ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ইন্তেকাল

Spread the love

উত্তরণ প্রতিবেদন: এক বর্ণাঢ্যময় জীবন পেছনে রেখে চলে গেলেন আইনের বাতিঘর দেশের অন্যতম সেরা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তার মৃত্যুতে আইন ও বিচারাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আইন অঙ্গনের এই দিকপাল বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়ে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় গত ২৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি … রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
তিন-দফা জানাজা শেষে বেলা সোয়া ৩টায় বনানী কবরস্থানে স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আইন পেশা শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, তা দিয়ে যে সমাজে বিশাল অবদান রাখা যায় তার নজির রেখে গেছেন আইন অঙ্গনের এই নক্ষত্র।
ব্যারিস্টার রফিক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন। রাজনীতি এবং দেশ সচেতন ব্যারিস্টার রফিক একজন অরাজনৈতিক এবং দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে আইনপেশায় ছয় দশক নিয়োজিত ছিলেন।
ব্যারিস্টার রফিক আইন পেশা থেকে উপার্জিত অর্থের সবই ব্যয় করেছেন সমাজসেবায়। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই মানবতার সেবায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। দানবীর ও সমাজসেবক হিসেবে তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতাল, আহছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল, গাজীপুরের চন্দ্রায় স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ডা. ফরিদা হক মেমোরিয়াল হাসপাতাল, আদ-দ্বীন হাসপাতালসহ অসংখ্য দাতব্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজ্ঞ সংবিধানের ত্রয়োদশ, ষোড়শ সংশোধনী মামলাসহ অসংখ্য সাংবিধানিক মামলায় অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে সুপ্রিমকোর্টে গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত দিয়েছেন। ছিলেন কোম্পানি আইনের একজন দিকপাল। বাংলাদেশ ব্যাংকিং আইন সংস্কারে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডিনেন্স, প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন জাতীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও দিক-নির্দেশনামূলক ভূমিকা রেখে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন ব্যারিস্টার রফিক। দেশের রাজনৈতিক সংকটের সময়ে আইনজীবী হিসেবে তার অবদান দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ, ঘুষ-দুুর্নীতি বন্ধে তিনি সব সময় ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।
প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বিপুল অবদান রেখেছেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ আইনবিদকে হারাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সংবিধান সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। একটি মিথ্যা মামলায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে তাকে গ্রেফতার করার পর জেল থেকে মুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ে এগিয়ে আসায় ব্যারিস্টার রফিকের ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

জীবন-বৃত্তান্ত
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মরহুম মমিনুল হক, মাতা নূরজাহান বেগম। ব্যারিস্টার রফিক ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৬০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী লিংকন ইন থেকে হিন্দু আইনের ওপর বার এট ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু আইন পাঠ্য হয়।
১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে যোগ দেন। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টে সিনিয়র হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ১৯৭৫ সালে। বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন ১৯৯০ সালে। কিন্তু নেননি কোনো সম্মানি। বর্ণাঢ্য জীবনে আইন পেশায় অতিবাহিত করেছেন দীর্ঘ ৬০ বছর। বিগত ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন কারাগারে তখন তাদের জন্য অকুতোভয় আইনি লড়াই করে তাদের মুক্ত করেন তিনি।

Leave a Reply