আমাদের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে হবে বিশ্ব দরবারে

Spread the love

উত্তরণ প্রতিবেদন: বিজয়ী জাতি হিসেবে বাঙালি বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলবে এমন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিল্পকলা সাহিত্য সংস্কৃতিকে আরও উন্নতমানের করে সারাবিশ্বে পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের সাহিত্য আরও অনুবাদ হোক। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ আমাদের সাহিত্যকে জানুক। সংস্কৃতিকে জানুক। যে জাতি রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা নিয়ে আসে সে জাতিকে কেউ হেয় প্রতিপন্ন করবে, সেটা কখনও আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না।
গত ২ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ভ্রমণবিষয়ক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সময় বিজয়ীদের মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার তুলে দেন তিনি। পরে মেলা ঘুরে দেখেন।
এর আগে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ছাত্রজীবনে লম্বা সময় বইমেলায় কাটানোর স্মৃতি রোমন্থন করেন প্রধানমন্ত্রী। বইমেলাকে প্রাণের মেলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে যেমন ছাত্রজীবনে এখানে দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতাম এবং ঘুরে বেড়াতাম বইমেলায়। পুরো সময়টা পারলে থাকতাম। যদিও সত্যি কথা বলতে, প্রধানমন্ত্রী হয়ে সব সময় এটাই দুঃখ লাগে যে, এখন আর সেই স্বাধীনতা নেই। আর এখন সেটা হয়ে ওঠে না। এই একটা দুঃখ থেকে যাচ্ছে। এ সময় অমর একুশে ‘গ্রন্থমেলা’ কথাটির চেয়ে ‘বইমেলা’ কথাটি বলতেই একটু বেশি আপন মনে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একুশের এই বইমেলা, গ্রন্থমেলা বলেন, আর বইমেলা বলেন, বইমেলা বলতেই একটু আপন আপন মনে হয় বেশি। মুজিববর্ষের প্রাক্কালে আয়োজিত মেলা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করায় আয়োজকদের ধন্যবাদও জানান প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্রমণবিষয়ক গ্রন্থ ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন শেখ হাসিনা। বই প্রকাশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ’৫২ সালে বঙ্গবন্ধু চীনে শান্তি সম্মেলনে গিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গ থেকে প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানে যাওয়ার পথটি, কীভাবে গিয়েছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এই বইতেই লেখা আছে তিনি শান্তি সম্মেলনে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। মনোজ বসু তার বইতে এ-কথা লিখেছেন। এসবই এই বইতে পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি। বঙ্গবন্ধুকে লেখক বা পর্যবেক্ষক বা পর্যটক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি একটা দেশের ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন। আজ সে ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে বলে দেখছি। আমি কয়েকবার চীন সফর করেছি। মনে হয়েছে, তারা সেই অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছে।
বইয়ের প্রসঙ্গে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাগারে খাতা সেন্সর করে দেওয়া হতো। সেই সেন্সরের সিল থেকে আমরা জানতে পারি এটি ১৯৫৪ সালে লেখা। প্রধানমন্ত্রী বইয়ের প্রচ্ছদ দেখিয়ে বলেন, চীনা অক্ষরের মতো ওপরের দিক থেকে নিচের দিকে অক্ষর সাজিয়ে বইয়ের নামটি লেখা হয়েছে। শান্তি সম্মেলনের মনোগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছে বইতে। তিনি জানান, মনোগ্রামটি করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী পিকাসো। বইটি নিয়ে বহুদিন ধরে কাজ করেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুর ওপর অনেক নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু কারাগার থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া নেতা নয়াচীনে গিয়ে একবারও সে প্রসঙ্গ তুলেন নি। বরং বলেছেন, আমাদের দেশের ভেতরে যা হচ্ছে সেটা তো হচ্ছেই। আমরা তো বিদেশে এসে দেশের বদনাম হবে এমন কিছু বলতে পারি না। প্রধানমন্ত্রী কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা এখন দেখি আমাদের অনেকেই বিদেশিদের কাছে বদনাম করেন। আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে যা না ঘটে তাও বলে আসেন।
ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষার জন্য বাঙালিকে জীবন দিতে হয়েছে। আমাদের ভাষা কেড়ে নেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছে। এক সময় আরবি হরফে বাংলা লেখানোর চেষ্টা হয়েছে। লাতিন হরফে বাংলা ভাষা লেখানোর চেষ্টা হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলো। কোন শব্দ হিন্দু শব্দ কোন শব্দ মুসলাম, তাও ঠিক করে দিল। বাঙালিকে এভাবে বহু রকমের চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আসতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষা সংগ্রামের অবদানও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরো ইতিহাসটি পাওয়া যায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। তাদের রিপোর্ট সংগ্রহ করে আমি এখন বই আকারে প্রকাশ করছি। চারখানা গ্রন্থ ইতোমধ্যে এসেছে। সেসব বইতে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
জাতির জনকের স্বপ্নের দেশ গড়ার প্রত্যয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আজকে এগিয়ে যাচ্ছি। বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বে একটা মর্যাদা পেয়েছে। জাতি রাষ্ট্রভাষা রাষ্ট্র বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। বাংলাদেশ মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে সম্মান পাবে। অন্তত এটুকু দাবি করতে পারি, গত ১০ বছরে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ফলে এখন আর বাংলাদেশকে কেউ ছোট চোখে দেখতে পারে না। বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দেখে। কাজেই এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল।

Leave a Reply