এসএ গেমসে বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড

Spread the love

আরিফ সোহেল: দক্ষিণ এশিয়ার অলিম্পিক বলতে বুঝাবে এসএ গেমসকে। এ-অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কঠিন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় সাত দেশের। সেখানে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে না থাকলেও এই আসরের অর্জনকে বড় করেই দেখা হয়। অ্যাথলেটরা এই আসরে ভালো ফলাফলের জন্য মুখিয়ে থাকেন। এবারের আসরে বাংলাদেশ নতুন রেকর্ড গড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ১-১০ ডিসেম্বর ২০১৯ হিমালয়-কন্যা নেপালে অনুষ্ঠিত আসরের বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে এবারের গল্প।
এসএ গেমসে ক্রিকেট, ফুটবলকে পেছনে ফেলে এবার উঠে এসেছে আরচারির নাম। বিশেষ করে বছর শেষে এসএ গেমসে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের আকাশে আরচাররা ছড়িয়েছেন বর্ণিল আলো। এসএ গেমসে বাংলাদেশের জেতা ১৯ স্বর্ণপদকের ১০টিই জিতে নিয়েছেন আরচাররা। এসএ গেমসের ১৯ স্বর্ণসহ ১৩৮ পদক জয়ে বাংলাদেশ চমক দেখিয়েছে। আর আরচারির সঙ্গে চলে আসে একটি নাম রোমান সানা। তার নাম জড়িয়ে আছে ৩টি স্বর্ণ পদকের সঙ্গে। আসরে এবারও ভারত ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে; তাদের অর্জন ১৭২ স্বর্ণের সঙ্গে সর্বমোট ৩১০টি পদক। ভারতের পেছনে থেকে লড়াই করেছে নেপাল-শ্রীলংকা। আর পাকিস্তানের পেছনে থেকে বাংলাদেশ হয়েছে আসরের পঞ্চম দল।

আর স্বাভাবিকভাবে আরচারি এলে গল্প উঠে আসবে রোমান সানারও। রোমান সানার সাফল্যের গল্প কিন্তু শুধু এসএ গেমসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বছরজুড়েই তিনি শিরোনাম হয়েছেন। মার্চে ব্যাংককে এশিয়া কাপ আরচারিতে জেতেন রৌপ্যপদক। জুনে নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জপদক জিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে সরাসরি ২০২০ অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন রোমান সানা। গেমসে মাত্র ১৪ বছর বয়সে অংশ নিয়ে ৩টি সোনার পদকের পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতি খাতুন। ইতি ব্যক্তিগত, দলীয় ও মিশ্র দলগতে দারুণ সাফল্য দেখান। সোহেল রানার পাশেও ৩টি সোনার পদক। এ ছাড়া বিউটি রায়, সুমা বিশ্বাস, অসীম কুমাররাও হেসেছেন সোনালি হাসি।
এসএ গেমসের ১৩তম আসরে বাংলাদেশ পেয়েছে সর্বোচ্চ সাফল্য। এসএ গেমসে সেরা সাফল্য এনে দেওয়ার তালিকায় আরচারির পরই আসছে কারাতের নাম। প্রত্যাশার বাইরে থেকেও কারাতে এবার জিতেছে ৩টি সোনার পদক। আল আমীন ইসলাম, মারজান আক্তার প্রিয়া এবং হুমায়রা আক্তার অন্তরা হাসেন সোনার হাসি। এর বাইরেও কারাতেকারা ৩টি রুপা এবং ১২টি ব্রোঞ্জপদক উপহার দিয়েছেন।
২০১৬ সালের এসএ গেমসে দেশকে প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেওয়া ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ওজন শ্রেণি বদলে এবারও এনে দিয়েছেন সেরা সাফল্য। আর আলোচনার বাইরে থাকা ভারোত্তোলক জিয়ারুল ইসলাম স্বর্ণ জিতে চমক দেখিয়েছেন। ভারোত্তোলনে এসেছে প্রত্যাশিত সাফল্য। ফেন্সিং এবং তায়কোয়ান্দো দুই স্বর্ণ জয় বাড়িয়েছে বাংলাদেশের মান।
এত সাফল্যের মাঝেও এসএ গেমসে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন সাঁতারুরা। গত আসরে দুই স্বর্ণ জেতা এই ইভেন্ট নিয়ে স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছিল। তাদের প্রাপ্তি ৩টি রুপা ও ৮টি ব্রোঞ্জ। এবার শুটাররাও হয়েছেন ব্যর্থ। শুটিংয়ে এসেছে ৪টি রুপা ও ৬টি ব্রোঞ্জ। জাতীয় খেলা কাবাডিও হতাশা উপহার দিয়েছে। ছেলে ও মেয়েদের কাবাডিতে চতুর্থ হয়ে জুটেছে ব্রোঞ্জপদক। গেলবার হ্যান্ডবলের মেয়েদের ইভেন্টে এসেছিল রুপার পদক। এবার ব্রোঞ্জও জিততে পারেনি তারা। ছেলেরা ব্রোঞ্জ জিতে মান রেখেছে। আর একেবারেই খালি হাতে ফিরেছে ভলিবল, বাস্কেটবল, সাইক্লিং, টেনিস এবং স্কোয়াশ।
১৯৮৪ সালে নেপালে এসএ গেমস শুরুর পর এক আসরে বাংলাদেশের অর্জন ছিল সর্বোচ্চ ১৮টি সোনা। ২০১০ সালে যা এসেছিল দেশের মাটিতে তৃতীয়বারের আয়োজনে। এবার নেপালে ১৩তম গেমসে সব ছাপিয়ে রেকর্ড ১৯টি সোনা পেয়েছে বাংলাদেশ। সঙ্গে রেকর্ডসংখ্যক ৩৩টি রুপা ও ৯০টি ব্রোঞ্জ। পদকের বিচারে এ গেমসে এটিই বাংলাদেশের সেরা সাফল্য। ১৯টি সোনায় বড় অবদান রেখে একটু বেশিই অভিনন্দন পাবেন লাল-সবুজের মেয়েরা। ৬টি ব্যক্তিগতসহ মোট ১১টি সোনার সঙ্গে যুক্ত তারা।
শুধু আর্চারি নয়; ক্রিকেট, কারাতেসহ আরও কয়েকটি খেলায় দল পাঠায়নি ভারত। এতে বাংলাদেশের সোনা গতবারের ৪টি থেকে একলাফে ১৫টি বেড়েছে। আর্চারির ১০টি বাদে বাংলাদেশ সোনা জিতেছে কারাতেতে ৩টি, ক্রিকেটে ও ভারোত্তোলনে দুটি করে, তায়কোয়ান্দো ও ফেন্সিংয়ে একটি করে। এর উল্টো পিঠের হতাশা হচ্ছেÑ অনেক খেলাতেই বাংলাদেশের বড় রকমের দুর্বলতা আবার ফুটে উঠেছে। ভলিবল, বাস্কেটবল, সাইক্লিং, টেনিসে কোনো পদকই পায়নি বাংলাদেশ। অ্যাথলেটিকসে অর্জন একটি রুপা। এই খেলায় বাংলাদেশ ২০০৬ সালের পর গত ৩টি গেমসে একটিও সোনা জিততে পারেনি। বাংলাদেশের পক্ষে সাউথ এশিয়ান গেমসে সর্বোচ্চ ২২টি সোনা জেতা শুটিং এবার ফিরেছে সোনা ছাড়াই। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭টি সোনা জেতা সাঁতার দল চরম হতাশ করেছে। গতবারের দুটি সোনা হারিয়ে সাঁতারে এবার নিঃস্ব। টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টনের মতো খেলাগুলোয় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে।
সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়ায় বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে, পরিসংখ্যানই তা বলবে। ১৩টি এসএ গেমসে ২ হাজার ৪৫টি সোনার মধ্যে মাত্র ৮৬টি জিতেছে বাংলাদেশ, যা মোট সোনার মাত্র ৪ শতাংশের একটু বেশি। ভারত ১ হাজার ২৬২, পাকিস্তান ২৯৯, শ্রীলংকা ২৫০, নেপাল ১২৪টি সোনা জিতেছে। লক্ষণীয়, এবার রেকর্ড ১৯টি সোনা জিতলেও পদক তালিকায় বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানেই রয়ে গেছে। সাত দেশের প্রতিযোগিতায় পঞ্চম হওয়া মোটেও সন্তুষ্টির নয়। আমাদের উচিত এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ধাপে ধাপে এগোনোর চেষ্টা করা। চেষ্টা করলে যে সাফল্য আসে, আর্চারির দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট।
চমক দেখিয়েছে আয়োজক দেশ নেপাল। ৫১ সোনা, ৫৫ রৌপ্য ও ৮৮ ব্রোঞ্জ নিয়ে শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে তারা। এটি তাদের এএস গেমসের ইতিহাসে সেরা সাফল্য। ১৩তম আসরের নেপালের ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানের হাতে। এসএ গেমসের পরবর্তী আসর অনুষ্ঠিত হবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে।

বাংলাদেশ ২০১৬-তে জিতেছিল স্বর্ণ ৪টি, রৌপ্য ১৪টি ও ব্রোঞ্জ ২৯টি-সহ মোট ৪৭টি পদক। ২০১০ সালে ১৮টি স্বর্ণ, রৌপ্য ২৩টি, ব্রোঞ্জ ৫৬টি-সহ মোট ৯৭টি পদক। ২০০৬-এ ৩টি স্বর্ণ, রৌপ্য ১৫টি, ব্রোঞ্জ ৩২টি-সহ মোট ৫০টি পদক। ২০০৪ সালে মোট পদক ৪০টি, ১৯৯৯ সালে ৪৭টি, ১৯৯৫ সালে ৭টি স্বর্ণসহ ৫৮টি, ১৯৯৩ সালে ১১টি স্বর্ণসহ ৬২টি, ১৯৯১ সালে ৪০টি, ১৯৮৯ সালে ৩৭টি, ১৯৫৭ সালে ৫৪টি, ১৯৮৫ সালে ৬৪টি, ১৯৮৪ সালে ২৩টি।

Leave a Reply