ফিরে দেখা ২০১৯, অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি শেখ হাসিনার

Spread the love

নবমবার দলীয় সভানেত্রী, চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী, ফোর্বসের প্রভাবশালী ১০০ নারীর তালিকায় স্থান, ৩৮ আন্তর্জাতিক পদক অর্জন

স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৮ বছরে দল ও সরকার পরিচালনায় অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পরপর তিনবার এবং সব মিলিয়ে চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গত ৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু করে। একইসঙ্গে গত ২৩ ডিসেম্বর উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২১তম কাউন্সিলে টানা নবমবার দলটির সভানেত্রী হয়েছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় সরকার ও দলের দায়িত্ব পালনের রেকর্ডও তার। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির শীর্ষ পদে ৩৮ বছর ধরে অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
মৃত্যুর ভয়কে পায়ের ভৃত্য করে সততা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা আর সাহসী নেতৃত্বগুণে শেখ হাসিনা অনেক আগেই দেশের গ-ি পেরিয়ে স্থান করে নিয়েছেন বিশ্বনেতৃত্বের কাতারে। মার্কিন ম্যাগাজিন ফোর্বস-এ বছরের বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ নারীর তালিকা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। তালিকায় ২৯তম অবস্থানে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী চার বছর সফলভাবে দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী নারী সরকারপ্রধানের রেকর্ড গড়ার পথে পা দিয়েছেন তিনি। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা নারী সরকারপ্রধানের এলিট ক্লাবে প্রবেশ করেছেন ৭২ বছর বয়সি শেখ হাসিনা।

এক বর্ণাঢ্য সংগ্রামমুখর জীবন শেখ হাসিনার। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ছয় বছর যন্ত্রণাময় প্রবাসজীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরেন। এর আগে ঐ বছরের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ত্রয়োদশ সম্মেলনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। এরপর টানা আটবার আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ১৯৯৬ সালে। ঐ বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। ২০০১ সালে মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয় বিএনপির কাছে। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে জটিলতা সৃষ্টি করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। এতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এ নির্বাচনের পর ঐ বছরের ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে গত ৭ জানুয়ারি সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট পেয়ে অনেকটাই নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক অঙ্গনে বছরজুড়ে ঘর সামলাতেই ব্যস্ত ছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেধা-মনন, সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, উদারমুক্ত গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বজয়ের নবতর অভিযাত্রায় এগিয়ে চলেছে। বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শত বাধা-বিপত্তি, প্রতিকূলতা, মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ, বারবার তার প্রাণনাশের চেষ্টার সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর শেখ হাসিনার অনবদ্য নেতৃত্ব উন্নত-সমৃদ্ধের মহাসোপানে নিয়ে গেছে বাংলাদেশকে।

৩৮টি পদক পেয়েছেন শেখ হাসিনা
‘এশিয়ান টাউনস্কেপ জুরিস অ্যাওয়ার্ড-২০১৯’ অর্জনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া আন্তর্জাতিক পদকের সংখ্যা ৩৮-এ উন্নীত হলো। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটির জন্য তাকে এই পদক দেওয়া হয়েছে। এর আগে চলতি বছর ড. কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল এক্সি­লেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০১৯ অর্জন করেন শেখ হাসিনা। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও পারস্পরিক সন্তোষজনক সম্পর্ক, নিজ দেশের জনগণের কল্যাণ, বিশেষ করে নারী ও শিশু এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতায় তার অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুল কালামের নামাঙ্কিত এই পদক দেওয়া হয়। চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে ‘লাইফটাইম কন্ট্রিবিউশন ফর উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান উইমেন। বার্লিনে ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এই পদক গ্রহণ করেন সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইমতিয়াজ আহমেদ।
এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র সমুন্নত ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন পর্যায়ের পদক প্রদান করে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে দায়িত্বশীল নীতি ও তার মানবিকতার জন্য প্রধানমন্ত্রী আইপিএস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৮ স্পেশাল ডিসটিংশন অ্যাওয়ার্ড ফর লিডারশিপ গ্রহণ করেন। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নিউজ এজেন্সি দি ইন্টার প্রেস সার্ভিস (আইপিএস) এবং নিউইয়র্ক, জুরিখ ও হংকংভিত্তিক ৩টি অলাভজনক ফাউন্ডেশনের নেটওয়ার্ক গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে দুটি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে। বাংলাদেশে নারী শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরিতে অসামান্য নেতৃত্বদানের জন্য গত বছরের ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল সামিট অব ওমেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এক ভোজসভায় মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মাননা জানায়।
শেখ হাসিনা প্রথম আন্তর্জাতিকমহলের বাড়তি মনোযোগে আসেন ১৯৯৮ সালে। সে-বছর দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘ দুই দশকের অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ইউনেস্কো প্রধানমন্ত্রীকে ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। আন্তর্জাতিক একাডেমিক কমিউনিটি শেখ হাসিনার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম এবং ভারতের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন, সাহিত্য, লিবারেল আর্টস এবং মানবিক বিষয়ে ৯টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এমডিজি) অর্জনে বিশেষ করে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অবদানের জন্য জাতিসংঘের অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়। বিএনপি সরকারের সময় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ঐদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। ইতিহাসের ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ তার দলের ২২ নেতাকর্মী নিহত হন এবং ৫০০-র বেশি মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান। তবে কোনো কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তার বিচক্ষণ পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশকে এখন আর কেউ অবহেলা করতে পারে না। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন আর অগ্রগতির সফল রোল মডেল।

Leave a Reply