খাদ্যে রেকর্ড: ৪ কোটি টন উৎপাদনের মাইলফলক অর্জন

Spread the love

কাওসার রহমান : কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুদ নিয়ে বাংলাদেশ স্বস্তির অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ চালের মজুদ রয়েছে তা দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সহজেই চাহিদা পূরণ করা যাবে। আর গমের যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে চলবে আগামী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত। জাতিসংঘ কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধান খাদ্যশস্য চাল ও গমের মজুদ গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রয়েছে। বিশেষ করে গমের মজুদ গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থায় আছে। ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত খাদ্যশস্য নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আর ডিসেম্বরের মধ্যেই দুটি ফসল আউশ ও আমন কৃষকের গোলায় উঠবে। বন্যায় কিছু পরিমাণ আউশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ-বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ লাখ হেক্টর বেশি জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। বর্তমানে মাঠে আউশ ধান কাটা চলছে। তবে বন্যার কারণে এ-বছর আমন উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে চার-দফা বন্যার কারণে নিচু এলাকার আমন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সরকারের মধ্যেও আমন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ অনিশ্চয়তা কাটাতে সরকার সীমিত পরিসরে চাল আমদানিতে যাবে বলে কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন।
তবে সম্প্রতি কৃষি খাতে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, গত বছর দেশে রেকর্ড ৩ কোটি ৮৯ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। এই চাল উৎপাদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে চাল উৎপাদনকারী শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গম উৎপাদন হয়েছে গত বছর। মোট গম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৪৭ হাজার টন। চাল আর গম মিলিয়ে এই প্রথম দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ৪ কোটির মাইলফলক পেরিয়ে গেছে। মোট খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে ৪ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার টন। এর সঙ্গে ভুট্টা যুক্ত করলে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ ২০ হাজার টন। এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ এদেশের কৃষকদের, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অত্যন্ত পরিশ্রম করে এই খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছেন। সেই সঙ্গে ধন্যবাদ সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এবং কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এমপিকে। যারা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে সারের দাম কমিয়েছেন। স্বল্পমূল্যে সার, বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। সর্বোতভাবে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের সহায়তা করেছেন।
বিশ্ব খাদ্য দিবস সামনে রেখে প্রণীত জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (ফাও) ‘সেকেন্ড র‌্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ থেকে আরও জানা যায়, ২০১৯ সালের ১ জুলাই দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট চালের মজুদ ছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ২১ হাজার টন। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টন। ওই বছর আমদানি হয়েছে ১৪ হাজার টন। এর মধ্যে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ, রপ্তানি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে ৩ কোটি ৮১ লাখ ২৭ হাজার টন। ফলে ২০২০ সালের ১ জুলাই চালের মজুদ দাঁড়ায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার টন। যা দিয়ে আরও ১৩৪ দিনের চালের চাহিদা পূরণ করা যাবে।
একইভাবে ২০১৯ সালের ১ জুলাই গমের প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ১৭ লাখ ৩০ হাজার টন। দেশে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে গমের উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার টন। আমদানি হয়েছে ৫৮ লাখ ৩৯ হাজার টন। আর গত বছর মোট গম ব্যবহৃত হয়েছে ৬৭ লাখ ৪৬ হাজার টন। ফলে চলতি ২০২০ সালের ১ জুলাই দেশে গমের মজুদ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৭০ হাজার টন। ফাও-র তথ্যমতে, এই গম দিয়ে দেশের আরও ১৩৪ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে।
ভুট্টা বাংলাদেশের একটি উদীয়মান ফসল। সরকারি উদ্যোগ ও প্রণোদনায় দেশে ভুট্টা উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। ভুট্টার মজুদ সম্পর্কে ফাও-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১ জুলাই দেশে ভুট্টার মুজদ ছিল ২০ লাখ ৬২ হাজার টন। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট ভুট্টা উৎপাদন হয়েছে ৩৪ লাখ ২৩ হাজার টন। এ-সময়ে আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ৪৬ হাজার টন। দেশে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গত বছর মোট ভুট্টা ব্যবহৃত হয়েছে ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টন। ফলে ২০২০ সালের ১ জুলাই দেশে ভুট্টার মজুদ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৮০ হাজার টন। যা দিয়ে আগামী ৩০০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
গত তিন বছরের খাদ্যশস্য মজুদ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, করোনা মহামারি সত্ত্বেও চাল এবং গম এই দুটি প্রধান খাদ্যশস্যের মজুদই আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে অনেকে বেড়েছে। বিশেষ করে দেশে বর্তমানে গত তিন বছরের মধ্যে গমের সর্বোচ্চ মজুদ বিরাজ করছে। এই অবস্থা ভুট্টার ক্ষেত্রেও। গত তিন বছরের মধ্যে দেশে ভুট্টার মজুদও সর্বোচ্চ অবস্থায় আছে। ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে গত তিন বছর ধরেই ভুট্টার মজুদ বেড়েই চলেছে।
মজুদ খাদ্যশস্য দিয়ে কত দিন চলবে তা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩০ দিন হিসাবে মাস ধরলে চালের বর্তমান মজুদ দিয়ে আগামী ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। আর গমের মজুদ দিয়ে চাহিদা পূরণ করা যাবে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ভুট্টা দিয়ে চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। ফলে বলা যায়, বর্তমান মজুদ দিয়ে সহজেই চলতি ক্যালেন্ডার বছর ২০২০ সালের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। কারণ ডিসেম্বরের মধ্যেই এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আউশ এবং আমন ধান। প্রণোদনা দেওয়ার কারণে এ-বছর ২ লাখ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ বেশি হয়েছে। তবে বন্যায় কিছু পরিমাণ আউশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে দেশে আউশ ধান কাটা চলছে। আর ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন আমন ধান কৃষকের গোলায় উঠবে। তবে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন আবাদ। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও চার-দফা বন্যার কারণে দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে আমন আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উঁচু এলাকায় আমন আবাদ ভালো হয়েছে।
উল্লেখ্য, বোরো মৌসুমে এক-দফা সময় বাড়িয়ে সরকার ২ লাখ ২০ হাজার টন ধান ও ৭ লাখ ৬৭ হাজার টন চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে। সরকারের এ-বছরের লক্ষ্য ছিল ৮ লাখ টন ধান এবং ১১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল ক্রয়। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য এ-বছর ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৮ লাখ টন করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি খাদ্যশস্য মজুদ ২০১৮-১৯ সালের চেয়ে কমে গেলেও ভয়ের কিছু নেই। কারণ বর্তমানে বাজারে চাল ও গমের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। চালের দাম দফায় দফায় বেড়েছে মূলত চাল ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে। চালের দাম বেশি থাকলেও বাজারে কোনো ঘাটতি নেই। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল এবং গমের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে বোরো চাল উৎপাদন ৬.৫ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে। মোট চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টন। যা দিয়ে বছরের চাহিদা পূরণের পরও ৬৪ লাখ টন উদ্বৃত্ত রয়েছে। গমের উৎপাদনও গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল গত বছর। এ-বছর সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৪৭ হাজার টন গম উৎপাদন হয়েছে। আর আমদানি হয়েছে ৫১ লাখ টনের বেশি। এই মজুদ চাহিদা পূরণের চেয়েও বেশি। যা দিয়ে খুব সুস্থিরভাবে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত চাহিদা মেটানো যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি মজুদ গত বছরের চেয়ে কমে এসেছে মূলত ধানের দাম বেশি থাকায়। এ-কারণে সরকারের চাল ও ধান সংগ্রহ অভিযান সফল হয়নি। তবে সরকারি মজুদ দেশের চাহিদা জোগানে কোনো প্রভাব ফেলে না। সরকারি ক্রয়ের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। এবার সরকারের সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এ-বছর কৃষক ধানের দাম ভালো পাচ্ছে। তবে এই সুবিধা পাচ্ছে মূলত বড় কৃষক, ফড়িয়া ও আড়তদাররা। যাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে ধান মজুদ আছে। কিন্তু প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে ধান না থাকায় এই বাড়তি দামের সুবিধা তারা পাচ্ছে না। ফলে দেশবাসীকে বেশি দামে চাল কিনে খেতে হচ্ছে।
গত ৪ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের কাছে মোট ১৩ লাখ ১৪ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল। এর মধ্যে ১০ লাখ টন চাল ও ৩ লাখ ১৪ হাজার টন গম রয়েছে। আর ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার ৪ লাখ ৮ হাজার টন চাল, ১ লাখ ১৭ হাজার টন গমসহ মোট ৫ লাখ ২৫ হাজার টন খাদ্যশস্য বিতরণ করেছে।
[সূত্র : জনকণ্ঠ]

Leave a Reply