Blog Archives

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (Conspiracy Theory)

‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি আমাদের দেশে বহুল প্রচারিত ও উচ্চারিত। বিশ্ব রাজনীতিতেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত। সূত্রাবদ্ধভাবে এই প্রপঞ্চটির প্রচলন খুব বেশি দিনের না। বিশ শতকের ষাটের দশকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি’ সূত্রাকারে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে লিপিবদ্ধ করা হয়। অক্সফোর্ড অভিধানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কোনো গ্রুপ বা মহল বিশেষের বে-আইনি ও ক্ষতিকর গোপন পরিকল্পনা যা অসৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। তা-ই ষড়যন্ত্র। যেমন গোপনে চক্রান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, সরকার উৎখাত, একাধিক গ্রুপ বা মহলের অপ্রকাশ্য আঁতাত; যার লক্ষ্য অবৈধ কোনো উদ্দেশ্য সাধন, হত্যা, বিশৃঙ্খলা বা অরাজকতা সৃষ্টি ইত্যাদিও ষড়যন্ত্রের অংশ।”
অক্সফোর্ড অভিধানে প্রথম এই শব্দটির ব্যবহারকারী হিসেবে দি আমেরিকান হিস্ট্রিক্যাল রিভিয়্যু-এর ১৯০৯ সালের একটি নিবন্ধের কথা উদ্ধৃত করা হয়।
সূত্রাকারে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা চালু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ষড়যন্ত্র ধারণাটি বিশ্বের দেশে দেশে প্রচলিত ছিল। বলা হয়ে থাকে, ১৮৭০ সাল পর্যন্ত এই শব্দটিকে একটি নেতিবাচক ধারণা হিসেবে গণ্য করা হতো। শুরুতে ‘ষড়যন্ত্র’ কথাটি নিরপেক্ষ অর্থে ব্যবহৃত হলেও এটি একটি নিন্দাসূচক ধারণা বা প্রত্যয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত শুরু হয় ১৯৬০ সালের দিকে। কনস্পেরেসি থিওরি ষাটের দশকে প্রথম প্রচলন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকা-কে ঘিরে অন্যান্য তত্ত্বকে বরবাদ করে এই কনস্পেরেসি তত্ত্ব চালু করে সিআইএ। পরবর্তীকালে দেশে দেশে এই তত্ত্বের প্রয়োগ করেছে সিআইএ। হত্যা, অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, হস্তক্ষেপ এবং এমনকি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনেও ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কার্যকর ছিল।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বৈধ-অবৈধ, নৈতিক বা অনৈতিক যে কোনো পন্থায় এক বা একাধিক ব্যক্তিগোষ্ঠী গোপনে সংঘবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল অথবা রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা এবং অসাংবিধানিক ও আইনবহির্ভূত উপায়ে সকলের অজ্ঞাতে নিজেদের গোপন রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কর্মকা-কেই আমরা ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। যেমন সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল। ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি বা কৃত্রিম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় সংকট সৃষ্টি করা প্রভৃতিকে ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। রাজনৈতিক হত্যাকা-Ñ প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, গোপন চক্রান্তের ফল স্বরূপ ক্ষমতাশীল বা ক্ষমতাবহির্ভূত প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা করার পরিকল্পিত কর্মকা-Ñ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রায়োগিক প্রমাণ। সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মীরজাফর ও রবার্ট ক্লাইভের গোপন আঁতাত এবং তদুনাসারে সিরাজকে পরাজিত ও হত্যা করা যেমন ষড়যন্ত্রের অংশ, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার পেছনে কতিপয় ব্যক্তি গোষ্ঠীর তৎপরতা ষড়যন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের বৈধ শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং ২২ জন নেতাকর্মীকে হত্যার পেছনেও ছিল গভীর ষড়যন্ত্র। মধ্যযুগে রাজাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার ঘটনা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রচুর ঘটেছে। সাধারণভাবে এসব কারণে ষড়যন্ত্রকে একটি নেতিবাচক বা অপরাধমূলক তৎপরতা হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু ইতিবাচক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রয়োগ ইতিহাসে কম নয়। দাসপ্রথার কঠোর নিগড় ভাঙার জন্য স্পার্তাকাশ যখন গোপনে কৃতদাসদের বিদ্রোহের জন্য সংগঠিত করেন, তাকে কী বলব? ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল ইতিবাচক ঘটনা। ঔপনিবেশিক যুগে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বহু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীরা গোপনে সংগঠিত হয়েছে,  প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলেছে, যুদ্ধ করেছে এবং রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন এবং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, ঔপনিবেশিক শাসকদের ভাষায় এসবগুলোই হলো তথাকথিত ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা। স্বাধীনতা প্রত্যাশী মানুষের কাছে যা ছিল বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক কর্মকা-, শাসকগোষ্ঠীর ভাষায় তা-ই ছিল রাষ্ট্রবিরোধী, সংবিধান বা আইনবিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা-।
রুশ বিপ্লবের নেতা ভøাদিমির ইলিচ লেনিন রুশ বিপ্লবের জন্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে ইতিবাচক এবং ন্যায্য উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ‘অনুশীলন’, ‘যুগান্তর’ ও ‘গদর’ পার্টির গোপন সশস্ত্র তৎপরতা এবং ব্যক্তি-হত্যাকে ‘ভুল’ পথ হিসেবে দেখা হলেও সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের কিন্তু পরম দেশপ্রেমিক হিসেবে জনচিত্তে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।
ষড়যন্ত্র কেবল রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এটি প্রসারিত। পারিবারিক জীবনে, যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-ে স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার জন্য ‘ষড়যন্ত্র’ অনুঘটক বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও অংশীদার অথবা প্রতিপক্ষ কোম্পানির প্রতিযোগিতা অবস্থানের কারণে ষড়যন্ত্র হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের মধ্যেও স্বামী বা স্ত্রী পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে একে অপরকে কোনো অপরাধমূলক ভিত্তিহীন অভিযোগে ফাঁসানোর জন্য চক্রান্তের আশ্রয় নেয়। এমনকি গোপন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য যে হত্যা পরিকল্পনা করে থাকে, তা-ও ষড়যন্ত্রমূলক।
তবে শেষ কথা হচ্ছে, ষড়যন্ত্র শব্দটি আখেরে কোনো মহৎ কাজ হিসেবে গণ্য হয় না। ষড়যন্ত্র শব্দটি কার্যত একটি অগ্রহণযোগ্য, অবৈধ, নিন্দনীয়, অনৈতিক বা নেতিবাচক কাজেরই সমার্থক হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতেই এই শব্দটির বা এই প্রত্যয়টির সর্বাধিক ব্যবহার হয়ে থাকে।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

কমনওয়েলথ

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMএকদা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল যুক্তরাজ্য। এক কথায় যাকে আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হিসেবে আখ্যায়িত করি। পৃথিবীর সকল মহাদেশেই ব্রিটিশ উপনিবেশ ছড়িয়ে ছিল। বলা হতো ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না।’ তবে কালক্রমে সাম্রাজ্য সংকোচিত হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকটি উপনিবেশ ডোমিনিয়ন মর্যাদা লাভ করে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ড প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটেনের অধীনস্ত ডোমিনিয়ন হিসেবে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ১৯২৬ সালের ১৮ নভেম্বর বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অব নেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই এই দেশগুলো ব্রিটিশ কমনওয়েলথ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৩১ সালে ওয়েস্ট মিনস্টার ‘সংবিধি’ দ্বারা এই ডোমিনিয়নগুলো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মর্যাদা লাভ করে।
কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে সমর্থন জানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যায়। দ্রুতই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পরাধীন দেশগুলো একের পর এক স্বাধীনতা অর্জন করে। সর্ববৃহৎ ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারত ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে স্বাধীনতা অর্জন করে। একে একে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয় বার্মা (মিয়ানমার), শ্রীলংকা, মালয়, সিঙ্গাপুর, ফিজি, নামিবিয়া, গ্রানাডা, গায়েনা, নাইজেরিয়া প্রভৃতি দেশ। ১৯৪৯ সালের ২৮ এপ্রিল ‘ব্রিটিশ’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘কমনওয়েলথ অব নেশনস’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান কমনওয়েলথ জোট আত্মপ্রকাশ করে।
ইংল্যান্ডের রানি কমনওয়েলথের প্রধান হিসেবে সর্বজন মান্য। ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট কমনওয়েলথের ১৬টি দেশ যুক্তরাজ্যের রানিকে তাদের দেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৭৪০ কোটি। আর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা এর এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৪০ কোটি। অন্যদিকে বিশ্বের চার ভাগের এক ভাগ জায়গা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সাধারণভাবে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোকে নিয়েই কমনওয়েলথ গঠিত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার এক সময়ের ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও তারা কমনওয়েলথের সদস্য নয়। পক্ষান্তরে ব্রিটিশ উপনিবেশ না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৯৫ সালে মোজাম্বিক এবং ২০০৯ সালে রোয়ান্ডা, এ দুটি আফ্রিকান দেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ গ্রহণ করে।
কমনওয়েলথের ইতিহাসে অনেক দেশ একবার সদস্যপদ নিয়েছে, পরে বেরিয়ে গেছে বা সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। কয়েক বছর পর আবার সদস্যপদে ফিরেও এসেছে। ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ লাভ করায় পাকিস্তান কমনওয়েলথ ত্যাগ করে। পরে ফিরে আসে। পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার কারণে কমনওয়েলথ তার সদস্যপদ খারিজ করে দেয়। পরে অবশ্য সদস্যপদ ফিরে পায়। ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর নীতির কারণে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। তবে ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর তারা আবার কমনওয়েলথে ফিরে আসে। ২০০৩ সালে রবার্ট মুগাবের নির্বাচনী কারচুপির সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। সর্বশেষ কমনওয়েলথ ত্যাগ করে গাম্বিয়া।
১৯৬৫ সালে কমনওয়েলথের একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। কমনওয়েলথের সদর দফতর লন্ডনের মার্লবোরো হাউসে অবস্থিত। প্রতি দু-বছর অন্তর কমনওয়েলথের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কমনওয়েলথ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশসহ পারস্পরিক সহযোগিতার ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। কমনওয়েলথ সকল সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়। প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার কমনওয়েলথ দিবস পালিত হয়।
কমনওয়েলথের ৫৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এশিয়ায় ৮টি, আফ্রিকায় ১৮টি, ইউরোপে ৩টি, উত্তর আমেরিকায় ১২টি, দক্ষিণ আমেরিকায় ১টি এবং ওশেনিয়ায় অস্ট্রেলিয়াসহ ১১টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র কানাডা এবং সবচেয়ে ছোট দেশ নাউরু। জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত সর্ববৃহৎ। একা ভারতের জনসংখ্যা কমনওয়েলথের অন্য সকল রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনকে বলা হয় হাই কমিশন এবং রাষ্ট্রদূতকে হাই কমিশনার।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

সুশাসন

Posted on by 0 comment

6সুশাসন একটি বহুমাত্রিক প্রত্যয় বা ধারণা। ‘সু’ মানে ভালো। ‘সু’ প্রত্যয়যুক্ত বেশ কিছু বাংলা শব্দ, প্রায় সর্বক্ষেত্রে ভালো বা ইতিবাচকতা বোঝায়। সুস্বাস্থ্য, সুমতি, সুনিবিড়, সুশৃঙ্খল, সুনীতি, সুবিচার, সুচিন্তিত, সুলভ্য, সদূর এবং সুশাসনÑ প্রভৃতি শব্দ একদিকে গুণবাচক, পরিমাণগত এবং মান (ঝঃধহফধৎফ) বাচকতাসহ বহু অর্থবোধক ও বহুমাত্রিক।
‘সুশাসন’-এর সহজ সরল অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের বাধাহীন সুযোগ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সর্বক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা। তবে সুশাসনের ধারণাটি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক এবং বিশিষ্ট রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীগণ এই ধারণাকে পরিব্যাপ্ত করেছেন, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।
সুশাসনের ক্লাসিক্যাল বা চিরায়ত ধারণা যেমন প্লেটোর রিপাবলিক গ্রন্থে পাওয়া যায়। তেমনি ম্যাকিয়াভেলি এবং ইউরোপে বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত বিকাশমান ধারণার (ঈড়হপবঢ়ঃ) মধ্যেও ‘সুশাসন’ শব্দবন্ধটির অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রাচীন ভারতের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে রাজ্যশাসনে সুশাসন বা সুনীতির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ‘সুশাসন’ শব্দটি প্রচলন করে বিশ্বব্যাংক। সত্তর ও আশির দশকে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থলগ্নীকরণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর, বিশ্বব্যাংক ১৯৮৯ সালে ‘সুশাসন’ ধারণাটির উদ্ভাবন করে। বস্তুত, সুশাসন হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রেসক্রিপশন। তারা খাতক রাষ্ট্র বা বিশ্বব্যাংকের ‘সাহায্য’ প্রাপ্ত দেশগুলোর উন্নয়নে, রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠাকে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব, দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা অদক্ষ, দুর্নীতি পরায়ণ আমলাতন্ত্রকে দায়ী মনে করে।
‘সুশাসন’ ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই ধারণার ভিত্তিতে ১৯৯৫ সালে এ ডি বি এবং ১৯৯৮ সালে আই ডি এ দেশে দেশে সুশাসনের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সুশাসন কেবল একটি রাজনৈতিক ধারণা (চড়ষরঃরপধষ ঈড়হপবঢ়ঃ) হিসেবেই নয়, আধুনিক বিশ্বে এই প্রত্যয়টি সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও ব্যক্তি পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছে।
সুশাসনের ক্লাসিক্যাল ধারণায় (প্লেটো, কৌটিল্য এবং ম্যাকিয়াভেলি) রাষ্ট্রের শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের নিরিখকে বিবেচনা করা হয়েছে। যেখানে শাসককুল ও প্রজাসাধারণের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারিত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান, শাসক ও প্রজাসাধারণের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং নাগরিকগণ তাদের অধিকার ভোগ করতে পেরে সন্তুষ্ট, সেখানেই ‘সুশাসন’ রয়েছে বলে মনে করা হয়।
আধুনিককালে সুশাসনের বহুমাত্রিক ধারণার বিকাশ ও প্রয়োগ হচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, ‘সুশাসনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মৌলিক স্বাধীনতার উন্নয়ন।’ ইউএনডিপি-র মতে, ‘সুশাসন সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করে।’ ম্যাককরনির মতে, ‘সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের সাথে জনগণের, শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ককে বোঝায়।’ জাতিসংঘের এককালীন সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানের মন্তব্য এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘এড়ড়ফ মড়াবৎহবহপব রং ঢ়বৎযধঢ়ং ঃযব ংরহমষব সড়ংঃ রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ভধপঃড়ৎ রহ বৎধফরপধঃরহম ঢ়ড়াবৎঃু ধহফ ঢ়ৎড়সড়ঃরহম ফবাবষড়ঢ়সবহঃ.’
বস্তুত, সুশাসন একটি আপেক্ষিক প্রত্যয়। এটির কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। ফলে সুশাসনকে এক এক সংস্থা, এক এক ব্যক্তি বা রাষ্ট্র এক একভাবে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তবে সাধারণভাবে কতকগুলো মানদ-কে সর্বজনীন ধরে নেওয়া হয়। যেমনÑ টঘঐঈজ সুশাসন বলতে ৫টি উপাদান চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলোÑ ১. ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ২. জবংঢ়ড়হংরনরষরঃু ৩. অপপড়ঁহঃধনরষরঃু ৪. চধৎঃরপরঢ়ধঃরড়হ এবং ৫. জবংঢ়ড়হংরাবহবংং। পক্ষান্তরে জাতিসংঘ স্থির করেছে ৮টি উপাদানÑ ১. দায়বদ্ধতা ২. কার্যকর ও দক্ষ প্রশাসন ৩. স্বচ্ছতা ৪. ন্যায়বিচার ৫. জবাবদিহিতা ৬. আইনের শাসন ৭. অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ৮. জনগণের মতামতের ওপর নির্ভরশীলতা।
ঘুরেফিরে নানা তত্ত্বের কথা বলা হলেও, সুশাসনের প্রাণ হচ্ছে নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র, যার অর্থ হচ্ছে নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা, সর্বজনীন মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রায়ন, সর্বস্তরে জনগণের অংশগ্রহণ, নারী-পুরুষের সমান অধিকার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মুক্তধারা, দুর্নীতি থেকে মুক্তি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র। বলা বাহুল্য সুশাসন হচ্ছে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠার সকল সুযোগ রাখা হয়েছে।
নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

শীতল যুদ্ধ, শান্তি আন্দোলন ও পিস অফেনসিভ

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-16-48 PMপিস অফেনসিভ শব্দটি গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী। এই শব্দটির উদ্গাতা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি। অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধের পাঁয়তারা এবং শীতল যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করা এবং জনমতের চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধংদেহী তৎপরতা বন্ধ বা হ্রাস করার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী শান্তি আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। পিস অফেনসিভ কথাটার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি, সমরাস্ত্র শিল্পের বিকাশের বিরোধিতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে শান্তি, স্থানীয় বা আঞ্চলিক যুদ্ধ প্রতিহত করতে শান্তি এবং জাতিসমূহের স্বাধীনতা রক্ষায় শান্তি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বযুদ্ধের আগে সামরিক শক্তি এবং বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা বা ধরে রাখা এবং সর্বত্র মোড়লিপণা যারা করত তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য অর্থাৎ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ ছিল প্রধান। পর্তুগাল ও স্পেনেরও অনেক উপনিবেশ ছিল। ইতালি ও জার্মানি মূলত দুনিয়াকে নতুন করে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার জন্য পুরাতন শক্তিধর বৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ড, ফরাসি ও রাশিয়াকে টার্গেট করে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে মানবেতিহাসের নজিরবিহীন গণহত্যা ও জীবনহানি, সম্পদহানি এবং ধ্বংস সাধন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি অর্থাৎ ‘জার্মানি-ইতালি-জাপানের’ পরাজয় নিশ্চিত করতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পরও মূলত নিজের পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। জনবহুল ঐ দুটো শহর মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং পরমাণু বোমা সোভিয়েত ইউনিয়নকে শঙ্কিত করে তোলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপে জামার্নির পরাজয়ের নির্ধারক শক্তি ছিল সোভিয়েত বাহিনী। বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের মোকাবিলা করার মতো সামরিক শক্তির অধিকারী ছিল একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। ফলে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে শুরু হয় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বলয় সৃষ্টির অশুভ প্রতিযোগিতা। ১৯৪৭ সাল থেকেই কোল্ড ওয়ার বা ঠা-া যুদ্ধের যুগের শুরু।
শীতল যুদ্ধ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক, ভাবাদর্শগত ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষত ট্রুম্যান স্তালিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে সহ্য করতে পারতেন না। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব ছিল সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিজমের ঘোর বিরোধী। তারা সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েতের ধ্বংস কামনা করত। পক্ষান্তরে সোভিয়েত ইউনিয়নও বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদ উৎখাত, পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লিপণাকে খর্ব করা এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টা করত। আর এসবই ছিল ঠা-া যুদ্ধের প্রধান কারণ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি এবং পরাধীন জাতিসমূহের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয়ের বাইরে ১৯৪৮ সালে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব ইন্টেলেকচুয়াল ফর পিস’ নামে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠান করে। এই সমাবেশ থেকে একটি স্থায়ী সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিয়ন কমিটি অব ইন্টেলেকচুয়াল ফর পিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯৪৯ সালে এই কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৭৫টি দেশের ২ হাজার প্রতিনিধি যোগদান করে। কমিটির বা সংগঠনের নাম হয় ওয়ার্ল্ড কমিটি অব পার্টিজান্স ফর পিস।
১৯৫০ সালে হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত হয় এই সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস। সম্মেলনে সংগঠনের নতুন নামকরণ করা হয়, বিশ্বশান্তি পরিষদ। বিশ্বশান্তি পরিষদের প্রথম সভাপতি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও ফ্রান্সের নোবেলজয়ী ফ্রেডারিক জুলিও কুরি। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন ইলিয়া এরেনবুর্গ, আলেকজান্ডার ফাদায়েভ, ডিমিট্রি সেস্তোভিচ, ডব্লিউ বইস, পল রবসন, পাবলো পিকাসো, হাওয়ার্ড ফাস্ট, লুঁই আরাগঁ, জর্জ অ্যামাদো, পাবলো নেরুদা, গিয়র্গি লুকাস, বেনাটো গুটোস, জন পল সার্ত্রে, লেরি, দিয়াগো রিভেরা ও মোহাম্মদ আল আসমার প্রমুখ মনীষীসহ বিশ্বের বহু নোবেলজয়ী ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী।
বস্তুত, ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিশ্বশান্তি পরিষদ একটি কার্যকর সামাজিক ও সিভিল সোসাইটি আন্দোলন হিসেবে প্রভূত মর্যাদা অর্জন করে। ‘শান্তি পরিষদ’ বিশ্বশান্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পুরস্কার প্রবর্তন করে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জুলিও কুরি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। বিশ্বে শান্তি ও মুক্তির বাতাবরণ সৃষ্টি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ববাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে শান্তি পরিষদ ছাড়াও অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছেÑ
১. খ্রিস্টান পিস কনফারেন্স ২. প্রতিরোধ সংগ্রামীদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ৩. ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পিস ৪. আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক আইনজীবী সংগঠন ৫. আন্তর্জাতিক অরগানাইজেশন অব জার্নালিস্ট ৬. ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস ৭. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ৮. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব সাইন্টিফিক ওয়ার্কার্স ৯. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নস ১০. উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন ১১. ওয়ার্ল্ড পিস এসপারেন্টো মুভমেন্ট ইত্যাদি।
বস্তুত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আর্থিক সহায়তায় বিশ্বশান্তি পরিষদসহ উল্লিখিত সংগঠনগুলো পরিচালিত হতো। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বিশ্বশান্তি পরিষদের হেডকোয়ার্টার ছিল। মানব বিধ্বংসী নতুন নতুন পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা এবং পরমাণু অস্ত্রের বিস্তারের বিরুদ্ধে, নিরস্ত্রীকরণ, মানব বিধ্বংসী অস্ত্রের পুনরুৎপাদনশীল ক্ষমতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, দেশে দেশে মার্কিন আগ্রাসন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি ইস্যুতে বিশ্বশান্তি পরিষদ পশ্চিমা বিশ্বসহ সর্বত্র সুশীল সমাজের সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
বিশ্বশান্তি পরিষদ (ডব্লিউপিসি) দেশে দেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, জাতিসমূহের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস, সকল প্রকার পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ তথা নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে প্রচারাভিযান ও জনমত গঠনে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশেও বিশ্বশান্তি পরিষদের শাখা রয়েছে। ১৯৭১-এর পরেও দীর্ঘদিন বিশ্বশান্তি পরিষদের সভাপতি ছিলেন ভারতের রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সভাপতি ছিলেন প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল প্রমুখ।
সোভিয়েত তাত্ত্বিকদের মতে, এভাবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধবাজ নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘শান্তি আন্দোলনকে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকেই চবধপব ঙভভবহংরাব হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো।
সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নৃ-গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শান্তির নীতিকে অনেকেই ‘পিস অফেনসিভ’ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণ ও ৫-দফা সমাধান সূত্র, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান ও মানবিক সাহায্য প্রদানের অঙ্গীকার ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার শাসকগোষ্ঠীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার এবং কূটনৈতিক তৎপরতার যে অবস্থান তিনি নিয়েছেন, এক কথায় তাকে ‘পিস অফেনসিভ’ বলা যেতে পারে। তার এই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলে মিয়ানমার অস্বীকৃতির অবস্থান থেকে সরে এসে রোহিঙ্গা সমস্যার বাস্তবতা মেনে নিতে এবং তাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে।
সোভিয়েত আমলের ‘পিস অফেনসিভ’ কথাটি বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

Category:

ভাষা আন্দোলন

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন কংগ্রেসের ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ সলিমুল্লাহ হলের এক সভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ। প্রথম থেকেই তমুদ্দন মজলিশ ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ ১৪৪ ধারা ভেঙে সচিবালয়ের সামনে ছাত্র গণবিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। শেখ মুজিব, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, রণেশ দাশগুপ্ত, ধরিণী রায়, শওকত আলী ও আবদুল ওয়াদদুসহ সেদিন ৬৯ জন ছাত্র-যুব নেতা গ্রেফতার বরণ করেন। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় শেখ মুজিবের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা সফরকালে রেসকোর্স ময়দানে এবং পরের দিন কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সভায় জিন্নাহ তাঁর বক্তৃতায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণা করেন। ‘নো’ ‘নো’ বলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ছাত্র। এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে ১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সূচিত ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে গণজাগরণে পরিণত হয়।
১৯৫১ সালের ২৭ মার্চ যুব সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি এবং সম্মেলন স্থল বার লাইব্রেরি হল পুলিশ দখল করে নেওয়ায় বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পারের গ্রিনবোটে বসে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। সম্মেলনে মাহমুদ আলীকে সভাপতি, খাজা আহমদ, ইয়ার মোহাম্মদ খান, শামসুদ্দোহা, আবদুল মজিদ এবং মিসেস দৌলতুন্নেসাকে সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদে অলি আহাদ, যুগ্ম সম্পাদক : আবদুল মতিন ও রুহুল আমিন এবং কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন তাসাদ্দক আহমদ চৌধুরী। কার্যকরী সংসদের সদস্য ছিলেনÑ মাহমুদ নুরুল হুদা, মো. তোয়াহা, মতিউর রহমান (রংপুর), আবদুল হালিম (ঢাকা), আবদুস সামাদ (সিলেট), মকসুদ আহমদ, কে. জি. মোস্তফা, কবির আহমদ (চট্টগ্রাম), এমএ ওয়াদুদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, প্রাণেশ সমাদ্দার, তাজউদ্দিন আহমদ, আকমল হোসেন, মোতাহার হোসেন ও মিস রোকেয়া খাতুন। যুবলীগ ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের শক্ত-ভিত গড়ে তোলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। যুবলীগে বামপন্থিদের প্রভাব ছিল বেশি। নানা কারণে এই সংগঠন শেষ পর্যন্ত ৬-৭ বছরের বেশি টেকেনি।
ইতোমধ্যে ১৯৫১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাখা গঠনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর আততায়ীর গুলিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নিহত হন। গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। লিয়াকত আলীর মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় সফরে এসে পুনরায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটিতে ছিলেনÑ

১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী : সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ
২. আবুল হাশিম : খেলাফতে রাব্বানী পার্টি
৩. শামসুল হক : সাধারণ সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ
৪. আবদুল গফুর : সম্পাদক, সাপ্তাহিক সৈনিক
৫. অধ্যাপক আবুল কাসেম : তমদ্দুন মজলিশ
৬. আতাউর রহমান খান : আওয়ামী মুসলিম লীগ
৭. কামরুদ্দিন আহমদ : সভাপতি, লেবার ফেডারেশন
৮. খয়রাত হোসেন : সদস্য, পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ
৯. আনোয়ারা খাতুন : সদস্য, পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ
১০. আলমাস আলী : নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী মুসলিম লীগ
১১. আবদুল আওয়াল : নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী মুসলিম লীগ
১২. সৈয়দ আবদুর রহিম : সভাপতি, রিকশা ইউনিয়ন
১৩. মো. তোয়াহা : সহ-সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ
১৪. অলি আহাদ : সাধারণ সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ
১৫. শামসুল হক চৌধুরী : ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ
১৬. খালেক নেওয়াজ খান : সাধারণ সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ
১৭. কাজী গোলাম মাহবুব : আহ্বায়ক, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ
১৮. মীর্জা গোলাম হাফিজ : সিভিল লিবার্টি কমিটি
১৯. মজিবুল হক : সহ-সভাপতি, সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদ
২০. হেদায়েত হোসেন চৌধুরী : সাধারণ সম্পাদক, সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদ
২১. শামসুল আলম : সহ-সভাপতি, ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদ
২২. আনোয়ারুল হক খান : সাধারণ সম্পাদক, ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্র সংসদ
২৩. গোলাম মাওলা : সহ-সভাপতি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ
২৪. সৈয়দ নূরুল আলম : পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ
২৫. মোহাম্মদ নূরুল হুদা : ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ
২৬. শওকত আলী : পূর্ববঙ্গ কর্মীশিবির, ১৫০ মোগলটুলী, ঢাকা
২৭. আবদুল মতিন : আহ্বায়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ
২৮. আখতার উদ্দিন আহমদ : নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ

কমিটি ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিক্ষোভ-সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে কারো কারো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। সে সময় কারাবন্দি হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান, যুবলীগ নেতা অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা এবং ছাত্রলীগ নেতা কাজী গোলাম মাহবুব ও খালেক নেওয়াজ প্রমুখের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে গোপনে মিলিত হন এবং ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি তার কারামুক্তির দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন পালনের কথা জানান। তিনি ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। পরামর্শ দিতেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান লিখেছেনÑ শেখ মুজিব কারাগারে থেকেও আন্দোলনের ব্যাপারে তাদের কাছে ‘চিরকুট’ পাঠাতেন, এবং তিনি প্রয়োজনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হলেও আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। ছাত্রনেতাদের সাথে যোগাযোগ ও আন্দোলনে তার এই ভূমিকার কথা জানতে পেরে ২১শে ফেব্রুয়ারির আগেই তাকে ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।
কিন্তু এসব করেও আন্দোলন ব্যাহত করা সম্ভব হয় না।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিল। মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ কার্যালয় ১৫০ মোগলটুলিতে ২০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে আতাউর রহমান খান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব এবং যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। দীর্ঘ সভায় কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় রাত ১টা ৩০ মিনিটে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি প্রত্যাহারের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ নিয়ে তীব্র বাদানুবাদ হয়। সভার সভাপতি মওলানা ভাসানী ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে থাকলেও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ভোট দেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান লিখেছেনÑ সংগঠনগতভাবে আওয়ামী লীগের ভাষা আন্দোলন প্রশ্নে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণ সোহরাওয়ার্দী সাহেব উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের নিন্দা করে বিবৃতি দিলেও সোহরাওয়ার্দী তখনও রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন না। অথচ মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব দৃঢ়ভাবে বাংলার পক্ষে ছিলেন। শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর করাচি গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর কাছে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার পর তিনি তার মত পরিবর্তন করেন। দ্রষ্টব্য : জিল্লুর রহমান, ভাষা আন্দোলন ও মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ গৌরবের ৫৫ বছর।

অন্যদিকে একই দিনে অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে ছাত্রনেতাদের বৈঠকে পর দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সভায় উপস্থিত ছিলেনÑ ১. যুবলীগ নেতা গাজীউল হক ২. হাবিবুর রহমান শেলী (সাবেক প্রধান বিচারপতি) ৩. মোহাম্মদ সুলতান (পরবর্তীতে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) ৪. এম আর আখতার মুকুল (ছাত্রলীগ নেতা ও পরবর্তীতে প্রখ্যাত সাংবাদিক) ৫. জিল্লুর রহমান (ছাত্রলীগ নেতা ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) ৬. আবদুল মমিন (ছাত্রলীগ নেতা, মন্ত্রি ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য) ৭. এসএ বারী এটি (ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জিয়াউর রহমান সরকারের মন্ত্রী) ৮. সৈয়দ কামরুদ্দিন শহুদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক) ৯. আনোয়ারুল হক খান (মুজিবনগর সরকারের তথ্য সচিব) ১০. মঞ্জুর হোসেন (চিকিৎসক) ১১. আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির বিরোধিতা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ জন-৫ জন করে মিছিল নিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য পুলিশ মিছিলের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা নেমে আসে। পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। শহীদ হন রফিক, জব্বার, শফিক, বরকত, সালাম প্রমুখ। এই বর্বরোচিত হত্যাকা-ের পর মুসলিম লীগ সরকার গণরোষের শিকারে পরিণত হয়। ঢাকাসহ দেশের দৃশ্যপট বদলে যায়। ঢাকায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভার কয়েকজন সদস্য অধিবেশন থেকে বেরিয়ে এসে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানান। ২২, ২৩ ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। একইসঙ্গে ১৯৫৩ সালে প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙ্গে দেওয়া এবং ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়। এভাবে সবচেয়ে সংগঠিত প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এ দেশের সকল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং বীর শহীদানের আত্মদানের ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলন কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জন করে। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল বামপন্থি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন কাজী আনোয়ারুল আজিম ও সৈয়দ আবদুস সাত্তার। ’৫২ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সুলতান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস।

Category:

সুশীল সমাজ বা সিভিল সোসাইটি

Posted on by 0 comment

1-3-2018 8-08-59 PMস্কটিশ রেনেসাঁর নেতৃস্থানীয় তাত্ত্বিক অ্যাডাম ফার্গুসন সিভিল সোসাইটি প্রত্যয়টির প্রথম ব্যবহার করেন। সিভিল সোসাইটি প্রত্যয়টির কোনো যুতসই বা যথার্থ বাংলা প্রতিশব্দ নেই। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে কেউ কেউ ‘সুশীল সমাজ’ শব্দ-বন্ধটি প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই শব্দটি এখন বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে প্রায় গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু মর্মার্থের দিক থেকে তা সিভিল সমাজ প্রত্যয়ের খ-িত প্রতিশব্দ বলা যেতে পারেÑ পূর্ণাঙ্গ নয়।
‘সিভিল সমাজ’ ধারণাটি নিয়ে প-িতমহলে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সমাজবিজ্ঞানে বিস্তর তর্ক রয়েছে। কোনো একটি রাষ্ট্রের শিক্ষিত মধ্যবর্গীয় নাগরিকগণ একটি স্বতঃপ্রণোদিত সংঘÑ যা ভাবাদর্শগত নানা পথ-মত, পেশা ও বর্গের মানুষকে সমাজের সাধারণ স্বার্থে সম্মিলিত করে, সহজভাবে তাকেই সিভিল সমাজ বলা যেতে পারে। এখানে নাগরিক বলতে কেবল নগরবাসীকে নয়, সমগ্র রাষ্ট্রের জনসমষ্টিকেই বোঝানো হয়েছে।
আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সিভিল সমাজ বলতে যে মধ্যবর্গীয় জনগোষ্ঠীকে বুঝানো হয়েছে, তাদের যেমন বিবর্তন হয়েছে, তেমনি প্রত্যয়টিও বিবর্তিত হয়েছে। সিভিল সমাজ বা পুর-সমাজের ধারণাটির উৎস ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্ততলের লেখা থেকে। তৎকালে রাষ্ট্র ও পুর-সমাজকেই সিভিল সমাজ হিসেবে গণ্য করা হতো। যেখানে সভ্যতার মাপকাঠি বিচারে সা¤্রাজ্য বিস্তারের পরিধি দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো বিকাশের স্তর বিবেচনা করা হতো। সা¤্রাজ্যবিস্তার ও রাষ্ট্রকাঠামোর আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে নাগরিক সমাজের ভূমিকা দিয়ে সিভিল সমাজের অবস্থান বিবেচনা করা হতো। একটি ন্যায়ানুগ রাষ্ট্র ও সমাজ এবং ব্যক্তিসত্তার মুক্তির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অ্যারিস্ততলের ভাবশিষ্য সক্রেটিস, প্লেটো ও সিসেরো প্রমুখ ধ্রুপদী দার্শনিকবৃন্দও নানাভাবে চিন্তা-ভাবনা করেছেন।
অষ্টাদশ শতকে শিল্প বিপ্লব এবং পুঁজিবাদের উদ্ভবের যুগে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং দার্শনিক চিন্তায় বিপুল পরিবর্তনের সূচনা হয়। স্কটিশ নবজাগরণ কেবল, স্কটল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, যুক্তিবাদী এবং নাগরিকজনের কল্যাণমুখী সামাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতার বাহক হয়ে ওঠে সিভিল সমাজের অগ্রণী সংগঠকগণ। সিভিল সমাজের কর্মকা-ের ভেতর দিয়ে মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বের অভিপ্রকাশ এবং মানুষে মানুষে সখ্য ও সম্প্রীতির দৃঢ়বন্ধন গড়ে তোলা সুশীল সমাজের আইডিয়েল হয়ে দাঁড়ায়। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড হিউম মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বাইরে সামাজিক কর্মকা-কেও সিভিল সমাজের কর্তব্য-কর্ম বিবেচনা করতেন। উনিশ শতকে সিভিল সমাজের এই ধারণাকে পরিপুষ্ট করেন বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক হেগেল। তার মতে, সিভিল সমাজ রাষ্ট্র ও পরিবারের মধ্যবর্তী বাজার ব্যবস্থার অনুঘটক। তিনি পুঁজিবাদী বিকাশ ও বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট দেশের বিভিন্ন সামাজিক বর্গ, শ্রেণি, গোষ্ঠী ও পেশাগত সংগঠনের স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে সিভিল সমাজকে বিবেচনা করা হতো। কার্লমার্কস হেগেলের এই চিন্তাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তার কাছে সমাজ বিকাশের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার সিভিল সমাজ কোনো শ্রেণি নিরপেক্ষ শক্তি নয়। শ্রেণি বিভক্ত সমাজের পরস্পরবিরোধী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে সিভিল সমাজের ভূমিকারও পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে। তার মতে, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে সিভিল সমাজ রাষ্ট্রকে পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে জনকল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণে অগ্রসর করে নেবে। ফ্যাসিস্ত ইতালির মার্কসবাদী প-িত আন্তোনিও গ্রামসি বলেছেন, পুঁজিবাদী নির্মমতার মধ্যেও সিভিল সমাজ স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বেচ্ছামূলকভাবে মিলিত হয়ে তার অধিকার রক্ষায় ব্রতী হতে পারে।
সাম্প্রতিককালে সিভিল সমাজকে ‘সামাজিক পুঁজি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বর্ধিত ভূমিকার কথা বলা হয়ে থাকে। পাটনাম বলেছেন, এই সামাজিক পুঁজি নাগরিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অনুঘটক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। নাগরিকজন তথা সিভিল সোসাইটি প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।
আন্তোনিও গ্রামসি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থরক্ষায় এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সিভিল সমাজকে সংগঠিত শক্তি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে যেখানে রাজনৈতিক দলের বিকাশ নি¤œমাত্রায় ছিল, সেখানে কিন্তু সিভিল সমাজই গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছে।
আমাদের দেশেও ভাষা আন্দোলন ছিল চরিত্রের দিক থেকে সিভিল সমাজের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিবাদী তৎপরতার স্বতঃস্ফূর্ত অভিপ্রকাশ। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, বাঙালির জাতিগত আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতাত্তোর কালে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সিভিল সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এ জন্য সিভিল সমাজকে রাজনৈতিক নিগ্রহেরও শিকার হতে হয়েছে। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী ‘সিভিল সমাজকে’ একটি সমাজের সবচেয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে অর্থাৎ তাদের মতো সিভিল সমাজের সবচেয়ে সংগঠিত রূপ হচ্ছে রাজনৈতিক দল। তবে রাজনৈতিক দলগুলো তা মনে করে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অ্যাডওয়ার্ড সাঈদের মতে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সিভিল সমাজ প্রায়শ রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়ে পড়ে। এর ফলে সমাজের স্বাধীন ভূমিকা ক্ষুণœ হয়। যেমনটি আমাদের দেশে ঘটছে।
কখনও কখনও রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে সিভিল সমাজ বা আমাদের দেশের বহুল উচ্চারিত ‘সুশীল সমাজকে’ প্রতিপক্ষ হিসেবে চিন্তা করা হয়। এর মধ্যে যেমন সিভিল সমাজের কোনো কোনো সংগঠনের বিতর্কিত ভূমিকা দায়ী, আবার রাজনৈতিক দলের অসহিষ্ণুতাও দায়ী। সিভিল সমাজের আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকল্প নয়, তেমনি সিভিল সংগঠন রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ হোক এটাও কাম্য নয়। সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয়দের কেউ কেউ যখন ‘সুশীল বাবু’ বলে ব্যঙ্গ করেন, তখন তিনি ভুলে যান সিভিল সমাজের সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি নিজেকেই ব্যঙ্গ করছেন। একটি সভ্যসমাজে সিভিল সমাজ তথা সুশীল সমাজ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক রূপান্তরের অপরিহার্য সহায়ক শক্তি।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

পোপ কাহিনি

12-6-2017 7-23-47 PMখ্রিস্টান ধর্মে রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ-এর মর্যাদা বিশ্বজনীন। ইতালির রাজধানী রোমের কেন্দ্রস্থলে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের তীর্থকেন্দ্রটির নাম ভ্যাটিকান। মাত্র ১১০ একর জমির ওপর ক্যাথলিক জগতের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র তথা রোমান চার্চটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদার অধিকারী। ভ্যাটিকানের জনসংখ্যা মাত্র ৯১০ জন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের আগে ভ্যাটিকানের কোনো পৃথক রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক মর্যাদা ছিল না। ইতালির রাজতন্ত্রের অন্তিমকালে ভ্যাটিকানকে অবশিষ্ট ইতালি থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। এই রাষ্ট্রের কর্ণধার কিন্তু কেবল ভ্যাটিকানের ৯১০ জন অধিবাসীর নয়, সারাবিশ্বের ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু হিসেবে স্বীকৃত। ভ্যাটিকান হচ্ছে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। তবে অন্য রাষ্ট্রের সাথে প্রকৃতগতভাবেই এটি আলাদা। এটি আসলে একটি বৃহৎ চার্চ ও খ্রিস্টান জগতের আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। ভ্যাটিকানের প্রধান হচ্ছেন একজন পোপ।
পোপ শব্দটি গ্রিক জরৎধপ অর্থাৎ ‘ঋধঃযবৎ’ থেকে উৎসারিত। খ্রিস্টধর্মের শুরুতে কোনো একক ‘পোপ’ ছিল না। তথন মূলত খ্রিস্টান ধর্মযাজক বা সকল বিশপের ক্ষেত্রেই এই পোপ অথবা ফাদার টাইটেলটি ব্যবহৃত হতো। কেবল রোমের ‘বিশপ’কে একমাত্র ‘পোপ’ বলার প্রচলন শুরু হয় একাদশ শতাব্দী থেকে। এর আগে, খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক যুগে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার প্যাট্রিয়ার্ক, পোপ হেরাক্লাস (ঐবৎধপষধং) অব আলেকজান্দ্রিয়া (২৩২-২৪৮ খ্রিস্টাব্দ) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইংরেজিতে চড়ঢ়ব টাইটেল বা শব্দটির ব্যবহার দেখা যায় দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে। গ্রিক থেকে ইংরেজি অনুবাদে পোপ ভিটলিয়ান (চড়ঢ়ব ঠরঃধষরধহ) সম্পর্কে এই টাইটেল বা বিশেষণটি ব্যবহৃত হয়।
খ্রিস্ট ধর্মমতকে প্রথম দিকে ইহুদি ধর্মমতেরই একটি শাখা মনে করা হতো। ওর্ল্ড টেস্টামেন্টের সঙ্গে খ্রিস্টের জীবন ও বাণী হিসেবে প্রচারিত গসপেল বা খ- কাহিনিগুলোর ধারাবাহিকতা বলেও মনে করা হতো। রোমানদের মধ্যে বিশেষভাবে এই ধারণার অবসান ঘটে সাধু পলের প্রচার ও খ্রিস্টানদের সংঘশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের ভেতর দিয়ে। পল-ই প্রথম ইহুদিদের বাইরে খ্রিস্টের বাণী প্রচার করেন। পল ছিলেন গ্রিকভাষী। কলোসিয়ান এবং এফিসিয়াদের উদ্দেশে তার লেখা পত্রাবলি (ঞযব ঊঢ়রংঃষবং) থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় পল প্রাচীন গ্রিক ধর্মের রূপক ও মিস্টিসিজমের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপের প্রবেশ পথে, স্যালনিকা, এথেন্স, কিরস্থ এবং রোমে যিশুর বাণী প্রচারের মাধ্যমে পল এক আধ্যাত্মিক আলোড়নের সৃষ্টি করেন। তবে শুরুতে রোমানদের কাছে খ্রিস্টধর্ম প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়েছিল। রোম স¤্রাটের মূর্তিপূজা করতে অস্বীকৃতি জানানোর অপরাধে মৃত্যুদ- দেওয়া হতো। প্রচ- অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেই খ্রিস্টধর্ম চতুর্থ শতকে রোমান-সা¤্রাজ্য, ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এমতাবস্থায় চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে রোমের স¤্রাট কনস্টানটাইন নিজেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। স¤্রাট খিস্ট্রধর্ম গ্রহণ করায় অচিরেই এই ধর্ম রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হয়। স¤্রাট কনস্টানটাইন সা¤্রাজ্যের রাজধানী রোম থেকে আজকের তুরস্কে স্থানান্তরিত করেন। তার নামে নতুন রাজধানী শহরের নামকরণ করা হয় কনস্টান্টিনোপল। মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপল ছিল বাইজেনস্টাইন সা¤্রাজ্য তথা খ্রিস্টান জগতের রাজনৈতিক, সামরিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। যিশুখ্রিস্টের জন্ম প্যালেস্টাইনে। তার বাণী প্রথমে প্যালেস্টাইন অঞ্চলের হিব্রু ভাষায়ই প্রচারিত ছিল। কিন্তু স¤্রাট কনস্টাইনটাইন ও পল গ্রিকভাষী হওয়ায় তারাই প্রথম যিশুর ওপর প্রত্যাদেশ হিসেবে আসা বাণীসমূহকে সংগ্রহ ও গ্রিক ভাষায় সংকলিত করেন। অতএব, ঙষফ ঞবংঃধসবহঃ হিসেবে পরিচিত আসমানি কিতাব তাওরাত, যেমন হিব্রু ভাষার তেমনি ঘবি ঞবংঃধসবহঃ বা বাইবেল বা ইঞ্জিল শরিফ গ্রিক ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়।
খ্রিস্টধর্মের প্রসারের পাশাপাশি খ্রিস্টানদের মধ্যে খোদ যিশুকে নিয়ে এবং ধর্মীয় অনুশাসন নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে থাকে। গোঁড়ামি, মতান্ধতা, নিজ নিজ গোষ্ঠীর ধর্মবেত্তাদের মতের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রভৃতি প্রবণতা খ্রিস্টীয় সমাজকে বিভিন্ন চার্চে বিভক্ত করে। শুরুতে এটা ছিল ট্রিনিটি বা ঈশ্বরের ত্রিত্ত্বভাব নিয়ে বিতর্ক। তৃতীয়-চতুর্থ শতক থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে খ্রিস্টান চার্চের প্রধান বিভক্তিগুলো সংঘটিত হয়। প্রাচীনপন্থি নেস্টেরীয় সিরিয়ান চার্চ, প্রথম দিকের কনস্টান্টিনোপল ও রোমের চার্চ, পূর্ব ইউরোপের বিশেষত রাশিয়ার অর্থডক্স চার্চ, ষোড়শ শতকে রিফর্মেশনের যুগে রোমান চার্চের বিভক্তির পটভূমিতে ক্যাথলিক চার্চের পাশাপাশি ইংল্যান্ডে প্রোটেস্টান্ট চার্চসহ ইউরোপ ও আমেরিকার একাধিক স্বাধীন চার্চ গড়ে ওঠে। এর ফলে রোমান চার্চের একাধিপত্যই কেবল খর্ব হয় না, রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকায়নেরও সূচনা হয়।
ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকেও চার্চের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল। জেরুজালেম, গ্রিস, কনস্টান্টিনোপল ও রোমের বিশপগণ বস্তুত স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে খ্রিস্টান সমাজের আধ্যাত্মিক জীবন পরিচালনা করতেন। তখন পর্যন্ত কোনো শক্তিধর পোপের কথা জানা যায় না। কিন্তু বাইজাইনস্টাইন সা¤্রাজ্যের অবসান এবং ইতালিতে বর্বর টিউটোনিক আক্রমণের মুখে ইতালির স্বাধীনতা রক্ষায় অবতীর্ণ হন পোপ। স¤্রাটের দুর্বল ভূমিকা, দাস সমাজের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় এবং ইউরোপে ছোট ছোট খ্রিস্টান রাজ্যের অভ্যুদয় চার্চের বর্ধিত ভূমিকার সুযোগ দেয়। ফলে পোপের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
কনস্টান্টিনোপল ছিল ক্যাথলিক চার্চের বাইরে। এখানকার খ্রিস্টান-সমাজ ছিল সনাতন বা অর্থডক্স চার্চের অধীন। তারা ক্যাথলিক ধর্মমত ও পোপের কর্তৃত্ব মানতো না। ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের অজুহাতে পোপ দ্বিতীয় আরবানের উদ্দেশ্য ছিল ‘বিধর্মীদের আক্রমণচ্ছলে’ কনস্টান্টিনোপল দখল করা এবং তার লালিত দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা, সেখানে ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্ব ও প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
ক্রুসেডের ব্যর্থতার কারণে চার্চের প্রতি হতাশ মানুষ অন্যত্র প্রেরণা খুঁজতে শুরু করে। পোপ ও চার্চের একাধিপত্য, যাজকদের বিলাসী জীবনযাপন, ব্যভিচার এবং গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত এবং সংস্কারপন্থি ধর্ম-সম্প্রদায় গড়ে উঠতে থাকে। ষোড়শ শতাব্দীতে জন্মসূত্রে জার্মান ধর্মযাজক মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে শুরু হয় চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা ‘প্রোটেস্ট’। চার্চের দুর্নীতি এবং প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে এই নবজাগ্রত ধর্মান্দোলনকে অভিহিত করা হয় ‘রিফর্মেশন’ বলে। সংস্কারপন্থি বা রিফর্মিস্টরা মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার ফলে রোমান চার্চের ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রাচীনপন্থি গ্রিক চার্চের দলভুক্ত রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপ এই বিভাজনের বাইরে রইল। সাধারণভাবে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দকে রিফর্মেশনের শুরুর বছর হিসেবে ধরা হয়। প্রোটেস্টাইন বিদ্রোহ বা রিফর্মেশনকে কেন্দ্র করে ক্যাথলিক জগৎ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ইউরোপের রাজন্যবর্গের একাংশ ক্যাথলিক চার্চের পক্ষে এবং অন্য অংশ প্রোটেস্টান্টদের পক্ষাবলম্বন করেন। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি ক্যাথলিক চার্চ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইংল্যান্ডে স্বতন্ত্র প্রোটেস্টান্ট চার্চ প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে চার্চের প্রধান ঘোষণা করেন।
ইউরোপে রেনেসাঁ, চার্চ থেকে রাষ্ট্র এবং চার্চ থেকে শিক্ষাকে আলাদা করা, পুঁজিবাদের উদ্ভব, ফরাসি বিপ্লব, সেকুলার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব গত ২০০ বছরে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে খর্ব করতে করতে ক্যাথলিক চার্চকে সংকোচিত করে ১১০ একরে সীমিত করেছে। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব না থাকলেও ক্যাথলিক চার্চের আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং পোপের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা সর্বজন স্বীকৃত।
    

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

অক্টোবর বিপ্লব

07মানবেতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী সামাজিক বিপ্লব ‘মহান অক্টোবর বিপ্লব’-এর শতবর্ষ পূর্ণ হলো। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ নভেম্বর তৎকালীন রাশিয়ার রাজধানী পেত্রোগ্রাদের উইন্টার প্যালেস দখল এবং ভøাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘সর্বহারা শ্রেণির’ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠানের ঘোষণাকে বলা হয়ে থাকে ‘মহান অক্টোবর বিপ্লব’। এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছে রুশ সোস্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি (বলশেভিক)। রুশরা বিপ্লবের আগে তাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি (জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি) অনুসরণ করত। পরে অবশ্য বিশ্বব্যাপী প্রচলিত গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করায় ৭ নভেম্বরকেই ‘বিপ্লব দিবস’ হিসেবে উদ্যাপিত করা হতো। তবে বিপ্লবের বিশ্বজনীন পরিচিতি হয়ে দাঁড়ায় ‘অক্টোবর বিপ্লব’।
১৯১৭ সাল ছিল রাশিয়ার এক ঘটনাবহুল রাজনৈতিক উত্থান-পতনের বছর। ইউরোপের তথা ভৌগোলিক দিক থেকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশ রাশিয়ায় ছিল সুদীর্ঘ রাজতন্ত্র। অষ্টাদশ শতকে পিটার দি গ্রেট রাশিয়ায় খ- খ- রাজ্যগুলোকে একত্রিত করে এক বিশাল রুশ সা¤্রাজ্য গড়ে তোলেন। তার নামেই সেন্ট পিটার্সবুর্গে স্থাপিত হয় দেশের রাজধানী। রাশিয়ার এই শাসক বংশকে বলা হয় জার। জার শাসকরা ছিল অত্যাচারী এবং সর্বপ্রকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরোধী। ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব এবং ঊনবিংশ শতকের সাম্য মৈত্রী ভ্রাতৃত্বের আহ্বান সম্বলিত ফরাসি বিপ্লব অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ইউরোপের দেশে দেশে বুর্জোয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। দল বা সংগঠন করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এমনকি নির্বাচন প্রথারও প্রচলন ঘটে। কিন্তু রাশিয়ার জার শাসকরা সে দেশে কোনো গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্ব থেকেই রাশিয়ায় নানা বিপ্লবী সংগঠন গড়ে ওঠে।
১৮৯৮ সালে ভøাদিমির ইলিচ সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত থাকার সময় রাশিয়ার মাকর্সবাদী বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। গড়ে ওঠে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি। ১৯০৩ সালে এই পার্টির মধ্যে নানা রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিতর্ক দলটিকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগে ছিলেন রাশিয়ায় মার্কসবাদী দর্শনের পথিকৃত প্লেখানভ এবং অন্যদিকে ভøাদিমির ইলিচ লেনিন। পরবর্তীকালে এই মতবিরোধকে কেন্দ্র করে পার্টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ (বেলশেভিক) ও সংখ্যালঘিষ্ট (মেনশেভিক) দুটি উপদল গড়ে ওঠে। এমনকি পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হয়ে যায়। লেনিনের নেতৃত্বাধীন পার্টি বলশেভিক পার্টি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে।
প্রথম মহাযুদ্ধের পটভূমিতে রাশিয়ার অর্থনীতিতে চূড়ান্ত বিপর্যয় নেমে আসে। শ্রমিক, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়ার বুর্জোয়া ও লিবারেল গণতন্ত্রীদের নেতৃত্বে এবং জারবিরোধী সকল শক্তির সম্মিলিত প্রয়াসে সশস্ত্র গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। স¤্রাট জার দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ‘স্টেট ডুমা’ (জাতীয় সংসদ) কেরেনেস্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পেত্রোগ্রাদ। কিন্তু কেরেনেস্কি সরকার জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকে। সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ ‘সোভিয়েত’ নামে এক ধরনের সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। শ্রমিক সোভিয়েত, কৃষক সোভিয়েত, সৈনিক সোভিয়েতÑ প্রভৃতি সমিতিগুলোকে বলশেভিক পার্টি যুদ্ধ বন্ধ ও কেরেনেস্কি সরকারকে উৎখাত ও শ্রমিক-কৃষকের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৈপ্লবিক সংগ্রাম গড়ে তোলে। ফিনল্যান্ডে নির্বাসিত লেনিন তখন রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। পেত্রোগ্রাদের (বিপ্লবের পর নাম রাখা হয়েছিল লেনিনগ্রাদ) রাজকীয় স্মলনি প্রাসাদকে হেডকোয়ার্টার করে চলতে থাকে বিপ্লবের প্রস্তুতি। এই পর্যায়ে লেনিন ও শ্রমিক সোভিয়েতগুলোকে সুসংগঠিত করা এবং অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা রাখেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম নায়ক লেভ ট্রটস্কি। ২৫ অক্টোবর                 (৭ নভেম্বর) লেনিন শীত প্রাসাদ আক্রমণ ও প্রভিশনাল কেরেনেস্কি সরকারকে উৎখাতের তারিখ নির্ধারণ করেন।
লেনিনের নির্দেশে যুদ্ধজাহাজ ক্রুজার অরোরা থেকে ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিনবার তোপধ্বনি করার ইশারা পেয়ে সশস্ত্র বাহিনী, বলশেভিকদের তৈরি রেডগার্ড (শ্রমিক, কৃষকদের নিয়ে) শীত প্রাসাদ আক্রমণ করে। কার্যত বড় ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই কেরেনেস্কি সরকার আত্মসমর্পণ করে। স্মলনিতে লেনিন পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাজত্ব ‘সমাজতান্ত্রিক রুশ প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এভাবেই আজ থেকে শতবর্ষ আগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়।
বিপ্লবের পর অবশ্য বিপ্লব বিরোধিরাও সংগঠিত হয়ে প্রতি আক্রমণ করতে থাকে। বস্তুত, ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ায় এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা কঠোর হস্তে প্রতিবিপ্লব দমনে সক্ষম হয়। ১৯২২ সালে রুশ সা¤্রাজ্যের অধীনস্ত অন্যান্য প্রদেশ বা দেশগুলোও বলশেভিকদের অধিকারে চলে আসে। ফলে ১৯২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএসএসআর বা ‘ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিকস’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বলশেভিক পার্টিও নতুন নামে ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
অক্টোবর বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যুদয়ের ফলে পৃথিবীর রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন অপরাজেয় পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। অন্যদিকে চীন, পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনেকগুলো দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাসীন হয়। গড়ে ওঠে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের সাথে সমাজতন্ত্র এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার একমাত্র বিকল্প হিসেবে প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি করে। কিন্তু ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সমাজতন্ত্রের অবসান হয়। অক্টোবর বিপ্লবের ৭৪ বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে মানবেতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

নোবেল পুরস্কার

Posted on by 0 comment

22বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের নাম ‘নোবেল পুরস্কার’। উনিশ শতকের বিশ্ববিখ্যাত রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল-এর নামে এই পুরস্কারটি প্রচলিত। প্রথম পুরস্কার প্রদান করা হয় ১৯০১ সালে। বর্তমানে প্রতিবছর মোট ৬টি বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। মানব কল্যাণে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনা বা আবিষ্কার, সমাজ ও উন্নয়ন এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাদের কৃতিত্বপূর্ণ বিশেষ অবদান রয়েছে, তাদেরই এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পুরস্কারের ক্ষেত্রগুলো হলোÑ ১. পদার্থবিজ্ঞান ২. রসায়ন ৩. চিকিৎসাশাস্ত্র ৪. সাহিত্য ৫. শান্তি এবং ৬. অর্থনীতি। শুরু থেকে প্রথমোক্ত ৫টি বিষয়ের নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হতো। ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থশাস্ত্র বা অর্থনীতিতে বিশেষ মৌলিক অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
আলফ্রেড নোবেল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম-এ ১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে রসায়নশাস্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় পড়াশোনা করেন। অসাধারণ প্রতিভাবান এই মানুষটি ১৮৮৪ সালে স্টকহোমের একটি লৌহ ও ইস্পাত কারখানা ক্রয় করেন। ইতোমধ্যে রসায়নশাস্ত্রে তার বহুসংখ্যক মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কার তাকে অর্থ ও খ্যাতি এনে দেয়। তিনি ধোঁয়াবিহীন বিস্ফোরক ‘ব্যালাস্টিক’ আবিষ্কার করে পৃথিবীজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তবে যে আবিষ্কারটি তাকে একাধারে খ্যাতি এবং বিপুল অর্থ এনে দেয় তা হলো ‘ডিনামাইট’। বস্তুত পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ধ্বংস ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ছিল ডিনামাইট। আলফ্রেড নোবেল তার ক্রয়কৃত লৌহ ও ইস্পাত কারখানাটিকে একটি অস্ত্র উৎপাদন কারখানায় রূপান্তরিত করেন। বিজ্ঞানী নোবেল সুইডেনের প্রথমসারির শিল্পপতিতে পরিণত হন।
ডিনামাইট ও অন্যান্য মানব বিধ্বংসী অস্ত্রশস্ত্র বিপুল মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মৃতদের দীর্ঘ তালিকায় নোবেলের এক সহোদর ভাইও ছিলেন। এই ধ্বংস ও মৃত্যু তার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তিনি বিজ্ঞানের এসব আবিষ্কারকে মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে বিজ্ঞানীদের এবং মানবকল্যাণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করতে তার সারা জীবনের অর্জিত অর্থ দিয়ে একটি পুরস্কার প্রবর্তনের চিন্তা করেন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ নভেম্বর তার সর্বশেষ উইলটি তিনি প্যারিসে সুইডিস-নরওয়ে ক্লাবে বসে প্রণয়ন করেন। এই উইলে তিনি তার পুরো সম্পদের ৯৪ শতাংশ, তৎকালীন মূল্যে ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা বা ৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও শান্তিÑ এই ৫টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদানের জন্য দান করেন।
আলফ্রেড নোবেল তার জীবিতাবস্থায় পুরস্কার প্রদান করে যেতে পারেন নি। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির ‘স্যানরিমো’ নামে নিজের গ্রামের বাসভবনে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তার জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যুর পর নোবেলের উইলের দুই সমন্বয়কারী রুগনার সোলম্যান ও রুডলফ লিলজেকুইস্ট ‘নোবেল ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। নোবেলের সম্পদ সংরক্ষণ এবং অর্জিত আয় দিয়ে পুরস্কার প্রদান ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করাই ছিল এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত সুইডেন ও নরওয়ে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র-কাঠামোয় দুটি স্বতন্ত্র স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঐক্যবদ্ধ ছিল। ১৮৯৭ সালে নরওয়ে নোবেলের উইল অনুমোদন করার পর নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি গঠিত হয়। ১৮৯৭ সালের ৭ জুন সুইডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যারোলিংস্কা ইনস্টিটিউট, ৯ জুন সুইডিস একাডেমি এবং ১১ জুন রাজকীয় সুইডিস একাডেমি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই নোবেল পুরস্কার বাছাই ও প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। ১৯০০ সালে একটি চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হয় এবং সুইডেনের রাজা অস্কার তা ফরমান বলে আইনে পরিণত করার ঘোষণা দেন। ১৯০১ সালে পূর্বোক্ত ৫টি (প্রতিটি ক্ষেত্রে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে) পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯০৫ সালে নরওয়ে সুইডেন থেকে পৃথক হয়ে যায়। তবে পৃথক হলেও নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের এখতিয়ারটি লাভ করে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি।
১৯৬৮ সালে সুইডিস কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩০০ বছর পূর্তিতে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নোবেল ফাউন্ডেশনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করে। আলফ্রেড নোবেলের সম্মানে এই অর্থ থেকে ১৯৬৯ সাল হতে অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রচলন হয়। ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে নোবেল পুরস্কার প্রদান বন্ধ থাকে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি ও সাহিত্যে পুরস্কার স্থগিত রাখা হয়।
নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত কঠোর। বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রদানের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমে সুপারিশ করার জন্য ৩ হাজার ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরা পুরস্কার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, প-িত এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সম্মানিত ব্যক্তি। যে বছর পুরস্কার দেওয়া হবে, সে বছরের প্রথম মাসে অর্থাৎ জানুয়ারির ৩১ তারিখের মধ্যে যার যার সুপারিশ নোবেল কমিটির কাছে পাঠাতে হয়। নোবেল কমিটি প্রাপ্ত তালিকা থেকে ৩০০ জনের নাম ঠিক করে, সেই তালিকার বিষয়ে মতামত চেয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠায়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মনোনয়ন ঠিক করা হয়। চূড়ান্ত মনোনয়নের পরই কেবল নির্বাচিত ব্যক্তিকে তা জানানো হয়। এমন অনেকেই আছেন, যারা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দুদিন আগে না জেনেই মৃত্যুবরণ করেছেন। অথবা কেউ কেউ জানার ২-৪ দিন পর মারা গেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ পাননি। মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয় না।
নোবেল শান্তি পুরস্কার অবশ্য প্রদান করে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি। তবে এক্ষেত্রে নরওয়ের পার্লামেন্ট পাঁচজন সংসদ সদস্যকে গবেষণার দায়িত্ব দেয়। ওই পাঁচজনের কমিটি কারও কাছে জবাবদিহি করে না। এই পাঁচ সদস্যই তাদের মনোনীত ব্যক্তির নাম নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির নিকট উত্থাপন করে। তাদের মনোনীত ব্যক্তিই শান্তি পুরস্কার লাভ করে। যারা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তাদের বলা হয় নোবেল লরিয়েট। পুরস্কারপ্রাপ্তরা একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। সময়ের ব্যবধানে অর্থের পরিমাণের পরিবর্তন হয়েছে।
নোবেল পুরস্কার বিতর্কের ঊর্ধ্বে না। ১৯০১ সালে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় সুইডিস কবি সূলি প্রুধমকে। বিশ্বের ৪২ জন প্রথমসারির সাহিত্যিক এর বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের মতে প্রুধম মধ্যমসারির কবি। পুরস্কার দেওয়া উচিত ছিল লিও তলস্তয়কে। সাহিত্য ও শান্তি পুরস্কার নিয়ে পরবর্তীকালেও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেক যুদ্ধবাজ ও বিতর্কিত ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের লি ডাক থো-র সঙ্গে যুদ্ধবাজ হেনরি কিসিঞ্জার, ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী সাইমন পেরেস ও আইজাক রবিনের মতো লোককে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। লি ডাক থো নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান নিয়েও বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ঝড় ওঠে। শান্তিতে যার বিন্দুমাত্র কোনো অবদান নেই, বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসকে অর্থনীতিতে না দিয়ে শান্তি পুরস্কার দেওয়ায় বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। বিশেষত রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করায় এই পুরস্কারটির মর্যাদা বহুলাংশে ক্ষুণœ হয়েছে।
এশিয়ায় প্রথম এবং বাঙালিদের মধ্যেও প্রথম নোবেল পুরস্কার (সাহিত্যে) লাভ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে।
নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ইতিহাসের ট্র্যাজেডির নায়ক

Posted on by 0 comment

6নূহ-উল-আলম লেনিন:  সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর মুঘল সা¤্রাজ্য কার্যত দ্রুত ভাঙনের মুখে পড়ে। পিতার মতোই আওরঙ্গজেবের তিন পুত্র সিংহাসন দখলের ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দুই ভাইকে হত্যা করে শাহ আলম দিল্লির মসনদ অধিকার করে। দিল্লিতে একের পর এক হত্যা-খুনোখুনি এবং শাসক বদলের প্রেক্ষিতে ভারতের সুবাহ বা প্রদেশগুলোর ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিভিন্ন প্রদেশের সুবেদার বা গভর্নরগণ দিল্লির স¤্রাটকে বার্ষিক নামমাত্র রাজস্ব দিয়ে প্রদেশ শাসনের সর্বময় কর্তৃত্ব (দেওয়ানি) লাভ করে। যারা ছিল দিল্লির নিয়োজিত বেতনভুক রাজকর্মচারী তারাই কার্যত স্বাধীন নৃপতি বা নবাবে পরিণত হন। ঢাকা ছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী। ঢাকার নায়েব নিজাম মুর্শিদকুলী খাঁ দিল্লির স¤্রাটের অনুমতি নিয়ে নিজ নামে শহর পত্তন করে মুর্শিদাবাদে সুবাহ বাংলার রাজধানী স্থানান্তর করেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলী স্বাধীন নবাব হিসেবে দেওয়ানি লাভ করেন। বাংলার এই স্বাধীন সত্তা মাত্র ৪০ বছর অক্ষুণœ ছিল। ক্ষমতা দখলের হিংসাত্মক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং হত্যা, পাল্টা হত্যা ইত্যাদি ঘটনায় এই ৪০টি বছরের ইতিহাস সমাকীর্ণ ছিল। প্রতারণামূলকভাবে ক্ষমতাদখলকারী নবাব আলীবর্দী খাঁ ছিলেন দক্ষ সমর নায়ক, প্রশাসক এবং কূটকৌশলী। তার কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় প্রিয় দৌহিত্র ২৮ বছর বয়স্ক সিরাজ-উদ-দৌলাকে তিনি তার উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করেন। ৯১ বছর বয়সে আলীবর্দী মৃত্যুবরণ করলে ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে আরোহণ করেন।
কিন্তু আলীবর্দীর আত্মীয়-পরিজনের অধিকাংশই সিরাজের নবাবী মেনে নিতে পারেনি। সিরাজকে অপসারণ করে নিজে অথবা নিজের পছন্দের আত্মীয়কে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্রের প্রধান নায়ক ছিলেন ইরাক থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী মীরজাফর, আলীবর্দীর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘষেটি বেগম এবং পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জং প্রমুখ। শেষোক্তরা ব্যর্থ হলেও মীরজাফর সফল হয়। মীরজাফরকে নবাবের সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক হিসেবে নিয়োগ করেন আলীবর্দী। অতঃপর আলীবর্দীর আশীর্বাদে দ্রুত তার পদোন্নতি ঘটে, নিয়োজিত হন প্রধান সেনাপতি রূপে। নিজ ভগ্নিকে মীরজাফরের কাছে বিয়ে দেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা প্রথম যৌবনে কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করলেও নবাব হওয়ার পর একজন দেশপ্রেমিক ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নবাবের অনুমতি ছাড়া ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক কলকাতায় দুর্গ স্থাপন (ফোর্ট উইলিয়াম), বিভিন্ন জায়গায় কুঠি স্থাপন এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে চাইলে তরুণ নবাব ইংরেজদের এই কর্মকা- বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তাতে কাজ না হলে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম গুঁড়িয়ে দেন। নবাবের জাতীয় স্বার্থে গৃহীত এসব পদক্ষেপ মীরজাফর, অর্থমন্ত্রী জগৎশেঠ, প্রভাবশালী রাজন্য রাজা রায় দুর্লভ, রায় বল্লভ, উমিচাঁদ কেউই মেনি নিতে পারেনি। মীরজাফর এর সুযোগ নেয়। গোপনে ইংরেজ গভর্নর কর্নেল ক্লাইভের সঙ্গে গোপন চুক্তি সম্পাদন করে এবং সিরাজকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করে।
নবাব অনেক ছাড় দিয়েও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। অনিবার্য হয়ে ওঠে পলাশীর যুদ্ধ।
নবাব মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্যদের ষড়যন্ত্র টের পান। তিনি মোহনলালকে তার প্রধানমন্ত্রী এবং মীরমর্দনকে সেনাপতি নিয়োগ করেন। বিপুল সৈন্য, কামান, বন্দুক থাকা সত্ত্বেও ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। মাত্র দেড়-দু হাজার ইংরেজ শ্বেতাঙ্গ সৈন্য এবং কর্মক্ষম ৪টি কামান নিয়ে লর্ড ক্লাইভ প্রকৃতপক্ষে সাজানো নাটকের যুদ্ধে জয়লাভ করেন। প্রধান সেনাপতি মীরজাফর, রাজা রায় দুর্লভ, রাজ বল্লভÑ কেউই নবাবের সাহায্য না করে ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন করেন।
ভীতসন্ত্রস্ত নবাব স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে নিয়ে ২৩ জুন রাতেই রাজধানীতে ফিরে আসেন। মনসুরাবাদ প্রাসাদের রাজভা-ার খুলে দিয়ে কোটি কোটি টাকা সৈনিক ও জনগণের মধ্যে বিতরণ করেন। ২৫ জুন তিনি লুৎফুন্নেসা ও শিশুসন্তানকে নিয়ে রাজধানী ত্যাগ করেন। রাজমহলে পালাবার উদ্দেশ্যে নৌকাযোগে রওনা করেও শেষ পর্যন্ত মীরজাফরের জামাতা মীর কাশেমের সৈনিকদের হাতে বন্দী হন। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। তাকে মীরজাফরের পুত্র মিরনের বাড়িতে একটি কক্ষে বন্দী করা হয়। মীরজাফর তখন ভাং-এর নেশায় চুর হয়ে দিবানিদ্রা যাচ্ছিলেন। মিরন পিতাকে বা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস না করেই সিরাজকে ঘাতক মোহম্মদিবেগকে দিয়ে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। পরে সিরাজের লাশ হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদের রাজপথ প্রদক্ষিণ করা হয়।
সিরাজের মৃত্যুতে ইংরেজরা উল্লসিত হয়। মাতাল, অদক্ষ, দুর্নীতিপরায়ণ এবং মেরুদ-হীন মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসানো হয়। কার্যত বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। ক্রমান্বয়ে ইংরেজরা বাণিজ্যিক সুবিধার দাবি বাদ দিয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শাসক রূপে আবির্ভূত হয়। পলাশীযুদ্ধের দুই দশকের মধ্যেই ইংরেজরা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার বৈধ ‘দেওয়ানি’ লাভ করে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মুর্শিদাবাদের তথাকথিত নবাবরা অর্থাৎ, মীরজাফরের বংশধরগণ প্রথমে ইংরেজদের দেওয়া ভাতা এবং ভারতের স্বাধীনতার পরও এক যুগ ধরে রাজন্যভাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ভারতের ইতিহাসে সিরাজ-উদ-দৌলাকে লম্পট, মদ্যপ, স্বেচ্ছাচারী, দুর্বিনীত, নৃশংস খুনি, বহুগামী, নারী নির্যাতনকারী এবং অব্যবস্থিত চিত্ত, অনভিজ্ঞ-অদক্ষ শাসক হিসেবে চিত্রিত করে। যেভাবে তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে, সম্ভবত আর কারও বিরুদ্ধে এই মাত্রায় ইতিহাস বিকৃত করা হয়নি। এখনও পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এবং মুর্শিদাবাদ-বহরমপুরের সাধারণ মানুষের একাংশ এই অপপ্রচারে বিশ্বাস করে বলে জেনে স্তম্ভিত হলাম।
প্রকৃতপক্ষে সিরাজ নিহত হওয়ার প্রায় দেড়শ বছর পর্যন্ত তার সম্পর্কে ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে বলার কেউ ছিল না। সিরাজের চরিত্র হনন করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে মুর্শিদাবাদ, কলকাতা এবং লন্ডনভিত্তিক যেসব ফারসি, ইংরেজি এবং বাংলা গ্রন্থ রচিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই ছিল হয় মীরজাফরের বা তার বংশধরদের এবং ইংরেজদের অনুগ্রহভোগী ফারসিভাষী ইতিহাস রচয়িতা ও ইংরেজ লেখকদের রচিত ইতিহাস গ্রন্থ। এসব গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑ ফারসি ভাষায় রচিত ১. মুনশি সলিমুল্লাহ রচিত তারিখ-ই-বাঙ্গালা (১৭৬৩) ২. তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহব্বত জঙিÑ ইউসুফ আলী খান (১৭৬৩-৬৪) ৩. মোজাফ্ফরনামাÑ করম আলী খান (১৭৭২-৭৩) ৪. সিয়ার-উল-মুতাখখিরিনÑ সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তাবাতায়ি (১৭৮০-৮১) ৫. রিয়াজ-উস-সালাতেনÑ গোলাম হোসেন সলিম জইদপুরি (১৭৬৬-৬৮) ৬. তারিখ-ই-মনসুরিÑ সাঈদ আলী প্রমুখ।
এই গ্রন্থগুলোর অধিকাংশেই মুঘল বা বাংলায় নবাবী শাসনকাল নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন করেছে। কিন্তু একমাত্র সিরাজের প্রসঙ্গেই লেখকগণ অযৌক্তিক ও প্রমাণ ছাড়াই তার চরিত্রকে কলুষিত করেছেন। কারণ এই লেখকদের সবাই-ই মীরজাফর ও ইংরেজদের দ্বারা নিয়োজিত ছিলেন।
ইংরেজ লেখকদের মধ্যে রবার্ট ওরমি, আইভ, থর্নটন, স্ক্রাফটস, ফাদার লং, হলওয়েল, ম্যাকলেজ, কর্নেল সোমসন এবং মঁসিয়ে লার প্রমুখ সমসাময়িককালে যেসব গ্রন্থ লিখেছেন তাতেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সিরাজের চরিত্র হনন করা হয়েছে।
বাঙালিদের মধ্যে পলাশীযুদ্ধের ৫০ বছর পর কার্যত রাজিব লোচন মুখোপাধ্যায় ‘মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং’ এবং আরও পরে ৫০ বছর পর নবীনচন্দ্র সেন পলাশীর যুদ্ধ কাব্যেÑ সিরাজের যে ভয়ঙ্কর চরিত্র আঁকেন তা মানব-কল্পনাকেও হার মানায়।
সিরাজ-উদ-দৌলাকে ইংরেজরা ইচ্ছেকৃতভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছে তাদের দখলদারিত্ব ও দুঃশাসনকে লেজিটিমেসি প্রদান করার উদ্দেশ্যে।
সিরাজের চরিত্র হননের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কলম ধরেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়। তার রচিত ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’ (১৮৯৬-৯৭) গ্রন্থটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিলপত্র ও গ্রন্থ ইত্যাদি ঘেঁটে নির্মোহ সত্য উদ্ঘাটনের প্রথম সার্থক প্রচেষ্টা। পরবর্তীকালে বিশেষত বিগত প্রায় অর্ধশতকে বাংলাদেশ ও ভারতের গবেষকগণ ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ইন্ডিয়ান আর্কাইভস এবং ফারসি ভাষার মূলানুগ অনুবাদ গ্রন্থ ইত্যাদি অবলম্বন করে যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে প্রমাণিত হয়েছে, সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার করা হয়েছে তা কেবল ভিত্তিহীন নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কল্পকাহিনি। সিরাজ-উদ-দৌলা নবাব হওয়ার পর মদ ছেড়ে দিয়েছিলেন (লর্ড ক্লাইভের সাক্ষ্য), তার অন্ধকূপ হত্যার কাহিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারকেন্দ্রিক বিদেশি প্রভুদের কাছে আত্মবিক্রয়কারী সিন্ডিকেট বা কায়েমি স্বার্থের গ্রুপটিকে ভেঙে/দুর্বল করতে চেয়েছিলেন। বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ছিল তার অগ্রাধিকারের বিষয়। অষ্টাদশ শতকের মানদ-েই নয়, আজকের মানদ-েও নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন একজন মহান দেশপ্রেমিক ও সাহসী যোদ্ধা। উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রামে সিরাজ-উদ-দৌলা প্রথম ‘শহীদ’।

Category: