Blog Archives

বিশ্বায়ন এবং নারী

এম এম আকাশ:


 

ভূমিকা
একজন নারীর জীবনে বিশ্বায়ন একদিকে যেমন সুযোগের স্বর্ণ দুয়ার খুলে দেয় তেমনি তার মধ্যে তৈরি করে অজানা-অচেনা জগতের ভীতি। শুধু ভীতি নয়, কখনও কখনও তা বাস্তব ক্ষতি ও বেদনায়ও পরিণত হয়। বিশ্বায়ন নারীকে অন্য নারীর জগতের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেয়। গ্রামের গৃহবন্দি নারী মোবাইলের মাধ্যমে বা টেলিভিশনের স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদান্যতায় দেখতে পায় কীভাবে তার মতোই একজন একাকী নারী ঢাকা শহরে পোশাক শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কীভাবে সেই পোশাক শিল্পের পণ্য বহু হাত ঘুরে আমেরিকার হাল ফ্যাশান তরুণীর প্রিয় পোশাকে পরিণত হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে গ্রামের মহিলারা কুটিরে বসে ছেলে-মেয়েদের কাপড় সেলাই করে যে ক্ষিপ্র অঙ্গুলীর অধিকারী হয়েছেন তা আজ বিশ্বায়নের কল্যাণে সর্বাধুনিক পোশাক তৈরির কাজে নিয়োজিত হয়েছে। ‘ক’-এর মা, ‘খ’-এর বোন অথবা ‘গ’-এর বউ এখন আর অন্যের পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছেন না। তার ভুলে যাওয়া নাম এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিচয় নিয়ে বিশেষ একজন শ্রমিকের পরিচয়পত্র নিয়ে জগতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলতে পারছেন আমার নিজস্ব পরিচয় আছে। আমি শুধু একজনের মা বা বোন বা কন্যা বা বধূ নই। তবে বিশ্বায়নের এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা সর্বত্র সমানভাবে বিকশিত হয়নি। যদিও নারীদের মনের আয়নায় এর একটি স্থায়ী ছায়াপাত ঘটে গেছে।
অ-আধুনিক চিরায়ত নারীদের আজন্ম লালিত অভ্যাস বিশ্বায়নের এই হাতছানিতে সবসময় দ্বিধাহীনভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হয় না। ভয় থাকে অনেক কিছুর। বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছাড়ার ভয়। রানা প্লাজার মতো ছাদ ভেঙে অকাল মৃত্যুর ভয়। রাত-বিরাতে ঘরে ফেরার সময় আকস্মিক হামলার ভয়। সবচেয়ে বড় ভয় নিজের সংসার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। নষ্ট মেয়ে অপবাদের ভয়। বিশ্বায়ন নারীকে সমুদ্রযাত্রার আহ্বান জানায়, সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয় ঠিকই; কিন্তু এমন কোনো নিশ্চিত গ্যারান্টি দিতে পারে না যে সমুদ্রপথে ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সে কখনোই ডুবে যাবে না। এ যেন অনেকটা এক নিরুদ্দেশ তীর্থযাত্রার মতো। কূলে ফেরার গ্যারান্টি নেই। পথেই মৃত্যু হতে পারে। তাই বিশ্বায়ন নারীর মনে এক অনিবার্য দোলাচলের সৃষ্টি করছে এবং তাকে নিক্ষেপ করেছে এক অস্থির দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘূর্ণিপাকে। এই ঘূর্ণিপাককে আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে তার ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিক থেকে। আমরা চাই না চাই এর থেকে আমাদের আজ আর কোনো পরিত্রাণ নেই। তাই কীভাবে নারীর কল্যাণে এর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যায় সেটাই আজ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন ও উত্তর একে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে।
বিশ্বায়ন কী?
মানব সমাজের প্রারম্ভে যেসব শিকারি গোত্রকে আমরা দেখতে পাই তাদের চরিত্র ছিল ‘বিচরণশীল’। কোনো এক জায়গায় বেশি দিন তাদের পক্ষে থাকা সম্ভব ছিল না। কারণ শিকার করতে করতে ঐ জায়গার বা ঐ অঞ্চলের পশু-পাখি ফল-মূল ফুরিয়ে যেত এবং গোত্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলেও তাদের পক্ষে ঐ সীমিত জায়গায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে উঠত। অতএব শিকারি সমাজ বিশ্বের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হতো। অনুমান করা যায় যে এ সময় গোত্রে গোত্রে ‘বনের’ মালিকানা নিয়ে ঝগড়া ও লড়াই হতো এবং সম্ভবত পরাজিত গোত্রের সদস্যদের ‘দাসে’ পরিণত করে বৃহত্তর দাস সমাজের সূচনা হয়েছিল।
গোত্রের বিচরণশীলতা বা চারণশীল মানব গোষ্ঠীর (Nomadic Tribes) ঘুরে বেড়ানোকে আমরা ‘বিশ্বায়ন’ বলছি না। কিন্তু দাস সমাজ যখন স্থিতিশীল হয়ে গ্রিসে বা প্রাচ্যের কোথাও কোথাও (মিসরে, মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকায়) সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে উঠল তখন পৃথিবীতে একটি নতুন প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটেÑ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রক্রিয়া। তখন দাস সাম্রাজ্যের অধীনে রাজ্যে-রাজ্যে দাসের বাণিজ্য, বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য, সৈন্যদের আগমন-প্রত্যাগমন শুরু হয়ে গেল। এই আন্তর্জাতিক লেনদেনই হচ্ছে বিশ্বায়নের প্রাথমিক সূত্রপাত।
বিশ্বায়নকে তাই আমরা সংজ্ঞায়ন করতে পারি ‘আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্রমবিবর্তনশীল এক প্রক্রিয়া হিসেবে’। এই লেনদেনের আধেয় (Content) ক্রমশ পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, গুণের দিক থেকে বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর হয়েছে এবং তাদের পরিসরও বিস্তৃত থেকে আরও বিস্তৃততর হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, প্রাচীন সাম্রাজ্যের পত্তনের পর থেকে বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়া ক্রমাগত কম-বেশি প্রসারিত হয়ে চলেছে। কোনো মানবগোষ্ঠী, কোনো অঞ্চল বা কোনো দেশ যদি সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনযাপনে নিয়োজিত হয়, তাহলে তা প্রবাহমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ঠিকই; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মতাগিদেই তাকে আবার আপন খোলস ভেঙে বিশ্বায়নের রথে চড়তে হয় নতুবা বিশ্বায়নের রথ নিষ্ঠুরভাবে তাকে মাড়িয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে যায়।
বিশেষ করে মুদ্রাভিত্তিক (স্বর্ণই হোক বা টাকাই হোক!) অর্থনীতির সূচনার পর থেকে সারাবিশ্বে বিশ্বায়নের প্রবাহমান শক্তি প্রায় অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অপ্রতিরোধ্য লেনদেনের প্রক্রিয়াগুলো হচ্ছে-
ক. পণ্যের লেনদেন
খ. পুঁজির লেনদেন
গ. শ্রমের লেনদেন
ঘ. জ্ঞান ও প্রযুক্তির লেনদেন
ঙ. তথ্যের লেনদেন
চ. সাংস্কৃতিক লেনদেন
ছ. মনের লেনদেন
জ. অন্যান্য নানা ধরনের সম্পর্কের বহুমুখী মাত্রায় ও গভীরতায় নিত্যনতুন লেনদেনের উদ্ভব হচ্ছে প্রতিদিন। যার বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে একবিংশ শতকের সর্বগ্রাসী যোগাযোগ বিপ্লব। আর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মুদ্রা ও অর্থ।
তাই সব মিলিয়ে বিশ্বায়নকে আমরা একটি বহুমুখী-জটিল-বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাচ্ছি এবং এই প্রক্রিয়ার দুটি পরস্পরবিরোধী অনিবার্য দিক হচ্ছেÑ
ক. ক্রমাগত সম্পর্কের বিস্তৃতি, গভীরতা, ঐক্য ও সংহতি। এবং একই সময়ে একই সঙ্গে
খ. ক্রমাগত সম্পর্কের টানাপড়েন সংগ্রাম, বিচ্ছেদ ও যুদ্ধ।
তাই এক কথায় বলা যায়, উত্থান-পতনের এবং শান্তি ও সংঘর্ষের এক দ্বান্দ্বিক গতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বিশ্বায়ন।

বিশ্বায়ন নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক
বিশ্বায়ন সম্পর্কে বর্তমানে তাই দুটো পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। যারা বামপন্থি তাদের অধিকাংশের অভিমত হচ্ছেÑ বর্তমানে যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া চালু আছে তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বভার বিরাজ করছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর হাতে, যার শীর্ষে রয়েছে ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’। আর প্রভাবশালী আমেরিকান তত্ত্ববিদদের মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা হচ্ছে এক উন্নততর গণতান্ত্রিক সভ্যতার বাহন। তাই পূর্ব বা দক্ষিণের পশ্চাদপদ দেশগুলোকে এই সভ্যতাই গ্রহণ করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় সেখানে যেসব দ্বন্দ্বের উদ্ভব হবে, তা আসলে হচ্ছে দুই ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার দ্বন্দ্ব, যার মধ্যে অগ্রণী প্রতিনিধি হচ্ছে পশ্চিম। সেজন্য পশ্চিমা শক্তিবিরোধী সকল ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করেই পশ্চিমকে জিততে হবে এবং সেখানে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই না থাকলেও চলবে। এমনকি নিজেদের উন্নততর সভ্যতা বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠার জন্যই পশ্চিমকে দ্বৈতনীতি অবলম্বন করতে হবে। এই ধারার প্রধান প্রবক্তা স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত গ্রন্থ “The Clash of Civilization and the Remaking of World Order”-এ লিখেছেন-“Hypocrisy, double standards and ‘but nots’ are the price of universalist pretensions. Democracy is promoted, but not if it brings Islamic fundamentalists to power; non proliferation is preached for Iran and Iraq, but not for Israel; free trade is the elixir of economic growth, but not for agriculture, human rights are an issue for china, but not with Saudi Arabia; aggression against oil owning Kuwaits is massively repulsed, but not against non oil owning Bosnians. Double standards in practice are the unavoidable price of universal standards of principle.”
(“ভ-ামী, দ্বিচারিতা এবং ‘কিন্তু না’ হচ্ছে সর্বজনীনতার মুখোশের দাম। গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করা হবে; কিন্তু যদি এতে ইসলামি মৌলবাদীরা ক্ষমতায় আসে তাহলে নয়, আণবিক বোমার বিচ্ছুরণ নিষিদ্ধ করা হবে ইরান এবং ইরাকের জন্য; কিন্তু ইসরায়েলের জন্য নয়, মুক্ত বাণিজ্যকে বলা হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জীবনসুধা; কিন্তু কৃষির জন্য তা নয়, মানবাধিকার অবশ্যই চীনের জন্য একটি সমস্যা বটে; কিন্তু সৌদি আরবের জন্য তা ঠিক নয়, তেলের মালিক কুয়েতকে আক্রমণ করাটা প্রবলভাবে ঘৃণিত হবে; কিন্তু তেলের মালিক নয় এ-রকম রাষ্ট্র বসনিয়া আক্রান্ত হলে অত আপত্তির কোনো কারণ নেই। সুতরাং সর্বজনীন নীতির আদর্শ রক্ষার অনিবার্য মূল্য হচ্ছে বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্রে দ্বিচারিতা করা।”)

এই উদ্ধৃতির পর সহজেই মনে হয় যে বিশ্বায়ন এবং পশ্চিমাদের আধিপত্য সমার্থক। চরম বামপন্থিরা এবং চরম রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থিরা উভয়েই এই নেতিবাচক ‘প্রিজমেই’ বিশ্বায়নকে দেখে থাকেন।
এ ধরনের আগ্রাসী পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং এর সূচনা ইউরোপের ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব থেকে। ১৫০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ইংল্যান্ড তার বিশ্ব সাম্রাজ্যটিকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা সব অঞ্চলই এই সময়কালে ইংল্যান্ডের আধিপত্যে চলে আসে। এই আধিপত্য ছিল পুঁজির আধিপত্য। এই বিশ্বায়ন ছিল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন। ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারকারী দেশগুলো ১৮০০ সালের মধ্যেই সারাবিশ্বের ৩৫ শতাংশ স্থলভাগে কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। আর পরবর্তী মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যে ১৮৩৫ সালে তা ৬৭ শতাংশে পরিণত হয়। এরপর ১৯১৪ সালে তা সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশে পরিণত হয়। কিন্তু এর পরেই নেমে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এরপর উপনিবেশগুলোর স্বাধীন হওয়ার পালা। সদ্য-স্বাধীন দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয় জোটনিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্ব। আর ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে যায় একটি দুই মেরুর বিশ্ব। সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্যের মধ্যে ফাটলের সূচনা হয়। ঠা-া যুদ্ধের পুরো আমলটাই ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার টানাপড়েন ও দ্বন্দ্বের যুগ। তাই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াগুলো সর্বদাই ছিল দ্বন্দ্বে ভরপুর। ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রকার ঘটনায় আকীর্ণ। উত্তরের শিল্পায়িত সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের মধ্যে ছিল দক্ষিণের মতো অসম বিকশিত প্রান্তিক জোটনিরপেক্ষ মিত্র। আবার দক্ষিণের নেতা সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যেও ছিল নানা প্রান্তিক মিত্ররাষ্ট্র। এর মধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধও অনুষ্ঠিত হয়ে যায়, যা সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের এই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। চীন নতুন সমাজতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ১৯৬০-এর পর থেকে নিজের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়াতে শুরু করে। তাই বর্তমান বিশ্বকে একটি জটিল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবেই দেখতে হবে, যার মাইলফলকগুলো হচ্ছেÑ
ক. আদি যুগের ও মধ্যযুগের দাস ও সামন্ত সাম্রাজ্যসমূহ।
খ. আধুনিক যুগের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব।
গ. বিংশ শতকে পুঁজিবাদী-সমাজতান্ত্রিক এই দ্বৈত মেরুতে বিভক্ত বিশ্ব।
ঘ. এবং বর্তমানে বহু মেরুতে বিভক্ত বিচিত্র বিশ্ব। এই বহু মেরুর মধ্যে রয়েছেÑ আমেরিকান জোট, ইউরোপিয়ান জোট, ল্যাটিন আমেরিকান জোট, চীন-রাশিয়া-ভারত জোট ইত্যাদি।
বিশ্বায়নের এই দীর্ঘকালব্যাপী ঐতিহাসিক পরিক্রমায় পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন পর্বটি সম্পর্কে বহু নেতিবাচক বিবরণ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু প্রধানত নেতিবাচক হলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যা ভুললে আমাদের চলবে না। পুঁজিবাদের সর্বাধিক নির্মম সমালোচক কার্ল মার্কস, যিনি পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বদলে সাম্যবাদী বিশ্বায়নের প্রবক্তা ছিলেন, তিনি নিজেই পুঁজিবাদের ইতিবাচক দিকগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন এবং বলতে চেয়েছেন যে পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা ও প্রাচুর্যকে ব্যবহার করেই গড়ে উঠবে নতুন বিশ্বায়নÑ যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সকল ব্যক্তির স্বাধীনতা পরস্পর পরিপূরক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং ব্যক্তি যখন বিশ্বমানব তথা বিশ্বরাষ্ট্রের সুসভ্য নাগরিকের প্রতিনিধিতে পরিণত হবেন। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বায়নের বিষয়গত ইতিবাচক দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলোÑ
ক. স্বয়ংসম্পূর্ণ, কুসংস্কার ও কূপম-ূকতার আড্ডাখানা মধ্যযুগীয় ছোট ছোট অঞ্চল ও গ্রামগুলোকে তা একত্রিত করেছে। বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়েছে।
খ. বদ্ধতা, সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিকতার বদলে তা তৈরি করেছে মুক্ত গতিশীলতা, বিস্তৃতি ও বিশাল সামষ্টিক জাতীয় বাজার।
গ. রেল বিপ্লব, বিদ্যুৎ বিপ্লব, কম্পিউটার বিপ্লব, ইত্যাদির মাধ্যমে তা সমগ্র পৃথিবীকে আরও যুক্ত ও আরও ছোট করে ফেলেছে। যা ছিল একশ বছরের ব্যাপার, তা এখন হচ্ছে এক মুহূর্তে।
ঘ. জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। প্রত্যন্ত জঙ্গলেও বিদ্যুতের আলো, সোলার প্যানেলের আলো পৌঁছে যাচ্ছে।
ঙ. চরম দারিদ্র্য ও চরম অভাব দূর করেছে অনেক জায়গায়। দরিদ্র না থাকা এখন বিশ্বব্যাপী একটি মানবাধিকারে পরিণত হয়েছে। এটা আজ আর সুদূর কোনো স্বপ্ন নয়। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও ক্ষুধার্ত লোকের অস্তিত্ব আছে।
চ. ভোগের প্রাচুর্য বৃদ্ধি করেছে, যদিও তা সবার জন্য সমান হয়নি।
ছ. মোট সম্পদের সৃষ্টি ও পরিবর্ধন ঘটিয়েছে। যদিও তা সর্বত্র ও সবার জন্য এক রকম হয়নি।
জ. পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে উপগ্রহ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মা-কে জয় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যদিও এসব করতে গিয়ে রুষ্ঠ প্রকৃতির রোষানল থেকে রেহাই পাওয়া যায়নি।
ঝ. শ্রম ও পুঁজির যে দ্বন্দ্ব তাকে যেমন এই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন উসকে দিয়েছে, তেমনি দুই যমজের মতো শ্রম ও পুঁজি উভয়ে উভয়কে আরও বড় আকারে আঁকড়ে ধরেছে। তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী বৃহৎ বহুজাতিক উৎপাদন ইউনিট। এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যত বৈষম্যই থাকুক না কেন, এর সামাজিক ও বৈশ্বিক যুক্ততা আজ অনস্বীকার্য।
ঞ. এ ধরনের পুঁজিবাদী বিশ্বায়নে বৈষম্য ও দ্বন্দ্বের বিষয়টা বণ্টনের ও অসম বিকাশের বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত হলেও মোট বা সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, মোট সম্পদ সৃজনের ক্ষেত্রে, মোট অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর গতিশীলতা এখনও অনস্বীকার্য।
তাই সামগ্রিক বিচারে আমরা বলব ‘বিশ্বায়নের’ যেই স্তরে আমরা আজ এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে আমরা বিপুল সম্ভাবনা যেমন দেখছি, তেমনি ঐ সম্ভাবনার বাস্তবায়নের ক্ষমতার ক্ষেত্রে রয়েছে বিপুল এক বৈষম্য। এই বৈষম্যের মূল কারণ হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা এক অসম কাঠামো এবং তার থেকে উদ্ভূত অসম বিকাশের প্রক্রিয়া। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না; বরং ঐ অসম প্রক্রিয়া ও কাঠামোকে সংস্কার ও মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এর সমাধানকে খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বায়নকে পরিত্যাগ করে নয়, গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেই এর সংকট ও ঝুঁকিগুলো হ্রাস করতে হবে।

নারী প্রত্যয়ের বিবর্তন
বিশ্বায়নের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারী প্রত্যয়ের অর্থ ও দ্যোতনারও পরিবর্তন হয়েছে। একদম আদিম সমাজে যখন গোষ্ঠীগুলো শ্রেণিহীন সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত, তখন ‘নারী’ ছিল সমাজের স্বাভাবিক বংশ লতিকার বাহন। সমাজটা তখন নারীদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত এবং সমাজটাকে তাই বলাও হতো মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। গোত্রের প্রতীক হতো সেই ‘মহা-মাতা’, যার থেকে পুরো বংশের সূত্রপাত। কিন্তু সমাজে বহুগামী বিবাহের বদলে এক-গামিতা যখন চালু হলো, যখন পিতারা উত্তরাধিকারীকে চিনতে পারলেন এবং তার সঞ্চিত সম্পদ তাকে দিতে শুরু করলেন, যখন কন্যা-সন্তানরা শুধু পুরুষ-সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে পরিণত হলো তখন থেকে সমাজে নারীদের ওপর পুরুষদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিণত হলো। ইতিহাসে দেখা যায়, শিকারি সমাজে বিষয়টি দ্রুত ঘটেছে আর কৃষিভিত্তিক স্থিতিশীল সমাজে নারীদের ক্ষমতা দীর্ঘকাল অটুট থেকেছে। মধ্যযুগে ক্রমশ নারীকে গৃহের মধ্যে রান্না, সন্তান পালন ও স্বামীসেবার ভূমিকায় আটকে ফেলা হয়েছে। যুদ্ধ, কঠোর পরিশ্রম, শিকার, বাণিজ্য, দেশ-দেশান্তর গমন, এসব ঝুঁকি বহনের কাজ থেকে নারীদের বিরত রাখা, তাদের একটি কমনীয় কোমল সৌন্দর্যের আধার রূপে আদর্শায়িত করা, এসবই ছিল দাস ও সামন্ত-সমাজের সাধারণ মূল্যবোধ। তাই এ যুগটা ছিল নারীদের বিশ্বব্যাপী পরাজয়ের যুগে এবং এ যুগে যে বিশ্বধর্মগুলোর উদ্ভব হয়েছে (হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম) সেগুলোর সর্বত্র ঈশ্বরের প্রতিনিধি হচ্ছেন পুরুষ এবং সংসারের সর্বত্র নারীর মূল্য ও অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে দ্বিতীয় হিসেবে।
কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ নিজেই বুঝতে পেরেছে যে মানব সমাজের অর্ধেককে জগৎ-বিচ্ছিন্ন করে, ঘরের মধ্যে বন্দী করে শুধু নিজের আনন্দ ও সম্ভোগের বিষয় (Object) পরিণত করলে জগতের বিকাশই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যাকে সে পশ্চাতে রাখবে সেই তাকে পশ্চাতে টেনে রাখবে। নিজের প্রয়োজনেই তাই পুরুষকে নারীর জন্য শিক্ষা ও একটু একটু স্বাধীনতা দিতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর এবং মুদ্রা অর্থনীতি চালু হওয়ার পর। পুঁজিপতিরা তখন দুটো বিষয় বিবেচনা করতে শুরু করে। প্রথমত; ম্যানুফেকচারিং প্রযুক্তি এমন যে একই ছাদের তলে অনেক শ্রমিককে জড়ো করতে হয়। আর সেই শ্রমিক বাহিনীর মধ্যে এমন কতকগুলো কাজ রয়েছে, যা নারীদের পক্ষে অনায়াসেই করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত; তারা এটাও খেয়াল করেন যে নারী ও শিশুরা অবিচ্ছেদ্য এবং এদের উভয়কেই শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করলে তাদের জন্য মজুরি দিতে হবে পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। অতএব, অধিক মুনাফার জন্যই পুঁজিবাদ অসচেতনভাবে নারীর কর্মের পরিসর গৃহ থেকে বাইরে নিয়ে এসেছে। নারীর এই বহিরাগমন ও নববিদ্যা ও দক্ষতা অর্জনই নারীমুক্তির প্রথম সোপান হিসেবে কাজ করেছে। নারী এখন আর সন্তান উৎপাদনের জন্য স্বামীর ওপর নির্ভরশীল স্বত্বা নয়, নয় সে সন্তানদের জননী বড়-মাতা, সে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবিকা ও সম্পদ আহরণকারী একজন পেশাজীবী। তার একটি পৃথক সামাজিক আত্মপরিচয় এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এরপর কী? গৃহমুক্ত নারী কি এরপর তার পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে সমসুযোগ নিয়ে, সমনিরাপত্তা নিয়ে, সম-অধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারছে? পারছে কি এই প্রতিয়োগিতায় জয়লাভ করে শীর্ষস্থানে আরোহন করতে? নিঃসন্দেহে আমাদের বলতে হবে যে তা হচ্ছে না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন নারীর ওপর দ্বৈত শোষণের (Double Exploitation) বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। বস্তুত, পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন শুরুই হয়েছে নারীদের বৈষম্যমূলক মজুরি প্রদানের মাধ্যমে। তাই অতি উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বেও নারী-পুরুষ বৈষম্য টিকে আছে, যদিও দীর্ঘদিনের বিকাশ ও সংগ্রামের মাধ্যমে নারীরা এখন সেখানে শিক্ষার অধিকার, নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার (অর্থাৎ মা হওয়া বা না হওয়ার অধিকার), ভোটের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, মাতৃত্বকালীন বিশেষ ছুটির অধিকার, পথে-ঘাটে চলাচলের সময় নিরাপত্তার অধিকার, পছন্দমতো বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, শ্রমবিভাজনের ক্ষেত্রে সর্বত্র গামিতার অধিকার (যেমন- পুলিশ, পাইলট বা মিলিটারি পেশায় যোগদানের অধিকার) ইত্যাদি অধিকারগুলো আংশিক বা বহুলাংশে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী অধিকারের চাম্পিয়ন হিসেবে কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিক এবং কল্যাণ পুঁজিবাদের অনুসারী স্ক্যান্ডিনভীয় দেশগুলো অধিকতর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে বলেই ধারণা করা হয়। সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্রই নারীর মুক্তি ও অগ্রগতিও অর্জিত হতে থাকে, তবে কোনো কোনো দেশ নিজস্ব অঙ্গীকার, বিশেষ ইতিহাস ও নীতিমালার কারণে এক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। বিপরীতক্রমে কোথাও কোথাও বল প্রয়োগ করে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অগ্রগতিকে আটকে রাখা হয়।
ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিশ্বায়ন তাই অবশেষে বিংশ শতকে মানব-মানবী, নারী-পুরুষ এই ধরনের পৃথকায়নের বদলে নতুন একক যে প্রত্যয়ের প্রবর্তন করেছে, তা হচ্ছে ‘মানুষ’ এবং ‘মানুষ’ প্রত্যয়কে কেন্দ্র করেই প্রণীত হয়েছে আধুনিক যুগের বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ। ‘Man’ or ‘Woman’ নয়, ‘‘Human being’’ এবং ‘Human Right paradigme’-ই বিশ্বায়নের বর্তমান পর্যায়ের সর্বজনীন দিগ্দর্শন। শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশ্বের মানুষকে আজ হতে হবে শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান, দীর্ঘজীবী, প্রাচুর্যশালী এবং সর্বত্রগামী। যদিও এই আদর্শের থেকে এখনও পর্যন্ত বহু দেশ বহুভাবে পিছিয়ে রয়েছে। নারী-পুরুষের বৈষম্যের পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের সমস্যাটিরও কোনো পূর্ণ সমাধান এখন পর্যন্ত আমরা বর্তমান বিশ্বে করে উঠতে পারিনি।

বিশ্বে নারীদের অবস্থান : তুলনামূলক চিত্র (২০১৪)
২০১৪ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে আমরা দেখতে পাই, সেখানে বলা হয়েছে, “Through the golbal gender gap Report 2014, the world economic forum quantifies the magnitude of gender based dispairties and tracks their progress over time while no single measure can capture the complete situation, the global gender gap Index presented in this Report seeks to measure one important aspet of gender equality : the relative gaps betwen women and men across four key areas : health, education, economy and politics.” (World Economic Forum, 2014)
ভূমিকায় লিখিত উপরোক্ত বক্তব্যের পেছনে বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের প্রধান উদ্দীপনাটি খুব সহজ এবং সাধারণ। তারা মনে করেন যে একসময় অর্থনীতির বিকাশের বা সম্পদ বৃদ্ধির চাবিকাঠি ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ। যদি প্রাচুর্যশালী বন থাকত, যদি নদী তীরের উর্বর ভূমিসম্পদ থাকত, যদি লোহা বা ব্রোঞ্জ বা তামার আকরিক পাওয়া যেত তাহলে সেই জায়গায় সেই মানবগোষ্ঠী দ্রুত প্রাচুর্যশালী হয়ে উঠতেন। কিন্তু শীঘ্রই মানুষ প্রকৃতি বশে আনার জন্য প্রযুক্তি, কৃৎ কৌশল ইত্যাদি আবিষ্কার করা শুরু করল। তখন ‘উৎপাদিত উৎপাদনের উপায়ই’ হয়ে গেল অর্থনীতির বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। পরে সেটাই পরিণত হলো পুঁজিতে এবং পুঁজির বিভিন্ন রূপবৈচিত্র্য তৈরি হলোÑ বাণিজ্যিক পুঁজি, শিল্প পুঁজি এবং সর্বশেষে ‘ফিন্যান্স’ বা আর্থিক পুঁজি। তখন থেকে প্রাচুর্যের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে গেল পুঁজি। পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি এই পুঁজি বিশেষত ফিন্যান্স পুঁজি যখন অঢেল হয়ে গেল, তখন প্রশ্ন এলো ‘শ্রমের’ সঙ্গে পুঁজিকে আরও যুক্ত করা যায় কীভাবে? পুঁজি তখন দেশ-দেশান্তরে শ্রমের সন্ধানে পাড়ি জমালো। পণ্য রপ্তানির জায়গায় এই পুঁজি রপ্তানি বিশ্বায়নকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই শ্রম শুধু পশ্চাৎপদ অদক্ষ শ্রমশক্তি হিসেবে থেকে গেলে চলবে না, তাকে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা দিয়ে উপযুক্ত মাত্রায় বিকশিত করে না তুলতে পারলে তাকে দিয়ে আধুনিক কৃৎকৌশলভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা স্বার্থকভাবে চালু রাখা সম্ভব হবে না। তাই আজকের যুগে বিশ্বায়নকে সচল রাখতে হলে পুঁজির নিজের জন্যই দরকার হয়ে পড়েছে বিশাল সুশিক্ষিত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ‘মানবসম্পদের’। আর মানবসম্পদের অর্ধেককে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অর্থই হচ্ছে প্রয়োজনীয় বিশাল এই মানবসম্পদ বিকাশের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে রাখা। তার ফলে পুঁজির সম্ভাব্য ফলপ্রসূতাও বাস্তবে সংকুচিত হয়ে অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একটি সহজ পরিসংখ্যান থেকেই এই সত্য ফুটে ওঠে। বিশ্বব্যাংক তার ২০১৩ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসনের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে নারীদের শ্রমবাজার বর্ধিত হারে অংশগ্রহণ। যদিও পুরুষদের তুলনায় তা এখনও অনেক কম। যে জায়গায় কর্মক্ষম পুরুষরা প্রায় শতভাগ অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করছে সে জায়গায় বাংলাদেশের নারীদের মাত্র ৩০ শতাংশ এখন অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত। যদি এটাকে ৮৭ শতাংশে উন্নীত করা যেত, তা হলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার এমনিতেই ৬ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হতো বলে বিশ্বব্যাংক হিসাব করে দেখিয়ে দিয়েছে। এই ছোট একটি তথ্য প্রমাণ করে gender gap কীভাবে পুঁজিবাদী উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে? এই Report-G gender gap score নির্ণয় করা হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় কতখানি কম বা কত শতাংশ পিছিয়ে আছে, সেটা দিয়ে।
ধরা যাক, কোনো দেশে শিক্ষিত নারীর অনুপাত ৩০ শতাংশ; কিন্তু পুরুষদের অনুপাত ৬০ শতাংশ, তাহলে সেদেশে gender gap ratio হবে  PM2    = ৬০% অর্থাৎ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় সেদেশে ৪০ শতাংশ গ্যাপে আছে বা পিছিয়ে আছে। এভাবে ৪টি মাত্রায় অনুপাতগুলো বের করে একটি সম্মিলিত সামগ্রিক gender gap ratio নির্ণয় করা হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশের জন্য। সেটি থেকে আমরা এই বিশ্বে নারীদের তুলনামূলক পশ্চাৎপদতার একটি পরিসংখ্যান চিত্র পেতে পারি। এক্ষেত্রে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে অনুপাতটি যখন ১০০ শতাংশ হবে তখন নারী-পুরুষে বৈষম্য নেই বলে ধরে নিতে হবে, আর যদি তা ১০০-র বেশি হয় তাহলে নারীদের তুলনায় পুরুষ পিছিয়ে আছে বলে ধরতে হবে। তবে ২০১৪ সালের এই জবঢ়ড়ৎঃ-এ দেখা যায় এই মধঢ়-টি সর্বনিম্ন হচ্ছে আইসল্যান্ডে (অর্থাৎ পূরণকৃত গ্যাপের মাত্রা হচ্ছে ৮৬ শতাংশ) এবং সর্বোচ্চ হচ্ছে পাকিস্তানে (অর্থাৎ পূরণকৃত গ্যাপের মাত্রা হচ্ছে মাত্র ৫৬ শতাংশ)। অর্থাৎ সবচেয়ে ভালো অবস্থাতেও পুরুষদের তুলনায় নারীরা ১৪ শতাংশ পিছনে রয়ে যায়। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পিছিয়ে থাকার অনুপাত ৪৪ শতাংশ। আমরা উদাহরণ হিসেবে আরও কয়েকটি দেশের ২০১৪ সালের gender gap ratio নিচের তালিকায় তুলে ধরছি।
এই তালিকা থেকে আমাদের কতকগুলো অনুসিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে বেরিয়ে আসে।
ক. প্রথমত সারাবিশ্বে এখনও পর্যন্ত নারীরা সর্বত্রই পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন। পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষ সমতা স্থাপিত হয়নি (অন্তত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতিÑ এ ৪টি ক্ষেত্রের জন্যই এ-কথা সত্য)।
খ. তবে নারী-পুরুষ বৈষম্য সবচেয়ে কম দেখা যাচ্ছে কল্যাণ ধনতন্ত্রের অনুসারী নরডিক দেশসমূহে।
গ. ইউরোপ ও আমেরিকায় নারী-পুরুষ বৈষম্য এখনও রয়েছে। তাদের গ্যাপ পূরণ স্কোর এক্ষেত্রে .৭৩৮ থেকে .৭৭৮-এর মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ তুলনামূলক গ্যাপের পরিমাণ মোটামুটি ২৫ শতাংশ।
ঘ. অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশে এই গ্যাপ সবচেয়ে কম কিউবায় এবং সবচেয়ে বেশি চীনে। এখানে প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাপ বিরাজমান।
ঙ. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থান দখল করে আছে বাংলাদেশ। এখানে প্রায় ৩১ শতাংশ গ্যাপ বিরাজ করছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পাকিস্তানে। এখানে গ্যাপের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ।
চ. মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণভাবে নারীদের অবস্থান ভালো না। এখানে সৌদি আরবে নারীদের মধ্যে গ্যাপের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে ইরানে তা আরও বেশি প্রায় ৪২ শতাংশ এবং ইয়ামেনে তা সর্বাধিক অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ, এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও বেশি।
বিশ্বব্যাপী নারী অগ্রগতির এই অসম বিকাশের পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে নারীবান্ধব আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতি ও নীতিপ্রণেতার অভাব। কোনো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে, আর কোনো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, তা যদি ঘনিষ্ঠভাবে আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলেই আমাদের উপরোক্ত বক্তব্যের যথার্থতা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

জেন্ডার গ্যাপ অনুপাত-২০১৪
Untitled-1 copy

বিশ্বব্যাপী ‘জেন্ডার’ বৈষম্য সূচকের গতিপ্রবণতা ও নীতিগত তাৎপর্য
‘Gender Gap Report’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। এরপর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আরও ৮টি বার্ষিক রিপোর্ট আমাদের হাতে রয়েছে। এসব রিপোর্ট থেকে আমরা বিশ্বব্যাপী ‘এবহফবৎ এধঢ়’-এর সূচকের গতিশীলতার একটি চিত্র পাই। সামগ্রিকভাবে বিশ্বে এটা কমছে না বাড়ছে? কমলে কোন ক্ষেত্রে কমছে? কোন ক্ষেত্রে বাড়ছে? কোন ক্ষেত্রে বর্তমানে বৈষম্য সর্বোচ্চ? কোন ক্ষেত্রে বৈষম্য অপেক্ষাকৃত নিম্ন?, ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর উত্তর খুবই জরুরি। কারণ এখান থেকেই আমরা সন্ধান পেতে পারি নারীদের বৈষম্য হ্রাসের সংগ্রামের রণনীতি ও রণকৌশল কি হওয়া উচিত তার। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সারাবিশ্বের ‘Best Practise’-গুলোর উদাহরণ শেখাতে পারে এবং সেগুলো আমরা আমাদের দেশ বাংলাদেশেও প্রয়োগ করতে পারি কি না, তা ভেবে দেখতে পারি। এ জন্য ব্যবহৃত চিত্রটি মূল রিপোর্টটি থেকে নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।

চিত্র-১
PM3চিত্র-১ এ gender gap ratio-এর ৪টি ক্ষেত্রে ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বৈষম্যের মাত্রাগুলোর সূচকের বিশ্ব পরিমাপের গতি প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। এই চিত্র থেকে আমরা আমাদের উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর নিম্নরূপ উত্তরগুলো পেয়ে যাচ্ছি। প্রথমত; দেখা যাচ্ছে geneder gap-এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার’ সূচকের ক্ষেত্রে। ১নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে ২০০৬ সালে এক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ পিছিয়ে ছিলেন।১  ২০১৪-তে এসেও তারা এখনও এক্ষেত্রে ৭৯ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বঞ্চনার ক্ষেত্রে মাত্রাটি সাধারণভাবে অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে তা কম হলেও তার উন্নতি খুবই শ্লথগতিতে হচ্ছে। ২০০৬ সালে এই বঞ্চনার অনুপাতটি ছিল ৮ শতাংশ, ২০১৪-তে তা কমে হয়েছে ৬ শতাংশ। সাধারণভাবে তাই বলা যায়, বিশ্বে শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের তুলনামূলক ফারাক অনেক কম এবং ক্রমশ তা ধীরগতিতে কমছে। পক্ষান্তরে স্বাস্থ্য ও আয়ুর ক্ষেত্রে ফারাকের সূচকটি শ্লথ গতিতে বৃদ্ধিই পাচ্ছে। ২০০৬ সালে তা ছিল ৩ শতাংশ, ২০১৪-তে এসে তা হয়েছে ৪ শতাংশ। তবে সাধারণভাবে এখানেও পূর্ণতার সূচকটির মাত্রা বেশিই রয়েছে বলতে হবে। কিন্তু অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের অপূর্ণতার সূচকটি এই দুই পরিমাপের তুলনায় অনেক বেশি। ২০০৬ সালে গ্যাপের এই সূচকটি ছিল ৪৪ শতাংশ। ২০১৪-তে এসে তা সামান্য হ্রাস পেয়ে ৪০ শতাংশে অবস্থান করছে।
এই সামগ্রিক চিত্র থেকে আমরা gender gap ratio এর প্রণেতাদের পক্ষ থেকে যে নীতি-নির্দেশনার পরামর্শ পাই, তা হচ্ছে-
১. শিক্ষার সুযোগ নারীদের ক্ষেত্রে এখন যে বিশ্বব্যাপী দিতে হবে এবং দেওয়া যে শুরু হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শিক্ষা লাভ তাদের পরবর্তীতে অর্থনৈতিক মুক্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারছে না। পুরুষরা যেমন তাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে ও রাজনীতিতে দ্রুত ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারছেন, নারী ঠিক তেমনটা পারছেন না। এ জন্য নারী শিক্ষার গুণগত মানকে আমাদের বৃদ্ধি করার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। শিক্ষাকে আরও বেশি প্রয়োগমুখী ও কর্মমুখী হতে হবে এবং একই সঙ্গে অতি উচ্চমানের শিক্ষাগুলোকেও নারীদের আয়ত্ত করে সমাজের উচ্চতর পেশাগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ অবাধ ও নিশ্চিত করতে হবে।
২. স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ ইতিবাচক নীতি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে বর্তমান অবনতির প্রবণতা রোধ করা যাবে না। নারীদের তুলনায় এখনও পুরুষরা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে এগিয়ে আছে এই অমানবিক বাস্তবতাটি স্বীকার করে নিয়ে এক্ষেত্রে নারী স্বাস্থ্য সুবিধা তুলনামূলকভাবে অধিকতর হারে বাড়াতে হবে।
৩. অর্থনীতি ও বিভিন্ন পেশায় নারীদের অভিগম্যতা এখনও নারীমুক্তির প্রধান সমস্যা হিসেবে সারাবিশ্বে বিরাজ করছে। এখানে শুধু নারীদের যোগ্যতার অভাব এবং পুঁজিবাদী আধুনিক শিল্পায়নের ঘাটতিই প্রধান বাধা নয়, বাধা হিসেবে বিরাজ করছে নারীদের নিজেদের মধ্যে ও সমাজের ভেতরে নানা সংস্কার ও দ্বিধা। তাছাড়া এই অংশগ্রহণের সুযোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সর্বদাই একটি বৈষম্য ও দ্বিচারিতা (Double Standard) বিদ্যমান। নারীরা অংশগ্রহণ করলেও সেক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের শর্তগুলো পুরুষের তুলনায় অধিকতর প্রতিকূল হয়ে থাকে, তাই এখানেও ইতিবাচক নীতির স্বীকৃতি থাকতে হবে।

নারীবান্ধব নীতিমালা ও বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী নারী-পুরুষ বৈষম্য যে এখনও বহাল তবিয়তে বিরাজমান তা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ‘Gender Gap Report’-এর পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টই দেখতে পাই। এই বৈষম্যের ৪টি মাত্রাও পরিদৃশ্যমান- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রাটি হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের বৈষম্য, যাকে প্রধানত সুযোগের, অধিকারের ও প্রাপ্তির বৈষম্য বলা হচ্ছে, আরেকটি মাত্রা হচ্ছে- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বৈষম্য, যার ফলাফল দুদিক থেকে পরিদৃশ্যমান, প্রথমত; দরিদ্র শ্রেণিগুলোর স্বাভাবিক বঞ্চনা তো রয়েছেই, তদুপরি দরিদ্র শ্রেণির পরিবারগুলোর মধ্যে নারীদের প্রতি আবার বিশেষ ধরনের অবহেলা ও বঞ্চনা রয়েছে। তৃতীয় সবচেয়ে ব্যাপকও গভীর বৈষম্য মাত্রাটি রাজনৈতিক। উচ্চক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদগুলো থেকে নারীদের বিরত রাখার বঞ্চনা এবং সর্বশেষে আমরা এসবের পরে যোগ করতে পারি এই ৩টি বঞ্চনার সম্মিলিত ফলাফল হিসাবে সামগ্রিকভাবে নারীদের যুগ-যুগব্যাপী সঞ্চিত হতাশা ও মানসিক হীনমন্যতা বোধের বাস্তবতা। কেউ কেউ এটাকে ‘মনোভঙ্গির’ (Mindset) সমস্যা হিসেবেও চিত্রিত করেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণভাবে আজ এ-কথাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে মুক্তবাজার দর্শন তথা নিওলিবারেলিজমের মাধ্যমে নারীমুক্তির সার্বিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ জন্যই নারী বৈষম্য সূচক কমানোর ক্ষেত্রে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ সাফল্য আমেরিকা বা ইউরোপের নয়া উদারনীতিবাদী রাষ্ট্রগুলো দেখাতে পারেনি। এই সাফল্য বরং সবচেয়ে বেশি অর্জিত হয়েছে নরডিক দেশগুলোতে। এরা সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি। গ্রহণ করেছে নিয়ন্ত্রিত বাজারের নীতি। বিশেষত; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুযোগকে তারা সকলের জন্য বিস্তৃত করেছে। একে ব্যক্তি খাতে ও বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি। তদুপরি নারী, প্রতিবন্ধী, শিশু, পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী ও শ্রেণিগুলোর জন্য এরা গ্রহণ করেছেন বিশেষ ইতিবাচক নীতিমালা (Special Affirmative Policies)। বাংলাদেশকেও তাই আজ এসব ভালো অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। তথাকথিত ‘মুক্তবাজার’ ও ‘নয়া উদারনীতিবাদ’ থেকে পুরোপুরি সরে আসতে হবে।
২০০৬-এর পর থেকে এ যাবৎ বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৩ সালে বিশ্বের ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক সূচকে অবস্থান ছিল বিশ্বে ৭৫তম। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালেই এ অবস্থানের উন্নতি ঘটে হয়েছে ৬৮তম (আরও বেশি সংখ্যক তথা ১৪২টি দেশের মধ্যে!)। এই একই সময়ে অর্থাৎ ২০১৪ সালে আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল আমাদের চেয়ে অনেক নিচে। ১৪২টি দেশের মধ্যে ১১৪তম। বাংলাদেশের এই তুলনামূলক বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতি মেলে নোবেল বিজয়ী নারীবান্ধব অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থে। তিনি তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘‘An Uncertain Glory : India and its Contradictions’এ বলেছেন-
“To point to just one contrast, even though India has significantly caught up with China in terms of GDP growth, its progress has been very much slower than China’s in indicators such as longevity, literacy, child undernourishment and maternal mortality. In South asia itself, the much poorer economy of Bangladesh has caught up with and overtaken India in terms of many social indicators (including life expectancy, immunization of children, infant mortality, child undernourishment and girls’ schooling).”
[Jean Dreze and Amartya Sen, 2013]

কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এরপরেও আমাদের আত্মসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সামনে এখনও প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছেÑ
ক. উন্নত বিশ্বে উৎপাদনশীল উচ্চতর পেশাগুলোতে নারীরা যে হারে অংশগ্রহণ করেন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমতা বিধান করতে হবে। সকল পদেই নারীদের সম-উপস্থিতি দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে হবে।
খ. এ উদ্দেশ্যে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো উচ্চতর গুণের ও মানের হতে হবে এবং সেখানে ইতিবাচক কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। যাতে পুরুষের সঙ্গে নারীর যোগ্যতা ও সক্ষমতার ফারাক কমে আসে।
গ. সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সম্পদ। তাই সম্পদের ওপর নারী ও পুরুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. অগ্রগতির জন্য চাই সচলতা। তাই পথে-ঘাটে চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. অল্প বয়সেই নারীর মা হওয়া তার স্বাস্থ্য ও আয়ুর জন্য ক্ষতিকর। তাই বাল্যবিবাহ থামাতে হবে।
চ. ফতোয়া ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের মনোভঙ্গি (গরহফংবঃ) বদলাতে হবে।
অমর্ত্য সেনের পর্যালোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে এক্ষেত্রে ‘বিশ্বায়ন’ আমাদের বন্ধু হতে পারে, তবে কতখানি বন্ধু হবে তা অনেকখানি নির্ভর করবে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও সুযোগের সদ্ব্যবহারের মাত্রার ওপর। অমর্ত্য সেন বিশ্বায়ন সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইজঅঈ আয়োজিত ঢাকাস্থ এক সেমিনারে বলেছিলেনÑ
‘ও ধস ধহঃর ধহঃর-মষড়নধষরুধঃরড়হ.’  অর্থাৎ
‘আমি বিশ্বায়ন বিরোধীদের বিরোধী।’
এই জটিল অবস্থানের বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন যে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের নানা সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা তিনি স্বীকার করেন; কিন্তু এর অর্থ বিশ্বায়নকে চরম খারাপ অভিহিত করে তাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বদ্ধ অর্থনীতি বা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সমাজ বা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়। নয়া চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অতীত অমøমধুর অভিজ্ঞতা সে সত্য প্রমাণ করেছে। সুতরাং বিশ্বায়ন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ সেটি মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছেÑ কোন ধরনের বিশ্বায়ন আমরা চাইব এবং কীভাবে সেটাকে আমাদের জাতীয় স্বার্থে আমরা ব্যবহার করব।
নারীমুক্তি অর্জনের সংগ্রামেও আমাদের একই ধরনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে। সেনের ‘‘Cooperative Conflict’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে আমরা গ্রহণ করতে পারি। নারীমুক্তি হোক কিন্তু পুরুষকে বাদ দিয়ে নয়। এ ধারণা অনুসারে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নারী ও পুরুষের মধ্যে যেমন সহযোগিতার ক্ষেত্র আছে, তেমনি আবার ‘বিরোধেরও’ ক্ষেত্র আছে। দুটোকেই কাজে লাগাতে হবে। ‘বিরোধ’ সর্বদা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না যখন পরিবারের নারী-পুরুষ বিচ্ছেদ হয়ে পরস্পর শত্রুতে পরিণত হয়ে গেল। আবার সহযোগিতা, ভালোবাসা, যতেœর নাম করে নারীকে চিরকাল একতরফা প্রেমের শিকলে আটকে রাখলেও নারীমুক্তি অগ্রসর হবে না। এক্ষেত্রে তাই আমাদের আধুনিক বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ যেমন পরিবারকে উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেজন্য নারীকে পুরুষদের সহযাত্রী যেমন হতে হবে তেমনি সেখানে নারীদের ন্যায্য হিস্যাটুকুও পুরুষদের নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের ভেতরেও ন্যায্য শ্রম বিভাজন মেনে নিতে হবে। পারলে নারীদের জন্য প্রথম দিকে সুষম প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছুটা ইতিবাচক স্বীকৃতির (An Uncertain Glory : India and its Contradictions’ বিধান বা বাড়তি সুবিধা প্রদানের নীতি অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বায়ন হোক; কিন্তু তা হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক (Inclusive and Democratic)।

গ্রন্থপঞ্জি
১. রেহ্মান সোবহান ও নাসরীন খন্দকার (২০০১) ‘গ্লোবালাইজেশান এন্ড জেন্ডার : চেঞ্জিং প্যাটার্নস অফ উমেনস এমপাওয়ারমেন্ট ইন বাংলাদেশ’, ইউপিএল এবং সিপিডি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২. বিনা আগারওয়াল, জেন হামফ্রিস এবং ইনগ্রিড রবিনস (২০০৬), ‘কেপেবিলিটিজ, ফ্রীডম এন্ড ইকুয়ালিটি : অমত্য সেনস ওয়ার্ক ফ্রম এ জেন্ডার পারস্পেকটিভ’ অক্সফের্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দিল্লী, ভারত।
৩. এন্থনী গীডেনস্ (২০০৩), ‘রানওয়ে ওয়ার্লড’, রুটলেজ পাবলিশার্স, নিউইয়র্ক।
৪. জ্যাঁ দ্রেজে এবং অমর্ত্য সেন (২০১৩), ‘এ্যন আনসার্টেইন গ্লোরী-ইন্ডিয়া এন্ড কনট্রাডিকশানস্’, পেঙ্গুইন বুকস্, লন্ডন, ইউকে।
৫. ওয়ার্লড ইকনমিক ফোরাম, (২০১৪), ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০১৪’, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।
৬. বিশ্বব্যাংক (২০১৩), ‘বাংলাদেশ পভার্টি এসেসমেন্ট : এসেসিং এ ডিকেড অফ প্রোগ্রেস ইন রিডিউসিং পভার্টি-২০০০-২০১০’, ঢাকা।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

সেই যে মধুর স্মৃতি

PM2জেসমিন আমিন: দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, যাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়ে থাকে, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য এবং অভিভূত হয়েছিলাম। এখানে শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুহম্মদ আবদুল হাই, আহমেদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, নীলিমা ইব্রাহীম, রফিকুল ইসলাম প্রমুখকে আমরা শিক্ষক রূপে পেয়েছি। এত বড় সৌভাগ্য ক’জনের হয়! এদের মধ্যে প্রথম তিনজনকে আমরা একাত্তরে হারিয়েছি।
পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গেও বড় চমৎকার দিন কাটে। এখানে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছি বেবী মওদুদ, কণা, মিনু, আলেয়া, সেলিমা, বেলিদের এবং শেখ হাসিনাকে, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। কলেজেও আমরা সতীর্থ ছিলাম।
লম্বা ছিপছিপে গড়নের হাসি-খুশি প্রাণচঞ্চল সুশ্রী মেয়েটিকে ভালো লাগত। কৌতুকময় চঞ্চল চোখ, পিঠের ওপর লম্বা একটি বেণি, পোশাক-পরিচ্ছদে সাদাসিধা এবং সুরুচিসম্পন্ন। কলেজে পড়াকালীন সাদা সালোয়ার-কামিজেও দেখেছি সম্ভবত। সদালাপি মেয়েটি মজা করে কথা বলত। হাসাতে পারত।
সেই সময় শনিবার ১০টায় বলাকা সিনেমা হলে বাংলা ছবি হতো। আমাদের ক্লাসের মেয়েরা দল বেঁধে ছবি দেখতে যেতাম। আমি তো সবসময় ছবির পোকা ছিলাম। দেখা ছবি বলে যদি না যেতে চাইতাম, হাসিনার কথামতো কণা সবার কাছ থেকে একআনা করে চাঁদা উঠাত আমার টিকিটের দাম দেওয়ার জন্য। পনেরোআনার টিকিট দিয়ে দল বেঁধে রিয়ারস্টলে বসে সবাই হাসি-গল্পে মজা করে ছবি দেখতাম। আনন্দ করাটাই ছিল মুখ্য।
মনে হয়, ১৯৬৭ সালে ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনার ড. ওয়াজেদ সাহেবের সঙ্গে শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন। হাসিনার বিয়ের পরদিন জেলগেটে বাবার সাথে দেখ হয়। বিয়ের পরও হাসিনার সাজপোশাকে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরাবরের মতো সাদাসিধাই ছিল। তবে দু-হাতে স্বর্ণের চুড়ি পরত ও মাঝে মাঝে খুব হালকা রঙের শাড়ি।
একবার আমাকে নিয়ে নিউমার্কেটে গিয়ে টুকিটাকি সেরে বলাকা সিনেমা হলের পিছন দিকটায় (বর্তমানে গাউছিয়া) গিয়ে ব্যাংকে কাজ সেরে সম্ভবত ধানমন্ডির ২ নম্বর রোডে তার নিজের বাসায় নিয়ে গেল। সেখানে ওয়াজেদ সাহেব ছিলেন। আমরা একসাথে বসে ভাত খেলাম। ইলিশ মাঝের মাথা দিয়ে পুঁইশাক ছিল মেন্যুতে, মনে আছে।
PM3১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আমাদের বন্ধু বেবী মওদুদের সঙ্গে হাসিনার ওখানে গিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর স্মরণে মিলাদেও যেতাম বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে। আমার স্বভাব একটু মুখচোরা গোছের। ছাত্র-জীবনে তার সঙ্গে প্রথমে তুই তুকারি সম্বোধন করলেও পরে তুমির দূরত্বে সরে যাই। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ওটাই রয়ে গিয়েছে।
সত্তরের মে মাসে আমার বিয়ের কার্ড দিতে গিয়েছিলাম বন্ধুদের। কার্ড হাতে নিয়ে বললÑ ‘যদি ভিপি আর জিএস’-এর ভোটটা দিয়ে যাস, তাহলে বিয়েতে যাব।’ সেদিন রোকেয়া হলে ছাত্র সংসদের ইলেকশন চলছিল। তুমুল হৈচৈ-ব্যস্ততা।
হাসিনা প্রকৃতিপ্রেমী। ওর কাছে গাছপালা খুব প্রিয়। খবরের কাগজে পড়েছিলাম একবার অনেকটা পায়ে হেঁটে একটা তমাল গাছ দেখতে গিয়েছিল টাঙ্গাইল অথবা মধুপুরের দিকে, ঠিক মনে নেই।
প্রথম গণভবনে যাওয়ার পর বেবী বলল, হাসিনা বনসাই খুব পছন্দ করে। খুব সুন্দর একটা বনসাই তাকে গিফট করলাম, যা পরে আমাকে দেখিয়েছে, ওটা ব্যালকনিতে লেখার টেবিলের সামনে রেখেছে। ওর ইচ্ছানুসারে রাজশাহী থেকে এক দক্ষ বনসাইবিদের সাহায্যে কুড়িটা বনসাই আনিয়ে দিলাম। আমার নিজের থেকেও দিলাম দুটি। ডালপালা বড় হয়ে গেলে মাঝে মাঝে গিয়ে ওগুলোর ডালপালা ছেঁটে দিতাম, অয়্যারিং করে দিতাম। বনসাই বিষয়ক একটি বই তাকে দিয়েছিলাম।
সেই সময় হাসিনার সঙ্গে বসে গল্প করতাম, চা-নাস্তা খেতাম। আমাকে গণভবনের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। গাছপালা, মাশরুম ঘর, পীচ ফল প্রভৃতির গাছ, কুর্চি ফুলের গাছ। আমার কুর্চি গাছটা মরে গিয়েছে শুনে টবসহ একটা গাছ আমাকে দিল। আমি খুব খুশি। দেখলাম মালি তমাল গাছের দু-পাশে বিস্তৃত সুন্দর ডালগুলো ছেঁটে ফেলেছে। ডালই তো এ গাছের সৌন্দর্য। এ-কথা শুনে মালিকে ডেকে বলে দিল। অ্যাসপারা গাছের বেডের কাছে নিয়ে গিয়ে কচি ডগা ভেঙে দিয়েছে। বলেছেÑ ‘খেয়ে দেখ ভালো লাগবে।’
আসলেই খেতে বেশ। আগে কখনও এই সবজিটা এভাবে খেয়ে দেখিনি। যখনই গিয়েছি, দিয়েছে। বর্তমানে সম্ভবত এই গাছের বেড এবং রক গার্ডেন সামনের বাগানে নেই।
তার ছেলে বউ নিয়ে দেশে এলে সুধাসদনে আমরা কয়েকজন বউ দেখতে গেলাম। বেবী মওদুদ, জাহানারা নিশি, হীরাফুলরা ছিল। হাসিনার জন্য বেশ কিছু অর্কিড প্ল্যান্ট নিয়ে গিয়েছিলাম।
লিখতে ভুলে গিয়েছি, ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গণভবনে আমাদের বাংলা বিভাগের সতীর্থদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। প্রায় সবাই গিয়েছি। আনন্দ করেছি।
প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদের সময় নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা কার্ড পেয়ে থাকি। রমজানের সময় ইফতারির নিমন্ত্রণ থাকে। গণভবনে গেলে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হয়। হাসিনা ঘুরে ঘুরে হাসিমুখে কুশলবিনিময় করে সবার সঙ্গে।
একসময় কিছুটা ঘনিষ্ঠতা থাকলেও দিনে দিনে ওর ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছে অনেক বেশি। আমাদের যোগাযোগ সেতু বেবী মওদুদও আর বেঁচে নেই। কিন্তু পুরনো দিনগুলোকে মিস করি খুব।

লেখক : সতীর্থ

Category:

আমার গর্ব – আমার অহংকার

[মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি]

PM2 সুপ্রিয় সহপাঠী বন্ধু হাসিনা,  বিশিষ্ট জননেত্রী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাম ধরে ডাকার আর তুমি করে সম্বোধন করার দুঃসাহস পেলাম শুধুমাত্র তুমি আমার কৈশোর-তরুণ জীবনের সহপাঠী বলে। তোমার হয়তো আমাকে মনে না রাখারই কথা। এক সমুদ্র শোক বুকে ধরে রেখে বাংলাদেশের কোটি জনতার সুখ-দুঃখের সমব্যথী হয়ে যে মানুষটার দিন কাটে, তার তো এতজনকে মনে রাখা সম্ভব হয় না। তবু তো প্রতিটি বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা কার্ড আর প্রতি বছরে ইফতার পার্টিতে আমাদের আমন্ত্রণ জানাতে তোমার ভুল হয় না। এটাই আমাদের পরম পাওয়া। সেই ছিয়ানব্বই থেকে আজ অবধি যত কার্ড এসেছে, আমার নামে সব আমি সযতেœ রেখে দিয়েছি।
১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করার পর Govt. Intermediate Girl’s College
(বর্তমান বদরুননেসা কলেজ)-এ ভর্তি হলাম। তোমাকে প্রথম দেখলাম জুবাইদা গুলশান আরা আপার ক্লাসে; সাদা সালোয়ার-কামিজ-ওড়না পরা, লম্বা চুলের বিনুনী গাঁথা, উজ্জ্বল চোখের চাহনি ভরা মায়াবী মুখের একটি মেয়েকে। জানলাম মেয়েটি শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। এত বড় জননেতার মেয়ে; কিন্তু তার চাল-চলন, কথা-বার্তা, ব্যবহারে অহংকারের লেশমাত্র নেই। আজও এর কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান বটে, তুমি হাসিনা।
এরপর তোমার সাথে তেমন ঘনিষ্ঠতা না হলেও আর দশটা সহপাঠীর মতো মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হতো। বন্ধুরা ক’জন ক’জন মিলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেলাম। একসাথে বসতাম, একসাথে বেড়াতাম, তুমিও তোমার স্কুলের বন্ধুদের সাথে দলে ভিড়ে গেলে। তোমাকে আমার ভালো লাগত তোমার সাহসিকতার জন্য। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে তুমি নির্ভীকচিত্তে প্রতিবাদ করতে তোমার বক্তব্যের মাধ্যমে। ধন্য তোমার সাহস, ধন্য তোমার মনোবল। এই সাহস আর মনোবল তোমাকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি, জেসমিন, জ্যোতি, কাজী রোজী, জাহানারা নিশি, শেলী, হাসি, আনু আরও অনেকে অবাক হয়ে তোমার বক্তব্য শুনতাম আর আমাদের মনেও ওদের প্রতি বিদ্বেষ জন্মাত।
সাতষট্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। শুনলাম তুমিও আমাদের Department-এ ভর্তি হয়েছো। পাকিস্তান থেকে বেবী মওদুদ এসে ভর্তি হলো। প্রথম দিন থেকে ওর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই বন্ধুত্ব অটুট ছিল। একবার আমি কলকাতা গেলাম বেবীর সাথে ও ডাক্তার দেখাবে। আমরা পাঁচ দিন ছিলাম। সারারাত কত গল্প করেছি। বেবী ওর নিজের কথার চেয়ে হাসিনার গল্প করতে পছন্দ করত। কত যে কথা- আমি অবাক হয়ে শুনতাম।
কলেজ জীবনের একটি কথা মনে পড়ে গেলে। একদিনের ঘটনা, যা আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন ক্লাস শেষেÑ বাসায় ফিরব। ঢাকা মেডিকেলের গেটে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছি, তুমি কলেজ থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলে,
– বাসায় যাবি? বাসা কোথায়?
– মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে।
– আয়, তোকে নামিয়ে দেব। আজকে গাড়ি আছে।
PM3আমি তোমার গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে বসে আমরা কি গল্প করেছিলাম আজ আর মনে নেই। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসার গেটে তুমি নেমে পড়লে। ড্রাইভারকে বললেÑ উনাকে উনার বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসেন। আমি আপত্তি করলাম তুমি শুনলে না। গেটটা বড় করে খোলা হয়েছিল, আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলাম- বারান্দায় আমার প্রিয় নেতা, যার আদর্শকে আমি মনে-প্রাণে লালন করি, সেই শেখ মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন- সাধারণ একটা সাদা পাঞ্জাবি গায়ে, পরনে চেক লুঙ্গি, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, হাতে চুরুট। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। যাকে চাক্ষুষ দেখার জন্য অনেকদিন ধরে মনের যে আকাক্সক্ষাকে লালন করে আসছিলাম, আজ সেই মানুষটি আমার সামনে। খুব ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করি। কিন্তু ভয়মিশ্রিত একটা লজ্জা আমাকে নামতে দিল না। চোখে দেখেই আমার জীবন ধন্য হয়ে গেল। আজ ৫৩ বছর পরও চোখ বুজলে আমি এ দৃশ্য দেখি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে এত কাছে থেকে আমি আর কোনোদিনই দেখতে পাইনি।
বন্ধু হাসিনা, এতসব কথা তোমার মনে না থাকারই কথা। কিন্তু আমি যে এমন সব ছোট ছোট স্মৃতিকে মনের কোঠায় লুকিয়ে রেখেছি। আজ সেই স্মৃতির দুয়ার খুলে দিয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর। হঠাৎ করেই তোমার বিয়ে হলো। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। বিয়ের পর তুমি দেশের বাইরে চলে গেলে। আমরা তোমাকে চোখে হারাতাম। আমরা সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিলাম। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা চলাকালীন সময় মুক্তির আন্দোলনে দেশ গর্জে উঠল। আমরা পরীক্ষা বয়কট করলাম। তারপরের ইতিহাস তো তোমার জানা। বাংলাদেশের এ ইতিহাস লিখতে গেলে হাজার পৃষ্ঠাতেও কুলাবে না। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর লাখো শহিদের বুকের রক্ত আর মা-বোনদের মান-সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম, নিজেদের পতাকা পেলাম আর পেলাম প্রাণের জাতীয় সংগীত- ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ সারাবাংলা তখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। জাতির পিতা দেশে ফিরলেন। হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার সংগ্রামে নেমে পড়লেন। কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণেরা তা হতে দিল না। জাতির পিতা যাদের এত বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাসঘাতকের দল গোপন ষড়যন্ত্র করে এমন ফেরেশতার মতো মানুষটিকে সপরিবারে এমনকি আত্মীয়-স্বজনসহ নিষ্ঠুরভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিল। এমন জঘন্যতম অপরাধ বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বকে হতবাক করে দিল। এমন বর্বর ঘটনার জন্য পঁচাত্তরের কালরাতের সেই নরপিশাচরা পৃথিবীর বুকে যুগে যুগে নিকৃষ্ট-ঘৃণিত জীব হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকবে।
যেদিন আমার মা মারা যান সেদিন আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, আর সাথে সাথে তোমার কথা বেশি করে মনে পড়ছিল। আমার শুধু মা মারা গেছেন, তাই আমার এত কষ্ট হচ্ছে আর হাসিনা তো একই সাথে মা-বাবা-ভাই-ভাবীকে হারিয়েছে। এমন কী ছোট্ট ভাইটা, যে মার কাছে যেতে চেয়েছিল তাকেও নরপশুরা রেহাই দেয়নি। দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য তুমি কত বিরাট কষ্টকে বুকে চেপে রেখে হাসিমুখে বাংলাদেশের উন্নতির লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছ।
তুমি দেশে ফিরে এলে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে জীবন বাজি রেখে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করলে। জাতির পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ডুবে যাওয়া নৌকার হাল ধরলে। বাংলার মানুষ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
আবার অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম বদরুননেসা কলেজের (আদি Intermediate Girl’s College) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। কলেজে কি সাজসাজ রব। এই কলেজের ছাত্রী আজকে দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার কলেজে এসেছেন প্রধান অতিথি হয়ে। আমাদের ব্যাচের মেয়েদের কি অহংকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সহপাঠী বলে। সেইদিন খুব একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিটি ছাত্রীর বুকে ব্যাজ লাগানো ছিল- তাতে তার নাম ও কোন বছরের ব্যাজ লিখা ছিল। তুমি সবার সাথে হাত মিলাচ্ছিলে, কাউকে জড়িয়ে ধরছিলেÑ যেন সেই পুরনো দিনে ফিরে গেছ। আমাকে দেখে আমার নাম ধরে ডেকে হাত ধরলে। আমি তো আনন্দে আত্মহারা। এত বছর পরÑ প্রধানমন্ত্রী হয়েও তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ, আমার নামও মনে রেখেছ। পরে বুঝলাম ব্যাজের নাম দেখে দেখে তুমি সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছ। অবশ্য কয়েকজন যারা তোমার ঘনিষ্ঠ ছিল, তাদের তুমি দেখেই চিনেছ। তোমার এ বিষয়টা প্রশংসনীয়। এ ঘটনা নিয়ে বান্ধবীরা আমাকে নিয়ে খুব মজা করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বহুদিন পর আমরা সতীর্থরা একত্রিত হলাম। ‘আহা! কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে’- সারাটা দিন খুবই মজা আর আনন্দ হলো। এরপর থেকে আমরা মাসে-দু’মাসে একেকজনের বাসায় মিলিত হতে লাগলাম। তুমিও একদিন আমাদের আমন্ত্রণ জানালে। গণভবনে আমরা প্রায় সারাটা দিন কাটালাম। বেবী মওদুদ আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল তোমার জন্য উপহার কেনার। বেবীর বুদ্ধিতে পিতলের পানের বাটা কেনা হলো। রাজু আর আমি তোমার হাতে উপহারটি তুলে দিলাম। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল।
মাঝে বাংলাদেশে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেল। অবশেষে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা তোমাকে আবার তোমার জায়গায় ফিরিয়ে আনলো। তুমি তোমার সতীর্থদের আবার কাছে ডাকার সুযোগ পেলে। এমন প্রতি বছর রোজার সময় ইফতার পার্টিতে দাওয়াত করো। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাও। সতীর্থদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকো। শত ব্যস্ততার মাঝেও সতীর্থদের মনে রেখেছো। এই তো সেদিনও- গত বছরের ইফতার পার্টিতে পেয়ারু, আমি আর মমতাজমহল দাঁড়িয়ে ছিলাম। তুমি আমাদের দেখে খুশিতে ঝলমল করে উঠলে আর ক্যামেরাম্যানদের বললে আমাদের সাথে তোমার ছবি তুলতে।
যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান তুমি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায়-নীতি, আদর্শ ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ তোমার রক্তে মিশে আছে। বিচারের বাণী আজ আর নিভৃতে কাঁদে না। সন্ত্রাসবাদী আর দুর্নীতিবাজদের তুমি কঠোর হস্তে দমন করেছো। বাংলার মানুষ আজ শান্তিতে দু’মুঠো ভাত খেতে পারছে। তোমার নিরহংকার জীবন কল্যাণময় হোক। তোমার জন্মদিনে আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তোমাকে সুস্থ ও নীরোগ জীবন দান করেন এবং দীর্ঘজীবী করেন।

ইতি তোমার বন্ধু
কানিজ হায়দার (কণা)­

Category:

‘সেবা ডিজিটাল হলে দুর্নীতি থাকবে না’

Posted on by 0 comment

PMfউত্তরণ প্রতিবেদন: সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্পৃক্ত হয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইসিটির জ্ঞান ও ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলে আইসিটি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ফলে জনগণের জীবনমানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ডিজিটাইজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন অর্জন করেছে।
এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, দুর্নীতি রোধে সরকার সকল সেবা ডিজিটাল করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ১ হাজার ৫০০ সরকারি সেবার ৩০০টি ইতোমধ্যে ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। বাকি সকল সেবাকে ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের সকল সেবা ডিজিটাল হতে থাকায় ক্রমান্বয়ে দুর্নীতিও কমে আসছে। সরকারের সকল সেবা ডিজিটাল করা হলে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। আর দ্রুত সময়ে দেশকে ডিজিটালাইজড করার কার্যক্রম বাংলাদেশ ছাড়া খুব কম দেশই পেরেছে। আমরা এখন ই-গভর্নমেন্ট মাস্টারপ্ল্যান করছি। এখন যেহেতু ক্রিটিক্যাল কিছু সিস্টেম হয়ে গেছে। এটার ওপর বেইজ করে অন্যান্য সার্ভিস ডিজিটাইজ করা সহজ হয়ে গেছে।
গত ১০ জুলাই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সংসদ সচিবালয় আয়োজিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ : সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তব্য প্রদানকালে তারা এসব কথা বলেন। সংসদ সদস্যদের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে ধারণা দিতে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন এমপি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। কর্মশালায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্য স্পিকার আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ উপহার দিয়ে এক নবদিগন্তের উন্মোচন করেছেন। এই ডিজিটাল রূপান্তরের মূল কারিগর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থপতি সজীব ওয়াজেদ জয়। সারাদেশের জনগণ মাত্র ১০ বছরে ডিজিটাল সেবার সুফল ভোগ করছে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, মেধাভিত্তিক জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনে অবদান রাখছে ডিজিটালাইজেশন। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদই উন্নত বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।
স্পিকার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি ডিজিটাল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সংসদ সদস্যদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। তিনি বলেন, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বেতবুনিয়ায়                ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে মহাকাশ জয়ের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রচেষ্টায় ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিয়েছেন।
বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন, বাস্তবায়ন এবং তদারকিতে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণ করতে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপানে নিয়ে যেতে দেশের পুরনো আইন-কানুনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করলে তারাই বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে। সে লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মের জন্য যথাযথ শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বিদ্যমান নীতি ও আইনের পরিবর্তন দরকার উল্লেখ করে জয় বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে তাদের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে এগিয়ে যেতে হবে। এটা করতে হলে নীতিমালা, আইনের দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন। করতে পারলে আমরা আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারব। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল সেক্টরে এখন যেটা ফেস করছি তা হলো বাইরের অনেক কোম্পানি আসতে চায়। বিনিয়োগ করতে চায়। তবে আমাদের অনেকের মধ্যে একটি ধারণা রয়ে গেছে, বিদেশি কোম্পানি এসে খালি প্রফিট নিয়ে চলে যায়। ভেবে দেখুন, আজকে যদি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে না আসত থ্রিজি, ফোরজি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারতাম না। আজকে তারা কিন্তু দেশে এসে শুধু প্রফিট নিয়ে চলে যায়নি। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কত মানুষের লাভ হয়েছে, তারা ট্যাক্স দিচ্ছে। আজকের যুগ বিশ্বায়নের। নিজেদের আলাদা করে রাখতে পারি না। অর্থনীতি আরও ওপেন করতে হবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় যে কোনো কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারে। আমাদের সেদিকে যেতে হবে। সরকার একা সব পারে না। সরকারের সব কিছু করা উচিতও না। কারণ সরকার যদি সব কিছু করতে যায়, তখন আরেকটি বিষয় দাঁড়ায়। সেটা হলো সিস্টেম লস। বেসরকারি খাত লাভ-লোকসান বেশি দেখে। সেখানে সিস্টেম লস কম।’
বিনিয়োগ বাড়াতে মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘প্রয়োজন হলো আমাদের নিজেদের মাইন্ড সেট পরিবর্তন করা। তরুণ প্রজন্ম এবং সিনিয়রদের মধ্যে একটা জেনারেশন গ্যাপ থাকে। এটা বাস্তব। আমি একটু অনুরোধ করব, আমরা এখন আধুনিক পদ্ধতিতে নিজেদের চিন্তাধারা, ভয় ছেড়ে আরও অন্যান্য যেসব দেশ এগিয়ে গেছে যেমনÑ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া তাদের কাছ থেকে উদহারণ নিয়ে নিজেদের নিয়ম-আইন-নীতিমালা একটু দ্রুত পরিবর্তন করব।’
তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগে আমাদের দেশে শুধুমাত্র টুজি ছিল। ১০ বছরে আমরা শুধু থ্রিজি নয়, ফোরজিতে চলে এসেছি। আর আমাদের এখন পরিকল্পনা আছে যে সারাবিশ্বে যখন ফাইভজি আসবে তার সঙ্গে সঙ্গে এগোনোর।’ বাংলাদেশে বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমাদের আইসিটি অবকাঠামো যেটা করেছি, যেমনÑ হাইটেক পার্ক, ডেটা সেন্টার। এগুলো আপনারা দেখেছেন। আরেকটা হলো আমাদের টেলিকমিউনিকেশন। আমাদের ডেটা নেটওয়ার্কটাই আইসিটির রাস্তা। আপনারা যেমন নির্বাচনী এলাকায় রাস্তার কাজ করেন। সেই টেলিকমিউনিকেশনের রাস্তার কাজ আমরা করছি। ১০ বছর আগে আইসিটি মন্ত্রণালয় বলতে কিছু ছিল না। বাংলাদেশ সংসদ বিভিন্ন আইন করে এই মন্ত্রণালয় আজকে বাস্তবায়ন হয়েছে। সেগুলো আমরা নতুন করে করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু আমাদের টেলিকমিউনিকেশন এখনও সেই ২০ বছর আগের। এটাকে আমাদের নতুন করে মডেল পদ্ধতিতে আনার প্রয়োজন। আমি উদ্যোগ নিয়েছি। প্রায় ১৫ বছরের পরিকল্পনা করেছি। আমরা সম্পূর্ণ নতুন একটা টেলিকমিউনিকেশন পলিসি করব।

এনআইডি যাচাইয়ে গেটওয়ে ‘পরিচয়’ উদ্বোধনে জয়
চালু হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই করার গেটওয়ে ‘পরিচয়’ (www.porichoy.gov.bd)। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এই ওয়েবসাইটটি অনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। গত ১৭ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ওয়েবসাইটটির উদ্বোধন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এছাড়া আইসিটি বিভাগের সচিব এনএম জিয়াউল আলম, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম, এটুআই-এর পলিসি এ্যাডভাইজার আনির চৌধুরীসহ আইসিটি বিভাগের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জয় বলেন, সরকারি সেবাগুলো সহজে ও দ্রুততম সময়ে জনগণের মাঝে পৌঁছে দিতে চাই আমরা। আর সে-লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের টার্গেট প্রায় ৯০ শতাংশ সরকারি সেবা মানুষের মোবাইলে থাকবে; আঙ্গুলের সামনে থাকবে। সরকারি সেবা পেতে জনগণকে যেন সরকারি অফিসগুলোতে যেতে না হয় তা আমার স্বপ্ন। তারই একটি অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে আমাদের                এই সফল উদ্যোগ।

Category:

শস্যবীমা : কৃষকদের নিশ্চয়তার রক্ষাকবচ

Posted on by 0 comment

15 PMরাজিয়া সুলতানা:  কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ। শস্য-শ্যামলা এই দেশকে স্বনির্ভরতা এনে দিতে পারে কৃষি খাত। দূরদর্শী বর্তমান সরকারের লক্ষ্য আপামর কৃষক-সমাজকে ধাপে ধাপে বীমার আওতায় নিয়ে আসা। এতে কৃষিনির্ভর জনগণের জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমে আসবে। নিশ্চিত হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। দেশের সম্পদ ও জীবনের ঝুঁকির শতভাগ বীমার আওতায় নিয়ে আসার একটি পাইলট প্রজেক্ট হলো শস্যবীমা। চলছে কৃষিমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ব্যাপক তোড়জোড়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকছে বর্তমান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। কাজ করবে আবহাওয়া অফিস। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিদফতর, কৃষি ব্যাংক ও এনজিও ডিস্ট্রিবিউশন অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।
যদিও শস্যবীমা বাংলাদেশে নতুন কোনো উপাত্ত নয়। এর শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। চালু করেছিল সাধারণ বীমা কর্পোরেশন। তবে খরচ বেশি হওয়ায় ১৯৯৬ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৪ সালে পাইলট প্রকল্প আকারে আবারও শস্যবীমা চালু করে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)। 37 PMবর্তমান সরকারের নতুন সংযোজন আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। এ-কারণে কৃষি-অর্থনীতিসহ বাংলাদেশের কৃষকরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব প্রশমনের লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর অনুদানের ওপর ভিত্তি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি) আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালু করা হয় খরাপ্রবণ রাজশাহী, বন্যাপ্রবণ সিরাজগঞ্জ ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ নোয়াখালী জেলায়, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন প্রায়োগিক ধারণা। আবহাওয়া কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত আবহাওয়াজনিত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই বীমা পলিসি প্রস্তুত করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দাবিকৃত বীমা পরিশোধ করা হয়। ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল কৃষিপ্রধান দেশে ইতোমধ্যে এই বীমা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমার মাধ্যমে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হ্রাস করা। প্রকল্পের আওতায় প্রকল্পভুক্ত জেলায় মোট ২০টি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪টি পাইলটিংয়ের আওতায় ৬ হাজার ৭৭২ কৃষকের অনুকূলে অতিবৃষ্টিপাতজনিত বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টিজনিত ঝুঁকি আবরিত করে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক পরীক্ষামূলক শস্যবীমা পলিসি ইস্যু করা হয়েছে। প্রথম ৩টি পাইলটিংয়ের আওতায় আমন ধান ও আলু ফসলের অনুকূলে ৫ হাজার ৩৯৯টি আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমাপত্র ইস্যু করা হয়েছে। এই বীমা পলিসির বিপরীতে উত্থাপিত বীমা দাবি ১৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩১৪ টাকা। বীমাগ্রহীতা কৃষকের সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে তা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির চতুর্থ পাইলটিংয়ের আওতায় প্রকল্পভুক্ত ৩টি জেলায় বোরো ধানের বিপরীতে মোট ১ হাজার ৩৭৩টি পলিসি ইস্যু করেছে। ভ্যাটসহ ৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৪০ টাকা প্রিমিয়াম অর্জিত হয়েছে। উক্ত পলিসিসমূহের বিপরীতে মোট ৩২ লাখ ৮৩ হাজার ১০০ টাকা বীমা-দাবি সাধারণ বীমা কর্পোরেশন পরিশোধ করা হচ্ছে। তন্মধ্যে নোয়াখালী জেলায় ৪২৬ বিঘা জমির অনুকূলে ৪০০টি আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা পলিসি ইস্যু করা হয়েছে। ইস্যুকৃত পলিসির বিপরীতে উত্থাপিত দাবিকৃত বীমা ৩ লাখ ৭০ হাজার ১০০ টাকা সাধারণ বীমা কর্পোরেশন পরিশোধের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। বীমা পলিসির বিপরীতে কৃষকদের বিঘাপ্রতি ভ্যাটসহ মোট প্রিমিয়াম ছিল ৬৯০ টাকা। তন্মধ্যে সরকার বিঘাপ্রতি ভ্যাটসহ প্রিমিয়াম বাবদ ৩৯০ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি ৩০০ টাকা কৃষকের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সর্বমোট ৬ হাজার ৭৭২ কৃষকের অনুকূলে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমাপত্র ইস্যু করা হয়েছে। এফজিডি, ট্রেনিং এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ৫৪৪ কৃষককে ডব্লিউআইবিসিআই সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ট্রেনিং প্রোগ্রাম/ওয়ার্কশপ/সেমিনারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের ৯০০ জনেরও অধিক কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে রাজশাহী জেলায় পঞ্চম পাইলটিংয়ের মাধ্যমে আমন ধানের অনুকূলে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা পলিসি ইস্যুর কার্যক্রম চলছে।
কৃষি জাতির মেরুদ-। দেশের অর্থনীতি ঠিক রাখতে কৃষকের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, শস্যবীমা পারে এই নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করতে। কৃষিবান্ধব কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মো. আবদুর রাজ্জাক এমপি কৃষকের উন্নতি তথা দেশের উন্নতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। তার মতে, জনগণের জন্য পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য কৃষির কোনো বিকল্প নেই। তবে দরকার কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আর এ জন্যই শুধু ৩টি জেলাই নয়Ñ মন্ত্রী উদ্যোগ নিচ্ছেন সারাদেশকে শস্যবীমার আওতায় নিয়ে আসতে। পাশাপাশি শস্যবীমা নিয়ে উল্টো মতও রয়েছে কৃষি গবেষকদের।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমাদের দেশে হাওর অঞ্চলে অতি বন্যার কারণে ফসল নষ্ট হয়। এতে কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের এই ক্ষতি কমিয়ে আনতে আগামী বাজেটে কৃষকদের ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনারও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আরশেদ আলী জানিয়েছেন, প্রতিবছরই কৃষকরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এজন্য কৃষকরা তেমন কোনো ক্ষতিপূরণ পান না। আবার সরকারিভাবে যে ক্ষতিপূরণ পান তাও পর্যাপ্ত না। শস্যবীমা চালু হলে কৃষকরা পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাবেন। তাতে কৃষকরা লাভবান হবেন। এতে তাদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি দেশে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষকের অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের উন্নয়ন ঘটবে।
সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের আবহাওয়া ও শস্যবীমা প্রকল্পের পরিচালক ওয়াসিফুল হক এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রতিবছরই অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এতে কৃষি-অর্থনীতিসহ দেশে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই কৃষকদের রক্ষায় শস্যবীমার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফকির আজমল হুদা জানিয়েছেন, পৃথিবীর উন্নত বেশির ভাগ দেশে সরকার ও কৃষকদের সমন্বয়ে শস্যবীমা চালু আছে। আমাদের দেশেও তা চালু করা প্রয়োজন।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. এম সালাহ্ উদ্দিন চৌধুরীর মতে, বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে কৃষকদের জন্য শস্যবীমার কোনো বিকল্প নেই। পূর্ব এশিয়ায় অর্থাৎ আসিয়ান জোটভুক্ত কয়েকটি দেশের শস্যবীমা সংক্রান্ত গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদনের যে বিরাট হুমকি রয়েছে, তা একমাত্র শস্যবীমার মাধ্যমেই সমাধান করা যায়। শস্যবীমা চালু হলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আর্থিক ক্ষতি থেকে কৃষকরা বাঁচবেন, বলছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।
কৃষকরা জানায়, ফসল নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় থাকে এক ফসলি জমির চাষিরা। এক ফসলি এলাকার কৃষকরা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুষিয়ে নেওয়া যায় না সহজে। এছাড়া ফসলের ক্ষতি হলে সরকার যে পরিমাণ সহায়তা দেয়, তাতে চলতে কষ্ট হয় কৃষকদের। তাই প্রতিবছর অনিশ্চয়তায় থাকেন এক ফসলি জমির কৃষকরা। এই অনিশ্চয়তা কাটাতে কৃষিতে শস্যবীমা চান তারা।
তবে সার্বিকভাবে কৃষকরা শস্যবীমা করতে ভয় পান। কারণ বীমা প্রতিষ্ঠান প্রথমে এসে বীমা চালু করার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সময় মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। কিন্তু দাবিকৃত বীমা পরিশোধে চরম মনোভাবের পরিচয় দেন। অনেক হাতুরে প্রতিষ্ঠান টাকা নিয়ে পালিয়েও যায়। থাকে নানা শঙ্কাÑ কষ্ট করে টাকা দিবে যদি ক্ষতি পূরণ না পায় ইত্যাদি। এ-কারণে অনেক কৃষকই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এ-কারণেই শস্যবীমা পলিসি ১৯৭৭-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বন্ধই ছিল। শস্যবীমা পলিসি অনেকের গলার ফাঁসও হতে পারে। কারণ পলিসির সাফল্য তুলে আনতে হলে ঠিকঠাক প্রিমিয়াম জমা দিতে হবে। সময়মতো তা দিতে না পারা মানেই পলিসি কার্যকারিতা থাকে না। বীমাটিও বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাবিকৃত বীমা পলিসির সুফল ক্লায়েন্ট পায় না। এতে বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা শস্যবীমা পলিসির নানা দিক নিয়ে নানা কথা বলেছেন।

* যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণের অভাবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না দিয়েই তাড়াহুড়া করে প্রকল্প চালু করা;
* কৃষিঋণ প্রথার সঙ্গে এর কোনো সংযোগ না করা;
* এ উদ্যোগের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সহায়তা না থাকা;
* বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন না করেই প্রকল্পের আকার বৃদ্ধি;
* আমলাতান্ত্রিক জটিলতা;
* শস্যবীমা কর্মসূচি ঐচ্ছিক ও ব্যক্তিভিত্তিক থাকার কারণে সুবিধাভোগী নির্বাচনে ভুলত্রুটি;
* দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শস্যঋণ মওকুফের ক্ষেত্রে দলীয় এবং স্বজনপ্রীতির প্রবণতা এবং
* বীমার আওতাধীন বিষয় একাধিক ছিল বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা, রোগবালাই ইত্যাদি।

বর্তমান সরকার অবশ্য শস্যবীমা কর্মসূচি ব্যবস্থাপনা জটিলতা নিরসনে কিছু সংশোধনী এনেছেÑ
* সরকার ও ঋণদানকারী সংস্থা বীমার প্রিমিয়ামের একাংশ বহন করবে;
* ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যয় তহবিল গঠিত হবে এবং
* ব্যক্তিভিত্তিক ক্ষতিপূরণের প্রথার পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক ক্ষতিপূরণের প্রথা চালু হবে।

সর্বোপরি আবহাওয়া সূচক অঞ্চলভিত্তিক ক্ষতিপূরণের মডেল প্রথাই যথাযথভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া আরও ফলপ্রসূ করার জন্য বীমা সার্ভেয়ারদের পেশাদারিত্ব মনোভাব তৈরির ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকার সার্ভেয়ারদের একটি আইনি কাঠামোয় আনার চেষ্টা করছে। এবং তারা তা মেনে চলতে বাধ্য। প্রাধান্য পাচ্ছে নথিপত্র, কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করা। সময়মতো নথিপত্র সংগ্রহ করা ইত্যাদি।
বীমা প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নতুন করে কৃষকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে ফসল তোলা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা এবং আপলোড করার পাশাপাশি সব খবরই এখন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে কৃষক ও বীমাকর্মীদের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। শস্যবীমার অর্থ পেতে আর বিলম্ব হবে না। যেহেতু বীমা সম্পর্কে মানুষের মৌলিক ধারণা এই পলিসি অর্থের বিনিময়ে জীবন, সম্পদ বা মালামাল রক্ষা করে। আর শস্যবীমা হলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের রক্ষা করে। তাই আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে শস্যবীমা চালুর মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকই হচ্ছে এ দেশের চালিকাশক্তি। তাই কৃষককে বাঁচাতে পারলেই  বাঁচবে দেশ। গড়ে উঠবে সোনার বাংলা। ঘটবে কৃষি বিপ্লব। আর কৃষক দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবেই পূরণ হবে বর্তমান সরকারের ভিশন ও মিশন।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি, শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি
raziasultana.sau52@gmail.com

Category:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির

Posted on by 0 comment

PfcMড. জাফর ইকবাল: আমি আজকাল ভাগ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। (না, আমি অন্যদেরও আমার মতো ভাগ্য বিশ্বাস করা শুরু করতে বলছি না!) তবে আমি নিজে কেন ভাগ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছি সেই কাহিনিটা একটু বলি।
সেই ছেলেবেলা থেকে যখন পৃথিবী আঁকতে হয়েছে তখন প্রথমে একটা গোলবৃত্ত এঁকেছি, তারপর তার মাঝে ডান থেকে বামে এবং ওপর থেকে নিচে কয়েকটা রেখা টেনেছি এবং সেটা দেখতে তখন পৃথিবী পৃথিবী মনে হয়েছে। তবে কেন গোলবৃত্তের মাঝে এ-রকম রেখা টানলে সেটাকে পৃথিবীর মতো মনে হয় সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই নি। একটু বড় হয়ে জানতে পেরেছি পৃথিবী তার অক্ষের ওপর ঘুরছে বলে দিন-রাত হয় এবং সূর্যের সাপেক্ষে এটা একটু বাঁকা হয়ে আছে (ঠিক করে বলা যায় ২৩.৫ ডিগ্রি) বলে শীত বসন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা এসব পাই। তা না হলে সারাবছর একই রকম থাকত, একঘেয়েমিতে আমরা নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যেতাম। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে দিন ছোট-বড় হয় আমরা সবাই সেটা লক্ষ করেছি। কিন্তু তার সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার ঘটে, সবাই সেটা লক্ষ্য করেনি। আমরা ধরেই নিয়েছে সূর্য পূর্বদিকে ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়; কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে সেটা যে কখনও কখনও ঠিক মাথার ওপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায় এবং কখনও কখনও একটু দক্ষিণে হেলে পড়া অবস্থায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায় সেটা কিন্তু সবাই জানে বলে মনে হয় না। সত্যি কথা বলতে কী পৃথিবীর সব মানুষ কিন্তু দাবিও করতে পারবে না যে, তারা বছরের কোনো-না-কোনো সময় সূর্য ঠিক তাদের মাথার ওপর দিয়ে যেতে দেখেছে। পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ছোট একটা অংশের মানুষের সূর্যকে ঠিক মাথায় ওপর দিয়ে যেতে দেখার সৌভাগ্য হয়। সৌভাগ্য শব্দটা ব্যবহার করেছি তার একটা কারণ আছে। কারণ, সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে তখন আমরা অবাক হয়ে দেখি মাটিতে আমাদের যেন কোনো ছায়া নেই। বিষুব রেখার আশপাশে শুধু বিষুবীয় অঞ্চলে সেটা ঘটে এবং সবচেয়ে উত্তরে যেখানে সেটা ঘটে সেটা একটা রেখা দিয়ে নির্দিষ্ট করা আছে এবং সেই রেখাটির নাম কর্কট ক্রান্তি। ঠিক সে-রকম দক্ষিণে যে পর্যন্ত এটা ঘটতে পারে সেটা আরেকটা রেখা দিয়ে নির্দিষ্ট করা আছে। সেই রেখাটির নাম মকর ক্রান্তি। (কর্কট ক্রান্তি এবং মকর ক্রান্তির মতো আর দুটি গুরুত্বপূর্ণ রেখা আছে দুই মেরুর কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে মানুষজন বেশি যায় না বলে আপাতত কিছু বলছি না।) অল্প জায়গার ভেতরে অনেক বেশি জ্ঞান দেয়ার ঝুঁকি নিয়ে হলেও আর দুটি তথ্য দিয়ে শেষ করে দিই। কর্কট ক্রান্তি, মকর ক্রান্তি এবং বিষুব রেখা নামে পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেখার কথা বলা হয়েছে। মাপজোখ করার জন্য উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত রেখারও প্রয়োজন। সেজন্য গ্রিনউইচকে শূন্য ডিগ্রি ধরে উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত একটি রেখা ধরে নেয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তখন ৯০ ডিগ্রি, ১৮০ ডিগ্রি এবং ২৭০ ডিগ্রি দ্রাঘিমার রেখাগুলোর একটা বাড়তি গুরুত্ব চলে আসে। আমরা যখন পৃথিবী আঁকি তখন একটা বৃত্ত এঁকে তার মাঝখানে এই রেখাগুলো আঁকার চেষ্টা করি এবং তখন বৃত্তটাকে পৃথিবী পৃথিবী মনে হয়!
যারা এখন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে আমার লেখাটি পড়ে এসেছেন এবং আমি কী বলার চেষ্টা করেছি বোঝার চেষ্টা করেছেন তারা যদি বিষয়টা পুরোপুরি নাও বুঝে থাকেন তাদের আমি খুব শর্টকাটে মূল কথাটি বলে দিই। ভৌগোলিক কারণে পৃথিবীতে তিনটি পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত রেখা আছে। সেগুলো হলো কর্কট ক্রান্তি, মকর ক্রান্তি এবং বিষুব রেখা। ঠিক সে-রকম চারটি উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত রেখা আছে। সেগুলো হলো শূন্য ডিগ্রি, ৯০ ডিগ্রি, ১৮০ ডিগ্রি এবং ২৭০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা।
এবারে একটা তথ্য দিতে পারি, যেটা সবার জন্য নিঃসন্দেহে একটি চমকপ্রদ তথ্য হবে। চারটি উত্তর-দক্ষিণ রেখা এবং তিনটি পূর্ব-পশ্চিম রেখা, সব মিলিয়ে বারো জায়গায় ছেদ করেছে। নিঃসন্দেহে এই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বারোটি বিন্দু। বারোটি বিন্দুর দশটি বিন্দুই পড়ছে সাগরে-মহাসাগরে। তাই মানুষ সেখানে যেতে পারে না। একটি পড়েছে সাহারা মরুভূমিতে। সেখানেও জনমানুষ যায় না। শুধু একটি বিন্দু (হ্যাঁ, শুধু একটি মাত্র বিন্দু) পড়েছে শুকনো মাটিতে, যেখানে মানুষ যেতে পারে। সেই বিন্দুটি পড়েছে আমাদের বাংলাদেশে। জায়গাটি ফরিদপুরের কাছে ভাঙ্গা উপজেলায়। কেউ যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে গুগল ম্যাপে গিয়ে ২৩.৫ঘ ৯০উ লিখতে পারে সঙ্গে সঙ্গে সেটি কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা কোথায় ছেদ করেছে সেটা দেখিয়ে দেবে।
সেই শহরে যখন বিষুব রেখা, কর্কট ক্রান্তি, মকর ক্রান্তি এই বিষয়গুলো পড়েছি আমি তখন থেকে জানি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কর্কট ক্রান্তি গিয়েছে। সেটা গিয়েছে কুমিল্লা-যশোর এই এলাকার ওপর দিয়ে। কিন্তু ঠিক কোথায় সেই রেখাটি সেটা জানার অনেক কৌতূহল ছিল; কিন্তু জানার কোনো উপায় ছিল না। কেউ একজন বলেছিল এটা না-কি কুমিল্লা শহরের টমসন ব্রিজের ওপর দিয়ে গিয়েছে। আমি সেই জায়গাটা বের করতে গিয়েছিলাম (আসলে তথ্যটি নয়, প্রকৃত কর্কট ক্রান্তি আরও ২ কিলোমিটার উত্তরে)।
এখন সস্তা থেকেও সস্তা টেলিফোনে জিপিএস থাকে তাই পৃথিবীর যে কোনো জায়গার অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ বের করে ফেলা যায়। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন পর্যন্ত জিপিএস সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়নি। ২০০০ সালে সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং বাজারে জিপিএস কিনতে পাওয়া যেতে পারে। আমি একবার আমেরিকা গিয়েছি এবং সেখান থেকে একটা জিপিএস কিনে এনেছি। সেই জিপিএস’কে সম্বল করে আমি প্রথমবার ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তায় ঠিক কোথায় কর্কট ক্রান্তি পার হয়েছি সেটা বের করে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলাম। আমার খুব ইচ্ছা হয়েছিল যে, রাস্তার পাশে একটা সাইন বোর্ড লাগিয়ে দিই। সেখানে লেখা থাকবে ‘আপনারা এখন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক রেখা কর্কট ক্রান্তি পার হতে যাচ্ছেন!’ তবে আমার ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি। আমি টের পেয়েছিলাম রাস্তার পাশে ইচ্ছা করলেই সাইন বোর্ড লাগানো যায় না এবং আমি প্রতিবার কর্কট ক্রান্তি পার হলেই যেভাবে আনন্দে চিৎকার করি অন্য সবাই সেভাবে চিৎকার নাও করতে পারে!
তারপর খুব সংগত কারণেই একদিন আমি একজনকে সঙ্গে নিয়ে কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদ বিন্দুটি খুঁজে বের করার জন্য বের হলাম। আগেই ম্যাপে জায়গাটি দেখে রেখেছি; কিন্তু ঠিক কোন দিক দিয়ে যেতে হবে জানি না। খুঁজে খুঁজে সেই জায়গাটি বের করতে হয়েছে। ভয় ছিল হয়তো গিয়ে দেখব আসলে সেটা একটা নদীর ভেতর কিংবা বিলের ভেতর পড়েছে। তখন আমার দুঃখের শেষ থাকবে না। কিন্তু দেখলাম জায়গাটি ছোট রাস্তার পাশে একটা ক্ষেত। যখন আমি গিয়েছি তখন সেখানে মটরশুটি না হয় কলাই লাগানো হয়েছে। আমি কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুললাম। আমি নিশ্চিত জমি চাষ করার সময় অনেক মানুষ এই বিন্দুটির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছে; কিন্তু এই জায়গাটির অচিন্তনীয় ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুভব করে সম্ভবত আর কেউ এখানে পা দেয়নি।
প্রতিবছর জুন মাসের ২১ তারিখ (অর্থাৎ ঠিক এক সপ্তাহ আগে) দুপুর বারোটার সময় কেউ যদি বাইরে দাঁড়ায় এবং আকাশে মেঘ না থাকে তা হলে আবিষ্কার করবে সূর্য ঠিক মাথায় ওপর এবং সে জন্যে সেখানে তার কোনো ছায়া পড়ছে না। কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার সেই ছেদ বিন্দুতে সেটি একেবারে পুরোপুরি আক্ষরিকভাবে সত্যি। তবে বাংলাদেশ যেহেতু ছোট এবং সূর্য যেহেতু ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে তাই সারাদেশেই এটা দেখা সম্ভব। তবে জুন মাস বর্ষাকাল এবং প্রায় সময়েই আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে। আমি যখন শাবি প্রবিতে ছিলাম তখন আকাশে মেঘ না থাকলে জুন মাসের ২১ তারিখ দুপুর বারোটায় ছাত্র এবং সহকর্মীদের নিয়ে খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে অনেকবার ছায়াহীন মজার ছবি তুলেছি! যাই হোক, আমার কাছে মনে হয়েছে কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা যায় এটি সারা পৃথিবীর একমাত্র এ-রকম একটি জায়গা। মাদাগাস্কার ওপর দিয়ে মকর ক্রান্তি গিয়েছে এবং শুনেছি সেটাকেই তারা গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের বেলায় শুধু কর্কট ক্রান্তিই নয়, তার সঙ্গে ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাও আছে এবং সেটি একটি নির্দিষ্ট বিন্দু। বলা যেতে পারে এটি হচ্ছে একটা মানমন্দির তৈরি করার জন্য একেবারে আদর্শতম জায়গা। যেহেতু পৃথিবীর আর কোথাও এ-রকম নেই, তাই অন্যরা কীভাবে করেছে তার সঙ্গে তুলনা করারও কিছু নেই। আমরা যেভাবে করব সেটাই হবে একমাত্র উদাহরণ। এটা যে শুধু একটা মানমন্দির হবে তা নয়, এটা যদি ঠিকভাবে তৈরি করে সবাইকে জানানো যায় তাহলে শুধু যে দেশ থেকে মানুষজন জায়গাটাতে একবার পা দিতে আসবে তা নয়, সারা পৃথিবী থেকেই আসবে। এটা হতে পারে দেশের অন্যতম একটা পর্যটন কেন্দ্র। যদি বিশ্বমানের একটা মানমন্দির তৈরি করা যায়, তাহলে আমরা সেটা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করতে পারি। আসলে বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক। তাই ছোটখাটো স্থাপনা উৎসর্গ করে হয়তো তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো যায় না; কিন্তু সারা পৃথিবীর একমাত্র এ-ধরনের একটি জায়গায় একটা মানমন্দির তৈরি করা হলে সেটি নিশ্চয়ই তাকে উৎসর্গ করা যাবে। বঙ্গবন্ধুর নামেই সেই মানমন্দিরটি তৈরি করা যেতে পারে।
সেটি করার জন্য সবার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা অধিগ্রহণ করতে হবে। আমি বহুদিন থেকে এই প্রক্রিয়াটা শুরু করার চেষ্টা করে আসছি। এটা নিয়ে বেশি আলোচনা করি না, কারণ যদি কোনো একজন ঋণখেলাপি জমিখেকো কোটিপতি এটা সম্পর্কে জেনে যায় এবং জায়গাটার দখল নিয়ে সেখানে একটা এমিউজমেন্ট পার্ক বানানো শুরু করে দেয় তাহলে কী হবে? বলাই বাহুল্য, পুরো ব্যাপারটাই আমার অসংখ্য স্বপ্নের মতো একটা স্বপ্ন হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল যদি কোনোভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টা জানানো যেত তাহলে তিনি হয়তো কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন। কিন্তু একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে কীভাবে নিজের একটি ব্যক্তিগত স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া যায় কিংবা আদৌ যাওয়া সম্ভব কি না সেটা আমার জানা ছিল না।
তখন একেবারে হঠাৎ করে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। আমি আবিষ্কার করলাম বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটিতে আমার নাম আছে এবং সেই কমিটির একটি সভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। শুধু তাই নয়, সেই সভায় সবাই যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে কী করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা করছেন তখন হঠাৎ করে আমাকেও কথা বলার সুযোগ দেয়া হলো এবং আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার এই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নটির কথা দেশের অনেক গণ্যমান্য মানুষের সামনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলার সুযোগ পেলাম। আমি বেশ অবাক হয়ে এবং আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করলাম সভার সকল গণ্যমান্য মানুষ এবং প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রস্তাবটি খুব পছন্দ করলেন। প্রধানমন্ত্রী জায়গাটি কোথায় জানতে চাইলেন। তখন আমি বললাম সেটি ভাঙ্গা উপজেলার কাছাকাছি। তিনি খুশি হয়ে বললেন আমাদের পদ্মা ব্রিজ ঠিক সেখানেই শেষ হবে। একে নিশ্চয়ই বলে সোনায় সোহাগা!
আমি উৎসাহ পেয়ে বললাম, যদি সেখানে সত্যিই বঙ্গবন্ধুর নামে একটা মানমন্দির বসানো হয় তাহলে আমরা দেশের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পুরো কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা বরাবর কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগিয়ে দিতে পারি। সেই কৃষ্ণচূড়া গাছে যখন ফুল ফুটবে তখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যখন কোনো প্লেন যাবে তারা অবাক হয়ে দেখবে সবুজ দেশটির মাঝখানে দুটি লাল রেখা। যে বিন্দুতে ছেদ করেছে সেখানে আমাদের বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে একটি মানমন্দিরÑ কী চমৎকার!
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির’ স্থাপন করার জন্য একটা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে! কারিগরি কমিটি তৈরি করে তারা একটি সভা পর্যন্ত করে ফেলেছে!
কাজেই আমি যদি বলি আমি ভাগ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, কেউ কী আমাকে দোষ দিতে পারবে?

Category:

ইকোসকে বিপুল ভোটে জয় বাংলাদেশের

Posted on by 0 comment
জাতিসংঘে নতুন মর্যাদা

জাতিসংঘে নতুন মর্যাদা

জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সদস্য পদ নির্বাচনে বাংলাদেশ বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। গত ১৪ জুন সকালে ১৯১ ভোটের মধ্যে ১৮১ ভোট পেয়ে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট মর্যাদাপূর্ণ এই পরিষদের সদস্য হয়। বাংলাদেশ ছাড়া এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে এ নির্বাচনে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন জয়ী হয়েছে। এই বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ২০২০-২২ মেয়াদে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে এবং বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম ইকোসকে তার দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করল। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এগিয়ে চলার স্বীকৃতি বলে মনে করেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মারিয়া ফার্নেন্দা এপ্সিনোসা গার্সেজের সভাপতিত্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গোপন ভোটে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফল ঘোষণা হওয়ার পর জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে সাংবাদিকদের কাছে এ বিজয়ের অনুভূতি ব্যক্ত করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, এই বিজয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক অনন্য উপহার। টেকসই উত্তরণ নিশ্চিতে ইকোসকের এই সদস্য পদ লাভ আমাদের আরও সামনে এগিয়ে নেবে। এছাড়া এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নেও এই বিজয় নতুন গতি আনবে।
ইকোসকের সদস্য পদ লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ এর আওতাধীন বিভিন্ন ফোরাম, কমিশন, কমিটি, নির্বাহী বোর্ড ও আঞ্চলিক ফোরাম, যেমনÑ ইউএনএসকাপের সঙ্গে এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে। ইকোসকে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তিন বছর মেয়াদে বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করবে। তিন বছর আগের কমিটিতেও বাংলাদেশ ইকোসকের সদস্য ছিল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০১৯-২১ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে।

Category:

অ্যালবাম

Posted on by 0 comment

12 copy 13 (c) copy 14 copy 27 copy 28 copy

Category:

দিনপঞ্জি : এপ্রিল ২০১৯

Posted on by 0 comment

PM2 ০২ এপ্রিল
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে এখন ১৪ লাখ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী রয়েছে। বর্তমানে সরকার ১০ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মাসিক ৭০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করছে। আগামী বাজেট থেকে দেশের সব প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেওয়া হবে। সরকারপ্রধান বলেন, পিতামাতা ও অভিভাবকহীন নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য সরকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বগুড়ায় ৫০ আসনের পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে বৃহৎ পরিসরে এ-ধরনের পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রে তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, খেলাধুলাসহ সব সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতে প্রতি জেলায় এ-ধরনের কেন্দ্র তৈরি করা হবে। দ্বাদশ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

০৩ এপ্রিল
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি না করার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘সামনে রোজা। এই সময় তেল, ছোলা, চিনি, ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ে। একইসঙ্গে পর্যাপ্ত সরবরাহ যেন থাকে, সে-বিষয়টিও আপনাদের দেখতে হবে।’ গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশব্যাপী ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্বোধন এবং ১৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে তিনি এ-কথা বলেন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) আওতাধীন বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক উৎপাদন, ২০টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ৫টি চলমান কাজেরও উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা।

০৪ এপ্রিল
* মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাতে না জড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘যেহেতু তারা আমাদের একবারে প্রতিবেশী, সেহেতু আমরা তাদের সঙ্গে সংঘাতে যাব না। বরং তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের যেন তারা ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রচেষ্টাই আমাদের অব্যাহত থাকতে হবে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব যেন, সেভাবে সবাই দায়িত্ব পালন করেন।’
০৫ এপ্রিল
* কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র ও জনগণের শাসন কায়েম হয়েছে। জনগণকে নিয়ে আমরা দেশ পরিচালনা করছি। যেদিন জনগণ আমাদের থেকে মুখ সরিয়ে নিবে সেদিন আমরাও ক্ষমতায় থাকব না। দেশে অবশ্যই গণতন্ত্র আছে এবং বর্তমান সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার। যারা বলছে দেশে এক দলীয় শাসন চলছে, তারা এ-কথা কীভাবে বলছে। দেশে মিডিয়ার অবাধ তথ্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সেদেশে এক দলীয় শাসন কীভাবে হয়। কাজেই এটা মিথ্যাচার এবং অপবাদ। তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই। তারা ২০০৬ সালে নিজেদের কবর খুঁড়েছিল। তাদের অপশাসন, দুঃশাসনে দেশের মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়ন টাঙ্গাইলের মধুপুর শাখার আয়োজনে দুপুরে সংগঠনের শ্রমিক সদস্যদের সন্তান যারা শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবী তাদের সম্মাননা ও বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

PM3০৮ এপ্রিল
* খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি নয়, তার চিকিৎসা নিয়ে রাজনীতি করাই বিএনপির মূল লক্ষ্য বলে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ এমপি। তার প্যারোলে মুক্তির জন্য যদি আবেদন করা হয়, তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপ-কমিটি আয়োজিত ‘ভবনের কর্মদক্ষতাভিত্তিক অগ্নি সুরক্ষা : বর্তমান প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের কাউন্সিল হলে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

১০ এপ্রিল
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অধিকতর গবেষণার জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সব ক্ষেত্রে গবেষণাই হচ্ছে একমাত্র পথ। গবেষণার মধ্য দিয়েই সমাজকে আমরা গড়ে তুলতে পারি। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা আরও ভালো করে গবেষণা করুন, কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও বেশি উৎকর্ষ লাভ করতে পারে এবং কোথায় আমাদের আরও বিনিয়োগ করা দরকার। আমাদের দেশের জলবায়ু, মাটি, পানি সবকিছু নিয়েই আপনাদের কাজ। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে টেকসই করতে গবেষণা অপরিহার্য। কাজেই সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সবাই কাজ করবেন, সেটাই আমি চাই। কারণ বিশ্বের সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে চলব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ এবং গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ-কথা বলেন।

১১ এপ্রিল
* ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি অন অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার-এর চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল বলেছেন, কেবল অবকাঠামো নয়, উন্নত ও মানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চাই প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। রাজধানীর স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র প্রণয়ন সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ-কথা বলেন।

১২ এপ্রিল
* আগুনে পুড়িয়ে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যার নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেছেন, এই হত্যাকা-ের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। তবে যারা বোরকা পরে নুসরাতের শরীরে আগুন লাগিয়ে হত্যা করেছে, জড়িতদের কাউকে ছাড়ব না। তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, তারা কেউ ছাড় পাবে না। তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে। সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতেই হবে। আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা বরদাশত করা হবে না। গণভবনে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মেয়েটিকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখজনক মেয়েটি আমাদের ছেড়ে চলে গেল। তাকে হত্যা করা হয়েছে বোরকা পরে হাত-মুখ ঢেকে। ওকে আগুন দেওয়া হয়েছে। যারা নুসরাতকে আগুন দিয়ে হত্যা করেছে তারা জঘন্য কাজ করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ধরা হয়েছে। বাকিদেরও ধরা হবে। কেউ ছাড় পাবে না। এদের কঠোর বিচারের আওতায় আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা ঘৃণিত অপরাধ।

১৩ এপ্রিল
* ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক রক্ত দিয়ে লেখা’। একাত্তরে ভারতের ১২ হাজার সৈনিক আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। এক কোটির বেশি বাংলাদেশিকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। এই ৪৮ বছরে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। ভারতের বিখ্যাত গণমাধ্যম প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মাস কমিউনিকেশন’ (আইআইএমসি)-এর সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন আইআইএমসি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি প্রধান অতিথির বত্তব্যে এ-কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, দুই দেশের সাংবাদিক, শিল্পী, সংস্কৃতিসেবী, খেলোয়াড়সহ সব খাতের মানুষের মধ্যে দৃঢ় বন্ধন তৈরি হয়েছে। সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগের বাইরে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগ দিনে দিনে বাড়ছে। মেধাবীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ালে অভিন্ন লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে।
* পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম এমপি বলেছেন, দেশের নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করা এবং নাব্য রক্ষায় সরকার সচেষ্ট। ইতোমধ্যে সরকার এ-ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে এবং যা দৃশ্যমান। পানিসম্পদ রক্ষায় সরকারের যা যা করা দরকার, তার সবটুকুই করবে। নেত্রকোনার প্রধান নদী মগড়া পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

১৪ এপ্রিল
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশ সার্বিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। যে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে। বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতি সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলবে। বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। সমগ্র দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গণভবনে আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের সকল কর্মের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণ করে যাব। বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন। বাংলা নববর্ষ সবার জীবনকে সুন্দর এবং উদ্ভাসিত করে তুলবে এবং বাংলাদেশে তার সরকারের নেতৃত্বে চলমান উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলা নতুন বছর ১৪২৬-র নতুন সূর্য সবার জীবনকে সুন্দর করুক, উদ্ভাসিত করুক, সফল করুক সেটাই আমি কামনা করি। তিনি আরও বলেন, পুরাতন বছরকে পেছনে ফেলে আমরা নতুন বছরে পদার্পণ করছি। সমগ্র বাঙালি জাতিকে এই নববর্ষে আমি শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। শুভ নববর্ষ!

১৬ এপ্রিল
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সব বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা জানিয়ে বলেছেন, শিক্ষার মান রক্ষায় যত্রতত্র মেডিকেল কলেজ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। আমরা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না, সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী চিকিৎসার সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। দেশের সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রচলিত চিকিৎসা-ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা চিরায়ত স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা ভেষজ, আয়ুর্বেদিক, ইউনানী এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা উপেক্ষা করতে পারি না এবং মানুষের চিকিৎসার সুবিধার জন্য এগুলোর উন্নয়নের জন্য আরও গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে এবং বিদেশে এর চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চিরায়ত ওষুধেরও ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ ও জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

১৭ এপ্রিল
* মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালিত হয়েছে। দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের ৪৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঐতিহাসিক এ দিনটি স্মরণে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননেও জাতীয়ভাবে পালিত হয় নানা কর্মসূচি। দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, গার্ড অব অনার প্রদান, কুচকাওয়াজ প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দিবসটি পালনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবেও শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আরেকবার পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

১৮ এপ্রিল
* বিদেশি পর্যটকরা যাতে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে নির্বিঘেœ চলাফেরা করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। নবম বাংলাদেশ ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের ঐতিহ্যসহ পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানগুলোকে বিদেশে চমৎকারভাবে তুলে ধরতে হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ আমাদের দূতাবাসগুলোকে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিদেশি পর্যটকরা আমাদের অতিথি। তারা যাতে নির্বিঘেœ এবং আনন্দঘন পরিবেশে বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে পারে, আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়, তাও নিশ্চিত করতে বলেন রাষ্ট্রপতি। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দেশের পর্যটন খাতের বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

২১ এপ্রিল
* তথ্য-প্রযুক্তি খাতে প্রতিবেশী দেশগুলো কী করছে, তাতে নজর না দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে তথ্য-প্রযুক্তিবিদদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) সামিটের চতুর্থ আসর উদ্বোধন করতে এসে তিনি এ নির্দেশনা দেন। তথ্য-প্রযুক্তিবিদদের উদ্দেশ্যে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, দেশকে কীভাবে ডিজিটাইজড করতে হবে, এ বিষয়ে কোনো দেশেরই কোনো পরিকল্পিত রূপকল্প ছিল না। কোনো কোনো দেশ এটাকে অর্গানিক্যালি করেছে। প্রতিটি দেশের সমস্যা ও সম্পদ একেবারে আলাদা। তাই আপনাকে থাকতে হবে নির্দেশকের ভূমিকায়। আর আমরা তা সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছি। তাই আপনাদের প্রতি আমার বার্তা হলো, আপনারা নতুন কিছু উদ্ভাবন করুন, নতুন প্রযুক্তি খুঁজুন। আপনারা কেউ অনুকরণ করবেন না, উদ্ভাবন করুন। আর এটাই আমার লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য।
২৪ এপ্রিল
* প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা শ্রীলংকায় ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের কোথাও কোনো অস্বাভাবিক কিছু পায়, সঙ্গে সঙ্গে যেন দেশবাসী তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানায়। আমরা জঙ্গিবাদ কঠোর হস্তে দমন করেছি। আমরা চাই না পৃথিবীতে এ-ধরনের ঘটনা কোথাও ঘটুক। এসব ঘৃণ্য হামলার সঙ্গে যারা জড়িত, সেসব সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের কোনো ধর্ম নেই, দেশকাল পাত্র নেই। জঙ্গি জঙ্গিই, সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই। দেশবাসীর কাছে আহ্বান, এই সন্ত্রাসী ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে মানুষ যেন জড়িত না হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বোমা হামলায় নিহত শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির নাতি জায়ানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আরও বলেন, ওই ঘৃণ্য হামলায় শুধু জায়ান চৌধুরীই নয়, ৪০ জনের কাছাকাছি শিশুসহ প্রায় সাড়ে ৩০০ মানুষ মারা গেছে। এ-ধরনের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও বোমা হামলার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আমি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের কারণে এ-ধরনের ঘটনা ঘটছে, এর মধ্যে হামলাকারীরা কি অর্জন করছে জানি না। এই ছোট নিষ্পাপ শিশু তো কোনো অপরাধ করেনি? তারা কেন এভাবে জীবন দেবে? কিছুদিন পূর্বেই নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সরাসরি গুলিতে অনেক মানুষকে হত্যা করা হলো। সেখানেও নারী ছিল, শিশু ছিল। আমাদের ক্রিকেট টিমও ছিল। খুব অল্পের জন্য তারা বেঁচে গেছে। সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ মানুষের কোনো কল্যাণ আনতে পারেনি।
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বলেছেন, ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সব সময় ভালো থাকবে এবং এ-সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও ভালো হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সেখানে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো থাকবে। গওহর রিজভী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম অডিটরিয়ামে আশুতোষ চক্রবর্তী স্মারক শিক্ষা বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ-কথা বলেন। এর আগে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।

২৮ এপ্রিল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খুন, অগ্নিসন্ত্রাস, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা, ধর্ষণ ও নানা ধরনের সামাজিক অনাচার চলছেÑ এগুলোর বিচার যেন খুব দ্রুত হয়, এদের কঠোর শাস্তি হয়। যাতে এর কবল থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পেতে পারে। সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৯’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই যেখানে ধনী, দরিদ্রের কোনো বৈষম্য থাকবে না। জনগণ মৌলিক অধিকারগুলো ভোগ করে নিজেরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারবে। তিনি বলেন, আমরা চাই প্রতিটি মানুষ ন্যায়বিচার পাক এবং সেই ব্যবস্থাটা যেন চালু হয়। কারণ, আমরা চাই না ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের কারণে, আমরা যেমন বিচার না পেয়ে কেঁদেছি আর কাউকে যেন এভাবে কাঁদতে না হয়। সবাই যেন ন্যায়বিচার পেতে পারে সেটাই আমরা চাই। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক মামলার দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রয়েছে, কেন যে আটকে রয়েছে তারা নিজেরাও জানে না। তাদের দোষটা যেমন কেউ জানে না, তেমনি কীভাবে আইনগত সহায়তা নিতে পারে তাও জানা নেই। সেই বিষয়টা দেখার জন্য আমরা ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং আমার মনে হয়, আইন মন্ত্রণালয় এ-ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৯’ উপলক্ষে বেসরকারি সংস্থা, প্যানেল আইনজীবী এবং লিগ্যাল এইডÑ এই ৩টি ক্যাটাগরিতে বিশেষ সম্মাননাপ্রাপ্তদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।

PM4২৯ এপ্রিল
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এ-ধরনের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এর বিরুদ্ধে দেশের সকল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের কোথাও এতটুকু জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের আলামত দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দিন। আমরা এ-ধরনের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে আর দেখতে চাই না। বাংলাদেশকে আমরা উন্নত ও শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলব। নুসরাত হত্যাকা-সহ যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারাই এ-ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জড়িতরা কে কোন দলের তা দেখা হবে না। যৌন নিপীড়ন যারা করবেন তাদেরও রেহাই নেই। অনেকেই কঠোর আইনের কথা বলেছেন। আইন রয়েছে। কিন্তু প্রয়োগে কঠোর আইন করতে হয় আমরা করব। তাদের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয় সেই ব্যবস্থাই আমরা করব। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদ, শ্রীলংকার গির্জা ও হোটেলে সন্ত্রাসী হামলা, ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ এবং এসব সন্ত্রাসী, যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল সংসদ, সরকার ও নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আনীত সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

Category:

গ্রীষ্মের ফলের পুষ্টিগুণ

Posted on by 0 comment

রাজিয়া সুলতানা

আনারস
PM2আনারস খুবই রসালো ও জনপ্রিয় একটি ফল। উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল। ভারতবর্ষে আগমন ১৫৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। বর্তমানে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এর প্রধান উৎপাদন স্থান। গাছটি তেমন দীর্ঘজীবী নয়। খাটো কা-ে পাতা গুচ্ছবদ্ধ। গোটা একটি মঞ্জুরি ১০০-২০০ ফুল। সম্পূর্ণ মঞ্জুরিটিই মাংসল যৌগ ফলে রূপান্তরিত হয়। ফলের ওজন প্রায় ০.৫-৫ কেজি। পরিপক্ব ফল হতে সময় লাগে পাঁচ-ছয় মাস। সারা বছরই আনারস পাওয়া যায়। তবে গ্রীষ্মে এর আধিক্য বেশি।
পুষ্টিগুণ
পরিপক্ব ফলে রয়েছেÑ
®    প্রায় ১৪ শতাংশ চিনি।
®    প্রোটিন।
®    জারক উৎসেচক ব্রমলিন।
®    পর্যাপ্ত সাইট্রিক এসিড।
®    ভিটামিন ‘এ’ ও ‘বি’।

তাজা ফল সুস্বাদু। জ্যাম, জেলি ছাড়াও টিনে ভরা রস ও টুকরা ফল বাজারজাত হয়।

কামরাঙা
PM3কামরাঙা টক-মিষ্টি, সুস্বাদু ফল। কামরাঙা সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (মালয় উপদ্বীপ থেকে ইন্দোনেশিয়ায়) উৎপন্ন ফল। এটি চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ফল। বাংলাদেশে বেশির ভাগ কামরাঙা বরিশাল বিভাগে ফললেও ইদানীং অন্যান্য এলাকায়ও এর চাষ হচ্ছে।

পুষ্টিগুণ
পুষ্টিগুণ বিচারে কামরাঙা উচ্চমানসম্পন্ন। কারণ এ ফলটি প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’-সমৃদ্ধ। যা আমাদের দেহে তৈরি হয় না। কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাছাড়া ফলটি নানা খনিজ পদার্থ এবং ‘এ’, ‘বি’ ভিটামিনে ভরপুর। তবে কিছু কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে কামরাঙা কিডনি রোগীদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।

সফেদা
PMএক প্রকার মিষ্টি ফল। সফেদা গাছ বহুবর্ষজীবী, চিরসবুজ বৃক্ষ। এর আদি নিবাস মেক্সিকোর দক্ষিণাংশ, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চল। পেটেনেস ম্যানগ্রোভ ইকো-অঞ্চলের উপকূলীয় ইউকাতানে এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে বিস্তার লাভ করে। স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলে এটি ফিলিপাইনে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মেক্সিকোতে এর ব্যাপক উৎপাদন হয়।
পুষ্টিগুণ
প্রতি ১০০ গ্রাম সফেদায়Ñ
®    ৮৩ কিলো ক্যালরি খাদ্য শক্তি।
®    ০.৭ গ্রাম প্রোটিন।
®    ২১.৪ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট।
®    ০.০২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১।
®    ০.০৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২।
®    ৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’।
®    ০.৫ গ্রাম খনিজ।
®    ২৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম।
®    ৯৭ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন।

সফেদায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ, যা তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি দেয়। ক্যালসিয়াম ও লৌহ হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখে। পেটের নানান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে সফেদা। ক্যারোটিন চোখের সুস্থতা রক্ষা করে ও রাতকানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়। ওজন কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেলে স্থূলতাজনিত সমস্যা সমাধান হয়। সফেদা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেতে পারলে অনিদ্রা, উদ্বেগ এবং বিষণœতা নিয়ন্ত্রণ হয়।

জামরুল
PM4হালকা সবুজ রঙের মিষ্টি ফল। লাল রঙের জামরুলও পাওয়া যায়। এই ফলটির আর একটি নাম হলো আমরুজ। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে সাদা জাম অথবা ম-ল হিসেবেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে জন্মে।

পুষ্টিগুণ
প্রতি ১০০ গ্রাম জামরুলেÑ
®    জলীয় ৮৯.১ শতাংশ।
®    ক্যারোটিন আছে ১৪১ মাইক্রোগ্রাম।
®    ভিটামিন বি-১ আছে ০.১মিলিগ্রাম।
®    ভিটামিন বি-২ আছে ০.৫ মিলিগ্রাম।
®    ভিটামিন ‘সি’ ৩ মিলিগ্রাম।
®    ক্যালরি শক্তি ৫৬।
®    প্রোটিন ০.৫ থেকে ০.৭ গ্রাম।
®    কার্বোহাইড্রেট ১৪.২ গ্রাম।
®    খাদ্যআঁশ ১.১ থেকে ১.৯ গ্রাম।
®    ফ্যাট ০.২ থেকে ০.৩ গ্রাম।
®    ক্যালসিয়াম ২৯ থেকে ৪৫.২ মিলিগ্রাম।
®    ম্যাগনেসিয়াম ৪ মিলিগ্রাম।
®    ফসফরাস ১১.৭ থেকে ৩০ মিলিগ্রাম।
®    আয়রন ০.৪৫ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম।
®    সোডিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম।
®    পটাশিয়াম ৩৪.১ মিলিগ্রাম।
®    কপার ০.০১ মিলিগ্রাম।
®    সালফার ১৩ মিলিগ্রাম।
®    ক্লোরিন ৪ মিলিগ্রাম।
®    আমিষ ০.৭ গ্রাম।
®    চর্বি ০.২ গ্রাম।
®    খনিজ পদার্থ ০.৩ গ্রাম।
®    খাদ্যশক্তি রয়েছে ৩৯ কিলোক্যালরি।

সহজলভ্য জামরুল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। জামরুলের উচ্চমাত্রার ফাইবার হজমে দারুণ উপকারী। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ মানুষের দেহে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধা ঠেকিয়ে দিতে দক্ষ জামরুল। জামরুলে রয়েছে ক্যানসার প্রতিরোধের উপাদান। ফাইবার ও পুষ্টি উপাদানের সম্মিলিত উপস্থিতি দেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে দারুণ কার্যকরি। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক আর করোনারি রোগের ঝুঁকিও কমাতে জুড়ি নেই জামরুলের। মস্তিষ্ক ও লিভারের সুরক্ষায় জামরুল টনিক হিসেবে কাজ করে। ত্বকে ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকায় এই ফল। লিভার আর কিডনির বিষ দূর করে বিপাকক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে যেন এক অব্যর্থ টোটকা এই জামরুল।

পেঁপে
PM5পেঁপে এমন একটি ফল, যা কাঁচা তথা সবুজ অবস্থায় সবজি হিসেবে এবং পাকা অবস্থায় ফল হিসেবে খাওয়া হয়। এর অনেক ভেষজ গুণও রয়েছে। এর ইউনানী নাম পাপিতা, আরানড খরবুজা। আয়ুর্বেদিক নাম অমৃততুম্বী। পেঁপে বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশে হয়।
পুষ্টিগুণ
প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা পেঁপেতে পাওয়া যায়Ñ
®    আমিষ ০.৬ গ্রাম।
®    স্নেহ ০.১ গ্রাম।
®    খনিজ পদার্থ ০.৫ গ্রাম।
®    ফাইবার ০.৮ গ্রাম।
®    শর্করা ৭.২ গ্রাম।
®    ভিটামিন ‘সি’ ৫৭ মিলিগ্রাম।
®    সোডিয়াম ৬.০ মিলিগ্রাম।
®    পটাসিয়াম ৬৯ মিলিগ্রাম।
®    আয়রন ০.৫ মিলিগ্রাম।
®    খাদ্যশক্তি ৩২ কিলোক্যালরি।

সুমিষ্ট পাকা পেঁপে রং, সুবাস আর স্বাদে অতুলনীয়। পেঁপে খেলে ওজন কমে, ত্বক পরিষ্কার হয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আর নানা উপকারী উপাদানে ভরপুর পেঁপে খেলে একদিকে স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকে, তেমনি চুল আর ত্বকের জন্যও উপকারী। খাবারে তাই পেঁপে রাখাটা জরুরি। এছাড়া এর যে এনজাইম থাকে, তা হজমে সহায়তা করে। পেঁপে ডায়াবেটিসে উপকারী। কারণ ডায়াবেটিস প্রতিরোধক উপাদান আছে পেঁপেতে। পেঁপেতে আছে ক্যারোটিনাইডস নামের উপাদান, যা চোখের জন্য উপকারী। এছাড়া চোখের মিউকাস মেমব্রেনকে সবল করতে ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে যে ধরনের উপাদান দরকার, পেঁপেতে তা অধিক পরিমাণে আছে। বিশেষ করে বেটা ক্যারোটিন, জিয়াক্সনাথিন ও লুটেইনের মতো উপাদান কোলন ও প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে এটি উপকারী।
আমাদের সব দেশি ফলই অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন। সব ফলের পুষ্টির কথা বলে শেষ করা যাবে না। এটা প্রকৃতির অপার দান। তবে প্রয়োজন জনসচেতনতার। জনগণ যদি ফলের সঠিক পুষ্টিগুণ জানে এবং এদের প্রয়োগ নিশ্চিত করেÑ তবে তারা আর ফলজনিত অপুষ্টিতে ভুগবে না।
সর্বোপরি বলা যায়, বাংলাদেশে পুষ্টি সমস্যা সমাধান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গ্রীষ্মের ফল তথা ফল বৃক্ষের কোনো তুলনা হয় না। ফল গাছ সংরক্ষণ, সুষম বণ্টন, এদের উন্নতি সাধন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি, শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা-১১০০
ৎধুরধংঁষঃধহধ.ংধঁ৫২@মসধরষ.পড়স

Category: