খুনের নেপথ্যে কারা, বের করা দরকার : ওবায়দুল কাদের

‘শোকাবহ আগস্ট : ইতিহাসের কালো অধ্যায়’ শীর্ষক ওয়েবিনার

আনিস আহামেদ : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মঞ্চের খুনিদের পেছনে যারা নেপথ্যে নায়ক, তাদের খুঁজে বের করা দরকার উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, এসব নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করতে হবে আগামী প্রজন্মের জন্য। আর বাংলাদেশ থেকে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করার জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
গত ১০ আগস্ট আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘উত্তরণ’ আয়োজিত ‘শোকাবহ আগস্ট : ইতিহাসের কালো অধ্যায়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে উদ্বোধক বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, এদেশে যারা রক্তাক্ত আগস্ট ঘটিয়েছিল এবং এর বেনিফিসিয়ারি ছিল, প্রকৃতির আদালতেই তাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
উত্তরণ-এর সম্পাদক ড. নূহ-উল-আলম লেনিনের সভাপতিত্বে ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেনের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধান অতিথি বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ।
ওয়েবিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড শুধু বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ওপর নয়, এই হত্যাকাণ্ড বহু কষ্টে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের ওপর নৃশংসতম হামলা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়েছিল ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতা ও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। এসব ষড়যন্ত্র অভিন্ন ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা।
আগস্ট হত্যাকাণ্ডের কুশীলবরা এখনও সক্রিয় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, মঞ্চের খুনিরা বিচারের মুখোমুখি হয়েছে, ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু এখনও কয়েকজন বিদেশে পলাতক। তাদের ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। আর মঞ্চের খুনিদের পেছনে যারা নেপথ্যে নায়ক, তাদেরও আজ খুঁজে বের করা দরকার আগামী প্রজন্মের জন্য। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মূল্যবোধ ও আদর্শকে একে একে আক্রমণ করা হচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে চিরতরে নির্মূল করতে হবে। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন। প্রতিটি সেক্টরে উন্নয়নের ভীত রচনা করে গেছেন। সেই পথরেখা ধরে বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। অভিষিক্ত হয়েছে উন্নয়নের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। জনমানুষের কল্যাণে নিবেদিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি জনমানুষের আস্থা দিন দিন বাড়ছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সততার রাজনীতি এই পরিবারকে সম্মানের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বঙ্গবন্ধু তার সুযোগ্য কন্যার দেখানোর পথ ধরে ত্যাগের পরকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের অকুতোভয়ে। দলের প্রতিটি নেতাকর্মীকে হতে হবে নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক। অন্যায় অনিয়মের থেকে মানুষকে ভালোবেসে রাজনীতি করব। বঙ্গবন্ধু থেকে শিক্ষা নেব, মানুষকে ভালোবাসার রাজনীতি। এটাই আমাদের শিক্ষা। আসুন আমরা শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করি। দেশকে সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় রূপান্তরে শেখ হাসিনার চলমান অদম্য যাত্রাকে করি আরও বেগবান।
অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর গড়িয়ে গেছে কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের, মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ ইতিহাস রচিত হয়নি। এটা আমাদের ব্যর্থতা ও অপারগতা। বিশেষ করে যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী ও গবেষক হিসেবে দাবি করে, এটা তাদের জন্য একটা কলঙ্কসম। তিনি আরও বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি- আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসটি যেন আমরা তুলে ধরতে পারি আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য। নইলে শুধু দিবস পালন, শুধু আবেগের প্রকাশ, শুধু বক্তাদের নামের আগে বিশেষণ প্রয়োগ, এগুলো দিয়ে কিন্তু কোনো লাভ হবে না। এগুলো থাকবে না। থাকবে বই, যদি সেটা বস্তুনিষ্ঠ হয়।
জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, খুনি জিয়া, খুনি মোশতাক, মাহবুব আলম চাষী, ওবায়দুল রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম, তখন খাদ্য সচিব ছিল মোমেন আরও অন্যান্য যারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবার কথাই কিন্তু পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর রায় এবং তাহের হত্যা মামলার রায়ে উল্লেখ আছে। এরা তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছে; কিন্তু তাদের কি আমরা এভাবে জীবিত রাখতে দেব? আমি ইনডেমনিটি আইন সম্পর্কে একটু কথা বলতে চাই। মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ডের কথা বলেছেন। জুলিয়াস সিজারকে হত্যাকারী ব্রুটাসেরও কিন্তু বিচারকার্য শুরু হয়েছিল। এটি খ্রিষ্টজন্মের আগের কথা। পরবর্তীতে ব্রুটাস আত্মহত্যা করলে তার বিচার সম্পন্ন হতে পারেননি। পৃথিবীতে আব্রাহাম লিংকন হতে শুরু করে যেসব নেতা হত্যার শিকার হয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধী, জন এফ কেনেডি, ওলফ পালমে-সহ যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিচার করা হয়েছে। এমনকি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যাকারী নাথুরাম গডসকে মহাত্মা গান্ধী নিজে মাফ করে দিতে বললেও তার বিচার করা হয়েছে, সাজা হয়েছে। আব্রাহাম লিংকনের যে প্রত্যক্ষ ঘাতক বুজ তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে তার বিচার হয়নি। কিন্তু ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আটজনের বিচার হয়েছিল। এই আটজনের মধ্যে একজন মহিলাসহ চারজনের ফাঁসি হয়েছিল।
পৃথিবীতে কোথাও রাষ্ট্রপতিকে হত্যাকারীদের বিচারের ক্ষেত্রে তাদের ইনডেমনিটি দিয়ে বিচার বন্ধের নজির নেই। প্রাচীন কালের ইতিহাসেও নেই, বর্তমান কালের ইতিহাসে তো নেইই। এটি একটি অত্যন্ত কলঙ্কজনক ঘটনা। আমি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রসিকিউশন টিমের একজন সদস্য হিসেবে মনে করি যে, খুনিদের ইনডেমনিটি দিয়ে বাঁচানোর কারণ হলোÑ খুনি জিয়া ও খুনি মোশতাক মনে করতেন এদের বিচার হলে তাদের নামও চলে আসবে। তাই তারা চেষ্টা করেছিল, এদের যাতে বিচার না হয়। এবং তাদের উচ্চতর কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল খুনি জিয়া। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যায় যারা নেপথ্যে ছিলেন, তাদের মুখোশ আজ উন্মোচিত হয়েছে। একজন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিফ অব আর্মি স্টাফ থাকাকালীন যখন মার্চ মাসে কিছু কর্মকর্তা তাকে এসে বলল যে, একটি রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী এবং রাষ্ট্রপতি পদবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে চাই! তখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্ব ছিল- তাদের বিরুদ্ধে সেনা আইনে ব্যবস্থা নেওয়া ও তাদের আটক করা। কিন্তু মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনি কিছুই করেননি। বরং নিম্নস্থানীয় কর্মকর্তাদের বলা হয়- ‘গো অ্যাহেড’! সিনিয়র অফিসার যখন এটা বলে তখন এটা অর্ডার হয়ে যায়।
কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো সকাল যেন আমাদের জীবনে আর না আসে। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল তারা আসলে বুঝেনি, মানুষকে হত্যা করলেও তার চেতনাকে হত্যা করা যায় না। বঙ্গবন্ধু যে চেতনা গেঁথে দিয়ে গেছেন তা বাঙালি জাতির রক্তে প্রবাহিত। সেই চেতনা নিয়েই বাঙালি জাতি এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।
ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সহ তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয় এবং এই বর্বর হত্যাকা-ের আরও শিকার হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসের, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, নববধূ সুলতানা কামাল, রোজি জামাল, ১০ বছরের শিশুপুত্রকেও খুনিরা রেহাই দেয়নি। হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলকে। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে এসে নিহত হন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জামিল, এই সময় কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, ১৩ বছরের বেবি সেরনিয়াবাত, ১০ বছরের আরিফ সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাতসহ চার বছরের সুকান্ত বাবুসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন সেদিন ঘাতকের হাতে প্রাণ হারান। আমি সকল শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। এই হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের নৃশংসভাবে জেলের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় আমাদের জাতীয় চার নেতাকে। হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। সুতরাং এই যে হত্যাকা- যে ধারাবাহিকতা সে-ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময় আমরা দেখছি জিয়া, এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার আমলে হত্যাকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। প্রশ্রয় শুধু না, তাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছে এবং সেই ইতিহাস আমরা সকলেই জানি। আগস্ট মাসে আমরা ইতিহাসের এই দিকটি নিয়ে আমাদের চেতনাকে শানিত করার জন্য, নতুন করে শপথ নেওয়ার জন্য এবং অন্যায় অবিচার দুঃশাসনকে রুখে দেবার জন্য শোকাবহ এই মাসে নতুন করে শপথ নেই।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, আমার জন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতার কিছু সময় পরে এবং আমি স্বাধীন বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের মতো। আমি ’৭৫-পরবর্তী জাতির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের পরে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিল, তাদের সেই মিথ্যাচার-অপপ্রচার এসব বিষয় জেনেই আমরা বড় হয়েছি। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমি যতই বড় হয়েছি, যতই আমি জেনেছি, যে বিষয়টি সবচেয়ে আমাকে পীড়া দেয়- এক ধরনের গ্লানি দেয়, এখনও যখন সেদিন রাতের হৃদয়হীন, নির্দয়তা, নির্মমতা আমরা দেখেছি। সেখানে শিশু রাসেল ও অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণি থেকে শুরু করে সেখানে সেদিন যারা দায়িত্বরত রাষ্ট্রের পুলিশ কিংবা অন্যান্য কর্মচারী ছিল, তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে হত্যার ষড়যন্ত্র ছিল না। সেটি কালেই প্রকাশিত হয়েছে, সেটি বাংলাদেশকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। এই আগস্ট মাস যখন আমাদের সামনে আসে তখন সেদিনের সেই নির্মমতা আমাদের ভাবায় এবং সেদিনের সেই কষ্ট, গ্লানি এবং অনেক সময় অপরাধবোধ আমাকেও তাড়া করে।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড পরবর্তী প্রতিবাদ আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে ‘উত্তরণ’ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের সাবেক সদস্য ড. নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আমরা আমাদের চোখের সামনে দেখলাম নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিল। এবং আওয়ামী লীগের চিহ্নিত মুজিব কোট পরেই তারা যখন শপথ গ্রহণ করেছে, আমাদের প্রতিরোধের সকল চিন্তা তখন অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আমরা কার নির্দেশে, কার আদেশে, কার অনুপ্রেরণায় কিছু করবÑ সেটা ঠিক করে উঠতে পারিনি। আমাদের প্রাথমিক অবস্থাটা এ-রকমই ছিল। পরের ঘটনাবলি আমার একটি বই ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : প্রতিবাদের প্রথম বছর’ বইতে দালিলিক প্রমাণসহ আমাদের অ্যাক্টিভিটিস ও বিভিন্ন সংগঠনের অ্যাক্টিভিটিস তুলে ধরেছি।
এ-কথাটি এজন্য বললাম যে, আমাদের ছাত্র-সমাজের কোনো উদ্যোগ ছিল না এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা কিছু করে উঠতে পারিনি- এ ধারণাটি ঠিক নয়। রোকেয়া হল থেকে মেয়েদের বের করে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু হল কর্তৃপক্ষ হলের গেটে তালা দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একইসঙ্গে কিশোরগঞ্জের ছাত্র-সমাজ কারও নির্দেশনার অপেক্ষা না করে তারা নিজেরাই প্রতিবাদ করে। বরগুনার তৎকালীন এসডিওর নেতৃত্বে ছাত্র-সমাজ কয়েকদিন পর্যন্ত বরগুনাকে মুক্ত রেখেছিল। খুলনা- সেখানে প্রতিবাদ হয়েছিল। এ-রকম বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে অনেক জায়গাতে প্রথম দিনের প্রতিবাদ হয়েছে বা তার পরের দিন হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কোনো উদ্যোগ না দেখে তারা আর আগায়নি। আমাদের সম্মিলিত হওয়ার বা পুনঃসংগঠিত হওয়ার জন্য আমরা কিছুটা সময় নিয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বন্ধের সময় আমরা ঢাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ছাত্র-সমাজকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছি। জাতীয় ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ, বাকশালের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সেই প্রস্তুতির খবর আপনারা জানেন। ৪ নভেম্বর একটা মৌন মিছিল নিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। ইতোমধ্যে অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। সে-সময়ের মিলিটারি কর্তৃপক্ষ আমাদের সেই মৌন মিছিলে বাধা দেয়। তা সত্ত্বেও সেবারই প্রথম ৪ নভেম্বর আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সক্ষম হই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply