জাতির শক্তি-সামর্থ্য : জনগণ ও সরকার

Spread the love

শেখর দত্ত: যার আত্মবিশ্বাস আছে, সে-ই সাফল্য ছিনিয়ে আনতে পারে। আত্মবিশ্বাসের কারণেই আমরা এক পায়ের পর আরেক পা সামনে বাড়াই। কথাগুলো যেমন ব্যক্তির জন্য সত্য, তেমনি সত্য জাতির জন্যও। কিন্তু ইতোমধ্যে দেশের ভেতরে ঘটে চলা অনভিপ্রেত ও অনৈতিক ঘটনাগুলোকে নিয়ে এমনসব প্রচার বিশেষভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হচ্ছে, যাতে আত্মবিশ্বাসের জায়গাটাকে ক্রমাগত আঘাত করে চলেছে। ভালো-মন্দ জীবনেরই অনুষঙ্গ। সামগ্রিক বিচারে খারাপটা জনগণ এবং সরকার চাইতে পারে না। বলাই বাহুল্য, মন্দ হচ্ছে মিথের অসুরের মতো, একটাকে দমন বা নির্মূল করা হবে তো নতুন রূপ ও পন্থায় আরেক রূপ নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াবে। জনগণ ও সরকার খারাপটাকে বিবেচনায় নেবে এবং সেগুলো দমন ও বন্ধ করার জন্য পথ ও পন্থা বের করবে। তবে ভালো যা আছে, তা অবশ্যই স্মরণে রেখে এবং প্রচার করে আত্মবিশ্বাসকে সমুন্নত রাখবে।
প্রকৃত বিচারে বর্তমানের সাফল্য ও অর্জনই রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে ভবিষ্যৎ আরও আরও সাফল্য বয়ে আনার সোপান। বর্তমানে যদি সাফল্য থাকে এবং তা যদি দৃশ্যমান করা যায়, তবে আত্মবিশ্বাসকে জাগ্রত হয়ে অশুভকে পরাজিত করবেই। কিন্তু বর্তমান দিনগুলোতে প্রচারে এমনটাই মনে হচ্ছে যে, আমরা জাতি হিসেবে যে শক্তি-সামর্থ্য ইতোমধ্যে অর্জন করেছি এবং যা থেকে আমরা সামনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা পেতে পারিÑ সেটাই যেন পাথরচাপা পড়ে যাচ্ছে। ইতিবাচক অর্জন ও সাফল্যকে সামনে না এনে বা সাফল্যকে ভিত্তি না করে কেবল মন্দ ও অশুভগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। ফলে সমালোচনা আর গঠনমূলক থাকছে না। অনেক সময় ভুলে যাওয়া হচ্ছে, সাফল্য ও অর্জনকে বিবেচনায় না নিয়ে যদি কেবল মন্দ ও অশুভ নিয়েই পড়ে থাকি, তবে এক সময় হতাশা জাতিকে গ্রাস করবে। আর দেশের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, হতাশা হচ্ছে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের আঁতুরঘর।
বর্তমানে বিশ্বের সকল দেশের সাথে জাতি হিসেবে আমরা রয়েছি বিশেষভাবে এক গভীর সংকটের মধ্যে। এই সংকটের কোনো কূল-কিনারা নেই। দেশে করোনার প্রথম ওয়েভ কমতে থাকলেও তা এখনো আছে এবং শীতে দ্বিতীয় ওয়েভ আসবে কি না, এলে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হব, তা আগে থেকে অনুমান করা শক্ত। করোনা বিপর্যয়ের কারণে কম-বেশি চার-পাঁচ মাস দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের অনেক কিছুই বন্ধ ছিল। তারপর এলো আম্পান। যতটা ভয়াবহ ক্ষতি আশা করা হয়েছিল, তা সরাসরি ছোবল না দেওয়ায় তেমনটা হয়নি। কিন্তু হয়েছে তো। এরই মধ্যে এসে গেল কোরবানির ঈদ। ব্যবসায়ীদের মূল্য বৃদ্ধির অপসংস্কৃতির কারণে এ নিয়েও ছিল শঙ্কা। শ্রমিক বেতন-বোনাস পাবে না, এটাও ছিল শঙ্কা ও প্রচারে। তারপর দেশের বেশ কতক এলাকা পরপর তিনবার বন্যার কবলে পড়ল। এসবের ফলে মানুষের জীবনে অভাব-অভিযোগ-শঙ্কা নিঃসন্দেহে বেড়েছে। জাতি হিসেবে সবটা সামাল দিয়ে ওঠা গেছে তা একেবারেই বলা যাবে না। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ না এলে সামাল দিয়ে ওঠার লক্ষণ সুস্পষ্ট।
করোনাকালের প্রথম দিনগুলোর কথা স্মরণ করলেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, জনগণের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে স্বাভাবিক কারণেই আমরা কতটাই না উদ্বিগ্নতা ও শঙ্কার মধ্যে ছিলাম। নিঃসন্দেহে একটা অজানা রোগ সামনে এসে পড়ায় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা-অপ্রতুলতা, দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি চোখের সামনে এসে ধরা দিয়েছিল। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তাতে সরকারের সমালোচনা তুঙ্গে উঠেছিল। হাসপাতাল-ক্লিনিক-চেম্বারসহ সর্বত্র ডাক্তারদের উপস্থিতি এক পর্যায়ে কমতে বা বন্ধ হতে থাকলে, সরকার পড়েছিল শাঁখের করাতের মধ্যে। সরকার যথাসম্ভব ব্যবস্থাদি নিয়ে ওই অবস্থা সামাল দেয়। অগণিত জনগণ করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়মকানুন না মেনে চলায় সরকার দুদিক থেকে পড়ে সমালোচনার মধ্যে। একদিকে কড়া ব্যবস্থা সরকার নিচ্ছে না কেন আর অন্যদিকে কড়া ব্যবস্থা নিলে সরকার মধ্যযুগীয় কাজ করছে বলে সমালোচনার মধ্যে পড়ে। গার্মেন্ট মালিকরা কারখানা খুলে দিল, একটা অভাবিত অবস্থার মধ্যে পড়া গেল, সরকার পড়ল প্রচ- সমালোচনায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল ত্রাণ তৎপরতা চালানো, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা, বোরো ধান কেটে কৃষকের ঘরে তোলা, শহুরে মানুষদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রাপ্তির জন্য সাপ্লাই লাইন সচল রাখা, দাম যাতে না বাড়ে তার ব্যবস্থা নেওয়া, মানুষ যাতে করোনাসহ সব রোগের চিকিৎসা পায় তা সচল রাখা, সরকারি অফিস দ্রুত খোলা, বন্যার পর উপদ্রুত এলাকায় সাহায্য পাঠানো, মানুষের মনোবল ঠিক রাখা প্রভৃতি। আমাদের সীমিত সম্পদ এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতার মধ্যে সরকার যা করেছে এবং সার্বিক বিচারে জনগণ বিশেষত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যে ক্রমে সাহসী-উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছে, তা বোধকরি সাম্প্রতিক সময়ে জাতির শক্তি-সামর্থ্য বিচারে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সরকার ও জনগণের মধ্যে একটা অভূতপূর্ব-অলিখিত মেলবন্ধন গড়ে উঠেছিল। জনগণ যেমন পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হয়েছে, তেমনি সরকারও জনগণের মনোভাবের সাথে খাপ খেতে খেতে অগ্রসর হয়েছে। ফলে করোনার সাথে বসবাস আমরা করতে পারছি।
আমরা যদি করোনাকালে সরকারের কার্যক্রমের দিকে লক্ষ করি, তবে দেখা যাবে করোনাকালের শুরুতেই অন্য অনেক বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আগেই অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি জেলার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে টেলিকনফারেন্স চালিয়ে গেছেন। এ দুটো তৎপরতা জনগণের মনোবল ঠিক রাখতে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা বুঝা যাবে ওইসব টেলিকনফারেন্স দেখতে টেলিভিশনের সামনে জনগণের আগ্রহ লক্ষ করলে। ত্রাণ তৎপরতায় সরকার জুলাই পর্যন্ত দেড় কোটি পরিবারকে ২ লাখ ১১ টন চাল, ১ কোটি ৬২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ টাকা নগদ এবং শিশু খাদ্য প্রায় ১ কোটি পরিবারকে ১২৩ কোটি টাকা প্রদান করেছে। এজন্য একটা তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে অবস্থাপন্ন জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ তৎপরতা। বলাই বাহুল্য, এবারের ত্রাণ তৎপরতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রায় বন্ধ থাকলেও একটি মানুষও না খেয়ে মারা যায়নি।
অতীত সময় বিবেচনায় এটা আমাদের শক্তি-সামর্থ্যরে বড় দিক। কোনো এলাকায় খাদ্য নেই বা দুর্ভিক্ষাবস্থা কথাটা শোনা যায়নি। ‘মরা কার্তিক’ চলে এলেও ‘মঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে না। তবে ত্রাণ তৎপরতায় সবচেয়ে অনভিপ্রেত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হচ্ছে ‘দুর্নীতি’। প্রশ্নটা হলোÑ দুর্নীতি কোথায়, কতটুকু হয়েছে কিংবা ধরা কতটা পড়েছে, শাস্তি কতটুকু হয়েছে প্রভৃতি নিয়ে বিস্তৃত কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্ট বা প্রতিবেদন চোখে পড়েনি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির খবরাখবর। এটা তো ঠিক, দুর্যোগ এলেই একদল লোভী, স্বার্থপর, অসৎ চরিত্র ও টাউট গোছের মানুষ ও তাদের চেইন তৎপর হয়ে ওঠে। বিশ্ব খ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় খুবই সুস্পষ্টভাবে দুর্ভিক্ষ নিয়ে ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় তা তুলে ধরেছেন। ওই ছবিতে ১৯৪৩ সালের আকালে চাল গুদামজাত করা, গ্রাম্যবধূ ছুটকির এক দেহলোভী নরপশুকে হত্যা আর অপর দেহলোভী পোড়ামুখো যদুর সাথে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা চিরায়ত বিধায়ই ওই সিনেমা চিরঞ্জীব হয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে দেখলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি একটি সত্য কথা, সব দেশেই ধর্ষণ আছে বলে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। বলা হচ্ছে, এতে ধর্ষকরা উৎসাহিত হবে। বিষয়টা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। তবে এজন্য দুর্নীতি, পেশিশক্তির ব্যবহার ও অপরাধ যারা করেছে, সেসব দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া আর বিশেষভাবে সার্বিক ত্রাণের শতকরা কতভাগ দুর্নীতি হয়েছে, সেটাও জানা একান্ত প্রয়োজন। যদি তা না হয়, তবে পদ্মাসেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগের মতো কান নিয়ে গেছে চিলে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি তো হবেই। মানুষের ধারণা হয়ে গেছে, সরকারি দল করলে সাত খুনও মাপ। মানুষ হয়তো ভুলেই গেছে, বঙ্গবন্ধুর আমলে সাত খুন করে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান গিয়েছিল জেলে, শাস্তি ছিল অবধারিত। আর জিয়াউর রহমান ওই খুনিকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সর্বোপরি বিএনপি আমলে বহু খুনের আসামি যুব কমপ্লেক্স খ্যাত ইমদু ছিল প্রতিমন্ত্রী কাসেমের বাড়িতে। এভাবেই পঁচাত্তরের পর তো রাজনীতির কালচার দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়েছে, সুবিধাবাদকে পুঁজি করে সুযোগ সন্ধানীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে সামরিক শাসনের দিনগুলোতে ওপর থেকে সরকারি দল গঠনের তৎপরতা।
পঁচাত্তরের পর ‘দল আমি পাল্টাই না, সরকার পাল্টায়, আমি সব সময় সরকারি দলে’ কথাটি রাজনীতির কালচারে পরিণত হয়েছে। যদি সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপির কথামতো আওয়ামী লীগে ‘কাউয়া’ অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে এবং তারা দাপটে অপকর্ম করে বেড়ায়, তবে তা দুর্ভাগ্যজনক। এটা তো ঠিক, সিলেটে ধর্ষণের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিহিত গুহ চৌধুরী বাবলাই প্রথম দলীয় পরিচয়ের লম্পটদের রুখে দাঁড়িয়ে পুলিশকে খবর এবং প্রকৃত ঘটনা দেশবাসীকে জানতে দিয়েছিল। পুলিশও ঠিক কাজটি করেছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে সিলেটের আইনজীবী-সমাজ। সিলেটের আইনজীবীরা যদি প্রতিবাদে দাঁড়াতে পারে, লিগ্যাল প্রফেশনের অজুহাতে অন্য জায়গায় পারেন না কেন? অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আমাদের দেশ এমনই যে, হলমার্কের মতো বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সত্য জেনেও নামি-দামি আইনজীবীরা ওই দুর্বৃত্তের পক্ষে কোর্টে দাঁড়িয়েছিলেন।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে দৃষ্টিভঙ্গির মূলকথা, যা বিগত নির্বাচনী ইশতেহারে লেখা হয়েছে, তা হচ্ছে : ‘দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি। পেশিশক্তির ব্যবহার ও অপরাধের শিকড় হচ্ছে দুর্নীতি। যার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে অবক্ষয় বা পচন শুরু হয়…। দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা।’ বলাই বাহুল্য, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়টা বিবেচনায় নিয়েই দুর্নীতি, পেশিশক্তির ব্যবহার ও অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। সিলেটের মতো ইতিবাচক গণপ্রতিরোধ যত সৃষ্টি হবে, ততই জিরো টরারেন্স নীতি কার্যকর হতে থাকবে বা কার্যকর করা সম্ভব হবে। গণপ্রতিরোধ আর জিরো টলারেন্স নীতি পরস্পরের সমানুপাতিক। মানুষ বিশেষত সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিবেকবান মানুষদের এক্ষেত্রে গঠনমূলকভাবে এগিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টা ও সামাজিক উদ্যোগ একসাথে মিলিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
কবিগুরু বলেছেন যে, সমাজের দুর্বলতাগুলোকে সমাজের ভেতর থেকে সংশোধন করতে হবে। সে সমাধান সামাজিক বটে, রাজনৈতিক নয়। দুর্ভাগ্য আমাদের ‘কাউয়াদের’ কারণে এটা এখন রাজনীতির সাথেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। তিনি আরও বলেছেন, নৈতিকতা সমাজের রুচির বিষয়। ব্যক্তিগত নৈতিকতা তখনই নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক বিকাশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়, যখন তা রুচিতে পরিণত হয়। মানবদেহে জিহ্বার যে স্থান, সমাজের নৈতিকতায় রুচির সেই স্থান। বাস্তবে সমাজ ও রাজনীতিতে জিহ্বাটা এখনও পড়ে আছে নর্দমায়। এমনটা যদি না হতো, তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্কুল-মাদ্রাসা শিক্ষক থেকে শুরু করে গির্জার ফাদার পর্যন্ত ধর্ষক হয় কীভাবে? আর রাজনীতিতে! এখানে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। ঘৃণিত স্বৈরাচার এরশাদ রংপুরে জিতে যাবে, বিরোধীরা দাঁড়াতেই পারছে না, এমন কথা ঢাকায় এসে পৌঁছাল। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দেশের উদ্যোগী বুদ্ধিজীবী নেতৃত্ব চাইলেন, এরশাদকে পরাজিত করতেই হবে। অর্থ তুললেন, নানা কেচ্ছাকাহিনি দিয়ে প্রচারপত্র ছাপালেন। আমাকে বলা হলো, এগুলো পাঠাতে হবে। পাঠালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া রংপুরের এক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা। কী আশ্চর্য! কোনো ফিটব্যাক নেই। সে ফিরেও আসে না, খবরও না। আমি সমালোচিত হচ্ছিলাম। তখন তো আর মোবাইল ছিল না। অনেক কষ্টে তাকে গ্রামের বাড়িতে পাওয়া গেল। সে বলল, নির্বাচনী প্রচারে অর্থ দিয়ে কোনো লাভ নেই। এরশাদের পক্ষে ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। আর প্রচারপত্র! ওসব বিলি করতে গিয়ে কর্মীরা কোনোক্রমে পালিয়ে বেঁচে এসেছে। মারমুখী সাধারণ মানুষ বলছে : আমাদের ‘ছাওয়াল’ যা করে করুক। রাজার ‘বাড়তি মেয়ে মানুষ’ থাকবে না-কি আমাদের থাকবে। এমনই আমাদের সমাজ! নতুবা সালিশি বিচারে ধর্ষিতার শাস্তি হয় কীভাবে? রাষ্ট্র-সমাজ ও রাজনৈতিক দলে এমন ‘কাউয়া’দের উৎপাত হয় কেন? বিএনপির আমলে ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ পরিচালিত ‘খোয়াব ভবন’-এর কিচ্ছাকাহিনি আমরা জানি। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান লন্ডন সফরে গিয়ে ক্রিস্টিন কিলারের সুইমিংপুল কাহিনি সৃষ্টি করেছিলেন। ক্ষমতার রাজনীতিতে এই ধারা হঠাৎ করে গা-সওয়া হয়নি।
ইতোমধ্যে বেশ কিছু দুর্নীতি, অনৈতিক কাজ, খুন ও ধর্ষণ মামলায় বিচারের রায় প্রকাশ পেয়েছে। এটা ভালো লক্ষণ। আইন দল-নির্বিশেষে মন্দদের বিরুদ্ধে নিজস্ব গতিতে চলতে থাকলে, সরকারি দলের হলে সাত খুন মাপ কথাটা বাতাসে মিলিয়ে যাবে। নির্বাচনী ইশতেহারে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স নীতি সামনে এনে কতক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন : ‘এক. দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্ম পরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী করে আধুনিকায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এবং প্রায়োগিক ব্যবহারে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। দুই. বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ভবিষ্যতে আরও জোরদার করবে। তিন. দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। চার. ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার এ-কথাগুলো পালনে মন্ত্রী-নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলে যদি অনুসরণ করেন, তবে দুর্নীতি, পেশিশক্তির ব্যবহার ও অনৈতিক অপরাধ যে দমিত বা নিয়ন্ত্রিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই করণীয়গুলোর ক্রমবাস্তবায়ন অতীব গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে ‘বৈশ্বিক দারিদ্র্যতা দূরীকরণে’ নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বানার্জির দুর্নীতি নিয়ে কথাগুলো স্মরণে রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতি থাকলেই সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে, তা নয়। মানে দুর্নীতির ভেতরেও অনেক কিছু হয়, পরিবর্তন হয়। যেদেশে দুর্নীতি আছে সেদেশে পরিবর্তন আটকে যায় না।’ উনিশ শতকের গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঠা-াযুদ্ধ যুগে কর্তৃত্ববাদী ফিলিপাইনের দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রপতি মার্কোস ও বর্তমানের চীনের উদাহরণ তিনি তুলে ধরেছেন। এর মানে কিন্তু একদমই এই নয় যে তিনি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছেন বা পক্ষে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে তার মত হচ্ছে, দরিদ্রের উন্নয়নের জন্য বারদ্দকৃত অর্থ বাড়ানো এবং যাতে সেই অর্থ ঠিকমতো খরচ হয়। বলাই বাহুল্য, দুনিয়া ও জাতীয় নানা কারণে আমরা জাতি হিসেবে যখন পরিস্থিতির রাতারাতি এক ধাক্কায় আমূল পরিবর্তন করতে পারছি না এবং ১৯৭১-৭৫ আমূল পরিবর্তন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা যেহেতু আমাদের রয়েছে, তখন এই নোবেলজয়ীর পরামর্শ দেশের বাস্তবতায় সৃজনশীল ও উদ্যোগী হয়ে বাস্তবায়ন ছাড়া আর পথবিকল্প নেই। বিগত নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, ‘দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণে গৃহীত পরিকল্পনা ও কর্মসূচির পরিধি অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে জোরদার করা হবে।’ বাস্তবে সরকার ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে যথাসম্ভব দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স পদক্ষেপ কার্যকর করা এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা বর্তমান সময়ে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রসঙ্গত, আমাদের জাতীয় জীবনে সাম্প্রতিক সময়ের বড় তাৎপর্যপূর্ণ দুটো সাফল্য ও অর্জন হচ্ছে, ১৮ কোটি মানুষের দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের অগ্রগতি। বিগত বছরগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। বিদ্যুৎ নতুন উৎপাদন অতিরিক্ত ৬৩২৩ মেগাওয়াট, ৪০ লাখ নতুন গ্রাহক হয়েছে, সুবিধাভোগী ৪৭ থেকে বেড়ে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। বিদ্যুতের জন্য এখন আর ঝাড়–মিছিল হয় না, রাজশাহীর কানসাটের রক্তাক্ত ঘটনার মতো ঘটনা ঘটে না। একইভাবে পানির জন্য কলসি নিয়ে মহিলাদের মিছিল আর দেখা যায় না। সার নিয়ে কেলেঙ্কারি শোনাই যায় না। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের মানদ- অনুযায়ী একটি দেশের মাথপিছু আয় হওয়া প্রয়োজন কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশে এখন ২১০০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ শতাংশ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২.৯ শতাংশ। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ শতাংশ বা এর কম; কিন্তু আমাদের ২৪ শতাংশ। এমন আরও আরও উন্নয়নের তথ্য ও উপাত্ত দেওয়া যায়।
তবে তথ্য-উপাত্তের মধ্যে না গিয়ে এটা বলাই যথেষ্ট যে, ব্যর্থ রাষ্ট্র, অকার্যকর রাষ্ট্র, সন্ত্রাসী রাষ্ট্র প্রভৃতি কালো তালিকাভুক্তির কথা এখন আর বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শোনা যায় না। যদি করোনা বিপর্যয়ে বিশ্বব্যাপী একেবারেই মহামন্দা দেখা না দেয়, তবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ব্যাপারে স্বপ্নভঙ্গের কোনো কারণ দৃষ্টিগোচর হয় না। হেনরি কিসিঞ্জার যুদ্ধবিধ্বস্ত, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকবলিত, বন্যায় সর্বস্বহারা ও খাদ্যের কারসাজি প্রভৃতি করে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন। ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ বই ও প্রামাণ্য চিত্রে ইন্দোচীন, বাংলাদেশ, চিলি, সাইপ্রাস, পূর্ব তিমুর প্রভৃতি স্থানে হত্যা-নির্যাতনে উৎসাহিত করেছিলেন বলে তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ঘৃণিত এই ব্যক্তি স্বাভাবিক কারণেই এখন প্রচারমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেন। তাই বলা যাবে না, এই অঘটনঘটনপটিয়শী ধুরন্ধর ব্যক্তিটি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বাংলাদেশ সম্পর্কে কী মন্তব্য করতেন। তবে তিনি না করলেও তার মিত্রদেশ পাকিস্তান বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ধরনের প্রশংসা করে, তা দেশবাসী জানে!
এসব স্মরণে রেখে দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্সকে কার্যকর করার জন্য, অর্জন ও সাফল্যের আরও ধাপ পার হওয়ার জন্য, দুর্যোগের দিনগুলোকে পাড়ি দেওয়ার জন্য, সরকার ও জনগণের মেলবন্ধনকে দৃঢ় করার জন্য আমাদের জাতির সাফল্য ও অর্জন, শক্তি ও সামর্থ্যকে প্রচারে যথার্থভাবে সামনে আনা প্রয়োজন। এটা প্রয়োজন আত্মসন্তুষ্টি লাভ কিংবা অহংকার প্রকাশের জন্য নয়, ‘আমরাও পারি, আমরাও পারব’ মর্মে আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ়, বিস্তৃত ও জাগ্রত করার জন্য। মুজিববর্ষে ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে এটাই একান্ত কামনা।
লেখক : সম্পাদকম-লীর সদস্য, উত্তরণ

Leave a Reply