Blog Archives

ইয়েমেন কাঁদছে

PM2সাইদ আহমেদ বাবু: মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতি আর আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইয়েমেন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাসীর মনে দাগ কেটেছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটি কেবল একটি যুদ্ধাহত দেশ নয়। বর্তমানে ইয়েমেন স্মরণকালের সর্বোচ্চ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায়ই দেখা যাচ্ছে না। যতদিন যাচ্ছে ততই ইয়েমেন সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধশালী দেশ। লোহিত সাগরের বাব আল মানদাব প্রণালির মুখে অবস্থিত ইয়েমেন সৌদি আরবের জন্য বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ১৯৩২ সালের সৌদ পরিবারের নামানুসারে গঠনের পর থেকেই ইয়েমেনের ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিল সৌদি আরব। ১৯৩৪ সালে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান হলেও সৌদি আরব নানা উপায়ে ইয়েমেনের ভেতর বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সীমান্ত বিরোধ নিয়ে কখনও কখনও সামরিক অভিযানও পরিচালনা করেছে।
বাণিজ্য এবং কৌশলগত ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল পার্সিয়ান, অটোমান, ব্রিটিশ। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর তথা ব্রিটিশ বাহিনী প্রত্যাহারের পরে দুটো নতুন রাষ্ট্র উত্তর ইয়েমেন (গণপ্রজাতন্ত্রী) এবং দক্ষিণ ইয়েমেন (কমিউনিস্ট) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইয়েমেনিদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার গোড়া পত্তন ঘটে। জাতি হিসেবে এই বিভক্তি তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মÑ সব কিছুকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৯০ সালের ২২ মে ইয়েমেনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন দুই ইয়েমেন ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিতভাবে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় রিপাবলিক অব ইয়েমেন। দুই ইয়েমেন একত্রিত হলেও দেশটির রাজনৈতিক সংকট কখনোই দূরীভূত হয়নি।
আজকের ইয়েমেন সংকটের শুরু ২০০৪ সালে এবং তখন এই সংকটের পটভূমি ছিল শিয়া-সুন্নির মধ্যকার বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে শিয়াদের তরফ থেকে সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিয়াদের সংগঠিত হওয়া। কিন্তু সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ তৎপরতা রোধে সৌদি আরব হুথিদের ওপর হামলার জন্য ইয়েমেনের সরকারকে তার ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় সংঘর্ষ নতুন মোড় নেয়। সৌদি আরব ইয়েমেন সীমান্তের জাবাল দোখান ঘাঁটিটি হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইয়েমেনকে অনুমতি দেওয়ার পরপরই হুথিরা তা দখল করে নেয়। এরপর এই অজুহাতে সৌদি আরব হুথিদের ওপর সরাসরি হামলা শুরু করে।
উপরোক্ত অবস্থার আলোকে বর্তমান ইয়েমেন সংকট কেবল ইয়েমেন তথা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা পালন করবে, তা-ই নয়। তার চেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, এতদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বহিঃশক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের নতুন সংস্করণ হচ্ছে তাদের পরোক্ষ মদতে বর্তমানে নিজেরাই এমন সংকটে জড়িয়ে পড়ছে, যা সমগ্র আরবের নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে অনিবার্য করে তুলবে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার শুরু। তা থেকে রেহাই পায়নি ইয়েমেনও। দেশটিতে তখন গণবিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। আরব বসন্তের প্রথম ধাক্কায় তিউনিসিয়ার পর দীর্ঘ ৩৩ বছর সময়ের একনায়ক আলী আবদুল্লাহ সালেহ সরকারের পতনের পর মনসুর হাদি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেও পুরো দেশের সব জাতিগোষ্ঠীকে একত্র করে একটি জাতীয় সরকার পরিচালনার পরিবর্তে মূলত সৌদি আরবের এবং পশ্চিমা পরামর্শে রাষ্ট্র শাসনের ফলে আজকের এ অবস্থা। ২০১৫ সালের জন্য একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি পার্লামেন্ট গঠন করা হবে। এছাড়া খসড়া সংবিধানে ফেডারেল ব্যবস্থার সরকার গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু হুথি বিদ্রোহীরা প্রত্যাখ্যান করায় এ উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ২০১৫ সালের শুরুতে আন্দোলনের মুখে মানসুর হাদির সরকার পদত্যাগ করে এবং হুথি নেতা আবদুল মালেক আল-হুথির নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যায়। হুথি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ। ফলে এই আন্দোলন আর শুধু হুথিদের আন্দোলন থাকল না। রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর-বন্দরেরও নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথি ও সালেহর সমর্থকরা। এরই মধ্যে সংসদ বাতিল করা হয় এবং বিপ্লবী কমিটি গঠনের মাধ্যমে মুহাম্মদ আলী আল-হুথিকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়ে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। তাই হাদি প্রশাসন কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। আর নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে ইয়েমেনের যাইডি শিয়া মুসলিম নেতৃত্বের হুথি আন্দোলনের কর্মীরা সাডা প্রদেশ এবং আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এ-সময় অনেক সুন্নিরাও তাদের সমর্থন জোগায়। ২০১৪ সালে সর্বশেষ তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে সৌদি আরবে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করার নেপথ্যে সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বহুধাবিভক্তিও অন্যতম কারণ। কিন্তু গণবিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী কমিটির কোনো কাজ ও ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি সৌদি আরব ও তার সমর্থকরা। একই অবস্থানে চলে যায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জগৎ। নতুন সরকারের পক্ষে ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সাংবিধানিক ঘোষণাকে তারা অবৈধ বলে আখ্যায়িত করে। সৌদি আরব ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইয়েমেনের ‘নীরব গণবিপ্লব’কে হুথি শিয়াদের আন্দোলন বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর চিরাচরিত প্রথায় বিল্পবী শক্তির বিরোধিতা করে মাঠে নামে আমেরিকা। শুরু হয় হুথি নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী কমিটিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কর্মকা-।
২০১৪ সালে হুথিরা দেশটির রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয়। কিন্তু দক্ষিণের ৪টি সুন্নি প্রধান প্রদেশ হুথিদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। এমন অবস্থায় হাদি সানা থেকে পালিয়ে গিয়ে এডেনে অবস্থান নেন এবং পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দেশটি আবার দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের নিয়ন্ত্রণ থাকল হুথিদের হাতে আর সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণের নিয়ন্ত্রণ থাকল বৈধ প্রেসিডেন্ট হাদির হাতে। এখন হুথিরা চাচ্ছে দেশটিতে শিয়াদের আধিপত্য বিস্তার করতে আর সুন্নিরা চাচ্ছে হাদি সরকারকে। পলায়নরত ইয়েমেনের শাসক হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদিতার অভিযোগ এনে সৌদি আরবের সাহায্য চান। ২০১৫ সালের মার্চে তাকে আবারও ক্ষমতায় বসাতে হামলা শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট। এর পরেই ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। দেশের দুই দলের কোন্দল যে গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে এমনটা ভাবেনি কেউ।
ইয়েমেনের বর্তমান সংকটটি মধ্যপ্রাচ্যের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া-সুন্নির বিরোধকে ছাপিয়ে বর্তমান ইয়েমেন সংকট বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন ইয়েমেনে দৃশ্যত সুন্নি সরকার ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধ, পাশাপাশি দুটি ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী সামরিক দিক থেকে সক্রিয় এবং তাদের স্বার্থ ভিন্ন। এর একটি হচ্ছে একাপ অর্থাৎ আল কায়দা ইন দা এরাবিয়ান পেনিনসুলা। অন্যটি হচ্ছে ইসলামি স্টেট, যে গোষ্ঠীটি ইরাক, সিরিয়ায় ব্যাপকভাবে তৎপর। ইয়েমেনের অস্থিতিশীল রাজনীতি এবং পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে আল-কায়দা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী শক্তিশালী ভিত তৈরি করে আছে। ফলে এই সংকটে আইএস চাচ্ছে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে, অন্যদিকে একাপ চাচ্ছে তাদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে। হুথি বিদ্রোহীরা চাচ্ছে শিয়াদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে সুন্নিগোষ্ঠী হাদী সরকারের অবস্থানকে চাচ্ছে আরও সুদৃঢ় করতে। আর লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব চাচ্ছে ইয়েমেনে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইয়েমেন রাষ্ট্রটি গভীর থেকে গভীরতর সামরিক সংকটে নিপতিত হচ্ছে। যেখানে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব ক্রমাগত দৃশ্যমান। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এই সংকট থেকে বের হওয়া একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কয়েক বছর ধরেই ইয়েমেনের মানুষ ভালো নেই। একদিকে হুথিদের আক্রমণ, অন্যদিকে সৌদি আরবের বর্বরোচিত বিমান হামলা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে আল-কায়দার জঙ্গি তৎপরতা। আমেরিকা, রাশিয়া, ইরান, চীন ও সৌদি আরব নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ইয়েমেনের সরকার, হুথি বিদ্রোহী, দক্ষিণের স্বাধীনতাকামী ও জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু ইয়েমেনের জনসাধারণের কথা কেউ বিবেচনা করছে না। মার্কিন সহায়তাপুষ্ট সৌদি আরব শুধু সামরিক হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি; ইয়েমেনের জল ও আকাশসীমায় অবরোধও আরোপ করেছে। জাতিসংঘ মানবতার ভয়াবহ বিপর্যয় হচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করছে। এভাবেই ইয়েমেনের সংকট জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। এরপর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আর অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রমেই আঞ্চলিক লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আবহ লাভ করে। ইয়েমেন মূলত মার্কিন ও ইরানিদের যুদ্ধ চলছে। মার্কিনের পক্ষে প্রক্সি দিচ্ছে সৌদি আর হুথিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে ইরান। মাঝ থেকে দুর্দশায় পড়েছে সিভিলিয়ানরা।
ইরানকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া ও চীন। চীনের লক্ষ যদি হয় বাণিজ্য, তবে রাশিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য খর্ব করা। চীন এডেন বন্দরকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় বাণিজ্যিক কারণে। ইরান ও রাশিয়ার উদ্দেশ্য সামরিক। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে আরবে ক্রমবর্ধমান রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে প্রতিহত করতে। ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি কেবল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ না; একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
সবকিছু মিলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে নানা দল লড়াই করছে। সৌদি সমর্থন পুষ্ট ইয়েমেনের সরকারকে ত্রিমুখী আক্রমণ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরানের সহায়তাপুষ্ট শিয়া হুথিগোষ্ঠী, দক্ষিণের স্বাধীনতাকামী ও ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী। সরকারবিরোধী তিন পক্ষ আবার নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। হুথিদের ওপর সৌদি জোট যেমন হামলা করছে; আবার হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদিকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়ছে। ইয়েমেনের বিপ্লবী যোদ্ধারা গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রথম দিকে তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও এখন তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আঘাত হানছে। মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও হুথিরা দুর্বল হয়নি; বরং সৌদির সামরিক খরচ বাড়ছেই। শিয়া-সুন্নি বিভেদের রূপ দিয়ে সৌদি আরবে ইয়েমেন ইস্যুতে অন্যান্য সুন্নি দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থন নিয়েও সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধে কোনো সাফল্যই অর্জন করতে পারেনি। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরু করে সৌদি আরব ভেবেছিল, খুব সহজেই তারা জনপ্রিয় আনসারুল্লাহ বাহিনীকে পরাজিত করে ইয়েমেন দখল করে নেবে এবং পছন্দের সরকার বসাবে। কিন্তু যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, ইয়েমেন যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইয়েমেনের তেল এবং গ্যাসের ওপর মার্কিন নজরও রয়েছে।
সৌদি-ইয়েমেন সংঘর্ষের কারণটা আসলে শুধু ভূ-রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে কারণের পিছনের কারণ দেখা যাচ্ছে। মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। শিয়া-সুন্নির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব। ইয়েমেনের যুদ্ধ বুঝতে হলে বুঝতে হবে ক্ষমতার কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া অধ্যুষিত দেশগুলোর শাসকগণ সুন্নি রাজ পরিবার বা নেতা আর খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা কোনোদিন শিয়াদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী নয়। শিয়াদের ক্ষমতার পালাবদল ঠেকিয়ে রাখতে দরকার সামরিক আগ্রাসন। বোমাবর্ষণ করে জয় সুনিশ্চিত করতে চাইছে সৌদি আরব। আরব দুনিয়ায় নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করতে তৎপর সৌদি। ইয়েমেনের সরকার এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার জনযুদ্ধে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১০ হাজার মানুষ, ইতোমধ্যে বাস্তুহারা হয়েছে ৩০ লাখ নিরীহ মানুষ আর অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। ইয়েমেনে এ মুহূর্তে চলছে পৃথিবীর সর্বাধিক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।
গত আট বছরেও ইয়েমেন তার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পক্ষে। বিশ্বের বেশির ভাগ শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পক্ষে তখন বিশ্বের অন্যতম দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন এক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে; যা পরোক্ষভাবে ইরানকেই সমর্থন করে। তাই সবদিক থেকে মনে হচ্ছে সুবিধাবাদী আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো ইয়েমেনের সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারবে না। ইয়েমেনকে তার সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান করতে হবে। তা না হলে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হবে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তাদের নিজে থেকে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছতে হবে। আর সেটি সম্ভব না হলে বিশ্ববাসী আরেকটি ধ্বংসযজ্ঞ দেখবে।

Category:

ফের ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি

Posted on by 0 comment

সাইদ আহমেদ বাবু: সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ফের ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদি। পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও মোদির পক্ষে যে এতটা সমর্থন থাকবে, তা ভারতের বিরোধী দলগুলোর ভাবনার অতীত ছিল। আগেরবারের চেয়েও বেশি আসন নিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে বিজেপি তথা এনডিএ। মূলত, ভোটের এ লড়াইটা হয়েছে মোদির সঙ্গে ভারতের সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর। এই লড়াইয়ে শুধু মোদি জেতেন নি, তিনি ছুঁয়ে গেছেন ভারতের সবচেয়ে সফল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রেকর্ড। দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৬৭ এবং ১৯৭২ সালে পরপর দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এ দুবারেও একাই ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে গিয়েছিল কংগ্রেস। এর আগে জওহরলাল নেহেরু পরপর তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন কংগ্রেসের হয়ে। ২০১৯ সালে যা দেখা যাচ্ছে, জওহরলাল নেহরুর কংগ্রেসের মতোই মোদির বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে। ভারতজুড়ে বিজেপির ভোট শেয়ারে ঢেউ উঠেছে, যা প্রায় অবিশ্বাস্য।
গত ২৩ মে ভোট গণনায় দেখা যায়, দেশের ইতিহাসে মোদিই হতে চলেছেন তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি পরপর দুবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী হলেন। অর্থাৎ কোনো জোট বা শরিক দলের সাহায্য ছাড়াই সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক ফিগার ছাড়িয়ে গেল কোনো দল। অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিই প্রথম, যিনি পরপর দুবার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসছেন। ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এটা রেকর্ড। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় পর্বে শাসক দলের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াও রেকর্ড। ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস পরিবারের প্রতিনিধি অভিজাত রাহুল গান্ধীর পরিবর্তে ‘চৌকিদার’ মোদিতেই ভরসা খুঁজেছেন ভারতের প্রায় ৯০ কোটি ভোটার। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে আরও বিপুল বিক্রম নিয়ে জয়ী হলো নরেন্দ্র মোদির বিজেপি জোট। বলা যায়, এককভাবে মোদি ম্যাজিকে আস্থা রেখেছেন ৯০ কোটি ভোটারের ভারত। আবারও তার কাঁধেই থাকবে দেশের ভার। তার হিন্দুত্ববাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের মিশেলে ক্যারিশম্যাটিক মোদি ঝড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে কংগ্রেসসহ বিরোধী শিবির। সাত-দফায় ৩৮ দিনের নির্বাচন শেষে গত ১৯ মে বুথফেরত জরিপেই আভাস মিলেছিল নিরঙ্কুশ জয় পাচ্ছে গেরুয়া শিবির মানে এনডিএ জোট। কিন্তু বাস্তবিক ফলাফল সেই আভাসকেও হার মানাল। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তিনি বলেছেন, এটা তার বা তাদের দলের জয়ই শুধু নয়, দেশের জয়, গণতন্ত্রের জয়। এবার লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীদের টার্গেট ছিলেন তিনিই। কিন্তু তার উত্থান আটকাতে পারেন নি কেউই। উনিশের নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটা বড় পরীক্ষা ছিল নরেন্দ্র মোদির। সেই পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উতরে গিয়ে মোদি আরও একবার প্রমাণ করলেন, তার বিজয়রথের চাকা থামেনি; বরং তা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। দুটো সেøাগান বিজেপি এবার জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করেছে। ‘ফির একবার, মোদি সরকার’ এবং ‘আব কি বার, তিন শ পার’। দেশের মানুষ বিনা বাক্যে সেই দুই সেøাগানকে সত্য করে তুলেছে। বিশ্বাস রেখেছে নরেন্দ্র মোদির ওপর। রচনা করেছে নতুন ইতিহাস।
বিতর্কিত নানা অধ্যায় ছাপিয়ে নিজেকে ‘চায়েওয়ালা’ পরিচয় দিয়ে পাঁচ বছর আগে ভোটের লড়াইয়ে জিতে দিল্লির মসনদে বসেছিলেন মোদি; এবার ভোটের আগে শাসক পরিচয়ের পরিবর্তে নিজেকে ‘চৌকিদার’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। আগামী পাঁচ বছর মোদির বিজেপি সরকার ভারতের ভাগ্য বিধাতা, আর মমতার দুর্গ দখল করতে না পারলেও বড় ফাটল ধরিয়েছে বিজেপির গৈরিক বাহিনী।
ভূমিধস জয় পেয়েই সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে উচ্ছ্বসিত নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ভারত আবারও জিতে গেল। এক টুইটে তিনি বলেন, ‘আমরা বেড়ে উঠেছি একসঙ্গে, সমৃদ্ধি এনেছি একসঙ্গে, একসঙ্গে থেকেই আমরা শক্তিশালী ভারত গড়ব, যা হবে সবার জন্য। ভারত আবারও জিতে গেল।’ মূলত, জাতীয়তাবাদের এই ট্রাম্পকার্ডই মোদির রাজনৈতিক মন্ত্র।
৯০ কোটি ভোটারের দেশ ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে গত ১৯ মে। ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত মোট ৭টি ধাপে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ৫৭০ আসনের লোকসভায় ১ হাজার ৮৪১টি রাজনৈতিক দলের ৮ হাজারেরও বেশি প্রার্থী এ নির্বাচনে অংশ নেন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৭২০ এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী চারজন। প্রসংগত, ১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচন সম্পন্ন হতে সময় লাগে তিন মাস।
ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে এনডিএ জোট পেয়েছে ৩২১টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএ পেয়েছে ১১০টি আসন। আর বিজেপি এককভাবে পেয়েছে ২৮৮টি আসন। এদিকে, কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যান্য দল পেয়েছে ১১১টি আসন। পশ্চিমবঙ্গে বরাবরের মতো দখলে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তারা পেয়েছে ২৩টি আসন। বিজেপি পেয়েছে ১৮টি আসন আর কংগ্রেস পেয়েছে ১টি আসন। বাম দলের আসন শূন্যের কোঠায়।
মনে রাখতে হবে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় ভারতের মতো বৃহত্তম গণতন্ত্রে কোনো একটা কারণে হয় না। জয়ের পিছনে অনেক কারণ থাকে। হিন্দুত্ববাদের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদের প্রচারণা চালিয়ে গেছেন মোদি। ভোটের প্রচারে বিজেপি যেভাবে অত্যন্ত কৌশলীভাবে জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন এবং ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে, তার বিপরীতে বিরোধী দলগুলো কার্যকর বক্তব্য হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। একেবারে শুরু থেকেই মানুষের মনে বিজেপি যে প্রশ্ন তুলে ধরেছিল, তা ছিল নেতৃত্বের। ‘মোদি বনাম কে?’ এই প্রশ্ন তারা জনতার সামনে রেখেছিল। বিরোধীরা এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। মোদি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন কী থাকবেন না, সেটা নিয়েই গোটা দেশে ভোট হয়ে গেল। বিরোধী শিবিরে মোদির কোনো একজন বিকল্প খুঁজে পাওয়া গেল না। বিজেপি তার প্রচারাভিযানে প্রকৃত সমস্যা আড়াল করতে মোদিকে ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি পুলওয়ামা-উত্তর পরিস্থিতি ও বালাকোট অভিযানের ঘটনায় জারিত জাতীয়তাবাদকে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছে। এবার মোদি ছাড়া আর কাউকেই মানুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাবতে পারেনি। তার কঠোর নেতৃত্ব, দৃঢ়চেতা মনোভাব, ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং দেশের শত্রুদের শায়েস্থা করার হিম্মত অন্য কেউ দেখাতে পারেন, মানুষ তা বিশ্বাস করতে চায়নি। আর তা হয়নি বলেই সত্য হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় সেøাগানটিও। বিজেপি তিনশ’ পার করেছে। ২০১৪ সালের তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার পর মোদির বিরুদ্ধে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল; কিন্তু মোদি এবং অমিত শাহ এমন এক কৌশল রচনা করলেন যে এই অসন্তোষ নির্মূল হয়ে গেল। পুলওয়ামা হামলার জবাবে পাকিস্তানের বালাকোটে হামলার নির্দেশ দিয়ে তিনি জনগণের মাঝে জাতীয়তাবাদের আবেগকে আরও উসকে দিয়েছেন বলেই মনে করছে গণমাধ্যম। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বালাকোট আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও বদলে দিল। মোদির ‘ব্র্যান্ড ইকুইটি’র সঙ্গে মিশে গেল হিন্দু রাষ্ট্রবাদ। মানুষ এক শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। বিপরীতে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি ভারতজুড়েই বিজেপির প্রতি মানুষকে আস্থা রাখতে সহায়তা করেছে। জোট গঠনেও প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন মোদি। যাদের জোটে নিয়েছেন তারা মোদির মতোই কট্টর ডানপন্থি। ভারতের পূর্বাঞ্চলে বিজেপিকে দৃঢ় করার কাজে মনোযোগ দেওয়াকেও জয়ের নিয়ামক হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্যারিশমা এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে অটুট রইল। তিনিই বিজেপির পক্ষে তিনিই যে ভোট টানেন সেটা আবারও প্রমাণ হলো। বিজেপিকে ভোট দেওয়া মানেই তাকে ভোট দেওয়াÑ মোদির এই মন্তব্য কার্যকর হয়েছে, তা ভোটের ফলাফলেই প্রমাণিত। সাংগঠনিক দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার, সব ধরনের আধুনিক প্রক্রিয়া ব্যবহারসহ বিভিন্নভাবে বিজেপি দল হিসেবে শক্তি অর্জন করেছে, তা এখন বিরোধীদের অতিক্রম করা যে খুবই কঠিন, যার প্রমাণ ভোটের প্রচারে মিলেছে।
বিরোধী দল যেভাবে ‘মোদি হটাও’ অভিযানে নামে, তাতে পুরো নির্বাচনটা মোদিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। এবারের নির্বাচনে ভারতের সেকুলার গণতান্ত্রিক বামপন্থি এবং আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে মুখে মোদি হটাও সেøাগান থাকলেও তারা মোদি ও এনডিএ’র বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর জাতীয় ঐক্য বা কোয়ালিশন গড়ে তুলতে পারেনি। বরং বিভিন্নভাবে ভোটযুদ্ধে পরস্পর প্রতিযোগিতা করে মোদি ও বিজিপির জয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। শুধু মোদি হটাও সেøাগান তোলা হলো, আর সব বিরোধী নেতাই ভাবতে লাগলেন যে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন; কিন্তু কোনো বিকল্প কর্মসূচি নেই। এভাবে মোদি মোকাবিলা হয়? বিপরীতে মোদি সুকৌশলে ‘মোদি হটাও’কেই ভোটের প্রচারের হাতিয়ার করে দিলেন। কর্মহীনতা, কৃষকদের সমস্যা, রাহুল গান্ধীর তোলা ‘ন্যায়’-এর বিষয়, সব গুরুত্ব হারাল। দেখা যাচ্ছে, যেসব রাজ্যে মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, সেসব রাজ্যেই মোদি ভোট পেয়েছেন বেশি। এবার মোদির জয়যাত্রার পেছনে তাই একদিকে যেমন আছে ‘মোদি’ নামক ব্যক্তির ‘ব্র্যান্ড ইকুইটি’, অন্যদিকে তেমনি আছে রাহুল গান্ধীর জোট না করার মানসিকতা।
ভারতের লোকসভা ভোটে জিতে প্রথমবার নিজের কেন্দ্রে গিয়ে ভোটারদের ধন্যবাদ জানালেন নরেন্দ্র মোদি। বারানসিতে মোদি বললেন, এবারের ভোটে অঙ্ক নয়, জিতেছে রসায়ন। কী সেই রসায়ন। প্রথম রসায়ন, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ-সহ দলের কর্মীদের সম্পর্ক এবং পরিশ্রম। তাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের সম্পর্কের রসায়ন। জাতীয়তাবাদ আর মেরুকরণের রসায়নেই সাফল্য এসেছে বলতে চেয়েছেন মোদি। এর পাশাপাশি মোদি এ দিন প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের। তার মতে, এই জয় বিজেপি, এনডিএ বা মোদি-অমিত শাহের জয় নয়, এটা আসলে সারাদেশের লাখ লাখ বিজেপি কর্মীর কঠিন পরিশ্রমের জয়। তিনি আরও বলেন, দেশবাসী তথা বারানসির মানুষ আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু আমি একজন সাধারণ বিজেপি কর্মী হিসেবেই নিজেকে দেখতে চাই। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে পূজা দেন তিনি। তারপর একটি জনসভায় যোগ দেন। সঙ্গে ছিলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবং উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। দুজনই বারানসির ভোটারদের ধন্যবাদ জানান।
২০০২ সালের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়টা ছিল মোদির উত্থানের সবচেয়ে বড় অনুঘটক। সে-সময়ে হিন্দু দাঙ্গাবাজদের উসকে দিয়ে ৩ হাজার মুসলমানকে হত্যা ষড়যন্ত্রে মোদিকে জড়িয়ে অভিযোগ থাকলেও তাকে বাঁচিয়ে দেন আদভানি। তবু বিভিন্ন মহল থেকে মোদির পদত্যাগের দাবি ওঠে। কিন্তু ২০০২ সালে গুজরাটের নির্বাচনে মোদির জয় তাকে আবারও আলোচনায় আনে। মোদির রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘোরে তখন থেকেই। বর্তমানে সেই মোদিই উন্নয়ন ও সুশাসনে দলীয় সামর্থ্যরে প্রতীক বনেছেন। বিপুল মধ্যবিত্ত তাকে সমর্থন জোগাচ্ছে। তার ‘আমিও পারি’ নীতি অনেকের মধ্যেই আশার সঞ্চার করেছে। হয়তো মোদির ওপর ভর করেই ভারত শাসনের স্বপ্ন দেখছে দলটি। নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি কর্মীদের শুভেচ্ছা জানালেন পূর্ব উত্তর প্রদেশের কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। প্রিয়াঙ্কা বলেন, মানুষের রায় আমরা মেনে নিয়েছি।
মোদি ও বিজেপি কর্মীদের অভিনন্দন। দ্বিতীয়বার সরকার গড়ছে মোদি বাহিনী, শুভেচ্ছা জানালেন সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। টুইট করে সাবেক রাষ্ট্রপতি লিখেছেন, ‘অভূতপূর্ব জয়ের জন্য মোদিকে অভিনন্দন।’
২০১৪ সালের তুলনায় যেসব রাজ্যে বিজেপি বেশি ভোট পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছেÑ গুজরাট, হরিয়ানা, ঝাড়খন্ড, হিমাচল প্রদেশ, কর্নাটক, মধ্য প্রদেশ, দিল্লি, ওড়িশা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ। দেশের অন্যত্র বিজেপি বিরোধীরা আর দাবি করতে পারবে না যে বিজেপি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পেয়েছে। ১০টিরও বেশি রাজ্যে বিজেপি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। বেলা ১১টা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের হিসেবানুসারে, হিমাচল প্রদেশে ৬৯ শতাংশ, অরুণাচল প্রদেশে ৬৩ শতাংশ, গুজরাটে ৬২ শতাংশ, উত্তরাখন্ডে ৬১ শতাংশ, রাজস্থানে ৫৯ শতাংশ, মধ্য প্রদেশে ৫৮ শতাংশ, দিল্লিতে ৫৭ শতাংশ, হরিয়ানায় ৫৭ শতাংশ, কর্নাটকে ৫২ শতাংশ, উত্তর প্রদেশে ৫০ শতাংশ এবং ছত্তিসগড়ে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোট শেয়ার বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি, ২০১৪ সালে তারা এ রাজ্যে পেয়েছিল ১৮ শতাংশ ভোট, এবার তারা পেয়েছে ৩৯ শতাংশ ভোট। গত লোকসভা ভোটে এ রাজ্যে দুটি আসন পেয়েছিল বিজেপি, এবার তারা ১৮টি আসনে পেয়েছে। এ রাজ্য থেকে মুছে যেতে চলেছে বামেরা।
কংগ্রেসের একমাত্র সুসংবাদ পাঞ্জাব এবং কেরালা। কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ ২০টির মধ্যে ১৯টি আসনে এগিয়ে। একমাত্র এ রাজ্যেই দলীয় নেতৃত্বের হিসাব মিলেছে। ভোটের পুরোটা সময় কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলগুলো মোদি-বিরোধী জোয়ার তৈরির চেষ্টা করলেও সেটি যে কাজে আসেনি তা দেখা যায় ফলাফলে। ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে তামিলনাড়–র একটি বাদে সবকটি আসনে এবার নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে সরকার গঠনের জন্য কোনো দল বা জোটকে পেতে হবে ২৭২টি আসন। সারাদেশে জয়ের বিপরীতে দক্ষিণের ৫টি রাজ্যের ৪টিÑ অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়– ও কেরালায় হারতে হচ্ছে বিজেপির। এসব রাজ্যের ৯১টি আসনের মধ্যে শেষ খবর পর্যন্ত বিজেপি জোটের অর্জন ৮টি আসন।
কংগ্রেসের জন্য আরেকটি বড় দুঃসংবাদ হলো, এবারের লোকসভা ভোটের ফলাফলের হিসাব অনুযায়ী ভারতের সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা হারাতে হচ্ছে কংগ্রেসকে। এবারের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে আরও একবার ব্যর্থ হলো কংগ্রেস। ২০১৪ সালে কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ৪৪টি আসন। যার ফলে গত লোকসভাতে সংসদের নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল কংগ্রেস।এবারও সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলো কংগ্রেস।
ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও ভারতের নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন একটি নির্বাচন উপহার দিয়েছে, যা সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির ৯০ কোটি ভোটারের ভোটের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। কোন দল জয়ী হয়েছে বা কোন দল পরাজিত হয়েছে, এ বিবেচনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেখানে গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে।

Category:

রক্তাক্ত শ্রীলংকা : ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসনের

Posted on by 0 comment

PMসাইদ আহমেদ বাবু: গত ২১ মে স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ৯টার দিকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় উৎসব ইস্টার সানডের প্রার্থনার সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সে-সময় শ্রীলংকার দ্বীপরাষ্ট্রটির রাজধানী কলম্বোর কোচিকাডের সেন্ট অ্যান্টনিস চার্চ, পশ্চিমের উপকূল শহর নেগোম্বোর সেন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চ এবং পূর্বের বাত্তিকালোয়া শহরের চার্চে পরপর বিস্ফোরণ ঘটে। অন্তত ৮টি স্থানে পরপর বোমা হামলা হয়। ৩টি পাঁচতারা হোটেলÑ শাংগ্রি লা, দ্য সিনামন গ্র্যান্ড হোটেল এবং দ্য কিংসবেরি হোটেলে বিস্ফোরণ হয়েছে। এই হামলার ঘটনার পর শ্রীলংকার সরকার কয়েক মিনিটের মধ্যে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে উদ্ধার তৎপরতা জন্য। অন্যদিকে, দেশটির নিরাপত্তা বিষয়ক পরিষদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহে। আর প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা জনগণকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এক টুইট বার্তায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহে বলেছেন, ‘অবর্ণনীয় এই ট্র্যাজেডির পরও আমরা শ্রীলংকানরা ঐক্যবদ্ধ আছি।’
পরে শ্রীলংকায় ১০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এরপরই শহরের রাস্তায় নামে সশস্ত্র পুলিশ কমান্ডো। অপরাধ অনুসন্ধান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমান চলাচল। দুদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হামলার সঙ্গে যোগসূত্র থাকতে পারে সন্দেহে সিরিয়া ও মিসরের নাগরিকসহ পুলিশ এখন পর্যন্ত ৭৬ জনকে আটক করেছে।
হামলার পর দেশজুড়ে জারি করা হয়েছিল কারফিউ। তবে তা ২২ এপ্রিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইন্সটগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরপরই ১৭ এপ্রিল শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি মৈত্রিপালা সিরিসেনা দেশটির পুলিশের প্রধান ও প্রতিরক্ষা সচিবের পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ এনে পুলিশপ্রধানকে গ্রেফতারেরও দাবি উঠেছে।
শ্রীলংকার নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নজরদারি করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট, যিনি এ ঘটনার ত্রুটি খুঁজে দেখার জন্য সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন।
দেশটির পুলিশ জানায়, মূলত টার্গেট ছিল খ্রিষ্টান, হোটেলের ভিনদেশের অতিথিরা। নিহত ছাড়াও যে ৫০০ জন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হামলায় নিহতদের অধিকাংশই শ্রীলংকার নাগরিক। এছাড়া ৩৯ জন বিদেশি নাগরিকও এ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে কলম্বো সরকার। নিহত বিদেশিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ, মার্কিন, অস্ট্রেলীয়, তুর্কি, ভারতীয়, চীনা, ড্যানিশ, ডাচ, পর্তুগিজ ও বাংলাদেশের নাগরিক। নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৪৫ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল।
বিক্রমাসিংহে বলেন, ‘ভারত আমাদের গোপন তথ্য দিয়েছিল; কিন্তু আমরা ঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারিনি।’ একের পর এক বোমা হামলায় তিন শতাধিক মানুষ নিহত ও পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার তিন দিন পর এই মন্তব্য করলেন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী। ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তদন্তকাজে শ্রীলংকাকে সহায়তা করছে বলে নিশ্চিত করেছেন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকেও সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করাই আমাদের প্রথম লক্ষ্য। তারা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়।
পুলিশ নানা জায়গা থেকে ২৪ জনকে আটক করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৮৭টি বোমা ডেটোনেটর, যার একটি পরে নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরিত হয়েছে।
ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলায় রক্তাক্ত লংকা। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে শ্রীলংকায় সন্ত্রাসী হামলা সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলে জানিয়েছে রয়টার্স। শোকে স্তব্ধ দেশটির লোকজন। এই হামলা কেন হলো, কীভাবে হলোÑ সবার মুখে মুখে শুধু একই জল্পনা।
শ্রীলংকার মোট আয়তন ৬৫ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ। এছাড়া ৭ শতাংশ খ্রিষ্টান, ৯ শতাংশ মুসলিম ও ১৩ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছে। দেশটির খ্রিষ্টানরা এতদিন যাবতীয় সংঘাত ও জাতিগত সহিংসতার প্রকোপ থেকে মুক্ত ছিল, যার ইতি ঘটলো ২১ এপ্রিলের বোমা হামলায়।
চার্চ ও হোটেলে সিরিজ বোমা হামলায় ৯ আত্মঘাতী অংশ নিয়েছে। এদের মধ্যে একজন নারী সদস্য ছিল। এই হামলায় এখন পর্যন্ত ২৫৩ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৯ জন বিদেশি। আহত হয়েছেন ৫০০ জন। শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান ওয়াইজেবর্ধনে জানিয়েছেন, ৮টি স্থানে পরপর বোমা হামলায় অংশ নেওয়া আটজনকে শনাক্ত করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। নিহত জঙ্গিরা স্থানীয় মুসলিম সংগঠন ন্যাশনাল তৌহিদ জামাতের (এনটিজে) সদস্য, নিহতদের মধ্যে তিন আত্মঘাতী বোমারু রয়েছে বলে জানায় দেশটির পুলিশ। শ্রীলংকায় সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে এই সংগঠনটি জড়িত রয়েছে বলে এর আগে জানিয়েছিল শ্রীলংকার সরকার।
শ্রীলংকায় ১৪০ উগ্রপন্থির সঙ্গে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
হামলার জন্য দেশটির সরকার যখন স্থানীয় মুসলিম মৌলবাদী একটি সংগঠনকে দায়ী করছে, হামলার তিন দিন পরে ওই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তারা এ ঘটনার মূল হোতাসহ সাতজনের ছবিও প্রকাশ করে। ওই সাতজনের মধ্যে জাহরান হাশিম নামে এক ব্যক্তিও ছিলেন। তবে দায় স্বীকার করলেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনটি।
শ্রীলংকার সরকার বলছে, জাহরান হাশিম কলম্বোর সাংরি-লা হোটেলে সংঙ্গী ইলহামকে নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন এবং বোমা হামলার সময় সেখানে নিহত হন বলে জানানো হয়। জাহরান হাশিম অনেক আগে থেকেই ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য বিতর্কিত ছিলেন। এমনকি তার ব্যাপারে এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কও করা হয়েছিল। এদিকে, ৯ জন বোমারু এই হামলা চালিয়েছে বলে জানায় শ্রীলংকার সরকার। শ্রীলংকার অপরাধ অনুসন্ধানকারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ আরিয়ানন্দ ওয়েলিয়াঙ্গ বলেছেন, হামলাকারীদের দেহের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মনে হয়েছে, তারা সবাই আত্মঘাতী বোমারু ছিলেন। এর মধ্যে শ্রীলংকার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে আত্মঘাতী তিনজনসহ ১৫ জন নিহত হন। দ্বীপদেশটিতে এই হামলায় জড়িত সন্দেহে ১০০ জনকে আটক করেছে। শ্রীলংকায় গির্জা ও হোটেলে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ‘গোয়েন্দা দপ্তরের একেবারে উচ্চ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছে করেই গোয়েন্দা তথ্য লুকিয়েছিলেন। কর্মকর্তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেননি।’
সরকারের প্রধান নিরাপত্তা শাখায় সমন্বয় না থাকায় হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। হামলা সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। ১০ দিন আগে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও রাষ্ট্রপতি পক্ষ প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনা জানান নি। হামলার পর তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাকে গোয়েন্দা তথ্য না দিয়ে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা, আইন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে। এই ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকেই দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। তার দাবি, বিক্রমাসিংহের আমলেই শ্রীলংকার গোয়েন্দা সংস্থা দুর্বল হয়েছে।
সরকারের মধ্যকার কোন্দলের বিষয়টি উঠে আসায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় দেশটির ‘ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত’ বা এনটিজে নামক ইসলামপন্থি সংগঠনটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর সহায়তায় এই হামলা চালিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে শ্রীলংকার পুলিশ।
ওই বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। ২০১৪ সালে খেলাফত ঘোষণার আগে বিদেশের মাটিতে এটিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আইএসের প্রচারমাধ্যমে আমাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলছেন, শ্রীলংকায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ও খ্রিষ্টানদের লক্ষ্যবস্তু করে যারা হামলা চালিয়েছেন, তারা সবাই আইএস সদস্য। হামলাকারীদের মধ্যে তিনজনের নাম হচ্ছেÑ আবু উবাইদাহ, আবু বাররা ও আবু মুখতার।
শ্রীলংকায় সহিংসতা নতুন নয়। সত্তরের দশকে বামপন্থি বিদ্রোহ বা আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহার করেছে তামিল টাইগাররা। গৃহযুদ্ধের ধকল বইতে হয়েছে দেশটিকে। হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সুলেমান বন্দরনায়েককে গোঁড়া বৌদ্ধরা হত্যা করেছিল। তার কন্যা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাকেও সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আহত করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসাকেও বোমা হামলায় হত্যা করা হয়েছিল। তার পরিণতিতে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম বা এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণকে যেভাবে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শ্রীলংকান সৈন্যরা হত্যা করেছিল, যেভাবে নিঃশেষ করা হয়েছে তার দলকেÑ সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ও দেখেছে দেশটির মানুষ। কিন্তু নতুন এই হামলার নির্মমতা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। শ্রীলংকায় ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা থাকলেও, খ্রিষ্টানরা বরাবরই সব ধরনের সহিংসতা এড়িয়ে চলেছে। বিশেষ করে এই ধর্মে যেহেতু সব গোত্রের মানুষই রয়েছে।
শ্রীলংকায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাস এমনিতেই খুব ভালো না। ২০১৮ সালে মার্চের সহিংসতা হয়েছিল সিংহলি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে। শ্রীলংকার মুসলমানদের মসজিদ, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কট্টর বৌদ্ধদের হামলায় প্রচুর ক্ষতি সাধন হয়েছিল। শ্রীলংকা সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছিল। ফলে ২১ এপ্রিলের হামলার সাথে মুসলিম একটি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা প্রকাশ হওয়ার পর স্বভাবতই অনেক মুসলিম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন। শ্রীলংকার মুসলমানরা এই হামলায় স্তম্ভিত ও লজ্জিত। এখন তাদের উপাসনালয়ে সরকার পাহারার ব্যবস্থা করেছে ওই হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও শোক প্রকাশ করেছেন শ্রীলংকার অল সিলন জামিয়াতুল ওলামা (এসিজেইউ) প্রধান রিজভী মুফতি।
তিনি বলেন, আমাদের খ্রিষ্টান ভাইবোনদের ওপর নৃশংস ও ন্যক্কারজনক এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরাও তাদের দুঃখে সমব্যথী। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষও এই কাজ করতে পারে না। ‘সোশ্যাল মিডিয়াতে শত শত মুসলিম লিখছেন এই সন্ত্রাসের সাথে ইসলামের শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই।’ তারাও ব্যানার নিয়ে হামলার নিন্দা করছে, আর খ্রিষ্টানদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।
শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান ওয়াইজেবর্ধনে জানিয়েছেন, বোমা হামলায় অংশ নেওয়া আটজনকে শনাক্ত করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। ধারাবাহিক এই বিস্ফোরণে জড়িত ছিল ৯ জন আত্মঘাতী বোমারু। প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে এরা প্রত্যেকেই স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠী ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত (এনজেটি)-এর সদস্য। আত্মঘাতী জঙ্গির এই দলটির বেশির ভাগ সদস্যই উচ্চশিক্ষিত। মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফলে এদের কেউ আর্থিকভাবে দুর্বল নয়। আর এটাই উদ্বেগের বিষয়। হামলাকারীদের মধ্যে বোমা হামলায় নিহত একজনকে আবদুল লতিফ মোহাম্মদ জামিল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যিনি শ্রীলংকাতে ফিরে আসার আগে যুক্তরাজ্যে এবং অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেছিলেন এবং বেশ কয়েকজনের বিদেশে যোগাযোগ ছিল। কেউ বিদেশে শুধু থেকেছে, কেউ বা পড়াশোনা করেছে।
ঢাকায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শীর্ষ গবেষক শাফকাত মুনির বলেছেন, বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই প্রধানত এ ধরনের সহিংস সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে। ‘এটি একটি কমন প্যাটার্ন। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের, পশ্চিমা দেশগুলোতে লেখাপড়া করা অনেক তরুণ যুবকদের সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।’
২০১৬ সালে বাংলাদেশে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের মাত্র দুজন বাদে সবাই বিদেশে লেখাপড়া করেছিল। বাংলাদেশের পুলিশও বিভিন্ন সময় বলেছে, ধর্মীয় উগ্রপন্থায় জড়িতদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া, ধনী ঘরের সন্তান। শ্রীলংকা নিয়ে এ-মুহূর্তে সতর্ক আন্তর্জাতিক মহল। দ্বীপরাষ্ট্রে পুনরায় হামলা হতে পারে, এই আশঙ্কার চীন ও মার্কিন নাগরিকদের নিজ নিজ দেশের জনগণকে শ্রীলংকায় না যেতে পরামর্শ দিয়েছে।
নিহত ও আহত বিদেশিদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন পর্যটক। কেবল বেড়ানোর জন্য শ্রীলংকায় যান তারা। তবে বেশিরভাগ লোক শ্রীলংকান ছিল, যদিও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে কমপক্ষে ৩৯ জন বিদেশিকেও হত্যা করা হয়েছে। শ্রীলংকায় ভয়াবহ বোমা হামলায় সেখানে সপরিবারে বেড়াতে যাওয়া আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির মেয়ে জামাই মশিউল হক চৌধুরী বোমা হামলায় গুরুতর আহত এবং তার আট বছরের নাতি জায়ান চৌধুরী নিহত হন।
শ্রীলংকার বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বোমা হামলায় নিহতের ঘটনায় শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। ভারত, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীলংকায় বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেন।  নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা। শ্রীলংকায় যে ঘটনা ঘটলÑ সবচেয়ে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা গেল। সেখানে আমাদের জায়ানকে হারাতে হয়েছেÑ এ জঙ্গি সন্ত্রাসের কারণে। আমরা জঙ্গিবাদ চাই না, আমরা শান্তি চাই। ভয়মুক্ত সন্ত্রাসমুক্ত পৃথিবী চাই। প্রত্যেক মানুষেরই তার ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকার রয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের মানুষই চায় স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে নিজ ধর্ম পালন ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা। কিন্তু কিছু নরকের কীট সে-পথে বাধা। ধর্মের বিষবাষ্প ছড়িয়ে নিজ স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে, ওরা সমাজে ভীতি সঞ্চার করে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা বা মতবাদ জোর করে চাপিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। উগ্র ধর্মান্ধদের হিংসার বলি।
আমরা এই ঘটনায় হতাহত সবার আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং তাদের নিকটজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। শ্রীলংকা সরকার এবং জনগণের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের ব্যক্তিগত রেষারেষি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের ওপর কালো ছায়া ফেলছে। নেতাদের দায়িত্ব জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আর তাদের ব্যর্থতার মূল্য সাধারণ নিরাপত্তা মানুষ দিয়েছে নিজেদের জীবন দিয়ে।
পরিশেষে বলতে হয়, শ্রীলংকার এই ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার পেছনের কারণ সহজ-সরল না। জাতিগত হিংসার ইতিহাস এবং রাষ্ট্র কাঠামোতে বিরাজমান দ্বন্দ্বের আঙ্গিকে পর্যালোচনা করলে ঘটনার পেছনের ঘটনা সম্পর্কে কিছুটা গভীর বিশ্লেষণ উঠে আশা সম্ভব। কোনো ঘৃণা নয়, বিদ্বেষ নয়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মমত্ববোধÑ সেটাই হোক একমাত্র সকল ধর্মপ্রাণ মানুষের চাওয়া।

Category:

ক্রাইস্টচার্চে নৃশংসতা রুখে দাঁড়িয়েছে নিউজিল্যান্ডবাসী ‘উই আর ওয়ান’

Posted on by 0 comment

4-9-2019 6-36-30 PMসাইদ আহমেদ বাবু: নিউজিল্যান্ড শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বহু দেশ থেকে অভিবাসী এসে মিশ্র জনগোষ্ঠীরই দেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে নিউজিল্যান্ড। লোকসংখ্যা মাত্র ৫০ লাখ। নিউজিল্যান্ড কুক প্রণালি দ্বারা দ্বিধাবিভক্ত। প্রণালির পূর্বপ্রান্তের দক্ষিণ পাশে ক্রাইস্টচার্চ শহর আর উত্তর প্রান্তে ওয়েলিংটন শহর। ক্রাইস্টচার্চ শহরে ১৮৫০ সালে এসে প্রথম মুসলমানরা বসতি স্থাপন শুরু করে। এই ক্রাইস্টচার্চ শহরে মুসলমানরা দুটি মসজিদ গড়ে তোলেনÑ আল নুর ও লিনউড। ২০১৮ সালে বিশ্বের মধ্যে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের তালিকায় নিউজিল্যান্ড ছিল দুই নম্বরে। বিশ্বের অনেক দেশেই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও নিউজিল্যান্ড ছিল ব্যতিক্রম। নিউজিল্যান্ডকে বরাবরই একটি ‘শান্তির দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৯/১১-এর ঘটনাবলির পর বিশ্বের অনেক দেশেই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও নিউজিল্যান্ড ছিল ব্যতিক্রম। এতদিন দেশটার মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল। কিন্তু এই শান্তির দেশটিও এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে? গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলা চালায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী। হামলায় প্রায় ৫০ জন নিহত হন। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল হিসেবেই বেশি পরিচিত। অথচ সেই দেশেই শুক্রবার (১৫ মার্চ) মসজিদের ভেতর ঘটে গেল নারকীয় হামলা। হত্যাকারী ব্যক্তি অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং হামলার শিকার হতাহত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। যাদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিসর, জর্ডান এবং সোমালিয়া আছে। ২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুসারে নিউজিল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ৪৬ হাজার, ওই হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। তবে প্রাণ হারান ৫ বাংলাদেশি। ১৯৪৩ সালের পর নিউজিল্যান্ডে এ ধরনের নারকীয় হামলা এই প্রথম। এই হত্যাকা- কেবল নিউজিল্যান্ডকে ভারাক্রান্ত করেনি, বিশ্বজুড়ে মানুষকে আলোড়িত করেছে। নিউজিল্যান্ডবাসীসহ গোটা বিশ্বের মানুষ এ বর্বর হত্যাকা-ে বিস্মিত, হতবাক। ঘাতক-সন্ত্রাসী টারান্ট এই হত্যাকা-ের দৃশ্য ধারণ করে ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেছে। সে এর আগে ৭৪ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি বিবৃতিও প্রচার করেছে। হত্যাকা-টি যে সুপরিকল্পিত ও চরম হিংসাত্মক, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। দেখা গেছে, আহতদের অনেকের ওপর বারবার গুলি চালিয়ে সে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। তাকে আটক করে পুলিশ।
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিবৃতি প্রদানের জন্য হাজির হলেন, তখন শুধু নিউজিল্যান্ডই তার বক্তব্য শুনতে উদগ্রীব ছিল, তা নয়। সারাবিশ্বের মনোযোগ ছিল সেদিকে। এই সংকটকালে সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন তিনি। অতি দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে এই বন্দুক হামলাকে তিনি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেন। ঐক্য সংহতি ও পরস্পরের জন্য সহমর্মিতাই পারে একটি বহুজাতিক সমাজে সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার রোধ করতে। প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন ১৫ মার্চের চরম বিদ্বেষমূলক অন্যায় আক্রমণের পর, মুসলমানরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ইসলামি উগ্রপন্থিদের সাথে যোগাযোগ করে প্রতিশোধ নিতে পারে। সন্ত্রাসী হামলার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্র্ন মুসলমানদের সান্ত¦না প্রদানের জন্য বিরল সংহতি প্রকাশ করলেন। এদেশটির জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী একযোগে মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়ান। দেশের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা মসজিদ দুটোর কাছে গেলেন এবং হতাহত লোকদের ও সন্ত্রাসী হামলায় নিহত মুসলিমদের পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে ধরে সান্ত¦না ও সমবেদনা জানান তিনি। সে-সময় মাথায় কালো রং এর স্কার্ফ পরেন তিনি, যা তাদের প্রতি শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে। তাদের অভয় দেন। তিনি অকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, হামলার ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসের কালো অধ্যায় তাই সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থা রয়েল কমিশনই এর তদন্ত করবে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। হামলাটি প্রতিরোধে কী করা উচিত ছিল, তাও খাতিয়ে দেখবে রয়েল কমিশন। আমরা সকলে মিলে এই আক্রমণকারীকে প্রতিহত করব। ক্রাইস্টচার্চে নৃশংস হত্যাকা-ের প্রেক্ষিতে সংসদের বিশেষ সভায় গত ১৯ মার্চ নিউজিল্যান্ডে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হয়েছিল একজন মাওলানার কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে যা এই প্রথম। অধিবেশনের শুরুতে কিউই পার্লামেন্টের স্পিকার বলেন, ক্রাইস্টচার্চে ভয়াবহ হামলার প্রেক্ষিতে আমি ইমাম নিজাম উল হক থানভিকে সংসদে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তিনি আরবিতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করবেন এবং তাহির নেওয়াজ সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনাবে। কোরআন তেলাওয়াতের পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন  ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে পার্লামেন্টে তার বক্তব্য শুরু করেন। ক্রাইস্টচার্চ সন্ত্রাসী হামলায় অভিযুক্ত অস্ট্রেলীয় বন্দুকধারীর নাম উচ্চারণ না করার অঙ্গীকার করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, সে একজন সন্ত্রাসী। সে একজন চরমপন্থি। এ হামলাকারীকে ‘আইনের সর্বোচ্চ সাজা’ ভোগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তার এই সন্ত্রাসী কর্মকা-ের পক্ষে সে অনেক কিছু ভাবতে পারে। কিন্তু সে কুখ্যাতি ছাড়া আর কিছুই পায়নি। তিনি সন্ত্রাসকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন মুসলমানেরা সাধারণ এই প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ ভূমিকায় সাহস ফিরে পাচ্ছে।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেকটা মসজিদে মুসল্লিরা যাতে শান্তিতে নামাজ আদায় করতে পারে তা নিশ্চিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। গোটা দেশের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দেশের বন্দুকনীতি কঠোর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যমে যে ঘৃণা ছড়ানো হয় তা প্রতিহত করা হবে। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা এটা আবার সামনে নিয়ে আসে যে সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই, জাত নেই। ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে গত ১৫ মার্চের হামলায় ৫০ জন নিহত ও ৪০ জনের বেশি মুসল্লি আহত হন। হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানাতে ২২ মার্চ এক সপ্তাহ পূরণ হলে দেশটিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয়। ক্রাইস্টচার্চের সামনে আল নূর মসজিদের সামনে হেগলি পার্কে স্মরণসভা আয়োজন করা হয়েছে। শোক পালনে হ্যাগলি পার্কে দেখা গেছে অভূতপূর্ব সব দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। সেদিন জুমার নামাজের আগে ওই সংকটকালে পুরো দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মানসে স্মরণসভায় সমবেত নাগরিকদের উদ্দেশ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উই আর ওয়ান’ আমরা সবাই এক, নিউজিল্যান্ডের সবাই আপনাদের সঙ্গে ব্যথিত। জাসিন্ডা আরডের্ন আরও বলেন, ‘মোহাম্মদ (স.) বলেছেন পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতি দিয়ে একটি শরীরের মতো থাকবেন। যখন শরীরের কোনো অঙ্গে ব্যথা হয় তখন পুরো শরীরের ব্যথা হয়।’
এ-বিষয়ে জাসিন্ডা বলেছেন, অপ্রত্যাশিত সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পুরো দেশে বেদনা ও ভালোবাসায় ভরে গেছে। স্মরণসভা আয়োজন করার মধ্য দিয়ে নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীরা আরেকবার দেখাতে চায়, তারা সহানুভূতিশীল, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে থাকতে চায়, এখানকার সমাজ বৈচিত্র্যময়। আর আমরা সেই মূল্যবোধকে সুরক্ষিত রাখব। হাজার হাজার মানুষ বাইরে বেরিয়ে এসে দুই মিনিট নীরবতা পালন করেছেন। নিউজিল্যান্ডের জাতীয় টিভি ও রেডিওতে জুমার নামাজের আজান প্রচার করা হয়। ঐদিন পুরো নিউজিল্যান্ডই মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, অমুসলিম নারীরাও মাথায় কাপড় দিয়ে মুসলিমদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন : শুধু মুসলিমরা নন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নানা জাতি-ধর্মের মানুষের ঢল নেমেছিল সেখানে। এ-সময়ে প্রধানমন্ত্রীর গায়ে ছিল মুসলিম রীতির পোশাক, মাথায় ছিল হিজাবের মতো ওড়না দেওয়া। হিজাব পরে আরডের্ন এবং তার দেশের নারীরা বার্তা দেন মুসলিম নারীদের। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’Ñ সেই চিরায়ত উচ্চারণ দীপ্তকণ্ঠে ফিরে আসে আরডের্নের মুখে। জুমার নামাজের পর মুসলমানদের সঙ্গে গণপ্রার্থনায় অংশগ্রহণ করে আক্রান্ত মুসলিম সম্প্রদায়কে অভয় দিলেন, আল নূর মসজিদে হাজার হাজার মানুষের সামনে ইমাম জামাল ফাওদা যে বক্তৃতা দেন, সেটি আলোড়িত করেছে সব মানুষকে।
বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মন ভেঙে গেছে। আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে তাকিয়েছি, তখন নিউজিল্যান্ড ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের চোখে ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখেছি। এতে আরও লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ভরে গেছে, যারা আমাদের সঙ্গে এখানে শারীরিকভাবে নেই; কিন্তু তাদের আত্মা আমাদের সাথেই আছে।
সন্ত্রাসী আমাদের দেশকে তার অশুভ মতাদর্শ দিয়ে বিভক্ত করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা তাকে দেখিয়ে দিতে পেরেছি যে নিউজিল্যান্ড ভেঙে টুকরো হয়ে যায়নি। বরং বিশ্ব আমাদের ভালোবাসা আর ঐক্যের উদাহরণ হিসেবে দেখছে। আমাদের মন ভেঙে গেছে; কিন্তু আমরা ভেঙে পড়িনি। আমরা বেঁচে আছি। আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে কেউ আমাদের বিভক্ত করতে পারবে না।
এই হামলায় যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে বলছি আপনাদের স্বজনের মৃত্যু বৃথা যায়নি। আপনাদের হারিয়ে নিউজিল্যান্ডের ঐক্য ও শক্তি জোরদার হয়েছে। কিন্তু আপনাদের চলে যাওয়াটা যেন নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব মানবতার জন্য একটি সতর্কবার্তা ছিল।
ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম বিদ্বেষ হন্তারক। মুসলমানেরা আগেও এর শিকার হয়েছে। কানাডা, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ইসলাম বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন অনেক মানুষ। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষ খুবই বাস্তব। এ মতাদর্শ মানুষের মানবতা ভুলে অযৌক্তিকভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে ভীতি ছড়ায়। আমরা নিউজিল্যান্ডের সরকার এবং আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আহ্বান জানাই হেটস্পিচ বা হিংসাত্মক বক্তৃতা ও ভয়ের রাজনীতির ইতি টানার জন্য যেন উদ্যোগ নেওয়া হয়। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের উত্থান এবং ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীলতা বিশ্ব মানবতার জন্য বিরাট এক হুমকি এবং এর অবসান এক্ষুণি হতে হবে। ইমাম তার বক্তব্যে ১৫ মার্চের ঘটনায় হতাহতদের প্রতি নিউজিল্যান্ডের মুসলমান ও অমুসলমানদের ভালোবাসা এবং চোখের জলের জন্য ধন্যবাদ জানান। নিউজিল্যান্ডের মানুষ মুসলমানদের সাথে সংহতি জানিয়ে যে ঐতিহ্যবাহী হাকা নৃত্যের আয়োজন করেছে সেজন্য ধন্যবাদ জানান।
আরডের্ন মনে করেন, তার দেশে সন্ত্রাসবাদের এই বাজে দৃষ্টান্তের মাধ্যমে অস্ত্র আইনের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তিনি আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই আইন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। যাতে দেশটির নাগরিকরা সেখানে বসবাস করতে নিরাপদ বোধ করে।
প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডার কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, জাসিন্ডার মতো একজন নেতা দরকার যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বের দেশ-বিদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন জাসিন্ডার কার্যক্রমের। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান থেকে সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমে এক প্রশংসিত নাম আরডের্ন। আরডের্নের প্রশংসা করে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, আতঙ্ক কীভাবে সামাল দিতে হয়, তা আরডের্নের কাছ থেকে শেখা উচিত বিশ্বের। অন্যদিকে, গার্ডিয়ানে লেখা হয়েছে সত্যিকারের নেতা।
ফরাসি সাইটে লেখা হয়েছে, ক্রাইস্টচার্চে বিয়োগান্তক ঘটনার পর উপযুক্ত, উন্মুক্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন, আমরা আশা করি আগামীতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ফরাসি সাইটে এই আবেদনটির উদ্যোক্তা ফরাসি কবি ড. খাল তোরাবুলি।
পশ্চিমা সমাজে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অশ্বেতাঙ্গ ও অভিবাসীদের ওপর যত সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটিয়েছে, তার তালিকা দীর্ঘ। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলাকে সেই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন বলা যেতে পারে। তবে ঘটনাটি যে হঠাৎ করেই ঘটেনি, তা বহু পর্যবেক্ষকই স্বীকার করেন। পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে এ ঘৃণা ছড়িয়ে আসছে। ইসলামভীতি তৈরিতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে আসছেন তারা। সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে এক হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তারপর নিউজিল্যান্ড ও এদেশের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন যে আন্তরিক সহানুভূতি ও সমর্থন দিয়েছেন তাতে ১৫০ কোটি মুসলিমের শ্রদ্ধা পেয়েছেন তিনি। অভিবাসনের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে বর্ণবাদ বেড়ে যাচ্ছেÑ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন জাসিন্ডা আরডের্ন।
উগ্র কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদী মনোভাবের উত্থানের বিষয়ে প্রশ্ন করলে আরডের্ন বলেন, নিউজিল্যান্ডে আমরা এ-ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাস করি না। তবে আমি বিশ্বব্যাপী একটি আহ্বান জানাতে চাই। নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় এখানকার মানুষ এমন এক ব্যক্তির সহিংসতার ভুক্তভোগী হয়েছে যে নিউজিল্যান্ডের বাইরে তার কট্টরপন্থি মতাদর্শের সাথে পরিচিত হয়েছে এবং সেখানেই এর অনুশীলন করেছে।
শরণার্থীদের গ্রহণ করার বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের ভূমিকার প্রশংসা করে আরডের্ন বলেন, আমাদের দেশে মানুষকে স্বাগত জানানো হয়।
কট্টর দক্ষিণপন্থি বর্ণবাদী মতাদর্শের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে বিশ্বের সব দেশের একত্রিত হয়ে লড়াই করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন।
বিবিসির সাথে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ ‘বিতাড়িত’ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ‘সীমানা দিয়ে ভাবলে আমাদের চলবে না’। আরডের্নের প্রথম বক্তব্যের সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের পর্যবেক্ষকরা তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে সুজানে মুর লিখেছেনÑ ‘মার্টিন লুথার কিং বলেছেন সত্যিকারের নেতারা ঐক্য খোঁজে না, তারাই ঐক্য তৈরি করে, আরডের্ন ভিন্ন ধরনের ঐক্য তৈরি, কর্ম, অভিভাবকত্ব ও একতার প্রদর্শন করেছেন।’
‘সন্ত্রাসবাদ মানুষের মাঝে ভিন্নতাকে দেখে এবং বিনাশ ঘটায়। আরডের্ন ভিন্নতা দেখেছেন এবং তাকে সম্মান করতে চাইছেন, তাকে আলিঙ্গন করছেন এবং তার সাথে যুক্ত হতে চাইছেন।’
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্নকে সম্প্রতি টুইটারে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ক্রাইস্টচার্চে নিহতদের সম্মানে এমনই একটি ছবি এঁকেছেন অস্ট্রেলিয়ান কার্টুনিস্ট ক্যাম্পবেল। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আঁকা তার এ ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। তিনি বলেন, রুপালি ফার্ন পাতা নিউজিল্যান্ডের জাতীয় জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমি জানি। সে ধারণা থেকেই নিহতদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে এটি আঁকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মার্টিন লুথার কিং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন অনেক কারণেই। এর প্রধান ও মুখ্য কারণ হিসেবে বলা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা। সারাবিশ্বে ক্রমবর্ধমান কট্টর ও উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থানের ঢেউ আমেরিকায় প্রবেশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে। তিনিই নিয়ে আসেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শব্দবন্ধটি।
মুখে বললেন পুরনো ঐতিহ্য ও শক্তিমত্তা ফিরিয়ে আনার কথা। কিন্তু কাজে টানলেন বিভাজনের রেখা। তার এই নীতি বলার অপেক্ষা রাখে না, সারাবিশ্বেই বড় প্রভাব ফেলেছে। ঠিক এই প্রাসঙ্গিকতাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তার সেই স্বপ্ন ও আশার কথা আরও জোর দিয়ে বলার সময় এখনই, যেখানে কোনো বিভাজন থাকবে না, থাকবে না কোনো বৈষম্য।

Category:

ভেনেজুয়েলায় কী ঘটছে?

Posted on by 0 comment

Mfdসাইদ আহমেদ বাবু: ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে ক্যারিবীয় সাগরের তীরে একটি রাষ্ট্র। ‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্র’র রূপকার খ্যাত প্রয়াত ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজ সেই দেশের অর্থনীতিকে বের করে এনেছিলেন পশ্চিমা কর্তৃত্ব থেকে। বলিভারিয়ান বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয় সরকারের এক সদস্য হাইদো ওর্তেগা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সময় আন্দোলনে যেতে হতোÑ যেন বিদ্যুৎ পাই, পথঘাট ঠিক হয় কিংবা উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা হয়।’ চ্যাভেজ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের সমন্বয়ে একটি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেন। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনেন তিনি। মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বদলে তেল বিক্রির অর্থ জমা হতে থাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। ভেনেজুয়েলার তেল থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেন তিনি।
সম্পদ-সমৃদ্ধ এদেশে চাভেজ সরকার ক্ষমতার আসার আগে ৬৬ শতাংশই প্রচলিত ‘দারিদ্র্যসীমা’র নিচে বসবাস ছিল। দেশের এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির, তার সহযোগী ছিল দেশি ধনিকরা। ১৯৯৮ সালে চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর দেশের এই ক্ষমতা ভারসাম্যের আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। সব প্রতিকূলতার মধ্যে চাভেজের প্রথম দশকে ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো কমিউনাল কাউন্সিল, যা জনগণকে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক কাঠামো দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে চাভেজ বিদ্যমান রাষ্ট্রের সমান্তরাল রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। দেশের সম্পদের ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংস্কার শুরু করেছিলেন। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও শুরু হয়েছিল। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় এক সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন চ্যাভেজ। সামরিক বাহিনীর অস্ত্র আর আক্রমণ প্রতিহত করে কারাকাসের রাজপথে নেমে এলো গরিব নারী-পুরুষ। সারাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। উৎখাতের কয়েকদিনের মধ্যে ক্ষমতায় ফিরে তিনি ভেনেজুয়েলাকে একবিংশ শতাব্দীর সমাজবাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তেল বিক্রির আয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ ভেনেজুয়েলানকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেন চ্যাভেজ ও ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি। দেশটিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনেন তিনি। অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনেন শিক্ষা, চিকিৎসা আর জ্বালানি সেবায়।
এই সরকারের সঙ্গে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির বিবাদ তৈরি হয়, বিশ্বের বৃহৎ আর্থিক সংস্থা বড় ব্যবসা হারায়, যুক্তরাষ্ট্র তাই প্রথম থেকেই ‘একনায়ক’ চাভেজ-বিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকে। চাভেজ সরকার একের পর এক তাদের আক্রমণ, চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাত মোকাবিলা করে অগ্রসর হয়েছে। গরিব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ে ক্রমান্বয়ে পাল্টা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর মধ্য দিয়েই এই চেষ্টা চলেছে।
দেশটির সাবেক প্রধান হুগো চাভেজ ২০১৩ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে নিকোলাস মাদুরো হন তার উত্তরসূরি। মাদুরো চাভেজের অনুসারী চাভেজের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। শেষে এক বছর চাভেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চাভেজের শাসন শুরুর ২০ বছরের মাথায় এসে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে একবারে শেষপ্রান্তে। ২০১৫ সাল থেকে কমপক্ষে ২৭ লাখ মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা দেশের ভেতরে আছেন তারাও ক্ষুধার যাতনা আর স্বাস্থ্যসেবার অভাবে দিশেহারা। সে-কারণেই খোদ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এ উদ্ধৃত সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, বিপন্ন এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সমাজতন্ত্রে আস্থা হারান নি। সংকট থাকলেও সে-জন্য চাভেজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা মাদুরোকে দায়ী না করার মতো মানুষ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ও অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে জুয়ান গুইদোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনতে। তবে, সিরিয়া প্রেক্ষাপটকে উদাহরণ হিসেবে ধরে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা এত সহজ হবে না। কারণ, ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর সরকারকে সেদেশের সেনাবাহিনী ও বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রগুলো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাই ভেনেজুয়েলায় চলমান সংকটকে আগেভাগেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া বিশ্বনেতাদের এখন আশু কর্তব্য।
মিন্টপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০১৪ সালের এক ঘটনা। সে-সময় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ধ্বংসের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তৎপর হয় আরেক তেলসমৃদ্ধ শক্তি সৌদি আরব। আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের বোঝা বাড়লেও কম দামে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখে তারা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে নেমে আসে ২৮ ডলারে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে ভেনেজুয়েলা। শুরু হয় বাজেট কর্তন এবং অর্থনৈতিক ধস। দেখা দেয় খাবারের অভাব। ২০১৫ সালে ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ওবামা প্রশাসন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত চারবার ভেনেজুয়েলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলা যত তেল রপ্তানি করে তার মধ্যে ৪০ শতাংশ তেলই আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তেলের ওপর জারি করা এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন অন্যান্য দেশও ভেনেজুয়েলার তেলের দাম কমিয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, ২০১৩ সাল থেকে মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া, চীন ও তুরস্ক। ফলে হয়তো পরিস্থিতি একই রকম থেকে যাবে।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে তার এই ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশ। তবে ইরান, রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রকেই তার দেশের সংকটের পেছনে মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে ম্যানয়েল লোপেজ বেশ কূটনৈতিক একটি অবস্থান নিয়েছেন। মাদুরো ও গুইয়াদোর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তা সমাধানের চেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে রাজি হয়েছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। খাবার ও ওষুধের মতো মৌলিক পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সেখানকার জনগণ। গুয়াইদো জোর দিয়ে বলছেন, লোকজনের সাহায্য প্রয়োজন। অন্যদিকে মাদুরো বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশের ভেতরে সাহায্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে চীন। একইসঙ্গে চলমান সংকট সমাধানে ও ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় দেশটি। সম্ভাব্য রক্তপাত এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসও।
ভেনেজুয়েলার জনগণ দুই প্রেসিডেন্টের প্রতি নিজেদের সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করায় পুরো দেশের জনগণ এখন দ্বিধাবিভক্ত। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দুই প্রেসিডেন্টের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বশক্তিগুলোর দুই প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করায় রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে। আমেরিকা এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট গুয়াইডুর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। আমেরিকা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ভূমিকা রাখার জন্য ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ‘একনায়ক’ আখ্যা দিয়ে অনির্বাচিত এক ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তাকে সমর্থন দিচ্ছে কানাডা, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশের সরকার। মার্কিন ও বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ দেখতে সক্ষম এ-রকম সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মরিয়া বিশ্বদুর্বৃত্তরা। কারণ হলো ভেনেজুয়েলার সম্পদ ও দারিদ্র্য। দেখতে হবে এদেশে জনপন্থি নেতা চাভেজের চেষ্টা এবং তাতে কার ক্ষতি কার লাভ।
সম্পদ এবং দারিদ্র্য কীভাবে পাশাপাশি থাকে, তার উদাহরণ বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। ভেনেজুয়েলায় পশ্চিম গোলার্ধে প্রমাণিত তেল মজুত এদেশেই সবচেয়ে বেশি। গ্যাস সম্পদেও এদেশ অনেক সমৃদ্ধ, বিশ্বের নবম বৃহত্তম প্রমাণিত গ্যাস মজুত আছে এদেশেই, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে এটি বৃহত্তম। কয়লা সম্পদ তুলনায় কম হলেও তার মজুতও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আছে লোহা, বক্সনাইট, সোনা, নিকেল ও হীরা। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার এই সমৃদ্ধিই তার কাল হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী এ থেকে লাভবান হয়েছে। দেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রপ্তানি বাণিজ্যÑ সবকিছুই বেশ রঙিন হয়েছে, কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য তার সুফল তৈরি হয়নি দীর্ঘকাল। বিশ্বের বহু দেশের মতো এদেশ আবারও দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি, সহিংসতা, লুণ্ঠন ও স্বৈরতন্ত্রে প্রবেশের হুমকির মধ্যে।
মাদুরো ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তিনি যদি হস্তক্ষেপ করেন তাহলে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিণতি বরণ করতে হবে। এদিকে যে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক অনধিকার চর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য পশ্চিমা হুমকিদাতাদের সতর্ক করে দিয়েছে মাদুরোর মিত্র রাশিয়া। ভেনেজুয়েলার সমস্যা এখন আর তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, এই সংকট এখন পুরো মহাদেশের শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

Category:

ব্রেক্সিট নিয়ে গৃহবিবাদে ব্রিটেন

2-6-2019 8-43-22 PMসাইদ আহমেদ বাবু: ব্রেক্সিট হলো ব্রিটিশ এক্সিটের সংক্ষেপিত রূপ। অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তথা এক্সিট বোঝাতে ব্রেক্সিট শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
১৯৭৩ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে গণভোট দিয়েছিল যুক্তরাজ্যবাসী। তাতে ৬৭ শতাংশ ইইসি’র পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ওই ইইসি-ই পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ’তে রূপ নেয়, যার সদস্য সংখ্যা এখন যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ২৮। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত দেশ যুক্তরাজ্য। প্রত্যেকটি ভূ-খ-ের নিজস্ব ভৌগোলিক অবস্থান-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি রয়েছে। একেক ভূ-খ-ের মানুষের চাহিদার মধ্যেও ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। ১৯৯৩ সালে ইইউ নিজস্ব মুদ্রা, নীতিমালা, নাগরিকদের জন্য সীমানামুক্ত বিচরণসহ বেশ কয়েকটি আইনে পরিবর্তন আনে। কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিক ইইউর বিধিনিষেধ মেনে চলা নিয়ে বিপক্ষে অবস্থান নিলে ২০১৬ সালের ২৩ জুন গণভোট আয়োজন করে যুক্তরাজ্য। এই অনুষ্ঠিত গণভোটে অঞ্চলভিত্তিক ভোটের ফলাফলে পার্থক্য দেখা যায়। নাগরিকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। গণভোটে প্রায় ৫২ শতাংশ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ২৮ জাতির ইইউ জোটের সঙ্গে চার দশকের সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন পথে হাঁটার প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের এই গণভোটকে সংক্ষেপে বলা  হচ্ছে ‘ব্রেক্সিট’।
ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে ব্রিটেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখছেন। এ নিয়ে দেশটিতে তৈরি হয় জটিলতা। অনেকে এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ব্রিটেনে এক ধরনের গৃহবিবাদ চলছে। দেশটির বিরোধী দল এই প্রস্তাবের শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছে। প্রায় এক বছর কেটে গেলেও এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ব্রিটেন। ফলে ব্রেক্সিট ব্রিটেন ও দেশটির প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে একটি চুক্তির ভিত্তিতে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ব্রিটেনের এই প্রস্থান কীভাবে হবে সে-বিষয়ে দেশটির সংসদ সদস্যরা একমত হতে পারছেন না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে না চাওয়ার কারণ
ক. ভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা : ইইউ’র সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা ইউরো ব্রিটেনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই তারা স্রোতের বিপরীতে অর্থাৎ ইউরোর পরিবর্তে পাউন্ড-স্টার্লিং নিয়ে আছে।
খ. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব : ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষ তাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক (মুদ্রা পাউন্ড-স্টার্লিং, জাতীয় পতাকা ও ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টে প্রণীত আইনের)-এর ওপর কারও হস্তক্ষেপ চান না।
গ. জাতীয় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য : ইইউ’র আইনকানুন সবক্ষেত্রে ব্রিটেনের সঙ্গে সমগামী নয়। তাছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ততার কারণে ব্রিটেন তার জাতীয় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য হারাতে চায় না।
ঘ. নাগরিক স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা : ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকদের স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধাকেই বড় করে দেখে। তারা চায় না ব্রিটিশ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা কোনোভাবে বিঘিœত হোক।
ঙ. শুধু ব্যবসা : ব্রিটিশরা ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করতে চায়; কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে চাওয়ার কারণ
ক. রাজনৈতিক দলের দ্বিমত : ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার ব্যাপারে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা-নেত্রী ও সদস্যরা মোটামুটি একমত এবং না থাকার বিষয়ে রক্ষণশীল দলের নেতা-নেত্রী ও সদস্যরা বিভক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার ব্যাপারে লন্ডন মহানগরীর নাগরিকরা মোটামুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বলা চলে।
খ. ইউরোপ বাদ দিয়ে ব্রিটেন নয় : ইউরোপকে বাদ দিয়ে ব্রিটেন নয়। এমনকি যে স্কটল্যান্ড গত বছর ব্রিটেন ত্যাগ করে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীন হতে চেয়েছিল, তারাও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার পক্ষে নয়।
গ. অর্থনৈতিক স্বার্থ : ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যেই বলেছেন, লন্ডনের শক্তিশালী অর্থনীতি ইইউ ত্যাগ করার ফলে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাছাড়া এই নগরীতে চাকরি হারাতে পারে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। হাউস অব কমন্স এবং হাউস অব লর্ডস। হাউস অব কমন্সের সদস্য সংখ্যা ৬৫০। যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। সরাসরি জনগণের প্রতিনিধি। আর হাউস অব লর্ডসে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০০-র মতো। এই সদস্যরা মনোনীত হন একটি সিলেকশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে যুক্তরাজ্যের রানি তাদের মনোনীত করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার আর মাত্র দু-মাস বাকি রইলেও এখনও ব্রিটিশ সরকার ঠিক করতে পারেনি তারা কোন শর্তে বেরিয়ে আসবে। সম্প্রতি পার্লামেন্ট ভোটাভুটির পর এ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ব্রিটেনে। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে ব্রেক্সিটের বিষয়ে একটি বড় অগ্রগতি হয়েছিল। ব্রিটেনের সরকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রেক্সিটের শর্ত ঠিক করার জন্য আলোচনা শুরু করে। সেই আলোচনার পর উভয় পক্ষ একটি চুক্তির বিয়য়ে একমত হয়েছিল। তেরেসা মে বলেন, ব্রেক্সিট নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে ব্রিটেনের জনগণ আর সময় অপচয় করতে চায় না। কিন্তু দেশটির প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে-র জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল সেই চুক্তি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনুমোদন করানো। অনুষ্ঠিত সেই ভোটাভুটিতে তেরেসা মে-র সরকারের বড় পরাজয় হয়েছিল। এরপর ২৯ জানুয়ারি দিন শেষে ৭টি সংশোধনীর ওপর ভোট হয়। অধিকাংশ সংশোধনী বাতিল হয়ে যায় ভোটের মাধ্যমে। আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে নতুন আলোচনা ও চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট না হওয়া। তেরেসা মে-র কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরে অনেক প্রভাবশালী সদস্য রয়েছেন, যারা এর বিপক্ষে। তারা চান ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সীমান্ত সম্পূর্ণ আলাদা হতে হবে। ফলে তেরেসা মে যে চুক্তি করেছিলেন সেটি বাস্তবায়নের ক্ষীণ হয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, তেরেসা মে-র প্রস্তাবটি বাতিলের পক্ষে ৪৩২ সংসদ সদস্য এবং প্রস্তাবের পক্ষে ২০২ সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটাভুটিতে ১১৮ এমপি বিরোধী দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মে-র চুক্তির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর মাধ্যমে এই প্রথমবার দেশটির কোনো ক্ষমতাসীন সরকার পার্লামেন্টে এত বড় ব্যবধানে পরাজয়ের মুখোমুখি হলো।
ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রশস্ত করতে তেরেসা মে-র চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই ছিল এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠান। তেরেসা মে-র প্রস্তাবিত চুক্তিটি অধিকাংশ সংসদ সদস্যরা বাতিল করায় তার সামনে এখন দুটো পথ খোলা আছে। প্রথমত, চুক্তির নতুন খসড়া তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের সময় বাড়িয়ে নেওয়া। তা না হলে কোনো রকমের চুক্তি ছাড়াই ২৭টি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে ব্রিটেনকে। এতে বেশ বড়সড় সংকটে পড়বে দেশটির অর্থনীতি তথা সামাজিক অবস্থা। ২৯ মার্চের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল ওই চুক্তিতে।
সাধারণ ক্ষেত্রে এ ধরনের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর বিশাল পরাজয়ের পর আশা করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। তবে ভোটাভুটির পরেই তেরেসা মে আভাস দিয়েছেন, তিনি সরকার পরিচালনা অব্যাহত রাখবেন। ভোটাভুটিতে ব্যর্থ মে এখন সব দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ব্রেক্সিটের বিষয়ে করণীয় ঠিক করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ব্রিটেনের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন কোনো দলের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় পরাজয় বলে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তেরেসা মে-র এই পরাজয়ের পর ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশটি। ইতোমধ্যে বিরোধী নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
এই চুক্তি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরের বিতর্ক, সমঝোতার সবকিছুই ভেস্তে গেল। আর অনিশ্চিত হয়ে গেল ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ। এখন সরকারকে নতুন প্রস্তাব নিয়ে হাজির হতে হবে। এই বিশাল ধকল সামাল দিয়ে তেরেসা মে সরকারে টিকে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়েও শুরু হয়েছে তোড়জোর।
মানুষের আশার চেয়েও বড় পরাজয় এবং এই ফলাফলের মাধ্যমে তেরেসা মে-র ব্রেক্সিট চুক্তির মৃত্যু ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। ব্রেক্সিট চুক্তি প্রত্যাখ্যানের পর পার্লামেন্টের বাইরে আনন্দ মিছিল করেছে যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনগণ। এদিকে ভোটের ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক। তিনি ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারকে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানান। তেরেসা মে-র দল কনজারভেটিভ পার্টির অনেক এমপি ব্রেক্সিট চুক্তিতে সমর্থন না দিলেও তারা সাধারণ নির্বাচন আয়োজনে আগ্রহী নয়। মে’র ডিইউপি জোটের অংশীদার দলগুলো ব্রেক্সিট চুক্তির বিপক্ষে ভোট দিলেও আস্থা ভোটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পাশেই থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ব্রেক্সিট চুক্তির অন্যতম বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আলোচিত ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণ কীভাবে পরিশোধ করবে যুক্তরাজ্য। এছাড়া যুক্তরাজ্যে বসবাসরত জোটের অন্য দেশগুলোর প্রায় ৩২ লাখ মানুষের অবস্থান কী হবে কিংবা ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাজ্যের প্রায় ১৩ লাখ নাগরিকের ভবিষ্যৎই বা কী হবে এগুলোও চুক্তির মধ্যে ছিল। এগুলো ছাড়া নর্দান আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সমস্যার বিষয়টি তো ছিলই। এসব বিষয়ে চুক্তিতে যেসব সমাধান দিয়েছেন তেরেসা মে, তার বেশির ভাগই সদস্যদের পছন্দ হয়নি।
ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি ক্ষুণœœ হচ্ছে। দেশটির অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতা বলয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডুবে গেছে ব্রিটেন। ব্রেক্সিট সংকট নিরসনে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশটিকে।
তেরেসা মে-র ব্রেক্সিট চুক্তি বাস্তবায়িত হলে আগামী ২৯ মার্চ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সাবেক উপনিবেশবাদী দেশ ব্রিটেনের। কিন্তু এই পরাজয়ের ফলে এ নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা থেকেই গেল।
চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে কী ঘটতে পারে সে-বিষয়ে বিবিসি জানায়, তেমন কিছু হলে রাতারাতি ইইউ-র সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটবে ব্রিটেনের। যদিও মে’র সরকার এবং আরও অনেকেই এর বিরুদ্ধে। দেশটির অধিকাংশ এমপি বলেছেন, কোনোরকম চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা ঠিক হবে না। এ-সংক্রান্ত একটি সংশোধনীর পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। তারা চান ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন হতে। কিন্তু পার্লামেন্ট বর্তমান ব্রেক্সিট চুক্তি মেনে নিতে নারাজ থাকলে এবং নতুন কোনো বিকল্প পাওয়া না গেলে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট হয়ে যাবে ব্রিটেনের। তখন আর ইইউ-র বিধিনিষেধ মানতে হবে না দেশটিকে।
তবে মেনে চলতে হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মকানুন। আমদানি-রপ্তানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপ হবে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ব্রিটেনে আসতে দেরি হবে। সেজন্য ব্রিটেনের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, যুক্তরাজ্য এখন সবদিক থেকেই চাপে রয়েছে। আমাদের উচিত তাদের বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বের এই জটিল সময়টিতে তাদের সাথে মধ্যস্ততা করা। কেননা, ব্রিটেন পরিস্থিতি ঠিকঠাক সামাল দিতে পারছে না।
আয়ারল্যান্ডের সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ভোটাভুটি অযথার্থ ব্রেক্সিট চুক্তির আশঙ্কাকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জার্মান ভাইস চ্যান্সেলর ও অর্থমন্ত্রী ওলাফ স্কলজ বলেন, ইউরোপের জন্য একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার দিন ছিল। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে, কঠোর কোনো চুক্তি ইইউ ও যুক্তরাজ্যের জন্য মোটেও শুভ ফল বয়ে আনবে না।
ব্রেক্সিট চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত এই পরিবর্তন ব্রেক্সিট ইস্যুকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে, চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট কার্যকরের কথা মাথায় রেখে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে সরকারের কেবিনেট। এজন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের জন্য ২ বিলিয়ন পাউন্ড স্টারলিং অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাতে বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। এছাড়া, ২০১৯ সালের ২৯ মার্চ থেকে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট কার্যকরের কথা মাথায় রেখে পূর্ব প্রস্তুতির জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেবে সরকার। এ-রকম একটি নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার কিংবা পার্লামেন্ট কেউই দিতে পারছে না সঠিক সমাধান। অথচ ব্রেক্সিট ইস্যু কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ।
ইইউ ত্যাগ করে একলা চলো নীতিতে ফেরা ব্রিটেনের জন্য কতটা সহজ বা দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মতো, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা প্রয়োজন। তেমনিভাবে ইইউ-র সঙ্গে থেকে গেলে প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হবে বা আদৌ ব্রিটেনের জন্য ভালো কিংবা স্বস্তিদায়ক হবে কি না তা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ জরুরি। সেই সঙ্গে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
না হলে দিন দিন এই সংকট বাড়বে, তবে কমবে না। সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসা প্রথম সারির দেশটির মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে পারে অন্যদিকে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীর্ঘ আলোচনার পর অনুষ্ঠিত আস্থা ভোটে তেরেসা মে-র সরকারের প্রতি সমর্থন জানান ৩২৫ সংসদ সদস্য। আর অনাস্থা জানান ৩০৬ জন। এরপর তেরেসা মে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সব সংসদ সদস্যকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটস এবং প্লেড সাইমরু নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। এখন বিকল্প পন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে যুক্তরাজ্যের সরকার।

Category:

বাংলাদেশের দুই বন্ধু পরলোকে

সাইদ আহমেদ বাবু:

uttaঅটল বিহারী বাজপেয়ী
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারতসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। গত ১৬ আগস্ট বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে মৃত্যু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতরতœ অটল বিহারী বাজপেয়ীর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। ১৭ আগস্ট দিল্লির স্মৃতিস্থল শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। চোখের পানিতে অটলজিকে বিদায় জানায় লাখ লাখ মানুষ।
প্রায় চার দশকের এই সংসদ সদস্য ছিলেন ভারতের প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী যিনি পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। প্রথম দফায় ১৩ দিন, দ্বিতীয় দফায় ১৩ মাস ও পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুরো মেয়াদ úূর্ণ করেন। প-িত জওহরলাল নেহ্রুর পর তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি পরপর দুবারের জন্য জনাদেশ পেয়ে এই পদে আসীন হন। বাজপেয়ী লোকসভায় ৯ বার নির্বাচিত হন এবং রাজ্যসভায় দুবার নির্বাচিত হন। তার ভাষণ এতটাই জোরদার ছিল, যা প্রভাবিত করেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহ্রুকেও।
আর্য সমাজের যুব শাখা আর্য কুমার সভা থেকে সমাজসেবায় অংশ নেওয়া শুরু বাজপেয়ীর। ১৯৪৪ সালে তিনি আর্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসবের মাঝে ১৯৩৯ সালে আরএসএসে যোগ দেন তিনি। ১৯৪৭ সালে পূর্ণ সময়ের আরএসএস কর্মী হন বাজপেয়ী। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন তথা রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় বাজপেয়ীর। সেই সময়ে ২৩ দিন গ্রেফতার করে রাখা হয়েছিল বাজপেয়ী ও তার দাদা প্রেমকে। পরে মুচলেখা শর্তে ছাড়া পান। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮। নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধীর হত্যার পর দেশজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয় আরএসএস-কে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসংঘে যোগ দেন বাজপেয়ী। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর জনসংঘের দায়িত্ব নেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু লালকৃষ্ণ আদভানি।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়ে গ্রেফতার হন বাজপেয়ী। ১৯৭৭ সালে ছাড়া পাওয়ার পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে কংগ্রেসবিরোধী জোট, যা জনতা পার্টি নামে পরিচিত ছিল, তাতে জনসংঘ নিয়ে বাজপেয়ী যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে জনতা পার্টি জোটের সরকার হলে প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজি দেশাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হন অটল বিহারী বাজপেয়ী। প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দেন তিনি। ১৯৭৯ সালে জনতা পার্টির সরকার পড়ে গেলেও ততদিনে বাজপেয়ী নিজেকে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।
১৯৮০ সালে আরএসএস’র প্রচারক বাজপেয়ী দীর্ঘদিনের বন্ধু লালকৃষ্ণ আদভানি, ভৈরো সিং শেখাওয়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি তৈরি করেন। তিনি হন বিজেপির প্রথম সভাপতি।
১৯৮৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজেপি মাত্র দুটি লোকসভা আসনে জয়ী হন। তবুও সংসদে কংগ্রেসের বিরোধী নেতা বলতে সবার আগে বাজপেয়ীর নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরত। ধীরে ধীরে অযোধ্যা ও রাম জন্মভূমি ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিকভাবে সারাদেশে বিজেপি ছড়িয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে জয়ের পরে বিজেপি অনেক শক্তিশালী হয়ে যায়।
১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। দুই পরমাণু অস্ত্রধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারত। হয়নি। কারণ পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলার অনুমতি দেননি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী।
১৯৯৯ সালে পুনরায় লোকসভা নির্বাচন হয়। কারগিল যুদ্ধ ও পোখরানে পরমাণু নিরীক্ষণের পরের এই ভোটে বিজেপি ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩০৩টি আসনে জেতে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাজপেয়ী তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সময়কাল সরকার চালানো হয়। আটের দশকে তার দুই সাংসদের দল আজ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দিল্লির মসনদে। গোটা ভারতের ২১টি রাজ্যের ক্ষমতায় বিজেপি। এমন দিনের ভবিষ্যদ্বাণী সেই কবে করে গিয়েছেন বাজপেয়ী। বলেছিলেন, ‘অন্ধেরা ছাটেগা, কমল খিলেগা।’
অটল বিহারী বাজপেয়ী, জাতীয় রাজনীতির আঙিনার সর্বাপেক্ষা শালীন, শিষ্টাচারে বিশ্বাসী, প্রজ্ঞাবান, সুবক্তার নাম। বাজপেয়ীজির উদারতা, বহুত্ববাদী মানসিকতা, কবিত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক বোধ, সাংগঠনিক দাপট এ মুহূর্তে প্রায় কিংবদন্তি।
আরএসএসের বীজমন্ত্রই সারাজীবন জপে এসেছেন বাজপেয়ী। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই হিন্দুবাদী রাষ্ট্রদর্শনকেই সার্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, নিজের ইমেজকে এতটুকুও কালিমালিপ্ত না করে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের জন্য তিনি আজীবন অবিবাহিত থাকা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কানপুরে পড়াশোনা করেছিলেন মি. বাজপেয়ী। তারপরে আইন পড়েছেন।
গুজরাট গণহত্যার পর গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। বলেছিলেন ভারত যদি ধর্মনিরপেক্ষ না হয়, তাহলে ভারত ভারতই নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এ উক্তি স্মরণীয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। উন্মত্ত সংঘ সেবকদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেল বাবরি মসজিদ। দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেলে দাঙ্গা। প্রাণ গেল অসংখ্য নিরীহ মানুষের। বাবরি মসজিদের ধ্বংস করার সেদিনের কা- কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। সেই ঘটনার জন্য গোটা দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। দশকের পর দশক ধরে তিনি বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন এক নেতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন, তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপসে যে তিনি রাজি নন, এই বার্তা ছড়িয়ে যায় গোটা দেশে।
২০১৫ সালে ভারত সরকার অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সম্মান ভারতরতœ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি পদ্মবিভূষণ পান। এছাড়া ১৯৯৪ সালে লোকমান্য তিলক পুরস্কার, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কারের মতো বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা তিনি পেয়েছেন।
বাজপেয়ী বরাবরই এক অজাতশত্রু, ঘোর রাজনৈতিক বৈরিতা ছিল যে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে, ’৭১-এর যুদ্ধে ভারতের অভূতপূর্ব বিজয়ের পর সেই ইন্দিরাকেই সংসদে দাঁড়িয়ে ‘মা দুর্গা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে অটল বিহারী বাজপেয়ী বলেছিলেন, দেরিতে হলেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমাদের সামনে ইতিহাস বদলের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়তি এই সংসদ এবং দেশকে এমন মহান কাজে রেখেছে, যেখানে আমরা শুধু মুক্তিসংগ্রামে জীবন দিচ্ছি না; বরং ইতিহাসকে একটি পরিণতির দিকে নিতে চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে নিজেদের সংগ্রামের জন্য লড়াই করা মানুষ এবং আমাদের রক্ত একসঙ্গে বইছে। এই রক্ত এমন সম্পর্ক তৈরি করবে, যা কোনোভাবে ভাঙবে না। কোনো ধরনের কূটনীতির শিকার হবে না। বিরোধী দলনেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সম্পৃক্ততাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন এ মানুষটি।
জনজীবনে শ্রী বাজপেয়ীর উত্থান, একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমাতেই তা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাকে বাংলাদেশের একজন মহান বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কফি আনান
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আর নেই। ৮০ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এই নোবেলজয়ী। অল্প কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে সুইজারল্যান্ডে ছিলেন তিনি। কফি আনান ছিলেন সারাবিশ্বের। জীবনভর তিনি শান্তির জন্য কাজ করে গেছেন।
১৯৩৮ সালের এপ্রিলে ঘানার কুমাসির এক অভিজাত পরিবারে জন্ম কফি আনানের। বাবা ছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর। এক যমজ বোনও ছিল তার। প্রথমে মিনেসোটার কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা। পরে জেনেভায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়েন। তারও পরে ম্যাসাচুসেটসের ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা। ফরাসি, ইংরেজিসহ অনেকগুলো ভাষায় দক্ষ ছিলেন আনান। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জে যোগ দেন তিনি, ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনে। দু-পক্ষের তিন সন্তান রয়েছে আনানের।
কফি আনান জাতিসংঘের সপ্তম মহাসচিব ছিলেন। প্রথম আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ১৯৯৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ওই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কর্মী হিসেবে জাতিসংঘে যোগ দিয়ে তিনিই প্রথম সংস্থাটির শীর্ষ পদে আসীন। অবসরের পর তিনি সিরিয়া বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করেন। তার নেতৃত্বেই আলোচনার মাধ্যমে সিরিয়ায় সাড়ে সাত বছরের গৃহযুদ্ধের ইতি টানার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জীবনভর সংগ্রাম করেছেন তিনি। যেখানেই দুর্ভোগ বা মানবিক আর্তি সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। গভীর সমবেদনা ও সমানুভূতিতে হৃদয় ছুঁয়েছেন বহু মানুষের। নিজের বদলে অন্যদের কথাই আগে ভেবেছেন তিনি, যা করেছেন তার সবকিছুই দ্যুতি ছড়িয়েছে সত্যিকারের মমতা, আন্তরিকতা আর মেধার।
বিশ্ব সংস্থাটির সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ও মানবাধিকার ইস্যুগুলো অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ২০০১ সালে আনান ও জাতিসংঘকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কারজয়ী কফি আনান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়েও কাজ করছিলেন।
অনেকভাবেই কফি আনান ছিলেন জাতিসংঘ। বিভিন্ন পদমর্যাদার মধ্যদিয়ে তিনি সংস্থাটির নেতৃত্ব পর্যায়ে এসে নতুন সহস্রাব্দে তুলনাবিহীন সম্মান ও দৃঢ়তার সঙ্গে এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেনÑ এক বিবৃতিতে বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাত অবসানে কয়েক দশক ধরে প্রচেষ্টা চালানোর পর তার জীবনাবসান হলো। রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিকে ‘মানবাধিকার সংকট’ বলল কফি আনান কমিশন। ২০০৭ সালে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক নেতাদের গ্রুপ দ্য এলডারস’র প্রতিষ্ঠা হলে এর সদস্য হন কফি আনান। ২০১৩ সালে ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান হন তিনি।
ইরাকে মার্কিন অভিযানের সময় বিপক্ষে অবস্থান নেয় সংস্থাটি। ওই অভিযানকে ‘অবৈধ’ অভিযান বলে বর্ণনা করেছিলেন মি. আনান।
কফি আনানের ভাষায় তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ‘সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারণÑ দারিদ্র্য আর শিশুমৃত্যু কমাতে বিশ্বব্যাপী প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি ছিলেন বৈশ্বিক কূটনীতিক ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। সমসাময়িক বিশ্বের উজ্জ্বল এই নক্ষত্রের বিদায়ে শোক জানিয়েছেন জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, মানবাধিকার কমিশনার জায়েদ রা’দ আল হোসেনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ।
নোবেল জয়ের বছরে বাংলাদেশে এসেছিলেন, এবার রোহিঙ্গাদের দেখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্তু… ইরাকযুদ্ধের শুরু থেকেই কফি আনান নামটি খ্যাতি পায় বিশ্বজুড়ে। যুদ্ধ বন্ধে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে দৌড়ঝাঁপসহ নানা পদক্ষেপ ছিল তার। তখন তিনি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী।
নোবেল জয়ের বছরেই তিনি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। জাতিসংঘের কোনো প্রধান নির্বাহীর এটি ছিল তৃতীয় বাংলাদেশ সফর। কফি আনানের সফরের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আরও দুজন মহাসচিব বান কি মুন (২০০৮ ও ২০১১) এবং বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফর করেছেন।
২০১৬ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের বর্বরতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশে তাদের প্রবেশে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিলেন কফি আনান। তিনি অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ এবং রাখাইন রাজ্যের উপদ্রুত এলাকাগুলোতে জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিউইয়র্কে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বৈঠক করেন কফি আনানের সঙ্গে। সেখানে ২০১৬ সাল থেকে রাখাইনে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রশংসা করেন ড. আনান।
৮০ বছরে জীবনাবসানে কফি আনান যে পৃথিবী হতে বিদায় নিলেন, সেই পৃথিবীতে এই গণতান্ত্রিক রীতি, সম্মেলক কাজ করার দৃষ্টান্ত, শান্তভাবে অন্যপক্ষের যুক্তি শুনবার বহু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও সমষ্টিগত অপারগতা সত্ত্বেও, বিশ্বময় সম্মেলক সক্রিয়তার লক্ষ্যটি যে অনর্থক নয়, সেই বিশ্বাস তিনি আবারও ফিরিয়ে আনলেন। এই ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করার জন্য দরকার ছিল যথার্থ নেতৃত্বগুণ। আনানের মধ্যে তা ছিল। ২০১৩ সালে কফি আনান ‘দ্য এলডার্স’-এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এ সংগঠনটি বিশ্বের প্রবীণ রাজনীতিকদের একটি সংগঠন, যারা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। ২০০৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

Category:

‘নেওয়াজ শরিফ ও কন্যা মরিয়ম নির্বাচনে অযোগ্য’

Posted on by 0 comment
8-6-2018 7-32-05 PM

পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা : নিশ্চিত কারাবাস জেনেও দেশে ফেরা

সাইদ আহমেদ বাবু: ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারতকে বিভক্ত করে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানকে এবং ১৫ আগস্ট ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান করেছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয় আর ১৯৫১ সালে রাওয়ালপিন্ডির জনসভায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বক্তৃতা প্রদান করার সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেনাবাহিনীর জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে এবং সে-দেশের মানুষ সামরিক এবং বেসামরিক দুর্নীতিবাজ আমলাদের হাতে বন্দী। দেশটির মানুষের ভাগ্য তাদের নিজের হাতে নয়।
বহুল আলোচিত পানামা পেপার কেলেঙ্কারিতে ফাঁস হওয়া দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তার কন্যা মরিয়ম নওয়াজ। ৬৭ বছর বয়সী নওয়াজ শরিফকে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে দেশটির সুপ্রিমকোর্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করার পর তিনি পদত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত হিসাব দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এখন তিনি ও তার মেয়ে মরিয়ম জেলে বন্দী। অ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট তাকে ১০ বছরের সাজা প্রদান করেছে। একই সঙ্গে তাকে ১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারও জরিমানা করা হয়। একই রায়ে তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে সাত বছর ও মরিয়মের স্বামী ক্যাপ্টেন সফদারকে এক বছর কারাদ- দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট রাজনীতিবিদদের শায়েস্তা করার জন্য সৃষ্টি করেছিল জেনারেল জিয়াউল হক। এই জেনারেল জিয়াউল হকই জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে। পাকিস্তানের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় সেনাশাসন থাকার ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি সেনা-অনুগত সিভিল-সমাজ এবং অনুগত জনগোষ্ঠী যারা রাজনৈতিক দলের চেয়ে সেনাশাসন পাকিস্তানের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করে। এছাড়া রয়েছে সেনা-অনুগত কিছু রাজনৈতিক দল।
আশা-নিরাশা, সফলতা-ব্যর্থতা উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ নিয়ে জীবনের গলিপথ। রাজনীতির এই মাঠে কেউ মহানায়ক হন আবার একই ব্যক্তি পরিণত হন খলনায়কে। পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ এমনই একজন। ২০১৭-এর ২৮ জুলাই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে মেয়াদপূর্ণের ১০ মাস আগে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তবে তিনিই পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন, যাকে কোর্টের রায়ে ক্ষমতা ছাড়তে হলো। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ইউসুফ রাজা গিলানি দেশটির ইতিহাসের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, আদালতের আদেশে যাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
কখনও গুপ্তহত্যা, কখনও গৃহবন্দি, কখনও মৃত্যুদ-, কখনও বিমান দুর্ঘটনা। পাক-রাজনীতিবিদদের জীবনটাই ঘটনাবহুল। মৃত্যুদ- হয়েছিল জুলফিকার আলি ভুট্টোর, রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল জেনারেল জিয়াউল হকের, আততায়ীর গুলি ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল বেনজির ভুট্টোকে, এ মুহূর্তে দেশের বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মুশাররফ। সেই অমোঘ নিয়তির শিকার সাবেক পাক-প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং তার পরিবারও। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উত্থান-পতন।
১৯৪৯ সালে লাহোর কাশ্মীরি শিল্পপতি পরিবারে জন্ম নওয়াজ শরিফের। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে স্নাতক, তারপরই পারিবারিক ইস্পাত ব্যবসায় যোগদান। ১৯৭৬ সালে পারিবারিক ব্যবসা নওয়াজের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করে জুলফিকার আলি ভুট্টো সরকার। তখনই তিনি যোগদান করেন পাকিস্তান মুসলিম লীগে। ভুট্টো ও শরিফ পরিবারের বিবাদের সেই শুরু। ১৯৮১ সালে পাক-পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু। চার বছরের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী ও নিজের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) প্রতিষ্ঠা। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত পাকিস্তানের দুর্নীতিবাজ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সেনবাহিনীর সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ১৯৯৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন। সেনাবাহিনী কোর্ট ব্যবহার করে তাকে গ্রেফতার করে ছিনতাই ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় এবং দুর্নীতির দায়ে আজীবন রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় কারাদ- থেকে বেঁচে গিয়ে নওয়াজ শরিফ পরিবারের ৪০ সদস্যসহ ১০ বছরের নির্বাসনে যান।
একই সঙ্গে ২০০৭ সালে সুচতুর নওয়াজ পাকিস্তানের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হওয়ায় সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তিনি ২০১৩ সালে আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে সেনাবাহিনীর পক্ষে এটা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। ফলে অনেকে এটা মনে করতে শুরু করেন যে কোর্টকে ব্যবহার করে, সেনাবাহিনীই আসলে নওয়াজকে সরিয়ে দিয়েছে তাদের পছন্দের কাউকে অথবা নিজেরাই ক্ষমতায় আসার জন্য।
পাকিস্তান মুসলিম লীগ-প্রধান নওয়াজ শরিফ তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নির্বাচনে জিতে কিন্তু কোনোবারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এবারের মেয়াদ নিয়ে তিনি পাকিস্তানের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী, যারা কেউ মেয়াদ শেষ করতে পারেন নি। তিনি সেনাবাহিনীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ মিটাতে চেয়েছেন বারবার। এবার তাকে চিরজনমের মতো অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ৭০ বছর বয়সী রাষ্ট্রটি এ পর্যন্ত ৩৪ বছর শাসন করেছে রাজনীতিবিদরা আর ৩৬ বছর শাসন করেছে দেশটির জেনারেলরা। মাত্র দুবার নির্বাচিত দল সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। পাকিস্তানের দেশরক্ষার বিষয় এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকা- প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সেনাবাহিনী।
১৯৭১-পরবর্তী পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো সামরিক শাসকই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হননি। পিপলস পার্টি, মুসলিম লীগসহ সবাই সেখানে সেনাশাসকদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে যতটা সম্ভব আপস করেই ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছেন। যখনই আপসরফায় বনিবনা হয়নি তখনই সেনাবাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে। ফলে, যখনই কোনো বেসামরিক শাসককে তারা পছন্দ করেনি নির্দ্বিধায় তাদের সরিয়ে দিয়েছে। জনগণ এবং সিভিল সমাজের একটা বড় অংশও তাদের এ কাজে সমর্থন জানিয়েছে।
পাকিস্তান জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা ৩৪২, যেখানে ২৭২টি সাধারণ এবং ৭০টি আসন নারী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য রিজার্ভ রয়েছে। আসনের মধ্যে আবার পাঞ্জাব প্রদেশে ১৭৪টি, সিন্ধু প্রদেশে ৭৫টি, পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ৪৮টি, বেলুচিস্তান প্রদেশে ১২টি আর কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ৩টি। পাঞ্জাব সর্ববৃহত্তম প্রদেশ এবং এ প্রদেশে আসন সংখ্যাও বেশি। নওয়াজ শরিফ পাঞ্জাবের লোক। তিনি জেনারেল জিয়াউল হকের সময় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আসলে জেনারেল জিয়াউল হকই তাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। নওয়াজেরা পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য পরিবার। ইত্তেফাক ফাউন্ডারির মালিক। তারা সারাবিশ্বে বিভিন্ন মেশিন সাপ্লাই করে থাকে।
বিবিসি জানিয়েছে, এর আগে নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আমরা পাকিস্তানকে বলতাম একটি রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র, এখন বলা হয় একটি রাষ্ট্রের ওপরে আরেকটি রাষ্ট্র।’
এই রায়ের ফলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) বড় রকমের ধাক্কা খেল।
নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের দেওয়া রায়টি কি কোর্টের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন না-কি সেনাসদর দফতরের ইচ্ছার প্রতিফলন তা বলার সময় এখনও আসেনি।
রায়ের পরই সাংবাদিক বৈঠকে নওয়াজ বলেন, রাজনৈতিকভাবে আমাকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্যই এসব হচ্ছে। দুর্নীতির দায়ে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর লন্ডনে চিকিৎসাধীন ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এদিকে রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় দিনটিকে ‘কালোদিন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তার ভাই ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফ। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে এই রায়ের মধ্যদিয়ে নতুন পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রধান ইমরান খান।
এদিকে, এই রায়কে আবারও চ্যালেঞ্জ জানানো হবে নওয়াজের পরিবারের পক্ষ থেকে। আগামী উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করবে তারা।
দেশে ফিরে গ্রেফতার হলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ (এন) নেতা নওয়াজ শরিফ। তার সাথে তার মেয়ে মরিয়ম নেওয়াজও গ্রেফতার হন। লন্ডন থেকে রওয়ানা দিয়ে আবুধাবী হয়ে ২ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট দেরিতে লাহোরের আল্লামা ইকবাল বিমানবন্দরে তারা পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই দেশটির ‘ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো (এনএবি)’ তাদের দুজনকে আটক করে এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। এরপর তাদের একটি ব্যক্তিগত বিমানে করে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে প্রেরণ করা হয়। দুজনেই দুর্নীতি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
নওয়াজ শরিফকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের সামনে জড়ো হয় নওয়াজের হাজারে সমর্থক। তারা নওয়াজকে সিংহ নামে সম্বোধন করে সেøাগান দিতে থাকে। তারা ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল তারা নওয়াজকে সাথে নিয়ে শোভাযাত্রা করবেন। তবে নওয়াজ গ্রেফতার হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কন্যা মরিয়ম নওয়াজ আবুধাবি বিমানবন্দর থেকে টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ৪৮ সেকেন্ডে এই ভিডিও-তে দেখা যায় নওয়াজ শরিফ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলছেন, সরাসরি জেলে চলে যাবেন জেনেও দেশের জনগণের জন্য তিনি পাকিস্তান ফিরে আসছেন। তিনি ভিডিও-তে উল্লেখ করেছেন, তার এই ত্যাগ স্বীকার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। এ ধরনের সুযোগ আগামীতে আর নাও আসতে পারে। তিনি বলেন, চলুন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে পাকিস্তানের ভাগ্য গড়ে তুলি। তিনি আরও বলেন, নওয়াজ শরিফ ইসলামাবাদ থেকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
সত্যি কথা স্বীকার করলে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে পাকিস্তানই দুর্নীতির মহারাষ্ট্র তবুও জনগণের ভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) রাজনৈতিক দলকে আর একবার বিশ্ববাসী দেখবে তারা কতখানি গণতন্ত্রমনা।

Category:

বহুল প্রতীক্ষিত ট্রাম্প-কিম বৈঠক বিশ্ববাসীর স্বাগত

Posted on by 0 comment

7-4-2018 5-55-18 PMসাইদ আহমেদ বাবু: কিছুদিন আগেও মনে হচ্ছিল, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসানের পর অবশেষে গত ১২ জুন সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় এই ঐতিহাসিক বৈঠক শুরু হয়। উত্তর কোরিয়ার নেতা ও কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এটিই প্রথম বৈঠক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং-দিনের শুরুটা হলো দুই নেতার ঐতিহাসিক করমর্দনের মাধ্যমে। দুই নেতা যখন পরস্পরের দিকে করর্মদনের জন্য এগিয়ে যায়, বিশ্ববাসী তখন অধীর আগ্রহে এই বিরল দৃশ্য অবলোকন করে।

এ বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনা ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা।
ট্রাম্প ও কিম শীর্ষ বৈঠকের পর একটি চুক্তিতে সই করেছেন যাতে বলা হয়েছে, দুদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। অন্যদিকে, কোরিয়া উপদ্বীপকে পরিপূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের জন্য উত্তর কোরিয়া এ চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছিল, যা উত্তর কেরিয়াকে ক্রমশ ক্ষুব্ধ করে তুলছিল। এ মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার ওপর সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হতো। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার অবসান ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে নির্বিঘœ করতে ব্যয়বহুল ও খুবই উসকানিমূলক মহড়ার অবসান ঘটানো হবে।

এই সমঝোতাপত্রে আমেরিকা এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল হোটেল ক্যাপেলায় সেই একান্ত বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমার বিশ্বাস, আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে শিগগিরই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটা হবে বলে আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন কিম। তবে উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে এখনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হচ্ছে না বলেই জানান। উত্তর কোরিয়ার সর্বাধিনায়ক কিম বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের এই প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। তারপরেও সমস্ত সংকট কাটিয়ে যে তারা আলোচনায় বসেছেন, তাতে তিনি খুশি। তাদের মধ্যে কথা হয়েছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে। দুই নেতার একান্ত বৈঠক শেষে দুদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। পারমাণবিক অস্ত্র থেকে শুরু করে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প ও কিম।

ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বেশ সুসংহত। এটি স্বাক্ষর করতে পেরে সম্মানিত বোধ করেছেন বলেও জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম বলেছেন, তারা একটি ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন ও অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৈঠককে সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।
চুক্তিতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিম। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া নতুনভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে, যাতে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নতির বিষয়টি প্রতিফলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়া যুদ্ধবন্দিদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে যেসব যুদ্ধবন্দি চিহ্নিত হয়েছেন তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুতই শুরু হবে।

উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গে এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেন, অবিশ্বাস্য একটি দেশ হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে তাদের। কিমের সঙ্গে আমার বৈঠক আন্তরিক, গঠনমূলক ও খোলামেলা ছিল। পরিবর্তন আসলেই সম্ভব। কিম এরই মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মূল ঘাঁটি ধ্বংস শুরু করছেন। কিমের প্রশংসা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কিম খুবই প্রতিভাবান। তিনি খুব কম বয়সে একটি দেশের ক্ষমতায় এসেছেন এবং কঠোরভাবে দেশ পরিচালনা করেন। অপেক্ষাকৃত সংক্ষেপে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও কিমের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধবন্দি মার্কিন সেনাসদস্যদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি এবং আশানুরূপ উত্তর পেয়েছি।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আমরা যখন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হব, তখন উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। আমি আসলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাই। তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া এই পদক্ষেপ নিতে চাই না।

দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকে কিমের সঙ্গে তার শীর্ষ পরামর্শকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেনÑ পিয়ংইয়ংয়ের শীর্ষ কূটনীতিক কিম ওং কোল, উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ওং হো, কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান রি সু ওং। আর ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ জন কেলি।
তবে, শুরুও শুরু থাকে। সেই যুক্তিতে, আশায় বুক বাঁধাই বোধকরি এখন বিশ্বের কর্তব্য। ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং যে মুখোমুখি বসতে পারবে, কয়েক মাস আগে পর্যন্ত এটা নেহাত কল্পকথা ছিল। সেই অভাবিত ঘটনা যে শেষ পর্যন্ত ঘটল, কম কথা নয়। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের সক্রিয় প্রচেষ্টা ছাড়া এটি সম্ভব হত না। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর সরকারের বিরাট কৃতিত্ব : দক্ষিণ-পূর্ব চীন সমুদ্র অঞ্চলে শান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক স্থিতি বজায় রাখবার লক্ষ্যে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা। এমন অসাধারণ কূটনৈতিক প্রয়াস প্রমাণ করে, শুভ সংকল্পে কত কী হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে সাংবাদিকদের চার মিনিটের একটি ভিডিও দেখানো হয়। এটি খুবই অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। ভিডিওটি ছিল কোরীয় এবং ইংরেজি ভাষায়। সংবাদ সম্মেলনে মি. ট্রাম্প বলেছেন যে এই ভিডিওটি তিনি কিম জং-আনকে দেখিয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সই হওয়া চুক্তি হয়তো আমেরিকা মানবে না, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ অনেক দেশের সঙ্গে আমেরিকা যা করেছে এক্ষেত্রেও তাই করতে পারে। ইরানের প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন আমেরিকার খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল জোন্স। শেষ পর্যন্ত তার এই আশা বাস্তবায়িত হয় কি না, সে কথা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আপাতত কোরীয় উপদ্বীপে ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা কমেছে, পৃথিবীর সব মানুষই তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

Category:

মালয়েশিয়ায় নির্বাচনে মাহাথিরের অভূতপূর্ব জয়

Posted on by 0 comment

june2018সাইদ আহমেদ বাবু: মালয়েশিয়ায় গত ৯ মে অনুষ্ঠিত ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন)-কে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পদে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নির্বাচিত নেতা হিসেবে ইতিহাস গড়লেন মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শাসনক্ষমতায় থেকেছে। মাহাথির মোহাম্মদ অতীতেও প্রধানমন্ত্রীর এবং বারিসান ন্যাশনাল প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২২ বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। ২০০৩-এ তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।
যে মাহাথির মোহাম্মদের হাত ধরে মালয়েশিয়া আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই ব্যক্তির হাত ধরে দেশটিতে ঘটে গেল আরেক বিপ্লব। সুদীর্ঘ ৬০ বছরের শাসক-জোটের পতন ঘটালেন তিনি। নির্বাচনে প্রমাণিত হলো যে কারও ‘সৎ কর্ম, মহৎ কর্ম কখনও হারিয়ে যায় না’। মাহাথিরকেও হারিয়ে যেতে দেয়নি মালয়েশিয়ার জনগণ তার কাজের জন্য। তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী করেছে তারা। সততা, সৎ চিন্তা, বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতা এবং নেতৃত্বের প্রগাঢ়তার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
শুধু বৈশ্বিক অঙ্গনেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিবাচক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সারথি হিসেবে, দক্ষ প্রশাসক হিসেবে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মাহাথির মোহাম্মদের প্রথিতযশা ভূমিকা অগ্রগণ্য। ব্যক্তিগত কারিশমা, জনগণের নিকট জবাবদিহিতা, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা তথা আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের মননশীলতার পতাকাবাহী ব্যক্তিক সমীক্ষায় অন্য যে কোনো প্রার্থীর চেয়ে মাহাথিরের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনামূলকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। মালয়েশিয়ার নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাপকাঠি হিসেবে কাজ করেছেন। ব্যক্তি মাহাথির যেখানে নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন, সেখানে দলের ভূমিকা কিয়দংশ হলেও গৌণ ছিল। কারণ, মাহাথির যে দলের হয়ে দীর্ঘ ২২ বছর দেশ শাসন করেছিলেন সেই দলের বিরুদ্ধে এবং তার সাবেক শিষ্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কারিশমা দেখিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং বলা চলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদকে মালয়েশিয়ার জনগণ পুনরায় রাজনীতিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্বও প্রদান করেছেন দেশের কল্যাণার্থে। পাশাপাশি, মালয়েশিয়ায় যে দুর্নীতি এবং অরাজকতার সংস্কৃতি বিরাজ করেছিল তার থেকে পরিত্রাণের জন্য মালয়েশিয়ার জনগণ নানাবিধ উপায় কিংবা প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান করেছিল। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার শেষে মালয়েশিয়ার জনগণ ব্যালট বাক্সকেই বেছে নেয় প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে এবং সেখানে তাদের প্রিয় মানুষ মাহাথির মোহাম্মদকে নির্বাচিত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছেন মালয়েশিয়ার জনগণ পরবর্তী সরকার পরিচালনার জন্য।

যেভাবে বদলে দিলেন মালয়েশিয়াকে
মালয়েশিয়ার আমূল পরিবর্তনে শুরু থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন মাহাথির। ক্ষমতায় এসে একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নও করেছেন সেগুলো। দেশটির ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মসূচিও তার ঘোষণা করা ছিল। মাহাথির শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিকÑ
মালয়েশিয়ার সকল মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি। মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহন করে। এই নীতি চালু হয় মাহাথিরের আমল থেকে। আশির দশকে গৃহীত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন তিনি। ফলাফল এই যে, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে উল্টো আরও ৮ লাখ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া। একই বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতেই ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, সমুদ্র থেকে ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার, অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি, একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, হাইওয়ে নির্মাণসহ তার অসংখ্য উদ্যোগ সফল হয়েছে। ১৯৯০ সালেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশের বেশি। ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর তালিকার তলানীতে থাকা মালয়েশিয়াকে নিয়ে আসেন তালিকার ১৪তম স্থানে। ব্যক্তিজীবনে মাহাথির ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি একাই যে স্বপ্ন দেখেছেন এমনটা নয়। পুরো জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। চীনা, মালয়ী, তামিলসহ বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত মালয়েশিয়াকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হন তিনি।
মূলত দুর্নীতির অভিযোগেই নাজিব রাজাকের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার সাধারণ ভোটাররা। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। অভূতপূর্ব এক বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন নাজিব রাজাকেরই রাজনৈতিক গুরু বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মাহাথির মোহাম্মদ। নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ভোটার ও প্রতিপক্ষের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বারহাদের (ওয়ানএমডিবি) অর্থ, তিনি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও সহযোগীরা মিলে ওই তহবিল থেকে কয়েকশ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে নাজিব রাজাকের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। নানা অভিযোগে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে চলেছেন নাজিব রাজাক।
ভগ্নদশায় পড়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে মেরামতের পথ খুঁজছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তার দাবি, পূর্বতন সরকার বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও খারাপের পথে গেছে।
মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, নাজিব রাজাকের আমলে এমন অনেক বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যার জন্য ব্যয় করতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলার। একের পর এক ব্যয়বহুল মেগা প্রজেক্ট। হয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রিঙ্গিতে (২৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার), যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেউলিয়াত্বের পথে মালয়েশিয়া। এ অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার হাল ধরলেন মাহাথির মোহাম্মদ।
আসন্ন দেউলিয়াত্বকে ঠেকাতে রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত নির্মিতব্য একটি হাইস্পিড রেলওয়ে প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে নেওয়া সব মেগা প্রকল্প পুনরায় যাচাইয়ের। সাক্ষাৎকারে ‘অপ্রয়োজনীয়’ সব অবকাঠামো প্রকল্প বাতিলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ হিসেবে কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজ দেশকে ‘দেউলিয়া হিসেবে ঘোষণা করার পথ রুদ্ধ করতেই’ এত বড় পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, এ মুহূর্তে যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে অন্যতম হলো মালয়েশিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি।
মালয়েশিয়ার জনগণ মহাসড়কে যান চলাচলে টোল হ্রাস, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দান এবং গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (জিএসটি) বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন অনেক দিন ধরেই। এতে সায় দিয়ে এসব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এতে মালয়েশিয়া সরকারের বার্ষিক রাজস্ব কমবে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ, যা দেশটির এ বছরের মোট রাজস্ব আয়ের এক-পঞ্চমাংশ। এতে কিছুটা প্রতিকূলে পড়তে পারেন তার সরকার। তবে এ প্রসঙ্গে মাহাথিরের বক্তব্য হলো, গণতন্ত্র মানেই পরিবর্তন ও সার্বক্ষণিক চাপ। কখনও কখনও আমাদের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের বদলে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়।
কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৬ সালে। ৩৭০ কিলোমিটার (২১৭ মাইল) দীর্ঘ রেলপথটির নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য অনুমিত সময় ধরা হয়েছিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত। কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ের ওপর নজর ছিল বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানেরই। মূলত ‘দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার’ ঝুঁকি এড়াতেই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহাথির মোহাম্মদ। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, তার পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে মালয়েশিয়ার মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি সই হয়েছিল, তার সবই পুনরায় খতিয়ে দেখবেন তিনি।
মাহাথির মোহাম্মদ জানান, এরই মধ্যে চীনা অর্থায়নে মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে নির্মিতব্য এক রেল লিংক প্রকল্প নিয়ে পুনরায় দরকষাকষি করবে তার সরকার। মূলত চুক্তির ‘অসম’ বিষয়গুলো দূর করতেই এ দরকষাকষি করতে চাইছেন তিনি। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ভবিষ্যতে ক্ষমতার এ ধরনের অপব্যবহার ও গোটা সিস্টেম একজনের কুক্ষিগত হয়ে পড়ার পথকে রুদ্ধ করতে সংসদীয় ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, এটা কোনো লুটেরা সরকার হবে না। অবশ্যই এ দেশ আরও অনেক বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।

Category: