বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী পরীক্ষিত বন্ধু ভারত

সাইদ আহমেদ বাবু: উইলিয়াম শেক্সপিয়ার একজন বিখ্যাত ইংলিশ কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও অভিনেতা। তাকে বলা হয়, ইংল্যান্ডের জাতীয় কবি। বন্ধুত্ব সম্পর্কে তার বিখ্যাত উক্তি- “কাউকে সারাজীবন কাছে পেতে চাও? তাহলে প্রেম দিয়ে নয়, বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখো। কারণ প্রেম একদিন হারিয়ে যাবে কিন্তু বন্ধুত্ব কোনোদিন হারায় না, বন্ধুত্ব যত পুরোন হয়, তত উৎকৃষ্ট ও দৃঢ় হয়।”
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, “আমরা বন্ধুর কাছ থেকে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই ও সেই জন্যই বন্ধুকে চাই।” ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কগুলো বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বের ভিত্তিতে রচিত, যা কৌশলগত অংশীদারিত্বকে ছাড়িয়ে গেছে। অভিন্ন ইতিহাস, মূল্যবোধ, সীমানা, ভাষা, সংস্কৃতি, পারিবারিক ও আত্মীয়তা এবং সর্বোপরি সভ্যতার বন্ধন এবং অন্যান্য বিষয়ে মিল সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একটি সম্পর্ক তৈরিতে অবদান রেখেছে। ফলে বিশেষ সম্পর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশ্বাস, আস্থা, ভরসা, সাম্য ছাড়া বন্ধুত্ব হয় না। হলেও তা টেকে না। এগুলো ছাড়া স্বার্থগত মিত্রতা হতে পারে। তা মোটেই বন্ধুত্ব নয়। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ঐতিহাসিক অনিবার্যতায় বা প্রয়োজনে।
একাত্তরের ২৫ মার্চ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনরত বাঙালিকে দমনে পাকিস্তানি বাহিনী বর্বর গণহত্যা শুরুর পর ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সমস্ত সীমান্ত খুলে দেয়, যাতে নির্যাতিত বাঙালিরা তাদের দেশে আশ্রয় নিতে পারে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এ ব্যাপারে তিনি বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন এবং তার প্রচেষ্টাতেই তৎকালীন বৃহৎ শক্তিধর দেশ রাশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়। এই ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার জায়গাটি দখল করে নেয় ভারত ও ভারতের জনগণ। সেদিন পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রতিবেশী ভারতের জনগণই। ১৯৭১ সালের মধ্য ডিসেম্বরে বাংলাদেশে যে নতুন সূর্যোদয় হয়েছিল, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রামের পর যে লাল-সবুজের পতাকা উড়েছিল বাংলার আকাশে, তার ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে ২০২১ সালে। সেদিন ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলার মুক্তিসেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত ও আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল ১৬ ডিসেম্বর। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক একাত্তরের রক্তে বাঁধা। ৭ হাজার ভারতীয় সেনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছেন, এই ইতিহাস এখন তরুণরা জানে। ভারতেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রের এসব হিসাব-নিকাশের জন্য অপেক্ষায় না থেকে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পাশে ভারতের জনগণ, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়িয়েছিল, তা অবশ্যই অবিস্মরণীয় ঘটনা। আমরা সব সময়ই তাদের সেই অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করব। সেই থেকে ভারতকে আমরা বলি বন্ধু-রাষ্ট্র। আমরা মনে করি, মানুষ মানুষের জন্য। আমরা এখন পর্যন্ত প্রমাণ রেখেছি যে ভারত বাংলাদেশের সব সময়ের বন্ধু। সে-সম্পর্কের তুলনা অন্য কারও সঙ্গে হতে পারে না। বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনীতিবিদদের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে সারা ভারত যেভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে, তা বিশ্বে বিরল। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতের সেনাদের সরিয়ে নিয়ে গেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকেও স্বামী-সন্তানসহ বেশ কয়েক বছর আশ্রয় দিয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর ভারত সরকার। মাঝে কিছু বছর দুদেশের মধ্যে কিছুটা টানাপড়েন থাকলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বরাবরই জোরালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ-সম্পর্ককে আরও জোরালো করেছেন। সেই সঙ্গে সহযোগিতার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন। ভারত-বাংলাদেশ একটি বিশেষ সম্পর্কের অংশীদার। এ-সম্পর্কের মূলে আছে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ ও অভিন্ন সংস্কৃতি। এটি স্বতন্ত্র একটি সম্পর্ক এবং এটি মনে রেখেই এ-সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এটি প্রতিযোগিতার সময় নয়; বরং দুদেশের উচিত সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে এ-সম্পর্কের আরও পরিচর্যা করা। সে-সঙ্গে সহযোগিতার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সম্পর্ক তাতে অন্য কোনো দেশের প্রভাব পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। রক্তের বন্ধনে গড়া বাংলাদেশ-ভারত ঐতিহাসিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও জোরদার হয়েছে। মানুষ জানে দুদেশের যৌথ উদ্যোগে কীভাবে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হয়। নরেন্দ্র মোদির সরকারের আমলে ভারতের আইন প্রণেতারা সর্বসম্মতিক্রমে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিল অনুমোদন করে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের ব্যাপারে সর্বসম্মত বার্তা দিয়েছেন। ফলে ২০১৫ সালে ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারত দুদেশের মধ্যে থাকা ছিটমহলগুলো বিনিময় করেছিল। এতে দুদেশের মধ্যে প্রায় ৭৪ বছরের পুরনো সমস্যার সমাধান হয়েছে। সুসম্পর্কের নিদর্শন মিলেছে দুদেশের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত সফরবিনিময় ও যোগাযোগের মধ্য দিয়ে।
১৩ মার্চ ২০২০ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর ভিডিও কনফারেন্স ডাকেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মোদির ভিডিও কনফারেন্সের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছিল, পরে ১৫ মার্চ ২০২০ সেই ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়, তাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সার্কের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। ঐ ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১ কোটি ডলারের তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন। কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় ভারতের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
করোনাকালীন সময় চীনের উহান থেকে ২৩ জন বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীর ফ্লাইট-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সরাসরি বাংলাদেশে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। সে-কারণে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। বেজিংয়ের ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই ভারতে ফেরেন। তারা সবাই দু-সপ্তাহের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সে-জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণায় ভারতের ১০ মিলিয়ন ডলার প্রাথমিক সহায়তা নিয়ে সার্ক কোভিড-১৯ জরুরি তহবিল গঠিত হয়। এই তহবিলের অধীনে ৩০ হাজার সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ১৫ হাজার হেড-কভার সমন্বিত জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রথম চালান গত ২৫ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনকে হস্তান্তর করা হয়। ২৬ এপ্রিল ২০২০ দ্বিতীয় চালান বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারত। চালানে রয়েছে ১ লাখ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট এবং ৫০ হাজার জীবাণুমুক্ত সার্জিক্যাল ল্যাটেক্স গ্লাভস।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি বলেন, সংকটের সময়ে প্রতিবেশী বন্ধুর সহায়তাকে আমরা স্বাগত জানাই। ভারতে হাইকমিশনার কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের অব্যাহত সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সার্ক অঞ্চলে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে গত ২৬ মার্চ ও ৮ এপ্রিল সার্ক দেশসমূহের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বাণিজ্য প্রতিনিধিদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং সেবা অনুশীলনগুলো বিনিময় বিষয়ে আলোচনার জন্য আলাদা ভিডিও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিকূল সময়ে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। ভারত ও বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধভাবে কোভিড-১৯ সংক্রমণে সৃষ্ট পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে।
করোনাভাইরাসের কারণে ভয়াবহ এই মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য নতুন কিছু নিয়ম সংযোজন করা হয়েছে। ব্যবসা কিংবা চিকিৎসা বা ভ্রমণের জন্য যেসব বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে যেতে চান, তাদের কাছে ভারতে প্রবেশের জন্য ভারতীয় হাইকমিশনারের অনুমতিপত্র থাকতে হবে। সে-সঙ্গে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করানো পরীক্ষার নেগেটিভ সার্টিফিকেট ও ২০২০ সালের ১ জুলাইয়ের পর ইস্যু করা ভিসার কাগজ থাকতে হবে। একই নিয়ম মানা হবে ভারতীয় পাসপোর্টধারী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও। করোনার কারণে যারা বাংলাদেশে আটকে রয়েছেন, তারাও একই পদ্ধতি মেনে ভারতে ফিরতে পারবেন। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যত বেশি সম্ভব সহযোগিতা করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ভারত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করা সম্ভব বলে মনে করছে দিল্লি। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের এ সময়টাতে দুই নিকট প্রতিবেশীর মধ্যে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ফলে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ব্যাঘাত ঘটেছিল, তা দূর করতে দুদেশই নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ছয় মাসে দুপক্ষের অনেকগুলো বৈঠক স্থগিত হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার ফোনে কথাও বলেছেন।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই আলোচনার সময়ে তিনি বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে ভারত একটি নতুন মাত্রা দিতে চাইছে বলেই পররাষ্ট্র সচিবের এই সফর। আগামী বছর মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে এ-সম্পর্ক আরও জোরালো হবে বলে বিশ্লেষকরা আশা করছেন। এরপরই ভারতের বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঝটিকা সফরে ঢাকায় আসেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন ভারতের বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। দুদেশের মধ্যে করোনা ভ্যাকসিন ও কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও পোক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানিসহ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি ৮৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বারৈয়ারহাট-হোঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় যুক্ত হন। ৮৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ভারতীয় ক্রেডিট লাইনের ঋণের অংশ হিসেবে ৫৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ও ভারতের ত্রিপুরার মধ্যে সংযোগ সড়ক তৈরি হবে এবং দুদেশের সড়ক উন্নয়ন করা হবে। রামগড় সীমান্তে একটি সীমান্ত হাট বসানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সব থেকে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশ বাংলাদেশ। গত এক দশকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য বেড়েছে। ২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশে ভারত প্রায় ৯.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল ১.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু চলতি বছর করোনা দুদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু ভারত সব সময় বাংলাদেশকে বন্ধু-রাষ্ট্র হিসেবেই দেখে এসেছে। আর তাই এবার দুদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু যেমনÑ ভ্যাকসিন সহযোগিতা, বাবল এয়ার, জয়েন্ট কনসালটেটিভ মিটিং, মুজিববর্ষ, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা। সাম্প্রতিক সময়ে দুদেশের সম্পর্কের শীতলতা বা অস্বস্তি নিয়ে নানান যে আলোচনা চলছে, সে-ব্যাপারে ঢাকায় দেশ দুটির পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে একে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দুপক্ষই বলেছে, দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সোনালি অধ্যায় চলছে, তা অব্যাহত থাকবে এবং সে-সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
কোভিড মহামারির কারণে ভারতের অর্থায়নে বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোতে ধীর গতি এসেছে বটে। তবে লকডাউনের মধ্যেও যেভাবে রেলপথে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের নতুন নতুন দিগন্ত খুলছে, কিংবা চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জাহাজে পণ্য পাঠানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কিন্তু থেমে নেই। এমনকি, দুদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মীয়মাণ রামপাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাজও কিন্তু লকডাউনে থেমে থাকেনি বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর।
ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুদেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার জোরালো আগ্রহ আছে। ভারতের সবচেয়ে বড় স্থলসীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে। ভারতের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্যও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না, সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সব পক্ষকে নিয়ে সমাধান করতে চায়। ভারতের বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, বন্ধুত্বের বন্ধনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। দুদেশের সম্পর্ক এখন সোনালি অধ্যায় পার করছে। করোনাকালে তার ব্যাপক সহায়তা দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করেছে। কারণ যে প্রকৃত বন্ধুত্বসুলভ আচরণ নিয়ে হাত বাড়িয়ে দেবে, তাকেই মানুষ গ্রহণ করবে। তবে ভারতকে উপলব্ধি করতে হবে, একতরফা সম্পর্ক দিয়ে কখনো ভালো সম্পর্ক গড়া যায় না। এজন্য পারস্পরিক ভারসাম্যমূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জরুরি। ভূ-রাজনীতি অনেক বদলে গেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভাষ্য হচ্ছেÑ “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ঘোষিত এই নীতির প্রতি অবিচল বর্তমান সরকার। এখানে প্রয়োজনে ছাড় দিতে হবে; প্রয়োজনে কূটনৈতিকভাবে দর-কষাকষি করে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। কূটনীতিতে প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। আধুনিক কূটনীতিতে তিনিই প্রকৃত বন্ধু, যিনি নিজের স্বার্থ আদায়ের পাশাপাশি অন্যের যাতে ক্ষতি না হয়, সেটিও আমলে নেবেন। এই সমস্যার বিকল্প কোনো সমাধান বা সমঝোতার পথ আছে কি? অবশ্যই আছে এবং সমঝোতার পথ একটাই। কবিগুরুর ভাষায় বলতে হয়Ñ “দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে।” তাই কোনো আলোচনায় বসার আগে দুপক্ষকেই স্বীকার করতে হবে, যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে উভয় পক্ষকে অবশ্যই ছাড় দিতে হবে এবং অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে মাঝামাঝি এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে। যদি দুটি পক্ষ সব বিষয়ে একমত হয়, তাহলে আলোচনারই দরকার হয় না। আমাদের মানতে হবে যে প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনেকগুলো সমস্যা আছে; কিন্তু কোনোভাবেই সমাধানের বাইরে নয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল বলেছিলেন, “আমরা সবাই সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভাগ করে নিই।” এই বাণী যেন আমাদের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে যে, এই বিশ্বায়নের যুগে সুখ-দুঃখ কোনো সীমান্ত মানে না এবং সবার দ্বারপ্রান্তেই আসে। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব সব সময় এই চেতনা দিয়েই প্রকাশিত হবে বলে আশা করি।

লেখক : উত্তরণ সম্পাদকম-লীর সদস্য

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply