Blog Archives

দিনপঞ্জি : নভেম্বর ২০১৬

57উত্তরণ ডেস্ক

১ নভেম্বর
* সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থেকে যুবসমাজকে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা চাই না আমাদের যুবসমাজ বিপথে যাক; অভিভাবকদের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াক। তাদের অবশ্যই মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকতে হবে। এগুলো সুস্থ ধারা নয়, সব সময়ই যুবসমাজের সুন্দরভাবে বিকাশের অন্তরায়। প্রধানমন্ত্রী ১ নভেম্বর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন।
* ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে অন্য কোনো ধর্মের ওপর আঘাতকে বরদাশত করবে না আওয়ামী লীগ। সকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি আরও বলেন, গত ২৯ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা শাস্তি পাবে। আর ক্ষতিগ্রস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশে আছে আওয়ামী লীগ। মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র হিসেবে ফেসবুকের কোনো স্ট্যাটাস বা গুজবের ওপর ভিত্তি করে অন্য কোনো ধর্মের ওপর কোনো আঘাতকে কখনও মেনে নেওয়া হবে না। নাসিরনগরে যার ফেসবুক থেকে স্ট্যাটাসটি পাঠানো হয়েছিল তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
* হবিগঞ্জের লাখাই থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. লিয়াকত আলী এবং কিশোরগঞ্জের স্বঘোষিত আলবদর কমান্ডার আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২ নভেম্বর
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভর্তিচ্ছুদের ভোগান্তি কমাতে কেন্দ্রীয় অথবা আঞ্চলিকভাবে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভাইস চ্যান্সেলরদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ২ নভেম্বর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অষ্টম ইউজিসি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ভাষণদানকালে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত করতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিরাট ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রাষ্ট্রপতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে এ বিষয়টি দেখারও আহ্বান জানান।
* স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে আমাদের সকল অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে দেশ যখন ভরে যাচ্ছিল, তখন আমরা তা কঠোর হস্তে দমন করেছি। অসাম্প্রদায়িকতার বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিস্তার হতে দেব না।
৩ নভেম্বর
* প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকা-ের সাথে ‘জিয়াউর রহমান জড়িত’ উল্লেখ করে বলেছেন, খুনি মোশতাক ছিল বেইমান, মীরজাফর। আর সেই খুনি মোশতাকই জিয়াকে সেনাপ্রধান করে। এতেই প্রমাণ হয়, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকা-ের সাথে জিয়া জড়িত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরাও সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছে যে, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের কথা জানত, তাদের সাথে ছিল। আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার না করে যারা মদদ দেয়Ñ তারাও খুনি, সমান অপরাধী। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রতিশোধ আর কোনোমতেই যাতে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধ্বংস করতেই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। ভয়াল-বীভৎস জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে ৩ নভেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণসভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।
* চায়ের দোকানে গোপন বৈঠক করার সময় বাগেরহাটে নব্য জেএমবির চার সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। ২ নভেম্বর রাতে একটি চায়ের দোকানে বসে নাশকতার পরিকল্পনাকালে তাদের আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি, ৪টি হাতবোমা, একটি চাকু, একটি চাপাতি, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, কয়েকটি মোবাইল ফোনসেট ও একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ২ নভেম্বর গভীর রাতে গোপনে বৈঠক করার সময় সেখানে অভিযান চালানো হয়।
* গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার সময় যে গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়েছিল সেগুলো তৈরির কাঁচামাল ও ছোট আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহকারীদের সন্ধান মিলেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ২ নভেম্বর রাতে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে চারজনকে গ্রেফতার করে। তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সিটিটিসি সংশ্লিষ্টদের দাবি, এরাই গুলশান হত্যাযজ্ঞে ব্যবহৃত অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল।
৪ নভেম্বর
* গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৫০ শতাংশ কমেছে। আহতের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ কম হয়েছে। আর সড়ক দুর্ঘটনার হার কমেছে ৩৬ শতাংশ। গত ৪ নভেম্বর বেসরকারি সংগঠন নৌ সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
* সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি জোরালোভাবে অনুসরণ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ভূখ- জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে ঢাকা যে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছে ভারত তার প্রশংসা করে। নয়াদিল্লিতে সফররত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী এমপির সাথে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
৫ নভেম্বর
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমবায়ের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সরকারের সুষ্ঠু নীতির কারণে দেশে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমে এসেছে। ক্ষুদ্র ঋণের বোঝায় যাতে কাউকে নিঃস্ব হতে না হয়, সে জন্য সরকার ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করেছে। এ প্রসঙ্গে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার প্রকল্প’ এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের স্বনির্ভরতা গড়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের নীতি দেশকে উন্নত করা, সমবায়কে বহুমুখী হিসেবে গড়ে তোলা। ৫ নভেম্বর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ৪৫তম জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন এবং জাতীয় সমবায় পুরস্কার-২০১৪ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
* জেলখানায় বসে পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের হাতে লেখা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কয়েকটি চিঠি পড়তে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারই দুই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাবার বন্দী জীবনে থাকার কক্ষ ও ব্যবহৃত তৈজসপত্র দেখার সময় তাদের চেহারায় বিষাদের ছাপ ফুঠে ওঠে। কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, কখনও মাঝারি বৃষ্টির মধ্যেই ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের সময় পুরো স্মৃতি মনে করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার চোখে-মুখে বেদনার নীল রং ছিল স্পষ্ট। বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছোট বোন শেখ রেহানা ও ভাগ্নে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। কারাগারে প্রবেশ করেই প্রধানমন্ত্রী প্রদর্শনীর জন্য রাখা ১৪৫টি দুর্লভ আলোকচিত্র দেখার পর সোজা যান বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। প্রথমেই সেখানে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। এরপর জাতির পিতা বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘসময় যে কক্ষটিতে বন্দী থেকেছেন তা ঘুরে ঘুরে দেখেন। বিশেষ করে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লাগানো কামিনী ও সফেদার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তার দুই কন্যা আবেগে জড়িয়ে পড়েন।
* আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন সফররত ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একটি প্রতিনিধি দল। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কথা বলেন দুদেশের রাজনীতিবিদরা। সাক্ষাতে ভারতের প্রতিনিধি দলে ছিলেনÑ বিজেপির মুখপাত্র ড. বিজয় শংকর শাস্ত্রী, বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য অরুণ হালদার, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক কপিলকৃষ্ণ ম-ল। আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে বিজেপির মুখপাত্র ড. বিজয়শংকর শাস্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক সীমানা আছে ঠিক; কিন্তু কোনো সাংস্কৃতিক সীমানা নেই।
৬ নভেম্বর
* রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিয়ো হোশি হত্যা মামলার আসামিদের প্রশিক্ষকসহ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির চার ক্যাডার গ্রেফতার হয়েছে। এতে সংগঠনটির বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ৫ নভেম্বর রাতে সদর উপজেলার চন্দনপাট ইউনিয়নের শাহাবাজপুর গ্রামের চাপলার দোলা এলাকার এসএমবি নামের পরিত্যক্ত ইটভাটার কাছে একটি গোপন আস্তানা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় একটি দেশীয় পিস্তল, একটি চাপাতি, দুটি চাইনিজ কুড়াল ও ৪টি ককটেলসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র এবং বইপত্র উদ্ধার করা হয়।
৭ নভেম্বর
* বেসরকারি স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মনোনীত হওয়ার বিধান বাতিল করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন আপলি বিভাগও তা বহাল রেখেছেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন গত ৭ নভেম্বর খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে চাইলে সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে।
* বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেফতার করতে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ-৩-এর বিচারক আবু আহমেদ জমাদার গত ৭ নভেম্বর এই পরোয়ানা জারি করেছেন। বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের মামলায় চলতি বছরের ২১ জুলাই তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদ- দেন হাইকোর্ট। একই সাথে তাকে ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। তারেক রহমানকে খালাস দিয়ে নি¤œ আদালতের ঘোষিত রায় বাতিল করে এই রায় দেওয়া হয়। এরপর হাইকোর্টের রায় বিচারিক নি¤œ আদালতে পাঠানোর পর ৭ নভেম্বর সাজা পরোয়ানা পাঠানো হয়। এর মধ্য দিয়ে এই প্রথম তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ইস্যু হলো।
* শর্ত পূরণ না করায় ৪টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আসন্ন ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে না। এক বছরের মধ্যে শর্ত পূরণ করতে না পারলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমই বন্ধ করে দেওয়া হবে। কলেজগুলো হলোÑ রংপুরের নর্দান মেডিকেল কলেজ, গাজীপুরের সিটি মেডিকেল কলেজ, ঢাকার আশুলিয়ার নাইটিঙ্গেল মেডিকেল কলেজ ও আশিয়ান মেডিকেল কলেজ। সচিবালয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তিসংক্রান্ত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এতে সভাপতিত্ব করেন।
* বেকার তরুণ-তরুণীদের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য দেশের আরও ৬৪ উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
৮ নভেম্বর
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করার জন্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আপনাদের কাজ করে যেতে হবে। সবাই মিলে দেশের উন্নয়ন করতে হবে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে বলে আমি প্রত্যাশা করি। গত ৮ নভেম্বর বিকেলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পৈতৃক জমিতে নবনির্মিত পারিবারিক ভবনে কার্যনির্বাহী সংসদের যৌথসভায় সভাপতির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এসব কথা বলেন।
* অবিলম্বে ভাঙতে হবে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতির (বিজিএমইএ) বহুতল অবৈধ ভবন। ভবন ভাঙার যাবতীয় খরচ বিজিএমইএ-কেই বহন করতে বলেছে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। বিজিএমইএ না ভাঙলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউককে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তা বিজিএমইএ’র কাছ থেকে নিতে বলা হয়েছে। বিজিএমইএ’র লিভ টু আপিল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
* সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের মতো ঢাকা মহানগরীর বেসরকারি স্কুলেও ৪০ শতাংশ আসন সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণের বিধান রেখে নীতিমালা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কোন শ্রেণিতে কীভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে এবং কোন ক্ষেত্রে ভর্তি ‘ফি’ কত হবে তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয় নীতিমালায়। নীতিমালার ভিত্তিতে ঢাকা মহানগরী ছাড়াও দেশের সব বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রাথমিক, নি¤œ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
* জামাতের আমীর মকবুল আহমাদের একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য অনুসন্ধান শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সরেজমিন অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় গত ৮ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের উত্তর লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১ শহীদ পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে ট্রাইব্যুনালের সহকারী পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল।
৯ নভেম্বর
* কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় এক বিএনপি নেতার জবরদখল থেকে মুক্ত করা হয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দ্বীপের আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের পূর্ব তাবলরচর রেড ক্রিসেন্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি গত দেড় বছর ধরে দখলে রাখেন ওই নেতা। কুতুবদিয়া দ্বীপের পূর্ব তাবলরচর গ্রামের বাসিন্দা আবু ইউসুফ নামের এই বিএনপি নেতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটিরও সভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ের কয়েকটি কক্ষ দখল করে এটি তার ব্যবসায়িক গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মক ব্যাহত হয়।
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবগঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডিএ) দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। সকালে প্রধানমন্ত্রী তার তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে বিআইডিএ’র গভর্নিং বোর্ডের প্রথম সভায় এই আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের দেশে আরও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় সভাপতিত্ব করেন।
* যে কোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিকেলে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের একটি প্রতিনিধি দল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন মন্দির ও বাড়িঘর পরিদর্শন শেষে স্থানীয় গৌর মন্দির চত্বরে এক শান্তি সমাবেশে নেতৃবৃন্দ এই আহ্বান জানান।
* দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে অসত্য, মনগড়া, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হিসেবে আখ্যায়িত করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন ইস্যুতে খালেদা জিয়ার মিথ্যাচার পুরো জাতিকে বিস্মিত ও হতবাক করেছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, খালেদা জিয়ার এই নির্জলা মিথ্যাচার বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ।
১০ নভেম্বর
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকা-ের জন্য কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতালির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিনেটর বেনদেত্তো দেল্লা ভেদোভা বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সাথে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ ব্যাপারে জানান। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসবের পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী কারা এবং কারা এদের অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতা তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে তার সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ বিষয়ে আমরা জনগণের কাছ থেকে বিপুল সাড়া পেয়েছি।
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে, অটিজমবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি সায়মা ওয়াজেদ পুতুল প্যারিসে ইউনেসকো দফতরে ‘ইউনেসকো-আমির জাবের আল-আহমদ আল-সাবাহ পুরস্কার’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। প্যারিস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানা গেছে। উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইউনেসকো-আমির জাবের আল-আহমদ আল-সাবাহ পুরস্কারটি চালু হয়। কুয়েতের অর্থ সহায়তায় পরিচালিত এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ২০ হাজার মার্কিন ডলার, যা একজন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ড এই পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য জমা পড়া শতাধিক আবেদনপত্রের মধ্য থেকে যোগ্যতম প্রার্থীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পালন করে থাকে।
১২ নভেম্বর
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে দেশের উন্নয়নের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের উন্নয়ন কর্মকা-কে অব্যাহত রাখার জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাটা জরুরি। সংখ্যালঘুদের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে আমরা প্রশ্রয় দেব না। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ নভেম্বর বিকেলে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের সর্বস্তরের জনগণের সাথে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদবিরোধী উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন।
* সিলেটের কথিত ব্যবসায়ী রাগীব আলীর ছেলে দুই মামলার পলাতক আসামি আবদুল হাইকে ১২ নভেম্বর গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দুপুরে ভারতের করিমগঞ্জ থেকে বাংলাদেশে ঢোকার সময় সিলেটের জকিগঞ্জ স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে। এ সময় তার সাথে ছিলেন স্ত্রী সাদিকা জান্নাত চৌধুরী ও ছেলে সাঈদ আজমিন আবদুল্লাহ (৪)। পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আবদুল হাইকে জকিগঞ্জ থানা পুলিশে দেয়। জকিগঞ্জ পুলিশ বিশ্বনাথ থানার দুটি গ্রেফতারি পরোয়ানার এ আসামিকে গ্রেফতার দেখায়। এরপর আবদুল হাইকে বিশ্বনাথ থানা পুলিশে সোপর্দ করা হয়। সন্ধ্যায় পুলিশ তাকে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
* অবশেষে উদ্ধার হওয়া রিজার্ভের ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত এসেছে। ১১ নভেম্বর ফিলিপাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল এই অর্থ গ্রহণ করে। দুটি মুদ্রায় এই টাকা দিয়েছে দেশটি। এর মধ্যে একটি অংশ মার্কিন ডলারে এবং অন্য অংশ ফিলিপাইনি মুদ্রা পেসোতে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১২১ কোটি টাকা।
* স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগ নেতা ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খাঁর বনানীর বাড়িটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। বাড়িটির লিজ বাতিল করে সেখানে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবির প্রসঙ্গ টেনে এমন কথা বলেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। সব যুদ্ধাপরাধীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে ১২ নভেম্বর বনানীতে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে মেয়র আনিসুল হক এমন কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে বনানীর ২৭ নম্বর রোডে এই মানববন্ধন করে।
১৩ নভেম্বর
* বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৩২ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাতিল করা হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার লাইসেন্সও। সম্প্রতি এনবিআর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এনবিআরের প্রতিবেদনে পর্যায়ক্রমে ১৩২টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থের পরিমাণ, ব্যবসায়ের লাইসেন্স নম্বর ও আওতাধীন সার্কেলের নামও তুলে ধরা হয়েছে।
* বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া দেড় কোটি ডলার হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জব্দ করে রেখেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর।
১৪ নভেম্বর
* চীনে তৈরি দুটি সাবমেরিন বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে দেশটির সরকার। এর মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক নৌশক্তি হিসেবে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ নৌবাহিনী। ১৪ নভেম্বর এ উপলক্ষে চীনের দালিয়ান প্রদেশের লিয়াওনান শিপইয়ার্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চীন সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদের কাছে সাবমেরিন দুটি হস্তান্তর করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল লিউ জিঝু। এ সময় চীন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) এই তথ্য জানিয়েছে।
১৬ নভেম্বর
* জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা পূরণের আহ্বান পুনর্বার জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব সুসংহত করার লক্ষ্যে সবাইকে একজোট হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে আরও বলেন, কথা না রাখলে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশ সময় ১৫ নভেম্বর রাত সাড়ে ৪টায় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২২) উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। মরক্কোর সাবেক রাজকীয় শহর মারাকাশে জাতিসংঘ আয়োজিত তিন দিনের উচ্চ পর্যায়ের বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বাংলাদেশসহ ১১৫টি দেশের ৮০ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং সিনিয়র মন্ত্রীরা অংশ নিয়েছেন। দুপুরে প্ল্যানারি অধিবেশনের উদ্বোধনের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হয় সম্মেলনের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র, সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীরা বক্তব্য রাখেন।
* মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা পালন করা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, সাংবাদিক ও কলাকুশলীদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। এই গেজেটের মাধ্যমে ১০৮ শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বেতারকর্মী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ সম্মানী ভাতা ও রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন।
১৭ নভেম্বর
* নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নব্য ধারার পাঁচ সদস্য ধরা পড়েছে। রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও আদাবর এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-২ এসব জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে বোমা তৈরির বিপুল বিস্ফোরক।
* মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্ত জামালপুরের যুদ্ধাপরাধী এসএম ইউসুফ আলী (৮৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
১৮ নভেম্বর
* মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি বলেছেন, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনার পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা। গত ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কালিয়াকৈর পৌর শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কর্মিসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেছেন। মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানের কাছে সেই সময়ে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা পাওনা ছিল। বর্তমান সময়ে এসে তা ১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যুক্তি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর ব্যাংকে রাখা পুরো টাকাটাই তারা আত্মসাৎ করেছে। ১৯৭০ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। সে সময় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিদেশিরা ২০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার একটি টাকাও আমাদের দেয়নি। আজও আমরা সেই টাকার পাওনাদার। এমনকি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক অংশ ওরা আমাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নিয়ে নিয়েছে। আজমেরি করাচি, ইসলামাবাদ, ভাওয়াল পি-িÑ এই ৩টি রাজ্যের অর্ধেক আজও আমাদের পাওনা। পাকিস্তানের যত দূতাবাস ছিল তার অর্ধেকটা আমরা পাওনা এবং পাকিস্তানের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোরও অর্ধেক ভাগ আমাদের। কিন্তু ওরা আমাদের কিছুই দেয় নি। এসব মিলিয়ে আজকে তাদের কাছে আমাদের পাওনা ১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
* আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) ‘রিকগনিশন অব এক্সিলেন্স’ পুরস্কার পেয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প।
* নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে অন্তঃসারশূন্য, চর্বিত চর্বণ ও জাতির সাথে তামাশা বলে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি। তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়া তার প্রস্তাবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এ ছাড়া তার সংলাপের প্রস্তাব হাস্যকরও বটে। ১৮ নভেম্বর দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবের ব্যাপারে দলের অবস্থান তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ওবায়দুল কাদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান একটি সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। সেই সার্চ কমিটিতে এমন ব্যক্তিরা ছিলেন যারা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। অতীতে কোনো সরকার এমন স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্বাচন কমিশন গঠন করে নি। যারা নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক ছড়াচ্ছেন তারা বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবজ্ঞা করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন।
১৯ নভেম্বর
* সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সন্তান যাতে বিপথে না যায় সে জন্য অভিভাবকদের এবং শিক্ষার্থীরা যাতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে জড়াতে না পারে সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলতে চাই। আমরা সেভাবেই মাথা উঁচু করে চলব। সেইভাবে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের উন্নতি হয়। বাংলাদেশ এগিয়ে চলে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কারণ আমরা এ দেশকে ভালোবাসি। দেশের মানুষকে ভালোবাসি। দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার ব্রত নিয়েই আমরা রাজনীতি করি। নিজের ভাগ্য গড়া না, মানুষের ভাগ্য গড়া। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর দেশ রেখে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। গত ১৯ নভেম্বর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানসহ চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আরভি মীন সন্ধানী নামে একটি জরিপ জাহাজের কার্যক্রমও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
২০ নভেম্বর
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে গত ১৯ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সে রাঙ্গামাটি সরকারি মহিলা কলেজে শিক্ষক শূন্যতার কথা তুলে ধরেন এক আদিবাসী ছাত্রী। প্রধানমন্ত্রী সাথে সাথে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ওই কলেজের শূন্য সব পদ পূরণের নির্দেশ দেন। ২০ নভেম্বরই কলেজের শিক্ষকদের শূন্য পদগুলো পূরণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাঙ্গামাটি সরকারি মহিলা কলেজে শূন্য পদে কয়েকজন শিক্ষককে পদায়ন করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী কলেজ অধ্যক্ষের সাথে এ বিষয়ে টেলিফোনে কথা বলেন এবং যেসব বিভাগ শিক্ষকশূন্য ছিল, সেগুলোতে শিক্ষক পদায়নের ব্যবস্থা নেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে ওই কলেজের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক পদায়ন করে।
* সবার জন্য নিরাপদ পানি এবং স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করাসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৬) অর্জনে বাংলাদেশকে বিশ্বে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত করতে কৌশলপত্র তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসডিজি-৬ বাস্তবায়নে গত ২০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত জাতীয় কর্মশালার উদ্বোধনী বক্তব্যে তার পক্ষে অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে এই গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
২১ নভেম্বর
* তৃণমূল জনগণের মাঝে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক মার্গারেট চ্যান। গত ২১ নভেম্বর চীনের সাংহাইয়ে ‘হেলথ প্রমোশন ইন দ্য এসডিজিস’ বিষয়ক নবম বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের সম্মানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আয়োজিত মধ্যাহ্ন ভোজ সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপির সাথে একান্ত আলাপকালে তিনি এই অভিনন্দন জানান। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে চ্যান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অর্জন বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। তিনি এ সময় ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
২৩ নভেম্বর
* সংবিধান এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সদা সতর্ক থাকার জন্য সেনাবাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, পবিত্র সংবিধান এবং দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থেকে অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক যে কোনো হুমকি মোকাবিলায় সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। গত ২৩ নভেম্বর বিকেলে সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে সদ্য গঠিত ১১ পদাতিক ব্রিগেডসহ ৯টি ইউনিটের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি এ নির্দেশ দেন।
* একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে নির্যাতিত আরও ২৪ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৩৭তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে মোট স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা ১৭০ জনে দাঁড়াল। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ২৪ বীরাঙ্গনা হলেনÑ রংপুর সদরের আনোয়ারা বেগম, মোসাম্মৎ আয়শা বেগম, বরিশালের বাকেরগঞ্জের মোসাম্মৎ আলেয়া বেগম, গৌরনদীর নুরজাহান বেগম, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কমিলা বেগম, ফরিদপুরের মধুখালীর ফুলজান বেগম, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আফিয়া খাতুন খঞ্জনী, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মমতাজ বেগম, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের আলেয়া বেগম, ঢাকার মুগদাপাড়ার মোসাম্মৎ হনুফা বেগম, কুড়িগ্রাম সদরের মোসাম্মৎ দেলো বেওয়া, রহিমা খাতুন, মজিদা বেগম, ছালেহা বেওয়া, বছিরন বেগম, তরু বালা, ফাতেমা বেগম, কুড়িগ্রাম সদরের খোতেজা বেগম, খুকী বেগম, গেন্দী বেওয়া, পাবনা আটঘরিয়ার সোনা বালা, মায়া রানী, জামেলা খাতুন ও চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মোমেনা বেগম। তারা প্রতিমাসে ভাতাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
২৪ নভেম্বর
* রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, উপসাগরীয় যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত কুয়েতের নিরাপত্তায় বিশেষ করে মাইন, ঝুঁকিপূর্ণ গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক অপসারণে অসামান্য সাহস ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অর্ডন্যান্স কোরের সদস্যরা। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে অর্ডন্যান্স সেন্টার অ্যান্ড স্কুলকে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে, যাতে দেশ ও বিদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এখান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেন। গত ২৪ নভেম্বর গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসে ষষ্ঠ অর্ডন্যান্স কোর পুনর্মিলনী ও কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। সেনানিবাসে অবস্থিত অর্ডন্যান্স সেন্টার অ্যান্ড স্কুলে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
* বিয়ের জন্য আগের মতোই মেয়েদের বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর বাধ্যতামূলক করে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬’ করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবা-মায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরও বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে এই আইনে।
* ২০১৭ সালের ছুটির তালিকা অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৪ দিন সাধারণ ও ৮ দিন নির্বাহী ছুটি মিলিয়ে মোট ২২ দিন ছুটি থাকবে। এর মধ্যে ১০ দিনই পড়েছে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার।
* বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রথমবারের মতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল লেকচার’ প্রবর্তন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রতিবছর এই মেমোরিয়াল লেকচার আয়োজন করা হবে। গত ২৪ নভেম্বর ইউজিসির ১৪৫তম পূর্ণ কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ইউজিসি অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি জানান, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে কমিশন এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
২৫ নভেম্বর
* মানুষের মন ও জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়াতে দেশে প্রথমবারের মতো একটি প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মিশেলের এই জাদুঘরটি প্রাণী, উদ্ভিদ, পাহাড়, সাগর, নদী, হাওর, অরণ্য, ভূ-তত্ত্ব ও জলবায়ুবিদ্যার অতীত ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার তথ্যচিত্রে ভরপুর থাকবে। এরই মধ্যে জাদুঘর নির্মাণের জন্য রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ৪ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেকটা লন্ডনের প্রাকৃতিক জাদুঘরের আদলে তৈরি করা হবে জাদুঘরটি। এখন এর নকশা তৈরি ও সমীক্ষার কাজ চলছে বলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রচলিত জাদুঘরের সাথে প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের বেশ পার্থক্য রয়েছে। প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর একটি দেশের জন্য শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত মানদ-ের ধারক ও বাহক। অন্যসব জাদুঘরের সাথে তুলনা করলে এই জাদুঘরে পরিবেশগত তথ্যচিত্র থাকে বেশি। পরিবেশ-প্রতিবেশ আগে কেমন ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, জাদুঘরে সে ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। তিন-চার দশক আগেও দেশে যেসব উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিচরণ ছিল, যেটা এখন নেই, সেগুলোও সংরক্ষিত থাকবে প্রাকৃতিক জাদুঘরে।
২৭ নভেম্বর
* আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি দেশে ফিরেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব হস্তান্তরের পর লন্ডনে এক মাস ছুটি কাটিয়ে গত ২৭ নভেম্বর দুপুরে তিনি দেশে ফেরেন। পারিবারিক কারণে গত ২৮ অক্টোবর লন্ডনে যান সৈয়দ আশরাফ।
* ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে দেশের যোগ্য সেবক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের মূল উদ্দেশ্য নেতা হওয়া নয়। এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য দেশ ও জণগণের সেবা করা। গত ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় হল সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে উঁচু করে দাঁড় করানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ছাত্রলীগের প্রতিটি কর্মীকে এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
২৮ নভেম্বর
* মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় নেত্রকোনার দুই সহোদরসহ তিন রাজাকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ২৮ নভেম্বর বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল করেন প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল ও সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি। ফরমাল চার্জে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও দেশত্যাগে বাধ্য করার ৫টি অভিযোগ রয়েছে। আগামী ১০ জানুয়ারি এই ফরমাল চার্জ আমলে নেওয়ার বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় তিন আসামি হলেনÑ দুই সহোদর মো. হেদায়েতুল্লাহ আঞ্জু ও এনায়েত উল্লাহ মঞ্জু এবং তাদের সহযোগী রাজাকার সোহরাব ফকির ওরফে ছোরাপ আলী। এর মধ্যে হেদায়েতুল্লাহ আঞ্জু পলাতক রয়েছেন।
* সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ জলদস্যু খোকাবাবু বাহিনীর প্রধান কবিরুল ইসলাম ওরফে খোকাবাবু তার ১২ সদস্যকে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গুলিসহ গত ২৮ নভেম্বর র‌্যাব-৮-এর সদর দফতর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। বেলা ১২টায় এই আত্মসমর্পণ শেষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে লুকিয়ে থাকা বাকি জলদস্যু ও বনদস্যুদের অবিলম্বে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, তা না হলে কেউ রেহাই পাবে না।
২৯ নভেম্বর
* বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তিন মামলায় এক মাসের মধ্যে নি¤œ আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। চাঁদাবাজির অভিযোগে করা তিন মামলায় ৯ বছর আগে দেওয়া জামিন বাতিল করে তাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হলো। একই সাথে এই তিন মামলার কার্যক্রমের ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া কর ফাঁকির অভিযোগের আরও দুটি মামলায় দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
* মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে জুনে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক দফতরে উত্থাপিত এক প্রতিবেদন থেকে সংস্থাটি এ আশঙ্কা করছে। গত ২৯ নভেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র বলেছেন, ওই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা, অবাধ চলাফেরার ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ, জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা, যৌন সহিংসতা, রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করাসহ ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ফুটে উঠেছে। সহিংসতার ধরন দেখে যে আশঙ্কা জাগছে তা হলো, রোহিঙ্গারা মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়ে থাকতে পারে।
* গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ‘প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ট্রাস্ট’ ও ‘ইউনূস সেন্টার’-এর সব ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সাত দিনের মধ্যে পাঠাতে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির বর্তমানে বন্ধ থাকা সব হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) থেকে দুটি চিঠি (১৭ নভেম্বর স্বাক্ষরিত) পাঠানো হয়েছে। ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে হালনাগাদ হিসাব বিবরণী চিঠি পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে।
৩০ নভেম্বর
* মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নেত্রকোনার পূর্বধলার ছয় রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হলেও তা ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এই মামলার ছয় আসামি হলেনÑ শেখ মো. আবদুল মজিদ ওরফে মজিদ মওলানা, মো. আবদুল খালেক তালুকদার, মো. কবির খান, আবদুর রহমান, আবদুস সালাম বেগ ও নুরউদ্দিন ওরফে রদ্দিন।
* শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠন করে দুটি বিভাগ গঠন করা হয়েছে। এর একটি ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ’, অন্যটি ‘কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ’। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত ৩০ নভেম্বর এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠন করে এ দুটি বিভাগ গঠন করেছেন বলে আদেশে বলা হয়।
* হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন দিয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রতিবেদনে বিমানের ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ নভেম্বর রাতে ওই ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত কর্মকর্তারা হলেনÑ বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মকর্তা এসএম রোকনুজ্জামান, সামিউল হক, মিলন চন্দ্র বিশ্বাস, লুৎফুর রহমান, জাকির হোসাইন ও টেকনিশিয়ান ছিদ্দিকুর রহমান।
* জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে বাংলা নববর্ষ বরণে বাঙালির প্রাণের উৎসবের বর্ণিল এই শোভাযাত্রা। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় গত ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ বিষয়ক আন্তঃসরকার কমিটির ১১তম অধিবেশনে এই সিদ্ধান্ত হয়। বিশিষ্টজনরা বলছেন, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঐতিহ্য বিশ্ব দরবারে আবারও প্রতিষ্ঠিত হলো।
* বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ২৩৫ কর্মকর্তাকে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

সংকলন : আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

Category:

সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট

54

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ট্রাম্পকে সপরিবারে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ট্রাম্পকে সপরিবারে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

উত্তরণ ডেস্ক : গণমাধ্যমের জরিপ ও সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে অবশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। গত ৯ নভেম্বর ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। এতে বিপুল জয় পান ট্রাম্প। কোনো প্রার্থীর জয়ের জন্য ৫৩৮ ইলেক্টোরাল ভোটের মধ্যে দরকার ছিল ২৭০ ভোট। কিন্তু মোট ২৯০ ইলেক্টোরাল ভোট পেয়ে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন পান ২১৮ ইলেক্টোরাল ভোট। পরাজয় মেনে নিয়ে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানান হিলারি। নির্বাচনে জয়ের পর এক র‌্যালিতে সব মার্কিনীর প্রেসিডেন্ট হওয়ার অঙ্গীকার করেন ট্রাম্প। আগামী ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেবেন ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট পদের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকানরা। রিপাবলিকানদের এই ভূমিধস বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বহু শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। দর বেড়েছে শুধু রুশ শেয়ারবাজারের। পড়ে গেছে মেক্সিকোসহ কয়েক দেশের মুদ্রার মান। পেশোর দাম কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে পৌঁছে।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকার মাটিতে থাকা ১ কোটি ১০ লাখের বেশি নথিবিহীন অভিবাসীকে দেশত্যাগে বাধ্য করবেন তিনি।
ট্রাম্পের জয়ে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্বনেতারা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ট্রাম্পকে সপরিবারে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের চির প্রতিদ্বন্দ্বী রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন অভিনন্দন জানিয়েছেন ট্রাম্পকে। তিনি দুদেশের মধ্যে ‘গঠনমূলক সংলাপ’ প্রত্যাশা করেছেন। দুদেশের সম্পর্কের উন্নয়নে তিনি ট্রাম্পের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোগেরিনি বলেন, ট্রাম্পের জয়ের পর ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র একসাথে কাজ করে যাবে।
ইউরোপীয় কাউন্সিল প্রধান ডোনাল্ড টাস্ক ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক আশা করেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নয়া প্রেসিডেন্টকে। তিনি আশা করেন, এর মধ্য দিয়ে দুদেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহাল থাকবে।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইদিরিম, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, ফিলিস্তিনের কট্টর ইসলামপন্থি সংগঠন হামাস, ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুর্তেতে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেছেন, ট্রাম্পের জয়ে বিশ্ব একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল।
এবার যুক্তরাষ্ট্রের মোট ভোটারের মধ্যে ৫৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৫০ অঙ্গরাজ্যের মধ্যে রিপাবলিকান ট্রাম্প আলাবামায় ৯, আরকানসাসে ৬, ফ্লোরিডায় ২৯, জর্জিয়ায় ১৬, আইডাহোতে ৪, ইন্ডিয়ানায় ১১, আইওয়াতে ৬, কানসাসে ৬, কেনটাকিতে ৮, লুইজিয়ানায় ৮, মিসিসিপিতে ৬, মিসৌরিতে ১০, মন্টানায় ৩, নেব্রাস্কায় ৫, নর্থ ক্যারোলিনায় ১৫, নর্থ ডাকোটায় ৩, ওহাইওতে ১৮, ওকলাহোমায় ৭, সাউথ ক্যারোলিনায় ৯, সাউথ ডাকোটায় ৩, টেনেসিতে ১১, টেক্সাসে ৩৮, ইউটাহতে ৬, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ৫ এবং ওয়াইওমিংয়ে ৩টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৫, কলোরাডোতে ৯, কানেটিকাটে ৭, ডেলাওয়ারে ৩, হাওয়াইতে ৪, ইলিনয়ে ২০, মেরিল্যান্ডে ১০, ম্যাসাচুসেটসে ১১, নিউজার্সিতে ১৪, নিউ মেক্সিকো ৫, নিউইয়র্কে ২৯, অরেগনে ৭, রোড আইল্যান্ডে ৪, ভারমন্টে ৩, ভার্জিনিয়ায় ১৩, ওয়াশিংটনে ১২ ও ওয়াশিংটন ডিসিতে ৩টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পান।
ভোটের প্রাথমিক ফল প্রকাশের শুরু থেকেই ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে লড়াই চলছিল। তবে পরে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়, হোয়াইট হাউসের উত্তরসূরি হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশের আগেই হিলারির সমর্থকদের মুষড়ে পড়তে দেখা যায়। কাঁদতে দেখা যায় অনেক সমর্থককে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু দিকে বেশির ভাগ জরিপেই এগিয়ে ছিলেন হিলারি। তবে নির্বাচনের দিন কয়েক আগে হিলারি-ট্রাম্প হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মেলে। একপর্যায়ে দু-একটি জরিপে এগিয়েও যান ট্রাম্প। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষকের রায় ছিল হিলারির পক্ষেই। কিন্তু সব হিসাব উল্টে দিয়ে অবিশ্বাস্য চমক দেখালেন ট্রাম্প।
২০১৫ সালে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোর পরপরই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ধনকুবের ট্রাম্প। ওই সময়েই মেক্সিকানদের ‘ধর্ষক ও সন্ত্রাসী’ বলে আলোচনায় চলে আসেন। ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন ট্রাম্প দলের সবচেয়ে বড় দাতা ও তহবিল সংগ্রাহকে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ২ কোটি ৫০ লাখের বেশি অনুসারী আছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন হারালেও ট্রাম্পের আশ্চর্যজনক বড় শক্তি ছিল শ্রমিক অধ্যুষিত শহর এবং ছোট কাউন্টিগুলো। হিলারি ফ্লোরিডার হিস্পানিক ভোটারদের বড় সমর্থন পেয়েছেন। অন্যদিকে ফ্লোরিডার বড় মহানগরী এলাকার ভোটে জয়ী হয়েছেন ট্রাম্প। তিনি পেনসিলভানিয়ার খনি শ্রমিক অধ্যুষিত কাউন্টি ও মধ্য-পশ্চিম শিল্প এলাকায় ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন। একসময় ডেমোক্র্যাটিক ঘাঁটি বলে পরিচিত কিছু এলাকাতেও জয়ী হয়েছেন তিনি। এসব গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ট্রাম্প। ভোটে ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গ ভোটার, পুরুষ ও কলেজ ডিগ্রি নেই এমন ভোটারদের সাথে জোট করেছেন। অন্যদিকে হিলারির ভোটারদের মধ্যে রয়েছে নারী, সংখ্যালঘু ও কলেজ গ্র্যাজুয়েটরা। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিনীদের প্রায় ৮৮ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ হিলারিকে সমর্থন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেদিন ভোরে বার্কলে ও ওকল্যান্ড শহরে কয়েকশ মানুষ রাস্তায় নেমে ‘ট্রাম্প আমার প্রেসিডেন্ট নয়’ বলে স্লোগান দেয়। পিটসবার্গ, সিয়াটল, পোর্টল্যান্ড ও ওরেতেও বিক্ষোভ হয়। পেনসিলভেনিয়া থেকে ক্যালিফোর্নিয়া, ওরেগন থেকে ওয়াশিংটন স্টেটÑ সব জায়গায় শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে।
– অনিল সেন

Category:

ফিরে এসেছে রুপালি ইলিশ

52রাজিয়া সুলতানা : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুপারমুনের মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে চলেছে রুপালি ইলিশ। একসময় উচ্চমূল্যের কারণে ইলিশ আলোচনায় এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটনা ঘটছে উল্টো। বাঙালির কাছে দুষ্প্রাপ্য রুপালি ইলিশ এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়। রয়েছে একেবারে ক্রয়সীমার মধ্যে। তাই বিপুল ইলিশ আহরণের রেকর্ড নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা। আলোচনা দাম কমে যাওয়ায়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ইলিশ সংগ্রহের পরিমাণ ইতোমধ্যেই ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে, যা ভোজনরসিক বাঙালিদের কাছে অনেকটাই স্বপ্নের মতো; নতুন রাষ্ট্রীয় রেকর্ড।
মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ টনের কম ইলিশ সংগ্রহ করা হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন। ২০১৪-১৫ মৌসুমে ইলিশ ধরা পড়ে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন।
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এই চিরায়ত সত্যই বাঙালির ঐতিহ্যময় কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি। আর বলতে দ্বিধা নেই মাছের রাজা ইলিশ। ইলিশের নাম শুনলেই জিভে পানি আসে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এই ইলিশ মাছ নিয়ে সারাদেশে হাহাকার কম হয়নি। নি¤œ মধ্যবিত্তরা বটেই; মধ্যবিত্তরাও উৎসব আয়োজনে খাদ্য তালিকায় ইলিশ রাখত যোগ-বিয়োগের সমীকরণটা ঠিক রেখে। অথচ সেই ইলিশই এখন বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল যুগোপযোগী সিদ্ধান্তে নি¤œবিত্ত মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে। এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের কার্যকর উদ্যোগে।
বাংলা আশ্বিন মাস ইলিশ মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত মৌসুম। ডিম ছাড়ার জন্য উপকূলীয় এলাকার মা ইলিশ এ সময়ে মিঠা পানির পদ্মা-মেঘনায় চলে আসে। এ সময় ইলিশ মাছ ধরলে মাছের বংশ বৃদ্ধি হতে পারে না। বর্তমান সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান প্রকল্প’ প্রতি বছর এই সময়ে ইলিশ ধরা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। এই আইন অমান্যকারীদের কাঠোর শাস্তির বিধান ইলিশ জেলেদের নিবৃত্ত করেছে। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরার বিষয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বরাবরই ছিল। তবে ২০১১ সালে মৎস্য সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে প্রধান প্রজনন মৌসুম নির্দিষ্ট এবং নিষেধাজ্ঞাও কড়াকড়িভাবে বলবৎ করা হয়।
ইলিশের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত নির্ধারিত ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার সীমানা হচ্ছে মীরসরাই উপজেলার শাহের খালী থেকে হাইতকান্দী পয়েন্ট, তজুমদ্দিন উপজেলার উত্তর তজুমদ্দিন থেকে পশ্চিম সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট, কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালি পয়েন্ট ও কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর কুতুবদিয়া থেকে গ-ারমারা পয়েন্ট। আর ২৭টি জেলা হচ্ছে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী জেলা। এসব জেলার সব নদ-নদী ছাড়াও দেশের সমুদ্র উপকূল ও মোহনায় ১২ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। মা ইলিশ ধরা ছাড়াও বাজারজাত, পরিবহনের ক্ষেত্রেও থাকে নিষেধাজ্ঞা।
বাঙালির খাবারের তালিকায় ইলিশ মাছ সম্প্রতি দুর্লভ হয়ে উঠেছিল। অনেকটা দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় চড়া দাম হয়েছিল ইলিশের। ইলিশের সাম্প্রতিক দাম মানুষের কাছে কল্পনার মতো। সরকারের উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরণে সহায়তা করেছে। মা ইলিশ এবং জাটকা রক্ষার জন্য বছরের ২২ দিন মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, একটি ইলিশ একবারে গড়ে ১০ থেকে ১২ লাখ ডিম ছাড়ে। তাই ক্রমে বাড়ছে ইলিশ আহরণের পরিমাণ। এখন যে দেড়-দুই কেজি ওজনের ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে, তার বয়স যথাক্রমে দুই ও চার বছর। তার মানে চার বছর ধরে ইলিশ রক্ষায় যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দেশের জনগণ তার সুফল পেতে শুরু করেছে। সব মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে দেশ মাছে ভরে যাবে।
ইলিশ মাছ বাংলাদেশের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-ইতিহাসের সাথে মিশে রয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই মাছের উৎপাদন বাড়লে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। ইলিশ বিচরণের জন্য জলাভূমি শুধু সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য ইলিশের ওপর নির্ভরশীল এবং ইলিশ উৎপাদন এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে দায়িত্ব নিতে হবে।
উন্নয়ন এবং উৎপাদনবান্ধব বর্তমান সরকার ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় ১৪টি জেলার ৭৬টি উপজেলার সাড়ে ৩ লাখ পরিবারের জন্য বিনামূল্যে ২০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দিয়েছে। মোট বরাদ্দ হয় ৭ হাজার ১৩৪ টন চাল আর অভিযান পরিচালনার জন্য ৪ কোটি টাকা। আইন অনুযায়ী, এই সময়ে কেউ মাছ ধরলে তাকে ন্যূনতম এক বছর বিনাশ্রম কারাদ-, ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ- দেওয়া হয়। জেলেরা কষ্ট করে হলেও নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখছে। মৌসুমে একজন সাধারণ জেলে প্রতিদিন প্রায় ২-৩ হাজার টাকা আয় করছেন। উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ ও জাটকা ধরা বন্ধের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোকে দূষণমুক্ত ও গভীরতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ইলিশের বিচরণও নিশ্চিত করতে হবে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে ইলিশ রক্ষার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে। না হলে জেলেরা ন্যায্য মূল্য পাবে না।
ইলিশ মাছ দুই ধরনের। এক মিষ্টি পানির ইলিশ। অন্যটা হলো সমুদ্রের লোনা পানির ইলিশ। এদের মধ্যে মিষ্টি পানির ইলিশই পুষ্টিকর। ইলিশ মাছে ভালো ফ্যাটের পরিমাণ অনেক বেশি। ইলিশ মাছে পলি আনস্যাচুরেটেড এবং মনো আন-স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। যা আমাদের শরীরের জন্য সব সময়ই উপকারী। তবে মাঝারি সাইজের ইলিশই সবচেয়ে পুষ্টিকর। ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজির ওজনের ইলিশ মাছের মধ্যেই একমাত্র পলি ও মনো আন-স্যাচুরেটেড ফ্যাট পাওয়া যায়। তার চেয়ে বেশি ওজনের ইলিশ মাছ আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। আবার ছোট ইলিশও ততটা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ নয়। এই মাছে একেবারে প্রোটিন নেই। মাঝারি সাইজের ইলিশে প্রচুর প্রোটিন, জিঙ্ক, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়ামের মতো খনিজ পদার্থ রয়েছে। ১০০ গ্রাম ইলিশ মাছে ২২.৩ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে। জিঙ্ক ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। ইলিশের সেলেনিয়াম অ্যান্টি অক্সিডেন্টের কাজ করে। এ ছাড়া ইলিশে রয়েছে ক্যালসিয়াম আর আয়রনের পুষ্টিগুণও। ইলিশ মাছে ভিটামিন এ, ডি এবং ই রয়েছে।
আমরা শুধু ইলিশের স্বাদের ওপর গুরুত্ব দেই। কিন্তু ইলিশের পুষ্টিমানও অসাধারণ। এতে ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান আছে, যা শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য উপকারী। এটি মস্তিষ্কের বুদ্ধি বিকাশে খুবই উপকারী। হার্টের কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে, প্রজননতন্ত্র গঠন ও বিকাশে সাহায্য করে। এটি ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
বাংলাদেশে পোলট্রি ও সবজি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। মাছও ক্রমে সেই উন্নয়নের মহাসড়কে পা রেখেছে। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ ইলিশের ক্ষেত্রে তেমন এক বিপ্লবের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আশা করছি, জামদানি শাড়ির পর রুপালি ইলিশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেমন স্থান দখল করবে।

লেখক : কৃষিবিদ, গবেষক এবং সমাজকর্মী

Category:

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল

50আরিফ সোহেল : ১৯৭১ সালে এই দেশ ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে। কিন্তু ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে পাল্টে যায় বাংলাদেশ। সেই দিন আয়োজিত মহাসমাবেশে তার অবিস্মরণীয় ভাষণে গর্জে উঠেছিল বাঙালিরা। জাতির পিতা বলেছেন, ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে…।’ জাতির পিতার কালজয়ী ভাষণে উদ্বীপ্ত হয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিল সব পেশার মানুষ। যে জোয়ারে মিলেমিশে একাকার হয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনও। তারা অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফুটবলকেই। গড়ে উঠেছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ময়দানে পৃথিবী খুঁজে পেয়েছিল ক্রীড়াঙ্গনের একঝাঁক সাহসী নিবেদিত ফুটবলারকেও।
বিশ্ব ইতিহাসে যা কখনও ঘটেনি, তেমন বিস্ময়কর এক নজির স্থাপন করেন বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলায় অংশ নেয় দলটি। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নৃশংসতার মুখে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক ক্রীড়াবিদই আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। অনেকে সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামের পথও বেছে নিয়েছিলেন। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামী বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চিন্তা থেকেই ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছিলেন ফুটবলাররা।
বিদেশের মাটিতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার এবং ফুটবল সংস্থার অনুমোদন ছাড়া আনুষ্ঠানিক কোনো ম্যাচ খেলা সম্ভব ছিল না। এজন্য সামছুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম কর্ণধার মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিপ্রায়ের কথা জানিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রী লুফে নিয়ে দল গঠনের জন্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকাও বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ফুটবল দল গঠনের বিষয়টি বেতারে ঘোষণা দেওয়া হয়। দল গঠনের জন্য ১৯৭১ সালের ১৩ জুন গঠিত হয়েছিল একটি কমিটি। গঠিত কমিটির নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম (পৃষ্ঠপোষক), প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ (পৃষ্ঠপোষক), প্রথম সভাপতি মো. সামসুল হক, দ্বিতীয় সভাপতি আশরাফ আলী চৌধুরী, তৃতীয় সভাপতি এনএ চৌধুরী (কালু ভাই), সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, কোষাধ্যক্ষ মো. মোহসীন। এ ছাড়া ওই কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এমএ হাকিম, এমএ মতিন, গাজী গোলাম মোস্তফা,  মজিবুর রহমান ভূঁইয়া এবং সাইদুর রহমান প্যাটেল প্রমুখ।
প্রাথমিকভাবে ফুটবল দল গঠন করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে সম্মিলিতভাবে ফুটবল দল গঠনে খুব বেশি সময় লাগেনি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা উল্লেখ করে মুজিবনগর গিয়ে যোগ দিতে বলা হয়। পাশাপাশি আকাশবাণীতে (কলকাতা রেডিও) ঘোষণা দেওয়া হলো বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত খেলোয়াড়দের মুজিবনগরে রিপোর্ট করার জন্য। ঘোষণার পরে ৪০ খেলোয়াড় মুজিবনগর ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখান থেকে ৩০ জন বাছাই করে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করা হয়। পরে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫ জনে। ২৩ জুলাই মুজিবনগর থেকে নদিয়া পৌঁছে। নদিয়ার ডিসি দীপক কান্তি ঘোষ এবং স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কর্মকর্তারা দলটিকে অভ্যর্থনা জানান। পরদিন নদিয়া একাদশের বিপক্ষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রথম খেলতে নামে। জাকারিয়া পিন্টুকে অধিনায়ক ও প্রতাপ শঙ্কর হাজরাকে সহ-অধিনায়ক করা হয়। দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তানভির মাজহার তান্না।
বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ভারত সরকার। ভারতে ফুটবল ম্যাচ খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত সৃষ্টি ও প্রচার-প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়। এটা মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। ভিন্ন নামে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রথম ম্যাচটি খেলেছে ত্রিপুরা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিপক্ষে। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচটি খেলেছে শরণার্থী একাদশ নামে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৪ জুলাই। আসাম রাইফেল মাঠে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বাংলাদেশ ১-২ গোলে হেরে গিয়েছিল। এই দলের বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে কায়কোবাদ দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুজিবনগর সরকারের অনুমতি পেলেও শুরুতে দল গঠন করা কঠিন হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পজিশনে পর্যাপ্ত ফুটবলার পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত ফুটবলার ছাড়াও আগরতলাসহ ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে থাকা অনেকে যোগ দেন। সবার প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত দলের সংখ্যা বেশ বড় হয়ে যায়।
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। নদীয়ায় ম্যাচ শুরুর আগে দলের কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়রা ভারতীয় জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি প্রস্তাবিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত বাজানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু বাংলাদেশ যেহেতু স্বীকৃত দেশ নয়, এ কারণে নদীয়া জেলা প্রশাসন তাদের অপারগতা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের কর্মকর্তা, খেলোয়াড় ও উপস্থিত দর্শকদের দাবির মুখে শেষ অবধি তারা সম্মতি দেয়। আর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নদীয়ার জেলা প্রশাসক ডিকে ঘোষ। কলকাতা থেকে বেশ দূরে প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ের পত্র-পত্রিকায় তা তেমনভাবে প্রচার পায়নি। অবশ্য স্থানীয়ভাবে ম্যাচটি দারুণভাবে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। খেলাটি ড্র হয় ২-২ গোলে।
বাংলাদেশের কাছে খেলার ফলাফল মোটেও মুখ্য ছিল না। মুখ্য ছিল স্বাধীন দেশের পতাকা উঁচিয়ে ধরা, বিশ্বকে নিজেদের মুক্তির বার্তা দেওয়া। সেক্ষেত্রে শতভাগ সফলই হয়েছিলেন পিন্টু-প্যাটেলরা। কৃষ্ণনগরের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ সেদিন আবেগঘন করে তুলেছিল সবাইকে। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু সেদিন শপথ পড়িয়েছিল মুক্ত-স্বাধীন স্বদেশের। খেলোয়াড়রা জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। এ ঘটনা যুদ্ধরত সবাইকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীন বাংলা দলের হয়ে প্রথম গোল করেন শাহজাহান। দুঃখজনক হলেও সত্যি স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর দায়ে পরদিনই নদিয়ার ডিসিকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে অবশ্য তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
নানা মত থাকলেও দেশসেরা ফুটবলাররাই গড়ে তুলেছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। বিশ্বে জনমত গঠনের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে মুজিবনগর সরকারের তহবিলে প্রায় ৫ লাখ টাকা জমা দেন। এই দলের বেশির ভাগই স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের সেরা ফুটবলার হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পারফরমেন্সও ছিল প্রশংসনীয়। এই দলটি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ১৬টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ৯টি জয়, ৪টি পরাজয় এবং ৩টি খেলা ড্র করেছে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চরম অনিশ্চয়তা, দেশে আত্মীয়-পরিজনের জীবনের ঝুঁকি, পরদেশে মানবেতর জীবনযাপন এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দুর্দান্ত পারফরমেন্স করেছেন তারা।
৮ আগস্ট পরাশক্তি মোহনবাগানের খ্যাতনামা ফুটবলার গোস্টপালের নামে গড়া একাদশের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচ খেলে স্বাধীন বাংলা দল। মূলত মোহনবাগানের খেলোয়াড়রাই এই দলের হয়ে মাঠে নামেন। সর্বশেষ খেলাটি অনুষ্ঠিত হয় মুম্বাইতে যেখানে মহারাষ্ট্র ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেন ভারতের খ্যাতনামা সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক নবাব মনসুর আলি খান পতৌদি। মুম্বাইয়ে মহারাষ্ট্র একাদশের হয়ে খেলেছিলেন মনসুর আলী খান পতৌদি একটি গোলও করেন। মুঘলে আজম খ্যাত দিলীপ কুমার এসেছিলেন ম্যাচটি দেখতে এবং ১ লাখ রুপি অনুদানও দেন দলকে।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন পৃথিবীর ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এই দল নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। দলে যারা ছিলেন তাদের একজনের কথার সাথে অন্যজনের কথার অনেক অমিল দেখা যায়। বলতে দ্বিধা নেই স্বাধীনতার এই ৪৫ বছর পরেও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নেই।
একমাত্র খেলাই পারে মানুষকে একসূত্রে গাঁথতে। এ উপলব্ধিতেই একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশসেরা ফুটবলাররা। স্বাধীনতা অর্জনে তাদের অবদান ভোলা মানে, প্রিয় স্বদেশকেই ছোট করা। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ক্রীড়াঙ্গনের সূর্যসন্তানরা চিরদিন বাংলাদেশের হৃদয়ে অম্লান হয়েই থাকবেন।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), প্রতাপ শঙ্কর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), আলী ইমাম, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অমলেশ সেন, আইনুল হক, শেখ আশরাফ আলী, বিমল কর, শাহজাহান আলম, মনসুর আলী লালু, কাজী সালাউদ্দিন, এনায়াতুর রহমান, কেএন নওশেরুজ্জামান, সুভাষ সাহা, ফজলে হোসাইন খোকন, আবুল হাকিম, তসলিম উদ্দিন শেখ, আমিনুল ইসলাম, আবদুল মমিন জোয়ারদার, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, মো. আবদুস সাত্তার, প্রাণগোবিন্দ কু-ু, মুজিবর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) খন্দকার নুরুন্নবী, লুৎফর রহমান, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জি, সনজিত কুমার দে, মাহমুদুর রশিদ, সাইদুর রহমান প্যাটেল, দেওয়ান মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন, মো. মোজাম্মেল হক, বীরেন দাস বীরু, আবদুল খালেক ও নিহার কান্তি দাস প্রমুখ।
ম্যানেজার : তানভীর মাজহার তান্না, কোচ : ননী বসাক।

Category:

রাজধানীতে নবান্ন উৎসব

49বাংলা পঞ্জিকার হিসাবে গত ১৫ নভেম্বর ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ। কৃষকের বোনা মাঠের ফসল ঘরে তোলার দিন নবান্ন। পাকা ধানের ম-ম গন্ধে গোলা ভরে ওঠার দিন। আবহমান গ্রাম বাংলার উৎসব-আনন্দের দিন। যদিও শহুরে নাগরিক জীবনে সেই দৃশ্যের দেখা মেলে না। পাওয়া যায় না শেকড়ের সেই অনুভব। তবে এদিন যান্ত্রিক শহর ঢাকায় বিরাজ করেছে নবান্নের আবহ। মৃত্তিকাসংলগ্ন উৎসবের টানে সাত-সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিল সংস্কৃতিপ্রেমী নগরবাসী। সেই সুবাদে শাহবাগের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ চারুকলার বকুলতলা যেন হয়ে উঠেছিল একখ- গ্রাম-বাংলা। উৎসবে আগত শুভানুধ্যায়ীদের জন্য নৃত্য-গীত ও কথনের নবান্ন আবাহনের পাশাপাশি ছিল মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা কিংবা পিঠা-পুলি পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন। নানা পরিবেশনা ও বিশিষ্টজনদের আলোচনায় উচ্চারিত হয়েছে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বারতা। হেমন্তের হালকা শীতে চারুকলার বকুলতলায় বেজেছে ঢাকঢোলের বোল। একতারা-দোতারা ও বাঁশির সুরে নাগরিক মন ফিরে গেছে শেকড়ের পানে। ‘এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবে’ স্লোগানে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনুসারী এই উৎসবের আয়োজন করে জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন পর্ষদ। বিকেলে পর্ষদের পক্ষ থেকে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও অনুষ্ঠিত হয়েছে এই উৎসব।
উদ্বোধনী বক্তব্যে নবান্ন উৎসবের প্রাচীন ঐতিহ্যটি বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান আবুল মাল আবদুল মুুহিত এমপি। বলেন, সার্বজনীন উৎসব চর্চা বাড়াতে হবে। নবান্ন উৎসব আমাদের সার্বজনীন উৎসব। এই উৎসবে সব ধর্ম, শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হতে পারে। নবান্ন উৎসবে গ্রাম-বাংলার কৃষককে স্মরণ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা এক দেহে লীন হয়ে গেছি। আজ আমাদের সবার একটাই পরিচয়, আমরা বাঙালি। এই তো উৎসবের মাহাত্ম্য।
উৎসব সাজানো হয় নবান্ন-বিষয়ক গান ও নাচ দিয়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ব্যাপ্তির সকালের আয়োজনে ছিলÑ মাটির গান, কৃষকের গান, ফসল তোলার আনন্দের গান। সংগীত পরিবেশন করেনÑ ফরিদা পারভীন, আবু বকর সিদ্দিক, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী। সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে এমআর ওয়াসেকের পরিচালনায় নন্দন কলাকেন্দ্র গারোদের সাংস্কৃতিক সংগঠন আচিক। ঘরে ফসল তোলা ও বণ্টনের রকমফের নিয়ে বিভিন্নধর্মী নৃত্য পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন কাদামাটি।
প্রথম পর্বের পরিবেশনা শেষে সকাল ৯টা ৫ মিনিটে চারুকলার বকুলতলা থেকে বের হয় নবান্ন শোভাযাত্রা। এটি টিএসসি চত্বর ঘুরে পুনরায় চারুকলার বকুলতলায় এসে শেষ হয়। পরে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একযোগে চারুকলার বকুলতলা ও ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

Category:

বিশ্বে সাহিত্যের সাথে হাত মিলিয়ে শেষ হলো ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৬’

48

সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধিবেশনটিতে ছিল ত্রিনিদাদের নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ভিএস নাইপলের কথোপকথন। ঘণ্টাব্যাপ্তির আলোচনায় সাহিত্য অনুরাগী শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন ত্রিনিদাদ থেকে যুক্তরাজ্যে আবাস গড়া এই কিংবদন্তি কথাশিল্পী।

উত্তরণ ডেস্ক : বাংলার সমাদৃত সাহিত্যকর্ম ছড়িয়ে যাবে সারাবিশ্বেÑ এ আশাবাদ ব্যক্ত করে গত ১৭, ১৮ ও ১৯ নভেম্বর তিন দিন ধরে পালিত হয় ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৬’।
উৎসবের সমাপনী দিন ছিল ১৯ নভেম্বর। সাহিত্যভিত্তিক নানান আলোচনার পাশাপাশি কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, আধ্যাত্মিক গানের পরিবেশনা, গল্পকথকের গল্প বলাসহ এদিনও নানান অধিবেশন প্রাণভরে উপভোগ করেছে বাংলা একাডেমি আঙিনায় উৎসবে আগত অগণন শ্রোতা-দর্শক। সেই সাথে বিভিন্ন বইয়ের স্টল ঘুরেও দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান লেখকদের সাহিত্যকর্ম সংগ্রহ করেছেন পাঠকরা।
সমাপনী দিনে নানান অধিবেশনের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জেমকন সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা। প্রবীণ ও নবীন দুই লেখকের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। সবশেষে ছিল সমাপনী আনুষ্ঠানিকতা। সমাপনী দিনে ছিল ৩৯টি অধিবেশন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এই উৎসবের আয়োজন করে যাত্রিক। উৎসবে অংশ নেয় ১৮ দেশের ৬৬ সাহিত্য-শিল্পসংশ্লিষ্ট বিদেশি অতিথি এবং দেড় শতাধিক বাংলাদেশি সাহিত্যিক-লেখক ও গবেষক। এদিনে ২০১৬ সালের জেমকন সাহিত্য পুরস্কার। জেমকন সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন মঈনুল আহসান সাবের এবং জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন মোস্তাফিজ কারিগর। তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক ঝর্ণা রহমান, ভারতের কবি জহর সেন মজুমদার ও আকবর আহমেদ। প্রখ্যাত শিল্পী মনিরুল ইসলামের শিল্পী-জীবন ও তার শিল্প-ভাবনা নিয়ে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে কসমিক টেন্টে। শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র ও গ্রন্থ প্রকাশ করেছে এনার্জিস লিমিটেড। ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘মনির’ শীর্ষক বইটিতে ১৯৬৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মনিরুল ইসলামের নির্বাচিত শিল্পকর্ম নিদর্শন স্থান পেয়েছে।
ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টায় কেকে টি স্টেজে ছিল ড্যানিয়েল হানের সঞ্চালনায় ‘বুক অব ঢাকা’ শীর্ষক অধিবেশন। এতে আলোচনা করেন অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অরুনাভ সিনহা, কায়সার হক ও কিউপি আলম। সন্ধ্যায় উৎসবের মূল মঞ্চ একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ছিল সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্র্যাকের চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। আরও বক্তব্য রাখেন উৎসব পরিচালক সাদাফ সায্ সিদ্দিকী, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান ও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট সমালোচক চালর্স ক্যাম্পেবেল।
১৮ নভেম্বর অধিবেশনের সূচনা হয় আধ্যাত্মিক গানের পরিবেশনা দিয়ে। শেষ হয় এ বছরের সাহিত্য শাখায় নোবেলজয়ী কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী বব ডিলানকে নিবেদিত গানের মাধ্যমে। তার আগে দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধিবেশনটিতে ছিল ত্রিনিদাদের নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ভিএস নাইপলের কথোপকথন। ঘণ্টাব্যাপ্তির আলোচনায় সাহিত্য অনুরাগী শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন ত্রিনিদাদ থেকে যুক্তরাজ্যে আবাস গড়া এই কিংবদন্তি কথাশিল্পী।
১৮ নভেম্বর ছিল উৎসবের দ্বিতীয় দিন। ৯০ অধিবেশনে সাজানো সম্মেলনে এদিনে অনুষ্ঠিত হয় ৩৭ অধিবেশন। সকাল ১০টায় প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় সাধনার শিল্পীদের পরিবেশিত লোকনৃত্য। একই সময়ে কেকে টি স্টেজে ‘ইন আদার ওয়ার্ডস : লাইব্রেরি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক অধিবেশনে ২০১৬ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক ডেবোরা স্মিথ, অরুনাভ সিনহা, চার্লস টার্নার ও কায়সার হক উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ড্যানিয়েল হার্ন। কবিতা পড়ে শোনান শেহজার দোজা, সৈয়দা আহমদ, ফাতেমা হাসান, জেফরি ইয়াং ও আহমাদ জান ওসমান। একই সময়ে ব্র্যাক মঞ্চে ম্যাক্স রোডেন বেকের সঞ্চালনায় ‘ক্যান ইন্ডিয়া স্পিক’ শীর্ষক অধিবেশনে আলোচনা করেন নারেশ ফারনান্দেজ, মঞ্জুলা নারায়ণ ও শ্রীরাম কারি। এই আলোচনায় মূলত ভারতের গণতন্ত্রের চর্চা ও কাশ্মীর প্রসঙ্গ উঠে আসে। একই সময়ে কসমিক টেন্টে প্রদর্শিত হয় তথ্যচিত্র ‘ব্লকেড’। তথ্যচিত্রটিতে বাংলাদেশের বাইরের দেশসমূহে ১৭৭১ সালে পাকিস্তানের নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিবাদ করেছিল, সে বিষয়টি উঠে আসে।
এর আগে ১৭ নভেম্বর ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধন করেন স্যার ভিএস নাইপল। সাথে ছিলেন সাদাফ সায্ সিদ্দিকী, লেডি নাদিরা নাইপল, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। আলোস্ত্রী নাদিরা নাইপলের সাহায্য নিয়ে হুইল চেয়ারে করে মঞ্চে আসেন ভিএস নাইপল। ঢাকা লিট ফেস্টের ষষ্ঠ আসরের উদ্বোধক এই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। অনেক দিন থেকে পারকিনসন রোগে ভুগছেন ৮৪ বছর বয়সী এই লেখক। এ ছাড়া প্রথম দিনের আরও কয়েকটি অধিবেশনের শিরোনাম ছিল ‘ইমাজিনিং হিস্ট্রি’, ‘ওয়ার্ল্ড ফিকশন : হিডেন রিয়েলিটি’, ‘ক্রাইম পেইস : দ্য আর্ট অব সাসপেন্স’। ছিল ভালোবাসার শহর চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ও আলোচনা, মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধুর ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে আলোচনা, সমকালীন কবিদের কবিতা আবৃত্তি। মূল মঞ্চের শেষ অধিবেশনে স্মরণ করা হয় সদ্য প্রয়াত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হককে। তাকে নিয়ে আলোচনা করেন তার ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক, কবি সাজ্জাদ শরিফ ও প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার। আলোচনার পর সৈয়দ হকের ছোট গল্প ‘নীল দংশন’-এর ইংরেজি প্রতিরূপ মঞ্চায়িত হয়।

Category:

একাত্তরের গেরিলা

43

[বাংলাদেশের অনেক বীর সন্তানের একজন কামাল। পুরো নাম এসএম কামাল হোসেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। অথচ তখন বয়েস আর কত? এসএসসি পরীক্ষার্থী মাত্র। কিন্তু পরীক্ষা, সুন্দর ভবিষ্যৎ এসবকে তুচ্ছ করে দেশের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলেন। জীবনকে বাজি রেখে গেরিলা কমান্ডের যোদ্ধা হিসেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। ২নং সেক্টর প্লাটুন ১৫-এর একজন যোদ্ধা ছিলেন কামাল। প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতের আগরতলার মেলাগড় ট্রেনিং ক্যাম্পে। কামালের জš§ তারিখ ২০ নভেম্বর ১৯৫৬। মতিঝিল সেন্ট্রাল গভ. হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন কামাল। ¯œাতক অবধি পড়েছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। নিভৃতচারী এই যোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন নি।]

বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ, অবজ্ঞা আর উপেক্ষাই তিলে তিলে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি এক তীব্র ঘৃণার জš§ দেয় কামালের মনে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা, ধ্বংসের বীভৎসতা দেখে সেই ঘৃণা চরম রূপ নেয় কামালের মনে। সেই সাথে জš§ নেয় মনে প্রতিশোধের আগুন। যে আগুনের দহন তাকে তাড়িত করে, চালিত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকে। প্রশিক্ষণ শেষে গেরিলা কমান্ডের একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের মাটিতে পা রাখেন। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত অবিচল থাকেন তার লক্ষ ও প্রতিজ্ঞায়।
’৭১ সালে কামালের বয়েস আর কত? বড়জোর পনের। তখন তার আবাস, ঢাকার নয়াপল্টনে। ২৫ মার্চ রাতে যখন ক্র্যাকডাউন হলো তখন কামাল পরীক্ষার পড়া তৈরি করছিলেন। হঠাৎ শুরু হয় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। গুলি আর ট্যাংকের শব্দ। মানুষের আর্তচিৎকার, আগুনের লেলিহান শিখার ভেতর এক চরম অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যে রাতটি কাটে কামালদের। ২৬ মার্চ সকালে কিছু সময়ের জন্য কার্ফু তুলে নেওয়া হলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যায় কামাল। এ প্রসঙ্গে পাক আর্মিদের বর্বরতার মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিক থেকে প্রচ- গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। তাই নিজ চোখে বাস্তব চিত্র দেখার জন্য সুযোগ পাওয়া মাত্র ছুটে যাই পুলিশ লাইনে।
গিয়ে কী দেখেন? শুধু রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নয়, মালিবাগ ব্যারাকেও অসংখ্য পুলিশের পোড়া, গুলিবিদ্ধ, ছিন্নবিচ্ছিন্ন বীভৎস সব লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ব্যারাকে ব্যারাকে আগুনের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে আশপাশের কোনো গাছও রক্ষা পায় নি। এমনকি উঁচু উঁচু নারিকেল গাছগুলোও পুড়ে প্রায় কয়লা হয়ে গিয়েছিল।
এমনই বীভৎসতা কামালকে বিচলিত করেছিল মর্মে মর্মে, উপলব্ধি করেছিল সেদিন নিজ দেশেই বাঙালি কত অসহায়! ফলে পাকিস্তানিদের প্রতি দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, ঘৃণা তীব্র হয়েছিল সেদিন প্রচ-ভাবে।
কামাল জানান, ২৫ মার্চ সারাটা দিনই এক ধরনের উৎকণ্ঠায় কেটেছিল ঢাকাবাসীর। এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছিল মানুষের মনে। নানারকম খবর। উড়ো খবরে সে শঙ্কা আরও বেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যেহেতু ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম আগে থেকেই, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে, যা আজকের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, সেই হলে ছোট ছোট দলে বেশ কবার গিয়েছিলাম এই ২৫ তারিখে। উদ্দেশ্য সত্যিকার অর্থে কী ঘটতে যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত তাই জানা। তবে পাক আর্মিরা যে কোনো সময় বাঙালিদের ওপর যে বড় ধরনের আঘাত করতে পারে সে আশঙ্কা ছিল সবার মধ্যেই। তবে ওই রাতেই যে সেই আঘাত নেমে আসবে বাঙালির ওপর, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি কেউ।
কখন কী হয়, কখন কী হয় এমনই অনিশ্চয়তা। সন্ধ্যার পর থেকেই সেই উৎকণ্ঠা ক্রমেই যেন আতঙ্কে রূপ নেয়। তবু পড়াশোনায় মন দিতে হচ্ছে। কারণ সামনেই এসএসসি পরীক্ষা। আজকের ডিআইটি এক্সটেনশন রোডটি তখন নির্মাণ হচ্ছিল। মাটি ভরাটের কাজ চলছিল তখন জোরোসোরে। রাত আরও গভীর হতেই সম্ভবত রাত ১২টার দিকে গভর্নর হাউসের (আজকের বঙ্গভবন) দিক থেকে মুষলধারে গুলির শব্দ আসতে থাকে। গুলি এবং গোলার বিকট শব্দে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন মানুষ মরিয়া হয়ে বেরিয়ে আসে রাজপথে। পল্টন, ফকিরেরপুল, টিএন্ডটি কলোনি এবং এজিবি কলোনি থেকে অসংখ্য মানুষ পথে নেমে আসে। তারা দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলা) মোড়ে, নির্মাণাধীন ডিআইটি এক্সটেনশন রোডের জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড দিয়ে পাক আর্মিদের গতি প্রতিহত করার চেষ্টা করে। ইট, ড্রাম, টায়ার, গাছের গুঁড়ি যার হাতের কাছে যা ছিল তাই দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে জনগণ। কিন্তু মিলিটারিদের ভারী যানবাহনের গতি তাতে ব্যাহত হয়নি। সবকিছু গুঁড়িয়ে দিয়ে তারা এগিয়ে গেছে এবং গুলি, আগুন আর শেল নিক্ষেপ করে বীভৎস তা-বলীলা চালিয়েছে। তখন চারদিক ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝে মধ্যেই কানে আসছিল আর্মিদের ওয়াকিটকির বুক কাঁপানো শব্দ। ওদের ভারী কণ্ঠ। সেই সাথে একটার পর একটা ট্যাংক আসছিল দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলা) দিক থেকে, চলে যাচ্ছিল পুলিশ হাসপাতালের দিকে ঘড় ঘড় শব্দ তুলে।
কামাল জানান, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুকুর ছিল দুটো। দুটো পুকুর পাড়েই পড়েছিল অসংখ্য লাশ। মূলত সেদিন পুলিশ ব্যারাকে আর্মিরা ঢুকতে চেয়েছিল পজিশন নিতে। তার আগে পুলিশদের আর্মসলেস করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পুলিশরা তাদের নির্দেশের প্রতি সাড়া না দিয়ে, তাদের প্রতি কোনোরকম আনুগত্য প্রদর্শন না করে রিভোল্ট করে এবং ব্যারাকে মিলিটারির প্রবেশ প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এবং তাদের হাতে যা কিছু সামান্য অস্ত্র ছিল তাই দিয়ে পাক আর্মিদের ওপর আঘাত হানে। কিন্তু ভারী অস্ত্রশস্ত্র এবং সাজোয়া বহরে সজ্জিত আর্মিরা পুলিশ লাইনে ম্যাসিভ অ্যাটার্ক করে। ট্যাংকের আঘাতে ব্যারাকের ভবন ধসিয়ে দিতে থাকে একে একে। ফলে মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের প্রতিরক্ষাব্যুহ ভেঙে পড়ে। পুলিশ লাইনে সেই রাতে একজন পুলিশও বাঁচতে পারে নি। পাক আর্মির দানবীয় আক্রমণে পুরো পুলিশ লাইনে এক ভয়াবহ ভুতুড়ে পরিবেশ নেমে এসেছিল সেদিন।
পুলিশ লাইনে ছিল ওয়ারলেস টাওয়ার। আন্তঃযোগাযোগের নানা সুবিধা। সেই কারণে সারাদেশের সাথে ছিল সুষ্ঠু নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা। এ ছাড়া ব্যারাক বলে ক্যাম্প তৈরির জন্যও ছিল সুবিধাজনক। অথচ সেখানে প্রবেশ করতে গিয়ে পুলিশের কাছ থেকে এভাবে তীব্র বাধা আসবে তা ছিল মিলিটারিদের কাছে অকল্পনীয়। তাই সমূলে সেদিন পুলিশ লাইনকে তছনছ করে দিতে পাক আর্মি সামান্যতম কার্পণ্য করে নি। ভুল করে নি কোনোরকম ঝুঁকি নিতে।
পুলিশ লাইনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দেখে কামালসহ তারা বেশ কিছু বন্ধু সংঘবদ্ধ হয়। এই অন্যায় আর নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু শুধু হাতে কী করে সম্ভব সামরিক জান্তাদের প্রতিহত করা! প্রয়োজন সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজন অস্ত্র। কিন্তু কোথায় পাবে তা? কার কাছে যাবে, কীভাবে যাবে এসব বিষয়ে ওরা ছিল তখন ঘোর অন্ধকারে। কিন্তু হার না মেনে ক্রমাগত অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারে ভারতে ট্রেনিং হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে যাবে, কোন পথ ধরে যাবে, কার কাছে যাবেÑ এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা ছিল না ওদের। এদিকে খবর এসেছে ওদের সহপাঠী আরেক কামাল এবং ওর বাবা পুলিশ দারোগা ভারতে যাওয়ার পথে দাউদকান্দিতে মিলিটারির হাতে ধরা পড়ে এবং তাদের হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে পাড়ার বড় ভাই মাহাবুব, এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছে।
দাউদকান্দি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় চাঁদপুর হয়ে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করা হলো। এদিকে কামালদের প্রতিবেশী রতনদের বাড়ি ছিল চাঁদপুরে। রতনরা তখন চট্টগ্রাম ছেড়ে চাঁদপুরে গিয়ে উঠেছে। তাই প্রথমে রতনদের বাড়ি গেল কামাল। রতনের নানা পাটোয়ারী সাহেব আবার বেশ ডাকসাইটে লোক ছিলেন। প্রভাব-প্রতিপত্তির জোর ছিল তার বেশ। তার নেতৃত্বে ভারতে শরণার্থী পাঠানো হচ্ছিল। এদের সব দেখভাল পাটোয়ারী নানাই করছিলেন। কামাল মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায় শুনে তাকে শরণার্থীদের সাথে ভারতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিলেন তিনি।
প্রথমে ভাঙাচোরা এক গাড়ি করে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লায় আসে ওরা। সেখান থেকে সারারাত পায়ে হেঁটে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাড়িয়ে, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সকালের দিকে ভারত সীমান্তের কাছে এসে পৌঁছে। তখন সারারাত বিকট শব্দে মাথার ওপর দিয়ে একটু পরপর শেল উড়ে যাচ্ছিল। সারাপথ কাদায় কাদাময়। পা দেবে যাচ্ছে। পা পিছলে যাচ্ছে একটু হাঁটতেই। এভাবে চৌদ্দগ্রামের এক জায়গা দিয়ে ভারতের এক গ্রামে প্রবেশ করল ওরা। সেই গ্রামের নাম বক্সনগর। এক পীরের আস্তানা ছিল সেই গ্রামে। আস্তানা খুলে দেওয়া হয়েছে শরণার্থীদের জন্য। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। গ্রামটি গোমতি নদীর পাড় ঘেঁষে। আস্তানার ঘরগুলো ডাকবাংলোর মতো ছাউনি দেওয়া। মেঝেতে খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাতে শোয়ার জন্য। দু-তিন দিন পরপর আগরতলা থেকে সেখানে কর্মকর্তারা আসেন মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুট করার জন্য। আর্মি, ইপিআর এবং রাজনীতিবিদদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই রিক্রুট দল। কামালদের মতো যারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী ওদের রিক্রুট টিম নিয়ে যায় বক্সনগর ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেটি ছিল আসলে ভারতীয় একটি স্কুল। স্কুল ভবনেই ক্যাম্প। এ প্রসঙ্গে কামাল জানান, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ৩৫-৪০ জন তরুণ-যুবক ঠাঁই পেয়েছিলাম সেই ক্যাম্পে। প্রথম দু-তিন দিন সেখানে কোনো খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। খুবই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছিল তখন। প্রায় ২৫ দিন আমরা ছিলাম সেখানে। তখন একদিন ক্যাম্প ভিজিটে আসেন কর্নেল শওকত আলী। সময়টা এপ্রিলের শেষ দিকে কিংবা মে মাসের প্রথম।
সেখান থেকে পরে কামালদের নিয়ে যাওয়া হয় মেলাগড় ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে শুরু হয়ে গেল গেরিলা প্রশিক্ষণ পর্ব। উঁচু টিলা আর শালবনে ঘেরা গহীন জঙ্গল চারদিকে। জলাশয়গুলো টিলা থেকে ২০-২৫ ফুট নিচুতে। সেখান থেকেই জল সংগ্রহ করতে হতো। জঙ্গল থেকে বাঁশ-বেত এসব কেটে কেটে নিজেরাই ব্যারাকের মতো ঘর তৈরি করেছিল থাকার জন্য।
প্রথম এক মাস প্রশিক্ষণ চললো পুরোদমে। আর্মস ট্রেনিং, এক্সক্লুসিভ ট্রেনিং, আর্মসহীন অবস্থায় শত্রুর কাছ থেকে আর্মস ছিনিয়ে নিয়ে আর্মস সংগ্রহ করার ট্রেনিংসহ নানা কৌশল ও প্রশিক্ষণ। কর্নেল খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, মেজর হুদা, কর্নেল শওকত আলী, হাবিলদার মুনির। যাকে মুনরি ওস্তাদ বলত মুক্তিযোদ্ধারা। এদের মাধ্যমেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
কামাল বলেন, এক্সক্লুসিভ প্রশিক্ষণ হতো শালবনে। ব্রিজের পিলার ভাঙার প্রশিক্ষণের সময় মোটা মোটা শাল গাছকে পিলারের ডামি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পিলারের ডায়ামিটার নির্ধারণ করার জন্য মডেল করা হতো শাল গাছকে। গেরিলাযুদ্ধ মানেই আইকিউর পরীক্ষা। নিজের জীবন রক্ষা করে কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়, তাই ছিল গেরিলা প্রশিক্ষণের মূলমন্ত্র।
প্রশিক্ষণ শেষে সম্ভবত আগস্টের শেষ দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কামাল এবং তাদের গেরিলা বাহিনী। তার আগে চূড়ান্ত ব্রিফ দিয়ে মেজর হায়দার এবং কর্নেল শওকত আলী পাসিং-আউট করেন ওদের। মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, পপসংগীত শিল্পী আজম খান, চারুশিল্পী শাহাবুদ্দিনÑ আমরা সবাই একই ক্যাম্পে একই সাথে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। অবশ্যি ওদের প্লাটুন ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
স্মৃতি হাতড়ে কামাল বলেন, যে রাতে আমাদের পাসিং আউট হয় সেই রাতে সেই জঙ্গলে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল না হাতের কাছে। তাতে কী! হাঁড়ি-পাতিল, চামচ-প্লেট, গ্রেনেডের কৌটা এসব ছিল বাদ্যযন্ত্রের বিকল্প হিসেবে। এতে সুর মূর্ছনায় কোনো কমতি ছিল না। সেই অনুষ্ঠানে আজম খান দেশপ্রেমের ওপর বেশ কিছু গান করেছিলেন। যা আমাদের ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল দেশের প্রতি। মাতৃভূমির প্রতি।
আজকের খ্যাতিমান শিল্পী শাহাবুদ্দিনের সেদিন আঁকার কোনো সরঞ্জাম ছিল না। লঙ্গরখানায় রান্নার জন্য যে কয়লা আসতো তাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্কেচ এঁকেছিলেন সেদিন। স্কেচগুলো ছিল এক কথায় দারুণ মর্মস্পর্শী। যা আমাদের মনে প্রচ- রকম সাড়া জাগিয়েছিল সেদিন।
বাংলাদেশ সীমান্তে যখন পৌঁছেছে ওরা, তখন নিকষ কালো রাত। বৃষ্টি হচ্ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি। সেখান থেকে চান্দিনা হয়ে চাঁদপুরের দিকে অগ্রসর হয় তারা। ১২৭ জনের দল ওদের। কমান্ডার ছিলেন মোহাম্মদ আলী, ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন মীর আকতার আহমেদ। এ প্রসঙ্গে কামাল জানান, ভারত সীমান্ত থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা যার যার কাঁধে বহন করে অস্ত্র আনে। বিপুল অস্ত্রের সম্ভার। কোন নৌকায় এসব অস্ত্র বোঝাই করা হবে এবং কোন মাঝিরা যাবে সেই ফরিদপুর পর্যন্ত তা আগে থেকেই বিশ্বস্ত সোর্স পাঠিয়ে ঠিক করে রেখেছিল ভারতীয়-ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ। তারপরও কামালরা স্থানীয় বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমেও নিশ্চিত হয় তাদের জন্য নির্ধারিত নৌকা সম্পর্কে। সেসব নৌকার মাঝিদের সম্পর্কে। এ প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই জোরাল এবং গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাসিং আউটের সময় আমাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল আর্মস, এক্সক্লুসিভ কোনোভাবেই যেন হাতছাড়া না হয়।
পথে পাক আর্মির ট্র্যাপে পড়ে গিয়েছিল ওরা। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়ে যায় তখন। একসময় তারা গিয়ে পৌঁছে চাঁদপুরে। যেতে হবে ফরিদপুরের জাজিরা অঞ্চলে। নদীপথে, মূলত ফরিদপুর, শরীয়তপুর অঞ্চল ছিল ওদের জন্য নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্র। সুতরাং, গন্তব্যে পৌঁছার জন্য বড় বড় ৩টি নৌকা ভাড়া করে তারা চাঁদপুর ঘাট থেকে। বিশাল আকৃতির নৌকা ছিল এক একটি। প্রতিটি নৌকার পাটাতনের নিচ বোঝাই করা হয় নানা রকম আর্মস দিয়ে। এলএমজি, এসএলআর, স্টেনগান, থ্রিনট থ্রি রাইফেল, এনটি পারসনাল মাইন, এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন, গ্রেনেড, ডেটোনেটর প্রভৃতি। কামাল বলেন, আমাদের কাছে তখন জীবনের চেয়ে এসব আর্মসের মূল্য ছিল অনেক বেশি। আমরা ১২৭ গেরিলা। নৌকায় এত মানুষ দেখলে আর্মিদের সন্দেহ হতে পারত, তাই আমরা বেশির ভাগই ছইয়ের ভেতরে পাটাতনের নিচে, পাটের বড় বড় গাঁটের আড়ালে লুকিয়ে থাকতাম। শুধু পালাক্রমে কয়েকজন করে মাঝির বেশে দাঁড় বাইতাম। খালি গায়ে লুঙ্গি পরে, মাথায় গামছা বেঁধে দাঁড় বাইতাম। মূলত দিনেই বেশি দাঁড় বাইতাম আমরা। কারণ দিনে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল খুব বেশি। রাত ছিল সে তুলনায় বেশ নিরাপদ। ভরা বর্ষা। প্রমত্তা পদ্মা। ঢেউ ফুলে ফেঁপে ২০ ফুট ওপরে নৌকা তুলছে আবার আছড়ে নিচে ফেলছে। বিশেষ করে চাঁদপুর তিন নদীর মোহনায় প্রকৃতি ছিল অসম্ভব বৈরী। নদীর ছিল রুদ্ররূপ। মাঝে মাঝে গানশিপের ছুটে চলা। সার্চলাইট ফেলে আর্মিদের তল্লাশি। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর ছিল সেই রাত।
বোঝাই অস্ত্র নিয়ে যখন পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে ওরা তখন উত্তাল পদ্মার আতঙ্কের চেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল ওদের কখন পাক আর্মিদের নজরে পড়ে যায়! কারণ গানশিপ নিয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে মিলিটারি চলে যাচ্ছে ওদের পাশ দিয়ে। নদীর দুপাড়ে সতর্ক পাহারা মিলিটারি এবং রাজাকারদের। তারা কেউ পেছন পেছন আসছে কিনা। কিংবা নদী পাড়ে নৌকা ভিড়ানোর জন্য ডাক পড়ে কিনাÑ সেই আতঙ্ক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ওদের পুরো পথজুড়ে। তার ওপর ছিল যে কোনো সময় ঝড়ের তা-ব শুরুর আশঙ্কা। বিশেষ করে গানশিপগুলো যখন ওদের নৌকার পাশ দিয়ে চলে যেত তখন সেই আতঙ্কের রূপ ছিল ভয়াবহ। কারণ গানশিপ থেকে আর্মিরা হঠাৎ হঠাৎ লঞ্চ, নৌকা ডেকে থামাচ্ছে। চেক করছে তন্ন তন্ন করে। এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, তারপরও এক ধরনের দৃঢ়তা এবং মনোবল নিয়েই আমরা পথ চলেছি। কারণ আঘাত এলে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি এবং মানসিকতা সবসময়ই ছিল আমাদের মনে। কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ওদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করব তার সামান্যতম আভাস আমাদের চিন্তায়, আমাদের ভাবনায় ঠাঁই পায়নি সেদিন।
এমনই অবস্থায় দাঁড় টেনে নৌকা বেয়ে বিশাল পদ্মা পাড়ি দেওয়ার মানসিক শক্তি সেদিন কোত্থেকে জড়ো হয়েছিল তা আজও ভাবনা জাগায় কামালের মনে। মনে সেদিন অপার শক্তি সঞ্চিত না হলে ভয়াল প্রকৃতির সেই প্রতিকূলতা, বৈরিতাকে পরাজিত করে এগিয়ে চলা সম্ভব হতো না। তখন পদ্মা ছিল প্রচ- উত্তাল। তবু এক মুহূর্তের জন্য নৌকা কোথাও ভিড়ে নি, থামে নি। এভাবে সারারাত, সারাদিন, আবার রাতভর নৌকা বেয়ে মাঝরাতের দিকে জাজিরা পৌঁছে কামালরা।
ভয়ঙ্কর এই অভিযানে মাঝিরা ছিল অসম্ভব রকম সহযোগিতাপ্রবণ। তাদের কাজে মাঝিদের সহযোগিতা-সহমর্মিতা ছিল অবাক করার মতো। এত প্রতিকূল পথেও সবরকম সহায়তা সেদিন পেয়েছিল ওরা মাঝিদের কাছ থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে এমনই সহযোগিতা করতে পেরে তারা সেদিন নিজেদের ধন্য মনে করেছিল। এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, তারা ইচ্ছে করলে সেদিন আমাদের ভুল পথে নিয়ে যেতে পারত। পাক আর্মিদের হাতে তুলে দিতে পারত। কিন্তু আমাদের প্রতি তারা আত্মিকভাবেই সহমর্মী ছিল। এক ধরনের দায়বদ্ধতা ছিল আমাদের প্রতি, দেশের প্রতি।
উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে সুদূর ফরিদপুরে গন্তব্য। অথচ নৌকায় ছিল না পর্যাপ্ত খাবার। মুড়ি-গুড়-চিড়া সামান্য যা ছিল তা-ও দিয়ে দেওয়া হয়েছিল মাঝিদের। কারণ ওরা ছিল ক্লান্ত-অবসন্ন। তার ওপর ওদের পেটে কিছু না পড়লে নৌকা চালিয়ে নেওয়াই দুরূহ হয়ে পড়ত সেদিন। তাই সামান্য যা ছিল তা মাঝিদের দিয়ে আড়াইদিন। রাতে নদীপথে শুধু জল খেয়ে ছিল কামালরা। ভোলার সিরাজ ভাই হাল ধরে রাখতে পারতেন খুব শক্ত করে। জোয়ান মদ্দ শরীর। কালোমতো দেখতে। মাঝির বেশে ভীষণ মানাত সিরাজ ভাইকে। এভাবে মুক্তিযোদ্ধারা মাঝি সেজে, আসল মাঝিদের বিশ্রাম দিত পালাক্রমে।
ভীষণ উত্তাল পদ্মার ¯্রােত ধরে তখন অসংখ্য মানুষের লাশ বয়ে যাচ্ছিল। তাদের হাত-পা আর চোখ ছিল বাঁধা। পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময় পাকিস্তানি গানশিপের নজর ফাঁকি দেওয়ার জন্য নৌকার সামনে-পিছনে ছিল বড় বড় সব পাটের গাঁট।
জাজিরা এসে কামালদের গেরিলা দলটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। ইদ্রিস মাস্টারের নেতৃত্বে এক গ্রুপ চলে যায় শরীয়তপুরের পালং থানার দিকে। আরেক গ্রুপ চলে আসে মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মাদারীপুরের দিকে। মাদারীপুর, ভাইগ্যার বিলে ক্যাম্প ফেলে ওরা। যাদের বাড়ি ক্যাম্প করা হয় ওরা ছিল সেই এলাকার সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার।
ভাইগ্যার বিল থেকে তাদের প্রথম মিশন শুরু হয় আমগ্রাম ব্রিজ এবং সমাদ্দর ব্রিজ অপারেশনের মধ্য দিয়ে। পাক আর্মিদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করার জন্য এই ব্রিজ দুটো ধ্বংস করা হয় প্রথমেই। ফলে ফরিদপুর-মাদারীপুরের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সমাদ্দর ব্রিজ যখন ধ্বংস করতে প্রস্তুতি নেয় কামালদের বাহিনী, তখন ওদের দেখে পাশের বাড়ি থেকে একজন হ্যারিকেন নিয়ে কেডাও, কেডাও করে এগিয়ে আসতে থাকে। কামালরা তখন মাটিতে গর্ত খুঁড়ে এক্সক্লুসিভ বসাতে ছিল ব্যস্ত। তখন অনাহূত এই আগন্তুককে রাজাকার ভেবে তাকে গুলি করে ওরা। পরে জানা গেল সে আসলে স্বাধীনতার পক্ষের একজন। তবে গায়ে গুলি লাগায় একটা সুবিধে হয়েছিল, লোকটির বাড়ি এবং আশপাশের ঘরবাড়ি আর্মিরা পুড়িয়ে দেয় নি। কোনোরকম নির্যাতন চালায় নি। সাধারণত কোনো এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালালে পাক আর্মিরা সেই এলাকার সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত। সাধারণ মানুষকে হয়রানি করত নানাভাবে। হত্যা করত নির্বিচারে!
পরের মিশন ছিল ওদের কালকিনি থানা। কিন্তু শেষ অবধি সেই অপারেশন সফল হয়নি। যে রিপোর্টের ভিত্তিতে কালকিনি থানা আক্রমণ করা হয়েছিল তা ছিল বিভ্রান্তিমূলক। কারণ গুপ্তচরের তথ্য ছিল থানার ঘাঁটিটি দুর্বল। তেমন অস্ত্রের মজুদ সেখানে নেই। আঘাত হানলে পাকবাহিনী পালানোর পথ পাবে না। অথচ আঘাত শুরু হতেই পাল্টা আঘাত এলো। এবং ভারী ভারী সব অস্ত্র দিয়ে আঘাত হানল পাকবাহিনী। এ অবস্থায় কামালদের দল ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে পেছন ফিরতে বাধ্য হয়। ভাগ্যিস সেই হামলায় তাদের কোনো যোদ্ধা নিহত হয়নি কিংবা কোনো আর্মস হারাতে হয়নি। স্মৃতি হাতড়ে এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, যাকে বিশ্বাস করে আমাদের গুপ্তচর করা হয়েছিল সে ছিল আসলে একজন রাজাকার। তাই আমাদের বিভ্রান্ত করাই ছিল ওর মূল উদ্দেশ্য।
এরপর কামালদের গেরিলা দলটি চলে যায় ভাটিয়াপাড়া। আলফাডাঙ্গা থানায় ছিল ভাটিয়াপাড়া ওয়ারলেস কানেকটিং টাওয়ার। ঢাকা-যশোর ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে সকল যোগাযোগ রক্ষা হতো ভাটিয়াপাড়া কানেকটিং টাওয়ারের মাধ্যমে। এই টাওয়ার ধ্বংস করতে হলে সুইচরুমে যারা চাকরি করে তাদের সহযোগিতা ভীষণভাবে প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সুইচরুমের লোকজন মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে সহযোগিতা করবে কিনা এবং তারা কোন চিন্তাধারার লোকজন তা জানার জন্য গ্রামবাসীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে নিশ্চিত হয় সুইচরুমের লোকদের সমর্থন পাবে। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। সুইচম্যান, ওয়ারলেস সুইচ অফ করে চাবি নিয়ে চলে আসবে। যাতে পরের পালায় যার ডিউটি সে যেন আর সুইচ অন করতে না পারে। সুইচ অফ থাকলে আর্মিরা ঢাকা বা যশোর ক্যান্টনমেন্টে বার্তা পাঠাতে পারবে না সাহায্য চেয়ে। সুইচ অফ করে চলে আসার সংকেত পাওয়া মাত্র ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পে আক্রমণ করা হয় তিন দিক থেকে। অন্যদিকে নদী। এদিকে টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পাকবাহিনী সাহায্য চেয়ে কোনো বার্তা পাঠাতে পারছে না কোথাও। শেষে নড়াইল হয়ে তিন দিন পর পাক আর্মিদের দূত যশোর ক্যান্টনমেন্টে খবর পৌঁছায়। তখন পাকবাহিনী আকাশ থেকে আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় ৭২ ঘণ্টা যুদ্ধ চালিয়ে শেষে কামালদের বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে কামালরা কয়েকজন সহযোদ্ধাকে হারায়। পাকবাহিনীরও কিছু সৈন্য এবং রাজাকার মারা যায়।
এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, ভাটিয়াপাড়ায় পাকিস্তানিদের ঘাঁটি এত শক্তিশালী ছিল যে ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও ভাটিয়াপাড়ার আর্মিরা আত্মসমর্পণ করে ১৯ ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনী ঢাকা থেকে পাকবাহিনীর কয়েকজন সিনিয়র অফিসারকে ভাটিয়াপাড়া নিয়ে গেলে সেখানে তাদের কথায় নিশ্চিত হয়ে তবে ভাটিয়াপাড়ার আর্মিরা আত্মসমর্পণ করে।
ভাটিয়াপাড়া টাওয়ার ধ্বংসের পরপরই ঘোড়াখালি রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করে কামালদের গেরিলা দল। গোপালগঞ্জ-যশোরের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্যই এই আঘাত হানা হয়। এরপর চলে আসে ওরা ফরিদপুরে। লক্ষ্য বাকু-া ব্রিজ। তখন ছিল রোজার মাস। সময়টা ছিল ভোররাত। খবর এলো বাকু-া বাজার ক্যাম্পে ১৫ রাজাকার সেহেরি খাচ্ছিল। তখন অতর্কিতে চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলা হয় এবং একটিও গুলি খরচ না করে তাদের আর্মসলেস করা হয়। পরে ব্রিজের নিচে এক্সক্লুসিভ পাতার জন্য ওদের দিয়ে সেখানে বালুর বস্তা বহন করাসহ আনুষঙ্গিক সব ধরনের প্রস্তুতি ওদের হাতেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।
বাকু-া ব্রিজ ধ্বংসের পর কামালদের দল আবার মাদারীপুর ফিরে আসে। সে সময় প্রচুর রাজাকার নিজেরাই খবর পাঠাতে থাকে ওরা স্যারেন্ডার করবে বলে। আশ্বাস পেলে ওরা স্যারেন্ডার করত এবং তাদের আর্মস দিয়ে দিত মুক্তিযোদ্ধাদের। অনেকে পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিশে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছে।
যুদ্ধমাঠের স্মৃতি হাতড়ে কামাল বলেন, ডিসেম্বরের ৮ কিংবা ৯ তারিখে রাতে খবর পাই বিভিন্ন দিক থেকে পাক আর্মিরা পালাচ্ছে। সম্ভবত শাজাহান নামে পাক আর্মিদের একজন ড্রাইভার ছিল। অবশ্যি সে ছিল বাঙালি। সারাদিন পাক আর্মিদের সাথে থাকত। রাতে থাকত আমাদের সাথে। ওর কাছ থেকেই সারাদিনের নানা খবর পেতাম পাকবাহিনীর কার্যক্রমের। তাদের গতিবিধির। সে বলল, আজ রাতে সম্ভবত পাক আর্মিরা এখান থেকে পালাতে পারে। এখানকার সমাদ্দর ব্রিজ শুরুতেই আমরা ধ্বংস করে দিয়েছিলাম বলে ভাঙা ব্রিজের বিভিন্ন জায়গায় বালির বস্তা ফেলে তার ওপর কাঠ বিছিয়ে গড়ি চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা করে নিয়েছিল পাকবাহিনীরা। ওদের পালানোর খবর পেয়ে তক্তার নিচে এন্টিপারসনাল মাইন এবং এন্টি ট্যাংক মাইন পেতে পজিশন নিয়ে রইলাম অ্যামবুশ করার জন্য।
ভোরবেলায় দেখি পাক আর্মিরা গাড়ির বহর নিয়ে রওনা দিয়েছে। বহরের প্রথম গাড়িটা ব্রিজের ওপর উঠতেই প্রচ- শব্দে বিস্ফোরিত হলো মাইন। গাড়িটি গেল উড়ে। জানমালের নিরাপত্তার জন্য এবং যুদ্ধের কৌশল হিসেবে সামনের গাড়িটি ছিল ব্ল্যাংক। কোনো সৈন্য ছিল না তাতে। ব্ল্যাংক গাড়িটি বিস্ফোরিত হতেই পেছনের গাড়িবহর থেকে আর্মিরা লাফিয়ে পড়ে পাশের বাঙ্কারে আশ্রয় নিল। এবং বাঙ্কার থেকে পজিশন নিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে লাগল। সেখানে টানা ৭২ ঘণ্টা মুখোমুখি যুদ্ধ হয় পাকবাহিনীর সাথে। একসময় ওরা সাদা ফ্ল্যাগ দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করার সংকেত দিলে কামালদের দল আক্রমণের রাশ টেনে ধরে। সে সময় কাপুরুষের মতো পাকবাহিনীরা ফের হামলা চালায়। তখন বাচ্চু নামে তাদের এক সহযোদ্ধা মারা যায় এবং আখতার নামে আরেক সহযোদ্ধার পেটে গুলিবিদ্ধ হয়। এবং মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয় তার। তারপরও সে বেঁচে গেছে এবং আজও বেঁচে আছে। জানালেন কামাল।
সেই যুদ্ধে পাকবাহিনী একসময় পরাস্ত হয় এবং আত্মসমর্পণ করে। যারা আত্মসমর্পণ করে তাদের মধ্যে মেজর খাটাক্ নামে একজন বেলুচ অফিসার ছিল। একজন পাঞ্জাবি মেজর ছিল। ২১ সৈনিক ছিল। আর ছিল ২২ রাজাকার। রাজাকার ২২ জনকে ভাইগ্যার বিলে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়। এবং পাক আর্মিদের ভারতীয় আর্মির হাতে সমর্পণ করা হয়।
রোজার মাসের আরেকটি ঘটনা। খবর এলো মাদারীপুর আমগ্রাম ব্রিজ ক্রস করবে পাক আর্মিরা। যদিও এই ব্রিজটি একবার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বিকল্প ব্যবস্থায় তা আবার চলাচল উপযোগী করেছে পাকবাহিনীরা। আর্মিদের গাড়িবহরে আঘাত হানার জন্য ব্রিজের নিচে এন্টি ট্যাংক মাইন পেতে রাখা হয়। এবং সেখানে পাহারায় রাখা হয় শাজাহান কবীর নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে। কথা ছিল দূর থেকে আর্মিদের গাড়িবহর দেখামাত্র কামালদের মূল গেরিলা দলকে সে সংকেত দেখাবে। কিন্তু তার বদলে আর্মি দেখামাত্র সে দেয় দৌড়। তাকে দৌড়তে দেখে পেছন থেকে গুলি করে পাক আর্মি। মারাত্মক রকম জখম হয় সে। তার সাথে একটি বেয়োনেট পেয়েছিল আর্মিরা। তবু তাকে হত্যা করেনি। বরং সেবা শুশ্রƒষা করেছিল ক্যাম্পে নিয়ে। পরে তাকে হাসপাতালেও ভর্তি করিয়েছিল পাক আর্মিরা। সে সময় মেজর খাটাক তাকে বিশেষভাবে সেবা করেছে, খবর নিয়েছে। দেশ স্বাধীন হলে জার্মানিতে তার চিকিৎসা হয়। এবং আজও সে বেঁচে আছে এবং ভালো আছে।
আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে নৌকার মাঝিদের ভূমিকা প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, যুদ্ধে মাঝিদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাঝিরা যদি বিশ্বাসঘাতকতা করত তা হলে যুদ্ধচিত্র আমূল বদলে যেতেও পারত। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান বাহনই ছিল নৌকা। সবসময় ওদের নৌকা বোঝাই থাকত বিভিন্ন রকম হাতিয়ার এবং এক্সক্লুসিভ। কখনও ভূমিতে কোনো আর্মস রাখা হতো না। কারণ যে কোনো সময় বিরূপ পরিস্থিতিতে যাতে হাতিয়ারসহ পালানো যায়, তাই হাতিয়ার সবসময় নৌকাতেই রাখা হতো। সবক্ষেত্রেই বাহন হিসেবে নৌকা ছিল নিরাপদ। কারণ পাক আর্মিরা যথাসম্ভব চেষ্টা করত জলপথ এড়িয়ে চলতে। জলকে ভীষণ ভয় পেত ওরা। অন্যদিকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সড়কপথ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিপদসংকুল। ঝুঁকিপূর্ণ। কামাল বলেন, মাঝিরা যদি আমাদের বিভ্রান্ত করত, আমাদের গোপনীয়তা রক্ষা না করত এবং গ্রামের সাধারণ মানুষরা যদি প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সঠিক পথ, নিরাপদ পথ চিনিয়ে দিয়ে সহযোগিতা না করত তা হলে সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারত।
কামালদের দলে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল, যার বাড়ি মাদারীপুরে। এক্ষেত্রে বিশ্বস্ত নৌকা ঠিক করার জন্য মাদারীপুরের মুক্তিযোদ্ধা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। স্থানীয় বলে অনেক তথ্যই জানা ছিল ওর। প্রয়োজনে স্থানীয় লোকজন কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা নিয়ে, পরামর্শ নিয়ে যাদের ওপর নির্ভর করা যায়, যাদের বিশ্বাস করা যায় এমন নৌকা, মাঝি কিংবা ভ্রমণপথ ঠিক করা হতো।
অনেক সময় দেখা গেছে মিলিটারি পেছন থেকে ধেয়ে আসছে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা যাতে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারে স্থানীয় জনগণ নিজের জীবন উপেক্ষা করে সেটুকু নিশ্চিত করেছে আগে। এমনই সহযোগিতা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তারা গুলির মুখে পড়েছে। পাক আর্মিদের হাতে ধরা পড়ে জীবন পর্যন্ত দিয়েছে। এদের অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন কামাল।
বাকু-া ব্রিজ অপারেশনের সময় প্রবীণ মাঝি চাঁন মিয়া এবং সমাদ্দর ব্রিজ অপারেশনের সময় অন্য একজন মাঝির ভূমিকা, যার নাম এখন আর মনে নেই, কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন কামাল। তিনি বলেন, ওদের সার্বিক মুভমেন্ট ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মতো। অনেক সময় তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। অপারেশনের সফলতায় উল্লসিত হয়েছে।
গ্রামের সাধারণ মানুষের নিরন্তর চেষ্টা ছিল কোন বাড়ি রাজাকারদের, কোন বাড়ি স্বাধীনতার বিপক্ষের লোকের তা চিনিয়ে দিতে। কোনো শত্রুর বাড়ি আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যাতে বিপদে না পড়ে সে জন্য সঠিক তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে সবসময় তারা সচেষ্ট থাকত ভাটিয়াপাড়া অংশ। এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, ভাটিয়াপাড়া অপারেশন শুরু হয় রাত ১টার দিকে। জায়গাটি ছিল ঝোপ-জঙ্গলে ঠাসা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোটা মোটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে আমরা পজিশন নিয়ে আছি। রাতভর চলে সেই অপারেশন। আমাদের সারা গায়ে অসংখ্য জোঁক কামড়ে ধরে আছে। রক্ত খাচ্ছে শুষে শুষে। ভোরের দিকে দেখি কে যেন আমার পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। ফিরে তাকাতেই দেখি এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। বয়েসের ভারে ন্যুব্জ শরীর। হাতে ধামা। ধামায় গুড়-মুড়ি। আরেক হাতে লোটা, তাতে ডাবের পানি। আমি ফিরে তাকাতেই বলে, বাজান দুইডা খাইয়া ল, কালকা সারারাত কিছু খাস নাই।
আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি, আপনি চলে যান, গায়ে গুলি লাগবে। তবু বৃদ্ধ সরে যায় নি। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাসহ আমাকে খাইয়ে তবে তিনি ফিরে গেলেন। এটা দেশের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
কামাল বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে পাসিং আউটের সময় আমাদের কঠিন এবং দৃঢ়ভাবে শপথ করানো হয়েছিল যেন যুদ্ধের সময় রাজাকারদের বাড়ি, কোনো দেশদ্রোহী বা শত্রুর বাড়ি আক্রমণ করলে কোনোভাবেই যেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু, নাবালক ছেলেমেয়ে এবং নারীদের ওপর কোনোরকম অত্যাচার না হয়। সোনা, রুপা, অর্থ, সম্পত্তির ওপর যেন সামান্য লোভ কাজ না করে। কোনো লোলুপ দৃষ্টি যেন সেদিকে না যায়।

অনুলিখন : আনিস রহমান

Category:

ঘাস কবুতর ও শেখ মুজিব

41ইমরুল ইউসুফ : সিঁড়ি বেয়ে রক্ত গড়াতে গড়াতে সবুজ ঘাসের গোড়ায় জমা হতে থাকে। কিন্তু এক জায়গায় বেশিক্ষণ থেমে থাকে না। রক্ত গড়াতে থাকে। ঘাসের গোড়ায় গোড়ায় জড়িয়ে যেতে থাকে রক্ত। ঘাসগুলো তখন কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। দম বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। গড়িয়ে আসা জিনিসটি কেমন জানি ভারী ভারী। আঠা আঠা, চটচটে। রংটাও কেমন জানি। খুবই অচেনা। আগে কখনও এমন কিছু গড়িয়ে ঘাসের গোড়ায় যায় নি। ঘাসের ওপরে পড়েনি। ঘাস চেনে পানি। সেই পানি তরল, নরম, রংহীন। কিন্তু কী যে শক্তি সেই পানিতে। পানির ছোঁয়া পেয়েই ঘাসগুলো তরতাজা হয়ে ওঠে। আনন্দে মাথা উঁচিয়ে উঁচিয়ে আকাশ দেখতে থাকে। বাতাসের ছোঁয়া পেতে থাকে। দুলতে থাকে দোলকের মতো।
একটি কবুতর পেখম মেলে দুলতে দুলতে নিচে নেমে আসে। দেখে লাল রঙের কিছু একটা গড়িয়ে আসছে তার দিকে। দূর থেকে অনেকটা সাপের মতো দেখা যাচ্ছে। ওটা কি সাপ? না! তারপরও কবুতরটি এক পা দু পা করে পিছন দিকে পেছাতে থাকে। আর রক্তের ধারা এগিয়ে যেতে থাকে তার দিকে। এখন মুখোমুখি রক্তের ধারা ও কবুতর। কবুতরটি বাকবাকুম করে ডাকতে থাকে। উড়ে উড়ে সেখানে ঘুরতে থাকে। দেখতে থাকে রক্তের বয়ে যাওয়া। কোথায় যাচ্ছে রক্ত? এই মুহূর্তে কী করা উচিত কবুতরটি ভেবে পায় না। শুধু উড়তে থাকে।
উড়তে উড়তে বসে একটি গাছের ডালে। ওটাকে গাছের ডাল বলা যাবে না। বলা ভালো পাতা। কবুতরটি একটি পেঁপে গাছে বসেছে। গাছটি তার অতি প্রিয় একজন মানুষের লাগানো। মানুষটি অসম্ভব পেঁপে ভক্ত। সকালের নাস্তায় পাতলা রুটির সঙ্গে পাঁচফোড়ন দেওয়া পেঁপের সবজি। আর কিছুই লাগে না তার। আর পাকা পেঁপে তার কাছে অমৃত। এজন্য বাড়ির দেয়ালের পাশ দিয়ে তিনি অনেক পেঁপে গাছ লাগিয়েছেন। শুধু কি পেঁপে গাছ। কত গাছ যে তিনি লাগিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। ফলের গাছ। ফুলের গাছ। ঔষধি গাছ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবুতরটি বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ পছন্দ করে। শুধু কি ওই কবুতরটি? না, এই বাড়ির প্রত্যেকটি কবুতরের কাছে তিনি খুব প্রিয় একজন মানুষ। প্রত্যেকটি গাছের কাছেও তিনি অতি প্রিয়।
কবুতর দলের প্রিয় মানুষটি এখনই আসবেন। হাত উঁচিয়ে ছিটিয়ে দেবেন খাবার। তিনি মোটা ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়ে দেখতে থাকবেন কবুতরদের খাবার দৃশ্য। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে একে অপরের গায়ে মুখ ঘষে নেওয়ার দৃশ্য। একজোড়া কপোতের ডিগবাজি খাওয়ার প্রতিযোগিতা। কিংবা কান পেতে শুনবেন বাকবাকুম বাকবাকুম ডাক। কবুতরগুলো ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে মানুষটির জন্য। একে অপরের দিকে তাকিয়ে ডাকাডাকি করছে। কবুতরের খোপের মধ্য দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। কই, তিনি তো আসছেন না। একটি কবুতর বলল, আসবেন। এখনই আসবেন। কেবল তো ভোর হলো। ওনার হয়তো এখনও ঘুমই ভাঙেনি। ঘুম ভাঙলেই তিনি আমাদের কাছে আসবেন। খাবার দেবেন।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও কেউ তাদের খাবার দিতে আসে না। বাড়তে থাকে কবুতরদের অস্থিরতা। ক্ষুধায় পেট চো চো করতে থাকে। আর সহ্য করতে না পেরে প্রায় সব কবুতর ওড়াউড়ি শুরু করে। খাবার খুঁজতে থাকে। সেই সাথে খুঁজতে থাকে প্রিয় মানুষটিকে। কিন্তু না, কোথাও নেই প্রিয় সেই মানুষটি। তিনতলা বাড়ির আশপাশে একজনও চেনা মানুষ নেই। সবাই তাদের কাছে অচেনা। সবার পরনে কালো পোশাক। হাতে অস্ত্র। মানুষগুলো এখানে দাঁড়িয়ে কী করে? একটি কবুতর বলে, আরে চল চল আর দেখতে হবে না। দেখছিস না ওদের হতে অস্ত্র। ওই অস্ত্রের একটি ফায়ারই যথেষ্ট। আমাদের আর বাঁচতে হবে না। এই কথা বলেই কবুতর দল বাড়ির পিছন দিকটায় চলে যায়।
বাড়ির ঠিক পিছন দিকটায় একটি রান্নাঘর। কবুতরের ঘরটি ঠিক ওই রান্নাঘরের পাশেই। কবুতরাগুলো ভাবেÑ ওই রান্নাঘরে যদি ঢোকা যেত তা হলে কিছু না কিছু খাবার পাওয়া যেত। এই ভেবে কবুতরগুলো উড়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে আসে। দেখে দরজা বন্ধ। কবুতরগুলো হতাশ হয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। সামনে একটু এগিয়ে ডান হাতে গাড়ি রাখার ঘর। এর ঠিক বাম হাতে চিকন রাস্তা। ওই রাস্তা ধরে সোজা সামনের দিকে পা বাড়ালে বাইরে বের হওয়ার পথ। রাস্তার দুপাশে সবুজ লকলকে ঘাস। বিভিন্ন ফুলের গাছ। কবুতরগুলো ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে থাকে। দু-একটি দানা খুঁজে পেয়ে তাদের সেকি আনন্দ!
এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। একটি কবুতর এমনভাবে বিকট শব্দ করে ওঠে যে বাকি সবাই ভয় পেয়ে যায়। ওড়াউড়ি শুরু করে। বলে, এখানেও রক্ত! বাড়ির চারদিকে এত রক্ত কেন? লাল লাল খাবলা খাবলা রক্ত। বেশ কিছু সময় আগে যে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল সব। সেই রক্তের ধারা থেমে গেছে এখন। একটি কবুতর বলে, এটি আমি সেই সকালে বাড়ির সামনের দিকে দেখেছি। এখানেও দেখছি সেই রক্ত। কিন্তু জমাট বাঁধা। এমন অবস্থা দেখে কবুতরগুলো ভয়ে উড়ে আরেটু সামনের দিকে যায়। দেখে আরও কিছু অচেনা মানুষ। তারা একজন দুজন তিনজন… অনেক মৃত মানুষকে বাড়ির ভিতর থেকে টেনে টেনে বের করছে। সবার শরীরে রক্ত। কাপড় রক্তে ভিজে জবজব করছে। চেহারা বিকৃত, মলিন। তবে ভীষণ শান্ত। এর মধ্যে একজন মানুষকে তাদের খুব চেনা। সেই সকাল থেকে এই মানুষটিকেই তারা খুঁজছে। কিন্তু মানুষটা যে শুয়ে আছেন। এই মানুষটিকে তারা কখনই শুয়ে থাকতে দেখে নি। তার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে রক্তে। পরনের সাদা-কালো চেকের লুঙ্গি। গায়ের সাদা গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি। কালো রঙের সিগারেটের পাইপ, দিয়াশলাই। সবই রক্তে ভেজা।
এমন দৃশ্য দেখে কবুতরগুলোর চোখও ভিজে ওঠে। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে বঙ্গবন্ধুর দিকে। কিন্তু অচেনা সেই মানুষগুলো তাদের সামনের দিকে যেতে দেয় না। হাত পা ছুড়ে, বন্দুকের নল উঁচিয়ে হই হই করে তাড়িয়ে দেয়। তারা বেশি দূরে যায় না। গাছের ডালে বসে দেখতে থাকে। শান্ত সৌম্য ওই মানুষটির বাম হাতটা বুকের ওপর ভাঁজ করা। ১৮টি গুলির আঘাতে তার বুক, পেট, পা, হাত ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। একটি গুলি লেগেছে তার মাথার ঠিক পিছনে। ৯টি গুলি চক্রাকারে বিদ্ধ হয়েছে বুকের ঠিক নিচে। একটি বুলেট ডান হাতে তর্জনীতে লাগার ফলে আঙুলটি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সাথে ঝুলে আছে। লম্বা চওড়া ওই মানুষটিকে নিয়েই সবাই যেন একটু বেশি ব্যস্ত। সবার চোখে-মুখে ভয়। যেন মৃত এই মানুষটি এখনই উঠে দাঁড়াবে। হুঙ্কার দিয়ে বলবে, এখানে কী চাও?
মৃত ওই মানুটিকে নিয়ে কিসের এত ভয় ওদের? আসলে কী চায় তারা। বোধহয় বঙ্গবন্ধুকে লুকিয়ে রাখতে চায়। এখান থেকে সরিয়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে চায়। তা না হলে বড় একটি বাক্স আনা হলো কেন? ভাবতে থাকে কবুতরগুলো। দেখে ওই বাক্সের মধ্যে তাদের প্রিয় মানুষটিকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সাত-আটজন মানুষ কিছুতেই যেন লাশটি বাক্সে তুলতে পারছে না। লাশটি কেবলই তাদের হাত থেকে সরে সরে যাচ্ছে। একবার মাথার দিকটি ঝুলে যাচ্ছে। আরেকবার ঝুলে যাচ্ছে মাজার দিকটি। আবার কখনও পায়ের দিকটি। একটি দেশের জন্মদাতার লাশ তো একটু ভারীই হবে। অনেক কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে লাশটি ভরে ফেলা হলো ওই বাক্সে। বাক্সের ওপরের অংশ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। তারপর কোণায় কোণায় ঠোকা হলো কয়েকটি পেরেক। কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দে কবুতরগুলো কেঁপে কেঁপে উঠল। যেন তাদের মাথা থেতলে দেওয়া হচ্ছে পাথরের সাথে।
কফিনের সাথে সাথে কবুতরগুলোও যাচ্ছে। একবার ডানে। একবার বামে। খোলা উঠোন পেরিয়ে রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গাড়ি। এর মধ্য থেকে একটি গাড়িতে তোলা হলো তাদের প্রিয় মানুষটিকে। কফিন থেকে তখনও টপটপ করে রক্ত পড়ছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঘাসে ঘাসে। সবুজে সবুজে। সারা বাংলাদেশে।
লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

Category:

কবিতা

40

Category:

আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী

38(b)

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

গত ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা এমপি। আগামী ২২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার।

Category: