Blog Archives

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য এবং ভূ-রাজনৈতিক রণকৌশল

Posted on by 0 comment

PMবাংলাদেশের নৌবাহিনীতে ‘জয়যাত্রা’ ও ‘নবযাত্রা’ নামে দুটি ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিন যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে সাবমেরিনের মালিক ৪১টি দেশের অন্যতম। এর ফলে সামুদ্রিক জলসীমার প্রতিরক্ষায় আমাদের সামর্থ্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের রণকৌশলগত অবস্থান নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
সত্য বটে, ভৌগোলিক বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে খুব ছোট একটি দেশ। কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম ১০টি দেশের অন্যতম। দ্বিতীয়ত; এটা কেবল সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ক্ষুদ্র তবে তার অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিগত এবং সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা বর্তমান বিশ্ব সভ্যতার দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। তৃতীয়ত; বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্বের প্রধান প্রধান সামরিক শক্তিধর দেশগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থের সাথে জড়িত। ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের একটি মাত্র দিক উন্মুক্তÑ দক্ষিণ দিক। দক্ষিণে, আমাদের সমুদ্রসীমার বাইরে ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে যে অকথিত প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর।
ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। তেমনি চীনের সাথে আমাদের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক সর্বোপরি দক্ষিণে সমুদ্র পৌঁছানোর লক্ষ্যে চীনের কুনমিং থেকে সড়ক ও রেলপথে চট্টগ্রাম বন্দর তথা বাংলাদেশের সংযুক্তির যে বহুজাতিক প্রচেষ্টা এবং সম্ভাবনা রয়েছে, তার গুরুত্বও অপরিসীম। এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কে ইরান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের প্রস্তাবিত সংযুক্তি যেমন অর্থনৈতিক বিবেচনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করবে, তেমনি কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চীনের অর্থনীতির জন্য সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের ব্যাপারে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ইতোমধ্যেই উপ-আঞ্চলিক সমঝোতা রয়েছে।
বিকাশশীল দেশ হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতি এবং মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা এখন আর কল্পনা বা অনুমানের বিষয় নয়। মিয়ানমার ও ভারতের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ এক বিশাল সমুদ্র অঞ্চলের মালিকানা লাভ করেছে। এই সমুদ্রে যেমন রয়েছে বিপুল মৎস্যসম্পদ তেমনি সমুদ্রের তলদেশে অনাবিষ্কৃত বিপুল খনিজসম্পদ। এই সমুদ্রসম্পদের সংরক্ষণ এবং এর অর্থনৈতিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠবে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্লু-ইকোনমি। ব্লু-ইকোনমিÑ বর্তমান শতাব্দীর মধ্যভাগেই বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর সারিতে উঠে আসতে অসামান্য অবদান রাখবে।
উল্লিখিত সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বৃদ্ধি না করতে পারলে, সব সময়ই আমাদের এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
আর এই শান্তিটুকু নিশ্চিত করতে হলেও আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সামর্থ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাÑ ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ অতএব, আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর এবং বৃহৎ শক্তির বন্ধুত্ব যেমন চাই, তেমনি চাই পরস্পরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব। একটা কথা অত্যন্ত পরিষ্কার, বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তি নয়। কোনো আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারেরও নীতি নেই বাংলাদেশের। বরং আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রেখে সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থে আমরা প্রতিবেশী ভারত, চীন, মিয়ানমার এবং পাশ্চাত্যের যে কোনো দেশের সাথে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। আমরা আমাদের দেশের সীমান্তকে দুর্ভেদ্য শান্তির সীমান্ত হিসেবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে এটাও নিঃসন্দেহ যে, বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির দাবার ঘুঁটি হবে না এবং তাদের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ পূরণের হাতিয়ারে পরিণত হবে না।
আমাদের দেশের অন্ধ আওয়ামী লীগ-বিরোধী এবং পাকিস্তানের স্বার্থের নিশানবরদার কোনো কোনো শক্তি সরকারের এই প্রতিরক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। যখনই বাংলাদেশ সরকার ভারত ও চীনসহ কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তখনই ‘স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব’ বিপন্ন বলে চেঁচামেচি শুরু করে। এরা বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় বেশি আগ্রহী।
কাউকে আক্রমণ করা বা আধিপত্য স্থাপনের জন্য নয়; বাংলাদেশ তার নিজের ভূখ-, সমুদ্রসীমা এবং আকাশসীমা রক্ষার ন্যায্য অধিকার অবশ্যই সংরক্ষণ করবে। আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি হচ্ছে, যে কোনো মূল্যে আমরা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমর্থ হতে চাই। আমরা কাউকে আক্রমণ করব না। কিন্তু আমাদের কেউ আক্রমণ করলে তার সমুচিত জবাব যেন আমরা দিতে পারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে কথাটিই জোর দিয়ে বলেছেন।

Category:

একুশ এখন বিশ্বসভ্যতার আলোকবর্তিকা

00কথাটা উচ্চারণ করেছিলেন প্রয়াত মনীষী অধ্যাপক আবুল ফজল : ‘একুশ মানে মাথা নত না করা।’ অন্তর্ভেদী ও গূঢ় তাৎপর্যম-িত এই বাক্যটি এখন প্রবচনে পরিণত হয়েছে। বাক্যবন্ধটি হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের স্মারক।
১৯৪৮-এর পথ বেয়ে ১৯৫২-এর ভাষা সংগ্রাম। এই সংগ্রামের অন্যতম পথিকৃৎ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি ভাষার দাবিকে জাতিসত্তার আত্মপরিচয় এবং স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিণত করে। ধর্মভিত্তিক-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের কাঠামোয় এই দাবি আদায় না হওয়ার, ১৯৭১ সালে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের কবর রচনা করেই বাঙালি জাতি তার নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এভাবেই এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনÑ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় আমাদের জাতি-পরিচয়কে, মাতৃভাষার মর্যাদাকে এবং আমাদের স্বপ্ন-সাধনাকে নতুন ব্যঞ্জনা দান করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ প্রদান করে বাংলা ভাষার গৌরবকে বিশ্বজনীন করে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের উদ্যোগে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ায়, কেবল মহান একুশের দিনটিই নয়, বিশ্বের ছোট-বড় ৪ হাজার ভাষাভাষী মানুষের ‘মাতৃভাষা’ জগৎ-জনের জাতিসত্তাগত, ভাষাগত এবং দেশগত আত্মপরিচয়কে স্বকীয় মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘নানান দেশের নানান ভাষা।/বিনে স্বদেশীয় ভাষা,/পুরে কি আশা’Ñ বাঙালি কবির এই উপলব্ধি বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষের সর্বজনীন উপলব্ধিতে পরিণত হয়েছে। আমরা গর্বিত এ কারণে যে, এটি হচ্ছে বিশ্বসভ্যতায় আমাদেরÑ বাঙালি জাতির উজ্জ্বল অবদান।
একুশের শত্রু সাম্প্রদায়িকতা। একুশের প্রতিপক্ষ ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদ। একুশের চেতনা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার দ্যোতক। একুশ স্বাধীনতার কথা বলে। একুশ মুক্তির কথা বলে। একুশ একটি ভেদ-বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রেরণার অনন্ত উৎস। একুশ জাতি-বিদ্বেষ, ধর্ম-বিদ্বেষ, নারী-বিদ্বেষ, দেশ-বিদ্বেষ, সংস্কৃতি-বিদ্বেষ, গণতন্ত্র ও মানবিকতা-বিদ্বেষকে ‘না’ জানায়। একুশ আমাদেরকে দুঃশাসনের কাছে, দুর্বৃত্তায়নের কাছে এবং অমানবিকতার কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা দেয়। একুশ মানে ভালোবাসা : সকল মানুষের প্রতি, সকল ভাষার প্রতি, সকল দেশের প্রতি, প্রতিটি জাতিসত্তার প্রতি, প্রতিটি মানুষের মুক্তচিন্তার প্রতি। একুশ মানে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন। একুশ এখন মানবিক মর্যাদায় বাঁচতে শেখা। একুশ মানে বিশ্বসভ্যতার আলোকবর্তিকা।

Category:

শেখ হাসিনা সরকারের টানা ৮ বছর অব্যাহত সাফল্য অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা

Posted on by 0 comment

00জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জননেত্রী শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের তিন বছর পূর্ণ হবে। পরপর দুই মেয়াদ মিলে আট বছর পেরিয়ে নবম বর্ষে পা দেবে ‘মহাজোট’ সরকার। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের কোনো সরকারই টানা দুই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর নির্বাচিত সরকারের ধারার অবসান ঘটে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত কয়েক দফা সরকার পরিবর্তন হয়, মূলত বন্দুকের জোরে। ১৫ আগস্ট সংবিধান লঙ্ঘন করে খুনি মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে। ওই একই বছর নভেম্বরে জিয়ার নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর কুশীলবগণ বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে শপথ নেওয়ায়। ঠুঁটো জগন্নাথ বিচারপতি সায়েমকে তার মেয়াদ পূর্তির আগেই জিয়াউর রহমান গদিচ্যুত করে স্বনিয়োজিত রাষ্ট্রপতির শপথ নেন। একটা হাস্যকর গণভোট সাজিয়ে ৯৯.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জিয়া তার ক্ষমতাকে ‘বৈধতা’ দান করে। এরপর ১৯৭৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে জিয়া ‘নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির’ মুখোশ পরে। ১৯৮১ সালে জিয়াকে তার অনুগত সেনারাই চট্টগ্রামে হত্যা করে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। তিন মাসের মাথায় সাজানো নির্বাচনে সাত্তার সাহেবকে বিজয়ী ঘোষণা করার কয়েক মাসের মধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদ সাত্তারকে আউট করে দেয়। এরশাদ প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হলেও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অর্পণ করেন বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের প্রধান হলেও বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন জেনারেল এরশাদের হাতের পুতুল। অতঃপর এরশাদও তার পূর্বসূরি জিয়ার মতো আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিজেকে যুগপৎ ‘রাষ্ট্রপতি’ ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। জিয়ার পথ অনুসরণ করে এরশাদ প্রথমে গণভোট এবং পরে একতরফা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে ‘বিপুল ভোটে’ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়। জিয়ার মতো সেনা ছাউনিতে বসে একই কায়দায় ‘জাগো দল’ এবং জাতীয় পার্টি গঠন করে।
বাংলাদেশে এরশাদই একটানা দীর্ঘদিনÑ প্রায় ৯ বছর বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে থাকতে সক্ষম হয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ স্বৈরাচারের পতন হয়।
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে জিততে দেওয়া হয় না। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। তিন জোটের রূপরেখার অঙ্গীকারের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রবল চাপের মুখে সংবিধান সংশোধন করে দেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন।
সংসদীয় ব্যবস্থায় খালেদা জিয়ার প্রথম সরকার মেয়াদ পূর্ণ করলেও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো দল ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের কু-দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত গণ-আন্দোলনের মুখে খালেদা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেও অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পদত্যাগের আগে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজিত করে সংসদ ভেঙে দেন।
১৯৯৬ সালে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। দীর্ঘ ২১ বছর পর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনার সরকার তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে। ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় নীল নকশার কারচুপির নির্বাচন। আওয়ামী লীগের অনিবার্য বিজয় ছিনতাই হয়ে যায়। সরকার গঠন করে বিএনপি-জামাত জোট। বিএনপি-জামাত জোটের দুঃশাসনে দেশ পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা না থাকায় অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা না থাকায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়। দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। সেনা সমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই সরকার দুবছর দেশ শাসন, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করেÑ বস্তুত এই ভীতির রাজত্ব কায়েম করে। নানা চক্রান্ত চলে। তবে সব চক্রান্ত ব্যর্থ হলে ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করে। বিএনপি পায় মাত্র ৩৩টি আসন। সাফল্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার পাঁচ বছর পূর্ণমেয়াদে দেশ পরিচালনা করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নানা অজুহাতে বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে এবং নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। কিন্তু তারা নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। মহাজোট পুনরায় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ২০১৪ সালে গঠিত সরকারের রয়েছে বিপুল সাফল্য ও অর্জন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় ব্যবস্থায় এবারই কোনো দল পরপর দ্বিতীয় দফা মিলে টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকার নজির স্থাপন করেছে।
অতিক্রান্ত এই আট বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নতির নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এ বিষয়ে চলতি সংখ্যায় বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত পরিবেশিত হয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে টানা আট বছর সরকার পরিচালনার ভেতর দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে নজির স্থাপন করেছেন, তা এখন বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মডেল। নবম বর্ষে পদার্পণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দেশবাসী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে শেখ হাসিনার তৃতীয়বারের এই সরকারও তার মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে কেবল আত্মপ্রকাশই করবে না, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষিত লক্ষ্যের দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাবে। আমরা বর্তমান সরকারের তিন বছর পূর্তি এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার টানা আট বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার অত্যন্ত সাফল্যের সাথে পালন করায় অভিনন্দন জানাচ্ছি।

Category:

সপ্তম বর্ষে ‘উত্তরণ’

02বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মাসিক মুখপত্র ‘উত্তরণ’ প্রকাশনার সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করলো। আমাদের জানামতে, আওয়ামী লীগের সংগ্রামমুখর ও গৌরবোজ্জ্বল ৬৭ বছরের ইতিহাসে উত্তরণ-ই একমাত্র দলীয় মুখপত্র যে বিরতিহীনভাবে ৬ বছর প্রকাশিত হয়ে সপ্তম বর্ষে পা রাখলো। নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগের অগণিত নেতা-কর্মী-সমর্থকের জন্য এটা একটা শ্লাঘার বিষয়।
উত্তরণ আরও একটি বিষয়ে গর্ব করতে পারে। এ দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে যেসব পত্র-পত্রিকা, বিশেষত সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রকাশিত হয়, প্রচার সংখ্যার দিক থেকে উত্তরণ সকলের শীর্ষে।
আমাদের মতে, উত্তরণ কেবল আওয়ামী লীগের মুখপত্রই নয়। উত্তরণ কার্যত বাঙালি জাতিরÑ বাংলাদেশের মুখপত্র। এটা কোনো বাগাড়ম্বর বা অতিশয়োক্তি নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, উত্তরণ কার কথা বলে? কার স্বার্থে এটি প্রকাশিত হয়। যদি বলি, উত্তরণ কেবল আওয়ামী লীগের কথা বলে অথবা আওয়ামী লীগের স্বার্থ প্রকাশিত হয়; তা হলে এটা হবে খুবই সংকীর্ণ এবং খ-িত সত্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিশারী এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের বৃহত্তম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ তো আসলে বাঙালি জাতির প্রকৃত স্বার্থ এবং আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। জন্মলগ্ন থেকেই এই দলটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা, ভাষার অধিকার অর্জন, স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে। বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।
আর স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন এবং একটি শোষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে ব্রতী ছিল। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। অপরিসীম আত্মত্যাগ ও অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশ এগিয়ে চলছে উন্নয়নের পথে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ গত ৮ বছরে বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছে। বাংলাদেশ এখন দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা রেখেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যার হার ২২ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ১২ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছেন শেখ হাসিনা। প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে। দেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পাশাপাশি জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটে চলেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের নজির। মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৭২ বছর ছুঁই ছুঁই করছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে বিশাল পদ্মা বহুমুখী সেতু। সমুদ্র বিজয়, এমডিজি অর্জন এবং এসডিজি অর্জনে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
বহুল উচ্চারিত এ কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলাম একটি কারণেই। এই যে অর্জনসমূহ, এর একটিও কি কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির স্বার্থে হয়েছে? এসব তো ‘আওয়ামী লীগের উন্নয়ন’ নয়। যা হয়েছে এবং হচ্ছে তা হলো বাংলাদেশের উন্নতিÑ বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ। আর বাংলাদেশের এই উন্নতির অনুঘটক হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেÑ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের’ অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিল। সেই অঙ্গীকার এখন বাস্তবে রূপায়িত হচ্ছে।
বাংলাদেশের মানুষের এই দুঃখ জয়েরÑ দারিদ্র্য জয়ের সংগ্রামের কথাই উত্তরণ তুলে ধরেছে। যারা বাংলাদেশকে দারিদ্র্য আর অনুন্নয়নের ফাঁদে আটকে রাখতে চায়, যারা জনগণের সুখ-শান্তি ও জীবনের নিরাপত্তা বিঘিœত করতে চায় এবং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চায়, উত্তরণ স্বাভাবিকভাবেই তাদের মুখোশ উন্মোচনের চেষ্টা করেছে। জনগণকে সতর্ক-সচেতন করতে চেয়েছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সকল গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াসকে সমর্থন জুগিয়েছে।
উত্তরণ একুশ শতকের এই দ্বিতীয় দশকের বাস্তবতায়, জাতীয় অগ্রগতি, শান্তি ও প্রগতির রূপকার শেখ হাসিনার ভিশনারি চিন্তাধারা এবং মিশনারি কর্মযজ্ঞকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতেও এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
একদেশদর্শিতা নয়। রাজনীতির পাশাপাশি সমাজ, অর্থনীতি, চলমান ঘটনাবলী, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সব ধরনের পাঠকের আগ্রহ ও পছন্দের বিষয়গুলোকে যথাসম্ভব উত্তরণের পাতায় আমরা অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছি।
উত্তরণ আর ১০টা বাণিজ্যিক পত্রিকার মতো পেশাদার সাংবাদিকদের নিয়ে নয়, দু-একজন বাদ দিয়ে বেশির ভাগ রাজনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রের কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা জানি, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তা সত্ত্বেও আমরা পত্রিকাটিকে সব ধরনের পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সপ্তম বর্ষে পদার্পণের এই শুভক্ষণে আমরা আমাদের অগণিত পাঠক, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং উত্তরণ-এর প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মীকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। উত্তরণ সময়ের চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে এগিয়ে যাবে এবং আওয়ামী লীগের হয়ে জনগণের মুখপত্র হিসেবে নিজেকে দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে, সপ্তম বর্ষে পদার্পণের প্রাক্কালেÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Category:

উদ্দীপনা আত্মবিশ্বাস এবং নতুন স্বপ্ন

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্মেলন

00বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সংযোজিত হলো স্বর্ণোজ্জ্বল নতুন অধ্যায়। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং প্রাণৈশ্বর্যে ভরপুর স্মরণকালে বৃহত্তম এবং বর্ণাঢ্য মিলনমেলার ভেতর দিয়ে সমাপ্ত হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুদিনব্যাপী ২০তম সম্মেলন। ২২ ও ২৩ অক্টোবর ২০১৬ ছিল ‘আওয়ামী লীগ ডে’ তথা গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনার দিন। একই সঙ্গে এই সম্মেলন ছিল নতুন স্বপ্ন রূপায়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দিন।
আমরা আগেও বলেছি, এবারের সম্মেলন কেবল গতানুগতিক কমিটি পরিবর্তন বা নেতৃত্ব নির্বাচনের কাউন্সিল ছিল না। সম্মেলনে নির্ধারিত সংখ্যক কাউন্সিলর ও ডেলিগেটের অংশগ্রহণ ছাড়া সারাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মিলনমেলায় সমবেত হয়েছিল। ২০০৯ থেকে গত ৮ বছরের অর্জিত বিপুল সাফল্যের শক্ত ভিতের ওপর নতুন স্বপ্নের সৌধ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা ছিল সকলের চোখে-মুখে ও হৃদয়ের গভীরে।
উদ্বোধনী অধিবেশনের বক্তৃতায় দলের প্রাজ্ঞ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিপুণ শিল্পীর মতো প্রত্যেকের মনে গেঁথে দিলেন ২০২১ সালের ছবি, ২০৩০ সালের এসডিজির অন্বিষ্ট এবং ২০৪১ সালের দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রস্তুত হতে বললেন ২০১৯ সালের নির্বাচনের জন্য। হুঁশিয়ারি জানিয়ে বললেন, অগ্রগতির এই রথযাত্রা যেন কেউ থামাতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে। জনগণের আস্থা, সমর্থন ও ভালোবাসা অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তিনি সরকারের অর্জিত সাফল্যের গাঁথা তৃণমূল পর্যায়ে পর্যন্ত মানুষকে শোনাতেÑ প্রচার করতে বললেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ঘোষণাপত্রের এবং গঠনতন্ত্রের সংশোধনীসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হলো। নির্বাচিত হলো নতুন নেতৃত্ব। কাউন্সিলের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই ঘোষিত হলো পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং উপদেষ্টা পরিষদের নাম। বিএনপি যা পাঁচ মাসেও পারে নি, আওয়ামী লীগ পাঁচ দিনেই তা করে দেখাল। গণতন্ত্র চর্চার নবতর নজির স্থাপিত হলো।
নতুন নেতৃত্ব এখন নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সূচিত উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির লক্ষ্য অর্জন।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ২০৪১ সালের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশে উত্তরণের পূর্বশর্তগুলো পূরণ করা, নতুন সোপান অতিক্রম করা। চতুর্থত, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য অবাধ নিরপেক্ষ এবং সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাক্সিক্ষত বিজয়ের জন্য সকল পর্যায়ে প্রস্তুতি গ্রহণ।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ১১টি দেশের অর্ধশতাধিক প্রতিনিধি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান নেতা এবং ‘বিস্ময়কর’ উন্নয়নের রূপকার হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে আওয়ামী লীগের সাফল্যে সবাই মুগ্ধ হয়েছেন এবং উচ্চ প্রশংসা করেছেন।
বিপুল উদ্দীপনা, পরম আস্থা ও নতুন স্বপ্ন নিয়ে সারাদেশ থেকে আগত কাউন্সিলর, ডেলিগেট এবং নেতাকর্মীরা যার যার ঘরে ফিরে গেছেন। আওয়ামী লীগের পরম শত্রুরাও সম্মেলন সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করার সুযোগ পায় নি। প্রকৃতপক্ষে দেশবাসীও এই কাউন্সিলের সাফল্য এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকারে উৎসাহিত হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন আরও দৃঢ়তর হয়েছে।
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সোনার বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামেও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নতুন নতুন বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবে। লাখো শহীদের আত্মদানে মাতৃভূমি বাংলাদেশ হবে গণতন্ত্রের পীঠস্থান, উন্নয়নের রোল মডেল, বিশ্বশান্তির অগ্রদূত এবং শোষণ-বঞ্চনামুক্ত উন্নত ও সমতাভিত্তিক মানবিক সমাজের বাতিঘর।

Category:

আলোর পথযাত্রীদের মিলনমেলা

আওয়ামী লীগের সম্মেলন-২০১৬
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের আলোর পথযাত্রীদের মহামিলন হতে যাচ্ছে ২২ ও ২৩ অক্টোবর। ২০১৬। নিছক একটি রাজনৈতিক দলের গতানুগতিক সম্মেলন নয়। যারা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাঙালির ইতিহাসের প্রথম জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছে, যারা সাম্প্রদায়িকতার মধ্যযুগীয় বর্বরতার অবসান ঘটিয়েছে, যারা শেকল ভেঙে গণতন্ত্র চিন্তা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, ভোট ও ভাতের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে, যারা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পশ্চাৎপদতা এবং অনুন্নয়নের অন্ধকার দূর করে বাঙালি জাতির আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ রচনা করেছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকাবাহী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মী-সদস্যরা তো সেই আলোর পথযাত্রী। তারা কেবল নতুন একটি কমিটি করা বা নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্যই ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মিলিত হচ্ছেন না। এই মিলনমেলা থেকে তারা আগামী দিনের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপকল্প বা কর্মসূচি রচনা করবেন। স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ একুশ শতকের মধ্যপাদে কোন উচ্চতায় পৌঁছবে, শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মেহনতি কৃষক, কল-কারখানার শ্রমজীবী মানুষ, অবহেলিত নারী সমাজ, গ্রাম-শহরের গরিব-মধ্যবিত্ত, প্রাণৈশ্চর্যে ভরপুর সৃজনশীল বাংলার তরুণ ও ছাত্রসমাজ মুক্তির পথের নতুন দিশা দেখতে পাবেন এই সম্মেলনে।
যিনি পঁচাত্তরের গহন অন্ধকারের ভয় ও ক্লীবতার অবসান ঘটিয়ে নতুন করে মুক্তিপথের আলো জ্বেলেছিলেন, সেই সাহসিক শেখ হাসিনা-ই এবারের সম্মেলনেও পথ দেখাবেন। বাঙালি জাতি পঁচাত্তরের পর স্বপ্ন দেখতে ভুলে গিয়েছিল। সামরিক একনায়করা বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, অর্থ ও প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে নিজেদের দল গড়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অর্জনগুলোকে বিসর্জন দিয়েছিল। তারা স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং লুণ্ঠনতন্ত্রকে নিয়মে পরিণত করেছিল।  তাদের হটিয়ে জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতে তুলে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ।
আবার বাংলাদেশের মানুষকে নতুন স্বপ্নে জাগিয়ে তুলেছেন তিনি। আর এখন এক স্বপ্নজয়ের পর নবতর স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন তিনি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর পঙ্ক্তিভুক্ত হবে বাংলাদেশ।
২০০৮ ও ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে পরপর দুবার দেশবাসীর নিরঙ্কুশ রায় পেয়ে আওয়ামী লীগ টানা প্রায় ৮ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এই ৮ বছরে বদলে গেছে বাংলাদেশ। এখন আর কেউ না খেতে পেয়ে, দুর্ভিক্ষে বা মঙ্গায় মারা যায় না। দারিদ্র্য, বিশেষ করে চরম দারিদ্র্য কমে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জনগণের মাথাপ্রতি আয় প্রায় ৩ গুণ বেড়ে ১ হাজার ৫০০ ডলার স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে নির্ধারিত সময়ের আগে। প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহতভাবে ৬ শতাংশের ওপরে। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল। অথচ জনগণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে ঈর্ষণীয় হারে। স্বাস্থ্যসেবা এখন মানুষের দোরগোড়ায়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার হ্রাসে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্থান প্রথম। গড় আয়ুষ্কাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ বছরে। গড়ে উঠছে শিক্ষিত মানবসম্পদ। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পুরস্কৃত। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ, বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্প সভ্যতার ভিত্তি রচনা, খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলাÑ বাংলাদেশকে নতুন পরিচয় বা ইমেজ নিয়ে বিশ্বসভায় উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নির্ধারিত সময়ের আগে সহ¯্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, এসডিজি প্রণয়নে নেতৃত্বদান এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার “বিশ্ব শান্তি, জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের মডেল” জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও রায় কার্যকর করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের সাফল্য প্রশ্নাতীত। এখন আর কোনো দেশ বা পরাশক্তি বাংলাদেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা উপেক্ষা করার সাহস রাখে না। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের গত ৮ বছরের উন্নয়ন এবং অগ্রগতি সামাজিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে বেগবান করেছে। সমাজের পুরাতন হত-দারিদ্র্যের দৃশ্যপট বদলে গেছে। বাংলাদেশে এখন ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি বাংলাদেশের সমাজে নতুন এক শক্তি ভারসাম্য গড়ে তুলেছে। এক দশক আগেও বাংলাদেশের এই সামাজিক রূপান্তর দৃশ্যমান ছিল না। মধ্যবিত্তের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা ও এলিট শ্রেণিও গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন এবং অংশদারিত্বের উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুকরণীয় নজিরে পরিণত হতে চলেছে। উন্নয়ন অভিযাত্রার এই পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। অতীতের সংগ্রাম, সাফল্য, সীমাবদ্ধতাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণ করবে কাউন্সিল। উন্নয়নের দ্বিতীয় সোপানে পা দেবে বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই দলের নেতা-কর্মী, সদস্য-সমর্থকদের দায়-দায়িত্ব যেমন বেড়ে যাবে, তেমনি সামাজিক রূপান্তরের নতুন পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা আরও বেড়ে যাবে। দেশবাসীর এই প্রত্যাশা পূরণে প্রবীণ ও নবীনদের সমন্বয়ে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের পাশাপাশি দলকেও নতুন যুগের উপযোগী করে গড়ে তোলার কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে। অতীতমুখিনতা নয়। আওয়ামী লীগের দৃষ্টি এখন আরও সামনের দিকে প্রসারিত। জাতির পিতার সোনার বাংলা আর বেশি দিন স্বপ্ন হয়ে থাকবে না। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আলোকোজ্জ্বল নতুন স্তরে উন্নীত হবে। মধ্যম আয়ের দেশ হতে ‘উন্নত’ দেশের স্তরে বাংলাদেশের অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন-২০১৬ বাঙালি জাতিকে নবতর চেতনায়, স্বপ্নে ও কর্ম-সাধনায় উজ্জীবিত করবে।

Category:

জনগণমন নন্দিত শেখ হাসিনার জন্মদিন ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন’

02আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সত্তরে পদার্পণ করবেন। ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন’ শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিনে বাংলাদেশের হৃদয় হতেÑ শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মৃত্যুকে তুড়ি মেরে জীবনের ৬৯টি ঝড়ো বসন্ত পেরিয়ে আসতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। ১৯৭৫-এ ঘটনাক্রমে দেশের বাইরে থাকায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ১৫ আগস্টের অনিবার্য মৃত্যুর থাবা থেকে প্রাণে বেঁচে যান। প্রাণে বেঁচে যান বটে, কিন্তু মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়েও দুঃসহ যন্ত্রণা ও কষ্ট নিয়ে গত চারটি দশক তাকে ‘জীবন জয়ের’ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে।
অমিত প্রাণশক্তি, দুর্জয় সাহস এবং অঙ্গীকারের দৃঢ়তা না থাকলে এ রকম সর্বস্ব হারিয়ে কারও পক্ষে রক্তে ভেজা মাতৃভূমিতে ফিরে আসা এবং পিতার অসমাপ্ত কর্তব্যভার কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে। নির্বাসনে থাকলেও, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে এবং হত্যাকা-ের বিচারের দাবিতে যেমন জনমত গড়ে তোলার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছেন; তেমনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে দলকে পুনঃসংগঠিত এবং আন্দোলনমুখী করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা চালিয়েছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একাধিক সদস্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন করেন। আয়োজন করেন একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের।
১৯৮১ সালে তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। ’৮১ সালের আগেও তিনি দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নানাভাবে বাধার সৃষ্টি করে। কিন্তু আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার অর্পিত হওয়ার পর, দিল্লিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান নেতৃবৃন্দ যখন তাকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ জানান, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী তার জীবনের ঝুঁকির কথাÑ নিরাপত্তার অভাবের কথা বলে তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমির ডাক এবং কর্তব্যবোধ তাকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে অনমনীয় করে তোলে। শিশু-সন্তানদের ভারতের মাটিতে রেখেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে বৃষ্টিমুখর দিনে স্বদেশে ফিরে আসেন। অকুতোভয় শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন আওয়ামী লীগের দায়িত্ব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অভিযাত্রার নেতৃত্ব। তখন তার বয়স মাত্র ৩৪ বছর।
অতঃপর গত ৩৫ বছরের দীর্ঘ ক্লান্তিহীন পথযাত্রা। এই যাত্রাপথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। গত ৩৫ বছরে কমপক্ষে ১৯ বার তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। ৩২নং-এর বঙ্গবন্ধু ভবনে, ঢাকার গ্রিন রোড, কাঁঠাল বাগান, ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়ার রেল পথে, ঢাকা-বরিশাল সড়ক পথে, বিভিন্ন সমাবেশে, কোটালিপাড়া জনসভা স্থলসহ বিভিন্ন স্থানে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিন্যুর আওয়ামী লীগ আয়োজিত শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড বৃষ্টির হত্যাযজ্ঞ থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বেগম আইভি রহমানসহ ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে সেদিন প্রাণ দিতে হয়। আহত হন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ অসংখ্য নেতাকর্মী।
হত্যা প্রচেষ্টা থেকে বাঁচলেও স্বৈরাচারী শাসকদের জেল-জুলুম-অত্যাচারের হাত থেকে তিনি রক্ষা পান নি। এরশাদের স্বৈরশাসনের আমল থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০০৬-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার তাকে গ্রেফতারবরণ এবং দীর্ঘ কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়। মোকাবিলা করতে হয় অসংখ্য মিথ্যা মামলা ও হয়রানির।
কিন্তু কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। অশুভ শক্তির সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবিলা করেই তিনি লক্ষ্যের দিকে অবিচল পদক্ষেপে এগিয়ে গেছেন। ১৯৭৫ সালের পর বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত নেতৃত্বহীন-দিশাহীন আওয়ামী লীগ প্রায় নিঃশেষিত হওয়ার পথে ছিল। দলে ঐক্যবদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য কোনো নেতৃত্ব ছিল না। ১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর একাধিকবারের ভাঙন, বিশ্বাসঘাতকতা এবং দলাদলির মতো আত্মঘাতী প্রবণতাকে মোকাবিলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে আবার জনসমর্থনপুষ্ট দেশের সর্ববৃহৎ সুসংগঠিত দলে পরিণত করেন। তার নেতৃত্বে এরশাদ স্বৈরাচারের পতন হয়। পরবর্তীকালে বিএনপি-জামাত জোটের দুঃশাসন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবিমৃশ্যকারী কা–কারখানা থেকে তিনি বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ২১ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে ছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে পরপর দুবার আওয়ামী লীগ তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে। গত আট বছর একটানা তার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে হত-দরিদ্র বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের দোরগোড়ায় পা রেখেছে।
বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো দারিদ্র্যপীড়িত পশ্চাৎপদ দেশ নয়। শেখ হাসিনার ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যা ২২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ নি¤œমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপ্রতি আয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার ছুঁই ছুঁই। খাদ্যে আন্তনির্ভরশীলতা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমস্যার সমাধান, শিক্ষাক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনি¤œ হার অর্জন, গড় আয়ুষ্কাল ৭১ বছরে উন্নীতকরণ, পার্বত্য শান্তিচুক্তি, গঙ্গাচুক্তি, সমুদ্রসীমা, ছিটমহল সমস্যার সমাধান, একক অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সর্বোচ্চ রিজার্ভ গড়ে তোলা, জনশক্তি রপ্তানি, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পদ্রব্য রপ্তানি প্রভৃতি অর্থনৈতিক কর্মকা- বাংলাদেশকে উন্নত দেশের স্তরে দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার ৭.২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২১ ফেব্রুয়ারি অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা। এই ফিরিস্তি আরও লম্বা করা যেতে পারে। এই সকল অর্জনের পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার দূরদর্শী প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বের গুণাবলি ও সাফল্য আজ বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত। ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, ফাও, কমনওয়েলথ, স্বল্পোন্নত দেশের গ্রুপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্র জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অসংখ্য পুরস্কার ও পদকে ভূষিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে শেখ হাসিনা নিজেকে যেমন, তেমনি বাংলাদেশকে অনন্য মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করেছেন। তিনি এখন আর কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে আসীন।
এক রাজনৈতিক পরিবারে শেখ হাসিনার জন্ম। কিশোর বয়সেই কার্যত রাজনীতিতেÑ দেশকর্মে তার হাতেখড়ি। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনে তার অগ্রণী ও নেতৃত্বের ভূমিকা আজ সর্বজন স্বীকৃত।
কেবল রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই তিনি অনন্য নন। তার রয়েছে অসাধারণ মানবিক গুণাবলি। লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ¯েœহময়ী ভগ্নী জায়া জননী। বিলাস বাহুল্যবর্জিত সাধা-সিদে জীবনযাত্রা এবং পোশাকে-আশাকে তার অতুলনীয় বাঙালিআনা তাকে মাটির মানুষের, দুঃখী মানুষের প্রিয় নেতা হিসেবে অসামান্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে বসিয়েছে।
বর্ণাঢ্য সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি, তার ধীশক্তি এবং সৃজনশীল লেখালেখি তাকে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও অনন্য আসনে বসিয়েছে। রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা যেমন, তেমনি লেখক-চিন্তক শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের ইতিহাসে নিজের জন্য শিখরস্পর্শী অক্ষয় আসন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিব্যাপ্ত হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতি অধ্যায়েÑ প্রতি পাতায়।
সংগ্রাম, সাফল্য এবং বর্ণাঢ্য জীবনের জীবন্ত কিংবদন্তি জননেত্রী শেখ হাসিনা শতায়ু হোন। বাঙালি জাতিকে আরও দীর্ঘদিন উন্নত-সমৃদ্ধ জীবন গড়ার কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দিন, সুস্থ থাকুনÑ ৭০ বছরে পদার্পণের মাহেন্দ্রক্ষণে এটাই আমাদের প্রত্যাশাÑ জাতির প্রত্যাশা। জয়তু শেখ হাসিনা। শুভ জন্মদিন।

Category:

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা : আমাদের করণীয়

Posted on by 0 comment

2প্রতিবছরের মতো এবারও যথাযথ কর্মসূচি ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হবে। বিন¤্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বাঙালি জাতির পিতাকেÑ বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করবে।
রাষ্ট্রীয়, দলীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান ও আয়োজনের অবশ্যই প্রয়োজন আছে। এসব আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়েও আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং সেই ইতিহাস নির্মাণে মহামানব বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে স্মরণ করি। নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারে, শিখতে পারে।
কিন্তু কেবল আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যদি আমরা সীমাবদ্ধ থাকি, গণভোজটাকে কে কত বড় করতে পারল, আলোচনা সভাটা কত বড় হলো এবং আয়োজন কত বর্ণাঢ্য হলো, সেই প্রতিযোগিতায়ই যদি নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখি, তা হলে দৃশ্যত বাহবা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ থেকে যদি কোনো শিক্ষা না নেই অথবা তার স্বপ্ন রূপায়নে যা করার তা না করি, তা হলে শেষ বিচারে এসব আনুষ্ঠানিকতা লোক দেখানো আড়ম্বর বলেই প্রমাণিত হবে।
বঙ্গবন্ধুর আমৃত্যু স্বপ্ন ছিল ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলা এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানো।’ এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘শুধু একটি কথা বলে যাইÑ শেষ কথা আমার, যে কথা আমি বারবার বলেছিÑ সোনার বাংলা গড়তে হবে। এটা বাংলার জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের প্রতিজ্ঞা। আমার আওয়ামী লীগের কর্মীরা যখন বাংলার মানুষকে বলি তোমরা সোনার মানুষ হওÑ তখন তোমাদেরই প্রথম সোনার মানুষ হতে হবে। তা হলেই সোনার বাংলা গড়তে পারবা।’ (১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে উদ্ধৃত)। বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
একই ভাষণে তিনি আরও বলেছেন, ‘যোগ্য নেতৃত্বের সাথে প্রয়োজন আদর্শের।… নেতৃত্ব ও আদর্শের পরে প্রয়োজন নিঃস্বার্থ কর্মীর। নিঃস্বার্থ কর্মী ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বড় হতে পারে না। কোনো সংগ্রাম সাফল্যম-িত হতে পারে না।’ আজ বঙ্গবন্ধুকে হারাবার ৪১ বছর পর আমরা যদি আত্মজিজ্ঞাসার আরশির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে/নিজেদের জিজ্ঞেস করি, আমরা নিজেরা ‘সোনার মানুষ’ হতে পেরেছি কি? আমরা আদর্শের প্রতি কতটা নিষ্ঠাবান আর কর্মী হিসেবে কতটা নিঃস্বার্থ হতে পেরেছি? বলাবাহুল্য গত ৪১ বছরে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ মুহূর্তের জন্যও আদর্শচ্যুত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির নেতৃত্বের শূন্যতাই কেবল পূরণ করেন নি, তিনি জাতির পিতার অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পন্ন করার সংগ্রামে বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। সত্য বটে, বঙ্গবন্ধু যে দুর্নীতিমুক্ত, শোষণ-বঞ্চনা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সেই লক্ষ্যে বিশাল অগ্রগতি সত্ত্বেও আজও আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। জাতি এখন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য অর্জনের অর্থাৎ, সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত।
বঙ্গবন্ধুই বলেছেন, আওয়ামী লীগ কর্মীদের আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে। যারা দুর্নীতি করে রাতারাতি বড়লোক হতে চায়, যেসব চাটার দল জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে, যারা দেশ, জনগণ ও দলের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে, বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্ট ভাষায় এই ধরনের লোকদের (সে বা তারা যত বড় নেতা বা কর্মী হোন না কেন) দল থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলেছেন। শুরুতেই ক্যানসার অপারেশন না করলে তা সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বঙ্গবন্ধু এজন্য বারবার দলকে ও কর্মীদের সতর্ক করেছেন। তিনি ১৯৭৪-এর এই ভাষণে দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় বলেছেন, ‘আবর্জনা যতই যায়, ততই মঙ্গল।… তাতে প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হয় না। যাদের আদর্শ নাই, যাদের নীতি নাই, যারা দুর্নীতিবাজ, যারা দেশকে ভালোবাসে না, তারা যদি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যায় (অথবা তাদের বের করে দেওয়া হয়); তাতে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয় না। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। তাই ভবিষ্যতেও এ ধরনের লোক প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিয়ে আওয়ামী লীগকে আপনাদের আরও শক্তিশালী করতে হবে।’
আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধুর এই শিক্ষা এবং নির্দেশ আজকের দিনে আমাদের জন্য আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। দেশপ্রেম, সততা, আদর্শনিষ্ঠা এবং ত্যাগের নজির স্থাপন করতে না পারলে দল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। নিজেরা নজির স্থাপন করলেই অন্যদের অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। কথায় বলে, ‘আপনি আচারী ধর্ম পরেরে শিখাও।’ বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে আমরা এই শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারি। কথাটা এজন্য বলছি, দুর্নীতি এমন একটা সামাজিক ব্যাধি, যা আমাদের অনেক সাফল্যকে পর্যন্ত ম্লান করে দেয়। এবারের ১৫ আগস্টের প্রতিজ্ঞা হবে জাতির পিতার জীবন ও উপদেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করব এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করব। সাম্প্রদায়িকতা সমূলে উৎপাটিত করব। ধর্মের নামে জনগণকে বিভক্ত করতে দেব না। জীবন দিয়ে হলেও প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা-সাবভৌম, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ধারা রক্ষা করব। শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যর অবসান এবং ক্ষুধা-দারিদ্রের অবসান ঘটিয়ে ‘বাঙলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাব।’ প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর অমর শিক্ষা অনুসরণ করলেই সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। চিরঞ্জীব হোক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ।

Category:

টার্গেট কিলিং, সন্ত্রাস ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ান

Posted on by 0 comment

সন্ত্রাসবাদ একটি পুরনো প্রপঞ্চ। এর দুটি ধারা আছে। একটি ধারা রাজনৈতিক, অন্যটি নিছক পেশাদার অপরাধীদের কর্মকা-। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবপন্থি ও নৈরাজ্যবাদীরা কখনও কখনও তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের পথ বেছে নিয়েছে। এই সন্ত্রাসবাদীরা প্রকাশ্যে বা গোপনে ব্যক্তি হত্যাকে তাদের লক্ষ্য অর্জনের উপায় হিসেবে বেছে নেয়। কোনো নিরীহ সাধারণ মানুষ তাদের টার্গেট হতো না। আমাদের দেশেই ব্রিটিশ সরকারকে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার জন্য প্রথমত স্বেতকায় ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের হত্যার টার্গেট করা হতো। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগের পর গোপনে দুটি বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী দলÑ যুগান্তর ও অনুশীলন পার্টি গড়ে ওঠে। এসব সন্ত্রাসবাদী তরুণ-যুবকরা ছিল আদর্শবাদী, সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবনদানের জন্য প্রস্তুত। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বিনয় বাদল দিনেশÑ এ রকম শত শত বিপ্লবীর কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা যায়, যারা ইংরেজ কর্মকর্তা বা পুলিশ মারতে গিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে জীবন দিয়েছেন।
ব্যক্তি হত্যার পথে যে পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচন এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের শেষ দিক থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীরা তা উপলব্ধি করতে থাকেন। সন্ত্রাসবাদের পথ পরিহার করে জনগণকে সুসংগঠিত করে গণ-আন্দোলনের পথ ধরেন তারা।
সশস্ত্র সংগ্রামের পথেও স্বাধীনতা এবং বিপ্লব-সাধনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। কয়েকজন সাহসী বীরের অস্ত্রধারণ নয়, যখন একটি জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থনপুষ্ট কোনো সংগঠিত সশস্ত্র যোদ্ধা; যেমন মুক্তিবাহিনী, গেরিলা বাহিনী ও নিয়মিত বাহিনী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছে, তখন স্বাধীনতা অর্জন বা বিপ্লবের সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চীন, আল-জিরিয়াসহ অনেক দেশ এ পথেই স্বাধীনতা অর্জন বা বিপ্লব-সাধন করেছে। আদর্শ ও লক্ষ্য যত মহৎই হোক না কেন সন্ত্রাসবাদের পথে তা অর্জন করা সম্ভব নয়; বিশ্বের ইতিহাস তা প্রমাণ করেছে।
অতীতে আমাদের দেশেও নকশালপন্থি, জাসদের গণবাহিনী এবং সিরাজ শিকদারের অনুসারী সর্বহারা পার্টির নামে সন্ত্রাসবাদীরা গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করে ব্যর্থ হয়েছে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশসহ অনেকগুলো দেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থি, মৌলবাদী এ জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো এই পুরনো পরিত্যক্ত পথে ‘জিহাদের’ নামে সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাড়াতে, আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী সংগঠন আল-কায়দা, আফগানিস্তানের মাদ্রাসা ছাত্রদের নিয়ে সশস্ত্র তালেবান বাহিনী এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে সর্বপ্রকারে মদত দিয়ে গড়ে তোলে। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত বাহিনী প্রত্যাহৃত হয়। জেঁকে বসে মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণার ধর্মীয় উগ্রবাদী তালেবান শাসক। আল-কায়দা ও আন্তর্জাতিক নানা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো এতই সাহসী ও মরিয়া হয়ে ওঠে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আকাশ পথে হামলা চালিয়ে টুইন টাওয়ার ধ্বংস ও কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে। মার্কিন শাসকগোষ্ঠীর টনক পড়ে। দুধ-কলা দিয়ে তারা যে কাল সাপ পুষেছে, সেই সাপ যখন তার সৃষ্টিকর্তাকে ছোবল মারতে উদ্যত হয়, তখন থেকে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। মার্কিন শাসকগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের ঘোষণা দেয়।
বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক থেকে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। জঙ্গিদের গ্রেনেড ও বোমা হামলায় অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। আক্রান্ত হন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এএমএস কিবরিয়া এমপি, শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপিসহ অনেক জাতীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা নিহত হন। জেএমবি, হরকাতুল জেহাদসহ বিভিন্ন নামে শতাধিক জঙ্গি সংগঠন গড়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জঙ্গি দমনে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হয়। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করে। এই সরকার জঙ্গি, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতি নেয়। ফলে সংগঠিত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু অবাক কা- হলো বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আবার ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদীদের উসকে তোলা হতে থাকে। বিএনপি-জামাত জোট দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে গণ-আন্দোলনের পথ পরিহার করে সন্ত্রাসবাদের পথ বেছে নেয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকানো এবং ২০১৫ সালে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেন খালেদা জিয়া। তিনি কার্যত দেশকে আগুন সন্ত্রাসের দিকে ঠেলে দেন।
শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ-মিছিল বা ধর্মঘট নয়, পেট্রল ঢেলে যাত্রীপূর্ণ বাসে অগ্নিসংযোগ, প্রতিষ্ঠানে হামলা, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয়ে হামলা, ট্রেনে হামলা এবং হত্যা সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয় বিএনপি-জামাত জোট। সারাদেশব্যাপী প্রতিবাদ ওঠে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিএনপি ও জামাত। সরকার শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে যান খালেদা জিয়া।
এসব সন্ত্রাস থেকে তিনি বা তার দল-জোট কোনো শিক্ষাই নেয় নি। প্রকাশ্য ও দৃশ্যমান সন্ত্রাস ব্যর্থ হওয়ার পর সম্প্রতি খালেদা জিয়া, তার লন্ডনে পলাতক জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান এবং জামাত-জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো সম্প্রতি টার্গেট কিলিং ও গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। গত বছরাধিক কাল সময়ে বেশ কয়েকজন ব্লগার, মুক্তিচিন্তার লেখক ও প্রকাশককে কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সাম্প্রতিককালে তারা হিন্দু পুরোহিত, খ্রিষ্টান যাজক ও সাধারণ মানুষ, বৌদ্ধ ভিক্ষু, ক্ষুদে দোকানদার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র এবং নিরীহ বিদেশি নাগরিকদের চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে। হাস্যকর হলেও সত্য, খালেদা জিয়া এসব হত্যাকা-ের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন। বস্তুত, তার দল ও জোটের মদতপুষ্ট এই জঙ্গি সন্ত্রাসীদের বাঁচানোর জন্যই তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে চলেছেন।
কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে জানি, এই গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিং, সংখ্যালঘু হত্যা, সন্ত্রাস ও ভয়-ভীতির পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। এসব সন্ত্রাসের পেছনে কোনো মহৎ আদর্শ যেমন নেই, তেমনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাও নেই। এরা মূলত ভাড়াটে সন্ত্রাসী। হতে পারে কেউ কেউ বিভ্রান্ত জঙ্গি। কিন্তু এই পথ যে খালেদার জন্য বুমেরাং হবে এটা যেমন তিনি বুঝছেন না; তেমনি যারা এই পথে ‘জিহাদ’ করতে চান, সেটি যে ভ্রান্তপথ, ইসলাম-বিরোধী পথ এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ, সেটিও তাদের উপলব্ধি করতে হবে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, হিংসা ও হত্যা ইসলাম অনুমোদন করে না। দেশবাসীকে এই সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ভাবাদর্শগতভাবে ওদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ ধর্ম সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক দেশ। শান্তির দেশ। যে কোনো মূল্যে আমাদের তা রক্ষা করতে হবে। দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়ে অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়াতে হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষায় সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

Category:

৬-দফা ও ৭ জুনের ৫০ বছর পূর্তি : আমাদের অনির্বাণ বাতিঘর

Posted on by 0 comment

‘বাঙালির মুক্তিসনদ’ বা স্বাধিকারের ম্যাগনাকার্টা ৬-দফা ঘোষণার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আহূত তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফাকে আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। ৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগের দিন, বিষয় নির্বাচনী কমিটির সভায় শেখ মুজিব ৬-দফা দাবি উত্থাপন করে, তা আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। বৈঠকে উপস্থিত কাউন্সিল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামি ও জামায়াতে ইসলামির নেতারা ৬-দফা শুনে সমস্বরে বলেন, পাকিস্তান ভাঙার এই প্রস্তাব তারা আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে দেবেন না। শেখ মুজিব ৬-দফা এজেন্ডাভুক্ত না করার তাৎক্ষণিকভাবে বৈঠক বর্জনের ঘোষণা দেন। লাহোরে নেজামে ইসলামি নেতা চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক ভেঙে যায়। শেখ মুজিব সভাস্থল ত্যাগ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেন। তার আগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ৬-দফার কথা লাহোরের নওয়ায়ে ওয়াক্ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা প্রত্যাবর্তন করে তেজগাঁও বিমানবন্দরে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের কাছে পূর্ণাঙ্গ ৬-দফা দাবি প্রকাশ করেন। ঢাকা প্রত্যাবর্তনের পর আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারাও ওয়ার্কিং কমিটির অনুমোদন ছাড়া ৬-দফা ঘোষণা করায় উষ্মা প্রকাশ করেন। শেখ মুজিব ১৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করেন। সভায় অনুমোদনের জন্য ৬-দফা উত্থাপিত হলে, আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ৬-দফার বিরোধিতা করে সভাস্থল ত্যাগ করেন। সভা মুলতবি হয়ে যায়। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ওয়ার্কিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে ৬-দফা পাস করে।
১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ ঢাকার হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ৬-দফা গৃহীত হয়। আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর সারাদেশে ৬-দফা দাবি ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনমত গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান উল্কার মতো ঘুরে বেড়ান। ২০ মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভার ভেতর দিয়ে শুরু হয় প্রচারাভিযান। তারপর একের পর এক জেলা জনসভা, পথসভা। মাত্র ৩৫ দিনে শেখ মুজিব অসংখ্য পথসভাসহ ৩২টি জনসভা করতে সক্ষম হন। বিদ্যুৎস্পর্শের মতো সমগ্র বাঙালি জাতি হঠাৎ যেন শতাব্দীর ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। ভীত সন্ত্রস্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথমে ৬-দফার বিরুদ্ধে ‘অস্ত্রের ভাষা’ প্রয়োগের হুমকি দেয়। তারপর নেমে আসে তীব্র দমননীতি। শেখ মুজিব যেখানে জনসভা করতে যান, সেখানেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাৎক্ষণিক জামিন নিয়ে তিনি আবার আরেক জেলায় ছুটে যান। সর্বশেষ, ৮ মে ১৯৬৬ নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষে তাকে জামিন অযোগ্য মামলায় গ্রেফতার করা হয়। ৭ থেকে ১০ মে’র মধ্যে সারাদেশে ৩ হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী গ্রেফতার বরণ করেন। সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ, আবদুল মমিন, শামসুল হক, মোল্লা জালালউদ্দিন, এম মনসুর আলী প্রমুখসহ প্রথমসারির সকল নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবসহ সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি ও ৬-দফা দাবিতে ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের সর্বাত্মক রাজনৈতিক হরতাল ছিল নানা দিক থেকে অনন্য। এ দেশের ইতিহাসে এই প্রথম শ্রমিক-শ্রেণি একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে কল-কারখানা বন্ধ রেখে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। আদমজীর পাটকল শ্রমিক, টঙ্গী ও তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা ঢাকার কেন্দ্রস্থলে আসার চেষ্টা করে। ‘পুলিশ-ইপিআর’ নানা জায়গায় শ্রমিক-শ্রেণির সংগঠিত মিছিলে বাধা দেয়, গুলিবর্ষণ ও লাঠিচার্জ করে। পুলিশের গুলিতে সেই দিন শ্রমিক মনু মিয়াসহ ১০ শ্রমিক শহিদ হন।
এই আন্দোলনেরই একপর্যায়ে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ৬-দফার স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তি, বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হওয়া, আইউব খানের পতন এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। অতঃপর এই ৬-দফা-ই বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের প্রিয় স্বাধীনতা।
৬-দফা এবং ৭ জুনের হরতালের ৫০ বছর পূর্তিতে আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং তার যোগ্য সকল সহকর্মীকে। আমরা শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি মনু মিয়াসহ ৬-দফা আন্দোলনের সকল শহিদদের স্মৃতির প্রতি।

Category: