Blog Archives

শুকলাল ডোম

PM2স্বকৃত নোমান: শুরুতেই আপনাদের জানিয়ে রাখি, বহুদিন ধরে একটি চরিত্র আমার মাথায় বসবাস করছে। এই চরিত্রের কথা আমি শুনেছিলাম সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূরের কাছে। জাহীদ ভাইকে চেনেন তো? সেই জাহীদ রেজা নূর, যার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার, রাজাকার ও আলবদরের পা-ারা ঢাকার চামেলীবাগের বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রায়ই ভাবি, জাহীদ ভাইর কাছে শোনা চরিত্রটি নিয়ে আমি লিখব। কিন্তু হয়ে ওঠে না। আজ বরং আপনাদের চরিত্রটি সম্পর্কে কিছু কথা জানিয়ে রাখি।
ধরা যাক তার নাম শুকলাল। পেশায় ডোম। আপনারা তো জানেন, ডোমেরা মূলত মৃতদেহ পরিচর্যা, ব্যবচ্ছেদ ও সেলাইয়ের কাজ করে। বর্ণপ্রথার কারণে এখনও সমাজে তারা অস্পৃশ্য হিসেবেই চিহ্নিত। বাংলাদেশে বাঙালি ও অবাঙালি, এই দু-ধরনের ডোম আছে। অবাঙালি ডোমদের ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝিতে বিভিন্ন কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাঁচি, মাদ্রাজ ও আসামের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা হয়। অনেকের ধারণা, মধ্যযুগে ডোমেরা দাক্ষিণাত্য থেকে বাংলায় এসেছে। তবে ‘চর্যাপদে’ ডোম শব্দের উল্লেখ দেখে আপনারা ভাবতে পারেন, ডোমেরা এই বাংলায় বসবাস শুরু করে আর্যদেরও আগে। হতেও পারে। ডোমদের একটা সময় চাঁড়াল বলা হতো। আপনারা নিশ্চয়ই কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলীযাত্রা’ পড়েছেন। এই উপন্যাসে আমরা বৈজু চাঁড়ালের কথা পাই। আহা কী অসাধারণ এক উপন্যাস! শুরুটাই কী চমৎকার : ‘আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোম-ল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে…।’
শুকলাল ডোমের পূর্বপুরুষেরা হয়তো উত্তর প্রদেশ থেকে, বা অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে, বা মধ্যপ্রদেশ থেকে, বা আসাম থেকে একদিন চারশ’ বছরের এই প্রাচীন নগরী ঢাকায় এসে বসতি পত্তন করেছিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। শুকলাল কখনও যুদ্ধ দেখেনি, কখনও মন্বন্তর দেখেনি, কখনও দাঙ্গা দেখেনি, কখনও মানুষের সারিসারি লাশ দেখেনি। সে কাজ করত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। মর্গে তো আর সারি সারি লাশ আসত না। কখনও একটি, কখনও দুটি, কখনও পাঁচটি লাশ আসত। সেসব লাশের শরীর ব্যবচ্ছেদ আর সেলাই করা ছিল তার কাজ। সে মনে করত, পৃথিবীটা এমনই। পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকতে পারে না, সবাইকে মরতে হয়। মৃত্যু স্বাভাবিক। কেউ বার্ধক্যজনিত কারণে মরে, কেউ অপঘাতে মরে। যারা অপঘাতে মরে তাদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কাটাছেঁড়া করতে হয়। এটাও পৃথিবীর নিয়ম। তার পূর্বপুরুষেরা অপঘাতে মৃত মানুষদের লাশ কাটাছেঁড়া করেছে, সেও করে। তার কাছে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সে তো তখন মাতাল থাকত। গলা অবধি চোলাই খেয়ে সে যখন কোনো লাশের গলা থেকে তলপেট পর্যন্ত চিরে ফেলত; স্টমাক, কিডনি, হার্ট, লাঞ্চ, লিভার বের করে আনতো, কিংবা মাথার খুলিটা আলাদা করে মগজগুলো বের করে আনতো, একবারও তার বুক কাঁপত না, হাত কাঁপত না। কখনও একটিবার মনে হতো না একদিন তাকেও মরতে হবে। হয়তো বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা কোনো অপঘাতে। হয়তো তার লাশও একদিন তার মতো কোনো ডোম এভাবে কাটাছেঁড়া করবে। সে-কথা বলতো তার মাতৃভাষায়। ডোমাই ভাষা। কিন্তু জন্ম তো তার এই গানের দেশ, ভাবের দেশ বাংলাদেশে। লাশ কাটতে কাটতে সে গাইত বাংলা গান, ‘ও কী ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে/কোনদিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও কয়া যাও রে…।’
শুকলাল ডোমের তখন বয়স কত? এই ধরুন পঁয়ত্রিশ। চল্লিশও হতে পারে। তার বাবা-মা তো কোথাও তার জন্ম তারিখ লিখে রাখেনি। তারা ডোম। তারা কি আর জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখে! জন্ম তারিখ লিখে রেখে কী হবে, তারা তো আর জন্মদিন পালন করে না। এসব তো বড়লোকদের ব্যাপার। ধরা যাক তার বয়স তখন চল্লিশ। শুরু হলো যুদ্ধ। পঁচিশে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী শুরু করল অপারেশন সার্চলাইট। সেই গণহত্যার কথা কী আর লিখব, আপনারা তো সবই জানেন। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ। এই বাংলাদেশে সংঘটিত সেই বীভৎস্য হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস আপনাদের জানতে হয়েছে। আপনারা জানেন সেই কালরাত্রির ইতিহাস। শুধু জানেন না, সেই রাতে ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা কি জানার কথা! কোনো গবেষকের পক্ষে কি গবেষণা করে বের করা সম্ভব! ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আর পিলখানায় কত মানুষকে হত্যা করেছিল, হত্যাকারীরা তো লিখে রাখেনি। তারা তো মানুষ গুনে গুনে হত্যা করেনি। যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই মেরেছে। আমরা শুধু অনুমান করতে পারি, সে-রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি খুনিরা হত্যা করেছিল প্রায় এক লক্ষ মানুষ।
সাতাশে মার্চ দুপুর। শুকলাল ডোমের তখনও ঘুম ভাঙেনি। রাত এগারোটা পর্যন্ত চোলাই খেয়ে ঘুমিয়েছে সেই বারোটায়। একটা বালিশ কোলে নিয়ে এখনও ঘুমাচ্ছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। উঠে কী করবে, দুদিন ধরে তো হাসপাতালে যাচ্ছে না। কী করবে গিয়ে, কাজ তো নেই। সে শুনেছে, গোটা ঢাকা শহরটাই না-কি লাশকাটা ঘরের রূপ নিয়েছে। চারদিকে কেবল লাশ আর লাশ। শুনে সে হেসেছে। যত্তসব আজগুবি কথা! এক রাতে কি আর এত মানুষ হত্যা করা যায়! হয়তো একশ’, বা দুইশ’, বা বড়জোর পাঁচশ’ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ মানুষ গুজব ছড়াচ্ছে, লাশ না-কি হাজার হাজার! রক্তে না-কি লাল হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার জল। তিলকে তাল বানিয়ে মানুষের কী যে সুখ!
বাইরে হঠাৎ বিপিন দাসের গলা শোনা যায়, ‘শুকলাল! এ শুকলাল! তো ঘর মে হ্যায় না? বাহির আ যা। দেখ কোন আয়া।’
শুকলাল উঠে বসে। আড়মোড়া ভেঙে হাই তোলে। গামছাটা গায়ে চড়িয়ে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। দেখে, মাঝিরঘাটের আড়ৎদার হারেস উদ্দিন। সঙ্গে দুই সেপাই। গায়ে খাকি, পরনে বুট, মাথায় হেট, কাঁধে রাইফেল। শুকলাল একটু ঘাবড়ে যায়। হাসপাতালে যাচ্ছে না বলে সেপাইরা কি তাকে ধরে নিতে এলো! সে হেসে বলল, ‘কেমন আছেন ভাইসাহাব? আচ্ছা হ্যায় তো?’
হারেস উদ্দিন বলে, ‘আচ্ছা আচ্ছা। জলদি রেডি হও মিয়া। কাজে যাওন লাগবো। স্যারেরা এসেছেন তোমাকে নিতে।’
শুকলাল জানতে চায় না কী কাজ। নিশ্চয়ই জরুরি কোনো কাজ। নইলে কি স্যারেরা আসতেন! গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে দ্রুত সে বের হয়। সেপাইরা তাকে নিয়ে যায় বুড়িগঙ্গার উত্তরের ঘাটে। সেখানে লাশের স্তূপ। শিশুর লাশ, কিশোর-কিশোরীর লাশ, তরুণ-তরুণীর লাশ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ। বিপিন দাসসহ আরও চার ডোমকেও আনা হয়েছে। এসব লাশ ঘাট থেকে সরিয়ে মাটিচাপা দিতে হবে। গর্ত খোঁড়া আছে। শুকলাল কি আর অমত করতে পারে? সে কি বলতে পারে, এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়! বললে ধড়ে কি আর মু-ু থাকবে!
ডোমেরা কাজ শুরু করে। শুকলালও। আঁকশি দিয়ে একটা একটা লাশ টেনে গর্তে ফেলতে থাকে। জীবনে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে এত লাশ দেখে শুকলালের অবাক লাগে। পাকিস্তানিরা এত এত মানুষ মারল, অথচ সে কি না গুজব বলে উড়িয়ে দিল! লাশের পর লাশ দেখে তার বুকে কাঁপুনি ওঠে। আঁকশি দিয়ে লাশ টানতে গিয়ে হাতটা বারবার কেঁপে উঠছে। তার মনে পড়ে যায় পট্টির অনন্ত দাসের কথা। খুব গল্পবাজ ছিল লোকটা। কত গল্প যে জানত! একদিন অনন্ত দাস বলেছিল কুরুক্ষেত্রের কথা। পা-ব ও কৌরবের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল কুরুক্ষেত্রে। সেই যুদ্ধ ছিল ধর্মের জয় আর অধর্মের বিনাশের যুদ্ধ। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। কিন্তু এ কোন যুদ্ধ! কেন এই যুদ্ধ! কোন অপরাধে এত এত মানুষকে হত্যা করা হলো!
লাশ টানতে টানতে শুকলাম ঘেমে ওঠে। কপালে ঘাম, দুই গালে ঘাম, গলায় ঘাম, বুকে ঘাম, সারাশরীরে ঘাম। শুকলাল খিদার কথা ভুলে গেছে। কতক্ষণ পরপর সে বিড়ি টানে, অথচ এখন বিড়ির কথা ভুলে আছে। লাশ টানতে টানতে দিন ফুরিয়ে যায়। সূর্যটা চলে গেছে অস্তাচলে। লাল গোলাকার সূর্য ক্রমে ডুবে যাচ্ছে।… অন্ধকার ক্রমে আসিতেছে। শুকলালের হাতের কাঁপুনি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। নিজের প্রতি ভীষণ রাগ ওঠে। লাশ নিয়ে তার কারবার। জীবনে কত লাশ কাটাছেঁড়া করেছে, কখনও হাত কাঁপেনি, এখন তো কাটাছেঁড়া করছে না, আঁকশি দিয়ে টেনে টেনে শুধু গর্তে নামাচ্ছে, তবু তার হাতটা এভাবে কাঁপছে কেন!
এক নারীর লাশে আঁকশি বসিয়ে শুকলাল দেয় জোরসে টান। লাশটা এলো না, ফিরে এলো আঁকশিটা। আঁকশির টানে পেটের চামড়াটা চিরে গেল বুক অবধি। বেরিয়ে এলো ফুটফুটে এক শিশু। শুকলাল থমকে দাঁড়ায়। শিশুটার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। কী সুন্দর মুখ। কী সুন্দর হাত-পা! শুকলালের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিশু শ্রীকৃষ্ণের মুখ। যেন সাক্ষাৎ ভগবান মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন! একটু পরেই বসুদেব আসবেন। পুত্রকে গোপনে তুলে দেবেন যশোদার কোলে।
নাড়িসুদ্ধ শিশুটিকে পরম মমতায় কোলে তুলে নেয় শুকলাল। শিশুটি মৃত, অথচ মনে হচ্ছে জীবিত। মায়ের আদর পেয়ে যেন ঘুমাচ্ছে। কচি মুখটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে শুকলাল। ‘হা ভগবান’ বলে সে পশ্চিমে তাকায়। সূর্য ডুবে গেছে।… ক্রমে অন্ধকার আসিতেছে। বিহ্বল শুকলাল এবার তাকায় নারীটির মুখের দিকে। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। মাথার কয়েক গাছি চুল ঢুকে আছে মুখের ভেতর। যুবতী। বিশ-একুশের বেশি হবে না বয়স। শুকলাল টের পায়, বুকের কাঁপুনিটা বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। বুকের ভেতরে যেন ট্রাকের ইঞ্জিন চলছে। তার পা দুটো কাঁপতে থাকে। থরথর করে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। চট করে বসে পড়ে। শিশুটি ছিটকে পড়ে যুবতীর বুকের কাছে।
গামছায় মুখ মুছে শুকলাল উঠে দাঁড়ায়। কম্পিত হাতে শিশুটিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয় যুবতীর পেটে। গামছা দিয়ে পেটটা শক্ত করে বেঁধে লাশটা তুলে নেয় কোলে। হাঁটা ধরে গর্তের দিকে। খুঁড়ে রাখা অসংখ্য গর্তের একটাতে লাশটা নামায়। মাটি ভরাট করে কবরের রূপ দেয়। কবরের সিথানে সে উবু হয়ে বসে। অন্ধকার হয়ে ওঠে গাঢ়। শকুনের ডানা ঝাপটানির শব্দ শোনা যায়। টের পাওয়া যায় শেয়ালের আনাগোনা। হাত দুটো জোড় করে কবরের মাটিতে মাথাটা ঠেকায় শুকলাল। বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, ‘ভগবান!’
সারারাত শুকলাল কোথায় ছিল কে জানে। পরদিন সকালে বিপিন দাস এসে দেখে, দু-হাতে আঁকশিটা ধরে সে বসে আছে ঘাটের পাকুড়তলায়। বিপিন তাকে ডাক দেয়, জলদি কাজ শুরু করার তাগাদা দেয়। সন্ধ্যার আগে সব লাশ গর্তে নামিয়ে মাটিচাপা দিতে হবে। নইলে সেপাইরা গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেবে।
আঁকশি হাতে শুকলাল উঠে দাঁড়াল। সঙ্গীদের সঙ্গে লাশের স্তূপের কাছে গেল। সঙ্গীরা শুরু করল কাজ। গতকালের মতো। একটা একটা করে লাশ আঁকশিতে টেনে গর্তে ফেলতে থাকে। শুকলাল দাঁড়িয়ে থাকে। চোখেমুখে উ™£ান্তি। এদিক-তাকায়, ওদিক তাকায়। হঠাৎ হেসে ওঠে। হা হা করে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে কেঁদে ওঠে। হহু করে কাঁদতে থাকে। কান্নার মধ্যেই আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। হাসি থামিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে। সঙ্গীরা কিছুই বুঝতে পারে না। তারা ভাবে, শুকলাল হয়তো চোলাই বেশি খেয়ে ফেলেছে।
দুপুর গড়িয়ে যায়। শুকলাল দাঁড়িয়ে থাকে। বিকেলও গড়িয়ে যায়। সূর্য আবার চলে যায় অস্তাচলে।… আর অল্পকাল গত হইলে আকাশে জাগিয়া উঠিবে রক্তিম আবির। সব লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়ে গেছে। অস্তাচলের দিকে মুখ করে শুকলাল আগের মতোই দাঁড়িয়ে থাকে। হাসে, কাঁদে আর কীসব বলে যায় বিড়বিড় করে।
এবার বলুন, এই শুকলাল চরিত্র নিয়ে কি কোনো গল্প লেখা যায়? আমি বহুবার চেষ্টা করেছি। পারিনি। লিখতে বসলেই বুকটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে। একটা পাথর যেন চেপে বসে বুকের ওপর। দু-চোখের কোণে বয়ে যেতে চায় বুড়িগঙ্গার স্রোত। আমি কোনোদিন হয়তো শুকলালকে নিয়ে লিখতে পারব না। কোনোদিন না। শুকলাল তার আঁকশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে আমার মাথায়। আমৃত্যু।

Category:

অলৌকিক ত্রিচক্রযান

Posted on by 0 comment

PMfঝর্ণা রহমান: তক্ষুনি একটা তক্ষক…
স্টেজে উঠে আমি কতক্ষণ বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
আমার মুখের সামনে রস্ট্রামে মাইক্রোফোন ঠিকঠাক করে দিয়েছে পিওন ইলিয়াস। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত দর্শক শ্রোতার সংখ্যা ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে দেড়শ থেকে বড়জোর দুশ হবে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাই আছেন আড়াইশর মতো। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সাত হাজার।
আমি ইলিয়াসকে বলি, দেখো, বাইরে ছেলেমেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে কি না, সবাইকে অডিটোরিয়ামে আসতে বলো। ইলিয়াস বকের মতো গলা উঁচু করে জানালা দিয়ে মাঠে চোখ ঘুরিয়ে আনে, বলে, ‘ম্যাডাম, ইস্টুডেন্ট স্যার ম্যাডাম কেউই আর নিচে নাই। য্যারা আইছে হ্যারা সবাই এইহানে আছে। বন্ধের দিন তো, কেউ আর কলেজে আইতে চায় না। বন্ধ তো বন্ধই। কলেজে আসতে হইলে তা আর ছুটি হইলো কেমনে তাই না ম্যাডাম?’
আমার যে কী হলো, আমি ইলিয়াসকে, যার টেকো মাথার তলায় ক্ষুদে ক্ষুদে ধূর্ত দুটি চোখে কুটকুটে আলো, নিকোটিনের কষে শুঁটকি মাছের মতো কালো হয়ে যাওয়া আমচুর-ঠোঁটে ছাঁৎলা পড়া এক ফালি হাসি, দাঁত খিঁচিয়ে বলি, ‘আচ্ছা, আজকের সরকারি ছুটিটা কী জন্য বলো তো!’
ইলিয়াস একটু ভড়কে যায়। আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে মঞ্চে ব্যাকড্রপের লেখাটা দেখার জন্য একটু ঘাড় ঘোরায়Ñ ‘ওই যে ম্যাডাম, আঙ্গুল উঁচাইয়া আছে, ওই বঙ্গবন্দুর জন্য। আজ তো জাতীয় শোক দিবস!’
ইলিয়াসের আঞ্চলিকতার জন্য শোক কথাটার উচ্চারণ হয় ‘শুক’ দিবস আর তা আমার কানে শোনায় ‘সুখ দিবস’। আমি আবার মূঢ়ের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে বলি, ‘কী বললে স্টুপিড? সুখ দিবস?’
Ñ শ্যাখ হাচিনা তার বাবার জন্য আইজ সরকারি ছুটি…
ক্লারিফিকেশন দিতে যায় ইলিয়াস।
ঠিক তক্ষুনি একটা তক্ষকের মতো পুরনো কোনো গাছের কোটর থেকে আমার সামনে যেন পিছলে পড়ে বায়োলজির প্রভাষক নূরুল আমিন। ইলিয়াসের নাকের ডগায় নূরুল আমিন থাবা হানে।
Ñ ধেৎ গাড়ল, শুদ্ধু কইরা কথা বল গাধা। সুখ দিবস না শোক দিবস। এমনেই আমার এক কথায় ম্যাডামের মেজাজ গরম অইয়া আছে। ছরি ম্যাডাম, ছরি, আপা। ইলিয়াসের সুখ দিবস আর আমার গুল্লি দিবস এইসব কথা ভুইলা যান। আসলে গায়ের থেইকা এখনও ইন্ভার্সিটির গন্ধ যায় নাই তো, রক্ত গরম, তাই মাঝে মইধ্যে দুই একটা আউল ফাউল কথা বাইর অইয়া যায়, মানে বের হয়ে যায়। আপা, আপনি তো আবার অশুদ্ধ ভাষায় কথা শুনতে পারেন না, তবে ম্যাডাম, আমার মতে এডাই হইল গিয়া শুদ্দু ভাষা, মানে যেডা গণমানুষের ভাষা, আপনের অই বইয়ের ভাষায় কথা কইব, হইল গিয়া ইন্দুর আর বইপোকা মানে বুকওয়র্ম। মানে য্যারা বই খায়, বইয়ের ল্যাখা খায়। অই বঙ্গবন্দুতেও কিন্তু এই গণমানুষের ভাষাতেই কইতো, সাত কোটি মানুষরে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আর এখন কিন্তুক ম্যাডাম, ছরি আপা, সাত দুগুনে চৌদ্দ প্লাস দুই, ষোল্ল কোটি মানুষÑ তাগোও দাবায়ে রাখা যাবে না। তাদের ভাষা তাদের চাহিদা নিয়াই কিন্তুক আপনাদের চলতে হবে বুঝলেন তো ম্যাডাম। সরি, আপা, আবার আপনারে রাগায়া দিতাসি মনে হয়…।
নূরুল আমিন ফিঁচেল হাসিমাখা মুখে কথাগুলো বলতে থাকে।
মাইক্রোফোনটা স্ট্যান্ড থেকে খুলে হাতে নিয়ে ডাংগুলির ঘুঁটির মতো আঙ্গুলের প্যাঁচে খেলিয়ে একটা ডিগবাজি লুফে নেয়। মুখের সামনে যন্ত্রটা নিয়ে কী একটু পরখ করে। সে কি এখন মাইকে তার এসব ‘আউল ফাউল’ কথা বলা শুরু করবে? আমি দাঁড়িয়ে আছি ডায়াসের সামনে। আমাকে শুরু করতে হবে আজকের অনুষ্ঠান। আমার সামনে ছিল মাইক। এখন সেটা ছিনতাই হয়ে গেল নূরুল আমিনের হাতে!
নূরুল আমিন মাউথপিসটাতে প্রচ- একটা ফুঁ দেয়। থুতু ছিটানো একটা ঝোড়ো বাতাস যেন সারা অডিটোরিয়ামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্ট্যান্ডে আবার মাইকটি সেট করে দিয়ে সে আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে।
Ñ মাইক ও-কে। নেন ম্যাডাম।
ওর মুখ থেকে কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ বের হচ্ছে। সকালে কী খেয়ে এসেছে কে জানে!
Ñ শুরু করেন ম্যাডাম। অডিয়েন্স বাড়ার আর কোনো আশা নাই। আপনের আশার গুড়েবালি আপা। স্যার-ম্যাডামরা সবাই বাসায় নাকে ত্যাল দিয়া ঘুমাইতেছে নয়তো জি-বাংলায় সিরিয়াল দেখতাসে। আমরা কয়েকজন সিনসিয়ার মানুষই কেবল হাজির। আর পোলাপানে তো এইসব ইতিহাস শুনতে চায় না। তারা ফেসবুক টুইটার হোয়াটস অ্যাপ ভাইবার লইয়া বইসা আছে, নয়তো গুগুলে ইন্দুর চালান দিতাসে, মানে কম্পুটারে মাউস গুতাগুতি করতাসে। আজকালকার পোলাপান হইল বদের বদ, আসল বান্দরের স্পেসিস। এগুলারে কেমনে কী শিক্ষা দিবেন আপনে। আপনে তো ব্লগ ফেসবুক এইসব দ্যাখেন না। কি যে হাবিজাবি পোস্ট দেয়। কী সব ইনফো আর ছবি! যাক ওইসব না দেখাই ভালো। আপনের মাথা গরম হইয়া যাইবো।
নূরুল আমিনের খয়েরি চোখের ভেতরে দুটো বাতিশলা ইঁদুর কুটকুট করে ঘরের বেড়া কাটে। আবার পেঁয়াজের গন্ধ।
Ñ ম্যাডাম-আপা, ঘোষণা শুরু করেন, জনক কলাম রাইগা যাইতাসে। আর ম্যাডাম বলায় আপনি রাইগেন না। সব ম্যাডামরে ম্যাডাম বলি তো শুদু আপনেরে আপা বলতে গিয়া তাই আমার ভুল হইয়া যায়।
আশ্চর্য! আমার রাগ কোথায় গেল। আমি কি রূপকথার গল্পের মতো দুষ্ট জাদুর প্রভাবে পাথরে পরিণত হয়েছি! আমার প্রথম দায়িত্ব তো বেয়াদব-বেল্লিক বাচাল নূরুল আমিনের তামাটে দুই গালে প্রচ- থাবায় দুটি চড় বসিয়ে দেওয়া, তারপর ওর গোময়লিপ্ত মগজটিকে বত্রিশ নম্বরের সিঁড়িধোয়া পানি দিয়ে পরিশুদ্ধ করা। সেটা কীভাবে করব আমি! আমি স্থাণুদেহে চড়চড় করে মোচড় তুলি। পেছনে, ব্যাকড্রপে, আমার দৃষ্টিজুড়ে জনকের অগ্নিভ মুখ। বল্লমের মতো একটি উত্তোলিত হাত।
ব্যাকড্রপের ডিজাইনে রক্তস্নাত বাংলাদেশের মানচিত্রের রেখার ভেতরে আরও কতগুলো জ্বলন্ত রেখায় জমাট বেঁধে ওঠা মুখটি থেকে কি একটা আগুনের চাবুক হিসসস করে ওঠে! কম্পাসের বিশাল কাঁটার মতো নিশানা করা হাতের আঙ্গুল থেকে ছড়িয়ে পড়ে বৈদ্যুতিক কম্পন! আর যদি একটা গুলি চলে…
গুলি চলছে! গুলি চলছেই! কে কাকে হত্যা করছে এখন?
এখন কি আবার আয়ুব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার বন্দুক তাক করা হয়েছে এদেশের মানুষের ওপরে?
ছাত্রের ওপরে? জনতার ওপরে? ব্যারাকের বাঙালি সৈনিকের ওপরে?
গুলি ছুটছে? ছুটে যাচ্ছে অজস্র জ্বলন্ত আগ্নেয় শিলা?
আমি শুনতে পাই একাত্তুরের সাতই মার্চে রমনার ময়দান থেকে ইথারে ছড়িয়ে পড়া সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠÑ আর যদি একটা গুলি চলে… আর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়…।
তারপরেও ওরা গুলি চালিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর। নারী শিশু বৃদ্ধের ওপর।
আর নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ওই রমনার ময়দানেই ওদের গুলিভরা বন্দুকগুলো সমর্পণ করতে হয়েছিল।
কিন্তু তারপর? তারপর সেই অস্ত্রগুলোর কী হলো? হাতবদল হলো! আরও হাত! কালো বাদামি খয়েরি লোমশ হাতের থাবায় থাবায় বন্দুক। গুলি চলছে! আবার নূর-ডালিম-রশীদ-ফারুক-মোসলেমদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে বাংলার মানচিত্র? বত্রিশের সিঁড়িতে গড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর শুদ্ধতম গাঢ়তম লাল রক্ত! ঘাতকের গুলিতে উড়ে যাচ্ছে স্ত্রী পুত্র পরিজনের মাথার মগজ। কারাগারের তালাবদ্ধ কক্ষে বন্দী নেতাদের বক্ষ ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে কালো দানবের হাত। সেসব ইতিহাস লোমশ কম্বলের তলায় কেউ চাপা দিয়ে রাখছে। আবার তাতে কেরোসিন ঢেলে বহ্নি-উৎসব করার করতাল তালে উদ্বাহু নৃত্য করছে প্রেতের দল।
চলছে ইতিহাসে গুলি, সংবিধানে গুলি, ভাষা আর সংস্কৃতিতে গুলি, রাষ্ট্রতন্ত্রে গুলি।
গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে পাঠ্যপুস্তক, মেধাবী ছাত্র, বিদ্যাপীঠ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর স্মৃতিসৌধ…।
আমি লক্ষ করি মাইক্রোফোন বাহিত হয়ে আমার কথাগুলো অডিটোরিয়ামের পিলারে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে কাতরাতে থাকে। দু-একজন ছাড়া কেউ আমার কথা শুনছে না। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
এ প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়ামটি নির্মাণের পরে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাউন্ডপ্রুফ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর তা হয়নি। বাইরে তখন চারপাশে অন্তত চার দুগুনে আট জায়গা থেকে আকাশ ফাটানো তীব্রতায় মাইকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর কোরআন তেলাওয়াত বাজানো হচ্ছে। আগে এ দিনটাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান বাজানো হতো। এখন ‘সময়ের দাবি’ মেনে নিয়ে গভর্নমেন্ট তার পলিসিতে নানারকম ব্যালেন্স আনছে। মৃত্যু দিবসে মৃতের আত্মার মাগফিরাত কামনা তো আর গানবাজনা দিয়ে হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শোক দিবস উদযাপনের সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাই আছে রচনা আলোচনা ইত্যাদির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামদ না’ত ক্বিরাত প্রতিযোগিতা আর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া মাহফিল করার নির্দেশ। আমার মনে হচ্ছে, টুঙ্গিপাড়ার মৃত্তিকা গহ্বর থেকে ঝাঁঝরা বুকের ফোকরগুলো দুহাতে চেপে ধরে ওই মানুষটিকেই উঠে আসতে হবে তার মৃত্যু দিবসটিকে একটু শান্তিময় করে তোলার জন্য।
প্রচ- শব্দের তাড়নার মধ্যে আমার কথাগুলো সহকর্মীদের গল্পগাছা আর ছাত্র-ছাত্রীদের চেঁচামেচির ভেতরে পড়ে এখন জল বিনে মাছের মতো তড়পাতে শুরু করে।

গোলাঘরের ইঁদুরগুলো…
আর যদি একটা গুলি চলে… আর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়…
গুলি চলছে। একটু আগে নূরুল আমিন গুলিতে ফুটো করে দিয়ে গেছে জনকের শোক। তাকে আমি খুনি বলি। ঘাতক। সে দর্শকের আসনে বসে পাশের সঙ্গীর সাথে আমাকে মঞ্চের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে কিছু বলে। কথা বলে। হাসে। পা নাচায়। গালপাট্টা দাড়ি ঘচঘচ করে চুলকায়।
নূরুল আমিনের সহচর আমজাদ হোসেন। প্রায় একই বয়সী। ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক। ‘নন্দিত জীবন নিন্দিত মরণ’ নামে সে একটি বই লিখছে। কদিন আগে আমজাদ তার পা-ুলিপি এনে আমাকে দিয়ে অনুরোধ করল একটু শুভেচ্ছা বাণী লিখে দিতে। আমি সেই বই পড়তে গিয়ে দেখি নন্দিতজনের তালিকায় আছেন সক্রেটিস পিথাগোরাস এডলফ হিটলার ইমাম হাসান ইমাম হোসেন আবু হানিফা মনসুর হাল্লাজ।
হিটলার? নন্দিতজন?
আমজাদ মাথা ঝাঁকায়। অফ কোর্স। নাৎসী নেতা হিসেবে সে হয়তো সমালোচনার পাত্র। কিন্তু তার দেশে তো তিনি বীর। দিকবিজয়ের কী তীব্র বাসনা! এই বাসনা তাকে আমৃত্যু ছুটিয়ে মেরেছে। পরাজয় তাকে ছুঁতে পারেনি। এমন কি মৃত্যুও তার কাছে হার মেনেছে। তাকে কিন্তু এভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
Ñ জার্মানির হিটলার গ্রিসের সক্রেটিস ইরানের হাল্লাজ আরবের হাসান হোসেন… কিন্তু বাংলাদেশের…
আমজাদ আমাকে কথা শেষ করতে দেয় না। মোরগের মতো মাথা ঝাঁকায়।
Ñ ইরানের মরমী সাধককবি মনসুর হাল্লাজের কথা ধরেন। কী অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শক্তির একজন মানুষ! যে কি না নিজের কলবের ভেতর আল্লাহকে উপলব্ধি করে বলেন আনাল হক, আমিই খোদা, আমাতেই আল্লাহ! সেই সক্রেটিসের মতো Ñ নো দাইসেলফ। আর খলিফার আদেশে তাই তার হাত পা জিভ গলা টুকরো টুকরো করে কাটা হয়। কনুই-কাটা হাত দিয়ে নিজের রক্তে নিজে অজু করে নামাজ পড়তে পারে যে মানুষ তিনি কি সাধারণ মানুষ বলেন, হাল্লাজকে নিয়ে তার দর্শন আর কবিতা নিয়ে আমাদের অনেক চর্চা হওয়া দরকার।
জ্ঞানীগুণী মহান সব মানুষকে নিয়েই চর্চা হওয়া দরকার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? তাকে নিয়ে চর্চা হবে না? শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ, নন্দিত যে মানুষটির সমগ্র জীবন উৎসর্গিত ছিল দেশের মানুষের জন্য, যার করুণতম মৃত্যু গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়Ñ তাকে ছাড়া এ তালিকার মূল্য কী। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী?  স্বদেশের, প্রতিবেশী দেশের এসব নন্দিতজনদের ট্র্যাজিক মৃত্যু আমজাদের কাছে নগণ্য বলে মনে হলো!
আমি পা-ুলিপিটি গোল করে মুড়িয়ে ফেলি। এ পা-ুলিপির জন্য আমার কোনো শুভেচ্ছা বাণী নেই। এটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করা। ‘নিন্দিত বাণী’ লিখে দিতে পারি।
আমজাদ চোখের ভেতর থেকেও সেদিন ইঁদুরের সুড়ঙ্গ বেরিয়ে এসেছিল। নাক ফুলিয়ে কথা বলেছিল আমজাদÑ
Ñ প্রতিবেশী দেশ হলে কী হবে। ওরা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কলকাতায় আমার পরিচিত এক কবি আছেন। আমাকে বলেছিলেন, তোমাদের দেশটা আমরা দখল করে নেব। তাহলে আর ভিসাটিসার ঝামেলা থাকবে না। আসলে একাত্তুরেই ওদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে দেশ। তা নইলে এই দু হাজার চৌদ্দতে এসে হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারত না। তবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু অবশ্যই ট্র্যাজিক। কিন্তু অনেকের কাছেই তিনি বিতর্কিত এটা মানতে হবে। তাই… তাছাড়া, হাসান হোসেন হানিফা হাল্লাজ এদের কথা তো আজকের প্রজন্ম তেমন করে জানে না। এদের ট্র্যাজেডিও গ্রিক ট্র্যাজেডির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
আমজাদ কি এদেশের নাগরিক?
তার পূর্বপুরুষ কি এদেশের জল হাওয়া মাটি শস্য নিয়ে জীবনযাপন করেছে?
বাংলা কি আমজাদের জিভের সচলতায় প্রতি মুহূর্তে ধ্বনিত?
যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
আমজাদ কি কখনও এ লাইনগুলো শুনেছে?
চরম ক্রোধে নন্দিত জীবনের পা-ুলিপি আমি সিঁড়ির নিচে ছুড়ে দিয়েছিলাম। তাতে করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল আমজাদ। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক সম্পর্কে ওর মুখ থেকে বিকৃত ইতিহাস আর জঘন্য বানোয়াট মিথ্যা কাহিনি ছাগলের পায়ুপথের মলগুটির মতো ছররা গুলি ছুড়তে থাকে।

আগুনরঙা একটি শাটিন ব্যান্ড…
নূরুল আমিনকে আমজাদের সাথে তুমুল বেগে গল্প করতে দেখি আমি।
নূরুল আমিন কি সাড়ম্বড়ে আজ সকালে আমার সাথে তার বচসার কাহিনি আমজাদকে শোনাচ্ছে! আমার দিকে বারবার তার সতর্ক দৃষ্টিনিক্ষেপে সে-কথা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয় না।
জাতীয় শোক দিবস উদযাপন উপলক্ষে আজ সকাল আটটায় ছাত্র-শিক্ষক সবার কলেজে আসার নোটিস ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ আগস্ট যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য সরকারি নির্দেশ আছে। কলেজের সাংস্কৃতিক বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায় এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করার। সকালে ব্যস্ততার এক ফাঁকে মাঠের মাঝখানে আমার মুখোমুখি নূরুল আমিন।
মাথার  চুলে পা-ব ভঙ্গিতে হাতের থাবা ঘষতে ঘষতে আমাকে বলে, ‘কী ম্যাডাম-আপা, আপনার গুল্লি দিবসের আয়োজন কতদূর? জলদি-জলদি আমাগোরে ছাইরা দেন। ছুটিডারে মাডার কইরেন না। বাসায় যাইয়া খিচুরি গরুর মাংস খাইয়া ঘুম দিমু।’
Ñ গুল্লি দিবস মানে?
নূরুল আমিন হাতের পাঞ্জা দিয়ে দানবের মতো খাবলে ধরে নিজের মাথার চুলÑ ‘গুল্লি দিবস না? আইজকার দিনে তো বঙ্গবন্দুরে গুল্লি কইরাই মারছিল। তার বউপোলাপান আ-াবাচ্চা সবার জন্য গুল্লি! তাই গুল্লি দিবস। হে হে হে…।’
Ñ আপনি এ নিয়ে মজা করছেন? রসিকতা?
Ñ কী করমু? জনগণের নেতা, হে গুল্লি খাইয়া মইরা গিয়া জনগণের জন্য একটা ছুটির দিনের ব্যবস্থা কইরা গেল। আর আপনেরা সেই ছুটি আমগোরে ভোগ করতে দেন না। নিয়া আইলেন কলেজে।
Ñ আমি নিয়ে আসব কেন, এটি সবারই নৈতিক দায়িত্ব…
Ñ আরে রাখেন আপনের নৈতিক দায়িত্ব। নৈতিক দায়িত্বের মানে জানে কেউ? যে দ্যাশে পরধান মন্ত্রী থেইকা শুরু কইরা মন্ত্রীমিনিস্টার কারও নীতি বইলাই কোনো জিনিস নাই, সেখানে আর নৈতিক দায়িত্বের সুরা পইড়েন না তো আপা! জানেন, আসার সময়ে দেখলাম আমাগো গলির ভিতর থাইকা একটা ক্যাচড়া পোলাপানের মিছিল বাইরাইতাসে। গুল্লি দিবস গুল্লি দিবস জিন্দাবাদ বইলা হেরা সোলোগান দিতাসে। ম্যাডাম দেখেন, আমাগো ছাত্রমাত্র কিন্তু বেশি আসে নাই। তারা আবার তাদের গলিতে গুল্লি দিবস করতে গেল কি না…
নূরুল আমিন আবার দুষ্টু ছাত্রের আদলে একটি সারল্যমার্কা চতুর হাসি হাসে।
আমি স্থানকাল ভুলে একটা চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। আপনি একটা রাজাকার। একাত্তরের চেয়েও জঘন্য রাজাকার। আপনার ফাঁসি হওয়া দরকার। আপনি আমার সামনে থেকে যান।
চাপাকণ্ঠে নূরুল আমিনও গর্জে উঠেছিলÑ
Ñ কীসের রাজাকার? কে রাজাকার? তাইলে আপনেরা আরও বড় রাজাকার। আপনাদের মতো ভক্তিমানেরা পঁচাত্তরে সেই গুল্লি মারার দিন সবাই যাইয়া গর্তে সান্দাইছিলেন। কেউ তো একটা পরতিবাদ করেন নাই। আপনেগো ভক্তি খালি গালভরা বক্তৃতায়।
আমার চেয়ে পঁচিশ বছরের জুনিয়ার নূরুল আমিন চূড়ান্ত গোঁয়ারের মতো আমার মুখের সামনে আঙ্গুল নাড়িয়ে কথা বলে। ক্লেদাক্ত সরীসৃপের মতো তার আঙ্গুল আমার নাকেমুখে কিলবিল করে বেয়ে উঠতে থাকে। আমার ক্রোধ জমাট বেঁধে কেলাসিত হয়। আমি স্থির চোখে তাকাই নূরুল আমিনের দিকে। তার ধূর্ত ইঁদুর চোখজোড়া লক্ষ করে ঠা-া গলায় বলি, ‘এই মুহূর্তে একটা পিস্তল আমার হাতে থাকলে একটা গুলি আপনার কপালে ফুটিয়ে দিয়ে আমি আর একটা গুল্লি দিবস বানাতাম।’
আমার কথা শুনে নূরুল আমিন মহাকৌতুকে বত্রিশ দাঁত বের করে ‘ওরে বাবা, খাইছে আমারে’ বলে দৌড়ে পালায়।
আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে।
কপাল টনটন করে ওঠে।
রাজাকারের ফাঁসি চাই।
উত্তাল শাহবাগ-এর আগুনরঙা একটি শাটিন ব্যান্ড আমার মাথায় আগুনপটি। নব্য রাজাকারদের ফাঁসি চাই।
কেউ এসে আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে মাইকের সামনে থেকে সরিয়ে নেয়। এসব কী বলছেন? আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! এটা কি রমনা না শাহবাগ? কী আবোল-তাবোল বলছেন?

খচমচে প্রেসক্রিপশন…
আমাদের কলেজের ডাক্তার খবিরুল হাসান আমার প্রেশার চেক করেছেন। পাল্স দেখেছেন। দ্রুত চলছে নাড়ি। স্নায়বিক উত্তেজনা, হতেই পারে। এ বয়সে এটা স্বাভাবিক।
Ñ আপা, শুনেন, ব্যক্তিভেদে রাজনৈতিক মতদ্বৈধতা থাকতেই পারে। তবে আপনাকে অনেক ধীরস্থির মাথার মানুষ বলেই জানতাম। আজকে এমন হয়ে গেল কেন…
ভাইস প্রিন্সিপাল টেবিলের কাচে পেপারওয়েটটি উল্টো করে চার আঙ্গুলের কারিশমায় লাটিমের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে কথা বলেন।
Ñ ডাক্তার সাহেব, আপাকে ভালো একটা প্রেসক্রিপশান দেন। রিলাক্সিন জাতীয় কিছু। নার্ভাস স্ট্রং করে এমন কিছু। শুনেন আপা, কিছু কিছু জিনিস আছে যেসব নিয়ে বেশি মাতামাতি করতে নেই। জানেন তো কড়া পাকে দড়ি ছেঁড়ে। আমাদের কাজ ছাত্র পড়ানো। বইপুস্তকে যা আছে ক্লাসে তা পড়িয়ে দেবেন। বছর শেষে পরীক্ষাটা যাতে ভালো দেয়। বাপ-মা কিন্তু তার ছেলেমেয়ের ভালো রেজাল্টটাই চায়। কাজেই সব কিছুতে সিলেবাসের পড়াটুকু জানলেই এনাফ…
প্রেসক্রিপশান লেখা হয়ে যায়। আমার চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বক, আমার শাড়ির ভাঁজ, খোঁপার ফাঁস, ব্যাগের পকেটÑ সব কিছু প্রেসক্রিপশানে ভরে উঠতে থাকে।

একটি লেবুর ভ্যান…
রাস্তায় নেমে আমি উল্টোদিকের ফুটপাতের ধূলিধূসরিত কাঠচাঁপা গাছটির তলায় একজন বৃদ্ধ চালকসহ একটিমাত্র রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। রিকশাচালক কী কারণে যেন আমাকে বিনা দরদামেই তার বাহনে তুলে নেন। হয়তো আমার ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা তাকে আমার প্রতি মায়ার্ত করে তুলেছিল। আমারও বুড়ো মানুষটির প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি জেগে ওঠে। যা ভাড়া চাইবে দিয়ে দেব। ব্যাগ খুলে আমি খুচরো টাকার পরিমাণটা দেখে নিই।
আমার ব্যাগের পকেটে, প্রতিটি চেম্বারে, মগজের কোষে, কানের ফুটোয় প্রেক্রিপশান খচমচ করতে থাকে।
রিকশা চলতে থাকে। চলুক।
আচমকা একটা বন্য সুবাস। তাজা লেবুর গন্ধের একটা ঝাপটা। গন্ধটা আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, মনে হলো আমার শরীরই একটা আস্ত লেবুগাছের মতো ডালপালা মেলে দিয়েছে। এতক্ষণ যে বাওকুমটা ধুলোর ঘূর্ণি আমার শরীরের ভেতরটা ড্রিল মেশিনের মতো খুঁড়ে চলছিল সেখানে একটা আরাম আসে। সবুজ লেবুর গন্ধটাকে এখন আমি দিব্যি ভাবতে পারছি পতাকার রং। সেখান থেকে সতেজ হাওয়ার সুগন্ধী রসের গুঁড়া এসে আমার চোখে-মুখে চৈতন্যের ছিটা দিতে থাকে। শীতল সৌরভ রমজানের সন্ধ্যার শরবতের মতো আমাকে ভিজিয়ে দিতে থাকে। আমি ক্যাটক্যাট করে চোখ মেলি। যেন আমার চোখের সামনে এতক্ষণ কিছুই ছিল না। বা কিছু ছিল অসুস্থ, মøান, কুষ্ঠ রোগীর পচে যাওয়া গলিত আঙ্গুল নোখ নাড়িভুঁড়ি কাকচিল বারুদআগুন। আমি দম টেনে রঙিন গন্ধটা নিই। আমার ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে লেবু-আস্বাদিত কথা।
Ñ ইস, কি দারুণ গন্ধ। খুব তাজা তো লেবুগুলো! মনে হচ্ছে এইমাত্র গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে। এত তাজা লেবু আজকাল পাওয়া যায়!
Ñ হ, পাওয়া যায়। লেবু অহনও জাউরা হয় নাই। তাই লেবু ঠিক আছে।
আমার রিকশাওয়ালার মুখ থেকে বন্দুকের গুলির মতো আচমকা বেরিয়ে আসে কথা কটি। লেবুর সবুজ টিলা বসানো ভ্যান গাড়িটি ততক্ষণে আমাদের রিকশা ছাড়িয়ে অনেকটা সামনে এগিয়ে গেছে। আমি সেদিকে চেয়ে জারজ আর বৈধ লেবুর তারতম্য আবিষ্কারে চোখ দুটোকে উড়ন্ত হারপুনের মতো ছুড়ে মারি।
ওদিকে রিকশাওয়ালার স্বগতোক্তি ছটাছট বেরিয়ে বাতাসের পর্দাগুলোকে ফুটো করে দিতে থাকে।
Ñ দেখবেন বাজারে এহন কোনো মাছ আসল নাই। সব অইল চাষ। এরা সব জাউরা। এগো কারও কোনো রং-চেহারা বাপ-দাদার লাহান না, চরিত্র তো না-ই। খাইতে স্বাদ নাই। লাউ-কুমড়া-পটোল-আলুুু-কইডা-ফুলকফি-পাতাকফি সব জাউরা। এগো শইলডা বড়, রঙডা ঘোলা, স্বাদটা পাইনসা। খালি লেবুডা অহনও আসল আছে। তাই লেবুর গাড়ির থাইকা এমুন সুবাস ছড়াইয়া পড়ছে।
নাসারন্ধ্রে লেবুর সৌরভ মুহূর্তের জন্য আমাকে একটি সতেজ সবুজ বাগানে দাঁড় করিয়ে দিলেও বাতাস চিরে তখনও দশ দিকে ছড়িয়ে পড়ছে মাইকে বাজানো বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ। অদূরেই একটি খোলা মাঠে শোক দিবসের জনসভার আয়োজন চলছে। ডিজিটাল পোস্টারে ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ দীপ্ত মুখের দৃপ্ত ভঙ্গিমার ছবি। ফুটপাতে বাদাম আমড়া ডালপুরি চা সিঙাড়ার অস্থায়ী দোকান। মানুষের ভিড়।
আমার রিকশাচালক সেদিকে চেয়ে আবার ছেড়ে দেওয়া কথার লেজটা ধরে ফেলেন।
Ñ ওই যে কত সব মানুষ। চাইরপাশে সব মানুষগুলা দ্যাহেন না? বাইরে নাকমোখ আছে তয় ভিতরটায় মানুষ নাই। খালি ঝুটা আছে। লেবুর লাহান তাজা আসল মানুষ আছিল একজনই। তারে সইজ্য অয় নাই। জাউরারা তারে মাইরা ফালাইল। জাতির পিতারে কুলাঙ্গার সন্তানেরা মাইরা ফালাইল। জাউরার আবার বাপের চিন্তা থাকে নি?
কী বলতে চান আমার চালক?
প্যাডেলে দ্রুত পা চালান তিনি। বাতাসে তার শুভ্র পাতলা চুল আর দাড়ি উড়তে থাকে।
আমাকে তিনি কোথায় নিয়ে যেতে চান? তিনি কি আস্তাকুঁড় থেকে নিকোনো প্রাঙ্গণের দিকে বোররাক ছুটিয়ে দেওয়া দেবদূত? সত্যের দিকে, ইতিহাসের দিকে, বেদনা আর রক্তময় জন্মমৃত্তিকার দিকে তার বাহনের সম্মুখচক্র তীব্র সেঁধিয়ে দিয়ে তার ধুলোমাখা নগ্ন পায়ের তলায় দৃঢ়ভাবে চেপে রাখবেন প্যাডেল?
বাতাসে আমার শাড়ির কুচি ফুলে ওঠে। আমার খোঁপার ফাঁস খুলে যায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান উড়ে যায়।
আমি কাঙ্গালের মতো আমার শ্রবণ মেলে ধরি।
কী বলছিলে গো তুমি? ও ভাই? তোমার নাম কী ভাই? তোমার কথাগুলো বলো আমাকে।
তিনি কেমন উদাস চোখে আমাকে একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখেন। আমাকে যেন তার বলার কিছু নেই। আমি কে-ই বা। হয়তো বা আমাকেও তিনি ভেবে নিয়েছেন জারজগোত্রের একজন। আপনমনেই কথাগুলো তিনি শস্যের চারার মতো তার পায়ের গোড়ালি চেপে চেপে প্যাডেলের ওপরে বসিয়ে দিতে থাকেন।
Ñ আহহা রে! কেমনে এমুন মানুষটারে মারলো? যে মানুষটা দ্যাশের জনগণের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করলো, জীবন ভইরা জ্যাল খাটলো তারাই তার বোকে গুল্লি চালাইলো। ক্যামনে পারলো এমুন এ্যাকটা মানুষের বোকে গুল্লি চালাইতে! তার বোকটা তো আছিলো এই দ্যাশটার সমান বড়। হেই বোকটারে ঝাঁজরা কইরা দিল! এখন এত বছর বাদে তিন-চাইরজন বুইড়া মানুষরে ফাঁসি দিয়া কী অইল। বিষনাগের ছানাপোনায় তো দ্যাশ ভইরা গেছে। অহন দিনে রাইতে হাজারবার হাসিনায় তার বাপের ভাষণ শুনাইয়াও কোনো কামিয়াব অইতে পারবো না। কেমনে অইবো। তার চাইরোপাশে সব ধান্দাবাজ মানুষ। অমানুষ। সব ঘরের ইন্দুর গোলার ধান খাইয়া ফালায়। অই যে বঙ্গবন্দুতে কইতো আমি কম্বল আনলাম গরিবের জন্য আর চাটার দল সব খাইয়া ফালাইল…।
হয়তো বা একটা ক্ষোভের ষাঁড় তাড়াতে লেগেছেন তিনি। দ্রুত প্যাডেল।
আবার লেবুর ভ্যানটাকে ধরে ফেলেছেন তিনি। আবার বাতাসে লেবুর ঝাপটা। এবার তিনি চেতনপুরে।
Ñ খালা, লন গন্ধ লন। তাজা গন্ধ। দেহমন চনমন কইরা উঠবো। চাইরপাশে এত আবর্জনা আর দুর্গন্ধ। তার মাঝে এই লেবুর গন্ধটা য্যান সব কিছু ফ্রেশ কইরা তোলে। সারা দ্যাশে লাখ লাখ লেবুর ভ্যান ছাইরা দিলে ভালো অইতো, না-কি কন!
স্বজ্ঞান হাসিতে দার্শনিকের প্রজ্ঞায় আলোকিত তার মুখ। এক ঝলক আমার দিকে সেই মুখ নিয়ে তাকিয়ে আবার রাস্তা দেখে প্যাডেলে চাপ দেন। কী ভেবে আবার আমার দিকে ফিরে তাকান।
Ñ কিছু মনে কইরেন না খালা। মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। মনের খেদে কতক্ষণ বকরবকর করলাম। আপনে আমার নাম জিগাইছিলেন। গরিব রিকশাওয়ালার নাম কেউ জিগায় না। জিগাইলেও তাগো নাম কেউ মনে রাখে না। আমার নাম জসীমউদ্দীন। তয় মজিব ভাই আমার নাম মনে রাখতো। কইতো কী রে জসীম, খবর কী। ভালো আছস না-কি? কত ভালোবাসতো আমারে।
Ñ মজিব ভাই? মানে বঙ্গবন্ধু?
Ñ হ, বঙ্গবন্ধু।
Ñ আপনি রাজনীতি করেন? আমার অজান্তেই তার প্রতি আমার সম্বোধন বদলে যায়।
মাথায় দৃঢ় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চালক মুখ ঘোরান আমার দিকে।
Ñ হ, করতাম, রাজনীতি করছি। আমি অইলাম বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। মজিব ভাইয়ের সাথে কত মিছিল করছি! কী একটা মানুষ আছিল মজিব ভাই। কথা কইত মোখ দিয়া না, য্যান কইলজাডা দিয়া। হের মাইয়া হাছিনা তো বাপের লাহান অইতে পারে নাই। বোকের হেই জোরডা-ই তো নাই।
Ñ আপনি কি শেখ হাসিনাকে দেখেছেন?
Ñ হ দেখছি। রাস্তায় যখন আন্দোলন করতো। জনসভায় বক্তৃতা দিতো। রিকশা থামাইয়া রিকশার উপরে খাড়ায়া তারে দেখতাম। মনে করতাম মজিব ভাইয়ের মেয়ে। আমাগো মাইয়া। বলতাম, হাসিনা তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে। সে তো তখন আছিল রাজপথেরই নেত্রী। তয় রাজপথ ছাইরা সংসদে গিয়া হে হইয়া গেছে সংসদ নেত্রী। তার চাইরপাশে  নানান কিছিমের মতলববাজ, স্বার্থপর আর চাটুকারের দল। এহন আর তাগোর কাছে আমার মতো গরিব রিকশাওয়ালা যাওয়ার সুযোগ নেই। তাগো দরগা ক্ষমতার গদি। আমাগো দরগা বত্রিশ নম্বর, আমাগো দরগা টুঙ্গিপাড়া। তহ আমাগো ভরসা বঙ্গবন্ধুর মাইয়া শেখ হাসিনা। হে সব বুঝে।
তীব্র স্বরে রিকশার বেল বাজে। সামনে নিশ্চয়ই কোনো বাধা। জসীম শক্ত হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে রাস্তার একটি খন্দক পেরিয়ে যান।

Category:

মুক্তিযুদ্ধের গল্প : রক্তঋণ

Posted on by 0 comment

চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে ফসলের মাঠ। বেশিরভাগ ক্ষেতেই সোনালি ধান ও পাট। আগের যে কোনো মৌসুমে গ্রামবাসীদের মধ্যে এ সময় ধান কাটার ধুম লেগে যেত। কিন্তু এখন শূন্য মাঠ। কদাচিৎ লোকজন চোখে পড়ে। কেউই মাঠে যেতে সাহস করে না।

PfcMহারুন হাবীব: গারো পাহাড়ের পাদদেশের অঞ্চলটি অপূর্ব সৌন্দর্যম-িত। প্রকৃতি যেন নিখুঁত শৈলীতে অনিন্দধারার সৌন্দর্য এঁকে দিয়েছে নিজের শিল্প ভাবনায়। পুবদিকে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়। বেশিরভাগই পড়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানায়। বাংলার ভাগ্যে যা জুটেছে তা কেবলই ছিটেফোঁটা। আর সেখান থেকেই সবুজ চা-বাগানের ঢেউ তোলা শরীরের মতো নিচের দিকে নেমে গেছে পেলব সমতল। এখানটায় দাঁড়ালে তফাৎটা স্পষ্ট বোঝা যায়। পাহাড় আর সমতলের দুই শরীর। পাহাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকালে চোখে পড়ে বাংলার গ্রাম, তাল ও বটগাছ, বাঁশঝাড়, আঁকা-বাঁকা নদী, খাল-বিল।
এখন হেমন্তকাল। গেল বছরেও এ সময় বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে টানা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পর টানা রোদ। সে-রোদে ধান ও পাটক্ষেতের জমা পানি টানতে শুরু করেছে। পা ফেললে এখন আর কাদামাটি আটকে ধরে না। অপেক্ষাকৃত কাঁচা মাটিতে মানুষের দাগ বসে। পদচিহ্ন আঁকা হয়। রোদে সে-দাগ শক্ত হয়। চিহ্ন থেকে যায়।
পাশেই ধানুয়া গ্রাম। চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে ফসলের মাঠ। বেশিরভাগ ক্ষেতেই সোনালি ধান ও পাট। আগের যে কোনো মৌসুমে গ্রামবাসীদের মধ্যে এ সময় ধান কাটার ধুম লেগে যেত। কিন্তু এখন শূন্য মাঠ। কদাচিৎ লোকজন চোখে পড়ে। কেউই মাঠে যেতে সাহস করে না। যে কোনো সময় পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে ছুটে আসতে পারে মর্টারের গোলা কিংবা মেশিনগানের গুলিÑ যা শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেবে। নবান্ন উৎসবের বদলে এখন শোনা যায় মর্টারের শেল ফাটার বীভৎস শব্দ, রাইফেল ও মেশিনগানের কানফাটা আওয়াজ। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আকস্মিক এই পরিবর্তনটিও যেন স্থানীয়দের গা সওয়া হয়ে গেছে! তবে এ পরিস্থিতিতেও ফসলের ক্ষেতগুলোতে সন্তর্পণে চলাচল করে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা।
বিস্তীর্ণ সীমান্ত-ঘেঁষা অঞ্চলটিতে বাঁশ, ঝোপঝাড়, আম-কাঁঠাল আর কলাবাগানের কমতি নেই। কিন্তু ধান পাকার এই সময়টায় সব সৌন্দর্য উপচে দিয়েছে বাতাসে দোল খাওয়া সোনালি ধানক্ষেত। মাঝে মধ্যে বাবুই আর শালিকেরা ঝঁাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে। এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে যায়। ওরা ধান সাবাড় করে। অন্য কোনো বছর হলে কৃষকের ছেলেমেয়ে কিংবা গৃহস্থ বউরা পাখিদের ঠোঁট থেকে শ্রম-ঘামের ফসল বাঁচাতে চেষ্টা করত। আজ তারা অসহায়। অতএব আনন্দের সীমা নেই পাখিদের।
সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়গুলোতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে নাম লিখিয়েছে বেশিরভাগ যুবক। ভয়ার্ত নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সীমান্ত বরাবর তৈরি রিফ্যুজি ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। পাকিস্তান ও ধর্ম রক্ষাকারী (!) সৈন্যদের নির্বিচার আক্রমণে গোটা দেশ জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। অতি-বৃদ্ধ এবং কিছু কিছু বয়স্ক পুরুষ বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে মাথায় টুপি লাগিয়ে, সৈন্যদের লরি দেখলেই ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ সেøাগান দিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এতে সৈন্যরা আশ্বস্ত হয়ে গুলি করা থেকে বিরত থাকছে। কারণ ওরা ‘খাঁটি মুসলমান’ চায়!
ওরা পাঁচজন। ধানুয়ার পাঁচ নম্বর বাংকার থেকে ওরা পাঁচজন বেরিয়ে আসে বিকেলের দিকে। জায়গাটা বিপদজ্জনক; মাথা তুলে দাঁড়ালেই মোকাবেলা হতে পারে মৃত্যুর সাথে। নিকটবর্তী পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে হয় ছুটে আসবে ঝাঁক ঝাঁক গুলি, নয় মর্টারের গোলা। মুক্তিবাহিনীর অনেকেই এ ভুলটা আগে করেছে। হতাহতও হয়েছে। এরপরও ওদের পাঁচজনের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। ডিউটি শেষে ক্যাম্পে ফিরতে হবে।
আধামাইলেরও কম দূরত্বে পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি শক্ত ডিফেন্স পোস্ট। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা বাংকারগুলো দখল নিতে ওরা বারবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। প্রচ- গোলাগুলির পরও মুক্তিবাহিনী নিজেদের অবস্থান ছাড়েনি। গেল দুদিনেও বেশ কয়েকবার গুলিবিনিময় হয়েছে। একজন কৃষকসহ তিনটি গরু মারা গেছে।
মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা নিজেদের প্রতিরক্ষা বাংকারগুলোতে পালা করে ডিউটি দেয়। রাইফেল ও মেশিনগান তাক করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। দু-দিন দু-রাত পাহারায় ছিল পাঁচজনের এই দলটি। আজ ডিউটির বদল হয়েছে। একটু আগেই নতুন দল এসে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। অতএব ওরা পাঁচজন ক্যাম্পে ফিরবে। ধান, পাটক্ষেত ও জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। দায়িত্ব পড়বে অন্য কোথাও। হলেও হতে পারে দিনখানেকের জন্য বিশ্রাম পাবে।
Ñ লিডার, চলেন ক্রল করে যাই। ব্যাটারা দেখলেই গুলি করবে। ওদিকে ওদের মেশিনগান পোস্ট আছে Ñ জানেন তো?
প্রথমেই দলনেতাকে সতর্ক করে মাহফুজ। বিশ কি বাইশ বছর বয়স। গায়ের শার্ট, লুঙ্গি এলোমেলো, দুমড়ানো। দু-দিন দু-রাত বাংকারে কাটিয়ে শরীর মাটিমাখা Ñ যেন মাটি ফুটে জন্মেছে মৃত্তিকা-পুরুষ। ঢাকার কাছে বিক্রমপুরে বাড়ি। যুদ্ধের ডামাডোলে ছিটকে পড়ে ঠাঁই নিয়েছে উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তে। এই জনযুদ্ধে কোথাকার মানুষ কোথায় গেছে কে তার খোঁজ রাখে!
Ñ ঠিকই বলেছ, সাবধানে যাওয়াই ভালো। চল, অন্যদিক দিয়ে যাই। প্লাটুন কমান্ডার রাজীব উত্তর দেয়।
কেবল বয়সেই বড় নয়, শিলং-এর পাহাড়ে গেরিলাযুদ্ধের ওপর উচ্চতর ট্রেনিং হয়েছে রাজীবের। প্রথম ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা। তবু মাহফুজের সতর্কবাণীকে সে উপেক্ষা করে না। সন্তর্পণে পশ্চিম দিকের ধান ও পাটক্ষেত লক্ষ্য করে সে হাঁটতে থাকে। প্রথমে রাজীব, এরপর মাহফুজ, বেলাল, এরপর হান্নান ও হেমেন্দ্র। এক বুক উঁচু ধান ও পাটক্ষেতের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে হেঁটে চলে ওরা। যতটা সম্ভব মাথা নিচু করে যাতে শত্রুপক্ষ না দেখে। ওদের হাঁটাপথে মাঠের কীটপতঙ্গ উড়তে থাকে। হঠাৎ কয়েকটা শালিক এদিক-ওদিক উড়ে যায়। ভারতের সীমান্তÑ বাঁধটা খানিকটা দূরেই। হয়তো মিনিট পনেরো সময় লাগবে পৌঁছতে। এরপর আর ভয় নেই। পাকিস্তানি সৈন্যরা সচরাচর এদিকে গোলাগুলি করে না। একেবারেই যে করে না তাও নয়। ব্রাহ্মণপাড়ায় ক’দিন আগে মর্টারের শেল পড়ে দুজন ভারতীয় নাগরিক মারা গেছে। পাল্টা গুলি চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বিএসএফ।
একের পর এক ধান ও পাটক্ষেত। পশ্চিমের রোদ পড়ে গেরিলাদের মুখগুলো লালচে বরণ হয়েছে। সবুজ লকলকে পাট গাছ, এখনও কাটার সময় হয়নি। ধানের ক্ষেতগুলো নদীর ঢেউয়ের মতো। বেশিরভাগই সোনালি। কিছু কিছু গাছ এখনও সবুজ। ক্ষেতে নামলেই কোমর পর্যন্ত ঢেকে যায়। বাতাসে দোল খাওয়া শীষগুলো বারবার শরীর ছুঁইয়ে দেয়। ওদের শিহরণ ধরে।
হঠাৎ বেলাল ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ বলে গান গেয়ে ওঠে। সাথে সাথেই মাহফুজ শাসিয়ে দেয়, ‘পাগল না-কি তুই, চুপ কর ব্যাটা!’
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে সমতল ইজেলে আঁকা প্রকৃতির শিল্পকর্ম দেখে গেরিলারা। উঁচু থেকে নিচুর দিকে। এ যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। দূর থেকে বহুদূর চোখ যায় বাংলার। কে কোথা থেকে কীভাবে যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে কেউ জানবার প্রয়োজন বোধ করেনি। জননীÑজন্মভূমি আজ আক্রান্ত। মা-মাতৃভূমি হানাদারদের হাতে বন্দি। ধান পাটের পাতায় আলতো হাত বুলিয়ে হেমেন্দ্র আকস্মিকভাবে গেয়ে ওঠে, ‘মাগো তোমায় কথা দিলাম জীবন দিব বলে…।’ কে জানে কতদিন এ যুদ্ধ চলবে। কবে পাকিস্তানি আধিপত্য থেকে বঙ্গের মাটি মুক্ত হবে!
এসব ভাবতে ভাবতেই প্রথম ঘটনাটা ঘটল। পুবদিক থেকে মেশিনগানের কড়কড় শব্দ শোনা গেল। কয়েক ঝাঁক গুলি উড়ে গেল চারপাশ দিয়ে। শালিক ও বাবুই পাখির দলগুলো ক্ষেতের ওপর দিয়ে আতঙ্কে উড়তে থাকল। এ-রকম কোনো অঘটন ওরা আশা করেনি। পাকিস্তানি ক্যাম্পটা খুব দূরে নয় Ñ একেবারে কাছেও নয়। কিন্তু প্রশিক্ষিত সৈন্যরা এমন একটা জায়গায় মেশিনগান বসিয়েছে, যাতে দূর থেকেও প্রয়োজনে শত্রুপক্ষকে আঘাত করা যায়।
‘শুয়ে পড়, শুয়ে পড়’ Ñ নির্দেশ দিয়েই ধানগাছ মাড়িয়ে মাটির সাথে গা মিশিয়ে দেয় রাজীব। মাটিতে দ্রুত শুতে গিয়েও হান্নান বাঁ পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। হাতের লাইট মেশিনগান তাক করে হেমেন্দ্র বলে Ñ ‘ওস্তাদ, ফায়ার অপেন করি? শালারা আবার গুলি চালাবে?’
রাজীব উত্তর দেয় না। সামনে এগুতে থাকে। হান্নান রাইফেলটা পাশে রেখে হাতের কাছে পাওয়া কিছু লতাপাতা ছিঁড়ে দাঁতে চিবিয়ে ক্ষতস্থানটা চেপে ধরে। তবু রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। প্যান্ট ভিজে ওঠে। রাইফেলটা একটানে কাছে নিয়ে পজিশন নিয়ে ফেলে সে Ñ ‘ওস্তাদ, অর্ডার দাও। অর্ডার প্লিজ।’
প্লাটুন কমান্ডার নিঃশব্দ। তাকে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। হেমেন্দ্র এবার তাগাদা দেয়, ‘ফায়ার শুরু করতে হবে ওস্তাদ, অর্ডার দাও? নইলে ওরা আরও গুলি চালাবে।’
রাজীব হাত তুলে নিষেধ করে। না, এখন নয়। সে বুঝে ওঠতে পারে না শত্রুপক্ষ দূর না ধারে-কাছের কোথাও থেকে গুলি চালিয়েছে। প্রথম গুলিগুলো মেশিনগানের তা সে নিশ্চিত। দ্বিতীয়টি সম্ভবত অটোমেটিক রাইফেলের। যুদ্ধাস্ত্রের শব্দগুলো কয়েক মাসেই তাদের জানা হয়ে গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেলাল নিজের এসএলআর ‘কক’ করে পজিশন নিয়ে ফেলে। বেশ কিছুটা সময় ধরে গুলি আসতে থাকে। দুদিন বাংকারে থেকে ওরা ক্লান্ত। ঠিক এ সময় মাহফুজের গলা শোনা যায় Ñ ‘কেউ দাঁড়াবি না, কেউ গুলি ছুড়বি না। ওরা যেন আমাদের ‘পজিশন’ বুঝে ফেলতে না পারে। বি কেয়ারফুল। ক্রল করে আরেকদিকে চল। হারি আপ।’
কমান্ডার রাজীব হাতের ঈশারায় সবাইকে চুপ থাকতে বলে। এরপরও থেকে থেকে গুলি আসতে থাকে। বেশ কিছু শালিক ও বাবুই ধপ করে মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। দৃশ্য দেখে বেলাল আর্তনাদ করে ওঠে, ইস্!
মিনিট দশেক পর গুলি বন্ধ হয়। চারদিকে অন্যরকম এক নিস্তবদ্ধতা। সন্তর্পণে মাথা তুলে দাঁড়ায় মাহফুজ। শত্রুপক্ষের আঘাত কোন্ দিক থেকে আসছে Ñ সে বুঝতে চেষ্টা করে।
এরই মধ্যে গামছা দিয়ে হান্নানের ক্ষতস্থানটি শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রক্ত পড়া কিছুটা বন্ধ হয়েছে। এবার সন্তর্পণে সামনে এগুতে হবে। ওরা চারদিক তাকিয়ে দেখে Ñ না, কিছুই চোখে পড়ে না। পাকিস্তানি ক্যাম্পটাও দেখা যায় না। চারদিক নীরবতা। ধান ও পাট গাছগুলো বাতাসে দুলছে। শালিক ও বাবুই পাখিগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দ্রুত উড়ে যাচ্ছে, যার যার নিরাপদ আশ্রয়ে।
সময় ক্ষেপণ না করে মাথা নিচু করেও ওরা দ্রুত সামনে এগুতে থাকে। এমন রসদ ও জনবল নেই যে পাল্টা আক্রমণে যেতে পারে। রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও হান্নান সহযোদ্ধাদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওরা আরেকটি ক্ষেতে প্রবেশ করে। যেহেতু শত্রুরা দেখে ফেলেছে, কাজেই দ্রুত সরে যেতে হবে তাদের। হান্নানের চিকিৎসা দরকার। একবারের জন্যও ওরা বুঝতে পারে না পিছু নেওয়া পাকিস্তানি দলটি ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাথা গুঁজে তাদের অনুসরণ করছে।
ধান ও পাটক্ষেতে হাঁটা, পাকা ধানের শীষ আলিঙ্গন করার অভিজ্ঞতা এই দলের সকলেরই আছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও ওরা সবাই গ্রামে বড় হয়েছে। পড়াশোনার টেবিল থেকে, কবিতা লেখা ও সংগীতচর্চা থেকে ওদের মুক্তিযুদ্ধের মাঠে নামিয়েছে ১৯৭১। সেনাশাসক ও তাদের স্থানীয় দালালেরা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে যে পাকিস্তান রক্ষা করতে চায়, সেই পাকিস্তান আর তাদের দেশ নয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে সরকারি বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেছে। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ হয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সাধারণ যুবতারুণ্য প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চলছে সশস্ত্রভাবে।
কিছুক্ষণ আগের গোলাগুলির ব্যাপারটা অবশ্য খুব বেশি অবাক করেনি গেরিলাদের। এসব হরহামেশাই ঘটে। অতএব ওরা স্বাভাবিক হতে থাকে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, ওরা যেন ভুলেই যায় একটু আগেই শত্রুপক্ষ থেকে যেভাবে গুলি আসছিল Ñ তাতে ওদের মৃত্যু হতে পারত!
ক্ষানিকক্ষণ সময় নিয়ে রাজীব ও বেলাল উঠে দাঁড়ায়। শত্রুপক্ষের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে। মাহফুজ এগিয়ে গিয়ে হান্নানের ঘাড়ে হাত রেখে জিগ্যেস করে Ñ রক্ত বন্ধ হয়েছে, দোস্ত?
Ñ না, আরও কিছু পড়–ক না দোস্ত, মায়ের চরণে সন্তানের রক্তদান কয়জনের ভাগ্যে ঘটে? এই যে দেখ… বলেই রক্তাক্ত বাঁ পা’টা মেলে ধরে আব্দুল হান্নান।
Ñ পাগলামো করবি না দোস্ত Ñ রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে Ñ ক্যাম্পে ফিরতে আরও সময় লাগবে। বলেই মাহফুজ কোমরের গামছাটা ছিড়ে হান্নানের ক্ষতস্থানটা আরও শক্ত করে বেঁধে দেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাঁধনটা আবারও রক্তে ভিজে ওঠে।
এরপর আবার হাঁটা শুরু হয় ওদের। হাঁটতে হাঁটতে সীমান্ত বাঁধটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনেই কয়েকটা বড় পাটক্ষেত। এরপর ফাঁকা একটি জায়গা। তারপর দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করা বাঁধ। বাঁধটা পেরুলেই আশ্রয়দাতা দেশ। কাজেই ভয়ের বিশেষ কিছু নেই।
কিন্তু শেষ ক্ষেতটি পেরোবার আগেই আকস্মিকভাবে আরেক দফা অস্ত্র তাক করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। গুলি আসতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে। পরপর কয়েকটা মর্টারের শেল ফাটে আশপাশে। শত্রুদের এবারের চেষ্টা বিফলে যায় না। চোখের পলকে গুলিবিদ্ধ হয় মাহফুজ ও হেমেন্দ্র। পরিস্থিতি বোঝে ওঠার আগেই রাজীবের চোখের সামনে ছিটকে পড়ে হেমেন্দ্র। ‘জয় বাংলা’ বলে কয়েকটা অস্ফূট শব্দ করে ধানক্ষেতের ওপর গা এলিয়ে দেয় মাহফুজ। বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে। কেউ মাথা তুলতে পারে না। মাহফুজকে শক্ত করে চেপে ধরে রাজীব। হেমেন্দ্রের রক্তাক্ত শরীরটাকে কাছে টেনে বেলাল পরিস্থিতি সামলাবার চেষ্টা করে। এলএমজি-টা ছোঁ মেরে হাতে নিয়ে হান্নান ট্রিগারে আঙ্গুল রাখতেই রাজীব চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘সাবধান, শত্রু ধারে-কাছেই। গুলি চালালেই আমাদের পজিশন বুঝে ফেলবে।’
কিন্তু হান্নানকে থামানো যায় না। লাইট মেশিনগানটাকে দু-হাতে তুলে ধরে পাগলের মতো সে গুলি চালাতে থাকে। যেদিকে থেকে গুলি আসছিল সেদিকে নল উঁচিয়ে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিতে থাকে Ñ ‘জয় বাংলা’।
মাঠের পাখিগুলো আবারও প্রবল আতঙ্কে উড়তে শুরু করে। মেশিনগানের ট্যা ট্যা শব্দে গোটা এলাকা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রং বিষণœœ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। যে পাকিস্তানি দলটি ওদের পিছু নিয়েছিল তারা মাটিতে শুয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে। ওরাও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে রাজি নয়।
মাহফুজ আর হেমেন্দ্রের শরীর বেয়ে তখন অবিরল ধারায় রক্ত পড়ছে। মর্টারের শেল লেগে এরই মধ্যে হান্নানের মাথাটা উড়ে গেছে। ধানগাছ, পাটগাছের শরীর বেয়ে টপ টপ করে এঁকেবেঁকে নেমে যাচ্ছে রক্তের ঢল। উপরে হেমন্তের আকাশ। সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে একের পর এক। পাখিরা উড়তে গিয়ে ভয়ার্ত চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছে। মুক্তিযোদ্ধাদের শরীর থেকে রক্ত পড়ছে মাটিতে। মাটি শুষে নিচ্ছে সে রক্ত।
সন্ধ্যা হতে তখনও খানিকটা বাকি। শেষ সূর্যের রক্তাভ রশ্মি জনযোদ্ধাদের শরীরকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। তিন সহযোদ্ধাকে জাপটে ধরে মাটির সাথে শরীর লাগিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত এগিয়ে চলেছে রাজীব ও বেলাল। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে হবে। এভাবে রক্ত যেতে থাকলে বন্ধুদের বাঁচানো যাবে না।
এরই মধ্যে মাহফুজ হঠাৎ মাথা সোজা করে তাকায়। প্রচুর রক্তক্ষরণে ওর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এরপরও মুখে হাসি টেনে বলে, ‘আমাদের রক্তের রং কী লাল, দেখ, কী অপূর্ব রং Ñ তাই না বন্ধুরা!’ বলতে বলতেই ওর মাথাটা ঢলে পড়ে। রাজীব ও বেলাল যন্ত্রণায় চোখ ঘুরিয়ে নেয়। চোখ মেলে হেমেন্দ্র একবার মাহফুজের দিকে তাকায়। আরেকবার তাকায় খানিকটা দূরে পড়ে থাকা হান্নানের গুলিবিদ্ধ মাথাটার দিকে। অস্পষ্ট হলেও বোঝা যায় সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সে শেষবারের মতো বলছে, ‘হয়তো আর কোনোদিন একসাথে “অপারেশন”-এ যাওয়া হবে না দোস্ত।’
প্লাটুন কমান্ডার রাজীব কান্নাভেজা কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, ‘চুপ কর হেমেন্দ্র, চুপ কর। আমরা দু-জন এখনও বেঁচে আছি।’
হেমেন্দ্রের পরিত্যক্ত এলএমজিটা হাতে তুলে নেয় কমান্ডার রাজীব। পাকিস্তানি দলটির অবস্থান সে নির্ণয় করে ফেলেছে। বন্ধুদের রক্তাক্ত শরীর ছুঁয়ে রাজীব ও বেলাল ক্রল করে এগুতে থাকে। আক্রমণে প্রাথমিক সাফল্যে পাকিস্তানি সৈন্যরা দাঁড়িয়ে অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করছে। রাজীব ও বেলাল সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে সুযোগ আসে।
পিছু নেওয়া সৈন্যদের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কানে আসতেই রাজীবের এলএমজি এবং বেলালের এসএলআর একযোগে গর্জে ওঠে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনজন পাকিস্তানি সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বাকিরা শুয়ে কিংবা ক্রল করে পালাতে থাকে। ট্রিগারে আঙ্গুল লাগিয়ে গেরিলারা শত্রুপক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। যত্রতত্র রক্তের দাগ, গুলির খোসা। শরীর ভেঙে যাচ্ছে; এরপরও মৃত পাকিস্তানি সৈন্যদের দেহগুলোকে টেনে আনে ওরা শহিদ বন্ধুদের কাছে। ওদের চোখে জল নেই, আছে রুদ্র। বলে, ‘কমরেড, দেখ, আমরা ঘাতকদের ক্ষমা করিনি।’
এরপর অবাধ্য পানি গড়াতে থাকে দুই মুক্তিযোদ্ধার চোখ থেকে। গেরিলাদের নতুন একটি প্লাটুন এগিয়ে আসে এরই মধ্যে। আহত সহযোদ্ধাদের বাঁচবার কোনো সুযোগ আছে কি না তারা পরখ করে দেখে। না, হয়তো সব শেষ।

Category:

কলাপাতা ও লাল জবাফুল

Posted on by 0 comment

PddMইমদাদুল হক মিলন: নয়ন দৌড়াতে দৌড়াতে এলো।
গ্রামে ঢোকার মুখে বিশাল কাঠের ব্রিজ। সেই ব্রিজের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন। ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিককার ভোরবেলা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে মাঠঘাট, মানুষের ঘরবাড়ি। খালের পানিতে ভাসছে কুয়াশা।
ভিড় ঠেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে গেল নয়ন। কমান্ডারের কাঁধে স্টেনগান, কোমরে গুলির বেল্ট। অন্যদের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। গুলির বেল্ট তো আছেই। কারও কারও সঙ্গে গ্রেনেড। মোট একুশজন মুক্তিযোদ্ধা।
কমান্ডারের নাম নাসির। ভিড় ঠেলে নয়নকে আসতে দেখে তিনি তার দিকে তাকালেন। নয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কমান্ডার সাহেব, আমার বড়ভাইও মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম বাদল। বাদল মির্জা।
নাসির কমান্ডারের মুখটা উজ্জ্বল হলো। তাই না-কি? বাদলকে তো আমি চিনি। মেলাঘরে একসঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছি। তুমি বাদলের ছোট ভাই?
জি। আমরা তিন ভাইবোন। বাদলদা সবার বড়। তারপর বোন তারপর আমি।
ইসমাইল লোকটা মাতাব্বর গোছের। আগ বাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস আছে। লুঙ্গির ওপর ছেঁড়া কালো কোট পরা। বলল, ভবেরচরের মুক্তিযোদ্ধাগো বাড়িঘর তছনছ করছে রাজাকাররা। নয়নরা তো বাড়িতে থাকতেই পারে নাই। বাড়ি দখল করছিল এক রাজাকারে। মির্জা সাহেব চইলা গেছিলেন দিঘিরপারের ওই দিককার এক গ্রামে। কয়দিন আগে ভবেরচরের রাজাকার আলবদররা সব পলাইছে। মুসলিম লীগের লোক আছিল চেরম্যান সাবে, সেও পলাইছে। তারপর মির্জা সাবে নয়নগো লইয়া গেরামে ফিরছে। ভবেরচর অহন স্বাধীন।
তবে বিপদ আপনাদের কাটেনি। কাল বিকালে খবর পেয়েছি আজ এদিকে মিলিটারি আসতে পারে। ওরা বুঝে গেছে দেশ স্বাধীন হতে আর সময় লাগবে না। এজন্য মরণ কামড় দিছে।
মিলিটারি আসতে পারে শুনে লোকজন আতঙ্কিত হলো। ভয়ার্ত চোখে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল।
জয়নাল বলল, হায় হায়, মেলেটারি আইলে তো সব্বনাশ! গেরামের লোকজন বেবাক মাইরা ফালাইব। বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিব। তয় আমরা যাই কমান্ডার সাব। বউ পোলাপান, মা বাপ ভাই বইন লইয়া পলাই।
না না পালানোর দরকার নেই। মিলিটারি যাতে গ্রামে ঢুকতে না পারে সেই ব্যবস্থা করুন। ওরা যে এদিকে আসবেই আমি তা বলিনি। বলেছি আসতে পারে। আসার সম্ভাবনা বেশি আলিপুর আর মধ্যবাউসিয়ার দিকে। এজন্য ওদিককার ব্রিজ দুটো উড়িয়ে দিয়েছি। এখন আমরা ওইদিকে চলে যাচ্ছি। মিলিটারি এলেই এট্যাক করব। একটাকেও বাঁচতে দেব না।
হাফেজ মিয়া বলল, তয় আমরা অহন কী করুম?
ব্রিজটা ভেঙে ফেলুন। মেইন রোড থেকে গ্রামে ঢোকার এই একটাই পথ। এটা ভেঙে ফেললেই কাজ হয়ে যাবে। তারপরও সাবধানে থাকবেন সবাই।
নাসির কমান্ডার নয়নের দিকে তাকালেন। তোমরাও বসে থাকবে না। তোমাদের বয়সি ছেলেরাও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা। ব্রিজ ভাঙার কাজে লাগো।
নয়ন গভীর উৎসাহের গলায় বলল, ঠিক আছে দাদা।
নয়নের মুখে ‘দাদা’ শব্দটা শুনে নাসির কমান্ডার একটু আবেগ আপ্লুত হলেন। নয়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমার ভাইবোনরাও আমাকে দাদা ডাকে। অনেকদিন তাদের সঙ্গে দেখা হয় না। দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরব। জয় বাংলা।
নয়ন আকাশের দিকে হাত তুলে চিৎকার করে বলল, জয় বাংলা।
মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার পর ইসমাইল বলল, এহেনে ঐ খাড়াইয়া থাকবেননি মিয়ারা? লন পোল ভাঙনের কামে লাইগা যাই। কুড়াল শাবল যার বাড়িতে যা আছে লইয়াহেন। বেবাকতে হাত লাগাইলে দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই পোল ভাইঙ্গা ফালান যাইব।
হাবিব নামের একজন বলল, আরে না মিয়া, এক-দেড় ঘণ্টার বেশি লাগব না।
মনির হোসেন বলল, প্যাঁচাইল না পাইরা কামে লাগো মিয়ারা।
নয়ন বলল, আমাদের বাড়িতে কুড়াল আছে। আমি নিয়া আসতেছি।
বাড়ির দিকে দৌড় দিল নয়ন। নয়নের সঙ্গে দৌড় দিল মোস্তফা। এই প্রথম মোস্তফাকে দেখতে পেল নয়ন। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, তুমি আসছো কখন?
তোমারে দৌড় দিতে দেইখা আমিও দৌড় দিছিলাম মিয়াভাই। গেরামে মুক্তিবাহিনী আইছে, দেখুম না তাগো?
তাহলে আমার আর বাড়ি যাওয়ার দরকার কী? তুমিই কুড়ালটা নিয়া আসো।
না না তুমিও লও। নাইলে মির্জা সাবে আর আম্মায় আমারে আইতে দিব না। মির্জা সাবের জ্বর। বাড়িতে কাম কাইজ আছে। আমি না আইতে পারলে তুমি কুড়ালডা লইয়া আইবা।
মোস্তফার বয়স এখন তেইশ-চব্বিশ বছর। রোগা পটকা শরীর। ছোটবেলা থেকে মির্জা বাড়িতে কাজ করে। এতিম ছেলে। কাছের আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। মির্জা বাড়িই তার বাড়ি, নয়নরাই তার সব। মির্জা সাহেব বিয়ে ঠিক করেছিলেন মোস্তফার। গজারিয়ার মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল দেখে বিয়ে আটকে আছে। দেশ স্বাধীন হলে বিয়ে হবে। বউ নিয়ে মির্জা বাড়িতেই থাকবে সে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাড়ির কাজ করবে।
মির্জা বাড়ির রান্নাঘরে এখন নাশতা তৈরি করছেন আমেনা বেগম। পুরনো শাল গায়ে জড়িয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে আছেন মির্জা সাহেব। খুক খুক করে কাঁশছেন। দিন সাতেক আগে বাড়ি ফিরেছে নয়নরা। বদু রাজাকার বাড়ি দখল করেছিল। দামি জিনিসপত্র সবই সরিয়ে ফেলেছে। বাড়িতে বলতে গেলে নেই কিছুই। বারান্দার চেয়ারটা রয়ে গিয়েছিল। মোস্তফার নড়বড়ে চৌকিটা রয়ে গিয়েছিল। এই শীতে মেঝেতে ঘুমাতে হচ্ছে নয়নদের। হাঁড়ি-পাতিল কিছু জোগাড় করেছেন আমেনা বেগম। থালা-বাসন জোগাড় করেছেন। সংসার চলছে কোনো রকমে।
বাড়ি ঢুকে লাকড়ি খড়ি রাখার ঘরটায় ঢুকল নয়ন। পুরনো কুড়ালটা পড়ে আছে একপাশে। সেটা নিয়ে দৌড় দেবে, মির্জা সাহেব বললেন, কুড়াল নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
ব্রিজ ভাঙতে যাচ্ছি বাবা। গ্রামে মিলিটারি আসবে।
বুদ্ধি করে মোস্তফাকেও সঙ্গে নিল নয়ন। মোস্তফা ভাই, তুমিও চলো। ব্রিজ ভেঙে ফেললে গ্রামে মিলিটারি ঢুকতে পারবে না।
আমেনা বেগম বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। মিলিটারি আসার খবরে ভয় পেয়েছেন। দিশাহারা গলায় বললেন, সর্বনাশ! তোর বাবার জ্বর। মিলিটারি এলে পালাবো কোথায়?
যাতে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতেই যাচ্ছি মা। মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজ ভাঙতে বলে গেছেন।
তোর যাওয়ার দরকার নাই। ও নয়ন, তোর যেতে হবে না বাবা। মোস্তফা যাক। তুই বাড়িতেই থাক। আমার ভয় করছে।
না না। কমান্ডার সাহেব বলেছেন। যেতেই হবে।
মির্জা সাহেব কী বলতে গেলেন! কাঁশির তোড়ে বলতে পারলেন না। নয়ন কুড়াল হাতে দৌড় দিল। মোস্তফা ছুটল তার পিছন পিছন।
ব্রিজ ভাঙা ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। ভারী কাঠের শক্ত ব্রিজ। অনেকদিনের পুরনো। তবে এখনও শক্তপোক্ত। ভাঙা কঠিন। লোকজন শাবল কুড়াল নিয়ে সমানে কোপাকুপি করছে। নয়নের বয়সি জনাদশেক কিশোরও জড়ো হয়েছে। তারাও কাজ করছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে। তাদের সবাইকেই নয়ন চিনল। এক স্কুলেরই ছাত্র সবাই। নয়নের ক্লাসমেটই আছে চারজন। ক্লাস ফাইভে পড়ে।
নয়নকে কুড়াল হাতে দেখে তাদের ক্লাসের আউয়াল এগিয়ে এলো। দে নয়ন, আমাকে দে। আমি কিছুক্ষণ কোপাই। আমি টায়ার্ড হলে তুই কোপাবি। দৌড়ে এসেছিস। একটু জিরিয়ে নে।
নয়নের হাত থেকে কুড়াল নিয়ে ব্রিজে চড়ল আউয়াল।
এইভাবে কুড়ালটা ঘুরতে লাগল। নয়নের হাত থেকে গেল শাহাদাতের কাছে, শাহাদাতের হাত থেকে রবিউলের হাতে। প্রত্যেকেই শরীরের সব শক্তি দিয়ে ব্রিজ ভাঙার কাজ করছে। তবে কাজ বেশিদূর আগাচ্ছে না। পুরনো ব্রিজ ঠিকই কিন্তু কাঠ এত শক্ত, লোহারপাত গজাল এগুলো এত কঠিনভাবে লাগানো হয়েছে, এই শীতেও ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছে লোকজনের।
আমিনুদ্দিন নামের মুসল্লি ধরনের মানুষটি শাবল চালাতে চালাতে বললেন, শুনছি মেলেটারিরা বলে মোসলমান। মোসলমান হইয়া মানুষ মারে? মোসলমান মারে? ওরা তো মোসলমান না। ওরা হইল শয়তান, শয়তান। ইবলিস শয়তান।
আনসার আলী কুড়াল চালিয়ে ক্লান্ত। দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ক্লান্তির শ্বাস ফেলছে। সেই অবস্থায় বলল, বাড়িতে বউ পোলাপানরে বইলা আইছি আমি পোল ভাঙতে গেলাম। মেলেটারি আইলেই দৌড়াদৌড়ি চিল্লাচিল্লি শুরু হইব। ওই রকম আওজ পাইলে এক মিনিটও দেরি করবা না। দক্ষিণ দিকে দৌড় দিবা। যে যেইভাবে পারো পলাইবা।
মফিজউদ্দিন বলল, আমিও কইয়াছি। বেবাকতেই ডরাইতাছে। মে মাসের কথা কইলো পোলাপানের মায়। তিনশো ষাইটজন মানুষ মারছিল আমগো এলাকায়। এক সকালে এতডি মানুষের জান নিল শুয়োরের বাচ্চারা। আইজ আইলে না জানি কী করে?
সোলায়মান মাস্টার বললেন, আসতে যাতে না পারে সেই জন্যই তো পোল ভাঙতে কইয়া গেল নাসির কমান্ডারে। কাম করেন মিয়ারা। তাড়াতাড়ি হাত চালান।
হোসেন বেপারি কুড়ালের বিরাট একটা কোপ বসালো চওড়া কাঠের ওপর। সেই অবস্থায় বলল, চেষ্টা তো চলতাছে মাস্টার সাব। কেউ তো বইসা নাই। তারপরও দেখেন, কাম আগাইতাছে না।
ইউনুস মিয়া বলল, কামডা আউলা ঝাউলা হইতাছে। যে যেই দিক দিয়া পারে কুড়াল শাবল মারতাছে। এইভাবে হইব না। এক দিক দিয়া ভাঙতে হইব। ও মিয়ারা, একদিক দিয়া ভাঙেন।
নয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। কুয়াশা আগের মতোই। বেশিদূর চোখ চলে না। রোদ কখন উঠবে কে জানে! ব্রিজ ভাঙার কাজ কখন শেষ হবে কে জানে! আলিপুরের দিকে, মধ্যবাউসিয়ার দিকে মিলিটারি এসে পড়ল কি না কে জানে!
না আসেনি। এলে গুলির শব্দ পাওয়া যেত। নাসির কমান্ডার বলে গেছেন তারা ওই দিকে পজিসন নিয়ে থাকবেন। মিলিটারি এলেই অ্যাটাক। এলে এতক্ষণে গোলাগুলি শুরু হয়ে যেত। শব্দ পাওয়া যেত।
কিন্তু ব্রিজ ভাঙার কাজ আগাচ্ছে না কেন? আর কতক্ষণ লাগবে? শয়তানগুলো যদি আলিপুর মধ্যবাউসিয়ার দিকে না গিয়ে এদিকে চলে আসে?
হলোও তাই।
দূরের রাস্তার দিকে গাঢ় সাদা কুয়াশার ভিতর দেখা গেল গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। কুয়াশা ভেঙে এগিয়ে আসছে কয়েকটা গাড়ি। এখনও দূরে আছে বলে শব্দ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত এদিকে আসছে গাড়িগুলো।
এই দৃশ্য প্রথমে দেখল রামমোহন। সে কুড়াল চালিয়ে ক্লান্ত। জিরাবার জন্য দাঁড়িয়েছে। তখন দেখে সার ধরে গাড়ি আসছে এই দিকে। কুয়াশায় রাস্তাঘাট দেখা যায় না বলে দিনেরবেলাই জ্বলছে গাড়ির হেডলাইট।
ব্রিজ আধাআধি ভাঙা হয়েছে তবে হয়েছে এলোমেলোভাবে। গাড়ি চলতে পারবে না কিন্তু মিলিটারিরা লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে আসতে পারবে।
রামমোহন তারপর চিৎকারটা দিল। মেলেটারি আইতাছে, মেলেটারি আইতাছে। ওই যে আইয়া পড়ছে। পোল ভাঙতাছে দেখলেই গুল্লি শুরু করব।
মুহূর্তে সাড়া পড়ে গেল লোকজনের মধ্যে। দিশাহারা ভঙ্গিতে রাস্তার দিকে তাকাল তারা। কুড়াল শাবল হাতেই দৌড় দিল কেউ, কেউ দৌড়াল ওসব ফেলেই। কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ‘মেলেটারি আইতাছে, মেলেটারি আইতাছে’ বলে চিৎকার আর দৌড়। বিরাট হুড়াহুড়ি পড়ে গেল।
নয়ন আউয়ালরা প্রথমে বুঝতে পারেনি ঘটনা কী! মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই নানারকম গুজব রটছে চারদিকে। মিলিটারি আসছে, ওই এসে পড়েছে, এ-রকম গুজব রটেছে বহুবার। মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। পরে দেখে কোথায় মিলিটারি? কিচ্ছু না।
এখনও কি তেমন কিছু রটল?
না। ওরা স্পষ্টই দেখতে পেল মিলিটারি ব্রিজের ওইপারে প্রায় এসেই পড়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামছে। গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
কে যেন চিৎকার করে বলল, দৌড় দে নয়ন। দৌড় দে।
বড়রা প্রায় সবাই উধাও হয়ে গেছে। নয়নরা দশ কিশোর দেরি করে ফেলেছে। তারপরও প্রাণপণে দৌড় শুরু করল ওরা…
মিলিটারিরা তখন দ্রুত এবং সাবধানে আধভাঙ ব্রিজ পার হচ্ছে। হাতে রাইফেল। রাইফেলের মাথায় বেয়নেট। শিকার ধরার সময় যে রকম ক্ষিপ্র হয় চিতাবাঘ, মিলিটারিরা সে রকম ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ছুটে আসছে।
নয়নরা এখন কোথায় যাবে? কোন দিকে পলাবে?
ব্রিজের এপারে এসেই চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে মিলিটারিরা। চারদিক দিয়ে ঘেরাও করছে গ্রাম।
নয়নরা এখন কোথায় যাবে? কোথায় পলাবে?
ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে ওরা। বুক ওঠানামা করছে হাঁপড়ের মতো। তিনদিক দিয়ে মিলিটারি এগিয়ে আসছে তাদের দিকে…
সামনে বহুদিনের পুরনো কবরস্থান। গাছপালা ঝোপঝাড়ে ঘেরা। শীতে কুয়াশায় জুবুথুবু হয়ে আছে জায়গাটা। দৌড়াতে দৌড়াতে নয়ন বলল, আউয়াল, কবরস্থানে ঢোক। কবরস্থানে। কবরস্থানে ঢুকে ওরা আমাদের মারবে না।
দশ কিশোর কবরস্থানে ঢুকল। ভয়ে আতঙ্কে দিশাহারা সবাই। দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত। কেউ কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ল পায়ে লতাপাতা জড়িয়ে। মতিউর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
মিলিটারিরা তখন কবরস্থানের দিকে ছুটে আসছে। তাদের বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
নয়ন বলল, চল আমরা একেকজন একেকটা কবর ধরে বসে থাকি। মিলিটারিরা কাছে আসার আগ থেকেই জোরে জোরে সুরা ফাতিহা পড়ব। ওরা মুসলমান আমরাও মুসলমান। ছোট ছেলেরা কবরস্থানে বসে সূরা পড়ছে দেখলে মারবে না। কিছুই বলবে না।
পাশাপাশি কবরগুলোর ধারে বসল ওরা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে একেকজনের। ভয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে কেউ কেউ। সেই কান্না গোঙানির মতো শোনাচ্ছে।
মিলিটারিরা ঢুকে গেল কবরস্থানে।
নয়নরা জোরে জোরে সূরা ফাতিহা পড়তে লাগল। ‘আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। আর রাহ্মানির রাহিম…’
কারও গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে কান্নার মতো করে, কারও গলা ফ্যাসফ্যাসে। শব্দ বোঝা যায় না।
চারজন পাঁচজন করে মিলিটারি রাইফেল বুকের কাছে ধরে একেক কবরের দিকে এগোতে লাগল। গুলি করছে না। চারদিক থেকে বেয়নেট চার্জ করার জন্য ধীরপায়ে এগোচ্ছে। মুখে কোনো শব্দ নেই। নয়নরা চোখ বুজে উচ্চৈঃস্বরে সূরা ফাতিহা পড়ে যাচ্ছে। ‘আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। আর রাহ্মানির রাহিম…’

সাতচল্লিশ বছর পর

সøামালেকুম আন্টি।
ওয়ালাইকুম আসসালাম।
আমি আপনাদের দোতলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটে। কালই ফ্ল্যাটে উঠেছি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এত ব্যস্ততায় গেল কালকের দিনটা। বাসা বদলানো যে কী ঝামেলার কাজ!
আমেনা বেগম চোখ তুলে ভদ্রমহিলার দিকে তাকালেন। তার বয়স হয়েছে আশির কাছাকাছি। চশমা ব্যবহার করেন অনেক বছর। কয়েক মাস ধরে চোখে ঝাপসা দেখছিলেন। শুনে বাদল তার ছোট ছেলে সাজিদকে পাঠাল। নাতি এসে ঢাকায় নিয়ে গেল দাদীকে। চোখের ভালো ডাক্তার দেখাল। পাওয়ার বেড়েছে। নতুন চশমা নিতে হলো। সেই চশমায় সবকিছু এখন পরিষ্কার দেখতে পান।
ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ হবে। স্বাস্থ্য ভালো। গায়ের রং শ্যামলা। চেহারা মন্দ না। হাসি-খুশি ধরনের মানুষ।
তোমার নাম কী মা?
আয়েশা।
বসো, বসো।
আয়েশা চেয়ার টেনে বসল। আমার হাজব্যান্ড এখানকার কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার হয়ে এসেছেন। আগে ছিলেন মানিকগঞ্জে। আমরা পাবনার লোক। একটাই ছেলে আমাদের।
আমেনা বেগম বুঝলেন আয়েশা গল্প করতে পছন্দ করে। ভালোই হলো। গল্প করার মানুষ পাওয়া গেল।
চা খাবে?
খেতে পারি। লিকার চা। দুধ চিনি ছাড়া।
আমিও তাই খাই।
আমেনা বেগম রাজিয়াকে ডাকলেন। রাজিয়া, দুকাপ চা দিতে বল। লিকার চা।
মোস্তফার ছোট মেয়ে রাজিয়া বারান্দায় পায়চারি করতে করতে পড়ছে। ভবেরচর কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। পড়াশোনায় খুবই আগ্রহ মেয়েটির। পরীক্ষার বাকি আছে মাস তিনেক। এ প্লাস পেতেই হবে। এজন্য রাতদিন পড়ছে।
আমেনা বেগমের কথা শুনে তার দিকে তাকাল না রাজিয়া। পড়তে পড়তেই চিৎকার করে মাকে বলল, দাদীর ঘরে দুই কাপ চা দাও।
মোস্তফার বউর নাম বেদানা। সে ছিল রান্নাঘরে। সংসার সে-ই সামলায়। বাড়ির সব কাজ তার। বাইরের কাজ মোস্তফার। দুদিন হলো মোস্তফা বাড়িতে নেই। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে। সেই মেয়ে তার জান। মাসে এক-দুবার মেয়ের কাছে গিয়ে থেকে আসে।
ট্রেতে দুকাপ চা নিয়ে এলো বেদানা। ষাটের কাছাকাছি বয়স। দেখলে মনেই হয় না এতটা বয়স হয়েছে। বেশ শক্তপোক্ত কর্মঠ মানুষ।
নাও মা, চা নাও।
আয়েশা চা নিল। আমেনা বেগমও নিলেন।
চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েশা বলল, একটা কথা আপনাকে বলে রাখা ভালো আন্টি। যাতে আপনি পরে বিরক্ত না হন বা না ভাবেন যে কেন আপনাকে আগে বলিনি।
কী কথা মা?
আমার ছেলেটার কথা। একটু অন্য টাইপের ছেলে। এগারো বছর বয়স। পড়ে ক্লাস ফাইভে। না না, দুষ্টুমি করে না। নিজেকে নিয়ে থাকে। ছবি আঁকে। মাটি দিয়ে এটা ওটা বানায়। ফুল পাতা দিয়ে বানায়। শহিদ মিনারের ছবি আঁকে, গ্রামের ছবি আঁকে, মুক্তিযুদ্ধের ছবি, পতাকার ছবি এসব নিয়েই থাকে।
ভালো তো! এই নিয়ে বলার কী আছে?
না মানে আপনার বাড়িতে এত গাছপালা। কখন কোনদিকে হাত দিবে সে, কোন গাছের ডালপালা ভাঙবে, ফুল ছিঁড়বে… মানে আমি আর ওর বাবা ওকে কিছু বলি না। আমাদের ধারণা ছেলেটা বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে।
এগারো বছর বয়স বললে? ক্লাস ফাইভে পড়ে?
জি আন্টি।
নাম কী?
নয়ন।
আমেনা বেগম কেঁপে উঠলেন। নয়ন? নয়ন?
আয়েশা অবাক। জি আন্টি। ডাকনাম নয়ন। ভালো নাম…
না না অন্য কোনো নাম জানবার দরকার নেই। নয়ন, নয়ন…
আমেনা বেগম উদাস হলেন। স্মৃতিকাতর হলেন। আমার ছেলেটার নামও ছিল নয়ন। এগারো বছর বয়স। ক্লাস ফাইভে পড়ত।
তাই না-কি? আশ্চর্য মিল। আপনার সেই ছেলে কোথায়?
আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই মাটিতে, ওই নদীতে, ফসলের মাঠে আর আকাশে মিশে আছে আমার নয়ন।
কথাটা বুঝতে পারল না আয়েশা। আমেনা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আয়েশাকে একাত্তর সালের সেই দিনটির কথা বললেন আমেনা বেগম। …..কবরস্থানে আশ্রয় নেওয়া নয়নদের দশজনকে গুলি করেনি জন্তুরা। চারদিক দিয়ে বেয়নেট চার্জ করেছিল। এলাকার সব মানুষ পালিয়েছিল। দশটি কিশোরের মরণ চিৎকার আর আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি। কবরস্থানের মাটি তাদের রক্তে ভিজে গিয়েছিল। জন্তুরা চলে যাওয়ার পর একজন দুজন করে ফিরেছিল গ্রামের লোক। যার যার ছেলে নিখোঁজ ছিল তারা বেরিয়েছিল ছেলে খুঁজতে। মির্জা সাহেব আর মোস্তফার সঙ্গে আমিও বেরিয়েছিলাম। নয়ন ছিল আমার জীবন। তার ছিন্নভিন্ন শরীর কবরস্থানে পড়ে থাকতে দেখে আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম…। নয়নের শোক নিয়ে আমি বেঁচে আছি। মির্জা সাহেব বেশিদিন বাঁচলেন না। বাড়িটা তখন এরকম ছিল না। বারান্দাঅলা টিনের ঘর ছিল। সেই বারান্দায় বসে ছেলের জন্য কাঁদতেন। কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকতেন। আমিও যেতাম। দিন নেই রাত নেই, যখন ইচ্ছা চলে যেতাম কবরস্থানে। আমার নয়ন যেখানে পড়েছিল সেখানে গিয়ে বসে থাকতাম। নয়নের কবরে হাত বুলাতাম। যেন ছেলের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি…
দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন আমেনা বেগম। দিনে দিনে সেই কষ্টটা কমে গেছে মা। এখন মনে হয় অন্যকথা। ভাবি, আমি তো স্বার্থক মা। আমার বাদল মুক্তিযোদ্ধা আর নয়ন দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। মা হিসেবে আমার আর কী চাওয়ার আছে? নয়নের জন্য আমার মেয়েও খুব গৌরব করে। বাদল গৌরব করে। আমার নাতি-নাতনীরা গৌরব করে। তোমার নয়নকে বলো সে স্বাধীন বাংলাদেশে বড় হচ্ছে। সে তার মতো করে বড় হোক। স্বাধীনভাবে বড় হোক। তার ভালো লাগা নিয়ে বড় হোক। আর আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে একটু দেখব।
সেদিন দুপুরের পরই নয়নকে দেখতে পেলেন আমেনা বেগম। বেদানা খুবই বিরক্ত হয়ে এসে বলল, নতুন ভাড়াইটার পোলাটা কলাপাতা কাটছে, লাল জবাফুল পাইড়া ওই যে দেখেন উঠানের কোণায় বইসা কী কী করতাছে। আমি না করছি। কথা শোনে নাই।
তাই না-কি। চল তো দেখি কী করে?
আমেনা বেগমের হাঁটতে অসুবিধা হয়। হাঁটুতে ব্যথা আছে। বেদানা বা রাজিয়াকে ধরে হাঁটেন। এখনও তাই করলেন। বেদানার বাহুর কাছটা শক্ত করে ধরে উঠানে এলেন।
উঠানের কোণে বড় একটা কলাপাতা চারকোণা করে কেটে মাটিতে বিছিয়েছে নয়ন। দশটা লাল টকটকে জবাফুল এখন সেই কলাপাতার ঠিক মাঝখানে গোল আর ঘন করে বসাচ্ছে। খুবই মন দিয়ে কাজটা সে করছে। কোনো দিকে খেয়াল নেই।
আমেনা বেগম মায়াবী গলায় ডাকলেন, নয়ন।
নয়ন চোখ তুলে তাকাল। কথা বলল না।
কী করছো? তোমার কথা আমি শুনেছি। তোমার মা বলেছে। এটা কী হচ্ছে?
হাতের কাজ শেষ করে নয়ন উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, বুঝতে পারনি?
না। জিনিসটা কী?
খেয়াল করে দেখো।
দেখছি কিন্তু বুঝতে পারছি না।
আরও খেয়াল করে দেখো। তাহলেই বুঝতে পারবে। খুবই সহজ।
এবার মুখ উজ্জ্বল হলো আমেনা বেগমের। শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, বুঝেছি বুঝেছি। বাংলাদেশের পতাকা। সবুজ কলাপাতার মাঝখানে গোল করে রাখা লাল জবাফুল। বাহ্। দারুণ।
মা বলেছেন, তোমার ছোট ছেলের নামও ছিল নয়ন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে। নয়নদের বাড়িতে আরেক নয়ন। এক নয়ন মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন আরেক নয়ন তাদের বাড়িতে কলাপাতা আর জবাফুল দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করছে। নয়নরা দশজন একসঙ্গে শহিদ হয়েছিলেন। এজন্য দশটা লালজবা।
নয়নের কথা শুনে তাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন আমেনা বেগম। অনেকদিন পর ছেলের জন্য কাঁদছেন তিনি।

Category:

গল্পটি জীবিত লাশের

Posted on by 0 comment

PMমোজাফ্ফর হোসেন: ‘মরা না জুটলি কেমনে বাড়ি যাই! লাশটা কেউ পেড়ি দাও, পায়ে পড়ি। আল্লা গো, এ তুমার কেমুন বিচার?’ বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কাঁদে দু’জন মা। নির্মাণাধীন হাজী রহমত টাওয়ারের চৌদ্দতলায় ঝুলে আছে লাশটি। তৃতীয় দিনে পড়ল। প্রথম প্রথম পরিবারটির বেশ ক’টি দাবি ছিল। এখন দাবি একটাইÑখালি লাশটা চায় তাদের। দাফন-কাফনের যা খরচ হয় তার সবটাই জোগাবে তারা। লাশ নামাতে যদি কোনো খরচ হয়, তাও দিতে রাজি আছে লাশটির পরিবার। পরিবার বলতে আছে শুধু লাশের বৃদ্ধ মা, শাশুড়িÑসে আরও বৃদ্ধ, কমবয়সী বৌ আর কোলের মেয়েটা। এই হলো লাশটির গুষ্টিসুদ্ধ লোকজনÑগুষ্টিতে একজনই পুরুষ ছিল, তাও এখন প্রাণহীন ধড় নিয়ে ঝুলে আছে। এই পরিবারে পুরুষরা বরাবরই টেকেনি। ‘রাইডার্স টু দ্য সি’ নাটকটির মতো। তোমরা যারা নাটকটি পড়োনি, তাদের বলিÑসেখানে, একটি পরিবারে একজন বৃদ্ধ মা আর তার দুই মেয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেÑগুনে গুনে ন’জন পুরুষকে সাবাড় করে রাক্ষুসে সমুদ্র। বৃদ্ধ মা কাঁদতে কাঁদতে নির্বাক হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত নিজেকে সান্ত¡না দেন এই বলে যে, তাকে আর কারও জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে হবে না। তিনি এখন সুখী, যেহেতু তার হারানোর আর কেউ থাকল না। গল্পটা এমনই মর্মস্পর্শী এবং একপেশে। রোমান্স আর সাসপেন্স বলতে ছিটেফোঁটাও নেই। কিন্তু আমার এই গল্পে কিছুটা হলেও বৈচিত্র্য আছে। ‘রাইডার্স টু দ্য সি’ নাটকটিতে একক ভিলেন সমুদ্র; কিন্তু এখানে আমরা ভিলেন হিসেবে কয়েকটি পক্ষকে খাড়া করতে পারি, চরিত্র কখনও কখনও নিজেই ভিলেন হয়ে আমাদের সামনে এসেছে। যারা অদৃষ্টবাদী তারা অদৃষ্টকেও দোষ দিতে পারেন।
ফিরে যাচ্ছি গল্পে। লাশটির বাবা মাটি কাটার কাজ করত। একদিন না খাওয়া শরীর নিয়ে মাটি কাটতে কাটতে হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘খিদেয় শরীরটা প্যাঙটা হয়ি আসছি।’ পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ল সে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওখানেই শেষ। নীল হয়ে যাওয়া শরীর দেখে কেউ কেউ সন্দেহ করছিলÑখিদে নয়, সাপের দংশনে মারা গেছে সে। সাপের দেখা কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেলেনি। তারপরও আপনারা সাপকেই ভিলেন হিসেবে ভাবতে পারেন, আর খিদেকে দায়ী করতে হলে, বের করতে হবে তার খিদের পেছনে দায়ী কারা? সেক্ষেত্রে আবার কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে আসার সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ ঘুরেফিরে সাপই দায়ী; কী বলেন?
লাশের ভাইটার শখ জাগল বাংলা সিনেমার নায়ক হবে। গরিবের ঘোড়ারোগ আর কি! কে যেন কবে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, ‘ছেলিটা দেখতি বোম্বের হিরু অক্ষয়ের মতোÑযেমনি গতর তেমনি সুরুত!’ পাকা আমে ঢিল মারল তার এক পড়ালেখা জানা বন্ধু। কোথা থেকে যেন সে আমদানি করলÑঅক্ষয় কুমার হোটেলে বাসন-কোসন মাজার কাজ করতে করতে নায়ক বনে গেছে! তারপর সে ক’দিন বাড়িতে থালাবাসন ভেঙে গাঁ ছাড়ল। সেই যে গেল আর ফেরেনি। বেচারা মা-টা টেলিভিশনে টেলিভিশনে কত সিনেমা দেখল, আজও ছেলের সন্ধান পেল না। এখনও ফিল্মের পোস্টার দেখলে তাকিয়ে দেখে, চেহারায় মিললে রাস্তায় লোকজন জড় করে নামটা জিজ্ঞেস করে। লাশটির ভাইটার নিরুদ্দেশের পেছনে নির্দিষ্ট করে কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না। একবার অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছে বলে খবর হয়েছিল, আর একবার শোনা গেল র‌্যাবের ভুল ক্রসফায়ারে পড়েছেÑওই শোনা পর্যন্তই, কোনো দফারফা হয়নি।
লাশের শ্বশুরটা গেছে ওপারেÑপরপারে নয়, অন্য এক নারীর হাত ধরে ভারতে। আর ফেরেনি। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে কেউ পড়লেই পরিবার কান খাড়া করত; একবার একটা লাশের বর্ণনা হুবহু মিলেও গিয়েছিল, কিন্তু অন্য এক পরিবারের দাবি বেশি পোক্ত হওয়ায় লাশের পরিবার আর এগোতে পারেনি। আর লাশের দাদার সম্পর্কে যা শোনা যায় সবটাই শোনা কথা। সৌদিতে কাজ করতে গিয়ে বছর বছর আসার কথা থাকলেও আর আসেনি। সে নিয়ে আবার কত কেচ্ছা! কেউ বলে সৌদিতে চুরি করতে গিয়ে হাত কাটা গেছে, কেউ বলে ফিলিপাইনে এক নারীর সাথে প্রেম করে ধরা পড়েছিল, সৌদি আইনে যা হওয়ার তাই হয়েছে! শেষ আপডেট ছিল, তাও অবশ্য বছর পঁচিশেক আগে, এলাকার একটি ছেলে তাকে জেদ্দায় দেখেছে, একটি ফলের দোকানে কাজ করছে, বয়সের ভারে নতজানু; কিন্তু ছেলেটিকে সে চিনতে পারেনি, বাংলা বুঝতে পেরেছে; কিন্তু উত্তর দিয়েছে আরবিতে। দোকানের সহকর্মীদের কাছে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তারা বলেছে যে, বৃদ্ধ সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। হঠাৎ হঠাৎ আসে কিছুদিন কাজ করে আবার গায়েব হয়ে যায়।
লাশের বৌয়ের পেটেও একটা পুরুষ বাচ্চা ধরেছিল। অপুষ্টিতে কুঁড়ি অবস্থাতেই ঝরে গেছে। এখন এই দুই বংশ মিলে বাকি ছিল খালি লাশটা। তখন তো আর সে লাশ ছিল না! ছিল জলজ্যান্ত-শক্তসামর্থ্য পুরুষ। ঢাকায় ভবন নির্মাণ শ্রমিকদের সাথে কাজ করত। এই শহরের প্রায় অর্ধশত বহুতল ভবনের ফিটফাট দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে তার অবদানের কথা কেউ না জানলেও তার জালি বৌটা জানে। জানে কারণ, লাশ আর তার সাঙ্গপাঙ্গ মিলে একটা একটা করে ভবন নির্মাণ করে আর লাশটা তার বৌয়ের কাছে সেই বাড়ির কত কেচ্ছা বনে! এ নিয়ে তাদের সংসারটাও চলছিল বেশ। অর্ধেক বস্তি গুঁড়িয়ে যে ভবন নির্মাণ হলো কিছুদিন আগে, সেখানেও কাজ করেছে লাশটা। নিজের ঘর ভেঙে অন্যের ঘর গড়াতে হাত লাগিয়েছে সে। কোলের মেয়েটার তখন বোল ফুটতে শুরু করেছে। বস্তিপাড়ার ছেলেবুড়ো যার কোলেই ওঠে, খানিকটা ভাষা, খানিকটা ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে, এটা তার বাড়ি, বাবা তৈরি করছে যে! তারপর ও বাড়িটা হলে আরেক বাড়িতে হাত দিয়েছে লাশটা। মেয়েটা আস্তে আস্তে বুঝে নিয়েছে, শহরে তাদের মেলা বাড়ি; কিন্তু ওখানে থাকলে আর সব বাড়ি বানাবে কে? তার বাপের বাড়ির খিদা, মেলা বাড়ি চাই তার! তার মতো এত এত বাড়ির মালিক এই শহরে দুটো নেই। লাশটি বোঝায়, মেয়েটিও বোঝে। এমনই সম্পর্ক তাদের।
লাশের যেদিন জন্ম হয় বাংলাদেশের বয়স সেদিন পাঁচ মাস পূর্ণ হলো। লাশ যখন পেটে, লাশের বাবা তখন যুদ্ধে। লাশের মায়ের ফেঁপে ওঠা পেট দেখে কত মানুষের কত কথা! মা সব নীরবে সয়েছে আর আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছেছে। যুদ্ধফেরত বাবা এসে যেদিন সবার দিকে বন্দুক-নলা তাক করে ঘোষণা দিল : এ আমার সন্তান, আমার রক্ত, কার সাধ্য দেখি কথা বলে, সেদিন থেকে সবার মুখ বন্ধ। আর কোনো দিন সে মুখ খোলেনি। তবে গাঁয়ে এই মরার খবর পৌঁছালে কয়েকজন বয়স্ক মহিলা ইশপিশ করে কী যেন বলতে চেয়েছিল। সেও পরিষ্কার করে কোনো কিছু না। আপাতত তাদেরও শঙ্কা, গায়ে মাটি পড়বে তো!
মেয়েটি ঘাড়ের ব্যথাটা একটু প্রশমিত হলেই ফের তা বাড়িয়ে তুলছে বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে। লাশের মা এখন যাকে পাচ্ছে তারই হাত পা ধরে বলছেÑ ‘স্যার, একটা ব্যবস্থা করেন না! ছেলি আমার শুকি গেল। আল্লা-মাবুদের নাম নি, ওর গায়ি ক’টা মাটি দেব গো সাহেব। ও সাহেব! দোহাই লাগে…।’ শাশুড়িরও জনে জনে একই আবদার। আর কচি বৌটা টাওয়ারের যেখান দিয়ে মিস্ত্রিরা নেমে আসে ওখানটায় চুপ করে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, সে কারও জন্যে অপেক্ষা করছে যে যেকোনো সময় এই পথ ধরে নেমে আসতে পারে। এই মৃত জগতের সঙ্গে তার কোনোই লেনাদেনা নেই।
এই ঘটনার পর থেকে মালিকপক্ষের লোকজন আর এদিকটায় আসছে না। সাথের শ্রমিকরাও আপাতত কাজ বন্ধ করে চলে গেছে। পুলিশি ঝামেলার কারণে লাশটি ছুঁয়েও দেখেনি তারা। প্রতিদিন জনতা জড় হচ্ছে, বদলাচ্ছে, থেকে যাচ্ছে শুধু চারটি চার বয়সের নারী আর ওই বাঁশের মাথায় বাদুড় ঝোলার মতো করে ঝুলে থাকা লাশটা।
পুলিশের লোকজন এসে তদন্ত করে গেছেন। তদন্ত মানে এটা-ওটা জিজ্ঞাসা। লাশটির সঙ্গে উপস্থিত মানুষগুলোর সম্পর্ক, তাদের বাড়ি কোন অঞ্চলে, লাশটি কত দিন থেকে এসব কাজ করছে, তাদের আর কে কে আছে, লাশটির ভালো নাম কী, তারা কাউকে সন্দেহ করছে কি না, সঙ্গের কারও সাথে তার বিবাদ ছিল কি নাÑএইসব দরকারি জিজ্ঞাসা! সাথের শ্রমিকরা আগেই জানিয়েছে যে, কাজ করতে করতে দশতলা থেকে পা ফসকে পড়ে গিয়ে নিচের আটতলার বাঁশের সঙ্গে গেঁথে গেছে। সব শুনে অফিসার পান চিবোতে চিবোতে মহাপ-িতের মতো বলেছেনÑ‘সেই!’ আর কোনো কথা তিনি বলেন নি। তারপর গাড়ি হাঁকিয়ে ফিরে গেছেন থানাতে। মালিকপক্ষের লোকজনের সাথে যা কথা হওয়ার ওখানেই হয়েছে। সরকারি পক্ষের আর কেউ আসেনি এদিকটায়। প্রথম দিনই লাশের শাশুড়ি গিয়েছিল থানাতে।
‘হুজুর, হেই আমাদের পেট চালাতুক। ওইটুকুন একটা মেয়ি। এখুন কী করি চলবি আমাদের? হাতে কুনো টাকাকড়িও নেই যে গাঁয় ফিরি যাব।’ পুলিশ শুনে বলেছেনÑ‘ঠিক আছে, হাজি রহমান সাহেবকে বলে কিছু টাকা নিয়ে দেব, যাও। ওদিকটাই থাকো। আমরা দেখছি কী করা যায়।’ তারপর তিন দিন হলো আর তাদের খোঁজ নেই। আজ সকালে আবার থানায় গিয়েছিল লাশের মা। এখন দাবি একটাইÑ‘হুজুর, ছেলিটা খালি নামানুর ব্যবস্থা করেন। নামি দেন, আমরা গাঁয়ির মানুষ গাঁয়ি চলি যাই। আর আপনাগো জ্বালাতন করবু না। মেলা কাজ আপনাদের। খালি একবার নামানুর হুকুমটা দেন।’ পুলিশ বুঝিয়ে বলেছেÑ‘অত ওপরে লাশ! চাইলেই তো আর নামানো যায় না। অনেক বন্দোবস্ত করতে হবে। আমাদের তো আর একটা কাজ না। আর তাছাড়া, আজকের আবহাওয়াটা বিশেষ সুবিধার না। তুমি যাও, একটু বাতাস হলে পড়েও যেতে পারে।’
দুপুর গড়িয়ে রাত নেমে এলো; বাতাস আর হয় না। পুলিশ মিথ্যে বলেনি, হালকা মেঘ আকাশে ছিল। একটা ঝটকা বাতাস হলে হতেও পারতÑকিন্তু হয়নি। ঝড়েরও দোষ না, শীতকালে এমন অল্পবিস্তর মেঘে সে চাইলেই আসতে পারে না। সবখানেই একটা নিয়ম আছে। মানুষের সুবিধে-অসুবিধে বুঝে সেই নিয়মের অদল-বদল হয় না। তবে এও ঠিকÑশীতকাল না হলে এতক্ষণ লাশের গন্ধে এখানে টেকা মুশকিল হয়ে পড়ত। রক্ত জমে কালো হয়ে গেছে। এ-বাঁশ সে-বাঁশ চুঁয়ে রক্ত খানিকটা মাটিতে এসে পড়েছে। লাশটির মা ওই কালো জায়গা আগলে বসে প্রলাপ বকছেÑ‘আমার তাজা ছেলিটা! আমার নিষ্পাপ ছেলিটার একি হাল হলু খুদা! এ কুন পাপের সাজা রে মাবুদ? আমার মতো আধমরা মানুষ থাকতি, ওমুন তাজা প্রাণ কেনে নিলি, মাবুদ রে?’
কাঁদতে কাঁদতে আর না খেয়ে খেয়ে নিচের মানুষগুলোরও প্রায় লাশের দশা। এ কয়দিনে কে বলবে কচি মেয়েটার বয়স বিশ না, চল্লিশ! বাচ্চাটাকে রাস্তার এ ও এটা-সেটা কিনে দেয়, সে তার বাপজান, মা, দাদি, নানি সবার জন্য ভাগ করে আর একটা একটা করে খায়। নানি তার মাথায় হাত রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলেÑ ‘তোর বাপ আর আসবি না রে মুখপুড়ি! এখুন থেকি তোকে লোকের কাছে ভিক্ষি করিই খেতি হবি। কি পুড়া কপাল নি জন্মালি রে…! প্যাটেই মরি যেতি পারলিনি? এসব দেখার আগে আমার কেনে মরণ হলু না, মরি গেলি এই আমি মাগি তো বাঁচতাম।’
‘মরি গেলি কেউ বাঁচে না-কি নানি?’Ñবাচ্চা মেয়েটা পাকা বুড়ির মতো বলে।
‘বাঁচে বাঁচে, গরিব মরি গেলিই বাঁচে’Ñ কান্না মিশিয়ে উত্তর দেয় নানি।
চার দিনে পড়েছে। আজ বিকেলে ব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল। ওদিকে আবার এয়ারপোর্টে ডেডবডি এসেছে দেশের এক বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সাবেক মন্ত্রীর। দেশ-বিদেশের যত ডাক্তার মিলেও আর শেষ রক্ষা করা গেল না। এ-পথ দিয়েই নিয়ে যাওয়া হবে তার মরদেহ। রাস্তাজুড়ে কড়া নিরাপত্তা। দুদিনজুড়ে জানাজা হবে স্থানে স্থানে। দেশবাসীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হলে তবেই তার দাফন হবে। রাজধানীর পুলিশ-প্রশাসনের কত কাজ ওখানে! লাশের বৌ ওপরে ওঠার পথে মাথা রেখে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটির মাথা আটকে গেছে ওপরেই, এখন নিচে তাকালেই তার ব্যথা করছে ঘাড়জুড়ে। দুই বৃদ্ধা কুকুরের মতো জড় হয়ে জমে আছে। শৈত্যপ্রবাহ চলছে, চলবে আরও ক’দিন। এখন খালি বাড়ি ফিরতে চায় ওরা, কিংবা কোথাও ফিরতে চায় না আর। লাশ নিয়ে ওদেরও আর ভাবনা নেই।
গল্পটি আমি এখানেই শেষ করতে পারতাম, ইনফ্যাক্ট সেটাই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একটা অল্পবয়সী ছোকরা এসে বাদ সাধল। ছেলেটির নাম মো. আব্দুল গণি। একালের ছেলের সেকেলে নাম। আব্দুল গণিকে চেনে না, এমন মানুষ এখন দেশে দুটো পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। আব্দুল গণি এক সাবেক রিকশাচালকের ছেলে। ওর বাবার নাম মীর আক্কাস আলী। বর্তমানে সিএনজি চালায়। থাকে মিরপুরে। আমি চাইলে বাড়ির নম্বরটাও বলে দিতে পারি; কিন্তু সেটার আর দরকার আছে বলে মনে করছি না। আব্দুল গণি পড়ছে মিরপুর বাংলা কলেজে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স। ছাত্র ভালোও না, খারাপও না। আবার মাঝামাঝি বলেও উল্লেখ করেনি কোনো শিক্ষক। ‘তয় নেক বান্দা’, আব্দুল গণির মাধ্যমিকের ধর্ম-শিক্ষক এক টেলিভিশনের টকশোতে স্কাইপিযোগে জানিয়েছেন। ভাবছেন, লাশের গল্পে আবার আব্দুল গণি এলো কি করে? এলো কারণ, গল্পের এ পর্বের নায়ক এই আব্দুল গণি। ও সেদিন ফিরছিল চিড়িয়াখানা থেকে, ডেটিং শেষ করে, বেশ খোশমেজাজে। মেয়েটির নামÑ? না থাক, অন্তত এই প্রাইভেসিটুকু থাকা উচিত! যাওয়ার সময় গিয়েছিল সিএনজিতে, ফিরবে লেগুনাতে। তার আগে একটু হালকা হওয়া দরকার। ঝুলে থাকা লাশটির নিচে গিয়ে দাঁড়াল। জল বিয়োগের মাঝপথে একটু উদাস হয়ে ওপরের দিকে ঘাড় তুলে তাকাল। কিছু একটা ঝুলে আছে। দু-তিনটা কাক বসে মাতামাতি করছে। একটা বিদঘুটে গন্ধ এতক্ষণে নাকে এলো। বেশি কিছু না ভেবে, জিপারটা আটকে পকেট থেকে পকেট-মারের কাছ থেকে সদ্য কেনা সিমফোনির স্মার্টফোনটা বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিল, সেলফি স্টাইলে নিজের মুখটাও নিয়ে নিল কায়দা করে। কোনো রকমে এলো ছবিটা। ভাবনাটা এলো লেগুনার চাপাচাপিতে। পকেট থেকে আবারও মোবাইলটা বের করে ফেসবুক ওপেন করে ছবিটা একটা ক্যাপশনসহ পোস্ট করে দিল। ক্যাপশনটা ছিল বেশ আবেগের, বাংলিশে লেখা-haire Shohor! Akta lash jhule ache, othocho karo kono mathabetha nai. Bechara এটা পোস্ট করার কিছুক্ষণ পর তার নতুন একটা ক্যাপশন মাথায় এলো, এডিট করে দিল ক্যাপশনটি-Amra boli Shobvota toiri hoi mojurer ghame. Akhon dakchi mojurer lashe! এই ক্যাপশনসহ ছবি শেয়ার দেয় আব্দুল গণির বন্ধুতালিকায় থাকা প্রায় সকলে। সেখান থেকে আবার আরও অনেকে। সংবাদ হয়ে যায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে। কেউ কেউ গণির পোস্ট করা ছবি ও ক্যাপশন ব্যবহার করে। দুপুর তিনটার ঘটনা। সন্ধ্যে ৭টার মধ্যে লাশটির নিচে, ওপরে, ডানে, বামে ক্যামেরায় ভরে যায়। লাইভ টেলিকাস্ট হতে থাকে চ্যানেলগুলোতে। মনের মাধুরী মিশিয়ে রিপোর্ট করতে থাকেন সাংবাদিকরা। কয়েক সেকেন্ডে ঘটনাটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আঞ্চলিক বিভাগেও খবরটি আসে। তবে তাদের খবরের বিষয় ছিল লাশটি নিয়ে নয়, একটি লাশ নিয়ে যে দেশজুড়ে মাতম তা নিয়ে। একটি সংবাদমাধ্যমে ছবির ক্যাপশন ছিল-A Hanging Body, Whole Country after it. আর একটা সংবাদমাধ্যম ডাবল মিনিং করে ক্যাপশন দিয়েছে-Bangladesh is Hunging with a Body.
লাশটির মা-বৌ-মেয়ে-শাশুড়ি বাড়ি ফিরছিল। তখন গোয়ালন্দ ফেরিঘাটে। একটি চায়ের দোকানে টেলিভিশনে বলতে শোনে। তারা বুঝে উঠতে পারে নাÑযাবে, না ফিরে যাবে। সামনে বা পেছনেÑকোনো দিকেই পা বাড়ানোর পর্যাপ্ত টাকা তাদের হাতে নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে সাংবাদিকদের বায়োবীয় চোখ উদ্ধার করে তাদের। দেশবাসী ফেরিঘাট থেকে লাইভ দেখে মা-বৌ-মেয়ে-শাশুড়ির শুকনো চেহারা। ভয়ে ভয়ে তারা কথা বলে, যেন কিছু একটা অপরাধ হয়ে গেছে। এদিকে টেলিভিশনের টক শো নায়ক তখন আমাদের সেই আব্দুল গণি। গণিকে এই ঘটনার উদ্ধারকর্তা হিসেবে ডাকতে শুরু করেছে চ্যানেলগুলো। গণি জানিয়েছে, লাশটি নামানোর ব্যাপারে তৎপরতা শুরু করলে, একটি অজ্ঞাত মহল থেকে তাকে হুমকি দেয়া হয়। ফলে পুলিশ তার সিকুইরিটির ব্যবস্থা করবে বলে জানিয়েছে।
ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে লাশটির মা-বৌ-মেয়ে ও শাশুড়িকে। রাত দুটোয় পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনীর উপস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন লাশটি নামিয়েছেন। বিকাল থেকেই আনকাট লাইভ চলছে। কিছু কিছু চ্যানেল গিয়ে অবস্থান নিয়েছে নির্মিতব্য ভবনটির মালিকের বাসভবনের গেটে।
অবশেষে সরকারিভাবে লাশটি দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন লাশটির পরিবারের দাবি-দাওয়া নিয়ে বাম ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন, লেবার ইউনিয়নের একটা খ-াংশ রাজপথে দাঁড়িয়েছে। টকশোতে বুদ্ধিজীবীরা এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এর আগে এ ধরনের যত ঘটনা ঘটেছে সেগুলো টেনে এনে এর ঐতিহাসিক ডিসকোর্স চলছে। লাশটির পরিবারের নারীগুলোকেও টেলিভিশনে ডাকা হয়েছে। মুখে পাউডার লাগিয়ে পর্দার সামনে কান্নাকাটি করছে তারা। সত্যিই কাঁদছে না-কি কাঁদতে হচ্ছে, সেটি বোঝা যাচ্ছে না। একসময় তাদের কান্না কেউ শোনেনি, এখন গোটা দেশবাসী শুনছে। তাই কান্নাটা যাতে ভালো দেখায় সেদিকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তাদের স্ক্রিপ্ট মুখস্ত করিয়ে সেটের সামনে আনা হচ্ছে। একেকটি চ্যানেলের স্ক্রিপ্ট আবার একেক রকম, একেক রকম এজেন্ডা তাতে। অত সব না বুঝে, হাতে কটা নগদ টাকা পেয়েই খুশি থাকতে হচ্ছে লাশটির পরিবারকে। সরকার থেকেও দুটো ছাগল দেয়া হবে বলে ঘোষণা এসেছে। যেহেতু ভবনটি ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার। তাই বিরোধী দল এটিকে ইস্যু করে সরকার পতনের আন্দোলনে নামা যায় কি না, তা নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করছে। তারা বিবৃতি দিয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেÑএই সরকার মানুষ মারার সরকার। এদেশের জনগণ এমন সরকার চায় না। যে সরকার পরিকল্পনা করে মেহনতি মানুষকে হত্যা করে, সেই সরকারের পতন অনিবার্য। এরপরও যদি সরকার গদি থেকে স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ায়, তবে লাগাতার হরতাল কর্মসূচি দেয়া হবে।
এদিকে ক্ষমতাসীন দল থেকে বলা হচ্ছে, এই নির্মম-নৃশংস খুনের পেছনে বিরোধী দলের হাত আছে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি থামাতে তারা পরিকল্পনা করে শ্রমিকদের টাকা দিয়ে এই হত্যা করেছে। জনগণ এমন জালিম ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলকে ভবিষ্যতে কখনোই ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, অচিরেই তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।
আমরা আবার ফিরে যাব আব্দুল গণির কাছে। সে এখন ভীষণ খুশি, আবার অসুখীও। তার হাতে এখন স্যামসাং স্মার্টফোন। প্রেমিকাকেও কিনে দিয়েছে সেইম সেট। ফুলটাইম সিএনজিতে ঘোরে। সাবধানে থাকতে হয় তাকে, মাঝে মাঝেই হুমকি আসে উড়োভাবে। সে এখন নিজেকে ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই পরিচয়টা তার নামের সাথে কারা যেন একটু একটু করে জুড়ে দিয়েছে। শঙ্কামুক্ত ব্লগার আন্দোলনেও এখন তাকে ঘটা করে দাঁড়াতে হচ্ছে।
লাশটির পরিবারের শেষ অবস্থার কথা জানিয়েই গল্পটির ইতি টানছি। তারা এখন নিজ বসতভিটায়Ñসর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার অবস্থায়। টাকা-পয়সা যা কিছু হয়েছিল, দুর্বৃত্তরা বাড়ি ঢুকে ছিনতাই করে নিয়েছে। অস্ত্রের মুখে ধর্ষণ করেছে লাশটির বৌকে, গণধর্ষণ। বাকি তিনজন নারী ধর্ষণের অনুপযুক্ত বলে মন খারাপ করে দৃশ্যপট ছেড়েছে নিরুপায় দুর্বৃত্তরা। এসব খবর অবশ্য জনসম্মুখে আসেনি। কারণ, কথিত দুর্বৃত্তরা এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে গায়েব করে দিয়েছে লাশটির পরিবারের অবশিষ্ট গল্প।

Category:

রক্ত পালক

Posted on by 0 comment

8-6-2018 7-49-20 PMআনিস রহমান: ট্যামা ম-লের বুক ধড়াস ধড়াস করে উঠছে আর নামছে। যেন শাটার মিস্ত্রির হাঁতুড়ি। একবার উঠছে। একবার নামছে ধড়াম করে। কখনও মনে হয় বুকটা হাঁপরের মতো ফুলে উঠছে। আবার চিমসে যাচ্ছে মুহূর্তে। আসলে ঠিক কী হচ্ছে ওর বুকের ভেতরে তা ও কেন ওর বাবাও যদি এসে ভেতরে সেঁধিয়ে যায় তাহলেও কিছু বুঝতে পারবে কি না সন্দেহ। তবে একথা ঠিক, ট্যামা যে কিছু বুঝতে পারছে না। কাউকে বোঝাতে পারছে না। বলতেও পারছে না কিছু। যাকে বলা যায়।
ট্যামা ম-ল মানে ত্রিমোহিনী ম-ল। বুঝ হতেই দেখে ওর মাথায় ঢাউস এক বোঝা। বয়েস যত বেড়েছে। বোঝার আকারও তত বেড়েছে। একসময় ও ছিল বাবার পেছন পেছন। একসময় বলা নেই কওয়া নেই বাবা সামনে থেকে সটকে পড়ল। সটকে পড়ল মানে টসকে পড়ল জীবন থেকে। হঠাৎ বড্ড একা হয়ে পড়ল ট্যামা। নিঃসঙ্গতা এত ভারী, এত ক্লান্তিকর আর আতঙ্কময় হতে পারে তা আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারেনি। সে উপলব্ধি আজ যেন ওকে নতুন করে চেপে ধরেছে। কিন্তু যে আতঙ্ক কিংবা নিঃসঙ্গতার স্বরূপ কেমন তা সবটুকু অবয়ব নিয়ে তাকে ধরা দিচ্ছে না। বিমূর্ত এক অবয়ব কিংবা কিছু আঁচড় না হয় কোনো এক অজানা স্কেচের অবয়বে সে যন্ত্রণা ওকে পোড়াচ্ছে। আঁচড়াচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত করছে।
তখন ওরা থাকতো ধোলাইখালের ঢালে। ছোট্ট ডেরা মতো ঘর। ঝুপড়ি যাকে বলে। পাশাপাশি দুটো ঘর। শরীর কুঁজো করে ঢুকতে হয়। তেমনি কুঁজো হয়ে বেরোতে হয় ঢেরা থেকে। একটিতে মা-বাবা। অন্যটিতে ছিল ওদের চার ভাই-বোনের আবাস। বাবার এমনি পালিয়ে যাওয়া কিংবা পলায়নপর মনোবৃত্তি মায়েরও বুঝি পছন্দ হয়নি। তাই বছর দু না পেরোতেই বাবার পথে মা-ও পা বাড়ালো। ভাই-বোনদের দেখভালের সবটুকু দায়িত্ব কেমন করে যেন ওর ঘাড়ে চেপে বসল। বাড়তি আরেক বোঝা নিয়ে ওর কেবলই মনে হয় বাবার কাঁধের বোঝাটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তবে বাবা চোখ বুজেছে। কখনও মনে হয় কোনো এক মামদো ভূত ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে আজীবনের জন্যে। বিশেষ করে ওর দুচোখ যখন মেটে চুলোর ধোঁয়ায় লালচে হয়ে উঠতো রান্নার সময়, কিংবা কখনও জল ঝরতো অঝোর ধারায়, তারপরও আগুনের পাত্তা মিলতো না চুলোর গাড্ডায়Ñ তখন মনে হতো খালের ওপারে বসে বসে বাবা-মা দুজনে তামাসা দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। ছেলেকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে। আর ভাবছে ছেলে ওদের লায়েক হবে কবে!
খালপাড়ে ট্যামার আবাস থাকলেও ওদের রোজকার পথ ছিল শ্যামবাজার থেকে ঠাঁটারীবাজার। পাইকারিপাড়া থেকে সবজির বোঝা নিয়ে ঠাঁটারীবাজারের বিভিন্ন মোকামে পৌঁছে দিত। মুটেগিরিতেই জীবন পার হয়ে গেল তার। একসময় বোঝার ভার এতটাই বাড়িয়ে নিল যে ঘাড় কাৎ হয়ে যেত। পা তুলতে পারতো না বোঝার ভাড়ে। কেবল রাবারের চপ্পল জড়ানো পা দুটি রাস্তার সিমেন্টের সঙ্গে ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে পথ কাটতো। খস্। খস্। খস্।
জায়গায় জায়গায় ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুড়িগঙ্গার মুখে চড়া পড়ায় একসময় ধোলাইখালের জলে বেশ টান দেখা দিল। তখন জলের রংও পাল্টে যেতে লাগলো দিনকে দিন। উৎকট গন্ধ সে জলে। অগত্যা ডেরা গুটিয়ে গে-ারিয়ায় চলে এলো। নতুন আবাস গড়ল রেললাইনের ধারে। কিন্তু এখানে যে এত গুমোট রাজনীতি জট পাকিয়েছিল, তা আগে জানা ছিল না ট্যামা ম-লের। রাজনীতির ঘুঁটির চালে হেরে এবং জটিল জালে জড়িয়ে খুব অল্পদিনেই উচ্ছেদ হলো ট্যামার সংসার। ট্যামার রোজগার থেকে ওদের যদি খাঁই মেটাতে যায় তাহলে সংসার চলে না। আর সংসার চালাতে গেলে ওদের মানে দখলদারদের খাঁই মেটাতে পারে না। উপায়ন্তর না পেয়ে একসময় স্টেশনের প্লাটফরমেই রাতে বিছানা পেতে শোওয়ার বন্দোবস্ত করে নেয় ওরা। তিন ভাইবোনকে ট্রেনে জল বিক্রির কাজ ধরিয়ে দিল। সে কাজের নাটাইয়ের টানে কে যে কখন কোন মাঠে ছিটকে পড়লো তার সন্ধান আর ট্যামাকে করতে হয়নি।
জেলা মিলনায়তনের গা ঘেঁষে যে জলের ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে। তা অনেক পুরনো। আবলুশ কালো স্টিলের তৈরি। সে ট্যাঙ্কের ছায়ায় টুকরির ওপর বীড়া, আর বীড়ার ওপর ওর মাথা এলিয়ে দিয়ে এক দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ল ট্যামা। যখন ওর ঘুম ভাঙলো তখন ভরসন্ধ্যা। অসংখ্য বানর আর টিয়ে পাখির কিচিরমিচির ট্যাঙ্কির তল্লাটে। বেশ কয়েকটি বানর ওকে ঘিরে আছে চারদিক থেকে। যদিও নিরাপদ দূরত্বে ওরা বসে। চোখে বিস্ময়। বিস্ময়ভরা চোখে দেখছে আগুন্তককে। বারবার দুহাতে চোখ কচলাচ্ছে। কচলানো হলে ফের বড়বড় চোখে ট্যামাকে যেন যাচাই করছে ওরা। তবে বানরগুলোর কেউই হামলা কিংবা কোনোরকম ঝামেলা পাকাতে আসেনি। আসেনি বলেই ভরসা পেল। নিশ্চিত হলো অন্তত ওরা কোনো ক্ষতি ওর করবে না। সেদিন ওর একা শরীরটা টেনেহিঁচড়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতেও কেন যেন আর মন থেকে সাড়া পেল না। পাইপের পাশে গজিয়ে ওঠা আধমরা দুব্বাঘাসের ওপর থেকে শরীরটা কোনোরকম সরিয়ে নিয়ে পাম্প হাউসের বারান্দায় নিয়ে ঠেকালো। একটি মাত্র শরীর। একটি মাত্র জীবন। তার জন্যে আর কত ভুঁই প্রয়োজন। কোনোরকম শরীরটা কাৎ করতে পারলেই হলো। ভাবে ট্যামা। ভাবনা-মতো শরীর ওর ঠিকই জায়গা করে নিল বারান্দায়। এক সন্ধ্যায় কবির ডেকে বলল, আমি তো একা মানুষ। যদি থাকতো চাও থাকতে পার। তার জন্যে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। ভেতরটায় আলো আঁধারিময়। তবে রাতে গাঢ় অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে নিবিড়ভাবে। অবশ্য এখানে বাতাস খেলে সবসময়। নদী থেকে উঠে আসা টাটকা বাতাস। ভেজা ভেজা আবেশও ছড়িয়ে সে বাতাসে। সে বাতাস ট্যাঙ্কির ছায়ার সান্নিধ্যে এসে আরও নির্মল আরও শীতল এবং হিমেল একটা ভাব নিয়ে খেলে বেড়ায় ট্যাঙ্কির তলায় ও চারপাশে। কিন্তু মনে একটুও স্বস্তি নেই ট্যামার। জমাট এক কষ্ট বুকজুড়ে। মন শুধু আনচান করে ভাইবোনগুলোর জন্যে। পথ চলতে চোখ রেখেছে অনেকদিন। খোঁজ পায়নি। অনেককে জিজ্ঞেস করেছে। খোঁজ মেলেনি। এখন আপাত নিঃসঙ্গ শরীরটা এলিয়ে দিলেও ভাইবোনগুলো ঠিকই ওর অন্তরের ভেতর থেকে ঘাঁই মারতে থাকে সদলবলে। সেই ঘাঁইয়ের আঘাত সইতে সইতে কখন যে ওর নিঃসঙ্গ শরীর ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে তা কখনোই আঁচ করতে পারে না ট্যামা ম-ল। কেবল বানরের কিচকিচ আর পাখির ট্যাঁও ট্যাঁও ডাকে ঘুম ভাঙে ওর। ঘুম ভাঙতেই ভাইবোনগুলো যেন কোথায় চলে যায় পাখির দলবলের সঙ্গে। তখন শূন্য বুকে যেমনি ধড়াম ধড়াম শব্দ ওঠে আজও তেমনি এক শূন্যতা নির্দয়ভাবে কামড়ে ধরেছে ওকে। কী এক অজানা আশঙ্কায় জিভ ওর শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। বুকের ভেতর পীড়ন হচ্ছে ভীষণরকম। ভাইবোনরা চলে যাওয়ার পর শূন্য বুকের হাহাকারের সঙ্গে এ হাহাকারের অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। মা-বাবা মরে যাওয়ার পর বুকটি যেমনি শ্মশান শ্মশান মনে হতো ওর। কেবল ছাই কেবল পোড়া গন্ধ ওকে অস্থির করে তুলতো। আজও সেই শ্মশান যেন ওর বুকের ভেতর। চিতা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ওর শ্মশান বুকের পোড়া গন্ধের জন্যে কিনা সামনের … ?
রাস্তা আজ বড্ড শুনশান। নিশ্চুপ। তেমনি নিশ্চুপ জলের ট্যাংকের বানরগুলো, পাখিগুলো। আজ বেলা হলেও ওরা কেন যেন চুপ মেরে আছে ঠিক বুঝতে পারে না ট্যামা। অথচ ওরা সব দিব্যি জেগে আছে। যেমনি জেগে থাকে অন্যদিন। কিন্তু পার্থক্য শুধু নীরবতা। বেজায়রকম নীরব। কোনো উচ্ছলতা নেই। দৌড়ঝাপ নেই। ছিটেফোটা দুষ্টুমিও নেই। কেবল মাঝেমাঝে বানরগুলো কান চুলকোচ্ছে। পা চুলকোচ্ছে আনমনে। কখনো পা সোজা করে শরীর সটান খাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়ছে। তখন লেজও ওদের খাড়া হয়ে যায়। এছাড়া বাড়তি কোনো চাঞ্চল্য নেই। কেমন যেন হাই তুলে ফের চুপ মেরে যায়। পাখিগুলো মাঝে মাঝে জায়গায় বসেই পাখসাট করছে। কখনো ছোট ছোট লাফ দিয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। কিন্তু মুখে কোনো রা নেই। শরীরে নেই কোনো চাঞ্চল্য। ওদের আচরণের এমনি পরিবর্তন চোখে পড়ে ঠিকই, তবে বুঝে উঠতে পারে না এর নেপথ্য কারণ। যেমনি বুঝতে পারে না ওর বুকের ভেতর কেন বইছে ঝড়ো হাওয়া। কেন শ্মশানের অত দহন।
এ যন্ত্রণার ভার ও বইছে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা পেল্লায় এক পাথর বুঝি ওর বুকে চেপে বসেছে। পাথরে খাঁজ কাটা। একটু ঘষা পেলেই জ্বলে ওঠে বুক অসহ্য এক যন্ত্রণায়। তখন সবেমাত্র জলের ট্যাংকের পশ্চিমের মোটা পাইপটার ওপর এসে বসেছে। তার আগে শেষ বোঝা নামিয়ে দিয়ে ফিরেছে কেবল। ক্লান্তি ওর সারাশরীরে। ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে গাঁয়ের ছেড়া গ্যাঞ্জিটা। তখন ওর চোখ যায় পশ্চিমাকাশে।
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু টকটকে লাল রক্তে যেন ভেসে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশ। তাজা রক্তের ধারা যেন ছড়িয়ে পড়েছে সারা আকাশজুড়ে। রক্তের ধারা টুপটাপ টুপটাপ করে একটু পরেই বুঝি ঝরে পড়বে আকাশ থেকে। অমন রক্তাক্ত আকাশ দেখে ভীষণ রকম চমকে ওঠে ট্যামা। কোনো ভাগাড় থেকে উড়ে আসা শুকুন এই মাত্তর ওর বুক খামচে ধরেছে। নির্বাক হয়ে অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। একাত্তরের আকাশ না? বিড়বিড় করে ওঠে ট্যামার ঠোঁট। পঁচিশে মার্চের সন্ধ্যায় এমনি রক্তভেজা আকাশ দেখেছিল ট্যামা। সে রাতেই পাকিস্তানি সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঢাকার পথে-ঘাটে। অলিতে-গলিতে। দালানে-বস্তিতে। টার্গেট শুধু বাঙালি। যেখানেই পেয়েছে সেখানেই হত্যা করে। হাজারে হাজারে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে দিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কত বস্তি ওর চোখের সামনে পুড়েছে। ছাই হয়ে গেছে মানুষশুদ্ধ। তার চাক্ষুষ সাক্ষী সে তো নিজেই। এরপর ৯ মাস ধরে ওরা কেবল হত্যা করেছে আর রক্ত ঝরিয়েছে। দেশজুড়ে। যেখানেই বাঙালি পেয়েছে সেখানেই ওদের অস্ত্র রক্ত ঝরিয়েছে। ওর মত মুটে-মজুররাও রক্ষা পায়নি। ট্যামা যে এখনও বেঁচে আছে তা আজও ওর কাছে এক বিস্ময়। সে রক্তের ধারা যেন ফের আকাশ ছাড়িয়ে উঠেছে। এ সূর্যের আলো না। এ রক্তের নদী। এ নদীকে চেনে ট্যামা। এ রক্ত দেখে এক বুক হিম করা ভয় নিয়ে গতরাতে ছেঁড়া কাঁথায় পা এলিয়ে দিয়েছিল ও। কিন্তু সে রক্ত ওর পিছু ছাড়েনি। খানিক আগে মনে হয় গত সন্ধ্যায় যে রক্ত গড়াতে গড়াতে ওর পিঠের নিচে এসে জমা হয়েছে। সে ধারার সঙ্গে মিলেমিশে আরও নতুন নতুন ধারায় রক্ত আসছে। সে রক্তের ভেজা আভাস ওর ঘুম কেড়ে নিল এক ঝটকায়। এবং সবকিছু কেন যেন অদ্ভুত রকম বদলে যাচ্ছে। যে বদলে যাওয়ায় কোনো আনন্দ নেই। কেবল ভয়। কেবল আতঙ্ক। কেবল নিঃসঙ্গতা, কেবল রহস্য শুধু হাঁসফাঁস করছে মোটা গুঁই সাপের মতো।
ট্যামার আশ্রয় এ ট্যাংকের তলায় আলো বাতাসের খেলা থাকলেও ট্যাঙ্কির গায়ের রং তো কালো।  নিকষ কালো বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। এমনিতেই স্টিলের তৈরি। তার ওপর অনেক কালের পুরনো। বিকট আকারে দেখতে। তাকালেই গা শিউরে ওঠে। কেবল বানরের লাফ-ঝাঁপ আর টিয়ে পাখির ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ আছে বলে জায়গাটা ভৌতিক কিংবা আতঙ্কময় কিছু মনে হয় না। প্রাণের এক কোলাহল সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে জল ট্যাঙ্কের ছায়া তার চারপাশ। ওদিকে পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি নারকেল গাছ। বাতাস খেলে পাতার গায়ে গায়ে। বাতাস দোলে পাতার ভাঁজে ভাঁজে। বাতাস পেয়ে পাতারা আনন্দে খেলা করে। যে আনন্দ ট্যামাকেও ছুঁয়ে যায়। আনন্দ চোখে আশপাশে তাকায় ও আনন্দের যেন শেষ নেই। সকালে ঘুম ভাঙে ওদের ডাকাডাকি, চ্যাঁচামেচিতে। ভাটি সন্ধ্যায় যখন ট্যাংকের আশ্রয়ে ফেরে তখনও ওদের কিচিরমিচির। যেন ট্যামাকে দেখেই ওদের সবটুকু আনন্দ ঝরে পড়ছে। অথচ আজ সকালটায় সব উল্টো। সে আনন্দের কোনো রেশ নেই। খাঁখাঁ চারদিক বিরান সবকিছু। ঝরাপাতার মর্মর। শুকনো পাতার খসখসে শব্দে পথ ভা-ার করুণ সুর। সব তাতেই কী ভীষণ শূন্যতা। মাঝেমধ্যে একটা-দুটো টিয়ের পাখসাঁটের শব্দ কানে আসে। কিন্তু কোনো ডাকাডাকি নেই। বানরগুলোও দু-একবার কিচকিচ করে উঠলেও। কণ্ঠে বিষণœতার সুর। হয়তো বেসুরো কোনো কান্না আর সবদিনের মতো সকালের সেই উল্লাস যেন কোথাও মাটিচাপা পড়েছে।
ট্যাঙ্কির পাশ ধরে বেশ চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে। এখানে এসে রাস্তটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো বাঁক নিয়েছে। রাস্তার ওপারেই নদী। নদী এখানে বাঁক নিয়েছে। সে বাঁক ধরেই রাস্তা চলে গেছে দূরে। রাস্তার ওপারেই বালুর গদি, ইটের মোকাম। এবং ঢালজুড়ে পাজা করে ইট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। থাকথাক ইট। তারপরেই নদী, নদীজুড়ে অসংখ্য নৌকো। মহাজনী নৌকো। গয়না নৌকো ছাড়াও খেয়াঘাটে পারাপারের লোকজনের ভিড় লেগে থাকে কাকভোর থেকে রাত অবধি। জলের ট্যাংক বাঁয়ে রেখে খানিক এগোলেই খেয়াঘাটের চারদিকে প্রাণচাঞ্চল্যের উদোম হাওয়া। সে হাওয়ায় মন ছুটে যায় নদী ছাড়িয়ে ওপারে। ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনেক দূরে। নৌকোর গায়ে নৌকো লেগে আছে। গলুইয়ের গায়ে গলুই খেয়া তরী ভরে যাচ্ছে মুহূর্তে। চড়াৎ চড়াৎ করে বৈঠা পড়ছে। আর নৌকো এগোচ্ছে মাঝ নদী বরাবর। শূন্য স্থানে নতুন নৌকো এসে ভিড়ছে। ফের যাত্রী বোঝাই হয়ে সরে যাচ্ছে সে নৌকো। মানুষের নানা কর্মের যজ্ঞ চলে এ ঘাটে। অথচ সেখানে আজ কেমন এক গুমোট নিস্তব্ধতা।
আর্মেনিয়ান গির্জা আছে কাছে। সেখানেও আজ ভোরে ঘণ্টা পড়েছে কি না ঠিক ঠিক মনে করতে পারছে না ট্যামা ম-ল। পাদ্রীদের আনাগোনাও চোখে পড়ছে না একেবারে।
দীর্ঘদিন ধরে মুটেগিরি করতে করতে ট্যামার ঘাড় বসে গেছে ভেতর দিকে। বাঁ দিকে বাঁকা হয়ে থাকে ঘাড়। সোজা করে রাখা বড্ড কষ্টকর। আজ সে ঘাড় সোজা করে বারবার রাস্তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করে ট্যামা। সমস্ত নীরবতা ভেঙেচুরে হঠাৎ একটা নেড়ি কুকুর লম্বা কুঁই দিয়ে ডেকে ওঠে। যেন কী এক কষ্টে কুকুরের বুক ভেঙে আসছেÑ ‘মরার কুত্তা আর ডাক দেওয়ার সময় পাইলি না। ট্যাংকির তলায় আইসেই তোকে মরতি হবে… যা… যা। হুস হুস…’ এমনি নানা শব্দে কুকুরটিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ট্যামা। যদিও কুকুরটি আর একটিবারও ডাকেনি কিংবা ডাকার চেষ্টা করেনি। তারপরও কী এক আতঙ্কে ও কুকুরটাকে তাড়িয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। দুদ- নির্ভাবনায় কাটাতে চায়। কিন্তু কুকুরটির সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। কেবল পিটপিট করে তাকাচ্ছে আর লেজ নাড়ছে। ওর চোখে মুখে গভীর মেঘের ছায়া। না-কি চোখের কোণে জল!
ত্রিমোহিনী ম-ল নামটি একটু বড়সড় এবং ডাকার জন্যে একটু খটোমটো বটে। তাই বাবা ওকে ডাকতো ত্রিমো-ত্রিমো বলে। মুখে মুখে সে নাম তিমো হয়ে গেল। পরে ওর শরীর কুঁজো হয়ে ঘাড়টা এক পাশে কাঁৎ হয়ে বসে গেলে এবং শেষে কেমন করে ঝড়ে উপড়ানো গাছের গুঁড়ির মতো বেঁকে গেল। তখন তিমো কখন যেন ট্যামা হয়ে গেল। সেই ট্যামা ম-লের বুকে আজ যেন শূন্যতার হাহাকার। ট্যাসে যাওয়া ঘাড়টাকে কখনও উঁচিয়ে, কখনও ঘুরিয়ে বারবার রাস্তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। আজ বুঝি ট্যামা ওর বসে যাওয়া ঘাড়টিকে ঠিকই টেনে তুলবে। মাঝে মাঝে ঘাড়টাকে চাড়ি দিয়ে চোখ-মুখ ওপর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন মনে হয় নির্ঘাৎ আজ ট্যামা ম-ল ওর বেসাইজ ঘাড়টাকে সাইজে নিয়ে আসবে। ও যেন আজ মরীয়া ওর ট্যামা নামটা ছেঁটে ফেলতে। আসলে কে বুঝবে ওর যন্ত্রণা। একটা আগুনের গোল্লা যেন ওর বুকের ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে সেই কাকভোর থেকে। এ যন্ত্রণাটাই ওকে আর ঘুমোতে দিল না।
পাম্প হাউসের বারান্দার এক কোণে ওর ছোটমতো এক বাক্স রাখা আছে। কেরোসিন কাঠের বাক্স। বাক্সের কোণায় কাগজে মোড়ানো গুলের কৌটো থেকে বড় করে তিন আঙুলের চিমটিতে এক দলা গুল নিয়ে নিচের ঠোঁট ফাঁক করে সেখানে পরম যতেœ বসিয়ে দিচ্ছিল। আর দুটো চোখের মণি নব্বুই ডিগ্রি কোণায় রেখে বাইরে কী যেন দেখছিল। সামনে বড় একটা গেট। আশপাশ সব পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তখনই খেয়াল করল দু-তিনটে আর্মি পিকআপ সাঁই সাঁই করে চলে গেল। মেশিনগান তাক করা কাছে। খানিক পরেই একটা কনভয় এসে থামল ট্যাংকির গেটে। নেমেই গেটের তালা ধরে ঝনঝন করে আওয়াজ করতে থাকে এক আর্মি। তর সইছিল না একটুও।
“গেট খোল। গেট খোল।” বলে ঝন ঝন করে ফের আওয়াজ। মাঝে মাঝে বুট দিয়ে শেকলে বাঁধা গেটের দুপাল্লার মাঝখানে লাথি মারছে। কবির তখনও ঘুমোচ্ছে। পাম্পম্যানের দায়িত্বে ও। কিন্তু ওর কোনো সাড়া নেই। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে দুজন আর্মি গেটের চৌকো খোপে পা রেখে গেট টপকাতে যাচ্ছিল। তখনই ট্যামাকে দেখে এক জোরসে ধমক লাগাল আর্মিÑ এই ব্যাটা কি দেখছ। চোখ তো চোখ। চোখের খোল বার কইরা ফালামু। গেট খোল গেট খোল। ট্যামা কোনোরকম ঠোঁট চেপে দৌড়ে আসে গেটের সামনে।
এই শালা কানে শুনছ না। কখন থেইকা হল্লা করতাছি। গেট খুলস না কেন। মতলব তো ভালো ঠেকতাছে না। এই ন্যাটা কাছে আয়। তোর কানপট্টি বরাবর একটা থাপ্পড় পড়লেই তখন ঠিকই শুনবি। বয়রা সাজো? সব বয়রামি কবুতরের লাহান পতপত করে উইড়া পালাবে। ট্যামা ওদের ধমকে গেটের আরও কাছে আসে।
উফঃ শালায় তো নেশা করছে। সারাশরীরে মুখে গাঞ্জার গন্ধ। গেট খোল। গেট খোল। তামাশা দেখো খাড়াইয়া খাড়াইয়া। আইজ তোর নেশার দাঁত তুইলা ফালামু।
ট্যামার পুরো শরীর স্প্রিংয়ের মতো কাঁপছে। আ-মা-র কাছে চা-বি নাই। আমি নেশাও করি নাই।
Ñ নেশার খবর পরে লবো আগে বল্ তালা মারছে কে?
Ñ পাম্পের মানুষ।
Ñ তুই তবে কেডা।
Ñ আমি পোজা বাই। এইহানে রাইত এট্টু আশ্রয় পাই।
Ñ তার মানে তুই ওয়াসার কেউ না।
Ñ না স্যার। এট্টুহানি মাথা গুঁইজা থাকি। ঘরবাড়ি নাই।
Ñ তুই সরকারের লোক না হয়ে সরকারি জায়গায় থাকস? শেখ তার ঘরবাড়ি দেয় নাই! তোর আইজকা খবর আছে বলেই টপাটপ গেট পেরিয়ে ভেতরে লাফিয়ে পড়ল ওরা। নেমেই কে একজন হাত ঘুরিয়ে এক চড় কষালো ট্যামার গালে। এমনিতেই ছোটখাটো শরীর। সেভাবে খাওয়াও জোটে না আজকাল। তখন চড়ের ধকল আর সামলাতে না পেরে পাঁচ-সাত হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে ও। এমনিতেই গুলের রস জমেছিল মুখে। সে রস বিজলের মতো ওর সারামুখে ছড়িয়ে পড়ে। এবার ওর কোমর বরাবর লাথি দেয়ার জন্যে যেই পা তুলেছে এক আর্মি, তখনই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে একজন লোককে। বয়েস পঁয়ত্রিশ। গায়ে সান্ডোগেঞ্জি। শত চেষ্টায়ও লুঙ্গির গিঁট খুলে যাচ্ছে বারবার। পায়ে রাবারের চপ্পল। ওকে আসতে দেখে পা নামিয়ে নেয় আর্মি। কাছে আসতেইÑ
তুই কে?
আমি কবির, পাম্পম্যান। কান্না আর ফোঁসফোঁস শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে অদ্ভুত এক শব্দ হচ্ছিল কবিরের নাক ও মুখ গলে।
বলতে না বলতেই ওর কান বরাবর এক থাপ্পড় এসে পড়ে। দুই মণ ওজনের থাপ্পড় যাকে বলে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে কবির। দাঁত বসে যায় ওর জিভে। কলকল করে রক্ত বেরুতে থাকে ওর মুখ গলে।
এতক্ষণ গেট খুললি না ক্যান। কোন মাগীর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছিলি?
স্যার আমি অনেক রাতে শুই। এত বড় ট্যাঙ্কি ভরা হইলে তবে শুইতে যাই। অনেক ভোরে পানি ছাড়তে হয়।
আজকে পানি ছাড়ছত?
অহনও টাইম অয় নাই। পনর মিনিট লেট আছে।
লেটের খেতাপুরি। এহনি পানি ছাড়। শেখের যুগ শেষ। মনে রাখবি কেউ যেন পানির জন্য কষ্ট না পায়। যদি শুনি কেউ পানি পায় নাই তবে তর খবর আছে। বলেই বন্দুকের নল ওর বুকে তাক করে। ভয়ে আতঙ্কে ছড়ছড় করে পেশাব করে দেয় কবির।
এ দেখে আর্মিগুলো হো হো করে হেসে ওঠে। প্রাণ খোলা সে হাসি। যেন পাকআর্মিদের প্রেতাত্মা ওদের বুকে বসে আছে।
যা এবার গেট খোল। বলে ঘাড় ধরে গেটের দিকে ঠেলে দেয় কবিরকে। কবিরের কোমরে বাধা কায়তনের সঙ্গে ইয়াবড় এক চাবির ঝোপা। চেনা চাবিটা খুঁজে পেতে আজ যেন ও কেনো বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে। একটার পর একটা চাবি ধরে। হাতে নেয়। তালা খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
এটা-না
ওটা-না
তৃতীয়টা-না
পরেরটা-না
তার পরেরটা-না
আরও একটা-না।
না, চাবি কোনোটাই ফিট করছে না। তালাও খুলছে না। এক আর্মি এবার দাঁত কিড়মিড় করে পেছন থেকে এক লাথি কষায় কবিরের পাছায়। আচমকা লাথিতে ওর মুখ গেটের লোহায় থেতলে যায়। মুহূর্তে কপাল ট্যামা হয়ে ওঠে। এবার নাক দিয়েও রক্ত ঝরতে থাকে। নিজেকে ধাতস্ত করে বড্ড করুণ দৃষ্টিতে একবার তাকায় কবির। এবার ঠিকই মিলে যায় চাবি। “শালার হারামখোর। এগুলারে কেমনে শায়েস্তা করতে অয় দেখলেন? অহন ঠিকই চাবি বার হয়। আসলেই মাইরের উপরে অসুধ নাই।” বলেই সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে এক হাসিতে ওর ঠোঁট ভরে ওঠে। সে হাসি দেখে তখন ট্যামার মনে হয় মানুষকে ভয় দেখানোর জন্যে এমন হাসি শেখাতে বুঝি ওদের ট্রেনিং দেয়া হয়। কী হাসি রে বাপ, আত্মা খাঁচা ছাইড়া যাওনের জোগাড়!
গেট খুলতেই আর্মিগুলো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফের ফিরে আসে। কাছে ডাকে ট্যামাকে। তারপর পাছায় হালকামত এক লাথি ঝেড়ে কান ধরে বাইরে নিয়ে যায় ওকে। দূর থেকেই কবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই নাটা যেন আর ভিতরে না ঢুকে। যদি ঢুকছে তোর খবর আছে। মনে রাখিস এইডা সরকারি জায়গা। আবোল তাবোল কাউরে ঢুকাবি তো জানে মাইরা ফালামু। আর মনে রাখবি মানুষের যাতে পানির জন্য কোনো কষ্ট না হয়। যদি খবর পাই মানুষ পানির জন্য কষ্ট পাইতাছে, তাহলে বুঝুম তুই মুজিবের দালাল। তখন মুজিবের যে পরিণতি সেই একই পরিণতি হইবে তোরও।
গেটের বাইরে গিয়ে রাস্তায় কুকুরের মতো দাবড়াতে দাবড়াতে অনেক দূর তাড়িয়ে দিয়ে আসে ট্যামাকে। রাস্তায় মানুষজন নেই বললেই চলে। আরো কয়েকটা আর্মির জিপ সামনে পেছনে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে। তবে জিপগুলো শূন্য। আর্মিরা নেই। কোথাও গিয়েছে হয়তো।
সুড়কির টিলার ওপর একটা ছাতা তখনও মেলে আছে। জরিনা ও সখিনা দুবোনে মিলে এখানে ইট ভেঙে খোয়া বানায়। রোদকে আড়াল করার জন্য খোয়ার মাঝখানে এক বাঁশের লগি পুতে তার সঙ্গে ছাতি বেঁধে রাখে। কিন্তু গত রাতে ওরা কেন যেন ছাতিটা নিতে ভুলে গেছে। ছাতির ছায়ায় গিয়ে বসে থাকে ট্যামা। থাপ্পড় খেয়ে তখনও ওর মাথা হেলদোল করছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তবু কোথাও একটু জলের দেখা নেই।
অনেকটা সময় ঝিম মেরে থাকে ট্যামা। একে একে সে খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করছে। তখনও সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে ওর। মুজিবের যুগ শেষ! ‘কী কয় হালার পুতেরা।’
কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে কিছু এমন কাউকে চোখে পড়ছে না। আলু, পেঁয়াজ, আদা, কুমড়োর বড় বড় মোকামগুলো সব বন্ধ। এমনকি চান মিয়ার হোটেলটাও আজ খোলেনি। তবে হোটেলটার পেছনে কারিগররা সব থাকে ম্যাস ভাড়া করে। ওদিকে যাবে কী একবার! কিন্তু আশপাশে তাকাতেই ওর চোখ ছোট হয়ে আসে। বুক শুকিয়ে তেজপাতা। তখনও একটি কনভয়, একটা জিপ দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ভেতর দিকের বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে বেশকিছু লোকজন ধরে নিয়ে আসে ওরা। বয়েস সবার বিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে ওদের কনভয়ের সামনে। এরপর আরও কয়েকজনকে ধরে এনে সবাইকে সারবেঁধে কনভয়ে তোলে। তোলা শেষ হলে ঝুমঝুম শব্দ করে কনভয় চলে যায় বাঁকের আড়ালে কোথাও।
‘একাত্তরে পাকসেনারা গেলগা তয় এরা কারা? পাকসেনাগো মতোই তো হম্বিতম্বি করলো। নাকি পাকসেনাগো ভূত আইল?’ বিড়বিড় করে স্বগোক্তি করে ট্যামা ম-ল। কী কইল হালারা, শেখের বেটার যুগ না-কি শেষ। মাত্থা খারাপ। নেশা করছে না তো! ঢাকা ভার্সিটির ময়দানে না আজ শেখ বেটার ভাষণ দেওনের কতা। রাতের শেষ বোঝাটা নামিয়ে ফেরার সময় ঠাটারি বাজারে পার্টি অফিসের সামনে দেখেছে অনেক লোকের হল্লা। তাদের অনেকের মুখে শুনেছে। আরও শুনছে ‘দুইডা বোমা নাকি ফুটছে গুলিস্তানে না কোনহানে। কানে ঠাডা পড়ার মতো শব্দ। তব্দা লাইগা গেছে কান।’
কখন যেন আর্মির গাড়ির দুটো চলে গেছে। এখন আর্মির কোনো গাড়ি আর দেখা যাচ্ছে কোথাও। এ ফাঁকে ইটখোলা থেকে রাস্তায় উঠে আসে ট্যামা ম-ল। তখনই দেখে গেটের ওপারে বেশ খানিকটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ঠোঁটমুখ ফুলে আলু। ট্যামাকে দেখেই ও একবার আকাশের দিকে হাত তোলে আবার দুহাত নেড়ে কী যেন বোঝাতে চেষ্টা করছে। একবার দুহাত ওর বুকে ঠেকায়। আবার সে হাত ঝাড়তে থাকে। ভেজা হাতের জল যেভাবে ঝেড়ে ফেলে, ঠিক সেভাবেই।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় ট্যামার। ‘অর্ধেক তো মইরেই গেছি। আর অর্ধেক মরতে কতক্ষণ, না হয় মইরেই যাব।’ বলেই এক দৌড়ে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ট্যামা। তখনও বেশ কিছুটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ও চোরা দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক একবার তাকিয়ে একরকম কুঁজো হয়ে গেটের কাছে চলে আসে। কপালে ওর পুরু বলিরেখা। চোখের মণি দুটোয় বড় অস্থিরতা। ও কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, বঙ্গবন্ধু নাই! কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, কেঁদে ওঠে ওর।
‘পাগলের কতা নাকি!’ ট্যামার কণ্ঠে বিস্ময়। ‘বঙ্গবন্ধুর গাঁয়ে টোকা দিবার ক্ষমতা আছে এমন বাপের পুতের জন্ম অহনও বাংলাদেশে অয় নাই।’ ট্যামার গলায় অদ্ভুত এক ঝাঁজ ফুটে ওঠে। ‘তুই অহনও স্বপ্নে আছত ট্যামাÑ বঙ্গবন্ধু নাই। মাইরা ফালাইছে।’
কেডায় কইল তরে?
রেডিও তে?
রেডিও তে? কী কইল!
শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। আরও কত কী? বারবার কইতাছে। ডালিম নামে এক মেজর এট্টু পরপরই কইতাছে। ট্যামার তখন ইচ্ছে হলো কবিরের ঘরে গিয়ে শোনে খবরটা। কিন্তু গেটে আরও কয়েকটা পেল্লায় সাইজের তালা ঝুলতে দেখে চুপ মেরে যায় ট্যামা। ওর বুক তখন হাঁপরের মতো উঠছে নামছে। ওর খেয়াল হয় পাশের ইশকুলের গেটেও তালা। অন্যদিন এ সময়ে মেয়েদের হৈচৈয়ে রাস্তায় কানপাতা দায়। সেসঙ্গে রিকশা, ঠেলা, ঘোড়াগাড়ির জ্যাম। বেলের টুংটাং। ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক। সহিশের অশ্লীল খিস্তি। সবকিছু মিলিয়ে এ জায়গাটায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে থাকে সেই সকাল থেকে।
না আজ কোনো ভিড় নেই। কোনো রিকশা নেই। গেট খোলা নেই ইশকুলের। দারোয়ানটাকেও দেখছে না কোথাও। সবকিছু কেমন উল্টোপাল্টা লাগছে। তবে কী…। ট্যামা আর দেরি করে না। চাঁন মিয়ার হোটেলের পাশের গলি ধরে ভেতরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে ম্যাসের সবাই রেডিও ঘিরে কান পেতে কী যেন শুনছে। “আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরচারী সরকার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে…” ট্যামা চুপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। দু-হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নায় গভীর এক বিষণœতা ঘরের সবাইকে যেন চেপে ধরে।
বিকেলে নদী পাড়ে এসে বসে ট্যামা। একমনে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চুক! চুক! চুক! চুক! শব্দে ঢেউয়ের পরে ঢেউ চলে যেতে থাকে ভাটির দিকে। ঢৈউয়ের এ শব্দ ভীষণ চেনা ওর। কেমন একটা ছন্দ খুঁজে পায় ও। কখনও মনে হয় ঢেউগুলো কী যেন কথা কয়ে কয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ সে শব্দে কী এক কান্নার সুর বাজে। অনেকক্ষণ খেয়াল করেছে ট্যামা। করুণ রাগিণী বাজছে নদীর জলে। একমনে সে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয় ট্যামার, জলের রং লাল। শুধু লাল নয়। রক্ত লাল! একটু আগেও জল ছিল ঘোলা। পরে এখন ফিকে রং ছিল একসময়। গভীর লাল আবির যেন ছড়িয়ে পড়েছে সে জলে। রক্ত না তো! বারবার চোখ কচলায় ট্যামা। ফের জলের দিকে চোখ রাখে। নাহ লাল। উৎকট লাল রং জলের। চোখ ভুল দেখছে না তো। হঠাৎ কী মনে করে আকাশের দিকে তাকায় ও। পশ্চিমাকাশে সূর্য এখনও বেশ উপরে। নামতে আরও বেশ খানিকটা সময় নেবে। খেয়াল করে আজকের আকাশ এখনও সেভাবে রক্তিম হয়নি। যেমনটি হয়েছিল গত সন্ধ্যায়। তাহলে আজ জল এত রাঙা কেন? ট্যামা আজলা ভরে জল হাতে নেয়। কিন্তু সে জলে কোনো রক্তের ছোঁয়া নেই। ফের নদীর জলে তাকায়। কী অসহনীয় রক্তিম সে জল। বড্ড পবিত্র,  নির্মোহ আর নিরাশক্ত মনে হয় সে রক্ত ধারা। রক্তের মধ্যে কোনো অভিমানের ছায়া নেই। এমনটিই ঘটবে। এভাবেই বুঝি পুরস্কৃত করবে দুখিনি বাংলার দুখি বাঙালিরা, তাই কোনো বিস্ময় নেই সে রক্তের ধারায়। এ রক্তের প্রবহমানতা চলবে অনন্তকাল ধরে।
পুরো শরীরে বড় রকমের এক ঝাঁকুনি খায় ট্যামা। কী মনে করে চারদিকে খুব বড় বড় চোখ করে তাকায় ও। না কোথাও একটিও নৌকো নেই। কার্গোগুলো স্থবির হয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছে কী এক অজানা আশঙ্কায়। একটি লঞ্চেরও ভেঁপু বাজেনি আজ সারাদিন। বুকের মধ্যে ভয়ানক এক শূন্যতা অনুভব করে ট্যামা। উঁইয়ের ঢিবির মতো খসখসে কী যেন ওর অন্তরের গভীরে মাথা তুলছে একটু একটু করে। ওই ঢিবির আড়ালে চাপা পড়ে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে।
এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে যায় ট্যামা। একছুটে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে চলে আসে কী মনে করে। কত দিনের পুরনো ঠাঁই। ছিন্ন করা কী এত সহজ। মা গেল। বাবা গেল। ভাইবোনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল একসময়। সেই থেকে একা মানুষটির সঙ্গে এই জলের ট্যাংকের গাঁটছড়া। তা তো আজকের কথা নয়। বিয়ে থা করেনি বলে জীবন থেমে আছে ওর মধ্যেই। তা না হলে বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার এক চাতাল সমান বড় হয়ে যেত। একটি মাত্র জীবন। তাই তেমন আর নাড়াচাড়ার প্রয়োজন পড়েনি। বিশেষ করে ট্যাংকের এ আশ্রয়, এ জল এর ছায়া এবং এর বানর আর টিয়ে পাখির সঙ্গে ওর দীর্ঘদিনের যে সখ্যতা তা ওই মিলিটারির বেটাদের এক ধমকেই শেষ হয়ে যাবে? ট্যামা ট্যাংকের ভেতরের দিকের পাঁচিল কালো কালো মোটা সব পাইপ, সবই তো আগের মতোই আছে। কিন্তু কোনো চাঞ্চল্য নেই। নিথর, নীরব, বিমর্ষ ওরা। যেন ওদের রক্তেমাংসে গড়া কোনো শরীর নয়। মাটির গড়া প্রতীমা সব বসে আছে থাকে থাকে। টিয়েগুলোরও একই দশা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ওরা। কিংবা ভেতরে প্রাণ নেই। উড়তে বোধহয় ভুলে গেছে জনমের মতো।
গেটের শিক ধরে অনেক সময় অপলকে তাকিয়ে থাকে জলের ট্যাঙ্কের দিকে। একসময় ফিস ফিস করে বলে, বান্দর, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। বানরগুলোর কোনো সাড়া নেই। একেবারে মৌন। চুপচাপ।
ও-টিয়া, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। টিয়ারাও নিঃশব্দ। কোনো সাড়া মেলে না ওদের কাছ থেকে।
‘শেখের বেটারে মারি ফেলবে এমন বুকের পাটা কার? শেখের বুক হচ্ছি গে পাহাড়ের লাহান। ও বুকে বুলেট ঢোকে না। ফিরে আসবি সমান গতিতে। ওর বুকে কেউ বুলেট ঢোকানোর চেষ্টা কইরলে সে বুলেট উল্টো তার বুকে এইসে বিঁধবে। এ কথা জানে। হ¹লে জানে। সারা দেশজোড়া মানুষ জানে। তারপরও কার বেটার সাহস হবে শেখের বুকে গুলি করে। পাকসেনারা সাহস করেনি যারে গুলি কইরতে। আইউব পারে নাই। ইয়াহিয়াও পারে নাই। কব্বর খুঁইড়াও পারে নাই তারে গুল্লি করতে। সেই শেখের বেটারে অহন গুল্লি করবো কোন খানকির পুত। সেই বেজন্মার পুতের জন্ম অয় নাই অহনও বাংলাদেশে। কি টিয়া হাছা কইলাম না মিছা? কতা ঠিক কি না টিয়া? এবারও টিয়ারা নীরব।
কি বান্দর? আমার কথায় কি বিশ্বাস অয় না। অয় না বিশ্বাস? বানরগুলোও নীরব। একইরকম মৌনতার ধ্যানে ওরা মগ্ন।
বানরের কাছ থেকে, টিয়ার কাছ থেকে কোনোরকম সাড়া না পেয়ে, জেদ ধরে যায় ওর মনে, ওরে পুঙ্গির পুতেরা, কতা কস্ না ক্যান্! তবে কী আমি মিছে কথা বইলছি। তখনই সাঁই করে একটা মিলিটারি জিপ চলে গেল উত্তরে। কেমন খ্যাপাটে গাড়িটার চালচলন। যেন পাগল হয়ে ছুটছে। দ্বিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটছে। সে শব্দে পেছন ফিরে তাকাতেই ওর চোখ থমকে যায়। বুক কেঁপে ওঠে অজানা কোনো আশঙ্কায়।
রক্তাক্ত আকাশ। পশ্চিমে তাকালে শুধু রক্তের ঢেউ চোখে পড়ে। প্রতিদিনই সূর্য ডোবে। কিন্তু ডুবন্ত সূর্য কখনও এভাবে রক্ত ছড়ায় না। গতকাল আর আজ যা ঘটল তার সঙ্গে একাত্তরের ২৫ মার্চ সন্ধ্যার সূর্য ডোবার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় ট্যামা। একাত্তুরের সন্ধ্যায় যেমনি রক্তগঙ্গার ছবি মিছে হয়নি। ঠিকই রাতে রক্ত ঝরেছে হাজার হাজার মানুষের। আজও কেন যেন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি রক্ত ঝরার আলামত এটা। তবে কী শেখের বেটা ঠিকই মাটি নিয়েছে। চোখে বইজে ফেলেছে? কোনোভাবেই বিশ্বাস হয় না। এ সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোককে পথ চলতে দেখা যায়। কেউ কেউ পায়চারি করছে উদাসভবে। দু-একজন জটলা পাকালেও গাড়ির শব্দ পেলেই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ হারিয়ে যাচ্ছে এঁদো গলির কোনো অন্ধকারে। তখনই কবির এসে এক ফাঁকে জানিয়ে যায়, আসলেই বঙ্গবন্ধু নাই।
কেমতে বুঝলি।
আকাশবানি থেইকাও কইছে।
আকাশবানিডা আবার কী?
ভারতের রেডিও স্টেশনের নাম। সরকারি রেডিও। অগো কথা মিছা না। না জাইনা তারা খবর দেয় নাই।
ট্যামা ট্যাংকের পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। দুহাতে কপাল চেপে ধরে বসে থাকে অনেকক্ষণ। অস্ফুটে বলতে থাকে, ‘এতক্ষণ ভাবছিলাম সব যেন মিছা হয়। ডালিম মিছা অয়। মিলিটারির জিপ মিছা অয়। রেডিওর কথা মিছা অয়। অহন আর কোনো ভরসায় কমু শেখের বেটা মরে নাই। কবির কইল, আকাশবাণী মিছা কথা কয় না।’
ওর চোখ গলে জল ঝরেছে অনেকটা সময় ধরে। ট্যামা একটুর জন্যেও ওর কান্নার কণ্ঠ চেপে ধরার চেষ্টা করেনি। সব বাঁধন আলগা করে দিয়ে দলা দলা কান্নাদের জল হয়ে বেরিয়ে যাবার পথ তৈরি করে রেখেছে ট্যামা। সে ধারায় বুকের পাষাণ অনেকটা যেন নেমে গেছে। বেশ হাল্কা বোধ হচ্ছে এখন নিজেকে। ওর দুচোখের তলায় জলের ধারা শুকিয়ে খসখসে কেমন এক দাগ পড়েছে। পথের ওপারে অপলকে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। গভীর এক ধ্যানে ডুবে আছে ও। হঠাৎ মনে হয় মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। কখনও আবার মনে হয় মানুষটা পায়চারি করছে। মুখে পাইপ। গভীর চিন্তায় মগ্ন। ট্যামা বারকয়েক চোখ কচলায়। ভুল দেখছে না তো! কিন্তু না তেমনই দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। শাদা পাঞ্জাবি পরা।
ট্যামার ভেতর থেকে সব অর্গল যেন খসে পড়ে। কথার খেই হারিয়ে ফেলে। ‘শেখের বেটা শেখ। আপনে কই যাইবেন আমাগ রাইখা। আপনি কি খালি দেশের নেতা! আপনে আমাগও নেতা। আপনে এই এলাকার এমপি। আমাগ ভোটে নির্বাচিত হইছেন। আমরা আপনারে ভোট দিয়া এমপি বানাইছি। আপনে আর যাবেন কই। এই নদী এই বালু মহাল, এই ইটের ভাটা, পাজা পাজা ইট সবই তো আপনার। অগো মালিকেরা সবাই আপনেরে ভোট দিছে। পাস করাইছে। আপনি এই এলাকার এমপি। ভুইলা গেলে তো চইলবে না।’
এ জীবনে তিন-তিনবার শেখের বেটার ভাষণ একেবারে কাছ থেকে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল ট্যামার। একবার ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে। একবার ’৭০ সালের নির্বাচনের সময় ধুপখোলার মাঠে। আরেকবার ’৭৪ সালে বানের সময়। দেশের বাড়িতে। ত্রাণ দিতে গিয়েছিল ওদের গ্রামে। আর একটা ভাষণ শুনেছে রেডিওতে। সত্তুরের নির্বাচনের আগে। জাতির উদ্দেশে নির্বাচনের আগে শেষ ভাষণ। সেসব স্মৃতি মনে করে ট্যামা বলে, ‘বাঘের বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইল! বাঙালি হইয়া বাঙালির সিংহডারে মাইরে ফালাইল! অই হারামখোরের পুতেরা, তোদের বুকটা একটুও কাঁপে নাই! নির্ঘাৎ অজ্ঞান কইরে তারপর গুলি করিছে শুয়রের ঘরের শুয়ররা। সিংহ, বাঘ, চিতা, নেকড়ে সবটারে এক কইরলে যে শক্তি অইবে, এক শেখে তার চেয়ে বেশি শক্তি রাখে। এ কথা কাজী মতিন কইছে। বাস্তুহারা লীগের নেতা কাজী মতিন। বঙ্গবন্ধু ওরে রেডিও বিবিসি কইয়ে ডাকতো! হেই বাগডার বুকের সামনে খাড়াইয়া ওর গায়ে গুলি করা অত সহজ কাম না!’
হঠাৎ তার এ কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পায় ট্যামা ম-ল। সিংহের মতো গর্জন করে কে যেন বলছে, ‘কঠিন কাজটাই খুব সহজেই করতে পেরেছে ওরা। তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না। ওরা আমার বুক বরাবরই গুলি করেছে। আমার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বাঙালির বুলেটের আঘাতে। ওরা পেরেছে। খুব সহজেই ওরা আমার বুকে গুলি চালাতে পেরেছে ট্যামা।’ হঠাৎ ও সম্বিৎ ফিরে পায়।
একরকম কুঁজো হয়ে ছুটতে ছুটতে রাস্তার ওপারে যায়। না কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। এমনি সিংহ কণ্ঠে দেয়া শেখের বেটার ভাষণের কথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে কানে ভাসে ট্যামার। “কৃষকদের প্রভুরা সকল সহায় সম্পত্তি আর সম্পদের মালিক। সব সুবিধা তারা ভোগ কইত্তেছে। অগো সহায় সম্পত্তি শুধুই বাইত্তেছে। আর অসহায় দরিদ্র কৃষক দিনদিন আরও দরিদ্র হইত্তেছে। বাঁচার তাগিদে তারা অহন গ্রাম ছাইড়ে শহরে চলি আইসতেছে।” মিছা তো কয়নাই। একটা কথাও তো মিছা কয় নাই শেখের পুত। বাংলার মীর জাফরদের তো শেখের বেটা তো ঠিকই চিনতে পাইরেছিল। তাইলে এতবড় ষড়যন্ত্রের ডিনামাইট কারা পুঁইতেছিল তা কেন ধইরতে পারলে না মুজিবর। আমাগ এমপি তুমি। তোমার কণ্ঠের সে কী তেজ। মাটি কাঁইপে ওঠে। কান ফাইটে ওঠে। তুমিই তো বইলেছিলে রেডিওর ভাষণে, বাংলার মীরজাফরদের কথা। তুমিই তো বইলেছিলে মীরজাফরদের কারণে আইজ আমাদের গায়ে কাপড় নাই। থালায় ভাত নাই। মাথার ওপর আশ্রয় নাই। তাই তো খালের ধারে রেলের ধারে থেইকা উচ্ছেদ হইলাম। অহন পানির ট্যাংক থেইকা, সরকারি জায়গা থেইকাও উচ্ছেদ হইলাম। আশ্রয় তো আর পাইলাম না শেখের বেটা। এখন তুই যে চইলে গেলি, তাইলে আশ্রয়ডা আর কেডায় দিবে। কার দিকে আর পথ চাইয়ে থাকব। তুই তো ভরসা ছিলি। তুই তো ঠিকই কইলি বাংলার ইতিহাস মানে সিরাজদ্দৌলা বনাম মীরজাফরের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস দুখিমানুষ বনাম মোনেমখাঁদের ইতিহাস। রেডিওতে কইছিলি। মনে আছে তোর? শুনছি তুই কারওরে ভুলস না। একবার দেখলে তার নাম। বদনখানি ঠিকই চিনতে পারস। আমরাও তোর ভাষণের কতা ভুলি নাই। ভুলি ক্যামনে। আমাগ প্রাণের কতা ভুলা যায়!
তাহলে তুই কেনে এমন ভুল করলি শেখের বেটা। শত্রু চিনাও তারে পুষলি। দুধ-কলা দি পুষলি। অহন তো ছোবল মারল ঠিকই। আশ্রয় ছিল না বইলে আমার তো কোনো দুঃখ ছিল না কখনও। কোনো অভিযোগ তো ছিল না! একা মানুষ। ট্যাংকির ছায়ায় খারাপ তো আছিলাম না। টিয়া, বান্দর এরা আমার সন্তানের মতো। আমারে ওরা দেইখা রাখতো। চোখে চোখে রাখতো সবসময়। আমিও অগো মায়া করি। অগো হৃদয়ডা অনেক বড়। অনেক অনেক বড় তোমার মীরজাফর আর মোনেমখাঁদের মতো বাঙালিদের চেইয়ে। ওরা অই ট্যাঙ্কির ওপরে থাকে না। অগো আত্মার লগে আমার আত্মার বাধি ফালাইছে, ওরা আমার আত্মীয়। সন্ধ্যা হলি পরে ওরা আমার জন্য পথ চাইয়ে থাহে। আমি ঠিকই বুঝতে পারি। ট্যাংকির ভেতরে পা রাখতেই আমি বুঝি ওদের মনের কথা। ওরা খুশিতে মুহূর্তে চিঁচি ট্যাঁ ট্যাঁ করে এতবড় ট্যাংকি ডারে মাথায় তুইলে ছাড়ে। প্রেম! গভীর এক প্রেম আমার সঙ্গে ওদের। কিন্তু বাঙালির প্রেমে যে অনেক বিষ ছিল তা আমরা না জানলেও তুমি তো ঠিকই জেইনেছিলে মুজিব। তারপরও…।
বলে দু-হাতে বুক চাপড়াতে থাকে ট্যামা। বাঁধনছেঁড়া কষ্ট। বুক যেন ভেঙে পড়বে এক্ষুণি। অনেকে ওকে জাপটে ধরে। অনেকে আশ্বস্ত করে মাথায় হাত বুলিয়ে। কেউ বলে মিলিটারি আসতেছে। গুলি করবে ট্যামা। তোর বুক বরাবর গুলি করবে। এ কথায় আরও বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় ও। এবার দুহাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ায় ট্যামা। ঘাড়টা কাৎ হয়ে থাকে। সে ঘাড়টাকে সোজা করার চেষ্টা করে বারবার। আর কেমন এক খিঁচানি দিয়ে বলে, ডাকো তোমার মিলিটারি। দেখি কয়ডা গুলি কইরতে পারে। গুলিতেও শান্তি কিন্তু মীরজাফরদের এই বিজয়, মোনেমখাঁদের এই উল্লাস আমি সহ্য কইরতে পাইতেছি না। কোনোভাবেই পাইতেছি না। মৃত্যু চাই। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে ওরে তোরা কেউ আয় না আমার কাছে। দেরি কচ্ছিস কেন। মৃত্যু বড় সহজ। এই দেশে মৃত্যু বড় সহজ। যুদ্ধে মানুষ মরেছে। আন্দোলনে মরেছে। এখন মরেছে শেখের বেটা নিজেই। তফাৎ কেবল একটাই। ওরা মইরেছে পাকসেনাদের হাতে। শেখ মইরেছে বাংলা সেনাদের হাতে। ওর দুঃখী বাংলার পোলাপানের হাতেই।
ও মুরুব্বিরা, ও দাদারা মীরজাফরের এই দেশে, মোনেমখানের এই দেশে আমার আত্মা কেন যেন আর শান্তি পাচ্ছে না। আমি শান্তির দেশে যাব। আমার নেতার কাছে যাব। আমার এমপির কাছে যাব। নির্বাচনের কালে গলা ফাটাইয়া কত ক্যানভাস কইরেছি। মিছিল কইরেছি আমর নেতার জন্য ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। বলেই দুহাত তুলে নাচাতে নাচাতে মাথাটা হঠাৎ ঢলে পড়ে ওর। এ খবর ওর প্রিয় টিয়ে পাখিরা, ওর প্রিয় বানরেরা জানে কি না কে জানে। তবে ওদের জীবনযাপনে যে বধিরতা, মৌনতা আর শূন্যতা নেমে এসেছে তা বোধহয় অনেক অনেক দিন বিমর্ষ করে রাখবে এই জলের ট্যাংকের তল্লাট। এর ছায়া এর আশপাশ। লঞ্চের ভেঁপুতে ওদের চিত্তে কোনো চাঞ্চল্য আর জাগবে কি না কে জানে। যদিও জাগে সে অনেক অনেক দিন পরে। যেদিন মানুষ বলবে একদেশে আছিল এক শেখের বেটা। শেখ মুজিব ওর নাম। পাহাড়ের লাহান। দুখি বাংলার জন্য জীবন দিয়েছিল। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেল খেটেছিল। তবু আপস করে নাই মীরজাফরদের সঙ্গে। কবির শোনে ট্যামা যেন বলছে :
লোকে আরও বলবে মৃত্যুর পরও ওর আত্মা যায় নাই। সাত আসমান উপরে যায় নাই। সাত আসমান কী, এক আসমানেও উঠে নাই। মাটিতেই আছে। ট্যাকের ঝোপে, খালে-বিলে, মাটিতে। পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে, ঝোপঝাড়ে, চরের বালুতে, আলু গাছের লতা-পাতায়, গাঙশালিকের গর্তে কোথায় সে নাই?  এত বছর পরও ওর আত্মা ঘোরে ধানের সবুজ বিচালি ছুঁয়ে। নদীর জলে সাঁতার কাটে। নৌকা বায়। লাঙল চষে। আর দুখি মানুষদের দেখে চোখের জল ফেলে। মুজিব যাবে কোণে। বাংলার মাটি ওরে ছাইড়বে না। কোনোদিনই ছাইড়বে না কবির। চোখ বুজলি ওরে দেখতি পাবি। চোখ খুললি পরে ওরে দেখতি পাবি। তবে যে সে চোখে দেখলি পরে তারে দেখা যাবে না। প্রেমের চোখে দেখতি হবে। ভালোবাসার চোখে দেখতি হবে। তোরা তো জানস না, প্রেম আর ভালোবাসা দিয়াই শেখের শরীর, ওর রক্ত গইড়েছে খোদায়। গুল্লি মাইরা শরীর মারা যায়, দেহ ফেলা যায়। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসারে তুমি গুল্লি করবা কেমনে। নিরাকার ভালোবাসার কোন অঙ্গে অদেখা প্রেমের কোন শরীরে গুল্লি করবা! বুকে প্রেম শরীরে ভালোবাসা জড়াইয়া শেখ ঠিকই এই বাংলার জলে, মাটিতে, আকাশে, পাখির নীড়ে, পাখির নরম ডানার ভিড়ে।

Category:

তিন বিল্লি গেলাম দিল্লি

Posted on by 0 comment

8-6-2018 7-38-41 PMনিয়ামত শাহ: রম্য রচনার প্রতীকী প্রয়োজনে আমরা তিনজন হয়ে গেলাম তিন বিল্লি। ক’দিন আগে গিয়েছিলাম দিল্লি।
কেন? কেন? প-িতি ভাষায় ‘কার্যকারণ কী’?
শুঁটকি। শুঁটকি। বাংলাদেশে আমরা ২০০৭ সনের ১১ জানুয়ারি থেকে ডাইরেক্ট শুঁটকি থেকে বঞ্চিত। এই শুঁটকি পাওয়ার জন্য কত কী যে করলাম। কত ম্যাঁওয়াও। কত ঘ্যাঁওয়াও। নখদন্ত। আঁচড়। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর। মনুষ্যভাষায় আগুনে বোমা, জ্বালাও পোড়াও, অবরোধ, চালক-যাত্রী আগুনে পুড়ে খাক করে দেয়া। আরও কত কী। বিদেশি দূত বিল্লি, স্বদেশী ‘সুশীল’ মার্জার, মিডিয়া টাইকুন ভেলকি। তবু হায় মেলেনি শুঁটকি।
২০০৮। ২০১৪। শুঁটকি মিলল না অনেক ম্যাঁওয়াও কাইজার পরও। পদ্মাসেতু আটকাবার সব ফন্দিফিকিরও ফক্কিকার হয়ে গেল। আমাদের গোত্রপ্রধানা বললেন, পদ্মাসেতুতে কেউ উঠবেন না। ওটা জোড়াতালি দিয়ে বানানো। ভেঙে পড়বে। একেবারে একটি সেতু কোনো জোড়া না লাগিয়ে তৈরি করবার নির্মাণ বিজ্ঞান পৃথিবীতে কোথাও নেই। তাই বিশ্ববিজ্ঞানীরা মুচকি হাসেন। হাসুক।
এখন চাই শুঁটকি। যে করেই হোক শুঁটকি চাই। ২০১৮-১৯ এর পর্বে আমাদের যে ক্ষমতা নামক শুঁটকি ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর পারি না।
আমাদের দেশি-বিদেশি ‘চিন্তাপুকুর’ মহামতিবৃন্দ এক হলেন। এখন কী করা যায়। সবশেষে এই ঠিক হলো দিল্লির মহাবিল্লিরা আমাদের দেশের শুঁটকি ব্যাপারটিতে যেহেতু একটা কিছু, অতএব সেই দিল্লিওয়ালা মহাবিল্লিদের দিল ভিজানো ছাড়া গতি নেই। ‘চিন্তাপুকুররা’ অনেক ভেবেচিন্তে আমাদের তিন বিল্লিকেই দিল্লিতে হাজিরা-নজরানা দেবার জন্য ঠিক করলেন।
হায় হায় কী করি! কী করি!! কেননা শুঁটকির আন্তর্জাতিক আর আঞ্চলিক হিসাবে আমরা যে অনেক জট পাকিয়ে ফেলেছি। একসময় বলেছি এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দাদের আজান, নামাজ, কোরআন কিছুই থাকবে না যদি শুঁটকির তহবিলদারি আমাদের হাতে না থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে যাবে দিল্লির হাতে।
২০০১ সনে শুঁটকির তহবিলদারি আমাদের হাতে তুলে দিতে দিল্লিও অনেক আশা করে যোগ দিয়েছিল পশ্চিমা মহা মহা বিল্লিদের সাথে। গ্যাস দেবার কথা দিয়েও হিম্মত হলো না আমাদের। বরং দিল্লিরাজকে আউলা-ঝাউলা করতে জাহাজে-ট্রাকে করে বিপুল অস্ত্র সেঁধিয়ে দিলাম ওদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। তদুপরি ওদের দেশের একজন সর্বদলীয় গণ্যমান্য রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মোলাকাত করার দিন-তারিখ-সময় অনেক আগে থেকেই ঠিক করার পরও তুচ্ছ অজুহাতে দেখা করলাম না। কূটনৈতিক ভাষা কী জানি না, এ যে এক বিশাল থাপ্পড়সম। কার বুদ্ধিতে গোত্রপ্রধান এমন অকা-টা করলেন, সেই ‘চিন্তাপুকুরে’ কারা কারা হাবুডুবু খেতেন তখন জানি না। সেই যে আমাদের মুখ পুড়ল, আর ভবি ভুলল না। ২০১৪ সালে শুঁটকির গন্ধ পেয়ে পেয়েও হঠাৎ পপাত ধরণীতল।
এইসব পটভূমি তো সবারই জানা। দিল্লির পিঠ-চাপড়ানিতে ২০০১ সনে শুঁটকি-মহাজন হয়েও ‘বেইমানি’ করার দায়ে পড়েছি এই বেকায়দায়। এখন আমরা মুখপোড়া বিল্লি প্রজাতি। ‘চিন্তাপুকুর’ ক’জনা বললেন, বাস্তব মেনে নিতে হবে। অতএব পোড়ামুখের লজ্জা নিয়েই রওনা হলাম দিল্লি।
পোড়ামুখে ঘষামাজা পেইন্ট মেকাপ করে অবশেষে হাজির হলাম দিল্লির মহাম্যাঁওয়াওদের নানা দফতরে। সামনের পদযুগলকে হাতজোড় করে আমরা তিনজনই একযোগে মৃদু মিউঁ মিউঁ মিনতিতে ভেসে গেলাম। শুঁটকি চাই। যে করেই হোক আপনাদের মন পেতে চাই। এই দেখুন সামনের ডান পায়ে বাঁ কান ধরি, বাঁ পায়ে ডান কান ধরি। ভুল হয়ে গেছে। বেয়াদবি করেছি। শুঁটকি পেয়েও বেইমানি করেছি। আপনাদের মহামান্যকে অপমান করেছি।
দিল্লিওয়ালারা অতঃপর বললেন : তোমাদের ওখানে কে শুঁটকির ভার পেল না পেল তা আমাদের ব্যাপার নয়। কিন্তু শুঁটকি পেয়েই যে তোমরা আমাদের স্বার্থে আঁচড় কাটো সেখানেই তো বড় গ্যাঞ্জাম। যে আঁচড় কেটেছ তার দাগ শুকাতে দাও। আমাদের পড়শির সাথে গোপন লেনদেন আর নয়। এবং ধৈর্য ধরো। ধৈর্য ধরো। সবুরে শুঁটকি মেলে।
কাকুতি মিনতি করলাম। আর কতাসবুর করিব, হে মহাম্যাঁওয়াও জন, আর কত? সহিতে পারিতেছি না। গোত্রপ্রধান কারাগারে। ইহার একটি হিল্লা করুন। গোত্র যুবরাজ আজ শরণার্থী হইয়া লন্ডনে নানাবিধ লণ্ঠন জ্বালাইতে জ্বালাইতে অধীর অস্থির হইয়া পড়িয়াছে। দেশে খুন খারাবি আগুনের মামলা সামলাইতে সামলাইতে হাজার হাজার আমাদের অনুসারীরা দম ফেলিবার ফুরসৎ পাইতেছে না।
দিল্লিওয়ালারা কহিলেন, ভাবিয়া করিও কাজ। করিয়া ভাবিলে দ্রুত সমাধান হইবে না। দেশি-বিদেশি যাহাদের তালে নাচিয়াছ, তাহাদের কাছে নারিকেল মার্কা শুঁটকির সন্ধান করিতে পার। তবে শুনো, আগের দুনিয়া নাই। আগের হিসাব নাই। তোমরা দুনিয়ার বড় বড় হিসাববিদ ভাড়া করো। অধীর হইও না। জঙ্গি দিয়া আমাদের নিরাপত্তাকে উসকাইও না। ভালা হইয়া যাও। অতঃপর আমরা ভাবিব। তোমাদের গোত্রপ্রধানা কারাগারে? আর তোমরা? প্রতিপক্ষকে ঝাড়ে বংশে ১৯৭৫ সনে শেষ করিয়াছ। ২০০৪ সনে অবশিষ্টদের শেষ করিবার নৃশংস কারবার করিয়াছ। তোমরা তোমাদের ইতিহাসের মহত্তম ব্যক্তির মৃত্যুদিনকে তোমাদের গোত্রপ্রধানার মিথ্যা জন্মদিন বানাইয়াছ। শুঁটকির তহবিলদারি পাইয়া বেসামাল হইয়া গিয়াছ।
অতঃপর আমরা কী করিলাম জানেন হে পাঠক।
দিল্লির দরবারে আমরা ভেউ ভেউ কাঁদিলাম, অশ্রুপাত করিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে উহারা আমাদের পৃষ্ঠদেশ চাপড়াইয়া দিল সান্ত¦নার ভঙ্গিতে।
আর তুষ্ট সেই পৃষ্ঠদেশ তিনটি দেশে ফিরে ‘চিন্তাপুকুর’দের দেখালাম। ওরা দেখলাম চিন্তাকে গভীরতর করতে পুকুরে নতুন করে ড্রেজিং যন্ত্রপাতি নামিয়ে দিল।
এই হলো আমাদের দিল্লি সফরনামার ইতিবৃত্তান্ত।

বি. দ্র. : ১৯৫৪ সনে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মঞ্চে গাওয়া গীতটির একাংশ স্মরণ করুন :
সকল খোপের কইতর (কবুতর) খাইয়া,
চলছে বিড়াল হজ্বে ধাইয়া।

Category:

রুটি ও মাতৃভূমির কুরসিনামা

Posted on by 0 comment

aaআলমগীর রেজা চৌধুরী: ঘুটঘুটে অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ওর ছায়া দীর্ঘ হয়। বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসে একটা নেড়ে কুকুর। শরীরে দগদগে ঘা, লোমগুলো উঠে গেছে। মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। কুকুরের ছায়াও দীর্ঘ হচ্ছে। কারফিউর মতো নির্জন রাস্তায় ওর চলার শব্দ কুকুরটির শব্দ ‘ঘেউ’ ছাড়া শব্দহীন সরণিতে এগোতে থাকে। ওর ছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এখন অন্ধকার। বিকট শব্দে শম্ভূগঞ্জ ব্রিজ দিয়ে ট্রেন ছুটে যায়। আজ আকাশে তারার মেলা বসেছে। কালপুরুষ বেশ বীরদর্পে পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সপ্তর্ষীম-ল সুখেই মিটমিট করছে। ওর কিছুই মনে পড়ে না। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত হোমোসেপিয়েন। দূরে শম্ভূগঞ্জের গায়ে অন্ধকার। কোনো পিদিমের আলো জ্বলে না। হেঁসেলের ধোঁয়া নজরে আসে না। এত তাড়াতাড়ি সব ঘুমিয়ে গেল!
এত শান্ত গ্রাম! ধনচে গাছ আড়াল করে জল বরাবর চোখ বুলাতে থাকে ও। কতক্ষণ। কৃষি বিশ্বদ্যিালয়ের দিকে সিগনাল দিচ্ছে নীলাভ আলো। বলাশপুরের দিকে কনভয় ছুটে চলার বিকট শব্দ ভেসে আসে। প্রায় এক ঘণ্টা জেগে ওঠা চরের মধ্যে বসে আছে। সাহেব কোয়াটার, সার্কিট হাউসসহ নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি বাংকার। কামানসহ অন্যান্য ভারী অস্ত্র নাক বরাবর তাক করা।
একটা টুস শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার গুলি ছুটে আসবে। ও ঘড়ির দিকে তাকায়। আট সতের। হঠাৎ ওর মনে পড়ে, হাতে কাপড়ে পেচানো আগ্নেয়াস্ত্র অত্যন্ত মারাত্মক। এটা হাতে নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হেঁটে আসা ঠিক হয়নি। এসকে হাসপাতালের কাছে ছোট একটা ট্রুপস অ্যামবুস করেছে। নদীপথে এসে যেন বটতলার এই বিপদসংকুল রাস্তায় সরাসরি ঢুকে গেরিলা আক্রমণ করতে না পারে। পেছন দিক থেকে কেউ ‘হল্ট’ বললেই ধরা পড়ে যেত। নইলে গোলাগুলির মধ্যে পরে বেঘোরে প্রাণ হারানো ছাড়া উপায় ছিল না। হঠাৎ করে ওর গায়ের লোম কঁাঁটা দিয়ে ওঠে। শিড়দাঁড়ায় বয়ে গেল শৈত্যের হলকা। এই বোকামিটা করা ঠিক হয়নি। কমান্ডারকে বলা যাবে না। জাবেদকে বলা যাবে। কিন্তু এখনও আসেনি। আদৌ আসবে কি না! তারও ঠিক নেই। আসলে না হয় প্ল্যানমাফিক এগোনো যাবে। না এলে? আবার এতটা পথ মাড়িয়ে কমান্ডারের নাগাল পাওয়া দুষ্কর। সকালের দিকে দুবলাকান্দা পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করার কথা। সিগারেটের তৃষ্ণায় কণ্ঠ কাঁপছে। জ্বালানোর উপায় নেই। নিñিদ্র অন্ধকারে হঠাৎ আলো ভয়ঙ্কর। সহজে টার্গেট করে। ছুটে আসে একঝাঁক মেশিনগানের গুলি। ওরা প্রশিক্ষিত। মিস হয় কম। নান্দিয়াপাড়ার সৈয়দ আলী এভাবেই ঝাঁঝরা হয়েছিল। তারপর সবাই সতর্ক। অন্ধকারে মিশে থাকতে হবে। আলোতে নয়।
জুন মাসের গুমোট গরমে ঘামছে ও। আবার আকাশের দিকে তাকায়। তারার মেলা। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে নক্ষত্রের মুখ জ্বলজ্বল করছে। তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখান থেকে ২০০ গজ দূরে ব্রহ্মপুত্র কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। ভারী বর্ষণ হলে গারো পাহাড়ের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে জোয়ার বইবে। ও এখানে বসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করছে, তাও তলিয়ে যাবে অথৈ জলে। স্রোতের কলকল ধ্বনি, বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণনের গোত্তা মেরে দু’কূলে ভাঙনের গান গেয়ে বয়ে যাবে। ট্রিগার ধরে অত্যন্ত সন্তর্পণে ও ব্রহ্মপুত্রের দিকে এগিয়ে যায়। জলের কিনারায় অস্ত্র রেখে আজলা ভরে পানি পান করে। শীতল পানি নাকে-মুখে ছিটকা মারে। আবার সেই ধনচে গাছের ঢিবির কাছে এসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
ঘড়িতে এখন পৌনে ৯টা। জাবেদের পাত্তা নেই। জাবেদ না এলে ওর করণীয় কী? ইত্যাকার ভাবে। হ্যান্ডব্যাগে দুটো গ্রেনেড আছে। যা বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ওদের মিশন। জাবেদ এলেই কাজটা সম্পন্ন করার ভাবনা করা যেত। মশা, ডাঁশ, ওলা পোকার বিস্তর উৎপাত। নাকে-মুখে হিচকা পড়ছে। তারপরও ও স্থির বসে থাকে। রাত পোকাদের গুঞ্জরণে পৃথিবীকে শব্দহীন করে দিয়েছে।
মাস তিনেক আগেও অন্ধকারকে ভয় ছিল। সাপের ভয়, ভূতের ভয়, মানুষের ভয় মিলিয়ে আঁধার আতঙ্কের মধ্যে যার পৃথিবী, সেই কি না চার মাইল অন্ধকার মাড়িয়ে কেওয়াটখালী পাষাণবেদী বাঁয়ে রেখে এখন ব্রহ্মপুত্রের চর ভেসে ওঠা ধনচে বনে আশ্রয় নিয়েছে একা। একাকী। ভয় শব্দটা এখন ওর মধ্যে বিরাজ করে না।
বরঞ্চ উন্মত্ত হিংস্রতা বসতি গেড়েছে। ওর হাতে স্টেনগানের মতো মারাত্মক মারণাস্ত্র। যার প্রতিটি কার্তুজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক একটি মানুষের প্রাণ। না, ও মানুষ হত্যা করতে চায় না। জীবনকে তুল্যমূল্য করে পশু হত্যা করতে চায়। যারা অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুজ প্রান্তরজুড়ে রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছে, তাদের সঙ্গে ফয়সালা না করে ফিরে যাবার পথ নেই। মৃত্যু নইলে স্বাধীনতা। নিরীহ পিতামাতা থেকে অবোধ কিশোর হত্যা করে যারা, তাদের জন্য কোনো অনুকম্পা নয়। ওকে কোনো অনুকম্পা করেনি। হাজার হাজার পাকিস্তানি আর্মি এই চর পর্যন্ত ছুটে আসছে। হায়েনার মতো দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে এই শ্যামল প্রান্তরজুড়ে।
হঠাৎ ওর মনে পড়ে, ‘এ দেশের শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি।’ ও ঈষৎ মুচকি হাসে। কবি, রমণীরা সব সম্ভ্রম রক্ষায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এসব খবর কি রাখেন? দরকার কি? এই সুন্দর তো তোমার। মহাকাব্যিক দার্শনিকতা। আহারে শ্যামল রমণী! মাতৃকূল। তোমার জন্য বিরল এই প্রান্তরে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে অপেক্ষা করছি। একটি বুলেট নাক বরাবর ছুটে যাবে। আবার আরেকটি বুলেট আমার দিকে ফিরে আসবে। কী চমৎকার! তুমি ভাবতে পারো? রক্তের মহাজন সেজে বসে আছি।
ঠিক এ সময় ক্ষীণ পদশব্দ। ও মাটির সঙ্গে দেহ মিশিয়ে অপেক্ষা করে। জাবেদ না অন্য কেউ? ঢিবিটার অতি কাছে হেঁটে যায় জাবেদ। জলের সঙ্গে ওর দেহের ছায়া মিলিয়ে ডাক দেয়, ‘পুটটুস’। থমকে দাঁড়ায় জাবেদ। তড়িৎ উত্তর দেয়, ‘টুকু’।
কাছে এসে ধপাস করে ধনচে গাছে পিঠ রেখে শুয়ে পরে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘জানে বেঁচে গেছি, প্রায় জীবনটা গেছিলো।’ টুকু উত্তর দেয়, ‘আমারও। বোকামি করে ফেলেছিলাম। আমিও।’
টুকু ঘড়ির দিকে তাকায়। প্রায় ১০টার কাছাকাছি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।
‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে।’
‘তোর জন্য রুটি এনেছি।’
‘দে।’
জাবেদ কার্তুজের ব্যাগ থেকে একখ- বনরুটি বের করে দেয়।
কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করে টুকু রুটি খেতে খেতে জলের নিকট হামাগুঁড়ি দিয়ে এগোতে থাকে। ক’ আজলা জল খেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে। যেন কতকাল ধরে ও এখানে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রস্রাব শেষ হতে চায় না। জলের গায়ে দু-একটা নক্ষত্র। তার আলোয় মাছ কিলবিল করে।
জাবেদ ডাক দেয়, ‘টুকু’।
ডাকও যেন শব্দহীন। জাবেদের কণ্ঠ ভরা সত্ত্বেও ওর কণ্ঠ রাতের পাখির ডাকের মতো শোনায়। টুকু বুঝতে পারে। এই বুঝতে পারার বয়স দু-মাস হয়নি। টুকু আবার হামাগুঁড়ি দিয়ে জাবেদের কাছে ফিরে আসে।
‘এখন?’ টুকু প্রশ্ন করে।
‘অপেক্ষা।’
‘কার জন্য?’
‘মতি ভাই আসবে।’
‘কখন?’
‘জানি না।’
ধনচে গাছে গায়ের শার্ট বিছিয়ে স্টেন জাপটে ধরে টুকু বলে, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে।’
‘তুই ঘুমা। আমি অপেক্ষা করি।’
‘শত্রু এলে তুই একা কি করবি?’
‘গুলি করতে করতে ব্রহ্মপুত্রের জলে হারিয়ে যাবো।’
‘ওরা আসবে না। ভীতু। রাজাকাররাও আসবে না। ওরা ভয় পায়। ওরা নিরীহ মানুষ হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধার নাগাল পায় না।’
‘তা ঠিক।’
ঠিক এক মিনিটের ভেতর টুকু ঘুমিয়ে যায়। ওলাপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে। দূরে কোথাও শেয়ালের হুক্কাহুয়া ভেসে আসছে। শম্ভূগঞ্জের ব্রিজের পাশেই পাষাণবেদি। এখন শেয়াল-কুকুরের মহোচ্ছব চলছে। গুলিবিদ্ধ বঙ্গসন্তানের নাড়িভুঁড়ি নিয়ে ওরা মহাসুখে আছে। তাই রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে ডেকে ওঠে। ওটুকুই। এ নিয়ে জাবেদ ভাবতে চায় না। প্ল্যান করে এগোতে হবে। কমান্ডার যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই। চুল পরিমাণ এদিক-সেদিক হবার জো নেই। ভুলটা করেছিল ও। মণিকাকে খুঁজতে যাওয়া ঠিক হয়নি। দিনমজুরের কেমোফ্লেক্স ঠিক ছিল। কিন্তু কাপড়ের ব্যাগে রাখা স্টেনগান-কার্তুজ-ব্যাগ অত্যন্ত বিপজ্জনক। চ্যালেন্স করলেই আটকে যেত। ধরা পড়লেই নির্ঘাত মৃত্যু। সশস্ত্র শত্রুকে কেউ বাঁচিয়ে রাখে না। ও নিজেও রাখবে না।
বড় সড়ক ক্রস করে গলির মাথায় দাঁড়ায়। তখন এদিকটায় বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল কেওয়াটখালি পাওয়ার স্টেশনে হামলা হয়েছে। ভয়ঙ্কর রকেট ল্যান্সার দিয়ে হামলা। তিনটা ইউনিটের মধ্যে একটা পুরোপুরি বিধ্বস্ত। শহরে লোডশেডিং চলছে।
গলি পেরিয়ে মণিকাদের বাড়ির আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভেতরে জনমনিষ্যির আঁচ পাওয়া যায়। অনেকটা বেদিশার মতো মণিকার বাবা অ্যাডভোকেট ত্রৈলঙ্গর গোস্বামী বাড়ির টপ-বারান্দায় উঠে আসে। সতর্ক পদক্ষেপ, নিশব্দ পদচারণা, সজাগ কান শুধুই অশুভ ইঙ্গিত করতে থাকে। তারপরও মণিকার পড়ার রুমের বদ্ধ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ইতিউতি ভাবতে থাকে। ভেতরের মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর অচেনা। গোস্বামী কাকা তো না! অন্য কেউ। নারীকণ্ঠ আছে। মণিকা বা মাসীমার নয়। অন্য কারও।
নানারকম চিন্তা মাথায় কাজ করতে থাকে। হিসাব মতে মণিকাদের থাকার কথা নয়। পঁচিশ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পরপর ওরা এ বাসা থেকে সটকে পরেছে। শহরে দুবার বিমান হামলার পর গোস্বামী কাকা মণিকাদের আর এ শহরে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। এখানে মনে হয়, তার সিদ্ধান্ত সঠিক। এ দেশে আর মানুষ বাস করতে পারে না। দখলদার দস্যু আর ফুঁসে ওঠা রাগী যুবকের মুক্তির ‘জয় বাংলা’র গেরিলা।
তারপরও কেন যে মণিকাকে খুঁজতে এলো, তা ও নিজেই জানে না। কেষ্টপুর দিয়ে পাস হওয়ার কথা ছিল। পুরবী’র দুলাল ভাইয়ের কাছ থেকে গ্রেনেড নিয়ে চর ধরে টুকুর কাছে পৌঁছানোর কথা।
‘এ বাড়ির মালিক ইন্ডিয়ায় গেছে গা। আমরার দহলে আছে। বাড়ি আমাগো। পাকিস্তান সরকার লেইক্কা দেব।’
ওর মনে হয় মণিকাদের বাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। মণিকার সঙ্গে আর দেখা হবে না। ভাবতে ভাবতে নারকেল গাছের আড়ালে আবার চলে আসে। ঠিক এ সময় বিদ্যুৎ এলো। দু-একটা বাতি জ্বললেও ল্যাম্পপোস্ট প্রায় ৩০০ গজ দূরে। এদিকে অন্ধকার ছেয়ে আছে। খুব সহজে বের হয়ে যাওয়া যাবে। ঠিক এ সময়ে জিপ ছুটে এলো গলির মুখ থেকে। ধামধাম করে ওপাশের আমগাছের গোড়ায় দুজন পাক আর্মি নেমে আসে। পেছন থেকে দুজন রাজাকার। মুখ বাঁধা প্রায় বিবস্ত্র এক নারী, রাজাকাররা ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। দ্রুততায় গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় উঠে যায় ওরা। অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে মেয়েটাকে জাপটে ধরে ডাক দেয়, ‘মানিক স্যার আইছে।’ খুঁট করে দরজা খোলার শব্দ হয়। ওরা ঢোকার পরে আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ও নারকেল গাছ আড়াল করে স্টেনগান লোড করে, অপেক্ষায় থাকে। জিপ একলা আম গাছের গোড়া বরাবর। বের হওয়ার উপায় নেই। জিপে ফৌজি থাকতে পারে। ঘড়ির কাঁটা এক সেকেন্ড করে এগিয়ে যেতে থাকে। দু-একবার ঐ নারীর আর্তনাদ শুনেছে। তারপর থেকে অপেক্ষা করছে। ওর কিছুই শুনতে ইচ্ছে করে না।
ওই কাতর নারীর কথাও মনে হয় না। অপেক্ষা করে। অপেক্ষারত জিপটা নিথর। ড্রাইভারসহ হয়তো গোস্বামী কাকার বাসায়। ও অপেক্ষা করে। ওরা চারজন, অভাগী নারী, বাড়ির দখলদার। মোট ছয়জন। ও ভাবে লোডেড কার্তুজ ২৮টা। এক ম্যাগাজিন একস্ট্রা। ৩টা গ্রেনেড। দুঃখী নারীকে বাদ দেয়। ওর বেঁচে থাকবার দরকার নেই। ও এই পৃথিবীতে সব অধিকার খুইয়েছে। ব্রাশফায়ারে মরে গেলে ক্ষতি কি? বাকি পাঁচজনকে অন্ধকারের এত নিকট থেকে…। সাত-পাঁচ ভাবে। সাহস হারাতে থাকে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিপদ। মৌডালের ঝোঁপ পেছনে রেখে উঠে দাঁড়ায়। এদিক দিয়ে দ্রুত বেরোবার পথ আছে। মসজিদের পাশ ঘেঁষে ধানক্ষেত দিয়ে বড় রাস্তা ক্রস করে বেরিয়েই নদীর পাড়। ধনচের আড়ালে আড়ালে টুকুর কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। টুকু অপেক্ষা করছে। হঠাৎ করে ওর ভয়ানক সিগারেটের তৃষ্ণা পায়। মণিকাকে মনে পড়ে। এম কলেজে মণিকা ওর সহপাঠী। কলেজ থেকে পূজাতে দল বেঁধে এ বাড়িতে এসেছে। হৈচৈ করে বাড়ি মাতিয়েছে। গোস্বামী কাকা বেশ শিক্ষিত মানুষ। কন্যার বন্ধুদের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাত দেখিয়েছে। মণিকা সাদামাটা তরুণী। বুদ্ধিদীপ্ত ক্লাসের সবাই মণিকাকে মনে রাখতে চায়। অথচ আজ মণিকা কি জানে, কি ভয়ঙ্কর সময়ের মুখোমুখি ও। ওর বিছানায় ধর্ষিত হচ্ছে বঙ্গললনা। একজন অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ওপারে। ওর মনে হয় ক্যাচ করে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিল। দরজা খুলে টপ-বারান্দায় এসে দাঁড়াল চারজন। একজনের হাতে সিগারেট। ‘আচ্ছা হ্যায়, মান্তা হ্যায়’ এই জাতীয় বাতচিতের মধ্যে ও স্পষ্ট দেখতে পায়। ও অপেক্ষা করে। ট্রিগারে আঙুল। আরও একজনের জন্য অপেক্ষা করে। সে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়েছে। ও অপেক্ষা করে। ঠিক এ সময় পঞ্চম লোকটি বের হয়।
‘পা-মুখ বাইন্ধা আইলাম।’
ঠিক এ মুহূর্তে আঙুলে চাপ পরে। ঠা-ঠা শব্দ চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। ধপাধপ ৫টি দাঁতাল গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় লুটিয়ে পড়ে। ও ১০ সেকেন্ড অপেক্ষা করে। তারপর মৌডাল আড়াল করে অন্ধকারে মিশে যায়। বড় রাস্তায় কনভয় ছুটিয়ে পাকসেনারা এদিকে আসছে। ও তখন দড়াইখাল পেরিয়ে বলাশপুর পৌঁছে গেছে। এ সময় একবার মনে হয়েছিল স্টেশন কোয়ার্টারে শোয়েব সিদ্দিকীর বাসার কথা। ওর বাবা গার্ড সাহেব। স্টেশন সংলগ্ন কলোনিতে থাকে। বড় ছেলে শোয়েব সিদ্দিকী এপ্রিল থেকে লাপাত্তা। শোয়েব ওর বন্ধু। সবাই জানে। প্রয়োজনে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে। পুত্র শোকার্ত ওর মায়ের মুখ মনে পড়ায় কষ্ট পায়, কি জবাব দেবে?
তারপর অনেক কাঠখড় পেরিয়ে টুকুকে আবিষ্কার করা। টুকু এখন ঘুমুচ্ছে। স্টেনের ম্যাগাজিন খুলে পরিষ্কার করে। এই ম্যাগাজিনের ১৪ কার্তুজ পাঁচ দানব খেয়ে ফেলেছে। মনে মনে হাসে। আহারে বেচারারা!
এখনও এক ম্যাগাজিনসহ ১৪টা কার্তুজ আছে। গ্রেনেড আছে ৩টা। ও এখন মতি ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। ঘড়ির দিকে তাকায় ১১টা ২৭। দূরে শম্ভূগঞ্জের চটকলে অসংখ্য বাতি জ্বলছে। জলের রেখায় বাতির ঝিলিক।
ওর মনে হয়, এতক্ষণের মধ্যে লাশগুলোসহ ওই নারীকে আরেক জিপে তুলে নিয়ে গেছে। অথবা সহযোগী হিসেবে বেয়নেটের খোঁচায় হৃদপি- এখন এফোঁড়-ওফোঁড়। তাহলে কেউ বাঁচতে পারেনি! পূর্বাপর ঘটনাটি ভাবতে থাকে জাবেদ। এক ইস্টু পাঁচ। মুচকি হাসে। পাঁচ ডেড বডি দেখে কি প্রতিক্রিয়া দাঁতালদের। পাগলা কুত্তা! ভাবনার মধ্যে মণিকাকে মনে পড়ে, পড়বেই তো। মণিকার জন্য। প্রিয় মণিকা, তোমার বিছানায় ধর্ষিত নারীর প্রতিশোধ নিয়েছি। তুমি কি খুশি হও নি? আমি এখন মাতৃভূমির সৈনিক। মাতৃভূমির কন্যা-জায়া-জননীর জন্য…।
মশা-ডাঁশ ছেঁকে ধরেছে। টুকু মাঝে মাঝে হাত নাড়ছে। শরীর ক্লান্ত। তারপরও তন্দ্রা আসছে না। জাবেদের মনের মাঝে তড়পাতে থাকে। হুটহাট ৫টি গুলিবিদ্ধ মানুষ গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় পড়ে গেছে। ওর জন্য এ এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। এত কাছ থেকে শত্রু নিধনের আনন্দই আলাদা। ওর বুক ভরে উদ্বেলিত আনন্দ। প্রকাশ করতে পারে না। টুকুকে বলা যেত। টুকু ঘুমাচ্ছে। সড়সড় শব্দে দু-একটা শেয়াল শন খেতে ঢুকে পড়ে। হুক্কাহুয়া ডেকে ওঠে। জাবেদ শুধু কান খাড়া করে থাকে, কখন মতি ভাই আসবে? ওর হঠাৎ করে আজিজুল হক স্যারের কথা মনে পড়ে। স্যার এম কলেজে বাংলা পড়ান। অসাধারণ বাগ্মী।
রবীন্দ্রনাথের শত শত কবিতা তার মুখস্ত। কি তার উচ্চারণ! সুমিষ্ট। এখনও কানে লেগে আছে। তার সঙ্গে শেষ ক্লাস ১৩ জানুয়ারি। এরপর আর দেখা হয়নি। উত্তাল বাংলাদেশ। হঠাৎ করে মণিকার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই মেয়ে, নাজিম হিকমতের নাম জানো?’
মণিকা অসহায়ের মতো মাথা নাড়ে।
‘তুরস্কের কবি। মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি মাটির প্রতি দায়বদ্ধ সচকিত কণ্ঠস্বর। কবিতা লেখার অপরাধে জেল-জুলুমসহ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত কবি। ভ্রাম্যমাণ জীবন নিয়ে শুধু মাতৃভূমিকেই মনে রেখেছে। নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে, ‘তুমি আমার কোমল প্রাণ মৌমাছি, চোখ তোমার মধুর মতো মিষ্টি।’ লিখেছে, ‘দড়ির একপ্রান্তে মৃত্যু, সে মৃত্যু আমার কাম্য নয়। তুমি জানো, জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরায় নাজিমের নীল চোখে ওরা ব্যথায় খুঁজে ফিরবে ভয়।’ তারপর স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নির্ধারিত সময়ের আগে।
মণিকা কি মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে? ও কি জানে ওর বন্ধুরা প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করছে। ওর শান্ত, নির্লিপ্ত স্বভাবের জন্য মণিকা ভাবতেই পারে ওর পক্ষে যুদ্ধফ্রন্টে হামাগুঁড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। আহা! মণিকা, তুমি জানবে না শত্রু নিধনের মধ্যে কি অসীম আনন্দ জড়িয়ে আছে। আসলে মণিকাকে কিছুই বলা হয়নি। সুযোগ কোথায়? আর বললেই বা কি হতো?
মণিকার মুখাবয়বে কে যেন একটি সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত পৌনে ১টা। মতি ভাই আসেনি। অপেক্ষা করছে। শান্ত নির্জন রাতের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে জাবেদের মনে হয়, এ পৃথিবীতে এত ক্রন্দন কেন? এ সময়ে ঘোর ভাঙে। তাকাতেই চোখের মণিতে নক্ষত্রের ঝিলিক খেলে যায়। আরমোড়া ভেঙে হামাগুঁড়ি দিয়ে জলের দিকে এগিয়ে যায়। আজলা ভরে জল খায়। নাকে-মুখে জলের ছিটা দেয়। জাবেদের কাছে গিয়ে বলে, ‘মতি ভাইয়ের কি খবর?’
‘আসেনি। সংবাদহীন।’
‘তাহলে?’
‘অপেক্ষা।’
‘মাঝরাত।’
‘অপেক্ষা।’
‘কি ভাবছো?’
‘কিছুই না। ভাবতে চাই না।’
‘খুব শিগগির অপেরেশন শেষ করতে হবে।’
‘জানি।’
‘হাতে সময় আছে।’
‘এতক্ষণ অপেক্ষা করা বিপজ্জনক।’
সুনসান নীরবতা। ওলাপোকা ডাকছে। তারপর ওদের আর কিছুই মনে নেই। ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়।
জাবেদের ঘুম ভাঙে শেষ প্রহরের একটু আগে। আকাশের গায়ে তখনও নক্ষত্রের মুখ। তড়িঘড়ি করে টুকুকে ডাকে।
‘ওঠ। মতি ভাই আসেনি। একটু পরে সকাল হবে।’
টুকু আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে, ‘উপায়!’
‘মতি ভাই ছাড়াই প্ল্যানমাফিক আক্রমণ করতে হবে।’
‘সম্ভব!’
‘ভয় পাস?’
‘না।’
‘তাহলে আমার পিছে পিছে আয়।’
জাবেদ স্টেনগান হাতে পেছনে ধনচে গাছ রেখে উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সামনে পা বাড়ায়।
টুকু জাবেদকে অনুস্মরণ করে। জাবেদ খুব পথ হাঁটে। অনেকটা তেলেসমাতির মতো জুবলিঘাট বরাবর ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেঁষে মন্দিরের ভিমের আড়ালে এসে দাঁড়ায়। টুকুর দিকে গ্রেনেডের ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘রুটি আছে। খেয়ে নে। গ্রেনেডগুলো দে। চার্জ করার পরে এক মিনিট অপেক্ষা করবি। ফিরে না এলে কিছুই ভাববি না। কমান্ডার তোর জন্য অপেক্ষা করবে। হিঙ্গানগর রাজাকার ক্যাম্প…’
টুকু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারে হেঁটে গেল জাবেদ। রুটি মুখে দিতেই বিকট শব্দে পরপর ৩টা গ্রেনেড ফাটার ভয়াবহ ভয় নিয়ে শেষ রাতে জেগে উঠল। সাইরেন বাজছে। পটাপট গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এই আতঙ্কিত সময়ের মধ্যে ১-২ করে ৩ মিনিট অপেক্ষা করে। তারপর দুর্দান্ত গেরিলা কায়দায় ধনচে ক্ষেত পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলে মিশে যায়। ঠিক এ সময় বড় মসজিদ থেকে ভেসে আসছে, ‘কল্যাণের জন্য এসো।’

পাদটীকা
পরদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এমআর আকতার মুকুল চরমপত্র পড়ে, “আমাদের ময়মনসিংয়ের বিচ্ছুরা কলেজ রোডে ব্রাশফায়ারে পাঁচজন, জুবলী ঘাটে গ্রেনেড দিয়া পাকসেনারে খতম। হা হা হা। এর মধ্যে আবার দু’জন জন্মের দুশমন, জন্মভূমির কুলাঙ্গার রাজাকার আছে। কে বা কারা এই সফল গেরিলা আক্রমণ করেছে, কেউ জানে না। খালি গেরিলা টুকুর বরাত দিয়া মিয়া চাঁদ কমান্ডার জানায়, মাতৃভূমির যোগ্য সন্তান জাবেদ শহীদ হয়েছেন, ইন্না … রাজেউন।”

Category:

দলছুট

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMফরিদুর রহমান : অনেক দূরে এলএমজি’র একটানা ঠা-ঠাÑ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মুনতাসিরের। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে জেগে উঠে ভাবতে চেষ্টা করে সে কি আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, না-কি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল! অন্ধকারের মধ্যে ডাইনে-বাঁয়ে হাত বাড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করে সে এখন কোথায়। বন তুলশি বা কানসিসার মতো নরম গাছপালা ছাড়াও ডান দিকে আকন্দ আটিশ্বরের হালকা ঝোপ-জঙ্গল হাতে ঠেকে। বাঁ হাতে ধরা এসএমজিটা কাছেই ভেজা মাটিতে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে। দু-পায়ের তলায় বালিমাটি আর ঠা-া জল-কাদার আভাস পায়। মুনতাসির বুঝতে পারে মুখটা নরম কাদামাটির মধ্যে গুঁজে রেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে। বাঁ হাতের তলায় একটা কাঁটা গাছের খোঁচা থেকে বাঁচবার জন্যে পাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করতেই পাঁজরের ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে যায় তার।
রাত সাড়ে আটটার দিকে নারায়ণপুর ক্যাম্পে হাঁসের ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে আটজনের ছোট্ট দলটি দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে দিয়ালা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। আগেভাগে বর্ডারে পৌঁছে যাওয়ায় দিয়ালার শরণার্থী শিবিরের কাছে টং দোকানে টিমটিমে হেরিক্যানের আলোয় বসে চা খেয়েছিল ওদের কয়েকজন। তখনই জানতে পারে গত এক সপ্তাহে দুবার সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। প্রথমবারে কোনো ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়বার দূর থেকে শরণার্থী শিবিরে গুলি চালিয়েছে। দিনের বেলায় তেমন লোকজন না থাকলেও গুলিতে দুবলহাটি কুমারপাড়ার বৃদ্ধ বৃন্দাবন পাল শিবিরের মধ্যেই মারা গেছেন। এছাড়া তাহমিনা নামে দশ-বারো বছর বয়সের এক কিশোরীর পায়ে গুলি লেগেছিল, তাকে বালুরঘাটে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মুনতাসিরের বুকের মধ্যে হঠাৎই ছ্যাঁত করে ওঠে। জানতে চায়, ‘মেয়েটার কী হয়েছে শেষ পর্যন্ত? বাঁচবে তো?’
‘কুনু খারাপ খবোর তো পাওয়া যায়নিÑ আল্লাহ বাঁচালে মোনে কয় ব্যাঁচে যাবে।’
বাঁশের অস্থায়ী মাচায় অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা বয়স্ক একজন জানান। আবুল কালাম কোলের ওপর স্টেনগান রেখে এক কোণায় বসেছিল। সে পরামর্শ দেয়। ‘তোমরাই বর্ডারের কাছে না থ্যাকে আরও ভিতরে সরে গেলেই তো পারিন।’
‘চেষ্টা করে দেখিছিÑ সরকারি জায়গা জুমি, ইস্কুল ঘর, পকর পাড় সব আগেই দখোল হ্যয়ে গেছে। সতীশ সরকারের একটা পুরানা চাতাল আর চক্রবত্তিঘেরে আমের বাগান পড়েই আছেÑ কিন্তুক দিবার চায় না।’
‘ইন্ডিয়ানরাও একোন বিরক্তরে বাÑ আর কতো ম্যানষেক জায়গা দিবে!’ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে শ্বেতশুভ্র চুলদাঁড়িওয়ালা একজন নিজে থেকেই ভারতীয়দের মনোভাব ব্যক্ত করেন।
ছয় গ্লাস চায়ের দাম হয়েছিল ষাট নয়া। মন্টুভাই চায়ের দাম দিতে গেলে দোকানি নিতে চায় না, ‘তোমাঘেরে পয়সা দ্যাওয়া ল্যাগবে না। তাড়াতাড়ি দ্যাশ স্বাধীন করিন, বাড়িত ফিরে যাবার প্যাল্লেই হামরা বাঁচি।’
‘হামাকেরে তো চেষ্টার কুনু ত্রুটি নাই চাচাÑ দোয়া ক্যরেন।’ দলনেতা সিরাজ ভাই উঠে পড়লে দলের সকলেই একে একে উঠে পড়ে।
বৃদ্ধ লোকটি দোয়া পড়ে সবার উদ্দেশে বাতাসে ফুঁ দিয়ে বলে, ‘ফি আমানিল্লাহÑ জয় বাংলা।’
সীমানা পিলার পার হবার খানিক পরেই সীতহার গ্রামের অনাবাদী জমি জঙ্গল পেরিয়ে দু-তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে পারে এমন পায়ে চলা পথের নিশানা পাওয়া যায়। ওরা আটজন আলপথের ডাইনে বাঁশে দুপাশে চারজন চারজন করে ভাগ হয়ে একটু আগেপিছে চলতে শুরু করে। গেরিলা দলের কখনোই এক লাইনে অথবা পাশাপাশি হাঁটার নিয়ম নেই। ট্রেনিং-ক্যাম্পের শিক্ষাগুলো যুদ্ধের মাঠে ঠিকঠাক মেনে না চলার কারণে বেশ কয়েকটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সিরাজ ভাই এসব ব্যাপারে ভীষণ কড়া। রাতের অন্ধকারেও সীতহারের আদিবাসী ছেলে মহিম মুরমু এখানকার পথঘাট ঠিক ঠাহর করতে পারে। তারপরেও কেমন করে যে এ্যাম্বুশে পড়ে গেল ওরা মুনতাসিরের মাথায় ঢোকে না।
রাইকালিপুর হাট থেকে দলটা তখনও আধা মাইল উত্তরে। মূল রাস্তা ধরে না এগিয়ে ওরা সড়কের পশ্চিম দিকে খাঁড়ির ঢালু পাড় ধরে ঝোপঝাড় পেরিয়ে খুব সাবধানে এগোতে থাকে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ঠিরিরি শব্দ আর দূরে কোনো পরিত্যক্ত বাড়ির উঠানে বেওয়ারিশ কুকুরের কান্না ছাড়া চারিদিকে শুনশান নীরবতা। আবছা আলো-আঁধারির মধ্যেই সিরাজ ভাইয়ের ইশারা পেয়ে পাড় ধরে ওরা তিন কিংবা চারজন হামাগুঁড়ি দিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই সারারাতের নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে ঠা-ঠাÑ ঠা-ঠাÑ করে একসাথে অনন্ত গোটা দুই-তিনেক এলএমজি থেকে শুরু হয়ে এক নাগাড়ে গুলিবর্ষণ। মুনতাসির সম্ভবত উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল। গুলির শব্দের সঙ্গেই সে মাটিতে শুয়ে পড়ে তারপর দ্রুত গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে যায়। বাঁ পাঁজরের নিচে চিনচিনে ব্যথার জায়গাটায় হাত দিতেই খানিকটা গরম তরল পদার্থ হাতে লাগে। হঠাৎ ওদের অবস্থান থেকে বিশ-পঁচিশ গজ সামনে আলোর ঝলকানির সাথে প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দ। দলের কেউ কি এগিয়ে গিয়ে গ্রেনেড চার্জ করেছিল! এরপর আর কিছু মনে করতে পারে না মুনতাসির।
বাড়ি থেকে একরকম পালিয়েই আসতে হয়েছিল তাকে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। চাকুরি ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত অপমানিত মানুষটি মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু ক্ষণেক্ষণেই মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন।
‘কি জানি বাপু! কবে কোন দিন দেশ স্বাধীন হবে সেই ভরসায় না থেকে চাকরিতে যোগ দেওয়ায় বোধহয় ঠিক হবেÑ তোর কি মনে হয়?’
যাকে প্রশ্ন করা সেই মুনতাসির কোনো উত্তর দেয় না, সে মনে মনেই পালাবার পরিকল্পনা করে। বুঝতে পারে সারাজীবন দশটা-পাঁচটা অফিস করে অভ্যস্ত বাবা একমাসেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। মা চান ছেলেরা যুদ্ধে যাক, কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলেকে যুদ্ধের মতো ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে বুক কেঁপে ওঠে। অগত্যা ছোট বোনের সাথে কথা বলে মুনতাসির। ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলার পরে বলে, ‘মনে কর আমি যদি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে আর ফিরে না আসি তাহলে তুই কি করবি?’
গত অক্টোবরে দশ পেরিয়ে এগারোতে পড়েছে তাহসিনা। ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তারপরে বলে, ‘তুমি কি বলো ভাইজান। তুমি না আসলে আমি তো কাইন্দা জারেজার হয়ে যাব!’ এবারে বিস্মিত হবার পালা মুনতাসিরের। ‘এই কথা তুই কোথায় পেলি?’
‘কোন কথা ভাইজান?’
‘এই যে কাইন্দা জারেজার…?’
ক্যান সেই দিন তুমি শোননি, দাদি পুঁথি পড়ে শোনাচ্ছিল…।’ এরপর সে নিজেই সুর করে বড় ভাইকে কয়েক লাইন শুনিয়ে দেয়।
‘লাখে লাখে মানুষ মরে, পলায় বেশুমারÑ পয়মাল হইল বসতভিটা আগুনে ছারখার
চারিদিকে শোকের মাতম দুনিয়া আন্ধারÑ ভাইয়ের শোকে বোনে হইল কাইন্দা জারেজার।’
মুনতাসিরের বুক ঠেলে কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে যায়। তার মনে হয় চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু একজন প্রশিক্ষিত গেরিলা হিসেবে সে জানে এ সময় সামান্যতম শব্দ করাও বিপজ্জনক। শত্রুরা কাছাকাছি কোথাও ওতপেতে আছে কি না কে জানে! সে যে দলছুট হয়ে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো। গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে গেলে হয়তো পানি পাওয়া যাবে। কিন্তু নড়াচড়া করতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। একই জায়গায় চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশে তাকিয়ে উত্তর দক্ষিণ আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। আশ্বিনের মাস শেষ হতে যাচ্ছে। কোথাও কোনো মেঘ নেই; কিন্তু ধ্রুবতারাটাও চোখে পড়ে না। একটা দিকচিহ্ন পেলে যত কষ্টই হোক ধীরে ধীরে উত্তরে সীমান্তের দিকে সরে যাওয়া যেত।
এলাকার মানুষ হলেও এ দিকের রাস্তাঘাট, খালবিল, এমনি হাট বাজারের সাথেও মুনতাসিরের তেমন পরিচয় নেই। ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে সারাদেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ছুটিছাটায় বাড়িতে এসেছে পাঁচ-সাত দিনের জন্য। এবারে যুদ্ধ শুরু হবার পরে গ্রামে মাস খানেক কাটিয়ে একদিন বর্ডার পার হয়ে সোজা রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে। দেশের ভূগোল ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেছে সেই ভৌগোলিক ভূখ- রক্ষার লড়াই। সীতাহার, তারুলিয়া আর রাইকালিপুর হাটের নাম জানা ছিল। সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে আঁকা ম্যাপ দেখে পুরো টার্গেট এলাকা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু এখন এই অন্ধকার রাতে গুলিবিদ্ধ আহত শরীরটাকে টেনে কোন পথে এগোবে সে!
দিয়ালা সীমান্ত থেকে যে পথটুকু তারা পাড়ি দিয়েছিল সেই পথ এবং হাঁটর গতি হিসাব করলে খাঁড়ির এই জায়গাটা রাইকালিপুর হাট থেকে আধ মাইল উত্তরে তারুলিয়া গ্রামের মাঝামাঝি। গ্রামটা বেশ বড়, কয়েক ঘর সম্পন্ন কৃষকের বসত ছিল এখানে। এখন না-কি বাড়ি বলতে কিছু মাটির দেয়াল, চাল কিংবা খুঁটির পোড়া বাঁশ, পরিত্যক্ত ঢেঁকি, লাঙ্গল আর মাটির ভাঙাচোরা হাড়ি কলসি। দরজা কপাট টিনের চাল লুটপাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারুলিয়ার উত্তরে সীতাহার গ্রামে ঢুকতেই খ্রিস্টান মিশনারিদের গির্জা। সীতাহার গির্জার চূড়ায় বিশাল ক্রুশচিহ্ন অনেক দূর থেকে দেখা যায়। গ্রামের আদিবাসি খ্রিস্টানদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলেও কেন যে বিধর্মী নাসারাদের এই উপাসনালয় এখন পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে তা পাকিস্তানিরাই ভালো বলতে পারবে। ক্রুশটা চোখে পড়লে খাড়ির পাড় ধরে ক্রলিং করে গির্জা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে বাঁকি পথটুকু হেঁটেও যাওয়া যেতে পারে। সীমান্তের গা ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত গ্রামগুলোতে টহল দিতে সাহস পায় না পাকিস্তানিরা।
পাঁজরের নিচে যেখানে গুলি লেগেছে কোমর থেকে গামছা খুলে সেখানে পেঁচিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে মুনতাসির। এমনিতেই যথেষ্ট রক্তক্ষরণ হয়েছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। এ সময় মনোবল হারিয়ে ফেললে হয় এখানেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে মরে পড়ে থাকতে হবে আর না হলে ধরা পড়তে হবে শত্রুর হাতে। ডান দিকে কাত হয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে মুনতাসির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওরা সবাই কি এতক্ষণে ক্যাম্পে ফিরে গেছে! দলছুট ছেলেটার কথা কেউ মনে করেনি, মরে পড়ে থাকলে লাশটাও তো খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে পারত। যুদ্ধ বড় নিষ্ঠুর খেলা। এখানে কেউ কারও বন্ধু নয়Ñ আর মুনতাসির তো এখানে এমনিতেই দলছুট। তাকে বাদ দিলে আর সবার ছাত্রজীবন শেষ। সবচেয়ে বেশি লেখাপড়া জানা মানুষ সিরাজ ভাই ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আক্কেলপুর বাজারে ছিট কাপড়ের দোকান দিয়েছিলেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই সব পুড়ে ছাই। দুই নিজামের একজন কালা নিজাম সাইকেল মেকার, অন্যজন ধলা নিজাম ম্যাট্রিক পাস করে মঙ্গলবাড়ি হাটের একটি ধানভাঙা কলের ম্যানেজার। এসএসসি পাস দ্বিতীয়জন কামরুল, খবরের কাগজের এজেন্সি চালায়। নিজে মালিক, নিজেই হকার। মাঝ মাঝে ঘুমের মধ্যেও হাঁক দেয়, ‘দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজারভার, দৈনিক পাকিস্তান…’ দেশ দুনিয়ার খবর সামান্য যেটুকু সেই রাখে। দলে প্রায় সবাই কৃষক পরিবার থেকে এলেও আবুল কালাম, মন্টু ভাই এবং মহিম মুরমু সরাসারি মাঠেই কাজ করত। তবে এদের কারোরই রাজনীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার একমাত্র ভাবনা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।
ক্যাম্পে মুনতাসিরের সংক্ষিপ্ত নাম ছিল মুন। কামরুল খুব সমীহ করে ডাকতো ‘চাঁদভাই’। সেই কামরুলও কি একবার তার খোঁজ করবে না! রাতটা কি শুক্লপক্ষ না কৃষ্ণপক্ষ! যা-ই হোক আকাশের চাঁদ তারা সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন কোনোভাবেই পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
রাত বোধহয় ধীরে ধীরে ফরসা হয়ে আসছে। বেশ দূরে, সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গ্রামের আভাস দেখা যায়। আশপাশের ঝোপঝাড়গুলোও এখন অনেকটাই স্পষ্ট। হাতের কাছে পড়ে থাকা এসএমজিতে পরম যতেœ হাত বোলায় মুনতাসির। এইখানে মরে পড়ে থাকলে অস্ত্রটাও খোয়া যাবে। দলে সবচেয়ে ভারী অস্ত্র বলতে তো দুটি সাব-মেশিনগান। একটা সিরাজ ভাই আর একটা মুনতাসিরের কাছে। বাকি ছয়জনের হাতে দুটি স্টেনগান আর চারটি থ্রি-নট-থ্রি। এ ছাড়া প্রত্যেকের কোমরে গোঁজা দুটি করে হ্যান্ডগ্রেনেড। পাকিস্তানি আর্মির টহলদল কিংবা সেতু কালভার্ট পাহারা দেওয়া রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালাবার জন্য এসব যথেষ্ট। কিন্তু এভাবে ফুটফাট গুলি চালিয়ে আর কতদিন! স্টেনগানগুলোকে খেলনা মনে হয় মুনতাসিরের। সাব মেশিনগানের রেঞ্জও এমন কিছু বেশি নয়। পঞ্চাশ গজের বাইর হলে টার্গেট তো মিস করেই, তাছাড়া পাকিস্তানি শয়তানগুলা যে হেলমেট মাথায় দেয় সেই হেলমেটে লাগলেও গুলি না-কি ছিটকে বেরিয়ে যায়। তার চেয়ে বরং থ্রি-নট-থ্রি ভালো। টার্গেটে হিট করতে পারলে জান নিয়ে পালাবার উপায় নেই।
খাড়ির উপরের রাস্তা পেরিয়ে গাছপালার ফাঁকে আকাশ ক্রমেই লাল হয়ে উঠছে। তাহলে এই দিকটাই তো পূর্ব দিক। বাঁ দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আবছা আলোয় কুয়াশার আবরণ ভেদ করে চোখে পড়ে সীতাহার গির্জার মাথায় সাদা পাথরের ক্রশ। মাত্র আধা মাইল দূরে গির্জা চত্বরে ক্রুশেবিদ্ধ যিশু যেনো তার জন্যেই অপেক্ষা করছেন। নতুন করে সাহসী হয়ে ওঠে মুনতাসির। এবারে ক্রলিং-এর প্রস্তুতি হিসাবে নিজের দিকে একবার ফিরে তাকায় সে। সবুজ ঘাসের উপরে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত দেখে তার কোনো ভাবান্তর হয় না। নিজেই নিজেকে বলে ‘বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করা’ বোধহয় একেই বলে। বাঁ পাঁজরের রক্তভেজা জায়গাটা আরেকটু শক্ত করে বেঁধে নেয়। তারপর অতি সাবধানে নিঃশব্দে উঠে বসে। নাÑ ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে রাস্তার ওপার থেকে দেখার কোনো উপায় নেই।
হঠাৎ সে খেয়াল করে একদল পিঁপড়া সারিবদ্ধভাবে তার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে কোথায় যেনো চলে যাচ্ছে। মানুষটা যে এখনও বেঁচে আছে সে ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পিঁপড়াদের ঝেড়ে ফেলতে একটা হাত তুলেই ফেলেছিল, পরক্ষণেই সে ভাবে, আহা থাকÑ আমার দেশের পিঁপড়া! সামনেই শীত আসছে হয়তো তাই খাবারের খোঁজে দল বেঁধে বেরিয়েছে। ওদের মেরে কি লাভ!
দূরে পরিত্যক্ত পোড়া বাড়িঘর আর কয়েকটা শিমুল শিরিষ গাছের ফাঁকে বিশাল একটা সূর্য আকাশজুড়ে আলোর আভাস ছড়িয়ে ক্রমেই আরও উপরে উঠে আসে। অপলক তাকিয়ে থাকে মুনতাসির। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একটি অসাধারণ সূর্যোদয় দেখবার জন্যে তাকে বাঁচতেই হবে! বুকের কাছে দুহাতে এসএমজিটা আঁকড়ে ধরে শ্বেতশুভ্র ক্রশ বরাবর ক্রলিং শুরু করে মুনতাসির।

Category:

যুদ্ধের খেলা

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-12-42 PMইমরুল ইউসুফঃ স্যার, আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমার এই কথা শুনে স্যার চোখ থেকে চশমাটা খুললেন। তারপর লম্বা একটা শ্বাস ছাড়লেন। বললেন, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় স্কুল চালানো যায় না। কবে স্কুল খুলবে তাও জানি না। কারণ এখন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়। যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়। যুদ্ধ কী স্যার? বলল, মনি। যুদ্ধ মানে সংগ্রাম, লড়াই। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াইয়ে জেতা মোটেও সহজ নয়। এটা একটা খেলা। বুদ্ধি করে যে ভালো খেলবে সেই জিতবে। শোনো, এ সময় তোমরা খুব সাবধানে থাকবে। দরকার ছাড়া বাইরে যাবে না। এই কথা বলে স্যার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
স্যার চলে যাওয়ার পর আমি সুরুজ ও মনি স্কুলের মাঠে এসে বসলাম। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। এমন সময় সুুরুজ বলল, আমরাও তো যুদ্ধে যেতে পারি।
মনি বলল, না ভাই আমার মা কিছুতেই যেতে দেবে না। আর আমরা তো বন্দুক চালাতে জানি না। বোমা ছুড়তে জানি না। কীভাবে শত্রুর মোকাবিলা করতে হয় তাও জানি না। আমরা কীভবে যুদ্ধ করব?
মনির এই কথা শুনে আমার হেড স্যারের কথা মনে পড়ল। বললাম, স্যারের কথা শুনিস নি। যুদ্ধ একটা খেলা। বুদ্ধি করে এই খেলা খেলতে হয়। এই খেলা যে ভালো খেলবে সে-ই জিতবে। সুরুজ, মনি শোন। কোনো অস্ত্র ছাড়াই আমরা যুদ্ধ করব। স্কুল খোলার জন্য যুদ্ধ করব। যুদ্ধ করব রাস্তাঘাটে শান্তিতে চলার জন্য। দেশ বাঁচানোর জন্য।
সুরুজের বড় ভাই মারা গেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে সুমন শহিদ হয়েছে। অনেক কষ্ট করেও মুক্তিযোদ্ধারা তাকে বাঁচাতে পারেনি। খবরটা এলো এই মাত্র। খবর শুনে সুরুজ কাঁদতে লাগল। আমরা তাকে কাঁদতে নিষেধ করলাম। বললাম, সুরুজ বাড়ি চল।
আগুন আগুন। মনিদের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এমন চিৎকার শুনে কাটাখালী গ্রামের মানুষ জেগে উঠল। অন্ধকার গ্রাম আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে উঠল। আগুন দেখে বাইরে বের হতে চাইলাম। কিন্তু মা বের হতে দিলেন না।
বললেন, খবরদার বাইরে বের হবি না। এমন সময় আমার বাবা ঘরে ঢুকলেন। বললেন, খান সেনারা মনিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মনির বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের এখন খুব বিপদ।
মনিদের বিপদ। কথাটা শুনেই আমার বুক কেঁপে উঠল। বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য ছটফট করতে লাগল। কিন্তু কথাটা বাবকে বলতে সাহস হলো না। অবশেষে বাবাই কথাটা বললেন। ‘এই রাতে ওরা কোথায় যাবে। যাই ওদের আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি।’
কথাটা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। কিছু সময়ের মধ্যে মনি ও তার স্বজনরা আমাদের বাড়িতে এলো। কিন্তু তাদের ভয় কাটল না। গ্রামে পাকহানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে। এই খবর মুহূর্তেই আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। কিন্তু মুক্তিসেনারা পালায় না। আমরা পালাই না। কীভাবে খান সেনাদের ঘায়েল করা যায় সে কথাই ভাবতে থাকি।
হঠাৎ আমার মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। মনিকে সুরুজদের বাড়িতে পাঠাই। সুরুজকে স্কুলের মাঠে আসতে বলি। আমরা তিনজন যখন এক জায়গায় হই তখন দুপুর। রাস্তায় একজনও মানুষ নেই। স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের হই-চই নেই। স্কুলটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
আর চুপ করে না থেকে আমরা কথা বলা শুরু করলাম। পাকসেনাদের দেখা মাত্রই আমরা কী করব তা আলোচনা করে ঠিক করলাম। এজন্য দরকারি জিনিস কীভাবে জোগাড় করব সেও ঠিক করে ফেললাম। সিদ্ধান্ত নিলাম দরকারি জিনিসগুলো সবসময় আমাদের কাছে থাকবে। কারণ যে কোনো সময় পাকসেনারা আমাদের গ্রামেও ঢুকতে পারে।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাড়িতে ফিরছি। এমন সময় আমরা দুজন পাকসেনা দেখতে পেলাম। তাদের যে এত তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব, আমরা ভাবতেই পারিনি। দেখলাম তারা আমাদের দিকে গট গট করে এগিয়ে আসছে। পায়ে বুট জুতা। গায়ে খাকি রঙের পোশাক। হাতে বন্দুক। মুখে মোটা গোঁফ। চোখ দুটি গোলগোল। মাথায় হেলমেট। এর ঠিক পেছনেই একজন রাজাকার। গায়ে লম্বা জামা। মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। মায়ের বলা গল্পের সঙ্গে তাদের চেহারার হুবহু মিল।
‘হাঁ করে কী দেখছিস? ওরা তো এসে গেল’। মনি বলল। আমি বললাম, মনি সুরুজ তোরা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়। সময়মতো সব কাজ করবি। দেখিস ভুল হয় না যেন।
দুই পাকসেনা আমার কাছাকাছি আসতেই আমি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম মাটিতে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ করতে লাগলাম। আমার খুব পেট ব্যথা করছে, এমন ভান করতে লাগলাম। ‘আমার পেটের নিচে কিছু দিন। আমার পেটের নিচে কিছু দিন।’ এই কথা বলতে লাগলাম।
আমার ছটফটানি দেখে পাকসেনারা দৌড়ে আমার কাছে এলো। মুখ নিচু করে আমাকে দেখতে লাগল।
‘এ লেড়কা তুমকো কেয়া হুয়া’ একজন সেনা বলল। আমি এই কথা শুনে আরও জোরে গোঙাতে লাগলাম। আমি এমন ভাব করতে লাগলাম যে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার কষ্ট দেখে ওদের একটু মায়া হলো। আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে মনি ও সুরুজ বের হয়ে এলো। পকেট থেকে তামাক পোড়ার গুঁড়া বের করল। তারপর দুই পাকসেনার চোখে মুখে ছুঁড়ে মারল। তামাকের গন্ধে দুই পাকসেনা কাশতে লাগল। হাঁচি দিতে লাগল। এমন সময় মনি ও সুরুজ আবার তামাক পোড়া ছুড়ল। তামাকের গন্ধে তারা দুজন ঝটপট করে উঠে দাঁড়াল। এ কয়ো হো গেয়া, এ কয়ো হো গেয়া। বদমাস ছোকড়াকা এ মুঝছে কেয়া কর দিয়া।’ এই কথা বলতে বলতে তারা আরও বেশি হাঁচি দিতে লাগল। তামাকের গন্ধে ছটফট করতে করতে তারা তাদের কাঁধ থেকে রাইফেল ফেলে দিল। তারপর চোখ মুখ ডলতে ডলতে পুকুরে ঝাঁপ দিল।
তাদের এমন কা- দেখে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এলো। পুকুর পাড়ে দুই পাকসেনাকে ঘিরে ধরল। দুই শয়তানকে আজ আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। এ কথা বলতে লাগল। কেউ কেউ আবার আনন্দ করতে লাগল মনি, সুরুজ ও আমাকে নিয়ে।
এমন সময় আমাদের স্কুলের হেড স্যার এলেন। রাইফেল দুটি হাতে তুলে নিলেন। আমাদের তিনজনকে কাছে ডাকলেন। ‘তো কি এমন করেছিস যে ওরা রাইফেল ফেলে পানিতে গিয়ে পড়ল?’ বললেন স্যার।
‘চোখে মুখে তামাক পোড়ার গুঁড়া দিয়েছি স্যার’ মনি বলল। ‘এত তামাক পোড়া তোরা কোথায় পেলি?’ স্যার বললেন। আমি বললাম, চুরি করেছি। আমরা সুরুজের দাদা-দাদির আর মনির নানার পান খাওয়ার তামাক চুরি করেছি। তারপর ওই তামাক শয়তান দুটির মুখে ছুঁড়ে মেরছি। আজ আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করেছি স্যার। এ যুদ্ধে আমরা জিতেছি স্যার।
এই কথা শুনে স্যার আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, তোরা আজ যে কাজ করেছিস তাতে দেশ শত্রুমুক্ত হবেই।

লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

Category: