বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি চীন হংকং মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুুুর ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাবে

উত্তরণ প্রতিবেদন: চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশেই থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তবে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে ম্যানিলাভিত্তিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি।
এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৯ আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আবাসিক কার্যালয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরে এডিবির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সুন চ্যান হং বলেন, শিল্প, কৃষি ও প্রবাসী আয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি হবে না। এডিবির আবাসিক প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
পূর্বাভাসে এডিবি জানায়, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হবে। এ প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে শিল্প খাত। জাতীয় বাজেটে সরকারের পক্ষ থেকে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে এ লক্ষ্য পূরণ হবে না বলে হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে সংস্থাটির বাংলাদেশের আবাসিক প্রধান মনমোহন প্রকাশ জানান, ২০২৪ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এজন্য বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে রাস্তা, বন্দর ও পদ্মাসেতুসহ বড় প্রকল্পগুলো এবং ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো যথাসময়ে শেষ করতে হবে। সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, আর্থিক খাতের উন্নয়ন ও ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে হবে। এডিবির পূর্বাভাস, দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের এ প্রবৃদ্ধিতে বড় ভ‚মিকা রাখবে শিল্প খাত। একইসঙ্গে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও চীন, হংকং, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে। এর পাশাপাশি উচ্চতর প্রবাসী আয়ের কারণে বাড়বে ভোগ ব্যয়। একই সঙ্গে সহজ মুদ্রানীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও বাড়বে। ব্যবসায় পরিবেশ উন্নত করতে চলমান সংস্কার এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুবাদেও বাড়বে প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন ও ভ্যাটের আওতা বাড়ার কারণে পণ্য এবং সেবার দাম বাড়বে বলে মনে করে এডিবি। ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে।
জাতীয় বাজেটে সরকারের পক্ষ থেকে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও ভঙ্গুর অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের অভাবে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে এটা পূরণ হবে না বলে এই প্রতিবেদনে জানানো হয়। সরকারের লক্ষ্যের চেয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন কম হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা বাংলাদেশই। এছাড়া প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করলে হবে না। একইসঙ্গে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন করলে হবে না। ঢাকাকে ফাঁকা করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ও অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত এপ্রিল মাসে প্রকাশিত মূল এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে বলা হয়েছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা মূল প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৪ শতাংশ, যা আগে ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। সিঙ্গাপুরের প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা মূল পূর্বাভাসে ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অগ্রগামী। রেমিট্যান্স প্রবাহ, সহজ মুদ্রানীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে সংস্কার কার্যক্রম, অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কারণে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ জিডিপি অর্জনে নিচের দিকে থাকলেও সব সেক্টরে ভালো করায় বাংলাদেশের অবস্থান ওপরের দিকে আছে। তবে এটা ধরে রাখা হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, মানবসম্পদ ও ভ্যাট আইনের কার্যকর প্রয়োগ ইত্যাদি। দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেন, সুশাসনের জন্য এটা খুবই ফলপ্রসূ হবে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। তবে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। থেমে গেলে হবে না। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কৃষি খাতের অংশ থাকবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতি হবে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণভাবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি এবং ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কারণে মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply