করোনা নিয়ে চীন ও আমেরিকার বাকযুদ্ধ

Spread the love

সাইদ আহমেদ বাবু: বিশ্বজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে কোভিড-১৯। এ পরিস্থিতিতে চীন ও আমেরিকার বাকযুদ্ধ তুঙ্গে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে করোনাভাইরাস বিশ্বকে যে দুর্যোগের মধ্যে ফেলেছে, তা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। এ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে চীন এবং তারা করোনাভাইরাস উহানের একটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি করেছে। করোনাভাইরাস নিয়ে চীনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেছেন, চীন যদি জেনে-শুনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে তবে তাদের কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তিনি বেইজিংয়ের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে চীন-আমেরিকার মধ্যে চলছে তুমুল বাকযুদ্ধ। বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমণকে শি জিনপিং সরকারের দায়িত্বহীন কা- বলে আক্রমণ করে আসছিল হোয়াইট হাউস। এ অভিযোগের বিরুদ্ধে এবার মুখ খুলল চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিজিয়ান ঝাও ‘আমেরিকাই এই ভাইরাসের জন্ম দিয়েছে’ বলে ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি বার্তা দিলেন। বিশ্ব যখন করোনায় আতঙ্কগ্রস্ত, এ সময় প্রমাণ ছাড়া দোষারোপ করা অনুচিত।
করোনাভাইরাস নিয়ে প্রতিদিন হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সম্মেলন করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উহানের ল্যাবরেটরিতে তার বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে বিষয়টি তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছে। আমেরিকা ভাইরাসের পুরোপুরি তদন্ত করছে এবং আমেরিকা ঠিক খুঁজে বের করবে যে ভাইরাস কী করে সারাবিশ্বে ছড়াল।
এই মহামারির প্রায় শুরুর সময় থেকে আহ্বান জানানো হয় যে, আন্তর্জাতিক তদন্তকারীদের চীনে যেতে দেওয়া হোক যাতে তারা তদন্ত করে দেখতে পারে কোথা থেকে এই ভাইরাস ছড়াল। করোনাভাইরাসের সূত্রপাত নিয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান চীন প্রত্যাখ্যান করেছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেন, আগামী সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের বার্ষিক বৈঠকে তিনি এই তদন্তের জন্য চাপ দেবেন। এই পরিষদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য নীতি-নির্ধারক। অস্ট্রেলিয়া এই পরিষদের নির্বাহী বোর্ডের সদস্য। এ বৈঠকে বর্তমান মহামারি থেকে ‘শিক্ষা নিয়ে’ আগামীতে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিটেনে চীনের একজন শীর্ষ কূটনীতিক চেন ওয়েন বিবিসি’কে বলেছেন, এই দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা এ মুহূর্তে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছি। এই ভাইরাস দমন করার জন্য আমরা পুরোমাত্রায় মনোযোগ দিচ্ছি। এখন তদন্তের কথাবার্তা কেন উঠছে? এই তদন্ত শুধু আমাদের লড়াইয়ে ব্যাঘাত ঘটাবে তাই নয়। এই তদন্ত কারও কোনো কাজে আসবে না। মিস চেন বলেন, এই ভাইরাসের উৎস নিয়ে অনেক গুজব ছড়িয়েছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বিপজ্জনক বলে তিনি দাবি করেন এবং বলেন, এটা একটা রাজনৈতিক ভাইরাস এবং করোনাভাইরাসের মতো একই রকম বিপজ্জনক। তার থেকেও বেশি বিপজ্জনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং সাফ বলেন, এ ঘটনা যে কোনো সময়ে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই ঘটতে পারে। অন্যান্য দেশের মতো চীনও এই ভাইরাসের হানায় বিধ্বস্ত হয়েছে। চীন অপরাধী নয়; বরং ভুক্তভোগী। এমন কিছু ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে সে-বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন করোনাভাইরাস নিয়ে একে অন্যকে দোষারোপ করেছে। প্রথম দিকে চীনে এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলেও গত কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় তারা তা সফলভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছে। করোনার এখনও কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। চীনের প্রতিরোধের পদ্ধতিটাই সবাই অনুসরণ করে করোনা প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। ফলে চীনের চেয়ে এখন অন্যান্য দেশেই করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো আসছে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ইরান থেকে। এসব দেশের সরকারগুলো সরাসরি এসবের পেছনে না থাকলেও, সরকারের সাথে সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তির কথায় এবং মিডিয়ায় এগুলো স্থান পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন থেকেই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে বলে মনে করছে আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিক দেশ। এর আগে থেকেই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে করোনা নিয়ে শি জিনপিং প্রশাসনের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছেন ট্রাম্প।
এদিকে চীনের ল্যাবে জীবাণু তৈরি হয়েছেÑ ট্রাম্পের এমন দাবিতে সমর্থন জানায়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ২১ এপ্রিল জেনেভায় ডব্লিউএইচও জানিয়ে দিয়েছে সব তথ্য-প্রমাণাদি থেকে জানা যায় যে, ভাইরাসটি একটি প্রাণী থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। এটি কোনো গবেষণাগারে বা অন্য কোথাও থেকে ছড়ায় নি। তবে প্রাণী থেকে কীভাবে এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এমন ধরনের ভাইরাস ল্যাব থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাব দেননি ডব্লিউএইচও মুখপাত্র ফাদেলা চাইব। এর আগে দ্য উহান ইনস্টিটিউট এমন দাবিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
আমেরিকা করোনাভাইরাস নিয়ে চীনকে অভিযুক্ত করে যে বক্তব্য দিয়েছে সে-সম্পর্কে তার ইউরোপীয় মিত্ররা কী ধারণা পোষণ করে তা এখনও জানা যায়নি। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইউরোপে। সে-কারণে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর চীনের ওপর ক্ষোভ থাকতেই পারে।
বিশ্বে এখন চীন অর্থের দিক থেকে অন্য দেশকে ছাড়িয়ে গেছে, এমন কী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিতে চীনের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। চীন সারাবিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে অকাতরে আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দিয়ে আসছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকার দেশগুলো চীনের বন্ধুত্বের প্রত্যাশী। চীন কিন্তু করোনার ব্যাপারেও আন্তরিকভাবে সাহায্য করছে বিশ্বের অন্য আক্রান্ত রাষ্ট্রগুলোকে।
করোনা-পরবর্তী বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ কে করবেÑ এখন তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সম্ভবত বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলোরও চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে। কারণ বিশ্ব খুব দ্রুত দুর্ভিক্ষ এবং আর্থিক মহামন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলো নিজেরাই সংকটে পড়বে। আর আমেরিকার আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। আমেরিকা এখন শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। চীনকে প্রতিরোধ করার জন্য করোনাভাইরাসকে চীনের ল্যাবে তৈরি বলে সারাবিশ্বকে আতঙ্কিত করা আমেরিকার কৌশলমাত্র।
করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া এবং অতি সংক্রামক এই রোগ নিয়ে মিথ্যা বলার অভিযোগ তুলে চীন সরকার ও দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা হয়েছে। মামলাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্য সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের পর করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে। অন্যান্য দেশেও আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। অন্যদিকে, চীনে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই সুস্থ হয়ে উঠেছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চীন প্রকৃত সংখ্যা লুকাচ্ছে, না-কি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে, তা নিয়ে গুঞ্জন ছড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সিএনএন এবং ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার উৎপত্তি উহানের ল্যাবে হয়েছিল কি না সেটি জানতে তদন্ত শুরু করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা। তবে এই ভাইরাসটি উহানের সামুদ্রিক খাবারের বাজারের পরিবর্তে ল্যাব থেকেই ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা।
এই ভাইরাস নিয়ে স্পর্শকাতর গোয়েন্দা তথ্যগুলো সংগ্রহ করছেন মার্কিন গোয়েন্দারা। তবে ল্যাব থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার যে গুঞ্জন রয়েছে; সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে চীন সরকার। এমন কী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরাও ল্যাব থেকে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়ার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নাকচ করে দিয়েছেন।
তবে তার আগে যুক্তরাষ্ট্র এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। এছাড়া ভাইরাসটির উৎপত্তির ব্যাপারে এখনও আরও অনেক তথ্য প্রয়োজন, যা গোয়েন্দারা সংগ্রহ করছেন বলে জানানো হয়েছে।
সংক্রমণ যত ছড়িয়ে পড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। শুধু যে সোশ্যাল মিডিয়াই এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ছয়লাব তাই-ই নয়, কিছু দেশের মূলধারার কিছু মিডিয়াও এসব তত্ত্ব প্রচার করছে।
চীন এবং ইরানের ভেতর থেকে সন্দেহ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। চীনের ভেতর সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষজন মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখছে এবং শেয়ার করছে যে, চীনকে শায়েস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্র জীবাণু অস্ত্র হিসেবে চীনের উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে এই ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল।
সারা দুনিয়াতেই মানুষ গুজবে একটু বেশিই আস্থা রাখে। রীতিমতো এসব নিয়ে চর্চাও হয়। কন্সপিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নামে এ চিন্তা ও তৎপরতার চর্চা সারা দুনিয়াতে চলে। গত শতাব্দীতে মানুষের সব থেকে বড় অর্জনগুলোর একটি চন্দ্র বিজয় নিয়েও এ-রকম হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তিনজন বিখ্যাত গবেষকের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, এই ভাইরাস চীনের উহানের স্থানীয় পশুর মার্কেট থেকে ছড়িয়ে পড়েছে, এখন পর্যন্ত এটাই প্রমাণিত।
বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাসের যে জিন রহস্য (জীবন রহস্য), তা পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে এটি গবেষণাগারে তৈরি কোনো ভাইরাস নয়। আর এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার অনির্ভরশীল সূত্র থেকে তথ্য নেওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
এছাড়াও, চীনের ভেতর থেকে একাধিক বিজ্ঞানী বলেই চলেছেন করোনাভাইরাসের মহামারি চীনে শুরু হলেও, এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে হয়নি।
এ অভিযোগ শুধু ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমনটা বিশ্বাস করেন। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, করোনাভাইরাস চীনের কাজ, তারাই দায়ী। এরপরই ট্রাম্পের সমর্থকরা সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র তৈরি করার অভিযোগ আনেন। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করছেন অনেকেই। বলছেন, এটা বর্ণবাদী। এটা এশিয়ান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত।
চীনা সংবাদমাধ্যম জানায়, ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। একইসঙ্গে দ্রুত এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চীন সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এ-সময় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিজেদের দেশের বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করেন। শি জিনপিং তখন এও বলেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার মোকাবিলায় আমাদের পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ্য আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে চীনের বাইরে করোনাভাইরাসে বেশি মৃত্যুর ঘোষণা আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার কথার লড়াই শুরু হয়েছে। করোনাভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দোষ দিয়ে চীনারা আনুষ্ঠানিকভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। পম্পেও বলেন, এখন ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানোর সময় নয়। এখন সব জাতিকে একত্রে এই হুমকি মোকাবিলা করার সময়।
করোনা মহামারি ঠেকাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত পদক্ষেপ ইতোমধ্যে সমালোচনার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমে এসেছে।
করোনাভাইরাস নিয়ে অনুসন্ধানরত অন্তত ১৩ মার্কিন সাংবাদিককে চীন থেকে বহিষ্কার করার পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলো বেইজিংয়ের তীব্র সমালোচনা করেছে।
পত্রিকাগুলো বলছে, চীনের উহান শহরে এই ভাইরাসটির প্রকোপ দেখা দেওয়ার পরপরই তারা এই মহামারির ওপর বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করছিলেন। বহিষ্কৃত এই সাংবাদিকরা নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক।
এ মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক কতজন চীনা নাগরিক সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে পারবেন তার সীমা বেঁধে দিয়েছিল। বলা হচ্ছে, এর প্রতিশোধ হিসেবেই বেইজিং মার্কিন সাংবাদিকদের চীন থেকে বহিষ্কার করেছে। আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও চীনকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা অনেকবার বলেছেন নতুন করোনাভাইরাস ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই।
চীনের প্রতি হু-এর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-কে আর্থিক সহায়তা করা বন্ধ করে দেবে আমেরিকা। তার কথায়, প্রতি বছর ৫০ কোটি ডলার সাহায্য দেওয়া হয় হু-কে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারই আসে মার্কিন নাগরিকদের দেওয়া কর থেকে। মনে করিয়ে দিয়েছেন, হু-কে আমেরিকার ১০ ভাগের ১ ভাগ আর্থিক সহায়তা করে চীন। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনে হারানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনসহ সারাবিশ্ব যখন করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় জোর লড়াই করছে, তখন বিশ্বের এই দুটো মহাশক্তিধর দেশের এই বাকযুদ্ধ সেই লড়াইকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সারাবিশ্ব যখন সংকটে পড়েছে তখন দোষারোপ করতে ব্যস্ত ট্রাম্প সরকার। আন্তর্জাতিক সংকটে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার নেমেছে নোংরা রাজনীতিতে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ কন্টে করোনাভাইরাস মহামারিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাসে ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একযোগে কাজ করতে হবে। না হলে ইইউ ভেঙে পড়বে।
আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার পটভূমিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান এই ভাইরাস নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ডব্লিউএইচও চীন-কেন্দ্রিক, ফলে জাতিসংঘে আমেরিকা তাদের তহবিল বন্ধ করে দিতে পারে মি. ট্রাম্পের এমন হুমকির উত্তরে সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস বলেছেন, আমরা সব দেশেরই ঘনিষ্ঠ, আমরা বর্ণ-কানা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান।

Leave a Reply