বিচ্ছেদের পক্ষে ভোট

Spread the love

সাইদ আহমেদ বাবু: কনজারভেটিভ এবং লেবার দু-দলই ব্রেক্সিট চাইছে ভিন্ন ভিন্নভাবে। তাই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এই নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। গত পাঁচ বছরেরও কম সময়ে এটি দেশটিতে তৃতীয় নির্বাচনের ঘটনা। অবশেষে পার্লামেন্টের ভোটে নির্বাচনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন এমপিরা। নির্বাচনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৪৩৮ জন আর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ২০ জন। আমরা ইউরোপের সঙ্গে আছি; কিন্তু ইউরোপের মধ্যে নেই! বলেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। সেই বিতর্কিত মন্তব্য মনে রেখেই ২০১৯-এর ১২ ডিসেম্বর ব্রিটেনের ইতিহাসে যোগ হয় আরেকটি সাধারণ নির্বাচন। একসময় যে সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না, সেই রাষ্ট্রের নির্বাচনে নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। ভোটারদের কাছে পার্টির চেয়ে বড় ইস্যু হয়ে উঠছে ব্রেক্সিট। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এমন একটি নির্বাচন হয়তো আর কখনোই হয়নিÑ যেখানে পুরো দেশটা মনে হচ্ছে যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এর কারণ একটাই ব্রেক্সিট অর্থাৎ ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগ।
ব্রিটেনের এই সাধারণ নির্বাচন ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯২৩ সালের পর এই প্রথম ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের পক্ষে অনুমোদন দিল হাউস অব কমন্স। ১০০ বছরের ইতিহাসে এটি ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের দ্বিতীয় ঘটনা। ১৯৭৪ সালে প্রথম শীতকালে নির্বাচন হয়েছিল। এবার তীব্র শীত ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোট দিয়েছেন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব প্রাপ্ত এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী সকল নাগরিক। আইরিশ ও কমনওয়েলথ নাগরিক যারা যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, তারাও নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। মোট ৬৫০টি নির্বাচনী কেন্দ্রে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা বরিস জনসন সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। আর প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন উত্তর লন্ডনে ভোট দিয়েছেন। স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (এসএনপি) নেতা নিকোলা স্ট্রাজিওন গ্লাসগো’র একটি কেন্দ্রে, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক (লিবডেম) পার্টির নেতা জো সুœইনসন পূর্ব ডানবার্টনশায়ারের একটি কেন্দ্রে, ব্রেক্সিট পার্টির নেতা নাইজেল ফ্যারাজ পোস্টাল ভোট ব্যবহার করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
২০১৯-এর ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনে লড়াইয়ের প্রধান মুখ কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং লেবার পার্টির জেরমি করবিন। জনগণের কাছে ব্রেক্সিট প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান জনসনকে তথা কনজারভেটিভ পার্টিকে এনে দেয় বিপুল ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয়। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ৬৫০টি সংসদীয় আসনের কনজারভেটিভ পার্টি ৩৬৫টি আসনে জয় পায়। মার্গারেট থ্যাচারের পরে এমন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হবার স্বাদ কনজারভেটিভ পার্টি আর পায়নি। ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে লেবার পার্টিকে পরাজিত করেছে তারা। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জেরমি করবিনের লেবার পার্টি মাত্র ২০৩ আসনে জয় পেয়েছে। আর স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি ৪৮ এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট পেয়েছে ১১ আসন। তবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে চমক দেখানো ব্রেক্সিট পার্টি আশ্চর্যজনকভাবে একটি আসনেও জয় পায়নি। এদিকে, সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩২৬টি আসনে জয়। কনজারভেটিভরা গতবারের চেয়ে ৪৮টি আসন বেশি পেয়েছে এবার। অন্যদিকে, লেবার পার্টি ৫৯টি আসন হারিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে ১৯৩৫ সালের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত লেবার পার্টির জন্য সব থেকে বাজে নির্বাচন বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে হয়ে যাওয়া ব্রিটিশ নির্বাচনকে। সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আসন সেজফিল্ড বা ১০০ বছর ধরে লেবারদের দখলে থাকা গ্রিম্সবি-র মতো ঘাঁটিগুলোতেও করবিনরা হেরেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বরিস ডিসেম্বরে হঠাৎ নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন মূলত ওয়েলস, মধ্য ইংল্যান্ড এবং উত্তর ইংল্যান্ডের ব্রেক্সিটপন্থি ভোটারদের সমর্থনের আশাতেই ভোটে লড়েছিলেন। এটিকেও অনেকে ব্রেক্সিট গণভোট হিসেবে অ্যাখ্যা দিচ্ছেন। কারণ ব্রেক্সিট প্রস্তাবে বিভক্ত যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত কনজারভেটিভ পার্টিকে বেছে নেয়। কনজারভেটিভ নেতা যেমন ভোটারদের সামনে স্পষ্ট ব্রেক্সিট-স্বপ্ন তুলে ধরতে পেরেছেন, ঠিক তার উল্টো পথে হেঁটেছেন লেবার নেতা জেরেমি করবিন। ভোটের ফলকে অত্যন্ত হতাশজনক আখ্যা দিয়ে করবিন বলেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে আর লেবার দলের নেতৃত্ব দেবেন না তিনি। ভালো ফল করেনি লিবারাল ডেমোক্র্যাটরাও। হেরে গিয়েছেন তাদের নেতা জো সুইনসনও। চমকপ্রদ সাফল্য পেয়েছে স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি)। গতবারের থেকে ১৩টি বেশি পেয়ে স্কটল্যান্ডের ৫৯টি আসনের মধ্যে ৪৮টিই গিয়েছে তাদের দখলে। নির্বাচনী প্রচারে নেমে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বরিসকে। অক্টোবরের শেষে ব্রেক্সিট সফল করবেন এই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতে না পারায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। কিন্তু সেই জায়গা থেকে যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন এবং বিশ্বাস অর্জন করলেন তাতে অনেক ঝানু রাজনীতিবিদও হতবাক হয়েছেন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’Ñ এবারের নির্বাচনে বরিস জনসনের মূল মন্ত্র ছিল এটাই। আর এই মন্ত্রকেই হাতিয়ার করে লেবার সমর্থকদেরও আস্থা ও লেবার সমর্থকদের একটা বড় অংশকে নিজের দিকে টেনে এনেই বাজিমাত করলেন বরিস। বরিসের নির্বাচনী প্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর ও মধ্য ইংল্যান্ডের লেবার পার্টির সমর্থনকারী ৪০টি আসনে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করা। আর এটাই ভোটের ফলের পুরো চিত্রকে বদলে দিয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর বরিস তাই বলেছেন, ‘আমরা সেই সব মানুষের আস্থা অর্জন করেছি যারা কোনোদিন কনজারভেটিভকে ভোট দেননি। আমরা জিতেছি।’ জয়ের পর জনসন বলেন, আমি একটি ‘জনগণের সরকারে’ নেতৃত্ব দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সেই সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন, মানুষ পরিবর্তন চাইছিল। তাদের নিরাশ করবে না কনজারভেটিভ পার্টি।
ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায় কনজারভেটিভ পার্টির ৬৭ শতাংশ সদস্যের সমর্থন পেয়ে দলের নেতা হয়েছেন বরিস জনসন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তারুণ্যকে প্রাধান্য দেওয়া বরিস জনসনের ৩১ সদস্যের মন্ত্রিসভার সদস্যদের গড় বয়স ৪৮। আর এতে নারী সদস্যের হার প্রায় ২৬ শতাংশ। ব্রেক্সিট সমর্থিত এমপিদেরই মন্ত্রিসভায় প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। নতুন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব পেয়েছেন ডোমিনিক রাব এবং প্রীতি প্যাটেল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ডোমিনিক রাব এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রীতি প্যাটেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাজিদ জাভিদকে নতুন চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। ব্রেক্সিট সেক্রেটারি হচ্ছেন, স্টেফেন বারক্লে, ডাচি অব ল্যানচেস্টারের চ্যান্সেলর মাইকেল গোভ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী লিজ ট্রাস, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক, শিক্ষামন্ত্রী গেভিন উইলিয়ামসন, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিকি মরগ্যান, বাণিজ্যমন্ত্রী অ্যান্ড্রি লিডসন, কর্ম ও পেনসনমন্ত্রী অ্যাম্বার রুড এবং হাউস অব কমন্সের প্রধান জ্যাকোব রিস মগ। এদিকে, মন্ত্রিসভা গঠনের পর বরিসের নেতৃত্বে প্রথম বৈঠকে বসেছেন এর সদস্যরা।
২০১৯-এর ১৯ ডিসেম্বর নতুন পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ভাষণের মধ্য দিয়ে। আগাম নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েই ব্রেক্সিট ইস্যুতে সংসদে ভোটাভুটির আয়োজন করেছেন বরিস জনসন। সংসদের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে ২০ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিচ্ছেদ বিল উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। সংসদে ৩৫৮ ভোট পক্ষে পেয়েছে এবং বিপক্ষে পড়ে ২৩৪টি ভোট। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনসহ অন্যরা বিলটির বিরোধিতা করেন। কিন্তু ব্রিটিশ সংসদে বরিসের কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় বিল পাস আটকে থাকেনি, তা প্রাথমিকভাবে পাস হয় (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া) কার্যকরের পথ সুগম হল। নিম্নকক্ষে বিলটি পাসের পর এর খুঁটিনাটি নিয়ে আরও বিতর্ক হবে। আগামী ৭-৯ জানুয়ারি এর তারিখ রয়েছে। বিলটি উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে পাস হলে আইনে পরিণত হবে ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই।
ব্রেক্সিট প্রশ্নে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রেক্সিট নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসন এবং এটা সম্পন্ন করার জন্য আমরা এখানে জড়ো হয়েছি। ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার জন্য জনগণ ভোটের মধ্য দিয়ে যে রায় দিয়েছে, তা এক দলের বিরুদ্ধে আরেক দলের বিজয় নয়। ব্রেক্সিটের জন্য। এবার সাড়ে তিন বছরের দুঃখজনক অধ্যায় শেষ হবে। সময় এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার। তবে ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবি হলেও এই দল থেকে মনোনীত চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী বিজয়ী হয়েছেন। এদের মধ্যে রুশনারা আলী টানা চারবার, টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক ও রুপা হক তিনবার এবং প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন আফসানা বেগম। হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন এলাকা থেকে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার বড় মেয়ে তিনি। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য আনন্দের সংবাদ। এই কৃতিত্বের জন্য তাদের প্রতিও রইল আমাদের অভিনন্দন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে। সেখানে তদন্তের পরে ভোটাভুটি। প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস সদস্য ভোট দিলে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করা হবে। পরের ধাপে ইমপিচমেন্ট মামলা যাবে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ অর্থাৎ সেনেটে। সেখানে সেনেটরেরা সিদ্ধান্ত নেবেন, প্রেসিডেন্ট দোষী না নির্দোষ। প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করতে সেনেটের ভোট লাগবে। এর আগে তিনজন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তদন্ত-প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ইস্তফা দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ওয়াটারগেট অফিস বিল্ডিংয়ে ডেমোক্র্যাটদের সদর দফতরে লোক ঢুকিয়ে গোপন ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন লাগানো, যাতে ডেমোক্র্যাটদের ওপর আড়ি পাততে পারে রিপাবলিকানরা। ইমপিচমেন্ট তদন্তের ফল কোনোভাবেই তার পক্ষে যাবে না দেখে ইস্তফা দেন নিক্সন। আমেরিকার ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন পদত্যাগ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার উদ্যোগ এই প্রথম নয়। বিল ক্লিনটন সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট, যাকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেটা ১৯৯৮ সালের ঘটনা। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকা লিউইনস্কির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এবং এ-বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেন। হাউসে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাস হলেও সেনেটের ভোটে রক্ষা পান তিনি।
অ্যান্ড্রু জনসন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিম্নকক্ষ অর্থাৎ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ। সেটা ১৮৬৮ সালের ঘটনা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেনেটের নির্দেশ সত্ত্বেও যুদ্ধবিষয়ক সচিব এডউইন স্ট্যান্টানকে সরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। হাউস ইমপিচমেন্টের পক্ষে রায় দিলেও সেনেট ইমপিচমেন্টের বিরুদ্ধে রায় দেয়। ফলে পদত্যাগ করতে হয়নি জনসনকে। তবে তাদের কাউকেই সেনেট দোষী সাব্যস্ত করেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা দুটি অভিযোগের ভিত্তিতে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে ভোট হয়েছিল। ওই কক্ষে ডেমোক্র্যাট সদস্যরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। পার্টি লাইন অনুযায়ী ভোট দিয়েছেন সকলে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগের ক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক ভোট পড়েছে। ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব ভোটাভুটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে অনুমোদিত হয়েছে। আমেরিকার ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, যাকে ইমপিচ করার প্রস্তাব পাস হলো। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’র চেয়ারের অনুমোদন দেওয়ার পর এ-বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। এরপর আগামী জানুয়ারিতে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি হবে সিনেটে। ট্রাম্পের (উড়হধষফ ঞৎঁসঢ়) বিরুদ্ধে ওঠা দুটি অভিযোগের একটি হলো, তিনি ক্ষমতা ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট জো বিডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো, ইমপিচমেন্টের তদন্তে অসহযোগিতা এবং কংগ্রেসের কাজে বাধাদানের চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রথম অভিযোগের ক্ষেত্রে ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট পড়েছে ২৩০টি এবং ১৯৭টি ভোট পড়েছে এর বিপক্ষে। দ্বিতীয় অভিযোগের ক্ষেত্রে ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট পড়েছে ২২৯টি ও বিপক্ষে পড়েছে ১৯৮টি ভোট। হাউস অব রিপ্রেসেন্টেটিভসের পর সিনেটে যাবে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া। সিনেট অবশ্য রিপাবলিকানদের দখলে। হাউস এবং সিনেটে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটরা।
একটি টিভি শোয়ে ন্যাডলার এবং তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডাম শিফ রিপাবলিকান সদস্যদের ইচ্ছে জানান, ‘ট্রাম্প গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। আপনারা ভেবে-চিন্তে ভোট দেবেন।’ হাউসে তেমন মনে হলো না। নিম্নকক্ষে তো ট্রাম্পের পক্ষেই ভোট দিয়েছেন রিপাবলিকানরা। সিনেটেও তাই হবে বলে মনে করছে আমেরিকার রাজনৈতিক মহল। ইমপিচমেন্ট করা হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। ২০২০ সালে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে পারেন ডেমোক্র্যাট পার্টির জো বিডেন। তিনি বারাক ওবামার আমলে আট বছর আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন।

Leave a Reply