Blog Archives

নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত

Posted on by 0 comment

আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?

42পাপড়ি রহমান: ফুটে-ওঠা-ভোর দেখতে দেখতে আমি রুনিদের বাড়িতে পৌঁছে যাই। অনেকদিন বাদে কোনো মফস্বলী-সকাল আমাকে রীতিমতো ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছিল। শান্ত-নীরব-সমাহিত ওই সকালের ভিতর দিয়ে আমাদের অটোরিকশা ধীরে-সুস্থে, প্রায় নিঃশব্দে চলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। থ্রি-হুইলের ওই যান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো একটানা শব্দ সরিয়ে ফেলা যায় নি। আমি সে চেষ্টাও করিনি। বরং ধোঁয়াটে-আলোর ভিতর আমি সত্যিকার অর্থেই মফস্বলী-সকাল দেখায় মগ্ন ছিলাম। আমার এই একাগ্র-মগ্নতাকে গাঢ় করে তুলেছিল রাতের বৃষ্টিপাতে সতেজ হয়ে থাকা রাস্তাগুলো। এঁকে-বেঁকে-যাওয়া পিচঢালা কালো-রাস্তা। ধুলাবালি শূন্য ভেজা-রাস্তা। চড়াই-উৎরাই কম। কোনো কোনো রাস্তার বাঁক পেরুনোর আগেই মনে হচ্ছিল যেন কোনো নদী! নিস্তরঙ্গ-কালো-নদী। যে নদীতে ঢেউ নাই। জলের কোলাহল নেই। কোনোরকম উত্তেজনা নাই। যেন-বা কালো দুধের ওপর ঘন-কালো সর পড়ে আছে। অথচ ওই কালো রাস্তার ধারে আমি সত্যিই এক নদী বয়ে যেতে দেখেছিলাম। বিস্তৃত সেই নদী। আর শ্রাবণের নদী মানেই উন্মত্ত। যৌবন লুটিয়ে দেবার বাসনায় মঞ্জুরিত। তীব্র কামুক আহ্বানে গতি হারা।
ওই যৌবন-মত্ত-নদী বইছিল পথগুলোর ধার ঘেঁষেই। তবুও আমি মতিচ্ছন্নতায় আক্রান্ত হলাম। পূর্বরাতের বৃষ্টিজলে বাসীভাবে ভিজে-থাকা রাস্তাগুলোকেই আমার নদী বলে মনে হলো। নদীটাকে রাস্তা ভেবে আমাদের অটোরিকশা যদি ওই পথে ধাবিত হতো! কিংবা চালককেও যদি আমার মতন মতিচ্ছন্নতায় পেয়ে বসত? আর সে অটোরিকশার গতি ঘুরিয়ে দিত? তা হলে বিপদ ছিল। সর্বোচ্চ বিপদ। ভাগ্যিস, সে তা করে নাই।
কেউ অন্যের মনের-ভাবনা দেখতে পায় না। পাশাপাশি বসে বা হেঁটে বা শুয়ে থেকেও কেউ অন্যের মনোজগত দেখতে পায় না। এটা আমার ওই সময়ই মনে হয়েছিল। এবং আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম। অবশ্য আমিও তাদের মনোজগত দেখতে পাচ্ছিলাম না। এক ধরনের স্বস্তি নিয়ে আমি তাকিয়েছিলাম রুনির দিকে। রুনি আমার ইশকুল-কালের বন্ধু। শুধু রুনি নয়, আমি অটোরিকশা-চালকের দিকেও তাকিয়েছিলাম। এমনকি রুনিদের বাড়ির কেয়ারটেকার মাহবুবের দিকেও।
মাহবুব বসেছে অটোচালকের পাশাপাশি। রুনির পূর্বপুরুষ জমিদার ছিল বিধায় এই বিভাজন। রাজা আর প্রজার সারি এক নয়। আমার পাশে বসে থাকা নীলরক্তধারী-রাজকন্যা-রুনিÑ তবে কি আমিও রাজা সারির?
এ প্রশ্ন হারিয়ে গিয়ে রুনির মনোজগত আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু তা দেখার কোনো উপায়ই আমার জানা ছিল না।
পেছনের সিটে আমি আর রুনি পাশাপাশি। সামনে মাহবুব আর চালক পাশাপাশি। আমাদের চারজনের মাঝে কোনো কাপড়ের পর্দা টানা নাই। চালক আর যাত্রীর বিভাজন স্টিলের গরাদ দিয়ে। যা দেখলেই চোর আর পুলিশের কথা মনে পড়ে। কে এখানে পুলিশ আর কে চোর? উত্তর যা-ই হোক আমরা এখানে কেউ কারও মন পড়তে পারছি না। অথচ চারজনের গন্তব্য একই দিকে।
মাহবুব আমাদের রিসিভ করার জন্য বাস-টার্মিনালে ছিল। পূর্বরাতের ঝড়-জলে সেও হয়তো ভিজেছিল। তাই যদি না-হবে জলের ছিটেফোঁটা কেন তার শরীরে লেগে আছে?
মাহবুব যখন বাসের পেট থেকে আমাদের লাগেজ টেনে আনে, আমি জলচিহ্ন দেখছিলাম। তার পরনের প্যান্টের পায়ের অংশটা ভেজা। পায়ের স্যান্ডেলটাও ভেজা-মলিন দেখাচ্ছিল। এসব নিশ্চয়ই বৃষ্টিপাতের বাসীজলের কারবার।
তখনও আমরা অটোতে চড়ি নাই। আর নদীর সাক্ষাৎ পাই নাই। পেলে হয়তো আমি অন্যকিছু ভাবতাম। রাস্তার বদলে মাহবুবকে না ঠিক মাহবুব নয়, মাহবুবের পায়ের পাতাগুলোকেই আমার নদী মনে হতে পারত। অথচ আমি দিব্যি দেখেছিলাম কালো-পায়ের-পাতায় টলটলে-জল!
কোনো কোনো মানুষের জল-ভেজা-পা শাপলা-ফুলের মতো দেখায়। সতেজ ও পবিত্র। সুগন্ধিযুক্ত। সব শাপলায় তেমন সুগন্ধ থাকে না। যে শাপলাফুল তারাকৃতি হয় তাতে সুগন্ধ বেশি থাকে। আর যেসব শাপলারা ভোর-ভোর ফুটে ওঠে। রোদ্দুরের সামান্য কিরণেই মেলে-রাখা পাপড়িগুলো গুটিয়ে ফেলে। অথচ ফুটন্ত অবস্থায় জলের ঢেউদের হালকা-সুবাসে আমোদিত করে রাখে। ওই ফুলের আমি মনে মনে নাম দিয়েছি তারাশাপলা। লাগেজ-টানার-সময় মাহবুবের ভেজা-পা দেখে আমার তারাশাপলার কথা মনে পড়েছিল। হতে পারে মফস্বলী-ভোরের-শ্রী আর নীরবতায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। ফলে আমার ভাবনায় ফুল-পাখি-প্রজাপতিরা উড়ে এসেছিল।
অটো এসে থামে রুনিদের বাড়ির গেটে। আমি আর রুনি নামি। মাহবুব ফের লাগেজ টানে অথবা ভাড়া মেটায়। আমাদের সামনের বদ্ধ গেট হঠাৎ খুলে যায়। আমি বুঝতে পারি না কে খুলল গেট? না-কি আগেই খোলা ছিল? আমি তখন নদী-রাস্তা-তারাশাপলার বিভ্রান্তিতে। অথবা পদযুগলের ঘাপলায়। মাহবুব তখনও অটোর ভাড়া মেটায়।
বাড়ির ভিতর পা দিয়েই আমার মনে পড়ে যায় আলিবাবা আর চল্লিশ চোর। সেই মন্ত্র চিচিং-ফাঁক। রুনি তো চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, তা হলে গেটটা খুলল কে? না-কি প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া মন্ত্রটি আমিই আওড়ে ছিলাম? কিন্তু রুনিদের বাড়িতে এই প্রথমবার এলাম আমিÑ ওদের মন্ত্র আমি কীভাবে জানব?
নদী আর জল-ভেজা-পথ, তারাশাপলার সৌরভ, বৃষ্টি¯œাত-পদযুগলের মতো ফের আমি রহস্যের ভিতর তালগোল পাকাই।
যাবতীয় বদ্ধ-দুয়ার খোলার-মন্ত্র কী একই না-কি? চিচিং ফাঁক!
গেটের ভিতরে এক টুকরো লন। তাতে বিছিয়ে থাকা সবুজ-ঘাস সাদাটে দেখায়। সকালের আলো এখনও ম্লান। সূর্যের শিশুদাঁত সবে হেসেছে। হয়তো ঘাসেদের রং বদলানো এই আলোতেই সহজ। কিন্তু আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি ঘাসের রং সাদাটে অন্য কারণে। অজস্র পাকা-জামরুল ঘাসের ওপর বিছিয়ে রয়েছে। বাঁদুরের দঙ্গল রাতভর খাওয়া-আধাখাওয়া-আস্ত জামরুল এন্তার ফেলেছে।
লন পেরিয়ে ঘরের দরোজায় যেতে যেতে আলো যেন প্রায় নিভে আসে। মেঘ করলো না-কি ফের? ভেবে আমি ওপরে তাকাই। এক বিশাল বৃক্ষপাতা ঢেলে দাঁড়িয়ে আছে। সেও ফলবতী। এই বৃক্ষ আমি চিনিÑ বিলম্বী!
জামরুল আর বিলম্বীর সাথে ঝুলে আছে কামরাঙা। ঘরের দরোজা সাদা-রঙে-ডুবানো। এবং এই দরোজাও পূর্ববৎ খুলে গেলে আমার ফের মনে পড়েÑ
চিচিং ফাঁক!
খুব অনায়াসে ঘরে প্রবেশ করি আমি। ২০০ বছরের প্রাচীন এক গৃহ। সময় ও ধূলিতে অনুজ্জ্বল-হয়ে-পড়া আসবাবে পরিপূর্ণ!
পারস্য-গালিচার ওপর আলবোলার নল হাতে বসে আছে সুন্দরী-নর্তকী। ওই সালংকারা নর্তকী যেন এক্ষুণি গেয়ে উঠবেÑ পিয়া ঘর আনা। ঝাড়বাতির আলোতে ঝলসে উঠবে তার পরনের ঘাঘরা। ঝমঝমিয়ে বেজে উঠবে পায়ের ঘুঙুর। নৃত্যের তালে-তালে খুলে যাবে নাকের কুন্দনের নথ। আর ঝরে পড়বে খোঁপার তাজাফুল। অথবা ফুলেদের পাপড়ি।

০২
তরজার বেড়ার ঘরে টিনের চৌচালা। সবই সাদা রঙে ডুবানো। সুরকি আর চুনের গুঁড়ার মিশ্রণের ওপর নিপুণভাবে প্রলেপ দেওয়া। ফলে বাইরের উত্তাপ ঘরের ভিতরে কম প্রবেশ করে। চৌচালা-চালের কড়ি-বরগা অনেক উঁচুতে উঠে টিনের আচ্ছাদন নিয়েছে। ওপর থেকে নেমে আসা ভাঁপ-তাপও উঁচুতেই ঝুলে থাকে। প্রায় মরচে-ধরা বৈদ্যুতিক পাখার হাওয়ায় ওই ভাঁপ-তাপ মেঝেতে নামাতে পারে না। মেঝের ওপর প্লাস্টিক-ম্যাট বিছানো। বিবর্ণ-রং ও ভঙ্গুর-চেহারা আড়াল করার প্রয়াস। কিংবা হতে পারে প্রাচীন-জীবনকে নতুনের সাথে একাকার করে রাখা।
মোদ্দাকথা ঘরটা বেশ প্রশস্ত ও আরামদায়ক। এবং আমার পছন্দ হয়ে গেল। বহু পুরাতন আমলের খাট, তাতে নরম বিছানা। খাটের পাশ দিয়ে পার্সিয়ান খাটপোষ পেতে রাখা।
রুনি আর আমার একই বিছানা। যদিও আমি শোওয়া-শোওয়ি শেয়ার করতে পারি না; কিন্তু রুনির বাড়িতে এসে মেনে নিলাম। এর কারণও পেয়ে গেলামÑ এক. এই বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো শোবার ঘর নাই। পেছনের ঘরগুলো কেয়ারটেকার মাহবুবের দখলে। দুই. রুনি এতটাই গুটিয়ে-শুটিয়ে ঘুমায় যে, আমার পাশে কেউ ঘুমাচ্ছে এটা বুঝা যায় না। এটা রুনির অভ্যাস না আভিজাত্য ঠিক ধরতে পারলাম না। অবশ্য অভ্যাসই কালক্রমে আভিজাত্যের অংশ হয়ে ওঠে।
খাটের পায়ের দিকে দেয়াল-ঘেঁষে ড্রেসিং-টেবিল। আর বহু পুরাতন কয়েকটা সোফা এদিক-সেদিক পেতে রাখা। সোফার গদিগুলো খটখটে। দুইটা পুরাতন স্টিলের-দেরাজ। এরাও সাদা রঙে ভরপুর।
মাহবুবের বউ তফুরার সারাক্ষণ তদারকিতে আমাদের দীর্ঘ-পথের ক্লান্তি উবে গেল। এই দম্পতির চারজন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েটার বয়স তের কি চৌদ্দ। নাম মাহি। বয়সের তুলনায় বাড়ন্ত গড়ন। আমার আর রুনির ফুটফরমায়েশের জন্য মাহি ছায়ার মতো লেগে রইল।
খাটের ওপর ঝকঝকে বিছানা। বালিশ-চাদর-বেডকভার। এত ঝাড়া-মোছা সত্ত্বেও ঘর থেকে পুরাতনী গন্ধটা বিলীন হয় নাই।
পারস্য-গালিচার ওপর স্থির বসে-থাকা নারীটির দিকে তাকিয়েও আমি তেমনই ভেবেছি। ধুলা পড়ে ওই নারীটির চেহারাও যেন ধুলাকার হয়ে গেছে। প্রাচীন-ঘর, আসবাব, কুশন-কভার, ঝালর-দেয়া-পর্দা। অথবা বেডকভার জুড়ে সময়ের-ধূলি-পড়া আবছা-গন্ধ! যা আমাকে নতুন কোনো অভিজ্ঞতার ভিতর ছুড়ে ফেলছিল। রুনি আমার মনোভাব বুঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার সম্মুখে আমি ছিলাম নির্বিকার।
আমাদের শোবার ঘরের ভিতরেই বাথরুম। বেশ বড়সড়। প্রাচীন আমলের কমোড। ¯œানের জন্য চৌকোণাকৃতি জায়গা। তাতে জল আটকানোর ব্যবস্থা। একপাশে পুরাতনী বেসিন। বেসিনের ভেতরটা গভীর। রীতিমতো কুঁজো হয়ে মুখ ধুতে হয়। মরচে-ধরা জলকল। ও থেকে কীভাবে জল বেরোয়? আমি বিস্মিত হই।
তফুরা বেশ পরিশ্রমী। বেডকভার তুলে বিছানা ভালো করে ঝেড়েমুছে দেয়। ক্লান্তিতে আমি শুয়ে পড়ি। বিছানায় শুয়ে ওপরে তাকালে দেখিÑ চালটা যে টিনের তা বুঝার উপায় নাই। সাদা-মোটা-কাগজ দিয়ে পুরো ঘরটাই আবৃত। ঘুমের ভিতর ঢুকতে-ঢুকতে আমার মনে হয়Ñ টাঙানো কোনো সাদা-তাঁবুর তলায় শান্ত-¯িœগ্ধ-বিছানায় আমরা ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। এখন রাত কত? আমি বুঝতে পারি না। ঘরের ভিতর কালো-জালের-মতো অন্ধকার ছড়িয়ে রয়েছে। নতুন জায়গা বলে আমি পূর্ব-পশ্চিমও বুঝতে পারি না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারিÑ রুনি অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ওর আপাদমস্তক কোনো কিছুতে ঢেকে রাখা। ফলে ও নারী না পুরুষ সেটিও অনুমান করার উপায় নাই।
তীব্র অন্ধকার খানিকটা চোখে সয়ে এলে আমি ফের রুনির দিকে তাকাই। ওর কোনো নড়াচড়া নাই। যেন কোনো শবদেহ পাশে শুয়ে আছে।
শবদেহ পাশে নিয়েই আমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ খুঁজি। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না। তবুও এটা খেয়াল হয় যে, কোনো বিকট শব্দেই আমার ঘুম ভেঙেছে। এবং এটা ভাবার পরক্ষণেই আমি ফের ধুমধাম আওয়াজ শুনতে পাই। কিসের শব্দ বুঝতে পারি না। কিন্তু এটা বুঝতে পারি ঘরের চাল বেয়ে শব্দ নিচে নামছে। ভয়ে আমি কানের ওপর বালিশ চেপে ধরি। কিন্তু আরও জোরে শব্দ হতে থাকে।
গহীন-অন্ধকারের ভিতর শুয়ে-শুয়ে আমি শব্দ এড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। এতকিছুর পরও রুনির ঘুম ভাঙে না। সে মৃতবৎ শুয়ে থাকে। আর আমি ভয়ের ভিতর সমর্পিত থাকি। আমার সমস্ত শরীর কুলকুল ঘামে ভিজে ওঠে। আমিও কি তবে রুনির মতো মারা যাচ্ছি?
ওই অন্ধকার রাত্রি কখন যে ভোরের দরজা খুলে দেয়Ñ আমি টের পাই না। বেশ বেলায় ঘুম ভাঙলে দেখি রুনি তখনও মরে আছে। ফের বিকট শব্দ হয়। এবং আমার অতি কাছেই। আমি তাকিয়ে দেখি এক বিড়াল।
বিড়াল আমার কাছে চিরকাল ভয়ের উৎস। ছোটকালেই আমরা জানতাম, বিড়াল শতরূপী হয়। যাকে বিড়াল মনে করছি সে আদতে অন্যকিছু। বিড়ালের বেশ ধরে এসেছে। সদ্য দেখা-পাওয়া বিড়ালের সঙ্গে আমার আই কনট্যাক্ট হয়। সে চোখ সরায় না। আমিও চোখ সরাই না। সে কি বিড়াল না বাঘ? তার গায়ে ঘিয়ে আর হলদে ডোরা। আর সে বেশ স্বাস্থ্যবান।
এই ঘরের দরোজা-জানালা সব বন্ধÑ সে ঢুকলো কীভাবে? কিন্তু সে যেমনি এসেছিল তেমনই হাওয়া হয়ে যায়। দিনের আলোতেও আমি ফের ভয় পেতে থাকি।
আমার অ্যালান পোর বিড়ালের কথা মনে পড়ে। আশ্চর্য! ভীতু মনে কত কী যে উদয় হয়। বিদেশি ওই বিড়ালের সঙ্গে বাংলাদেশি বিড়ালকে তুলনা করার কোনো মানে আছে?
বিড়ালটা কখন জানি হাওয়া হয়ে যায়। আর রুনি সামান্য নড়ে ওঠে। গ্রীষ্মকালে সামান্য হাওয়া বইলে নিমপাতা যেভাবে নড়ে ওঠেÑ সেভাবে। আচ্ছা, রুনি কি বিছানায় শোয়ামাত্রই মরে যায়? আর রোদ্দুর চড়তা হলে জীবন ফিরে পায়?
আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?
রুনি কথা বলে ওঠেÑ ‘কি রেÑ যা ঘুমাইলি রাতভর। একটুও নড়িস নাই।’
শুনে আমি অবাক হয়ে যাই।
আমি যেমন গত রাতে রুনিকে মরে যেতে দেখেছি, সেও কি আমাকে তেমনই দেখেছে?
বাথরুমে ঢুকে আমি দরজা বন্ধ করি। এতে করে রুনি ঘরের ভিতর আটকা পড়ে যায়। এ ঘরের বাসিন্দাদের কেউ বাথরুমে গেলে এভাবেই যেতে হয়। তফুরা যে দরজা দিয়ে ঢুকবে সেটাও বন্ধ রয়েছে।
পুরাতন মডেলের কমোড। পুরাতন কল। এমনকি কলের তলায় পেতে রাখা বদনাটাও বহু পুরাতন। রং-জ্বলা-নিষ্প্রভ। আমার বামপাশের দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। জুলাই মাস, ১৯৯৫। আমি চমকে উঠি। জুলাই মাস! তার মানে গত ২০ বছরে এই বাড়িতে কোনো নতুন বছর ঢুকে নাই।
এই বাড়িতে কেউ থাকে না তেমন তো নয়! মাহবুব আর তফুরা বাস করে। ওদের বাচ্চাকাচ্চা। বিদেশ থেকে রুনি আসে। ওর বোন ও ভাইও আসে। তা হলে ১৯৯৫ সাল কেন বাথরুমে ঝুলে আছে? এসব ভাবনার ভিতর আমি কল ছাড়ি। দীর্ঘকাল পর জলের সরু ধারা নামে। আয়রনের আধিক্য হেতু কফিরঙা জল। নাকি রক্ত! আমার শরীর হিম হয়ে আসে। আমি তড়িঘড়ি বদনা হাতে নিতেই ভয়ে কেঁপে উঠি। ধাতব স্পর্শের বদলে নরম ও কোমল অনুভূতিÑ একটা ডোরকাটা বিড়াল শুয়ে আছে। আর আমি তার পিঠে হাত রেখেছি!
০৩
রুনিদের প্রাচীন ঘরটার জানালা গলিয়ে দুদ্দাড় করে মেঘ ঢুকে পড়ে। ফলে ঘরের ভিতরটা ধোঁয়া-ধোঁয়া আর শীতল। বাতি-না জ্বালানো পর্যন্ত কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না। ওই মেঘকক্ষের ভিতর আমি চুপচাপ বসে থাকি। জানালার বাইরের অবিশ্রাম বৃষ্টি আমাকে অবাক করে দেয়। এই শহরে বড় অদ্ভুতভাবে জল ঝরে।
ঝরছে তো ঝরছেই। অক্লান্ত এই ঝরে পড়া। জামরুলগুলো জলে ভিজে টসটসা। পাতাগুলো জলমগ্ন। বিলম্বী গাছটাও অবিরাম ভিজছে। ভিজতে ভিজতে তার বাকল কালচে হয়ে উঠেছে। জলের ঝাপটায় ভিজে একসা কামরাঙা গাছটি। এন্তার বেগুনি-বর্ণ-ফুল ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টি-¯্রােতে। বৃষ্টির প্রবহমান জলে ফুলরাশি ভাসতে দেখে আমার নদীর কথা মনে পড়ে। ফুলনদী! আহা! জলধারা ক্ষীণ হলেও এ তো নদী-ই। ফুলনদীÑ নইলে এত ফুল এর জলে ভেসে যায় কেন?
তুমুল তুফান আর বৃষ্টি। প্রচ- ঝড়ো-হাওয়া। আসমান ভেঙে পড়ছে জলধারা। থইথই শ্রাবণে আমি গৃহবন্দি। অটোরিকশায় আসার পথে নদীতে আমি জল উথলে উঠতে দেখেছিলাম। জল-ভরন্ত নদী আমাকে বলে দিয়েছিল ভরা-শাওন। নইলে ওই নদীকে অমন সোমত্ত দেখাত না! ভরা-বর্ষার সমস্ত চিহ্নই ফুটে রয়েছে এই শহরে। মাহবুবের জল-ভেজা-পা আর পিচরাস্তার ওপর গড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টির দাগ।
রুনিদের জানলায় বসলেই আমি যেন ওই নদীটাকে দেখতে পাই। টিনের-চালে বৃষ্টির-ফোঁটা সংগীত-মুখর হয়ে ওঠে। জল-কণারা জানালার ফিনফিন পর্দায় মুক্তদানার মতো ঝুলে থাকে। মেঘ-থমথমে ঘরের ভিতর আমি হঠাৎ আরও দুটো দেরাজ দেখতে পাই। সাদা-রঙে-চুবানো। এই দুটো কেন আগে দেখিনি?
তফুরাকে জিজ্ঞেস করলে বলেÑ ‘খালাম্মা, এইহানে তো পানির পাম্প।’
ঘরের ভিতর পানির পাম্প! হতেই পারে। ২০০ বৎসর পূর্বে পানির পাম্প ঘরে রাখাই স্বাভাবিক।
ওই দিনও আমি রাতভর ঘুমাতে পারি না। বিদঘুটে শব্দরা আমাকে জাগিয়ে রাখে। হয়তো অ্যালান পোর বিড়ালেরা দলবেঁধে আসে। রুনির শবদেহ তেমনই নিঃসাড়। ভোরের দিকে তন্দ্রার ভিতর থেকে আমি হঠাৎ জেগে উঠে।
খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিলের ওপর সুরকি-চুন-বালি আর কাঠের টুকরা ধসে পড়েছে। আমি অবাক হয়ে দেখিÑ ওই সুরকি আর চুনের স্তূপের নিচে এক বিড়াল লেজ নাড়ছে। কালো আর শাদাতে ডোরাকাটা। এই বিড়ালটিকে আমি আগে দেখিনি। তফুরা ছুটে আসে। মাহবুবও। ওদের মেয়ে মাহি। ওরা ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ওদের চুপসানো মুখাবয়ব দেখি। ঘরের চাল দেখি। তাঁবুর মতো করে টানিয়ে দেয়া মোটা-কাগজটা একদিকে ঝুলে পড়েছে। হয়তো ওই পথেই সুরকি-চুন-বালি-কাঠের স্তূপ নেমেছে।
রুনিকে বিড়াল দেখার কথা বলতেই ও হা হা করে হেসে ওঠে।
‘এটা বিড়ালের কাজ। ঘরের চাল ভেঙে এই চুন-সুরকি-বিড়ালই ফেলেছে।’
বিড়াল কীভাবে অত উঁচু থেকে পড়ার পরও বেঁচে থাকে? আমার বোধগম্য হয় না। রুনিকে বলতেই সে বলেÑ
‘কি যে বলিস না! বিড়ালের হাড্ডি। ওরা সহজে মরে না।’
ওই ভাঙা-আবর্জনাতে আমি সিমেন্টের প্লাস্টারের অংশও দেখেছি। যদি ওসবই আমার বা রুনির মাথার ওপর পড়ত?
তফুরা আর মাহি ওইসব ধস ঝাঁট দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখি তফুরার পা-দুটো ভেজা-ভেজা দেখাচ্ছে। যেন সে এক্ষুণি পা ধুয়ে এসেছে।
তফুরার পদযুগলকে তারা-শাপলার মতো দেখায়। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আবছা-সুঘ্রাণ পাই।
ওই দিনের দুর্ঘটনার পর আমি রুনিদের বাড়ির সর্বত্র বিড়াল দেখি। যখন ডাইনিংয়ে খেতে বসি আমার পায়ের কাছে বিড়াল চলাফেরা করে। বাঘের মতো ডোরাকাটা বিড়াল। তফুরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলেÑ
‘কই খালাম্মাÑবিড়ালউড়াল কিচ্ছু নাই।’
শ্রাবণ-মাসের বৃষ্টি ফের ঘন হয়ে নামে। বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে আমি বিলম্বী গাছটাকেও আর দেখতে পাই না। এমনকি জামরুলের পত্র-শাখাও অস্পষ্ট দেখায়।
মেঘের বড়সড় চাঙর ঝুলে থাকে রুনিদের জানালায়। সেই ধূপছায়া রঙের ভিতর দিয়ে আমি আলোর ছিটেফোঁটাও দেখি না।
টিনের চালে ছোট-বড় নানারকম ফোঁটায় বৃষ্টির সংগীত বেজে চলে। আর মেঘের শরীরে মেঘ ঘনায়। বিজলী চমকালে আমি দেখি, রুনিদের চাল থেকে চুন-সুরকি-কাঠের টুকরা খুলে পড়ছে। চুন-সুরকির স্তূপ জমে ওঠে। আর সেখান থেকে এক বিড়াল মুখ বের করে ডেকে ওঠে!
গাছপালা-বাড়িঘর যাবতীয় কাঁপিয়ে কাছেপিঠেই কোথাও বাজ পড়ে। কিন্তু ওই বিড়াল আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, আমি অন্যদিকে মনোযোগী হই না। ফলে রুনিদের প্রাচীন ঘরটা ধসে পড়ার শব্দও আমার কানে আসে না। হয়তো ওটা বাজ পড়ার শব্দও হতে পারে।
ঝড়ো-হাওয়া প্রচ- দাপট নিয়ে মেঘেদের ঘনঘন ডেকে আনে আর বিজলী চমকায় দুই চক্ষু অন্ধ করে দিয়ে। আমি রুনিকে ডাকার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমার গলা ফুটে কোনো শব্দ বেরোয় না। আমি শুধু অনুভব করি, পানির পাম্প দিয়ে অসংখ্য বিড়াল ওঠানামা করছে। আর বিড়ালদের পদশব্দে একটা প্রাচীন বাড়ি ভেঙে পড়ছে।
আমার হঠাৎ মনে পড়েÑ আমি বিড়ালদের নিয়ে না-ভেবে ওই নদী নিয়ে ভাবতে পারতাম। রুনিদের বাড়িতে আসার সময় যে বরফ-গলা-নদী দেখেছিলাম। আদতে ওটা ছিল একটা সংকেত। আর নদীটা ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লেখক জহির রায়হানের নদী। আমি যদি একবার ওই নদীর কথা রুনিকে বলতাম। মাত্র একবার! ‘বরফ গলা নদীর’ দৃশ্যাবলি নিয়েও যদি একটিবার কথা বলতাম দুজন! তা হলে হয়তো এই ঝড়-জলের তা-ব আমরা এড়াতে পারতাম। আমাদের নিশ্চিত অথচ অপঘাত-মৃত্যুও হয়তো আটকাতে পারতাম। দুঃখের বিষয়, বিদেশি বিড়ালদের নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, ওই নদীর কথা একেবারেই স্মরণ হয় নাই।
ফের তুমুল ঝড় আর বৃষ্টিতে আক্রান্ত হলে আমার আর রুনির যুগপৎ মনে পড়েÑ নদীটার নাম ছিল ‘বরফ গলা নদী’। মফস্বলের নদীগুলোর এমন আজগুবি নামই হয়!

Category:

ঘাস কবুতর ও শেখ মুজিব

41ইমরুল ইউসুফ : সিঁড়ি বেয়ে রক্ত গড়াতে গড়াতে সবুজ ঘাসের গোড়ায় জমা হতে থাকে। কিন্তু এক জায়গায় বেশিক্ষণ থেমে থাকে না। রক্ত গড়াতে থাকে। ঘাসের গোড়ায় গোড়ায় জড়িয়ে যেতে থাকে রক্ত। ঘাসগুলো তখন কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। দম বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। গড়িয়ে আসা জিনিসটি কেমন জানি ভারী ভারী। আঠা আঠা, চটচটে। রংটাও কেমন জানি। খুবই অচেনা। আগে কখনও এমন কিছু গড়িয়ে ঘাসের গোড়ায় যায় নি। ঘাসের ওপরে পড়েনি। ঘাস চেনে পানি। সেই পানি তরল, নরম, রংহীন। কিন্তু কী যে শক্তি সেই পানিতে। পানির ছোঁয়া পেয়েই ঘাসগুলো তরতাজা হয়ে ওঠে। আনন্দে মাথা উঁচিয়ে উঁচিয়ে আকাশ দেখতে থাকে। বাতাসের ছোঁয়া পেতে থাকে। দুলতে থাকে দোলকের মতো।
একটি কবুতর পেখম মেলে দুলতে দুলতে নিচে নেমে আসে। দেখে লাল রঙের কিছু একটা গড়িয়ে আসছে তার দিকে। দূর থেকে অনেকটা সাপের মতো দেখা যাচ্ছে। ওটা কি সাপ? না! তারপরও কবুতরটি এক পা দু পা করে পিছন দিকে পেছাতে থাকে। আর রক্তের ধারা এগিয়ে যেতে থাকে তার দিকে। এখন মুখোমুখি রক্তের ধারা ও কবুতর। কবুতরটি বাকবাকুম করে ডাকতে থাকে। উড়ে উড়ে সেখানে ঘুরতে থাকে। দেখতে থাকে রক্তের বয়ে যাওয়া। কোথায় যাচ্ছে রক্ত? এই মুহূর্তে কী করা উচিত কবুতরটি ভেবে পায় না। শুধু উড়তে থাকে।
উড়তে উড়তে বসে একটি গাছের ডালে। ওটাকে গাছের ডাল বলা যাবে না। বলা ভালো পাতা। কবুতরটি একটি পেঁপে গাছে বসেছে। গাছটি তার অতি প্রিয় একজন মানুষের লাগানো। মানুষটি অসম্ভব পেঁপে ভক্ত। সকালের নাস্তায় পাতলা রুটির সঙ্গে পাঁচফোড়ন দেওয়া পেঁপের সবজি। আর কিছুই লাগে না তার। আর পাকা পেঁপে তার কাছে অমৃত। এজন্য বাড়ির দেয়ালের পাশ দিয়ে তিনি অনেক পেঁপে গাছ লাগিয়েছেন। শুধু কি পেঁপে গাছ। কত গাছ যে তিনি লাগিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। ফলের গাছ। ফুলের গাছ। ঔষধি গাছ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবুতরটি বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ পছন্দ করে। শুধু কি ওই কবুতরটি? না, এই বাড়ির প্রত্যেকটি কবুতরের কাছে তিনি খুব প্রিয় একজন মানুষ। প্রত্যেকটি গাছের কাছেও তিনি অতি প্রিয়।
কবুতর দলের প্রিয় মানুষটি এখনই আসবেন। হাত উঁচিয়ে ছিটিয়ে দেবেন খাবার। তিনি মোটা ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়ে দেখতে থাকবেন কবুতরদের খাবার দৃশ্য। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে একে অপরের গায়ে মুখ ঘষে নেওয়ার দৃশ্য। একজোড়া কপোতের ডিগবাজি খাওয়ার প্রতিযোগিতা। কিংবা কান পেতে শুনবেন বাকবাকুম বাকবাকুম ডাক। কবুতরগুলো ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে মানুষটির জন্য। একে অপরের দিকে তাকিয়ে ডাকাডাকি করছে। কবুতরের খোপের মধ্য দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। কই, তিনি তো আসছেন না। একটি কবুতর বলল, আসবেন। এখনই আসবেন। কেবল তো ভোর হলো। ওনার হয়তো এখনও ঘুমই ভাঙেনি। ঘুম ভাঙলেই তিনি আমাদের কাছে আসবেন। খাবার দেবেন।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও কেউ তাদের খাবার দিতে আসে না। বাড়তে থাকে কবুতরদের অস্থিরতা। ক্ষুধায় পেট চো চো করতে থাকে। আর সহ্য করতে না পেরে প্রায় সব কবুতর ওড়াউড়ি শুরু করে। খাবার খুঁজতে থাকে। সেই সাথে খুঁজতে থাকে প্রিয় মানুষটিকে। কিন্তু না, কোথাও নেই প্রিয় সেই মানুষটি। তিনতলা বাড়ির আশপাশে একজনও চেনা মানুষ নেই। সবাই তাদের কাছে অচেনা। সবার পরনে কালো পোশাক। হাতে অস্ত্র। মানুষগুলো এখানে দাঁড়িয়ে কী করে? একটি কবুতর বলে, আরে চল চল আর দেখতে হবে না। দেখছিস না ওদের হতে অস্ত্র। ওই অস্ত্রের একটি ফায়ারই যথেষ্ট। আমাদের আর বাঁচতে হবে না। এই কথা বলেই কবুতর দল বাড়ির পিছন দিকটায় চলে যায়।
বাড়ির ঠিক পিছন দিকটায় একটি রান্নাঘর। কবুতরের ঘরটি ঠিক ওই রান্নাঘরের পাশেই। কবুতরাগুলো ভাবেÑ ওই রান্নাঘরে যদি ঢোকা যেত তা হলে কিছু না কিছু খাবার পাওয়া যেত। এই ভেবে কবুতরগুলো উড়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে আসে। দেখে দরজা বন্ধ। কবুতরগুলো হতাশ হয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। সামনে একটু এগিয়ে ডান হাতে গাড়ি রাখার ঘর। এর ঠিক বাম হাতে চিকন রাস্তা। ওই রাস্তা ধরে সোজা সামনের দিকে পা বাড়ালে বাইরে বের হওয়ার পথ। রাস্তার দুপাশে সবুজ লকলকে ঘাস। বিভিন্ন ফুলের গাছ। কবুতরগুলো ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে থাকে। দু-একটি দানা খুঁজে পেয়ে তাদের সেকি আনন্দ!
এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। একটি কবুতর এমনভাবে বিকট শব্দ করে ওঠে যে বাকি সবাই ভয় পেয়ে যায়। ওড়াউড়ি শুরু করে। বলে, এখানেও রক্ত! বাড়ির চারদিকে এত রক্ত কেন? লাল লাল খাবলা খাবলা রক্ত। বেশ কিছু সময় আগে যে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল সব। সেই রক্তের ধারা থেমে গেছে এখন। একটি কবুতর বলে, এটি আমি সেই সকালে বাড়ির সামনের দিকে দেখেছি। এখানেও দেখছি সেই রক্ত। কিন্তু জমাট বাঁধা। এমন অবস্থা দেখে কবুতরগুলো ভয়ে উড়ে আরেটু সামনের দিকে যায়। দেখে আরও কিছু অচেনা মানুষ। তারা একজন দুজন তিনজন… অনেক মৃত মানুষকে বাড়ির ভিতর থেকে টেনে টেনে বের করছে। সবার শরীরে রক্ত। কাপড় রক্তে ভিজে জবজব করছে। চেহারা বিকৃত, মলিন। তবে ভীষণ শান্ত। এর মধ্যে একজন মানুষকে তাদের খুব চেনা। সেই সকাল থেকে এই মানুষটিকেই তারা খুঁজছে। কিন্তু মানুষটা যে শুয়ে আছেন। এই মানুষটিকে তারা কখনই শুয়ে থাকতে দেখে নি। তার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে রক্তে। পরনের সাদা-কালো চেকের লুঙ্গি। গায়ের সাদা গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি। কালো রঙের সিগারেটের পাইপ, দিয়াশলাই। সবই রক্তে ভেজা।
এমন দৃশ্য দেখে কবুতরগুলোর চোখও ভিজে ওঠে। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে বঙ্গবন্ধুর দিকে। কিন্তু অচেনা সেই মানুষগুলো তাদের সামনের দিকে যেতে দেয় না। হাত পা ছুড়ে, বন্দুকের নল উঁচিয়ে হই হই করে তাড়িয়ে দেয়। তারা বেশি দূরে যায় না। গাছের ডালে বসে দেখতে থাকে। শান্ত সৌম্য ওই মানুষটির বাম হাতটা বুকের ওপর ভাঁজ করা। ১৮টি গুলির আঘাতে তার বুক, পেট, পা, হাত ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। একটি গুলি লেগেছে তার মাথার ঠিক পিছনে। ৯টি গুলি চক্রাকারে বিদ্ধ হয়েছে বুকের ঠিক নিচে। একটি বুলেট ডান হাতে তর্জনীতে লাগার ফলে আঙুলটি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সাথে ঝুলে আছে। লম্বা চওড়া ওই মানুষটিকে নিয়েই সবাই যেন একটু বেশি ব্যস্ত। সবার চোখে-মুখে ভয়। যেন মৃত এই মানুষটি এখনই উঠে দাঁড়াবে। হুঙ্কার দিয়ে বলবে, এখানে কী চাও?
মৃত ওই মানুটিকে নিয়ে কিসের এত ভয় ওদের? আসলে কী চায় তারা। বোধহয় বঙ্গবন্ধুকে লুকিয়ে রাখতে চায়। এখান থেকে সরিয়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে চায়। তা না হলে বড় একটি বাক্স আনা হলো কেন? ভাবতে থাকে কবুতরগুলো। দেখে ওই বাক্সের মধ্যে তাদের প্রিয় মানুষটিকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সাত-আটজন মানুষ কিছুতেই যেন লাশটি বাক্সে তুলতে পারছে না। লাশটি কেবলই তাদের হাত থেকে সরে সরে যাচ্ছে। একবার মাথার দিকটি ঝুলে যাচ্ছে। আরেকবার ঝুলে যাচ্ছে মাজার দিকটি। আবার কখনও পায়ের দিকটি। একটি দেশের জন্মদাতার লাশ তো একটু ভারীই হবে। অনেক কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে লাশটি ভরে ফেলা হলো ওই বাক্সে। বাক্সের ওপরের অংশ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। তারপর কোণায় কোণায় ঠোকা হলো কয়েকটি পেরেক। কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দে কবুতরগুলো কেঁপে কেঁপে উঠল। যেন তাদের মাথা থেতলে দেওয়া হচ্ছে পাথরের সাথে।
কফিনের সাথে সাথে কবুতরগুলোও যাচ্ছে। একবার ডানে। একবার বামে। খোলা উঠোন পেরিয়ে রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গাড়ি। এর মধ্য থেকে একটি গাড়িতে তোলা হলো তাদের প্রিয় মানুষটিকে। কফিন থেকে তখনও টপটপ করে রক্ত পড়ছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঘাসে ঘাসে। সবুজে সবুজে। সারা বাংলাদেশে।
লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

Category:

আর্নিলা ও আমাবুড়ি

একদিন গভীর রাতে মুক্তিবাহিনী মাইন ফুটিয়ে উড়িয়ে দিল নাগলা ব্রিজ। দুপক্ষের তুমুল গোলাগুলি হলো। মুক্তিবাহিনীর কাছে টিকতে পারল না রাজাকার। জিপ নিয়ে উল্টো পথে পালিয়ে গেল মিলিটারি। পাকবাহিনীর যোগাযোগের পথ বন্ধ হলো।

50ঝর্ণা রহমান: এপ্রিলের দুপুরের তাতানো রোদ্দুরে এক চিলতে নালার মতো খালটির পানি একেবারে তপ্ত হয়ে আছে। এই খালটি না-কি একসময় ছিল দর্ষা নদীর শাখা। সে কোন আমলে তা জানে না আর্নিলা। কালে কালে নদী শুকিয়ে খাল, এখন খাল শুকিয়ে নালা।
আজ উপবাসে আছে আর্নিলা। খুব ক্লান্ত লাগছে। রোদে গরম হয়ে উঠেছে মাথা। বাঁ দিকের কুঁচকে যাওয়া চোখ আর গালের পোড়া চামড়াটা যেন আগুনের ছুরি দিয়ে চিরে দিচ্ছে কেউÑ এমন চিড়বিড় করে জ্বলে। তারপরেও চোখ বুঁজে একবার নিলীনার মুখটা স্মরণ করে আর্নিলা। তালের শাঁসের মতো মুখ। সব সময় মুখটাকে মনে হতো জলে ভেজা। টলটলে। এবারের উপবাস নিলীনার জন্য পরম প্রার্থনায় উৎসর্গ করেছে আর্নিলা। চোখের কোণাটা একটু জ্বলে ওঠে। ওড়নার প্রান্ত দিয়ে ডান চোখটা চেপে ধরে আর্নিলা। গরম এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। গলিত বাঁ চোখটা দিয়ে এমনিতেই মাঝে মাঝে ঘন রস নেমে আসে। তার কোনো অনুভূতি টের পায় না আর্নিলা। শুধু মুছতে গিয়ে বখাটে হিরুর শুয়োরের মতো ছুঁচালো ঠোঁট ঠেলে বেরিয়ে আসা হিংস্র চেহারাটা মনে পড়ে। অথচ এই চেহারাটাই একদিন ভালো লেগেছিল আর্নিলার।
আজ শুক্রবার। মাঝখানে আর একটা দিন আছে রোববার আসতে।
এই রোববারটি পুণ্য রোববার। ইস্টার সানডে। প্রভু যিশুর পুনরুত্থান দিবস। বিস্তর কাজ জমে আছে বাড়িতে। মা একা একা সব সামাল দিতে পারে না। রোববার চার্চে যেতে হবে। সেদিন ফাদার নিকোলাস ওদেরকে বাইবেল থেকে সদাপ্রভু ঈশ্বরের বাণী পড়ে শোনাবেন। শোনাবেন প্রভু যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার কাহিনি। তারপর শোনাবেন কেমন করে মানুষের মঙ্গলের জন্য ত্রাণকর্তা যিশু মৃত্যুর ঘুম ভেঙে কবর থেকে উঠে এলেন।
দু’কান ভরে মহান যিশুর কাহিনি আর ধর্মীয় বাণী শুনে শুনে ওরা সবাই মাথা দোলাবে। বুকে ক্রস এঁকে ফিস ফিস করে বলে উঠবে, প্রভু আমাদের দয়া করো। আকাশ আর মাটির ঐশ্বর্যকে আমাদের জীবনে সত্য করে তোলো। আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করো। আর ঝু-ু-বুড়ো কেউ তখন মাথা দোলাতে দোলাতে আপন মনে বিড় বিড় করে বলবে সাংসাবেক-সাংসাবেক-সাংসাবেক। গাছের ফাঁক দিয়ে আকাশে তাকিয়ে টাটারা রাবুগা, সালজং, চোরাবুদিÑ এসব আদি দেবতার নাম জপতে থাকবেন বুড়িরা। এ দেবতাদের কেউ বিশ্বজগতের ¯্রষ্টা, কেউ সূর্য-দেবতা, কেউ ফসলের রক্ষাকর্তা। আর্নিলা আকাশে মুখ তুলে গনগনে সূর্যের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলে, হেই সালজং, এত রাগ কেন তোর? সব জ্বালাইয়া দিবি না-কি হ্যাঁ?
পা থেকে বুনো ঘাসের চপ্পল জোড়া খুলে নিয়ে খালের পানিতে পা রাখে আর্নিলা। রোদ্দুরে তাতানো পানি। তার পরেও ক্লান্ত ক্ষুধার্ত শরীরে শুকনো পায়ে পানির ছোঁয়া ভালো লাগে আর্নিলার।
আর্নিলাকে সবাই কাটছাট করে ডাকে নিলা। তবে ১৯ বছর আগে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ফাদারের দীক্ষা প্রদানের সময় নামকরণ খাতায় ওর পুরো নাম লেখা আছে। আর সপ্তম শ্রেণির পর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলেও, এখনও স্কুলের খাতায় আছে ফাদার রবার্টের দেওয়া নিলার পুরো নামÑ আর্নিলা আগাথা চাম্বুগং। চাম্বুগং আর্নিলার মায়ের পদবি। আর্নিলার মা পার্মিলা চাম্বুগং ছিল বলেই ওরা কটি প্রাণী যেন এখনও বেঁচে বর্তে আছে। নইলে ওদের আদি ধর্ম ‘সাংসাবেক’ বা আদি বুলি ‘আচিক ভাষা’র মতো ওরাও কবে হারিয়ে যেত। হালুয়াঘাটের গাজীর ভিটা গ্রামে অনল ছিশিম-এর বউ পার্মিলা চাম্বুগং-এর দুখানা মাটির কুটির বসানো এই ছোট্ট জংলাঝুপি বাড়িটির অস্তিত্বও আর থাকত নাÑ ওটার নাম-নিশানা বদলে ভিন্ন চেহারার বাড়ি হয়ে যেত। যেমন বদলে গেছে সুবোধ অনাদি আর ডেভিডের বাড়ি। ওগুলো এখন রংচঙা টিনের ঘর, নকশি দেয়াল, পাকা উঠোন নিয়ে পিকনিক স্পট হয়েছে।
কিন্তু ভিটাবাড়িটি আঁকড়ে ধরে রাখতে পারলেও বাড়ির হালটে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী পুরনো নাগেশ্বর গাছটিকে রাখতে পারেন নি পার্মিলা। বেঁচে দিতে হয়েছে। অনেক টাকার দরকার ছিল। আর্নিলার চিকিৎসার খরচ, হিরুর নামে মামলা করার খরচÑ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যও তো টাকা লাগে! পার্মিলা চাম্বুগংÑ মুক্তিযোদ্ধা সোমেনের ভগ্নিÑ তাকে তো বসে থাকলে চলবে না! যুদ্ধে নামতে হয় পার্মিলাকে।
আর আর্নিলা? সে হলো সোমেনের ভাগ্নী। মামাকে দেখেনি আর্নিলা। কিন্তু চামড়ার তলায় অনুভব করে তার রক্তের তাপ। যুদ্ধ তো তাকেও করতে হবে! মা মেয়ে দুজনই যুদ্ধ করেছে। মুখের এক পাশ বিকৃত হলেও সুস্থ হয়ে উঠেছে আর্নিলা। আর আদালতের বিচারে সাত বছরের জেল হয়েছে হিরুর।
হিরুর বাপ মকসেদ ব্যাপারির চোরাই মাদকের ব্যবসা। বনের গাছ কেটে কাঠ পাচারের বাণিজ্য।
বিস্তর টাকা হিরুর পকেটেও। হিরু গলায় রুমাল বাঁধে। কড়া সেন্ট মাখে। থুতনির তলায় এক গোছা দাড়ি। হাতে অষ্টধাতুর বালা আর গলায় পরে রুপার চেন। হিরুকে দেখায় হিরোর মতোই।
স্কুলে যাওয়া আসার পথে এক-একদিন সাইকেল চালিয়ে সাঁৎ করে আর্নিলার সামনে চলে আসত পাশের গাঁয়ের যুবক হিরু। স্কুলে যাবার পথে পকেট থেকে সে কোনো দিন আর্নিলাকে বের করে দিত এক মুঠো বকুল ফুল, কোনোদিন বুট ভাজা বা মিষ্টি পান। মাঝে মাঝে নিজের সাইকেলটাও চালাতে দিত। বেশ মজা লাগত আর্নিলার। ভালোই লাগত হিরু দাদাকে।
একদিন হিরু সাইকেল চড়িয়ে স্কুলে পৌঁছে দেবার নাম করে একটা পুরনো মন্দিরে নিয়ে তোলে আর্নিলাকে। হিরুর সাথে বেশিক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না কিশোরী আর্নিলা। হাত-পা ঠেসে ধরে মুখে রুমাল গুঁজে দিয়ে আর্নিলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হিরু। তবে একসময় বিধ্বস্ত আর্নিলাকে আর একবার দুহাতে জড়িয়ে ধরে মোবাইল ফোনে ছবি তোলার কসরৎ চালানোর সময় হাতের কাছে কুড়িয়ে পাওয়া একটা ইট দিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে হিরুর মাথায় একটা মোক্ষম ছ্যাঁচা দিতে পেরেছিল আর্নিলা। তারপর দ্রুত হিরুর সাইকেলটা চালিয়েই ফিরে এসেছিল। গির্জার পশ্চিম দিকের জঙ্গলে নেমে সাইকেল ফেলে সোজা বাড়ি চলে এসেছিল।
ঘটনা শুনে পার্মিলা মেয়েকে কাহাইলের ছিয়া দিয়ে চোরা মার মেরেছিল।
নাক টিপলে দুধ গলে তোর এত বড় সাহস!
ভালো করে বুনি-ওঠেনি-মেয়ে পিরীত করতে যায় ড্যাকরা ছোঁড়ার লগে। তাও নিজের সমাজের নয়।
কিন্তু আর্নিলার কী দোষ! ছোট মেয়ে। সরল মনে হিরুর সাথে গেছে।
তবে আর্নিলার বাপ ঘরের চালা থেকে ট্যাঁটা খুলে নিয়ে লাফিয়ে উঠেছিল। খতম করে দেবে শুয়োরের বাচ্চাকে। চেয়েছিল থানায় গিয়ে নালিশ করতে। কিন্তু পার্মিলা কিছুই করতে দেয়নি। চুপ করে যাও। মেয়ের বাপ চেপে যাক এসব। মেয়ে এখনও রজঃস্বলা হয়নি। তাই অন্য কোনো ভয় নেই। তবে ঘটনা সমাজে জানাজানি হলে মেয়েকে কোচ দিয়ে গেঁথে ফেলা হবে।
পার্মিলার কথা না শুনে উপায় নেই। বুড়ো শাশুড়ি পরমনির মাথা ঠিক নেই। পার্মিলাই এই সংসারের ‘নকনা’।
শরীর একটু সেরে উঠলে আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল আর্নিলা। একদিন পথ রোধ করে দাঁড়াল হিরু। সেদিন হিরু সাইকেলে নয়, মোটরসাইকেলে। এক পা প্যাডেলে আর এক পা মাটিতে ঠেকিয়ে রেখে দাঁড়ায়। হিরুর মাথা চাঁছা ছোলা। একপাশে গভীর ত্যারছা দাগ। সেলাইয়ের দাঁত কেলিয়ে আছে চামড়ার ওপরে। ভয়ঙ্কর দেখায় হিরুকে। প্যান্টের পকেট থেকে আস্তে-ধীরে বের করে আনে নতুন এক উপহার। ‘তোর লেইগা নয়া গিফট’ বলে হিরু বাতাসে হিস হিস করে নাচায় হাত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্নিলার সবুজ চাঁদের মতো গোলাকার শ্যামল মুখের চামড়ায় ছিটকে পড়ে তরল আগুন।
খাল পেরিয়ে আবার চপ্পল জোড়া পায়ে পরে নেয় আর্নিলা। ধানের খড় আর বুনো ঘাস দিয়ে তৈরি চপ্পল। পাহাড়ি বুনো ফল রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় নানারকম রং। রঙের চাকতিও থাকে। শুকনো খড়কুটো বা ঘাস সেই রঙে চুবিয়ে জ্বাল দিয়ে আবার রোদে শুকানো হয়। এরপর রঙিন খড়কুটো দিয়ে নকশা করে বোনা হয় চপ্পল, হ্যাট, ব্যাগÑ নানারকম শৌখিন সামগ্রী। আর্নিলা এসব হাতের কাজে খুব পটু। স্থানীয় বাজারে হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকানগুলোতে আর্নিলা তার হাতে বানানো জিনিসপত্র দিয়ে আসে। চপ্পলগুলোই ভালো বিক্রি হয়।
আর্নিলার ভেজা পায়ের পাতায় লাল টুকটুকে ঘাসের চপ্পল ফুলের মতো ফুটফুটে দেখায়।
সূর্যপুর বাজার থেকে গাজীর ভিটা তক যাওয়া-আসা করতে গিয়ে আজ যেন একেবারে জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে। বড় কড়া নিদাঘ। সকালে কাঁচকলা আর মেন্দা পাতার ঝোল দিয়ে একমুঠো বাসি ভাত খেয়েছে। সারাদিনে আর কোনো খাবার খাওয়া যাবে না। একবারে খাবে সন্ধ্যার পর। যাই হোক, তবুও দীপক চিরানের সাথে দেখা করে কথা বলে আসতে পেরেছে, তার জন্য এখন ক্লান্তিটাকে আর ক্লান্তি মনে হচ্ছে না।
হালুয়াঘাটে প্রথমবারের মতো গারো সংস্কৃতি মেলা হতে যাচ্ছে। রাংরাপাড়া ট্রাইবাল সেন্টার এই মেলার আয়োজন করবে। মেলায় দীপকের হস্তশিল্পের স্টলে আর্নিলাও তার কিছু হাতের কাজ রাখবে। দীপক শুধু রাজিই হয়নি, ওকে খুব উৎসাহও দিয়েছে। লেগে থাকো নিলা। কাজ করো। তোমার কাজ খুব ভালো। দীপকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে। মেলা শুরু হতে আরও দুসপ্তাহ। এর মাঝে আর্নিলা চপ্পল ব্যাগ টুপি এসব ছাড়াও আরও নতুন কিছু জিনিসপত্র বানিয়ে ফেলতে চায়। মেলা শেষ হলে নিজের বাড়িতেই তার তৈরি জিনিসের একটা বিক্রয়কেন্দ্র খুলতে চায়। কিছু টাকা জমলে পরে বাজারে একটা দোকান করারও চিন্তা আছে।
আর্নিলা আরও অনেক কিছু করতে চায়। পড়াশোনাটা আবার শুরু করতে চায়। আবার স্কুলে ভর্তি হতে চায়। স্কুলের পড়া শেষ করে কলেজে পড়তে চায় আর্নিলা। গ্রামে গারো শিশুদের জন্য একটা পাঠশালা খুলতে চায়। ছোট বোন মারিয়াকে শহরের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে চায়। পাহাড়িদের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করবে আর্নিলা। নিজের ভাষাÑ আচিক ভাষা রক্ষা করতে চায়। গারোদের আদি ভাষার গান ছড়া প্রবাদ এসবও সংগ্রহ করবে।
আমাবুড়িÑ আর্নিলার নানী, যার বয়স প্রায় ৮৫ বছর, মাঝে মধ্যে আদি ভাষায় বিড়বিড় করে কথা বলে ওঠে। বাড়িতে কেউ আর পুরোপুরি পাহাড়ি ভাষায় কথা বলে না। বেশির ভাগ বাংলা ভাষাই বলে। নয় মেশানো। আর্নিলা আচিক ভাষাটা জানেও না। প্রাইমারি স্কুলে টুকটাক কিছু শব্দ শিখেছিল, সেটুকুই। আমাবুড়ির কথাগুলো টুকে রাখে ও। কখনও মায়ের কাছ থেকে শুনে লিখে রাখে প্রবাদ প্রবচন ছড়া আর গান।
দাদা-দাদি নেই আর্নিলার। অনেক আগেই তারা গত হয়েছেন। দাদা-দাদি বেঁচে থাকলে এখন আর্নিলা ওদের ‘আচ্চু’ আর ‘আম্বি’ বলেই ডাকত। নিজের ভাষাটাকে মরে যেতে দেওয়া যাবে না। আর্নিলা আচিক ভাষাকে বাঁচিয়ে তুলতে চায়। নিজেকেও বাঁচিয়ে তুলতে চায়। গলিত চোখ আর পোড়া গালটাকে মনে রেখেই।
এসব চাওয়া আর্নিলার মাথার ভেতর খোপে খোপে ঠেসে ভরা আছে। কোনটা দিয়ে শুরু করবে সেটা অবশ্য বুঝতে পারছে না। যেটাই শুরু করবে তার জন্য পয়সা লাগবে। পয়সা কে দেবে? নুনভাতের পয়সা জোগাড় করতেই ওর মায়ের জান বেরিয়ে যায়। আগে তো বেঁচে থাকতে হবে। তারপর না লেখাপড়া আর মাথার খোপে ঢুকিয়ে রাখা ইচ্ছেগুলোকে বের করে আনা! কাজেই আর্নিলাকে লড়াই করতে হবে দশ হাতে। পয়সা রোজগারের কাজও করতে হবে।
আর্নিলার সহপাঠী আগ্নেস রিছিল, আঁখি রুরাম, লিনেত রেমা, সংগীতা রেমা, ক্যাথারিন, ডলি, রোজÑ এরা কেউই স্কুলের শেষ চৌকাঠ ডিঙোতে পারেনি। কোনোমতে প্রাইমারির গ-ি পেরিয়ে অথবা না পেরিয়ে ওরা সবাই শহরে চলে গেছে। বেশির ভাগই বিউটি পার্লারে কাজ নিয়েছে। কেউ কেউ সেলস গার্ল নয় তো ধনীর বাড়িতে গৃহকর্মী। কিন্তু আর্নিলাকে কে বিউটি পার্লারে কাজ দেবে? এই বিকৃত চেহারা নিয়ে কোথায় যাবে আর্নিলা?
হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে কুলুঙ্গিতে রাখা হাত-আয়না আছড়ে ভেঙে ফেলেছিল আর্নিলা।
কাটা ছাগলের মতো গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিল। এখন শুধু আর্নিলার মুখ দেখে পানাপুকুরের জল। পানাপুকুরের জলে এখন নিলীনা আর চামেলির মুখও ছোট ছোট ঢেউয়ের টুকরোর সাথে ভেসে ভেসে আসে। আবার হারিয়ে যায়।
নিলীনা, ছোট বোন নিলীনার ফুলের মতো মুখটা ভেসে ওঠে চোখে। কোথায় হারিয়ে গেলি নিলী!
আর চামেলি! চামেলি কি পার্মিলা চাম্বুগং-এর কোল থেকে ছিটকে পড়ল আর এক রাজ্যে! সবার ছোট মারিয়া এখনও অনেক ছোট। আর্নিলা ছাড়া ওকে কে মানুষ করে তুলবে? মারিয়া বড় হয়ে উঠলে কি সেও হারিয়ে যাবে কোনো পাহাড়ের আড়ালে?
দুশ্চিন্তায় মাথাটা টিপটিপ করে আর্নিলার। আপাতত বাড়ি গিয়ে শরীরটা জলে ভেজাতে হবে।
অখিল বুড়োর বাড়িটা পেরিয়ে ওদের বাড়ির সীমানায় শিমুল গাছটার কাছে আসতেই আমাবুড়ির চেঁচানি শুনতে পায় আর্নিলা। নিত্যদিনের একই জপমালা জপে যাচ্ছে আমাবুড়িÑ
‘দামাল মজাবামু মি চা আ? আঙা দো বে এন মু মি চা আ।’
উস্কু খুস্কু চুল বুড়ির। হাতের কাছে একটা টিনের খালি থালা। তাই ঢং ঢং বাজায় আর ছন্দে ছন্দে চেঁচিয়ে মরে বুড়িÑ ‘দামাল মজা বামু মিচা আ…’
বুড়ির থালাপেটানো শব্দে ওদের বাড়িটাকে মনে হতে থাকে দুগ্গা মাতার মন্দির। সারাক্ষণ কাসরঘণ্টা বাজছে। ঢংমি ঢংমি ঢংমি। ভাতঢং ভাতঢং ভাতঢং…। পাগলি বুড়ি। আমাবুড়িকে লোকে এখন মিচা বুড়ি বা ভেতো বুড়ি বলে ডাকে। সারাদিনে তার মুখে ঐ এক কথা।
Ñ ‘আজ কী দিয়ে ভাত খেয়েছো?’
Ñ ‘আমি মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছি।’
আর্নিলা মাঝে মাঝে খেপে ওঠে নানীর ওপর। হেই আমাবুড়ি, রোজ জোটে না বলে দুটা রসুনের কোয়া, খাইতে হয় নুনমরিচের বাটা, কে তোকে মুরগির মাংস দিয়া ভাত খাওয়ায়, হ্যাঁ?
ফোকলা দাঁতে হাসে বুড়ি। কিলবিল করে আঙ্গুলগুলো চোখের সামনে নাড়াচাড়া করে। নখের কোণাগুলো খোঁটে। নখদর্পণে কী দেখে বুড়ি! মুঠো খুলে গন্ধ শোঁকে। মনে হয় মুঠোর ভেতর লুকানো আছে চন্দনের টুকরো। তারপর ঘচঘচ করে উকুন ভরা মাথা চুলকাতে চুলকাতে বিড় বিড় করেÑ
‘আঙা দো বে এন মু মি চা আ।’
ভাত। ভাতের স্বপ্নই সারাক্ষণ দেখে বুড়ি।
মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেতে খুব ভালোবাসতো বুড়ির একমাত্র ছেলে সোমেন। সোমেন চাম্বুগং। কিন্তু অভাবের সংসারে মুরগির মাংস দিয়ে রোজ কে ভাত দেবে? রোজই খেতে হয় টকপাতা নয় মেন্দাশাক, বাঁশের কোড় কিংবা শুঁটকি আর বেগুন পোড়া।
একাত্তরে জুলাইয়ের দিকে একদিন খেতে বসে মুরগির মাংস চাইল সোমেন। ভালো করে পেট ভরে তাকে ভাত খেতে হবে। জোয়ান পেটটা তো ভরাতে হবে। নইলে কাজ করবে কী করে? আজ জবর কাজ আছে তার।
হুহ কাজ! কাজ আবার কী সোমেনের? সারাদিন তো পাহাড়ে জঙ্গলে টইটই। বনের মোষ তাড়ানো। কাজ কী তা জানা আছে। গজ গজ করেন পরমনি। পাতে দেন গমের রুটির সাথে মরিচে মাখানো গাছ আলু দিয়ে চ্যাপা শুঁটকির চচ্চড়ি। রাগে থালা উল্টে ফেলে উঠে গেল সোমেন।
পার্মিলার বয়স তখন তেরো কি চৌদ্দ। ‘দাদা দাদা’ চেঁচাতে চেঁচাতে সে খানিক সোমেনের পিছু পিছু দৌড়ে এলো। ম্রংপাড়ার বাঁশের বনের ঘন ঝোপটার ভেতর দিয়ে জিংলা ঘেরা অন্ধকার সরু পথটায় সোমেনের লাল ফতুয়া পরা দেহটা ঢুকে গেলে পার্মিলা ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে। আর পার্মিলাকে অবাক করে দিয়ে ভুচ্চুৎ করে বেরিয়ে এসেছিল সোমেন। চোখ ঘুরিয়ে মাথায় ঝাঁকুনি তুলে বলেছিল, ‘ঘর যা পার্মি। দিনকাল ভালো না। আমি পরে আইমু। চিন্তা করিস না।’
তারপর কয়েক দিন সোমেনের খবর নেই। তা নিয়ে পরিবারের কেউ মাথা ঘামায় না।
সোমেন অমনই। গোঁয়ার একরোখা। কাহাইলের ছিয়া পাঁই পাঁই ঘুরিয়ে বলত সব মেলিটারির মাথা ছাতু কইরা দিমু। তখন ফুলপুর হালুয়াঘাট সড়ক দিয়ে মাঝে মাঝেই আশপাশের এলাকায় মিলিটারি চলে আসত। বাজারগুলোতে হামলা চালাত। রাজাকারদের সহায়তায় ওদের প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্র নিয়ে যেত সীমান্ত ফাঁড়িগুলোতে। গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ত। মেয়ে বউরা সামনে পড়লে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে তুলত জিপে আর নয়তো বন্দুক তুলে গুলি। অসীম রিছিলের নতুন বিয়ে করা বউ চন্দনা আর কিশোরী বোন পূর্ণিমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল অসীমের বুড়ি মা আর বিধবা পিসি। ফলে গর্জে উঠেছিল ওদের অস্ত্রগুলো আর গোবরলেপা তকতকে উঠোনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকল ৪টি রক্তাক্ত নারী দেহ।
সীমান্ত থেকে পাকসৈন্যদের হালুয়াঘাট সড়কে আসতে নাগলা ব্রিজ পেরিয়ে আসতে হতো।
তাই পালা করে নাগলা ব্রিজে পাহারা দিত পাকবাহিনী আর রাজাকারের দল।
একদিন গভীর রাতে মুক্তিবাহিনী মাইন ফুটিয়ে উড়িয়ে দিল নাগলা ব্রিজ। দুপক্ষের তুমুল গোলাগুলি হলো। মুক্তিবাহিনীর কাছে টিকতে পারল না রাজাকার। জিপ নিয়ে উল্টো পথে পালিয়ে গেল মিলিটারি। পাকবাহিনীর যোগাযোগের পথ বন্ধ হলো। কিন্তু দুসপ্তাহ পরে অসীম আর সোমেনের লাশ ভেসে এলো ভোগলা নদীতে। গুলিতে সোমেনের মাথাটা ছাতু হয়ে গিয়েছিল আর অসীমের পেট খুলে বেরিয়ে এসেছিল আঁতের পোটলা। লোকে বলে নাগলা ব্রিজের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীরা রাজাকারদের অবস্থান জানার জন্য প্রথমে স্থানীয় যুবকদের সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। সেই দলে ওরা দুজনও ছিল।
অসীমের জন্য শোক করারও কেউ নেই।
সোমেনের শোকে ধীরে ধীরে পাগল হয়ে গেল আর্নিলার আমাবুড়ি পরমনি চাম্বুগং। মায়ের কাছে সোমেন মামুর যুদ্ধের গল্প শোনে আর্নিলা। আমাবুড়িটার জন্য ওর বুকের খোড়লে কেমন এক দলা বাতাস ধাক্কা মারতে থাকে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আর্নিলা তার নানীকে এই-ই দেখে আসছে। দিনমান মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে থালা পেটায় আর মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার জপ্না জপে।
আর্নিলা আমাবুড়ির সামনে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে। আমাবুড়ির বয়স কত? সারামুখে অজ¯্র বলিরেখা। খসখসে দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজের মতো মুখ। খাঁজে খাঁজে ঘাম জমে আছে। ক্লান্ত। জীর্ণ-শীর্ণ। তার সামনে একটা মাটির ঘটে পানি। কাত হয়ে পড়ে আছে। বাটিতে অড়হড় ডাল মেশানো খুদের ঝাল চাপড়ি। আমাবুড়ি তা ছুঁয়েও দেখেনি। তার ওপর বাতাসে উড়ে এসে পড়েছে ঝরাপাতা। মুরগি ট্যাক ট্যাক করছে চারপাশে। আমাবুড়ির শনের মতো সাদা জটবাঁধা চুলের ওপরেও ঝরাপাতা মরা ডাল। ছেঁড়া ময়লা ঢলঢলে একটা ব্লাউজ। তার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে বিশীর্ণ স্তন। শুকনো কলার ফাতরার মতো আমাবুড়ির বুক দুটোও বাতাসে ঝরে পড়বে যেন।
আর্নিলার মনটা ছলকে ওঠে। আহা!
চুল থেকে ঝরাপাতা সাফ করে দিতে দিতে বলে, ‘নানী ঘরে আইয়ো। ভাত দেবো তোমারে।’
উদাস তাকিয়ে তাকে বুড়ি। আর্নিলা আবার মাথায় হাত বোলায়Ñ ‘আমাবুড়ি, মিচা আ?’
এবার নড়েচড়ে ওঠে বুড়ি। থালা বাজায়। মুরগির মাংস! ভাত!
হ্যাঁ, তাই দেয়া হবে। উঠোনে ঘুরে বেড়ানো মোরগ-মুরগির দল থেকে একটাকে ধরে আজ আমাবুড়ির জন্য রান্না করে দেবে আর্নিলা।
মা কোথায়? মাকে ডাকে আর্নিলা।
‘ম্যায়া, এট্টা মুরগি ধরো ম্যায়া। আমাবুড়ি আইজকা মাংস দিয়া ভাত খাইবো।’
মাকে দেখা গেল রান্নাঘরে ধেনো মদ বানানো নিয়ে ব্যস্ত। পার্মিলার রোজগারের একমাত্র উপায়।
কয়েকটা হাঁড়িতে চোলাই-এর পাতনা দেয়া হয়েছে। গরম ভাতে ধেনো পিঠার গুঁড়ো ঢেলে দিয়ে রান্না করার পরে ঠা-া পানি মিশিয়ে হাঁড়িতে ভরে মুখ বন্ধ করে পাতনা দিয়ে রাখতে হয় চার-পাঁচ দিন। ভাত গেঁজে উঠে সরষের তেলের মতো পাতলা তরল রসে পরিণত হবে। সেটা ছেঁকে নিলেই হয়ে গেল ধেনো। আগে আর্নিলার বাপই তৈরি করত ধেনো। হাঁড়ি খুলে বিক্রিবাট্টার আগে নিজেই পেট ভাসিয়ে খেয়ে নিত। বাড়িতে না থাকলেও ধেনোর পিছনে ছুটত বাজারের শুঁড়িখানায়। খেয়ে টং হয়ে খিঁচ ধরে থাকত বাবা। তার বাদে বাড়ি এসে ঠ্যাঙাতো বউকে। চাল নেই কেন। নুন নেই কেন। ধেনো নেই কেন। ছেলে নেই কেন। কাম নেই কেন। পয়সা নেই কেন। সব নেই আর সব কেনর জন্য মাতাল অনল ছিশিমের ধাতানি খেতে হবে তার বউ পার্মিলা চাম্বুগংকে।
মারধোর খেয়ে কেঁদে কেটে আবার পার্মিলাই উঠোনো দু পা ছড়িয়ে বসে-থাকা অভুক্ত অ¯œাত সোয়ামিটাকে টেনে তুলত। মাটির চাড়ে তুলে রাখা পানি এনে ঢেলে দিত মাথায়। খাবারের সানকি তুলে দিত হাতে।
পচানি খেয়ে খেয়ে লোকটার লিভার গেল পচে। বছর পাঁচেক আগে একদিন পেট ফেটে মরে গেল আর্নিলার বাপ অনল ছিশিম। পার্মিলার চারপাশ থেকে ধেয়ে এলো আঁধার। এখন কে সংসার দেখে, কে করে চাষবাস। আয়-উপার্জনের পথ কী। পার্মিলার কোলে তখন এক বছরের মেয়ে মারিয়া। তার আগে আর্নিলার পিঠাপিঠি আরও দুই মেয়ে চামেলি আর নিলীনা। এই চার মেয়ে নিয়ে পার্মিলা কী করে সব সামাল দেয়।
আর্নিলা দেখেছে তার মা কী করে সব একা হাতে সামাল দিয়েছে। কী করে দিনমান মারিয়াকে পিঠে বেঁধে মা কখনও গরুর জাবনা গুলেছে, ধেনো মদের জন্য চাল গুঁড়ো করছে। তিতপাতা আর ফল মিশিয়ে আদা কুচি দিয়ে চাকা চাকা পিঠা বানিয়ে রোদে শুকিয়ে রাখছে। তারপর ধান কুটে বের করছে চাল। চাল জ্বাল দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে পিঠার গুঁড়ো। চুলার দাউ দাউ আগুনে পার্মিলা চাম্বুগং-এর ঘর্মাক্ত মুখ তামার প্রতিমার মতো লালচে আভায় জ্বলজ্বল করতে থাকে।
এই দেখা গেল পার্মিলাকে রান্নাঘরে, আবার চলে গেছে পুকুরে, বাড়ির পালানে, গোয়ালে, আথালে। আবার পিঠ থেকে শিশুকন্যাকে নামিয়ে তার পাগলী মাকেই আর একজন শিশুর মতো বুকে আগলে ঘর থেকে বের করে এনে বসিয়ে দিচ্ছে পেয়ারাতলায়। মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার। মাকে তখন আর্নিলার কাছে মনে হতো মাতা মেরী। এক বছরের পিতৃহীন শিশুকন্যাও যেমন, তেমনি ৮০ বছরের বৃদ্ধ জননীও। মা সবাইকেই যেন পরম আদরে শিশু যেসাসের মতোই কোলে তুলে নেন।
আর্নিলাও মায়ের হাতের দুপাশে জুড়ে দেয় নিজের দুটো হাত।
উঠোনের পাশে এক চিলতে জায়গায় বেগুন আর মরিচের চারা লাগায়।
গরু নিয়ে মাঠে খোঁটা বেঁধে দেয়। ধেনোর চাল গুঁড়ো করে। বাজার করে। মাছ ধরে। ছোট বোনটাকে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়ানি গান করেÑ
‘কই নন কই কই
ককবিচি চানাদে কই
সিরু বিচি চানাদে কই কই
বাবা গোড়া রাবানো কই কই
বাবা লারু রাবানো কই কই…’
বোনটি ঘুমো ঘুমো, তা হলে তোকে মুরগির ডিম খেতে দেব, শালিকের ডিম খেতে দেব। বাবা তোর জন্য ঘোড়া নিয়ে আসবে, বাবা তোর জন্য নাড়– নিয়ে আসবে।
শেষ দুলাইন এখন আর গায় না আর্নিলা। বাবাই নেই। কে আনবে ঘোড়া আর নাড়–!
রাত জেগে হারিকেন জ্বালিয়ে একটা খাতায় নিজের ভাষার এই গান তুলে রাখে। পুরনো বইগুলো আবার পড়ে। স্কুলের বইয়ের পড়াগুলো সব বাংলায়ই। জাতীয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত বই-ই পড়তে হয় ওদের। নইলে স্কুলের পড়া শেষ করে ওরা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না। চাকরি করতে পারবে না।
আচিক মান্দি ভাষায় তো এ দেশে কোনো চাকরি নেই। রবিন স্যারের কথা খুব মনে করে আর্নিলা। তিনি বলতেন, আমরা ব্যবহার না করলে, সংরক্ষণ না করলে একদিন এই ভাষার কোনো নাম-নিশানাই থাকবে না। কিন্তু কীভাবে ভাষার সংরক্ষণ করবে আর্নিলা তা জানে না।
স্কুলে পড়াকালীন রবিন স্যার ছোট ছোট শব্দ শিখিয়ে দিতেনÑ বল, ‘চি’। আচিক-এর ‘চি’। ‘চি’ মানে জল। ‘রংক্রেক’ মানে নুড়ি পাথর। জলের নিচে থাকে। ‘সালজং’ হলো সূর্য। ‘মিত্তে সালজং’ হলো সুরুজ দেওতা। সারাদিন কিরণ দেয়। নদীর জল সুরুজ দেওতা রঙিলা আলো দিয়ে ঝলমলে করে তোলে নদীর ঢেউ। শিমুল গাছগুলোতে লাল লাল ফুল ফুটিয়ে তোলে। মাঠে মাঠে ফসলের শীষ বের করে আনে। আর ‘জাজং’Ñ মাখন মাখা গোল ময়দার চাকতির মতো চানÑ আলো দেয় রাত্তিরে। হেরিকেন লাগে না। খ-খ করে ‘বোপ্পা’। মানে চারপাশের গাছপালা। প্রকৃতি। সেই চান্নি রাতে ‘আদুরী’তে বাতাসের ধাক্কা দিয়ে সুর তোলে বনের দেবতা। ‘আদুরী’ হলো গিয়ে মইষের শিঙের বাঁশি। কী সুন্দর সুন্দর ক্যাথা!
Ñ ‘মা, হাচ্চিক ক্যাথা আমরা কই না ক্যান রে আমা?’
মা বিরক্ত মুখে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে বলেন, ‘তুই বুঝবি সেই ভাষা?’
কেন বুঝবে না আর্নিলা। বললেই বোঝে।
বাইরে কে বুঝবে? বাজারে বুঝবে? দোকানে? স্কুলে? রাস্তায়? গীর্জায়? আপিসে ব্যাংকে হাসপাতালে? ওসব জায়গায় চলে পাহাড়ি ভাষা? আছে পাহাড়ি? পাহাড়িরা, গারোরা সব পাহাড়ের তলায় চাপা পড়ে গেছে। হুই উত্তরে আকাশ খামচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে গারো পাহাড়। ওকে নড়ানো যাবে না। ওর সাথে ক্যাথা বল গিয়ে। এখন সর।
Ñ ‘আমি কইতে চাই মা। আচিক মান্দি। মান্দি ক্যাথা।’
মা আর্নিলার মুখের দিকে কেমন এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন।
বিড়বিড় করে বলেনÑ
‘সোনা দংজা রুপা দংজা চিং নি দো
জাং খো রায়ে খাদংসনা মানসজা
বসু গ্রিমচিং বিবাল গাবজক।’
আমাদের সোনা রুপা কিছু নেই, আমাদের হাতে কিছু নেই। কিছু দিতে পারিনি তোমাদের… তারপরে যেন কী… ভুলে গেছি রে নীলা। ভুলে গেছি গানটা…
আর্নিলা মুহূর্তেই কণ্ঠে তুলে নেয় গান। ‘সোনা দংজা রুপা দংজা…’ সোনারুপার মাদুলির মতো তার গলা জড়িয়ে থাকুক এই হাচিক ক্যাথা। ভুলবে না। আর্নিলা ভুলে যেতে দেবে না। ভুলে যেতে দেবে না তার গলিত বাঁ চোখটিকে। ভুলে যেতে দেবে না নিলীনাকে। ভুলে যেতে দেবে না সোমেন মামুকে। ধরে রাখবে তার ‘আমা’কে  আর আমাবুড়িকে।
গীর্জা থেকে বনের ভেতরের আড়াআড়ি পথ ধরে হেঁটে আসে গাজীর ভিটা গাঁয়ের গারো সম্প্রদায়ের ছোট একটি দল। ইস্টার রোববারের উৎসব আজ। এ গাঁয়ের শ’দেড়েক গারো পরিবার আজ উৎসবে মেতে উঠবে। ৪০ দিন উপবাস গেছে ওদের। সকালে নিরামিষ, অল্প ভাত, নয় তো ফল দিয়ে হালকা নাশতা আর রাতে ভরপেট ভাত খেয়ে এই উপবাস। গীর্জায় ফাদার নিকোলাস এসেছিলেন আজ। বাইবেল পড়ে শুনিয়েছেন। লুক আর যোহনের পাঠ ব্যাখ্যা করেছেন। যিশু মানুষের মুক্তি চেয়েছেন। মানুষের কল্যাণ কাজ বাকি রেখে তার মৃত্যু হতে পারে না। তাই ক্রুশে বিদ্ধ দেহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া আত্মা আবার তার দেহে প্রবেশ করে। তিনি পুনরায় উঠে দাঁড়ান।
মানুষও পারে, মানুষের পরম ইচ্ছেগুলোরও মৃত্যু হয় না। তা থেকে যায় মনের গভীরে। তাকে বাঁচিয়ে তোলা যায়। চেষ্টা করলে হয়।
আর্নিলা ছোট বোন মারিয়ার হাত ধরে হাঁটে। মা প্রতিবেশী দিদির সাথে গল্প করতে করতে পেছনে আসে। আগে ওরা চার বোন একসাথে বনের ভেতর দিয়ে হৈচৈ করতে করতে বাড়ি ফিরত। আজ চামেলি আর নিলীনা নেই।
নিলীনা একেবারেই নেই।
চামেলি আছে দূরে। ঢাকায় এক বাসায় কাজ করে। মহিলা একটি পোশাকের দোকান চালান। চামেলি বাসার কাজের পাশাপাশি সেই দোকানে কাজ করে। সুন্দর জামাকাপড় গায়ে দেয়। চেহারাও সুন্দর হয়েছে চামেলির।
চামেলির কাছাকাছিই একটি বিউটি পার্লারে কাজ করত নিলীনা। অল্প বেতন। খাটনি ছিল বেশি। ১০ ঘণ্টা খাটতে হতো পার্লারে। কোনো থামাথামি নেই। পার্লারের মালিক মহিলা ছিল খা-ারনি। রক্তঘাম সব চেটেপুটে নিত ওদের। নিলীনাও চাচ্ছিল চামেলির সাথে ওই দোকানে কাজ করতে। কথাবার্তাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই একদিন বিকেলে পুলিশ এসে নিলীনাসহ পার্লারের মেয়েদের ধরে নিয়ে গেল থানায়। মালকিনসহ। গোপন খবর পেয়েছে সেই পার্লারে অনৈতিক কাজ করা হয়।
থানায় গিয়ে মালকিন খানিক চেঁচামেচি করলেন। এখানে সেখানে ফোন করলেন। কিছু বক্তব্য লেখালেখি করলেন। তারপর গাড়ি হাঁকিয়ে বের হয়ে এলেন। নিলীনাসহ ওরা চারজন মেয়ে থেকে গেল থানাহাজতে। মালকিন বলেলেন, শিগগিরই ছাড়িয়ে নেবেন। তার শত্রুরা ভুয়া খবর রটিয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে কিছু টাকা-পয়সা লাগবে।
রাত্তিরে মদ গিলে হাজতঘরে দুই পুলিশ এলো। নিলীনার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে টেনে দাঁড় করায়। কোমরের বেল্ট আলগা করে গায়ের জামা খুলে ফেলে দুজন।
পার্লারের কাজটা আজ রাত্তিরে এখানে সেরে দিয়ে যাও সোনারা। মাগনা না। পয়সা দেব।
শজারুর চোখের মতো ওদের চোখ জ্বলজ্বল করে।
নিলীনার চিৎকার শুনে কেউ এগিয়ে আসেনি। চারদিন পরে ছাড়া পেয়েছিল নিলীনা। গাঁয়ে চলে এসেছিল। দিন-রাত ঘরে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিল। নিলীনার ফুলের মতো সুন্দর চেহারাটা দিনে দিনে ফ্যাকাশে হয়ে যেতে লাগল। তারপর একদিন খেতে বসে থালার ওপরে পেট উল্টে উগরে দিল সব।
পার্মিলা চাম্বুগং সেদিন পাগলের মতো আলুথালু চুলে ছুটে বাইরে গিয়ে দুহাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করেছে।
‘হে আসমানের দেবতা, আমার মাথার ওপর এক খ- বিষের মেঘ নিয়ে এসে তাতে বাজ হানো। ওই মেঘ ফেটে বিষ ঝরুক বিষ। আমি তা পান করি। হে আদি অরণ্য, গারো পাহাড়ের জংলারাজা, আমাকে জড়িয়ে নাও বিষলতায়। আমার ফুল ফুল মেয়েগুলোকে আর বিষে বিষে জর্জরিত করো না।’
কিন্তু নীলিনা ঠিক চিনে নেয়ে জঙ্গলের বিষলতা। মুখে নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছিল। নিথর দেহ পড়েছিল রান্নাঘরের দাওয়ায়। ঠিক যেন নীল জারুলের একখানা ফুটন্ত ডাল কেউ এক কোপে কেটে এনে ফেলে গেছে পার্মিলার আঙিনায়।
নিলীনার মৃত্যুর পর পাড়া প্রতিবেশী চামেলিকে শহর থেকে নিয়ে আসতে বলেছিল।
কিন্তু রাজি হয়নি চামেলি। গ্রামে গিয়ে কী করবে চামেলি। দিদি আর্নিলার মতো অত খাটনি সে খাটতে পারবে না। অত কিছু নিয়ে ভাবতেও তার ইচ্ছে করে না। তার মালকিন ভালো মানুষ। বলেছে, দোকানের কাজ শিখে নিলে ভবিষ্যতে নিজেই একটা বুটিক শপ দিতে পারবে।
ধাই ধাই করে মাথায় বেড়ে উঠেছে চামেলি। কানে ঝোলানো-দুল, গলায় পাথরের হার পরে খোঁপায় শামুকের মালা জড়িয়ে চামেলি একটা ঝলমলে ফুলছাপের ফতুয়া গায়ে দিয়ে যখন দোকানের আয়নায় নিজেকে দেখে, তখন নিজেকে আর গাজির ভিটা গ্রামের ছোট ছোট মাটির কুটির ছাওয়া গারো পল্লীর পার্মিলা চাম্বুগং-এর নাকচ্যাপটা হাঁড়িমুখো মেয়ে বলে মনে হয় না। মনে মনে গোপন আশা আছে, একদিন লাক্স সাবানের বিউটি কনটেস্টে যাবে। ফোন করে মাঝে মাঝে। শহুরে ভাষায় কথা বলে। ইংরেজি শব্দও লাগায়। বদলে গেছে চামেলি।
মা মাঝে মাঝে ধাপ ধাপ দম ছাড়ে। আর্নিলার মনে হয়, থাক, চামেলি চামেলির মতোই থাক। হয়তো ও জীবনের একটা পথ খুঁজে পাবে।
আমাবুড়ির পাতে মুরগির রানটা তুলে দেয় আর্নিলা।
গরম ভাত থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।
কুমড়ো পাতায় মুড়ে ‘জাগুয়া নাখাম’-এর ভাপা করেছেন পার্মিলা। মায়ের পাতের কিনারে কালচে সবুজ রঙের পাতামোড়া ভাপাটি যতেœ বসিয়ে দেন পার্মিলা।
Ñ ‘খাও মা। তোমার মতন বানাইতে পারি নাই। তুমি পছন্দ করো। আমার হাতে বানানো চ্যাপা শুঁটকি মা। জাংলার পাতা। ছ্যাচা রসুনের কোয়া আর পিঁয়াজকলি আর লাল মরিচের লগে দুইখান ‘জাগুয়া নাখাম’-এর বাটনা। কৌরা ত্যাল দিয়া আগে একটা মাখ দিয়া নিছি মা। তোমারে দেখতাম। কি সুবাস উঠত!’
মা পাশে বসে গুন গুন করে কথা বলেন। ‘মা, নীলা তোমার লেইগা মুরগি রানছে। ভাত খাও মা।’
আর্নিলা থালাটি নানীর কোলের কাছে বসিয়ে দেয়।
বিশীর্ণ কালচে রগ মোচড়ানো হাতের আঙ্গুলগুলো থরথর করে কাঁপে পরমনি চাম্বুগং-এর। মুক্তিযোদ্ধা সোমেনের মা। আর্নিলার নানীÑ আমাবুড়ি।
আমাবুড়ি! আদরভরা কণ্ঠে ডাকে আর্নিলা। ঢলঢলে ব্লাউজখানা আমাবুড়ির কাঁধের ওপর তুলে দেয়।
Ñ ‘খাও আমাবুড়ি। ভাত। মুরগির মাংস দিয়া ভাত! দো বে এন মি!’
মুরগির রানটা তুলে নেন আমাবুড়ি। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেন। হঠাৎ রানের টুকরাটা মশালের মতো তুলে ধরেন মাথার ওপরে। বিড়বিড় করে কান্নাবিকৃত গলায় বলে ওঠেন। ‘সোমেন, সোমেন! দো বে এন মি চা আ…।’
আমাবুড়ি। মুক্তিযোদ্ধা সোমেনের আমা। যোদ্ধাজননী পরমনি চাম্বুগং। পাতলা ছোট্ট একটা দেহ। জড়িয়ে ধরে আর্নিলা। বুড়ি হাউমাউ করে কাঁদে। ‘আঙা নাংখো নামিন নাম্নিকা।’ আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি!
Ñ ‘কাকে বলছে? কারে নানী? কারে ভালোবাসো?’
Ñ ‘আমারে? আমার মুখ পোড়া। আমি অপয়া। ভালোবাসো আমারে আমাবুড়ি?’
বুড়ি কাঁদে। আর্নিলাও কাঁদে। ডান চোখ ভিজে ওঠে। রোদে পোড়া শুকনো গাল বেয়ে একটা গরম ফোঁটা নেমে আসে। বাম গালের চামড়ায় যেন তপ্ত ছুরি চিলিক দিয়ে ওঠে। ধারালো ছুরির তীক্ষè ডগায় চিরে যেতে থাকে বুঝি ওর ১৯ বছরের যৌবনরাঙা চামড়া। অজ¯্র বলিরেখা জমতে থাকে বুঝি আর্নিলার রৌদ্রতপ্ত কপালে। পোড়া গালের চামড়ায়। আমাবুড়ির শুভ্র চুলের আঁশ তুলো ফুলের মতো উড়ে আসে আর্নিলার মাথায় মুখে। যেন বা আর্নিলা নিজেই আমাবুড়ি। যেন সে বয়সিনী পরমনি।
আর্নিলা ছোট্ট মারিয়ার মতোই কোলে জড়িয়ে তুলে নেয় আমাবুড়ির গুটিয়ে যাওয়া পাতলা দেহখানা।
‘আঙা নাংখো নামিন না¤িœকা। আমাবুড়ি, আঙা নাংখো নামিন না¤িœকা।’ আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি।

Category:

যখন শরীর দুজনের

49নুসরাত নীলা: ‘বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে।’
উঁচু ভলিউমে বাজছে। ল্যাপটপের সাথে দুইটা তার। একটা সাউন্ড বক্সের দিকে গেছে আর একটা থেকে ল্যাপটপ তার জেগে থাকার রসদ নিচ্ছে। ওয়াইফাই অন। ফেসবুক পাতা খোলা। কাকে যেন ডাকছে ঈশানাÑ এসো এসো আমার ঘরে এসো। আবার শুধরে দিয়ে বলছে, না না, কেন আসবে, এসো নাÑ আমি দারুণ আছি। দারুণ থাকার পরে আবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করে, কেন আছিÑ এ থাকার কী মানে। মনে মনে ঠিক করে, আজ যাব, যেতেই হবে আমাকে। কোনো পিছুটান আর রুখতে পারবে না ঈশানা নিশ্চিত। তা-ও তো কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেল। রিপ্লাই আসে নি এখনও। অনেক আগে সে অনলাইন ছিল। ফেসবুক দেখাচ্ছে এগার ঘণ্টা! একটাই ভুল হয়েছে সেল নম্বর নেয়া হয় নি। ঈশানা স্ক্রল করে করে ঘুরছে। ইনবক্স দেখছে। আরও অনেকেই আছে। না কারও জন্য মন টানছে না। যার জন্য টানছে আশ্চর্যজনকভাবে আজ সে হাওয়া! অনেক দিন এমন হয়েছে লগ ইন করে তাকে সবুজ বাতি হয়ে জ্বলতে দেখেই সে তাড়াহুড়োয় অফ লাইনে গেছে! প্রতিদিন এগুলো শুনতেও ভালো লাগে না। কবি মানুষ। তাই তার কথা কবিতা সব সময় রেডি। নারীরা নিজের রূপ- যৌবন নিয়ে শুনতে চায় খুব সত্য। কিন্তু এই রূপ যৌবনের কী দাম যে একটা পুরুষকে বাঁধতে পারে না! আবার একই রূপ আরেক পুরুষ যাচে! সত্য তো এই সেই পুরুষও যেচেই নিয়েছিল। কিন্তু মধুপ সে কলিরÑ তাই রইল না। রইল না আবার কী কথাÑ রইল তো, বাড়ি রইল, গাড়ি রইল, সোনা-গহনা অই যে টেবিলে সাজানো সুস্বাদু খাবার সবই তো রইল। সে রইল না তার সব কিছু তো রইল! কাল সে মরে গেলে কে বলবে, সে আসলে ছিল নাÑ আহা আহা বেচারা কত কিছু রেখে গেছে বউটার জন্য, দিনরাত কত পরিশ্রমই না করেছে এগুলো গোছাতে! হো হো করে হাসলো ঈশানা। সত্যিই বউয়ের জন্যই তো সব! দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালোÑ প্লেনটা উড়ছে এখনও। সে যাচ্ছে স্বর্গে আর ঈশানা কিনা তার মৃত্যু নিয়ে ভাবছে! যাহ্ স্বর্গ বললে কেমন মনে হয় মৃত্যুর পর স্বর্গে যাচ্ছে সে! আবারও অট্টহাসি দিল ঈশানা। থাক আজ তাকে নিয়ে আর না ভাবুক ঈশানা। প্রতিদিন তো তাকে নিয়েই ভেবে ভেবে গেল। কূল-কিনারা মিলল না কিছুই। দেরাজ খুলে দেখল অনেকগুলো না পরা শাড়ি জমা হয়ে আছে। শাড়ি পড়তে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু কোথায় যাবে এখনও ঠিক হয় নি। যাবে এটুকু শুধু নিশ্চিত। সে বলেছিল, আপনাকে শাড়িতে আরও সুন্দর দেখাবে। ফেসবুকে কোনো শাড়ি পরা ছবি নেই। সবই পাশ্চাত্যের ঢং-এ। সে বলে এগুলোও সুন্দর তবে বাঙালি নারী মানেই কল্পনায় শাড়ি আসে! বলেছিল, ‘একদিন আপনি শাড়ি পরে আসুন আমি আপনার খোঁপায় লাল ঝোপা রঙ্গন গুঁজে দেব! আচ্ছা আপনার কি নেলপলিশ পরতে ভালোলাগে? আপনি চোখ বুঁজে থাকবেন আমি আপনার নখ রাঙাবো! শরীরের একটা আলাদা এই ছোট্ট দুনিয়া কেমন নানা রঙে নেয়ে উঠবেÑ পায়েও পরাব, অবশ্য আলতা দিলে আরও ভালো দেখাবে মনে হয়।’ সেদিন হঠাৎ মনে পড়ল স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠে একদিন হিন্দু বধূর মতো খুব সখে সেজেছিল। তার একটা ছবিও হয়তো কোথাও রয়ে গেছেÑ খুঁজলে পাওয়া যাবে। পা ভরা আলতা। পুকুরে সেই পা ডুবিয়ে কলসি হাতে ঘাটের দিকে চেয়ে আছে। সময়গুলো সুন্দর বয়ে গেছে সে সময়। অবশ্য বিষের বোঝাতো সে অনেক আগে থেকেই বইছিল! ঝুপ ঝুপ করে অনেকগুলো শাড়ি পড়ে গেল নিচে। কুড়িয়ে নিতে গিয়েই শুনল গান ছাপিয়ে ম্যাসেজ টোন বেজে উঠেছে। নিজের লেখাটা আগে পড়ল। ‘সশরীরে হাজির হতে চাই, মুগ্ধতার রেশ কতটুকু এরপরেও রয়ে যায়Ñ দেখব।’ প্রথমে উত্তর এসেছে একটা হাসির ইমো। তারপর লিখেছে, ‘মুড অফ না শাহী হেরেম আর ভালো লাগছে না? আসুন। কতক্ষণ লাগবে, শাড়ি পরবেন?’ তারপর ঠিকানা লেখা। ঈশানা লিখল, একটু সময় লাগবে, সিল্ক না সুতি বুঝতে পারছি না। ওপাশ থেকে উত্তর এলো, ‘একটা লাল টিপ দিবেন। আমি রঙ্গন খুঁজতে যাচ্ছি।’ ঈশানা লিখলো, আসছি। ওপাশ থেকে এলো, ওয়েটিং। তারপর তিনটা হার্ট ইমো। শাড়ি হাতেই অনেকক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকল ঈশানা। একবার বাথরুমে গেল সেখানে কিছুক্ষণ থমকালো। শরীরটা ভার ভার লাগছে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো। অহেতুক এতক্ষণ সেসব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তড়পাচ্ছিল! মনের জোর নেই ঈশানা। বলল নিজেকে। শুয়েও পড়ল। এ অর্থহীন, খুব খারাপ হবে। একটা মানুষের অহেতুক স্বপ্ন ভঙ্গ। ভালোবাসা ছাড়া শরীর মেলে? আবার ঈশানা শরীর মেলাতে চাইলে সে যদি বলে, ভালোবাসা চাই। মনে মনে বলল, চাইলে চাইবে। তারপর ভেসে যাব, ডুবে যাব। সুখের তেপান্তরে নয়তো দুখের ঝড়ো হাওয়ায়। ঘড়িতে এখন তিন ঘণ্টা পার হয়েছে। প্লেন ল্যান্ড করেছে মনে হয়। বলেছে, সিম নিয়েই ফোন দেবে। ঈশানা চেঁচাল, মেকি মেকি, সব মেকি। বিশ্বাস ভঙ্গকারীর মুখে অনুরক্ততার একটা বাক্য শুনতেও ভালো লাগে না। তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে আবার চেঁচাল, যাব না কেন, যাব। আমি পারব। কাউকে ডুবিয়ে আমাকে ভেসে থাকতে হবেই। কিংবা এই ভেসে থাকার অর্থহীনতাকে প্রমাণ করে ডুবে যেতে হবে। মস্ত এক টিপ কপালে দিল। মাঝখানে সিঁথি কেটেছে। বেশি উড়লে এক ফাঁকে চুলগুলো বেঁধে নেবে। রূপার চুল কাঁটাটা ব্যাগে ভরে নিল। আর কানে পরল একটা রূপার ঝুমকা। ল্যাপটপটা অফ করল। দরজার কাছে পৌঁছালে ড্রাইভার দৌড়ে এলোÑ ভাবি গাড়ি নিবেন না? নাÑ ছোট্ট করে বলল ঈশানা। এত অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে! আয়নায় নিজেকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেছে। হিসাব করল, কতদিন দেখে নি সেÑ তাও কয়েক বছর! আবার তাকে নিয়ে ভাবনা! তার সমস্ত ভাবনায় কেন সে এমন উছলে ওঠে! ‘ঈশানা’Ñ ডাকল নিজেকে, ‘শোনো ঈশানা, পুরনো বসন্ত চলে গেছেÑ এক ডালে বারবার এক কোকিল ডাকে না। সে পারলে তুমিও পারবে, বলো নিজেকে।’ ঈশানা আজ পারবে। ঈশানা আজ পেরেই ছাড়বে। মনে মনে শক্ত ঈশানা এরপর একটা বাসে চড়ে বসল। কিন্তু তারপর ঈশানার কী হলো কে জানে, বারবার বিব্রত হতে চাইল তার ঠোঁট, বলতে, ড্রাইভার বাস থামান, আমি নেমে যাব। ভিন্ন আর এক আত্মা গুড়গুড় করে উঠল মেঘের মতোÑ ঈশানা কেন যাচ্ছ? তুমি পারবে? তোমার বিশ্বাস? সব খোয়ালেÑ এ শ্রেফ গোয়ার্তুমি। তুমি শরীফ না। এতদিন নিজেকে বলে এসেছ শরীফের শিক্ষা আর তোমার শিক্ষা ভিন্ন, এই শিক্ষা তুমি নিজেই বলেছ, তোমার পরিবার তোমাকে দেয় নি, তুমি দিনে দিনে নিজ থেকে অর্জন করেছ! ঈশানা বলল, বিশ্বাস যখন কারও বাপের সম্পত্তি না, সেই তো বলেছেÑ এই ক্ষতবিক্ষত হতে হতে দেখি না একবার বিশ্বাস ভাঙার আনন্দ কেমন! এরপর খুব রেগে গেল ঈশানা। কেন পারব নাÑ এই যন্ত্রণা কেউ বুঝবে? কেউ না। ভালোবেসে মানুষ বিশ্বাস ভাঙে। বিশ্বাস ভাঙার কী এত আনন্দ! আর আজ? সেই গুড়গুড় জানতে চাইলÑ কী আজ? এই যে আজ সে পাশে বসিয়ে নিয়ে গেল কাউকে। কেমন করে নিশ্চিত হলেÑ সে তো বলেছে অফিসের কাজ! আমি জানি, আমি জানি সব। আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। কী জানো। অইযে খোলা বুক, কেঁপে উঠল সে! খোলা বুক? হুম। তার সামনে দাঁড়ানো যে মানুষটা। আমি তাকে খুব ভালো বাসতাম। কত তার হাত ধরে হেঁটেছি! পৃথিবীর পথে অইতো আমার হাঁটার শুরু! সে যখন এমন করল…! জীবনের সমস্ত বিষয়কেই দুইরকম দৃষ্টিতে দেখা উচিত ঈশানা। তুমি খুব একচোখা! কিন্তু এ চোখের সামনেই কেন এত কিছু পড়ে যায় বল? হয়তো তুমি অভাগা বলে। হয়তো তুমি একবার দেখে ফেলার পরে বারবার দেখতে চাও বলে। তুমি প্রমাণ চাও। ভালোবাসার কোনো প্রমাণ হয় না। সেই সব স্মৃতি আমার বিশ্বাস নড়বড়ে করে দিয়েছিল। মানছি, তবু তুমি পুরুষই যাচলে দেখ! এখনো তাই করছো! তুমি নিশ্চিত জান না সে কাউকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ তুমি সেই শোধ নিতে আর একটা পুরুষকে চাইছো! আমি নিশ্চিত নইÑ কিন্তু পুরুষ এমনই। আমি তার কিছু ব্যক্তিগত কাগজ পড়ে ফেলেছিলাম। এরপর আর বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। পাঁচ মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম; অসুস্থ, সে সময় সে-মানছি তার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন কি আমার ছিল না, আমার নেই? কই আমি তো আর কারও বিছানায় উঠে যাচ্ছি না! ও, তা হলে তুমি বলতে চাও তোমার প্রয়োজন মিটছে না বলেই বারবার ঠেলে তাকে এর তার বিছানায় তুলে দিচ্ছ যেন তোমার আর কোনো বিছানায় ওঠা সহজ হয়? না, না এমনটা কখনোই না। তুমি এভাবে ভেবো না। আমি খুব সহজভাবে তার সঙ্গে জীবনটা শুরু করেছিলাম। একটা ক্ষতে ভরা শৈশব-কৈশোর বয়ে নিচ্ছিলাম এ সত্য। কিন্তু আমি দম নিয়েছিলাম এইখানে এসে। মনে হয়েছিল কত দীর্ঘ দিন-রাত বারবার জীবনের বিচিত্র অলিগলি থেকে ধেয়ে আসা দুর্বোধ্য ধোঁয়া কেটে যে শহরে পৌঁছাব বলে একের পর স্টেশন বদলেছিলামÑ নিশ্চিত হয়েছিলাম আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি; আমার যাত্রা শেষ হয়েছে। কিন্তু না, একদিন আবার ধেয়ে এলো ঝড়। বুবস মানে জানি না তখনও। নেটে এই শব্দটা খুব চলছে তখন। ঘুরতে ঘুরতে চোখে এসে পড়ল বিশাল বুক খোলা ছবিটার নিচে তার কমেন্ট। বমি উগড়ে এলো। এ কী! কেন? তারপর আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম চতুর্দিক। কত ছল, কত নোংরা দিয়ে আমার সেই সবুজ পৃথিবী ভরে গেল। ফিরে যাওয়ার পথ কই? এ তো কানামাছি, গোল্লাছুট নয় যে যা খেলব না বলে-চলে গেলাম। সামনে পথ বাড়াব? পেছন খাঁমচে ধরে। আবার ঠিক দিন যে যায় না তা নয়, যায়। ধুকে ধুকে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ আমার সব এক রঙে রাঙা! কেন এমন করলে? কেন এত খুঁজতে গেলে? যেটুকু জেনেছিলে তারপরই থেমে যেতে। তোমার নিজের জন্য নিজের বেঁচে থাকা জরুরি ছিল। জানো না সব মানুষেরই একটা গোপন জগৎ থাকেÑ এরপর আর তুমি কী করে বাঁচবে বলো? আমি তো বেঁচে নেই। নিঃশ্বাসটাই কেবল পড়ছে। ভালোবাসার পরীক্ষায় হেরে গেছি আমি! তার প্রতিটা আচরণ আমার জঘন্য লাগে। মনে হয় আমি আড়াল হলেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে একটা খোলা বুকের সামনে! আমি তাই বুক লুকিয়ে রাখি। আমি তাই শরীর লুকিয়ে রাখি। আমার খুব কষ্ট হয়। সেই কোন কালের স্মৃতি হয়তো আমাকে উসকে দিয়েছিল আর একটা খোলা বুক খুঁজে পেতে। এবং কী আশ্চর্য দেখ আমি বারবার তাই খুঁজে পেয়েছি! ঈশানা, ঈশানা-কে যেন খুব দূর থেকে ডাকলÑ ঈশানা এখন তো তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ। অই স্মৃতিটার পক্ষে একটা ভালো যুক্তি দাঁড় করাও না। পৃথিবীর সব পুরুষ তার সঙ্গীর আড়ালে খোলা বুকের সামনে দাঁড়ায় না। তুমি এমনটা খুঁজে পেতে চেয়েছ বলেই পেয়েছ। তোমার ভেতর পুরুষকে একটা কদর্য রূপ দেবার প্রবণতা সেই ছোট্ট কালেই গড়ে তুলেছিলে। মনে পড়ে যে পুরুষটাকে তুমি বিয়ে করতে চেয়েছিলে খুব করে আমি নিশ্চিত পেলে তাকেও তুমি এমন কদর্যতায় আঁকতে! মোটেই না। আমি নিশ্চিত। মনে আছে তোমার? একদিন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সে একটা মেয়ের বুকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, দেখ মেয়েটা বুকের কাপড় আলগা করেছে কেমন! তুমি এখনও সেই স্মৃতি ভাবো। কেন সে তোমাকে পাশে রেখেও অন্য নারীর বুকের দিকে চেয়েছিল এই প্রশ্ন এখনও তোমার ভেতর রয়ে গেছে! আর তুমি কখনোই তাকে তোমার বুক খুলে দেখাও নি। সেই কদর্য স্মৃতি তোমাকে বলেছিল বুক লুকিয়ে ফেলতে। জীবনে একবার যে তোমরা খুব কাছাকাছি এসেছিলে সেদিনও তুমি ব্যথায় ককিয়ে উঠেছিলে, যেন তুমি পাপ করছোÑ কারণ তোমার স্মৃতি তোমাকে বলেছিলে ওগুলো পাপ। কে জানে আজ ভেবে দেখ সেদিন যদি তুমি এটাকে পাপ না ভাবতে আজ হয়তো তোমরা একসাথে থাকতে। আমি নিশ্চিত আজ তুমি তাকে জিজ্ঞেস করো, সে বলবে সেই প্রত্যাখ্যান তার ভেতর দ্বিধা তৈরি করেছিল! হয়তো এর যে একটা বিশাল শূন্যতা ছিল তার ভেতর গলে সে বেরিয়ে গিয়েছিল। পুরুষের আদিমতাকে তোমার মানতে হবে, বুঝলে ঈশানা। ঈশানা। ঈশানা শুনছো আমার কথা? পুরুষের আদিমতা, বুঝলে? ঈশানা একটু কেঁপে উঠল। তারপর দেখল সামনের দেয়ালে একটা পোট্রেটÑ দুটো হাঁস সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত। একটা টিকটিকি দ্রুত দৌড়ে সেটার আড়ালে লুকিয়ে গেল! আঙ্গুল তুলে দেখাল ঈশানাÑ রঙ্গন! ডাক্তার ফুলদানিটা দেখলেন। তোমার প্রিয় ফুলÑ প্রথম দিনেই বলেছিলে। তোমার ভালো লাগবে ভেবে সাজিয়েছি। এরপর ঈশানা চোখ মেলে ঘরটা দেখল। বলল, আমার অন্য কোথাও যাবার কথা ছিল! কোথায়? ডাক্তার প্রশ্ন করলেন ঠিকই উত্তর নিলেন না। বললেন, আজ আমাদের সিটিং। আমি তোমাকে রিমাইন্ড দিয়েছি। তুমি বললে তুমি তৈরি হচ্ছো। খুব সম্ভবত তখন তুমি কোনো শাড়ি খুঁজছিলে। ঈশানা বলল, না অন্য কোথাও। তারপর একটু থেমে বলল, এটা খুব সহজ নয় ডাক্তারÑ পুরুষের আদিমতাকে বোঝা। কারণ আমি পুরুষ নই। আমি যুক্তি দিয়ে যতটা বুঝি আবেগ দিয়ে তার চেয়ে বেশি। প্রতিদিন সে ভালো আর সে ভালো না এই বিচার করার জ্বালা আপনি বুঝবেন না। সবাই ভাবে আমি এই সম্পর্কটা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাই তাই বারবার সে ভালো না ভালো না বলে চেঁচাই। তাকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, কখনও যতটা উদ্দেশ্য নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো। তার প্রতি আমার যে ঘৃণা তা আর একটা পুরুষের দিকে প্রেম হয়ে বয়ে যেতে চাইছে। ঘৃণা আর প্রেম খুব পাশাপাশি থাকে, জানেন তো। যখন দেখি না সে ভালোÑ নিজেকে বলি আমিও ভালো থাকতে চাই। তার ভালো থাকা তার জন্য যতটা জরুরি আমার জন্য তার চেয়ে বেশি। আর যেটা বলছিলেন, হ্যাঁ সেই প্রত্যাখ্যান ওর ভেতর দ্বিধা তৈরি করেছিল সত্য; কিন্তু আমাকে তা বিচিত্র প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তা হলে কি আমি ধরে নেব, শরীর ছাড়া আমাকে কেউ ভালোবাসবে না? সমর্পণে আমার হাত আর ফাঁকা থাকবে না? কিন্তু কী হলোÑ সময় আমাকে বুঝিয়ে দিল শরীর দিয়েও কোনো পুরুষকে ধরে রাখা যায় না! যে থাকতে চায় সে কারণ ছাড়াই থাকে। আমি সেদিনটা ভাবতে পারি খুব। আমি ছুটে যাচ্ছি এক শহর থেকে আরেক শহরে। কেন? কারণ আমি হাত খুঁজে পেয়েছি। একটা সুনসান গলি। গলির মোড়ের দোকানে গান বাজছে। আমার পায়ে হলুদ এক জোড়া জুতো। জুতোটা এত সুন্দর! সে বলল, এটা বাইরে রাখা যাবে না! খুব ক্ষিপ্রতায় তুলে ঘরের খাবারের টেবিলের তলে লুকিয়ে ফেলল সেটা। ভেতরে যখন গেলাম সমস্ত ফাঁকি! ঘর এত অন্ধকার। অথচ সে বলেছিল তার ঘর আলো দিয়ে ভরা। বলেছিল সব সময় সে তার ঘর গুছিয়ে রাখে। দেখলাম চারপাশে ছড়ানো ময়লা! একটা এটাচ বাথ আছে, সেটাই সে ব্যবহার করে। বাথরুমটা নোংরা আর মাকড়শার জালে ভরা। যখন বললাম কই বলেছিলে এটাই তুমি ব্যবহার করো। সে বলল, হ্যাঁ করি তো। আমি দেখলাম এটার লাইট কাটা। অনেকদিন এখানে আলো জ্বলেনি! সব কিছু কেমন করে মিথ্যে হয়ে যায়Ñ এক এই শরীর পাওয়ার জন্য এত ছল! তাকে বোঝাতামÑ দেখ আমি এমন নই। সে বলত, হ্যাঁ সেটাই; তুমি তো কেবল উদারতা দেখিয়ে যাচ্ছÑ আমিই খারাপ! তারপর একদিন ফাঁকা রাস্তায় ছেড়ে চলে গেল। তাকে বোঝান গেল না উদারতা নাÑ আমি ভালোবাসা নিয়ে এসেছি। রাগে এতটাই জ্বলছিল তার পায়ের একটা জুতো ছিঁড়ে গেছিলÑ সে সেটা ছুড়ে দিয়ে হেঁটে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল! পেছন ফিরে আর দেখল না। তার জানতেও ইচ্ছে হলো না আমি এবার কীভাবে পৌঁছাব! এই যে এতদূর এলাম সব হাঁটা মিথ্যে! একটা মেয়ে এক খোলা বুক দেখেছিল। হ্যাঁ সেও বুঝেছিল তারও শরীর আছে। কিন্তু সে শরীর সে তুলে রেখেছিল সময়ের জন্য। তার কাছে সত্যের ব্যবচ্ছেদকারীর দাম ছিল না। এ তার অসুস্থতা? হ্যাঁ, আপনি বলবেন অসুস্থতা। আপনি বলবেন, পুরুষের আদিমতা! কিন্তু ঈশানা তুমি নিজেই বলছো তোমার ভেতরে যে ঘৃণা তার বিপরীতেই রয়েছে ভালোবাসা। আর সেটা অবশ্যই পুরুষের জন্য। না। ভালোবাসা নেই। এখানে কেউ ভালোবাসে না। কারণ আমি যেখানেই যাই আমাকে ওই যোনি বলেই ভাবা হবে। আমি একটি মাংস পি-। এর বেশি কিছু না। কিন্তু ডাক্তার, যদি পুরুষের আদিমতাকেই বুঝতে হয় তবে নারীরটা নয় কেন? নারী হিসেবে হাওয়াই আগে আদমকে প্রলুব্ধ করেছিল এবং তারা দুজনেই এরপর একসাথে নিজেদের নগ্নতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছিল। শরীর পুরুষের একার ছিল না। একার এখনও নেই। কিন্তু আপনি কি বলতে চাইবেন আমি নষ্ট হয়ে গেছি? পচে গেছি? আলুথালু হয়ে গেছি? তবে একই রূপ কেন অন্যজন যাচে? কাকে বলে তবে পুরুষের আদিমতা? ডাক্তার চেয়ে আছেন ঈশানার মুখে। বললেন, কী বলতে চাও তুমি? কিছুই না। দৃঢ় হয়ে উঠল ঈশানার কণ্ঠ। রগগুলো ফুলে উঠল গলার। চোখের পাতা নিশ্চল হয়ে রইল কিছুক্ষণÑ পড়ল না। বলল, শুধু এটুকুই, আমার অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল। যাই নি। তার অর্থ এই না আমি কখনও যাব না। আমি চাই এভাবে একইভাবে একটি কোনো পুরুষ এসে আপনাকে বলুক, নারীর আদিমতা নিয়ে! আমি এখানে আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি এই লজ্জা যার যার! পুরুষের একার, নারীর একার। আর একটা কথা ভালোবাসা এখনও খুব মিষ্টি শব্দ ডাক্তার। যে এর নাগাল পায় সেই খুব সুখি।

Category:

জয় বাংলা

Posted on by 0 comment

গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে কিছু সময়ের জন্যে।  এবার ভারী বুটের আঘাত।দরজা নেহি খোলো তো গুলি চালাতে বাধ্য হবো। বলেই ধুম ধুম করে দরজায় লাথি পড়তে থাকে।

41আনিস রহমান: বাড়িটি ভারী সুন্দর। দেখতেই চোখ কাড়ে। দোতলা, অনেকটা পুরনো ছাদের। তবে অভিজাত দেখতে। এ পাড়াটিও তাই। অভিজাত সব পরিবারের বসবাস। ডেভেলপারদের আনাগোনা এখনও শুরু হয়নি তেমন। তাই প্রায় সবগুলো বাড়িই এখনও তাদের বনেদি ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ বাড়ি দোতলা অবধি। তিনতলা-চারতলা চোখে পড়ে না বললেই চলে। কদাচিৎ কেউ কোনো ফ্লোর ভাড়া দেয়। তাও নিজেদের মধ্যে। বার বাড়ির কিংবা অপরিচিত কেউ ভাড়া পেয়েছে এমন নজির নেই।
দোতলা বাড়িটি চারজনের সংসার। তবে ঠিকে ঝি, বাধা ঝি, দারোয়ান মালি ড্রাইভার মিলে সাত-আটজনের বাস। বাড়ির গেট ছুঁয়ে বেড়ে উঠেছে বগনভেলিয়ার ঝাড়। ঝাপানো গাছটি। টানা বারান্দা অনেকখানি ঢেকে রেখেছে হাওয়া মিঠাই রঙের ফুলগুলো। উত্তরের শেষ প্রান্তে গোটা কয়েক সুপুরি গাছ জড়াজড়ি করে আছে। ওদের পাশ ফুঁড়েই আকাশে মাথা তুলেছে কয়েকটা রয়েল পামের চারা। ওদের জড়িয়ে আছে মানিপ্ল্যান্টের ঢাউস সব পাতা। তার আশপাশে বৃত্তাকারে এবং দেয়াল ঘেঁষে সার করে রাখা গোলাপের টব। সাদা-কালো হলুদ, লাল, কমলা অনেক পদের গোলাপ দিয়ে সাজানো টবগুলো। বাহারে সব গোলাপ রং ছড়িয়ে। দারুণ এক বিভার সৃষ্টি করেছে বাড়ির সামনে ছোট্ট চাতালজুড়ে। বাড়ির দেয়ালে মিষ্টি রঙের ডিসটেম্পার। ¯িœগ্ধভাব দেয়ালজুড়ে।
পেছনে পরপর কয়েকটি নারকেল গাছ। বাড়ির সামনে-পেছনে দু কোণায় দুটো আম গাছ। গাছ দুটো এখনও প্রৌঢ়ত্বে পা দেয়নি। তারুণ্যের লাবণ্য গাছের পাতা-ডাল সবকিছুতে। তারপরও বাড়িটি যেন কী এক শূন্যতায় ভরা। সারাদিনেও কোনো লোকের আনাগোনা নেই। বাধা ঝি কামরুন বেলা শুরুতেই নিচের কন্টেইনারে রাতের বাসি-পচা থেকে শুরু করে করে আনাজ-সবজি ও ডিমের খোসা সব ঢেলে যায়। ঠিকে ঝিটাকে দেখা যায় দুপুর নাগাদ ছাদে উঠতে। কাচা কাপড়গুলো রোদে মেলে দেয় তখন। কখনও কখনও পামেলা ওঠে ছাদে। এ বাড়ির বড় মেয়ে ও। কোনো একটা কাপড় কেচে দুহাতে মেলে ধরে ছাদময় ঘুরতে থাকে। সামনে যায় পেছনে যায়। ডানে যায়, বাঁয়ে যায়। আর আনমনে তাকায় এদিক-ওদিক। চোখ দুটো ওর বড় রুক্ষ। যখন তাকায় দৃষ্টিতে রাজ্যির বিরক্তি। মুখে হাসি নেই। কথা নেই কারও সঙ্গে। ওদিকে কাপড়টা একইভাবে ঝুলতে থাকে দুহাতের আঙুলের চাপ খেয়ে। একেক জায়গায় যায়। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ফের ঘুরে ঘুরে আরেক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। এভাবে মনের খেয়ালে কখন কোন তার জায়গা হবে কাপড়টির তা কেবল পামেলাই জানে। কখনও চালনে শুকোতে দেওয়া ধনে, চালের গুঁড়ো নেড়েচেড়ে দেয়। কখনও জায়গা সরিয়ে দেয় কী মনে করে। যেন স্থবির একখ- মেঘ ওর চোখেমুখে। বোধের জায়গায় বিরাট শূন্যতা।
মাঝে-সাঝে বাদ যায়। এছাড়া প্রায় সবদিনই রিনি হাসানকে দেখা যায় ছাদে। সাধারণত শেষ বেলায় ছাদে ওঠে ও। এসেই গোটাকয়েক কাপড় তার থেকে তুলে নিয়ে ওর কাঁধেই চাপায়। অন্য কাপড়গুলোর দিকে মন নেই। কেন ওই কাপড়গুলো তুললো, কেন অন্যগুলো তারেই ঝুল খাচ্ছে তার কোনো অর্থ কেউ দাঁড় করাতে পারেনি।
গোটাকয়েক কাপড় কাঁধে চাপিয়েই নিচে নেমে যায় না রিনি। দূরের আকাশে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। কোনো গাড়ির কর্কশ হর্ন, কাকের বিরক্তি করা ডাক। কিংবা মানুষের কোলাহল। না হয় কখনও কামরুন এসে ডাক না দেওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিনি। দূরের আকাশে কী খোঁজে কে জানে। আনমনে কিভাবে কেউ বলতে পারে না। শরীরও যে ভেঙে পড়েছে তা-ও নয়। তবে শরীর না ভাঙলেও মনটা যে ভেঙে গেছে তা বোঝা যায়। রিনি হাসানের গায়ের রং, দুধে আলতা নয়, হলুদও না। একেবারে গোলাপি বলতে যা বোঝায় তাই। চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। কপালে বলি রেখা। মাথার চুলে সাদাপাটই বেশি। কাপড় কেমন আলুথালু হয়ে জড়িয়ে থাকে গায়ে। কখনও আঁচল লুটোয় মাটিতে। এ সময়ে কখনও পামেলাও উঠে আসে ছাদে। বরাবরই সে এসে পেছনে কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। আশপাশের বাড়িতে তাকায়। কিন্তু চোখে কোনো কৌতূহল থাকে না ওর। কিংবা চঞ্চলতা। অর্থহীন চাউনি একেবারে। তখন রিনি এসে দাঁড়ায় কখনও ওর পাশে। কখনও মেয়েটার কাঁধে হাত রাখে। কখনও চুলে হাত বুলোয়। কখনও বুকে জড়িয়ে নেয় পামেলাকে। তারপরও সারা অবয়বজুড়ে ওর কী যেন নেই কী এক হাহাকার। এমনি তৃষ্ণা নিয়ে চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে যখন তাকিয়ে থাকে রিনি তখনই হঠাৎ গলা চড়িয়ে চেঁচাতে থাকে রূপক। একমাত্র ছেলে রিনির। বয়েস পঁয়তাল্লিশ। পামেলা ওর পিঠেপিঠি।
দুহাত তুলে কখনও দুহাত ভাঁজ করে হাতের পেশিগুলো শক্ত করে গলা চড়িয়ে রূপক বলে আমি হিমালয়ে যাব। কখনও, আমি বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করবো। সুন্দরবনে যাব। কে কে যাবি আয়। বলে হাঃ হাঃ করে হাসতে থাকে।
ওর হাসি দেখে অন্যরাও হাসে। ভিড় করে ওকে ঘিরে। রূপকদা আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। আমার বন্দুক আছে। দোনলা।
আমার দাদুও বন্দুক দিয়ে হাতি মেরেছে, বাঘ মেরেছে। তা-ও যে-সে বাঘ নয়, রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বলে, হুম করে শব্দ করে নিলয়। পাশের বাড়ির ছেলে ও। ওর হুম শব্দ যেন হালুম হয়ে বাজে সবার কানে।
রূপক এদিক-ওদিক তাকায় চকিতে। হালুম! হালুম! বাঘ এসেছে। বাঘ!
বন্দুক। দোনলা বন্দুক! বন্দুক কোথায়? রূপকের কণ্ঠে বিস্ময় একই সঙ্গে অস্থিরতা। কিন্তু কথাগুলো যখন ও আওড়ায় তখন চোখের ফাঁদ বড় হয়ে যায় ওর। মণি দুটো কোণায় এসে কেমন তেরচা হয়ে সেধিয়ে যায় ভেতরে। এ সময় অস্বাভাবিক ঠেকে ওকে। কেউ কিছু বলে না। কিন্তু পাশের বাড়ির দারোয়ান দেলোয়ার একেবারে চুপ থাকতে পারে না। ওর ট্যারা চোখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, কী সোন্দর পোলাডা, চোক্ষের ফাই চাইলেই খালি মনে হয় ওর অসুখ। অন্য সময় জোয়ান তাগড়া ব্যাডা। খোদার কী বাইল! বলে বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে দেলোয়ার।
এমনি সময় রূপক ফের চেঁচিয়ে ওঠে। দোনলা বন্দুক। আমি মিলিটারি। হাঃ হাঃ হাঃ লেফট রাইট, লেফট রাইট। ঠিকই এক জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে লেফট রাইট করতে থাকে রূপক। ওকে দেখে মানুষের জটলা আরও বড় হয়। কখনও কারও কারও টিপ্পনিকাটা দেখে রিনি বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বেলকোনিতে হাত রেখে মাথা বাড়িয়ে ডাক দেয়Ñ রূপক, বাবা ঘরে চলে এসো, চা খাবে। চলে এসো বাবা।
রূপক মায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। শেষে চা, চা হবে মা! চোখে-মুখে তখন আনন্দ ঝরে পড়ে ওর। তেমনি লেফট রাইট, লেফট রাইট করতে করতে চলে যায় ঘরে।
কখনও পাশের বাড়ির বুয়াকে দেখে ডাক দেয়। এই জুলেখা!
– আমার নাম জুলেখা না!
– তুমি জুলেখা না!
– আমি পরিবিবি!
– পরি! তুমি ও বাড়ি কাজ করো?
– হ।
– ওরা তোমাকে মারে?
– মারব ক্যা, আমি চোর না ডাকাইত!
– তবে আদর করে?
– হ।
– বেশ ভালো করে খেতে দেয়!
– খাইতে খাইতে পেট ফাইট্টা যায় আর কী!
– বেতন কত দেয়!
পরিবিবি দাঁত কেলিয়ে হাসে। দুহাতের দশ আঙুল দেখিয়ে বলে ১০ হাজার! ১০ হাজার! বেশ ভালো, বেশ ভালো।
মালি লালচানের সঙ্গে ওর খুনসুটি লেগেই থোকে। ও যখন একমনে নিড়ানি দিচ্ছে টবে, আগাছা পরিষ্কার করছে। কিংবা জল ঢালছে ফুল গাছে। তখন গুটি গুটি পেছনে এসে দাঁড়ায় রূপক। তারপর পিঠে আলতো টোকা দিয়েÑ এই কী হচ্ছে?
– অয় নাই অবে!
– অবে কি! বলো হবে!
– অই অইলে।
– কি হবে?
– ছাও!
– ছাও! অমন চাষাদের মতো কথা বলছো কেন?
– আমি তো চাষাই!
– বাজে বকো না লালচান!
বলেই মালির কানের লতিতে চটাং করে এক টোকা বাজিয়ে হেঃ হেঃ করে হাসি ছড়িয়ে কেটে পড়ে রূপক।
হালে ওর মুখে লেফট রাইট লেফট রাইট তেমন শোনা যায় না। বোলচালে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু হরতাল নিয়ে মেতে আছে ও। হরতাল! হরতাল! আজ হরতাল। হরতাল হবে তো! হরতাল? হরতাল হবে? কি বলেন? ভাই স…ব, ভাই… সব হরতাল! হরতাল!
এরপরই আবার উল্টো সুর, হরতাল মানি না মানি না। আবার কখনও হরতাল হতে হবে! হতে হবে! হবে তো? হরতাল? কথাগুলো মানেহীন। ছন্নছাড়া। অসংলগ্ন এবং খাপছাড়া। তবু ভালোলাগে। কথা বলছে ও। অন্যরা হাসুক। টিপ্পনি কাটুক। ‘রিনি কটেজের’ কারও তাতে কিছু যায় আসে না। অন্তত ওর জগৎ নিয়ে ও তো ভালো আছে! এটুকুই ওদের সান্ত¡না। না হলে যখন ও কাঁদে খুব সকালে এবং রাতে, তখন মনে হয় ও বাড়িতে কেউ মারা গেছে। কিংবা ওকে ধরে কেউ পেটাচ্ছে। শুধু পেটন! মনে হবে যেন, এক্ষুণি অজ্ঞান হয়ে পড়বে। কখনও মনে হয় তীব্র কোনো যন্ত্রণায় ওর ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। সে কী চিৎকার। সে কী কান্নার ব্যাকুলতা!

বেলা বাড়ার পর উঃ আঃ করে করে গোটা বাড়ি চষে বেড়াবে। আর শুধু উঃ আঃ, উঃ আঃ করে দু’হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ওপর-নিচ করবে। দেখে কখনও মনে হবে, ছেলের মুখ ঝালে পুড়ে যাচ্ছে। কখনও মনে হবে গা জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। অগ্নিদহন সারা শরীরজুড়ে। এমনি যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একসময় ছাদে উঠে আসে রূপক। যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে সারাছাদ ছুটে বেড়ায়। একসময় শান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসে। কখনও মাথা চেপে ধরে শুয়ে থাকে একটা চৌকিতে। ঘরে ওর জন্যে আলাদা খাট রাখা আছে। রোজ ঝাট দেওয়া হয় খাটে। দুদিন পরপর চাদর বদলে দেওয়া হয়। তারপরও কেন যেন খাট ছেড়ে চৌকিতেই শুয়ে থাকে ও। বোধহয় চৌকিতেই শুতে ভালো লাগে ওর। কিন্তু ভালো লাগে, তাই বা বলি কী করে! মাথাটা যেভাবে দুহাতে চেপে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে, কখনও ডান হাতের কনুইয়ের ভাঁজে বাঁ হাতের কনুই দিয়ে চেপে ধরে মাথা। যেন অসহ্য কোনো যন্ত্রণা মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছে ও। অনেকক্ষণ আর কোনো শব্দ নেই ওর। একসময় নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
পড়ন্ত বিকেলে কখনও শেষ বিকেলে বেরিয়ে আসে ও ঘর থেকে। কখনও ছোট্ট চাতালটুকুতে, কখনও গেটের সামনে কখনও বা রাস্তার বাঁ-পাশ ধরে পায়চারি করতে থাকে রূপক। একসময় হঠাৎ বলে ওঠে হরতাল! হরতাল! হরতাল হবে তো! কি বলেন?
ইদানীং হরতাল প্রসঙ্গেই বলছে শুধু। আগে বাঘের কথা। বাঘের দুধ খাওয়ার কথাই বলতো বেশি। কিন্তু প্রজন্ম চত্বরে যখন থেকে মানুষের সমাবেশ হচ্ছে, তখন থেকেই ওর বোল পাল্টে যায়। এখন হরতালের কথা বলে। কখনও বলে ও, তোমার আমার ঠিকানা… তারপর থেমে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে ঠিাকানা তো হারিয়ে ফেললাম! ঠিকানাটা কেউ বলতে পারো? ঠি…কা-না!
তখন কেউ ধরিয়ে দেয়, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’। অমনি গলা চড়িয়ে বলতে থাকে, পদ্মা মেঘনা যমুনা।
কখনও তুমি কে আমি কে বলেই থেমে যায়। আশপাশে তাকায়। অন্যমনস্কভাবে পা চালিয়ে পোড়োবাড়ির মতো ধসেপড়া বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। ওখানে এক দঙ্গল ছেলেপুলে ক্রিকেট খেলছে। ওদের থেকে দাঁত উঁচু লম্বাটে মুখের ছেলেটাকে ডেকে বলে— এই ছোড়া বলতো তুই কে?
– বাঙালি।
– ওরা?
– ওরাও বাঙালি।
– সাবই তোরা বাঙালি? সত্যি বলছিস তো!
– আমরা মিথ্যে বলি না।
তাই তো, তাই তো। বেশ কবার তাই তো তাই তো করে ফের গলা চড়ায় রূপক। তুমি কে, আমি কে, ছেলেগুলো কোরাসে চেঁচিয়ে ওঠে বাঙালি! বাঙালি!
তুমি কে? আমি কে? তুমি কে! আমি কে! এমনটি বলতে বলতে গলা নেমে আসে ওর। হঠাৎ গলা চড়িয়ে ফের বলে জয় বাংলা! জয় বাংলা! বেশ ক’বার ‘জয় বাংলা বলে থামে ও। এদিক-ওদিক তাকায়। একে-ওকে ডাকে। জয় বাংলা বলছো না কেন? তোমরা গিয়েছিলে? জয় বাংলার ওখানে গিয়েছিলে? বেলা পড়ে এলো, কখন যাবে! আমিও যাবো! তোমার আমার ঠিকানা! একসময় গলা নেমে আসে খাদে। বিড়বিড় করে কী যেন বলে! তারপর গলা চড়িয়ে মা মা করে ডাকতে থাকে রূপক।
মা ছাদের কার্নিশে এসে দাঁড়ায়।
– কি হয়েছে বাবা!
– জয় বাংলা শোনোনি জয় বাংলা!
– শুনেছি বাবা!
– যাবে না? জয় বাংলার ওখানে যাবে না মা!
– যাবো বাবা অবশ্যই যাবো।
– যাবো কি নেমে এসো এক্ষণি নেমে এসো।
রিনি হাসানের মুখ হাসিতে ঝলমল করে ওঠে। দেরি না করে একরকম ছুটে নেমে আসে নিচে। রূপক মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। পা থেকে মাথা অবধি কী যেন পরখ করে তীক্ষè চোখে। বেশ ক’বার এমনি করে শেষে মায়ের চোখে চোখ রেখে বলে তুমি জয় বাংলা দেখতে যাবে না?
যাবো তো! রিকশা কর।
রূপক কিছু বলে না। ফের মাকে দেখে। পরখ করে তীক্ষè চোখে। তারপর প্যান্টের দু-পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে, কখনও আবার বুকে দু-হাত বেঁধে জায়গা বদল করে বেশ ক’বার। একসময় শূন্যে তাকায়। হাত-পা নাড়াচাড়া করতে থাকে অস্থিরভাবে। মাকে ঘুরে ঘুরে দেখে ফের।
– কী দেখছিস যাবি না জয় বাংলায়?
রূপক মুখে রা করে না। ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ কী মনে করে যেন মা নিজের দিকে তাকায়। তারপর আঃ হাঃ চু… চু… করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। জয় বাংলায় যাবো অথচ এখনো বাসার কাপড়রই বদল করিনি। কী যে মনভুলো হয়েছি! বলেই দ্রুত সিঁড়ি ভাঙতে থাকে মা।
খানিকবাদেই পাটভাঙা আকাশ-রঙের একটা শাড়ি পরে আসে রিনি।
মাকে দেখেই জয় বাংলা, জয় বাংলা, তুমি কে, আমি কে বাঙালি বাঙালি বলে কবার চক্কর দেয় মাকে ঘিরে। মা হেসে আলতো করে রূপকের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দেয়।
রূপক রাস্তায় এসে রিকশা ডাকে, এই রিকশা যাবে! জয় বাংলায়! জয় বাংলা চেনো না? তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা! লেফট রাইটের মতো তালে তালে পা তোলে আর সেøাগান মুখে। আশপাশের লোকজন জড়ো হয়।
রূপকদা জয় বাংলায় যাবে! এই রিকশা শাহবাগ নিয়ে চল।
দুটো রিকশা পরপর চলতে থাকে। একটিতে রূপক আর ওর মা। পেছনেরটায় মালি আর দারোয়ান। কখন মাথায় ওর কি খেলে! তাই সাবধানের মার নেই। এ ভেবে ওরাও চলেছে সঙ্গে। পথে খ- খ- মিছিল। আমি কে তুমি কে তোমার আমার ঠিকানা। সব সেøাগানের সঙ্গে তাল মেলায় রূপক। ওর চোখেমুখে মুগ্ধতা, আলোর উদ্ভাসন। কখনও ফিরে ফিরে ওদের রিকশা দেখে, তোমাদের ভালো লাগছে তো? উত্তরে ওরা কী বলল ওদিকে খেয়াল নেই। একমনে জয় বাংলা জয় বাংলা বলে সেøাগান দিতে থাকে ও। কোথাও বাবার কাঁধে চড়ে কোথাও বৃত্তাকার মানুষের ভিড়ে এই এত্তটুকুন বাচ্চারা সেøাগান দিচ্ছে গলা চড়িয়ে। কারও কারও শরীর বেঁকে যাচ্ছে সেøাগান দিতে গিয়ে! বিস্ময়ে অভিভূত দুটি চোখ বারবার দেখে ওদের। দুচোখ ভরে দেখে হাঁটু সমান ছেলেপুলেদের। এ দেখে দুঠোঁট নড়ে ওঠে মায়ের। চোখ ভেজা, কে বলবে ওর মাথায় গোল আছে। কেমন চনমনে! কি সুন্দর করে সেøাগান দিচ্ছে। কখনও অন্যের সেøাগানে জোগান দিচ্ছে। ছেলেটার আমার চোখেমুখে কী আনন্দ! প্রজন্ম তোমরা বেঁচে থাকো। অন্তত আমার ছেলের জন্য তোমরা বেঁচে থাকো অনন্তকাল!
একসময় ফিরে আসে ওরা। রূপকের মাথায় লাল সবুজ কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। মা একটা টি-শার্টও কিনে দিয়েছে। বুকে লাল সূর্য। তাতে লেখা ‘রাজাকারের বিচার চাই’। বাড়ি ফিরে নতুন সেøাগান রূপকের কণ্ঠে- বিচার হবে বিচার হবে। রাজাকারের বিচার হবে। ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই রাজাকারের ফাঁসি চাই! বলছে আর পায়চারি করছে। মাঝে মাঝে দুহাত তুলে আরও বেশি প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটাচ্ছে রূপক।
তখনই হুইল চেয়ারে করে যাচ্ছিল জেবুন খালা। ওকে দেখে থামলো। হাতে অনেকগুলো মোম। তার থেকে তিনটে মোম দিল রূপককে। রূপক বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।
জ্বালতে হবে, ঠিক সন্ধ্যে ৭টায় জ্বালতে হবে। আমিও জ্বালাবো! বলেই হাতে মুঠো করা মোমগুলো দেখায় রূপককে।
– জ্বালবো! আগুন দিয়ে?
– আগুন দিয়ে জ্বালবে।
আগুন দিয়ে জ্বালতে হবে। আগুন দিয়ে! বলে পায়ে পায়ে তাল মেলাতে থাকে রূপক। জেবুন খালার ক্লান্ত শরীর। তারপরও একগাল হাসি ছড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় নেয় রূপকের কাছ থেকে।
ওদের তিন বাড়ি পরেই জেবুন খালার বাসা। অনেকদিন হলো ক্যানসারে ভুগছে। অনেকটা পয়সার ওপর বেঁচে আছে বলা যায়।
১০ নম্বর ক্যামো চলছে ওর। তবু হুইল চেয়ারে করে বেরিয়ে এসেছে। মোমবাতি কিনবে বলে। প্রজন্ম চত্বরের ডাকে আজ সন্ধ্যায় আলো নিভিয়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হবে সারা দেশজুড়ে। আলোর বিভায় দেশ থেকে সব আঁধার দূর হয়ে যাক, সব অমানিশা হারিয়ে যাক চিরতরেÑ এ প্রত্যাশায়। সুতরাং এর সাথে না থাকলে কি হয়? তাই কাজের ঝিটাকে অনেক বলে-কয়ে রাজি করিয়েছে।
– দাদাবাবু জানলে ভীষণ রাগ করবে দিদি!
– ও নিয়ে তুই ভাবিসনে মিনাক্ষী।
– তুমি যা করচো না দিদি। দাদাভাই জানলে আমার ধড়ে আর মাথা থাকবে না।
এই এক ঝকমারি মিনাক্ষীকে নিয়ে। চা-বাগানের মেয়ে ও। মায়ের দেখভাল এবং সেবার জন্যে বাগান থেকে পাঠিয়েছে শ্যামা। ওর স্বামী জিকু চা-বাগানের ম্যানেজার। মিনাক্ষীকে পাঠিয়ে শ্যামা ফোন করেছিল, জানো মা মিনাক্ষী ভারী লক্ষ্মী মেয়ে। কাজে কামে দারুণ পটু। আমার বাংলোতে সবদিক ও-ই সামলায়। যখন যেভাবে যা বলবে, ঠিক তা তা করবে, একটুও নড়চড় হবে না।
এখন জেবুন দেখছে শ্যামা যা বলেছে তার চেয়ে কয়েক ধাপ বেশি ও। অসম্ভব দায়িত্ববোধ মেয়েটির। বিশ্বস্তও বটে। সুতরাং যেভাবে নির্দেশ দিয়ে গেছে দাদাবাবু, তার ১৯-২০ হবার জোটি নেই। এখন জেবুন বললেই ওকে নিয়ে পথে পথে ঘুরবে, দোকানে যাবে তা ভাববার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আজ ঘাইঘুই করে শেষে একরকম রাজি হয়েছে দিদিকে নিয়ে বাইরে আসতে। না এসে উপায় কী? টিভি চ্যানেলে দিদি এখন আর অন্য কোনো অনুষ্ঠান দেখে না। কেবল শাহবাগে মন পড়ে থাকে ওর।
– জয় বাংলা! জয় বাংলা!
– আমি কে? তুমি কে? বাঙালি।
– রাজাকারের ফাঁসি চাই! ফাঁসি চাই।
শুনে শুনে জেবুন খালাও চুপ থাকতে পারে না। খাটে বসে নিজেও বিড়বিড় করে সেøাগান দেয়। ক্লান্ত শরীর। তবু উত্তেজনায় দুহাত তুলে জয় বাংলা জয় বাংলা বলে কখনও। কখনও বলতে বলতে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। তখন মিনাক্ষী তোয়ালে দিয়ে দুচোখ মুছে দেয় জেবুনের।
– ওভাবে কাঁদছো কেন দিদি?
– সেলিনার কথা মনে পড়ছে।
পরে জেনেছে মিনাক্ষী সেলিনার কথা। সাংবাদিক ছিল। সংবাদপত্রে কাজ করত। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যা করেছে। সময়ের প্রলেপ পড়ে একসময় বোনের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল জেবুন। মাঝে মধ্যে আবছা করে মনে পড়ত ধূসর কোনো ছবির মতো। বিশেষ করে পিঠেপিঠি দুবোনের একসঙ্গে একটি ছবি আছে ওর ঘরে। অনেকদিন পরপর ছবিটি যখন মুছতে নেয় জেবুন, তখন অপলকে তাকিয়ে অনেক সুদূর থেকে সেলিনাকে ছুঁতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারেনি। বারবার চেষ্টা করেও ছুঁতে পারেনি ওকে। শেষে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে যেখানকার ছবি সেখানেই রেখে দিত। কিন্তু প্রজšে§র ডাকে এখন যেন সেলিনা এ ঘরেই ঘুরঘুর করছে। জেবুনও ওর ঘাতকদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার। তাই আজ শুধু নিজের জন্যেই মোম কিনে আনেনি ও। অনেককেই দু-তিনটে করে মোম বিলিয়েছে। বলেছে সময়মতো জ্বালতে ভুলো না যেন।
প্রজন্মকে ঘিরে জেবুনের এমনি তরতাজা ভাব দেখে শরীফ হক অবাক হয়। অবাক হয় ওর ছেলেমেয়েরাও। শরীফ হাসতে হাসতে বলে, তোদের মায়ের আর ক্যামো-ট্যামো লাগবে না। প্রজšে§র ডাকে দেখবি একদিন ও ঠিকই সুস্থ হয়ে গেছে। স্বামীর কথায় বিষণœ জেবুনের মুখেও হাসি ফোটে।
– কথাটা মিথ্যে বলোনি। এখন মনে হয় রাজাকারগুলোর বিচার না হওয়া পর্যন্ত আর মরছি না।
– এ কথায় সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।
আসলেই তাই! বলতে গেলে এতদিন জেবুন খালা বিছানা থেকে উঠতেই পারেনি। বিশেষ করে নতুন ক্যামো যখন শুরু হয় তার কয়েকদিন বড্ড নাজুক হয়ে পড়ে ওর শরীর। অথচ এখন সবকিছু কেমন পাল্টে গেছে। কখন ক্যামো শুরু হলো আর শেষ হলো বোঝাই যায় না। টিভি থেকে একেবারেই চোখ সরে না ওর। আর শরীর একটু ভালো থাকলে তো কথাই নেই, খাটে গা সেটে একটার পর একটা চ্যানেল ঘোরাতে থাকে। কোথাও আরও নতুন কোনো খবর আছে কিনা, রাজাকারের পরাজয়ের খবর। প্রজন্মের জাগরণের খবর। নতুন নতুন মিছিলের খবর। মানুষ কেমন করে ধেয়ে আসছে সারাবাংলা থেকে সে খবরÑশুনতে একেবারে মুখিয়ে থাকে। সেøাগানে মুখরিত শাহবাগ চত্বরের ছবি যখন ভেসে ওঠে টিভি পর্দায়। খালার মুখ তখন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পবিত্র এক আলোর ছোঁয়ায়। স্বপ্নময়, প্রত্যাশা জাগানিয়া সে আলোয় একসময় ভিজে আসে তার হৃদয়। নেমে আসে হৃদয়ের ক্ষত ফুঁড়ে জলধারা। দুচোখ ছাপিয়ে সে ধারা নেমে আসে দুগাল বেয়ে। সে জল আড়াল করে না খালা। মুছেও নেয় না অগোচরে। তখন একমনে তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। গত ৪০ বছর ধরে এ ছবিটাকে আগলে রেখেছে খালা। যখন যেখানে গেছে ছবিটা কখনও হাতছাড়া করেনি। তার রুমে একেবারে চোখের সামনে ছবিটা টাঙিয়ে রেখেছে। হালে ছবিটা যেন কথা কয় খালার সঙ্গে। হাঁটে ঘরময়। মাথার কাছে এসে বসে। কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। খালার কষ্ট দেখে কাঁদেও ছবিটা। কখনও আবেগ আর ধরে রাখতে পারে না খালা। বলে, সেলিনা ছবি হয়েই আমার ঘরে কতকাল। কিন্তু ওকে যেন ভুলেই গিয়েছিলাম। শুধু ছবি হয়েই ফ্রেমে বন্দী ছিল। ওর কোনো জাগতিক অস্তিত্ব ছিল না আমার কাছে। কিন্তু রাজাকারের ফাঁসি চেয়ে অসংখ্য মানুষের ঢেউ সব নীরবতা যেন ভেঙে খান খান করে দিয়ে গেছে। সে স্মৃতি মনে হলে এখনও হিম হয়ে আসে বুক।
এক কালো রাত্রিরে দরজায় নক। প্রথমে মৃদু শব্দ। বাড়ির সবাই তখন শোওয়ার আয়োজন করছে। এমন সময় সেই শব্দ। সবাই একে একে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। এবার ধুম ধুম শব্দ!
– দরজা খোল দাও।
– কে তোমরা? বাবার কণ্ঠ।
গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে কিছু সময়ের জন্যে। এবার ভারী বুটের আঘাত।
– দরজা নেহি খোলো তো গুলি চালাতে বাধ্য হবো।
বলেই ধুম ধুম করে দরজায় লাথি পড়তে থাকে। ভারী বুটের লাথি। ভারী সে শব্দ! শেষে বাবা বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দেয়। অমনি হুড়মুড় করে কয়েকজন আর্মি ঘরে ঢুকে পড়ে। ওদের পেছন পেছন কজন তরুণ। বাঙালি ওরা! ওদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। ওদেরই একজনের হাতে সেলিনার একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি। ছবিটা এক আর্মির দিকে বাড়িয়ে দেয় এক তরুণ। আর্মি একরকম ছোঁ মেরে ছবিটা হাতে তুলে নেয়। বেশ কবারে ছবিটার দিকে চোখ বুলোয়। তারপর বাবাকে দেখিয়ে :
– একে চেন?
– বাবা চুপ।
– কি বলছি, একে চেন?
– জ্বি।
– ও তোমার কী হয়।
– মেয়ে।
– ও কোথায়?
– বাড়ি নেই।
– তোম ঝুট বলতা হ্যায়।
– হাম সাচ্ বল্রাহু।
তারপর সব আর্মিদের উদ্দেশে বলল, বাড়ি সার্চ করো। অমনি ধুমধাপ করে ছড়িয়ে পড়লো আর্মিরা বাড়িময়। একসময় বুকে স্টেনগান ঠেকিয়ে বের করে আনে সেলিনাকে। ও আর জেবুন, তখন একই সঙ্গে বাথরুমে লুকিয়েছিল। ছবির সঙ্গে সেলিনার চেহারা মিলে যেতেই তার বুকে স্টেনগান ঠেকালোÑ কোনো চালাকি করার চেষ্টা করো না। বেরিয়ে আস। যেন হিম হিম কণ্ঠ। কেটে কেটে বেরুচ্ছে গলা চিরে। চোখে রক্তাভা। ঘামের ঘন ফুটকি খানসেনাদের মুখে। ও মুখের দিকে তাকাতেই ওদের শরীরের রক্ত জমাট হয়ে যায় মুহূর্তেই। ফ্যাকাশে সেলিনার মুখটি আজও চোখে ঠাঁই করে আছে জেবুনের। নীরবে বেরিয়ে আসে ও বাথরুম থেকে। পা চালাবার আগে চকিতে একবার সেলিনা তাকিয়েছিল জেবুনের দিকে। বড্ড রহস্যময় ছিল সে দৃষ্টি। অনেক না বলা কথা যেন জমে ছিল সে চোখে। জেবুন কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল তখন। গলা যেন চেপে ধরেছিল ওরা লোহার মতো শক্ত হাতে। সেলিনা সে যে বেরিয়ে গেল। আর ফিরে আসেনি। ও বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরেই গুলির শব্দ শুনেছিল ওরা। শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল অনেকেই। মগবাজারসহ আশপাশের সব তল্লাটে খুঁজে দেখলো সবাই কিন্তু কোথাও কোনো লাশ দেখতে পেল না। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি। কিন্তু সেলিনাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না কোথাও। সাংবাদিক সেলিনা মুক্তিযুদ্ধের খবর ছাপতে ছাপতে একসময় যে ও নিজেই খবর হয়ে যাবে তা কে জানতো?
বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে জেবুন। সেলিনা নিখোঁজ হবার কদিন পর থেকে লাগাতার একটি স্বপ্ন দেখেছিল জেবুন। স্বপ্নটি অদ্ভুত ও রহস্যময়। গভীর রাতে ফোন আসতো সেলিনার। ও বলতো, কারা যেন আমাকে আটকে রেখেছে। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের কেউ ওরা কিন্তু পরিচয় দেয়নি ও। বলছিল, ওরা শুধু টাকার জন্যে চাপ দিচ্ছে। ওর কাছে নাকি অনেক টাকা পাবে। সে টাকা পেলেই ওকে ছেড়ে দেবে। আরও কী যেন বলতে চায় ও। তখনই রিসিভারটা ওর হাত থেকে কেড়ে নেয় কেউ। স্বপ্নে একই কথা জানিয়ে আরও কয়েকবার ফোন করেছিল সেলিনা। আজও দিব্যি ওর সে কণ্ঠ কানে বাজে জেবুনের। একবার স্বপ্নে ও ফোন নম্বরও দিয়েছিল। সে নম্বরে ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বন্ধ। এ কেমন স্বপ্ন! তবে কী সেলিনা বেঁচে আছে কোথাও? বেঁচে থাকলে ৪০ বছরেও কি একবারও আসতো না। যেখানেই থাকুক না কেন, খুঁজে পেতে ঠিকই চলে আসতো। কিন্তু এমন অদ্ভুত এক স্বপ্ন কেন যে দেখলো, এর মানেই বা কি? তা অনেকদিন তাড়া করে ফিরেছে জেবুনকে। বাসার সবাইকেও ভাবিয়েছে সে স্বপ্ন। এরপর অনেক দিন পর আজ আবার গভীরভাবে মনে এসে নাড়া দিচ্ছে সেলিনা।
মানুষ কত স্বার্থপর হয়। ভেবে নিজেকে বড্ড ছোট মনে হচ্ছে জেবুনের। পিঠেপিঠি দুবোন। ছোট ছিল সেলিনা। দিনভর কেবল এ ওর সঙ্গে খুনসুটি করে কাটাত। অথচ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ও কেমন মলিন হয়ে গেল। স্মৃতি হয়ে গেল। একসময় সে স্মৃতি হারিয়ে গেল অনেক দূরে কোথাও। কত কত দিন মনে হয়নি সেলিনাকে। অথচ এখন মনে হচ্ছে ও এ ঘরেই ঘুরছে। পায়চারী করছে। বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশ দেখছে।
সত্যি বলতে কী সেলিনা অনেক বছর পর ফের স্বপ্নে দেখা দিচ্ছে। বলছে শাহবাগ চত্বরে চলে আয় বুবু। আমি আছি। কখনও বলে, আর্ট ইনস্টিটিউটের পুকুর পাড়ে বসে আছি বুবু। বটগাছ না কি একটা গাছ আছে। বড্ড ঝাপানো। তারই ছায়ায় বসে আছি। কখনও আবার দেখে, ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে জেবুনের মাথায়। বলছে, বুবু তোর মাথার অমন লম্বা চুলগুলো গেল কোথায়। এ কী হাল তোর শরীরের। শুকিয়ে কাঠ! বিছানার সঙ্গে সেটে গেছিস একেবারে!
জেবুন মিটিমিটি হাসে। বেঁচে আছি এই তো বেশি। বোধহয় তোর অপেক্ষাতেই এখনও চোখ মেলে চাইছি!

মাঝে মাঝে বড্ড ভয় হয়। ঘরে-বারান্দায় কোনো মানুষের অস্তিত্ব দেখা যায় না। কিন্তু মনে হয় কোনো এক ছায়া। চোখ ফেরাতেই সরে যায় আচমকা। অনেকদিনই এমনটি হয়েছে। ছায়া দেখে অলুক্ষুণে নানা চিন্তা জেবুনের মাথায় ভিড় করে। বোধহয় মৃত্যু ওকে সহসাই কাছে ডাকবে। তবে কী ওটা যমেরই ছায়া! অদ্ভুত এ ছায়ার কথা হাসানকেও বলেছে, মনে হয় আমি আর বাঁচবো না। সময় ফুরিয়ে এসেছে। ছেলেমেয়েদের দেখো। আমি চলে যাবার পর তুমিই ওদের মা-বাবা দুই-ই। বুকে আগলে রেখো।
তারপর খুনসুটি করে বলে, তোমাদের পুরুষদের তো আবার বিশ্বাস নেই! আমি চোখ বুজতেই তুমি হয়তো হাতে মেহদি পরতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। দুষ্টু এক হাসি তখন জেবুনের চোখেমুখে।
হাসান প্রথমে একটু বিরক্ত হয়। পরে কাছে বসে নরম কণ্ঠে বলে তুমি হেরে যাবে আমাদের কখনও তা মনে হয় না। এতদূর সংগ্রাম করে যখন এসেছো তখন জয় তোমার নিশ্চিত।
এরপর থেকে যেন ছায়াটি আর দেখে না জেবুন। তবে কেন যেন সেলিনার উপস্থিতি গভীরভাবে টের পায়। মনে হয় ছায়াটা সেলিনারই। এখন ও পুরো অবয়বে আসছে। ঘুরছে। কেবল দেখা দিচ্ছে না। এমনি ভাবনায় যখন মগ্ন তখন বাইরে কোথাও কোলাহল শুনে পায়ে পায়ে বেলকোনিতে এসে দাঁড়ায় জেবুন। দেখে রূপক একটা দড়ি হাতে। দড়ির মাথা গোল করে ফাঁসির চিহ্ন এঁকেছে। বলে, দড়ি নেবে ফাঁসির দড়ি। ২০ টাকা। তারপর দুহাতে তালি বাজিয়ে ডাকে, এই শোনো তোমরা ফাঁসি দেবে না। রাজাকারের ফাঁসি। বলে ফের দড়ির মাথা গোল করে গলা ছাড়ে, দড়ি নেবে ফাঁসির দড়ি। ২০ টাকা।
বেলকোনি থেকে জেবুন খালা বেশখানিক সময় দেখে রূপকের কা-। ওর কাছে বেশ আমুদে মনে হয় ব্যাপারটি।
– রূপক আমাকে একটা দড়ি দে।
– ফাঁসির দড়ি! ফাঁসির দড়ি! কুড়ি টাকা।
– তা তো বুঝলাম। আমাকে একটা দে। একটু পরেই টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
– ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই। তুমি ফাঁসি দেবে। দড়ি নেবে! দড়ি দড়ি ফাঁসির দড়ি কুড়ি টাকা।
খালার দিকে আর খেয়াল নেই রূপকের। পোড়ো বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেই ছেলেগুলো আজও ক্রিকেট খেলছে। রূপক সোজা গিয়ে ক্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ছেলেগুলো হতভম্ব। রূপক দড়ি ঝোলাতে ঝোলাতে বলে জয় বাংলা। জয় বাংলা। অমন সময় দস্তগির কাকু চেঁচিয়ে ওঠে। বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে ছেলেপুলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিল ও।
– এবার বুঝেছি জয় বাংলা বুলি ওরা কোত্থেকে শিখেছে! ওই স্ক্রাউন্ডেলগুলো বস্তাপচা এ বুলি এতদিন পর আমদানি করেছে কবর থেকে। তাই আবার বাড়ি বাড়ি বয়ে এনে মার্কেটিং করছেন তিনি। তাই তো এখন ছক্কা মারলে জয় বাংলা। কট হলে জয় বাংলা। বোল্ড আউট; জয় বাংলা। কদিন বাদে দেখবো খেতে বসে জয় বাংলা। ভালো মাছ কিনে জয় বাংলা। যত্তসব পি-ি চটকানো ব্যাপার। এই রূপক তোমাকে সাফ বলে দিচ্ছি নিজের মাথায় গোল বাধিয়েছো, এখন ছেলেপুলেদের মাথা খারাপ করো না। এই মন্টি, বান্টি, পূর্ণ তোমরা ঘরে যাও। ঐ পাগলের সঙ্গে আর দেখেছি তো মাথা ভেঙে দেবো।
ছেলেপুলেরা সুড় সুড় করে সরে পড়ে। রূপক দড়িটা ঝোলাতে ঝোলাতে পাগল! পাগল পেলে কোথায় তোমরা। পাগলেরও ফাঁসি হবে! তবে রাজাকারের ফাঁসি হবে না। ফাঁসি হবে তো!
অমনি একদঙ্গল ছেলে সমস্বরে বলে ওঠে, ফাঁসি হবে রূপকদা। রাজাকারের ফাঁসি হবে। ওরা দূর থেকে খেয়াল করছিল সব। যদি দস্তগির ব্যাটা খুব বেশি চোটপাট নেয় তখন রুখে দাঁড়াবে ওরা। বোধহয় আঁচ করতে পেরে আর তেমন মাতেনি দস্তগির।
দস্তগিরকে দেখিয়ে বলে এ রাজাকারেরও ফাঁসি হবে। আগে আর পরে। ওরও ফাঁসি হবে। পরে হবে পরে!

– হ্যাঁ ও ছোট রাজাকার। তাই পরে হবে। আগে হবে বড় রাজাকারদের।
– পাড়ার ছেলেগুলো বোধহয় সাপের পাঁচ পা দেখেছে। মুরুব্বিদের সঙ্গেও কেমন গলা উঁচিয়ে কথা বলছে। এই ছেলেরা। মুরুব্বিদের সঙ্গে কি করে কথা বলতে হয় তা কি তোমাদের মা-বাবা শেখায়নি?
খানিকটা তেড়িয়া গোছের ছেলে তরুণ, তা বড়দের সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হবে তা শিখিয়েছে কিন্তু রাজাকারের সঙ্গে কি করে কথা কইতে হয় তা তো শেখায়নি!
– রাজাকার! কে রাজাকার? খুব বাড় বেড়েছে। একেবারে জিভ টেনে নিয়ে আসবো।
– রাজাকারের বড় গলা! শালাকে ধর ধর।
অনেকে হইহই করে ওঠে। কেউ কেউ আবার পথ আগলায় ওদের। এ ফাঁকে দস্তগির মাথায় টুপি পরাতে পরাতে পেছনের গলি ধরে কোথায় যেন পা বাড়ায়।
জেবুনের শরীর আজ আরও ভালো ঠেকছে। তাই হুইল চেয়ারে করে শাহবাগ অবধি ঘুরে এসেছে। এই এত্তটুকুন ছেলেমেয়ে কেমন করে সেøাগান দিচ্ছে ভেবে অবাক হতে হয়। এসব গল্পই করছিলেন জেবুনখালা রিনি হাসানের সঙ্গে। রিনি নতুন আরেকটি ৭১ দেখবো বলেই হয়তো এখনও বেঁচে আছিরে। গেটের ধারে হুইল চেয়ারে বসে জেবুন খালা। রিনি দাঁড়িয়ে ছাদরে কার্নিশ ঘেঁষে। ওপর-নিচে কথা হচ্ছে। তা রূপককে দেখছি না যে রিনি!
– ও শাহবাগ গিয়েছে।
– একা!
– না দারোয়ান আছে। পাড়ার ছেলেরাও সঙ্গে গেছে।
– ওকে এখন বেশ স্বাভাবিক মনে হয়! কেমন করে সারা দিন ফাঁসি চায় রাজাকারের। আমি শুনি ঘরে শুয়ে শুয়ে। কখনও দেখি ওকে জানালা গলে। দেখি ওর সেøাগানে ও ডুবে আছে, দেখে ভারী ভালো লাগে। দেখে মনে হয় পূর্ণ স্বাভাবিক ও। কোনো গোল-টোল নেই মাথায়।
রিনির মুখ আনন্দে ভরে ওঠে। বলে, জেবুন তুমিও দিব্যি সেরে উঠছো দেখছি। কে বলে তোমার ক্যানসার! ক্যামো চলছে একটার পর একটা! শরীর না কুলোলে শাহবাগ অবধি কেউ যায় এই শরীর নিয়ে! তুমি যে এত হ্যাপা সামলে এসেছো দেখে মনেই হয় না।
রিনি আশীর্বাদ করো রাজাকারদের বিচারটা যেন দেখে যেতে পারি। তা হলে পরপারে গিয়ে সেলিনাকে অন্তত বলতে পারব তোর ঘাতকদের বিচার হয়েছে!
রাতে জেবুন ফের স্বপ্নে দেখে সেলিনাকে। মাথা গোল করে মোটা এক ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দিচ্ছে এক যুবককে। যার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরনে। স্বপ্নটা দেখে অনেক সময় আর দুচোখ এক করতে পারেনি জেবুন।
এদিকে কেন যেন খুব ভোরেই রূপক পথে নেমে এসেছে। জয় বাংলা! জয় বাংলা! জয় বাংলা হবে তো! হ্যালো হ্যালো এই যে জয় বাংলা হবে?
লোকটা মুচকি হেসে বলে হবে! হবে! আলবাৎ হবে!
তোমার আমার ঠিকানা? পথচারী অনেকেই জড়ো হয়েছে ততক্ষণে। তাদের কে যেন বলে, পদ্মা মেঘনা যমুনা!
যমুনা! যমুনা আমাদের ঠিকানা মা! মা! গলা ছেড়ে ডাকতে থাকে রূপক।
মায়ের কেন যেন ভালো ঘুম হয়নি রাতে। রূপকের বাবা সারারাত পায়চারি করছিল শুধু। এমনিতেই মানুষটা কেমন চুপসে গেছে অনেক দিন! মুখে রা সরে না বললেই হয়। সব সময় আনমনা থাকে। তার ওপর আজকাল রূপক রাজাকারদের নিয়ে কেন এত হইচই করছে তা ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। জঙ্গিরা তো মারার সময় বাছ-বিচার করবে না। কার মাথায় গোল আছে কার মাথায় নেই তা যাচাই করবে না। যাকে টার্গেট করবে ঠিকই প্রাণ খুইয়ে ছাড়বে।
অমনি রূপকের কণ্ঠ শুনে মা-বাবা দুজনেই বরান্দায় এসে দাঁড়ায়।
– মা যমুনায় আমাদের ঠিকানা। যমুনা কোথায় মা। আমাদের যেতে হবে বাবা। যমুনায় যেতে হবে!
– যাবো বাবা যাবো! তুমি ঘরে এসে তৈরি হয়ে নাও।
– যমুনায় যাবো আমরা। আমাদের ঠিকানা যমুনা।
তারপর জয় বাংলা বলতে বলতে ঘরে চলে আসে রূপক। পথচারীদের অনেকেই ভিড় করেছে ততক্ষণে। ওদের বেশিরভাগ প্রাতভ্রমণ সেরে ফিরেছে। তাদের মধ্যে দস্তগিরও আছে। এর-ওর কথার ফাঁকে একসময় ঠাঁই করে নেয় সেও।
শাহবাগ শাহবাগ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। নাতিরা সেদিন খুব করে ধরলো নিয়ে যেতে। আজ না কাল করে কাটিয়েছি। সেদিন আর ছাড় দিল না, বলল, যে করেই হোক আজ নিয়ে যেতে হবে। অগত্যা গেলাম। চারদিকে শুধু সেøাগান। মিছিলের পর মিছিল জোয়ারের পানির মতো ধেয়ে আসছে মিছিল। যেন আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! খরস্রোতা পানির মতো জোর সে মিছিলে! অগত্যা নিরাপদ এক কোণে জায়গা নিয়ে দেখছিলাম শুধু মানুষ আর মানুষ! স্রোতের মতো ধেয়ে আসছে। দেখতে দেখতে একসময় দেখি আমিও ওদের একজন হয়ে গেলাম।
– একজন হয়ে গেলাম মানে! কে যেন জানতে চায়।
মানে… মানে…। কথা জড়িয়ে যায় দস্তগিরের। আবেগে ভারী হয়ে আসে ওর কণ্ঠ। আসলে… আসলে… মানে… একসময় দেখি আমিও হাত তুলে বলছি জয় বাংলা! জয় বাংলা! মনে হলো একাত্তুরের দিনগুলোতে ফিরে গেছি আবার। ওই স্পিরিট আমাদের সবাইকে তাড়া করে ফিরছে। তা না-হলে আমিও কেন…
বলতে বলতে দুচোখ বেয়ে জল গড়াতে থাকে দস্তগিরের। সে জল ছুঁয়ে যায়, ভিজিয়ে যায় আশপাশের আরও অনেককে।

Category:

তিব্বত ৫৭০

Posted on by 0 comment

‘গ্রাম ছেড়ে ক্রমশ শহুরে হয়ে ওঠা এই আমার কানে দোকানদার ইউছুব মিয়ার কথাগুলো স্পষ্টই ঢুকে যায়। তার ওপর থেকে চোখ নামিয়ে আমি এবার তাকাই সেই বৃদ্ধের দিকে।’

41 খালিদ মারুফ: ভিড়। ইউছুব মিয়ার দোকানজুড়ে আজ খদ্দেরের মধুর উৎপাত। দাঁড়ানোর জায়গা নেই এতটুকু, কেউ অবশ্য দাঁড়িয়ে থাকতে চাচ্ছেও না। প্রয়োজনীয় সদাই-পত্তর নিয়ে কেটে পড়লেই যেন বাঁচে। তখন দুপুর, কত হবে? ধরে নিন একটা প্রায়। এখানে সপ্তাহে দুদিন হাট বসে রবিবার ও বিস্শুদবার। তবে বিস্শুদবারের হাটটাই জমে ভালো। আর কিছুক্ষণ পরে এই প্রান্তরে ভিড়ের ঠেলায় পা ফেলার জায়গা থাকবে না এতটুকু। বাতাসজুড়ে থাকবে শুধু ধুলো আর ধুলো। দূর-দূরান্ত থেকে বয়ে আনা গ্রামবাসীর কলার কাঁদি, প্রমাণ সাইজের মানকচু, পাটখড়ির বোঝা, বীজ ধান ও অন্যান্য বিনিময়যোগ্য উদ্যানফসল এবং কৃষিপণ্যের বেচাকেনা প্রাক্দুপুরেই শুরু হয়ে যায়। আজও তাই হয়েছে। অধিকাংশের বয়ে আনা কলা কচুর বিক্রি প্রায় শেষ। সেগুলো পুব থেকে আসা পাইকারদের ট্রলারে ইতোমধ্যেই বোঝাই করা হয়েছে। আর এই বিক্রি শেষ করা মানুষেরাই নিত্যপ্রয়োজনীয় সাংসারিক দ্রব্যাদি সংগ্রহের জন্যে ভিড় জমিয়েছে নিকটবর্তী ইউছুব মিয়ার দোকানে। ইউছুব মিয়ার মুখে একটি ছদ্ম বিরক্তি। তবে এমন জনাকীর্ণ দিনগুলিতে ভেতরে ভেতরে সে অনেক সুখবোধ করে, যা সে ছদ্ম বিরক্তি দিয়ে আড়াল করতে পারে না।
কার্যসূত্রে এই জনপদে প্রায়ই আমাকে আসতে হয়। তাই এই হাট, মাঠ, নদী, দোকান এমনকি ইউছুব মিয়াও আমার পরিচিত হয়ে উঠেছে। আমি একশ টাকার নোটখানা ওয়ালেট থেকে বের করে মুঠোয় চেপে অপেক্ষায় আছি। ইউছুব মিয়ার ঝাঁপির তলাটা কিঞ্চিৎ ফাঁকা হলেই সেটা বাড়িয়ে ধরব আর চেয়ে নেব এক প্যাকেট সিগারেট এবং এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় ইউছুব মিয়া যাতে কোনোরূপ বিরক্তি প্রকাশের অবকাশ না পায় সে জন্যই আমার এই সতর্কতা। তবে এইমাত্র ইউছুব মিয়ার মুখে সত্যিই খানিকটা বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল। এবং আমি তার বিরক্তিমাখা স্বগতোক্তিগুলো কান খাড়া করে শুনতে থাকি, ‘আর শালারপুত এই বুড়োটা, আমি একশ দিন কইছি শালারপো তুই আর আমার দোকানে আসিস না, অন্য দোকানে যা! না, যাবে না। হাটবারের দিনটা হইলেই সকাল সকাল বুড়ো একখান পাঁচ টাকার নোট নিয়ে হাজির হবে, দাও! ওনারে একখান ৫৭০ সাবান দাও। আইজ তিন বছর হয় ৫৭০-এর দাম সাড়ে সাত টাকা, এত কই বুড়ো একখান পঁচা নে, সুলতান নে, চাইস তো কসকো নে, নাহ! তার ৫৭০-ই চাই।’
গ্রাম ছেড়ে ক্রমশ শহুরে হয়ে ওঠা এই আমার কানে দোকানদার ইউছুব মিয়ার কথাগুলো স্পষ্টই ঢুকে যায়। তার ওপর থেকে চোখ নামিয়ে আমি এবার তাকাই সেই বৃদ্ধের দিকে। নির্বিকার, নিজের ধুলোমাখা পায়ের দিকেই তিনি তাকিয়ে আছেন, আমি তার চোখ দেখতে পাচ্ছি না। তবে আমার মনে হচ্ছে তার নমিত চোখে কোনো পলক নেই। দোকানদারের ভর্ৎসনাগুলির কোনোটাই সে শোনেনি কিংবা শুনলেও আমলে নেয়নি সেটা। আমি বুঝতে পারলাম, যখন সে পাল্টা খেকিয়ে উঠে দোকানদারকে বলল, ‘কিরে ইছুব সাবান দিলি না!’ তার বলার ভঙ্গিতে হুকুম আছে এবং অন্তত এই মুহূর্তে তা কার্যকর বলেই মনে হয়, কেননা দোকানদার ইউছুব মিয়া এরপর কিছু অস্পষ্ট স্বগতোক্তি করে। কাগজে জড়িয়ে পাটের সুতো পেঁচিয়ে একখানা তিব্বত ৫৭০ সাবান তার দিকে ছুড়ে দেয়। সাবান হাতে বুড়ো এবার উঠে দাঁড়ায়, হাঁটতে শুরু করে, আর আমি ইতোপূর্বে ক্ষীণস্বরে ইউছুব মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দলাপাকানো শতটাকার নোটখানা পুনরায় পকেটে ঢুকিয়ে বৃদ্ধের পিছু নেই, নাগরিক মধ্যবিত্তের চেনা প্রবণতা আমাকে পেয়ে বসে, আমার জানতে ইচ্ছে করে এই বৃদ্ধের তিব্বত ৫৭০ সাবান প্রেমের রহস্য। বৃদ্ধ সোজা নদীর দিকে হেঁটে চলে। মানুষকে প্রশ্ন করতে আমি সাধারণত দ্বিধাগ্রস্ত হই না। হতে পারে প্রশ্ন করাটাই আমার কাজ। তবু আমি এক মুহূর্তে খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি, কী বলে আমি কথা শুরু করব, ‘চাচা আপনার নাম?’ নাহ্! তবে কী, ‘এই যে বুড়ো, একটু দাঁড়ান।’ নাহ্! তাও হয় না। আমি হাঁটতে থাকি তার পেছনে। কিঞ্চিৎ দূরত্ব বজায় রেখে, দেখতে থাকি তাকে। তার পরনে থাকা লুঙ্গিটা নিচের দিক থেকে হাঁটু পর্যন্ত তোলা। মাথার চুল ছোট করে ছাটা প্রায় পাকা চুলগুলো দেখে মনে হয় বেশ শক্ত। মৃত্যুর পূর্বে এগুলো মাথা থেকে যাবে না। জীর্ণ সাদা স্যান্ডোগেঞ্জিটা পিঠ ও পেটের মাঝামাঝি ছেড়া, কাঁধের লোমগুলোও পাকা, ঘামসিক্ত বোগল থেকে অনাদৃত পাকা লোম পেছন দিকে বেরিয়ে আছে, মেরুদ-টা সোজা, হাঁটায় কোনো জড়তা নেই। দেখতে দেখতে আমরা নদীর ঘাটে পৌঁছে গেছি। বুড়ো তো নেমেই পড়বেন, তবে তিনি নামলেন না। কিছু একটা মনে করে নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেনÑ
‘চাচা একটু কথা বলি?’ আমার দিকে না তাকিয়েইÑ

‘সময়টা ছিল ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি যখন আকাশের রূপও থাকে বিচিত্র। এই মেঘ তো এই তীব্র রোদ। নব ঘোরাতে ঘোরাতে সে মাথার ওপর তীব্র রোদ অনুভব করে, নব ঘুরিয়ে চ্যানেল পেতেই তারা একটি নজরুল গীতি শুনতে পায়। মাথা তুলে সে দেখতে পায় তাকে অথবা তার রেডিওকে ঘিরে একটি ছোট জটলা পাকিয়ে উঠেছে। নজরুল গীতি শেষ হয়।’
‘জ্বে বলেন!’
‘এখানে প্রচ- রোদ, চলেন একটু ছায়ায় যাই।’
‘না, খরায় আমার কিছু হয় না, আপনি এইহানেই কন।’
‘জ্বি, আপনি কি সব সময় ৫৭০ সাবানই কেনেন?’
‘হ, কেন?’
‘জ্বি, দোকানে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম আপনি…।’
শেষ করার আগেই তিনি আমাকে থামিয়ে দিলেন, আমি ভাবলাম ঐ কথাগুলো শুনে ফেলায় তিনি অনধিকার চর্চার অভিযোগ তুলবেন, কিন্তু নাÑ
‘ও আমার ভাইরবেটা অয়, তাই অমন করে কয়।’
‘না, মানে দোকানদারের বিষয় নয় আমি আসলে জানতে চাইছিলাম তিব্বত ৫৭০ সাবানের বিষয়টা।’
‘আচ্ছা তাইলে ছায়ায় চলেন।’
‘জ্বি!’
আমি তার নাম জানতে চাই। সে তার প্রচলিত নামটাই আমাকে জানায়। গল্পের শুরুতে যুদ্ধকালে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাওয়া তাদের বাড়িটার কথা স্মরণ করে সে, নদীর ওপারে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। যুদ্ধ-পরবর্তী তীব্র অভাবের সময়ে কাজের খোঁজে এদিক-ওদিক ঘুরে প্রায় দিগ্ভ্রান্তের মতোই সে ডাকবাংলোর ঘাটে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে সে জাহাজের পাথর নামানোর কাজ নেয়। আমি বুঝলাম একটা বিশেষ সময়ে বড় বড় পাথরের চাই কিংবা ঝুড়ি মাথায় করে ওঠানো-নামানোর জন্যই হয়তো এই বয়সেও তার মেরুদ- এতটাই অক্ষত আর সোজা রয়ে গেছে। সেখানে তার প্রায় দুবছরেরও বেশি সময় কেটে যায়। সে বলতে থাকে, এই সময়ে সে বেশ কিছু টাকা জমিয়ে একবার বাড়ি ফিরে আসে পুড়ে যাওয়া ঘরের ডোয়ার ওপর একটা নতুন দোচালা ওঠাবার ইচ্ছে নিয়ে, তবে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠে না। সে আবার তার জাহাজ থেকে পাথর নামানোর কাজে ফিরে যায়। এবং সেইদিন অর্থাৎ যেদিন তার শেখ সায়েবকে হত্যা করা হয়। সে ছিল ডাকবাংলোর ঘাটে ফেরার দীর্ঘ একাকী হাঁটা রাস্তায়। বাড়ি থেকে কিঞ্চিৎ মেঘ মাথায় করে বেরোলেও পথে নামার পর আর মেঘ ছিল না। তবে নদীর পাড় ধরে হেঁটে যেতে যেতে মাথার ওপর সে অনেক শকুন উড়তে দেখেছিল বলে আমাকে জানায়। এবং এই শকুনেরা তার সাথে প্রায় ডাকবাংলোর ঘাট পর্যন্ত উড়ে এসেছিল। সে রাতে কেন যেন তার পায়ে একটি অচেনা ব্যথাজনিত আড়ষ্টতা সে অনুভব করে। ডেরায় ফিরে আর বিশেষ বিলম্ব না করে ঘুমিয়ে যায়। সকাল বেলা ঘুম ভাঙার পর থেকেই বাতাসে একটি কী যেন বিষাদের সুর সে শুনতে পাচ্ছিল। যে সুর সে আগেও একদিন শুনেছিল যেদিন আকরাম রাজাকারের সাথে আসা পাকমিলিটারি তার পিতাকে উঠোনের ওপর চিৎ করে শুইয়ে বুকে পেটে বেয়নেটের চারটি খোঁচায় হত্যা করেছিল। সেদিন সে তাদের গ্রামের অন্যান্য যুবকের সাথে দূরের বিলে গিয়ে পালিয়েছিল। এসব বলতে বলতে সে জানায় মিলিটারির হাতে তার বোনের ‘বেইজ্জতি’ হবার কথা। ইজ্জত খুইয়েও বোনটা তার বেঁচে ছিল পুরোটা যুদ্ধের সময়। পরবর্তীকালে মিলিটারির গ্রামে হানা দেবার সংবাদে তারা যখন দলবেঁধে নৌকায় করে দূরের গ্রামে গিয়ে পালাত তখন অন্যেরা তার সেই সম্ভ্রম হারানো বোনটাকে নৌকায় তুলতে চাইত না। এমনকি নৌকায় ওঠার পর অন্য মহিলারা তার সাথে কথা পর্যন্ত বলত না। এই নিরতিশয় গ্লানিকর জীবন নিয়ে তার সেই বোনটা যুদ্ধকালে বেঁচে থাকলেও যুদ্ধশেষে সবাই যখন ফিরে আসে তখন আর সে নিজেকে ধরে রাখতে সক্ষম হয় না এবং পরিণামে পরনের জীর্ণ শাড়িটার আঁচল গলায় পেঁচিয়ে খালের ওপর নুয়ে পড়া বিরাট হিজল গাছটায় ঝুলে পড়ে আত্মহত্যা করে।
সেদিন বাতাসে ধেয়ে আসা কান্নার সুর তাকে সকাল থেকেই আলোড়িত করে তোলে। একটু বেলা করে সে কাজে যোগ দেয়। ঘাটে আসার পর ইলিয়াস নামে তার এক বন্ধু স্থানীয় শ্রমিক তাকে তার রেডিওটার কথা মনে করিয়ে দেয়। চারপাশে এক ধরনের নীরবতা সে লক্ষ করে। পাথরের স্তূপের পাহারাদার, যার দায়িত্ব হলো বিচিত্র রকমের গালিতে সারাদিন পাথর শ্রমিকদের তটস্থ করে রাখা আর ঝুড়ির গণনায় কম ধরা। আজ রহস্যময় কারণে তাকে চুপ করে থাকতে দেখা যায়। কোমরের গামছাটা সে শক্ত করে বাঁধে মাথার ফেট্টিটা বাঁধবার সময় ইলিয়াস পুনরায় তাকে তার রেডিওটা নিয়ে আসার জন্য তাড়া দেয়। এদিক-সেদিক তাকিয়ে সর্দারের হাকডাক শুনতে না পেয়ে সে ফেট্টি বাঁধায় ক্ষান্ত দিয়ে ডেরায় গিয়ে রেডিওটা নিয়ে আসে। সে আমাকে বলে, সময়টা ছিল ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি যখন আকাশের রূপও থাকে বিচিত্র। এই মেঘ তো এই তীব্র রোদ। নব ঘোরাতে ঘোরাতে সে মাথার ওপর তীব্র রোদ অনুভব করে, নব ঘুরিয়ে চ্যানেল পেতেই তারা একটি নজরুলগীতি শুনতে পায়। মাথা তুলে সে দেখতে পায় তাকে অথবা তার রেডিওকে ঘিরে একটি ছোট জটলা পাকিয়ে উঠেছে। নজরুলগীতি শেষ হয়। অনির্ধারিত খবরের বিপ বেজে ওঠে। যা শোনা যায় তা হলো : ‘শেখ মুজিবে’র লাশ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বুকটা তার ধক করে ওঠে। বিশ্বাস হতে চায় না। ইলিয়াস তার দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘খবর তাইলে সত্যি।’ বিমূঢ়ের মতো সে বসে থাকে রেডিওর মুখোমুখি। কতক্ষণ তা ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারে না। দূর থেকে আকাশ ফাটিয়ে হেলিকপ্টার আগমনের শব্দ কানে আসে। কে যেন বলে ‘ডাকবাংলোয় নামবে।’ রেডিওর কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ‘আমি দৌড় শুরু করি’ বৃদ্ধ আমাকে বলে যেতে থাকে। হেলিকপ্টারের পাখার বাতাসে ডাকবাংলোর মাঠ দিয়ে ধুলো উড়তে থাকে। সাত-আটজন পুলিশ মাঠে চৌকি বসিয়েছে। আস্তে আস্তে হেলিকপ্টার মাটিতে নামে। পুলিশ সবাইকে কাছে যেতে নিষেধ করে, বাঁশি বাজায়। কেউ অবশ্য কাছে যাবার জন্য পড়িমরিও করে না। উপস্থিত সকলের মুখে একটি ভয়ার্ত বিষাদ খেলা করে। বৃদ্ধের মনে হয় হেলিকপ্টারের দরজা খুললেই রেডিওর খবর মিথ্যে হয়ে যাবে। সাদা পা’জামার পা নেমে আসবে মাটিতে। আর তারা সবাই তার পিছু নেবে সেবারের মতো। এই পর্যন্ত বলে বৃদ্ধ আরও বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আমি তাকে গল্পে ফিরিয়ে আনি, বলিÑ ‘থামবেন না, দয়া করে বলে যান।’ Ñ ‘সেবার যখন ভোটের আগে শেখ সায়েব শহরে আইছিল, আমি সেদিন কী যেন কাজে শহরে গেছিলাম। মানুষ আর মানুষ। দোকানপাট বন্ধ করে মানুষ সব শেখ সায়েবের পিছন-পিছন চলে আসে। শেখ সায়েব কাঁচাবাজারের সামনের বড় রাস্তাটা দিয়ে ঘাটের দিকে যাচ্ছিল, ভিড়ের চাপে কীভাবে যেন আমি তার সামনে আইসে পড়ি। বিশাল সেই হাত দিয়ে শেখ সায়েব আমারে তার কাছাকাছি টাইনে নেয়। আমি তার মুখ দেখতে পারি নাই। খালি আকাশের মতোন বিশাল বুকখান দেখছি। ভয়ে খুশিতে আমি তারে ছুঁয়ে দেখতে পারি নাই। সে আমারে আমার গ্রামের নাম জিজ্ঞেস করে আর কয় সবাইরে নিয়ে সকাল সকাল ভোট দিবার যাবি।’
বৃদ্ধ আবার আনমনা হয়ে যায়। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকে। আমি তাকে বলি, হেলিকপ্টার নামার পরে কী হলো? বৃদ্ধ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে যায়, আমি শুনতে থাকি,Ñ হেলিকপ্টারের দরজা খুলে হাতে লাঠি নিয়ে একজন আর্মি অফিসার নেমে আসে, উপস্থিত পুলিশ অফিসারকে কী যেন বলে ইংরেজিতে। অফিসার কাচুমাচু হয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। তার সেপাইয়েরা আরও জোরে বাঁশি বাজাতে থাকে। মানুষের জটলা পিছিয়ে যায়। বিশাল লাশের বাক্স হেলিকপ্টারের দরজা দিয়ে টেনে নামানো হয়। দশ-বারোজন সেনা সেই বাক্স কাঁধে তুলে নিয়ে ‘শেখ সাহেবে’র বাড়ি অভিমুখে রওনা হয়। ‘আমি পাশে পাশে হাঁটতে থাহি।’ একজন আর্মি তাকে ধমক দেয়। ধমক খেয়ে সে রাস্তার পাড় ছেড়ে আরও নিচ দিয়ে পানির কাছাকাছি লাশের বহরের সাথে দৌড়াতে থাকে। ‘শেখ সাহেবে’র বাড়ির সামনে গেলে পুলিশ তাকে পুনরায় আটকায়। ভেতরে ঢুকতে দেয় না। আরও লোক সেখানে এসে জমা হয়। আর্মি লাশ নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে। পূর্ব থেকে খুঁড়ে রাখা কবর বাহির থেকে দেখা যাচ্ছিল। বাহির থেকে দেখে কবরটাকে অনেক ছোট মনে হচ্ছিল বৃদ্ধের। সে মনে মনে ভাবছিল, এত বিশাল দেহ এমন ছোট কবরে ঢুকবে কেমন করে। আর সে পায়ে পায়ে বাড়ির ভেতরে যাবার সুযোগ খুঁজছিল। ভালো করে বাড়ির ভেতরে তাকিয়ে সে ঘাট মসজিদের ইমামকে দেখতে পায় আর্মি অফিসারের সাথে কথা বলতে। পরে সে জানতে পারে আর্মি ইমাম সায়েবকে লাশের গোসল ছাড়াই কবর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ইমাম সায়েব রাজি না হওয়াতে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে লাশ কবরস্থ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইমাম সায়েব বেশ শব্দ করে চার-পাঁচজন লোক ভেতরে আসতে বলে। ‘আমি এক লাফে সবার আগে ইমাম সায়েবের পাশে যেয়ে দাঁড়াই’ এভাবেই বলে চলেন বৃদ্ধ। লাশের বাক্সে তালা দেওয়া ছিল। দুজন সেনাসদস্য ঝুঁকে পড়ে লাশের বাক্সের তালা খুলে দেয়। তালা খোলার পর আইয়ুব মিস্ত্রী কাঠের বাক্সের ওপরের অংশটি ছোট শাবলে চাড়িয়ে উন্মুক্ত করে। আমি বৃদ্ধের কোটরিস্থিত চোখের দিকে তাকাই, ঘোলা, ভাষাহীন, বিষাদ ছাড়া আর কিছুই পড়া যায় না। ধরে আসা গলা কাশি দিয়ে পরিষ্কার করে তিনি বলতে থাকেন। বাক্স খোলার পর মিলিটারি অফিসার ইমাম সায়েবকে বলে, ‘হইছে এবার কবর দেন’ ইমাম সায়েব লাশের গোসল করানোর জন্য পীড়াপীড়ি করেন। মিলিটারি অফিসার তাদের মাত্র দুই মিনিটের সময় দিয়ে গোসল জানাজা সব শেষ করতে হুকুম দেয়। এসব কথাবার্তা হচ্ছিল বৃদ্ধের পিছন দিকে, বৃদ্ধ তখন কফিনের পাশে বসে একদৃষ্টিতে দেখছিল ‘শেখ সায়েবে’র রক্তাক্ত মুখ। ইমাম সায়েব এগিয়ে এসে কফিনে শোয়া ‘শেখ সায়েবে’র পিঠের নিচে হাত দেন, অন্যেরা তখন হাত লাগিয়ে লাশকে কফিন থেকে তুলে পাশে শাড়ি টাঙ্গিয়ে যে আড়াল তৈরি করা হয়েছে সেখানে নিয়ে যায়। ‘শেখ সায়েবে’র গায়ের ওপর একটি তোয়ালে জড়ানো ছিল, পকেটে ছিল চশমা। কে যেন তার দিকে একখানা ব্লেড এগিয়ে দেয়। ইমাম সায়েব সেই ব্লেড দিয়ে গায়ের পাঞ্জাবি কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। কম্পমান হাতে তিনি বুকের ওপর থেকে নিচ সে পাঞ্জাবি কেটে ফেলে। খোলার সময় সেই পাঞ্জাবির সাইড পকেটে শক্ত কী যেন একটা তার হাতে পড়ে। বের করে তারা দেখে ‘শেখ সায়েবে’র প্রিয় সেই পাইপ, তখনও তামাকের চনমনে তাজা গন্ধ ছড়াচ্ছে। দেখার জন্য পাইপটি তার হাত থেকে অন্য একজন হাতে নেয়। ইমাম সায়েব মৃদু গলায় দ্রুত করার নির্দেশ দেন। খোলা সেই শরীর ‘আমি দেখতে থাকি’, বুকের নিচে গোল হয়ে একঝাঁক গুলি ঢুকেছে। গুলির ছিদ্রগুলোর মুখ দিয়ে রক্তের ধারা বেয়ে নেমেছে, প্রথমে নিচে তারপর বায়ে, কোনোটা ডানে। বার বার কোত্থেকে মরার পানি এসে তার চোখ ভরিয়ে তুলছিল। গুলিগুলো ঢুকেছিল চক্রাকারে। ইমাম সায়েব বলেছিল, ‘শেখ সায়েবে’র শরীরে লাগা গুলির সংখ্যা গুনে দেখতে। বুকের গুলিগুলো সে তিনবার গুনেছে। একবার সংখ্যা হয়েছে নয়, তো আরেকবার দশ, তারপর আট। তারপর ইমাম সায়েব নিজে ‘শেখ সাহেবে’র সারা শরীর খুঁজে সর্বমোট আঠারোটি গুলির সন্ধান পায়। এমন পরিস্থিতিতে তার হঠাৎ ‘শেখ সাহেবে’র সেই হাতের কথা মনে পড়ে, যে হাত তিনি একবার তার কাঁধে রেখেছিলেন। ‘শেখ সায়েবে’র বাঁ-হাতের তর্জনিটা একটুর জন্য উড়ে যায়নি। ডান হাতের তলায় গুলি লেগে ছিদ্র হয়ে গেছে। কোন হাত, আহ্! কোন হাত তিনি আমার কাঁধে রেখেছিলেন! ডান হাতই হবে, কেননা কাঁচাবাজারের কর্দমাক্ত সরু গলিটা দিয়ে সে ‘শেখ সাহেবে’র ডান পাশ দিয়েই বেরিয়েছিল। এ সময় তার ‘শেখ সাহেবে’র দীর্ঘ পা-যুগলের কথা মনে হয়, যা দিয়ে তিনি সারাজীবন রাজপথ আর দেশের আনাচে-কানাচে হেঁটেছেন, 44বাকিরা দৌড়েও তার সাথে মিলিয়ে গতি ধরে রাখতে পারে নাই। ‘আমি তহন ফাল দিয়ে শেখ সায়েবের পা’র কাছে যাই। দুইডা পাও তার জমাটবান্ধা রক্তে লাল হয়ে রইছে। পাও দুইডার রগ কাইটে দিছে, ওই পাও দিয়ে সে আর হাঁটতি পারবে না। কোমরের গামছা বালতির পানিতে ভিজিয়ে ‘শেখ সাহেবে’র পায়ে লেগে থাকা জমাট রক্ত মুছে পরিষ্কার করার জন্য সে সাবান হাতে নেয়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে ‘এই দ্যাহেন, এই যে, এই সেই সাবান’ বলে বৃদ্ধ তার কথিত ‘ভাইপো’ ইউছুব মিয়ার দোকান থেকে আনা তিব্বত ৫৭০ সাবানখানা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে।
আমার বোধহয় এই অজানা বৃদ্ধের তিব্বত ৫৭০ সাবান প্রীতির রহস্য আবিষ্কার করা হয়ে গেছে। আমি কি এখন তাকে থামতে বলব? আমার কি ভণিতা সর্বস্ব সান্ত¡নামূলক কিছু কথা বলে এই বৃদ্ধের নিকট থেকে বিদায় গ্রহণ করা উচিত? সেই ভাবনা থেকে বৃদ্ধ নিজেই আমাকে মুক্তি দেয়, বলেÑ ‘আপনি যান, এহন গোসল করব না, আমার অন্য কাম আছে’, বলেই জোর পায়ে বিস্শুদবারের জমে ওঠা হাটের জনারণ্যে হারিয়ে যায়। আমি ধীর পায়ে হাঁটুরে মানুষের ঘর্মাক্ত শরীরের স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ওপরে উঠে আসি। সিগারেটের নেশা আর পানির তেষ্টা ভেতরটাকে গুলিয়ে ফেলছে। ইউছুব মিয়ার দোকানের সামনে এখন কিছুক্ষণ আগের মতো অতটা ভিড় নেই তবে চার-পাঁচজন লোক বসে আছে বাঁশের তৈরি বেঞ্চটার ওপর। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই, পকেট থেকে দুমড়ানো ঘামে ভেজা নোটখানা বের করে ইউছুব মিয়ার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলিÑ ‘একটা তিব্বত ৫৭০ সাবান দেন!’ ইউছুব মিয়া আমার হাত থেকে নোটখানা নিয়ে বলে, ‘আরে ভাই, আপনি না এক প্যাকেট সিগারেট কিনতে আইছিলেন ক্ষাণিক আগে? বুজছি, হেমো ফহিরের পিছ পিছ ঘাটে গেছিলেন, এহন কী নেবেন? সাবান না সিগারেট?’
আমি বললাম, ‘দিন! আমাকে বরং একটা ৫৭০ সাবানই দিন।’

Category:

মধুমতীর চাঁদ

Posted on by 0 comment

‘ কিন্তু কবিরাজ থামেন না। মাস্টারের স্কুল আছে। ঘরে বউ আছে। কিন্তু একটা বাচ্চা নাই। এক রাইতে মাস্টার আমার হাত ধইরা কইলÑ ‘কবিরাজ, আমার সব আছে, শুধু সংসারে সুখ নাই।’

41রেজা ঘটকঃ সীমান্তপুর গ্রামে ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের উঠোনে বিচার দেখতে আসা উৎসুক জনতার মতো, গোধূলি না যেতেই উঁকি দিল শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী চাঁদ। পল্লী বিদ্যুৎ না পৌঁছালেও অমন ধবধবে জ্যোৎ¯œায়, খোলা আকাশের তলায় মাটির বিছানায়, আসন নিতে কারও কোনও অসুবিধা হলো না। দু-একজনের সঙ্গে থাকা হ্যারিকেনের ঢিবঢিবানি আলোগুলোও যে যার সুবিধামতো নিভিয়ে ফেললেন। মৃদু শোরগোলের মধ্যে একমাত্র হাতল ভাঙা চেয়ারটাতে সীমান্তপুরের টানা পঁয়ত্রিশ বছরের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ইজ্জৎ আলীও নিজের আসনে বসলেন। মুহূর্তে পাশের চারপায়া নড়বড়ে বেঞ্চিটাও গায়েগায়ে ভরে গেল। চাঁন্দুর বাপ কই? ইজ্জৎ আলীর স্বভাবসুলভ গলা। শোরগোলটা একটু থেমে আবার যেন বাড়ল। একেবারে পেছনের সারি থেকে টুপি মাথায় গামছা গায়ে বকের মতো কুজো বয়স্ক যে লোকটা বিলি কেটে কয়েক ধাপ সামনে গিয়ে বসতে উদ্যত, সেই কি চাঁন্দুর বাপ? উপস্থিত সবাই যে লোকটিকে অনেকদিন থেকে গভীরভাবে চেনেন, নতুন করে আবার সবাই সেই লোকটিকে সার্কাসের সঙের মতো এক নজর দেখলেন। যেন ভীন গ্রহের কোনো রহস্যমানব শশীতলে পদার্পণ করতে গিয়ে ভুলবশত এইমাত্র স্বয়ং পৃথিবী পৃষ্ঠেই অবতরণ করলেন। কেউ কেউ বললেনÑ আরও সামনে যান। বেঞ্চিতে বসা টর্চলাইট হাতে গোঁফওয়ালা লোকটি সেই ফাঁকে চেয়ারম্যান সাহেবের কানে কানে জরুরি কথাগুলো ফিসফিস করে কানিমুখী করলেন। পঁচাত্তর বছর বয়সেও ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের ধৈর্যশক্তিটা মাশাল্লা ভালোই। কথা শেষ করে গোঁফ বাঁকিয়ে হাতের টর্চলাইটটা বাম কাঁধে ঝুলিয়ে লোকটা আবার আগের মতো পেছনের বেঞ্চিতে গাদাগাদি করে বসলেন। চেয়ারম্যান সাহেব এবার কিছুটা ধমকের সুরে প্রশ্ন করলেনÑ চাঁন্দুরে ডাকো? ওপাশ থেকে ক্ষীণকণ্ঠে জবাব এলোÑ হেয়তো বাড়িত নাইকা। ভাইগ্যা গ্যাছে। এই ফাঁকে কেউ কেউ উপচেপড়া ভিড়ের মধ্যে দরকারি কাশি কাশল, কেউ গলা থেকে কফ খসাল, কেউ আবার আরামছে বিচি চুলকাতে গিয়ে কি খুব গোপনে একটা আকামও করল? ওপাশের অনেকের মধ্যে জায়গা ছেড়ে উঠে যাওয়ার লক্ষণ কি সেই গন্ধময় গোপন বায়ুকর্ম?
জনতার শোরগোল থেকে জবাব শুনে সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান। কোথায় গ্যাছে? সবাই একদম চুপ। একটু আগের ঝিরঝির গুঞ্জনটাও যেন ভাষা হারিয়ে ক্ষণিকের জন্য নির্বাক হয়ে গেল। চেয়ারম্যান সাহেবের কলেজ পড়–য়া নাতনি লাইলীরে নিয়া দিনদুপুরে চাঁন্দু যে সবার চোখ ফাঁকি দিয়া সীমান্তপুর থেকে ওভাবে পালাতে পারে তা কে জানতো? তা ছাড়া ভালো ছাত্র হিসেবে চাঁন্দুর চারদিকে যেরকম নাম-ডাক, সেই ছেলের বইয়ের চেয়েও অন্যকিছুর প্রতি অমন আসক্তি থাকতে পারে তা আগে থেকে কেউ জানলে তো? বরং তিন মাস আগে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে নানা-নানীর অতি উৎসাহে, নানার প্রতিষ্ঠিত কলেজে লাইলীর ওভাবে ভর্তি হওয়াতে কলেজের মাস্টাররা পর্যন্ত চমকে গিয়েছিলেন। শান্ত লক্ষ্মী মেয়ে লাইলী। অনেকটা অপরিচিত চাঁন্দুর সাথে এত অল্প সময়ে কী করে তেপান্তর হবার মতো ভাব হতে পারে সেটাই সবার কাছে একটা বিশাল রহস্য।
নীরবতা ভাঙল ঠকঠক করে হেঁটে আসা একজোড়া খড়ম। খড়মের উৎস যে সীমান্তপুর গ্রামের গত পঁচিশ বছরের মেহবান, রোগ-ব্যাধির দুর্যোগকালে বিনা ফি’তে রোগী দেখা, সারাক্ষণ নির্লিপ্ত থাকা জানু কবিরাজ, সে বিষয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ নেই। অমন খড়ম দশ গাঁয়ে আর কারও থাকলে তো? একেবারে চাঁন্দুর বাপ যেখানটায় বসা, ঠিক তার পেছনে গিয়ে কবিরাজ নীরবে দাঁড়ান। কেউ একজন একটা টুল এনে দেয় তাকে বসতে। বসার সুযোগ পেয়েই সবচেয়ে কম কথা বলায় অভ্যস্ত এতদিনের পরিচিত জানু কবিরাজের মুখে কোথা থেকে এলো আজ টগবগে খৈয়ের মতো গরম গরম শব্দ? বাক্যের পর বাক্য? নির্মেদ সত্য সব বুলি, যেন ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে বাক্যের বন্যা বইছে। বিচার চাই, চেয়ারম্যান ছাব। আমার নিরুদ্দেশ বেটির সন্ধান চাই। কেউ কেউ এই সুযোগে ফিসফিস করে উঠল। কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি। একটা অজানা রহস্যময় বাক্যালাপ উপস্থিত সকলকে যেন সেই মুহূর্তে কিছুটা হলেও ব্যস্ত করে তুলল।
জানু কবিরাজ চিরকুমার। যাযাবর। সুন্দরবনের কাছাকাছি এখন যেখানে মংলা বন্দর। তার ওপারে বাজুয়া বাজারের কাছে জানু কবিরাজের পূর্ব পুরুষদের বাস। এমনটিই শুনেছে সবাই। গ্রাম-শহর-নগর-বন্দরে ছিন্নমূল মানুষের মতো ঘুরেঘুরে কবিরাজি বিদ্যায় হাত পাকিয়ে বাকেরগঞ্জ থেকে কলকাতা পর্যন্ত সুনাম যার, সেই জানু কবিরাজের একটা কন্যা আছে, যে কিনা আবার নিরুদ্দেশ, কী কারণে নিরুদ্দেশ, কাদের বিচার চায়-কবিরাজ? জানু কবিরাজকে অমন ক্ষুব্ধ আর উত্তেজিত হতে আগে কেউ কখনও দেখেছেন?
ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান জানু কবিরাজকে বন্ধুর মতো ভালোবাসেন। নিজেই উদ্যোগী হয়ে পুরান বাড়ির কাচারি ঘরে জানু কবিরাজকে স্থায়ীভাবে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। কোনো বিষয়ে কখনও কোনো পরামর্শ লাগলে কবিরাজই বলতে গেলে গত দুই যুগ ধরে চেয়ারম্যানের একমাত্র ভরসা। সেই কবিরাজ আজ কেন অমন রুদ্রভাবে ফুঁসে উঠলেন? এমন একটা ভাবনা কিছুক্ষণের জন্য বুঝিবা ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানকেও পেয়ে বসে। তবে কি জানু করিরাজ হিমাদ্রী বাবুর হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়ের কথাই বলছেন? সে গল্প তো কবিরাজ হাজারবার শুনিয়েছেন। যুদ্ধের সময়কার সেই রাতের গল্প। সেই গল্পের সাথে চাঁন্দু-লাইলীর উধাও হওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়? ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান চিন্তা করেও কবিরাজের বিচার চাওয়ার প্রসঙ্গে কুলকিনারা পায় না।
তা ছাড়া কবিরাজের মুখে হিমাদ্রী শেখর মাস্টারের মেয়ে হারানোর গল্পটা যতবারই তিনি শুনেছেন ততবারই ঘটনার সঙ্গে মাত্র একজন লোকেরই নাম বলেছেন কবিরাজ। অম্বরেশ বাবু। সেই রাতে অম্বরেশ বাবুর দোকানে তারা দুজনÑ কবিরাজ আর তপু জলপানের সঙ্গে কিছু নাস্তাও খেয়েছিলেন। তারপর তারা পায়ে হেঁটে খেয়াঘাট পর্যন্ত যায়। মধুমতীর ওপারেই সাঁচিয়া বাজারের কাছে হিমাদ্রী বাবুর শ্বশুরবাড়ি। তপু কবিরাজকে নিয়ে মামা বাড়িতে রাতটুকু থেকে পরদিনই বাবা হিমাদ্রী শেখরের চিতা দর্শনে যাবে। কলকাতায় বিয়ে হবার পর ওই রাতে প্রথম সে কবিরাজের সঙ্গেই জন্মস্থানে ফিরছিল। উদ্দেশ্যটি পরিষ্কারÑ বাবার চিতা দর্শন। আর ওরকম মহৎ একটা কাজে জানু কবিরাজই যে তপুকে সন্তান ¯েœহের মতো যোগ্য সঙ্গ দিতে পারেন তা তো যে কেউই বিশ্বাস করবেন। কিন্তু সেই রাতে তপুর অমন অলৌকিকভাবে মধুমতীতে নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় কবিরাজ তো আজকের মতো আগে কখনোই এমন উত্তেজিত হয় নি? রহস্যটা কোথায়? জ্যোৎ¯œার কোমল আলোতেও ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করে ওঠে।
জানু কবিরাজ উত্থাপিত ঘটনার আকস্মিকতায় চাঁন্দু-লাইলীর পালিয়ে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়োজিত বিচারে উপস্থিত সবার মুখে যেন খিল লাগে। জানু কবিরাজ দুই যুগ আগে ঘটে যাওয়া একটা দুর্ঘটনার, আজ কেন চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে বিচার চাইছেন? সেই জিজ্ঞাসাও জাগে উপস্থিত অনেকের মনে। নাকি জানু কবিরাজ পাগল হয়ে গেল! পাগলামো কইরো না, কবিরাজ। আইজ আমার দুঃখের শ্যাষ নাই। আমার লাইলী কিনা চাঁন্দুর মতো পোলার হাত ধইরা পালাইছে। তুমি ভাবতে পারো কবিরাজ? আহন দশ গ্যারামের সক্কলে জানে, আমি ক্যামুন কেলেঙ্করিতে পরছি। এইসবের মইধ্যে তুমি মাস্টারের মাইয়ার কথা তুলতে পারলা, কবিরাজ? চেয়ারম্যানের গলায় বিনয়ের সুর।
পাগলামো কে করতাছে চেয়ারম্যান? আমি? না তুমি? নাকি তোমরা? আগের ঘটনার আগে বিচার হইরো? নাকি পরের ঘটনার আগে? কোনটার আগে বিচার হওয়া উচিত চেয়ারম্যান? জানু কবিরাজ প্রশ্নের লহোরা ছুটায়ে দেয়। কালিদাশকে আমি কি জবাব দেব? কোথায় তার সোনাচাঁন বউ? কৃষ্ণরে আমি কীভাবে বুঝাব? কোথায় তার প্রাণের মা? মাস্টারকে আমি ক্যামনে কমু? কোথায় তার প্রাণের বেটি তপু? আজ যেন জানু কবিরাজ প্রশ্নের গোলা ছুটিয়ে দিয়েছেন। বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো তা উপস্থিত জনতার মনেও যেন চাঁন্দু-লাইলীর ঘটনার চেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করেছে। কবিরাজকে শান্ত করতে ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে সেয়ানা উকিলদের মতো কিছু তাজ্জব প্রশ্ন করেন কবিরাজকে। এক অম্বরেশ ছাড়া আর কোনো সাক্ষী আছে তোমার?
সাক্ষী। কীসের সাক্ষী? চাঁন-সুরুজ সাক্ষী। মধুমতী সাক্ষী। কাদের মাঝি সাক্ষী। সাক্ষী রামগোপাল। সাক্ষী কালিদাশ। তপুর শিশু ছেলে কৃষ্ণ সাক্ষী। আর কত সাক্ষী লাগবে তোমার চেয়ারম্যান? কলকাতা থেকে বনগাঁ পর্যন্ত সেই পথে বাসে যারা আমাদের সঙ্গে ছিল। তারা সাক্ষী। রামগোপালের পেছন পেছন বেনাপোল বর্ডার পার হবার সময়কার সেই ভোরের কুয়াশা সাক্ষী। সাক্ষী মেঠো সেই পথ। বেনাপোল থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত কয়েক দফায় কত লোক যারা সেই দিন আমাদের সাথে গাড়িতে ছিল, তারা সাক্ষী। বাগেরহাট থেকে খাসেরহাট পর্যন্ত কাদের মাঝির নৌকায় আসার পথে যারা আমাদের দেখেছে, তারা সবাই সাক্ষী। সেই রাতে অম্বরেশের দোকানে যারা হাজির ছিল। তারা সবাই সাক্ষী। মধুমতীর কূল সাক্ষী। আর ওই যে চাঁদ, সেই দিনও সে ছিল আজকের মতো নীরব সাক্ষী। আর কত সাক্ষী লাগবে তোমার, চেয়ারম্যান? কালবোশেখী মেঘের গর্জনের মতো ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের ওপর খেঁকিয়ে ওঠেন জানু কবিরাজ।
খেয়ার কাউরে কি তুমি চিনতে পারছিলা? পাল্টা প্রশ্ন করেন ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান।
Ñ আমরা খেয়ায় উইঠা বসি। জোয়ারের উজান থাকায় কিছুদূর ওরা কূল বরাবর খেয়া চালায়। তারপর হঠাৎ কি হইল? ওরা আমাকে চ্যাংদোলা কইরা ছুইড়া মারে মধুমতীতে। আমি জলের ওপর ভাইসা উঠতেই সেকি বৈঠার মার। তারপর আমি কখন কীভাবে কূলে আসলাম, কীভাবে আমার জ্ঞান ফিরল, কীভাবে বা আমি বাঁচলাম, সব ওপরওয়ালা জানেন। ফুটো কলসিতে জল রাখলে যেমন ঝরঝর করে তা পড়তে থাকে তেমনি কবিরাজের চোখ থেকে ঝরতে থাকে ফোঁটায় ফোঁটায় বাঁধ ভাঙা জল। চাঁদের আলোয় সে আঁসুর প্রভাবে উপস্থিত অনেকের চোখও তখন ছলছল করে ওঠে।
শান্ত হও কবিরাজ। ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান বিনীত অনুরোধ করেন। কিন্তু কবিরাজ থামেন না। মাস্টারের স্কুল আছে। ঘরে বউ আছে। কিন্তু একটা বাচ্চা নাই। এক রাইতে মাস্টার আমার হাত ধইরা কইলÑ ‘কবিরাজ, আমার সব আছে, শুধু সংসারে সুখ নাই। সবিতারে আমি একটা বাচ্চা দিতে পারলাম না। এই দুঃখ আমি কারে কই?’ তারপর আমি কবিরাজিতে নামলাম। বছর ঘুরতেই তপু হইল। আমার তপু বড় দুঃখিনী মেয়ে। জন্মের তিন বছরের মধ্যে মা হারাইল। স্কুল আর ঘর লইয়া বড় হইল তপু। মাস্টার আবারও আমারে ডাকলÑ  ‘এবার কন্যারে সৎপাত্রে দান কর, কবিরাজ। তুমি দেশ দেশান্তরে ঘোরো, তপুমার জন্য ভালো পাত্র তুমিই পাইবা কবিরাজ।’ বাকেরগঞ্জ থেকে কলকাতা পর্যন্ত তখন জানু কবিরাজের রোগী দেখার সে কি ব্যস্ততা? কবিরাজি ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলে খুঁজে বের করলেন জানু কবিরাজ।
সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের সময় বাইশারীতে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় কলিদাশের বাবা কালিকান্ত সিংহ খুন হওয়ার পর, দুই মেয়ে কবিতা, নমিতা আর শিশু কালিদাশকে নিয়ে হতভাগী বিধবা সাধনা রানি কলকাতা চলে যায়। কলকাতার বাঘাযোতিনে বড় বোন প্রার্থনার সংসারে গিয়ে আশ্রয় নেয় তারা। আশ্রয় পাওয়া মাসীর সংসারে বড় হতে গিয়ে খুব অল্প বয়সেই পাক্কা ব্যবসায়ী বনে যায় কালিদাশ। হেমন্ত মেসোর পাটের গুদামে দিনরাত কত অমানুষিক পরিশ্রম তার। ওখানেই হেমন্ত মেসোর পরিচিত এক পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কালিদাশের খাতির হয়। তারপর গোটা বাঘাযোতিন, গড়েরমাঠ, পাক সার্কাস, ধর্মতলা, শিয়ালদাহ, উল্টোডাঙ্গায় দোকানে দোকানে ধূপকাঠী জোগান দেওয়ার কাজ জোটে কাশিদাশের। হেমন্ত মেসোর পাটের গুদামে ফাই ফরমায়েসের পরেও ধূপকাঠী জোগান দেওয়ার ওই কাজটা অল্প সময়ের মধ্যেই কালিদাশ বেশ দক্ষতার সাথেই রপ্ত করল। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বড় দুই বোন কবিতা আর নমিতাকে বিয়ে দিয়েছে গড়িহাটা আর লেকসার্কাসে। বাইশারীর কালিকান্ত সিংহ আর কলকাতার বাঘাযোতিনের হেমন্ত কড়াতিÑ উভয় পরিবারের সঙ্গেই জানু কবিরাজের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। সেই সূত্রে কালিদাশের বিয়ের কথা উঠলে দুই বোন সাধনা আর প্রার্থনা জানু কবিরাজকে বাগে পেয়ে তাকেই কালিদাশের জন্য একটা যোগ্য কন্যার সন্ধান দেওয়ার অনুরোধ করেন। হিমাদ্রী শেখর মাস্টারের মা-হারা মেয়ে তপুর বিয়ের জন্য কালিদাশের চেয়েও যোগ্য পাত্র আর কোথায় পাবেন জানু কবিরাজ? ফিরতি পথে তাই হিমাদ্রী মাস্টারকে কালিদাশের কথা শোনান জানু কবিরাজ। হিমাদ্রী মাস্টারও বাইশারীর কালিকান্ত সিংহকে চিনতেন। তার ছেলের সঙ্গে তপুর বিয়েÑ কবিরাজের প্রস্তাবে একবাক্যে রাজি হয়ে যান মাস্টার বাবু।
কালিদাশের সঙ্গে তপুর বিয়ের পর একমাত্র জানু কবিরাজই উভয় পরিবারের তখন যোগাযোগের অনুঘটক। বাকেরগঞ্জ থেকে কলকাতা কত হাজার হাজার রোগী জানু কবিরাজের। কত শত শত মানুষের সঙ্গে যে জানু কবিরাজের বন্ধুত্ব। যখন যে বাংলায় জানু কবিরাজ, তখন সেই বাংলায় তিনি যেন সেরা কবিরাজ। কঠিন কঠিন রোগ-বালাইয়ের কবিরাজি ছাড়াও উভয় বাংলার কত ধরনের খবরাখবর আনা-নেওয়া যে জানু কবিরাজকে করতে হয়। সেই কবিরাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরেই হঠাৎ করেই কেন কবিরাজি ছেড়ে দিলেন? কথাবার্তা কমিয়ে দিলেন। যুদ্ধের ভেতরে সেই রাতে মধুমতীতে খেয়ানায়ে জানু কবিরাজের ভাগ্যে কি ঘটেছিল? যে মেয়ে তপুর তিনি কোনো হদিস পেলেন না? কারা সেদিন খেয়ানাও থেকে তপুকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন? আর পরবর্তীতে যার কারণে জানু কবিরাজ ওভাবে পাল্টে গেলেন?
কালিদাশের সাথে তপুর বিয়ের ব্যবস্থা, সব ঘটনা তো তোমার জানা, চেয়ারম্যান। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন জানু কবিরাজ। তপু আমার বড়ই দুর্ভাগা মেয়ে। ঘরে নিজের সন্তান আসল। আর এপারবঙ্গে বাপটা গেল চিতায়। খবরটা পর্যন্ত পাইল তিন মাস পর আমার থাইকা। কালিদাশ ওরে খুব কইরা বুঝাইলÑ ‘কৃষ্ণ একটু বড় হোউক, তারপর যেও। তা ছাড়া বাবার চিতা দেরিতে দেখেও কি কষ্ট ভুলতে পারবা?’ আমিও তপুরে অনেক বোঝালাম। আবার আসলে আমিই তোরে নিয়া যামু। ততদিনে যুদ্ধ লাইগা গ্যাছে। আমি যুদ্ধে যাবার পরিকল্পনা করলাম। মেদিনীপুর ট্রেনিং করলাম টানা এক মাস। যুদ্ধ করতে দেশে ঢুকুম। মনে বড় ইচ্ছে জাগল মা তপুরে একবার দেইখা যাই। সেই যাওয়ায় তপু আমার সঙ্গ নিল। এপার থাইকা সবাই যখন ভিটেমাটি ছাইড়া ওপার যাচ্ছে, তপু তখন নিজের সন্তানরে স্বামীর কাছে রাইখা বাবার চিতা দেখতে আমার সঙ্গী হইল। উল্টামুখী যাত্রা। রামগোপাল দিন শুরু হওয়ার আগেই বর্ডার পার কইরা দিল। তারপর একটা যুদ্ধের মধ্যে বেনাপোল থাইকা অম্বরেশের দোকান পর্যন্ত কত যে সতর্কতা, চেয়ারম্যান। আর তারপর মধুমতীতে আইসাই কিনা সব শ্যাষ। আমি কি এই দেখতে চাইছিলাম? তুমি কও, চেয়ারম্যান?
ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান এ পর্যায়ে উঠে গিয়ে আবারও জানু কবিরাজকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জানু কবিরাজের চোখে তখন যে ক্ষোভাশ্রু তা নিবারণ করবে কে? আইজ আমারে কইতে দাও, চেয়ারম্যান। আইজ তুমি কিসের বিচার করবা? কার বিচার করবা? কার কার বিচার করবা? দ্যাশ স্বাধীন করলা। জনগণের প্রতিনিধি হইলা। নেতারে মাইরা ফেলাইলা। তার বিচার করতে পারছো তোমরা? আইজ কিসের বিচার করবা? কোন বিচারটা আগে করবা? ওই মধুমতীরে আমি আর দু’চক্ষে দেখতে পারি না। ওই চাঁন্দের দিকে আমি আর চাইতে পারি না। আমার বিচার কে করবে, চেয়ারম্যান? বলতে বলতে ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের হাতের ওপরেই মূর্ছা যায় জানু কবিরাজ। ততক্ষণে উঠানভর্তি জনতার শোরগোলটা আবারও উথলে ওঠে। চুপিচুপি ত্রয়োদশীর চাঁদ তখন নীরবে বলে ওঠেÑ দ্য নাইট ইজ সো ইয়াং, পিপল। সে কথা সেই হই হট্টগোলের মধ্যে কেউ কি আর শুনতে পায়?

Category:

স্বাতি যাবে দেবালয়ে

Posted on by 0 comment

‘জীবনে কখনও ট্যাক্সিতে ওঠেনি স্বাতি। বরের ভাড়া করা এসি গাড়িতে বসে আনন্দে উদ্বেলিত স্বাতি বধূবেশে রানির হালে শ্বশুরবাড়ি রওয়ানা হলো, লালবাগের বস্তিকে পেছনে ফেলে।’

49আনিস আহামেদ: বারো বছরের কিশোরী স্বাতি। দুধে আলতা গায়ের রং। ছিপছিপে দেহ। দিঘল কেশ। কালো মায়াবী চোখ। ওর কোনো রূপচর্চার প্রয়োজন পড়ে না। এমনিতেই সবার নজর কাড়ে। ওর মায়ের আদলই পেয়েছে। নি¤œ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। স্বাতির মায়ের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না এখন।
পুরনো ঢাকার বস্তিতুল্য এক পাড়ায় ওদের বাস। ওর ঠাকুরদা পর্যন্ত ঋষি নামেই পরিচিত ছিল। একসময় ওদের পাড়ার সবাই কাঁচা চামড়া পচিয়ে পাকা করত বলে স্থানীয় নাম চামারটুলি। এখন সবাই নামের পাশে দাস লেখেন। হাজারীবাগ ট্যানারি হওয়ার পর ওদের পেশা বদলে যায়। হাতে চামড়ার স্যান্ডেল বানাতে ওদের পাড়ার অধিকাংশ মানুষ। কেউ কেউ মুচিগিরি করেন এখনও। ব্যান্ড পার্টিতে বাদ্য বাজানো বা শ্মশানে জ্বলন্ত চিতার সামনে কীর্তন করা কারও কারও পার্ট টাইম জব। আগে জীর্ণশীর্ণ ঘুপসি ঘর ছিল বেশির ভাগ। পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছিল সেকেলে।
স্বাতির ঠাকুর দাদা সকালে জন্ডিস রোগীদের হাত ধোয়ানোর টোটকা চিকিৎসা করতেন। দিতেন ডাব পড়া। এই সামান্য আয়ে সংসার চলত না। তাই রিকশা চালাতেন আধাবেলা। ওর বাবা-কাকারা তিন ভাই, সবাই শৈশব থেকেই জুতা বানানোর কারিগর। ঠাকুরদা মরার পর ওর বাবা এখন টোটকা চিকিৎসা করেন। দূর-দুরান্ত থেকে অগণিত লোক লাইন দিয়ে দাঁড়ায় বাড়ির দরজার সামনে, সূর্য ওঠার পর মা শিতলার পূজা দিয়ে ধূপধোঁয়া জ্বালিয়ে ওর বাবা আসনে বসেন, তুকতাক করেন, বোকা মানুষ বা সরল মহিলা পেলে এটা-সেটা বলে বাড়তি কামাই করে নেয়, বেদ-বেদনীর মতো। গোপনে গাঁজা ও মাদকদ্রব্য বিক্রি করে মোটামুটি কিছু টাকা হাতে এসেছে ওর বাবার। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত চার ছটাক জমির ওপর ওদের বাড়ি এখন দোতলা।
স্বাতিদের বাড়ির খুব কাছেই দুর্গামন্দির। প্রাইমারি গার্লস স্কুল। কোনোমতে ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে স্বাতি। মুক্তিযুদ্ধের কথা বইতে পড়েছে। ওর বাবার জন্মও স্বাধীনতার পর। আটাশির দাঙ্গায় ওদের পাড়া আক্রান্ত হয়েছিল। লুটেরারা লুটেছে ধন-সম্পদ-সম্ভ্রম। আগুনও দিয়েছিল এখানে-ওখানে। একানব্বইয়ের নির্বাচনে যখন নৌকা মার্কা হেরে গেল। সাহস হারিয়ে ফেলেছিল এ-পাড়ার লোকজন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের খপ্পরে পড়ে পাড়ার এক-চতুর্থাংশ পরিবার পানির দামে জমি বেছে ভারতে পাড়ি দিয়েছিল। ওদের অধিকাংশই ওখানে ভালো নেই। টাকা-পয়সা নিঃশেষ হয়ে তারা এখন কাঙ্গাল মানুষের দলে। দেশের জন্য মনস্তাপ হয়; কিন্তু ফেরার পথ খোলা নেই। ওদের পাড়ার অনেকেই এখন প্লাস্টিক জুতার কারখানা করে অথবা সিঙ্গাপুরে পাড়ি দিয়ে অঢেল বিত্তের মালিক হয়ে গেছে। পোশাক-আশাক, চাল-চলনে বোঝার উপায় নেই ওদের পূর্ব পুরুষদের লুঙ্গি বা ধুতি কেনার টাকা ছিল না, খালি গা আর গামছা জড়িয়ে দিন কাটাতে হতো। গলির ‘রাজার কলে’ কিংবা পুষ্প সাহার তালাবে এই পাড়ার মেয়ে ঝি’রা যখন ¯œান করত তখন ওদের কাপড়ের জীর্ণদশায় অর্ধনগ্ন শরীরের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিতে হতো পথচারি মুসলমানদের। দিনদুপুরে দেশি মদ আর চামড়ার উৎকট গন্ধে সহজে কেউ ওই গলিপথে প্রবেশ করতে চাইত না। নিচু জাতের মানুষ বলে, ওদের মেয়েদের প্রতি আগ্রাসী ছিল না স্থানীয় মুসলমানরা। সময়ে সময়ে দু’চারজন মুসলমান বদলোক লীলা চালালেও ওদের ঘৃণার চোখে দেখে সমাজের মানুষ।
শিশুবেলা থেকেই মন্দিরের কাসার শব্দে ঘুম ভাঙে স্বাতির। এই মূর্ছনা তাকে টেনে নিয়ে যায় দেবীর পদতলে। মন্দিরে দুর্গা সারাবছরই অধিষ্ঠিত থাকেন। শারদীয়া পূজার প্রতিমা অদল-বদল হয়। আদতে এটা রাধা মাধব মন্দির। শত বছর আগে এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান কৃষ্ণভক্ত হয়ে গৃহত্যাগ করে আর ফেরেন নি। মন্দিরের সম্পত্তি তাদেরই দান করা। মন্দিরের পূজা নির্বিঘœ করতে তারা মন্দির সংলগ্ন জমি ব্রাহ্মণকে দান করেছিলেন। ঠাকুর গড়তে জানতেন এই ব্রাহ্মণরা। আটাশির দাঙ্গার পর স্থানীয় এক ধনাঢ্য রাজনীতিকের কাছে গোপনে জমি বিক্রি করে রাতের আঁধারে ভারতে পরবাসী হয় এই ব্রাহ্মণ পরিবার।
50স্বাতিদের পাড়ায় সন্ধ্যায় নগর কীর্তন হয়। আর প্রধান উৎসব হয় দুর্গাপূজার এক মাস পর। তারা বলেন মচ্ছব। চব্বিশ প্রহর নাম কীর্তন শেষে বিতরণ করা হয় প্রসাদ। পাড়ার বিবাহিত মেয়েরা সব নাইয়রে আসে এই সময়। মাছ, মাংস, মিঠাই, ম-ার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে পাড়াময়। ভিন্ন ভিন্ন বয়সের সখীরা মেতে ওঠেন আনন্দে-উৎসবে। সারাবছরের সুখ-দুঃখের ভাববিনিময় করেন তারা। জামাই বাবু ও শ্যালকরা সম্মিলিতভাবে মেতে ওঠেন সুরাপান উৎসবে। ইদানীং মুসলিম বখাটেরাও মিশে যান ওদের সাথে। পাড়ার মুসলমানদের আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রকাশ্যেই গরু কোরবানি হয় রাস্তায়। দেখতে বীভৎস হলেও স্বাতিদের চোখ এখন সয়ে গেছে।
স্বাতির বয়স তখন পাঁচ কী ছয়। পাড়ার বাবার বয়সী এক কাকা চকলেট দেওয়ার কথা বলে, নির্জন দুপুরে এক কারখানা ঘরে নিয়ে স্বাতির শরীর উদম করে পা থেকে কপাল পর্যন্ত লেহন করেছিলেন সরীসৃপের মতো। সেই কথা মনে হলে স্বাতির গা এখনও শিউরে ওঠে। স্বাতির বাবা-মা মধ্যরাতে টিভির পর্দায় উলঙ্গ নারী-পুরুষদের দাপাদাপি দেখতো। হঠাৎ ঘুম ভেঙে স্বাতি এই দৃশ্য কখনও কখনও দেখেছে। এর মানে স্বাতি এখন বোঝে। এরপর আরেকটু বড় যখন তখন থেকেই পূজাম-পে, কীত্তনের আসরে, হোলি কিংবা দেয়ালির রাতে অনেক পুরুষের কদর্য হাত ছুয়ে দিয়েছে স্বাতির আনকোরা শরীর। পাড়ার এক বালক বছর দুই আগে স্বাতিকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট চুষেছে কয়েক মিনিট। এই অনুভূতিটা এখনও শিহরণ জাগায় স্বাতির হৃদয় মন্দিরে।
স্বাতি এখন না-কি বড় হয়ে গেছে। ওর বাবা-মা বলেছেন, এক মুসলিম ছেলে বিয়ে করতে চায় স্বাতিকে মুসলমান বানিয়ে। বিনিময়ে ওর বাবাকে দুই লাখ টাকাও দিতে চেয়েছে। পরিবারের প্রয়োজনে ওর বাবা এপথ-সেপথে থেকে বাড়তি কিছু উপার্জন করলেও, মেয়েকে বিক্রি করতে মন সায় দেন নি। বিয়ে মানে কী একথা এখন বুঝে ফেলেছে স্বাতি। মাস দুয়েক আগে ওর নানুর গ্রাম কুমিল্লার হোমনার এক নমপাড়া থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এলে পরে পাকা হয়ে যায়। বর সিঙ্গাপুর থেকে দশ বছর টাকা কামাই করে দেশে পাকা দালান আর ওখানকার বাজারে শাড়ি কাপড়ের দোকান পেতেছে, খুব ভালো অবস্থা। বরের বয়স ৩৫ হলে কি হবে, রানির হালে থাকবে সেখানে স্বাতি।
পৌষের শীতে বিয়ের লগ্নে স্বাতি বাঁধা পড়ল জীবনের সাতপাকে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বাতি বরের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হলো পরদিন বিকেলে।
জীবনে কখনও ট্যাক্সিতে ওঠেনি স্বাতি। বরের ভাড়া করা এসি গাড়িতে বসে আনন্দে উদ্বেলিত স্বাতি বধূবেশে রানির হালে শ্বশুরবাড়ি রওয়ানা হলো, লালবাগের বস্তিকে পেছনে ফেলে। রথে চড়ে যেন, মর্ত্য থেকে দেবালয়ের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে স্বাতি।

Category:

মানুষ

Posted on by 0 comment

49স্বকৃত নোমানঃ ওই যে মানুষটাকে দেখছেন, গায়ে হাফশার্ট, বুকের দুই বোতাম খোলা, পরনে কালো প্যান্ট, পায়ে সস্তা চামড়ার জুতা, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, দেখতে খুবই সাধারণ, তবু তার চেহারা ও ভাবভঙ্গিতে এমন এক অসাধারণত্ব, এমন এক রাজকীয় ভাব―তার নাম আসাদুজ্জমান। খেয়াল রাখবেন, আসাদ-উজ-জামান নয় কিন্তু, আসাদুজ্জমান। আমরা তো নামকে যতটা পারি শুদ্ধ করি। এই শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে যে দেশীয় সংস্কৃতির অবমাননা ঘটিয়ে ফেলি, বুঝি না। বোঝার চেষ্টাও করি না। আসাদুুজ্জমান বোঝেন। বোঝেন বলেই তিনি গল্পের চরিত্র হয়ে উঠেছেন।
প্রায় পনের বছর পর তার সঙ্গে আমার দেখা। খেয়াল করা দরকার, পনের বছর কিন্তু কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছুরই বদল ঘটে যায়। পনের বছরে পৃথিবীটাও অনেকখানি বদলে গেছে। উন্নয়নশীল এই দেশটারও অনেক কিছু বদলে গেছে। যোগাযোগ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতি বদলেছে, দেশের মানুষরাও বদলে গেছে। আমিও কি বদলাই নি? বটেই। গ্রাম থেকে শহরে এসেছি, তিন সন্তানের বাবা হয়েছি, মোটামুটি অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছি এবং কবি হিসেবে প্রচুর যশ-খ্যাতি পেয়েছি। সবচেয়ে বড় বদল ঘটেছে আমার আমির। আমাকে দেখে কেউ এখন আর তরুণ বলে না। পঁয়ত্রিশ বছর তো তারুণ্যের নয়, যৌবনের। যৌবন মানেই প্রৌঢ়ত্বের কাছাকাছি চলে আসা। তার মানে আমি টের পাই বা না পাই, সময়ের ব্যবধানে আমার মধ্যেও অনেক অদল-বদল ঘটে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই বদলে গেছেন আসাদুজ্জমানও। ফর্সা চেহারাটা তামাটে রং ধরেছে, মাথার চুলে পাক ধরেছে, ভুঁড়িটা বেড়ে গেছে, চোখের নিচে চামড়াগুলো কুঁচকে গেছে। বদলায় নি শুধু আগের সেই হাসিখুশি ভাবটা। হয়তো এটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এখনও তার কথায় মানুষ হাসে, রাগ করে কাউকে গালি দিলেও মনে করে তিনি বুঝি রসিকতা করছেন। শত্রুকেও তিনি কথার মারপ্যাঁচে নাস্তানাবুদ করে দিতে পারেন।
কথার এই মুন্সিয়ানা এবং হাশিখুশি স্বভাবের জন্যই হয়তো এলাকায় তার এত জনপ্রিয়তা, যতটা নেই একজন রাজনৈতিক নেতারও। এই মফস্বল শহরের রাস্তায় তিনি যখন হাঁটেন সবাই তার দিকে সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়, সামনে পড়ে গেলে সালাম-নমস্কার দিতে কেউ ভুল করে না, বয়স্করাও ডান হাতটা উঁচিয়ে অন্তত এটুকু বলতে ভোলে না, কেমন আছ বাবাজি? বিশ্বায়নের এই যুগে সামাজিক সম্পর্কগুলো যখন ক্রমাগত ভেঙে যাচ্ছে, এটাই বা কম কিসে? আমরা যারা রাজধানীতে থাকি, কই, মাসের পর মাস কেটে গেলেও তো কেউ জিজ্ঞেস করে না, কেমন আছেন?
অথচ দেখুন, আসাদুজ্জমান কিন্তু বিশ্বায়নের অস্থিরতার খপ্পরে এখনও পড়েন নি। ঢাকা থেকে বহু দূরের এই উপজেলা শহরে তিনি যতটা ভালো আছেন ততটা কিন্তু আমরা নেই। শান্ত-নিরিবিলি মফস্বল শহর, সর্বোচ্চ এক ঘণ্টায় পুরো শহরটা চক্কর দেওয়া যায়। মানুষের ভিড় নেই, কোলাহল নেই, ব্যস্ততা নেই। কোথাও আকাশ ঢেকে দেওয়া কোনো দালানকোঠা নেই, শহরের মাঝখানে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিশাল আকাশ দেখা যায়, বিশ মিনিট হেঁটেই নদীর তীরে চলে যাওয়া যায়, সকাল-সন্ধ্যা জোয়ার-ভাটা দেখা যায়, অমাবস্যার ঘন অন্ধকার দেখা যায়, আর দেখা যায় পূর্ণিমার মোহনীয় চাঁদ।
শহর থেকে মাত্র এক মাইল দক্ষিণে মজা খালটার পাড়ে আসাদুজ্জমানের বাড়ি। চৌচালা টিনের ঘর, চারদিকে বাঁশের বেড়া। চাইলেই তিনি দালান তুলতে পারেন, সেই টাকা তার আছে। শুধু আষাঢ়-শ্রাবণে টিনের চালে আদিম বৃষ্টির প্রাকৃত সুর শোনার জন্যই ঘরকে তিনি প্রাসাদে রূপান্তরিত করেন নি। পৈতৃক যা কিছু জমিজমা আছে তাতে ছয়জনের সংসারটা মোটামুটি চলে যায়। জমির ধারে-কাছে তিনি যান না কখনও, চাষবাদে তার মন নেই। মন থাকলেও সময় নেই। সব কিছু দেখাশোনা করে তার ছোট ভাই, বাবার মৃত্যুর পর যাকে তিনি নিজ খরচে লেখাপড়া করিয়েছেন। সকালে একবার বাড়ি থেকে বেরোলে সারাদিন তার আর খবর থাকে না। কোথায় আছেন, কী করছেন, কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন―কোনো কিছুরই হদিস পায় না তার পরিবারের কেউ। ফোন দিলেও সহজে পাওয়া যায় না, মোবাইলটা সারাক্ষণই ব্যস্ত। ব্যস্ততার সীমা নেই তার। হয়তো ইউএনও’র সঙ্গে অথবা ওসির সঙ্গে অথবা পৌর চেয়ারম্যানের সঙ্গে জরুরি কোনো বিষয়ে কথা বলছেন। জরুরি? না, তার ব্যক্তিগত কোনো জরুরি কাজের কথা নয়, অন্যের কাজের কথা। হয় কোনো দুর্নীতির অনুসন্ধান করছেন, অথবা কোনো খুনের রহস্য উদঘাটন করছেন, অথবা পুলিশ কর্তৃক আটক কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ওসিকে অনুরোধ করছেন, অথবা কোথাও কোনো ঝগড়া-বিবাদের সালিসি করছেন।
সারাদিন তার এই করেই কাটে। রোজ সকালে প্রায় এক যুগ আগে কেনা ভাঙাচোরা মোটরসাইকেলটিতে চড়ে যখন পৌর মার্কেটে তার অফিসের উদ্দেশে রওনা হন তখন থেকেই তার ব্যস্ততার শুরু। রাস্তায় কারও না কারও দেখা পাবেনই, যারা বিচিত্র রকমের সমস্যা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কারও বাড়িতে রাতে পুলিশ হানা দিয়ে মিথ্যা মামলার কোনো আসামিকে ধরে নিয়ে গেছে, কারও স্বামীর কাছে এলাকার মাস্তানরা চাঁদা দাবি করেছে, কারও মেয়েকে পাড়ার বখাটেরা উত্ত্যক্ত করছে, গ্রামের মোড়লের সঙ্গে কারও জমি নিয়ে বিরোধ―এমন নানাবিধ সমস্যা। তিনি এলাকার মোড়ল-মাতবর নন, চেয়ারম্যান-কমিশনার নন, রাজনৈতিক কোনো নেতাও নন, তিনি একজন নগণ্য সাংবাদিক। নগণ্য? স্থানীয় একটি পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদক এবং দ্বিতীয় শ্রেণির একটি জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক হিসেবে নগণ্যই বটে।
হোক, তবুও তো সাংবাদিক। কিন্তু সাংবাদিকের কাজ তো সংবাদ সংগ্রহ করা, মানুষের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করা নয়। সাংবাদিকের সামনে কেউ বাসচাপায় পড়লে তার একমাত্র কাজ তখন ছবি তোলা, তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া নয়। তার সামনে কেউ কাউকে মেরে রক্তাক্ত করে দিলে তিনি আক্রান্ত ব্যক্তিটিকে উদ্ধার করতে চেষ্টা করবেন না, তার প্রধান কাজ তখন ছবি তোলা। হামলাকারী ঘুষিটা কীভাবে পাকাল, আক্রান্ত ব্যক্তিটির হাতে, বুকে, পিঠে, নাকি পাছায় ঘুষিটা মারল, তার একটা ভালো ছবি তো তুলতেই হবে। নইলে সাংবাদিক কিসের?
ব্যতিক্রম শুধু এই মফস্বল সাংবাদিক, আসাদুজ্জমান। মোটরসাইকেলের সিটটাই তার সিংহাসন। এখানে বসেই তিনি সবার সব সমস্যার কথা শোনেন। কারও কথায় কোনো দোষ-ত্রুটি পেলে গালাগাল শুরু করেন। না, কেউ তার গালি গায়ে মাখে না, হাসতে হাসতে হজম করে নেয়, কারণ তিনিই তাদের শেষ ভরসা এবং তারা জানে এসব গালাগালের মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো রাগ-ক্ষোভ নেই। সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তিনি আবার অফিসের উদ্দেশে মোটরসাইকেলটা হাঁকান। কিন্তু ব্রিজটা পার হলেই চা-দোকান, যেখানে এলাকার মুরব্বিরা বসে চা খাচ্ছেন। তাকে দেখতে পেয়েই তাদের হাঁক, ‘এক কাপ চা খেয়ে যাও বাবা।’ বাড়ি থেকে চা হয়তো তিনি খেয়েই বেরিয়েছেন, তবু এখন এক কাপ চা তাকে খেতেই হবে, সঙ্গে এক খিলি পানও।
মুখে কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে, রসিয়ে, তরিয়ে কাপের সবটুকু চা শেষ করে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামনে এগোলেন; কিন্তু রাস্তার ডান দিকে বটগাছটার নিচের দোকানটায় ওয়ার্ড কমিশনার বসা। ‘এক কাপ চা খেয়ে যান বড় ভাই’, পেছন থেকে কমিশনারের হাঁক। বাধ্য হয়ে তাকে আবারও থামতে হয়। চা তিনি এর আগে দু-কাপ খেয়েছেন তাতে কী, আরও এক কাপ খেতেই হবে।
এভাবে অফিসে যাওয়ার পথেই চার-পাঁচ কাপ চা তার খাওয়া হয়ে যায়। মাত্র দশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে অফিসে পৌঁছতে লেগে যায় এক-দেড় ঘণ্টা। অফিস মানে তার সম্পাদিত পাক্ষিক পত্রিকাটির অফিস। ষোল বছর আগে চার পৃষ্ঠার পত্রিকাটির সম্পাদনা শুরু করেছিলেন। তারও আগে তিনি ছিলেন হকার। ঢাকা থেকে আসা দৈনিকগুলো গ্রাহকদের ঠিকানায় পৌঁছে দিতেন এবং শহরের চৌরাস্তার মোড়ে যাত্রী ছাউনিটার নিচে দাঁড়িয়ে বিক্রি করতেন। মাস শেষে যা লাভ হতো তাতে তার পড়ালেখার খরচটা হয়ে যেত।
হকার থেকে কেউ সাংবাদিক হতে পারে? পারে। যেমন পেরেছেন আসাদুজ্জমান। সবে তিনি বিএ পরীক্ষা দিয়েছেন, একদিন ঢাকা থেকে এই মফস্বল শহর ভ্রমণে আসা এক সাংবাদিক তার কাছ থেকে পত্রিকা কেনার সময় কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইল, আচ্ছা, এখানে কি কোনো সাংবাদিক নেই?
না। উত্তর দিলেন তিনি।
তুমি করবে?
কী?
সাংবাদিকতা?
রাজি হয়ে গেলেন তিনি। পরের মাসেই একটি জাতীয় দৈনিকের উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিলেন। ঢাকার সেই সাংবাদিকই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সপ্তাহের চার দিনই কোনো না কোনো পাতায় তার পাঠানো সংবাদ ছাপা হতো। পদবি ছিল উপজেলা প্রতিনিধি, মাসিক সম্মানী বলতে কিছু ছিল না। লেখার গুণে অল্প দিনেই জেলা প্রতিনিধি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে গেলেন, এক হাজার টাকা সম্মানীর বিনিময়ে। কিন্তু তার ভেতরে এক ধরনের অতৃপ্তি কাজ করত। কারণ প্রতিমাসে যে পরিমাণ সংবাদ ডাকযোগে এবং ফ্যাক্স করে পাঠাতেন, ছাপা হতো তার তিন ভাগের এক ভাগ। প্রয়োজন দেখা দিল নিজের সম্পাদিত একটি পত্রিকার, হোক সাপ্তাহিক অথবা পাক্ষিক, যেখানে তিনি এলাকার প্রতিটি সংবাদ ছাপতে পারবেন। কাগজপত্র প্রস্তুত করে ডিক্লারেশনের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করলেন, এক মাসের মাথায় ডিক্লারেশন পেয়েও গেলেন। শুরু হলো সাংবাদিক হিসেবে তার নতুন যাত্রা।
উদ্বোধনী সংখ্যায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দুর্নীতি নিয়ে লিড নিউজ। পত্রিকা ছেপেছিলেন এক হাজার কপি। সব কপি শেষ হয়ে শহরের অলিগলিতে সংবাদটির ফটোকপি বিক্রি হতে লাগল। সারাশহরে হৈচৈ পড়ে গেল। শহরের কোনো সাংবাদিক যার বিরুদ্ধে একটা শব্দ লিখতে কোনোদিন সাহস করেনি তার বিরুদ্ধেই কিনা লিখল আসাদ! চেয়ারম্যান কি আর চুপ করে বসে থাকেন? প্রথম শ্রেণির হাকিমের আদালতে প্রথমে এক লাখ টাকার একটা মানহানির মামলা ঠুকে দিলেন। কিন্তু পরপর তিন তারিখ মামলার বাদী আদালতে হাজির না হওয়ায় সাত মাসের মাথায় মামলাটি খারিজ করে দিলেন আদালত।
না, চেয়ারম্যান দমবার পাত্র নন। শহরের এক মুদি দোকানিকে বাদী করিয়ে থানায় একটা চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দিলেন। আসাদুজ্জমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ শহরের কেউ বিশ্বাস করেনি। হতেই পারে না, আসাদ এমন ছেলে নয়, সব চেয়ারম্যানের ষড়যন্ত্র। কিন্তু চেয়ারম্যানের অনেক ক্ষমতা, ওসি বাধ্য তার কথা মানতে। নইলে বদলি করিয়ে বান্দরবান পাঠিয়ে দেবেন। রাজনৈতিক চাপে বাধ্য হয়ে পুলিশ আসাদুজ্জমানকে গ্রেফতার করল বটে, অথচ মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি জামিনে বেরিয়ে এলেন। চাঁদাবাজির মামলায় মাত্র পাঁচ দিন কারাবাস! শহরবাসী তো বটেই, চেয়ারম্যান নিজেও অবাক। জীবনে প্রথম তিনি কলমের ক্ষমতা টের পেলেন। তারপর আর কোনোদিন আসাদুজ্জমানকে তো নয়ই, শহরের কোনো সাংবাদিককেই তিনি ঘাঁটাতে যান নি।
সেসব দিনের কোনো একদিন ঢাকার মালিবাগে কারিতাস ভবনে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। একটা বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এক ফিচার ওরিয়েন্টেশন কোর্সে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে আমরা মোট পঁচিশ সাংবাদিক এসেছিলাম। তিন দিনের কোর্স। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন জাতীয় দৈনিকের বড় বড় সাংবাদিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকরা। প্রথম দিন কোর্স শুরুর আগে হাস্যোজ্জ্বল তরুণ আসাদুজ্জমান তার চার পৃষ্ঠার পাক্ষিকটির একটি করে আমাদের হাতে হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমরা উল্টেপাল্টে দেখি এবং তার এই মহতি উদ্যোগের প্রশংসা করি। আমরাও একদিন এমন একটা পত্রিকার সম্পাদক হব, স্বপ্ন দেখতে দেখতে কোর্সটা শেষ করি। চতুর্থ দিন ভোরে আমরা যার যার গন্তব্যে ফিরে যাই।
তারপর পনের বছর তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। স্মৃতির প্রতারণায় তার নামটিও ভুলে যাই। তবে তার সম্পাদিত পত্রিকাটির নাম স্মৃতি ভুল করে ধরে রাখে। নইলে পনের বছর পর পত্রিকাটির নাম ঠিকঠিক মনে পড়ে গেল কীভাবে? স্থানীয় এক কবির উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক কবিতা উৎসবের অতিথি আলোচক হিসেবে যোগ দিতে ঢাকা থেকে আমরা কজন, যারা কবি হিসেবে মোটামুটি নাম-যশ কুড়িয়েছি, তার শহরে যাই। আমাকে বলা হয়েছিল আধুনিক কবিতার প্রকরণ নিয়ে আলোচনা করতে। আলোচনার শুরুতেই স্মৃতিরা হাজামজা পুকুরের বুদ্বুদের মতো এমনভাবে ভেসে ভেসে উঠছিল, আলোচনার অর্ধেকটাজুড়েই ছিল আসাদুজ্জমানের প্রসঙ্গ। একটিবার তার নামটি উচ্চারণ না করেও, শুধু তার সম্পাদিত সেই পাক্ষিকটির কথা উল্লেখ করে স্মৃতিচারণ করতে করতে আমি যখন আলোচনার মাঝামাঝি এসে বলি, ‘জানি না আমার সেই সাংবাদিক বন্ধুটি এখন কোথায়, কেমন আছেন’―ঠিক তখনই দর্শক-সারি থেকে হাত উঁচিয়ে সাংবাদিক আসাদুজ্জমান হাঁক দিলেন, এই যে আমি, এখানেই আছি।
অনুষ্ঠান শেষে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে তার অফিসে নিয়ে গেলেন আমাকে। যেতে যেতে খেয়াল করি পথচারীদের সালামের জবাব দিতে দিতে তার ডান হাতটি আর নামছেই না। কোথাও কোথাও তাকে থামতেও হলো, এক রাজনৈতিক নেতার অনুরোধে একবার চা-ও খেতে হলো। আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে লেগে গেল প্রায় আধা ঘণ্টা।
আমার কৌতূহল জাগল। জানতে চাইলাম, রাজনীতি করেন নাকি?
আরে না! সাংবাদিকরা রাজনীতি করলে চলবে? হাসতে হাসতে বললেন তিনি।
শহরের মাঝখানে পৌর মার্কেটের দোতলায় তার বিশাল অফিস। একপাশে দুটো কম্পিউটার, কয়েকটা ডেস্ক, অন্যপাশে কয়েকটা র‌্যাকে বেশ কিছু বই। বেশ সাজানো-গোছানো অফিস। উপজেলার ইউএনও, থানার ওসি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, কমিশনার, শহরের বড় বড় ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতারা সকাল-বিকেল তার অফিসে আড্ডা দিতে আসে। এমনকি সংসদ নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্য প্রার্থীদেরও একবার এই অফিসে হাজিরা দিয়ে যেতে হয়। না, লৌকিক বা অলৌকিক কোনো ক্ষমতা নেই তার, ঢাকার বড় কোনো মন্ত্রীর সঙ্গেও তার যোগাযোগ নেই, তবু তার মতো একজন মফস্বল সাংবাদিকের অফিসে কেন সংসদ সদস্য প্রার্থীর মতো উঁচুতলার মানুষদের এখানে আসতে হয়? কারণ একটাই, তার জনপ্রিয়তা, এই শহরের মানুষরা তাকে ভালোবাসে। তিনি কারও ভাই, কারও ভাতিজা, কারও চাচা, কারও মামা। রক্তের সম্পর্ক নয়, আত্মার। নির্বাচনে তিনি যার পক্ষে কাজ করবেন নিশ্চিতভাবেই তার কয়েক হাজার ভোট বেড়ে যাবে।
কতক্ষণ পরপরই আমাদের জন্য মৌসুমি ফলফলাদি আর চা-নাশতা আসছিল। সকালে এলজিইডির এক ঠিকাদার একশ লিচু পাঠিয়েছে, দুপুরে এক ছাত্রনেতা পাঁচ কেজি হিমসাগর আম দিয়ে গেছে। খেতে খেতে আমরা গল্প করি। সমাজ থেকে রাজনীতি, সাহিত্য থেকে অর্থনীতি কোনো বিষয়ই বাদ যায় না। সব বিষয়েই তিনি খোঁজখবর রাখেন।
গল্প করতে করতে সন্ধ্যা নামে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি পুবের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। মফস্বল শহর, ঘন ঘন লোডশেডিং হয়, অথচ তখন লোডশেডিং মনেই হচ্ছিল না, সমস্ত বারান্দায় জোছনা গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমার খুব ইচ্ছে করছিল কোনো নদীর তীরে গিয়ে জোছনা উপভোগ করি। তিনি বললেন, কাছেই নদী। কিন্তু ভোগ করে নদীর তীরে গেলে উপভোগটা ভালো জমবে।
তার রসিকতাপূর্ণ ইঙ্গিত বুঝতে পেরে আমি হাসি। খিদাও লেগেছে প্রচুর। দুপুরে উৎসবের বিরিয়ানি খেয়েছিলাম, হজম হয়ে গেছে বিকেলেই। বাঙালি, চা-নাশতায় তো আর ভাতের খিদা মেটে না। তিনি আমাকে শহরের সবচেয়ে ভালো হোটেলটায় নিয়ে গেলেন। পদ্মার তাজা ইলিশ ভাজা এবং গরুর মাংস দিয়ে দুজনে খেলাম। আমি বিল দিতে চাইলে তিনি বললেন, প্রশ্নই আসে না, আপনি আমার মেহমান।
অথচ কী কা- দেখুন, তিনি বিল দিতে কাউন্টারের সামনে গেলে হোটেল ম্যানেজার বলল, আপনার মেহমান তো আমারও মেহমান। বিল দিতে হবে না, যান।
আচ্ছা, আপনার এই জনপ্রিয়তার পেছনে কারণ কী? আমি তার কাছে জানতে চাইলাম।
তিনি হাসতে হাসতে আমার প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেন। চাঁদের আলোয় তার হাস্যোজ্জ্বল মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হচ্ছিল যেন একজন রাজাধিরাজ হাসছেন, যে রাজার কোনো মুকুট নেই, যিনি প্রবাদের সেই মুকুটবিহীন সম্রাট।
পরদিন সকালে ফেরার জন্য আমি যখন অন্য অতিথিদের সঙ্গে বাসে চড়ে বসি, আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন আসাদুজ্জমান। হাত বাড়িয়ে তার কাছ থেকে যখন বিদায় নিচ্ছিলাম, আমার হাতটা দুহাতে চেপে ধরে তিনি বললেন, গতকাল রাতে হাঁটতে হাঁটতে আপনি আমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন।
হ্যাঁ, আমি আপনার এত জনপ্রিয়তার পেছনের কারণ জানতে চেয়েছিলাম।
আসাদুজ্জামান বললেন, আচ্ছা, আপনি লালনের গান শোনেন?
মাঝে মধ্যে। বললাম আমি।
তার গানে আছে, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। শুনেছেন?
হঠাৎ বাসটি চলতে শুরু করল। আসাদুজ্জমান হাত নেড়ে শেষবারের মতো বিদায় জানালেন। মাথাটা যতটা সম্ভব জানালা দিয়ে বের করে আমি তখন দু-হাত জোড় করে কপালে ঠেকাই।
আর তখন পাশের সিটে বসা কবি বন্ধুটি বললেন, আপনি কাকে প্রণাম করছেন?

Category:

রক্তাক্ত গ্লানি

মনি হায়দার:

60তোর সমস্যাটা কী?
ইমনের প্রশ্নে দিদার চোখ তুলে তাকায়, তাকিয়েই দৃষ্টি অন্যদিকে নামিয়ে নেয়। ইমন বাইরে থেকে এসে প্যান্ট-শার্ট বদলাতে বদলাতে কথা বলছে। দিদার পড়ার টেবিল ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আজ ক্লাসে যায় নি, কোনো কিচ্ছু ভালো লাগছে না ওর। ইমনের প্রশ্নের উত্তরও দিতে ইচ্ছে করছে না। মুখের ভেতরের স্বাদ পাল্টে গেছে এক ধরনের তিক্ততায়। শরীর মন বিষিয়ে উঠছে। ইচ্ছে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ১৭১ নম্বর রুম থেকে নিচে লাফিয়ে পড়তে। লাফিয়ে পড়লে কি মারা যাবে? না-কি আহত হয়ে হাত-পা ভেঙে বিছানায় শুয়ে থাকবে? বিছানায় শুয়ে থাকলে, থাকতে হলে আরেক যন্ত্রণাÑ বাঁচতে হবে অন্যের অনুগ্রহে। বিছানায় শুয়ে ঘুলঘুলির দিকে তাকায়। সেখানে কয়েকটা চড়–ই বাসা বেঁধেছে। ফুড়–ত ফুড়–ত চড়–ইয়ের আসা-যাওয়া দেখে। মানুষ না হয়ে চড়–ই হলে কেমন হতো? ওদের জীবনে কি এমন রক্তক্ষরণ হয়?
বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ইমন বসে দিদারের পাশে। মাথায় হাত রাখেÑ কী হলো?
কী হবে?
আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না যে?
ইমন!
কী?
তোর প্রশ্নের কী উত্তর দেবÑ আমার কোনো কিছু ভালো লাগছে না।
বুঝলাম, তোর ভালো লাগছে না, কিন্তু কেনÑ সেটা তো বলবি।
সব কথা কী বলা যায়?
বাহ! তুই দেখছি দার্শনিকদের মতো কথা বলছিস।
হাসে দিদার­Ñ­ কতজন দার্শনিকের সাথে তোর পরিচয় আছে?
বেশি না, মাত্র একজন দার্শনিকের সাথে আমার পরিচয় আছে। সেই বিখ্যাত দার্শনিকের নাম শুনবি?
বল।
তার নাম জনাব দিদারুল হক।
দিদার দুঃখের মধ্যে গলা ফাটিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে বিছায়ায় উঠে বসেÑ শালা, তুই পারিসও বটে। আমাকে নিয়ে আমার সাথে ঠাট্টা!

এই তো চাঁদবদনে হাসি ফুটেছে, ওঠ খেতে চল।
চল।
দিদার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ইমন আর দিদার বঙ্গবন্ধু হলে ১৭১ নম্বর রুমে থাকে। ইমন অর্থনীতিতে, দিদার পড়ে সমাজবিজ্ঞানে। ইমনের বাড়ি বাগেরহাটে, দিদারের বাড়ি রাজশাহীতে। আগে পরিচয় ছিল না, রুমে উঠেই দুজনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ইমনের প্রেমিকা লিজি প্রতিসপ্তাহে লম্বা লম্বা চিঠি পাঠায়। রাত জেগে জেগে চিঠি পড়ে ইমন। লিজি আর ইমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই ‘মোবাইলের কলি যুগে’ ওরা একে অপরকে চিঠি লিখবে। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা চিঠিটাকে বাঁচিয়ে রাখবে। মোবাইল ম্যাসেজে আবেগের সব কথা-ব্যথা-হাসি-কান্না প্রকাশ করা যায় না। ইমন মাঝে মধ্যে দু-একটা লাইন পড়ে শোনায় দিদারকে। লিজি স্থানীয় কলেজের বিএ পড়ছে। এমনিতে ওরা দুজনে খালাতো ভাইবোন। ইমন উদার মনের মানুষ প্রাণ খুলে হাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে জড়িয়ে রেখেছে নিজেকে। নাটক করে, আবৃত্তির সাথেও জড়িত। সেক্ষেত্রে দিদার কিছুটা মুখচোরা স্বভাবের। ভেতরের টানাপড়েন, কষ্ট সে প্রকাশ করতে পারে না। নিজের ভেতরের কষ্ট নিয়ে নিজের ভেতর নিজে দগ্ধ হয়।
ইমনের মতো তারও একজন প্রেমিকা ছিল, এখন নেই। স্থানীয় কলেজে পড়ার সময় জেসমিনের সাথে একটা গভীর মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ইমন নিখাদ গ্রামের ছেলে। ম্যাট্রিক পাস করার পর জেলা শহর বাগেরহাটের সরকারি কলেজে ভর্তি হয়। থাকে কলেজের হোটেলে। জেসমিন জেলা শহরের বড় ব্যবসায়ীর মেয়ে। খুব যে সুন্দরী জেসমিন এমন নয়। গায়ের রংটা ফর্সা, মাথায় ছোট ছোট চুল, ঘাড়ের ওপর লেপ্টে থাকেÑ মুখ অনেকটা ছেলেদের মতো। জেসমিনের আকর্ষণীয় ছিল আশ্চর্য নিটোল দুটো চোখ। ক্লাসে আড্ডা দিতে দিতে দুজনে কাছাকাছি চলে আসে। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের ¯্রােতে ভাসতে ভাসতে দিদার অবাক সব স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করে জেসমিনকে নিয়ে। সেই স্বপ্নের হাত ধরে এক সন্ধ্যায় যায় জেসমিনদের বাড়ি।
মোটামুটি একটা নিগূঢ় সম্পর্ক হলেও জেসমিন কখনও ওকে বাসায় আমন্ত্রণ জানায় নি। অথচ দিদারের মনে প্রচ- কৌতূহল। সেই কৌতূহলের সূত্র ধরে জেসমিনের বাসায় গেলে জেসমিন সামান্য অবাক হলেও তাকে আন্তরিক আবেগে স্বাগত জানায়। বিশাল দোতলা বাড়িÑ অপরূপ কারুকার্যে সাজানো ড্রইংরুম। জেসমিন ওর বাবা-মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে স্বাভাবিক সৌজন্যে তারা কথা বলেছে। ছাদে হাঁটতে হাঁটতে জেসমিনের সাথে চা খেয়েছে। আসার সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে জেসমিন ওকে হঠাৎ একটা চুমুও দিয়েছিল। শরীরে অদ্ভুত শিহরণ আর মনে তীর ভাঙা ঢেউ নিয়ে হোস্টেলে ফিরে কাঁকর জড়ানো ভাতের সাথে পাতলা ডাল মিশিয়ে ভাত খেতে খেতে দিদার নিজেকে তেপান্তরের অসহায় রাজকুমার ভাবে। রাজকুমারের স্বপ্নের ঘোড়াটা হারিয়ে গেলে সে পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
জেসমিন ক্লাসে দিদারের পাশে বসে। গল্প করে। কখনও আলতোভাবে দুজন দুজনকে স্পর্শ করেÑ দিদার মনের ভেতরে অসংখ্য প্রেমের পিরামিড তৈরি করছিল। হঠাৎ জেসমিন কয়েকদিন ক্লাসে আসে নাÑ খবর নিয়ে জানে দিদার, জেসমিনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের পর জেসমিন সুইজারল্যান্ডে চলে যাবে স্বামীর সাথে। এমনিতে অন্তর্গত স্বভাবের মানুষ দিদারের পুরো ব্যাপারটা হজম করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। দিনটা কোনোভাবে কাটলেও রাতে ঘুমুতে পারত না। হোস্টেলের ছাদে উঠে নিরুপম আকাশ দেখতে দেখতে কাঁদত। কাঁদতে কাঁদতে দিদার নিজেকে বাস্তবতার মুখোমুখি নিয়ে আসে এবং সান্ত¦না পায়Ñ জীবন আসলে এই রকমই। কখনও ভাঙে। কখনও গড়ে। কখনও জীবন বিকলাঙ্গ স্বপ্নও প্রসব করেÑ
ইমন সহজভাবে সবার সাথে মেশে। রুমমেট হিসেবে দিদারকে তার পছন্দ হয়েছে। শুরুতে দিদার কিছুটা গুটিয়ে থাকলেও ইমনের প্রাণের দোলায় সে চঞ্চল হয়। ইমনের সাথে নাটক দেখেছে সে বেশ কয়েকবার মহিলা সমিতি মঞ্চে। তবে থিয়েটার আর্ট নাট্যগোষ্ঠীর নাটক ‘কোর্টমার্শাল’ দেখার পর ভেতরের দিদার বাইরের দিদারের সাথে এক অসম আদর্শগত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিমুহূর্তে মনে হয় ওর পেছনে একজন লোক দাঁত কেলিয়ে হাসছে। হাসিটা বড় বিশ্রী। হাসিটায় কখনও দাঁত দেখা যায় না। দুটি মাড়ির নিষ্ফল আস্ফালন। সে কারণে হাসিটা আরও কদাকার লাগে। জানে এটা তার এক কষ্টকল্পনাÑ তারপরও বিশ্রী হাসিসহ লোকটার ছায়া ওর পেছনে বুক পকেটে রাখা কলমের মতো লেগে থাকে। কেন যে থাকেÑ ছায়াটার কী উদ্দেশ্য কিছুই বুঝতে পারে না। ইমন লক্ষ্য করেছে দিদার শীতের সময়ে কেমন যেন মানসিকভাবে কিছুটা পীড়িত, কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়ে। জিজ্ঞেস করলেও কোনো সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। তিন বছর হলো একই রুমে পাশাপাশি থাকছে। দুজনার পারিবারিক অনেক গল্প কথা হয়Ñ কিন্তু দিদার এসব বিষয়ে কথা বলে ঠিকই, ইমন টের পায়Ñ একটা কিছু লুকোচ্ছে ও। ইমনের ধারণা, ওর মা-বাবা আলাদা থাকে হয়তো। নইলে দুজনার মধ্যে তালাক হয়েছে। নইলে বাবা-মা প্রসঙ্গে এলে চুপসে যায় কেন?
দিদার অনেকবার শুনেছে ইমনের মুখেÑ আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি, আমার বাবা রায়হানুর রহমান স্কুলের টিচার। পাকিস্তানবিরোধী প্রত্যেকটা আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে রায়হানুর রহমান স্বাধীনতার স্পষ্ট ঘোষণা মনে করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এলাকার তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে আরম্ভ করেছিলেন ডামি রাইফেল দিয়ে। তারপর ক্র্যাক ডাউনÑ অপারেশন সার্চলাইট, ভুট্টোর উল্লাস, ইয়াহিয়ার দর্প, গোলাম আযম-নিজামীদের দালালিÑ সব কিছু ইমনকে বুঝিয়ে গেছেন রায়হান।
তোর বাবা কি শহীদ হয়েছিলেন?
না। তিনি বিজয়ী বাহিনীর বিজয়ী সৈনিক ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় থানা কমান্ডার ছিলেন। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধে তার পায়ে গুলি লেগেছিল। বাবার সেই দাগ আমি দেখছি, স্পর্শ করেছি অনেকবার।
জীবিত যোদ্ধাদের চেয়ে শহীদদের সম্মান বেশি।
তোর কথাটা ঠিকই। বলে ইমন, আমাদের দেশের মানুষ অনেক ভুল ধারণাকে সঠিক মনে করে। যেমন ধর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীকে আমাদের পত্র-পত্রিকায় সর্বাধিনায়ক লেখে, অনেক রাজনীতিবিদও তাকে সর্বাধিনায়ক বলে অথচ ব্যাপারটা মারাত্মক ভুল।
কেন? চোখ কপালে তোলে দিদারÑ তিনি কি যুদ্ধ পরিচালনা করেন নি?
অবশ্যই। হাসে ইমন কিন্তু কোন্ পদ অলঙ্কৃত করে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন।
সর্বাধিনায়কের পদ।
ভুল, ভুল এবং ভুল।
তোর কথার মাথামু- কিছুই বুঝতে পারছি না। ভুল হতে যাবে কেন?
দিদার! মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুজিবনগরের যে সরকার গঠিত হয়েছিল সেই সরকারের সাংবিধানিক কাঠমো কী ছিল?
দিদার চুপ করে থাকে।
বুঝতে পারছিস না তো! কথা বলে ইমনÑ সাংবিধানিক কাঠামো ছিল মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তিনিই সরকারপ্রধান হিসেবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ সরকারে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন রাষ্ট্রপতিÑ প্রধান সেনাপতি নন। বুঝতে পেরেছিস?
মাথা নাড়ে দিদারÑ কিছুটা।
যাক তুই তবু কিছুটা বুঝেছিসÑ কিন্তু অনেক শিক্ষিত মানুষেই ব্যাপারটা বোঝে না। সেই সময়ে মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের লায়ালপুর কারাগারে বন্দী বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। তার অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তাজউদ্দিন আহমদ। সেই মুজিবনগর সরকারের প্রধান সেনাপতি আরও পরিষ্কার করে বললেÑ স্থল বাহিনীর প্রধান নির্বাচিত হন কর্নেল ওসমানী। তিন বাহিনীর প্রধানকে বলে সর্বাধিনায়ক এবং সর্বাধিনায়ক হন মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের রাষ্ট্রপতি। অথচ এদেশের পত্র-পত্রিকায় সবসময় কর্নেল ওসমানীকে সর্বাধিনায়ক লেখা হয়।
সমর্থন করে দিদারÑ তুই ঠিক বলেছিস। কিন্তু বড় বড় সাংবাদিক, সম্পাদকÑ এরা কেন ভুলটা বার বার করছে?
সেটা ওরাই ভালো জানে। এবং মজার ব্যাপার কি জানিস? ওসমানীর নামের আগে সর্বাধিনায়ক লিখে প্রকারান্তরে তাকে অপমানই করে।
কীভাবে?
ওসমানী তো সর্বাধিনায়ক ছিলেন না। যিনি যেটা ছিলেন না, তাকে সেই উপাধিতে ডাকলে অপমান করা হয় না?
এভাবে দিদার মুক্তিযুদ্ধের অনেক তথ্য ও তত্ত্ব জানতে পারে ইমনের কাছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলতে কোনো ক্লান্তি থাকে না ইমনের। আবেগের সাথে গভীর মমতায় ও বলে যায় আর ধ্যানমগ্ন হয়ে, নীরবে শোনে দিদার। শোনে আর ভেতরে ভেতরে জবাই করা মুরগির যন্ত্রণায় ছটফট করে। দিদারের ভেতরের ওই নিগূঢ় যন্ত্রণার গল্প সে কাউকে বলতে পারে না। এই গল্প বলা যায় না। তীব্র বিষের মতো এই গল্প গিলে ফেলতে হয়। গিলেও কিন্তু আত্মদর্শনের মুখোমুখি হলে দিদার নিজেকে সামলাতে পারে নাÑ রক্তবমি করে!
কেন্টিনে খাওয়া-দাওয়া সেরে দুজনে রুমে আসতে আসতে কথা বলছে। বেশি কথা বলে ইমন, দিদার চুপ থাকে। দু-একটা উত্তর দেয়।
জানিসÑ আজ কোথায় গিয়েছিলাম? ইমনের প্রশ্নে দিদার তাকায়।
হাসে ইমনÑ গিয়েছিলাম সুনীলদের বাসায়। সুনীলদের বাসা নদীর ওপারেÑ কেন গিয়েছিলাম? শোন ওদের বাগানে প্রচুর গাঁদা ফুল আছে। অনেক ফুল নিয়ে এসেছিÑ কাল সাভারে যাব স্মৃতিসৌধে।
ফুলগুলো কোথায়?
টিএসসিতে রেখে এসেছি। বিকেলে সবাই মিলে মালা তৈরি করব। খুব ভোরে প্রথম বাসেই সাভার যাব। কী যে ভালো লাগে সেখানে গেলে, চারদিকে মানুষ আর মানুষ। লাল মানুষ, নীল মানুষ, শিশু মানুষ, নারী মানুষ, বৃদ্ধ মানুষÑ সবার মুখে উল্লাস বিজয় আর হাসি। ওসব না দেখলে বর্ণনা করে বোঝানো যায় না। তাকায় দিদারের দিকেÑ এবার তুই যাবি তো?
ঘাড় নাড়ে দিদারÑ যাব।
তোর কথায় বিশ্বাস নেই। গত দুবছর ধরে তুই বলিস যাবি স্মৃতিসৌধে কিন্তু যাস না। কেমন করে যেন এড়িয়ে থাকিসÑ এবার না গেলে খবর আছে। রুম থোকে তোকে বের করে দেব।
ইমনের কথায় হাসে দিদারÑ পারলে দিস।
সন্ধ্যায় টিএসসিতে যায় দিদার। সাথে ইমন। অনেকের সাথে মিলে ফুল দিয়ে মালাও গাঁথে। কিন্তু রাতে দিদার রুমে ফেরে না। ইমন অবাক হয়। মোবাইল করে, দিদারের মোবাইল বন্ধ। ফোন করে বন্ধুদের কাছে। কেউ কোনো খবর দিতে পারে না। হঠাৎ দিদারের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার কোনো সূত্র খুঁজে পায় না ইমন। সকালে উঠে বন্ধুদের সাথে মালা নিয়ে সাভারে যায়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে স্মৃতিসৌধের চারপাশের নয়নাভিরাম জায়গায় ঘুরে বিকেলে ঢাকায় ফিরে আসে। হলের রুমে এসে দেখে দিদার ফেরেনি। শুরুতে অভিমান থাকলেও তখন চিন্তা হচ্ছে দিদারের জন্য। কোনো বিপদ হয়নি তো? আশপাশে রুমমেটদের কাছে খবর নেয়Ñ না কেউ দেখেনি দিদারকে গত রাত থেকে। আবার মোবাইল করে, বন্ধ। ঘাবড়ে যায় ইমন। ঢাকায় ওর কোনো আত্মীয়-স্বজন আছে কি-না তাও জানে না ইমন। দীর্ঘ দু-আড়াই বছর এক রুমে থাকার পরও মানুষ কেমন অচেনা থাকে প্রমাণ পেয়ে ইমন লজ্জিত হয় মনে মনে। বিকেলে খাওয়া-দাওয়া করে পরিচিত বন্ধুদের হলে যায়। খোঁজে দিদারকে। পায় না। সন্ধ্যায় যায় টিএসসিতে তৈমুর মামুর চা-দোকানে। তৈমুর মামুর দোকানেই ওরা আড্ডা দেয় কিন্তু কোনো খবর নেই দিদারের। বিষয়টা নিয়ে বন্ধুরাও চিন্তিত। একজন বলে থানায় ডায়রি করতে আর হাউস টিউটরকে জানাতে। ইমন সিদ্ধান্ত নেয় রাতটা দেখে সকালে থানায় যাবে।
রাতে রুমে এলে গভীর ভাবনায় মধ্যে পড়ে ইমন। দিদারকে ছাড়া ভালো লাগছে না। কী হলো ওর? রাত সাড়ে ১০টা বাজে। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত ইমন বিছানায় শোয়Ñ শোয়ার সাথে সাথে সে ঘুমিয়ে পড়ে। দরজায় টোকার শব্দে ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে তাকায় রাত সাড়ে ১১টা। দরজা খোলে। সামনে দাঁড়ানো দিদার। চোখ-মুখ ফ্যাকাশে, বিধ্বস্ত।
হাত ধরে ইমনÑ কী হয়েছে তোর? বলতে বলতে রুমের মাঝখানে আসে।
হঠাৎ দিদার দুহাত ইমনের পা জোড়া জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েক মুহূর্ত বিহ্বল থাকলেও পর মুহূর্তে ইমন জাপটে ধরে দিদারকে বসায় খাটেÑ পাগল হয়ে গেলি না-কি? কী হয়েছে তোর?
ইমন? ভাই আমাকে মাফ করে দেÑ কাঁদছেই দিদার।
কান্নার শব্দে পাশের রুমের বেশ কয়েকজন ছাত্র এসেছে। সবাই হতবাক দিদারের কান্নায়।
তুই এমন কী করেছিস যে তোকে ক্ষমা করতে হবে?
তুই তো মুক্তিযোদ্ধার ছেলেÑ তুই ক্ষমা করলে আমি শান্তি পাব।
তোর কথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
দিদার একটু থামেÑ জ্ঞান হওয়ার পর থেকে অসম্ভব গ্লানি বহন করে চলেছি। আমার বাবা… থেমে যায় দিদার।
কী তোর বাবা? অসুস্থ? হাসপাতালে নিতে হবে?
না রে। আমার বাবা বাংলাদেশের আলোÑ বাতাসে বেড়ে ওঠা একজন রাজাকার।
ইমনসহ সবাই চমকে ওঠেÑ বলিস কী?
হ্যাঁ, তুই যখন তোর মুক্তিযোদ্ধা বাবার ঘটনা বলিস, আমি তখন বেদনার কাদাজলে ডুবে যাই। তুই যখন বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিনের কথা বলিস, আমি তখন একটা মূষিকে পরিণত হই। তোরা যখন ২৬ মার্চ সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাস বুকে সাহস আর বিজয়ের উল্লাস নিয়ে, তখন আমি পালিয়ে বেড়াই। আমি কতকাল পালিয়ে বেড়াব? কতকাল এই রক্তাক্ত গ্লানি বহন করব? রাজাকারের সন্তান হয়ে বাঁচার যে কী গ্লানিÑ কী কষ্ট তুই বুঝবি না বুঝবি নাÑ আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো অঝোরে কাঁদতে থাকে দিদার।
পুরো রুমটা কাঁদছে রক্তের ধারায়। জড়ো হওয়া ছাত্রদের চোখও ভিজে যাচ্ছে। ইমন আলতোভাবে দিদারের ডান হাতটা হাতে নেয়Ñ বন্ধু, তোর এই পবিত্র অনুশোচনাই তোকে তোর গ্লানি থেকে মুক্তি দেবে।
তাকায় দিদারÑ তুই বলছিস?
হ্যাঁ, বলছি। তোর ভেতরের এই কষ্ট, যাতনাই তোর যাবতীয় গ্লানি থেকে তোকে মুক্তি দেবে। দেশের স্বাধীনতা, শেখ মুজিব, অগণিত শহীদ ভাই, প্রায় তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং তাজউদ্দিন, নজরুল ইসলামদের পবিত্র আত্মা তোকে জামিন দেবেÑ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমাকে বাঁচালি ভাই! কাঁদতে কাঁদতে অদ্ভুত এক অপার্থিব পবিত্র হাসি ফোটে দিদারের মুখে।

Category: