খাদ্যের অভাব হবে না : প্রধানমন্ত্রী

Spread the love

উত্তরণ প্রতিবেদন: করোনাভাইরাসজনিত মহামারির কারণে সারাবিশ্বে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে খাদ্য সংকট হবে না বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২০ এপ্রিল গণভবন থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বলেন, ‘আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব হবে না। এখন ধান উঠছে। ধান কাটাও শুরু হয়ে গেছে। আগামীতেও ফসল উঠবে।’ প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চলতি মৌসুমে ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা সরকার কিনে রাখবে। তাতে ভবিষ্যতে কোনো অভাব হবে না। আমরা মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারব।’
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ সঠিক রাখতে সরকার পদক্ষেপ নেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাজারে স্বাভাবিক পণ্য সরবরাহ বজায় রাখতে মনিটরিং জোরদার করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে সর্বশেষ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৮টি জেলার জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করেন। জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ সদর। প্রধানমন্ত্রী এর আগে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে চার-দফা ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট এবং বরিশাল বিভাগের ৪৩টি জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করতে পেরেছি বলেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সবাই সচেতন হলে করোনা থেকে বাঁচা সম্ভব হবে। আপনারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন এবং অযথা ঘোরাঘুরি করে নিজেকে এবং অন্যের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না।’ তিনি দেশের মানুষকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় কোনো আবাদি জমি ফেলে না রেখে তরিতরকারি ও ফলমূল উৎপাদন করার জন্য আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সংকটে দেশে যেন খাদ্যের সমস্যা না হয়, সে জন্য সব জমিতে ফসল ফলাতে হবে। দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে, সেদিকে সবাই দৃষ্টি দেবেন।’ ধান কাটায় সহযোগিতার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং ছাত্র-সমাজের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। এ জন্য ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই বছরের জন্য না। আগামী তিন বছর দেশের অর্থনীতির চাকা যাতে সচল থাকে, সেটা মাথায় রেখেই এই প্রণোদনা। এটা অব্যাহত রাখা হবে।’
কিশোরগঞ্জের মানুষ কিশোরই থেকে গেছে : কিশোরগঞ্জ জেলার সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে চান, ‘কিশোরগঞ্জে এত ধান হয়, সেখানে আধুনিক রাইসমিল আছে?’ জবাবে ভিডিও কনফারেন্সে কিশোরগঞ্জ প্রান্তে উপস্থিত একজন বলেন, ‘এখানে কোনো রাইসমিল নাই। আপনার বদন্যতায় ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির চেষ্টায় যোগাযোগব্যবস্থা হইছে।’ উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসলে তা না। কিশোরগঞ্জের মানুষ কিশোরই থেকে গেছে। তারা চিন্তাই করে নাই যে রাইসমিল লাগবে। ইউনিভার্সিটি করা, হাওরে মাছ ওঠে সেটার জন্য হ্যাচারি তৈরি করা, মাছ ধরে রাখা- এগুলো নাই।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার মনে হয়, ওখানে অনেক ব্যবসায়ী আছেন। একটা আধুনিক রাইসমিল যদি করা যায়, তাহলে কৃষকরা যত ধান পাবেন, আমরাও সেই ফসল রাখতে পারব।’
জেলার ত্রাণ-স্বাস্থ্য তদারকির দায়িত্বে সচিবরা : জেলাগুলোর ত্রাণ কার্যক্রম ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করার দায়িত্ব সচিবদের দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের সচিবরা আছেন। যেহেতু এখন মন্ত্রণালয়ের কাজ অনেকটা সীমিত হয়ে গেছে তাই একেকটা জেলায় একেকজন সচিবকে দায়িত্ব দিয়েছি, ত্রাণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজগুলো যথাযথভাবে হচ্ছে কি না সেই খোঁজখবর তারা নেবেন এবং সেই রিপোর্ট আমাকে দেবেন।’
বক্সে লেখা এন-৯৫, ভেতরে ভিন্ন জিনিস : পিপিই, মাস্কসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সঠিকভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কনফারেন্সের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রীর কাছে কিছু ছবি পাঠিয়েছি। যারা সাপ্লাই দেয়, তারা সঠিকভাবে সঠিক জিনিস দিচ্ছে কি না? মহানগর হাসপাতালে কিছু জিনিস গেছে, পিপিই নাম করে দিয়েছে; কিন্তু ভেতরে জিনিসগুলো ঠিকমতো যায়নি। এটা আপনাদের সব সময় দেখা উচিত। সঠিক জিনিসটা কিনছি কি না দেখা দরকার, বিষয়গুলো একটু দেখবেন।’
এ সময় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা নিম্নমানের হওয়ার কারণে ১ লাখ ৭০ হাজার পিপিই ফেরত দিয়েছি। দেশের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হয়তো আমাদের ভুল হয়ে থাকতে পারে। এখন আমরা চাচ্ছি, এই ভুলগুলো যেন না হয়।’

আরও ৫০ লাখ দরিদ্রকে রেশন কার্ড দেওয়া হবে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহামারি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দিনমজুর ও মেহনতি শ্রেণির মানুষকে খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য আরও ৫০ লাখ দরিদ্র লোককে ১০ টাকা কেজিতে চাল সরবরাহের জন্য রেশন কার্ড সুবিধার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘বর্তমানে ৫০ লাখ চরম দরিদ্র ও দুস্থ মানুষ সরকারের রেশন কার্ড সুবিধার আওতায় প্রতি কেজি ১০ টাকায় চাল পাচ্ছেন। কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা আরও ৫০ লাখ লোককে এই সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
গত ১৬ এপ্রিল সকালে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা বিভাগের ৯টি জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সিভিল সার্জনসহ চিকিৎসক, সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সর্বশেষ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময়কালে এ-কথা বলেন। ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জ জেলা ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত ছিল।
যারা হাত পেতে খেতে পারবে না তাদের জন্যই তার সরকার ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে ৫০ লাখ রেশন কার্ড আরও অতিরিক্ত দেব সেখানে যারা সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন এবং যাদের ইতিমধ্যেই রেশন কার্ড রয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে যাদের সত্যিকার প্রয়োজন তাদের নামটা যেন তালিকায় থাকে।’ তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে কমিটি করতে বলেছেন যাতে যারা সত্যিকার দুস্থ এবং যাদের ঘরে খাবার নেই তাদের খুঁজে বের করা যায়। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাদের প্রকৃত প্রয়োজন তাদের কাছে সাহায্য যেন পৌঁছায় সেজন্য ইতিমধ্যেই আমরা নির্দেশ দিয়েছি। সরকারি বা বেসরকারিভাবে যে সহায়তা দেব সেটা যেন সঠিক লোকের কাছেই পৌঁছায়। সেখানে যেন কেউ অনিয়ম করতে না পারে সেদিকেও বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি খানিক বাদে বাদে গরম পানি খাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। যারা বাইরে থেকে আসছে তাদের দ্বারাই এই ভাইরাসটা নতুন নতুন জায়গায় সংক্রমিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী লকডাউন কঠোরভাবে অনুসরণের এবং কোনো জেলায় নতুন করে কেউ প্রবেশ করতে গেলে তাকে বাধা প্রদান করে সেখানেই লকডাউনের নির্দেশ দেন।
সৌদি আরবে পর্যন্ত মসজিদে জামাত বন্ধ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমনকি তারাবির নামাজও সেখানে ঘরে বসে সবাই পড়বে। মন্দির, মসজিদ, গীর্জা এমনকি ভ্যাটিক্যান সিটিতে পর্যন্ত এ-ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা আসন্ন মাহে রমজানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত আপনি সব জায়গায় বসে করতে পারবেন। আপনারা ইসলামি ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা মেনে ঘরে বসেই তারাবির নামাজ পড়বেন। আর আল্লাহকে ডাকতে হবে। সেটা আপনি আপনার মতো করে যত ডাকতে পারবেন, মহান রাব্বুল আলামিন সেটাই কবুল করবেন।’

Leave a Reply