Blog Archives

এই সেই ১৫ আগস্ট ’৭৫

Posted on by 0 comment

PMf সরদার ফজুলুল করিম : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই মর্মান্তিক হত্যাকা-। সেদিনের সেই ঘটনায় আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা কয়টি আজ আবার বলতে ইচ্ছা হচ্ছে নিজের রোজনামচায় নিজের আবেগময় অনুভূতির কথা।
রোজনামচাটির শিরোনাম ছিলÑ ‘মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধী’। সেই শিরোনামটিকে সামনে রেখে লিখেছিলাম :
মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধী : এই যে এদের এমনভাবে কাতারবন্ধি করা হয়েছে এর দান-অবদান আমার নয়। আসলে এমনভাবে এরা কাতারবন্দি হবেনÑ এ কথা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এদের এভাবে কাতারবন্দি দেখে আমার মনটা আলোড়িত হয়ে ওঠে।
বয়সের বিধানেই বোধহয় এখন আমার যখন তখন চোখে পানি আসে, গলা ধরে যায়। কারুর কাছ থেকে একটা ভালো কথা, আশার কথা, অনুপ্রেরণার কথা কিংবা বেদনার কথা শুনলেই চোখে গলায় আবেগের সৃষ্টি হয়। তখন সেই মুহূর্তে আর পরিষ্কার করে বাক্য উচ্চারণ করতে পারিনে।
অথচ সচেতন বুদ্ধি দিয়ে বলি, আমি এ তিনজনের কারুরই অন্ধ ভক্ত কোনোদিন ছিলাম না। এটা কোনো বাহাদুরির কথা নয়। এদের তিনজনের কার্যকলাপকেই আমি নিজের জীবনে নিজের চোখে কিছুটা দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি এবং বইপত্র পড়েছি। বলা চলে কিছুটা বিরুদ্ধভাবের পর্যালোচনামূলক মনোভাব।
গান্ধীজিকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা পশুতে করেনি। হত্যা মানুষেই করেছে। আমরা অবশ্য আমাদের অপছন্দের মানুষকে অনেক সময় পশুর সঙ্গে তুলনা করি। বলি : ওটা পশু। ও পশুর মতো আচরণ করেছে। অথচ এমন তুলনা অর্থহীন। মানুষ নিজের চরিত্রহীনতাকে পশুর ওপর আরোপ করতে চায়। অহেতুক, অযৌক্তিক এবং অপাশবিক আচরণের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। মানুষের মধ্যেই দেখা যায় অমানবিক আচরণ। অমানবিক এ কারণে যে, এমন আচরণ যে প্রজাতি হিসেবে মানবগোষ্ঠীর জন্য আত্মহত্যামূলক, এই কথাটা এই মানুষরা বুঝতে পারে না।
গান্ধীজিকে কে হত্যা করেছিল? সে নামের উচ্চারণ বা অনুচ্চারণে কিছু আসে-যায় না। সে গডসে কিংবা নিডসে, তাতেও কিছু পার্থক্য হয় না। সে মানুষ। গান্ধীজি মানুষ ছিলেন। গডসেও মানুষ। গান্ধীজি জীবনব্যাপী নানা আচরণে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি বা সমাজনীতি, যে ক্ষেত্রের কথাই বলি না কেন, গান্ধীজির আচরণের মধ্যে তার আদর্শ প্রকাশিত হয়েছে। তার এই সব আদর্শকে কি আমি বা আমরা সব সময় সমর্থন করেছি? তা নয়। সেই ’৪৫, ’৪৬, ’৪৭ সালে নানা ব্যক্তি, দল-উপদল নানাভাবে গান্ধীজিকে ব্যাখ্যা করেছে। সমালোচনা করেছে। আবার অসংখ্য তার অনুসারীও ছিল। তার সহযোগী সাথীরা ছিলেন। তারা সব সমাজনীতি বা ধর্মীয় PMf2নীতিকে আমি সমালোচনা করতে পারি। আমরা করেছিও। কিন্তু একটা মৌলিক সত্যকে তিনি তার আচরণ দ্বারা প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন : মানুষকে মানুষের সঙ্গেই বাস করতে হবে। তাদের পারস্পরিক বৈষম্য এবং বিভেদকে দূর করতে হবে। মানুষের ওপর মানুষের নির্যাতনের অবসান আবশ্যক। আমাদের মতপার্থক্য ছিল তার উপায়ের ক্ষেত্রে। কিন্তু তার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে নয়। কিন্তু গান্ধীজিকে যারা হত্যা করেছে তাদের আচরণে তাদের কি আদর্শের প্রকাশ ঘটেছে? যা ঘটেছে সেটা এই যে, মানুষ মানুষের সঙ্গে বাস করতে পারে না এবং কারুর যদি অপর কাউকে অপছন্দ হয় তা হলে তাকে অবিলম্বে হত্যা করতে হবে। গান্ধীজির হত্যাকারীরা অদূরদৃষ্টির লোক। তারা অর্বাচীন। আসলে তারা বোঝেনি : গান্ধীজিকে হত্যা করে তারা মানুষ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বকেই হত্যা করেছে। কারণ, তোমার যদি হত্যা করার অধিকার থাকে, অপরকে তাহলে অপরেরও অধিকার আছে তোমাকে হত্যা করার। এমন পারস্পরিক হত্যার ফলে পরিশেষে কাউকে হত্যা করার কিংবা কেউ নিহত হওয়ারই অবশিষ্ট কোনো মানবপ্রাণী থাকে না। এই কথাটি এই অর্বাচীনরা বুঝতে পারেনি। এখানেই গান্ধীজিকে হত্যা করা অমানবিক। এটা পাশবিক নয়। পশুরা অপর এমন কোনো নিরীহ পশুকে হত্যা করে না। গান্ধীজি যখন মানুষের হত্যার আঘাতেই ঢলে পড়লেন তখন তার মুখ দিয়ে কোনো অভিযোগ বাণী উচ্চারিত হয়নি। তিনি নাকি কেবল বলেছিলেনÑ হে ঈশ্বর! হা রাম! সে উচ্চারণে বিস্ময়ের বেদনা থাকতে পারে, এতদিনের তার ভালোবাসার, তার প্রেমের এই প্রতিদানের জন্য বিস্ময় বা বেদনা। কিন্তু অভিশাপ ছিল না। সে উচ্চারণে প্রকাশিত হয়েছিল অধিকতরভাবে এই বিশ্বাস : মানুষের সমাজকে রূপান্তরের পথ অনেক দীর্ঘ। তাকে সহজ ভাবাই ভুল। শেখ মুজিবকে যখন সে রাতে ঘেরাও করে অস্ত্রধারীরা হত্যা করল তখন সাহসী শেখ মুজিব ভীত হলেন না। যারা তাকে গুলি করল, তাদের তিনি চেনেন। তার মুখেও উচ্চারিত হয়েছিল বিস্ময়ের ধ্বনি : তোরা কি করছিস! এই কথা বলেই নিজের ঘরের সিঁড়ির ওপর তিনি গড়িয়ে পড়েছিলেন। হত্যাকারীরা তাকে স্তব্ধ করে দেবার জন্য নিশ্চয়ই আরও গুলি ছুড়েছিল। গুলিবিদ্ধ সে দেহকে দেশবাসী কেউ দেখতে পারেনি। যারা দেখেছিল তাদের কেউ যদি এখনও বেঁচে থাকে হয়তো তারা বলতে পারে, কটা বুলেট সে দেহে বিদ্ধ হয়েছিল, কেমন করে সেই দীর্ঘদেহী ফরিদপুরের এককালের গ্রামের যুবকটি ঢলে পড়েছিল।
’৭৫-এর ১৪ আগস্ট রাতে আমিও চিন্তা করেছিলাম ১৫ আগস্টের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বেশ কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করছে। শেখ মুজিব আসবেন ইউনিভার্সিটিতে। তিনি কোন কোন পথ দিয়ে যাবেন, কোন বিভাগ থেকে যাবেন কোন বিভাগে, উপাচার্য তাকে কীভাবে সংবর্ধনা জানাবেনÑ ইত্যাদি কর্মসূচি প্রচার করা হয়েছিল। দেশে তখন বেশ কিছুটা রাজনৈতিক উত্তপ্ত অবস্থা। আমি নিরীহ শিক্ষক। কেবল দুই চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। ঘটনা থেকে ঘটনার চমকে চমকিত হই। নিজের ক্ষুদ্র জীবনকে ধন্য মানি। কত ঘটনা দেখলাম। পঞ্চাশ বছর আগেও আমার পূর্বোক্তগণ এত দ্রুত সব ঘটনার সাক্ষাৎ পেতে পারতেন না। ঘটনাই তো জীবন। যত ঘটনা তত সেই জীবনের চঞ্চলতা। ’৭১-এর ঘটনা শুধু দেখলাম না, ’৭১-এর পরে ২৫ মার্চ থেকে নিহত হলাম। মৃত্যুর পরে বাঁচা বলে যদি কিছু থাকে, তবে ’৭১-এর পরে মৃত্যুর পর বাঁচার সেই বোধ হলো। তাতে একটা লাভ আমাদের এই হলো যে, মৃত্যুর ভয়টা একেবারে চলে গেল। মৃত্যুর পর মরার আর কি ভয় থাকে? এবং সে জন্যই বোধ হয় ’৭১-এর পশ্চাৎকালে আমরা যেমন মারতে ভয় পাইনে, তেমনি মরতেও ভয় পাইনে। আমাদের ইতিহাসে কোনো যুগে এত মানুষ কি মানুষকে মেরেছে এবং এত মানুষ মরেছে এবং এখনও চিন্তা করলে কৌতুকের এই বোধটা আসে যে, মৃত্যুর জন্য যদি ভয় না থাকে তবে মরণের আর তাৎপর্য কি রইল? আমরা আগে মানুষকে ভয় দেখাতাম, তোমাকে মেরে ফেলব। অর্থাৎ তুমি ভয় পাও। ভয় পেয়ে আমার অকাম্য কাজ থেকে তুমি নিবৃত্ত হও। কিন্তু আমার উদিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা যখন যথার্থই বলে, মৃত্যুকে আমি ভয় পাইনে, তখন তাকে মারের ভয় দেখিয়েও যেমন কোনো লাভ হয় না, তেমনি তাকে মেরে ফেলেও না। কারণ মেরে ফেলে তো কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।
কথাটি কেবল আমরা হত্যাকারীরা বুঝিনে। মেরে ফেলে কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় না। সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের পথ হচ্ছে দীর্ঘ বিবর্তনের পথ। মুক্ত মোকাবিলার পথ। যুক্তির সঙ্গে প্রযুক্তির লড়াইয়ের পথ। এ পথের কোনো বিকল্প নেই।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই যে আমার অর্বাচীনের মতো মাথা কাটার পথ নিয়েছি, এ আমরা শিখেছি পাতা কাটা থেকে। আমাদের ছেলেরা পরীক্ষার সময় বইয়ের পাতা কেটে নিয়ে যায়। পরিশ্রম করে পড়বে না। সহজে ব্লেড দিয়ে পাতা কাটবে। তাই ঢাকা ইউনিভার্সিটির গ্রন্থাগারের প্রায় বইয়েরই পাতা কাটা। এখানের দশ পাতা, ওখানে বিশ পাতা। অথচ পাতা কেটে কি জ্ঞান অর্জন করা যায়? না, তা যায় না। অবশ্য এমন ভারি কথা বললে রাস্তাঘাটের এমনকি ক্লাসঘরের যুবকরা বলে : রাখেন স্যার আপনার দর্শনের কথা। জ্ঞান কি আমরা ধুয়ে খাব? পাস হচ্ছে আসল। আমাদের পাস করতে হবে। ‘বাই হক আর বাই ক্রুক।’ যেমন করে হোক, পাতা কেটে, খাতা চুরি করে, মাস্টার মেরে : যে করেই হোক। কথাটার জোর আছে। পরীক্ষার পাস করতে হবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন : পরীক্ষা পাস করেই বা কি হবে? এবং তুমি দর্শন বল, আর বড় কথা বল সত্য তো এই যেসব পরীক্ষা নিয়েই তোমার, আমার এবং দেশের জীবনের পরীক্ষা। সে পরীক্ষাতে পাতা কাটা, শটকাট বা ‘মইডইজি’র তো কোনো জায়গা নেই।
১৫ আগস্ট ভোর রাতেই কিছু গুলির শব্দ শুনেছিলাম। ভোরের দিকে একটা মাইকের আওয়াজ : ‘খুনি মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। খুনি মুজিব কথাটাতে তত চমক লাগেনি। খুন  করতে গেলে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুনি বলতে হয়। তবে অনেককাল আগের একজন জ্ঞানী বলেছিলেন : খুনি কেবল এই কথাটি খেয়াল করে না, খুনিকে যে খুন করে সেও একজন খুনি।’ আমি চমকিত হয়েছিলাম, ‘মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’Ñ এই আওয়াজটাতে। আর যে কিছুর জন্যই সেদিন তৈরি থাকি না কেন, এই চমকটির জন্য নয়। আওয়াজ শুনে ভয়ে ঘরের দরজা-জানালা একটু বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরে একটু আলো ফুটতে ভয়ে ভয়ে ঘরের পুবের জানালাটা একটু ফাঁক করেছিলাম। এই জানালা দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের মূল চত্বরটি দেখা যায়। আতঙ্কিত মনে চাইলাম সেই চত্বরটির দিকে। একেবারে জনশূন্য। হয়তো সকাল ছ’টা কিংবা সাড়ে ছ’টা। দেখলাম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উড়িয়ে একটি কালো রঙের গাড়ি নিউমার্কেট-নীলক্ষেতের রাস্তার পশ্চিম দিক থেকে এলো, কলা ভবনের দালানটিকে হাতের ডানে রেখে উত্তর মুখে ঘুরল, কোথাও গেল, হয়তো পরিস্থিতিটা পর্যবেক্ষণ করল। আবার কয়েক মিনিট পর গাড়িটা ফিরে এই পথ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। এও আমার সেদিনের অভিজ্ঞতার আর এক চমক।
আমি একটু-আধটু শ্রেণিগত বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। অপর কারুর জন্য নয়। নিজে বোঝার জন্য। ‘ব্যাপারটি কি’Ñ এই ধরনের আত্মপ্রশ্নের আত্মজবাব হিসেবে। শ্রেণিগত বিশ্লেষণ একেবারে নিরর্থক নয়। আসলে কোনো ব্যক্তিই তো পরিবেশ-বিচ্ছিন্ন কোনো অস্তিত্ব নয়। একজন ব্যক্তি হয় বড়লোক, নয় গরিব। নয়তো মাঝামাঝি এই বড়লোক, গরিব আর মাঝামাঝিÑ এ তো কেবল তার সম্পদের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। তার সম্পদ তো আহরিত হয় কোনো মাধ্যম, কোনো ব্যবস্থায়। এবং সেই মাধ্যম বা ব্যবস্থাই হচ্ছে বিশেষ বিশেষ অর্থনৈতিক কর্মকা-। একেই একটু তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থান। এবং অর্থনৈতিক এই শ্রেণিগুলোর মধ্যে সম্পদ বা সুযোগের তারতম্যের কারণে বিরোধ বিদ্যমান। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সুবিধা-বঞ্চিতরা সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সুবিধাভোগীরা সে লড়াইকে প্রতিরোধ করতে চায়। তাদের সুবিধাকে অব্যাহত রাখতে এবং বর্ধমান করতে চায়। আসলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য-অসাম্যÑ তথা এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব মানুষের সমাজের অন্যতম চালকশক্তি। কিন্তু এ তত্ত্বের আলোচনাও আমার উদ্দেশ্য নয়।
আমার অনুভব হচ্ছে, ব্যক্তিশ্রেণি ঊর্ধ্ব কোনো অস্তিত্ব নয়। প্রত্যেক ব্যক্তিরই শ্রেণিগত একটা অবস্থান আছে। গান্ধীজির ছিল। শেখ মুজিবের ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর ছিল। সেই অবস্থান থেকে তারা আচরণ করেছেন। তাদের বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সে চিন্তার সাথে অপরের বিরোধ থাকতে পারে। গান্ধীজির রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নীতিকে আমি অসমর্থন করতে পারি। আমার, তথা তার বিপরীত পক্ষের যদি কোনো নির্দিষ্ট নীতি থাকে তবে গান্ধীজির যুক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দিয়ে জনসাধারণকে বোঝাতে হবে। গান্ধীজির পক্ষে যদি জনমত প্রবল থাকে, বিপরীত পক্ষকে তার নিজের যুক্তির জোর এবং কর্মের ব্যাপকতা ও গভীরতা দিয়ে সেই জনমতকে পরিবর্তিত করে নিজের দিকে নিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই ব্যাপারটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। গান্ধীজির নিজের জীবনই এর উত্তর দৃষ্টান্ত। এ প্রক্রিয়ায় অধৈর্য হয়ে গান্ধীজির মাথাটি কেটে ফেলে প্রক্রিয়ার পথটিকে হ্রাস করা যাবে না, যায় না। শেখ মুজিবের একটা শ্রেণিগত অবস্থান ছিল। তার রাষ্ট্রনৈতিক পদ, দায়িত্ব এবং ক্ষমতা ছিল। তার কর্মকা-ে, চিন্তা-ভাবনায় পদক্ষেপের বাস্তবতা কিংবা অবাস্তবতায়, চিন্তার গভীরতা কিংবা অগভীরতায়, সমস্যার মোকাবিলায় পারদর্শিতা কিংবা অপারদর্শিতায় মূলত তার শ্রেণিগত শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই প্রকাশিত হয়েছে। তুমি বা তোমরা, যারা তার বিপরীত পক্ষ, যারা তার হত্যাকারী এবং তার হত্যায় ক্ষণকালের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত, তোমাদেরও একটি শ্রেণিগত অবস্থান আছে। তোমাদের এমন আচরণেও তোমাদের শ্রেণিগত চরিত্রেরই প্রকাশ ঘটেছে। তোমার মূল অবিবেচনা এখানে, যদি তোমাদের কোনো আদর্শ থেকে থাকে, রাজনৈতিক বা সামাজিক, তবে তাকে অর্জন করার পথ শেখ মুজিব বা তোমার প্রতিপক্ষকে হত্যা করা নয়। অবশ্য আগে উল্লেখ করেছি যে, জ্ঞানীর কথা, তার উক্তিই খাঁটি। তুমি যদি শেখ মুজিবকে ‘খুনি’ বলে খুন করে থাক তবে তুমিও খুনি। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে খুন করা সাংঘাতিক কোনো কঠিন ব্যাপারও নয়। ছুরি দিয়ে খুন করা যায়। লাঠি দিয়ে খুন করা যায়। স্টেনগান-ব্রেনগান দিয়ে খুন করা যায়। কঠিন হচ্ছে  আদর্শগতভাবে খুন করা। শেখ মুজিবের ওপর এবং তার স্ত্রীর ওপর এবং তার ছোট ছেলে রাসেলের ওপর স্টেনগানের ব্রাশফায়ার করে খুনিরা মনে করল, সাংঘাতিক সাহসী কাজ তারা করেছে। সশস্ত্র কাপুরুষের দল গোপন আক্রমণে শেখ মুজিব এবং তার পরিবার-পরিজনকে খুন করল।
ফরিদপুরের কৃষকের সন্তান শেখ মুজিবের এই একটা গুণ ছিল যে, সে জানের পরোয়া করত না। এই গুণটা আমাদের ক’জনার থাকে? মরতে হবে, তবু আমরা মৃত্যুর ভয় করি। কিন্তু শেখ মুজিব জন্মগতভাবেই বোধহয় একটু একরোখা ছিলেন, গোঁয়ার ছিলেন। কৃষকের সন্তানের সারল্য থেকে তিনি হয়তো এই বোধটি পেয়েছিলেন : মরছি তো আমরা হরহামেশা, নিত্যমুহূর্তে। তবে আর মৃত্যুর ভয় কী? এমন বোধ থেকেই সাত মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের জমায়েতে শেখ মুজিব বলেছিলেন : ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব বাংলাকে স্বাধীন করে ছাড়ব।’
সত্যি, লোকটির কথায় যেমন গেঁয়োমি ছিল, তেমনি জোর ছিল। শেখ মুজিব আমাদের প্রিয় এই কারণে যে, শেখ মুজিব আমাদের পরিচিত ছিলেন। বিদেশি নন। অপরিচিত নন। অনাত্মীয় নন। তার বাড়ি আর আমাদের বাড়ির মধ্যে মাইলের দূরত্বও যেমন বেশি ছিল না। এক দেশের লোক। পাশাপাশি জেলার লোক। আত্মীয়তাই ছিল কি না? এবং এদিক থেকে আমি এবং আমরা বলতে পারতাম : ‘আমাদের শেখ মুজিব’।
’৭১ সালের শেষের দিকে যখন আমাকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে আটক রাখল জেলের ২০ ডিগ্রির একটা নির্জন সেলে এবং যখন হতাশায়, আঘাতে প্রায় মুষড়ে পড়েছিলাম, পাহারারত সিপাইটি আমাকে অভয় দিয়ে বলল : সাহেব, আপনি তো আগেও জেল খেটেছেন। মন খারাপ করেন কেন? এই সেলে একদিন শেখ মুজিব ছিলেন। আর যেদিন তাকে গভীর রাতে আগরতলা মামলার বিচারের জন্য ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়, সেদিন সিপাহিদের মধ্যে আমিও ছিলাম। নিশ্চিত ফাঁসির মঞ্চের দিকে যাওয়ার মুখে দেখলাম, শেখ সাহেব সেলের বাইরে এসে নত হয়ে এক মুঠো মাটি নিয়ে মুখে ছোঁয়ালেন, বলে উঠলেন : ‘বাংলা মা আমার, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ তারপর আমাদের পাহারাদার সিপাহিদের জড়িয়ে ধরে বললেন : ‘যাই ভাই, তোমরা আমায় দোয়া করো।’
অবশ্য ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশের জীবনে এক নতুন পর্যায় শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব এসে যখন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার জীবনের একটি নতুন পর্বের শুরু। পিছনের পর্যায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহসের একটি আবেগের সমাধান হবে না। এখানে নতুন দক্ষতা এবং দর্শনের প্রয়োজন হবে। কিন্তু দক্ষতা এবং দর্শন যাই হোক, পর্যায়টি দীর্ঘ এবং কষ্টকর এক নতুন পর্যায়।
এই নতুন পর্যায়ের নতুন দল গঠিত হচ্ছিল। নতুন মোকাবিলার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছিল। সমাজ রূপান্তরের দীর্ঘপথে এ অনিবার্য। আমি চাচ্ছিলাম, মুজিবের বিপক্ষীয়রা যেমন, মুজিবও তেমনি পরস্পরের সঙ্গে রাজনীতিকভাবে মোকাবিলা করুন : মুক্তির ভিত্তিতে, গণতন্ত্রের ভিত্তিতে। ধৈর্য, ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে। এমন হলেই মাত্র শেখ মুজিবের যেমন রূপান্তর ঘটত : ভালো কিংবা মন্দ, যাই হোক না কেন, তেমনি তার শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা প্রকাশিত হতো। সেই মোকাবিলার মধ্যে দিয়ে তাকে অতিক্রম করে সমাজ রূপান্তরের ক্ষেত্রে নতুনতর সংগঠন ও শক্তি বিকশিত হতো। এমন পর্যায়েও পক্ষ-বিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্ন থাকে। একের বিরুদ্ধে অপরের ন্যায়-অন্যায়ের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের ব্যাপার থাকে। কিন্তু হত্যা করার নীতি কোনো বিবেচনার নীতি নয়।
আমি শেখ মুজিবের দলের সদস্য ছিলাম না। আমি শেখ মুজিবের সরকার গৃহীত অনেক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করতাম না। কিন্তু মানসিকভাবে আমি চাইতাম, দেশ যেন অতিক্রম করতে পারে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত নেতৃত্বের পর্যায়টি। ব্যক্তিটি অতিক্রম করে যেন সাধারণের যৌথ সংঘশক্তি প্রকাশিত হতে ক্ষমতা, অপার ক্ষমতাবান ব্যক্তির ওপর সব কিছুতে নির্ভর করার প্রবণতা : সাধারণ মানুষের এইসব চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য, ভালো-মন্দ, কটু কথায় নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে দূরীভূত হয়ে সংগঠনের যৌথ নেতৃত্বকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সংগঠন, তথা যৌথ সাধারণ অতিক্রম করে উঠুক, সেই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকুক, এই ছিল আমাদের চেতনা-অচেতন মনের কামনা।
শেখ মুজিবকে আয়ুদানের ক্ষেত্রে এখানেই হত্যাকারীদের অবদান। গান্ধীজি স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে যতখানি অমর হতে তার হত্যাকারী ব্যক্তিবর্গ তার চাইতে অধিক আয়ু গান্ধীজিকে দান করেছে। শেখ মুজিব স্বাভাবিকভাবে প্রয়াত হলে তার দান-অবদান, শক্তি এবং সীমাবদ্ধতার যে মূল্যায়ন সম্ভব হতো এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে যে আয়ু এবং অবস্থান তিনি লাভ করতেন তার হত্যাকারীর দল তার সেই মূল্যায়নকে রুদ্ধ করে মুজিবের দিকে আয়ুকে দীর্ঘতর করেছে, মুজিবের অবস্থানকে দৃঢ়তর করেছে। শেখ মুজিবের দিকে নিক্ষিপ্ত হত্যাকারীর বুলেটের আওয়াজ থেকে মুহূর্তের মধ্যে জন্ম নিয়েছে অপর এক আওয়াজ : ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।’ ইন্দিরা নেহরুর কন্যা। কিন্তু আজ ভারতে ‘নেহরু’ শব্দের যত না উচ্চারণ, তার অধিক উচ্চারণ ‘ইন্দিরা’ শব্দের। এখানে অবশ্যই কন্যা পিতাকে অতিক্রম করে গেছেন। এবং তার এমন অতিক্রমণে তার দেহরক্ষীদের নিক্ষিপ্ত বুলেটের যে একটি অবদান রয়েছে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

Category:

বাংলাদেশ কে সৃষ্টি করেছেন?

Posted on by 0 comment

PMf আনিসুল হক: “সবাইকে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। ভাবতে হবে আমাকে যেন মানুষ মনে রাখবে। কিন্তু মানুষ কেন মনে রাখবে, সেটি ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবাই তাঁকে মনে রেখেছে। এভাবেই সবাইকে স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে।”Ñ কথাটা ঢাকায় এক ভাষণে বলেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম (প্রথম আলো ডট কম, ১৭ অক্টোবর ২০১৪)।
প্রতিটা জিনিসেরই একজন নির্মাতা থাকেন। এই চেয়ারটা কে বানিয়েছেন, এই টেবিলটা কে বানিয়েছেন, বলে দেওয়া যাবে। তেমনি যদি প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ কে নির্মাণ করেছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তো তাকে বলা হয়, জাতির জনক।
এ ধারণাটা নিয়ে আমি একটা ছড়া রচনা করেছি :

ফেইসবুকটা কে বানাল, বলতে পারো,
জানলে পরে উত্তরটা জলদি সারো
সবাই পারে, জবাব আসে দু-চার লাখ,
ফেইসবুকটা বানিয়েছেন জুকারবার্গ।

বলো তো কারা করল বিমান আবিষ্কার,
জবাব আসে, সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার,
রাইট ব্রাদার্স রাইট ব্রাদার্স দুজন ভাই।
কে আছে যার এই জবাবটা জানাই নাই?

বাংলাদেশটা কে বানাল বলো দেখি
সবাই জানে সবাই মানে জবাব একই
সূর্য তারায় উত্তরটা দহমান
শিরায় শিরায় জবাব নিত্য বহমান
স্বাধীনতার মানের সঙ্গে সহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমার্থক। ‘যারা ভোর এনেছিল’ কিংবা ‘উষার দুয়ারে’Ñ ইতিহাসভিত্তিক এই উপন্যাসগুলো লিখতে গিয়ে আমাকে ইতিহাসের অলিগলি রাজপথ পরিক্রম করতে হয়েছে। ইতিহাস যতই পড়েছি, ততই এই প্রত্যয় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মই হয়েছিল বাংলাদেশটাকে তিনি স্বাধীন করবেন বলে। তিনি তার সারাটা জীবন একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছেন, এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি। এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে তিনি বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তিনি ও আর তার পরিবার অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট-যাতনা ভোগ করেছেন; কিন্তু তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি, তিনি আমাদের স্বাধীন করে গেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি কখন দেখতে শুরু করেন?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের ভাষায়, “সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।” (অন্নদাশংকর রায়, ইতিহাসের মহানায়ক, প্রকাশক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ২০১১)।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নিল, পাকিস্তান আর ভারতÑ দুটো দেশ জন্ম নিল। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সিরাজ-উদ-দৌলা হলে যুবক শেখ মুজিব ডাকলেন তার ঘনিষ্ঠ ছাত্র-যুবা কর্মীদের। বললেন, “স্বাধীনতা সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। এবার আমাদের যেতে হবে বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে। এই স্বাধীনতা স্বাধীনতাই নয়।”
বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭-এ পূর্ববাংলায় ফিরেই মুসলিম লীগ সরকার ও পশ্চিমাদের বাঙালি-বিরোধী অন্যায় PMf2আচরণের প্রতিবাদে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলের নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি কারাবরণ করেন।
তার নেতা সোহরাওয়ার্দীও তাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে মেনে নিতে; কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকেই গ্রহণ করতে। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, “শেখ মুজিবুর রহমান ডিজঅ্যাপ্রুভড দি সাজেশন অব মিস্টার সোহরাওয়ার্দী টু গিভ রিজিওনাল স্ট্যাটাস অব বেঙ্গলি। শেখ মুজিবুর রহমান রিসিভড দি সাজেশনস অব মিস্টার সোহরাওয়ার্দী থ্রু এ লেটার। অন্য কর্মীরাও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে একমত হলো না।” (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জীবন ও রাজনীতি, সম্পাদক : মোনায়েম সরকার)।
শেখ মুজিবের পেছনে গোয়েন্দারা ছায়ার মতো লেগে থাকত। তিনি কখন কী করতেন, সেই ’৪৮-’৪৯ সাল থেকেই তার সম্পর্কে রিপোর্ট করা হতো সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে। তাকে গ্রেফতার করা হতো। গ্রেফতারের পরই তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। তাকে জামিনের জন্য কোর্টে নেওয়া হলে সেখানেও ভিড় জমে যেত। তিনি সেই জনতার উদ্দেশ্যে আবার বক্তৃতা করতে শুরু করতেন মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে। ১৪ মার্চ ১৯৫১-এ শেখ মুজিবের গতিবিধি সম্পর্কে সরকারি নথিতে বলা হচ্ছে, “গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে গোপালগঞ্জ কোর্ট থেকে ১৪ মার্চ জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক ছাত্র মিছিল সহকারে তাকে নিয়ে বের হয়ে আসে ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুজিবুর রহমান সভায় ভাষণ দেন। তিনি মওলানা ভাসানীসহ অন্যদের বিনাবিচারে আটক রাখার বিরুদ্ধে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। মুজিবুর রহমানকে সেদিনই গ্রেফতার করা হয়।… পরের দিন তাঁর মুক্তির দাবিতে গোপালগঞ্জে হরতাল পালিত হয়। স্থানীয় ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ও ফ্রান্স কর্তৃক মরক্কোর ওপরে নিপীড়নের প্রতিবাদে মিছিল করে। মিছিল শেষে সভায় শেখ মুুজিবের মুক্তির জন্য লড়াই করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।” (ইংরেজি থেকে অনুবাদ লেখকের) এই ছিল ওই সময়কার নিত্য চিত্র। শেখ মুজিব জেল-জুলুমকে পরোয়া করতেন না। সাহস, দেশপ্রেম আর আপসহীনতা ছিল তার রক্তের কণায়।
সরকারি গোয়েন্দারা তার মুচলেকা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, তিনি কখনও মুচলেকা দিতেন না, বলতেন, সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ তিনি করেই যাবেন। এখন সেই গোয়েন্দাদের সরকারি রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, তারা বলতেন, এই বন্দীর অবস্থান খুব শক্ত। তাকে টলানো যায় না।
১৯৫১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে খুলনা কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাতের রিপোর্ট দিচ্ছেন জনৈক গোয়েন্দা ২৬ ফেব্রুয়ারিতে, “হি ওয়াজ নট উইলিং টু এক্সিকিউট এনি বন্ড ফর রিলিজ ইভেন ইফ দি ডিটেনশন উড কজ হিম টু ফেস ডেথ। হিজ অ্যাটিচুড ওয়াজ ভেরি স্টিফ।” এই বাক্যগুলো খেয়াল করুন, যদি তার অন্তরীণ থাকাটা তার মৃত্যুও ডেকে আনে, তবু তিনি কোনো মুচলেকায় স্বাক্ষর করবেন না। তার মনোভাব ছিল ভীষণ অনড়। যতবার যতজন গোয়েন্দা তার কাছে বন্ড স্বাক্ষর করাতে গেছেন, ততবার তারা একই মনোভাবের পরিচয় পেয়েছেন, একই কথা লিখেছেন। ২২ মে-র গোয়েন্দা রিপোর্টেও বলা হচ্ছে, “তিনি (মুজিব) তাঁর অতীতের রাজনৈতিক কর্মকা- নিয়ে মোটেও অনুতপ্ত নন, বরং তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে তাঁর মুক্তির পর একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাবেন। কী করবেন, সে-কথা জানাতে তিনি অনিচ্ছুক। মুক্তি পেতে তিনি খুবই আগ্রহী; কিন্তু মুক্তির জন্য কোনো বন্ডে তিনি সই না করার ব্যাপারে স্থিরচিত্ত। হিজ অ্যাটিচুড ওয়াজ ভেরি স্টিফ… তাঁর মনোভাব খুবই অনড়।”
শেখ মুজিব বারবার জেলে যেতেন, তাকে এক জেল থেকে আরেক জেলে বদলি করা হতো, জামিন নিয়ে বেরোনোর সময় কারাগারের ফটকে লোক জমে যেত, তিনি সেখানেই আবার সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করতেন, আবার তাকে জেলে পোরা হতো। কিন্তু তাকে দমানো যেত না।
তিনি তো কারাগারে। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে বেগম মুজিব ভাসতেন অকূল পাথারে। এমনও হয়েছে, আগের দিন শেখ মুজিব মন্ত্রী, কেন্দ্রের এক ঘোষণায় সরকারের পতন হয়ে গেছে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সরকারি বাসা ছেড়ে দিতে হচ্ছে, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেগম মুজিব পথে পথে ঘুরছেন, কেউ তাদের বাসা ভাড়া দিতেও সাহস পাচ্ছে না। বেগম মুজিবের অপরিসীম সাহস আর আত্মত্যাগের কাহিনি লিখতে গেলে পুরো একটা বই লিখতে হবে।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় কারাগারে বঙ্গবন্ধু অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। তাকে কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছিল না। তার হার্ট দুর্বল ছিল, জীবনহানির আশঙ্কা দেখা দিল। শেষে সরকার তার প্রতিজ্ঞার কাছে নতি স্বীকার করল। তিনি মুক্তি পেলেন। টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন। সে-সময়ের একটা ঘটনা তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেনÑ
“একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও রাসেল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকে। রাসেল চেয়ে থাকে। একসময় রাসেল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ রাসেল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে ঝুলে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন ও আর সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস।”
এই ছিল বাস্তবতা। শেখ মুজিব লড়ছেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, তাই তাকে জীবনের অনেকটা সময় কাটাতে হচ্ছে কারাগারে, তার ছেলে তাকে ভাবছে আপার আব্বা। শেখ মুজিব যদি তার নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বড় করে দেখতেন, বেগম মুজিব যদি তার পরিবারের সুখ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন যে কোনো সাধারণ নারীর মতো, তাহলে এই দেশটা এত সহজে স্বাধীন হতো না। বঙ্গবন্ধু নিজের প্রাণের ভয়ে কোনো দিনও ভীত ছিলেন না। ওই ১৯৫১ সালে কারাগারে জেরা করতে আসা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে তিনি যে কথা বলেছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা-ই ছিল তার মূলমন্ত্র, যদি মৃত্যু আসে আসুক, তবু বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে কোনো আপস নয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার ফাঁসি হতে পারত, ওই সময় বন্দিশালায় তাকে গুলি করে মারার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তার নিজের ভাষায় “আমি দুই দুইবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। প্রথমবার আইয়ুব খানের বন্দিশালায়। ষড়যন্ত্রের মামলায়। আমার এক সাথী আমাকে সতর্ক করে দেয় যে সন্ধ্যাবেলা সেলের বাইরে গিয়ে নিয়মিত বেড়ানোর ব্যাপারটি বিপজ্জনক। পেছন থেকে গুলি করবে আর বলবে পালিয়ে যাচ্ছিল বলে গুলি করেছি। অন্যের বেলা ঘটেও ছিল ওরকম গুলি চালনা। দ্বিতীয়বার ইয়াহিয়া খানের কারাগারে। আমার সামনেই আমার কবর খোঁড়া হচ্ছে। বুঝতে পারছি যে আমার সময় ঘনিয়ে আসছে।” (অন্নদাশংকর রায়)।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে এভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। একাত্তর সালে যখন পাকিস্তানের কারাগারে তাকে আটকে রাখা হয়েছে, তখন তার মৃত্যুদ- স্থির হয়ে গিয়েছিল, তার জন্য সেলের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিল। সামান্য আপস বাংলাদেশের মুক্তির পথকে বাঁকা আর দুর্গম করে তুলতে পারত। তা তিনি করেন নি।
অন্যদিকে আছেন বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু। কী অসাধারণ এক নারীই না পেয়েছিলাম আমরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে! যার কথা ইতিহাসে আসে না। কারণ, নারী ও পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ আর অবদানের কথা থেকে যায় ইতিহাসের অন্তরালে। আমাদের ইতিহাসের দুটো খুব মাহেন্দ্রক্ষণে বেগম মুজিব নীরবে আমাদের ইতিহাসের গতি-প্রকৃতিকে ইতিবাচকভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। একটা হলো ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময়। শেখ মুজিব তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। ওই সময় একটা গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবকে অংশগ্রহণ করানোর জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছিল। সারাদেশে প্রচ- আন্দোলন হচ্ছে। আর এই সময় শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে যাবেন আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠক করতে! বেগম মুজিব তাড়াতাড়ি ডেকে পাঠালেন বড় মেয়ে হাসিনাকে। শেখ হাসিনার হাতে চিরকুট দিলেন। শেখ হাসিনাও সেই চিরকুটের বার্তাটা মুখস্থ করে নিলেনÑ যদি প্রহরীরা চিরকুট কেড়ে নেয়! বেগম মুজিবের বার্তাটা ছিল, সারাদেশের মানুষ তোমার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত, খবরদার তুমি প্যারোলে মুক্তি নিবা না। যদি তুমি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আস, আমি তোমার বিরুদ্ধে পল্টনে সভা করব। (শেখ হাসিনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা, মঞ্জুরুল ইসলাম, সময় প্রকাশনী)।
সেই বার্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ছাত্রী শেখ হাসিনা পৌঁছে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব সেদিন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেননি। বঙ্গবন্ধু হিসেবে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে এসেছিলেন।
একাত্তরের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় যোগ দিতে যাবেন বঙ্গবন্ধু। তিনি খুব অস্থির। একদিকে ছাত্র-জনতার প্রচ- চাপ, আজই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে। অন্যদিকে সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে ওই ভাষণটির দিকে। আমরা আজ জানি, এমনকি আমেরিকার কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার ক্ষমতাকেন্দ্রও নির্ঘুম অপেক্ষা করছিল শেখ মুজিব কী বলেন তা জানার জন্য। ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স যদি আসে, তার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি মিলিটারি। এই অবস্থায় কী করবেন বঙ্গবন্ধু! নিজের ঘরে তিনি পায়চারি করছেন। বেগম মুজিব তাকে বললেন, তুমি এত অস্থির কেন। শুয়ে খানিকক্ষণ রেস্ট নাও। মুজিব শুয়ে পড়লেন। তাঁর মাথার কাছে মোড়া নিয়ে বসা শেখ হাসিনা, পায়ের কাছে বেগম মুজিব। বেগম মুজিব বললেন, তুমি তোমার নিজের বিবেকের কথা বলবা। তোমার সামনে লক্ষ মানুষের হাতে বাঁশের লাঠি, পেছনে বন্দুক। তুমি তা-ই বলবা, যা তোমার অন্তর বলতে চায়। শেখ মুজিব খানিকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে উঠলেন। যাওয়ার আগে বেগম মুজিবের কপালে চুম্বন করলেন। খানিকটা দেরি করেই তিনি পৌঁছালেন সভামঞ্চে। মানুষ তখন অধীরভাবে প্রতীক্ষা করছে, নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, ‘কখন আসবে কবি?’
‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
… গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতাখানি, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এত ত্যাগ, এত বীরত্ব, এত ভালোবাসা, এত প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষটি আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন! ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার ওই রাতে তিনি সাংবাদিক আতাউস সামাদকে বলেছিলেন, “আই হ্যাভ গিভেন ইউ ইন্ডেপেন্ডেন্স, নাউ প্রিজার্ভ ইট।” (আজকের কাগজ, ২২.০১.৯৩)। আমাকে আতাউস সামাদ একাধিকবার বলেছেন, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন, “আমি ইউডিআই দিচ্ছি (ইউনিলিটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্স বা স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণা)। আমি তোদের স্বাধীনতা দিয়ে গেলাম, যা তোরা রক্ষা কর।”
ইথারে ছড়িয়ে পড়ল সেই ঘোষণা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।
১৯৭২ সালে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে জিগ্যেস করেছিলেন, “আজ এই মুহূর্তে অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন বলে গণ্য করবেন? কোন মুহূর্তটি আপনাকে সব চাইতে সুখী করেছিল?”
বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।”
ফ্রস্ট : আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন?
শেখ মুজিব : সমগ্র জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।
ফ্রস্ট : এমন দিনের স্বপ্ন আপনি কবে থেকে দেখতে শুরু করেন?
শেখ মুজিব : বহুদিন ধরে আমি এই স্বপ্ন দেখে আসছি।
তাকে হত্যা করার জন্য বারবার সব আয়োজন সম্পন্ন করেও পাকিস্তানিরা তাকে মারতে পারেনি! ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আগে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, আমাকে আর দুটো দিন সময় দিন, আমি শেষ কাজটা করে নিই, শেখ মুজিবের মৃত্যুদ-টা কার্যকর করি।
সেই মৃত্যুদ- সেদিন কার্যকর হয়নি। হয়েছে আরও চার বছর পরে।
আর তার প্রাণ কেড়ে নেবে বাঙালিরা, এটা বঙ্গবন্ধু কোনোদিনও ভাবতে পারেন নি। তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে পারে, এসব তথ্য বিভিন্নভাবে তার কাছে পৌঁছানো হয়েছিল, এমনকি ভারতীয়রাও এই তথ্য জানাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিল। আমেরিকার অবমুক্ত নথি থেকে আমরা আজ তা জানি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালিদের বিশ্বাস করতেন নিজের চেয়েও বেশি। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না, আর এটা তাকে বিশ্বাস করানো অসম্ভব ছিল যে, কোনো বাঙালি তাকে আঘাত করতে পারে। তিনি বলেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তিনি তার দেশের মানুষকে বেশি ভালোবাসেন। আর তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তিনি দেশের মানুষকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসা আর বিশ্বাস তার মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে হত্যা করেছে যারা, তাদের ভাষা ছিল বাংলা, তাদের হাতে ছিল গরিব বাঙালির রক্ত পানি করা টাকায় কেনা অস্ত্র। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, শুধু বেগম মুজিব নন, শিশুপুত্র রাসেল, গর্ভবতী পুত্রবধূও রেহাই পায়নি সেই হত্যাকা-ের রাতে!
জাতির জনককে হত্যা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকেই পেছনের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলো। তার নাম মুছে দেবার চেষ্টা হলো নানাভাবে। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন তিনি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির জাতির জনক। বিবিসি বাংলার জরিপে যে উঠে এসেছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, তা যথার্থÑ কারণ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তিনিই বাঙালিকে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।
আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কথা দুটো সমার্থক হয়ে উঠেছে।

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

Category:

ভয়াবহ ২১ আগস্ট

Posted on by 0 comment

PMfসরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: আগস্টের ২১ তারিখ ২০০৪ অশ্রুভেজা রক্তে মাখা আরও একটি দিন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভয়াবহ বর্বরোচিত ও নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ঘটে ওই দিন বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ জঘন্যতম নজিরবিহীন ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পতœী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ আহত হন ৪ শতাধিক। শুধু শেখ হাসিনাই নয়, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে এই হামলা চালানো হয়।
সারাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের বোমা হামলার প্রতিবাদে ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকাল ৫টায় পৌঁছান। মঞ্চ করার অনুমতি পাইনি বিধায় ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষ করেন। উপস্থিত নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। ঠিক এ সময়ই মঞ্চ লক্ষ্য করে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানববর্ম করে ঘিরে মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেন শেখ হাসিনাকে। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে পরপর বিস্ফোরিত হয় ১৩টি শক্তিশালী গ্রেনেড।
এ ধরনের জনসভা বা সভামঞ্চের আশাপাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে ও বিভিন্ন ফ্লোরে পাহারায় থাকে স্বেচ্ছাসেবকরা। কিন্তু সেদিন স্বেচ্ছাসেবকদের কোথাও অবস্থান করতে দেয়নি পুলিশ। এ হামলার অন্যতম মূল নেতা মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তি মতে হামলার একদিন আগে ২০ আগস্ট হুজির দুই সদস্য আহসানউল্লাহ কাজল ও আবু জান্দাল ঘটনাস্থলের আশপাশে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রেকি করে যায়। হুজির সদস্য বাদেও জামাতের ১৫ সদস্য অংশগ্রহণ করে। সমাবেশের মঞ্চটি ছিল পশ্চিমমুখী। হামলাকারীদের প্রতি দলে চারজন করে ৩টি দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। মঞ্চে আক্রমণের দায়িত্ব ছিল জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের সমন্বয়ে গঠিত প্রথম দলের। তাদের অবস্থান ছিল মঞ্চের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে। সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বলের সমন্বয়ে দ্বিতীয় এবং মুত্তাকিম, মুরসালিন, আরিফ হাসান ও ইকবালের দায়িত্ব ছিল যথাক্রমে পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিকে অবস্থান নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীর ওপর আক্রমণ করা। এই ১২ জনকে ১৫টি গ্রেনেড ভাগ করে দেওয়া হয়। আসামি জাহাঙ্গীর তার জবানবন্দিতে বলেছে প্রথম গ্রেনেড হামলার পর রক্তাত মানুষদের চিৎকার ও ব্যাপক হট্টগোল শুরু হলে সে ভয়ে আর পরের গ্রেনেডটি ছুড়তে পারেনি। প্রথম গ্রেনেড চার্জের পর মঞ্চের জায়গা ফাঁকা হলে দ্বিতীয় গ্রেনেড মারার কথা ছিল বুলবুলের। কিন্তু মানুষের দিগবিদিক ছোটাছুটির মধ্যে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বুলবুল আর গ্রেনেড ছুড়তে পারেনি। পরে সেফটি পিন না খুলেই গ্রেনেড মাটিতে ফেলে পালিয়ে যায় সে।
বিস্ফোরণের পরপর ধোঁয়ার কু-লী, মানুষের চিৎকার, ছোটাছুটিতে একটি প্রাণবন্ত সমাবেশের চেহারা পাল্টে হয়ে যায় হাহাকার আর্তনাদ ও ক্রন্দন শিহরিত। উপস্থিত সকলে হয়ে ওঠে উ™£ান্ত, ভিতু ও অপ্রস্তুত। আওয়ামী লীগ কার্যালয় আর রমনা ভবনের সড়কে জায়গায় জায়গায় প্রবাহিত হয় রক্তের স্রোত। ছেঁড়া স্যান্ডেল, রক্ত, পড়ে থাকা ব্যানার, পতাকার সঙ্গে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে নারী-পুরুষের দেহ-কেউ নিথর-স্তব্ধ, কেউবা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। স্টেডিয়ামের দিক হয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে নেত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা যখন ঘটনাস্থল ত্যাগ করছিলেন তখনও একই দিক থেকে কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে গ্রেনেড এসে ঘটনাস্থলে বিস্ফোরিত হতে থাকে। গ্রেনেড আক্রমণ ব্যর্থ হলে নেত্রীকে হত্যার বিকল্প পন্থা হিসেবে বন্দুকধারীদের তৈরি রাখা হয়। আর এই বন্দুকধারীরাই খুব হিসাব কষে নেত্রীর গাড়ির কাচে গুলি চালায়। এই গুলি বুলেট প্রুফ কাচ ভেদ করতে ব্যর্থ হলে তারা গাড়ি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারে। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সব শেষে গাড়ির চাকা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে থামানোর চেষ্টা করা হয়। গুলির আঘাতে গাড়ির বাঁ পাশের সামনের ও পেছনের দুটি চাকা পুরোপুরিভাবে পাংচার হয়ে যায়। এ সময় তাকে ঘেরাও করে রাখা মাহবুব স্পটেই মারা যান। কোনোক্রমে শেখ হাসিনা গাড়িতে ওঠার পরপরই গাড়ি চালু করতেই পেছন থেকে বাঁ দিকের সিট লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়। চালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই গাড়িটি বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ৬টার দিকে ধানমন্ডির সুধা সদনে নিয়ে আসে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানকে ব্যাহত করার জন্য পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। কেউ কেউ উদ্ধারকারীদের বুকে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আওয়ামী লীগের যে কর্মীটি সন্ত্রাসবিরোধী ব্যানার নিয়ে এসেছিল সেই ব্যানারেই তার ক্ষত-বিক্ষত দেহটি বহন করে নিয়ে যায় তার সহকর্মীরা। আহত অবস্থায় প্রথমে প্রায় সবাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিভিন্নজনকে সরকারি-বেসরকারি নানা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের আর্তচিৎকার আর স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে প্রকম্পিত সেখানকার পরিবেশ। এমনকি নিহতদের নিতে ও জানাজা পড়তেও বাধা দিয়েছে তথাকথিক ইসলামি নামধারি জামাত-বিএনপি সরকার।
গ্রেনেড হামলার পর মামলা হয়েছিল পৃথক ৩টি। এই হামলার তদন্ত কয়েক দফা হলেও শুরুতেই মামলার গতি ভিন্ন পথে নেওয়ার চেষ্টা করে জোট সরকার। শুধু তাই নয়, মামলার আলামত নষ্ট করা হয়। এমনকি মামলার গুরুত্ব নষ্ট করতে হামলার স্বীকার আওয়ামী লীগের দেখে সন্দেহের আঙ্গুল তুলেছিল এই সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা। এর মধ্যে প্রথম সাত বছরের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় মোট ছয়বার। ২০০৫ সালের ৯ জুন আটক জজ মিয়া ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ। তীব্র সমালোচনা শুরু হয় যখন গণমাধ্যমে ফাঁস হয় যে জজ মিয়ার বিষয়টি পুলিশের সাজানো নাটক। মিথ্যা সাজানো ঘটনা ‘জজ মিয়া নাটক’ নামে বাংলা প্রবাদে পরিণত হয়েছে। প্রথম তদন্ত হয় বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে কিন্তু কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে নতুন তদন্তে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া। ওই অভিযোগপত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতাদের শনাক্ত করা হয়নি। বর্তমান সরকার আমলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন। ১৩-দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার তদন্ত শেষ হয়। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে উঠে এসেছে হত্যাকা-ের মূল নির্দেশদাতা তারেক রহমান। ষড়যন্ত্রের বৈঠক হয়েছিল কুখ্যাত হাওয়া ভবনে। সার্বিক আয়োজক ছিল সে-সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। পুরো হামলায় মদদ দিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো আর আর্চেস গ্রেনেড এসেছে পাকিস্তান থেকে। ঘটনার ১৪ বছর এক মাস ২০ দিন পর ২০১৮-এর ১০ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। গ্রেনেড হামলা মামলায় মোট ৪৯ জন আসামি ছিলেন। যাদের মধ্যে ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১৯ জনকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আবদুস সালাম পিন্টুসহ ৩১ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। এছাড়া তারেক রহমান এবং হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ জন পলাতক। বাকি তিনজনের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় গ্রেনেড হামলা মামলা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

Category:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেমন দেখেছি

Posted on by 0 comment

PMপঙ্কজ ভট্টাচার্য: আমাদের জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের মহানায়ক স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এই মহামানবের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
ষাটের দশকের গণতন্ত্র স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামে যে বিরাট যুবজাগরণের উত্থান ঘটে নিজগুণে কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন তাদের প্রধান পথপ্রদর্শক, হয়ে ওঠেন সকলের প্রিয় মুজিব ভাই। আমাদের মতো গণতন্ত্রের মাঠকর্মীরা না-দেখা বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, সুভাষ বসু প্রমুখদের জীবন-সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি আর খুবই কাছ থেকে দেখা তেজদীপ্ত বিশাল মাপের মানুষ সকলের প্রিয় মুজিব ভাইকে পেয়েছি পাকিস্তানের বৈরী ও বন্ধুর পরিবেশে আমাদের পরম নির্ভরতার কা-ারি হিসেবে। দলীয় নেতার পরিচয় ছাপিয়ে, দলের সীমা সরহদ্দ মাড়িয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে সমগ্র জাতির আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জাতির আশা-আকাক্সক্ষা তাকে ঘিরে আবর্তিত হতো সেই দিনগুলোতে। গণতন্ত্র, বাঙালিত্ব, অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের সেদিনকার দল-মত-নির্বিশেষে কর্মীবাহিনীর কাছে তিনি প্রকৃত জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তার অনন্য সাধারণ সাহস, জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, দুঃসহ কষ্ট ও কারাযন্ত্রণা ভোগ ও ত্যাগের নজির হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে মুজিব ভাই জনমনে হিমালয়ের উচ্চতা অর্জন করেন। অন্যদল এমনকি ভিন্নমতের নেতা-কর্মীদের সাথে তার উষ্ণ আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল ঈর্ষণীয়। এখন মনে হয় যেন তিনি এক একান্নবর্তী রাজনৈতিক পরিবারের সহৃদয় অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন সেই দিনগুলোতে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জাতীয়তাবাদী বাম প্রগতিশীল দলের কর্মীবাহিনী মুজিব ভাইয়ের কাছে পেতেন অঢেল স্নেহ-ভালোবাসা ও অফুরন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা। (কল্পনা করতেও আজ কষ্ট হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কত মানবিক ও সমন্বিত এবং কত উচ্চ ও উন্নত স্তরে উন্নীত ছিল তৎকালে।)
এই স্বল্প গৌরচন্দ্রিকা শেষে দু-চারটি ঘটনার স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে এই মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করব। জাতীয় কর্তব্য পালনের অঙ্গ হিসেবে দলীয় বিবেচনায় তাকে ব্যবহার করা বা অতিমানব হিসেবে চিহ্নিত করা তাৎক্ষণিক স্বার্থোদ্ধারে তাকে ব্যবহার করা অথবা রাজনৈতিক বৈরিতায় তাকে খাটো করার যে কোনো প্রয়াস ইতিহাস মেনে নেবে না, মানতে পারে না।
তেষট্টি সনে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন এবং ছাত্র আন্দোলনে পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তার উপলক্ষে মুজিব ভাইয়ের কাছে একাধিকবার গিয়েছি তার ৩২ নম্বর বাসভবনে। কখনও রেজা আলী, মানিক বা মুর্তজা ভাইয়ের সাথে। আন্তরিকতায় সিক্ত তার পরামর্শ ও সহযোগিতা সব সময়ে পেয়েছি, নিজের কর্মীদের জন্য সংগৃহীত সীমিত সঞ্চয় থেকে তিনি আমাদের বড় অনুষ্ঠানের জন্য হাজার টাকাও দিয়েছেন, এমনকি তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছে তিনি আমাদের পাঠাতেন অধিক অর্থের প্রয়োজনে। একাধিকবার দেখেছি মফস্বল থেকে আসা আওয়ামী লীগের গরিব ও নিম্নবিত্ত কর্মীরা নেতার সাথে দেখা করতে এসেছেন, তাদের তিনি মধুর ব্যবহারে তুষ্ট করে সংগঠন ও আন্দোলনের কাজে জোরদারভাবে নামতে উৎসাহিত করতেন। বিদায় পর্বে কর্মীর মাথায় হাত বুলিয়ে তার পকেটে পুরে দিতেন একটি হোমিওপ্যাথিক পুরিয়ার মতো জিনিস। পরে মুজিব ভাইকে প্রশ্ন করে জেনেছি গরিব কর্মীরা কষ্ট করে ঢাকা আসে, তাদের কিছুটা কষ্ট লাঘব করতে তিনি ৫০, ১০০ ও ২০০ টাকার পুরিয়া করে রাখেন। সেদিনকার সংগঠন-আন্দোলনের কাজে ঐ পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যেত নেতার কাছ থেকে, যা ছিল উদ্দীপনার রসদ। আজকের বাস্তবতায় এই নজির কল্প-কাহিনির মতো শোনাবে।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, সময় সময় বৈরিতাও হয়েছে; কিন্তু ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে ৬-দফা ও ১১-দফা, গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর ক্ষেত্রে অবিচ্ছিন্ন ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ অব্যাহত থাকার পশ্চাতে ছিল মুজিব ভাইয়ের দূরদর্শী রাজনৈতিক লক্ষ্যসীমা ও তাগিদ, এ-কাজে মণি সিংহ, মুজাফ্ফর আহমদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, পীর হবিবুর রহমান, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, মানিক মিয়া, মিজানুর রহমান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, শহীদুল্লাহ কায়সার পালন করতেন যথাযোগ্য পরিপূরক-সম্পূরক-ভূমিকা। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরাচারী সরকার পূর্ব বাংলার বিশেষত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে ১৯৬৪ সালের ১৪ জানুয়ারি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেয়, দিনকয়েক পূর্বে কাশ্মীরের হযরতবাল মসজিদে পয়গম্বরের রক্ষিত পবিত্র চুল চুরির প্রতিক্রিয়ায় পূর্ববঙ্গে এ দাঙ্গা ঘটায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ভয়ার্ত উদ্বাস্তু নর-নারী-শিশুরা আশ্রয় গ্রহণ করেছিলÑ মাসাধিককাল ধরে। তখন জগন্নাথ হলে ছাত্রদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সংসদ ভবনে একটি আশ্রয়শিবির স্থাপিত হয়, ২ হাজারের বেশি শরণার্থীদের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি মুজিব ভাই ও মহীউদ্দীন আহমেদের কাছে চাল, ডাল, হ্যাজাক লণ্ঠন ও কিছু টাকা চেয়ে পত্রবাহক আখলাকুর রহমানকে পাঠাই, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ বস্তা চাল, এক বস্তা ডাল, ২ হাজার টাকা এবং দুটি হ্যাজাক পাঠান মুজিব ভাই। পরের দিন মহীউদ্দীন ভাইও পাঠান প্রায় কাছাকাছি পরিমাণের সাহায্য সামগ্রী। ১৫ জানুয়ারি ঢাকা শহরে প্রেসক্লাব থেকে বের করা হয় ঐতিহাসিক দাঙ্গাবিরোধী শান্তি মিছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুজিব ভাই, সুফিয়া কামাল, মহীউদ্দীন আহমেদ, আতাউর রহমান খান, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, আহমেদুল কবীর, শহীদুল্লাহ কায়সার-সহ অনেকে। সেই শান্তি মিছিল নওয়াবপুর রেলক্রসিং অতিক্রম করে ইত্তেফাকের দিকে অগ্রসর হলে হাক্কা গু-া নামে একজন দাঙ্গাবাজ (শান্তি আন্দোলনের শহীদ নামে খ্যাত) বেগম রোকেয়ার ভাতিজা আমির হোসেন চৌধুরীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। আরেক ঘটনায় মহীউদ্দীন আহমেদ ঐদিন ছুরিসহ এক দাঙ্গাবাজ গু-াকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। ১৫ জানুয়ারি ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ নামে প্রথম পৃষ্ঠার অভিন্ন সম্পাদকীয়।
১৭ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল। চার দিন গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদের পর আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় অভিযুক্ত করে পাঠানো হয়। কারাগারে ঢুকেই দেখি কারাগার হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন মুজিব ভাই। জিজ্ঞাসাবাদের বিস্তারিত বিষয় তাকে জানালাম, যার সিংহভাগই ছিল মুজিব ভাইয়ের বিরুদ্ধে, মানিক চৌধুরী, বিধান কৃষ্ণ সেন, চট্টগ্রামের ডা. জাফর, হান্নান সাহেব, একে খান প্রমুখ সাথে শেখ মুজিবের বৈঠক ইত্যাদি নিয়ে। পাশাপাশি কয়েকজন সেনা অফিসারদের সাথে বৈঠক প্রসঙ্গও ছিল ঐ জিজ্ঞাসাবাদে। যা হোক ’৬৭ সালের অক্টোবরের ২০ তারিখে আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিই এই মর্মে যে, সেনা-আমলা যুক্ত করে মুজিব ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র মামলা তৈরি করা হচ্ছে, যা পরবর্তীকালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে খ্যাতি পায়।
কারাগারে অবস্থানকালে ঐ সময়কালে কথা প্রসঙ্গে একবার মুজিব ভাইকে একটি বইয়ের কথা বলেছিলাম। বইটির নাম ‘এন এথনিকেল স্টাডি অব পাকিস্তান’Ñ লেখক অধ্যাপক গণকোভস্কী যে গ্রন্থে পাকিস্তানের জাতিসমূহের বিশেষত বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম-সংঘাতের মাধ্যমে রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে ভাষ্য দেওয়া ছিল। কবি জসীমউদ্দীন এ বইটি রাশিয়া থেকে নিয়ে আসেন, তার পুত্র জামাল আনোয়ার বাসু বন্ধুবরের কাছ থেকে বইটি নিয়ে আমি পড়ার সুযোগ পাই। মুজিব ভাই এ তথ্যটি নিয়ে একাধিক দিন তর্ক করেন এই মর্মে যে, প্রচ- জনমত সৃষ্টি হলে শাসকগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক চাপে ৬-দফা মেনে নিতে বাধ্য হবে। তাছাড়া সশস্ত্র যুদ্ধের পার্টি তো আওয়ামী লীগ নয়, এমনকি ন্যাপও নয়। অবশ্য এ-কথাও তিনি পরে বলেছিলেন, “যদি সশস্ত্র যুদ্ধই করতে হয় তবে আমি হিসাব করে দেখেছি ২৭ জনের বেশি লোক পাব না। সম্ভাব্যদের মধ্যে তৎকালীন ছাত্র নেতারাসহ বিভিন্ন জেলার সার্বক্ষণিক কর্মীদের নাম তিনি বলেন, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন সন্দ্বীপের লোক সম্ভবত আবদুর রহমান বয়াতি, তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার জনসভার পূর্বে লোকগান পরিবেশন করে জনগণকে মাতিয়ে তুলতেন। যাক, আমার জামিনে মুক্ত হওয়ার দিনে তিনি বলেন মামা (শহীদুল্লাহ কায়সারকে) দিয়ে বইটা পাঠিয়ে দিস।” স্বাধীনতার পর ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিশ্বজয়ীর বেশে দেশে ফিরেন বঙ্গবন্ধু। ১২ জানুয়ারি তাকে শুভেচ্ছা জানাতে গেলাম। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে, পরে বললেন, “কিরে রাশিয়ান বইটা তো দিলি না, বইটা না পড়েও বই-য়ের কথা অনুযায়ী কাজ তো করেছি, কি বলিস।” অবাক হলাম মুজিব ভাইয়ের ঈর্ষণীয় স্মরণ শক্তির বহর দেখে ও শুনে। অথচ ঘটনাটি ভুলেই গিয়েছিলাম বলা চলে।
’৭৩ সালের শেষের দিকে মুজিব ভাইয়ের সাথে দেখা করি। তখন জাতীয়করণকৃত জুটমিলগুলোতে সাবেক মালিকদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সাবেক মালিকরা ১৮টি মিলের যাবতীয় অর্থ একই দিনে উঠিয়ে মিলগুলো দেউলিয়া করার উদ্যোগ নেন। পূর্ব রাতে এ সংবাদ নিয়ে ফরাসউদ্দীন (পিএস)-এর সাথে দেখা করে তাকে ঘটনা খুলে বলি। তিনি ডিসিকে টেলিফোন করে ঐ সকল জুটমিলের অ্যাকাউন্ট জব্দ করার ব্যবস্থা করেন।
’৭৪ সালে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট ‘গজ’ গঠনসহ বহুবার তার সাথে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছি, কারাজীবনে তার সান্নিধ্য ও সাক্ষাৎ সঞ্জীবনীতুল্য অভিজ্ঞতায় পূর্ণ করেছে স্মৃতির ভা-ার। সর্বশেষ সাক্ষাৎ করি বঙ্গবন্ধুর সাথে ১২ জুলাই ১৯৭৫ সাল। বুলগেরীয় রাষ্ট্রদূত ছিলেন ৮৭ বছরের, নাম ছিল বরিস বায়েসদিক, যিনি হিটলারের বন্দিশিবিরে অত্যাচারিত হন, বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ মধ্যম পর্যায়ের একটি সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা অচিরে ঘটতে পারে মর্মে সংবাদটি রাষ্ট্রপতিকে জানাতে তিনি আমাকে অনুরোধ করেন। আমি সে-কথা কিছু সুপারিশসহ বঙ্গবন্ধুকে জানাই, তিনি প্রথমে স্বভাবগত ঔদার্য নিয়ে বিষয়টি হালকাভাবে নেন, আমার চাপাচাপিতে তিনি বলেনÑ রক্ষীবাহিনীর নুরুজ্জামানকে মার্শাল টিটোর কাছে পাঠিয়েছেন এন্টি ট্যাংক গান আনতে, যা এক মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য, উক্ত রাষ্ট্রপতির সচিব পদমর্যাদার আগন্তক আর কেউ নন, পাকিস্তান পুলিশের দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি এবং ’৬৭ সালে গোয়েন্দা হেফাজতে আমাকে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেন, কিছু প্রতিশোধক ব্যবস্থার কথাও বলেন। এই সময়ে আবদুর রহিম নামধারী একজন সাবেক পুলিশ কর্তা এবং তৎকালীন সচিব আকস্মিকভাবে ঐ ঘরে ঢুকেন একটা ফাইল নিয়ে, আমি বঙ্গবন্ধুর হাঁটুতে চাপা দিই ঐ প্রতিশোধক বিষয়টি যেন না বলেন, তিনি হেসে বলেন, ‘ও আমার লোক’ এ-কথা বলে কি ব্যবস্থা এক মাসের মধ্যে নেবেন তা পুনরায় উল্লেখ করেন। কথা শেষে যখন বেরিয়ে আসি তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগোতোক্তি করি “ওরা এক মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে”, বিষয়টি সংক্ষেপে ত্বড়িৎ জানাই অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ ও কমরেড ফরহাদ ও মণি সিংহকে। সেদিন মুজিব ভাইয়ের কাছ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তিনি রসিকতা করে বলেন, “আমি তোদের বিপদ নিয়ে ভাবি, তোরা সাবধানে থাকিস, আমি ক্ষমতা ছেড়ে জনতার মধ্যে ভিড়ে যাবো, বিপদ হবে তোদের।” রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে বের হবার পথে দেখি হনহন করে খোন্দকার মোশতাক টুপিটা ঠিক করতে করতে ঢুকছেনÑ বঙ্গবন্ধু রসিকতা করলেন “কি ‘রিএক্সনারী’ নেতা কেমন আছেন।” ত্বড়িৎ জবাব দিলেন মুশতাক ‘নেতা, আপনার জীবদ্দশায় আমি বিরোধিতা করবো না” খুনি খোন্দকার মুশতাক বঙ্গবন্ধুর হত্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করেন। খুনিও তার কথা রেখেছেন।
প্রিয় মুজিব ভাই, দেশবাসীর প্রিয় বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যুহীন ও চির ভাস্বর হয়ে বাংলার মানুষের অন্তরে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।

লেখক : ঐক্য ন্যাপের সভাপতি

Category:

চিরজীবী বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

PMরাশেদ খান মেনন: পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের ভোর। সেই ভোরেই পাশের রাস্তার বাসা থেকে আমার শ্বশুর হন্তদন্ত হয়ে এসে ঘুম থেকে জাগিয়ে যে খবরটি দিলেন, তা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। আমার শ্বশুরের বিবিসি শোনার অভ্যাস ছিল। সকালে বিবিসি-র সেই খবরে বঙ্গবন্ধু হত্যার যে সংবাদ দেওয়া হয়েছিল তা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সেটা যে সত্য তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তারপরও খবরের সত্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ বেতার খুলতেই খুনি মেজর ডালিমের সেই উন্মত্ত কণ্ঠের ঘোষণায় আরও স্পষ্ট হলাম যে বিবিসি সঠিক সংবাদই দিয়েছে। কিন্তু তারপরও বিমূঢ়তা কাটেনি। এই অবস্থায় কি করণীয় তাও বুঝতে পারছিলাম না। কারণ পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতাতেই জানতাম এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক কর্মী-নেতাদের জন্য বিপজ্জনকÑ তা তিনি সরকার অথবা বিরোধী দল যেখানেই অবস্থান করুন না কেন। অল্প সময়ের মধ্যে এই বিপদের দিকগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল যখন দেখলাম ‘বাংলাদেশ বেতার’ পরিবর্তিত হয়ে গেছে ‘রেডিও বাংলাদেশ’-এ। ‘জয় বাংলা’ পরিবর্তিত হয়ে গেছে ‘জিন্দাবাদ’-এ। ‘জয় বাংলা’কে নির্বাসন দিয়ে ‘জিন্দাবাদ’-এর প্রচলন কোন ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে সেটা বুঝতে একজন রাজনৈতিক কর্মীর খুব অসুবিধার হওয়ার কথা না।
বেলা গড়াতে রেডিওতে তিন বাহিনীর প্রধানের খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের চার জাতীয় নেতা বাদে অধিকাংশ বাকশাল মন্ত্রীদের খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ এবং ঢাকাসহ দেশব্যাপী সামান্যতম তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান প্রতিরোধের অনুপস্থিতিÑ এসব ঘটনায় এটা বোঝা গিয়েছিল যে দেশের পরিস্থিতি ১৮০ ডিগ্রি উল্টা দিকে ঘুরে গেছে। যারা বাকশাল নিয়ে অতি উৎসাহ দেখিয়েছে, অন্যকে বাকশালে যোগ দিতে বাধ্য করেছে, তারাই এখন ঘোর বাকশাল বিরোধীতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থাতে যে কথাটি আমার মনে প্রথম এসেছিল, সেটা হলো ’৭৫-এর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের কথা। ইতোমধ্যে ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়েছে। সংবিধানের ঐ চতুর্থ সংশোধনী অনুসারে দেশে একটি জাতীয় দল থাকবে। অন্য সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত হবে। সংসদ সদস্য যারা জাতীয় দলেÑ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু যার নামকরণ করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, সংক্ষেপে বাকশালÑ যোগদান করবেন না তারা তাদের সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। শ্রমিক, কৃষক, নারী, ছাত্র, যুবÑ এ ধরনের সকল ক্ষেত্রেই একটি মাত্র গণসংগঠন থাকবে। অন্যগুলো বিলুপ্ত হবে। এ অবস্থায় আমাদের পার্টির মধ্যেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে পার্টির গোপন অস্তিত্ব ও কাঠামো বজায় রেখে বাকশালের মধ্যে ফ্যাকশনাল কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় পরে সেটা পরিবর্তন করে সিদ্ধান্ত হয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ অথবা দেশব্যাপী পরিচিত ব্যক্তি বাকশালে যোগদান করবেন না। তবে দেশে একটিমাত্র আইনসংগত ট্রেড ইউনিয়ন থাকায় কারাখানার কর্মরত শ্রমিকরা সেই ইউনিয়নে থাকবেন।
‘বাকশালে’ এই যোগদানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু আমাকে ও বন্ধু হায়দার আকবর খান রনোকে তার সাথে দেখা করার জন্য তার একান্ত সচিব ড. ফরাসউদ্দিনকেÑ যিনি আমাদের সহপাঠী ও বন্ধুÑ দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আর সে অনুসারে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরের বাসায় আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তার নিজের লাইব্রেরি ঘরে বসিয়ে তিনি আলাপ করেছিলেন আমাদের সাথে।
বাইরে থেকে ফিরে একটু ফ্রেস হয়ে আসার জন্য ওপরে গিয়েছিলেন। এই ফাঁকে বন্ধু রনো তার লাইব্রেরির আলমারিতে সাজানো বইগুলো দেখছিল। ওপর থেকে নেমে লাইব্রেরিতে ঢুকেই তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চোখ টিপে রনোকে বললেন, ‘কি দেখছিস। লেনিনের বইও আছে, মার্কসের বইও আছে।’ তারপর কথা শুরু হলো। তিনি বললেন, ‘শোন। সিরাতুল মুশতাকিনের মানে বুঝিস? মানে হলো সিধা রাস্তা। আমি ঠিক করেছি সমাজতন্ত্র করে ফেলব। বিয়ের প্রথম রাতে বিড়াল মারার গল্প জানিস? আমি অলরেডি লেট। আর দেরি নয়। এবার সমাজতন্ত্র করে ফেলব। তোরা চলে আয় আমার সঙ্গে। আমি পাঞ্জাবি ক্যাপিটালিস্ট তাড়িয়েছি। তাই বলে মাড়োয়ারি ক্যাপিটালিস্ট অ্যালাও করব না। আমি ক্যাপিটালিজম হতে দেব না। আমি সোস্যালিজম করব। তোরা চলে আয় আমার দলে।’
আমাদের উত্তর ছিলÑ ‘সমাজতন্ত্রের জন্য তো আমরা ছাত্রজীবন থেকেই লড়াই করছি। এর জন্য আমাদের ডাকতে হবে না। যদি সত্যিই সমাজতন্ত্র করেন, আমরা থাকব। কিন্তু এখন যা চলছে তা সমাজতন্ত্র নয়। আপনি জানেন আমরা ভয়ও পাই না, প্রলোভনেও ভুলি না।’ তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তা তো জানি তোদের একটা নীতি আছে। তার জন্যই তো তোদের চাই।’ রনো বলল, ‘এভাবে যদি দেশ চলে তাহলে আমরা কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে নামব।’ তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘তোদের আগে আমিই নামব। যারা দেশটার সর্বনাশ করছে তাদের বিরুদ্ধে আমার আগে কে নামবে?’
এ-ধরনের অনেক কথাই হয়েছিল সে-রাতে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশ-সোভিয়েত সম্পর্ক, মস্কোপন্থি কমিউনিস্টদের কারসাজি, ন্যাপ, ভাসানী, সিরাজ শিকদারÑ এ-ধরনের বিবিধ প্রসঙ্গে যা এখানে লিখতে গেলে পরিসর অনেক বড় হবে। আমরা তাকে বিনয়ের সাথে বলেছিলাম, ‘আমরা বাকশালে যোগ দেব না। প্রকাশ্যেই থাকব। বাকি আপনার ইচ্ছা।’ তিনি শেষে বলেছিলেন, ‘যা, দেখ আমি কি করি। ওয়াচ অ্যান্ড সি।’
কিন্তু সেটার দেখার সুযোগ দেশবাসীর হয় নাই। ঘাতকের বুলেট তার বুক বিদীর্ণ করেছে। চরম নৃশংসতায় তারা সমস্ত পরিবারকে হত্যা করেছে। ঢাকা থেকে দূরে তার নিজ গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে তাকে তড়িঘড়ি দাফন করেছে। ভালোভাবে গোসল, কাফন, জানাজাও সেভাবে করতে দেয় নাই।
কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ সেই কবর থেকে তিনি নিজ মহিমায় ভাস্বর হয়ে রয়েছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। তার দৈহিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তিনি চিরজীবী হয়ে আছেন এদেশের মানুষের মধ্যে।

লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও ১৪ দলের নেতা

Category:

বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও বিনীত সালাম

Posted on by 0 comment

PMমোহাম্মদ নাসিম: আমার জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি হলোÑ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য অনুভব করা। এত বড় মহান নেতার স্নেহ ও সান্নিধ্য পাওয়া যে কোনো মানুষের জন্য গৌরবের। শহিদ মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার, অনেকবার স্নেহ-আদর পাওয়ার। আমি যখন পাবনায় ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম তখনই বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল; আমাদের বাসায়। এরপর এতবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মহাপ্রাণ মহাপুরুষ। তিনি হাজার মানুষের মধ্যে একজনকে একবার দেখলেও পরবর্তীতে কয়েক বছর পর দেখা হলেও চিনতে পারতেন। তার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। তিনি তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের তরুণ বা বৃদ্ধ যে-ই হোক, তাদের ডেকে কথা বলতেন। তিনি এমন নেতা ছিলেন পায়ে হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর কঠিন পরিশ্রম করে বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকার কাদা-মাটি ঘেঁটে আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে তিনি সাহসিকতা দেখিয়ে ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, আইয়ুবের সামরিক-বিরোধী আন্দোলন, ৬-দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির আলোকবর্তিকা। সততার মূর্ত প্রতীক। একটি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এই মহামানবের সাথে অনেক ঘটনা বা স্মৃতিচারণা আছে। একটি কথা সব সময় স্মরণ করি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত হৃদয়বান মহামানব। ১৯৬৮-৬৯ সালে আমি পাবনায় ছাত্রলীগ নেতা থাকা অবস্থায় নকশালের কিছু সন্ত্রাসী আমাকে পাবনায় ছুরিকাঘাত করে। আমি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলাম, তখন বঙ্গবন্ধু খবর পেয়ে আমার পিতা মনসুর আলীর সাথে যোগাযোগ করেন। আমাকে বিমানযোগে ঈশ^রদী থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তখনকার সিটি নার্সিং হোমে (প্রখ্যাত ডা. টিএসএম-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত) ভর্তি করান। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, আমি যখন নার্সিং হোমে ভর্তি হলাম, তার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে তিনি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে আমাকে দেখতে আসেন। তার সাথে শহিদ তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি তখন শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আমি তখন অঝরে কাঁদছি। এর চেয়ে বড় কিছু জীবনে আর হতে পারে না। হাসপাতালে থাকাবস্থায় তিনি একাধিকবার আমাকে দেখতে এসেছেন। শেখ কামালকে দিয়ে ফলমূল ও খাবার পাঠিয়েছেন। সন্তানের মতো খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি তার কর্মীদের সমস্যার কোনো খবর পেলেই ছুটে যেতেন, সহায়তা করতেন; সে যে পর্যায়ের নেতাকর্মীই হোক-না-কেন।
১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি এবং আমার পিতা শহিদ মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী। একদিন আমার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তখনকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল) ভর্তি করি। তখন বাবাকে একটি অপারেশন করানো হয়। ভোরবেলা বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে আসেন এবং ডাক্তারদের সাথে কথা বলেন, আমাদের সাহস দেনÑ অপারেশন এখানে যতœসহকারে করা হবে। সে-সময়কার অনেক নেতাকর্মী, যারা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং অনেক সাধারণ মানুষ আছেন, যারা বঙ্গবন্ধুর সাহায্য পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে সাহায্য পাননি এমন কোনো নেতাকর্মী নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এমন একজন সাহসী-সুদর্শন, ভরাট কণ্ঠের অধিকারী বাঙালি কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি ছিল। তার শত্রু হলেও তাকে অস্বীকার করার শক্তি কারও ছিল না। শুধুমাত্র কয়েকজন বেইমান ছাড়া।
আমি শহিদ মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে তার সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। তরুণ বয়স থেকেই ৩২ নম্বরে অনেকবার গিয়েছি। দুই পরিবারের একটি আত্মীয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সব সময় ছিল। বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা ছিলেন, তিনি তার সহকর্মীদের শুধু রাজনৈতিকই নয়, সকলের পারিবারিকভাবে খোঁজখবর রাখতেন। বঙ্গমাতাও খোঁজখবর রাখতেন। সেই গুণটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাও পেয়েছেন। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন কর্মীদের খোঁজখবর রাখেন, দুর্দিনে পাশে থাকেন, তখন সেই নেতার জন্য সহকর্মীরা জীবন দিতেও পিছপা হয় না। সে-জন্যই ’৭৫-এ জাতীয় চার নেতা জীবন দিয়েছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেইমানি করেন নি। আমার পিতা শহিদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধুকে এত বেশি ভালোবাসতেন যে, মনে হতো আমাদের থেকেও তিনি তাকে বেশি ভালোবাসতেন। সন্তানদের থেকেও বঙ্গবন্ধুর সাথে একাত্ম ছিলেন তিনি। শত প্রতিকূলতা ও প্রলোভন সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গ ত্যাগের সামান্য চিন্তাও তাকে স্পর্শ করেনি কখনও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর আমার বাবাকে দেখেছি অঝর-ধারায় কেঁদেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেনÑ প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুনি মোশতাকরা সে-সুযোগ দেয়নি। জাতীয় চার নেতাকে কারাগারেই হত্যা করা হয়। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। সেই সুযোগ তারা পেলে এদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধু তত বেশি সমুজ্জ্বল থাকবেন বিশ^বাসীর কাছে। সাহস, ধৈর্য ও ত্যাগের মূর্ত প্রতীক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে কাছ থেকে দেখা, কাছে যাওয়া, আদর পাওয়া অথবা ধমক খাওয়াও হলো একজন কর্মীর জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম স্মৃতি এবং উপলব্ধি হলোÑ বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শেষ হওয়ার নয়। অনেক স্মৃতি রয়েছে। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে কাজ করি। তার কাছে আমাদের ঋণ স্মরণ করতে চাই। ১৫ আগস্টের শোকাবহ মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও বিনীত সালাম।

লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, ­­­আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক

Category:

সপরিবারে কেন হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে

Posted on by 0 comment

PMমুনতাসীর মামুন: ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পেছনে রহস্য নেই’Ñ লিখেছিলেন শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী; কিন্তু ‘চক্রান্ত ছিল’। এই মন্তব্যের সত্যতা নিয়ে আজ আর দ্বিমত নেই। পরবর্তীকালের ঘটনাসমূহ এর উদাহরণ। বিশেষ করে লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান ও বিএনপির উত্থান তা প্রমাণ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে লাভবান হয়েছেন কে? জেনারেল জিয়া। প্রতিষ্ঠানিকভাবে, বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্র, পাকিস্তানপন্থি দলসমূহ। আন্তর্জাতিকভাবে সৌদি-পাকিস্তানি চক্র, আমেরিকা-চীন চক্র। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, যা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। পাকিস্তানের নির্দেশে ১৯৭১ সালে খুনিদের দলগুলোকে নিয়ে বিএনপির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন যাতে আরও যোগ দেন দেশবিরোধী রেনিগেড কিছু রাজনীতিবিদ। জাসদের হঠাৎ উত্থান বিশেষ করে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের পার্টির তাত্ত্বিক ও প্রধান হওয়াকে অনেকে মনে করেন এসব ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। আরেকটু পেছনের ইতিহাস দেখলে দেখব, ১৯৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুণ নেতাদের অনেকের প্রকাশ্যে তাজউদ্দীন আহমদের বিরোধিতা, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একাংশ ও আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্র। অথচ, বঙ্গবন্ধু তো ২৫ মার্চের আগে চার ছাত্রনেতা ও অন্য নেতাদের সব জানিয়ে গিয়েছিলেন। প্রয়াত নেতা কাজী আরেফ শাহরিয়ার কবিরকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেনÑ
“১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব সিরাজুল আলম খান এবং আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এক পর্যায়ে শেখ মনি ও তোফায়েলকে ডেকে নেন। আন্দোলন পূর্বাপর পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য পাকিস্তানি সামরিক শক্তির মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। জঙ্গি কর্মীবাহিনী তৈরি করে লড়াইয়ের উপযুক্ত ছাত্র-যুব শক্তি গড়ার কথা বলেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা চার যুবনেতা বা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান।”
এরপর ২১ তারিখেও একটি বৈঠক করেন এবং সেখানে তাজউদ্দীন আহমদকে উপস্থিত থাকতে বলেন। শেখ মুজিব যুবনেতাদের বলেন, “আমি না থাকলেও তাজউদ্দীনকে নিয়ে তোমরা সব ব্যবস্থা করো। তোমাদের জন্য অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।”
কাজী আরেফ আরও লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু কলকাতার একটি ঠিকানা দিয়ে তাদের বললেন, “এই ঠিকানায় গেলেই তোমরা প্রবাসী সরকার, সশস্ত্র বাহিনী গঠন, ট্রেনিং ও অস্ত্রশস্ত্রে সহযোগিতা পাবে। নেতাকে বলেন, তোমরা চারজন সশস্ত্র যুবশক্তিকে পরিচালনা করবে। আর তাজউদ্দীন প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব নেবে। তিনি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠনের কথা বারবার করে বলেন, বিপ্লবী কাউন্সিল প্রয়োজনে স্বাধীনতার পরও পাঁচ বছর থাকবে। তিনি কামারুজ্জামান ও সৈয়দ নজরুল ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকেও এই কথাগুলো জানিয়ে রাখেন।”
২২ মার্চ তিনি আবারও চার নেতাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, “কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তোমরা ঐ হায়েনাদের সাত দিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে তো? চার নেতা তাঁকে কথা দিয়েছিল?”
সুতরাং, অপরিণামদর্শী তিনি ছিলেন না। সবকিছুই ছকে নিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পারতপক্ষে একজনকে আরেকজনের কথা জানান নাই। বিপ্লবী দলের পরিকল্পনা যেভাবে ছকা হয় সেভাবেই সব ছকে ছিলেন। কাজী আরেফের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন সূতারের বক্তব্যের মিল আছে।
চিত্তরঞ্জন সুতারের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন শাহরিয়ার। সূতার তাকে জানিয়েছেন, ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ইন্দিরা গান্ধীর “সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের সাহায্যের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য যে আলোচনা করেছিলেন সেখানে বিএলএফ নেতাদের সম্ভাব্য গেরিলা প্রশিক্ষণের বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল।”
১৯৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি বিষয়টি জানানো হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদকে। ২৫ মার্চের আগে বঙ্গবন্ধু সূতারকে পাঠিয়েছিলেন কলকাতায় দুটি বাড়ি ভাড়া করার জন্য, যাতে সময় এলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ সেখানে জড়ো হয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। যাক সে প্রসঙ্গ। জিয়া ও বিএনপি প্রসঙ্গে আসি।
১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের পর ঘাতকদের বিচার বন্ধ করতে ইনডেমনিটি জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক। আর জিয়াউর রহমান সেই অধ্যাদেশটিকে পঞ্চম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত করেন। ঘাতকদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পুরস্কার ও এনাম দানের পালা অব্যাহত ছিল। আরও কৌতূহলের বিষয় যে, খন্দকার মোশতাক ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে এক গেজেট নোটিফিকেশনে জেলহত্যা তদন্তের জন্য তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেন, জিয়াউর রহমান সেই তদন্ত কমিটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। বিএনপি ও তার সহযোগীরা বরাবর ১৫ আগস্টকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলেও চালিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু এটি যে সর্বৈব মিথ্যা, পরবর্তী ঘটনাবলিই তার সাক্ষী। সোহরাব হাসান যথার্থই লিখেছেন, বিরুদ্ধবাদীরা বলেন, আওয়ামী লীগই না-কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেছিল। যদি সেটাই সত্য হয়ে থাকে জিয়াউর রহমানের দল কেন মুজিব হত্যার দায় কাঁধে নিচ্ছে? আওয়ামী লীগের যে অংশ ১৫ আগস্ট চক্রান্তে জড়িত ছিল তারা এখন কোথায়? খন্দকার মোশতাক মারা গেলেও তার সব সহযোগী মারা যান নি। তারা কি আওয়ামী লীগ করছেন না অন্য পার্টি করছেন? ১৫ আগস্টকে যারা ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করত, তারাই বা কোন দলের? বিদেশে মুজিব হত্যাকারীদের পাসপোর্ট করে দিয়েছে কোন সরকার? (যুগান্তর, ১৫.০৮.২০০৫)।
১৫ আগস্ট সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক লরেঞ্জ লিফসুলজ বলেছেন, কিসিঞ্জার ও সিআইএ এই হত্যাকা-ের উদ্যোক্তা। কিছুদিন আগে ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচিন্স একটি বই লিখেছেন, নাম ‘ট্রায়াল অন হেনরি কিসিঞ্জার’। হিচিন্স নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করেছেন, কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরের সময় মার্কিন দূতাবাসে বসেই ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘গো এহেড’ সিগনাল দেন।
ভারতের প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তী বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার দু-মাস পরই লিখেছিলেন, বিশ্বের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে মার্কিন ক্লায়েন্ট সরকার স্থাপন করতে হবে। মাধ্যম হবে ঘুষ, ব্ল্যাকমেইল ও হত্যা।
কিসিঞ্জার যে বেইজিংয়ে মাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন বা ঢাকাতে যে জঘন্য কা- ঘটেছে এটি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই হত্যাকারীরা যেভাবে সহজে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানে আশ্রয় পেল, তা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ছিল এই হত্যাকা-ের পেছনে।
ইন্দিরা গান্ধী তখন ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণ, জর্জ ফার্নান্দেজ প্রমুখ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তারা একে আখ্যায়িত করেছেন ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ বলে। ইন্দিরা গান্ধী সিপিআই নেতা ভুপেশ গুপ্তকে তখন বলেছিলেন, বিরোধীরা শুধু তার মৃত্যু নয়, তার সরকার অর্জিত সব সুফলকেও ধ্বংস করতে চায় এবং এর পেছনে অভ্যন্তরীণ প্ররোচনা ছাড়া বহিঃশক্তির ইন্ধনও আছে।
ইন্দিরা গান্ধীর সেই অনুমান ভুল বলি কীভাবে, যখন দেখি ‘বিপ্লবী’ ফার্নান্দেজ মহানন্দে চরম গণবিরোধী বিজেপি সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন।
মোহিত সেন লিখেছেন, সে-সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের একটি চিঠি নিয়ে কুৎসোবিন এলেন দিল্লি। কুৎসোবিন সোভিয়েত পার্টি হয়ে ভারতীয় ডেস্ক দেখতেন। তিনি সিপিআই নেতৃবৃন্দের কাছে সেই চিঠি ও কিছু দলিলপত্র হস্তান্তর করেন। চিঠির একটি কপিও করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল পড়ার পর তা ধ্বংস করে ফেলতে। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ স্থাপনে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। উপমহাদেশের তৎকালীন সেই তিনি নেতা হলেনÑ ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো। মস্কো থেকে প্রেরিত সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রথম দুজন নেতাকে ইতোমধ্যে এ ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়েছে। সিপিআই নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তারা যেন প্রভাব খাটিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে বোঝান ষড়যন্ত্রের বিষয়টি হালকাভাবে না নিতে। কুৎসোবিন আরও জানিয়েছিলেন, ভুট্টোকে বিষয়টি সরাসরি জানানো হয়নি। কারণ ভুট্টো কমিউনিস্টদের বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বলে রাখা ভালো, ভুট্টো বিশ্বাস করতেন মার্কিনীদের। কিছুদিন পর জানিয়েছেন, মোহিত সেন, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সই করা একটি চিঠি এলো ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের কাছে। ক্যাস্ট্রো জানিয়েছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা মার্কিন ষড়যন্ত্র চলছে। কেউই গুরুত্বসহকারে তা নেননি। মোহিত সেন অবশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নি যুক্তরাষ্ট্রই ছিল এর হোতা। তবে ইঙ্গিতটি স্পষ্ট সোভিয়েত এই ষড়যন্ত্র করেনি, করলে কুৎসোবিনকে দিল্লি পাঠানো হতো না। তাহলে বাকি থাকে আমেরিকা ও তার ক্লায়েন্ট স্টেট পাকিস্তান।
উপমহাদেশে সপরিবারে প্রথম নিহত হন বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা। এতে ভুট্টো সহায়তা করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। স্ট্যানলি ওলপোর্ট ভুট্টোর যে জীবনী লিখেছেন তাতে এর ইঙ্গিতও স্পষ্ট [প্রমাণসহ]। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বিশ্ব পরিকল্পনা নস্যাৎ করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হলোÑ এটি নিক্সন-কিসিঞ্জার মানতে পারেন নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল পাকিস্তানের জন্য চপেটাঘাত। এটি ভুট্টো ও পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর পর ভুট্টোকেও যেতে হয়। মার্কিন তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা [দুই জিয়া] ক্ষমতায় আসে এবং মার্কিনী সাহায্যে এক দশক ক্ষমতা থাকে। এর আগে একই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল চিলিতে। আলেন্দেকে হত্যা করে পিনোচেটকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু কী তাকে হত্যা ষড়যন্ত্র জানতেন না? জানতেন। ভারত ও সোভিয়েত সূত্র থেকে তাকে তা জানানো হয়েছিল। সেই আমলে বাংলাদেশে যারা গুরুত্বপূর্ণ আমলা ছিলেন (গোয়েন্দা বিভাগেও) তাদের কাছ থেকেও জেনেছি, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করেন নি। তারা তখন তাকে ৩২ নম্বরের বাসভবন ছেড়ে গণভবনে এসে থাকার অনুরোধ করেছিলেন। তাতে তিনি খানিকটা সম্মতও হয়েছিলেন। কিন্তু বেগম মুজিব ৩২ নম্বর ছেড়ে যেতে না চাওয়ায় তিনি আর গণভবনে যেতে চাননি। তাছাড়া বিষয়টিকে তিনি হালকাভাবে নিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্যও তার মনে হয়নি কোনো বাঙালি তাকে খুন করতে পারে। কারণ তার ভাষায়, “আমি আমার দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসি, তারা আমায় ভালোবাসে।” রবীন্দ্রনাথের ভক্ত শেখ মুজিব রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাও বিশ্বাস করেন নিÑ “৭ কোটি মানুষকে বাঙালি করেছ… মানুষ করনি।”
বিএনপি আমলে এমন কী শেখ হাসিনার আমলেও সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে বলা হতো এবং অনেক বিএনপি-জামাত অ্যাপলজিস্ট ও ‘নিরপেক্ষ’রা বলতেন এবং বলেন, একদল বিপথগামী সেনাসদস্য শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় দু-ডজন সেনা কর্মকর্তার আত্মস্মৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই ফারুক-রশীদদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন। এমন কী জিয়াউর রহমানও কিন্তু কেউ বঙ্গবন্ধুকে জানান নি। [বিস্তারিত আমার লেখা ‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন]।
৩৪ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়ে রায় হয়েছে। এ বিচারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার। গত ৩৪ বছর বিএনপি ও পাকিস্তানপন্থিরা যে প্রচারণা চালিয়েছিল, তার মূল কথা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা একটি তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা। তাদের এ প্রচারণার লক্ষ্য ছিল ঘাতকদের রক্ষা এবং সমাজের সর্বস্তরে পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবে মামলায় যেসব নথিপত্র উত্থাপন করা হয়েছে তার আলোকে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু হত্যা, জাতীয় চার নেতা হত্যা ও সংবিধান পরিবর্তন এবং সিভিল সমাজের কর্তৃত্ব অপনোদনÑ সব এক সূত্রে গাঁথা। এসব ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল, তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গবন্ধু যে শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন তা তো নয়। তিনি ছিলেন একটি নতুন আদর্শেরও প্রতীক। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য এটি পছন্দ করেনি। মার্কিন ডিকটেক্ট ও চীনাদের মার্কিন ও পাকিস্তান প্রীতিকে নস্যাৎ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি দেশ স্বাধীন করেছিল এটি তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। যে কারণে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে সবচেয়ে বড় গণহত্যার বিষয়টি মার্কিন ও ইউরোপীয় বইপত্রে উপেক্ষা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রধান কৃতিত্ব ছিল সশস্ত্রদের ওপর নিরস্ত্র বা সিভিল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যা সেই আমলের সেনা সদস্যদের পছন্দ হয়নি। তাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রে তাদের কর্তৃত্ব থাকবে। বেসামরিক আমলাতন্ত্রও বাকশাল হলে কর্তৃত্ব হারাত। এমনিতেও তাদের কর্তৃত্ব হ্রাস পাচ্ছিল। অতি বামরাও বঙ্গবন্ধুকে সরানোর জন্য ভুট্টোর সাহায্য চেয়েছিল এবং দেশেও ‘বিপ্লব’-এর নামে অরাজকতার সৃষ্টি করেছিল। এ সমস্ত মিলে তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কারণ ছিল দুটিÑ এক. যেন তার পরিবারের কাউকে কেন্দ্র করে আবার সেই আদর্শ উজ্জীবিত না হয়, দুই. এমন আতঙ্ক সৃষ্টি যাতে কেউ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দাঁড়াতে সাহস না পায়।
এ উদ্দেশ্য দুটির কোনোটিই সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হয়েছে, তাদের পৃষ্ঠপোষক বা দল বিএনপি-জামাত হীনবল হয়েছে। কিন্তু, তাতে কি সেই ষড়যন্ত্রের শেকড় উৎপাটিত হয়েছে? হয়নি। এবং সে কারণেই শেখ হাসিনাকে ২২ বার খুনের চেষ্টা করা হয়েছে। ভেবে দেখুন, পরাজিত পাকিস্তানপন্থিদের কাউকে একবারও হত্যার চেষ্টা হয়নি [এবং আমরা সমর্থনও করি না]। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু বা তার আদর্শের শত্রুদের ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই।
বঙ্গবন্ধুর বিচার সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কেন, কারা এবং কী কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা হত্যা করল সে-সম্পর্কে এখনও আমাদের জ্ঞান সীমিত। এ কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্র উদঘাটনে একটি কমিশন হওয়া উচিত, যাতে ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কেনেডি হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ারেন কমিশন গঠিত হয়েছিল। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে দেখেও আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। ঐ রায়ের পরও দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র বিনাশ হবে বলে মনে করি না। এর সর্বশেষ উদাহরণ প্রিয়া সাহা। ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড় অনেক গভীরে।

Category:

ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিব

Posted on by 0 comment

PfcMড. এম আবদুল আলীম: (গত সংখ্যার পর)
ভাষা-আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং অন্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কারাবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানের আলাপ-আলোচনা ও দিক-নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। বদরুদ্দীন উমর, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আহমদ রফিকসহ অনেকেই এর বিপক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে মহিউদ্দিন আহমেদ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, কামরুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদ, এম আর আখতার মুকুল, শেখ আব্দুল আজিজ, জিল্লুর রহমান, কে. জি. মুস্তাফা, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ ভাষাসংগ্রামী এবং মযহারুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, হারুন-অর-রশিদ, মুনতাসীর মামুন, আবু আল সাঈদ, নূহ-উল-আলম প্রমুখ গবেষক এর পক্ষে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বদরুদ্দীন উমর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থের তৃতীয় খ-ে নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে ভূমিকার কথা অলি আহাদের বক্তব্য-সূত্রে পরোক্ষভাবে স্বীকার করলেও; পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায় তা সরাসরি নাকচ করে দেন। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো : “শেখ মুজিব ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, যে সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে বিপুল সংখ্যায় গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র অনেক সদস্য আত্মগোপন করে আছেন। এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি লাভ থেকেই প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন ভাষা আন্দোলনে তারও কোন ভূমিকা ছিল না এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মুক্তি দেওয়াটা সরকার নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিপজ্জনক কিছুই মনে করেনি।” বদরুদ্দীন উমরের এ বক্তব্য খ-িত। কারাগারে ছাত্রনেতারা যে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে ভাষা-আন্দোলনে দিকনির্দেশনা নিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিদান প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন, ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী ভাষা-আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে জেলখানা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়ে বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্যকে যুক্তি দ্বারা খ-ন করেছেন একুশের গান রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা প্রদান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : ‘ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের আগে থেকেই শেখ মুজিব জেলে ছিলেন। তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী জেল থেকে তার অনুগত সেপাইদের মাধ্যমে ছাত্রলীগের ও আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাদের কাছে গোপনে চিঠিপত্র পাঠিয়ে আতাউর রহমান-শামসুল হক গ্রুপের আন্দোলন-বিমুখতা সম্পর্কে সতর্ক করতে শুরু করেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে সরকার যদি ১৪৪ ধারা জারি করে, তাহলে আওয়ামী লীগ কমান্ডের নির্দেশ যাই হোক, ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা যাতে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়, সেই পরামর্শ দিতে থাকেন। সরকারি গোয়েন্দারা যখন টের পেল যে, শেখ মুজিব জেলে বসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তার দল ও অনুসারীদের উৎসাহিত করছেন, তখন আকস্মিকভাবে তাকে ১৫ অথবা ১৬ তারিখে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।… ফরিদপুর জেলে বসেও তিনি চিরকুট পাঠান, যেটি একুশ তারিখে একটু দেরিতে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে পৌঁছে।’
বদরুদ্দীন উমরের প্রত্যেকটি মত বিভিন্ন যুক্তি দ্বারা খ-ন করে একুশের গান রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আরও লিখেছেন : ‘উমরকে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না। বায়ান্ন সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারেকাছেও তিনি ছিলেন না।… একটি আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলে পদে পদে যে ভুল হয়, ১৪৪ ধারা সম্পর্কে উমরের বালখিল্য উক্তিই তার প্রমাণ।’
আবদুল মতিন এবং আহমদ রফিক নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত থাকা এবং ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টিকে ‘ইতিহাসের কল্পকাহিনী’ বলে অভিহিত করে লিখেছেন : ‘একুশের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অথচ দীর্ঘকাল পর বৃথাই একুশের আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে ‘মিথ’ তৈরির চেষ্টা চলছে, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, সে চেষ্টা এখনো চলছে এবং এজন্য দায়ী কয়েকজন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি। এতে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে।’ আহমদ রফিক তার ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তরপ্রভাব (২০১৭) গ্রন্থে আগের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করে লিখেছেন : ‘দীর্ঘকাল পর বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) ভূমিকা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সঠিক তথ্য-নির্ভর ইতিহাস নয়। কেউ বলেছেন ‘১৪৪ ধারা ভঙ্গের নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন’ কেউ বলেন পরিষদ ভবন ঘেরাওয়ের পরিকল্পনা তারই, আবার কেউ দাবি করেছেন ‘আন্দোলনের কর্মসূচি তাঁর কাছ থেকেই এসেছে’। দাবিগুলো এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে এসেছে যারা কমবেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।’
আহমদ রফিক ও আবদুল মতিনের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, আছে ঢালাও মন্তব্য। তাঁরা বলতে চেয়েছেন যে, ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে কেন অসুস্থ অবস্থায়ই ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত হলেন না? তাঁদের দাবি ভাষা-আন্দোলন ‘তখনও চলছে’। এবং ২ মাস পর ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তব্য দেন, তার ফলে তাঁরা ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে তাঁর যুক্ত না থাকার ‘ঘটনা সঠিক’ বলে মনে করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন। তাদের এ বক্তব্য খ-ন করার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
প্রথমত, তারা বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান ২৬শে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ তথ্য ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ঐ সময়কার ইত্তেফাক, ইনসাফ প্রভৃতি পত্রিকায় তার মুক্তির সংবাদ ছাপা হয়। ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নিরাপত্তা বন্দী জনাব মুজিবর রহমানের মুক্তিলাভ’ শিরোনামের সংবাদে বলা হয় : ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র হইতে ঘোষণা করা হইয়াছে যে, বিখ্যাত নিরাপত্তা বন্দী জনাব মুজিবর রহমান খানকে [ভুলবশত খান বলা হয়েছে] গতকাল মুক্তি দান করা হইয়াছে।’ অর্থাৎ, শেখ মুজিব কারামুক্ত হন ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। প্রকৃতপক্ষে, ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তো ভাষা-আন্দোলন চলমানই ছিল না, তাতে শেখ মুজিবুর রহমান যোগ দেবেন কী করে? ২৫ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় ‘২৬.২.৫২ তারিখ থেকে সাধারণ ধর্মঘট প্রত্যাহার’ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা ‘শহরের সর্বত্র স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু’ হয়।
দ্বিতীয়ত, ফরিদপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় এবং কারামুক্ত হয়ে তিনি ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে নীরব ছিলেন না। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা ও শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং আনিসুজ্জামানের স্মৃতিকথা থেকে এ তথ্য জানা যায়। ঢাকায় গুলিচালনা ও ধরপাকড়ের সংবাদ শুনে শেখ মুজিবুর রহমান অতিশয় মর্মাহত হন এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দেন। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেন এবং কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় এসে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন এবং কারাবন্দিদের মুক্তির দাবি করেন। তিনি করাচিতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে বন্দিদের মুক্তির দাবি জানান। এছাড়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বিবৃতি প্রদান করান। তিনি সংবাদ সম্মেলন করে পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর করেন।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা অলি আহাদ (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেন) ভাষা-আন্দোলনের দুই পর্বেই প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো এবং ভাষা-আন্দোলন নিয়ে কথা-বার্তা চলত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন : ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫০ সালের ১লা জানুয়ারী হইতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। চিকিৎসার কারণে সরকার তাঁহাকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযোগ গ্রহণ করিয়া আমরা তাঁহার সহিত হাসপাতালেই কয়েক দফা দেখা করি। তিনি ও নিরাপত্তা বন্দী মহিউদ্দিন আহমেদ ১৬ই ফেব্রুয়ারী হইতে মুক্তির দাবীতে অনশন ধর্মঘট করিবেন, সেই কথা শেখ সাহেবই আমাদিগকে জানাইয়াছিলেন।… ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে শেখ মুজিবর রহমানকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয় এবং এই ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে ফরিদপুর যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে নারায়ণগঞ্জ নেতৃবৃন্দের সহিত শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ ঘটে।’
শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা হয়েছিল তখনকার মেডিকেল কলেজের শেষবর্ষের ছাত্র মির্জা মাজহারুল ইসলামের। তিনি শেখ মুজিবের পূর্বপরিচিত ছিলেন তাই হাসপাতালে একাধিকবার তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। ঐ সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন : ‘১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা বন্দী অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমি তখন এই কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। দোতলায় ৮ নম্বর ওয়ার্ড-সংলগ্ন একটি কেবিনে তিনি থাকেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করলাম। রাউন্ড দেয়ার সময় প্রফেসরদের সঙ্গে আমরা যেতাম কিন্তু আমাদেরকে কেবিনে প্রবেশ করতে দিত না। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পূর্ব সম্পর্ক ছিল। কলকাতায় আমাদের মাঝে প্রথম পরিচয় হয়, পরে ঢাকা এসেও বহু বার দেখা হয়েছে। একদিন বঙ্গবন্ধু ‘এই মির্জা’ বলে আমাকে ডেকে তাঁর কেবিনের জানালার কাছে নিয়ে যান এবং ভাষা আন্দোলনের খোঁজখবর নেন। তিনি আমাকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
তখনকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ভাষাসংগ্রামী ও গবেষকের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ‘ছাত্রনেতারা গোপনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) সাথে দেখা করতেন। তাঁর মুক্তির জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিবৃতি দেন। নাইমউদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা দেখা করেন এবং তাঁরা ভাষা আন্দোলন বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। সরকার তাঁকে হাসপাতালে বসে রাজনীতি করার অপরাধে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে এবং তাদের সুপারিশে তাঁকে অনেকটা সুস্থ বলে ঘোষণা দিয়ে আবার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালে তিনি ও মহিউদ্দিন আহমেদ চিঠি দিয়ে সরকারকে জানান, ১৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি না দিলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা অনশন ধর্মঘট শুরু করবেন।’
এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক পক্ষ বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে বাহ্বা নিতে চেয়েছেন; অন্য পক্ষ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সকল কৃতিত্ব তার কাঁধে তুলে দিতে চেয়েছেন। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং তাঁর সম্পর্কে প্রণীত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনসমূহ প্রকাশের পর ভাষা-আন্দোলনে তার ভূমিকা কী ছিল, তা দিবালোকের মতো সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের যোগাযোগ হয়েছে, সরাসরি কথা হয়েছে এবং তিনি আন্দোলন সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এবং সে নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ও ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পথেÑ নারায়ণগঞ্জে।
তাছাড়া কারাগার থেকে চিঠির মাধ্যমে, টেলিগ্রামের মাধ্যমে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পথে নারায়ণগঞ্জে এবং চিরকুট পাঠিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন এটিও সত্য। ভাষা-আন্দোলনে তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন, এটা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কর্মকা-, বক্তৃতা-বিবৃতি ও সমকালীন পত্র-পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করলেই প্রমাণিত হয়।
কারাগারে বসে তিনি এবং মহিউদ্দীন আহমদ ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করলে ভাষা-আন্দোলনে কর্মসূচিতে আসে উৎসাহ ও প্রেরণা। তাদের মুক্তির দাবি যুক্ত হয়ে ভাষা-আন্দোলনের কর্মসূচি ভিন্নমাত্রা পায়। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের সভায় যেসব প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি যুক্ত ছিল। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা হয়। ঐদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দারি করে পোস্টারও দেওয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয় : “উরফ ুড়হধষ ফঁঃু রহ ঃযব ঝঁঃৎধঢ়ঁৎ চ. ঝ. ধৎবধ রিঃয ড/ঈ গফ. ণধংঁভ ড়হ ১৯.২.১৯৫২ ধহফ ঃযরং সড়ৎহরহম (২০.২.৫২) ধ ইবহমধষর ষবধভষবঃ ঁহফবৎ যবধফরহম “ঐঁহমবৎ ঝঃৎরশব ড়ভ ঝযবরশয গঁলরনধৎ জধযসধহ” ধহফ গধযরঁফফরহ ধিং ভড়ঁহফ ঃড় নব ফরংঃৎরনঁঃবফ ধঃ ফবভভবৎবহঃ ঢ়ষধপবং ড়ভ উধপপধ ঈরঃু.” এছাড়া তাদের মুক্তির জন্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভায় আবেদন করা হয়।
সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় : ‘পাকিস্তান সংগ্রামের জঙ্গী কর্মী, ছাত্র-যুব আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাস ও বন্ধ দিনগুলির নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে জীর্ণ স্বাস্থ্যের জন্য উৎকণ্ঠার ও ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলিয়া প্রদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই প্রদেশের সকল রাজনৈতিক কর্মীÑ বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের আশু মুক্তির প্রশ্নে পূর্ববঙ্গ পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক আবেদনপত্র পেশ করিয়াছেন। স্বাক্ষরকারীগণ বলেনÑ সর্বশক্তি নিয়োজিত করিয়া আপনারা পাকিস্তানে আইন ও নীতির শাসন, সৌভ্রাতৃত্ব ও গণতন্ত্র কায়েম করুন।… আসুন আসুন, আপনারা পরিষদের ভিতরে আর আমরা বাহিরে পূর্ববঙ্গের রাজবন্দীদের বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তুলি।’ কেবল রাজপথ এবং সভা-সমাবেশে নয়, বঙ্গীয় আইন পরিষদেও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি তোলা হয়। তার ‘অনশন পালন বিষয়ে আলোচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বিলিতে আনোয়ারা খাতুন এমএলএ মুলতবি প্রস্তাব পর্যন্ত উত্থাপন করেছিলেন।’
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘মানবতার নামে’ শীর্ষক এক পৃথক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের মুক্তির দাবি জানান। রাজবন্দিদের অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন : ‘আমি জানিতে পারিয়াছি য়ে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হইতে নিরাপত্তা বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ আনশন ধর্মঘট শুরু করিয়াছেন। জনসাধারণ অবগত আছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন হইতে মারাত্মক রোগে ভুগিতে ছিলেন এবং কিছুদিন পূর্বে চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও স্থানান্তরিত করা হইয়াছিল। কিন্তু তাঁহাকে রোগ মুক্তির পূর্বেই আবার জেলে প্রেরণ করা হয়। মহিউদ্দিনের স্বাস্থ্যও দ্রুত অবনতির দিকে যাইতেছে। এমতাবস্থায় আমরা সহজেই বুঝিতে পারিতেছি যে, এই অনশন ধর্মঘট তাঁহাদের ভগ্ন স্বাস্থ্যের পরিণতি ঘটাইবে। তাঁহাদিগকে আটক রাখার সম্বন্ধে কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাব দেখিয়া আমি অত্যন্ত মর্মাহত হইয়াছি। আমি মানবতার নামে সরকারের নিকট এই আবেদন করিতেছি যে তাঁহারা মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনকে মুক্তিদান করেন।’
২৭ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে অত্যন্ত অসুস্থ শরীরেও তিনি গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণে প্রাণহানির ঘটনায় মর্মাহত হয়ে বিবৃতি পাঠান এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে এসে নিরাপত্তা-বন্দিদের মুক্তি দাবিতে বিবৃতি দেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : “আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যাঁরা ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম। সরকার যে বলেছেন, বিদেশী কোন রাষ্ট্রের উস্কানিতে এই আন্দোলন হয়েছে, তার প্রমাণ চাইলাম। ‘হিন্দু ছাত্ররা’ কলকাতা থেকে এসে পায়জামা পরে আন্দোলন করেছে, একথা বলতেও কৃপণতা করে নাই মুসলিম লীগ নেতারা। তাদের কাছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছাত্রসহ পাঁচ ছয়জন লোক মারা গেল গুলি খেয়ে, তারা সকলেই মুসলমান কি না? যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বইজন মুসলমান কি না? এত ছাত্র কলকাতা থেকে এল, একজনকেও ধরতে পারল না যে সরকার, সে সরকারের গদিতে থাকার অধিকার নেই।”
১৯৫২ সালের ২৭ এপ্রিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। ‘জনাব মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় সরকারের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি বলেন জনসাধারণের ন্যায্য দাবী আন্দোলনকে সরকার রাষ্ট্রের ও এজেন্টদের বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন : এরাও দুশমনের উপর গণআন্দোলন সৃষ্টি করেছেন। আমার বিশ্বাস শত শত মানুষ আমাদের অনুসরণ করিতেছেন। তার মতে রাষ্ট্রে এর চেয়ে আর কোন আইন থাকতে পারে না।’
১৯৫২ সালের জুন মাসে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন আদায় করেন এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাকে দিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করান। বিবৃতিটি ১৯৫২ সালের ২৯শে জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিব লিখেছেন : “একটা অনুরোধ করলাম, তাঁকে লিখে দিতে হবে যে, উর্দু ও বাংলা দুইটাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে তিনি সমর্থন করেন। কারণ অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। মুসলিম লীগ এবং তথাকথিত প্রগতিবাদীরা প্রপাগা-া করছেন তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই লিখে দেব, এটা তো আমার নীতি ও বিশ্বাস।’ তিনি লিখে দিলেন।” করাচিতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ভাষা-আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের সাংবাদিক সম্মেলনের পর তা দূর হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন : ‘খাজা সাহেব ও লাহোরের শহীদ সাহেবের ভক্তরা প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করলেন।… প্রেস কনফারেন্সে সমস্ত দৈনিক কাগজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এমনকি এপি’র প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। আমার বক্তব্য পেশ করার পরে আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, আমি তাঁদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিলাম। আমরা যে উর্দু ও বাংলা দু’টাই রাষ্ট্রভাষা চাই, এ ধারণা তাঁদের ছিল না। তাঁদের বলা হয়েছে, শুধু বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করছি আমরা।’
ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান আরেকটি সাংবাদিক সম্মেলন করে পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার এক সংবাদে বলা হয় : ‘জনাব রহমান [শেখ মুজিবুর রহমান] প্রকাশ করেন যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানে যথেষ্ট ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হইয়াছিল, কিন্তু সমস্ত খুলিয়া বলিবার পর সে ভ্রান্তি তাহাদের দূর হইয়াছে। তিনি বলেন, পাশ্চিম পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা আজ আর বাংলার দাবীকে অন্যায় মনে করে না। তাহাদের অধিকাংশই আজ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবীকে সমর্থন করেন। জিন্না আওয়ামী লীগের মামদোতের খান, মানকীর পীর প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ বাংলার দাবীর প্রতি কিরূপ মনোভাব পোষণ করেন তাহা জিজ্ঞাসা করা হইলে জনাব রহমান বলেন তাহা আমি বলিতে পারিনা।’
১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন সফরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ‘মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।’ এতে বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা যেমন প্রকাশিত হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে যারা যোগদান করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন ভারতের মনোজ বসু। চীনের শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রদান প্রসঙ্গ এবং বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা উচ্চে তুলে ধরে পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন : ‘মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা হলো মাঝে আরও কতকগুলো হয়ে যাবার পর।… ছিয়াশি জন বক্তার মধ্যে বাংলায় মোট দু’জনÑ পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান আর ভারতের এই অধম।’ চীন সফরের সেই স্মৃতি স্মরণ করে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।… কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করলেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা।… আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”
১৯৫২ সালের ২০ নভেম্বর আরমানিটোলা ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত ঐ জনসভায় বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা কামারুজ্জামান, দেওয়ান মাহবুব আলী, ইব্রাহিম ত্বাহা, সুলেমান খান, আশরাফ ফারুকী, মুহম্মদ এমাদুল্লাহ, গাজীউল হক প্রমুখ। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আরমানিটোলা মাঠে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আরও একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বন্দিদের মুক্তি ও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। দৈনিক আজাদ পত্রিকা থেকে জানা যায় : ‘গতকল্য (শুক্রবার) অপরাহ্ণে আরমানীটোলা ময়দানে পূর্ব্ব পাকিস্তান সর্ব্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম্মপরিষদের উদ্যোগে “বন্দীমুক্তি দিবস” উপলক্ষে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগের সহঃ সভাপতি জনাব আতাউর রহমান। সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে প্রাদেশিক আওয়ামী মোছলেম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, গত ভাষা আন্দোলনে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন সরকার তাঁহাদের সকলকে বিনা বিচারে জেলে আটক রাকিয়াছেন।… সর্ব্বশেষে সভায় গৃহীত একটি প্রস্তাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে এবং অন্যান্য কারণে বিনা বিচারে আটক সকল রাজনৈতিক বন্দীর অবিলম্বে বিনা শর্তে মুক্তি দাবী করা হয়। অপর একটি প্রস্তাবে বিনা বিচারে আটক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং অন্যান্য রাজবন্দীর স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয়া পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ এবং সরকারের জেলনীতির তীব্র নিন্দা করা হয়। আর একটি প্রস্তাবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান হয়।’
১৯৫৩ সালের শুরু থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন এবং উর্দুকে বয়কট করার ব্যাপারে সোচ্চার হন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ‘ঢাকার এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, এ দেশ জুড়ে উর্দু বয়কট করার জন্য আন্দোলন শুরু করা হবে।’ এ বছর ৫ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার একটি জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘বক্তৃতার সময় শেখ মুজিব বলেন, বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এখানকার স্কুল-কলেজে নূরুল আমীন সরকার উর্দু চালু করেছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান তার স্কুল-কলেজে বাংলা চালু করেনি। তারা যদি বাংলাকে না মেনে নেয়, তাহলে কয়েকমাস পর আমরাও উর্দুকে বয়কট করব।’
ভাষা-আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস পালনের আহ্বান জানান। ঐদিন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ঢাকার সর্বস্তরের মানুষ প্রভাতফেরি, শোভাযাত্রা, শহিদদের কবর জিয়ারত এবং আলোচনা-সভার আয়োজন করে। এতে নেতৃত্ব দেন আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুব এবং ছাত্রলীগ নেতা এম এ ওয়াদুদসহ অনেকে। ভাষা আন্দোলনের বর্ষপূর্তির সংবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়। ঢাকা প্রকাশ-এ শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলা হয় : “আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সেক্রেটারী জনাব মুজিবুর রহমান সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন যে, গত বৎসর ঠিক এমন দিনে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সাড়ে চার কোটি অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে আজাদ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার দাবীতে ঢাকা শহরে ছাত্র ও জনসাধারণ নির্ভীকভাবে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়াছে। তাহারা সেই দিন যে নতুন ইতিহাস রচনা করিয়াছে, সমগ্র জাতি তাহা চিরদিন শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করিবে। ২১শে ফেব্রুয়ারীকে তিনি ‘জাতীয় কারবালা দিবস’ বলিয়া অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, আজ পাকিস্তান সরকারের সম্মুখে শুধুমাত্র দুইটি পথ খোলা রহিয়াছে। হয় তাঁহারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলিয়া মানিয়া লইবেন, নতুবা গদি ছাড়িবেন। তিনি সকল রাজবন্দীর আশু মুক্তি এবং নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার করিবার জন্যও দাবী জানান।” শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের দাবি তোলেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা সম্পর্কে বলা হয় : “দায়ী ব্যক্তি (শেখ মুজিবুর রহমান) ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’-এ বিশেষ নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেন। ২১.২.৫৩ তারিখে ঢাকার একটি জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন যে, পূর্ববাংলার ‘উর্দু’ বয়কট করার জন্য প্রদেশব্যাপী দাবি বা আন্দোলন দিবস পালন করা হবে। ২১.২.৫৩ তারিখ ‘শহীদ দিবস’ উপলক্ষে তিনি ঢাকায় একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেন।” ঐ দিনের বক্তৃতায় ‘যতদিন বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না পাবে, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য সবার প্রতি তিনি আহ্বান জানান।’
২১শে ফেব্রুয়ারির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে গাজীউল হক গেয়েছিলেন তার গান : ‘ভুলব না, ভুলব নাÑ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না!’ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধেই তিনি গানটি ঐ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে গাজীউল হক লিখেছেন : ‘সভায় জনাব শেখ মুজিবুর রহমান-এর অনুরোধে ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা আমার গানটি আমাকে গেয়ে শোনাতে হয়। এখানে বলা প্রয়োজন, ১৯৫৩-৫৪-৫৫ সালে যে গানটি গেয়ে প্রভাতফেরি করা হতো সে গানটি লিখেছিলাম আমি। গানটির প্রথম লাইন ছিল, ‘ভুলব না, ভুলব নাÑ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না!’ সময়ের প্রয়োজনে এ গানটি লিখেছিলাম।’
১৯৫৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি-সম্বলিত শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। ১১ মার্চ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র উদ্যোগে ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে যে আলোচনা-সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতেও বক্তৃতা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১২ মার্চ দৈনিক আজাদ-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবী’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয় : ‘গতকল্য (বুধবার) শহরের বিভিন্ন ছাত্রপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কর্ত্তৃক রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়। এই উপলক্ষে গতকল্য সর্ব্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম্মপরিষদের পক্ষ হইতে ছাত্র জনসাধারণের নিকট ব্যাজ বিক্রয় করা হয় এবং সন্ধ্যায় বার লাইব্রেরী হলে এক আলোচনা-সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব আতাউর রহমান। সভায় অধ্যাপক আবুল কাসেম, পূর্ব্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য আবদুল মতিন, আওয়ামী লীগের জমিরুদ্দীন আহম্মদ, গণতন্ত্রী দলের মাহমুদ আলী, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবীতে বক্তৃতা করেন।’
এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অসামান্য। মূলত, ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমেই ঢাকার রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে জাগ্রত জাতীয়তাবাদী চেতনা লালন এবং বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ থেকে শুরু করে স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলোতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ও জাতিসংঘে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছেন, তার ফলে ইতিহাস তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সমৃদ্ধির অভিযাত্রা

Posted on by 0 comment

অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন: “আমি নেতা নই। সাধারণ মেয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী। আপনাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাদের নিয়ে আমি নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাব।”Ñ কথাগুলো বঙ্গবন্ধু-কন্যা বর্তমানের নন্দিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এভাবেই তিনি গণতন্ত্র মুক্তির নবতর সংগ্রামে তার শপথের কথা উচ্চারণ করেছিলেন। সেদিনের শেখ হাসিনার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে পরদিন ১৮ মে’র ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিবেদন ছিল এ-রকমÑ “শেরেবাংলা নগরে সুপ্রশস্থ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত বৈদ্যুতিক আলোহীন অন্ধকার পরিবেশ, ঝড়-বৃষ্টির দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও দূর-দূরান্ত হইতে আগত অজস্র শ্রোতা উপস্থিত ছিলেন। দলীয় নেত্রীর আবেগমথিত কান্নার সময়, তার বক্তৃতার আহ্বানের জবাবে অর্ধঘণ্টার এই সমাবেশে শ্রোতারা মুহুর্মুহু সেøাগান দিতেছিলেন।” লাখ লাখ জনতার ভালোবাসায় অভিষিক্ত শেখ হাসিনা সেদিনের জনসভায় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৩৮ বছরের মাথায় এসে এখনও সেই অঙ্গীকার পালনে তিনি একনিষ্ঠ ও দৃঢ়।
১৯৮১ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ (ক) বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার (খ) হত্যা ক্যু ষড়যন্ত্রের রাজনীতির চির অবসান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা (গ) বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি তথা অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম (ঘ) গণতন্ত্র এবং (ঙ) জাতীয় ঐক্য।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের অন্ধকারে কাপুরুষোচিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ঘটনাক্রমে সেদিন দেশের বাইরে থাকার কারণে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঘাতকদের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে দীর্ঘ ২১ বছর বিচারের পথ রহিত করা হয়। ১৯৭৫ সালের পর থেকে জিয়া-এরশাদ-খালেদার সরকার বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করেছে।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর হত্যার উপর্যুপরি অপচেষ্টা ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা চরম ধৈর্য ও সাহসিকতা নিয়ে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার নিরলস সংগ্রাম পরিচালনা করেন। তার প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ধৈর্যশীল প্রচেষ্টার ফলেই আইন-বহির্ভূত কোনো পথে নয়; বরং প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৮১ সালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের লাখো জনতার উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “’৭৫-এর হত্যাকা-ের জন্য সরকারের কাছে নয়, আপনাদের কাছে এর বিচার চাই।”
১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা যখন তার প্রিয় স্বদেশভূমিতে ফিরে আসেন তখন হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বেশ ভালোভাবেই বিস্তার লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বেনিফিসিয়ারিরাই তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের মুক্তির জন্য শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। ত্যাগের মহান ব্রত নিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলেই তার পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছিল, “আমি আমার জীবন আপনাদের জন্য, সোনার বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব তথা শোষিতের গণতন্ত্র কায়েমের জন্য দান করে দিতে চাই।” স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তার ওপর গ্রেনেড হামলা করা হয়। নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। এসব হত্যা প্রচেষ্টা, গুলিবর্ষণ, বোমাবাজি সত্ত্বেও তিনি অসীম সাহসে লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থেকেছেন। জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে এগিয়ে গেছেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে জনগণের ভোটে সুদীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর সূচিত স্বৈরশাসন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধারার অবসান হয়। রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনের সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ^সভায় বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়ায়। এই শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রমূলক ভোট ডাকাতির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি-জামাত জোট পুনরায় ক্ষমতা দখল করে উন্নয়নের বিপরীতে নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থে স্বৈরতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখে। বিএনপি-জামাতের অপরাজনীতির ফলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পটপরিবর্তন সংগঠিত হয়। বিরাজনীতিকরণের হীন প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে সর্বজনস্বীকৃত অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ক্ষুধা দারিদ্র্য নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের সফল অগ্রযাত্রায় দেশ এগিয়ে যায়। ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত থেমে থাকেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব অযৌক্তিক ও জনসম্পৃক্ততাহীন আন্দোলন ও আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থামানোর অপচেষ্টা হয়।
জননেত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে এসব চক্রান্ত প্রতিহত করেন। ২০০৮ থেকে টানা দুই মেয়াদে ১০ বছর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, সমতা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক গণতান্ত্রিক দেশ বিনির্মাণের পথে জাতিকে অগ্রসরমান রেখেছেন। জাতির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল মানুষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের অবাধ নির্বাচনে আবারও নৌকায় ভোট দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকার দ্রুতগতিতে উন্নয়নের স্বপ্নযাত্রায় দেশবাসীকে শামিল করেছেন। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। শেখ হাসিনার হাত ধরে আমাদের জন্মভূমি পরমাণু ও স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করেছে। এক সময়ের ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বাংলাদেশ আজ আত্মবিশ^াসী হয়েছে। ‘শেখ হাসিনাই পারে, শেখ হাসিনাই পারবে’Ñ এ-কথা আজ মানুষ বিশ^াস করছে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয় সম্মানবোধ ও আত্মবিশ^াস সম্পর্কে বলেছেন, “আমাদের দেশে সকলের চেয়ে বেশি দরকার হাতে ভিক্ষার ঝুলি তুলিয়া দেওয়া নয়, মনে ভরসা দেওয়া।… যে দেশে গরীব ধনী হইবার ভরসা রাখে, সে দেশে সেই ভরসাই একটা মস্ত বড় ধন।”
আমরা আল্লার ওপর ভরসা ঠিকই রাখি। কিন্তু সরকারের ওপর ভরসা রাখতে পারিনি। অগণতান্ত্রিক সরকার আমাদের বারবার ঠকিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর পর শেখ হাসিনার সরকারই জাতির চোখ খুলে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও বলেছেন, “ভিক্ষুকের জাতির কোনো সম্মান নেই।” কবিগুরুর লেখার সূত্র ধরে আমরাও বলতে পারি, বাঙালি জাতির ভরসার স্থল আজ দেশরতœ শেখ হাসিনা। তার হাত ধরেই দেশ পৌঁছে যাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায়।

লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Category:

একাত্তরে আমার ক’দিন

Posted on by 0 comment

4-9-2019 6-45-18 PMবিষ্ণু বিশ্বাস: আমি তখন ক্লাস ফোরে উঠেছি। ১৯৭১। মার্চ মাস। একদিন সকালবেলা রান্নাঘর থেকে খেয়ে উঠোনে এসেছি। রেডিওতে কে যেন কথা বলছে! কণ্ঠের সে কি আওয়াজ, আমার গায়ের রোম শিউরে উঠেছে, আমি পা ফেলে আর নড়তে পারি না। কথা বলা শেষ হলে দাদু বললো, শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ, রেডিও তার রেকর্ড বাজিয়েছে। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকে খানসেনাদের সাথে বাঙালির যুদ্ধ হবে বলাবলি ছেয়ে যেতে থাকে। ঝিনেদার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বিষয়খালী আসতে থাকেন এ-বেলা ও-বেলা। বিষয়খালী বাজারের পাশে আমাদের বাড়ি খড়িখালীতে। নদী আছে একটি তার এপারে। ওপারে ইপিআর-রা বাংকার খুঁড়তে শুরু করেছে। ব্রিজের এপারের মুখে স্থানীয়রা খাদ কাটছে। ব্রিজের মুখের পাশে হাজার বছর বয়সের কড়–ই গাছÑ তার একটা বিশাল ডাল কেটে খাদের ঠিক সামনে রাস্তার উপরে আড়াআড়ি করে রাখা হয়েছেÑ খানসেনারা যাতে কোনোভাবেই ব্রিজ পেরিয়ে ঝিনেদা, কুষ্টিয়া, উত্তরবঙ্গ এবং ঢাকায় যেতে না পারে। স্কুল বন্ধ। রোড দিয়ে গাড়ি চলাচল আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র ঝিনেদা থেকে নেতা-কর্মীদের জিপ-ট্রাক বিষয়খালী বাজার পর্যন্ত আসে। যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ কী রকম জানা নেইÑ অল্প বয়েস। আমরা অল্প বয়েসীরা এটাকে উৎসবের মতো দেখেছি। সকালে খেয়েই বাজারে চলে আসি। আম দেবদারু বনে বাংকার খোঁড়া হয়েছেÑ তাতে নামি উঠি, রাইফেল কী রকম তা দেখি। ব্রিজের দক্ষিণ দিকে রাস্তার উপরে গাছ কেটে রাখা হচ্ছে তা দেখে বেড়াই।
এপ্রিলের কাছাকাছি। আমের গুটি বড় হয়েছে, খেয়ে বেড়াচ্ছি আর লোকজন যা বলাবলি করছে তা শুনছি। ঢাকায় খানসেনারা রাতে গুলি চালিয়ে লোক মেরে ফেলেছে তা শুনেছি। ভয় এসেছে। আমরা রাত জেগে বারান্দায় বসে থাকিÑ কখন খানসেনারা যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এদিকে মারতে মারতে আসেÑ বাড়ির বড়রা আর পাড়ার বড়রা ভয় পেয়ে গেছেÑ বুঝেছি।
ঢাকায় খানসেনারা জনগণকে গুলি করে মারবার পরে দেশের শহরবাসীরা গ্রামে যেতে শুরু করে। এই সময় খুলনা যশোরের লোকেরা পায়ে হেঁটে রাস্তার পাশে গ্রামের পাড়ার ভিতর দিয়ে তাদের গ্রামের বাড়ি যেতে থাকে। আমাদের পাড়ার ভিতর দিয়ে আমাদের ছোট গাঙ পেরিয়ে লোকেদের যাওয়া আর ফুরোয় না। যেতে যেতে তারা বলতো যুদ্ধ এসেছে, জল খেতে চাইতো। আমরা ছোটরা কুয়ো থেকে বালতিতে জল তুলে জগে করে নিয়ে গিয়ে তাদের জল খাইয়েছি। মাঠে তখন পাকা গম আর পাকা ছোলা; ঘরে তুলে আনতে কিছু বাকি। সকালে খাওয়ার পরে আমি মামার সাথে ছোলা তুলতে গেছি। ছোলা তুলছি ছোলা তুলছিÑ এমন সময় খট খট, খট খট খট আওয়াজ আসছে কয়ারগাছির দিক থেকেÑ কয়ারগাছি বিষয়খালী থেকে দেড় মাইল দূরে দক্ষিণ দিকে। প্রথমবার আওয়াজের পরে আমি ভাবছি কাঠঠোকরা পাখি বুঝি গাছ ঠোকরাচ্ছে। দ্বিতীয়বার আওয়াজ হলে মামা বললো, মেশিনগানের গুলির শব্দ! খানেরা মারতে মারতে আসছেÑ চল্, বাড়ি চল্ তাড়াতাড়ি।
মাঠ থেকে বাড়ির দূরত্ব অল্প। এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়ির এবং পাড়ার সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে গিয়েছে। বাজার থেকে পাড়ার নেতৃত্বস্থানীয়রা দৌড়ে পাড়ায় এসে ঢুকেছে। তারা বললোÑ খানসেনারা রাস্তার দু-পাশের গ্রামের ওপর গুলি ছুড়তে ছুড়তে আসছে, তাতে মরছে, পুড়ছেÑ এসব হচ্ছে, এখনই দূরের গ্রামের দিকে চলে যেতে হবেÑ বলে কয়েকজন শিশুকে কোলে কাঁধে তুলে নিয়ে তারা দৌড়াতে শুরু করলো। আমরা সবাই তাদের পিছু পিছু দৌড়াতে লাগলাম। সাগরকলা বাগানের ভিতর দিয়ে গাঙ পার হয়ে আমরা আমাদের পুবের দিকের গ্রাম গড়েলা পৌঁছালাম।
এখানটি কতখানি নিরাপদ তা নিয়ে এখানকার লোকের সাথে আমাদের লোকের আলোচনা হলো। আমাদের লোকেরা আরও দূরের গ্রামে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো। সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা বড় মাঠের ভিতর দিয়ে আরও দূরের গ্রামে যেতে থাকলাম। আরও লোক আমাদের পিছে পিছে আসছে তা দেখলাম। পিছনে রাস্তার দিকে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ। বাড়িঘরে আগুন লেগেছে, ধোঁয়া আকাশে উঠছে চোখে পড়ছে। আমাদের কুকুরটা আমাদের সঙ্গ নিয়েছে। আরও অনেক কুকুর লোকের সঙ্গ নিয়েছে চোখে পড়ছে।
প্রায় বারোটার দিকে আমরা তেঁতুলবেড়ে গ্রামে পৌঁছালাম। ওখানে শুনলাম, খানসেনারা গুলি চালাতে চালাতে বিষয়খালী ব্রিজের কাছাকাছি এসেছেÑ ইপিআররা ওদের বিরুদ্ধে পাল্টা গুলি ছুড়ছেÑ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা কিছুক্ষণ বসলাম ওখানে। জল খেলাম। একটা গুলি এসে কার গায়ে বিঁধেছে খবর রটলো। এ গ্রামের লোকেরা এখানে নিরাপদ বোধ করছে নাÑ তা বললো আমাদেরকে। তারা আমাদের আরও পুবের দিকের গ্রামের দিকে যেতে বললো।
আমরা আরও পুবের দিকের গ্রামে যেতে থাকলাম। আমরা পুবের দিকের আরও এক গ্রাম পেরিয়ে পরের গ্রামে গিয়ে উঠলাম। গ্রামটির নাম নারাণপুর। এখানে কুঠিবাড়ি। আমরা কুঠিবাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বাড়ির উঠোন পেরোলে দক্ষিণের দিকে পুকুর। আমরা পুকুর পাড়ে গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম। সবুজ দূর্বা ঘাসে ছাওয়া পুকুর পাড়টি। দুপুর পেরিয়ে গেছে। এই প্রথম দুপুরের ওয়াক্তে খাওয়া নেই। যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। আমাদের ঘরবাড়িতে আগুন লেগে পুড়ে গেছেÑ সে খবর এসেছে। আমার জামা-প্যান্ট, বইপত্র, বইয়ের পৃষ্ঠার ভাঁজে যতেœ রাখা একটি পাঁচ টাকার নোট পুড়ে গেছে বুঝে দুঃখে ভরে গেছে আমার হৃদয়।
বেলা প্রায় চারটের দিকে পুকুর পাড়ের দিকে গুলি আসতে লাগলো। দাদু পুকুর পাড়ের ঢালুতে তাড়াতাড়ি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বললো। আমরা তাই করলাম। গুলি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যেতে থাকলো। ভয়ে মাটিতে শরীর মিশিয়ে দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর গুলি যাওয়া বন্ধ হয়েছে, চোখ খুলে পশ্চিমের মাঠের দিকে তাকিয়েছি, দেখি মাঠের পাশে কিছু বাড়িÑ তাতে আগুন লেগেছে। খানসেনাদের কিছু এ পর্যন্ত এসেছে। দেখলাম মাঠের ভিতরে সামনাসামনি বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে। তাতে একজন মরলো বলে মনে হচ্ছে। আমি অবাক হয়ে যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। ছ’টার দিকে যুদ্ধ শেষ হলো। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। হতাহতের খবর আসতে শুরু করেছে। ব্রিজ উড়িয়ে দেবার কথা আগেই শোনা গিয়েছিল। খানসেনারা ব্রিজ পেরিয়ে আর সামনের দিকে যেতেই পারেনি। তাদের সরাসরি রুখে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। আমাদের পরিচিত কয়েকজনের মৃত্যু সংবাদ এসেছে। খানসেনারা না-কি অনেক মরেছে। তারা তাদের লাশ তুলে নিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফেরত গেছেÑ তারা হেরে গেছে।
সন্ধ্যায় আমাদের খিচুড়ি ভাত খেতে দেয়া হলো। আমরা খেলাম। তারপর শুয়ে পড়লাম। কুঠিবাড়িতে রাত কাটিয়ে আমরা ভোরে উঠে কুলাবাজারের কাছে আমাদের আত্মীয় বাড়ি গ্রাম খালকুলো গেলাম। সেখানে পনেরো দিন মতো ছিলাম। আত্মীয়রা পালা করে আজ এ-বাড়ি কাল ও-বাড়ি করে খাওয়ালোÑ শুতে দিলো।
যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। দেশ স্বাধীন হতে অনেক দিন লাগবেÑ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের গ্রামে গিয়ে বাড়ি তুলতে পারবো নাÑ বড়রা বলাবলি করে শরণার্থী হয়ে ইন্ডিয়া যেতে মন স্থির করলো। যে পনেরো দিন ওই গ্রামে থাকা হলো, ওই গ্রামের আমার বয়েসী ছেলে-মেয়েদের সাথে দাড়িপাল্লা নামের আমবাগানে কাঁচামিঠে আম খেয়ে বেড়ানো, বৈচী ফল খাওয়া, মৌচাক ভাঙার পদ্ধতি শিখে ক্ষুদে মৌমাছির চাক ভেঙে মধু খাওয়া ইত্যাদির মধুর স্মৃতি ঘটলোÑ যাবার আগে কান্নায় চোখ ভাঙলো।
পশ্চিম বাংলা যাবার পথে আমরা আমাদের গ্রাম হয়ে গেলাম। আমাদের পাড়ায় ঢুকে দেখলামÑ আমাদের ঘরবাড়ির কোনো চিহ্ন নাই। পাড়ায় যে দুটি বাড়ি টিকে আছে তার একটিতে আমরা খেলাম। এই বাড়িতে একটি ঝুট শালিক খাঁচায় পোষা। সে দুপুরেÑ স্নান করতে যাবি তো চল্, চল্Ñ বলেÑ আমাদের বললো। আমরা স্নান না করে ভয়ে ভয়ে কোনো রকমে খেয়ে রাস্তা পার হয়ে পশ্চিমের গ্রামের দিকে যেতে থাকলাম। যারা থাকলোÑ তারা খুব ভয়ে ভয়ে আছেÑ স্নান রান্না খাওয়া- দাওয়াÑ সব লুকিয়ে লুকিয়ে করছে। আবার খানসেনারা আসবার আগেই তারাও ইন্ডিয়া যাবেÑ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সৌজন্য : যুক্ত
মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিলাম। মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার বাঘমারা থানার সীমান্তবর্তী মালিকোনা নামক স্থানে বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ইয়থ ক্যাম্প ছিল। আমি ঐ ক্যাম্পের দায়িত্ব পালনকালে সীমান্ত এলাকায় কর্তব্যরত একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে আমার যোগাযোগ হয় এবং গেরিলা বাহিনীর ইয়থগণ যখন ক্যাম্পে না থাকে তখন ঐ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সীমান্তে আমি কাজ করি। ফলে স্থানীয় বিএসএফ-র অধিনায়ক ক্যাপ্টেন মুরারীর সাথেও আমার পরিচয় হয়। ক্যাপ্টেন মুরারী একজন বাঙালি-প্রেমিক, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি খুবই দরদি এবং রসিক মানুষ ছিলেন। মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হলে আমাদের উৎসাহ দিতেন, সাহস দিতেন। নানারকম কথাবার্তা বলে হাস্যরস করতেন। ফলে তিনি ছিলেন সবার কাছে একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব।
বাঘমারা সীমান্ত থেকে মাত্র ২ কিমি দূরে পাকবাহিনীর রানীখং নামক স্থানে ক্যাম্প ছিল। প্রায়ই পাকবাহিনী গুলিবর্ষণ করত এবং বিএসএফ বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধারাও প্রতিউত্তর দিয়ে পাকবাহিনীকে জবাব দিত। এসব ঘটনার সময় ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথী বাঙালি জাতির বন্ধু ক্যাপ্টেন মুরারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস এবং মনোবল জোগাতেন।
তখন সন্ধ্যার পর হতে ভোর পর্যন্ত সমস্ত বাঘমারা এলাকায় কারফিউ জারি থাকত। বাঘমারা সীমান্তের অদূরে পাহাড়ের ওপর বিএসএফ ক্যাম্প ছিল। ক্যাপ্টেন মুরারী ঐ ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন এবং তিনি সেখানে থাকতেন।
যে পাহাড়ে বিএসএফ ক্যাম্প ঐ পাহাড়েই ওঠার পথে নিচে গাছ দিয়ে বেরিকেড দেওয়া হতো এবং নিচে পালাক্রমে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকতেন। একদিন রাত ৮-৯টার সময় ক্যাপ্টেন মুরারী জিপ নিয়ে পাহাড়ে ওঠার সময় ঐ বেরিকেডের কাছে এসে গাড়ি থামিয়ে হর্ন বাজান।
তখন কর্তব্যরত বীর মুক্তিযোদ্ধা চিৎকার দিয়ে বলেন, কেলা গো? ক্যাপ্টেন মুরারী গাড়ি থেকে নামলে বীর মুক্তিযোদ্ধা তাকে স্যালুট করেন। মুরারী সাহেব গাড়িতে উঠলে বেরিকেড উপরে উঠালে গাড়ি পাহাড়ের ওপর চলে যায়।
পরদিন সকালে আমি আমাদের ইয়থ ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তখন ক্যাপ্টেন মুরারী মর্নিংওয়াক করে ফিরছিলেন। তিনি আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনÑ
ব্যাটা বাতাওতো কেলা গো কিয়া হে। আমি প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তখন ক্যাপ্টেন সাহেব ঘটনাটি বর্ণনা করলে আমি বুঝতে পারি এবং বলি যে, স্যার ও লোক আপকে পূছা হে-আপ কোন হু? এই কথা শুনে ক্যাপ্টেন সাহেব হাসতে হাসতে আমার পিট চাপড়ালেন এবং বললেন এঁহিবাতÑ আচ্ছা হ্যায় আচ্ছে হ্যায়। আমি উনাকে স্যালুট করলাম, তিনি চলে গেলেন।
ঐ বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি নেত্রকোনা বা কিশোরগঞ্জ মহকুমায় ছিল। এরপর ঘটনাটি মুখে মুখে প্রচার হলে ঐ মুক্তিযোদ্ধার নাম পড়ে যায় ‘কেলা গো’।
আজ অনেক বছর পরে একটি স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে ঐ বীর মুক্তিযোদ্ধার চেহারা হৃদয়পটে ভাসছে; কিন্তু কেলা গো ছাড়া তার আসল নাম কোনোভাবেই মনে করতে পারছি না। জয়তু বীর মুক্তিযোদ্ধা।

Category: