পুনশ্চঃ সতর্কবাণী

সম্পাদকের কথা: প্রকৃতির কাছে মানুষ কতটা অসহায়, এটা যেমন মানবেতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে; তেমনি প্রকৃতিকে জয় করার ক্ষেত্রে মানব মণীষা কতটা পারঙ্গম সেটিও প্রমাণিত। ডাইনোসর ও ম্যামথ প্রভৃতি বিশালাকৃতির প্রাণী হাজার লক্ষ বছর আগে দুনিয়া দাঁপিয়ে বেড়াত। কিন্তু এক সময় প্রকৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে ডাইনোসরসহ ঐসব বিশালাকৃতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের বেশ কয়েকটি জাদুঘর পরিদর্শন করে ডাইনোসরের কঙ্কাল, ম্যামথের কঙ্কাল এবং বিলুপ্ত অনেক বৃহদাকার প্রাণীর দেহাবশেষে দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছি। ওরা টিকতে পারেনি। ডারউইনের তত্ত্ব অনুযায়ী এসব প্রাণী প্রাকৃতিক বিচারে (Selection of Nature) বিলুপ্ত হয়েছে। বেঁচে আছে সেইসব প্রাণী, যারা সতত পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সাথে খাপ খেয়ে চলতে অভ্যস্ত।
মানুষ Natural Selection-এ এখনও বেঁচে আছে। হোমোইরাকটাস থেকে লক্ষ বছরের বিবর্তনে বর্তমান মানুষের পূর্ব পুরুষ হোমোসেপিয়ানসরা টিকে আছে প্রধানত তাদের প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার সক্ষমতার জন্য, দ্বিতীয়ত বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন উন্নত প্রজাতির প্রাণী বলে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রাচীন ও মধ্যযুগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির এই যুগে বহু মহামারি, বন্যা, ঝড়- জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করে মানুষ একবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। সত্য বটে, কোটি কোটি মানুষ অসহায়ভাবে প্রাণ দিয়েছে। আবার এই মানুষই প্রকৃতির বিরুদ্ধেÑ মহামারির বিরুদ্ধে নিজ বুদ্ধি ও নতুন নতুন আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে প্রকৃতিকে জয় করেছে। আমাদের দেশে এই গেল শতাব্দীতেও (বিশ শতক) লক্ষ লক্ষ মানুষ প্লেগ, কলেরা, গুটি বসন্ত এবং ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণ-সংহারী মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছে। মানুষ কেবল প্রকৃতির আক্রোশে নয়, নিজেদের আত্মঘাতী মারণান্ত্র আবিষ্কার করতে গিয়েও মৃত্যুর শিকার হয়েছে। হিরোশিমা-নাগাসাকির আণবিক অস্ত্রের আঘাতে যেমন, তেমনি পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে ভুলের জন্য চেরনোবিলের মতো দুর্ঘটনা এবং রাসায়নিক অস্ত্র বানাতে গিয়েও গণহারে মৃত্যুর কারণ হয়ে আছে।
আর এখন তো মানুষের হাতে প্রকৃতিই বিপন্ন। নির্বিচারে বন উজাড় ও গাছপালা নিধন এবং শিল্পের নামে সীমাহীন কার্বন নিঃসরণের মতো ঘটনায় মানব অস্তিত্বই বিপন্ন হতে চলেছে। সর্বশেষ আমরা মোকাবিলা করছি কোভিড-১৯ নামক অপ্রতিরোধ্য অতিমারি বা মহামারি। বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ ঠেকাতে না পেরে অত্যুন্নত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পশ্চাৎপদ দরিদ্র আফ্রিকার বহু দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে। পৃথিবীতে গত ১০ মাসে ১০ লাখ ৪৪ হাজারেরও বেশি মানুষ এ পর্যন্ত কোভিড-১৯-এ প্রাণ হারিয়েছে। ৩ কোটির ওপর মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংক্রমণ ও প্রাণহানির সংখ্যা সর্বোচ্চ। সে তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যু হার ১.৭/৮-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। এটা আত্মতুষ্টির ব্যাপার নয়। মৃত্যু ও সংক্রমণের হার আরও কম হতে পারত, যদি আমরা ঠিকমতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতাম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই মনে করতেন, তিনি এবং তার স্ত্রীÑ দুজনেই করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দুষ্টু লোকেরা বলছেন, ট্রাম্পের আসলে করোনা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অনিবার্য পরাজয়ের আশঙ্কায় তিনি জনগণের সহানুভূতি লাভের জন্য নাটক করছেন। তবে আমরা দুষ্টু লোকের কথায় কান দেব না; বাস্তবেই ট্রাম্প দম্পতি কোভিড-১৯ এর শিকার হয়েছেন।
কোভিড-১৯ প্রতিরোধের জন্য মানব জাতি এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রাশিয়া যে ‘স্পুটনিক ফাইভ’ নামে প্রতিষেধকটি আবিষ্কার করেছে তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফলে এর উপযোগিতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও ভারতে প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিষয়ে অনেক কোম্পানি সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে করা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, সময় লাগলেও মানব জাতি প্রতিষেধক আবিষ্কারে সক্ষম হবে। প্রকৃতিকে নিশ্চয়ই মানুষ জয় করতে সক্ষম হবে।
তবে ওটা যতক্ষণ না হচ্ছে ততদিন আমরা জীবনহানির আশঙ্কামুক্ত হতে পারি না। শোনা যাচ্ছে, আমাদের দেশে কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউ বা ওয়েভ আরম্ভ হয়েছে বা হতে চলেছে। তাই এখন থেকে যদি আমরা সতর্ক না হই, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে না পারি, তবে মৃত্যু মিছিলই কেবল বাড়বে না, আমাদের অর্থনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি স্থবির হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ ৮ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। করোনা না হলে আমাদের উন্নয়নের এবং প্রবৃদ্ধির হার আরও ঊর্ধ্বমুখী হতো। প্রথমে লকডাউন ও করোনাজনিত আনুষঙ্গিক প্রতিক্রিয়ার ফলে আমাদের প্রবৃদ্ধি কমে ৫.২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। সত্য বটে, আমাদের দেশে উন্নয়ন, আমদানি, রপ্তানি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের দিক থেকে অচলাবস্থা বা স্থবিরতা সৃষ্টি হয়নি। এর মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এই করোনার মধ্যেও অর্থনীতির গতিশীলতা অক্ষুণœ রেখে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। তবুও বলব, কাক্সিক্ষত বা পরিকল্পিত লক্ষ্য কিন্তু অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। হাজার হাজার মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। একজন মানুষও না খেয়ে মরেনি সত্য। তবে এই অস্বাভাবিক অবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে আমাদের আবেদন, আপনি নিজে, আপনার পরিবার ও আপনার চারপাশের মানুষকে বাঁচতে, তাদের কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ওয়েভ থেকে রক্ষা করতে চান, তাহলে এখনই সতর্ক হোন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। মাস্ক পরুন। পরস্পর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। করোনা সংক্রমণ ঠেকান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply