Blog Archives

৭৫-এর ১৫ আগস্ট : সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Posted on by 0 comment

34স্বপন কুমার দাস: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল অম্লমধুর সম্পর্ক। পিতা শেখ লুৎফর রহমানের ইচ্ছায় বঙ্গবন্ধু আইনজীবী হওয়ার উদ্দেশে কলকাতা থেকে দেশে ফিরে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। এ সময় তিনি মাতৃভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং এ কারণে কারাবরণ করেন। তিনি ক্যাম্পাসে একজন ত্যাগী ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশে ধর্মঘট করলে বঙ্গবন্ধু তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি সমর্থন দেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ১০ টাকা জরিমানা করে এবং ভালো হয়ে চলার মুচলেকায় স্বাক্ষর দিতে বলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা করতে অস্বীকার করায় কর্তৃপক্ষ ১৯৪৯ সালের ২৯ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনে তার ছাত্রত্ব বাতিল করে। ফলে তার উচ্চ শিক্ষার পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করার সহপাঠীদের বলে যান, ‘আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে আসব। তবে ছাত্র হিসেবে নয়, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে।’ তিনি তার কথা রেখেছিলেন। তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন স্বল্পকালীন হলেও এ সময়ই তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান ঘটে। তার ছাত্রত্ব চলে যাওয়ায় এক অর্থে তা শাপেবর হয়। এরপর তিনি পুরোপুরিভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে পরিণত হন এক অপরিহার্য রাজনীতিকে। তার হাতে গড়া ছাত্রলীগ এ সময় সকল রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেয়। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলকে (ইকবাল হল) ছাত্রলীগের ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়। তার নির্দেশেই এ হল থেকে আন্দোলন পরিচালিত হয়। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করে তারও রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ’৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার সামনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করে। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ উপাধি দেওয়া হয়। এবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে এক জমকালো সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। বঙ্গবন্ধু তখন শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই নন, তার মুকুটে ‘জাতির পিতা’ শব্দটিও শোভা পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর তিনি তার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বেড়াতে আসেন ১৯৭২ সালের ৬ মে। যদিও তার এ সফরটি ছিল আড়ম্বরহীন; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন কলাভবনের সামনে বটতলায় তাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হয়। সেদিন তার সামনে তার ছাত্রত্ব বাতিলের আদেশপত্রের কপিটি ছিঁড়ে ফেলা হয়। বঙ্গবন্ধু সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের ভালোবাসায় অভিভূত হন।
এরপর বঙ্গবন্ধু আরও দুবার অনানুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। একবার তিনি আসেন দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরই। তখন দেশে তীব্র খাদ্য সংকট চলছিল। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হলের ডাইনিংয়ে একবেলা ভাত ও একবেলা রুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন যাওয়ার পর ছাত্ররা দুবেলাই ভাত দেওয়ার দাবিতে সন্ধ্যার সময় তৎকালীন উপাচার্য ড. মুজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরীকে তার বাসভবনে ঘেরাও করে। বঙ্গবন্ধু সে খবর শোনামাত্র প্রটোকল ছাড়া কেবল গেঞ্জি গায়ে ছুটে আসেন উপাচার্যের বাসভবনে। তিনি ছাত্রদের রুটির পরিবর্তে ভাত দেওয়ার আশ্বাস দিলে ছাত্ররা ঘেরাও কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৭২ সালের শেষের দিকে ছাত্ররা অটোপ্রমোশনের জন্য শিক্ষকদের ঘেরাও করে রাখলে বঙ্গবন্ধু তা শোনামাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন এবং ছাত্রদের আশ্বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান করেন।
তবে, যে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধুর কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবে তা হচ্ছেÑ ’৭৩-এর অর্ডিন্যান্স। এই যুগান্তকারী অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গণতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ লাভ করেন নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। সিনেট, সিন্ডিকেট, ডিন, ফিন্যান্স কমিটি, শিক্ষক সমিতি তথা প্রতিটি বডি নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালনার বিধি চালু হয়। এমনকি উপাচার্য নির্বাচন শুরু হয় শিক্ষকদের সরাসরি ভোটে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাজেট প্রণয়ন করার এখতিয়ার লাভ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া স্বাধীনতার পর হাজারও সীমাবদ্ধতার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নতুন আবাসিক হল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ হলটির নাম স্যার এএফ রহমান হল।
এসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে সাড়ম্বরে সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারিখ ঠিক হয় ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং পদাধিকার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। সে বছরের প্রথম দিকে তিনি বাকশাল গঠন করে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ তার সে ডাকে সাড়া দিয়ে বাকশালে যোগদানের জন্য সে দিনটার অপেক্ষায় ছিলেন। তখন ক্যাম্পাসের সর্বত্রই শুধু একই আলোচনা চলছেÑ ‘বঙ্গবন্ধু ক্যাম্পাসে আসছেন।’ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দেখা, খুব নিকট থেকে তার বক্তৃতা শোনা সেদিন যেন ১২ হাজার ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীর একমাত্র মনোবাসনা হয়ে দাঁড়ায়। তাই স্বাভাবিক কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর আগমন নানা দিক থেকে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর শুভাগমন উপলক্ষে আগস্ট মাসের শুরু থেকে এক মহাকর্মযজ্ঞ শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ভবন ঘষেমেজে ঝকঝকে করে তোলা হয়। দেয়ালে দেয়ালে চমৎকার সব স্লোগান লেখা হয়। করিডোরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি শোভা পায়। ব্যানার ও ফেস্টুনে ভরে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। কলাভবনের সামনে বিশাল মঞ্চ তৈরি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আগমনকে উপলক্ষ করে তিলে তিলে তিলোত্তমা সাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নীলক্ষেত মোড় থেকে টিএসসি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খুঁটিতে মাইক লাগানো হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেসব ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় সংগীত পরিবেশন করবে তারা ডাকসুর রুমে রিহার্সেল দেয়। ইউওটিসির ক্যাডেটরা সালাম জানানোর জন্য প্যারেড করে জগন্নাথ হলের খেলার মাঠে। অতিথিদের মাঝে বিতরণ করা হয় আমন্ত্রণপত্র। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে লেখা মানপত্রটি লিখে প্রস্তুত রাখা হয়। দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-ছাত্রীরা দিনরাত কাজ করে। সব কাজের তদারকি করেন তৎকালীন উপাচার্য বোস-অধ্যাপক ড. আবদুল মতিন চৌধুরী। সার্বিক দায়িত্ব পালন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। তখন ডাকসুর ভিপি ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস ছিলেন মাহবুব জামান। অনুষ্ঠানটি যাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় সেজন্য দিনরাত কাজ করেন বঙ্গবন্ধু-তনয় শেখ কামাল। তখন তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষবর্ষের ছাত্র।
এমনিভাবে আসে ১৪ আগস্ট। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে সেবার ক্যাম্পাস যেমনভাবে সেজেছিল, এবার তার চেয়েও মনোরম ও আকর্ষণীয় সাজে ক্যাম্পাস সাজে। অনুষ্ঠান পরিচালনাকারীরা সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। নিরাপত্তাকর্মীরা সব সময় পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ রাখে। এসবের মধ্যেই সেদিন সন্ধ্যার সময় বিকট আওয়াজে দুটি ককটেল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ও সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনের পেছনে বিস্ফোরিত হয়। ফলে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর আগমনের প্রস্তুতিতে সাময়িক ছেদ পড়ে। এজন্য জাসদ কর্মীদের দোষারোপ করা হয়। পরে অবশ্য সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। সেদিন মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীরা। সব শেষে ক্যাম্পাস ছেড়ে জিপ চালিয়ে চলে যান শেখ কামাল। তখন কে জানত এটাই কামাল ভাইয়ের শেষ যাওয়া।
বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের অনুষ্ঠানমালা নানা ব্যঞ্জনে সাজানো হয়েছিল। ’৭১-এর শহীদ শিক্ষকদের কবর জিয়ারত ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনের প্রথম কর্মসূচি পালনের কথা ছিল। এরপর ইউটিসির ক্যাডেটদের প্যারেড পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ, ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পুষ্পমালা গ্রহণ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মিউজিয়াম পরিদর্শন, জগন্নাথ হলের গণকবরে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনের সম্প্রসারণের কাজ উদ্বোধন এবং সবশেষে কলাভবনের সামনে নির্মিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীদের উদ্দেশে বক্তৃতা প্রদান। সেদিন সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত দুঘণ্টার জন্য ছিল অনুষ্ঠানের সময়সূচি।
পরদিন ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার জেগে ওঠার আগেই এক মহাদুঃসংবাদ এসে ক্যাম্পাসে আছড়ে পড়ে। বেতার ঘোষণায় বারংবার বলা হতে থাকেÑ এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন। এমন মর্মান্তিক আর হৃদয়বিদারক খবরে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। আয়োজকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পালিয়ে যায়। আমরা কলেজ পড়–য়া সমবয়সীরা আমাদের নীলক্ষেত কোয়ার্টারের সামনে নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পাসের দিকে তাকিয়ে থাকি।
তখন সকাল ৮টা। একটি ট্যাংক নিউমার্কেটের দিক থেকে এসে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিল। কালো পোশাক পরা চার-পাঁচজন সৈন্য ট্যাংকের ওপর অস্ত্র হাতে বসেছিল। তারা আমাদের দেখে অস্ত্র উঁচু করে চিৎকার দিয়ে উর্দু ভাষায় বলেছিলÑ ‘শালালোগ আন্দারমে যাও। নাহি তো গুলি ক্যার দাউঙ্গা।’ আমরা তাদের এমন রক্তপিপাসু হুঙ্কারে ভয় পেয়ে যার যার বাসায় চলে আসি। মনে পড়ে, ’৭১-এর ২৬ মার্চ সকালে নীলক্ষেত মোড়ের দৃশ্য। সেদিন সকালে বাসা থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা ট্যাংকের ওপর বসে তাচ্ছিল্যভরে বাঙালিদের গালিগালাজ করছিল আর দেখামাত্রই গুলি করছিল। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একই দৃশ্য দেখতে হবে ভাবতে পারিনি।
সকাল তখন সাড়ে ৮টা। বাসায় এসে অন্যমনস্ক হয়ে নাস্তা খাচ্ছি। হঠাৎ শুনতে পাই খসরু ভাইয়ের (কামরুল আলম খান খসরু) গলার আওয়াজ। খসরু ভাই আমার নাম ধরে জোরে জোরে ডাকছেন। দোতলা থেকে দৌড়ে কাছে এসে দেখি তার উষ্কখুষ্ক চেহারা, উত্তেজনায় কাঁপছেন। তিনি বলেন, তোমরা কয়েকজন আমার সাথে এসো। মাটি খুঁড়ে অস্ত্র উঠাতে হবে। আমরা তিন-চারজন সমবয়সী খসরু ভাইয়ের পিছু পিছু আবু সাঈদ হলের (বর্তমানে বিলুপ্ত) সামনের মাঠে চলে আসি। খসরু ভাই বলেন, মন্টুকে (মোস্তফা মোহসিন মন্টু) খবর দিয়েছি। ও আসলেই কাজ শুরু করব। বিনা চ্যালেঞ্জে তাদের ছাড়ব না। প্রতিশোধ নিবই। আমি বলি, টিএসসির সামনে ট্যাংক রয়েছে। খসরু ভাই বলেন, ট্যাংক ধ্বংস করার ট্রেনিং আমার আছে। দরকার কেবল কিছু গ্রেনেড আর একটি বেয়োনেট। এদিকে বেলা ৯টা পেরিয়ে যায়। খসরু ভাই অস্থির হয়ে মাঠে পায়চারি করছেন। হঠাৎ এক লোক হন্তদন্ত হয়ে এসে খসরু ভাইয়ের কানে কানে কী যেন বলে। খসরু ভাই আমাদের যার যার বাসায় চলে যেতে বলে তিনি জহুরুল হক হলের পেছন দিক দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এর কয়েক বছর পর তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল কলকাতায়।
যাক সে কথা। বাসায় না ফিরে কৌতূহলী মন নিয়ে আমি ক্যাম্পাসের অবস্থা দেখার জন্য চুপিসারে নীলক্ষেতের রাস্তা পার হয়ে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং ও কলাভবনের পেছনের সরু পথ দিয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির কাছে চলে আসি। তারপর যুতসই একটি স্থান খোঁজ করে সেখানে গিয়ে বসি। পুরো ক্যাম্পাস নীরব-নিস্তব্ধ। এতদিনকার চেনা ক্যাম্পাসকে বড় অচেনা মনে হয়। কোথাও একটি লোককেও চলাচল করতে দেখা যায় না। মাঝে মধ্যে কাকের কর্কশ আওয়াজ আর ট্যাংক-সামরিক যানের চলাচলের আওয়াজ। একটি প্রাইভেট কার রোকেয়া হলের সামনের রাস্তা দিয়ে একাধিকবার আসা-যাওয়া করছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার। বেলা ১২টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে যথারীতি আজান দেওয়া হয়। কিন্তু একজন মুসল্লিকেও নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে দেখিনি।
এমনিভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। এদিক-সেদিক দু-একজন মানুষকে চলাচল করতে দেখা যায়। আমি সাহসকে ভর করে ধীরে ধীরে কলাভবনের সামনে দিয়ে নীলক্ষেতে নিজেদের বাসার ফিরে আসছি। দেখি কলাভবনের সামনে থাকা বিশাল মঞ্চটি ফাঁকা পড়ে আছে। আশপাশের দেয়ালের লিখনগুলো জ্বলজ্বল করছে। আজও ৩টি স্লোগান আমার মনে আছেÑ ১. সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই ২. সবুজ বিপ্লবের পথ ধর বাংলাদেশ গড়ে তোল ৩. যতদিন রবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বহমান ততদিন রবে তোমার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে সারাদিন ক্যাম্পাসে কাটিয়ে ব্যথিত মন নিয়ে বিকেলে বাসায় ফিরে আসি। মা আমাকে দেখে বলে সারাদিন কোথায় ছিলি বাবা। আমরা তোর চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছি। দেখি মা’র চোখে জল। আমি মনে মনে বলি, মা যদি কাঁদতে হয়Ñ বাংলাদেশের জন্য কাঁদো। দেশ আজ পিতৃহারা হলো।

লেখক : সাংবাদিক

Category:

চলে গেলেন আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদ

Posted on by 0 comment

59 উত্তরণ প্রতিবেদন:  লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে গিয়েছিলেন জীবনের বড় একটা অংশ। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সবার চোখের আড়ালে থেকেই বিদায় নিলেন জীবন থেকেও। নভেরা আহমেদ, বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ গত ৬ মে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তিনি রেখে গেছেন তার স্বামী গ্রেগোয়া দ্য ব্রন্সকে। দেশে-বিদেশে আরও রেখে গেছেন তার শিল্পকর্মের অসংখ্য গুণগ্রাহী।
প্যারিসপ্রবাসী চিত্র সমালোচক ও নভেরা আহমেদের শেষ জীবনের ঘনিষ্ঠজন আনা ইসলাম প্যারিস থেকে জানান, বছর খানেক ধরেই নভেরা আহমেদ শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। এ ছাড়া আক্রান্ত ছিলেন বয়সজনিত আরও নানা জটিলতায়। থেকে থেকেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছিল তাকে। সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল চিকিৎসা নিয়ে চলে যান প্যারিসের হাসপাতাল থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে, শঁন পামেল নামে গ্রামে তার স্বামীর বাড়িতে। গত সপ্তাহ থেকে তার অবস্থার আবার অবনতি ঘটতে থাকে। তিনি কিছুই খেতে পারছিলেন না। মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি কোমায় চলে যান। ৬ মে প্যারিস সময় রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে কোনো একসময় নভেরা জীবনের সীমারেখা পেরিয়ে যান।
আনা ইসলাম জানিয়েছেন, নভেরার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তিনি শঁন পামেলের নভেরাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। ঘনিষ্ঠজনদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ সারাদিন বাড়িতে রাখা হয়। মরদেহ পরে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালের হিমঘরে। ১১ মে ওই গ্রামেরই স্থানীয় কবরস্থানে পরিবারের সদস্যরা নভেরাকে অন্তিমশয্যায় শায়িত করেন।
নভেরার জীবন ও কর্ম : নভেরার জন্ম ২৯ মার্চ ১৯৩৯ সালে। বাবা সৈয়দ আহমেদ। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদীঘির উত্তরপাড়া। নভেরা কলকাতার লরেটো স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। পরবর্তী শিক্ষার জন্য তাকে বাড়ি থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। পরিবারের ইচ্ছা ছিল, তিনি আইনে উচ্চতর শিক্ষা নেবেন। তবে শৈশব থেকেই শিল্পানুরাগী নভেরার ইচ্ছা ছিল ভাস্কর্য করার। তিনি সেখানে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে যোগ দেন। পরে ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে। সেখান থেকে তিনি পাঁচ বছর মেয়াদের ডিপ্লোমা কোর্স করেন। এরপর তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষা নেন।
নভেরা আহমেদ দেশে ফেরেন ১৯৫৬ সালে। সে সময় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ চলছিল। ভাস্কর হামিদুর রহমানের সাথে নভেরা আহমেদ শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে। ‘ইনার গেজ’ শিরোনামের ওই প্রদর্শনীটি কেবল নভেরারই নয়, গোটা পাকিস্তানেই ছিল কোনো ভাস্করের প্রথম একক প্রদর্শনী। তাতে ভাস্কর্য স্থান পেয়েছিল ৭৫টি। প্রদর্শনীতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, লাহোরের পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সম্পাদক ও প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, লাহোর আর্ট কলেজের উপাধ্যক্ষ শিল্পী শাকির আলীসহ বহু বিদগ্ধজন উপস্থিত ছিলেন। আধুনিক শিল্পধারায় রচিত নভেরার ওই শিল্পকর্মগুলো বিপুল সমাদর পায়। নভেরা আহমেদ এ দেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। সেই প্রদর্শনীর ৩০টি ভাস্কর্য পরে জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। সেই শিল্পগুলো নিয়ে ১৯৯৮ সালে তারা একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করে। নভেরার সেসব ভাস্কর্যের কয়েকটি এখনও জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে স্থাপিত রয়েছে।
নভেরার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী হয় ১৯৭০ সালে, ব্যাংককে। এতে তিনি ধাতব মাধ্যমে কিছু ভাস্কর্য করেন। তার তৃতীয় একক প্রদর্শনী হয় প্যারিসে, ১৯৭৩ সালে রিভগেস গ্যালারিতে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে প্যারিসে তার পূর্বাপর কাজের ১০০ দিনব্যাপী একটি প্রদর্শনী হয়।
নভেরা আহমেদ ১৯৯৭ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। দেশের আধুনিক ভাস্কর্যের অগ্রদূত নভেরা আহমেদ প্রায় ৪৫ বছর ধরে পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে নিভৃতে প্যারিসে বসবাস করছিলেন। চলেও গেলেন নীরবে।
নভেরা আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নভেরার মৃত্যু পুরো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। নভেরার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি।

না ফেরার দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এ আর খান
60শুধু শিক্ষক হিসেবেই অনন্য ছিলেন না, বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চারও একজন অগ্রদূত তিনি। পুরো নাম আনোয়ারুর রহমান খান; সংক্ষেপে এ আর খান নামেই পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এ অধ্যাপকের জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ছিল অপরিসীম কৌতূহল। বাংলাদেশের প্রবীণ এ জ্যোতির্বিজ্ঞানী লন্ডনে জীবনের শেষ দিনগুলোও কাটিয়েছেন গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে।
এ আর খান ছিলেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি। দাবা থেকে সেতার পর্যন্ত নানা বিষয়ে ছিল তার পারদর্শিতা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকও। সাইকেলে ঢাকার পথে তার ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য যারা দেখেছেন, কোনোদিন তা ভুলতে পারবেন না। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এ মানুষটি মুক্তিযুদ্ধোত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
গত  ২৫ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে লন্ডনের সেন্ট মেরিস হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
১৯৩২ সালে তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে এ আর খানের জন্ম। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পাস করার পর তিনি একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। ১৯৬০ সালে কলম্বো প্ল্যান ফেলো হিসেবে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬২ সালে লন্ডনের ইমপেরিয়েল কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং এখানে শিক্ষকতা করার সময় কেমব্রিজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকায় ফিরে আবারও ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে এ বিভাগ থেকেই অবসরে যান। বিজ্ঞানচর্চায় অনুরাগী এ আর খান ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠা করেন অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞান চক্র। তিনি বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। অ্যাসোসিয়েশন থেকে মহাকাশ বার্তা নামে যে পত্রিকাটি বের হয়, দীর্ঘদিন তিনি এর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে হ্যালির ধূমকেতু পর্যবেক্ষণের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির তিনি ছিলেন আহ্বায়ক। ইউনেস্কো ২০০৯ সালকে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বছর হিসেবে পালন করে। প্যারিসে সেই উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

মনিরুল হকের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাজী মনিরুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গত ২০ মে এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, কাজী মনিরুল হক প্রবাসে থেকেও দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। প্রবাসীদের কল্যাণে অবদান রেখেছেন। তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে হারাল। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

Category:

নোবেলজয়ী গ্যুন্টার গ্রাস আর নেই

Posted on by 0 comment

39উত্তরণ ডেস্কঃ  জার্মানির নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যুন্টার গ্রাস আর নেই। দেশটির উত্তরাঞ্চলের লুবেক শহরের একটি হাসপাতালে গত ১৫ এপ্রিল তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
গ্যুন্টার গ্রাসের প্রতিভা ছিল বহুমুখী। একই সাথে তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী। প্রথম উপন্যাস টিন ড্রাম (১৯৫৯) প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যে তিনি তার প্রবল আবির্ভাবের ঘোষণা দেন। এ উপন্যাস তাকে পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে মায়া ও বাস্তব মেশানো উপন্যাস টিন ড্রাম তাকে পৌঁছে দেয় খ্যাতির চূড়ায়। জীবদ্দশায় তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হন। সাহিত্যের সবচেয়ে গৌরবময় নোবেল পুরস্কার পান ১৯৯৯ সালে। এ পুরস্কার দেওয়ার সময় সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গ্যুন্টার গ্রাস তার সাহিত্যে নিপুণ হাতে ‘ইতিহাসের বিস্মৃত মুখচ্ছবি’ এঁকেছেন।
কিংবদন্তি লেখক গ্যুন্টার গ্রাসের জন্ম ১৯২৭ সালে, পোল্যান্ডের ডানজিগ শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মার্কিন সেনাদের হাতে ধরা পড়ে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই বছর তিনি বন্দী ছিলেন। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি খামার শ্রমিকের কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনি চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন ডুসেলডর্ফ ও বার্লিনে। বিশ্ববিখ্যাত লেখক হেরমান মেলভিল, উইলিম ফকনার, টমাস উল্ফ ও জন ডস প্যাসোসের লেখার তিনি অনুরাগী ছিলেন।
গ্যুন্টার গ্রাসের উল্লেখযোগ্য অন্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ক্যাট অ্যান্ড মাউস, ক্র্যাব ওয়াক, ডগ ইয়ার্স, দ্য ফ্লাউন্ডার, পিলিং দ্য অনিয়ন, মাই সেঞ্চুরি, দ্য র‌্যাট প্রভৃতি।
গ্রাসের বাংলাদেশ সফর : ১৯৮৬ সালে গ্যুন্টার গ্রাস বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। এ সফরের সময় স্ত্রী উটে গ্রাসও তার সাথে ছিলেন। ঢাকা শহরে তিনি রিকশায় ও পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন। জাতীয় জাদুঘরে জয়নুল আবেদিনের ছবি দেখে তিনি মুগ্ধ হন। লালবাগের কেল্লা ঘুরে দেখেন। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে বিহারি ক্যাম্প দেখতে যান। ভোরে গ্রাম দেখতে বের হন। কুমার, তাঁতি ও বস্তিবাসীদের জীবন তিনি খুব কাছে থেকে দেখেন। দিনপঞ্জিতে সেসব অভিজ্ঞতার বিবরণ তিনি লিখেছেন।
রাজধানী ঢাকা সম্পর্কে গ্যুন্টার গ্রাস লেখেনÑ ৬০ লাখ লোকের একটি প্রায় শহরতলী, একটি দেশের রাজধানী, যে দেশ আয়তনে বাভারিয়্যর প্রায় দ্বিগুণ; কিন্তু লোকসংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি, প্রতিবছর এ সংখ্যা ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। পড়তে ও লিখতে জানে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ। ১৯৪৬-৪৭ সালের নরমেধযজ্ঞ বা ১৯৭১ সালের লোকক্ষয়Ñ বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করেÑ কোনো কিছুতেই এই পরিসংখ্যানের উন্নতি ঘটেনি, ফি-বছরের বন্যা ও তার পরবর্তী মহামারিতেও নয়।
ঢাকার সাথে কলকাতার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে দিনপঞ্জিতে গ্যুন্টার গ্রাস লিখেনÑ কলকাতার চেয়ে এখানে মোটরগাড়ি কম, কিন্তু অনুমোদিত রিকশাই আছে ১ লাখের মতো। বাতাস কলকাতার চেয়ে ভালো, রাস্তাঘাটে আবর্জনা কম, গরু-বাছুর পথ রোধ করে নেই। আর শহরে প্রবেশের রাস্তাগুলো প্রশস্ত, সামরিক কুচকাওয়াজের উপযোগী, খানাখন্দ নেই।
বাংলাদেশের শীতের ভোরের বর্ণনা করতে গিয়ে গ্যুন্টার গ্রাস লেখেনÑ ভোর ৫টায় বেরিয়ে পড়ি গ্রামের উদ্দেশে। সকালের তাজা হাওয়ায় জমে যাওয়া শরীরগুলো কাপড়, শাল, কাঁথা-কম্বলে মোড়ানো। অধিকাংশ ঘরের চালা টিনের। পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় এখানকার গ্রাম ঘন। একটি গ্রাম মিশে আছে আরেকটি গ্রামের সাথে। আমাদের গন্তব্য টাঙ্গাইলের একটি মসলিন বাজার। মানুষের চাপে প্রদর্শনীর জন্য রাখা কাপড়ের রোলগুলো প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু যে মধ্যস্বত্বভোগী দালালেরা এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তারা ছাড়া বায়বীয় জাল কে আর কিনতে পারে?
লালবাগের কেল্লা ঘুরে দেখার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে গ্যুন্টার গ্রাস তার দিনপঞ্জিতে বলেন, আমরা দেখতে গেলাম মোগল যুগের বিশাল লালবাগ কেল্লার অশেষ। খুব দীনহীন একটি জাদুঘর সেখানে আছে। বেশি কিছু সেখানে থাকলেও অন্ততপক্ষে তার দৈন্যদশা এই সাক্ষ্য দেয় যে, সংস্কৃতিলোলুপ ইংরেজরা কী নির্মমভাবে তাদের নিজেদের জাদুঘরগুলো সমৃদ্ধ করেছে।
গ্রাসের এই উপমহাদেশের স্মৃতিকথায় বাংলাদেশ এভাবে ওতপ্রোত হয়ে মিশে আছে।

Category:

আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ানের জীবনাবসান

Posted on by 0 comment

45উত্তরণ ডেস্কঃ আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ’য়ের জীবনাবসান ঘটেছে। গত ২৩ মার্চ সকালে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ক্ষণজন্মা এই মানুষটির বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। প্রায় এক মাস ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ছিলেন। ২৯ মার্চ তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তার মৃত্যুতে সিঙ্গাপুরে সাত দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে, লি কুয়ানের মৃত্যুতে শোকাহত বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, চীনা প্রসিডেন্ট শি জিনপিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ করেছেন। একজন লি কুয়ানের উত্থান : আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা জনক লি কুয়ান ইউ ছিলেন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। ১৯৫৪ সালে পিপলস অ্যাকশান পার্টির (পিএপি) গঠনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়। এর পাঁচ বছরের মাথায় ‘শহর-রাষ্ট্র’টির তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। লি কুয়ান ১৯২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ধনী এক চীনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সিঙ্গাপুরে শিক্ষাজীবন শেষে লি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। সেখানে ব্যারিস্টারি পড়লেও তিনি সিঙ্গাপুরে ফিরে আসেন এবং পোস্টাল ইউনিয়নের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে যোগ দেন।
সিঙ্গাপুরে ১৯৫৪ সালে তিনি নাম লেখান রাজনীতিতে। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে গভর্নরকে সহায়তা করতে যে গণপরিষদ ছিল তাতে প্রথম দিকে নির্বাচন না করে সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হতো। পরে সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনের বিধিবিধান চালু হয়। ১৯৫৫ সালে পরিষদের ৩২টি আসনের মধ্যে ২৫টিকে নির্বাচিত আসন রাখার বিধান চালু হয়। এ বছরই নির্বাচনে লি’র সাবেক সহকর্মীদের দল লেবার ফ্রন্ট ১৩টি আসন জেতে এবং পিএপি পায় ৩টি আসন। পরের বছর সিঙ্গাপুরের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আলোচনা করতে লি লন্ডন যান। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়। সিঙ্গাপুরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পিএপির কিছু নেতাকর্মী কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৭ সালে লন্ডনে সিঙ্গাপুরের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে পুনরায় আলোচনা ফলপ্রসূ হয় এবং সিঙ্গাপুর স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। দেশটিতে অনুষ্ঠিত এক উপনির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে লি জয়লাভ করেন। ১৯৫৯ সালে সিঙ্গাপুরে নতুন সংবিধানের আওতায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে লি’র দল ব্যাপক বিজয় অর্জন করে। দলটি ৫১ আসনের মধ্যে ৪৩টি আসন পায়। কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের ব্রিটেন কারামুক্তি না দিলে সরকার গঠন করবেন না বলে জানান। ব্রিটিশ সরকার পিএপির নেতা-কর্মীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। লি ১৯৫৯ সালে ৫ জুন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং সরকার গঠন করেন। ১৯৬৩ সালে লি’র নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর নব-গঠিত ফেডারেশন অব মালয়েশিয়ায় যোগ দেয়। কিন্তু একপর্যায়ে সিঙ্গাপুরে চাইনিজ ও মালয়দের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে লি বলেন, সিঙ্গাপুরকে অবশ্যই ফেডারেশন ত্যাগ করতে হবে। তার ঘোষণার পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সিঙ্গাপুর এবং লি হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
তার দীর্ঘ শাসনকালে সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধশালী দেশে পরিণত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে না পারলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হবে। তিনি দেশটিতে ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটানোর উদ্যোগ নেন। বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করেন। একপর্যায়ে সিঙ্গাপুর পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হয়। ১৯৮০-র দশকে লি’র নেতৃত্বে পূর্ব এশিয়ায় মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সিঙ্গাপুর দ্বিতীয় অবস্থান লাভ করে। পিএপি ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয় এবং লি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। ওই দশকে তার উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রশ্নটি উঠে আসে। সফলভাবে উত্তরাধিকার নির্বাচনের পর লি ১৯৯০ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তবে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি পিএপির নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিজ্ঞ উপদেষ্টা (মেনটর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও সফল এ রাষ্ট্রনায়কের বিরুদ্ধে সমালোচনাও রয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালে বহু বিরোধী মতাবলম্বী রাজনীতিককে জেলে পুরেছেন তিনি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি সিঙ্গাপুরে একজন দয়ালু একনায়কের ভূমিকায় আসীন ছিলেন। কঠোর আইনি কাঠামো আর বিধিবিধানের বেড়াজালে তিনি সিঙ্গাপুরকে পরিচালনা করেন। যার ফলে দেশটি উন্নতির শিখরে পৌঁছে। পরবর্তী সময়ে তার উত্তরসূরিও এ ব্যবস্থা ধরে রেখেছেন।
শোকার্ত বিশ্ব নেতৃবৃন্দ : আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ানের মৃত্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ করেছেন। ওবামা এক বিবৃতিতে বলেন, লি ছিলেন এক বিশাল ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে যিনি আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক হিসেবে বিবেচিত হতে থাকবেন। এশীয় রাজনীতির অন্যতম কুশলী ব্যক্তিত্বও ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, লি সব সময় ব্রিটেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। অনেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার পরামর্শে উপকৃত হয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, লি কুয়ান ছিলেন এশিয়ার প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব। দৃঢ় ও রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ছিলেন ব্যাপকভাবে শ্রদ্ধাশীল। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লিকে ‘চীনা জনগণের পুরানো বন্ধু’ উল্লেখ করেছেন। শি বলেন, একজন কুশলী ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে লি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অধিক সম্মানিত ছিলেন। লি কোয়ানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, লি কেয়ানের কর্মকা- শুধু সিঙ্গাপুরের জনগণের জন্যই নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যও একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। লি একজন বীর, একজন নেতা এবং সবার ওপর একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোক বার্তায় বলেন, লি কুয়ান তার নেতৃত্ব ও কর্মকা-ের জন্য কেবল সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের কাছে নয়, সারাবিশ্বেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। লি সিঙ্গাপুরকে এশিয়ান টাইগারে পরিণত করতে উন্নয়নের যে পথ নিদের্শনা দিয়েছেন, তা আমাদেরও ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে। বাংলাদেশের জনগণ ও তার নিজের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়াতের পরিবারের সদস্যবর্গ ও সিঙ্গাপুরের জনগণের প্রতি সমবেদনা এবং অপূরণীয় এ ক্ষতি বহনের শক্তি ও সহিষ্ণুতা প্রদানের প্রার্থনা জানান।

Category:

শ্রদ্ধা ভালোবাসা প্রার্থনায় শহীদদের স্মরণ

Posted on by 0 comment

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ছয় বছর

63গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হলো পিলখানা হত্যাযজ্ঞে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে সেই হত্যাযজ্ঞের ষষ্ঠ বার্ষিকীতে বনানীর সামরিক কবরস্থানে সেদিনের শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন তাদের স্বজন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাদের সামরিক সচিব, তিন বাহিনী প্রধান ও বিজিবি মহাপরিচালকসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ সময় স্বজনদের কান্নায় সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। হত্যাকা-ের মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের রায় দ্রুত কার্যকর করার তাগিদ দিয়েছেন স্বজনরা। ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সপ্তাহ চলাকালে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের নৃশংসতায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এ উপলক্ষে ২৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানায়, বিডিআরের কতিপয় বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল সদস্য কর্তৃক সংঘটিত নিরস্ত্র সেনা সদস্যদের বর্বরোচিত হত্যাকা-ের ষষ্ঠ শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শাহাদাতবরণকারীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মো. জয়নুল আবেদীন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী (যৌথভাবে) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ (যৌথভাবে)। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা স্যালুট প্রদান করেন। পরে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এ ছাড়া এ উপলক্ষে সব সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে কোরআন খতম এবং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। এসব মাহফিলে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদবির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিজিবি জানায়, শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে পিলখানাসহ বিজিবির সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি বাদ ফজর খতমে কোরআন এবং বিজিবির সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় পিলখানায় বিজিবি মহাপরিচালকের সচিবালয়ে শাহাদাতবরণকারী তৎকালীন বিডিআরের কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর মো. নুরুল ইসলামের পরিবারকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার বার্ষিক অনুদানের চেক হস্তান্তর করা হবে। এ ছাড়া বিকেল সাড়ে ৪টায় পিলখানায় বীর-উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে, বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ তার দলের বেশ কয়েকজন নেতা। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সকাল ১১টায় শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

Category:

উগ্র জঙ্গিবাদী দুর্বৃত্তদের হাতে অভিজিৎ রায় খুন

Posted on by 0 comment

46উত্তরণ প্রতিবেদন ঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ধর্মান্ধ মৌলবাদী দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ব্লগার ড. অভিজিৎ রায়কে (৪২) হত্যা করেছে। দুর্বৃত্তদের হামলায় তার স্ত্রী ডা. রাফিদা আফরিন বন্যা (৩৫) গুরুতর আহত হয়েছেন। দুর্বৃত্তরা তার মাথায় উপর্যুপরি কুপিয়েছে। অভিজিৎ রায় একজন ব্লগার। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। ‘মুক্তমনা’ নামে একটি ব্লগের তিনি প্রতিষ্ঠাতা। ওই ব্লগে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র ধর্মীয় চেতনাবিরোধী লেখালেখি করতেন। তিনি স্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি বুয়েট থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনা করে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দুই মাস পর তিনি পিএইচডি ডিগ্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন। তিনি সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। লেখালেখি নিয়ে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীরা। এবার একুশের বইমেলায় দুটি বই প্রকাশ হয়েছে অভিজিতের।
অভিজিতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে লেখক ও ব্লগাররা ছুটে যান। ছুটে যান অভিজিতের বাবা অজয় রায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
অভিজিতের একজন সহকর্মী ও ব্লগার জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে অভিজিৎ রায় ব্লগে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। বিশেষ করে উগ্র ধর্মীয় চেতনা ও ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করতেন তাদের নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। ‘মুক্তমনা’ ব্লগে এসব নিয়ে লেখালেখির কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে বিশেষ করে শিবির ও হিযবুত তাহরীর-কেন্দ্রিক বেশ কিছু ব্লগে তার বিরুদ্ধে লেখালেখি হয়েছে। ‘সদালাপ’ নামে একটি ব্লগে তাকে প্রায়ই মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হতো।
ড. অভিজিৎ রায়ের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অবিশ্বাসের দর্শন’, ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’, ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’, ‘ভালবাসা কারে কয়’, স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি ইত্যাদি। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে একইভাবে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছিল। ওই হামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জাম’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) জড়িত ছিল বলে পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

Category:

কালজয়ী গানের ¯্রষ্টা গোবিন্দ হালদারের মহাপ্রয়াণ

54a  উত্তরণ ডেস্ক : গোবিন্দ হালদার ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ কিংবা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় লেখা এমন অনেক কালজয়ী গানের ¯্রষ্টা গোবিন্দ হালদার আর নেই। দীর্ঘ রোগভোগের পর গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তিনি স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে, জামাইসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
গত ১৩ ডিসেম্বর কিডনির অসুস্থতা নিয়ে প্রথম কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি হন গোবিন্দ হালদার। ২০ ডিসেম্বর রাতে হাসপাতালে অসুস্থ গোবিন্দ হালদারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন গোবিন্দ হালদারকে তার চিকিৎসার খরচ বহন করার আশ্বাস দেন তিনি। ২২ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে গোবিন্দ হালদারকে দেখতে হাসপাতালে যান। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি চিকিৎসা খরচের অর্থ ৩১ ডিসেম্বর  কলকাতার কাঁকুরগাছি এলাকায় গোবিন্দ হালদারের বাসভবনে গিয়ে তার স্ত্রীর হাতে তুলে দেন কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার জকি আহাদ।
গোবিন্দ হালদার জন্মেছিলেন অবিভক্ত যশোর জেলার বনগ্রামে। তিনি মূলত একজন কবি ও গীতিকার। তার প্রথম কবিতা ছিল ‘আর কতদিন’। তিনি লিখেছেন অন্তত সাড়ে তিন হাজার কবিতা ও গান। তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ দূর দিগন্ত। গোবিন্দ হালদার আয়কর দফতরের একজন কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। অবসর নিয়েছেনও এখান থেকে। গোবিন্দ হালদারের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার জকি আহাদসহ হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কলকাতার উপ-হাইকমিশনের পক্ষ থেকে গোবিন্দ হালদারের মরদেহে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গোবিন্দ হালদারের শেষকৃত্য হয় কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গীতিকার ও সুরকার গোবিন্দ হালদারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, গোবিন্দ হালদারের দেশাত্মবোধক গান ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে লাখ লাখ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, খ্যাতিমান এই গীতিকারের মৃত্যুতে বাংলাদেশের মানুষ তাদের এক অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল। গোবিন্দ হালদারের মৃত্যুতে আরও শোক জানান জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বি মিয়া প্রমুখ।

ড. মোহাম্মদ সেলিমের ইন্তেকাল
54bসাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর বড় ছেলে ড. মোহাম্মদ সেলিম গত ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় লন্ডনে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির সোবহানবাগে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লির সাবেক সদস্য প্রয়াত ড. মোহাম্মদ সেলিমের বাসভবনে যান। প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং তার স্ত্রী সালমা সেলিম ও ছোট ভাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাদের সান্ত¦না দেন এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। ড. মোহাম্মদ সেলিমকে বনানী কবরস্থানে ২৬ জানুয়ারি বিকেলে দাফন করা হয়। এর আগে, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলা পরিষদ মাঠে ওইদিন দুপুরে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাফিউল ইসলাম গার্ড অব অনার প্রদান করেন। জানাজা শেষে জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষে ফুল দিয়ে মরহুমের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সেদিন দুপুর দেড়টায় হেলিকপ্টারযোগে মরহুমের লাশ ফের ঢাকায় নেওয়া হয়। ২৫ জানুয়ারি বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ড. মোহাম্মদ সেলিমের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের জনগণ মরহুমের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

পরলোকে চাষী নজরুল ইসলাম
55aচাষী নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণ করে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের দেবদাস উপন্যাস অবলম্বনে ‘দেবদাস’ সিনেমা করে সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রেরও সার্থক রূপকার তিনি। সংগ্রাম, শুভদা, হাঙর নদী গ্রেনেড, পদ্মা মেঘনা যমুনা, হাছন রাজার মতো জীবনমুখী আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করে এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। গত ১১ জানুয়ারি ভোর ৫টা ৫১ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন। খ্যাতিমান এই চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছরের কিছু বেশি। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, ছয় নাতিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। চাষী নজরুল ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে ভারতের জামশেদপুরের টাটানগরে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে প্রথম অভিনয় করেন প্রখ্যাত এই নির্মাতা। ১৯৬০ সালে ফতেহ লোহানীর সঙ্গে আসিয়া ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর কাজ করেন ওবায়েদ উল হকসহ আরও অনেকের সঙ্গে। অভিনয়ও করেন কয়েকটি ছবিতে। ১৯৭২ সালে পরিচালনা করেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি ‘ওরা ১১ জন’। চাষী নজরুল ইসলাম সব মিলিয়ে ৩৫টির মতো ছবি নির্মাণ করেছেন।
চলে গেলেন হকি অন্তঃপ্রাণ জুম্মন লুসাই
55bচলে গেলেন বাংলাদেশের হকির সাবেক তারকা জুম্মন লুসাই। হকির জন্য নিবেদিতপ্রাণ এ মানুষটি গত ১৮ জানুয়ারি দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মারা যান। ১৯ জানুয়ারি সকাল ১০টায় জুম্মনের মরদেহ আবাহনী ক্লাবে এবং বেলা ১২টায় বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে নেওয়া হয় জন্মস্থান সিলেটে। সেখানে লুসাই সম্প্রদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হন জুম্মন। মৃত্যুর সময়ে জুম্মনের পাশে ছিলেন তার বোন মারিয়ান লুসাই ও ছোট ভাই। পরে জুম্মন লুসাইয়ের স্ত্রী মিজোরাম থেকে বাংলাদেশে এসে পৌঁছান। স্ত্রীসহ তিন ছেলে রেখে গেছেন জুম্মন। জুম্মনের মৃত্যুর খবর শুনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে গিয়েছিলেন যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ, আবাহনী লিমিটেডের পরিচালক হারুণ অর রশীদ, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খাজা রহমতউল্লাহ এবং হকির অনেক সাবেক খেলোয়াড়।
জুম্মন ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট জন্ম নেওয়া জুম্মন। তার বাবা হারেঙ্গা লুসাইও হকি খেলতেন। চাচাতো ভাই রামা লুসাই ফুটবল ও হকি খেলেছেন জাতীয় দলে। ছোটে ভাই জুবেলও হকি খেলোয়াড় ছিলেন। জুম্মন ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের রক্ষণভাগের হয়ে মাঠে আলো ছড়ান। হকি ফেডারেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের একমাত্র হকি খেলোয়াড়, যিনি বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলার গৌরব অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন জুম্মন। ১৯৮৫ সালে এশিয়া কাপে ইরানের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন তিনি। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত নবম এশিয়ান গেমসে অংশ নেন জুম্মন। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় এশিয়া কাপ, ১৯৮৬ সালে সিউলের দশম এশিয়ান গেমস ও ১৯৮৯ সালে দিল্লিতে তৃতীয় এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দলের পক্ষে হয়ে খেলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও সংসদ সদস্য, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম হামিদুর রহমানের সহধর্মিণী হাসনা হামিদ ইন্তেকাল করেছেন। গত ৩১ জানুয়ারি  ভোররাতে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। হাসনা হামিদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর মা। হাসনা হামিদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা, মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা পরিষদ প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ মহিউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ও বিশিষ্ট সমাজসেবিকা মোসাম্মৎ ফজিলাতুন নেছা রাজধানীর একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। এক শোক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক মহিউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ফজিলাতুন নেছা বেগমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

Category:

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারক কাজী গোলাম রসুলের ইন্তেকাল

Posted on by 0 comment

62a  উত্তরণ প্রতিবেদন : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় প্রদানকারী ঢাকার সাবেক জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল গত ১১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। সেদিন বাদ আছর কাকরাইলের সার্কিট হাউস রোডের টিপটপ জামে মসজিদে জানাজা শেষে সন্ধ্যায় বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয় সাবেক এই বিচারককে। মৃত্যুর আগে তিনি বিভিন্ন স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালেই হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে তিনি কাজী গোলাম রসুলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান এবং তাদের সমবেদনা জানান। ঐতিহাসিক রায় প্রদানকারী সাবেক এই বিচারকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
১৯৯৮ সালে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গোলাম রসুল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মামলায় ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। ওই বছরের শেষ দিকে তিনি অবসরে যান। পরে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি স্ত্রী, তিন মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার ২৩ বছর পর ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর এই হত্যা মামলায় ২০ আসামির ১৫ জনকে মৃত্যুদ- দেন ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল।
আসামিপক্ষের আপিলে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এ মামলায় বিভক্ত রায় দেন। বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ১০ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রাখেন। অন্য বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ১৫ আসামির ফাঁসির আদেশই বহাল রাখেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ আসামির মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে পাঁচ আসামি সুপ্রিমকোর্টে আপিল করলে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগ তা খারিজ করে এবং পরের বছর ২৮ জানুয়ারি প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। রায় কার্যকর হওয়ার পর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গোলাম রসুল বলেছিলেন, এখন থেকে আর কেউ এমন জঘন্যতম অপরাধ করার সাহস পাবে না।
কাজী গোলাম রসুল ১৯৪১ সালের ৩১ ডিসেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০ সালে তৎকালীন পটিয়া মহকুমার মুনসেফ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ থাকা অবস্থায় চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের ১০ থেকে ১২ দিন পর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান তিনি। সর্বশেষ তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের সিনিয়র লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
চলে গেলেন শিশুসাহিত্যিক এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ
62bঅর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে বাংলা ভাষার শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলে গেলেন শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ। গত ২৪ ডিসেম্বর ভোর ৪টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান উনিশশ ষাটের দশকের জনপ্রিয় কিশোর পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’র এই সম্পাদক। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে গত প্রায় এক মাস ধরেই হাসপাতালে ছিলেন তিনি।
১৯৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০০ সালে সরকার তাকে ভূষিত করে একুশে পদকে। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়া এখ্লাসউদ্দিন দীর্ঘদিন কাজ করেছেন দৈনিক জনকণ্ঠে। তবে ছন্দের উঠোনে স্বচ্ছন্দ বিচরণ তাকে দিয়েছে ছড়াকারের খ্যাতি। তার লেখা একদিকে শিশু-কিশোরদের নির্মল আনন্দ দিয়েছে, অন্যদিকে তুলে ধরেছে দেশ ও সমাজের নানা অসঙ্গতি। কখনও আবার ছন্দে বাঁধা রাজনৈতিক প্রতিবাদও ধারণ করেছে তার ছড়া। শুধু ছড়া নয়, শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প, উপন্যাসও লিখেছেন এখ্লাসউদ্দিন। তার সৃষ্টি ‘তুনু’, ‘তপু’ ও ‘কেঁদো’ চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে শিশুদের বন্ধু। নানা দেশের গল্প, ছড়া ও কবিতার সংকলনের সম্পাদনা করেও তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’-এ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের ছড়ায় গণচেতনা’ প্রবন্ধে বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন, ‘পাকিস্তান আমলে যেমন, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশেও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের ছড়াকাররা প্রতিবাদে মুখর, দ্রোহিতায় শাণিত। ঔপনিবেশিক শাসক আর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এমন কিছু পঙ্ক্তি রচিত হয় এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদের হাতে।’
কেবল একুশে পদক নয়, শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬২ সালে পশ্চিমবঙ্গ যুব উৎসব পুরস্কার, ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু একাডেমি পুরস্কার, ২০০৪ সালে কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৭ সালে ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
অভিনেতা খলিল আর নেই
63aবিশিষ্ট অভিনেতা খলিলউল্ল্যাহ খান গত ৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ৫৮ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। শক্তিমান এই অভিনেতার মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার আরও দুই ছেলে ছিল। দুদিন আগে খলিলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ইনটেনসিভ কেয়ারে চিকিৎসা চলছিল তার। গুরুতর একটি অস্ত্রোপচারের জন্য সকালে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন খলিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ১০ মে তার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। তিনি অসুস্থ খলিলের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে জন্মেছিলেন খলিল। তার স্ত্রীর নাম রাবেয়া খানম। ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে থাকতেন তিনি। হাসপাতাল থেকে এখানেই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। বাসার নিকটস্থ গোরস্তানে তাকে বাদ আছর দাফন করা হয়। মঞ্চ দিয়েই খলিলের অভিনয় জীবন শুরু হয়। কলিম শরাফী ও জহির রায়হান পরিচালিত ‘সোনার কাজল’ ছবিতে নায়ক হিসেবে রুপালি পর্দায় অভিষেক হয় তার। এ ছবিতে তার নায়িকা ছিলেন সুলতানা জামান ও সুমিতা দেবী। এরপর নায়ক হিসেবে ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’, ‘প্রীত না জানে রীত’, ‘কাজল’, ‘জংলীফুল’, ‘সঙ্গম’সহ আরও কয়েকটি ছবিতে কাজ করেন তিনি। প্রতিটিই ছিল  বেশ ব্যবসাসফল। ছবির নায়ক হওয়ার মাধ্যমে রুপালি পর্দায় অভিষেক হয় তার। গুণী এই অভিনেতা তিন শতাধিক ছবিতে কাজ করেছেন। চিত্রনায়িকা কবরী প্রযোজিত ও আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘গু-া’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা খলিল। এসএম পারভেজ পরিচালিত ‘বেগানা’ ছবিতে প্রথমবার খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করেন খলিল। নেতিবাচক চরিত্রেও তার অভিনয় প্রশংসিত হয়। এরপর খলনায়ক হিসেবেই নিয়মিত কাজ করতে থাকেন তিনি। ফলে নায়ক চরিত্রে আর ফেরা হয়নি।
খলিল অভিনীত ছবির তালিকায় আরও উল্লেখযোগ্য ‘আলোর মিছিল’, ‘অশান্ত ঢেউ’, ‘সমাপ্তি’, ‘তানসেন’, ‘নদের চাঁদ’, ‘মাটির ঘর’, ‘পাগলা রাজা’, ‘অলংকার’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘বেঈমান’, ‘কন্যাবদল’, ‘যৌতুক’, ‘সোনার চেয়ে দামি’, ‘বদলা’, ‘মেঘের পর মেঘ’, ‘মধুমতি’, ‘ওয়াদা’, ‘ভাই ভাই‘, ‘বিনি সুতোর মালা’, ‘মাটির পুতুল’, ‘সুখে থাকো’, ‘অভিযান’, ‘গু-া’, ‘পুনর্মিলন’, ‘কার বউ’, ‘বউ কথা কও’, ‘দিদার’, ‘আওয়াজ’, ‘নবাব’, ‘দ্বীপ কন্যা’, ‘আয়না’ প্রভৃতি। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টিভি নাটকেও অভিনয় করেছেন খলিল। তার অভিনীত নাটকের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটিভিতে প্রচারিত আবদুল্লাহ আল মামুনের ধারাবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’। অভিনয়ের পাশাপাশি দুটি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। আনসারের সাবেক এই কর্মকর্তা বাংলাদেশ চলচিত্র শিল্পী সমিতির দ্বিতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আবদুর রাজ্জাক ছিলেন দুর্দিনের কা-ারি
63bমুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, তার চিন্তা-চেতনায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ’৭৫-পরবর্তী তিনি আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। তিনি ছিলেন সংগঠনের দুর্দিনের কা-ারি। গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটরিয়ামে আবদুর রাজ্জাক স্মৃতি পরিষদের আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনা সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি বলেন, রাজ্জাক ভাই জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেই বিচার দেখে যেতে পারেন নি। তবে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ চলছে এবং চলবে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, আবদুর রাজ্জাক বেঁচে থাকলে যারা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে রাজনীতি করে, তাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে একত্র করতেন। আজ সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলকে এক কাতারে আসার। রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, বর্তমান সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছে। তা বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে।  মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আবদুর রাজ্জাক আওয়ামী লীগ বাদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল, বাংলাদেশের সরকারি ও বিরোধী দল দুটিই হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, জাতীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূরুল ফজল বুলবুল, একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু প্রমুখ। এর আগে সকালে আওয়ামী লীগ ও আবদুর রাজ্জাকের পরিবারসহ বিভিন্ন দল-সংগঠনের পক্ষে বনানী কবরস্থানে আবদুর রাজ্জাকের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে বনানী কবরস্থান মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আলোচনা সভা করেছে।

Category:

শেষ কথাটি না বলে চলে গেলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী

77 নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখ। ২০১৪ সাল। রোববার। রাত ৮টা ৪০ মিনিট। স্থান রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়াম। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গ সংগীতের চতুর্থ দিনের উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সামনে হাজার হাজার মানুষ। উজ্জ্বল আলোকিত মঞ্চ। বিশেষ অতিথি কাইয়ুম চৌধুরীর চোখে ঘনিয়ে এলো প্রগাঢ় অন্ধকার। চলে গেলেন তিনি পৃথিবীর সব সুর, সব রং-রূপের মায়া কাটিয়ে। এই আকস্মিক ঘটনায় শ্রোতারা হকচকিত হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে মঞ্চ থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই তিনি চিরতরে চলে গেছেন। মৃত্যুকালে তার  বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। রাতে মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।
আজ ১ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় নেওয়া হয়। এরপর বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে নানা পেশাজীবীর মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সামরিক সচিব ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্র্রদ্ধা জানান দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ অন্যরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর শ্রদ্ধা নিবেদন জানান।
এ ছাড়াও গণতন্ত্রী পার্টি, জাসদ, বাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ছায়ানট, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, কণ্ঠশীলন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও  সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা কীর্তিমান এই শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, হাশেম খান, রফিকুন নবী, শিল্পী হামিদুজ্জামান, অধ্যাপক জামিল চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুল মান্নান, লেখক ও গবেষক মফিদুল হক নাট্যব্যক্তি মামুনুর রশীদ, কেরামত মওলা, ফয়েজ জহির, গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী প্রমুখ। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা হয় বাদ জোহর। এরপর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর জন্ম ১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে। বাবা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী কো-অপারেটিভ ব্যাংকের সহকারী রেজিস্ট্রার ছিলেন। ১৯৬০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ২৯ বার তিনি শিল্পকলা একাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। বাংলাদেশের বইয়ের প্রচ্ছদের পালাবদলের অন্যতম রূপকার তিনি। ১৯৭৫ সালে ন্যাশনাল বুক সেন্টার আয়োজিত প্রচ্ছদ প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে প্রথম চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করেন। ১৯৫৪ সালে গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস থেকে তিনি ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন।
চলে গেলেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
78aপ্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী গত ১১ নভেম্বর রাত পৌনে ১২টায় রাজধানীর বনানীর নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। সেই দিন রাতে জিল্লুর রহমানের মরদেহ শমরিতা হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। পরের দিন ১২ নভেম্বর তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আনা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এ আয়োজন করে। সর্বস্তরের মানুষ শহীদ মিনারে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ। পরিবারের পক্ষ থেকে তার ছেলে ড. শাকিল আক্তার শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ ছাড়াও বাসদ, ঐক্য ন্যাপ, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে অধ্যাপক জিল্লুর রহমানের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর জন্ম ঝিনাইদহে ১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ১৯৪৫ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। পরে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ ও এমএ ডিগ্রি নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকা কলেজে। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে পরপর দুই মেয়াদে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত উপাচার্য ছিলেন জিল্লুর রহমান। ১৯৯০-৯১ সালে দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন খ্যাতনামা এই শিক্ষাবিদ। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সপ্রতিভ বিচরণ ছিল জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর। অনুবাদ করেছেন ইংরেজি সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনেক বই। লিখেছেন প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনি। পাঠকপ্রিয় হয়েছে তার কবিতাও। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, বাঙালির আত্মপরিচয়, শব্দের সীমানা, কোয়েস্ট ফর আ সিভিল সোসাইটি, দ্য কোয়েস্ট ফর ট্রুথ : সেক্যুলার ফিলোসফি বাই আরজ আলী মাতুব্বর, যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ছিলাম ইত্যাদি। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধানের সম্পাদক তিনি। ১৯৭৭ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার পান জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। দুই বছর পর ১৯৭৯ সালে পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ২০১০ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার।
না ফেরার দেশে জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি
78bনা ফেরার দেশে তিনি চলে গেলেন। রেখে গেলেন এমন এক কীর্তি, যা বাঙালির স্মরণে চিরজাগরূক থাকবে। তিনি স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার স্মারক যে সৌধটি মাথা উঁচু করে আছে সাভারে, সেই জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি তিনি।
দীর্ঘদিন রোগভোগের পর গত ১০ নভেম্বর তিনি রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন দীর্ঘদিন থেকে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। স্থপতি মাইনুল হোসেনের জন্ম ১৯৫১ সালের ১৭ মার্চ, মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীতে। তার বাবা সৈয়দ মুজিবুল হক যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। দাদা সৈয়দ এমদাদ আলী ও নানা গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি। তিনি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে ¯œাতক ডিগ্রি নেন।
স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন জাতীয় স্মৃতিসৌধ ছাড়াও ১৯৭৬-৯৮ সালের মধ্যে বেশ কিছু বড় স্থাপত্যকর্ম করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে কারওয়ান বাজারের আইআরডিপি ভবন, ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, চট্টগ্রাম ইপিজেড, ঢাকার অ্যাডভোকেট বার কাউন্সিল ইত্যাদি। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সাভারে স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নকশা আহ্বান করা হয় ১৯৭৮ সালে। মোট ৫৭টি নকশার মধ্যে থেকে সে সময়ের তরুণ স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নকশাটি গৃহীত হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮৮ সালে। জাতীয় স্মৃতিসৌধ ৭টি সমদ্বিবাহু ত্রিভূজাকৃতির স্তম্ভের সমন্বয়ে নির্মিত। এটি ১৫০ ফুট উঁচু। এই ৭টি স্তম্ভ বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ৭টি পর্যায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত। পর্যায়গুলো হলো ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬-এর শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে পৃথক শোকবাণী দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। তারা বলেছেন, এই বরেণ্য স্থপতির স্মৃতি অমর হয় থাকবে। তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সংস্কৃতি সচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস।
অসময়ে চলেন গেলেন সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী
79রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক, কলামিস্ট, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী গত ২৯ নভেম্বর নিহত হন।
সেদিন রাত ৮টার কিছু পরে কারওয়ানবাজার এলাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী একটি টিভি টকশোতে অংশ নিতে কারওয়ান বাজারে টেলিভিশন চ্যানেলটির কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। কারওয়ানবাজারে একটি বাস থেকে নামার সময় পড়ে মারাত্মক আহত হন। সেখান থেকে তাকে পান্থপথ মোড়ে মোহনা ক্লিনিকে নিয়ে যাই। সেখানে থেকে তাকে পাশের কমফোর্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জগ্লুল আহ্মেদের লাশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।
প্রবীণ এ সাংবাদিকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানান। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জগ্লুল আহ্মেদের মৃত্যুতে দেশ হারিয়েছে সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। আমি হারিয়েছি আমার সহপাঠী ও শুভাকাক্সক্ষীকে। তার মৃত্যুতে সাংবাদিকতা জগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা অপূরণীয়।
আজ ১ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টায় সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় প্রেসক্লাবে। তাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য সাংবাদিক ও পেশাজীবীরা সেখানে উপস্থিত হন। সেখানে আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার সঞ্জীব চক্রবর্তী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা। সেখান থেকে আজিমপুর গোরস্তানে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।জগ্লুল আহ্মেদের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার পিয়াম গ্রামে। তার বাবা নাসিরউদ্দিন চৌধুরী যুক্তফ্রন্ট সরকারের আইনমন্ত্রী ছিলেন। জগ্লুল আহ্মেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর করেন। নিউইয়র্ক টাইমসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির স্থায়ী সদস্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জগ্লুল আহ্মেদ। ১৯৮৮-৮৯ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব ছিলেন তিনি।

Ñ অনিল সেন

Category:

ইতিহাসের আলোকবর্তিকা জাতীয় অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ পরলোকে

উত্তরণ ডেস্ক : জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহ্উদ্দীন আহ্্মদ আর নেই। ইতিহাসকে সাক্ষী করে দীর্ঘ বিস্তৃত পথচলায় জাতির আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠা এই জ্ঞানতাপস গত ১৯ অক্টোবর ভোর ৬টায় বনানীতে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল 57   ৯২ বছর। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের বনানীর বাসভবনে যান। সেখানে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। তার বাসভবনে আরও যান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ড. সিরাজুল ইসলাম, বদরুদ্দীন উমর, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, নাট্যব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে।
বিকেল ৩টায় অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সভাপতিম-লীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, ডা. দীপু মনি এমপিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফসহ রাজনৈতিক, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শহীদ মিনারে জাতির এই সূর্যসন্তানকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজার পর বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবনী গ্রন্থের সম্পাদক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ। ১৯২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের জন্ম। তার পুরো নাম আবুল ফয়েজ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ। তার বাবার নাম ফয়জুল মহিন এবং মায়ের নাম আকিফারা খাতুন। কলকাতার আলিপুরের তালতলা হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তিনি ১৯৪০ সালে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ¯œাতক (সম্মান) শ্রেণিতে। ১৯৪৩ সালে সেখান থেকে অনার্স শেষ করেন এবং ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর হামিদা খানমের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন। ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয়। সেখানে তিনি ছাত্রদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পর সেখানে তিনি ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ কিছুদিনের জন্য জাপানের ‘ইউনেস্কো কালচারাল ফেলো’ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিভাগে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের নভেম্বরে ড. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে। সেখানে প্রায় ছয় বছর কাজ করে ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত চাকরি থেকে অবসর নেন। সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের সদস্য-পরিচালক ছিলেন। ড. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ অনেকগুলো গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ‘উনিশ শতকে বাংলার সমাজ-চিন্তা ও সমাজবিবর্তন ১৮১৮-১৮৩৫’, ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্য’, ‘ইতিহাসের সন্ধানে’, ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশ : অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ’, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘বাঙালির সাধনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’, ‘বাংলাদেশ : ট্র্যাডিশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’, ‘বেঙ্গলি ন্যাশনালিজম অ্যান্ড দি ইমারেন্স অব বাংলাদেশ’ প্রভৃতি। তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
ভাষা সংগ্রামী আবদুল মতিনের জীবনাবসান
58bভাষা সংগ্রামী ও রাজনীতিক আবদুল মতিন গত ৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সংকটাপন্ন অবস্থায় আবদুল মতিন গত ১৯ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০ আগস্ট তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু ৩ অক্টোবর থেকে অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
এদিকে ভাষা সংগ্রামী মতিনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ভাষা সংগ্রামী আবদুল মতিনের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ শাসিত পূর্ববঙ্গের সিরাজগঞ্জে। তবে ১৯৩২ সালে দার্জিলিং স্কুলে ভর্তির মাধ্যমে তার শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৪৩ সালে মেট্রিকুলেশন পাসের পর তিনি পূর্ববঙ্গে ফিরে আসেন এবং পরের বছর রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। তিনি ¯œাতক সম্পন্ন করেন ১৯৪৭ সালে। এরপরই তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং এ আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদানকারী ছাত্র নেতা ও সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্ররা যে প্রতিবাদ মিছিল বের করে তাতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। একই বছরের ২৪ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণে উর্দুকেই যখন একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন, তখন ছাত্রনেতা মতিনই চেয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে ‘নো, ইট ক্যান নট বি’ বলে প্রতিবাদ জানান। অন্য ছাত্ররা তখন আবদুল মতিনকে সমর্থন করে জিন্নাহর ভাষণের প্রতিবাদ করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা স্বীকৃতির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তত্ত্বাবধানে ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ একটি র‌্যালি বের করা হয়। তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি খালেক নাওয়াজ খানের সভাপতিত্বে র‌্যালি পরবর্তী এক সভায় আজকের এই প্রয়াত ভাষা মতিনকে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকশন কমিটির কনভেনার করা হয়। তিনি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদেরও সদস্য ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা বজলুর রহমানের ইন্তেকাল
58aবঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা বজলুর রহমান গত ১৯ অক্টোবর রাতে তার ধানমন্ডির বাসায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। গতকাল দুপুরে রাজধানীর লালমাটিয়ায় শাহী (বিবি) মসজিদে তার প্রথম জানাজা ও বিকেল ৩টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাতেই তার লাশ মিরপুরে দাফন করা হয়। তিনি এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সাবেক এই লিয়াজোঁ কর্মকর্তার মরদেহ দেখতে মরহুমের বাসভবনে যান। তিনি মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বজলুর রহমান সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। সামরিক আদালতের বিচারে তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। নব্বইয়ের দশকে তিনি কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেন।
এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বজলুর রহমানের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ পরিবার একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে হারাল। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারাবরণকারী বজলুর রহমানের অবদান দেশ ও জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।
সিরাজগঞ্জের এমপি ইসহাক তালুকদারের ইন্তেকাল
58cগত ৬ অক্টোবর সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইসহাক হোসেন তালুকদার শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভুগে মারা গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ইসহাক ১৯৮৬, ২০০৭ ও ২০১০ সালে তিন দফা রায়গঞ্জ-তাড়াশ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সালের ১৮ জুন সিরাজগঞ্জে জন্ম নেওয়া ইসহাক স্ত্রী, দুই ছেলে ও নাতি-নাতনি রেখে গেছেন। সংসদ সদস্য ইসহাক তালুকদারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ও চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এক শোকবাণীতে স্পিকার বলেন, ইসহাক হোসেন তালুকদার ছিলেন দেশ ও জাতির একজন সূর্য্য সন্তান।

Category: