের কয়েকজন ছিল, খুবই গলা চড়িয়ে কথা বলছিল। শেখ মুজিববিরোধী মনোভাব প্রকাশ করছিল তারা। ফলে আমাকে গোটা পরিস্থিতিই সতর্কতার সঙ্গে সামাল দিতে হয়। অবশ্য কোনো লাশেরই যাতে অমর্যাদা না হয় আমি সেটি নিশ্চিত করেছিলাম। সিপাহিদের কয়েকজন কবর খুঁড়তে অনীহা প্রকাশ করে, লাশের খারাপ অবস্থার কারণে কয়েকজন এমনকি ছুঁতে পর্যন্ত রাজি ছিল না। আমি নিজে প্রথম মৃতদেহটি (বেগম মুজিবের) ওঠাই এবং চিরশয্যায় শায়িত করি। শেখ নাসেরের দেহাবশেষ একইভাবে দাফন করি। এরপর আর আমার সমস্যা হয়নি। চার নম্বর ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলো কবর ঠিকভাবে খোঁড়া হয়। কারণ আমরা সূর্যোদয়ের আগেই সব সেরে ফেলার জন্য তাড়াহুড়ো করছিলাম। গোরস্তানমুখী সড়কগুলোয় আমরা আগেই সিপাহি মোতায়েন এবং গোরস্তান এলাকায় ‘কারফিউ’ জারি করি। ভোরে ঘুম ভাঙা লোক ও পথচারী কী ঘটছে বোঝার চেষ্টা করলে তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়।
সাত নম্বর সারির চারপাশে বেড়া দেওয়া হয় এবং অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে ২৪ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য গোরস্তানটিতে দাফন কাজ বন্ধ ও দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
মৃতদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র : কয়েকটি লাশের সঙ্গে কিছু গহনা পাওয়া যায়। একটি তালিকা তৈরি করে গহনাগুলো স্টেশন কমান্ডারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দাফন : ১৬ আগস্ট ১৯৭৫, বেলা ১১টায় শেখ মুজিবের লাশ সেনাবাহিনীর একটি ট্রাকে করে ক্যান্টনমেন্টে আনা হয়। কাফন কেনা হয় সিএসডি (ক্যান্টিন স্টোরস ডিপার্টমেন্ট) থেকে। এটি কেনা হয়েছিল বাকিতে! অর্ডন্যান্সের জিডিও (গ্যারিসন ডিউটি অফিসার) মেজর মহিউদ্দিন আহমেদকে লাশের সঙ্গে টুঙ্গিপাড়া যাওয়ার খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একটি বিএএফ (বাংলাদেশ এয়ারফোর্স) হেলিকপ্টারযোগে লাশ দাফনের জন্য টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মৃতদেহের গোসল ও জানাজা দেওয়া হয়। জানাজায় শেখ মুজিবের চাচাসহ ডজনখানেক লোক শরিক হন! একটি অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে কবরটি পাহারার জন্য রক্ষী মোতায়েন করা হয়। জিডিও টুঙ্গিপাড়া থেকে ফিরে সদর দফতরের মিলিটারি অপারেশনসের ডিরেক্টরের কাছে তার রিপোর্ট পেশ করেন।
বনানী গোরস্তান : ৭ নম্বর সারিতে যাদের কবর দেওয়া হয়Ñ ১. বেগম মুজিব, ২. শেখ নাসের, ৩. শেখ কামাল, ৪. সুলতানা কামাল, ৫. শেখ জামাল, ৬. রোজি জামাল, ৭. শিশু রাসেল, ৮. অজ্ঞাত পরিচয় ১০ বছর বয়সী একটি বালক, ৯. ফাঁকা (৯ নম্বর কবরের নাঈম খানের লাশ লে. আবদুস সবুর খানের (এনওকে) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল), ১০. অজ্ঞাত পরিচয় ১২ বছর বয়সী একটি বালক, ১১. গৃহপরিচালিকা, বয়স ৪৫, ১২. অজ্ঞাত পরিচয় ১০ বছর বয়সী একটি ফুটফুটে বালিকা, ১৩. শেখ মণি, ১৪. মিসেস মণি, ১৫. অজ্ঞাত পরিচয় ২৫ বছর বয়সী এক যুবক, ১৬. অজ্ঞাত পরিচয় ১২ বছর বয়সী একটি বালক, ১৭. আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ১৮. অজ্ঞাত পরিচয় ২৫ বছর বয়সী এক যুবক।

Category:

বঙ্গবন্ধু : স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক

Posted on by 0 comment

8-1-2017 8-22-19 PMজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসে তার নিজের স্থানটি নিজেই নির্ধারণ করেছেন। কথাটা দুভাবেই সত্য। Sheikh Mujib is the Product of the History and he has Oreated the History.. বাংলাভাষী পূর্ব বাংলার মানুষ ভোট দিয়ে পাকিস্তান এনেছিল। পাকিস্তানের প্রতি তাদের মোহ ছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই সেই মোহ ভাঙতে শুরু করে। তরুণ শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথম জীবনে মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান।
কিন্তু এই মানুষটিই হয়ে উঠলেন ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নির্মাণের প্রাণপুরুষ। আঞ্চলিক বৈষম্য, মাতৃভাষার ওপর আঘাত, ফ্যাসিবাদী শাসন, গণতন্ত্রহীনতা সর্বোপরি বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শ্বেতাঙ্গদের মতো বর্ণবাদী ঘৃণা ও জাতিগত নিপীড়ন পূর্ব বাংলার মানুষের পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ৬-দফা ও স্বাধিকারের চেতনা বাঙালিদের মনে একটি নতুন জাতিচেতনার জন্ম দেয়। পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গ হলেও তারা কিন্তু অতীতে ফিরে যেতে, অর্থাৎ অখ- বাংলা বা ভারতে ফিরে যেতে চায় নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতীয় বাঙালিরা এথনিক দিক থেকে বাঙালিত্বের গৌরব বহন করলেও, তাদের রাষ্ট্রচেতনায় আছে ‘ভারতীয়তা’। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার বাঙালিদের মনে প্রোথিত করেন একইসঙ্গে জাতিত্ব ও জাতিরাষ্ট্রের চেতনা।
৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে যে বাংলাভাষী মানুষ তারা একটা জাতি হতে চেয়েছিল। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা জাতি হতে চায়, অন্য কিছু নয়।… যা আমাদের একত্রে ধরে, পরিণত করেছে এক জাতিতে, তা হচ্ছে আমাদের শুধু এই জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়ার ঐকান্তিক কামনা।” বাঙালির এই ঐকান্তিক কামনা বা ইচ্ছেকে দেশপ্রেমের জারক রসে ভিজিয়ে ‘আত্মপরিচয়’ প্রতিষ্ঠার গৌরবে উজ্জীবিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রফেসর রাজ্জাক আরও বলেছেন, “পৃথিবীর সেই ছোট্ট অংশটির প্রেমে তিনি বিহ্বল ছিলেনÑ যার নাম হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ধরনের ভালোবাসা বিপজ্জনক হতে পারে। বঙ্গবন্ধুই তার প্রমাণ। এ ধরনের আবিষ্ট বিহ্বল ভালোবাসা একজনকে অন্ধ করে তোলে, বিশেষ করে সেই ভালোবাসার প্রতিদান পাওয়ার সময়।” বস্তুত ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি জাতির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বে বরিত হওয়ার পর ১৯৭১-এর মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর, গোটা মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুই হয়ে ওঠেন সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যবদ্ধ আশা-আকাক্সক্ষা, লড়াই-সংগ্রাম, আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রতীক। তার শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, জাতীয় ঐক্যের একমাত্র চৌম্বুকক্ষেত্র, ভাবাদর্শগত শিক্ষক এবং নতুন জাতিসত্তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহানায়ক।
বিশ্ব ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো ‘প্রতীক’ হয়ে ওঠা আরও অনেক নেতা ছিলেন। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় আন্দোলনের নেতা আহমেদ শোয়েকার্নো (সে দেশের মানুষ তাকে বাংকার্নো বা ভাই কার্নো হিসেবেও অভিহিত করত), কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা জোমো কেনিয়াত্তা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কঙ্গোর প্যাট্রিস লমুম্বা প্রমুখÑ প্রায় সবাই নিজ নিজ দেশবাসীর কাছে বিপুল জনপ্রিয় এবং জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদের কথা বাদই দিয়ে জিন্নাহ ও গান্ধী প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্য উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, “উভয়েরই (জিন্নাহ ও গান্ধী) কোটি কোটি ভক্ত। এসব জনতার কেউই গান্ধী বা জিন্নাহকে তাদের নিজেদের বলে ভাবতে পারত না। এটাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিন্নাহ বা গান্ধীর পার্থক্য। বঙ্গবন্ধু জাতি আর তার মধ্যে একটা অবিভাজ্য মেলবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন।”
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আমি তোমাদেরই লোক’ হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর মধ্যেই অভিব্যক্ত হয়েছে বাঙালির ‘জাতি হওয়ার আকাক্সক্ষা’, অসাম্প্রদায়িক মানবিকবোধ, ঐতিহ্য-চেতনা, স্বদেশানুরাগ এবং বাঙালি জাতির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই অন্ধ ভালোবাসা ও বিশ্বাস যেমন তাকে মরণজয়ী সংগ্রামে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করেছে, আবার এই অন্ধ ভালোবাসা ও বিশ্বাসই তাকে তার নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্লিপ্ত করেছে। এটা একটা আত্মঘাতী প্রবণতা। নিরাপত্তাহীন নিরস্ত্র বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যার সুযোগ করে দিয়েছে তার এই আত্মঘাতী অন্ধ দেশপ্রেম ও বাঙালির প্রতি প্রশ্নাতীত ভালোবাসা।
বাঙালির জাতি হয়ে ওঠার সাগ্নিক জনগণের ভেতর থেকে উত্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বেহিসাবী ভালোবাসা, অতুলনীয় আত্মত্যাগ, সাহস, প্রজ্ঞা এবং বাঙালির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের কারণে বরিত হয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। শোকাবহ আগস্টে এই অন্ধ প্রেমিক বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমগ্র জাতির সাথে আমাদেরও নমিত শ্রদ্ধা। জয় বঙ্গবন্ধু।

Category: