পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ

সম্পাদকের কথা: একজন উচ্চাকাক্সক্ষী সেনা শাসকের অবৈধ গর্ভজাত বাজাদ (বেজাত?) নামক সার্কাস পার্টিটি ৪২ বছর পার করিয়াছে। জন্মলগ্নে তাহাকে পুষ্টি জোগাইয়াছে বাংলাদেশের ইতিহাসের উচ্ছিষ্ট, পরিত্যক্ত ও গোলামে পাকিস্তানের ভাবাদর্শের কীটপতঙ্গরা। নতুন কিছু সৃষ্টি করতে অক্ষম (বাজা) দলটি মদত পাইয়াছে ‘পাকসার জমিন সাদবাদ’ওয়ালাদের নিকট হইতে। বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে উর্দিপরা তাহাদের মতো পার্মানেন্ট পলিটিক্যাল পার্টিকে জবরদস্তি আসীন দেখিয়া উদ্বাহু নৃত্য করিতে করিতে মারহাবা মারহাবা বলিয়া মাতোয়ারা করিয়াছে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতাকারী চৈনিক কমরেডরা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভ্রান্ত বেরাদারানরা এবং পশ্চিমের বড় ভাইরা বাজা দলের জন্মকে স্বাগত জানাইয়াছিল। যার যার স্বার্থে বেসামরিক পোশাকে ‘সামরিক গণতন্ত্র’কে মদত জোগাইয়াছিল।
৪২ বছরে বুড়িগঙ্গা দিয়া অনেক পানি গড়াইয়াছে। নিজের উর্দিপরা জ্ঞাতি ভাইয়েরা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করিবার পর মোহেতারেমা খালেদা বেগম দুই পূর্ণ মেয়াদে বাংলাদেশের উজিরে আজম হইয়াছিলেন। জিয়া-সাত্তার-খালেদা মিলে ‘বাজাদল’ প্রায় ১৬ বৎসর ক্ষমতার মজা লুট করিয়াছে। অথচ সেই দলটি এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়িয়া গভীর অনিশ্চয়তার সাগরে হাবুডুবু খাইতেছে।
ইহার কারণ কী? প্রথমত জন্মের পাপ। বাজাদল জনগণের ভেতর হইতে উত্থিত কোনো দল নহে। তাই দেশ ও জনগণের মধ্যে তাহাদের কোনো দৃঢ়মূল শেকড় নাই। এই দলটির ভা-ারে আছে অন্ধ আওয়ামী লীগ বিরোধিতা, পরিচ্ছন্ন আদর্শের সংকট, অবৈজ্ঞানিক ও ধর্মাশ্রিত পাকিস্তান মার্কা ‘জাতীয়তাবাদ’। এমনকি জনগণ ও দেশের কল্যাণে দলটির কোনো কর্মসূচি নাই। এমন একটি দলকে মানুষ কেন তাহাদের আস্থার দল মনে করিবে? দুর্নীতির দায়ে দলীয় প্রধান স্বয়ং খালেদা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ তথা দুর্নীতির দায়ে দ-প্রাপ্ত অপরাধী। খালেদা-বিএনপির উত্তরাধিকার তারেক জিয়াও দ-িত আসামি। এই যদি হয় দলের নেতৃত্বের অবস্থা, সেই দলের প্রতি জনগণ তো দূরের কথা, দলীয় নেতাকর্মীরা বিশ্বাস ও আস্থা রাখিবে কী করিয়া?
খালেদার মুক্তি এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গিবত গাওয়া ছাড়া বাজাদলের আর কোনো কাজ নাই। সর্বোপরি সাহস ও ঝুঁকি নেওয়ার কোনো মনোভাব নাই। তাই তাহারা কোনো আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে ব্যর্থ হইয়াছে। এছাড়া সন্ত্রাসী মৌলবাদী যুদ্ধাপরাধীদের কোলে আশ্রয় গ্রহণ এবং তাহাদের ক্ষমতার অংশীদার করিয়া জাতীয় আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইয়াছে। দৃশ্যত বিএনপি এখন বন্ধুবিহীন (পাকিস্তান ছাড়া)। বস্তুত, বিএনপি এখন নেতৃত্বের শূন্যতায় ভুগিতেছে। তাহাদের কোনো সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি নাই। নাই বাস্তবতার উপলব্ধি। ২১ আগস্টের মতো তাহাদের একাধিক হিংসাশ্রয়ী কর্মকা- প্রমাণ করিয়াছে দলটি আসলে প্রতিহিংসা পরায়ণ, সন্ত্রাসী। দলটির সম্ভাবনা এখন ক্রমহ্রাসমান। লক্ষ্যহীন, পথহারা পাখির মতো বাজাদল এইভাবে চললে তাহার নিশ্চিহ্ন হইয়া যাওয়াই ভবিতব্য।
তবে এই দেশের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শক্তির আত্মপ্রসাদ লাভ করিবার উপায় নাই। দেশের সর্বোচ্চ আদালত জিয়া এবং তাহার উত্তরসূরি খুনি মোশতাক ও জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করিতে গিয়া উদ্ঘাটিত হইয়াছে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য নায়কদের একজন। মৃত বলিয়া তখন তাহাকে আসামি করা হয় নাই। এখন কথা উঠিয়াছে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্রের কুশীলবদের বিচার সম্পন্ন করিতে হইবে। জিয়ার অবৈধ ক্ষমতা দখল ও সামরিক ফরমান বলে সংবিধান কর্তনকে আমরা বিএনপির জন্মলগ্নের পাপ বলিয়াছি। আখেরে এই ধরনের দলের টিকিয়া থাকা প্রায় অসম্ভব। বাজাদল তাহার কর্মফল ভোগ করিতেছে। খালেদার যেমন ক্ষমতায় ফিরিয়া আসা সুদূর পরাহত; তেমনি তাহার অপগ- ও উদ্ধত পুত্রটির ক্ষেত্রেও তা সত্য। তবু এ-কথা মানিতে হইবে, সমাজে এখনও পর্যন্ত এই দলটির দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রভাব আছে। কাদায় মুখ লুকাইয়া হইলেও স্বাভাবিক সাংবিধানিক সরকার ও গণতান্ত্রিক চর্চার সুবাদে তাহাদের অস্তিত্ব টিকিয়া আছে। তবে টিকিয়া থাকা আর জনপ্রিয় দল হইয়া উঠিবার মধ্যে পার্থক্য আছে। জনগণকে মোবিলাইজ করিয়া গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার রদবদল করা দুরূহ। কিন্তু হত্যা-ষড়যন্ত্রে পারদর্শী এই দলটি রক্তাক্ত পথে হইলেও ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করিবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
আর এই আশঙ্কা বিদ্যমান থাকিবার কারণে আওয়ামী লীগ ও তাহার সহযোগী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলিকে সতর্ক থাকিতে হইবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply