Blog Archives

প্রবাসে একাত্তরে

19পূরবী বসু : মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাতেই আমরা দেশের বাইরে ছিলাম। ছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে। পঁচিশে মার্চের কালরাতে ও ছাব্বিশে মার্চের ভোরবেলার বাংলাদেশের গণহত্যার কথা বিশ্বের খবরের কাগজের মাধ্যমে পৃথিবীজুড়ে লোকের প্রথম চোখে পড়ার আগেই আমরা তা জানতে পেরেছিলাম। বড় অদ্ভুতভাবে। জ্যোতি (গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত) ও আমি দুজনেই তখন ¯œাতকোত্তর ছাত্রছাত্রী। মাস্টার্স করছি ফিলাডেলফিয়ার দুই ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
১৯৭১ সাল। মার্কিন দেশের ফিলাডেলফিয়া শহর। এ সেই শহর যেখানে তখন থেকে দু’শ বছর আগে ইংরেজদের কাছ থেকে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার প্রতীক হিসেবে এক পাশে ফেটে যাওয়া ধাতু দিয়ে তৈরি ঐতিহাসিক ‘লিবার্টি বেল’ এই শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত দর্শনীয় বস্তু। লিবার্টি বেলকে কেন্দ্র করে আজকের ফিলাডেলফিয়া শহরে বিরাট জায়গাজুড়ে যে বিশাল স্থাপনা ও দর্শনীয় এলাকা গড়ে উঠেছে, ১৯৭১ সালে তেমন ছিল না। খোলা জায়গায় কাচ দিয়ে ঢাকা একটি বিশাল পাত্রে রাখা ছিল তখন লিবার্টি বেলটি। এটি দেখতে যেতে গাড়ি পার্ক করারও দরকার পড়ত না তখন। আজকের ফিলাডেলফিয়ায় লিবার্টি বেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল এক কেন্দ্র, লিবার্টি পার্ক বলে সামগ্রিকভাবে লোকে যে স্থানটিকে শনাক্ত করে। অনেক স্থাপনা, পার্ক, গাছপালা, বিশাল এক অঞ্চল। জনসাধারণের জন্য লাইন ধরে অনেক নিরাপত্তার ভেতর সংরক্ষিতও ‘লিবার্টি বেল’ দেখার ব্যবস্থা। লিবার্টি বেল ও আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আলোকচিত্র মিউজিয়ামের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো। রয়েছে জনসাধারণের অবগতির জন্য নির্মিত লিবার্টি বেল ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। প্রতিদিন শত শত দর্শক আসেন এখানে লিবার্টি বেল দেখতে। আমাদের নিজেদের দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমরা আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের সূতিকাগৃহে অবস্থান করেছিলাম, এটাও একটা অদ্ভুত যোগাযোগ।
মার্চের শেষ। শীত তখনও কমেনি উত্তর-পূর্ব আমেরিকার এই পুরনো শহরে। তবু এরই মাঝে কিছু কিছু ন্যাড়া গাছে সবে ছোট ছোট ফুলের কুড়ি দেখা দিতে শুরু করেছে।
খুব ভোরে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে গিয়ে প্রতিদিনের মতো সেদিনও টেলিপ্রিন্টার চালিয়ে দিয়েছিল জ্যোতি। গ্রাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে মাসে আড়াইশ ডলারের একটা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পেতো সে, 21যার বিনিময়ে সামান্য পড়ার দায়িত্ব ছাড়াও ছাত্রদের হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শেখানোর জন্য টেলিপ্রিন্টার থেকে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা থেকে পাঠানো উল্লেখযোগ্য সংবাদ সংগ্রহ করা জ্যোতির অন্যতম দৈনিক দায়িত্ব ছিল। জ্যোতির সেই অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের মাসিক আড়াইশ টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলত। তাই দিয়েই ছোট্ট একটি ফারনিসড বাসা ভাড়া (মাসে পঁচাত্তর ডলার), কাঁচাবাজার-সদাই করা, বাস-সাবওয়ে-ট্রলি করে যাতায়াতের খরচ সবই করতে হতো। আমাদের দুজনেরই অবশ্য টিউশন-ফ্রি স্কলারশিপ ছিল। টিউশন দিয়ে পড়ার সামর্থ্য আমাদের হতো না।
কম্পিউটারের যুগ সেটা ছিল না। খবর আসত বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার উৎস থেকে টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমেই। বিশেষ উল্লেখযোগ্য খবর এলে টেলিপ্রিন্টার থেকে ঘণ্টার সংকেতে অ্যালার্ম বেজে উঠত। অন্যসব দিনের মতো সেদিন ভোরেও জ্যোতি অফিসে এসে টেলিপ্রিন্টার চালিয়ে দিয়ে ক্লাসের অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। টেলিপ্রিন্টারের কাছাকাছি বসেই সে কাজ করছিল। হঠাৎ টেলিপ্রিন্টারে অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে খবর আসতে শুরু করল পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় বার্তা সংস্থা থেকে। টেলিপ্রিন্টার থেকে একটানা অ্যালার্মের শব্দ শুনে জ্যোতি যখন ছুটে এসে দাঁড়াল টেলিপ্রিন্টারের সামনে, তখনও সে জানে না, তার আগ্রহী, কৌতূহলী চোখের সামনে কী শব্দসমূহ ভেসে উঠবে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে জ্যোতি দেখল একের পর এক ভেসে উঠছে তার নিজের মাতৃভূমিতে পাকিস্তানি সৈন্যের পৈশাচিক গণহত্যার সংবাদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হতে বেশ খানিকক্ষণ বাকি তখনও। আশপাশে কেউ তখন পর্যন্ত আসেনি। সাংবাদিকতার ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ছাত্রদের জন্য প্রতিদিনের মতো টেলিপ্রিন্টার থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে এসে আজ ভোরে জ্যোতি হিমশীতল, স্থবির। কোনোমতে টেলিফোনে খবরটা জানায় আমাকে। বলে, অন্য বাঙালিদের জানাতে। সে নিজেও কয়েকজন বাঙালি বন্ধুদের ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে দুঃসংবাদটি জানায়। খবর শুনে আমি তো স্তম্ভিত। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। এরই মধ্যে শহরের জানাশোনা দেশবাসীদের (অধিকাংশই ছাত্র), তাৎক্ষণিভাবে যাদের কথা মনে পড়ল, একের পর এক ফোন করে জানাতে শুরু করলাম। আমাদের বলার আগে তারা কেউ জানতেন না কী ঘটে গেছে দেশে গতরাতে। দুঃসংবাদটি গণমাধ্যমে তখনও আসেনি।
একাত্তরে, সেইকালে, যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন উন্নত ছিল না, বলাই বাহুল্য। কম্পিউটার প্রযুক্তি চালু হওয়ার আগের যুগের কথা সেটা। তখনকার দিনে পারস্পরিক যোগযোগের মাধ্যম ছিল খুবই সীমিত। ই-মেইল, ফেসবুক, টুইটার দূরে থাক (সেইসব প্রযুক্তির তো জন্মই হয়নি তখনও), টেলিফোন যার আবিষ্কার আরও অনেক আগেই, তার ব্যবহারও আমাদের সাধ্যের ভেতর ছিল না। বিশেষ করে আমাদের মতো ছাত্রদের জন্য। সবচেয়ে বড় কথা সরাসরি ডায়ালের তো প্রশ্নই আসে না তখন। ওরকম কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। অপারেটরের মাধ্যমে ফোন বুক করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফোনের সামনে হা-পিত্যেস বসে অপেক্ষা করতে হতো, যদি লাইন মেলে। যদি মেলেও, সেদিনই যে মিলবে তারও নিশ্চয়তা ছিল না। কখন পাওয়া যাবে বলতে পারা যেত না। সবচেয়ে বড় কথা খুব খরচসাপেক্ষ ব্যাপার ছিল টেলিফোন। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে চিঠিপত্রেই যোগাযোগ হতো তখন। শুধু দেশের লোকজনের সাথেই নয়, আমেরিকার ভেতরের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও। দেশে ফোন করার মতো ব্যয়সাপেক্ষ না হলেও আমেরিকার ভেতরেও লং ডিস্টেন্স ফোন যথেষ্ট ব্যয়বহুল ছিল আমাদের মতো বিদেশি ছাত্রদের কাছে। পোস্ট অফিস ছাড়া কালেভদ্রে, ইমার্জেন্সির জন্য ছিল টেলিগ্রাফের ব্যবস্থা।
ফলে সেই সময়, Telecommunications-এর তেমন উচ্চতর অবস্থান যখন ছিল না, কম্পিউটারের ব্যবহারের কথাও ভাবা যায়নি, সেই সময়, কাগজে সংবাদ আসার আগেই আমরা, ফিলাডেলফিয়ার বাঙালিরা দেশের ভয়ঙ্কর দুর্যোগের কথা কাকভোরে জেনে গেলাম জ্যোতির অফিসের টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে, এটা প্রায় অলৌকিক ঘটনার মতোই মনে হয়।
সেদিন বিকেলেই আমরা কয়েকজন একত্রিত হলাম। ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ও ছোট ছোট আকারে বিভিন্ন খবর আসতে শুরু করল বিভিন্ন জায়গা থেকে। সন্ধ্যায় আমরা যখন দেশের অবস্থা নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছি সেই সময়ের ভেতর সারাবিশ্ব জেনে গেছে মানবতার জঘন্য এই অপরাধ, মারাত্মক এই লঙ্ঘনের কথা। নিরপরাধ, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরোচিত এই ভয়ঙ্কর ও নির্মম আঘাতের কথা।
এরপর দুটো দিন কাটে প্রবাসী বাঙালিদের নানান জরুরি বৈঠকে, পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সকলের মনে দারুণ উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা, মনোকষ্ট। দেশে প্রিয়জনরা কেমন আছে প্রায় কেউ আমরা জানি না। অথচ তাৎক্ষণিক যোগাযোগের কোনো উপায় নেই।
দুদিন পর আমরা ফিলাডেলফিয়ার কয়েকজন (প্রায় সবাই ছাত্র-ছাত্রী), সুলতান আহমেদ, মমতাজ আহমেদ, সস্ত্রীক মোনায়েম চৌধুরী, নূরুল ইসলাম ভুইঞা, সুলতানা আলম, নাজমা আলম, জ্যোতি, আমি সহ আরও কেউ কেউ রওনা হলাম নিউইয়র্কের উদ্দেশে। সেখানে জাতিসংঘের সামনে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার প্রতিবাদ জানাতেÑ অন্যান্য শহরের বাঙালিদের সঙ্গে মিলিত হয়ে একত্রে। ফিলাডেলফিয়া শহর পেনসেলভেনিয়া স্টেটের অন্তর্গত। ফিলাডেলফিয়া থেকে নিউইয়র্ক শহরে যেতে গেলে নিউ জার্সি স্টেট পার হতে হয়। পথে নিউ জার্সিতে অনেক বছর ধরে এ অঞ্চলে বসবাসকারী ইঞ্জিনিয়ার মাজহারুল হক ও তার স্ত্রী ফরিদা হক (সম্প্রতি লোকান্তরিত; ফরিদা হোক দিলারা হাশেমের সহোদরা)-এর বাড়িতে থামলাম আমরা কিছুক্ষণের জন্য। বলে রাখা ভালো যে এই মাজহারুল হক-ই পরবর্তী ৯ মাস আমাদের এ অঞ্চলের (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডেলোয়ার ভ্যালি; ফিলাডেলফিয়া ও 25আশপাশের জায়গা, নিউ জার্সি এবং ডেলোয়ার স্টেটের বাঙালিদের নিয়ে যে সংগঠন তৈরি হয়েছিল পরে) বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হক দম্পতির কাছেই শুনলাম একটু আগেই তারা ভাসাভাসা খবর পেয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে তাদের ঘরের ভেতর ঢুকে মেরে এসেছে পাকবাহিনী। শুনে শিউরে উঠলাম। কিন্তু তখনও জানতাম না, কত বড় ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়ে গেছে আমাদের। নিহত শিক্ষকদের নাম জানা যায়নি তখনও, বললেন তারা।
জাতিসংঘের সামনে এক বিরাট জমায়েত হয়েছিল সেদিন। অনেক জায়গা থেকে বাংলাদেশের লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে একত্রিত হয়েছিলেন সেখানে। বহু পরিচিত-অপরিচিত মুখের সমাবেশ। মনে পড়ে, সেখানে অনেকের মধ্যে বক্তৃতা করেছিলেন তখন নিউইয়র্কে বসবাসকারী ডাক্তার খোন্দকার আলমগীর (প্রয়াত), ফরিদা মজিদ (নিউইয়র্ক ছেড়ে দেশে গিয়ে এখন ঢাকায় বাস করছেন) প্রমুখ। দেখা হয়েছিল সেখানে পূর্ব-পরিচিত আমেরিকায় পাকিস্তানের দূতাবাসে নিযুক্ত মাহমুদ আলী ও তার স্ত্রীর সঙ্গে। মাহমুদ আলীর ছোট ভাই দিনাজপুরের খোকা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। খোকার আমন্ত্রণে এবং নিমন্ত্রিত অতিথি আমার শ্বশুর ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবের সঙ্গে আমি মাত্র কয়েক বছর আগেই ঢাকায় মাহমুদ আলীর বিয়ের সংবর্ধনাতে গিয়েছিলাম। পাকিস্তানি নৃশংসতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সামনে বহু অঙ্গরাজ্য থেকে আসা বাংলাদেশিদের সেই প্রথম জমায়েত। যতদূর মনে পড়ে স্লোগান শেষে বক্তৃতার সময় একটা বিশাল বৃত্ত রচনা করা হয়েছিল, যার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে বক্তারা কথা বলছিলেন। আর অন্য সকলে বৃত্তের পরিধিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে বক্তৃতা শুনছিলেন। মাহমুদ আলীর স্ত্রী নিজের হাতে তৈরি করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন একগাদা বাংলাদেশের ছোট ছোট পতাকা। ঘুরে ঘুরে উপস্থিত বাঙালিদের হাতে তিনি তা তুলে দিচ্ছিলেন। তখনকার দিনের বাংলাদেশের পতাকায় গাঢ় সবুজের ভেতর লাল গোলাকারের কেন্দ্রে থাকত সোনালি রঙের বাংলাদেশের একটি মানচিত্র।
১৯৭১ সাল। তখন পর্যন্ত আমাদের দেশ থেকে ব্যাপক হারে আমেরিকায় অভিবাসন শুরু হয়নি। অধিক সংখ্যক বাঙালিদের আমেরিকা যাত্রার সূচনা হয় অন্তত আরও এক যুগ পরে। একাত্তরে বাংলাদেশের যারা ছিলেন আমেরিকায়, তারা মূলত ছাত্র, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, কিছু ডাক্তার (ডাক্তার ও ফার্মাসিস্টদের দলে দলে অভিবাসন শুরু হয় স্বাধীনতার পরে), গবেষক বা সেই গোত্রীয় কিছু পেশাজীবী লোক। সংখ্যায়ও খুব মুষ্টিমেয় ছিলেন তারা। উদাহরণস্বরূপ আমেরিকায় জনবসতির দিক থেকে চতুর্থ শহর ফিলাডেলফিয়ার তখন সকল বাংলাদেশি মানুষ, কেবল বাংলাদেশি কেন সকল বাঙালিই, একে অন্যের পরিচিত ছিলেন।
জাতিসংঘের সামনে সেদিন বক্তৃতা শুনতে শুনতে হঠাৎ লক্ষ্য করি, একটু দূরে দাঁড়ানো জ্যোতির সঙ্গে গভীরভাবে আলোচনায় মগ্ন ফারুকুল ইসলাম ও শচীদুলাল ধর। ওরা আমার কাছ থেকে এতটা দূরে যে ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু কিছুই আমার পক্ষে জানা বা শোনার উপায় ছিল না। তবু আমি ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ লক্ষ করি, কথা বলতে বলতে অতি আকস্মিক জ্যোতির মুখখানা এমন বিষণœ, এমন মলিন হয়ে গেল, ওর চোয়াল এমন করে ঝুলে পড়ল যে আমি কোনো কিছু না শুনতে পেয়েও এতটা দূরে দাঁড়িয়েই বুঝে গেলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল শিক্ষক নিজ গৃহে নিহত হয়েছেন, তার তালিকায় আমাদের পরম প্রিয় পিতৃসম ব্যক্তিটিও রয়েছেন। উল্লেখ্য, ঋষিসম দার্শনিক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব জ্যোতিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নিজের পুত্র বলে সাগ্রহে গ্রহণ করে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। মাত্র আট মাস আগে আমার বাবার মৃত্যুর সংবাদের মতোই আজ শ্বশুরের (ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব) মৃত্যু সংবাদও কাউকে মুখে উচ্চারণ করে বলে দিতে হয়নি আমাকে। দু-দুবারই অতি আকস্মিকভাবে জ্যোতির চোখ-মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন আমাকে আপনাআপনি জানিয়ে দিয়েছে আমাদের পরম ক্ষতিÑ চরম হারানোর বার্তা। আর তাই জ্যোতি আমার কাছে এসে যখন বলল, ‘চল, ফিলাডেলফিয়া ফিরে যাই। ভালো লাগছে না’, আমি কোনো প্রশ্ন না করে ওর সঙ্গে ঘরে ফিরে আসি।
আট মাস আগে, আমি এদেশে আসার ঠিক ছয় মাস পরে, অতি আকস্মিকভাবে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে, মুন্সিগঞ্জে, আমার বাবা মারা গেলে আমি প্রায় অর্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম। মূলত আমাকে একটু সুস্থ করার জন্য এবং সেই সঙ্গে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমার শ্বশুর ড. দেব গত অক্টোবরে আমাদের এখানে ফিলাডেলফিয়ায় এসেছিলেন। এই তো গত মাসে, মাত্র এক মাস আগে, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তিনি ফিলাডেলফিয়ার আমাদের বাসা থেকেই দেশে ফিরে গেলেন। দীর্ঘ পাঁচ মাস আমেরিকায় থেকে দেবতার মতো সৎ, অত্যন্ত ¯েœহবাৎসল খাঁটি দেশপ্রেমিক মানুষটি আমাকে পিতার মৃত্যু শোক সামলে উঠতে অনেক সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তারপরে ঘরে ফিরে একটা মাসও বাঁচতে পারলেন না, এটা কী করে সহ্য করা যায়? আমি মাত্র আট মাসের ব্যবধানে দু-দুবার পিতৃহীন হলাম।
এর পরের ৯টা মাস আমাদের কাটে শুধু শঙ্কা আর দুশ্চিন্তায় নয়, অতিরিক্ত ব্যস্ততার মধ্যেও। পড়াশোনা সিকায় ওঠে। ছাত্র-ভিসায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান। ফলে ছাত্রত্ব বজায় রাখতেই হয়। কিন্তু পড়াশোনায় আগ্রহের অভাবে পরীক্ষার ফল হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে মিছিল, সমাবেশ করি। আজ ওয়াশিংটন, কাল নিউইয়র্ক। ফিলাডেলফিয়াতেও ঘন ঘন মিটিং বসে। সকলে সাধ্যমতো মাসিক চাঁদা দিয়ে একটা জরুরি তহবিল গঠন করি। দেশে যারা ছিল তখন মৃত্যু ভয় ছিলÑ জীবনে নিরাপত্তার অভাব ছিল। আমাদের সেসব ছিল না ঠিকই। কিন্তু একার্থে আরও দুঃসহনীয় মনে হতো এ বসবাসÑ আমাদের এই অবস্থান। বিশেষ করে খারাপ লাগত যেহেতু প্রিয়জনরা সকলেই রয়ে গেছে ওখানে। প্রায় কিছুই জানতে পারছি না কী হচ্ছে সেখানে। অবাধ সংবাদ আদান-প্রদানের সুযোগ দিচ্ছে না পাকিস্তান সরকার, তার সামরিক বাহিনী।
পঁচিশ মার্চের কয়েকদিন আগে শেষ যোগাযোগ যখন হয় শ্বশুরের সঙ্গে, জানতে পেরেছিলাম, আমার ছোট ভাই দুলাল তখন ঢাকায়, আমার শ্বশুরের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলোয়, যেখানে তিনি পঁচিশে মার্চ রাতে, মানে প্রথম রাতেই খুন হন। আমরা তখনও জানি না, আমার ভাইটি বেঁচে আছে কিনা। অনেক পরে খবর পেয়েছিলাম, দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে শ্বশুর দুলালকে পঁচিশ তারিখের আগেই আমাদের বাড়িতে (মুন্সিগঞ্জ শহরে) চলে যেতে বলেছিলেন, এবং তিনি নিজেও দু’চার দিনের মধ্যেই সেখানে আসবেন কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ তার হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আমরা প্রায় প্রত্যেক বাঙালি ছাত্র এক একটি ছোটখাটো পোস্ট অফিসের কাজ করেছি। দেশ থেকে চিঠি আসত আমাদের ঠিকানায়। সেই চিঠি আমাদের পাঠিয়ে দিতে হতো দেশের সেইসব লোকদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে ভারতে। চিঠিগুলো পাঠাতে হতো বিভিন্ন রিফিউজি ক্যাম্প বা উদবাস্তু শিবিরে। কোনো কোনো চিঠি পাঠাতাম অন্য কারও কেয়ার অফে অথবা তাদের কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। মনে পড়ে দু’তিনবার খুব হৃদয়বিদারক সংবাদ দিয়ে পরিচিতদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে চিঠি দিতে হয়েছিল। মুন্সিগঞ্জ শহরের মোক্তার মন্মথ মুখার্জি (মনাবাবু বলে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন), আমাদের পাড়াতেই সপরিবারে বাস করতেন। সকলের চেনা, শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় একটি নাম। মনাবাবু। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রং, মেদহীন সুন্দর স্বাস্থ্য, অত্যন্ত সুপুরুষ। শুধু ভালো মোক্তার বলে নয়, ভালো সংগীতজ্ঞ, খেলোয়ার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি সবার কাছে ছিলেন সুপরিচিত। তার স্ত্রীর চিঠি অনুযায়ী মনাবাবুকে অন্যান্য আরও অনেকের সঙ্গে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে সামরিক বাহিনী এবং তাদের বাঙালি দোসররা। মনাবাবুরই ভয়াবহ মৃত্যুসংবাদ আমাদের জানাতে হয়েছিল তার বড় পুত্রের কাছে কলকাতায়। পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা মুন্সিগঞ্জের আরও অনেককেই ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তাদের মধ্যে আমাদের পাশের বাড়ির দাদু মোক্তার অনিল চাটার্জি ও বাগমামুদালির শিক্ষক সুরেশ ভট্টাচার্য ও তার পুত্র বাদলও ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে আমাদের বিভিন্ন চার্চ, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে আমাদের দেশের কথা বলা, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অমানবিক কাজকর্মের চিত্র তুলে ধরা। সেই সঙ্গে তাদের জানানো যে ট্যাক্সপেয়ারদের ডলার দিয়ে নিক্সন সরকার এই নির্যাতনকারী পাকিস্তানি সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকান সাধারণ জনসাধারণের রাজনীতিতে আগ্রহ কম, পরদেশি রাজনীতিতে তো নেইই। আর তাই সুযোগ পেলেই সহকর্মী, ছাত্র ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমরা কথা বলতাম। দেখতাম, এতদিন ধরে কোথাকার কোন সুদূরের বাংলাদেশ নামক জায়গায় কী হচ্ছে যা নিয়ে এতটুকু মাথা ঘামাত না তারা, আজ ভীষণভাবে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে সেই একই ব্যাপারে, যখন পরিচিত কারও বাস্তবিক অভিজ্ঞতার কথা শুনতে পায় তারা। সমস্যাটি তখন সত্যিকারের একটি সমস্যা হয়ে, মানবতার গুরুতর লঙ্ঘন হয়ে তাদের কাছে ধরা পড়ে। আমাদের উদ্দেশ্যও ছিল তাই। আমেরিকানদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো যাতে তারা তাদের সরকারকে পাকিস্তান সমর্থন ত্যাগ করতে বাধ্য করে।
কিছুদিনের ভেতরেই আমাদের কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন ফিলাডেলফিয়ার উপকণ্ঠের কোয়েকার সমাজ। কোয়েকার একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় সংস্থা যারা খ্রিস্টান ধর্ম থেকেই একটি ছোট অংশে বেরিয়ে এসে হিং¯্রতা ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে, এবং শান্তির পক্ষে অবস্থান নেন। অত্যন্ত নিরীহ, মানববাদী এই কোয়েকার সমাজ। তারা ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত অরাজনৈতিক। বাংলাদেশের যুদ্ধে আমরা দেশবাসীরা স্বাধীনতা লাভ করব কী করব না সেটা নিয়ে তদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সেটি আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সমস্যা যার উত্তরণ আমাদেরই ঘটাতে হবে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ জনগণের ওপর সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর এই অত্যাচার তারা মানতে পারেন নি, মানবিকতার লঙ্ঘন বলেÑ ভয়াবহ নিষ্ঠুর ও অন্যায় আচরণ বলে। ফলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তারা আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।
ওদের সঙ্গে বাল্টিমোর গিয়েছিলাম আমরা ফিলাডেলফিয়ার বাঙালিরা। বাল্টিমোর বন্দরে এসে হাজির হয়েছিলেন, ওয়াশিংটন, বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ডের অনেক বাঙালিও। যুদ্ধ সরঞ্জামবাহী পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করতে উদ্যত বিশাল জাহাজের প্রতীকী গতিরোধই বাল্টিমোরে যাওয়ার উদ্দেশ্য। আগেই খবর নিয়ে জানা গিয়েছে কবে কখন জাহাজটি বাল্টিমোরে ভিড়বে এবং সেখান থেকে কবে আবার ছাড়বে। আমেরিকার জনগণ যতই শান্তিপ্রিয় হোক, পাকিস্তানিদের বর্বরতার প্রতিবাদ করুক, নিক্সন সরকার ও পররাষ্ট্র সচিব কিসিঞ্জার বরাবরই পাকিস্তানের সমর্থক। আর তাই নিরপরাধ মানুষদের নির্বিচারে খুন করছে জেনেও পাকিস্তানের মিলিটারিদের জন্য আরও সরঞ্জাম পাঠাচ্ছেন নিক্সন সরকার।
কোয়েকার নেতা ডিক টেলর ও তার সঙ্গীরা নিক্সন সরকারের অবিবেচনা ও অমানবিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার উদ্দেশে গাড়ির ছাদে বেঁধে আনা ডিঙ্গি নৌকা, হাওয়া ঢুকিয়ে ফুলানো প্লাস্টিরের হালকা নৌকা করে যুদ্ধজাহাজ অবরোধ করতে বাল্টিমোর বন্দরের জলেÑ অর্থাৎ আটলান্টিকের বে’তে নেমে পড়েন। ওরা আমাদের বাঙালিদের কাউকে সঙ্গে যেতে দেন না তাদের এ অভিযানে। সমুদ্রের খুব কাছে পর্যন্ত যেতে দেন না। কেননা তাতে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। ধরা পড়লে সোজা দেশে পাঠিয়ে দেবে, যা মৃত্যুরই সমকক্ষ। বাঙালিরা ধরা পড়লে তাদের পাঠিয়ে দেবে এজন্য যে তখন প্রায় আমরা সকলেই সাময়িক ভিসায় পড়তে এসেছি, প্রায় কেউই এ দেশের নাগরিক নই। বাল্টিমোর বন্দরে দূর থেকে আমরা দেখি ওদের কর্মকা-। আর প্ল্যাকার্ডে বিভিন্ন স্লোগান হাতে আমরা তখন বৃত্তাকারে ঘুরে বেড়াই বাল্টিমোর বন্দরের পাশে মৌন মিছিল করে। অনেক সাংবাদিক এসেছিলেন সেদিন খবরের কাগজ, রেডিও ও টেলিভিশন থেকে। ডিক টেলর আমাদের বুঝিয়েছিলেন, তারা জাহাজ আটকানোর এই মিশনে গিয়ে যদি গ্রেফতার হতে পারেন, যদি কাগজে ফলাও করে সংবাদটা ছাপা হয়, যা পড়ে আমেরিকাবাসী জানবে তাদের সরকার বাঙালিদের হত্যা করতে পাকিস্তানে যুদ্ধ সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে। ডিক টেলর বলেন, তা হলেই আমাদের মিশন সার্থক হবে আজকে।
যেরকম ভাবা গিয়েছিল, সেরকমই ঘটল। বিশাল যুদ্ধজাহাজ পদ্মার চারপাশে ডিঙ্গি নৌকা চালিয়ে জলপথের নির্দিষ্ট সীমা লঙ্ঘন করায় ও যুদ্ধজাহাজের এত কাছে যাওয়ার অপরাধে কোয়েকারদের কয়েকজন গ্রেফতার হলেন। সঙ্গে সঙ্গে পরদিন বড় করে খবরে ছাপা হলো সেই সংবাদ। জনরোষও সৃষ্টি হলো যেমন ভাবা গিয়েছিল।
ডিক টেলর ও তার সহযোগীরা যেদিন গ্রেফতার হলেন, সেদিন বাল্টিমোরে একটি চার্চে আমাদের এই মিশনে আসা সবার দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গাঢ় মুসুরি ডালের ভেতর বহুরকম তরকারি ও শাক দিয়ে রাঁধা গরম গরম স্যুপ আর সেই সঙ্গে রোল রুটি অমৃতের জ্ঞানে ভক্ষণ করেছিলাম আমরা। আজও মুখে সেই স্বাদ টের পাই। ওরকম স্যুপ বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা আজও করে যাই মাঝে মাঝে। তবে সারাদিন ধরে রোদে দাঁড়িয়ে মিছিল করে আমরা সবাই অত্যন্ত ক্ষুধার্থ হয়ে পড়েছিলাম। চার্চের মুসুর ডালের স্যুপটি সেদিন এত সুস্বাদু লাগার সেটা অন্যতম কারণ ছিল কিনা বলতে পারব না আজ।
অনেক পরে ডিক টেলর তাদের সেই যুদ্ধজাহাজ অবরোধের কাহিনি ‘Blockade’ নামে একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন, যার বঙ্গানুবাদ ধারাবাহিকভাবে দৈনিক সংবাদে ছাপা হয়েছিল। স্বাধীনতার ২০ বছর পর ১৯৯১ সালে ফিলাডেলফিয়ায় বসবাসরত বাঙালিদের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডেলোয়ার ভ্যালি’র তরফ থেকে শহরের উপকণ্ঠে খ্যাতনামা কলেজ সোয়ার্থমোর-এর ক্যাম্পাসে বিশাল এক অনুষ্ঠান হয়। সেই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলে বসবাসকারী লোকদের অবদানের জন্য কয়েকজনকে সম্মাননা দেওয়া হয়। ডিক টেলর এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তার বক্তৃতা শুনে মনে হলো ২০ বছর পরেও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তিনি সমান আগ্রহী ও সহমর্মী। সেই অনুষ্ঠানে জ্যোতি আর আমাকেও আমাদের ভূমিকার জন্য সম্মানীত করা হয় এবং প্ল্যাক দেওয়া হয়। ডিক টেলরের ‘Blockade’ বইটি বাজারে আর পাওয়া যায় না কথাটি জ্যোতি ডিক টেলারকে বলায় অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি গিয়েই তিনি এক কপি ‘Blockade’ ডাকযোগে আমাদের বাসার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। বইটিতে প্রবাসে বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধের সময়ের অনেক তথ্য ও ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
একাত্তরে ওই সময় এত দূরে বসে দেশের সংবাদের জন্য কী উৎকণ্ঠায় দিন কাটত আমাদের তা বলে বোঝানো যাবে না। টেলিফোনের প্রতুলতা ছিল না, সরাসরি ডায়ালের ব্যবস্থা তো নয়ই। আর খরচের কথা তো আগেই বলেছি। ডাকের চিঠি, সংবাদপত্র, ব্রডব্যান্ড রেডিও ও টেলিভিশনই ছিল ভরসা। আমেরিকার মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসে সবচেয়ে বেশি খবর থাকত বাংলাদেশের। সিডনি শনবার্গ প্রথম দিন থেকেই বড় বড় সব প্রতিবেদন দিতেন নিউইয়র্ক টাইমসে। সেগুলো গোগ্রাসে পড়তাম আমরা। একবার লক্ষ করলাম, বাংলাদেশ বা মুক্তিযুদ্ধের ওপর বহুদিন তার কোনো খবর বেরুচ্ছে না নিউইয়র্ক টাইমসে। তখন সরাসরি তাকে চিঠি লিখে বসলাম। অভিমান করে জানতে চাইলাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়ায় মি. শনবার্গ কি আমার দেশ সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন? আমাকে অবাক করে দিয়ে শনবার্গ কিন্তু ডাকে আমার চিঠির জবাব ঠিকই দিলেন। জানালেন, মানে আশ্বস্ত করলেন আমাকে যে বাংলাদেশের ব্যাপারে তার আগ্রহ ও সহানুভূতি পুরোমাত্রায় রয়েছে। একটুও কমেনি। শুধু তার স্ত্রীর দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের কারণে এই সময়টায় তিনি স্ত্রীকে কিছুদিন সঙ্গ দিচ্ছেন। আর ছুটিতে থাকার কারণেই কিছুদিন বাংলাদেশের খবর দিতে পারেন নি তিনি। শনবার্গের কথার সত্যতা আমরা শিগগিরই টের পাই। কিছুদিনের ভেতরেই তিনি আবার নিয়মিত সংবাদ দিতে শুরু করেন, পাকিস্তানিদের পৈশাচিকতার আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিক অপারেশনের।
১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সিডনি শনবার্গের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হলো। নিউইয়র্কের বিখ্যাত ভারতীয় রেস্টুরেন্ট ‘দাওয়াত’-এ মধ্যাহ্ন ভোজে। মফিদুল হক অনূদিত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিউইয়র্ক টাইমসের শনবার্গ লিখিত সংবাদসমূহের বাংলা সংকলনটির একখানা কপি হাসান ফেরদৌস সেদিন তুলে দিয়েছিলেন শনবার্গের হাতে। সেই উপলক্ষেই এ মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন। হাসান ফেরদৌস, সিডনি শনবার্গ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত আর আমি। চারজনের জন্য হলেও আমরা একটি বড় টেবিলই দখল করি। শনবার্গ তখন আর নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে নেই। টাইমস ছেড়ে তিনি নিউইয়র্ক শহরের আরেকটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা দৈনিক নিউইয়র্ক নিউজ ডে-তে যোগ দিয়েছেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর সব গ্রাহক চলে যাওয়ার পরেও সেই দুপুরে দাওয়াত রেস্টুরেন্টে আমরা চারজনÑ হাসান, সিডনি শনবার্গ, জ্যোতি আর আমি অনেকক্ষণ বসে গল্প করেছিলাম। দুপুরে অনেক ভিড় ছিল এখানে। এখন একেবারে শান্ত, চুপচাপ। আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। আমাদেরও মধ্যাহ্ন ভোজের পর ইতোমধ্যে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কফি খেতে খেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছিলেন শনবার্গ। বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন তিনি। ঘুরে-ফিরে আসছিল বঙ্গবন্ধুর কথা। সিডনি শনবার্গের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ জানাশোনা ছিল। পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো যখন বঙ্গবন্ধু আসছেন, পথে দিল্লিতে থেমেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যখন তিনি হেঁটে সামনের দিকে যাচ্ছেন, পৃথিবীর সব নামকরা সাংবাদিকরা পথের দু’ধারে লাইন করে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই ভিড় থেকে বঙ্গবন্ধু সিডনি শনবার্গকে চিনতে পারেন এবং তার কাছে এসে তার সঙ্গে কোলাকুলি করেন। ছোট্ট দু’একটা কথার আদান-প্রদান ঘটে এরই মধ্যে। ঢাকাতেও স্বাধীনতার আগে-পরে বেশ কয়েকবার সিডনি শনবার্গের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখা হয়Ñ কথা হয়। সেসব সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কিছু কিছু রোমন্থন করতে করতে শনবার্গের চোখ ছলছল করে ওঠে। বেশ কয়েক বছর পরে কম্বোডিয়ায় শনবার্গের পরবর্তী এসাইনমেন্টে যাওয়ার সময় তার বিমানটি যখন পাকিস্তানের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, শনবার্গের গা শিউরে উঠছিল এটা ভেবে যে, এরকম একটি দেশের আকাশসীমার ভেতরে রয়েছেন তিনি। বিমানটি ভারতে ঢুকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন তিনি, যদিও তার অনেক আগেই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশের গৌরব অর্জন করে ফেলেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকে শনবার্গ উপমহাদেশের সবচেয়ে কলঙ্কময় ঘটনা বলে মনে করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্র থাকার কারণে অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমাদের করণীয় এবং করার ক্ষমতা ছিল অতি সীমিত। তবু সব সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের কাছে আমরা অনেকেই মাঝে মাঝে চিঠি লিখতাম। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের কথা লিখে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের জীবনের নিরাপত্তার অভাব এবং অনবরত খুন, জখম, ধর্ষণের শিকার হওয়ার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট-ভাইস প্রেসিডেন্টসহ সব সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের কাছে মিনতি জানাতাম যাতে তারা যেনÑ তাদের সরকার যেন এই ভুল ও নিষ্ঠুর পররাষ্ট্রনীতি পরিহার করেন। বেশ কিছু সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের অফিস থেকে উত্তরও এসেছে। যদিও জানতাম, এসব চিঠি তাদের সহযোগীরাই লিখেছেন। সিনেটর, কংগ্রেসম্যানদের সময় কোথায় প্রতিদিন ডাকে আসা এত শত চিঠি পড়ার? তবু এটা ভাবতে ভালো লেগেছে, আমরা অনেকে এরকম লিখলে তাদের সহযোগীরা অন্তত আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে তাদের কানে পৌঁছে দেবেন। সেটা ঘটেছিলও। সিনেটর কেনেডি, সিনেটর হামফ্রে, সিনেটর চার্চ, সিনেটর সেক্সবি, সিনেটর ম্যাকগভার্ন, সিনেটর মাস্কি খুবই মুখর ছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে। চার্চ-সেক্সবি বিল নামে একটি জনদরদি বিলও পাস হয়েছিল তখন। আমার কাছে লেখা সিনেটর হামফ্রের চিঠিতে একটি মন্তব্য ছিল যাতে প্রকাশ পেয়েছিল, সিনেট ও হাউসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা যতই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়ে থাকুক না কেন, এদেশে সংবিধানেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা রাখা হয়েছে অত্যধিক।
আমরা বাঙালিরা তখন আমেরিকায় যে যেখানে থাকতাম, সেখানকার স্থানীয় সংবাদপত্রে দেশের যা খবরাখবর পেতাম, তা পরস্পরের কাছে পাঠাতাম। ছোট ছোট অনেক নিউজ লেটারও বেরুত বিভিন্ন জায়গা থেকে, পরস্পরের কাছে সংবাদ বিতরণ করাই যার উদ্দেশ্য। মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে পাঠানোর জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য আমরা কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। মনে পড়ে তেমনি এক অনুষ্ঠানে পশ্চিম বাংলার বিজ্ঞানী ডক্টর নূরুল হক সরকারের সুশ্রী স্ত্রী রাবেয়া সরকার অনুপম নেচেছিলেন চেরী হিল, নিউ জার্সিতে। সরকার দম্পতি ছাড়াও পশ্চিম বাংলার কিছু বাঙালি যেমন ইউনিভার্সিটি অব পেন্সিলেভনিয়ার বিশ্বনাথ ঘোষ ও তার স্ত্রী, বাণী ও রণজিৎ চক্রবর্তী, সুনীল নিয়োগী প্রভূত সাহায্য করেন। এছাড়া ঘরে বানানো দেশি খাবার-দাবার, বাংলাদেশের পতাকা, বাংলাদেশের পতাকার রং দিয়ে তৈরি বোতাম, টাই ও পোস্টার বানিয়ে আমরা যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে সবাই মিলে একটা বড় টেবিল সাজিয়ে বসে পড়তাম। সংবাদ বিতরণ ছাড়াও ওইসব সুভেনিরের বিনিময়ে কিছু অর্থ সংগ্রহ করে তা দেশে বা কলকাতার মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে বা মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে পাঠানো হতো। একসময় আমাদের হাতে এলো আমাদের জাতীয় সংগীতের ও অংশুমান রায়ের প্রাণ ছোঁয়া ‘শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠে’ গান দুটির ৪৫ আরপিএম-এর বেশ কিছু রেকর্ড। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের জন্য এক সেট কেনা ছাড়াও সেই রেকর্ড দুটো বিক্রি করে কিছু অর্থ সংগ্রহ করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ তহবিলের জন্য। মনে পড়ে অংশুমান রায়ের গানের উলটো পাশে একই গান ইংরেজিতে রেকর্ড করা ছিল। আমরা আমাদের বিদেশি বন্ধু, প্রতিবেশী এবং সহকর্মীদের সে গান শুনিয়েছি। ওই সময় ওই গানগুলো আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। কী যে উদ্দীপিত হতাম, কী রকম রোমাঞ্চিত যে হতাম এবং স্বদেশ যে কী জিনিস সে সময় প্রতি মুহূর্তে তা টের পেয়েছি। আগেই বলেছি দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ভারতীয়ই ও আমেরিকান আমাদের দেশ ও জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। তারা বিভিন্নভাবে আমাদের সাহায্য করেছিলেন। এর মধ্যে প্রধান ছিল নিউইয়র্কের বিখ্যাত মেডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রবিশংকর ও বিটলের জর্জ হ্যারিসনের নেতৃত্বে তখনকার সময়ের সংগীত জগতের সকল সুপার স্টারদের নিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য ‘Concert for Bangladesh’-এর আয়োজন। ওটা সাফল্যম-িত করার জন্য আমরা চেনাজানা সব বিদেশিদের উৎসাহ দিয়েছি সেই কনসার্টে যাওয়ার জন্য, যদিও নিজেদের যাওয়ার সামর্থ্য হয়নি। অনেক বছর পরে ‘Concert for Bangladesh’-এর ওপর করা প্রামান্য চলচ্চিত্রটি দেখেছি ও লং প্লে রেকর্ডের সেট কিনে রেখেছি। মনে পড়ে সেই রেকর্ড সেটটি কিনেছিলাম এক রেকর্ডের ওখান থেকে মিজৌরি স্টেটে। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল সব রেকর্ড ৫০-৮০ শতাংশ কম দামে বিক্রি হবে কেবল ঈড়হপবৎঃ ভড়ৎ ইধহমষধফবংয ছাড়া, যেটির দামে নিয়মানুযায়ী কোনো অবস্থাতেই একটুও ডিসকাউন্ট দেওয়া যাবে না। এই অ্যালবাম, মুভি ও কনসার্টের যাবতীয় অর্থ মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য দান করা হয়েছে। Concert for Bangladesh একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আরেকটি Concert আজও হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের সেই ৯ মাসে দেশ থেকে অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন আমেরিকায়। কেউ কেউ স্বাধীনতার পক্ষে, কেউ কেউ ঘোর বিপক্ষে। তাদের অনেকেরই মতামত শোনার সুযোগ হয়েছে আমাদের। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি) বলেছিলেন একাত্তর শেষ হওয়ার আগেই স্বাধীনতা আসবে, এবং তা আসবেই। এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন বিএ সিদ্দিকী। খুব সম্ভবত তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই সাক্ষাৎটি ঘটেছিল নিউ জার্সিতে মাজহারুল হকের বাড়িতে। দেশে তখন প্রবল বর্ষা। স্বাধীনতার কোনো আভাস তখনও দেখতে পারছিলাম না আমরা। তবু সেদিন তার কথায় প্রচ- সান্ত¡না ও উৎসাহ পেয়েছিলাম। পরমাত্মীয়ের মতো তাকে ঘিরে সবাই বসেছিলাম আমরা। শুনছিলাম তার কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো। প্রশ্ন করছিলাম তাকে নানা বিষয়ে, যার যা মনে এসেছিল সেই সময়। একাত্তরের মধ্যেই স্বাধীনতা আসবে, তার সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয়েছিল বৈকি।
এভাবেই স্বাধীনতা অর্জনের আশায়, আনন্দে, স্বজন হারানোর দুঃখে-শোকে, পিছে ফেলে আসা প্রিয়জনদের নিরাপত্তার সংশয়ে কেটে গেছে ৯টি মাস। প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে উৎকণ্ঠায়, প্রতীক্ষায়Ñ আশায়, উত্তেজনায়। ইতোমধ্যে জ্যোতির কোর্স ওয়ার্ক ও মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষ। অ্যাসিসট্যান্টশিপও শেষ সেই সঙ্গে। অথচ এ অবস্থায় দেশে ফেরা অসম্ভব। কেমন করে খবরটা পৌঁছে গেল শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিস ডিপার্টমেন্টে। তখনকার দিনে ছাত্ররা পড়াশোনা শেষ করলে প্রাকটিক্যাল ট্রেনিংয়ের জন্য দেড় বছর কাজ করার অনুমতি পেতো ছাত্র ভিসায় এলে। এই দেড় বছর পরে ছাত্রদের যার যার দেশে ফিরে যেতে হতো, যদি না আমেরিকার স্থায়ী ভিসার জন্য ইতোমধ্যে দরখাস্ত করা না হয়। ফলে জ্যোতি এখন কিছু না করলে মার্কিন রাষ্ট্রে থাকার বৈধতা হারাবে। দুশ্চিন্তায় আমরা ক্ষতবিক্ষত। এমন দিনে হঠাৎ এক দুপুরে এক ফোন এলো বাসায়। জ্যোতি তখন ঘরে ছিল না। বাংলাদেশের ডিসপ্লেসড স্কলারদের পুনর্বাসনের জন্য যে গ্রুপটা তখন খুব সক্রিয় ছিল তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া-বিশেষজ্ঞ বিখ্যাত প-িত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডোয়ার্ড ডেমক ও তার সহকর্মীরাও ছিলেন। সেই দুপুরে টেলিফোন বাজলে আমিই রিসিভার তুলি। অন্য পাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ পরিষ্কার বাংলায় জানতে চায়, জ্যোতি ঘরে আছে কিনা। নেই জানালে এবং আমার পরিচয় দিলে, পুরুষ কণ্ঠ জানায়, জ্যোতি যদি বাংলা পড়াতে রাজি থাকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ মাসের একটি ফেলোশিপ দেওয়া যেতে পারে। ভদ্রলোকের নাম জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ক্লিন্ট সিলি’। এমন পরিষ্কার বাংলা-বলিয়ে লোকের এমন পরিচ্ছন্ন বিদেশি নাম শুনে আমি থতমত খেলে ক্লিন্ট (যে পরবর্তীকালে আমরা শিকাগো গেলে আমাদের একজন অতি নিকটবন্ধু হয়েছিল) হেসে বলল, ‘আমি মার্কিনী।’ বরিশালে বহু বছর কাটানো জীবনানন্দ-প্রেমিক, বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসের অনুবাদক এই মার্কিনী মানুষটির সহৃদয়তা ও আমন্ত্রণে মুক্তিযুদ্ধের শেষাংশে জ্যোতি গিয়েছিল শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ আমি ও জোতি তাই দুই জায়গায় যথাক্রমে ফিলাডেলফিয়া ও শিকাগো শহরে বসে, মহানন্দে কিন্তু এককভাবে বিজয় উৎসব-বিজয় দিবস পালন করি। নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস ছাড়া মোট জনসংখ্যার দিক থেকে এবং বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষির লোকজনের সংখ্যার দিক থেকে আমেরিকায় এ দুটো শহরেরই তখন সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থান।

Category:

সুস্থ হয়ে উঠছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ

48উত্তরণ ডেস্ক : কবি নির্মলেন্দু গুণ ভালো হয়ে উঠছেন। ধীরে ধীরে শুকাচ্ছে তার বাইপাস সার্জারির ক্ষতস্থান। চিকিৎসক কার্ডিওলজিস্ট ডা. লুৎফর রহমান জানান, তিনি স্বাভাবিক নিয়মেই সুস্থ হয়ে উঠছেন। কবির সাথে আলাপ করেই বোঝা গেল তিনি সুস্থতার পথে আছেন। কথা বলছেন স্বাভাবিক। গত ১২ তারিখ বিকেল ৪টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে প্রথম জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, তারপর ওইদিন ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৩ তারিখ তার বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয়। ২৬ তারিখ রাতে কবি নির্মলেন্দু গুণ বাসায় ফিরে যান। চিকিৎসক তাকে নিবিড় বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, তার চিকিৎসা খরচ ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করে। সরকারের পক্ষ থেকে ল্যাবএইড হাসপাতালকে ধন্যবাদপত্র প্রদান করা হয়।
লালনের তিরোধান দিবস পালিত
ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় কুষ্টিয়ায় পালিত হলো লালন তিরোধান দিবস। বাউল সম্রাট লালন ফকিরের ১২৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত চলে অন্যতম এই সাংস্কৃতিক উৎসব। শত বছরেরও আগে থেকে লালন শাহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রতিবছর অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে লালন তিরোধান দিবসটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে।
শত বছরের ধারাবাহিকতায় দিবসটি এখন শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের পুনর্মিলন ও বিনোদনের অফুরন্ত এক উৎসও বটে। উৎসব উপলক্ষে শহরের কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া এলাকায় প্রতিষ্ঠিত লালন কমপ্লেক্সে দেশের নানা প্রান্ত থেকে শত শত বাউলের পাশাপাশি হাজার হাজার ভক্ত জড়ো হন। এবার নিয়ে পরপর অষ্টমবারের মতো বাংলালিংক এই উৎসবের সহযোগিতা করে। পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজক ছিল লালন একাডেমি ও ডিসি অফিস কুষ্টিয়া। গত ২০ অক্টোবর খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুস সামাদ সমাপনী অনুষ্ঠানটি ঘোষণা করেন।
১৬ অক্টোবর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী। উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, লালনের ভক্ত হিসেবে আমি/আমরা এখানে এসেছি। লালনের গান, ভাবের টানে আমি/আমরা এখানে এসেছি। এখানে যে লাখ লাখ ভক্ত, অনুসারী আজ সমবেত হয়েছেন তারাও এখানে ছুটে এসেছেন লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনার টানেই। জীবন দর্শনকে জাগিয়ে তুলে লালনই পারে মানুষকে এক করতে। সেদিন আলোচনায় অংশ নেনÑ লালন গবেষক ও লেখক, আনোয়ারুল কবীর, কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মো. আমিরুল ইসলাম, কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন, জেলা পরিষদ প্রশাসক জাহিদ হোসেন জাফর, কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী, লালন মাজারের প্রধান খাদেম মোহাম্মদ আলী, কুমারখালী উপজেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাহেলা আক্তার প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন লালন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম হক।
কবি শামসুর রাহমান স্মরণ
গত ২৩ অক্টোবর আলোচনা, স্মৃতিচারণা, গানের সুরে, নৃত্যের ছন্দে ও কবিতার শিল্পিত উচ্চারণে উদযাপন করা হয়েছে কবি শামসুর রাহমানের ৮৬তম জন্মদিন। সেদিন বিকেলে কবিকে যৌথভাবে স্মরণ করে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ। আয়োজনের শুরুতেই ‘বিশ্বসাথে যুগে যুগে, যেইখানে তোমার নিবেদন’ রবীন্দ্রসংগীতের সুরে ছিল নৃত্যম নৃত্যগোষ্ঠীর নাচ। নৃত্যশিল্পী তামান্না রহমান নির্দেশিত এ পরিবেশনার পর শুরু হয় কবিকে নিয়ে আলোচনা। শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অলোচনা করেনÑ সাংবাদিক সালেহ আহমেদ, অধ্যাপক কায়সার হক, অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ। বক্তরা বলেন, শামসুর রাহমান আমাদের কাব্য-রুচি নির্মাণ করেছেন, আধুনিক কাব্য ভাষা নির্মাণ করেছে। তার প্রতিটি লেখায় এক একটি উক্তির মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলার রূপবৈচিত্র্যের কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আলোচনা শেষে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন লায়লা আফরোজ, রফিকুল ইসলাম, রেজীনা ওয়ালী লীনা, শাহাদাৎ হোসেন ও মাহিদুল ইসলাম। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মহিউজ্জামান চৌধুরী, সুজিত মোস্তফা, সুমা রানী রায়, রাজিয়া মুন্নী ও ঐশিকা নদী।

Category:

সুরে ও বাণীর মালায় নজরুল স্মরণ

63‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে’ মনে অপার দুঃখ নিয়ে গেয়েছিলেন কাজী নজরুল। তবে তার লেখা গান সত্যি হয়েছে। তাকে সত্যিই ভোলা যায় না। আমাদের সামাজিক ও জাতীয় জীবন আর অস্তিত্বে মিশে আছেন মহান পুরুষ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। গণমানুষের প্রিয় কবি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকীও হৃদয়ের উষ্ণতায় তাকে স্মরণ করল পুরো জাতি। নজরুলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী বৈচিত্র্যময় বাণী ও রাগ-রাগিণী সমৃদ্ধ সুর-ঐশ্বর্যের সম্মোহন আর অসাম্প্রদায়িক মানবতার বাণী উচ্চারণে মুখর ছিল প্রতিটি অনুষ্ঠান মঞ্চ। সাম্যবাদী ও দ্রোহী চেতনার ধারক বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২৭ আগস্ট বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার জীবনবোধ শিল্পীরা গানে, কবিতায় ফুটিয়ে তোলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ওইদিন ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠনসহ সর্বস্তরের হাজারও মানুষ। ভোর থেকে নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ‘মসজিদুল জামিয়া’তে ফজরের নামাজের পর কোরআনখানি অনুষ্ঠিত হয়। সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সমিতি ও ছাত্রছাত্রীরা কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও ‘নজরুল মঞ্চে’ আলোচনা করেন। কবি পরিবারের পক্ষ থেকে কবির নাতনি খিলখিল কাজীসহ অন্য সদস্যরা পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করেন। দিনভর অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল গান, নৃত্য পরিবেশনা, আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য মঞ্চায়ন, নজরুল বিষয়ক আলোচনা প্রভৃতি।
জাতীয় কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ। বিএনপির পক্ষে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে দলের নেতৃবৃন্দ। কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল আবৃত্তি পরিষদ, শিশু একাডেমি এবং ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন। নজরুল ইনস্টিটিউট সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, নজরুল পদক প্রদান, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির মহাপ্রয়াণ দিবস উদযাপন করেছে নজরুল ইনস্টিটিউট।
নজরুল চর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য খিলখিল কাজীকে ও নজরুল সাহিত্য অনুবাদের জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয় ড. নাশিদ কামালকে।

Category: