ভাষা আন্দোলন ও রাজনীতি

Spread the love

শেখর দত্ত: বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের উৎসমুখে মহান গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত তথা বাংলা ভাগের ভেতর দিয়ে পূর্ব বাংলায় হিন্দু-মুসলিম বিভেদ চূড়ান্ত রূপ নেয়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনই প্রথম পূর্ব বাংলার জনগণকে বিভাজনকারী প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক ওই তত্ত্বের বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকে ঐক্যবদ্ধ করে। বাঙালি জাতিসত্তার ভ্রƒণ সৃষ্টি ও বিকাশ শুরু হয় এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। এই আন্দোলনই ছিল পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠীর প্রতিভূ তৎকালীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রথম প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে ভাষা আন্দোলনই প্রথম এই মানচিত্রের অবহেলিত-নির্যাতিত জনগণকে ভাবতে শেখায়, ন্যায্য দাবিতে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অপ্রতিরোধ্য ও অপরাজেয়। ভাষা আন্দোলনের রক্তস্মৃতি বিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় চেতনার স্মারক এবং ভাষা শহিদ মিনার আমাদের চির প্রেরণার উৎস। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে একুশের স্বীকৃতি আমাদের জাতিকে বিশ^ দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এবং নতুন নতুন বিজয় ছিনিয়ে আনতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
প্রকৃত বিচারে আমাদের জাতীয় জীবনে ভাষা আন্দোলন বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। এই আন্দোলন ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মাকে মা বলে ডাকার লড়াই। মুখের ভাষাকে রক্ষা করার লড়াই। এদিক থেকে এই আন্দোলনের রূপ হচ্ছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক। কিন্তু সামাজিক-সাংস্কৃতির গ-ির মধ্যে এই আন্দোলন থাকার কোনো কারণ ছিল না। কেননা পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী মুসলিম জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে বাঙালি জাতির ওপর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বিজাতীয় উর্দুকে গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল রাজনীতির প্রয়োজনে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রকে অপব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে দমন করতে উদ্যত হয়েছিল। তাই এই আন্দোলন সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপ নিয়ে অবির্ভাব হলেও শুরু থেকেই এর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে রাজনীতি ছিল এবং আন্দোলন যত অগ্রসর হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যেতে থাকে, ততই এর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক রূপ সুস্পষ্ট হতে থাকে।
প্রসংগত নৃতত্ত্ব, ভাষা, ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গির পর্বত প্রমাণ পার্থক্য সত্ত্বেও কেবল ধর্মের ভিত্তিতে ২ হাজার মাইল দূরের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে কৃত্রিম ও অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। তাই এই রাষ্ট্রের জনগণের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিশেষত রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষা করার জন্য এক ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়া ভিন্ন উপায় ছিল না। তবে কেবল এটাই একমাত্র কারণ ছিল না। প্রসংগত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শুরু থেকেই পাঞ্জাবের সামন্ত ভূস্বামী, ব্যবসায়ী-পুঁজিপতি, সামরিক-বেসামরিক আমলা অর্থাৎ তিন গণবিরোধী শক্তি পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী রূপে রাষ্ট্রক্ষমতায় চেপে বসে। এই গণবিরোধী অশুভ শক্তি পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি বিশেষত বাঙালি জাতির ওপর কার্যত ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ চাপিয়ে দেয়। এক দেশ, এক ভাষা, এক নেতা, এক মতÑ গণবিরোধী শাসক-শোষকগোষ্ঠী এই নীতি নিয়ে অগ্রসর হয়। তাই নতুন রাষ্ট্রের ক্ষমতা কুক্ষিগত, নিরঙ্কুশ করার জন্য রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
তাই ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার গণজীবনে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতির মুক্তির প্রত্যাশা নিয়ে সমুপস্থিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের ভাষা কি হবে তা পাকিস্তান সৃষ্টির আগে অমীমাংসিত ছিল। ভারতে এখনও পর্যন্ত কোনো জাতীয় ভাষা নেই, দাপ্তরিক ভাষা আছে, হিন্দি ও ইংরেজি। ১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ১৫ বছরের মধ্যে ইংরেজির বদলে হিন্দি বসানো হবে; কিন্তু পরবর্তীকালে আইন প্রণয়ন করে ইংরেজির ব্যবহার বহাল রাখা হয়। কিন্তু ভারতের মতো পাকিস্তানও বহু ভাষাভাষি জাতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠার পরদিন থেকেই উর্দুকে বাঙালি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাই প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির আন্দোলন উঠতি-পড়তির ভেতর দিয়ে চলমান থাকে। দুই পর্যায়ে আন্দোলন ব্যাপক ও তীব্র হয়ে ওঠে।
প্রথম পর্যায় ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ এবং দ্বিতীয় ও সর্বোচ্চ পর্যায় ১৯৫২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি। তবে একদিকে জনগণের সচেতনতা, সমাবেশের ব্যাপকতা, রাজনৈতিক ও শ্রেণি-পেশাজীবী সংগঠনের তৎপরতা আর অন্যদিকে সরকারের দমন-পীড়নসহ হিংসাত্মক কাজের মধ্যে এই দুই পর্যায়ের আন্দোলনের গুণগত পার্থক্য ছিল। প্রথম পর্যায়ের আন্দোলন সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সচেতনতার চাইতে স্বতঃস্ফূর্ততা এই আন্দোলনকে পরিচালনা করে। কেননা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক অর্থনীতি ও অগণতান্ত্রিক শাসন-শোষণের রাজনৈতিক রূপ তেমনভাবে সুস্পষ্ট ছিল না। পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব বাংলার জনগণের মোহ থাকায় রাজনৈতিক ইস্যু তখন সামনে ছিল না। তদুপরি তখন কলকাতা ছিল রাজনীতির কেন্দ্র এবং অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতারা সেখানে থেকেই রাজনীতি করতেন। তারা ঢাকা আসেন পরে। তাই একেবারে প্রথম থেকে এই আন্দোলনে রাজনীতি তেমনভাবে যুক্ত থাকা বাস্তব কারণেই সম্ভব ছিল না।
কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি সামনে আসে তা বিবেচনায় নিলেই অনুধাবন করা যাবে, প্রথম দিকে ভাষা আন্দোলনে শিক্ষার সাথে রাজনীতি, সচেতনতার সাথে স্বতঃস্ফূর্ততা কতটুকু জড়িয়ে ছিল। প্রসংগত অবিভক্ত ভারতে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রশ্নে হিন্দি-উর্দু বিতর্ক বহুদিন থেকেই বিদ্যমান ছিল। বলাই বাহুল্য মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে এবং কংগ্রেস হিন্দির পক্ষে ছিল। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে এমন বিবেচনা সামনে থাকে। তাই ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম কাউন্সিলের সামনে খসড়া ম্যানিফেস্টোতে অন্যান্য দাবির সাথে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টি সামনে আনেন। এটা তখন গৃহীত হয় নাই বরং সমালোচিত হয়। ৩ জুন ১৯৪৭, ব্রিটিশ ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও বাংলা ভাগের কথা ঘোষণা করার পর জুলাই ১৯৪৭, আলীগড় বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জিয়াউদ্দিন আহমেদ ভারতে হিন্দির অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। এই মাসেই ঢাকায় বামপন্থি কর্মীদের উদ্যোগে গঠিত গণআজাদী লীগ যে ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে তাতে প্রথম ‘বাংলা হইবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ কথাটা উত্থাপন করা হয়। বলাই বাহুল্য পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলতে কি বুঝানো হয়েছিল, তা সুস্পষ্ট নয়।
এদিকে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রাষ্ট্রভাষা ও ভাষা সমস্যা নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে পরে ৩০ জুলাই ১৯৪৭ ও ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৭ পত্রিকায় দুটো প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তাতে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার মতের বিরুদ্ধে তিনি ‘তীব্র প্রতিবাদ’ জানান এবং লেখেন, ‘বাঙালাই হইবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা।’ ‘আরবীকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে’ মন্তব্য করে তিনি লেখেন, ‘সেদিন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সার্থক হইবে যেদিন আরবী সমগ্র পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হইবে।’ সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে ভাষা সংক্রান্ত প্রস্তাবে ‘বাংলা ভাষাকে শিক্ষা ও আইন আদালতের ভাষা করা হোক’ দাবি উত্থাপন করা হয় এবং বলা হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনগণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হোক।’ তমদ্দুন মজলিস ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকায় উত্থাপিত প্রস্তাবে ‘কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা হইবে দুটোÑ উর্দু ও বাংলা’ দাবি উত্থাপন করে।
মূলত এই সংগঠনের উদ্যোগে অক্টোবর ১৯৪৭ শিক্ষক-ছাত্রদের নিয়ে প্রথম ক্ষুদ্র পরিসরে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এদিকে পাকিস্তান পাবলিক সর্ভিস কমিশনের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া, মুদ্রা, ডাকটিকিট ইত্যাদিতে বাংলা স্থান না পাওয়ার ঘটনা ঘটে। এই পরিষদ গঠনের পর এসব বিষয়সহ ভাষার দাবি নিয়ে সরকারের সাথে দেন-দরবার চলে। এই ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় নিলে অনুধাবন করা যাবে, প্রথম দিকে ভাষার দাবিতে আন্দোলন মূলত শিক্ষা-চাকরি সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হয়। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক বিবেচনা তখন তেমন ছিল না। শিক্ষা-রাষ্ট্রীয় কাজ তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা থেকে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়।
ভাষার দাবি উত্থাপনে সচেতন ও স্বতঃস্ফূর্ততার মিশেল লক্ষ্য করা গেলেও প্রথম রাস্তার আন্দোলন শুরু হয়েছে মূলত স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ৭ ডিসেম্বর ১৯৪৭, করাচির শিক্ষা সম্মেলনের আগে বাংলা উপেক্ষা করা হবে খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ৫ ডিসেম্বর শামসুল হক, শেখ মুজিব, নাইমউদ্দিন আহমদ প্রমুখ ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে একটি মিছিল বর্ধমান হাউসে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় উপস্থিত হয় এবং ভাষার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করে। এ থেকে সুস্পষ্ট হয় প্রথম থেকেই বিশেষভাবে ছাত্র রাজনীতির সাথে ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ একটা যোগাযোগ ছিল। উল্লিখিত শিক্ষা সম্মেলনে ‘উর্দুকে পাকিস্তানের লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা’ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর সংবিধান সভার কাছে স্বীকৃতির জন্য সুপারিশ করা হবে ঘোষণা করা হলে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার দাবি’ শিক্ষকদের উপস্থিতিতে ছাত্র সভায় সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়। এটাই ছিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম ছাত্রসভা।
এই সভার পর সারা ঢাকা শহরে সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়, পাকিস্তানের শত্রুরা বাংলার মতো একটি হিন্দু ভাষাকে উর্দুর পরিবর্তে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত করছে। একই সাথে সরকার ভাড়া করা গু-াদের মাঠে নামায়। ১২ ডিসেম্বর কিছু সংখ্যক গু-াপা-া বাস ও ট্রাকে চড়ে পলাশী ব্যারাক ও আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে উপস্থিত হয়ে ইটপাটকেল এবং গুলি ছোড়ে। এই হামলার প্রতিবাদে উত্তেজিত ছাত্র-জনতার মিছিল সেক্রেটারিয়েট অভিমুখে অগ্রসর হয়, এটাই ছিল ভাষার দাবিতে প্রথম মিছিল। এই মিছিল প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রীর বাসায় যায় এবং লুঙ্গি পরা অবস্থায় মিছিল করে সেক্রেটারিয়েটে যেতে বাধ্য করে। সেখানে যাওয়ার পর কৃষিমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছ থেকে বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে থাকা এবং তা আদায়ে ব্যর্থ হলে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করবেন মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়। তবুও গু-ামি চলতে থাকে। ১৩ ডিসেম্বর সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারিরা পূর্ণ হরতাল পালন করে।
আন্দোলন চলতে থাকা অবস্থায় সরকার আরও কঠিন অবস্থান গ্রহণ করে। ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সংবিধান সভার নিয়ম-কানুন কমিটি সরকারি ভাষা হিসেবে উর্দু ও ইংরেজিকে সমমর্যাদা দানের সুপারিশ করে এবং যদি কোনো সদস্য এই দুই ভাষায় কথা না বলতে পারে, তবে সভাপতির অনুমতিসাপেক্ষে নিজেদের প্রাদেশিক ভাষায় বক্তৃতা দিতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়। এদিকে গুজব রটে জানুয়ারি ১৯৪৮-এর প্রথম দিকে ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করা হয়েছে। ৮ জানুয়ারি একটি ছাত্র প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী (পরে মুখ্যমন্ত্রী বলা হয়) নাজিমউদ্দিনের সাথে দেখা করে। এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে ভাষার দাবিতে জনমত ব্যাপকতা লাভ করে। প্রসংগত সেই দিনগুলোতে মুসলিম লীগের কোনো নীতি ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভিন্ন মত প্রকাশ করা ছিল দেশদ্রোহিতার শামিল। এই স্বৈরাচারী নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ও সমর্থক ছাত্রদের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় এবং সেই দলে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলতে থাকে। বিদ্রোহী অংশ বিশেষত রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-যুবকরা ক্রমেই ভাষা আন্দোলনে জড়িত হতে থাকে। তবে তখনও পর্যন্ত সরকার বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম ছিল না।
মুসলিম লীগ ছাড়া তখন অতীত থেকে চলে আসা দল ছিল কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় কংগ্রেস ও তফসিল ফেডারেশন। শেষোক্ত দলটি মুসলিম লীগ সরকারের অংশীদার হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ছিল। আর অন্য দুটো দল বিশেষভাবে জাতীয় কংগ্রেসকে সহজেই ভারতের দালাল দল হিসেবে চিত্রিত করা যেত এবং মানুষের মধ্যেও তেমন মনোভাব ছিল। এ পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে হিন্দুরা ভারতে চলে যেতে থাকায় কংগ্রেস পাকিস্তানের প্রথম কয়েক মাস দল হিসেবে তেমন কার্যকর থাকতে পারে নাই। তবে ভাষার দাবির পক্ষে যে ছিল তা সহজেই অনুমান করা চলে।
কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম থেকেই ভাষা আন্দোলনে রাজনৈতিক দল হিসেবে সক্রিয় অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত ভারত ভাগ মেনে নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে আনন্দ মিছিল-জমায়েত করলেও ব্যাপকভাবে হিন্দুরা ভারতে চলে যেতে থাকায় দল সংকুচিত হয়ে পড়ে। মূলত হিন্দুদের মধ্যে দলের ভিত্তি ছিল, নেতৃত্বও ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। পাকিস্তানের পক্ষে কি না, ধর্ম মানে কি না প্রভৃতি নিয়ে মানুষের মধ্যে এই দল সম্পর্কে ছিল চরম বিভ্রান্তি। তবুও এই দল ভাষার দাবি উত্থাপনে এবং আন্দোলনকে অগ্রসর করে নেওয়ার পক্ষে যথাসম্ভব ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের পক্ষে ও বিপক্ষে থাকে যথাক্রমে মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি। জনপ্রিয়তা জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তি বিচারে এই দুই দল তুলনীয় ছিল না। দল দুটোকে কেন্দ্র করেই এক প্রান্তে প্রবল প্রতাপশালী মুসলিম লীগ আর অন্যপ্রান্তে সংকুচিত ও কোণঠাসা কমিউনিস্ট পার্টিকে রেখে ভাষা আন্দোলন অগ্রসর হয়। নতুন গড়ে ওঠা দল, শ্রেণি, পেশা ও সামাজিক সংগঠন প্রভৃতি তখন এই দুই দলকে মাঝে রেখেই আবর্তিত হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লিখিত বিরাজমান অবস্থা থাকায়ই মূলত প্রথম দিকের ভাষা আন্দোলনের যেমন রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে নাই। তেমনি আন্দোলনেরও ব্যাপকতা ও তীব্রতা লাভ করা সম্ভব ছিল না।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে জানুয়ারি ১৯৪৮ পর্যন্ত সময়কালে মূলত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাষা আন্দোলন যখন চলছিল, তখন রাজনৈতিক ভিন্নমত ও পথের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসক-শোসকগোষ্ঠীর প্রতিভূ মুসলিম লীগ সরকারের দমন-পীড়নমূলক নীতি ও পদক্ষেপ সুস্পষ্ট হতে থাকে। ভিন্নমত পোষণ করলে জেল, মামলা, হুলিয়া, বহিষ্কার, গু-া আক্রমণ চলতে থাকে। ‘শির কুচলে লেঙ্গে’ হুমকি স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। প্রসংগত মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে দলাদলি ও কোন্দল এবং ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের পরিবেশ পাকিস্তান সৃষ্টির আগ থেকেই ছিল। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক শেরে বাংলা মুসলিম লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জন্য সক্রিয় থাকতে পারেন নি। সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেমও ছিলেন সমালোচনা ও নানামুখী চাপের মধ্যে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কোণঠাসা করা হয়। এসবই হচ্ছিল কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় বাঙালার প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ফলশ্রুতিতে।
প্রসংগত, ১৯৪৬ সালের অবিভক্ত বাংলার আইনসভার নির্বাচনের পর ২৪ এপ্রিল ১৯৪৬ সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্বে মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হয়। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির আগের দিন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ ছাত্র-যুবকদের সমর্থন সত্ত্বেও ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ফলশ্রুতিতে সোহরাওয়ার্দী আর ওই পদে থাকতে পারেন না। খাজা নাজিমউদ্দিন হন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেম গ্রুপের কেউ স্থান পায় না। তাই চরমতম অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত, কোন্দল-বিবাদ ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের মধ্যে নিমজ্জিত অবস্থায় থেকে মুসলিম লীগ বাংলা ভাগের ভেতর দিয়ে সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হয়। বাংলার তিন নেতা শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশেম আর সেই সাথে ছাত্রনেতা শেখ মুজিব হন তাই পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতাদের সমর্থনপুষ্ট নাজিমউদ্দিন-আকরম খাঁ (সভাপতি) গ্রুপের চক্ষুশূল। তাই মুসলিম লীগের মধ্যে বিভক্তি সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে। বলাই বাহুল্য প্রথম দিকে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট আন্দোলন রূপে আত্মপ্রকাশ করলেও ভাষা আন্দোলন এই বিভক্তিকে তরান্বিত করে।
ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার ও দলের স্বৈরাচারী নীতি ও পদক্ষেপ সুস্পষ্ট হতে থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন গ্রুপের সমালোচক শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকা চলে আসেন। আসার দিনে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে মুসলিম লীগ তাকে কালো পতাকা প্রদর্শন করে। বাসা ভাড়া পেতে বাধা দেয়। ৭ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ঢাকার সিরাজ-উদ-দৌলা পার্কে তার প্রথম জনসভা গু-াবাহিনী দিয়ে প- এবং সভামঞ্চে আগুন দেওয়া হয়। আসাম মুসলিম লীগের নেতা ও এমএলএ, সরকারের তীব্র সমালোচক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। স্থানীয় জনগণের অনুরোধে টাঙ্গাইলের শূন্য আসনের উপনির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হলে, তা মেনে নির্বাচন বাতিল এবং ১৯৫০ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অবিভক্ত বাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ৬ মার্চ ১৯৪৮ গণপরিষদের প্রথম ভাষণে সরকারের সমালোচনা করেন। পরবর্তীতে ছয় মাসের জন্য তার পূর্ব পাকিস্তান প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়।
এদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কলকাতা থেকে সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেম গ্রুপের শেখ মুজিবসহ ছাত্র ও যুবনেতারা ঢাকা আসতে থাকলে মুসলিম লীগের নাজিমউদ্দিন বিরোধী গ্রুপ ১৫০ মোগলটুলির ওয়ার্কার্স ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে সচল হয়ে ওঠে। ২০ ডিসেম্বর ১৯৪৭, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা উদ্যোগ নিয়ে ঢাকার বলিয়াদি হাউসে সোহরাওয়ার্দী সমর্থক এমএলএ’দের একটি বৈঠক করে। কিন্তু সরকার ক্ষমতার টোপ দিয়ে অনেককে গ্রুপে টেনে নিলে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এসব ঘটনা চলতে থাকাকালীন সময় ছাত্র ও যুবনেতারা নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য সদস্য ফরম চাইলে তা দেওয়া হয় না। বলা হয়, যারা সরকারকে সমর্থন করবে তারাই কেবল সদস্য ফরম পাবে। এসব পূর্বাপর ঘটনা সমানে নিয়ে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সরকারবিরোধী ও মুসলিম লীগের প্রগতিশীল এবং বামপন্থি ছাত্রদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের জন্ম হয়। দ্রুতই ছাত্রদের মধ্যে এই সংগঠনের প্রভাব ও সংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।
প্রসংগত, ওই সময়ের রক্ষণশীল ও বৈরী পরিবেশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বদানকারী ও জনসমর্থনপুষ্ঠ মুসলিম লীগের আওতায় থেকে মুসলিম লীগ সরকার-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে এই সংগঠন খুব সুকৌশলী অবস্থান নেয়। নামের সাথে মুসলিম শব্দ রাখে এবং আদর্শ ও উদ্দেশে সরাসরি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন না করে ‘জনসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের ন্যায্য দাবি-দাওয়াগুলোর সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করিয়া দিয়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মিলনকে সুদৃঢ়’ করার দাবি উত্থাপন করা হয়। পাকিস্তানি আমলে ভাষা আন্দোলনসহ পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই সংগঠনের অগ্রণী ভূমিকা ও অবদান ইতিহাসে অমোচনীয় থাকবে।
এ পরিস্থিতিতেও সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে এবং বাংলা ভাষার পক্ষে ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে গু-াপা-া লেলিয়ে দেয়। তাদের চাকরির ব্যাপারে বাধাবিঘœ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেয়। এর প্রতিবাদে জানুয়ারি ১৯৪৮-এর শেষ দিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আর্টস ও সায়েন্স ফ্যাকাল্টি যুক্ত বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনের সকল স্কুল-কলেজে নিম্নতম থেকে আইএ পর্যন্ত সকল ক্লাসে ১৯৫০-৫১ শিক্ষাবর্ষ থেকে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হবে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহমুদ হাসান শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। পত্র-পত্রিকায় পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার যত হতে থাকে, ততই আন্দোলনের তরঙ্গ মফস্বল এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সিলেটসহ কোথাও কোথাও মহিলারা এ আন্দোলনে শামিল হয়। এ-সময় ছাত্রলীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও তমদ্দুন মজলিস এই দাবিকে জনপ্রিয় করতে এবং আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখে।
জানুয়ারি ১৯৪৮-এর শেষ দিকে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন সামনে রেখে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়ে সরকার হন্যে হয়ে ওঠে এবং স্থানে স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ চালানো ও হুমকি দেওয়া হতে থাকে। সাম্প্রদায়িক ও কমিউনিস্ট-বিরোধী প্রচার তুঙ্গে তোলা হয়। সরকার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সংলগ্ন রশীদ বিল্ডিং-এর তমদ্দুন মজলিস ও সংগ্রাম পরিষদ অফিস গু-া দিয়ে আক্রমণ ও আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং কাগজপত্র লুট করে নিয়ে যায়। সংগ্রাম পরিষদ অফিস ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে স্থানান্তরিত হয়। এ পরিস্থিতিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮, গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কংগ্রেস এমএলএ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে উর্দু ও ইংরেজির সাথে বাংলাকে রাখার প্রস্তাব করেন। ‘মানি অর্ডার ও স্ট্যাম্পে বাংলা ভাষা নেই। বাংলা ভাষাভাষি মানুষ তা পড়তে পারে না’ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জনসংখ্যা দিয়ে যুক্তি উত্থাপন করে তিনি বলেন যে, ‘রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে যে ভাষা রাষ্ট্রের অধিকাংশ লোক ব্যবহার করে। সুতরাং আমি মনে করি বাংলা রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা-রাষ্ট্রভাষা।’ এ দাবির পক্ষে কেবল কংগ্রেস এমএলএ’রা বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাখেন।
এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। পূর্ব বাংলার ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয় এবং ছাত্র মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে ছাত্রলীগ, গণআজাদী লীগ, তমদ্দুন মজলিস ও সলিমুল্লাহ হল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ২ মার্চ ১৯৪৮ ফজলুল হক হলে এই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের আহ্বান জানানো হয়। হরতালের দিন সকালে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে মিছিল সচিবালয়ের সামনে পিকেটিং করে এবং তিনি বক্তব্য রাখেন। সরকার পুলিশ ও সেনাবহিনী নিয়োগ করে। মারপিটের ফলে ২০০ জন আহত এবং ৩০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে অনেককে মুক্তি দিলেও শেখ মুজিবসহ ৫৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ১২ মার্চ জগন্নাথ হলে প্রতিবাদ সভা, ১৩ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট, ১৪ মার্চ সকল জেলায় পূর্ণ হরতাল এবং ১৫ মার্চ সর্বস্তরের মানুষ ধর্মঘট পালন করে। সচিবালয়, রেল ও অন্যান্য অফিসে ধর্মঘট পালিত হয়।
পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফরের আগে এভাবে আন্দোলনে গতি সঞ্চারিত হয়। বিপদ বুঝে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ছাত্রদের সাথে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিরোধ মেটাতে উদ্যোগী হন। ১৫ মার্চ সংগ্রাম কমিটির সাথে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে এই চুক্তিতে গ্রেফতারকৃত ছাত্র নেতৃবৃন্দের মুক্তি, পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ ও পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন, ‘এই আন্দোলন দুষমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়’ মর্মে ৮-দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের কথা প্রচার হলেও ছাত্রদের বিক্ষোভ চলতে থাকে। ছাত্ররা দাবি করতে থাকে মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের মুখ থেকে তারা চুক্তি সম্পাদন সম্পর্কে জানতে চায়। তা না হওয়ায় পরদিন ১৬ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু দুজন ছাত্রনেতাসহ প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী রণেশ দাশগুপ্তকে মুক্তি দেওয়া হয় না। শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতারা এদের ছাড়া মুক্তি নিতে অস্বীকার করলে তাদেরও মুক্তি দেওয়া হয়।
১৬ মার্চ ১৯৪৮, অধিবেশন চলাকালীন সময়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সামনে ছাত্র বিক্ষোভ চলে। এদিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শেখ মুজিবের সভাপতিত্বে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় চুক্তি সংশোধন করে প্রস্তাব পাস এবং সভা শেষে মিছিল আইন পরিষদের দিকে অগ্রসর হয়। পুলিশ মিছিলকে বাধাদান করে। এদিকে পুলিশ বিশ^বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর লঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জানতে চান, ছাত্রদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে কি না? এ অবস্থায় পরিষদের অভ্যন্তরে গ-গোল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ১৭ মার্চ এর প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ ছাত্রদের এসব সাহসী পদক্ষেপে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯ মার্চ ১৯৪৮ গর্ভনর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসেন। উল্লিখিত চুক্তি সম্পর্কে জানা থাকা সত্ত্বেও ২১ মার্চ ঢাকার নাগরিক সমাজের নামে রেসকোর্সের সম্বর্ধনা সভায় বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারীদের ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ‘একটিমাত্র রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনো জাতিই এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে কার্যনির্বাহ করতে পারে না।… পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি একই কথা বলেন। ‘না, না’ বলে ছাত্ররা এর প্রতিবাদ করে। জিন্নাহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা, পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র, মুসলিম জাতির ঐক্য প্রভৃতি বিষয়ে বুঝাতে সচেষ্ট হন।
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তির ফলে এ পর্যায়ে আন্দোলন থমকে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে এপ্রিল ১৯৪৮ প্রথম দিকে পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নলিখিত প্রস্তাব পাস হয় : ‘ক) পূর্ব বাংলা প্রদেশে ইংরেজির স্থলে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে গ্রহণ করা হইবে; এবং যত শীঘ্র বাস্তব অসুবিধাগুলো দূর করা যায় তত শীঘ্র তাহা কার্যকর করা হইবে। খ) পূর্ব বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষার মাধ্যম হইবে যথাসম্ভব বাংলা অথবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ স্কলারদের মাতৃভাষা।’ বলাই বাহুল্য এই প্রস্তাব ইংরাজিতে পেশ করা হয়। ‘অসুবিধাগুলো’, ‘যথা শীঘ্র’, ‘যথাসম্ভব’ প্রভৃতি শব্দগুলো যুক্ত করে বিশেষভাবে চুক্তি ভঙ্গ করায় সরকারের স্বৈরাচারী ইচ্ছারই প্রকাশ ঘটে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ সময়কালের আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলন শিক্ষার গ-ি অতিক্রম করে রাজনৈতিক চরিত্র পরিগ্রহ করে। এ পর্যায়ে আন্দোলন স্তিমিত হয় ঠিকই; কিন্তু জানান দিয়ে যায় ভাষার দাবিতে আগামীতে ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন অপেক্ষা করছে।
প্রথম পর্যায়ের ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ব বাংলায় আন্দোলনে ব্যাপ্তি ঘটে। ছাত্রদের বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন ছাড়াও ৮ জুলাই ১৯৪৮ পুলিশ ধর্মঘট ও অনেক পুলিশ হত্যা, মার্চ ১৯৪৯-এর প্রথম দিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ধর্মঘট, তাতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সমর্থন, শেখ মুজিবসহ ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার ও বিশ^বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার প্রভৃতি শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলন চলতে থাকে। জানুয়ারি ১৯৪৯ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান আরবি হরফে বাংলা লেখা হবে ঘোষণা দিলে ছাত্র-গণরোষ তীব্র হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণ সুস্পষ্ট হতে থাকে। রপ্তানি বন্ধ হলে পাটচাষ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। পূর্ব বাংলার অর্থ-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়।
১৯৪৯ সালের ২ মার্চ সরকার নিয়ম বহির্ভূতভাবে সোহরাওয়ার্দীর গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিল করে। তিনি একটি শূন্য আসনে নির্বাচন করে মুসলিম লীগের অসহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভার সদস্যদের ভোটে পরাজিত হন। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র, লোভ ও অর্থ প্রধান ভূমিকা পালন করে। ২৫ এপ্রিল টাঙ্গাইল উপনির্বাচন হয় এবং করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে সাধারণ কৃষক পরিবারের ছেলে, তরুণ নেতা শামসুল হক বিজয়ী হন। তাকেও নানা ষড়যন্ত্র করে আইন সভায় বসতে দেওয়া হয় না। এই পরাজয়ে ভীত হয়ে মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কালক্ষেপণ করতে থাকে। নির্বাচনের আগে ২৪ এপ্রিল শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি ২৭ জুলাই পর্যন্ত জেলে আটক থাকেন। সার্বিক অবস্থায় একটি বিরোধী দল গঠন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় ২৩ ও ২৪ জুন ১৯৪৯, ঢাকার রোজ গার্ডেনে মূলত ১৫০ মোগলটুলি ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের কর্মীদের উদ্যোগে এক সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। দলের ঘোষণাপত্র রচনার উদ্দেশে ১২-দফা কর্মসূচি গৃহীত এবং মওলানা ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই দল গঠনের ভেতর দিয়ে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ইতোমধ্যে বছরের শেষ দিকে পূর্ব বাংলায় খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়। দ্রব্যমূল্য অসহনীয়ভাবে বাড়তে থাকে। মুসলিম লীগ সরকারের অবহেলার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। আওয়ামী মুসলিম লীগ আন্দোলনে নামে এবং পর্যায়ক্রমে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। পরে দুজনকে জানুয়ারি ১৯৫২-তে মুক্তি দেওয়া হলেও শেখ মুজিবকে জেলে আটক রাখা হয়।
ইতোমধ্যে ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫০ মূলনীতি নির্ধারক কমিটি শাসনতন্ত্রের অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট গণপরিষদে পেশ করে। এ রিপোর্টে পূর্ব বাংলার গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় উত্থাপিত দাবিগুলোর প্রতি উপেক্ষা এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করা হয়। স্বাভাবিকভাবে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ অবস্থান গ্রহণ করে এবং পূর্ব বাংলাব্যাপী তীব্র ও ব্যাপক প্রতিবাদ চলতে থাকে। আন্দোলন চরমে উঠলে ১২ নভেম্বর ১৯৫০ গণপরিষদ এই রিপোর্ট প্রত্যাহার করে। আন্দোলনে বিজয় সূচিত হয়। শাসনতন্ত্র বিষয়ে মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট বাতিল করা হলেও শাসনতন্ত্র প্রণয়নে কালক্ষেপণ চলতে থাকে এবং সরকারি কর্মকা- ও মন্ত্রী-নেতাদের কথাবার্তায় এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শাসক-শোষকগোষ্ঠী তাদের কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা, ‘এক লোক এক ভোট’ নীতি গ্রহণ ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি উপক্ষিত থাকবে। এ অবস্থায় ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা স্মরণ দিবস পালিত হয়। ২৭ ও ২৮ মার্চ ১৯৫১ দমন-পীড়ন ও উত্তপ্ত অবস্থার মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসমান নৌকায় সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গঠিত হয়। এই সংগঠন পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনসহ বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৫১ সালে আবারও পূর্ব বাংলায় খাদ্যাভাব দেখা দেয়। লবণ সংকট চরমে ওঠে। দুর্নীতি ও দমন-পীড়নে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ১৬ অক্টোবর ১৯৫১ লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডিতে ভাষণ দানকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে পরিস্থিতি আরও অবনতিশীল হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় ৩০ জানুয়ারি ১৯৫২, মুসলিম লীগ আয়োজিত পল্টনের জনসভায় ছাত্র-সমাজের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বরখেলাপ করে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এর প্রতিবাদে ছাত্র-সমাজ ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে। ওই দিন ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরি হলে আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় প্রতিনিধিদের সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ মওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি গঠনের পেছনে কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ উদ্যোগ ছিল। এ কমিটিতে আওয়ামী মুসলিম লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, খেলাফতে রব্বানী পার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, লেবার ফেডারেশন, রিকশা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন ছাত্র হলের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
এই কমিটি গঠনের ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলন যোগ্য নেতৃত্ব পায় এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি বাজেট অধিবেশনের দিনে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি সাধারণ ধর্মঘট, জনসভা ও মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে। সারা পূর্ব বাংলায় ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি অর্থ সংগ্রহের জন্য পতাকা দিবস পালিত হয়। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে। পরের ঘটনা সকলেরই জানা। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখ নাম জানা-অজানা ১৯ জন শহিদ ও বহু আহত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী সর্বস্তরের মানুষের সভা-সমাবেশ-মিছিল চলে। ছাত্ররা শহিদ মিনার নির্মাণ করতে গেলে তা ভেঙে দেওয়া হয়। ছাত্রসহ শত শত মানুষ গ্রেফতার বরণ করে। মওলানা ভাসানী, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ, খয়রাত হোসেন, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, আবুল হাশিম, গাজিউল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ রাজনৈতিক যুব ও ছাত্রনেতা, অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিত গুহ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন। এদিকে জেলে অনশনরত শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ১ মার্চ ১৯৫২ মৃতপ্রায় অবস্থায় জেল থেকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রচ- দমন-পীড়নের মধ্যেও তীব্রভাবে না হলেও ভাষা আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
ওই সময় ভাষার দাবি আদায় না হলেও পরবর্তীতে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি পায়। এই আন্দোলন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নতুন যুগের সূচনা করে। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ঘটায়। দ্বিজাতিতত্ত্বের পরাজয় ঘটে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাজনীতির পথ সুগম করে। আওয়ামী মুসলিম লীগ এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী গণ-আস্থাসম্পন্ন রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থান গ্রহণ করে। ছাত্র-যুবকদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বামমুখী প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ভাষা সাহিত্য শিল্পকলায় সৃজনশীল বিকাশ শুরু হয়। প্রকৃত বিচারে ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত গৌরবময় পথ অনুসরণ করেই বাঙালি জাতি চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে নব নব বিজয় ছিনিয়ে আনে।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১-দফার ভিত্তিতে জাগরণ ও বিজয় অর্জন, ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন-বিরোধী ছাত্র অন্দোলন, ১৯৬৪ সালের ছাত্র গণ-আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের ১১-দফার ভিত্তিতে গণ-অভ্যুত্থান, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন স্বদেশ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতির উৎসমুখে মহান গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের চেতনা অমøান ও অবিনশ^র, এর ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা জাতীয় চারনীতি স্বাধীনতার পর সংবিধানে স্থান পায়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কর্ণফুলি-সুরমা-তিস্তা বয়ে যাবে, ততদিনই ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বাঙালির হৃদয়ে জাগরূক হয়ে থাকবে। বাঙালি জাতিকে বিশ^ দরবারে মাথা উঁচু করে সম্মুখপানে চলতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Leave a Reply