করোনা ভ্যাকসিন সম্পর্কিত কিছু কথা

Spread the love

ডা. মোহাম্মদ হোসেন : করোনা বা সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটি গত বছর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে আবির্ভূত হয়ে মাত্র ৯ মাসের মধ্যে পৃথিবীর ২১৩টি দেশ বা অঞ্চলে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী এখনও প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ নতুন করে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এ পর্যন্ত এই ভাইরাসে বিশ্বে মোট আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ, মৃত্যুবরণ করেছে ১০ লাখের ওপরে।
লক্ষণীয় যে এ-মুহূর্তে করোনা মহামারির এপিসেন্টার এশিয়া মহাদেশ এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এর সংক্রমণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্তের দিক দিয়ে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বে প্রথম। অন্যদিকে মোট আক্রান্তের দিক দিয়ে এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, যদিও আমাদের মৃত্যুহার ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য বেশ কিছু দেশের তুলনায় কম। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে সংক্রমণের নিম্নগতি লক্ষ করা গেলেও মৃত্যুহার পূর্বের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। মহামারির বর্তমান পর্যায়ে বিজ্ঞানীদের সতর্ক বাণী হচ্ছে, করোনাভাইরাস সহসাই আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে না। কাজেই এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করেই আমাদের জীবনযাপন করতে হবে। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় নিরাপদ এবং কার্যকরী ভ্যাকসিন প্রয়োগে এই মহামারিকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ কিংবা সমূলে নির্মূল করা।
ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি ধাপ থাকে। প্রথমে একটি ভ্যাকসিনের প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয় যেখানে ভ্যাকসিনটিকে সাধারণত প্রাণী যেমনÑ ইঁদুর, গিনিপিগ, বানর কিংবা শিম্পাঞ্জির ওপর পরীক্ষা করা হয়। নিরাপদ ও কার্যকরী প্রমাণিত হলে এরপর মানব দেহের ওপর ৩টি ফেজে এই ট্রায়াল চলে। ফেইজ-১/২-তে কমসংখ্যক জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা করা হয়, ফলাফল নিরাপদ ও কার্যকরী হলে ফেইজ-৩-তে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আয়োজন হয়। বর্তমানে বিশ্বে ৩৮টি ভ্যাকসিন বিভিন্ন ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। এর মধ্যে শেষ ধাপ বা ফেইজ-৩ ট্রায়ালে রয়েছে অক্সফোর্ডের চ্যাডক্স-১, চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিনোবায়ো ভ্যাকসিন, রাশিয়ার স্পুটনিক-৫, মডার্নার এমআরএনএ ভ্যাকসিন এবং জার্মানির বায়োন্টেক/ফাইজার-এর ভ্যাকসিন। অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তাদের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করবে সেপ্টেম্বরে এবং অক্টোবরেই তারা ভ্যাকসিনটি বাজারে আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে মডার্না এবং সিনোভ্যাক তাদের ভ্যাকসিন এ বছরের শেষে বা আগামী বছরের প্রথম দিকে বাজারজাত করতে পারবে বলে আশা করছে। অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনেকার অক্সফোর্ড (চ্যাক্স-১) ভ্যাকসিনটির এ মুহূর্তে ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, ভারত, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ হাজার ভলান্টিয়ারের ওপর। চীন তার ক্যানসিনো ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়াল সম্পন্ন করছে রাশিয়া, সৌদি আরব ও পাকিস্তানে। অন্যদিকে রাশিয়া তার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটি ফেইজ-৩ ট্রায়াল সম্পন্ন না করেই নিজ দেশের জনগণের ওপর প্রয়োগ শুরু করে। এভাবে ভ্যাকসিন তৈরি ও প্রয়োগ বিপজ্জনক বিধায় বিজ্ঞানীদের আপত্তির মুখে রাশিয়া তার পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে আসে। বর্তমানে তারা তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে নিজ দেশের প্রায় ৪০ হাজার ভলান্টিয়ারের ওপর। অন্যদিকে সীমিত আকারে ভ্যাকসিনটি ব্যবহারের অনুমোদনও দিয়ে রেখেছে রাশিয়া। এদিকে অসমর্থিত খবরে জানা যায়, চীন তার সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনটি ফেইজ-৩ ট্রায়াল চলাকালীন জুলাই থেকে দেশের জনসাধারণের ওপর ব্যবহার শুরু করেছে। দ্রুত ভ্যাকসিন তৈরি ও প্রয়োগের প্রক্রিয়ায় ট্রায়ালের একটা পর্যায়ে গিয়ে সরাসরি ভ্যাকসিন মানুষের ওপর প্রয়োগের পদ্ধতি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক না হলেও করোনা মহামারির ভয়াবহতায় এ মুহূর্তে সবাই এটাকে অনেকটা মেনে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ হাজার ভলান্টিয়ারের ওপর ট্রায়াল চলছে আমেরিকার মডার্না এবং জার্মানির বায়োন্টেক/ফাইজারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ভ্যাকসিনটির। ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে জানা যাবে না কোন ভ্যাকসিনগুলো মানবদেহের জন্য নিরাপদ হবে এবং কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারবে। তবে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তে বোঝা যাচ্ছে অক্সফোর্ড, স্পুটনিক-৫, মডার্না, বায়োন্টেক ও ক্যানসিনোর ভ্যাকসিনই কার্যকরী বেশি সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের গ্লোব বায়োটেক তাদের ভ্যাকসিন প্রজেক্ট শুরু করে মার্চের শুরুতে। তাদের মিডিয়া ব্রিফিং থেকে জানা যায়, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তারা অ্যানিম্যাল ট্রায়াল শেষ করে অক্টোবর থেকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করবে। গ্লোব দাবি করছে, ডিসেম্বর নাগাদ তারা ৩টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করে সামনের বছরের শুরুতে তাদের ভ্যাকসিনটি বাজারে নিয়ে আসতে পারবে। কাজটি কঠিন, তবে আমরা আশা করি যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা তাদের কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাবে, কারণ এ-রকম উদ্যোগ আমাদের দেশে এই প্রথম। ফলাফল যাই হোক, ভ্যাকসিন তৈরির প্রেস্টিজিয়াস ক্লাবে যুক্ত হতে পারাটা দেশের জন্য, গ্লোবের জন্য এক বড় অর্জন। সাহসী উদ্যোগের জন্য গ্লোবকে অভিনন্দন।
আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন দ্রুততার সাথে কীভাবে দেশে আনা যাবে সে-বিষয়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশও জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মা ইতোমধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানি আইসিডিডিআরবি’র সাথে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে তাদের ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু করেছে, এর জন্য সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন তারা পেয়েছেন। উৎপাদন ও বিপণনের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারলে রাশিয়া তার স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশে তৈরি ও বাজারজাত করার অনুমতি দেবে সে-রকম আশ্বাসও পাওয়া গেছে। এদিকে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন কূটনীতি জোরদার হচ্ছে এবং বিশ্বের ধনী যেমনÑ আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলো বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় মূলধনের জোগান দিচ্ছে, এমনকি কেনার আগাম চুক্তিও সম্পন্ন করে রেখেছে। এতে আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন ধনী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভ্যাকসিন কূটনীতির এরূপ টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে সজাগ থাকতে হবে এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র যেমনÑ ভারত, রাশিয়া এবং চীনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভ্যাকসিন সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
এদিকে এপ্রিলে ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশন অপপবংং ঃড় ঈঙঠওউ-১৯ ঞড়ড়ষং (অঈঞ) উদ্যোগ চালু করে, যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো কোভ্যাক্স (ঈঙঠঅঢ) বা গ্লোবাল ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ। ধনী দেশসহ বিশ্বের ৯২টি দেশ এর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে এবং তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। কোভ্যাক্স ২০২১ সালের মধ্যে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কোভ্যাক্স উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশ ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানেই আছে বা থাকবে। তবে ভ্যাকসিনপ্রাপ্তির পর তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৌশল ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা এখনই প্রয়োজন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে সে-বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখা দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা যেমনÑ চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশকেও অনুরূপ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করে তাদের ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে এবং পরবর্তীতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ধাপে ধাপে বাকি জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোভিড-১৯ মহামারিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করতে হলে কী পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিজ্ঞানীরা বলেন, দেশের ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে না পারলে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে না। সেক্ষেত্রে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হবে। বিজ্ঞানীদের একটা অংশ অবশ্য ধারণা করেন ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমেও এই লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। যদি এটাও সত্য হয়, তাহলেও আমাদের প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে। লক্ষ্যমাত্রা থেকে সহজেই অনুমেয় এটা কী রকমের বিশাল একটি কাজ। কাজেই টিকা আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাতকেও সম্পৃক্ত করতে না পারলে সরকারের একার পক্ষে এত বড় কাজ সম্পাদন করা কঠিন। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের সাথে সহযোগী হিসেবে অনেক এনজিও কাজ করে। এক্ষেত্রেও এনজিওদের সহযোগিতাও নেওয়া যেতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজে ভ্যাকসিন কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, নজর রাখছেন বিশ্ব-ভ্যাকসিন কূটনীতির ওপরও। প্রস্তুতি হিসেবে ইতোমধ্যেই তিনি বাজেটে ভ্যাকসিনের জন্য বড় অঙ্কের আগাম বরাদ্দ দিয়ে রেখেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রেখেই বলা যায়, সরকারের প্রয়োজনীয় সকল বিভাগের সমন্বয় ও জনগণের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ভ্যাকসিনযজ্ঞের কাজটি সফলভাবেই সম্পন্ন করতে পারবে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

Leave a Reply