আমরা সেই সূর্যগ্রহণ চাই না

Spread the love

অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, যোগ্যতার পাশাপাশি প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সমন্বয় সাধন এই নতুন কাঠামোকে অধিকতর শক্তিমান করেছে। কমিটিতে কে গেল, কে গেল না, মন্ত্রী পদে কে এলো, কে গেল আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল ঐতিহ্যের অধিকারী দলের জন্য কোনো বিষয় হতে পারে না।

আবেদ খান: আগ্রহ ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দেবেন সেটা শুনেই এই লেখায় হাত দেওয়া। ভাষণটি অনেক কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যম-িত হবে অনুমান করি। তার সেই বক্তৃতাটিতে এমন কিছু থাকবে বলে মনে হয়Ñ যা দলকে, জাতিকে, বিশাল কর্মীবাহিনীকে বিশেষ বার্তা প্রদান এবং দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের জন্য দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেওয়া হবে অনুমান করি। কারণ এমন একটা সময়ে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন, যখন সামগ্রিকভাবে গোটা দেশ কিংবা উপমহাদেশের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রকদের সতর্ক চক্ষু এবং কর্ণ তার দিকে নিবদ্ধ থাকবে। এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার। বাংলাদেশ এখন ক্রমান্বয়ে নতুন বাংলাদেশের রূপ পরিগ্রহ করতে চলেছে। বাংলাদেশের বিপুল ঐশ্বর্যের সন্ধান পৃথিবী পেয়ে গেছে আজ। সে-ঐশ্বর্য শুধু কর্ষিত ভূমিতে নয়, প্রকৃতিতে ছড়ানো নয়, সাগরের তলদেশেও নয়। সে-ঐশ্বর্য মানুষের অদম্য সাহসে, সে-ঐশ্বর্য মানুষের আত্মার শুদ্ধতায়। আর এই অনন্য সত্যকে যিনি ক্লেদাক্ত বিস্মরণের গহ্বর থেকে উদ্ধার করে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করেছেন, মহিমান্বিত মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, তিনি আর কেউ নন, জাতির পিতার সুযোগ্য দুহিতা জনগণমননন্দিত শেখ হাসিনা। তার ভাষণ থেকে প্রয়োজনীয় নির্যাস নিয়ে এই লেখা সাজালে বোধহয় আমি উপকৃতই হতাম। কিন্তু ‘বন্ধুবর’ নূহ-উল-আলম লেনিনের মুহুর্মুহু তাগাদায় ভাবনাটাকে সংকুচিত করতেই হলো।
লেখায় মনোসংযোগ করার সময়ই বাপ্পীর প্রয়াণ সংবাদ পেলাম। নড়াইলের যে মেয়েটির ঠিকানা ছিল লড়াই-এর মাঠ, রাজপথ, সংসদ থেকে আদালত পর্যন্তÑ সেই মেয়েটি, সেই ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পী অল্পদিনের সামান্য অসুখে চলে যাবে, কে ভেবেছিল। তবু লিখতে হবে কারণ, ‘শো মাস্ট গো অন’। যা-ই ঘটুক না কেনÑ চলবেই সময়ের চাকা।

দুই
আমার কাছে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের এই নতুন কমিটি কিংবা নতুন কাঠামো নিয়ে হতাশাই প্রকাশ করেছেন। আমি কিন্তু সেভাবে দেখছি না এবং কেন দেখছি না তা আমি সে-সময় দু-একটা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে আলোচনা করতে গিয়েও বলেছি। আমার মনে হয় কোনো রকমের আবেগতাড়িত না হয়ে অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক যোগ্যতার মাপকাঠিতে যাচাই করে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে। পারসেপশনের চাইতে প্রয়োজনীয়তাকেই বেশি মূল্যায়ন করা হয়েছে। ৭০ বছরের এই সংগঠনটিকে অনেক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই পথ চলতে হয়েছে। আঘাতে আঘাতে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব মহৎ এবং উদার যেমন হয়েছে, তেমনি বিপর্যয়ের মুখে ইস্পাতদৃঢ় মনোবল নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে। অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, যোগ্যতার পাশাপাশি প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সমন্বয় সাধন এই নতুন কাঠামোকে অধিকতর শক্তিমান করেছে। কমিটিতে কে গেল, কে গেল না, মন্ত্রী পদে কে এলো, কে গেল আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল ঐতিহ্যের অধিকারী দলের জন্য কোনো বিষয় হতে পারে না। যে অবদান রাখতে পারবে সে থাকবে আর যে অবদান রাখতে পারবে না, সে থাকবে নাÑ এটাই হওয়া উচিত যে কোনো প্রতিষ্ঠানের মূলমন্ত্র। আধুনিক চীনের স্থপতি দেং জিয়াও পিং একবার এক চমৎকার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বিড়ালের রং সাদা না কালো সেটা বড় কথা নয়Ñ বড় কথা হচ্ছে বিড়ালটি ইঁদুর ধরতে পারে কি না।’ একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য। একটি দায়িত্বশীল গণভিত্তিসম্পন্ন দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে কতখানি সতর্কতার সঙ্গে পথ চলছে তার প্রতিফলন যেমন এই জাতীয় সম্মেলনকে নেতৃত্ব বাছাই-এর বেলায় দেখা গেছে, তেমনি দেখা গেছে দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় অবস্থানের এক দশকেও। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা অত্যন্ত পরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন কখন কতটুকু পথ হাঁটতে হবে, কতটুকু পথ দৌড়াতে হবে কিংবা কখন থামতে হবে বা কার সঙ্গে কতটা চলতে হবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে।
আমাকে সবচাইতে মুগ্ধ করেছে এটা দেখে যে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব অনেক নতুন প্রজন্মকে মন্ত্রী পরিষদে স্থান দিয়েছে আবার সরকারের পদবি এবং দলের পদের সঙ্গে একটা লক্ষণ রেখা বেঁধে দিয়েছে। অর্থাৎ, দলের কাজে পরিপূর্ণ আত্মনিয়োগ করো আর সরকারকে চলতে দাও তার নীতিমালা অনুসারে। আমার মনে পড়ে কোনো এক সময়ে আমি একটি লেখায় খুব জোরের সঙ্গে বলেছিলাম, সরকার যদি অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে আমলাতন্ত্র রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে ফেলে এবং পক্ষান্তরে দল যদি মাত্রাতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে তাহলে দল হবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তার প্রভাব পড়বে পুরো রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ওপর। কাজেই ভারসাম্য রাখতেই হবেÑ দলকে বুঝতে হবে কতটুকু তার ক্ষমতা আর সরকারকেও জানতে হবে একটি রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত সরকারের সীমানা কতখানি বিস্তৃত। আমরা যদি উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পদচারণা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব যখন দেশ কোনো ধরনের সামরিকতন্ত্রের খপ্পরে পড়েছে তখনই সরকার এবং দল দুই-ই ক্ষত-বিক্ষত এবং ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই কারণে অনেক দল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, অনেক সরকারের পতন ঘটেছে, অনেক সম্ভাবনাময় রাজনীতির অন্তর্ধান ঘটে গেছে।

তিন
আমি বলব আওয়ামী লীগ এই উপমহাদেশের মধ্যে সবচাইতে ভাগ্যবান একটি রাজনৈতিক সংগঠন। ভাগ্যবান এ-কারণে যে, এই দলটির প্রধান কা-ারির নাম শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি বাংলার মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু হিসেবে আদৃত। যিনি আজীবন দুঃখী মানুষের নেতা হিসেবে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে রয়েছেন। যিনি একটি জাতির জন্ম এবং জাগরণ নিশ্চিত করেছেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে এমন একটি আদর্শ উপস্থাপন করেছেন, যা চিরকালীন শাশ্বত সত্য হিসেবে বিরাজ করবে।
আর একটি কারণে বাঙালি ভাগ্যবান যে জাতির পিতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার যাত্রায় অনেকখানি পথ অতিক্রম করে চলেছেন। তিনি দল ও সরকারকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যা যে কোনো অগ্রসরমান জাতির জন্য অপরিহার্য।
কয়েকদিন আগে সূর্যগ্রহণে কিছু সময়ের জন্য রাত্রির অন্ধকার নেমে এসেছিল। তখন পৃথিবী বুঝেছিল পৃথিবীর জন্য সূর্য কতখানি অপরিহার্য। যখন বাগানে ফুল ফোটে, পাখির কলকাকলিতে অরণ্য মুখর হয় তখন তো কেউ বোঝে না ফুল ফোটার জন্য, পাখির কলস্বরের জন্য সূর্যের কী অবদান!
আজ দল এবং সরকার কেউ হয়তো বুঝতে পারছে না এই দেশ, এই জাতি এবং এই পৃথিবীর জন্য একজন শেখ হাসিনা কতখানি অপরিহার্য। এমন কোনো সূর্যগ্রহণের মুখোমুখি আমরা হতে চাই না, যা আমাদের জগতকে অন্ধকার নেকাবে ঢেকে দেবে।

Leave a Reply