বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারল না কেন? উত্তর খোঁজা জরুরি

মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব.) : বিশ্বের স্বাধীনতাকামী অনেক জাতি আক্ষেপ করে বলে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতা থাকলে অনেক আগেই মুক্তি অর্জন করে ফেলত। নিঃসন্দেহে এই চির সত্য ভাস্বর হয়ে থাকবে যে বঙ্গবন্ধু না জন্মালে বাঙালি জাতির মুক্তি এত সহজে অর্জিত হতো না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলি বিশ্বের অনেক দেশের নেতা খুব গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন এবং অনুসরণ করেছেন, যদি তার কাছাকাছি পৌঁছানো যায় কি না। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা থেকে ও মুক্তিযুদ্ধের দর্শন এবং কৌশল তৈরি হয়েছিল। শুধু রাজনৈতিক নয়, তিনি ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক স্বল্পদীর্ঘ ভাষণে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কৌশলের রাজনৈতিক ও সামরিক রূপরেখা এত সূক্ষ্ম ও সঠিকভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যে, তার অনুপস্থিতিতেও মুক্তিযুদ্ধ এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল কোনোরকমের বিপত্তি ছাড়া। এ-জন্যই তার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক কবিতা আখ্যায়িত করে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিশ্বসংস্থায় আগামীর শিক্ষণীয় উদাহরণ হয়ে সংরক্ষিত থাকবে।
২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে বন্দী করে মিথ্যা মামলা দিয়ে তথাকথিত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দিতে পারেনি, কেননা বাংলার দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে জয়ের আলো জ্বালিয়ে তুলতে সক্ষম হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঝড় তুলেছেন বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে কিছু বিভ্রান্ত বাঙালির হাতে জীবন দিতে হয়েছে। বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ এখনও বন্ধ হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে কান্নার রোল দেখেছি ঘরে ঘরে।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, তার সারাজীবন উৎসর্গিত করেছিলেন বাঙালির মুক্তির জন্য। বাঙালিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন নিজের নেতৃত্বের গুণাবলি দিয়ে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে ঐক্যের বন্ধনে বেঁধেছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের বেঁধেছিলেন এক সুতায় তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের যুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ডাক বাঙালিকে উন্মাদ করে তুলেছিল এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, আকাশে লাল-সবুজের পতাকা উড়ল, বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিল মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে দেশে ফিরলেন, নতুন চেতনার বিকাশ হলো। নাম হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ভুখানাঙ্গা মানুষকে দুবেলা খেয়ে বাঁচার লড়াই শুরু হলো। দেশ গঠনের লড়াই, অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই, দারিদ্র্যতা বিমোচনের লড়াই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের নিশ্চিতের লড়াই। সংবিধান প্রণীত করলেন চার মূল স্তম্ভের ওপর। শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে সংবিধানে যোগ হলো সমাজতন্ত্র। অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়ে বিভাজন ভেঙে ধর্মীয় অধিকারকে সমুন্নত করলেন। স্নায়ুযুদ্ধে প্রবলভাবে বিভাজিত বিশ্ব। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর এদেশের মাটিতে আত্মসমর্পণের লজ্জা যেন পাকিস্তানের সমর্থক দেশগুলো নিজেদের ইজ্জত হারানোর লজ্জায় ভুগতে থাকল।
বঙ্গবন্ধুকে বাঁচতে না দেওয়ার পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিনাশ ও বৈশ্বিক রাজনীতির পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের অন্তরে গভীর শঙ্কা থেকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কুশীলবরা গোপনে ও প্রকাশ্যে কারসাজি করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বঙ্গবন্ধুর জীবনের ঝুঁকি ফিদেল কাস্ত্রো বুঝতে পারলেও নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকরা কেউ অর্পিত দায়িত্ব পালনে সমর্থ হয়নি এবং ঘাতকরা পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসকে ঘিরে একটা বিশাল বাহ্যিকভাবে অনুগতদের ক্ষেত্র তৈরি করে ঘাতকদের জায়গা করে দিয়েছিল। সেনাবাহিনীর দুটি যোদ্ধা ইউনিট হত্যামিশনে অংশ নেয় মাত্র এবং তাতে নেতৃত্ব দেওয়া কিছু মধ্যমসারির সেনা অফিসার। এটা দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের একদল মানুষ বাংলাদেশে বসবাস করে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে কিন্তু পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য। দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট পাকিস্তানকে ইসলামের ধারক ও প্রতীক মনে করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করতে পারে না। সুকৌশলে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অপ্রাপ্তি থেকে তৈরি হওয়া মানসিকতাকে সুতীক্ষèভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করার ক্ষেত্রে বহিঃশক্তির ভূ-রাজনৈতিক খেলা চলেছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। ১৯৭৪ সালে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি এবং পরিকল্পিতভাবে আর্থ-সামাজিক পরিবেশ নিয়ে ধূম্রজাল থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি করে রাষ্ট্র-কাঠামোকে দুর্বল করে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকাঠিকে সুকৌশলে হস্তগত করে ভয়ানক ও মর্মান্তিকভাবে আঘাত হেনে বাংলাদেশকে ধ্বংস করার মনোবৃত্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখল চিরস্থায়ী করতে গিয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বঙ্গবন্ধু-কন্যাদ্বয় দেশের বাইরে অবস্থান করায় বেঁচে থাকেন এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগকে খ–বিখ- করে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে প্রত্যাবর্তন করেও প্রতিকূল পরিবেশে দলের হাল ধরে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সম্পাদনের নিমিত্তে মাঠে নামেন। আবার বাঙালির ভোটে ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত করেন এবং পাকিস্তানি দর্শনের ধারকদের বাংলাদেশ ধ্বংস করার ছক ভেঙে দেন। তখন তাদের মধ্যে আবার বাসা বাঁধতে থাকে পুরনো ছক। এবার রূপ বদলিয়ে জঙ্গিরূপে আবর্তিত হয়, কিন্তু আবারও ব্যর্থ হয়। অর্থনীতির চাকা দ্রুতবেগে চলতে থাকে এবং এগুতে থাকে। প্রবৃদ্ধির হার ৮.৭ শতাংশে উন্নীত হয়ে পড়ে। দেশ নিম্নআয়ের দেশের কালিমা থেকে মুক্ত হয়ে উন্নয়নের রোল মডেল দেশে পরিণত হয়। এবং পাকিস্তানি জনগণের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়Ñ কেমন করে বাংলাদেশ এত অল্প সময়ে তাদের পেছনে ফেলে দিল? কী আলাদিনের প্রদীপ পেল বাংলাদেশ? মূলত বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও বঙ্গবন্ধু-কন্যার প্রায়োগিক পরিচালনার দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থিরা কৃতিত্ব না দিলেও পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানের জন্য একজন শেখ হাসিনা খুঁজছে হন্যে হয়ে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তানকে পাঁচ বছরের মধ্যে সুইজারল্যান্ড বানানোর প্রতিশ্রুতি দিলে জনগণ দাবি জানায়, আপনাকে ১০ বছর দেওয়া হলো, আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দেখান। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশকে খাঁদে ফেলতে দেশের ও বাইরের শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হবে, যা শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার শক্তি হারিয়ে এখন নতুনবেশে দলের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে ক্ষমতাধর জায়গায় বসে অন্যভাবে কলকাঠি ঘুরিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের নতুন ছক দৃশ্যমান হচ্ছে। সেনাবাহিনীকে উসকে দেবার বেশ কিছু প্রচেষ্টা দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সার্বিকভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার জন্য শক্তিশালী কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, অনুপ্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে, দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকাদের চিহ্নিত করতে হবে। বিশ্বাসকে পুঁজি করতে দেওয়া যাবে না।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যখন বঙ্গবন্ধু ভীষণভাবে নিয়োজিত, দেশে অর্থ নেই, খাবার সংকট, দেশ গঠনের ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশে জাসদ নাম নিয়ে প্রথম চক্রান্তের সূচনা হয়। শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, সঙ্গে বিপ্লবের নামে গণবাহিনী তৈরি করে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়, সদ্য স্বাধীন দেশের সার্বিক সক্ষমতার ঘাটতিকে উপলক্ষ করে থানা লুট থেকে সংসদ সদস্য হত্যা পর্যন্ত করে। তখন থেকে অপশক্তির প্রকাশ্য ও গোপনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা থেকে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তারপর থেকেই নিয়মতান্ত্রিক পথ ছেড়ে গোপন ও ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটা শুরু করে বাংলাদেশ-বিরোধী হয়। তখন দৃষ্টি পড়ে সামরিক বাহিনীর দিকে। পাকিস্তানি ইতিহাসে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার একটি মূল অবলম্বন ছিল সামরিক অভ্যুত্থান। ততকালীন সময়ে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরাশক্তির অপছন্দের সরকারকে সরিয়ে সামরিক শাসনের মাধ্যমে অনুগত সরকার স্থাপন একটি প্রচলিত পন্থায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের নামে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পেছনে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস ও ধারণা ছিল যে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক শক্তি খুব প্রবল। জনগণনির্ভর রাজনৈতিক শক্তির কাছে প্রকৃতপক্ষে সামরিক শক্তি ভেসে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনার অংশ ছিল তাকে সপরিবারে হত্যা করা। কুশীলবদের পরিকল্পনার সাথে পাকিস্তানি কৌশলের অনেক চিহ্ন বিদ্যমান ছিল, যা পরবর্তীতে প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে অপসারণ করে পাকিস্তানি দর্শনের ধারক কোনো গোষ্ঠী বা দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে বাংলাদেশ বিরোধিতাকারীদের পুনঃক্ষমতায়ন কার্যত পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা করবে, কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাকিস্তানের অস্তিত্বে মারাত্মক আঘাত হেনেছিল এবং তার আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার জন্য অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন শুধু হতে হয়নি, তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে খাবি খেতে শুরু করেছিল। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একদিকে সামরিক পরাজয়ের লজ্জা অন্যদিকে অর্থনৈতিক অধঃগতির জন্য তারা তাদের শাসকদের দায়ী করে রাজনীতির অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্ম নেওয়া নিরঙ্কুশ আস্থা মূলত পাকিস্তানকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ-বিরোধী পাকিস্তানি প্রচারণা মুখ থুবড়ে পড়েছিল যখন পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি’র দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের উপস্থিতি সম্মেলনের পূর্ব শর্ত হিসেবে উপণীত হলে বঙ্গবন্ধুর শর্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্তে মেনে সম্মেলনের নিমন্ত্রণ পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল, যা পাকিস্তানি শাসকের কাছে আরেকটি পরাজয় হিসেবে উপনীত হয়। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা, ধর্ষণের ঘটনা ক্রমেই পাকিস্তানি জনগণ ও তাদের সমর্থনকারী অনেক দেশের কাছে স্বচ্ছ হয়ে উঠলে, অনেকেই তাদের পিছন থেকে সরে গিয়ে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে আরও উষ্ণ করে তুলতে থাকলে পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ে। চীনকে কাছে রেখে মার্কিনীদের সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে বেশি দূর এগুতে না পেরে মেতে ওঠে বাংলাদেশে পাকিস্তানের অনুগত সরকার স্থাপনে। বঙ্গবন্ধুর শোষিত শ্রেণির মুক্তির লড়াইয়ের ডাক পশ্চিমা পুঁজিবাদী অনেক দেশকেই শঙ্কিত করে তুলেছিল। পাকিস্তান তাদের পুরনো মিত্রদের দিয়ে সামরিক বাহিনীর ওপর ভর করে। বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র খুব গভীরভাবে পরিকল্পনা শুধু করা হয়নি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জায়গায় অনুপ্রবেশ করে দেশরক্ষার সক্ষমতাকে কিছুটা নির্লিপ্ত করে হত্যা সংগঠনে সক্ষম হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেককেই নির্লিপ্ত দেখা গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী খন্দকার মোশতাককে পেয়ে গেল অতি সহজেই। যিনি ক্ষমতার অভিপ্রায়ে হত্যাযজ্ঞের রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়লেন। ষড়যন্ত্রকারীদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তিনি যদি কোনোমতে একবার জনগণকে ডাক দিতে পারেন, তবে মানুষের ঢলে ট্যাংক, রাইফেল ও সাঁজোয়া যান কোনো কাজে আসবে না। তাই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই হত্যা করা। এই হত্যা প্রক্রিয়ার নায়করা জেনারেল জিয়াকে ঘিরে শক্তি সঞ্চয় করে সুরক্ষিত হয়েছে। সেনাপ্রধানের নাকের ডগায় তারা বেশ কিছুদিন ধরে সংগঠিত হয়েছে; কিন্তু তিনি বোধহয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজের অক্ষমতাকে ঢেকে রাখতে সচেষ্ট হলে বিপদ আরও ঘনীভূত হয়।
১৯৭৫-এর মর্মান্তিক ঘটনার ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার জন্য কোনাে ইতিহাসবিদের গবেষণামূলক বইয়ের অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। স্বল্পসংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু বই প্রকাশ করেছেন, এর মধ্যে কিছু বিদেশিও আছেন। মার্কিনীদের গোপন তথ্য, যা অবমুক্ত করা হলে বেশ অনেক কিছুই প্রকাশ পায়। সেই সাথে কিছু ফাঁস হওয়া নথিও রয়েছে। প্রতিটি প্রকাশ হওয়া তথ্যে দেখা যায়, সামরিক ক্ষেত্রে বিপথগামী মধ্যমস্তরের অফিসারদের তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়ার আশপাশে ঘুরঘুর করতে। তার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা ও নিয়মিত আলোচনা ও পর্যালোচনায় লিপ্ত দেখা গেছে। অনেকবার তার সাথে দেখা করা গোপন বৈঠক এবং অনেক ক্ষেত্রেই তিনি উসকানি দিয়ে তাদের ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। অনুমিত হয় বিপথগামীরা তার কাছ থেকে উচ্চ পর্যায়ের সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেছে এবং জেনারেল জিয়া নিজে ক্ষমতা দখলের উপায় হিসেবে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা ও সুরক্ষা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার দায় এড়ানো শুধু নয়, তিনিও ষড়যন্ত্রের সক্রিয় অংশ ছিলেন বলে অনুমান করতে কষ্ট না হলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাকে চিহ্নিত করা হয়নি। ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানি সংযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের ব্যবস্থা করেছিলেন। বিনিময়ে পাকিস্তানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাদ বিনাস করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে দ্বিজাতিতত্ত্বকে আলিঙ্গন করে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বানিয়ে দিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক স্তম্ভকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিলেন এবং ভারত-বৈরিতাকে সম্পূরক মনে করে পাকিস্তানি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য পাকিস্তানি নির্দেশনায় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তায় বাংলাদেশের মাটি ব্যবহারে সুযোগ করে দিলেন। সামরিক ফরমান দিয়ে রাষ্ট্রের সংবিধান কাটাছেঁড়া করে পাকিস্তানপ্রীতি প্রদর্শন করেছেন। পাকিস্তানি দর্শনে দেশকে পুনরায় ঠেলে দেওয়ার সব চেষ্টা করেছেন এবং হত্যাকারীদের বলেছেন তোমরা সার্থক হলে আমি আছি। ব্যর্থ হলে আমাকে জড়িও না। উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি এত কিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অন্য সেনানায়কগণ আস্থার সংকটে পড়ে নিঃসন্দেহে দোদুল্যমান ছিলেন এবং বিজয়ীদের সাথে মিশে যাবেন মনে করে হয় অদক্ষতায় ভুগতে থাকা অবস্থায় পুরো কমান্ডের নিয়ন্ত্রণ নির্দ্বিধায় তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, নতুবা নিজেরা পেছনে যুদ্ধের বাইরে থেকে নিজেদের নিরপেক্ষ রাখার জন্য রাষ্ট্রপতিকে রক্ষার সাংবিধানিক পবিত্র দায়িত্বকে হেলা করেছেন। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীকে নিতে দেখা যায়নি। তাহলে তারা সবাই কী করে একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালেন প্রশ্ন থেকেই যায়। সামরিক বাহিনীর বিপথগামীরা নৈশ প্রশিক্ষণের নামে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে সেনানিবাসের বাইরে অপারেশন পরিকল্পনা করে কমব্যাট টিমে ভাগ হয়ে আবার সেনানিবাসের ভিতরে অন্য কমান্ডের মধ্য দিয়ে সদর্পে বঙ্গবন্ধুর বাসস্থান ধানমন্ডির দিকে ধাবিত হয়, পথে জাতীয় রক্ষীবাহিনীসহ অন্য কোনো বাহিনীর হস্তক্ষেপ রুখতে বিভিন্ন স্থানে ব্লক লাগিয়ে এগিয়ে যায় এবং কোনোরকম সময় ব্যয় না করে স্বল্প কয়েকজন গার্ডকে পরাস্ত করে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে, যা পাকিস্তান করতে পারেনি বাঙালি জাতির পিতার রক্তে হাত রাঙিয়ে পুরো জাতিকে কলঙ্কিত করল। সেই সাথে আরও তিন পরিবারে হানা দিয়ে হত্যা করে নিশ্চিত হতে চেয়েছে যে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কেউ যেন না দাঁড়াতে পারে। পাকিস্তান হত্যার খবর অনেক দ্রুত পেয়েই উল্লসিত হয়ে খবর প্রচার করল এবং পাকিস্তান তার প্রভাবে থাকা দেশগুলোকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানাল। এরপর শুরু হলো রাজনৈতিক বিবর্তনের খেলা। সেই খেলার মূল খেলোয়াড় খন্দকার মোশতাকের সাথে অনেক রথি-মহারথিদের দেখা গেল। নিঃসন্দেহে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু-হত্যার পেছনের ঘটনাকে জনগণের জন্য অবমুক্ত করা এখনও সম্ভব হয়নি। যার ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা বারেবারে ওই একই রাস্তায় পথ চলতে চায়। জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে হত্যা করার অভিপ্রায় সফল হয়নি। বাংলার জনগণ আবার বঙ্গবন্ধু-কন্যাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনলে পঁচাত্তরে হত্যাকারীদের এবং পর্দার আড়ালে থাকা ষড়যন্ত্রকারী রাজনৈতিক দল, পাকিস্তানি স্বপ্নে বিভোর রাজনীতিবিদ এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট দল ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে লিপ্ত থাকা বহিঃশক্তিকূলের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়নি বলে আবার তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ফলে পুনরায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সরকার সরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক পথ জনগণের জন্য কাজে লাগাতে না পেরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কুশীলবগণ আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করতে দশক পার হয়েছে। ধীরে ধীরে হত্যাকা-ে অংশ নেওয়ার দায়ে অভিযুক্তদের বিচার কার্যকর হতে চলেছে। পলাতক ফাঁসির আসামিদের যেমন করে আশ্রয়দাতা দেশগুলো ফেরত দেওয়া শুরু করেছে, ফলে নব্য বাংলাদেশ-বিরোধীদের মনের মধ্যে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। এ পদক্ষেপ ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযাত্রায় নামার সাহস যেমন তিরোহিত হবে, তেমনি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মুখোশ উন্মুক্ত করতে পারলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিরাপদ হবে। বঙ্গবন্ধু-হত্যা রুখতে না পারার এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বঙ্গবন্ধু-হত্যার প্রকাশ্য ও পর্দার আড়ালে থাকা কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা দরকার। একটি সত্য ও সঠিক ইতিহাস আগামী প্রজন্মের জন্য প্রস্তত করা উচিত সে-জন্য একটি কমিশন অথবা গবেষক নিয়োগ করে সাক্ষ্য-সাবুদ সম্বলিত ইতিহাস রচনা করে কার্যত ব্যর্থতার দায়ভার চিহ্নিত করে তাদের জনতার সামনে দাঁড় করানো উচিত। আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত সকলের মুখোশ খুলে ফেলতে হবে এবং বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের শিক্ষণীয় বিষয়কে অনুধাবন করে রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে হামলার ছককে চিনতে বা বুঝতে কষ্ট না হয়। আগামী প্রজন্মের জন্য উত্তরগুলো খুঁজে রাখতে হবে।

লেখক : স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইন্সটিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস-এর নির্বাহী পরিচালক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply