উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ আপাতত করোনা মোকাবেলায় ব্যয় হবে

Spread the love

উত্তরণ প্রতিবেদন : উন্নয়ন প্রকল্পের যেগুলো অত্যাবশ্যকীয় নয়, সেগুলোর বরাদ্দকৃত অর্থ আপাতত করোনা মোকাবেলায় ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সংকটটা যাতে কাটিয়ে উঠতে পারি, তার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। অর্থনৈতিকভাবে যে নেতিবাচক দিনগুলো সামনে আসতে পারে, সেগুলো বিবেচনা করে আমরা কর্মসূচি নিয়েছি। গত ১৮ এপ্রিল একাদশ জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনের বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অধিবেশনে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ও সমাপনী ভাষণ একই সঙ্গে দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে এ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই সংসদের সভাপতি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জানান, শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই এ অধিবেশন। বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটের প্রেক্ষাপটে এ অধিবেশন হবে সংক্ষিপ্ত।
অধিবেশনের শুরুতেই শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী করোনায় মৃত্যুবরণ করা মানুষদের স্মরণে শোক প্রকাশ করা হয়। শোক প্রকাশ করা হয় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাঈনউদ্দিনের স্মরণেও।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের সব শ্রেণির মানুষের কথা বিবেচনা করে প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ আমরা দিয়েছি। অর্থনীতি যাতে গতিশীল থাকে, সেজন্য আমরা তিন ভাগে এ সুযোগটা দিচ্ছি।
তিনি বলেন, আমাদের পরিবারগুলো যাতে খাদ্যে কষ্ট না পায়, সেজন্য আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। দুর্ভিক্ষ যদি বিশ্বব্যাপী হয় আমাদের দেশে মানুষ যাতে দুর্ভিক্ষে না পড়ে, তার জন্য আগাম তিন বছরের বিষয়টি মাথায় রেখেই প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। তিনি বলেন, আমাদের খাদ্যের অভাব নেই, অভাব হবেও না। কৃষি উৎপাদন যদি অব্যাহত থাকে তার জন্য আমরা নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়েছে, দিনমজুর যারা এখন কাজ পাচ্ছেন না তাদের একটা সুযোগ। তারা এখন ধান কাটতে যেতে পারেন। কেবল দিনমজুর নয় সবারই যাওয়া উচিত। এখানে কেবল উঁচু-নিচু নয়, কাজ করা সবার দায়িত্ব। ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে, বিশেষ করে ছাত্রদের আমি বলব, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যেন একটু এগিয়ে আসে। সবাই মিলে ধানটা যদি আমরা ভালোভাবে তুলতে পারি, আমাদের খাবারের কোনো অভাব হবে না। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া আছে যারা যেখানে ধান কাটতে যেতে চায় তাদের সেখানে পৌঁছে দেয়া হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ব থেকে এরই মধ্যে খাদ্য দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের উর্বর মাটি আছে, মানুষ আছে, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা যে যা পারি তরিতরকারি হোক ছাদে হোক মাটিতে হোক উৎপাদন করতে পারি, আমরা নিজেরা চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশকে দিতে পারি।
চিকিৎসাসেবার হটলাইনে ফোন দিয়ে অনেকে খাবারও চাচ্ছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যারা হাত পাততে পারেন না কিন্তু বাড়িতে খাবার নেই, এই তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। আমি দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছি এ হটলাইনের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য, যদি কেউ সাহায্য চায় সঙ্গে সঙ্গে যেন তা পৌঁছে দেয়া হয়। ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের জন্য ৫০ লাখ কার্ড আমাদের দেয়া আছে। আরও ৫০ লাখ কার্ড করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সেটা শুরুও হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি কার্ড করা হচ্ছে। এতে ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ সুবিধা পাবে। স্বাস্থ্য খাতে এত বড় দুর্যোগ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আগে কখনও হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেছি। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগে এ-রকম একটা ঝড় উঠবে তা আমাদের কল্পনাতীত ছিল। ভাইরাসসহ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আমাদের আগের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি এর অভিজ্ঞতা সারাবিশ্বে কারও নেই। তারপরও তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ অন্য দেশের চেয়ে যথেষ্ট ভালো আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিজস্ব কিছু চিন্তা-ভাবনা থেকে আমরা পদক্ষেপ নিই।
তিনি বলেন, আমাদের পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সশস্ত্র বাহিনী স্বাস্থ্যসেবা দানকারী চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যেকেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
ঘরে থাকার নির্দেশনা না মানায় উষ্মা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের মানুষ সাহসী হতে গিয়ে একটু বেশি সাহসী হয়ে গেছে। তাদের বারবার ঘরে থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিন-রাত যথেষ্ট কষ্ট করছে। কিন্তু কেন যেন মানুষ এটা মানতে চায় না। দেখা যায় এখানে বসে আড্ডা, ওখানে বসে গল্প। এটা করে সে নিজেও ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্য ১০ জন মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
মানুষের ঘরে না থাকার প্রবণতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সবাইকে বলা হলো ঘরে থাকেন। ঘরে না থেকে বউ নিয়ে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গেল। শিবচর থেকে টুঙ্গিপাড়া হাজির। ভাইরাস টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত পৌঁছে গেল। নারায়ণগঞ্জ থেকে চলে গেল বরগুনা। আমরা বারবার অনুরোধ করছি, আপনারা যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন।
সরকারের নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের চেষ্টা হচ্ছে মানুষের জীবনটাও যেন চলে, তারা যেন সুরক্ষিত থাকে, সেদিকে লক্ষ রেখেই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেশবাসীকে আহ্বান জানাব, সংসদ সদস্যসহ নির্বাচিত প্রতিনিধি আছেন তাদের সবাইকে বলব, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতামূলক নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, সবাই দয়া করে তা মেনে চলবেন। মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসেই এবাদত করার আহ্বান জানান তিনি।

বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল সংসদ
বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা মহামারির মধ্যে মাত্র সোয়া ঘণ্টা স্থায়ী ছিল একাদশ জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশন। এর মাধ্যমে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে স্বল্পতম সময়ের সংসদ অধিবেশনের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল এই সংসদ। সাংবিধানিক বাধ্য-বাধকতার কারণে গত ১৮ এপ্রিল বিকেল ৫টার পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই অধিবেশন শুরু হয়। সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় শেষ হওয়া এই অধিবেশনের প্রধান ইস্যু ছিল করোনাভাইরাস সংক্রমণে সতর্কতা। একদিনে শুরু হয়ে সোয়া ঘণ্টায় কোনো অধিবেশন সমাপ্তি হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে কখনও ঘটেনি।
করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও সাধারণ ছুটির মধ্যে আহূত এই অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ স্বল্পসংখ্যক সংসদ সদস্য অংশ নেন। উপস্থিত সংসদ সদস্যরা বিগত দিনের আসন বণ্টন এড়িয়ে করোনা সতর্কতা মেনে আসন গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সারিতে শুধুমাত্র বেগম মতিয়া চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply