বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা অভিন্ন সত্তা

সম্পাদকের কথা: গভীর অন্ধকার রাত্রি না হলে রাক্ষস-খোক্কস নররক্ত পানের অভিযানে বের হয় না। মিথলজিতে আছে নরমাংসভোজী রাক্ষস-খোক্কস একবার খিদেয় টিকতে না পেরে সূর্যকে মহাকাশ থেকে ছিনতাই করে মহাসমুদ্রের তলদেশে গিরিখাতের গোপন গহ্বরে লুকিয়ে রেখেছিল। ফলে অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল ত্রিভুবন। গণহত্যার মহোৎসবে মেতেছিল রাক্ষস বাহিনী। যেমনটি হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও তার পর।
কিন্তু মানুষ তো সূর্যালোক ছাড়া বাঁচে না। ঘুমের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তার বেশি অন্ধকার সে সইতে পারে না। কিন্তু তারা জানত না কোথায় সূর্যকে লুকিয়ে রেখেছে। দানবে-মানবে সেই যুদ্ধে মানুষের পক্ষে সাহসী কোনো নেতৃত্ব ছিল না। ১৯৭৫-এ যেমন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরও সাহস করে কেউ দাঁড়ায় নি, তেমনি ১৯৮১ সালের আগে পর্যন্ত তেমন কেউ ছিল না, যার ওপর আস্থা রাখা যায়। এমন কেউ ছিল না যে মহাসমুদ্রের তলদেশ ভেদ করে সূর্যকে উদ্ধার করে মহাকাশ আলোকিত করবে।
একজনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হলো। আশা করা হলো, তার নেতৃত্বে রাক্ষস-খোক্কস বধ হবে; সূর্যকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করা হবে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু-হত্যার মাত্র কয়েকদিন পর তিনি রাক্ষস বাহিনীর প্রধানের প্রতিনিধি হয়ে মস্কো ভ্রমণে গিয়েছিলেন। ১৯৭৮-এ আরেকজনকে সভাপতি করা হলোÑ যে ১৯৭৫ সালে স্পিকার ছিলেন। সেই তিনি লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অসম্মানজনক উক্তি করতে দ্বিধা করেন নি। এমনই এক ঘোরতর দুর্দিনে, তার অনুপস্থিতিতে সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হয় বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে।
মাত্র ৩৪ বছর বয়স পূর্ণ না হতেই নৌকার হাল ধরলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের অমোঘ বাণীকে সত্য প্রমাণিত করলেন :

“ওরে ভীরু, তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার
হালের কাছে মাঝি আছে করবে তরী পার!”

কত ঝড়-ঝঞ্ঝা, নির্যাতন-নিপীড়ন-হত্যা-রক্তপাত! কতজন যে নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ল, কেউ প্রাণের ভয়ে, কেউ হালুয়া-রুটির জন্য। আবার কেউ কেউ হালের মাঝি হওয়ার চেষ্টায়। কিন্তু সাহসী, দূরদর্শী নেতৃত্ব পেয়ে, সেই নেতৃত্বের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখে প্রবল গণজোয়ার সৃষ্টি হলো বাংলাদেশে। ‘আত্মদানের উৎস ধারায় মঙ্গল ঘট’ ভরে তারা এগিয়ে গেল রাক্ষস নিধনে। বদলে গেল বাংলাদেশের দৃশ্যপট। গত প্রায় ৪০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পন্ন করার সাধনায় জীবনপণ সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করে চলেছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা।
অন্ধকারের প্রাণী- রাক্ষস-খোক্কসের তা-ব বন্ধ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশ, অপহৃত স্বাধীনতার চেতনা আজ বঙ্গবন্ধু-কন্যার হাতে কেবল পুনরুদ্ধারই হয়নি, তার হাতে তা আজ নিরাপদ ও সুরক্ষিত। তিনিই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, লক্ষ্য ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেছেনÑ শানিত করে এগিয়ে নিচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ভিক্ষুকের জাতির সম্মান থাকে না।’ বাংলাদেশ আজ আর ভিক্ষুকের জাতি না। বঙ্গবন্ধু-কন্যা সেই কলঙ্ক ঘুচিয়েছেন। আজ আমরা খাদ্যে নির্ভরশীল দেশ। দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড।’ না আজ আর বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নেই। বঙ্গবন্ধু-হত্যাকা-ের বিচার করেছেন শেখ হাসিনা। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। শেখ হাসিনা ছাড়া আর কারও পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না।
বঙ্গবন্ধু ‘চাটার দলের’ প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স-এর নীতিই কেবল নেননি, বিএনপি আমলের দুর্নীতিতে বিশ্বে ১নং হওয়ার লজ্জা ঘুচিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু সোনারবাংলা গড়ে, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। তার সেই অসমাপ্ত কর্তব্যভার শেখ হাসিনা নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নকামী দেশের রোল মডেল। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ৮.৭ শতাংশ স্পর্শ করেছে। মাথাপ্রতি আয় ২ হাজার ৪৬ ডলার। এই করোনার মধ্যেই বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি-রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বেড়েছে। সাধারণ শিক্ষা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ নজির স্থাপন করেছে। নিজস্ব আয়ে আমরা পদ্মাসেতু করছি। কর্ণফুলিতে টানেল করছি। পায়রা বন্দর করছি। গভীর সমুদ্রবন্দর করছি। সমুদ্র জয় করেছি। মহাকাশে এখন আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট ঘুরছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব। বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩,৫৮৪ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। আমরা পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছি।
আমরা শতবর্ষব্যাপী ডেল্টা প্ল্যান হাতে নিয়েছি। ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বিশ্বের বুকে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও সৃজনশীল মানুষের দ্বারা। কিন্তু উপযুক্ত নেতৃত্ব ছাড়া মানুষের এই অসীম ক্ষমতাকে কাজে লাগানো যায় না। যোগ্য সাহসী দূরদর্শী নেতা ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা সম্ভব হয়েছিল। তেমনি বঙ্গবন্ধুর মতো গুণাবলি, সাহস-আত্মত্যাগ ও উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল বলেই জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনারবাংলা গড়ে উঠছে। স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ও আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন বলেই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা- অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়েছেন। ২৮ সেপ্টেম্বর তার শুভ জন্মদিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশবাসীর পক্ষ থেকে এই দিনে প্রাণঢালা অভিনন্দন! জয়তু শেখ হাসিনা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply