‘কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও জলবায়ু অর্থায়নে অঙ্গীকার পূরণ করুন’

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা আমাদের সময়ের সব থেকে গুরুতর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। এটি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অস্তিত্বের হুমকি। তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে আমাজনের জঙ্গলে আগুন এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জে ঘূর্ণিঝড় ডোরিয়ান সমগ্র বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমবর্ধমানভাবে আমাদের সভ্যতার ক্ষতি সাধন করছে। প্রধানমন্ত্রী কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে জাতিসংঘ সদর দফতরের একটি কনফারেন্স কক্ষে গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশন (জিসিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এ-কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এমপি, পরিবেশ বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এমপি প্রমুখ।
এই অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি উন্নত জাতিগুলোকে কার্বন নিঃসরণ নিয়ে তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপে অর্থায়নের আহ্বান জানাই। একটি অনিঃসরণকারী দেশ এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং সামর্থ্যরে স্বল্পতা থাকার পরেও বাংলাদেশ স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমাদের অংশীদারিত্বের অঙ্গীকার এমন একটি প্লাটফর্মের সৃষ্টি করবে যেখানে উদ্ভাবনী এবং অভিযোজনমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপসমূহ জলবায়ু পরিবর্তনের সহযোগিতামূলক বিভিন্ন কার্যপ্রণালি নির্ধারণে ভ‚মিকা রাখবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) পঞ্চম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে (এআর-৫) পরিষ্কার বলা হয়েছে- কার্বন নিঃসরণ কার্যকরভাবে বন্ধ বা হ্রাস করা সম্ভব না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বর্তমান শতাব্দীতে তীব্রতর হতে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরো ২০১৮ এবং ২০১৯ সাল জুড়েই জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রা নির্বাহে জনগণের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল। আমরা দুটি ক্ষেত্রে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। প্রথমত; ভবিষ্যতে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণে, দ্বিতীয়ত; যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত ক্ষতি সাধিত হয়ে গেছে সেখানে অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণে।
তিনি বলেন, কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে থাকবে যদি আমরা এ দুটি ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করতে না পারি। আমরা জিসিএ’র ঢাকা কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণায় আরও আনন্দিত কেননা আমাদের অভিজ্ঞতা এবং অঙ্গীকার নিয়ে জিসিএ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বড় আকারের কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এই অফিস অন্যান্য জিসিএ আন্তর্জাতিক অফিসসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে। অভিযোজন বিষয়ে তাদের সেরা অনুশীলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কমিশনের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা বৈঠক সেই অপার সম্ভাবনাই দেখিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) প্রতিষ্ঠার একটি অংশ হতে পেরে বাংলাদেশ আনন্দিত, যা অভিযোজন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে এবং বিদ্যমান সেরা অনুশীলনগুলো পরস্পরের মাঝে ভাগ করতে সহায়তা করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী কমিশনকে, কো-চেয়ার এবং কমিশনারদের ‘ফ্লাগশিপ রিপোর্ট’ প্রণয়নের জন্য অভিনন্দন জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ, এটি জলবায়ু পরিবর্তনে এবং পানিজনিত বিভিন্ন হুমকি ও চ্যালেঞ্জের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে জলবায়ুর চরমভাবাপন্ন বৈরী আচরণ এবং পরিবেশের অবনমন আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ব-দ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনাকে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডস সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ডেল্টা পরিল্পনা-২১০০ প্রণয়ন করেছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতি এবং অঙ্গীকার টেকসই ব-দ্বীপ বাস্তবায়নে। ডেল্টা মানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডেল্টা পরিকল্পনা ২১০০-র স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা জিসিএ বাংলাদেশ, এটির সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলন এবং অর্থসংস্থান করতে কাজ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারকে বাধ্য করুন
রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক সমাধান চাই। মিয়ানমারই এই সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই রয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় তাদের পৈতৃক নিবাসে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের আহŸান জানান তিনি।
স্থানীয় সময় গত ২৫ সেপ্টেম্ব বিকালে নিউইয়র্কের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনসে (সিএফআর) আয়োজিত ‘এ কনভারসেশন উইথ অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার শেখ হাসিনা’ শীর্ষক এক ইন্টারঅ্যাকটিভ সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে সন্ত্রাস ও উগ্র চরমপন্থাকে দুটি সামাজিক ব্যাধি আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য চার-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত; সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের জোগান অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত; তাদের অর্থের জোগান বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত; সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে এবং চতুর্থত; আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য সমান সুবিধাজনক পরিস্থিতি নিশ্চিতের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
মিয়ানমার সরকার একটি পরিকল্পিত নৃশংসতার মাধ্যমে উত্তর রাখাইন রাজ্য থেকে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নিধন শুরু করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা নৃশংসতা ও সন্ত্রাস থেকে পালিয়েছিল। আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে সীমান্ত খুলে দেই। তিনি বলেন, সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য সাধ্যমতো সব ধরনের মানবিক সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে বাংলাদেশকে সর্বপ্রকার সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সবাইকে বাংলাদেশের কক্সবাজারস্থ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এ সমস্ত শিবির পরিদর্শনে এসে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা রোহিঙ্গাদের নিধনযজ্ঞের বিভিন্ন নৃশংস ঘটনাবলি শুনলে আপনারা কেঁপে উঠবেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি, বন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম জিয়াউদ্দিন, সিএফআর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এন হাস প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।


এসডিজি অর্জনে অর্থবহ অংশীদারি জরুরি : টেকসই লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থবহ অংশীদারি এবং সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এসডিজি বাস্তবায়নে কার্যকর অংশীদারি এবং সহযোগিতা স্থানীয় এবং বৈশ্বিক উভয় পর্যায়ে সমভাবেই প্রয়োজনীয়। তিনি এই গ্রহ এবং তার অধিবাসীদের প্রতি অঙ্গীকারে অটুট থাকতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহŸান জানিয়েছেন। একইদিন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল আয়োজিত ‘লোকালাইজিং দ্য এসডিজিস’ অনুষ্ঠানে এ-কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি অনুষ্ঠানে কো-মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রশাসক অ্যাচিম স্টেইনার, ইন্টার পার্লামেন্টারিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট গ্যাবরিয়েলা চ্যুয়েভাস ব্যারন, ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়র মেয়র ত্রি রিসমহারিনি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসডিজি হলো মানুষের প্রয়োজন, আকাক্সক্ষা এবং অধিকারের বহিঃপ্রকাশ। এসডিজির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে স্থানীয়দের ক্ষমতায়নে ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো আমাদেরও বহুমুখী ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারদের সমর্থন প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আমি নিশ্চিত আমরা একত্রে এসডিজির সুবিধাগুলোকে সবচেয়ে প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারব, যাদের অবস্থান প্রায়শই সমাজের একেবারে তলানিতে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী মো. আবুল কালাম আজাদ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এবং পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply