আজ থেকে মানুষ হলাম

মফিদা আকবর: রাত দ্বিপ্রহরের নিস্তব্ধতা খানখান করে ভেঙে দেয় সেলফোনের রিংটোন। মিথিলার চোখে ঘুম নামের শব্দটি সহজেই কিছুক্ষণের জন্য হলেও শীতল পাটি বিছিয়ে বসে না। নির্ঘুম মিথিলা কোলাহলহীন নির্জন রাতের প্রতিটি প্রহর হাঁসফাঁস যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটিয়েই অভ্যস্ত। আর মাঝে মাঝে কখনও যদি ঘুম নামের শব্দটি শান্তির নীলাঞ্জনা এঁকে দেয়Ñ তখন ওর নিজেকে খুব সুখী মনে হয়। এ-রকম একটি ঘুমই অকস্মাৎ চোখে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। ঘুমিয়ে গেল মিথিলা। সেলফোনটি চার্জে দেওয়া ছিল ওর থেকে একটু দূরে। রিংটোনটি বেজে ওঠার সাথে সাথেই ধড়মড়িয়ে উঠে গিয়ে আনতে আনতে অবিরাম বেজে চলতে থাকে সেলফোনটি। ঘুমের ঘোরে দেখা হয় না কে ফোন করলো এ-সময়। ফোন অন করে হ্যালো বলতেই চিরচেনা কণ্ঠস্বরটি ভেসে এলো ও-পাশ থেকে। এবং সারা শরীরময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো ওর। ইচ্ছে করলেই ফোনটি অফ করা যেতো। কিন্তু মিথিলা ফোনটি অফ না করে আদনানকে ভাঙা ভাঙা শান্ত গলায় বললো, আমি জানতাম, অপমান এবং অবমাননাকর আরও অনেকগুলো শব্দ ব্যবহার করা হয়ে উঠেনি আমাকে উদ্দেশ্য করে। যে নিছক শব্দগুলোই পারমাণবিক বোমার মতো আমার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এবং তুমি যে একজন সামর্থ্যবান পুরুষ সেটাও তো প্রমাণ করতে হবে তোমার বউয়ের সামনে। হ্যাঁ, বলো। শুনছি।
ইথারে ভেসে আসতে শুরু করলো অকথ্য কথা-সংলাপ।
মিথিলা কানের কাছে ধরে রেখেছিল ফোন সেটটি। সেটি ধীরে ধীরে গরম হচ্ছিল কিন্তু শান্ত, নির্বিকার মিথিলা। ওপাশ থেকে বারবার ধমকের সুরে তাগাদা দিচ্ছিল মিথিলা কেন কোনো উত্তর দিচ্ছে না। আদনানের উত্তেজিত চিৎকার-চেঁচামেচিতে মিথিলা আবারও শান্ত গলায় বললো,Ñ
– আমি শুনছি। তুমি বলে যাও। আমার কিছু বলার নেই।
আদনান যেসব কথা বলছিল প্রতিটি কথাই ছিল মিথিলার বলা কথার জের। মিথিলা ধরেই নিয়েছিল এমনটি হবে। আরও আগেই হওয়ার কথা ছিল। যেহেতু রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত হয়নি তাই ভেবে নিয়েছিল আদনানের স্ত্রী দিবা তাহলে কথা রেখেছে। মিথিলার বলা কথাগুলো আদনানকে বলেনি। কিন্তু না! দিবা সে-কথা পারেনি। সে প্রমাণ করেছে যে, সে আদনানের স্ত্রী। সে ছেলেমেয়ের কসম খেয়ে এবং আজানের কসম খেয়ে বলেছিল এসব আদনানের কাছে বলবে না। দিবা মিথিলার হাতে হাত রেখে বলেছিল, আজ থেকে আমরা দুজন পরম কাছের মানুষ, বন্ধু বা বোন হলাম। যা কিছু করবো দুজনে আলাপ-আলোচনা বা সমঝোতা করেই করবো। কিন্তু আদনানের বলা কথাগুলো শুনে মিথিলা বুঝলো যে, দিবা কথা রাখেনি বর্ণে বর্ণে, দাড়ি, সেমিকোলন পর্যন্ত মিলে গেছে। সুতরাং কি আর বলার আছে মিথিলার? অবশ্য মিথিলা এটা জানতো যে, দিবা কথা রাখতে পারে নাÑ পারার কথা নয়। কিন্তু মিথিলার কথাগুলো তো বলতেই হতো। তাই সে বলেছিল দিবাকে। না হলে হয়তো বা মিথিলার বাকি জীবনটাই আদনানের হাতে বন্দি অথবা রক্ষিতা হিসেবেই কাটিয়ে দিতে হতো। পৃথিবীর মানুষগুলো একজন বুক ফুলিয়ে চলা, মহৎদের একজন একজনই ভেবে যেতো তাকে। আর তাছাড়া ওর স্ত্রী দিবা সারাজীবন আলোকিত ইতিহাসের বাইরেও যে কিছু অন্ধকারময় পঙ্কিল ইতিহাস থাকে সেটা জানা থেকে বঞ্চিত হতো। দিবার সন্দেহের শাণিত চকচকে ছুরিটা বরাবরই অব্যবহৃত থেকেছে আদনানের অতি সাধুতা আর অতি চালাকির জন্যে। কিন্তু দিবার সন্দেহের ছুরিটা বরাবরই নিশপিশ করছে ব্যবহৃত হতেÑ কিন্তু মিথিলাকে হাতেনাতে ধরতে না পারার জন্যে ফালাফালা করতে পারেনি নিজের ভেতর পুষে রাখা জমাট বাঁধা কষ্টগুলোকে। কিন্তু সেদিন গভীর রাতে আদনানকে মিথিলার সেন্ড করা এসএমএসটাই হয়ে গেল একটি বিস্ফোরক বারুদ। অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে গালি দিচ্ছে আদনান। মিথিলা ফোন কানে ধরে আছে। সে জানে আদনান কি কথা বলতে পারে। মিথিলা এও নিশ্চিত জানে যে, আদনান দিবাকে পাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। মিথিলার সেন্ড করা এসএমএস-এ যা লিখেছে, তা যে সত্যি নয় তা প্রমাণ করার জন্য এখন যা যা বলতে হয় এবং করতে হয় তার সবই জানা আছে আদনানের। আদনান জোরে শব্দ করে ফোন রেখে দিলো।
আদনানের বলা শেষ কথাটি ছিলÑ শুয়োরের বাচ্চা তুই অনেক পুরুষকে ফাঁসিয়েছিস টাকা কামাই করার জন্য। আর এখন আমার সুখের সংসারে আগুন লাগাবার জন্য এই পথে নেমেছিস!
– আমি যদি বাপের বেটা হই তাহলে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে তোর শাড়ি খুলে কুকুর লেলিয়ে দেব। দেখবো তোর কত ত্যাজ।…
হাতের ফোনটি বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলো অনেকক্ষণ। দুচোখের ঘুম নিমিষে উবে গেল। মাথার দুপাশের শিরা দপদপিয়ে লাফাতে লাগলো।
দুই হাতে মাথাটা চেপে ধরে মিথিলা ধীরপায়ে বেলকোনিতে এলো। মধ্যরাতে হেমন্তের মৃদু হিমধরা এক দঙ্গল হাওয়া এসে ওর গায়ে পরশ বুলিয়ে গেল। বেলকোনির কোনায় বেতের চেয়ারে বসলো। অনেকক্ষণ ওর মাথায় কোনো বিষয় ঢুকলো না। মিথিলা নিশ্চিত জানে আজকের আদনান আর আগামীকালের আদনানে বিস্তর ফারাক থাকবে। সে এসে মিথিলার পায়ে পড়ে মাথা ঠুকবে। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে দিবার জন্য। একদিকে স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে স্বামী নামক পুরুষটি যে একটি আস্ত পশু সেটাও ওর জানা হলো না।
মিথিলা ভেবেছিল আদনানের অন্যায় থেকে নিজেকে বাঁচানোর একমাত্র পথ হলো, ওর স্ত্রী দিবা। কিন্তু দিবা যে বুঝলো না! এসব ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। সময়ের কাঁটা দৌড়ায়। মিথিলার অবচেতনে সোনামাখা ভোর উঁকি দিয়ে। এক স্নিগ্ধ ভোরের জন্ম হয়। মিথিলা বসেই থাকে।
ঘড়িতে ন’টা বাজার সংকেত দেয় ঢংঢং করে। সেলফোনটাও সমানে বাজতে থাকে।
অবিন্যস্ত মিথিলা উঠে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো।
– আমি তোমার বাড়ির গেটের সামনে আসবো?
– এসো।
আদনান এলো। ওর হাতে নানারকম ফলমূল, মিষ্টি, বিস্কুট ও একতোড়া ফুল।
অন্যদিন হলে মিথিলা আদনানের হাতে অনেক কিছু দেখলে বিরক্ত হতো।
– বসো।
আদনান বিচক্ষণ দৃষ্টি দিয়ে মিথিলাকে নিরক্ষণ করে বললো,
– আমায় ক্ষমা করবে না?
মিথিলার ঠোঁটের কোণে দৃঢ়তা, শরীরে মৃদু উত্তেজনা নিয়ে মিথ্যে করে বললো,
আমি জানি তুমি আসবে। তাই দিবাকে বলেছি আসতে। দেখে যেতে সরেজমিনে ওর স্বামী নামক ভদ্রলোকটির আসল চেহারা।
– শুধু তাই না? থানার পুলিশ অফিসারকেও বলেছি একবার আমার বাড়িতে পদধূলি দিতে।
– আমি জানি আদনান তোমার সাথে শুতে পারছি না বলে যে পুলিশকে আজ ডেকে আনছি। পরে নিয়মিত তাকেই আমার শরীরের ঘ্রাণ দিতে হবে। আমারও নিতে হবে তার শরীরেরও অচেনা ঘ্রাণ।
আদনানের মুখের রং পাংশুটে রং ধারণ করে। সে পালাতে পারলে বাঁচে।
মিথিলা ওর দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে দেখে, মৃদু হাসির রেখা ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললো,
– অল্পবয়স্কা এক বিধবা নারী তার শরীর বাঁচাতে অফিসের যার কাছেই ধন্না দিয়েছে সে-ই এক লহমায় চেখে দেখতে চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত তুমি এসেছিলে বন্ধু এবং রক্ষক সেজে। শেষে তুমিও কি না ভক্ষক হতে চাও। আদনানের দেহজুড়ে ঘামের স্রোত বয়ে চলেছে। দিবাÑ মানে বউ আর থানা পুলিশÑ মানে কেলেঙ্কারির শেষ বুঝি আর রইলো না। মিথিলার মতো সহজ-সরল মেয়ে কি এমন করতে পারে? ওর গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।
মিথিলা অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। মনে পড়ছে স্বামী পারভেজের কথা। বিয়ের তিন মাসের মাথায় অ্যাকসিডেন্টে মারা যায় সে। সবাই বলতো এমন জুটি না-কি সাধারণত চোখে পড়ে না। স্বামীর স্মৃতিকে ঘিরেই শ্বশুরালয়ে থাকতে চেয়েছিল সে। কিন্তু পারেনি দেবর কবীরের যন্ত্রণায়। শেষে স্বামীর চাকরির স্থলাভিষিক্ত হয়ে মিথিলা এ অফিসে। স্বামীর কলিগদের ভাবী। ভাবীদের কাছে তো স্বামীদের লেনাদেনা থাকেই।
এসব ভাবতে ভাবতে তাকায় আদনানের দিকে।
– কি? একেবারে ভয়ে লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে গেলে যে?
চিৎকার করে ওঠে মিথিলা।
– মনে আছে গতরাতে কী কী বলে আমায় গালি দিয়েছিলে? আমি সব ক’টা কথার বদলা নেব এখন।
– তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছো?
– যাবে না-কি…
ভবিষ্যতে যদি তোমাকে আমার ধারে-কাছে দেখি তাহলে…
আদনান বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এক পা বাইরে রাখে।
মিথিলা বললো,
– দাঁড়াও। তোমার আনা এসব নিয়ে যাও। পেছন ফিরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল আদনান।
মিথিলা বললো,
– যদি ভালো চাও।
ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায় আদনান। আদনান চলে যাওয়ার পর মিথিলা আলমারিটা খুলে পারভেজের প্যান্ট-শার্ট বের করে দেখলো ওর গায়ে হয় কি না। হ্যাঁ, মোটামুটি হয়ে গেল। প্যান্ট কোমরের দিক দিয়ে একটু ঢিলে হলেও বেল্ট দিয়ে সেটিকে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে। আর শার্টটি ঢিলেঢালা হওয়াতে ভালোই হলো। প্যান্ট-শার্ট পরে চোখে একট সানগ্লাস লাগিয়ে বেরিয়ে পড়লো মিথিলা। প্রথমে সেলুনে গিয়ে লম্বা চুলগুলো কেটে বয়কাট করে ছেঁটে নিয়ে বেরোলো পথে। একটি রিকশা ডেকে উঠে পড়লো সে পায়ের ওপর পা রেখে। অফিসের গেটের সামনে নেমে পান-সিগারেটের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে একটি সিগারেট বের করে দোকানিকে সে বললো আগুন ধরিয়ে দিতে। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে গটগট করে ভিন্ন স্টাইলে অফিসে ঢুকে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো।
পিয়ন এসে বললো,
এখান থেকে সরে বসুন।
– কেন?
– আপনি অফিসের ডেকোরাম বুঝেন না? চেহারা দেখে তো ভদ্রলোকই মনে হয়।
– এটা আমাদের মিথিলা ম্যাডামের চেয়ার।
মিথিলা সিগারেটের একগাল ধোঁয়া ছেড়ে চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে টেবিলে রেখে মুখে মুদু হাসির রেখা টেনে বললো,
– সমস্যা নেই জব্বার মিয়া। আজ থেকে মিথিলার বদল হয়েছে। আগের মিথিলা মরে গেছে। নতুন মিথিলার জন্ম হয়েছে। আজ থেকে আমায় কখনও ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবে না।
– স্যার বলবে। এই পৃথিবীটা নারীর বসবাসের জন্যে তো নয়। পুরুষদের একাধিপত্য। জব্বার মিয়া হা করে তাকিয়ে রইলো মিথিলার দিকে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মিথিলার অন্য নারী-পুরুষ কলিগরাও। এ সময় দ্রতগতিতে অফিসে ঢুকছিল আদনান। সে একবার-দুবার অসংখ্যবার দেখলো মিথিলাকে। চোখ কচলিয়ে আবারও দেখলো।
– না সে তো ভুল দেখেনি। এ তো মিথিলাই!
ওর চোখ ছানাবড়া। হাতের সিগারেটটি ফেলে দিয়ে আরেকটি সিগারেট ফস করে অগ্নিসংযোগ করে মিথিলা বললো,
– এ পৃথিবীটা শক্তের-ভক্ত। আর এতদিন নারী ছিলাম। আজ থেকে মানুষ হলাম।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply