প্রতিশ্রুতি

ফরিদুর রহমান

ভোরবেলা একটা হৈচৈ শুনে মনিরের ঘুম ভাঙে। বৃষ্টি হতে পারে মনে করে রাতে জানালাটা বন্ধ করে রেখেছিল। অনেক রাত পর্যন্ত জমাট আড্ডা দিয়ে দেরিতে ঘুমিয়ে এত ভোরে জেগে যাওয়ায় যথেষ্ট বিরক্ত সে। বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে জানালার পাল্লা খুলে ঘটনাটা বুঝতে চেষ্টা করে। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রায় সকলেই দেরিতে ওঠে আর শুক্রবার ছুটির দিনে তো কথাই নেই। বেলা দশটার আগে কারও সকাল হবার কথা নয়।
শেরেবাংলা হল এবং আমির আলি টিনশেডের মাঝের রাস্তায় একটা জটলার মতো মনে হয়। ঠিক মিছিল নয়, তবে সংখ্যায় আট-দশজন জটলা পাকিয়ে পূর্ব দিক থেকে এসে মূল ক্যাম্পাসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এদের দু-একজন মাথার ওপরে দুই হাত তুলে নাচের ভঙ্গিতে ঘুরছে, একজন হাতে একটা কাঁসা বা পিতলের থালা কাসর ঘণ্টার মতো তালে তালে কাঠি দিয়ে পিটাচ্ছে। মনির সদ্য ঘুমভাঙা চোখের দেখা এবং কানে শোনা সেøাগানে উচ্চারিত কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছিল; কিন্তু ক্রমেই দূরে সরে যেতে যেতে মিছিলের শব্দাবলি দ্রুত তার শ্রবণের সীমা অতিক্রম করে যায়। তবে এরই মধ্যে যেটুকু তার কানে আসে তা শুধু অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য নয়, সেøাগানের প্রতিটি শব্দ তার শরীরে রক্ত হিমকরা এক ভীতির অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়। বালিশটা আঁকড়ে ধরে বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে থাকে মনিরুজ্জামান।
মনির ঠিক কতক্ষণ এভাবে কাটিয়েছে জানে না। দরজায় ঘনঘন অস্থির ধাক্কা শুনে সে দ্রুত উঠে পড়ে। পাশের বিছানায় নাজমুল এখনও অঘোরে ঘুমাচ্ছে, মৃদুলের বিছানাটা খালি। দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেন ফাইনাল ইয়ারের খালেক ভাই। কোনোরকমে দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করেন, ‘বঙ্গবন্ধু ইজ নো মোর… আর্মিরা তাকে মেরে ফেলেছে।’
মৃদুলের বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দেন খালেক ভাই। মনির কোনো কথা বলে না, সে ধীরে ধীরে খালেক ভাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েস্ট হাউস থেকে বেলাল ভাই, উপর থেকে টিপু এবং পাশের ঘর থেকে ছোট্ট একটা ট্রানজিস্টার রেডিও হাতে রুহুল আমিন এসে হাজির হয়। সবার চোখ-মুখেই চাপা আতঙ্ক আর বিস্ময় থাকলেও রুহুলকে কিছুটা নির্ভার-নিশ্চিন্ত মনে হয়। হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে নাজমুল জানতে চায়, ‘কি রে, এত সকালে কীসের মিটিং?’
রুহুল আমিন তার পকেট ট্রানজিস্টারটা নাজমুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘শোন!’ ভলিউমের নব ঘুরিয়ে সবচেয়ে উপরে তুলে দিলেও খুব ভালো শোনা যায় না। সকলেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে পরবর্তী ঘোষণার অপেক্ষা করে। অস্পষ্ট হলেও বেতার তরঙ্গে ভেসে আসা একটি হিংস্র কণ্ঠস্বর শোনা যায়। ‘রেডিও বাংলাদেশ। মেজর ডালিম বলছি। শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে…’
‘হোয়াট!’ বলে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠতে গেলে নাজমুলের হাত থেকে রেডিওটা ছিটকে পড়ে বহু দূরে চলে যায়। রুহুল আমিন ওটা কুড়িয়ে এনে চালু করার আগেই খালেক ভাই মনিরকে কাছে ডেকে নেন। ফিসফিস করে বলেন, ‘ভিড় যেভাবে বাড়ছে, তাতে এখানে বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ হবে না। তুমি রেডি হয়ে নাও ২৪৮-এ সবার সাথে বসে একটা ডিসিশন নিতে হবে।’
বেলা বাড়ার সাথে সাথে ক্যাম্পাসের ছাত্র ইউনিয়ন অফিস হিসেবে পরিচিত আমির আলি হলের ২৪৮ নম্বর রুমে ভিড় বাড়তে থাকে। একে একে এগারো জন উপস্থিত। বারোতম আবদুল হাই একটু ভীতু কিসিমের। সে জুম্মার নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে অথবা অজুহাত হিসেবে পাঞ্জাবি পরে একটা টুপি মাথায় দিয়ে চলে এসেছে। অন্য সময় হলে এটা নিয়েই খানিকক্ষণ হাসাহাসি চলত। কিন্তু আজ সবাই গম্ভীর, যদিও ভীতি এবং অবিশ্বাসের পরিবর্তে ক্রমেই দানা বাঁধছে অনিশ্চয়তা এবং ক্রোধ। সকলেরই জানা ছিল, যে কোনো সংকটে বা সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন হলে এখানেই সকলকে পাওয়া যাবে। তাই কিছু পরে আহসান ঘরে ঢুকলে অবাক হয় না কেউই। কিন্তু তার চেহারা দেখে হঠাৎ করেই চিনতে পারা যায় না। বয়সে সবার বড় সুব্রতদা তার গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে দম-বন্ধ সকালেও হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেন, ‘পরিস্থিতি যাই হোক, তোমার তো এখনই মাথা ন্যাড়া করে ছদ্মবেশ ধারণ করার দরকার ছিল না।’ ‘আমি কী আর ইচ্ছে করে মাথা ন্যাড়া করেছি। সকালে সাহেব বাজারের দিকে গিয়েছিলাম, আর্মি ধরে মাথা কামিয়ে দিয়েছে।’ ‘বঙ্গবন্ধুকে খুন করার পরে আমাদের সেনাবাহিনী তাহলে একটা কাজের মতো কাজ পেয়েছে। বাস্টর্ডস!’
খালেক ভাইয়ের কণ্ঠে ক্রোধ। মনির শুরু থেকেই চুপচাপ ছিল, এখন সে একটু উসখুস করে। এ সময় হল শাখার সভাপতি পঙ্কজ ম-ল একটু নড়েচড়ে বসে বলে, ‘বন্ধুরা! যদিও আজ কোনো আনুষ্ঠানিক কোনো সভা করার মতো অবস্থা নাই, তবুও আলোচনা করে আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত।’
আলোচনা খুব দীর্ঘস্থায়ী হলো না। সিদ্ধান্ত যা হতে পারে তাও প্রায় সবারই জানা ছিল। নেতৃস্থানীয় কেউ আজ রাতে হলে থাকবে না। পুলিশ বা আর্মি কাকে কখন তুলে নিয়ে যাবে ধারণা করা কঠিন। কাজেই শহরে বা অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব না হলে অন্তত নিজের ঘরে থাকা চলবে না। দ্বিতীয়ত; কে কোথায় যাচ্ছে বা কোথায় থাকছে জাসদের ক্যাডাররা যেন অবশ্যই জানতে না পারে। কারণ ভুলে গেলে চলবে না, আজ সকালের আনন্দ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে জাসদ ছাত্রলীগের শরিফুল। এরা ছাড়াও ছাত্রমৈত্রীসহ চীনপন্থিদের সাথে কথা বলার ব্যাপারেও সাবধান থাকা দরকার। তৃতীয়ত; কারফিউ না থাকলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যাম্পাস ছাড়তে হবে। গ্রামের বাড়ি বা অন্য কোনো নিরাপদ শেল্টারে থেকে পরিস্থিতি বুঝে তারপর ক্যাম্পাসে ফিরলেই চলবে। তবে শহর ছাড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন, বিনোদপুর বা কাজলা বাসস্ট্যান্ড এড়িয়ে চলতে হবে।
রাজশাহী শহরে বা আশপাশে কোথাও রাতের আশ্রয় মিলতে পারে এমন কারও কথা মনিরের মনে পড়ে না, তাই আপাতত হলেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। গাছপালায় ঘেরা শেরেবাংলা হলের রাতগুলো এমনিতেই নিজ্ঝুম। কারফিউয়ের কারণে অন্ধকার এবং নৈঃশব্দ দুটোই বেড়েছে। সাড়ে নয়টার দিকে মনির যখন বেরিয়ে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে সেই সময় ঝড়ো কাকের মতো ঘরে ঢোকে কানু মোহন গোস্বামী। হাতের ব্যাগটা বিছানায় ফেলে চাপাগলায় বলে, ‘রাতটা তোর এখানে থাকতে এলাম। সমস্যা হবে না তো? আর সমস্যা হলেই বা কি, একটা রাত মাত্র!’
বিস্মিত মনির কী বলবে প্রথমে ভেবে পায় না। তারপর হাসতে হাসতেই বলে, ‘দাদা, আপনি তো শিল্পী, গানের মানুষ। বাসায় থাকলেও আপনার কোনো সমস্যা হবার কথা নয়।’
‘সে-জনেই তো ভয় আরও বেশি। এই আর্মি শালারা গান-বাজনা একেবারেই পছন্দ করে না। দেশটা তো ইসলামিক রিপাবলিক হয়ে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে আমার নামটাই বড় সমস্যা।’
সমস্যার স্বরূপ বুঝতে দেরি হয় না মনিরের। নিজের বিছানাটা কানুদাকে ছেড়ে দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। দাদা অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘রাতে তুই কোথায় থাকবি?’
‘আমি একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছি। সকালে দেখা হবে।’ কথা না বাড়িয়ে সে বেরিয়ে যায়।
আরব আলির তেল চিটচিটে বিছানা বালিশে শুয়ে মনিরের ঘুম আসে না। দুপুরে মিটিং শেষে ফেরার পথেই হলের বাবুর্চির সাথে কথা বলে রেখেছিল। ফরিদপুর থেকে আসা এক মুখ সাদাকালো দাড়ির হাস্যোজ্জ্বল আরব আলিকে ভীষণ বিমর্ষ দেখেই মনিরের মনে হয়েছিল তাকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময়টুকু বাদ দিয়ে একুশ বছর বয়েস পর্যন্ত ঘরে-বাইরে সব সময়ই ধোপদুরস্ত বিছানা-বালিশে অভ্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাত্ত্বিক আলোচনায় শ্রেণি সংগ্রাম, স্লোগানে শ্রমজীবী মানুষ এবং স্বপ্ন হিসেবে সর্বহারার মুক্তির কথা বলেও শ্রমিক-শ্রেণির মানুষের বিছানায় শুয়ে সারারাত ছটফট করে। মশার সুরেলা ওড়াউড়ি এবং ছারপোকার নিঃশব্দ কামড় সহ্য করে মাঝরাতের কোনো একসময় ঘুমিয়ে খুব সকালে উঠে পড়ে মনির।
পরিচিতদের মুখোমুখি হবার ঝামেলা এড়াতে কিছুটা রিকশায় কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে পরদিন দুপুরের দিকে মনির কাঁটাখালি পৌঁছাল। লোকাল বাস দ্বিগুণ সময় নিয়ে যাবে জেনেও সে একটা নড়বড়ে বাসে উঠে পড়ে। পথে সময় আরও বেশি নিলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু পেছনের দিকে জানালার পাশে বসে শুরুতে যে স্বস্তি সে অনুভব করেছিল, পুঠিয়া পৌঁছবার আগেই বৃষ্টি এসে সেই সুযোগ দুর্ভোগে রূপান্তরিত হলো। কেবল তখনই সে লক্ষ করল জানালা বন্ধ করার কোনো উপায় নেই। কাঁটাখালি থেকে আড়াই ঘণ্টা পরে মনির যখন নাটোর স্টেশনের কাছে এসে বাস থেকে নামল, ততক্ষণে বৃষ্টি ছেড়ে গেলেও জামা-কাপড় ভিজে শেষ।
ঘণ্টাখানেক আগে পৌঁছাতে পারলে সন্ধ্যার সীমান্ত এক্সপ্রেস ধরতে পারত মনির। এখন প্রায় সারারাত প্লাটফর্মে কাটিয়ে ভোরের দিকে খুলনা মেইল ভরসা। স্টেশনে লোকজনের তেমন ভিড় নেই। যারা আছে তারাও প্রায় চুপচাপ, কেউই কারও সাথে কথা বলে না। বারদুয়েক প্লাটফর্মের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত চক্কর দিয়ে একমাত্র চায়ের দোকানে বিস্বাদ চায়ে চুমুক দিয়েও সময় কাটতে চায় না। আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার কথা ভাবতে ভাবতে প্লাটফর্মের উত্তর দিকে পা বাড়াতেই উর্দিওয়ালা কয়েকজনের মুখোমুখি পড়ে যায় মনির। সেনাবাহিনীর একজনের কাঁধে স্টেনগান ঝোলানো, অন্যজন নিরস্ত্র এবং দেখতেও নিরীহ কিসিমের। পেছনে তিন পুলিশের কাছে তিনটি থ্রি নট থ্রি।
‘প্লাটফর্মে ঘোরাঘুরি করেন কেন?’ জিজ্ঞেস করে স্টেনগানওয়ালা।
‘সীমান্ত এক্সপ্রেস মিস করেছি। পার্বতীপুর মেইল ধরব।’ সংক্ষেপে উত্তর দেয় মনির। এবারে পুলিশ তিনজনের একজন মনিরের কাঁধের ব্যাগে রাইফেলের নল নিয়ে খোঁচা দেয়, ‘ব্যাগে কী?’
‘জামা কাপড়, লুঙ্গি গামছা আর দুই-একটা বইপুস্তক।’
‘বোজলেন না, ইনিভারসিটির ছাত্র, মজিবরের চ্যালা অহন পলাইতাছে!’
এ সময় চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে হয় মনিরের। মনে মনে বলে, ‘শুয়োরের বাচ্চারা! সাড়ে তিন বছরের মধ্যে শেখ মুজিবকে মেরে তোদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে হবে জানলে কোন বেকুব আঠারো বছর বয়সে মরার জন্যে যুদ্ধ করতে যেত!’
‘যান ঘোরাঘুরি না করে ওয়েটিং রুমে বসেন।’ নিরীহ নিরস্ত্র সেনা সদস্যটি মনিরকে এ-যাত্রা রক্ষা করে।
দুর্গন্ধযুক্ত ওয়েটিং রুমে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, ভোরের ট্রেনে গাদাগাদি করে বসে ঝিমাতে ঝিমাতে ঘণ্টাতিনেকের পথ পাড়ি দিয়ে এবং সবশেষে ভাঙাচোরা রাস্তায় তার চেয়ে বেশি ভাঙাচোরা মুড়ির টিনে চেপে মনির যখন রাইকালী গ্রামে সেজখালার বাড়ির উঠানে পা রেখেছে তখন বেলা সাড়ে এগারোটা। বারান্দায় পেতে রাখা চৌকির ওপর সটান শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল তার। সেজখালা অবশ্য মনিরের অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন, ‘কিছু একটা মুখে দিয়ে ঘুমাতে যা বাবা। পরে তোর কথা শুনব।’
খালার বড় মেয়ে মিলা আপা তাড়াতাড়ি গামলা ভরা আম দুধ আর একটা ডালায় খই নিয়ে এসে সামনে রেখে বলে, ‘তুই যে শেষ পর্যন্ত আসতে পারবি আমরা কেউই ভাবিনি।’
‘উঁই কি আর ইমনি আসিছে, আর্মির তাড়া খ্যায়ে ভ্যাগিছে।’
‘সøামালেকুম খালু।’
হঠাৎ সামনে সেজখালুকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয় মনির। বলে, ‘তাড়া দেওয়ার আগেই কেটে পড়েছি। ভাবলাম এই সুযোগে মিলাপুর বিয়েটাও দেখে যাই। তারিখ ঠিক আছে তো?’
‘ঠিক আছে মানে! শেখ মজিবরের বাকশালের আমলে কথাবার্তা শুরু হচ্ছিল, আর বিয়া পড়ান্যা হবে এ্যাখোন মোস্তাকের ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশে! ভালোই হ্যছে কি কও?’
‘দেশটা কিন্তু এখনও ইসলামিক রিপাবলিক হয়নি খালু।’
‘হয়নি হতে কতক্ষণ! প্রোক্রিয়া শুরু হ্যয়ে গেছে, সৌদি আরব, লিবিয়া স্বীকৃতি দিলো ব্যলে …’
‘ছেলেটা রাত জেগে এসেছে আব্বা, একটু নাস্তা করে ওকে ঘুমাতে দাও, কথা পরে হবে।’ মিলা তার পাকিস্তানপন্থি বাবার হাত থেকে মনিরকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে।
‘ঠিক আছে তুমি খ্যায়েদায়ে রেস্ট ল্যাও, পরে তোমার সাথে রাজনীতি লিয়ে আরও আলোচনা-সমালোচনা হ্যবে।’
শুধু ঘুম নয়, প্রচ- খিদেও পেয়েছিল মনিরের। তাই খালু চলে যাবার পরে দ্রুত হাপুস-হুপুস করে খেয়ে সে ঘুমাতে যায়। সেজখালার বিশাল বাড়িতে ঘরের অভাব নেই। মিলাপু মনিরকে নিয়ে যায় ছোট বোন নীলার ঘরে। নীলাই চিঠিতে মনিরকে আসতে লিখেছিল, সাথে আবার একটা ফর্মাল বিয়ের কার্ড! ঘণ্টাখানেক আগে এলেও নীলার সাথে এখনও দেখা হয়নি, তবে ওর কথা মিলাপুকে জিজ্ঞেস করতেও কেমন যেন বাধে। অথচ বছরখানেক আগেও এমন কোনো সমস্যা হতো না। গত বছর এইচএসসি পরীক্ষার সময় শহরে ওর বড়খালা অর্থাৎ মনিরদের বাসায় থেকে পরীক্ষা দেওয়ার সময় থেকেই সম্পর্কটা অন্যরকম হয়ে গেছে। সত্যি বলতে কী, মনির বিয়েতে আসবে না জানাবার পরেও প্রথম সুযোগেই চলে এসেছ এবং সেটা প্রথমত নীলার জন্য।
মিলাপু বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে মনির। ঘুমের মধ্যেই ভোরের রেলগাড়ির যাত্রীদের কথা তার কানে ভেসে ভেসে আসতে থাকে।
‘সবই ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যারা চায়নি তাদের সাথে নিয়ে সিআইয়ে ঘটনাটা ঘটিয়েছে।’
‘কাজটা যারাই করুক খুব একটা খারাপ করেছে বলতে পারব না বারী ভাই। বাকশাল করে স্বৈরাচার একবার জেঁকে বসলে ভবিষ্যতে নামানো কঠিন হতো।’
‘তুমি যাই বলো মোহসীন, এভাবে রাতের অন্ধকারে জাতীয় নেতাকে মেরে দেশের কোনো উন্নতি হতে পারে না।’
‘তোরা কেউ গতকালের ইত্তেফাক দেখেছিস, দেশের এত সমস্যা বাদ দিয়ে হারামজাদা মোশতাক জাতীয় টুপির ডিজাইন নিয়ে ব্যস্ত!’
‘চুপ আস্তে! এই শয়তানটাই কিন্তু এখন দেশের প্রেসিডেন্ট!’
‘ধুর! তোর প্রেসিডেন্টের গুষ্টি কিলাই। শালাকে দেখলেই তো একটা জোকার মনে হয়।’
পাশ ফিরে শুয়ে আবার গভীর ঘুমের ভেতরে লক্করঝক্কর বাসের ঝাঁকুনি এবং ক্যাঁচকোঁচ শব্দের সাথে মনির তার সহযাত্রীদের কথা শুনতে পায়।
‘ক্যারে শ্যাক মজিবরক বলে ম্যারে ফ্যালাচে?’
‘তুই এ্যাদ্দিন কোন্টে আছুলু? তিন দিন হ্যয়ে গেল! ছলপল সব শুদ্ধা ম্যারে ভুনাট ক্যরে ফ্যলাচে।’
‘কামডা ভালো হয়নি রে বাপু। তাই তো দ্যাশ স্বাধীন করিছিল। এ্যাতো কষ্টো ক্যরে দ্যাশ স্বাধীন ক্যরে কী লাভটা হলো কও দিনি?’
‘অ্যলা রাজনীতির কতা আর ক্যয়ো না। চুপচাপ দেকে যাও আর শুনে যাও।’
‘ক্যা! দ্যাশের ম্যানুষ কী বানের পানিত ভ্যাসে আসিচে? কতা কওয়ার অধিকার সগলারই আছে।’
‘তুই কোন্টেকার জুমিদার হে? শালার ইয়াকত কষে দুডা বাড়ি দিলে সোজা হবে।’
‘মার শালাক!’
হঠাৎ বাসের চাকা একটা গর্তে পড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায় না-কি মনিরের ঘুম ভেঙে যায় সে বুঝতে পারে না। চোখ খুলেই সামনে দেখে হাসি-হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে নীলা।
‘ভাইজানের ঘুম ভাঙলো তাহলে! যাও এখন গোসল করে খেয়ে নাও।’
মনির বিছানায় উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙে। নীলার মুখের দিয়ে তাকিয়ে থাকে তারপরে বলে, ‘সকালে তোকে দেখলাম না যে, কোথায় ছিলি?’
‘তুমি তো আর আমাকে দেখতে আসোনি, মিলাপুর বিয়েতে এসেছ। আমাকে দেখবে কেমন করে!’ নীলার কণ্ঠে অভিমান গলে পড়ে, মনির অপলক তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।
‘আমাদের জীবনে একটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটে গেছে রে। এ-রকম একটা পরিস্থিতি না হলে হয়তো আসতেই পারতাম না।’
‘মিলাপুর জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে তিন দিন পরে।’
‘বিয়ের কথাবার্তা তো চলছে অনেকদিন থেকে, তাছাড়া মিলাপুর নিজের কোনো পছন্দ ছিল বলে জানি না। তাহলে সমস্যা কোথায়?‘
‘পাখির মতো উড়ে বেড়ানো মেয়েটা এবারে খাঁচায় বন্দি হয়ে যাবে। মিলাপুর হবু শ্বশুর তো পুরাই পাকিস্তানি, যুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিল।’
‘ভালোই তো মেজখালুর সাথে মিলবে ভালো।’
‘বাবা হচ্ছে মুখে মুখে ইসলামপন্থি। নামাজ রোজার নামগন্ধ নাই; কিন্তু দেশটা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হচ্ছে সেই খুশিতে লাফাচ্ছে। রেডিওতে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সাগর সেনের রবীন্দ্রসংগীত শুনে এখনও আহা উহু করতে থাকে।’
‘মেজোখালুর ব্যাপারটা অবশ্য আমি বুঝতে পারি।’
‘মিলাপুর শ্বশুর বাড়ি কিন্তু তেমন হবে না। একবার ঘরে ঢুকে পড়লে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলবে।’ এই পরিস্থিতিতে মনির কী বলবে ভেবে পায় না। নীলাই আবার তাকে তাড়া দেয়, ‘মনিভাই, অনেক বেলা হয়েছে এবারে উঠে পড়ো।’
জাতীয় দুর্দিন, নির্মম হত্যাকা- কিংবা রাজনৈতিক সংকট, কোনো কিছুতেই কিছু আটকে থাকে না। বিয়ে বাড়ির আনন্দ আয়োজন চলতে থাকে যথারীতি। শুধু মনিরের বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে ক্ষোভের নিঃশব্দ কান্না আর মাথার ভেতরে ধিকিয়ে ধিকিয়ে জ্বলতে থাকে ক্রোধের আগুন। এই দুঃসময়েও রাইকালীর মতো গ্রামে সাধ্যমতো আয়োজনের কোনো ত্রুটি রাখেননি খালা-খালু। দুদিনের মধ্যে বিশাল বাড়ি আত্মীয়স্বজন অতিথি অভ্যাগতদের উপস্থিতিতে থৈ থৈ করতে থাকে। আনন্দ কোলাহলে পরিপূর্ণ এই বাড়িতে নিজেকে নিঃসঙ্গ এবং অপাঙ্ক্তেয় বলে মনে হয় মনিরের। বিকালে বাড়ির পেছনের পুকুর ঘাটে বসেছিল সে। নীলা ছুটতে ছুটতে এসে খবর দেয়, ‘মনিভাই তুমি এখানে! বড়খালা সেই কখন থেকে তোমাকে খুঁজছে।’
‘মা এসেছে না-কি? তুই যা আমি আসছি।’
‘উঁহু তা হবে না, তুমি আমার সাথে চলো। তাছাড়া শুধু খালা নয়, আমার খালাতো বোনেরাও হাজির।’
ছেলে-মেয়েদের নিয়ে মনিরের মায়ের এমনিতে কোনো বাড়তি আদিখ্যেতা নেই। তারপরেও এবারে কেন যেন ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝতে চান সে কতটা ভালো আছে। মায়ের কথা থেকে মনির বুঝতে পারে তার আসার সংবাদ নীলা আগেই তার বড় খালাকে পাঠিয়েছে। মনিরের খবর না পেলেও মা হয়তো আসতেন, তবে এক মুহূর্তও স্বস্তি পেতেন না।
বাড়িতে লোকজন বেড়ে যাওয়ায় তৃতীয় রাতে মনির স্থানান্তরিত হলো মিলাপুর দাদির ঘরে। বছরখানেক আগে দাদি মারা যাবার পর থেকে এ ঘরে কেউ থাকে না। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরটাকে ওরা সাজিয়ে-গুছিয়ে ঝকঝকে তকতকে করে রেখেছে। মনির ঘুমাতে এসে দেখে কেউ একজন আগে থেকেই ঘুমিয়ে আছে। নীলা বলল, ‘দুটো রাত তোমার একটু কষ্ট হবে। চাচার ছোট ছেলে চয়ন এসেছে আজই। ও থাকবে তোমার সাথে।’
‘কোনো সমস্যা নেই। বিয়েবাড়িতে ঠিকঠাক ঘুমাবার জায়গা পাচ্ছি, এই তো বেশি।’
‘তোমাকে অবশ্য আরও একটা বিশেষ কারণে এই ঘরে পাঠানো হয়েছে। মা বলেনি কিছু?’
‘না তো। খালা কিছু বলেনি।’
‘দেখছো না লোহার সিন্দুক, স্টিলের আলমারি এমন কি মিষ্টির প্যাকেট রাখার তাকগুলোও এই ঘরে। বিয়ের গয়নাগাটি, নগদ টাকা-পয়সা সবকিছুই এখন তোমার দায়িত্বে থাকল। মা তোমার চেয়ে বিশ্বস্ত আর কাউকে খুঁজে পায়নি।’
‘আজীবন তোকে পাহারা দেবার দায়িত্বটাও খালা নিশ্চিন্তে আমার ওপর ছেড়ে দিতে পারে।’
‘সময় আসুক, দেখা যাবে।’
নীলা চলে যাবার পরে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ে মনির।
শুক্রবার সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হলো। কথা ছিল বরযাত্রীরা জুম্মার নামাজের আগেই এসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মিষ্টিমুখ করে নামাজে যাবেন। দুপুরে মসজিদ থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়া, তারপর কিছু গ্রামীণ আচার অনুষ্ঠানের পরে বিকালের দিকে বাড়ি ফিরবেন নতুন বউ নিয়ে। বৃষ্টির কারণে বরপক্ষ রাইকালী পৌঁছতেই জুম্মার আজান পড়ে গেল। বরযাত্রী দলের মেয়েরা বাড়িতে চলে এলেও বাদবাকি সকলেই আশ্রয় নিয়েছেন মসজিদে। বাড়ি থেকে মসজিদ তিন মিনিটের পথ, ইচ্ছা করলে এক ছুটে চলে আসা যায়। কিন্তু ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে সম্মানিত অতিথিদের তো ভিজতে দেওয়া যায় না। সেজখালু কয়েকটা ছাতা হাতে দিয়ে মেজখালার এক দেবরসহ মনিরকে পাঠালেন বরযাত্রীদের নিয়ে আসতে। মনির মুরুব্বি গোছের একজনের মাথায় ছাতা ধরে সম্মানের সাথে বাড়ির বারান্দার কাছে পৌঁছাতেই সেজখালু দুই হাত বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে বললেন, ‘আসেন বিয়াই সাহেব। বিষ্টি অ্যাসে আমাদেক বড়োই বেইজ্জত ক্যরে ফ্যালালো।’
কেউ না বলে দিলেও মনিরের বুঝতে বাকি থাকে না ইনিই মিলাপুর শ্বশুর।
বর্ষাকাল শেষ হলেও বৃষ্টির ধারাবর্ষণ থেমে থেমে চলতেই থাকে। এরই মধ্যে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অতিথি অভ্যাগতদের খাইয়ে খালাতো মামাতো ভাইবোনদের সাথে মনির যখন খেতে বসল তখন বিকাল গড়িয়ে গেছে। সন্ধ্যার পরে কাঁচা রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে ফিরতে সমস্যা হবে বলে বরপক্ষের লোকজন ঘনঘন তাড়া দিতে থাকে। তারপরেও নতুন বর-বউকে একসাথে বসিয়ে সামনে আয়না ধরে যখন মুখ দেখাদেখির পালা চলছে; বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়ানো সেজখালা মনিরের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠেন, ‘সত্যি করে কও তো বাবা, সাজ-মানা হ্যচে?’
চমকে ওঠে মনির। আপাত দৃষ্টিতে দেখতে মানানসই হয়েছে কি না, তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু পরিশীলিত বাংলায় কথা বলা, যুক্তিবুদ্ধিতে সবাইকে হারিয়ে দেওয়া, কবিতা লেখা গান গাওয়া, সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা সেজখালার এ কী অবস্থা! কিছু বুঝতে না দিয়ে সে বলে, ‘জ্বি খালা, ভালোই তো।’
সন্ধ্যায় মিলাপু চলে যাবার পরে বাড়িটা হঠাৎ করেই যেন অন্ধকার হয়ে যায়। গোটাচারেক হ্যাজাগ বাতি শোঁ শোঁ শব্দ তুলে এখানে-সেখানে জ্বলছে। তারপরেও বাড়িটায় শুনশান নীরবতা। আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই চলে যাওয়ায় কোনো হৈচৈ নেই। তিন দিন পরে আজ আবার নীলার ঘরে ঘুমাতে যায় মনির। নীলা একবার এসে টেবিলে পানিভর্তি জগ-গ্লাস রেখে খোঁজ নিয়ে গেছে। সারাদিনের খাটাখাটনির পরে অনেক রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসে না তার। মনির যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায়, মিলাপু যে পরিবারে যাচ্ছে, সেখানে মানিয়ে নিতে নিতে চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আসবে। হয়তো মায়ের মতোই একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করবে, মেয়েদের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই।
সারারাতে একমুহূর্তের জন্য ঘুমাতে পারে না মনির। তার মাথায় রাজ্যের প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। এ-পাশ ও-পাশ করতে ভোরের দিকে তন্দ্রা জাগরণের ভেতরেই নিজের সাথে এক ধরনের বোঝাপড়া শুরু করে। সে যেন নিজেকে শুনিয়ে বলতে থাকে, ‘তোমার জীবনটা তো ঘুমিয়ে কাটাবার জন্যে নয় মনির। নিজে জাগতে হবে এবং অন্যদেরও জাগাতে হবে।’
নিজেই সে প্রশ্নের উত্তর দেয়। ‘জ্বি আমি বুঝতে পারছি।’
‘বুঝতে পারোনি। তুমি একটা ঘোরের মধ্যে আছো, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তোমরা তোমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ। আর যে যাই করুক, অন্তত তোমাকে এটা মানায় না।’
দ্বিধান্বিত মনির আত্মপক্ষ সমর্থনে কী বলবে ভেবে পায় না। সে যেন নিজেকেই বিশ্লেষণ করতে থাকে। সত্যিই তো কারও ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ, কোনো ভাণ্ডার পাহারা দেবার জন্যই কি আমার জন্ম হয়েছে? সারা বাংলাদেশ, এদেশের দুখি দরিদ্র মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।
মনির নীরবে তার বিছানায় উঠে বসে। তার ভেতর থেকে ভেসে আসে ভর্ৎসনা, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পাকিস্তানি সেবাদাসের মাথায় ছাতা ধরে শোভাযাত্রা করতে তোমার লজ্জা করে না মনির?’
‘শোভাযাত্রা নয়, এটা ছিল বরযাত্রা। আমি আটকেপড়া মানুষদের কেবল মসজিদ থেকে নিয়ে এসেছি।’ আবার আত্মপক্ষ সমর্থন করে মনির। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা বলে, বিপদে পড়লে শয়তানও মসজিদে আশ্রয় নেয়। ইসলামের নামে অনেক অপকর্ম অতীতে হয়েছে, এখন আবার তারই সূচনা হতে যাচ্ছে। এই বিষবৃক্ষ এখনই শেকড় শুদ্ধো উপড়ে ফেলতে না পারলে, আরও বহুদিন ভুগতে হবে। মুক্তির পথ কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনির নিজেই নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বলে ওঠে, ‘আমরা মুক্তি চাই, তবে তার সাথে একটা প্রতিশোধ নিতে চাই। জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাই সবচেয়ে বড় কলঙ্কের দাগ।’
ভেতর থেকে কে যেন তাকে তাগাদা দেয়, ‘তাহলে এবার জাগো, উঠে পড়ো, সংঘবদ্ধ হও।’
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার সাথে সাথে এক ঝলক রোদ এসে মনিরের চোখে পড়ে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply