… যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী

Spread the love

জয়দীপ দে

পিয়াল! পিয়াল!!
দুবার চিৎকার করে ডেকে চুপ মেরে গেল। এখন পিয়াল এলে ও কী করবে? কান ধরে কষে একটা চড় মারবে? না-কি আচ্ছাসে ধমকে দেবে। না-কি কাছে ডেকে নিয়ে বিষয়টা বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হবে না, সে জানে। পিয়ালের এ পরিণতির জন্য পরোক্ষভাবে তারাই দায়ী।
বড়াপু এলে সম্রাটের প্রথম প্রথম ভালো লাগে। কত স্মৃতি কত মায়া এক জীবনে। বোন ছাড়া কারও কাছে এমন মায়া মিলে না। কিন্তু কিছুদিন গেলেই প্রথমে অপরাধবোধে, পরে অস্বস্তিতে মনটা বিষিয়ে ওঠে।
সাত ভাইবোনের মধ্যে বড় চারজনই বোন। তারপর বাদশাহ। আর দুজন সম্রাট আর রাজা। বড় চার বোনের কাজ ছিল ছোট তিন ভাইকে পেলেপুষে বড় করা। মেয়ে বলে তাদের প্রতি খুব একটা মনোযোগ ছিল না আম্মা-আব্বার। বড়াপুর কোলেপিঠে সম্রাট বড় হয়েছে। সারাবছর মেয়েলি রোগে ভোগা মায়ের কাছে তেমন একটা আদরস্নেহ পায়নি সম্রাট। মা বলতে মানুষের মনে যে সুখানুভূতির জন্ম হয়, তা তার বড়াপুকে ঘিরে। সারাদিন বড়াপু তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। আর হাতে থাকত একটা বই। নিজে নিজে বইয়ের কবিতা পড়ত আর কবিতার ছন্দে মাথা দুলাত।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি-
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
সম্রাটের বয়স তখন তিন কি সাড়ে তিন। বাসাভর্তি মানুষ ছিল। দুই বেকার চাচা উঠেছিল কাজের সন্ধানে। আব্বা একটা স্টেশনারি দোকান খুলে দিয়েছিল তাদের জন্য। ছোট মামা পড়ত পলিটেকনিকে। ফুপি খালারা প্রায় আসত নাইওরে। বড়াপু তখন সবে থ্রি-পিছ পরা শুরু করেছে। আম্মা বারবার বলত বুক ঢেকে রাখতে। তখন একদিন রান্না করতে করতে গায়ে কাঁপুনি দিয়ে রান্নাঘরেই শুয়ে পড়ে বড়াপু। সম্রাট তার পাশে একটা চটের বস্তার ওপর বসে খেলছিল। চুলায় ছিল বেগুন-আলুর তরকারি। একটু পরেই পোড়া লাগতে শুরু করে। সারাঘর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। আম্মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ‘হতভাগী’, ‘কপালপুরি’, ‘রাক্ষুসি’ বলে গালাগালি করছিল। বড়াপুর শরীরে এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল না যে উঠে গিয়ে ঢালাইর কড়াইটা নিচে নামাবে। তারপর কে যেন এসে কড়াইটি নামাল।
এই কাঁপুনির জ্বরে বেশ অনেকদিন ভুগলো বড়াপু। সারারাত পেটের ব্যথায় ঘুমাতে পারত না। মাঝে মাঝে সম্রাট তার পাশে গিয়ে দাঁড়াত। দেখত গা থেকে গরম ভাপ ছাড়ছে। তাকে দেখলে এত যন্ত্রণার মধ্যে বড়াপু মৃদু হাসত। ইশারায় কাছে ডাকত। তখন অন্য বোনরা তাকে টেনে নিয়ে যেত। কানে কানে বলত : ‘কাছে যাস নে, বড়াপুর মরণ রোগ হয়েছে। বেশি দিন বাঁচবে না। তুই গেলে, তোকেও ও নিয়ে চলে যাবে।’
সাড়ে তিন বছরের সম্রাট কথাটা পরিপক্ব একটা মানুষের মতো করে গ্রহণ করেছিল। সে ধরেই নিয়েছিল কয়েকদিন পর আর বড়াপু থাকবে না। একটা সোনার তরী এসে তাকে নিয়ে চলে যাবে। তারপর মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কেউ বলবে না ‘যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী’। তাকে দেখে মিষ্টি হেসে কাছে ডাকবার মানুষটা থাকবে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, বড় বড় লকমা দিয়ে ভাত খাওয়াবার কেউ থাকবে না। সবাই বড়াপুর চলে যাওয়া নিয়ে প্রস্তুত ছিল, একমাত্র সম্রাট ছাড়া।
যখন বড়াপুর গোঙ্গানিতে কেউ আর ঘরে শান্তিমতো থাকতে পারছিল না, একদিন আব্বা রিকশা ডেকে এনে তাকে রেলওয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিল। তখন মনে হলো অন্য বোনদের কথাই ঠিক। বড়াপু মরণ রোগ নিয়ে চিরতরে চলে যাচ্ছে।
দিন পনেরো পর বড়াপু ফিরল। নববসন্তের পরশে যে পাতাটি সতেজ নিটোল হয়ে উঠেছিল, এক বালুঝড়ে যেন বিবর্ণ হয়ে ফিরল। তার বুক ঢেকে রাখার প্রয়োজন হয় না। শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে। গৌরবর্ণে একটা ধুলোর প্রলেপ। মাথার চুলগুলোও হালকা হয়ে গেছে। কানে কম শুনে।
এরপর বড়াপুর মাথায় পড়া ধরত না। যে বড়াপু মাটির চুলায় রান্না করতে করতে আর ধোঁয়ায় চোখ মুছতে মুছতে বই পড়ে একটার পর একটা ক্লাস ডিঙিয়ে গিয়েছিল, সেই বড়াপু দুইবার নাইনে ফেল মারল। প্রায় আফসোস করে বলত : কিছু মাথায় থাকে না রেÑ
আব্বা মুড়ি মাখা খেতে খেতে বলত, টাইফয়েডে ওর ব্রেইন শর্ট হইয়া গেছে। ওর দ্বারা পড়াশোনা হইত না।
আব্বা নেমে পড়লেন পাত্রের সন্ধানে। প্রায় বিকেলে এ ও দেখতে আসে। বাবার খুব শখ রেলের কোনো কর্মচারীর সাথে মেয়ে বিয়ে দেবে। পাত্রের চাকরি যাই হোক, খালাসী পিয়ন কিংবা আরএনবি’র সেপাই। একটা হলেই হলো। রেলের কোয়ার্টার মিলবে। এক তারিখে বেতন। রিটায়ার্ডের পর পেনশন। একটা নিশ্চিত নিরাপদ জীবন পাবে মেয়েটি। কিন্তু শর্ট ব্রেইনের মেয়েকে বিয়ে করবেই বা কে? করানোর জন্য যে প্রণোদনা প্যাকেজ দরকার, সেটা দেবার সাধ্যি নেই আব্বার। ফলে বিয়েটা আর হচ্ছিল না।
এর মধ্যে কুয়েত থেকে আসা এক ছেলে খুব করে পাত্রী দেখছিল। কাঁচা টাকার লোভে বিশ বছরের বড় এক পুরুষের সাথে বড়াপুর বিয়ে দিয়ে দিল আব্বা। প্রথম প্রথম ভালোই দিন কাটছিল তাদের। বিদেশ থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠাত দুলাভাই। বছরে একবার আসত। আসার সময় শ্বশুরবাড়ির জন্য নিয়ে আসত টুইনওয়ান, ইস্ত্রি, প্রেশারকুকার। পুরুষদের জন্য সিকো ঘড়ি, মহিলাদের জন্য কসমেটিক্স। এসব নিয়ে আব্বা খুব গৌরব করত।
কিন্তু সে আনন্দ বেশিদিন টিকল না। উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হলো। কোনো প্রকারে প্রাণ নিয়ে ফিরল দুলাভাই।
সেই মধ্যবয়সী মানুষটাকে সম্রাট কোনোদিন ‘দুলাভাই’ বলে ডাকেনি। তার ইতস্তত লাগত। কুয়েত থেকে ফেরার পর শুরু হলো দারিদ্র্য। আগে পাঠানো টাকার কোনো হদিস নেই। বড়াপুর অল্প বয়স, ধৈর্য কম। সারাদিন অভাব-অনটন নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করে। মেজাজ তিরিক্ষ হয়ে ওঠা দুলাভাই প্রায়ই তার ওপর চড়াও হয়। গরুর মতো পেটায়। তারপর বিশ্রামের জন্য চলে আসে সে বাপের বাড়ি। সারাদিন তখন স্বামীর নিন্দা গীবত করে বেড়ায়। কীভাবে তার স্বামীকে টাইট দেবে সেই কৌশল বর্ণনা করে জনে জনে। কেউ অবশ্য তাকে পাত্তা দেয় না। ‘ব্রেইন শর্ট’ বলে ফোড়ন কাটে। স্বামীকে টাইট দেওয়ার আগেই সে শিথিল হয়ে যায়। সপ্তাহ খানেক পর হাসিমুখে পতিগৃহে ফিরে যায়। বড়াপুকে দেখে সম্রাট জেনেছে, দুর্বলের আত্মসম্মান থাকতে নেই। বেঁচে থাকাই তাদের একমাত্র লক্ষ।
বড়াপুর সাথে আসে তার দুই ছেলে আর মেয়ে। বড় ছেলে পিয়াল। বয়স ১২ হবে। এখনই সে পকেট মারতে শিখে গেছে। সম্রাট লক্ষ করছে প্রতিরাতে তার মানিব্যাগ থেকে কে যেন টাকা সরিয়ে রাখে। এ পিয়াল ছাড়া আর কেউ নয়, সে নিশ্চিত। একদিন হাতেনাতে ধরেছিল।
আজ দেখল পুরো একটা ৫০০ টাকার নোট হাওয়া। রাগে সে ক্রোধান্ধ হয়ে পড়েছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল ডেকে মনের সুখে কিছুক্ষণ চড়াতে। কিন্তু পরোক্ষণেই একটা অপরাধবোধে আচ্ছন্ন হয়ে গেল সম্রাট।
সম্রাটদের আড়াই কোঠার বাসাটা এখন বেশ বড়। একসময় অনেক মানুষ ছিল। গাদাগাদি করে সবাই থাকত। বাবা তাই প্রতিবছর একটু একটু করে বাসাটা বড় করেছিল। মূল কোয়ার্টারের সামনে পিছে পাশে টিনের ঘর তুলে অনেকগুলো মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তখন। অথচ এখন আর মানুষ নেই। চাচারা নিজ নিজ সংসার করে পৃথক হয়ে গেছে। রাবুপা সালেপা দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন। বড় ভাইও তাদের সাথে থাকে না। তাই টিনের এক্সটেনশন ঘরগুলো শূন্য পড়ে থাকে।
এ-রকম একটা টিনের এক্সটেনশনে একটি চকি পাতা হয়েছে। তাতে সম্রাট আর রাজা থাকে। চকির চারপাশে বইয়ের ছড়াছড়ি। একটা বাঁশের বুকসেলফ আছে। তাতে সবুজ রং করা। কিন্তু সেই সেলফে বইয়ের জায়গা হয় না। টেবিলে মেঝেতে বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে বিছানায়ও বইয়ের দেখা মিলে। বেশির ভাগ বই-ই সোভিয়েত ইউনিয়নের রাগুদা প্রকাশনীর। রুম জুড়ে মার্ক্স এঙ্গেলস আর লেনিনের রাজত্ব। সম্রাট রাজার রাজনৈতিক আদর্শ বুঝে। কিন্তু এসব নিয়ে কথা বলে না। এ বয়সে বামপন্থি হওয়া খারাপ না। বয়স হতে হতে সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাজা গেল বছর ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। বিষয় বনবিদ্যা। অবশ্য বনবিদ্যা বললে কেউ বুঝবে না। ফরেস্ট্রি নামে পরিচিত। তাদের বংশের সবচেয়ে উজ্জ্বল ছেলে রাজা। বড় ভাই বাদশাহ রেলে পিএনএলের চাকরি করে। বউ-বাচ্চার সুবিধার জন্য বারো কোয়ার্টারে ওখানে বাসা নিয়েছে। কলোনিতে না-কি বাচ্চা মানুষ হয় না। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়।
সম্রাট ফিরে রাতের ইংরেজি নিউজ শুরু হওয়ার পরপর। আজ অবশ্য বেশ আগেই ফিরেছে। রাজার ফেরার কোনো টাইমটেবিল নেই। যেদিন টিভিতে ধারাবাহিক নাটক কিংবা ইংরেজি সিরিয়াল থাকে ছাত্রের বাসায় দেখে ফিরে। তখন সাড়ে ১০টা বেজে যায়। নইলে ৮টার নিউজের পরপরই রুমে ফিরে আসে। তারপর অখ- মনোযোগে সারাদিন ডায়েরিতে হিবিজিবি করে লেখা লেখাগুলো সাদা অফসেট কাগজে সযত্নে তুলতে থাকে। টেবিলল্যাম্পের আলোয় নিরিবিলিপ্রিয় মেধাবী ভাইটাকে দেখে বড় ভালো লাগে সম্রাটের। হামিদুল ইসলামের অন্তত একটা ছেলে তার নাম ছড়াবে। তাকে নিয়ে গর্ব করবে তার ভাইবোনরা। ভাগ্নে ভাতিজারা তার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।
সম্রাট মানিব্যাগের অর্থ তছরুপ নিয়ে কি করবে ভাবছিল, তখন রাজা ঢুকল রুমে। তার পিঠে একটা ছোট র‌্যাক্সিনের ব্যাগ। পেছনে পেছনে সুমিও ঢুকল রুমে। সুমি, বড়াপুর মেয়ে। মুখের আদলটা ঠিক মায়ের মতো। তার হাতে রঙিন একটা ছড়ার বই।
– এামা, এটা কি লিখেছে। একটু পড়ে দাও না-
বইটা হাতে নিয়ে রাজা খেকিয়ে উঠল, যা তো এখন, ডিস্টার্ব করিস না।
রাজার অচম্বিত ব্যবহারে চমকে গেল সম্রাট। ও তো এমন ছেলে না। সম্রাট কিছুক্ষণ রাজাকে লক্ষ করল। রাজা কাঁধের ব্যাগটা রাখল বিছানায়। শার্টটা খুলে একটা লুঙ্গি পরে নিল। নাহ, অস্বাভাবিক কিছু নেই। সম্রাট ভারী গলায় বলল, সুমির সাথে এমনটা করলি ক্যান?
– আর বলিস না, বাংলা ভাষার ছড়াকারদের হুঁশজ্ঞান বড় কম। এমন সব কথা ছোটদের বইতে লিখে রেখেছে, বলতে গেলে বিপদ। বুঝাইতে গেল আরও বিপদ।
– কি কথা লিখছে রে?
– লিখছে, মক্ষিরাণী পক্ষিরাজ/দস্যি ছেলে লক্ষ্মী আজ… মক্ষিরাণী শব্দের অর্থ যদি জানতে চায় কি বলব আর দস্যি ছেলে কীভাবে লক্ষ্মী হয় বলত…
হো হো করে হেসে ওঠে সম্রাট। তার সাথে যোগ দেয় রাজা।
বহুদিন পর এ বাড়িতে হাসি শোনা গেল।
আরেকটা ঘর থেকে বড়াপু মধুর সুরে কবিতা পড়ে যাচ্ছে।
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি-
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
শেষের লাইনটা কেমন আহাকার তুলে যায়। ‘… যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।’ তাই তো, অভাব-অনটনের মধ্যেও কি মধুরই না ছিল তাদের শৈশব! বাসাভর্তি মানুষ ছিল। উৎসব উৎসব একটা ভাব থাকত সবসময়। অভাব ছিল, গ্লানি ছিল না। হাসি-ঠাট্টা আনন্দ ভরিয়ে রাখত সে জীবন। কোনো এক সোনার তরী সব তুলে নিয়ে গেল। রেখে গেল শুধু আহাকার।

Leave a Reply