Blog Archives

মহাভারত ও রামায়ণ

Posted on by 0 comment

মহাভারত
07মহাভারত ও রামায়ণ ঠিক ধর্মগ্রন্থ নয়। কিন্তু সাধারণ হিন্দুদের মনে হাজার বছরের লালিত সংস্কার ও বিশ্বাসে এ দুটি মহাকাব্য ধর্মগ্রন্থের স্থান দখল করে আছে। শুধু তাই নয়, এ দুটি মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র দুটিÑ শ্রীকৃষ্ণ ও রাম মানুষরূপী অবতাররূপে পূজিত। এ দুটি মহাকাব্যই গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে। তবে এ দুটি মহাকাব্যের মূল কাহিনি ও উপাখ্যানগুলো খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহ¯্রাব্দের প্রথমাংশে রচিত বলে মনে করা হয়। মহাভারত হচ্ছেÑ
The great epic poem of the Hindus, probably the longest in the world. It is divided into eighteen parvas or books, and contains about 2,20,000 lines. The poem has been subjected to much modification and has received numerous comparatively modern additions, but many of legends and stories are of Vedic Character and of great antiquity.
‘মহাভারত’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ তার ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন : ‘আর্য সমাজে যত কিছু জনশ্রুতি খ- খ- আকারে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল তাহাদিগকেও একত্র করিয়া মহাভারত নামে সংকলিত হইল।’ মহাভারতের মূলকাহিনি পা-ব-কৌরবদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে কেন্দ্র করে পল্লবিত হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্র নামক স্থানে ১৮ দিনব্যাপী এক মহাসমরে পরিণতি লাভ করে।
রামায়ণ
সাধারণভাবে ‘রামায়ণ’ হচ্ছে বনবাসরত অযোধ্যার রাজা রামের সুন্দরী পতœী সীতা রাক্ষসরাজ রাবণ কর্তৃক অপহরণ এবং তাকে উদ্ধারের কাহিনিকাব্য। ‘মহাভারতে’র বন-পর্বে ‘রামায়ণে’র মূলকাহিনির উল্লেখ রয়েছে। ‘রামায়ণ’ সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীনতম দুই মহাকাব্যের অন্যতম। ধ্রুপদী ‘রামায়ণে’র রচয়িতা ঋষি বাল্মীকি। ‘রামায়ণে’র সবচেয়ে পরিচিত ভাষ্যগুলোর মধ্যে একটি উত্তর ভারতের অন্যটি বাংলা ভাষায় রচিতÑ
The Northern is the older and purer; the additions and alternations in that of Bengal are so numerious that it is not trustworthy, and has even been called Spurious.
বাংলা ভাষায় ‘রামায়ণ’ অনুবাদ করেন মধ্যযুগের কবি কৃত্তিবাস ওঝা (১৪০০-১৪৭৫ খ্রিস্টাব্দ)। কৃত্তিবাসী রামায়ণ আক্ষরিক অনুবাদ তো নয়ই; বরং এটি বহুলাংশে মৌলিক রচনা। বাঙালি হিন্দুরা কার্যত কৃত্তিবাসী রামায়ণের দ্বারাই সবচেয়ে প্রভাবিত হয়েছেন। উত্তর ভারতের সংস্কৃত ও হিন্দি ‘রামায়ণ’ ছাড়া ভারতের নানা প্রাদেশিক ভাষায়ও ‘রামায়ণ’ বিভিন্ন সময় অনূদিত হয়েছে। ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসব ‘রামায়ণে’ (এমনকি ‘মহাভারত’ও) স্থানীয় অনুবাদক বা রচয়িতার হাতে পরিবর্তিত, সংযোজিত হয়েছে এবং স্থানীয় ভাষ্য হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাম-সীতা সম্পর্কে নানা লোককাহিনি-লোকগাঁথা।
শ্রীকৃষ্ণ ও রাম কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র কি না তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রতœতাত্ত্বিক বা অন্য কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রামাণ্য নিদর্শন পাওয়া যায় নি, যা থেকে রামচন্দ্রকে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা যায়। হিন্দু মিথোলজি অনুসারে রামচন্দ্রও মানুষরূপী অবতার :  The Rama is the seventh incarnation of God Vishnu, and made his appearances in the world at the end of the Treta or second age.
এ কথা সত্য বটে, বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিমানুষ বা ঘটনাকে কেন্দ্র করেও মানব কল্পনাপ্রসূত মিথ গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ববিহীন ব্যক্তি এবং পৌরাণিক কাহিনিকাব্যকে ঘিরে যে মিথ গড়ে ওঠে, তাকে সাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করা গেলেও, ইতিহাস হিসেবে অবশ্যই তা পরিত্যাজ্য। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মৌলবাদীরা যুক্তির বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ধার ধারে না। তারা মিথকে হয় জাগতিক নয়তো ঐশ্বরিক সত্য বিবেচনা করে, সেই ‘সত্য প্রতিষ্ঠায়’ যে কোনো পথ গ্রহণে দ্বিধাহীন। উপমহাদেশে ‘হিন্দুত্ববাদী’ সাম্প্রদায়িক এবং মৌলবাদী শক্তিগুলো ‘রাম জন্মভূমি’ নিয়ে যে হিংসাশ্রয়ী ঘটনা (বাবরি মসজিদ ধ্বংস, ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২) ঘটিয়েছে, তার প্রেরণার অন্যতম উৎস রামকাহিনি বা ‘রামায়ণ’। অথচ ‘রামায়ণে’ সূর্য বংশীয় রাজা রামচন্দ্রকে একজন ন্যায়পরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ, মানবহিতৈষী, প্রজাবৎসল এবং পরম ধার্মিক অতিমানব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা গান্ধী এই রামরাজত্বকেই তার রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। গান্ধীজী তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন পরম ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সেকুলার মানবতাবাদী। রামরাজত্বের ধারণাকে তিনি রূপক বা প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, আমার কাছে রামও যে, রহিমও সে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাধারীরা রামজন্মভূমি ও রামরাজত্বকে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার আকর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে বারংবার।
নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

Posted on by 0 comment

03প্রত্যেক দেশেই কতগুলো জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় উৎসব থাকে। কখনও কখনও কোনো কোনো জাতীয় (অর্থাৎ জাতিগত-সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক) উৎসব রাষ্ট্রীয়ভাবেও উদযাপিত হয়। তেমনি কোনো কোনো রাষ্ট্রীয় উৎসব আর জাতীয় উৎসবও অভিন্ন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস প্রভৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস), ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালনের সঙ্গে রয়েছে আমাদের জাতিসত্তার আত্মপরিচয় এবং স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস। পক্ষান্তরে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালনের পেছনে রয়েছে আমাদের হাজার বছরের লোক সংস্কৃতি ও লোক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। তবে বাংলাদেশে নববর্ষ পালনের পেছনেও রয়েছে জাতিসত্তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাঙালি সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণের সচেতন প্রয়াস।
পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা নববর্ষকে কোনোদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে তারা মনে করত ‘হিন্দুয়ানি’। অথচ এটি একটি নিখাদ অসাম্প্রদায়িক লোক উৎসব। মুঘল স¤্রাট আকবর হিজরি চন্দ্রবর্ষ এবং বাংলা সৌরবর্ষকে ভিত্তি করে বাংলা বর্ষ বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেন ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ। তবে এটি কার্যকর বলে গণ্য করা হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। মুঘলদের আগেও বাংলায় ঋতুচক্রের সাথে মিলিয়ে আবর্ত উৎসব বা ফসল উৎসব পালিত হতো। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে একসময়ে বর্ষা শেষে আমন ধান কাটার সময়টিকে, অর্থাৎ হেমন্তের শেষ মাস অগ্রহায়ণ থেকে বছর গণনা শুরু হতো। সেই বিচারে ১ অগ্রহায়ণ ছিল নববর্ষের প্রথম দিন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফসলচক্রের বৈশিষ্ট্য এবং বছর শেষে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা ‘ফসলি সন’ গণনার এই ক্যালেন্ডার চালু করেন। মুঘল আমলে প্রবর্তিত জমিদারি প্রথা রহিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার, রায়ত চাষি ও অন্যান্য বর্গের মানুষ ৩০ চৈত্র পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করত। পহেলা বৈশাখ এ উপলক্ষে আয়োজিত হতো মেলা ও অন্যান্য আনন্দ উৎসব। শুভদিন হিসেবে দিনটিতে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের হিসাবের খাতা চালু করতেন। সে জন্য এখনও পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ খোলার প্রথা বিদ্যমান আছে।
বাংলা নববর্ষের সাথে আমাদের গ্রামীণ জীবন, লোক উৎসব এবং নানা আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত ছিল। আজকের মতো ‘নববর্ষ’ উৎসব পালনের ধারণা সামন্ততান্ত্রিক যুগে ছিল না। ছিল বটে বছরের প্রথম শুভদিন হিসেবে তার স্বতন্ত্র মর্যাদা। একসময় হালখাতা অনুষ্ঠানের সাথে কিছুটা ধর্মাশ্রয়ী নানা রীতি-প্রথা, পূজা বা প্রার্থনাও চালু হয়। হিন্দু ব্যবসায়ী, দোকানদার এবং গৃহস্থরা যেমন গণেশ পূজা করত, তেমনি মুসলমানরাও পহেলা বৈশাখে প্রতি গদিতে মিলাদ পড়ানো, মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি চালু করেছিল। মেলাগুলো হতো সর্বজনীন। তবে কিছু ধর্মাশ্রয়ী আচার চালু হলেও বাংলা নববর্ষের দিনটি কখনোই ধর্মীয় উৎসবের দিন ছিল না, ছিল সর্বজনীন বর্ষবরণের দিন।
তবে আজকের নাগরিক মধ্যবিত্ত যেভাবে নববর্ষ পালন করছে তা উৎসারিত হয়েছে প্রথমত; বাংলা নববর্ষকে, বাঙালির স্বতন্ত্র জীবনধারাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে। দ্বিতীয়ত; আধুনিক নাগরিক জীবনে নববর্ষ পালনের জাতীয় গৌরববোধের ধারণাটি এসেছে পাশ্চাত্যের নিউ ইয়ার পালনের প্রভাবে।
ইউরোপ-আমেরিকায় নববর্ষের প্রথম দিনটি রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে অনেক আগে থেকেই গণ্য হতো। পাকিস্তান আমলে পহেলা বৈশাখে ছুটি ছিল না। নাগরিক মধ্যবিত্তের মধ্যে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা এবং একে বর্তমানে সর্বজনীন বিশাল জাতীয় উৎসবে পরিণত করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ১৯৬৬ সালে, রমনার বটমূলে (আসলে অশ্বত্থ মূল) পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয় থেকে বর্ষবরণ উপলক্ষে ছায়ানট সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। শুরুর বছরগুলোতে অগ্রসর মধ্যবিত্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলে কয়েকশ মানুষ রমনায় মিলিত হতো।
কিন্তু কালক্রমে তা লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং সর্বধর্মের মানুষের ব্যাপকতম সমাবেশ ও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকরা চালু করেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লা বা পাবলিক প্লেসে এখন অসংখ্য সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন নববর্ষ উৎসবের আয়োজন করছে। ঢাকা ছাড়িয়ে এখন দেশের সর্বত্র, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা আয়োজনের ভেতর দিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পহেলা বৈশাখ জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেন।
বাঙালির আত্মপরিচয় ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখ, বিশেষত বাংলাদেশে নতুন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলা ভাষাভাষী ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পর্যায়ে নানা আয়োজনে ঠিক আমাদের মতো করে উৎসব পালিত হয় না। বস্তুত, পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের বাঙালির শ্রেষ্ঠ চিরায়ত জাতীয় উৎসব।
আর এ কারণে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলোর বর্ষবরণ উৎসবকে তাদের আক্রমণের টার্গেটে পরিণত করেছে। কয়েক বছর আগে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমাবর্ষণ করে অনেকের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল জঙ্গিরা।
কিন্তু জঙ্গি-মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এই হিং¯্র আক্রমণ পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালনকে বন্ধ বা স্তিমিত করতে পারেনি। বরং মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপন কোনো রাষ্ট্রীয় আদেশ-নির্দেশ বা অর্থানুকূল্যের ওপর নির্ভর করে না। একুশে ফেব্রুয়ারি যেমন ভাষা শহিদদের আত্মদানের ভেতর দিয়ে বাঙালির সর্বজনীন শোক ও গৌরবের দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে, তেমনি পহেলা বৈশাখও।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

মৌলবাদ >>Fundamentalism

Posted on by 0 comment

15ধর্মীয় মৌলবাদ এমন একটি প্রপঞ্চ যা বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশের মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। ধর্মীয় মৌলবাদের কাছে তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ কেবল পারলৌকিক নয়, ইহজাগতিক সমস্যাসমূহের সামগ্রিক সমাধানের অপরিবর্তনীয় দিক-নির্দেশিকা। তারা স্ব স্ব ধর্মমত অনুসারে আদি ও অকৃত্রিম ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। নিরঙ্কুশ ধর্মীয় বিধি-বিধান কার্যকর করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়ও তারা প্রয়াসী।
আধুনিক ‘মৌলবাদ’ বিশেষণটির উৎপত্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৮৯৫ সালে নায়াগ্রা বাইবেল সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের প্রথম Fundamentalist হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ওই সম্মেলনের পর বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোড়া প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায় খ্রিস্টধর্মের মৌলিকত্ব রক্ষার লক্ষ্যে এক আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা তাদের বিশ্বাস মোতাবেক Fundamentalism শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করেন। ১৯১০ সালে লসএঞ্জেলেস বাইবেল সোসাইটি (BIOLA বর্তমানে Biola University) আরএ টোরি (RA Torrey) মিল্টন এবং লেম্যান স্টুয়ার্ড-এর সম্পাদনায় ‘The Fundamentalists’ নামে ৫টি বিষয়ে ১২টি সিরিজ গ্রন্থ প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রে মৌলবাদী আন্দোলনের সূচনা হয় রক্ষণশীল প্রোটেস্ট্যান্ট প্রেজবিটারিয়ান যাজক, শিক্ষাবিদ, ধর্মতত্ত্ববিধ এবং প্রিন্সটন ধর্মতাত্ত্বিক সেমিনারিদের দ্বারা। এই মৌলবাদীদের মদদ জোগায় আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির রক্ষণশীল সদস্যগণ। এই আন্দোলনের পুরোধামের অন্যতম লেম্যান স্টুয়ার্ড (Layman Steward) ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিয়ন তেল কোম্পানির (বর্তমানে টহরপড়ষ হিসেবে পরিচিত) সভাপতি ও যৌথ প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫০ সালের আগে পর্যন্ত ইংরেজি Fundamentalism শব্দটি অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই শব্দটি ১৯৮৯ সালের অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধানের দ্বিতীয় সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে ইহুদিদের মধ্যে মৌলবাদ, জায়নবাদ ও সর্বশেষ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে। ইহুদিরা মনে করে প্যালেস্টাইন ভূখ-ে একটি ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ওল্ড টেস্টামেন্টে লেখা আছে। মৌলবাদ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ১৯৭৯-৮০ সালে আয়াতুল্লা খোমেনির নেতৃত্বে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময় থেকে। ‘ইসলামি মৌলবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব। খ্রিস্টান মৌলবাদের অনুসরণে সাধারণভাবে রক্ষণশীল ইসলামি আন্দোলনকে ‘মৌলবাদের ইসলামি ভাষ্য’ হিসেবে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়। সাম্প্রতিককালে বিশেষ করে ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনার পর মৌলবাদ শব্দটির সঙ্গে ইসলামি জঙ্গিবাদ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ শব্দযুগলও যুক্ত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক ইসলামি জঙ্গি মৌলবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্ব অবসানে যুক্তরাষ্ট্রই পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগানিস্তানসহ সারাবিশ্বের ‘জিহাদি’ মৌলবাদীদের একত্রিত করে, যুদ্ধের ট্রেনিং, অস্ত্র ও অর্থ জোগায়। তারাই আল-কায়দা এবং তালেবানি সশস্ত্র জঙ্গিদের মদদ জুগিয়ে গড়ে তোলে। তবে ভাবাদর্শগতভাবে আধুনিক ইসলামি মৌলবাদের উৎপত্তি প্রথমে আরবে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের অভ্যুদয়ে। এখনও ওয়াহাবি মতবাদই হচ্ছে ইসলামি মৌলবাদের বিপজ্জনক উৎস। তবে রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে আধুনিক মৌলবাদের জনক আবুল আলা মওদুদী। মওদুদীই সাম্প্রতিক বিশ্বে মুসলমানদের কাছে জিহাদের আবশ্যকতা তুলে ধরেন। এবং জিহাদের মূল কথা যে সশস্ত্র সংগ্রাম সেটাও তিনিই প্রথম দাবি করেন। মওদুদী তার মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। অন্যদিকে ১৯২৮ সালে হাসান আল বান্না মিসরে ইসলামি ব্রাদারহুড নামক চরমপন্থি দল গঠন করেন। পরবর্তীকালে সাঈদ কুতুব মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে আসেন। মওদুদীর মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত সাঈদ কুতুব তার চিন্তাধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র মোকাবিলা মওদুদী মতবাদের সর্বোত্তম অভিপ্রকাশ। সব মৌলবাদই জঙ্গিবাদী নয়। তবে মওদুদী মতবাদ ভাবাদর্শগতভাবে জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসবাদী।
মুসলমান মৌলবাদের মতো হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদও বিপজ্জনক। হিন্দুত্ববাদের দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে শঙ্করাচার্যের হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ। দয়ানন্দ স্বরস্বতী ও আর্য সমাজের প্রেরণায় এই মতবাদ বিকশিত হয়। ১৯১৩ সালে এলাহাবাদে ‘হিন্দু মহাসভা’, ১৯২৫ সালে হেডগাওয়ারের উদ্যোগে নাগপুরে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ’ (আরএসএস) গঠিত হওয়ার পর হিন্দু মৌলবাদীদের বৃত্ত গড়ে ওঠে। এই বৃত্তকে ঘিরে জনসংঘ (১৯৫১), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (১৯৬৪), শিবসেনা (১৯৬৬), ভারতীয় জনতা পার্টি (১৯৮০) এবং বজরঙ্গ দল (১৯৮৪) নিয়ে গড়ে ওঠে সংঘ পরিবার।
হিন্দু মৌলবাদের মূল কথা ভারতীয় সংস্কৃতি, হিন্দুত্ব, জাতিত্ব সমার্থক। ভারতের সকল নাগরিক জাতি পরিচয়ে হিন্দুস্তানি (ভারতীয়তা সমার্থক)। হিন্দুস্তান কেবল হিন্দুদের দেশ। অন্য যারা বাইরে থেকে এসেছে (বিশেষ করে মুসলমানরা) তারা বহিরাগত। বহিরাগতদের অতিথি হিসেবে, হিন্দু-সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে এদেশে থাকতে হবে।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

৬-দফা আন্দোলন >>Six Point Movement

31ভাষা আন্দোলন যেমন বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটায়, ৬-দফা তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করে। জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ধরনের আচরণ, জাতিগত শোষণ, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং পূর্ব বাংলা থেকে পাকিস্তানে সম্পদ পাচার প্রভৃতি কারণে ষাটের দশকের গোড়া থেকেই পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সমাজের মধ্যে স্বাধিকারের চেতনা শাণিত হতে থাকে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান কার্যত পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পূর্ববাংলার মানুষের মনে সৃষ্টি হয় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্তবোধ। এই পটভূমিতে ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলো লাহোরে একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কয়েকজন সহকর্মী উক্ত সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে ৪ ফেব্রুয়ারি লাহোর যান। আনুষ্ঠানিক সম্মেলনের আগে ৫ ফেব্রুয়ারি সাবজেক্ট কমিটির সভায় শেখ মুজিব খসড়া ৬-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে তা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা এতে সম্মত না হওয়ায় শেখ মুজিব সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করেই ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিতে এবং ১৮ মার্চ কাউন্সিল সভায় ৬-দফা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। ৬-দফা দাবির মোদ্দা কথা ছিল, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া অন্য সকল ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা।
এ ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দুটি পৃথক মুদ্রা, দুটি পৃথক স্টেট ব্যাংক অথবা রিজার্ভ ব্যাংক চালু এবং এক লোক এক ভোট ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদীয় ব্যবস্থা কায়েম।
৬-দফা দাবি পাকিস্তানি সামরিক জান্তা, পশ্চিম পাকিস্তানের সুবিধাভোগী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও এলিট শ্রেণির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তারা ৬-দফাকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান ৬-দফা আন্দোলনকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে অস্ত্রের ভাষায় তা মোকাবিলা করার হুমকি দেন।
পক্ষান্তরে ৬-দফা দাবি অবদমিত বঞ্চিত বাঙালিদের মনে মুক্তি সনদ হিসেবে প্রবল জাতীয় জাগরণের সৃষ্টি করে। শেখ মুজিব ও তার সহকর্মীগণ সমগ্র পূর্ববাংলা ঘুরে ৬-দফা দাবি ব্যাখ্যা করেন এবং নতুন ভাষা, নতুন চেতনা ও নতুন স্বপ্নে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নবতর পর্যায়ে উন্নীত করেন। ৬-দফা আন্দোলনেই প্রথম উচ্চারিত হয় ‘জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা’ প্রভৃতি জাতীয়তাবাদী স্লোগান। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আওয়ামী লীগের ডাকে আহূত হরতাল গণবিস্ফোরণে পরিণত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীর ধর্মঘটী শ্রমিকদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। ফলে মনু মিঞাসহ ১১ জন শ্রমিক ঐ দিন নিহত হয়।
প্রকৃতপক্ষে ১৯৬৬ সালের এপ্রিল মাস থেকেই শেখ মুজিব ও ৬-দফাপন্থি আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর তীব্র দমন নির্যাতন নেমে আসে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে শেখ মুজিবকে অসংখ্যবার গ্রেফতার করা হয়। জামিন নিয়ে বের হওয়ার পরমুহূর্তে আবার তাকে গ্রেফতার করা হতে থাকে এবং অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষে ৮ মে ভোররাতে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং দীর্ঘ ২০ মাস ১০ দিন কারাবন্দি রাখার পর ১৯৬৭ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী রেখে সামরিক আদালতে বিচার শুরু হয়।
৬-দফা আন্দোলনে তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির শত শত নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ জুনের হরতালের সাফল্যের পর সরকারের দমননীতি সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়। গ্রেফতার, নির্যাতনের ফলে ৬-দফা আন্দোলন এই পর্যায়ে সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে পড়ে। ৬-দফা দাবিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলতে থাকে। এই ছাইচাপা আগুনই ১৯৬৯-এর মহান গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

জয় বাংলা >> Joy Bangla

Posted on by 0 comment

23‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি। তবে এটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের সময়েই উচ্চারিত হয়নি। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর করে নেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি রণধ্বনি অথবা বিজয়সূচক দেশাত্মবোধক ধ্বনিসমষ্টিÑ যা কেবল উদ্দীপকই নয়, জাতিসত্তার পরিচয় জ্ঞাপক। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল এমন প্রতিটি দেশের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন ও সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামে এ জাতীয় বিজয়সূচক রণধ্বনি রয়েছে। যেমনÑ ল্যাটিন থেকে উদ্ভূত স্প্যানিশ ভাষায় ‘ভিভা’ বা ‘ভেনচেরেমোস’, ইংরেজিতে ‘ভিক্টরি’ এবং ফরাসি ‘ভিভ’ বা ‘ভিক্টোরিয়া’ প্রভৃতি শব্দগুচ্ছ বিজয়সূচক উদ্দীপক রণধ্বনি হিসেবে ওই সকল ভাষাভাষী উপনিবেশে দেশনামের সঙ্গে উচ্চারিত হতো। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘আজাদ হিন্দ্ ফৌজ’ তাদের রণধ্বনি হিসেবে ‘জয় হিন্দ্’ শব্দবন্ধকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
বাংলাদেশে ‘জয় বাংলা’ প্রথম উচ্চারিত হয় ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারিÑ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। এরপর একই বছর ১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তৃতা শেষ করেন ‘জয় বাংলা’ বলে। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি সকলের মুখে উচ্চারিত হতে থাকে এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
তবে এই স্লোগানের পেছনেও একটু ইতিহাস আছে। ছয়-দফা ও এক-দফা আন্দোলনের সময়েই দেশাত্মবোধক জাতীয়বাদী নানা স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন আজ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। স্লোগান ওঠে ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’ এইসব স্লোগান ও ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিটি উৎসারিত হয়েছে ৩ বৈশাখ, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঙালির বাংলা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ থেকে। ওই প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন, ‘বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই মন্ত্র শেখাও : এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙালির-আমাদের।’… ‘বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’ বস্তুত কাজী নজরুল ইসলামের উল্লিখিত লেখা থেকেই ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিটি চয়ন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে প্রথমে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি পরিবেশিত হয়। পরে বঙ্গবন্ধু শপথবাক্যের অংশ হিসেবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটিও উচ্চারণ করেন। শপথের পর অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ শীর্ষক একটি গণসংগীত পরিবেশিত হয়।
১৯৭১-এর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সেদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্লোগান ওঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ ওই দিন থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটিও সর্বজনীন হয়ে ওঠে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। টেলিপ্রিন্টারে পাঠানো বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণাটিও শেষ হয় ‘জয় বাংলা’ বলে। শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ বা মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জনপ্রতিনিধিদের সভায় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়। এই ঘোষণাপত্রটিকেই বলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের বৈধ সাংবিধানিক ভিত্তি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করা হয় এবং মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে। এই শপথ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাদের বক্তব্যেও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের রণধ্বনি হয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা’। ‘জয় বাংলা’ বলতে বলতে অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করতে গিয়ে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন। পাকবাহিনীর হাতে ধৃত মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি সাধারণ বাঙালিকেও ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে হত্যা করেছে অথবা ‘জয় বাংলা’ না বলে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলার জন্য বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে যন্ত্রণা দিয়েছে। ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে যেমন ‘জয় বাংলার’ লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তেমনি মুক্তিবাহিনীকেও বলা হতো ‘জয় বাংলা বাহিনী’ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি পাকহানাদার বাহিনীর মধ্যে রীতিমতো ভীতির সঞ্চার করত। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিটি ছিল মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির শৌর্যবীর্য এবং বিজয় লাভের আত্মপ্রত্যয়ের অবিনাশী জয়ধ্বনি।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান>Mass Movement of Sixty nine

13বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন ছিল একটি মাইলফলক। ছয়দফা আন্দোলনের ধারাবাহিক তীব্রতার কারণে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্রের নামে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলা করে। এতে শেখ মুজিবের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন বাড়তে থাকে। ১৯৬৭ সাল থেকেই ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, ছাত্রদের শিক্ষা জীবনের নানা সমস্যা ও বন্দিমুক্তি প্রভৃতি ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করতে থাকে। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে হরতাল ধর্মঘটের মাধ্যমে গণ-অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি এই ঐক্য প্রচেষ্টা ১১ দফা দাবিনামা প্রণয়নের ভেতর দিয়ে সুনির্দিষ্টরূপ লাভ করে।
১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত হয় ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আহূত ছাত্র সমাবেশের ভেতর দিয়ে সূচিত ছাত্র আন্দোলন অচিরেই গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিলাভের মাধ্যমে এর সফল সমাপ্তি ঘটে।
ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি তৎকালীন সারা পাকিস্তানের ৮টি রাজনৈতিক দল মিলে ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ’ বা উবসড়পৎধঃরপ অপঃরড়হ ঈড়সসরঃঃবব Ñ ‘ডাক’ গঠন করে। ডাক-এর সদস্য ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, পাকিস্তান ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, এনডিপি ও পিডিএম প্রভৃতি দল। ডাক ৮ দফা দাবি প্রণয়ন করে, যার মূল কথা প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন, জরুরি আইন প্রত্যাহার, কালাকানুন বাতিল এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি প্রভৃতি। ‘ডাক’ ৮ দফায় পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি এড়িয়ে যাওয়ায় পূর্ববাংলার মানুষের মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেনি। তবে ‘ডাক’ গঠিত হওয়ায় এবং ডাক-এর আহ্বানে ১৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জুড়ে হরতাল পালিত হওয়ায় গণ-আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়ে।
পূর্ববাংলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে আহূত আন্দোলন দমনে ১৪৪ ধারা জারি এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ও কারফিউ ভঙ্গ করেই আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্র মিছিলে গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান নিহত হন। ২৪ জানুয়ারি এর প্রতিবাদে আহূত হরতাল-ধর্মঘটেও গুলিবর্ষণ করা হয়। নিহত হয় স্কুলছাত্র মতিউর। ঐদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে আইয়ুব খান বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার এবং শেষের দিকে শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের আহ্বান জানান। মুজিব প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে বন্দী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহিরুল হককে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে হত্যা করে। সারাদেশ এর প্রতিবাদে বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠে। সরকার সেনাবাহিনী নিয়োগ করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে সেনাবাহিনী হত্যা করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জনগণ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে। ইতিমধ্যে আইয়ুব খাঁ পিছু হটতে শুরু করেন। শেখ মুজিব ছাড়া সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের চাপে আইয়ুব আর রাষ্ট্রপতি হবেন না ঘোষণা দেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রেসকোর্স ময়দানে সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা জানায় এবং ওই জনসভা থেকেই দেশবাসীর পক্ষ থেকে ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা হিসেবে বরিত হন।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

ভাষা আন্দোলন>>Language Movement

6পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য বাঙালি ছিল বিশ্বের প্রথম জীবনদানকারী জাতি। ভাষা আন্দোলনকে মোটা দাগে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়টি প্রাক্ পাকিস্তান আমল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায় ১৯৫১-৫২ সাল অবধি। তবে ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের পর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আওয়াজ ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। আর এরই অনুষঙ্গ হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার একটা মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সারা পাকিস্তানের জন্য চালু করা নতুন মুদ্রা (টাকা), ডাকটিকিট, পোস্টকার্ড, দলিল-দস্তাবেজ, রেলের টিকিট প্রভৃতি সব কিছুতেই মূলত উর্দু ও ইংরেজি লেখা হয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর প্রস্তাব করা হয়। ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ‘আরবি হরফে’ বাংলা লেখার প্রস্তাব দিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না সরকারি অর্থ খরচ করে ‘আরবি হরফে’ লেখা বাংলা বই বিনামূল্যে প্রচার এবং এই পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের জন্য বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেন।
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ঢাকায় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কেবল উর্দু ও ইংরেজিকে গণপরিষদের ভাষা করার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তার বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করার সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তার এই সংশোধনী প্রস্তাবটি মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে অগ্রাহ্য হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
তমদ্দুন মজলিস প্রভাবিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারায় ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে নতুন করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ১১ মার্চ (১৯৪৮) সমগ্র পূর্ববাংলায় প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। প্রতিবাদ দিবসে সচিবালয়ের প্রথম গেটের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই বিক্ষোভ মিছিল থেকে পুলিশ শেখ মুজিব, শামসুল হক, অলি আহাদ ও কাজী গোলাম মাহাবুব প্রমুখ নেতাকে গ্রেফতার করে। মিছিলে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও পুলিশি নির্যাতন করা হয়। গ্রেফতার ও পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২৩ মার্চ ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। মার্চ মাসের মধ্যেই ভাষা আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের মুখে সরকার পিছু হটে। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তি করেন। তমদ্দুন মজলিস একে বিরাট বিজয় হিসেবে দেখলেও সাধারণ ছাত্ররা চুক্তিতে খুশি হয়নি। ফলে ১৬ মার্চ সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৮ দফা চুক্তির প্রতিবাদে ছাত্ররা প্রাদেশিক পরিষদ ভবন অবরোধ করে। পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে অবরোধ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় প্রথমবার এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। জিন্নাহর এই উক্তির তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের ছাত্রদের মধ্য থেকে ঘড় ঘড় ধ্বনি ওঠে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৫০ সালে নতুন করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশ থেকে আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এই সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ভাষা আন্দোলনে প্রাণসঞ্চরের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আন্দোলনে ছেদ ঘটায়। তবে ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ তাদের বহুমুখী রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রচারমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে ভাষার প্রশ্নটিকে পূর্ববাংলার রাজনীতির প্রধান ইস্যুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টরেন আয়োজিত জনস্যভায় পুনরায় উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ভাষা আন্দোলনকে জাতীয় আন্দোলনের রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ৩১ জানুয়ারি (১৯৫২) ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ’। মওলানা ভাসানী এর সভাপতি নির্বাচিত হন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। ঐ দিন ছিল পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন। ছাত্রদের পরিকল্পনা ছিল ওই দিন মিছিল করে ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশন ঘেরাও করে রাষ্ট্রভাষার দাবি জানানো। সরকার শঙ্কিত হয়ে শহরে ১৪৪ ধারা জারি ও মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ২১ ফেব্রুয়ারি মিছিলের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় ছাত্ররা সমবেত হয়। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ছাত্রসমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের হয়। মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের নির্দেশে পুলিশ বাহিনী মিছিলের ওপর গুলি চালায়। শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার প্রমুখ ছাত্র তরুণ। অসংখ্য ছাত্র আহত ও গ্রেফতার হন। ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশন থেকে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, আনোয়ারা বেগম ও আবুল কালাম শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন পরিষদ সদস্য ওয়াকআউট করে বেরিয়ে আসেন। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে ঢাকা শহরে হরতাল পালিত হয়। ছাত্র আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববাংলা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক পরিষদের সভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category: