করোনা পরিস্থিতি- অভিজ্ঞতা ও করণীয়

Spread the love

অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন : করোনাসৃষ্ট মহামারি আজ ভয়ঙ্কর রূপ লাভ করেছে। বর্তমানে ২১০টি দেশ ও স্থানের প্রায় সাড়ে ৩ মিলিয়ন মানুষ করোনাভাইরাসের শিকার। যদিও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা ৫০-৮০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর মধ্যেই বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে বাড়তে থাকা এই সংখ্যা লকডাউন ও অন্যান্য সতর্কতা না মানলে আমেরিকা, ইউরোপের দেশের মতো রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এই ভাইরাসের সংক্রমণে কোনোরূপ উপসর্গ দেখায় না। এই উপসর্গবিহীন অথচ ভাইরাস বহনকারী ব্যক্তিরা অন্যকে সংক্রামিত করতে পারেন খুব সহজে।
এই প্যানডেমিক মোকাবিলায় ভাইরাসকে শনাক্ত করা অতীব জরুরি। ভাইরাস শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে রিয়েল টাইম পিসিআর অধিক গ্রহণযোগ্য, কেননা তা জিনোমিক লেভেলে কাজ করে। সতর্কতার সাথে কাজটি সম্পাদন করতে পারলে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার ডিটেকশন অতি সহজেই করা সম্ভব। এখানে ফলস পজিটিভ/নেগেটিভ ফলাফল অত্যন্ত কম। কিন্তু এই পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত ল্যাব এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন। এর পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দরকার দক্ষতা ও সতর্কতা। বাংলাদেশে এর ঘাটতি রয়েছে। মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বায়োকেমিস্টসহ মলিকুলার বায়োলজিতে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া এ ধরনের সংবেদনশীল পরীক্ষায় ভুল ফলাফলের সম্ভাবনা থেকে যায়।
প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে করোনা শনাক্তকরণের কাজ করতে গিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহের টিউবের সাথে কেস রিপোর্ট ফর্ম পেঁচিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নমুনা টিউব থেকে স্যাম্পলের লিকেজ হচ্ছে, স্যালাইনের পরিমাণ বেশি থাকছে, যথাযথ সোয়াব স্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে না, নমুনাগুলো উল্টো করা অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে ইত্যাদি। এ-রকমভাবে নমুনা প্রদান করা হলে বায়োসেফটি মেনে নমুনা প্রসেস করার পেছনে অনেক সময় দিতে হয় এবং অনেকক্ষেত্রে বায়োসেফটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ফলে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার যুক্ত ব্যক্তিদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। যারা মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করছেন, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব আছে বলে মনে হয়েছে। এটা ঠিক যে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছেন; কিন্তু সেই নমুনা সঠিকভাবে সংগ্রহ করে তা ল্যাবে পরিবহন করা পর্যন্ত যথেষ্ট সতর্কতা না নিলে একদিকে যেমন তা ভুল ফলাফলের সম্ভাবনা তৈরি করে, অন্যদিকে তা নমুনা সংগ্রহকারী ও যারা পরীক্ষা করছেন তাদের সংক্রমণের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়।
রোগীর সংস্পর্শে যেসব ডাক্তার অথবা স্বাস্থ্যকর্মী এসেছেন, তাদের নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। আমরাও অনেক ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর নমুনায় করোনার উপস্থিতি পেয়েছি। বিষয়টি উদ্বেগজনক। ডাক্তার ও করোনাযোদ্ধাদের জন্য উপযুক্ত পিপিই ও অন্যান্য সুরক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে বায়োসেফটি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের এই ভাইরাসকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, প্রচুর গবেষণা করতে হবে প্রতিনিয়ত, কারণ এটা একটা আরএনএ ভাইরাস হওয়ায় সময়ে সময়ে এর মধ্যে নানারকম পরিবর্তন হতে থাকবে। এই পরিবর্তনের কোনো কোনো অংশ ভাইরাসটিকে আরও বেশি সংক্রামক এবং ক্ষতিকর করে তুলতে পারে। এই পরিবর্তনকে আমরা বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলি মিউটেশন। করোনার মধ্যে সেই পরিবর্তন ঘটছে। মিউটেশনের ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে আগাম মন্তব্য করা কঠিন।
সম্প্রতি চঘঅঝ জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, নোভেল করোনাভাইনাসের ৩টি প্রধান Variant রয়েছে-
A, B, C| amino acid–এর পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে তারা এই দাবি করেন। A আর ঈ মূলত পূর্ব এশিয়ার বাইরে, ইউরোপে আর আমেরিকাতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে, টাইপ B পাওয়া যাচ্ছে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। প্রতিনিয়ত ভাইরাসে mutation হওয়ায় এই ভ্যাকসিন কাজ সব এলাকায় একইভাবে করবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটেনের কয়েকটি দাতব্য সংস্থার অর্থায়নে ২০০৫ সালে গড়ে ওঠা জেনার ইনস্টিটিউট যে ভ্যাকসিন তৈরি করার চেষ্টা করছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব এবং করোনা তার রূপ পরিবর্তন করলেও ভ্যাকসিনটি কাজ করবে বলে দাবি সেখানকার বিজ্ঞানীদের। তবে ভ্যাকসিন তৈরি হলেও তা বিভিন্ন ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে বাজারে আসতে বেশ সময় লাগবে। এছাড়া, বাংলাদেশে ভাইরাসের কোন ধরনটি বিদ্যমান তা না জানলে এবং সেই অনুযায়ী দেশে ভ্যাকসিন তৈরি না করা গেলে ভবিষ্যতে হয়তো অন্য দেশ থেকে আমদানি করা ভ্যাকসিন কাজ নাও করতে পারে। বাংলাদেশে ভ্যাকসিন তৈরি করার মতো প্রয়োজনীয় মেধা ও যোগ্যতা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আছে। কিন্তু সমস্যা হলো এই গবেষণা চালিয়ে নেওয়ার মতো মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি নেই বললে চলে।
ডব্লিউএইচও-র রিকোমেন্ডেশন অনুযায়ী নিউক্লিক এসিড এম্পলিফিকেশন টুল ((NAAT)) পরীক্ষা (যেমন- পিসিআর, আরটিপিসিআর) এবং সিকুয়েন্সিং-এর জন্য বিএসএল-২ (বায়োসেফটি লেভেল-২) মানের ল্যাবই যথেষ্ট। কিন্তু ভাইরাসকে ল্যাবে গ্রো করিয়ে অন্যান্য পরীক্ষার জন্য বিএসএল-৩ বা বিএসএল-৪ ল্যাব লাগে। করোনা পরীক্ষার জন্য তাই অনুমতিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাব যথেষ্ট উপযোগী। কিন্তু গোটা দেশে দু-তিনটি জায়গা ছাড়া বিএসএল-৩ মানের ল্যাব নেই। এই ল্যাবের সংখ্যা আরও বাড়লে ভাইরাস-সংক্রান্ত আরও গবেষণা করা যেত, এমনকি ভ্যাকসিন তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া যেত। আমাদের ঢাকাস্থ ল্যাবে গরুর খুরা রোগের কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করা গেছে, সেখানে আমরা ভাইরাস কালচার বা ভাইরাস গ্রো করাতে পেরেছি (এই ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করে না, তাই বিএসএল-২ ল্যাবেই কাজ করা গেছে)। ইতোমধ্যে আমরা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের একটি সম্ভাব্য ডিজাইনও করেছি; কিন্তু সেটি নিয়ে কাজ করা বা তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা এ-ধরনের ল্যাবে সম্ভব নয়। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারগুলোকে আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা আমরা কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি। মাইক্রোবায়োলজিসহ জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষণার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
রিসার্চ বিশেষত বায়োলজিক্যাল রিসার্চের ওপর জোর দিয়েই রূপরেখা তৈরি করতে হবে করোনা-পরবর্তী বিশ্বনেতাদের। গবেষণা খাতে দিতে হবে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজনীয় বরাদ্দ। রিসার্চকে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে তরুণদের সামনে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সেভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ-ধরনের মহামারি প্রতিরোধে তারা আরও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
যেহেতু এখনও কোনো নির্দিষ্ট আক্রান্ত সংখ্যা ও মৃত্যুহার কমানোর উপায় হলো ননথেরাপিউটিক প্রতিরোধ অর্থাৎ মহামারি ব্যবস্থাপনা। এর জন্য দরকার সরকার বিভিন্ন ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ। দরকার উপযুক্ত গবেষণা। ডাক্তারদের পাশাপাশি মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ভাইরোলজিস্ট, এপিডেমিওলেজিস্টসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের গবেষকদের এই করোনা মোকাবেলায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আমরা মানব সম্পদে সমৃদ্ধ। সুযোগ পেলে বাঙালি তার মেধা, প্রতিভা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও গবেষণা দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। করোনা সংকটের আশু মোকাবিলার পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, উদ্ভাবনা এবং জীবন রক্ষার জন্য সেসবের উৎপাদনের জন্যও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেনÑ একজন বিজ্ঞান গবেষণাকর্মী হিসেবে, এটা আমাদের বিনীত প্রত্যাশা।

লেখক : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং গরুর খুরা রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারক

Leave a Reply