Blog Archives

মাসব্যাপী নানা আয়োজনে : বঙ্গবন্ধু-স্মরণ

PM2হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ স্মরণ করে জাতির পিতাকে। বরাবরের মতো এবারও সরকারি-বেসরকারিভাবে পালিত হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। জাতীয় শোক দিবস সামনে রেখে আগস্টের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।
১ আগস্ট গোপালগঞ্জে ১০০ শিশুর অংশগ্রহণে জাতির পিতা উৎসর্গীকৃত ‘পুষ্পকানন’ নির্মাণের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
২ আগস্ট গোপালগঞ্জে মুজিববর্ষে নির্মিতব্য সফল শিল্পের নির্মাণ ভাবনা ও কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
৫ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ওপর রচিত ১০০টি গ্রন্থের পাঠ পর্যালোচনা করা হয়।
৬ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় নাট্যশালায় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ‘মুজিব মানে মুক্তি’ নাটক মঞ্চায়িত হয়।
১১ আগস্ট রাঙ্গামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের নিজস্ব হলরুমে বিভিন্ন উপজেলার স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে ছড়াগান, দেশাত্মবোধক গানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
১৫ আগস্ট সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোয় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবস পালন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওগুলো দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। এ উপলক্ষে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর মাসিক সচিত্র বাংলাদেশে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ১নং গ্যালারিতে ১ আগস্ট থেকে ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক মাসব্যাপী কমসূচি পালন করা হয়। ফ্রেমে ফ্রেমে ঝুলানো শিল্পীদের রংতুলির আঁচড়ে বঙ্গবন্ধু ওপর চিত্রকর্ম ও আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বেলা ৩টা হতে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় এবং তথ্যভবনে পক্ষকালব্যাপী এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলে।
জাতীয় জাদুঘরে কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘ভয়াবহ আগস্ট’ শিরোনামে এক সেমিনার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে ‘বঙ্গবন্ধুকে জানো বাংলাদেশকে জানো’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ছড়া পাঠ, শিশু বক্তাদের অনুভূতি প্রকাশ, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিশু একাডেমি হতে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক ২৫টি বইয়ের প্রদর্শনী এবং বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। বেইলী রোডস্থ অফিসার্স ক্লাবের আয়োজনে নিজস্ব মিলনায়তনে মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনদের নির্মম হত্যাকা-ের প্রেক্ষাপটে গবেষণালব্ধ নাটক ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’ মঞ্চস্থ হয়। মহাপ্রয়াণের শোক আখ্যান ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’ রচনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনন জামান এবং মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ৪০তম এ প্রযোজনার পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরমেন্স স্ট্যাডি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশিক রহমান লিওন।
সারাদেশের অলিগলিতে মাইকে প্রকম্পিত হয় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গান, কবিতা-ছড়া, দেশাত্মবোধক তথা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণামূলক গান। শোক দিবসের পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার, কালো পতাকা ও কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান, কবিতা-ছড়া, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং হামদ-নাত, মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।
১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণে বিশেষ সাহিত্য আসর আয়োজন করে খেলাঘর। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্ব-রচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, স্মৃতিচারণ ও শিশুদের সংগীত পরিবেশনা।
২১ আগস্ট ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা নিয়ে ৫১ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে স্থাপনা শিল্প ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশী ধ্বংষযজ্ঞ’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
২৩ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বাউল কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু’ এবং বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ পাঠ ও চিত্র নির্মাণের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও একাডেমির নাট্যশালায় ইন্টারন্যাশনাল ডিজিটাল কালচারাল আর্কাইভে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্র : ‘অসমাপ্ত মহাকাব্য’, ‘চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু’, ‘স্বাধীনতা কী করে আমাদের হলো (ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ অবলম্বনে)’ এবং ‘BANGABANDHU Forever in our hearts’ প্রদর্শিত হয়। সকল জেলা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
২৪ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালায় ইন্টারন্যাশনাল ডিজিটাল কালচারাল আর্কাইভে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্মিত প্রামান্য চলচ্চিত্র : ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম (বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি বিষয়ক তথ্যচিত্র)’, ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র)’, ‘সোনালি দিনগুলো (বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছর)’, ‘বিরতি’, ‘ওদের ক্ষমা নেই’ এবং ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ প্রদর্শিত হয়। জাতীয় চিত্রশালায় বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণে ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।
২৫ আগস্ট জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে কবিতা ও গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি)।
২৬, ২৮ ও ২৯ আগস্ট তিন দিনব্যাপী জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে ‘বঙ্গবন্ধু বিষয়ক পুস্তক প্রদর্শনী ও পাঠ’ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায়।
৩০ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় চিত্রশালায় ‘আমার বঙ্গবন্ধু’, ‘আমিই মুজিব’, ‘২০৪১ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা’ তিন বিষয়ের ওপর স্কুল ছাত্রদের শ্রেণিভিত্তিক শিশু চিত্রাঙ্কান প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
৩১ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় বঙ্গবন্ধু বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে শেষ হয় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ ও আর্কাইভ ’৭১-এর মাসব্যাপী এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন।
শোকাবহ আগস্টের মাসজুড়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে সরব ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গন।

শাহ্ সোহাগ ফকির

Category:

বিক্রমপুরে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ আবিষ্কৃত

2-6-2019 8-41-35 PMআরিফ সোহেল: প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র বিক্রমপুরের মুন্সিগঞ্জে এবার আবিষ্কৃত হয়েছে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ। গত ২২ জানুয়ারি রামপালের বল্লালবাড়িতে আবিষ্কৃত মৃৎ পাত্র, ইট, কাঠ-কয়লা ও ইটের টুকরো তার সাক্ষ্য বহন করে। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতœতত্ত্ব খননের মাধ্যমে সূচিত হয়েছে আরেকটি নব ইতিহাসের। এর আগে নাটেশ্বর এবং রঘুরামপুরেও প্রতœস্থান খুঁজে পেয়েছে এই সংগঠনটি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ও চীনের একদল প্রতœতাত্ত্বিক যৌথভাবে এই কাজে সম্পৃক্ত। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে বিক্রমপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’ যাত্রা শুরু করে। রামপালের বল্লাল বাড়িতে আবিষ্কৃত রাজা বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ ও মন্দির রয়েছে। দুদিনের পরীক্ষামূলক খননেই মাটির নিচে চাপা থাকা ৮০০ বছরের পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন খননকারীরা।
মুন্সিগঞ্জ সদরের রামপাল ইউনিয়নের বল্লালবাড়ি এলাকাটি বাংলার সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুর হিসেবে পরিচিত থাকলেও সেখানে রাজবাড়ির কোনো চিহ্ন দৃশ্যমান ছিল না। দখল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটিতে চারদিকে পরিখাবেষ্টিত এমন বিশাল বাড়িটি আবিষ্কারের জন্য এর আগে কোনো প্রতœতাত্ত্বিক খনন হয়নি। ড. নূহ-উল-আলম লেনিনের নেতৃত্বে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শন ও প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ উদ্ধারে ২০১১ সাল থেকে প্রতœতাত্ত্বিক দেশের খ্যাতিমান প্রতœতত্ত্ববিদ ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে জরিপ ও খননকাজ শুরু হয়। এতে রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে আবিষ্কৃত হয় হাজার বছরের বৌদ্ধবিহার ও টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বরে বৌদ্ধমন্দির। আর এবার একই ইউনিয়নের বল্লালবাড়ি এলাকায় আবিষ্কৃত হলো সেন আমলের রাজবাড়ি। বল্লালবাড়িতে খননকাজ শুরুর আগে জমি দখল অধিকারে থাকা মালিকদের অনুমতি নিয়েই খননকাজ শুরু করা হয়েছে।
সেন বংশের দ্বিতীয় রাজা বিজয় সেন ও বিলাস দেবীর ছেলে বল্লাল সেন ১১৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাবার মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১১৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ২০ বছর রাজত্ব করেন। তিনি তার নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিক্রমপুরের রামপালে। কিন্তু সেই রাজধানীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে মুন্সিগঞ্জে বল্লালবাড়ি একটি জায়গা রয়েছে। সেখানের একটি স্পটে খনন করেই মূল মাটির ২-৩ ফুট নীচে প্রাচীন ইট, ইটের টুকরো, মাটির পাত্রের টুকরো, কাঠ-কয়লা পাওয়া গেছে। প্রথমে খননকাজ শুরু হলে প্রাচীন প্রতœস্থানের নিদর্শনস্বরূপ এসব জিনিসই পাওয়া যায়। পরে বিস্তৃত আকারে খনন করলে মূলত দেয়াল বেরিয়ে আসে। যেমনটি পাশর্^বর্তী রঘুরামপুরে ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বরে পাওয়া গেছে। খননকাজটি চালিয়ে যেতে পারলে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ, মন্দির, রাস্তাঘাট সবকিছুই পাওয়া যাবে। ভূ-প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদ বা দুর্গ হারিয়ে গেছে বহুকাল আগেই। একটি ক্ষুদ্র অংশ আবিষ্কৃত হওয়ায় প্রাচীন বিক্রমপুরের ইতিহাসের নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে বলেন, প্রায় ৮০০ বছর প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিল এই বিক্রমপুরে। তাই এখানে ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু কখনও এই রাজধানী বা রাজপ্রাসাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আজকের খননের মধ্য দিয়ে যে সম্ভাবনা লক্ষ করছি, তা আমাদের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে। উল্লেখ্য, খননকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এবং চীনের অধ্যাপক চাই হোয়াংবো।
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, সেন বংশের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। খননের মধ্য দিয়ে সেন বংশের ইতিহাস ও তৎকালীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুরের ইতিহাস বৈজ্ঞানিকভাবে বের হয়ে আসছে। যা বিক্রমপুর তথা বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে। খুঁজে পাওয়া নিদর্শন নিয়ে গবেষণা করা হবে। এগুলো থেকে প্রাচীন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বল্লালবাড়িতে পরীক্ষামূলক খনন শুরু হয়েছে। ২১ জানুয়ারি মাত্র ৯ বর্গমিটার খননেই বেরিয়ে আসে প্রাচীন বসতির গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য স্থাপত্যের চিহ্নরেখা। প্রথম দিনই উন্মোচিত হয় সেন রাজবাড়ির প্রতœতত্ত্ব নিদর্শন পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা।
মাত্র দুদিনে পরীক্ষামূলকভাবে ২১-২২ জানুয়ারি খনন করে এই বল্লালবাড়ি আবিষ্কার করা হয়েছে। একটি পানের বরজের মাটি খুঁড়ে দলটি এই প্রতœনিদর্শন পায়। এখান থেকে পাওয়া চারকোল দিয়েও তাই সহজেই এটার বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব। সংগ্রহকৃত চারকোলটি আমেরিকান ল্যাবরেটরি বেটাতে পাঠানো হবে। সেখানে কার্বন পরীক্ষা শেষে সংগ্রহ করা নমূনা কত বছর আগের তা জানা যাবে।
প্রতœতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সন্ধান করে জানা গেছে, বল্লালবাড়ি এলাকাটি একটি দুর্গ। এটি বর্গাকার, প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ২৭২ মিটার। দুর্গের চারদিকে যে পরিখা [নালা] ছিল তা প্রায় ৬০ মিটার প্রশস্ত। রামপাল কলেজের পাশে এখনও একটি পরিখা দৃশ্যমান। অন্যগুলো ভরাট করে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। আবিষ্কৃত নিদর্শনের সময়কাল নির্ণয়ে এখন গবেষণা করা হবে।
মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বলেন, এই খননে প্রাচীন নিদর্শনের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিক্রমপুরের ইতিহাস-সমৃদ্ধ ছাড়াও প্রতœতত্ত্বনগরী মুন্সিগঞ্জে আরও বেশি আকৃষ্ট করবে পর্যটকদের।
উল্লেখ্য, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী ও রামপাল অঞ্চলে প্রাচীন নিদর্শন ও প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ উদ্ধারে ২০১১ সাল থেকে প্রতœতত্ত্ব জরিপ ও খননকাজ হাতে নেয়। বৌদ্ধ ধর্মের প-িত অতীশ দীপঙ্করের বাস্তুভিটার কাছে ২০১৩ সালে প্রাচীন বৌদ্ধবিহারটি আবিষ্কার হয়। বিহারটি বিক্রমপুর বিহার নামে পরিচিত। আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারের ৫টি ভিক্ষু কক্ষ ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। একেকটি কক্ষের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৩ দশমিক ৫ মিটার করে। ধারণা করা হচ্ছে, বৌদ্ধ ধর্মের জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে এই বিহারের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর গ্রামে দেড় হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধনগরীও আবিষ্কার করেছে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন। সেখানে খননে বেরিয়ে এসেছে বৌদ্ধমন্দির, অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, ইট নির্মিত নালা, রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এই খননে দেড় হাজার বছর আগের বৌদ্ধযুগের নগরীর নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়।
শ্রীনগরের বালাসুরে জমিদার যদুনাথ রায়ের পরিত্যক্ত বাড়িতে অগ্রসর বিক্রমপুর সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়েই বিক্রমপুর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৩ সালের ২৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। বিক্রমপুর জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু ১৯৯৮ সালের ২৪ এপ্রিল।

Category:

‘বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা’

2-6-2019 8-17-19 PMআনিস আহামেদ: বায়ান্নর চেতনায় উদ্ভাসিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়েছে। প্রতিবারের মতোই বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমি এই মেলার আয়োজন করছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে গত ১ ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় গ্রন্থমেলাকে প্রাণের মেলা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি শুধু বই কেনা-বেচার জন্য নয়, আমাদের বাঙালির প্রাণের মেলা। মনটা পড়ে থাকে এই গ্রন্থমেলায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সম্মানিত বিদেশি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা ভাষার প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ এবং মিসরের প্রখ্যাত লেখক-সাংবাদিক ও গবেষক মোহসেন আল-আরিশি। প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে যখন ক্ষমতায় ছিলাম না তখন গ্রন্থমেলায় আসতাম। ঘুরে বেড়াতাম। এখন বলতে গেলে এক ধরনের বন্দী জীবনযাপনই করতে হয়। আসার আর সুযোগ হয় না। আসতে গেলে অন্যের অসুবিধা হয়। নিরাপত্তার কারণে মানুষের যে অসুবিধা হবে তা বিবেচনা করে আর আসার ইচ্ছাটা হয় না। তবে সত্যি বলতে কী মনটা পড়ে থাকে এখানে।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতই আমরা যান্ত্রিক হই না কেন, বইয়ের চাহিদা কখনও শেষ হবে না। নতুন বইয়ের মলাট, বই শেলফে সাজিয়ে রাখা, বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, আমরা সব সময় তা পেতে চাই। তবে একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সব বই অনলাইনে বই দেয়া এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রন্থমেলা আয়োজন করে বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী এদিন ইতিহাস জানার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বাঙালির ইতিহাস আত্মত্যাগের উল্লেখ করে আগামী প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে জানার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থ সিরিজের দ্বিতীয় খ-ের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গোয়েন্দাগিরি করে জাতির জনকের বিরুদ্ধে যেসব রিপোর্ট দিয়েছিল, সেগুলোর ভিত্তিতে এই সিরিজ গ্রন্থ প্রকাশ করা হচ্ছে। আগে প্রথম খ- প্রকাশ করা হয়েছে। এবার এলো দ্বিতীয় খ-।
বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগকে সাহসের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো নেতার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া রিপোর্ট বই আকারে প্রকাশ করার নজির নেই। আমি জানি না পৃথিবীর কোথাও অতীতে কেউ এ ধরনের প্রকাশনা করেছে কি না। এসব দলিলে আপনারা অনেক তথ্য পাবেন। একজন নেতা কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, কী বললেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার কাছে লেখা চিঠি বা তিনি যেসব চিঠি লিখেছেন বা যোগাযোগ করেছেনÑ এসব বিষয় নিয়ে বই প্রকাশ করছি আমরা।
তিনি বলেন, এসব তথ্য ইতিহাস বিকৃতি থেকে মুক্তি দিতে পারে। সত্যকে উদ্ভাসিত করতে পারে। দুর্লভ দলিল উদ্ধারের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকারে আসার পরই আমি গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করি। একটি করে কপি আমার কাছে রেখে মূল দলিল এসবির কাছে পাঠিয়ে দিই। পরে আমি এবং আমার বান্ধবী বেবী মওদুদ দুজন দিনের পর দিন একসঙ্গে বসে পড়ি। তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। তখন আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করি যে, এগুলো অমূল্য সম্পদ। তিনি বলেন, এখানে ৪৬টি ফাইল ৪৮টি খ- ছিল। ২০০৯ সালে সরকারে আসার পর প্রকাশ করার পদক্ষেপ নিই। সিরিজের মোট ১৪ খ- প্রকাশিত হবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী এদিন গুরুত্বপূর্ণ দলিলের ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। জাতির পিতা যখন আইন বিভাগের ছাত্র সে-সময় এই আন্দোলন শুরু করেন। সদ্য প্রকাশিত বইতে তথ্য পাওয়া যায় যে, জাতির পিতা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তুলেন। তমদ্দুন মজলিস ছাত্রলীগ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন সকলকে নিয়ে একটি ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন শুরু করেন। ১১ মার্চ থেকে সে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়।
বই থেকে একটি প্রতিবেদন পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী, যেখানে বলা হয়Ñ শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ গোপালগঞ্জে হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এসএম একাডেমি এবং এমএন ইনস্টিটিউটে ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেøাগান ছিলÑ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। নাজিম উদ্দীন নিপাত যাক। মুজিবকে মুক্তি দাও। তিনি বলেন, অর্থাৎ আন্দোলনের শুরুতেই ১১ মার্চ শেখ মুজিবসহ অনেক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় জুুলুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে ছাত্র-ছাত্রীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় শেখ মুজিব, দবিরুল ইসলাম ও নাদিরা বেগম বক্তৃতা করেন। সভায় শেখ মুজিব বলেন, এক মাসের মধ্যে ছাত্রদের ন্যায্য দাবি পূরণ করা না হলে ছাত্ররা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নামবে। শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ১৯৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী। এই পাঠ থেকেও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সম্পর্কে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পরও আন্দোলন করতে হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান অনশন করে কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। এবং ৩০ মে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি পেশ করতে করাচিতে যান। সেখানে পেশ করা স্মারকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এভাবে ভাষা আন্দোলনে মুজিবের অজানা অধ্যায় সবার সামনে তুলে ধরেন তারই কন্যা। পরে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে নতুন অনুবাদ গ্রন্থ
বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে আরবি ভাষায় বইয়ের অনুবাদ ‘শেখ হাসিনা : যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়।’ মিসরের সাংবাদিক লেখক মোহসেন আল-আরিশি রচিত বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান
উদ্বোধনী মঞ্চে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ প্রদান করা হয়। এ বছর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে আফসান চৌধুরী, প্রবন্ধ ও গবেষণায় সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, কবিতায় কাজী রোজী, কথাসাহিত্যে মোহিত কামাল এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। প্রত্যেকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

দুই ভেন্যু বর্ধিত পরিসর
অমর একুশে গ্রন্থমেলা বইকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় আয়োজন। কালক্রমে আয়োজনটি বঙ্গ সংস্কৃতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সৃজনশীল সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই মেলায় অংশ নিয়েছে। বর্তমানে মেলার দুটি ভেন্যু। একটি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। অন্যটি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দুই অংশ মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট জায়গায় মেলা আয়োজন করা হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে স্থান পেয়েছে ১০৪টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আছে তারুণ্যের প্ল্যাটফর্ম লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। বয়ড়াতলায় ১৮০টি লিটলম্যাগকে ১৫৫টি স্টল দেওয়া হয়েছে। ২৫ স্টলে দুটি করে লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আর মূল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো থাকছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। চার চত্বরে বিন্যস্ত করা উদ্যানে ৩৯৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে। বাংলা একাডেমিসহ ২৪ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ২৪টি প্যাভিলিয়ন। সব মিলিয়ে মেলায় অংশ নিচ্ছে ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠান। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭৭০টি ইউনিট। একক ও ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থার বই পাওয়া যাবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। গ্রন্থমেলায় আগতরা ২৫ শতাংশ ছাড়ে বই কিনতে পারবেন। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকছে শিশুচত্বর। বন্ধের দিনগুলোতে রাখা হবে বিশেষ শিশুপ্রহরও।

লেখক বলছি
মেলার নির্বাচিত বই নিয়ে থাকছে নতুন আয়োজন ‘লেখক বলছি।’ এই মঞ্চে প্রতিদিন পাঁচজন লেখক তাদের বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হবেন। প্রত্যেক লেখক নিজের বই সম্পর্কে ২০ মিনিট বলার সুযোগ পাবেন। কিশোর লেখকদের উৎসাহিত করতেও থাকবে বিশেষ উদ্যোগ।

সেমিনার কবিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
২ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিশিষ্ট বাঙালি মনীষীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নতুন যোগ হয়েছে কবিতা। প্রতিদিনই থাকবে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ এবং আবৃত্তি। শিশু-কিশোরদের জন্যও থাকবে নানা আয়োজন। চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

Category:

মৃণাল সেন, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং শ্রমিকের শিল্পী

মাসুদ পথিক: মৃণাল সেন। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে কজন নির্মাতা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক হয়েছেন এবং নিজস্ব ভাষা ও স্বর তৈরি করতে পেরেছেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ নিজের বাড়িতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন মৃণাল সেন।
১৯২৩ সালের ১৪ মে মৃণাল সেন বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরের একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়াশোনার জন্য কলকাতায় আসেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও তিনি কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। চল্লিশের দশকে তিনি সমাজবাদী সংস্থা আইপিটিএ-র (ইন্ডিয়ান পিপ্লস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন) সঙ্গে যুক্ত হন এবং এর মাধ্যমে তিনি সমমনভাবাপন্ন মানুষের কাছাকাছি আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি একজন সাংবাদিক, একজন ওষুধ বিপণনকারী এবং চলচ্চিত্রে শব্দ কলাকুশলী হিসেবে কাজ করেন।
১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘রাতভোর’ মুক্তি পায়। এই ছবিটি বেশি সাফল্য পায়নি। তার দ্বিতীয় ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’ তাকে স্থানীয় পরিচিতি এনে দেয়। তার তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ থেকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। ১৯৬৯ সালে তার পরিচালিত ছবি ‘ভুবন সোম’ মুক্তি পায়। এই ছবিতে বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিটি অনেকের মতে মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি। তার কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭১), ‘ক্যালকাটা ৭১’ (১৯৭২) এবং ‘পদাতিক’ (১৯৭৩) ছবি ৩টির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন। মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন তার খুবই প্রশংসিত দুটি ছবি ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯) এবং ‘খারিজ’ (১৯৮২)-এর মাধ্যমে। ‘খারিজ’ ১৯৮৩ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮০ সালের চলচ্চিত্র ‘আকালের সন্ধানে’। এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল একটি চলচ্চিত্র কলাকুশলী দলের একটি গ্রামে গিয়ে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষের ওপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির কাহিনি। কীভাবে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের কাল্পনিক কাহিনি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে সেটাই ছিল এই চলচ্চিত্রের সারমর্ম। ‘আকালের সন্ধানে’ ১৯৮১ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার হিসেবে রুপোর ভালুক জয় করে। মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৯২) এবং ‘অন্তরীণ’ (১৯৯৪)। এখন অবধি তার শেষ ছবি ‘আমার ভুবন’ মুক্তি পায় ২০০২ সালে।
মৃণাল সেন বাংলা ভাষা ছাড়াও হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলেগু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ১৯৬৬ সালে ওড়িয়া ভাষায় নির্মাণ করেন ‘মাটির মনীষ’, যা কালীন্দিচরণ পাণিগ্রাহীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়। ১৯৬৯-এ বনফুলের কাহিনি অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় নির্মাণ করেন ‘ভুবন সোম’। ১৯৭৭ সালে প্রেম চন্দের গল্প অবলম্বনে তেলেগু ভাষায় নির্মাণ করেন ‘ওকা উরি কথা’। ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন জেনেসিস, যা হিন্দি, ফরাসি ও ইংরেজি ৩টি ভাষায় তৈরি হয়।
মৃণাল সেন পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলো প্রায় সবকটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব থেকে পুরস্কার জয় করেছে। ভারত এবং ভারতের বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অব দি ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮১ সালে তিনি ভারত সরকার দ্বারা পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন।
২০০৫ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান।
তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল অবধি ভারতীয় সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন।
ফরাসি সরকার তাকে কম্যান্ডার অব দি অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস (ঙৎফৎব ফবং অৎঃং বঃ ফবং খবঃঃৎবং) সম্মানে সম্মানিত করেন। এই সম্মান ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান।
২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তাকে অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ সম্মানে ভূষিত করেন।
সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেন এই ত্রয়ী ভিন্ন ভিন্ন পথের সন্ধান করলেও এই সারফেস এই সয়েলের একই মোহনায় মিলে গেছেন।
প্রান্তিক মানুষের প্রতিচ্ছবি, দর্শন ভিজুয়ালি উপস্থাপন করে মৃণাল সেন যে সিনেমা-ভাষা নির্মাণ করেছেন, তা তরুণ প্রজন্মের পাথেয়।

Category:

টুসির ‘মীনালাপ’ এবার জিতল ‘ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড’

11-6-2018 6-22-54 PM

তাজিকিস্তানে অষ্টম ডিডোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

উত্তরণ ডেস্ক: কাজাখস্তানে ১৪তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গ্রান্ডপিক্স অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তির পর এবার তাজিকিস্তানেও অনুষ্ঠিত অষ্টম ডিডোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে বাংলাদেশি নির্মাতা সুবর্ণা সেঁজুতি টুসি’র স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মীনালাপ’। গত ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পাঁচ দিনব্যাপী তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশাম্বে-তে অনুষ্ঠিত অষ্টম ডিডোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০১৮ আসরের সমাপণী দিনে এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। পুরস্কারের Citation–এ এই পুরস্কার প্রদানের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, “For the cinematic reflection of the idea of humanism.”  ফিল্ম     এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া-র প্রযোজনায় চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা করেছেন সুবর্ণা সেঁজুতি টুসি।
11-6-2018 6-23-51 PMপরিচালক সুবর্ণা সেঁজুতি জানান, ২৮ মিনিট দৈর্ঘ্যরে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রটির গল্প গড়ে উঠেছে বাঙালি এক দম্পতিকে ঘিরে এবং আশায় আবর্তিত শহুরে নিঃসঙ্গ জীবনের মুহূর্তগুলো নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পুনে শহরে আসা গার্মেন্টসে কর্মরত একটি বাঙালি দম্পতির অনাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ-মুহূর্তগুলো চলচ্চিত্রটিতে উঠে এসেছে। ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পরিবারটি পুনে শহরে চলে যায়। সেখানে এক গার্মেন্ট কারখানায় এই দম্পতি কাজ নেয়। নতুন শহরে তাদের নতুন সংগ্রাম, নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন।
এর আগেও চলতি বছরের ৬ জুলাই কাজাখস্তানে অনুষ্ঠিত ১৪তম ইউরেশিয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগে গ্রান্ডপিক্স পুরস্কার অর্জন করে ‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রটি। যা ছিল প্রথম এই উপমহাদেশের কোনো নির্মাতার চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হওয়া।
‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণ করেছেন অর্চনা গাঙ্গরেকর। শব্দগ্রহণে স্বরূপ ভাত্রা, শিল্প নির্দেশনায় হিমাংশী পাটওয়াল এবং সম্পাদনায় ছিলেন ক্ষমা পাডলকর। চলচ্চিত্রটি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’র প্রযোজনায় নির্মিত। ‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিতাস দত্ত, প্রমিত দত্ত, বিবেক কুমার এবং দেভাস দীক্ষিত।
সুবর্ণা সেঁজুতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে টুসি নামেই বেশি পরিচিত। ছোটবেলা থেকে জড়িত ছিলেন মঞ্চ নাটকের সঙ্গে। সাংবাদিকতা করেছেন। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা আর গ্রন্থনার কাজ করেছেন। তিনি নাটক ও চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টও লিখেছেন। বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে। ভারতে পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে ফিল্ম ডিরেকশন ও স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেছেন। সুবর্ণা সেঁজুতি এর আগে আরও কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। ছবিগুলো হলোÑ জাদু মিয়া (২০১১), পারাপার (২০১৪) ও পুকুরপার (২০১৮)। তার নতুন ছবির নাম ‘মীনালাপ’।

Category:

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : আজীবন সম্মাননা পেলেন ববিতা ও ফারুক

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক : গত ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২০১৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠান। জমকালো আয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পদক তুলে দেওয়া হয়।
পুরস্কার অর্জনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে নাদের চৌধুরী পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’। সেরা গীতিকার, সেরা সুরকার ও সেরা সংগীত পরিচালকসহ ৪টি পুরস্কার জিতেছে এ ছবিটি। এবারের আসরে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নিয়েছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ও তৌকীর আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’। সেরা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ছবিটি সেরা কাহিনিকার ও সেরা খল-অভিনেতার পুরস্কারও জিতে নিয়েছে। এ আসরে গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’ চলচ্চিত্রও পেয়েছে ৩টি পুরস্কার।
একনজরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৬ : শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রÑ অজ্ঞাতনামা, শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রÑ ঘ্রাণ, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রÑ জন্মসাথী, শ্রেষ্ঠ পরিচালকÑ অমিতাভ রেজা চৌধুরী (আয়নাবাজি), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (প্রধান চরিত্র)Ñ চঞ্চল চৌধুরী (আয়নাবাজি), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (প্রধান চরিত্র)Ñ যৌথভাবে আফরোজা ইমরোজ তিশা (অস্তিত্ব) ও কুসুম শিকদার (শঙ্খচিল), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (পার্শ্ব চরিত্র)Ñ যৌথভাবে আলীরাজ (পুড়ে যায় মন) ও ফজলুর রহমান বাবু (মেয়েটি এখন কোথায় যাবে)। আর সব ছাপিয়ে এবার আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের সবার প্রিয় অভিনেত্রী ববিতা এবং অভিনেতা ফারুক।

Category:

জ্ঞানালোক পুরস্কার পেলেন অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ

Posted on by 0 comment

8-6-2018 7-22-34 PMমাসুদ পথিক: সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন বরাবরের মতো এবারও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘জ্ঞানালোক পুরস্কার’ প্রদান করেছে। গত ৩১ জুলাই বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘর সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
চিকিৎসাসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা রাখার জন্য ২০১৭ সালের ‘জ্ঞানালোক পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। এই পুরস্কার তুলে দিয়েছেন অনুষ্ঠানের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অধ্যাপক এ কে আজাদ খানকে ক্রেস্টসহ ১ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন সংগঠনের সভাপতি রাজনীতিবিদ ও কবি নূহ-উল-আলম লেনিন। এছাড়াও প্রধান অতিথি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অধ্যাপক এ কে আজাদ খানকে বিক্রমপুরের প্রতœত্ত্বাতিক খননের চিত্র উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত ডা. এ কে আজাদ খানের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন সহ-সম্পাদক আবু হানিফ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডা. রশিদী মাহবুব। মানপত্র পাঠ করেন নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান।
প্রধান অতিথি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার বক্তৃতায় বলেন, অধ্যাপক এ কে আজাদ খান নানা গুণ ও যোগ্যতার জন্য সমাদৃত। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও সৌজন্যপরায়ণ মানুষ। তার জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবতাবোধ ও দায়িত্ববোধ। বাংলাদেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসাসেবায় তিনি একজন পথিকৃৎ। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের সেবা করে গেছেন। আর এ কে আজাদ সেই কাজকে আরও বড় করে তুলেছেন।
অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, সম্মাননা পেয়ে গর্বিত মনে করছি। একজন ডাক্তার হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা করাই আমার একমাত্র কাজ। আমি সেটাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাকে যতটুকু সম্মানিত করা হয়েছে ততটুকুর যোগ্য আমি নই। তবে আমি যোগ্য হয়ে উঠতে চেষ্টা করে যাব। অনুষ্ঠানের শুরুতে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য এবং নজরুল ইসলামের গান পরিবেশন করেন বুলবুল মহলানবীশ। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন অধ্যাপক ঝর্ণা রহমান। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি রাজনীতিবিদ ও কবি নূহ-উল-আলম লেনিন।

Category:

সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা

Posted on by 0 comment

4-5-2018 7-25-46 PMইমদাদুল হক মিলন: আমার প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৯৭৩ সালে। সেই সময়কার দৈনিক পত্রিকা ‘পূর্বদেশ’-এর ছোটদের পাতা চাঁদের হাটে। লেখা ডাকে পাঠিয়েছিলাম। পরের সপ্তাহেই ছাপা হয়েছিল। তখনও পর্যন্ত জানি না ‘চাঁদের হাট’ পাতা কে সম্পাদনা করেন, ওই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কে? এরপর থেকে যখন নিয়মিত লিখতে শুরু করলাম, ধীরে ধীরে যাতায়াত শুরু হলো বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের কাছে। সেই সময়ে কয়েকজন সাহিত্য সম্পাদক লেখক-কবিদের খুবই সমীহের জায়গায় অবস্থান করছিলেন। যেমনÑ আহসান হাবীব, আবুল হাসনাত বা মাহমুদ আল জামান। আহসান হাবীব দৈনিক বাংলা-য় সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন। আর হাসনাত ভাই করতেন দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য পাতা। দুজনই কবি। হাসনাত ভাই কবিতা লিখতেন মাহমুদ আল জামান নামে। এখনও এই নামেই লেখেন। দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই। তিনি বিখ্যাত ছড়াকার এবং শিশু-কিশোর সংগঠন ‘কচি ও কাঁচা’র প্রতিষ্ঠাতা। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যতটা না খ্যাতিমান তার চেয়ে অনেক বেশি নাম ছিল তার কচি ও কাঁচার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। ইত্তেফাকের ছোটদের পাতাটির নাম ‘কচি ও কাঁচা’। তিনি সেই পাতাটিও সম্পাদনা করতেন। ‘জনপদ’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল। এই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক এখলাস উদ্দিন আহমেদ। ওই পত্রিকায় ছোটদের পাতাটিও তিনি সম্পাদনা করতেন। পুরান ঢাকার বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলে ঢোকার মুখে একটি পুরনো বাড়িতে ছিল অফিস। আমি তখন জগন্নাথ কলেজে পড়ি। আর দু-হাতে ছোটদের লেখা, বড়দের লেখাÑ যখন যা মনে আসছে লিখে যাচ্ছি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখলাস ভাই আমার সেই সব কাঁচা লেখা অতি যতেœ সম্পাদনা করে ছাপতেন। ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় বা কচি ও কাঁচা পাতায় দাদা ভাইয়ের হাত দিয়ে আমার কোনো লেখা কখনোই ছাপা হয়নি। বোধহয় শেষ দিকে, আটাত্তর-ঊনআশি সালে কোনো বিশেষ সংখ্যায় দাদা ভাই আমার একটা-দুটো লেখা চেয়ে নিয়ে ছাপিয়েছিলেন। ততদিনে লেখক হিসেবে আমার পায়ের তলার মাটি একটু একটু শক্ত হচ্ছিল। বাংলা একাডেমির পাক্ষিক পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ সম্পাদনা করতেন কবি রফিক আজাদ। আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবতজীবন’ ধারাবাহিকভাবে ছেপে তিনি আমাকে কথাসাহিত্যের জায়গায় অনেকটাই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কারণে পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক এবং লেখক-কবিদের কাছে আমার কিছুটা কদর হয়েছে। বোধহয় সেই কারণেই দাদা ভাই আমার লেখা চেয়েছিলেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বেশ অনেকগুলো বছর বাংলাদেশে তরুণ-কবিদের সবচাইতে আগ্রহের জায়গা ছিল দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতা। কবি আহসান হাবীব সম্পাদনা করেন। নতুন লেখকদের লেখা অতি যতেœ সম্পাদনা করে ছাপতেন। একটু সম্ভাবনা আছেÑ এমন নবীন লেখককে গুরুত্ব দিতেন। আর তখন এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল, আহসান হাবীবের পাতায় লেখা ছাপা হওয়া মানে লেখক বা কবি হিসেবে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠিত লেখক-কবিরাও সমীহ করতেনÑ ও আচ্ছা, তোমার লেখা তাহলে হাবীব ভাই ছেপেছেন। খুব ভালো। এই তো লেখক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলে।
সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কবি আহসান হাবীবের ছিল এই মর্যাদা। আমার একটিমাত্র লেখা তিনি ছেপেছিলেন মনে আছে। সেই লেখা কোথায় হারিয়ে গেছে, লেখার নামও আজ আর মনে নেই। তবে তিনি আমার অনেক লেখা ছাপার অনুপযুক্ত বলে ফেরত দিয়েছেন। একসময় খুব অভিমান হলো। ঠিক আছে, আর লেখাই দেব না হাবীব ভাইয়ের পাতায়। তার কাছে আর যেতামও না। মৃত্যুর বছরখানেক আগে দৈনিক বাংলা ভবনে একদিন দেখা হয়েছিল। তিনি স্নিগ্ধ মুখে বললেন, ‘তুমি তো আর লেখা দাও না। তোমার অভিমানটা আমি টের পাই।’ মাথা নিচু করে বলেছিলাম, ‘লিখব হাবীব ভাই।’ কিন্তু লেখা হয়নি। তার মৃত্যুর পর বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলাম দৈনিক বাংলায় সাহিত্য পাতায়। ‘কোন কাননের ফুল’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলাম। তখন পাতার সম্পাদক সালেহ চৌধুরী অথবা নাসির আহমেদ।
দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের মধ্যে আমাকে সবচাইতে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন সংবাদের হাসনাত ভাই। এই পত্রিকায় সাহিত্য পাতাটিও তখন খুবই উঁচু স্তরের। অসামান্য সব লেখা ছাপা হতো। এই পাতাটির জন্য সাহিত্যপ্রেমীরা সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করত। পাতাটি বেরোত বৃহস্পতিবার। আমার শিল্পী বন্ধু কাজী হাসান হাবিব পাতা মেকআপ করতেন, গল্প-কবিতায় ইলাস্ট্রেশনস করতেন। এও ছিল আরেক বাড়তি আকর্ষণ আমাদের। হাবিবের লেটারিং ছিল অসাধারণ। ইলাস্ট্রেশনস করতেন চোখে লেগে থাকার মতো। মঙ্গলবার বিকেলে সাহিত্য পাতায় মেকআপ ইত্যাদির কাজ করতেন হাবিব। আর আমরা চার বন্ধু গিয়ে বসে থাকতাম হাবিবের টেবিলের পাশে। গল্পকার সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ জুবায়ের, ফিরোজ সারোয়ার আর আমি। চা আর ডালপুরি খাওয়া চলছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক। হাবিব মাথা নিচু করে লেটারিং করছেন, ইলাস্ট্রেশনস করছেন। আমরা গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এক-দুবার হাসনাত ভাই এসে উঁকি দিয়ে গেলেন। তিনি গম্ভীর মানুষ। সহজে হাসেন না, কথাও বলেন নিম্নস্বরে। হাসনাত ভাইকে আমরা যেমন ভালোবাসি, গাম্ভীর্যের কারণে ভয়ও পাই কিছুটা। নিয়মিতই তিনি আমাদের লেখা ছাপছেন। লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন। সংবাদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ম্যাগাজিন সাইজের দুর্দান্ত একটি সংখ্যা প্রকাশ করলেন। একেবারেই তরুণ লেখকদের মধ্য থেকে আমার একটি গল্প ছাপলেন। গল্পের নাম ‘রাজা বদমাশ’। কত জ্বালা যে হাসনাত ভাইকে আমি জ্বালিয়েছি। লেখক হিসেবে আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, দুজন মানুষ ঠেলে ঠেলে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। একজন রফিক আজাদ, আরেকজন হাসনাত ভাই। এই দুজনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমা নেই।
স্বাধীনতার পর আমাদের সাহিত্যে শুরু হয়েছিল এক নতুন জোয়ার। একসঙ্গে অনেক তরুণ লিখতে শুরু করেছিলেন। লেখা প্রকাশের জায়গা ছিল কম। তিন-চারটি দৈনিক পত্রিকা, দু-একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটি-দুটি মাসিক পত্রিকা। কিন্তু প্রতিটি পত্রিকারই একটি মানের জায়গা ছিল। যারা সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তারা খুব মন দিয়ে নতুন লেখকদের লেখা পড়তেন। অতি যতেœ সম্পাদনা করতেন। অপছন্দের লেখা নির্দ্বিধায় ফেরত দিতেন। কারও মুখ চেয়ে লেখা ছাপাতেন না। অমুকের সঙ্গে আমার খাতির আছে বলে তার দুর্বল লেখাটি আমি ছেপে দেবÑ এই মনোভাব একজন সাহিত্য সম্পাদকেরও ছিল না। যে লেখক-কবির মধ্যে সম্ভাবনা দেখতেন তাদের ডাকতেন। লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতেন। লেখার দুর্বলতা ধরিয়ে দিতেন। একজন কবির কিংবা কথাসাহিত্যিকের সাহিত্যের পড়াশোনার জায়গাটি নিয়ে কথা বলতেন। এক লেখাই হয়তো লেখককে দিয়ে দু-তিনবার লেখাতেন। এ অবস্থাটি নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পত্রিকার সংখ্যা বাড়তে লাগল। শ্রদ্ধেয় সাহিত্য সম্পাদকরা বিদায় নিতে লাগলেন। নতুন নতুন মানুষ সাহিত্য সম্পাদক হলেন। একদিকে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা হলো অগণিত, অন্যদিকে লেখক তৈরি হওয়া কমতে লাগল। উচ্চমানের লেখা সব সময় কম লেখা হয়। কিন্তু শুদ্ধ সুন্দর পরিশীলিত ভাষায় চলনসই লেখার পরিমাণও বিস্ময়করভাবে কমে গেল। ফলে সাহিত্য পাতা ভরানো খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। এ অবস্থায় অনেক অলেখকেরও জায়গা হতে লাগল ভালো ভালো পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। আসলে, সাহিত্য সম্পাদকদেরও এ অবস্থায় কিছু করার নেই। সব দেখেশুনে রফিক আজাদ একবার বললেন, ‘এখন আর সাহিত্য সম্পাদক সেই অর্থে নেই। যারা পত্রিকার ওই পাতাটিতে কাজ করেন তারা অসহায়। তাদের বিশেষ কিছু করার নেই। তারা আসলে সম্পাদক না, তারা সংগ্রাহক। লেখা সংগ্রহ করে ছেপে যাচ্ছেন।’
এখনও আসলে এ অবস্থাই চলছে। ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকাটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের বাঁকবদল ঘটেছিল। আজকের বাংলাদেশে যে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় এই আঙ্গিক তৈরি করে দিয়েছে আজকের কাগজ। দৈনিক পত্রিকার ভেতরে সাপ্তাহিক কাগজের চরিত্র এবং বিষয়, পাক্ষিক এবং মাসিক কাগজের চরিত্র এবং বিষয় সন্নিবেশিত করে চলছে এখন দৈনিক পত্রিকাগুলো। ফলে সাপ্তাহিকের কদর বাংলাদেশে আর নেই, পাক্ষিক এবং মাসিকের কদরও নেই। দৈনিক পত্রিকা একাই ধারণ করে আছে বহু পত্রিকার চরিত্র। হয়তো এই অবস্থারও বদল ঘটবে। হয়তো সংবাদপত্র অচিরেই বাঁক নেবে নতুন আরেক দিকে। সংবাদ পরিবেশন ভঙ্গিমায়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতিতে ও সাহিত্যের পাতাগুলো ঢুকে যাবে নতুন ভাবনাচিন্তার জগতে। একটি আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা টের পাওয়া যাচ্ছে। নতুন চিন্তা-চেতনার উন্মেষ টের পাওয়া যাচ্ছে।
আমি যেহেতু সাহিত্য এবং সংবাদপত্র দু-জায়গারই লোক, দু-জায়গা থেকেই নতুন সম্ভাবনার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। আমাদের সংবাদপত্র ধীরে ধীরে নতুন স্তরে উন্নীত হচ্ছে, তার সঙ্গে সাহিত্যও চলছে নতুন স্তরের দিকে। নতুন মেধাবী লেখক-কবিরা এসে নতুন আঙ্গিকের সাহিত্য উপহার দেবেন, আর নতুন সাহিত্য সম্পাদকরা সেই সম্ভাবনায় রাখবেন তাদের মূল্যবান হাতের পরশ। সব মিলিয়ে আমাদের সংবাদপত্র এবং সাহিত্য আরও অনেক বড় জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে।

Category:

গৌরবে উৎসবে আনন্দে মুখর বিজয় দিবস

Posted on by 0 comment

45উত্তরণ প্রতিবেদন: গত ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই যেন চিত্রশিল্পীর রঙিলা ক্যানভাস হয়ে ওঠে শহর ঢাকা। নগরের চারপাশে দেখা গেছে বর্ণময়তার দৃশ্যকাব্য। নগরবাসী পথিকের সূত্র ধরে পথে পথে বয়ে গেছে আনন্দের ফল্গুধারা। আর এমন আনন্দের উপলক্ষ্য ছিল মহান বিজয় দিবস। সেই সুবাদে বাঙালির জাতিসত্তা প্রকাশের দিনটিতে দারুণ সরব ছিল নগরের সংস্কৃতি ভুবন। সেসব আয়োজনে স্মরণ করা হয়েছে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়া শহীদদের। ভালোবাসা জানানো হয়েছে পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠানো নতুন দেশের স্বপ্ন আঁকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। দিনভর উচ্চারিত হয়েছে জয় বাংলার গান আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। দিনটিতে যেন নতুন করে খোঁজা হয়েছে স্বাধীনতা শব্দটির তাৎপর্য। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসায় বর্ণিল হয়েছে ঢাকার পথ-প্রান্তরসহ নানা মঞ্চ কিংবা মিলনায়তন। আর এসব আয়োজনে বিশিষ্টজনদের আলোচনা, নৃত্য, গীত ও কবিতার ছন্দে, নাটকের সংলাপে কিংবা শিল্পীর মনন আশ্রিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে জাতির সূর্য-সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব
বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আট মঞ্চে সপ্তাহব্যাপী বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সে আয়োজনের অংশ হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘৭ মার্চ মুক্তি ও স্বাধীনতার ডাক বাংলার ঘরে ঘরে/৭ মার্চ সম্পদ আজ বিশ্ব-মানবের তরে’। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম ও রামেন্দু মজুমদার।
শোভাযাত্রা-পূর্ব বক্তৃতায় জোট নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু এখনও পরাধীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হইনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকেও মুক্ত হয়নি। অসম্পূর্ণ যে কাজগুলো আছে তা আমাদের পূর্ণ করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ করবে।
শোভাযাত্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন জোটভুক্ত শতাধিক সংগঠনে কয়েক হাজার সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ। সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত হয় শোভাযাত্রা। বিজয়ের আনন্দ ও চেতনা ছড়িয়ে দিতে নাটক, গান, আবৃত্তি ও নৃত্যাঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্টরা অংশ নেয় শোভাযাত্রায়। শোভাযাত্রা জুড়ে ছিল জাতীয় পতাকা ও একাত্তরের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পোস্টার। ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে ঐতিহাসিক ২৪টি বাণী সম্বলিত ফেস্টুন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এসে শেষ হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী উৎসবের শেষ দিন ছিল বিজয় দিবস। এদিন সকালে আগারগাঁওয়ের জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় কার্যক্রম। এরপর অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

শিল্পকলা একাডেমি
বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ছিল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক কামাল লোহানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ড. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সাংস্কৃতিক পর্বে প্রখ্যাত শিল্পীদের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা দেশের গান, নাচ ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এক ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে যেভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল ঠিক সেভাবেই প্রতীকী আত্মসমর্পণের আয়োজন করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা অবলম্বনে একটি নাটক পরিবেশন করে যশোরের একটি নাট্য দল। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা নতুন প্রজন্মের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন।

বাংলা একাডেমি
বিজয় দিবসের বিকেলে একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এতে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি, বিজয় ও বিজয়ের মহানায়ক শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন রামেন্দু মজুমদার, খুশী কবির ও নাদীম কাদির। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

শিশু একাডেমি
বিজয় দিবসের বিকেলে ‘আমার ভাবনায় ৭ মার্চ’ শীর্ষক শিশুদের আঁকা চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিশু একাডেমি। এ অনুষ্ঠানে শেখ রাসেল আর্ট গ্যালারি উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির চেয়ারম্যান কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন।
ছায়ানট
ছায়ানটের আয়োজনে বসেছিল দেশের গানের আসর। এর যৌথ আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সবাই জাতীয় পতাকার লাল-সবুজের পোশাকে রাঙিয়ে তুলেছিল। সবাই একসাথে গেয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। শিল্পীরা আসেন লাল শাড়ি আর পাঞ্জাবি গায়ে। দর্শকরা এসেছিলেন সবুজ শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে। বেলা পৌনে ৪টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, ছায়ানটের সভাপতি সন্জীদা খাতুন ও দীপ্ত টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছিল শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় দেশবরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী শিল্পীরা।

কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা
সেগুনবাগিচার কচি-কাঁচা মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কচি-কাঁচার মেলা। অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা শোনান স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। সভাপতিত্ব করেন মেলার ক্ষুদে সদস্য আদিবা কিবরিয়া।

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম সোসাইটি
১৫ ডিসেম্বর বিকেলে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম সোসাইটি। রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্টার অডিটোরিয়ামে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ফোরামের উপদেষ্টা মনজারে হাসিন মুরাদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, যখনই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করা হয়েছে তখনই সংস্কৃতিকর্মীরা সিনেমাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবাদ করেছে। পরে জাহিদুর রহিম অঞ্জন পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র মেঘমল্লার এবং তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মিত মুক্তির গান প্রদর্শিত হয়। বিজয় দিবসের দিনে দেখানো হয় ইয়াসমিন কবিরের স্বাধীনতা, নাসির উদ্দিন ইউসুফের গেরিলা এবং মানজারে হাসিন নির্মিত এখনও ’৭১।
বিজয়ের ৪৬ বছর উদযাপনে দিনটি রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গন ছিল আনন্দমুখর। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সাভারের স্মৃতিসৌধ অভিমুখে ছিল মানুষের স্রোত। শিশু-কিশোররা ছুটেছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। অনেকে ভিড় করেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। জাতীয় জাদুঘরের দ্বার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। নগরীর মঞ্চে মঞ্চে ছিল একাত্তরের প্রেরণা সঞ্চারী সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, নাচসহ নানা আয়োজন।

Ñ সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

Category:

তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩।

8-1-2017 9-11-18 PMতথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু: সেই মধুমতি পাড়ের স্বপ্নময় এক কিশোর থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠা। হয়ে ওঠা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন তো সিনেমার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয়। অথচ রাজনীতির এ মহানায়কের জীবনী নিয়ে আজও বাংলা ভাষায় কোনো পূর্ণাঙ্গ কাহিনিচিত্র নির্মিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নতির প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা এফডিসি’র প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার হাত ধরেই এফডিসি (ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেন। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয় নেতাকে নিয়ে চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। যেমনÑ মহাত্মা গান্ধী, লেনিন, চে-গুয়েভারা, আব্রাহাম লিংকনের মতো অনেককে নিয়ে বায়োপিক সিনেমা নির্মিত হয়েছে।
১৯৭১-এর আগে-পরে ছিল না এত টিভি চ্যানেল কিংবা উন্নত প্রযুক্তি। মোটের ওপর আশা ভরসা ছিল বিটিভি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা ভিডিওর মাধ্যমে যতটুকু দেখতে পাই তার সবটাই মূলত সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিংবা তার প্রাত্যহিক রাজনৈতিক কর্মকা-। তবে অল্প কিছু কাজ হয়েছে তাকে নিয়ে যেগুলোতে তার আদর্শ, অর্জন, স্বপ্ন ইত্যাদি ফুটে উঠেছে বেশ স্পষ্টভাবে।
রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল : বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩। চলে এলেন বাংলাদেশে। শুরু করলেন ডকুমেন্টারি নির্মাণের কাজ। অসাধারণ এ কর্মে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবন, তার প্রাত্যহিক কর্মকা-, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিবিধ বিষয়। প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক, যে সময় আমাদের মহান বিজয় দিবসের প্রথম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। সেই সাথে এ দিনটি অন্য একটি কারণে মহিমান্বিত। আর তা হলো, এদিন বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর করা হয়। শুরুর দিকে সেই নতুন সংবিধানের আলোকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের দুর্লভ মুহূর্ত ধারণ করা হয়েছে। এই ডকুমেন্টারিতে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের উপস্থিতি। প্রায় সকল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতির কারণে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমার ছোট ছেলে জন্মানোর পর থেকেই আমি বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছি। সে আমাকে তেমন একটা কাছে পায় নি। ফলে সে সবসময় আমাকে হারানোর ভয়ে থাকে, তাই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে।’ অবশ্য, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাত থেকে রাসেলের আর বাবাকে হারানোর ভয় নেই। সে বাবার সাথেই আছে সেই সময় থেকে। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নাস্তা শেষ করে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা, সংবিধান কার্যকর উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মানে পার্টিতে যোগদান এবং বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ফুটেজ সংযোজিত হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। সেই সাথে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় যেমনÑ ১৯৭১-এ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানি আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ, নতুন প্রণীত সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির জনক’ উপাধি, বাঙালি জাতির গর্বের বিষয়Ñ এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এ মহান ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি গ্রামেই থাকবেন তার ছেলে ও নাতি-নাতনী নিয়ে, ঢাকায় আসবেন না। একদম শেষ অংশে ধারাভাষ্যকার সংশয় প্রকাশ করেন, তার বাবার এই স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না। কারণ এই ব্যক্তি তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এ দেশের জন্য।
বাংলাদেশ! : ১৯৭২ সালে আরেকটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ!’ যেটি প্রযোজনা করেছিলেন এবিসি টিভি। এটি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত হয়। এখানে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ায় দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা দেন তার প্রথম লক্ষ্য এ দেশের মানুষের অন্ন সংস্থান করা, তাদের ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যুদ্ধকালীন বিজয় লাভের সন্ধিক্ষণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানকে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। একই সাথে তিনি অন্য দেশের সাথেও সম্পর্ক স্থাপনের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেনÑ তার লক্ষ্য জোটনিরপেক্ষ, স্বাধীন, পররাষ্ট্রনীতি। মার্কিন সাংবাদিক হাওয়ার্ড টাকনার এবং পিটার জেনিংসের সাথে সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তার এসব পরিকল্পনার কথা। এই প্রামাণ্যচিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা।
ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ : কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট যুদ্ধের ঠিক পরপর ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যা ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের মুহূর্ত, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা, বিচার প্রক্রিয়া, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণসহ যাবতীয় বর্বরতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বেশ ভালোভাবেই। একই সাথে তার রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য কারাগারবাস, রাজনৈতিক আদর্শ, বিশ্বনেতাদের প্রসঙ্গ যাদের তিনি অনুপ্রেরণার উৎস মানেন, সেসব বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারেই প্রথম বঙ্গবন্ধু জানান যে, বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ। তিনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াতে আহ্বান জানান এ আলাপচারিতায়।
দ্য স্পিচ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং এর বিশ্লেষণ নিয়ে আরেকটি তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য স্পিচ’। পরিচালনায় ছিলেন ফখরুল আরেফিন। এই ভাষণ বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময়। কারণ এর মাধ্যমেই স্বাধীনতাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে সামরিক শাসন জারি ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি জাতির উদ্দেশ্যে এমন বিস্তৃত খোলামেলা ভাষণ দেওয়া দুরূহ ব্যাপার। আরও দুঃসাধ্য সেটি ভিডিও করা এবং যুদ্ধদিনে সংরক্ষণ। ‘দ্য স্পিচ’ প্রামাণ্যচিত্রে সেই ইতিহাসটা তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রামাণ্যচিত্রে আমরা জানতে পারি কীভাবে শুরু হলো ভাষণ ভিডিও করার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং কঠোর গোপনীয়তায় সংরক্ষণ, যা পরবর্তীতে আমাদের ইতিহাসভিত্তিক উপাদানে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করেছে। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়েছে তাদের ঐ সময়কার কর্মকা- সম্পর্কে জানতে। যেমনÑ মূল পরিকল্পনাকারী তৎকালীন এমএনএ (মেম্বার অফ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) আবুল খায়ের, ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম)-এর ক্যামেরাম্যান আবুল খায়ের এবং এমএ মোবিন।
তা ছাড়া আবদুুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’, তারেক মাসুদের গান, বিশ্বজিৎ সাহার ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ প্রসংশিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির কারণে এবং ভালো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ১৫ আগস্টের নির্মমতার ওপর কোনো সম্পূর্ণ সিনেমা নির্মিত হয়নি, যা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এখন বোধকরি সময় এসেছে ‘বঙ্গবন্ধু ও তার শহীদ পরিবার’-এর ওপর উন্নতমানের তথ্যচিত্র ও পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের। আশা করি তা আমরা অচিরেই দেখতে পাব।

Category: