২০২০ সালে নোবেল পেলেন যারা

Spread the love

উত্তরণ প্রতিবেদন: ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার (সুয়েডীয় : ঘড়নবষঢ়ৎরংবঃ) প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল, অনন্যসাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক তুলনারহিত কর্মকা-ের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তিতে অসাধারণ অবদান রাখার জন্য প্রতি বছর এই ৬টি ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় নরওয়ের অসলো এবং বাকিগুলো সুইডেনের স্টকহোম থেকে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালীন পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের ন্যায় জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠান না হলেও নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানে তিনজন
পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য এ বছর তিনজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পুরস্কার জয়ীরা হলেনÑ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোস, মার্কিন জ্যোতির্বিদ রেইনহার্ড গেঞ্জেল ও জার্মান পদার্থবিদ আন্দ্রিয়া ঘেজ। এর মধ্যে রজার পেনরোজ পেয়েছেন পুরস্কারটির অর্ধেক এবং বাকি দুজন পেয়েছেন বাকি অর্ধেকের অর্ধেক করে।
মহাবিশ্বের অন্যতম বিস্ময় কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে নতুন আবিষ্কারের গবেষণায় এ বছর পদার্থে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। মহাবিশ্বের অন্যতম বিস্ময় ব্ল্যাকহোলের গঠনে সাধারণ আপেক্ষিকতার ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কারে অর্ধেকটা পেয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রজার পেনরোজ। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেকটাই পাবেন তিনি। বাকি অর্থের অর্ধেক পাবেন জার্মানির মাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্সের গবেষক রাইনহার্ড গেনজেল ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দ্রেয়া ঘেজ। তারা দুজন আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অদৃশ্য এবং ভারী এক ধরনের বস্তু (সুপারম্যাসিভ কমপ্যাক্ট অবজেক্ট) আবিষ্কার করেছেন।
রসায়নে দুই নারী বিজ্ঞানী
এ বছর রসায়নবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দুই নারী। তারা হলেনÑ এমানুয়েলে কার্পেন্তিয়ের ও জেনিফার এ. দোদনা। দুজন পুরস্কারটির অর্ধেক অর্ধেক করে পেয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন মার্কিন ও একজন ফরাসি বিজ্ঞানী। জিনোম সম্পাদনার একটি পদ্ধতির বিকাশের জন্য তাদের যৌথভাবে ২০২০ সালে রসায়নের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস জানাচ্ছে, জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য তাদের যৌথভাবে এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হলো। তারা যৌথভাবে জিন সম্পাদনার জন্য সবচেয়ে কার্যকরী যে প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে; তার নাম সিআরআইএসপিআরস বা ক্যাস-৯ জেনেটিক ছুরি। এটি ব্যবহার করে গবেষকরা খুব সহজেই প্রাণী, উদ্ভিদ এবং অণুজীবের ডিএনএ পরিবর্তন করতে পারেন। তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি আমাদের জীবন ও বিজ্ঞানে ওপর যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে। এটি অবদান রাখছে নতুন ক্যানসার থেরাপিতে। এছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রোগ নিরাময়ের স্বপ্নকে সত্য করে তুলতে পারে এই প্রযুক্তি।
এমানুয়েল চারপেনটায়ার ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সের জুভিসি সুর অর্গে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালে প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউট থেকে পিএইচডি করা এমানুয়েল এখন জার্মানির রাজধানী বার্লিনে অবস্থিত ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য সায়েন্সেস অব প্যাথোজেনস-এর পরিচালক হিসেবে কর্মরত। জেনিফার এ দোনার জন্ম ১৯৬৪ সালে ওয়াশিংটনে। বোস্টনের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল থেকে ১৯৮৯ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এছাড়া হাওয়ার্ড হজেস মেডিকেল ইনস্টিটিউটের ইনভেস্টিগেটর হিসেবে দায়িত্বরত।

চিকিৎসায় তিনজন
চিকিৎসায় বিশেষ অবদানের জন্য এ বছরও তিন বিজ্ঞানীকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে মনোনীত করা হয়েছে। তারা হলেনÑ হার্ভে জে আল্টার, মিখায়েল হাউটন এবং চার্লস এম রাইস। আমেরিকান হার্ভি জে অল্টার একা পুরস্কারের অর্ধেক এবং অধ্যাপক চার্লস এম রাইস ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল হোগটন দুজনে মিলে পাবেন বাকি অর্ধেক। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আবিষ্কারের জন্য তারা ২০২০ সালের জন্য এই পুরস্কারে ভূষিত হলেন।
জুরি বোর্ড এও জানিয়েছে, তিনজনকে ‘রক্তজনিত হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নির্ধারিত অবদানের জন্য’ সম্মানিত করা হয়েছে। এটি একটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সমস্যা। যা সারাবিশ্বের মানুষের মধ্যে সিরোসিস এবং লিভারের ক্যানসার সৃষ্টি করে। নোবেলজয়ী এই তিন বিজ্ঞানী দুরারোগ্য হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বের করেছেন। যা থেকে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই এই ভাইরাস শনাক্ত এবং নতুন ওষুধ আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।

শান্তিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি)। সংঘাত ও যুদ্ধকবলিত এলাকাগুলোতে ক্ষুধা নিরসনে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সংস্থাটিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ‘বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি’ জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা সংক্রান্ত শাখা। ক্ষুধা ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত বিশ্বের বৃহত্তম সংস্থা এটি। এর সদর দপ্তর ইতালির রোমে। ২০১৯ সালে সংস্থাটি ৮৮টি দেশে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ডাব্লিউএফপি’র ৮০টিরও বেশি শাখা আছে। এগুলোর মাধ্যমে এই সংস্থা এমনসব মানুষকে সাহায্য করে, যারা নিজেদের ও পরিবারের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার উৎপাদন কিংবা আহরণ করতে অক্ষম।

অর্থনীতিতে পল আর মিলগ্রোম ও রবার্ট বি উইলসন
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ। তারা হলেনÑ পল আর মিলগ্রোম এবং রবার্ট বি উইলসন। নিলাম তত্ত্বের উন্নতি এবং নতুন নিলাম পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তাদের নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, নিলাম কীভাবে কাজ করে এবং দরদাতারা কেন একটি নির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করেন এই দুই অর্থনীতিবিদ শুধু তাই সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেনি, তারা পণ্যসেবা বিক্রির জন্য সম্পূর্ণ নতুন নিলাম পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছেন।
মিলগ্রোম এবং উইলসন দুজনই ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নিলাম পদ্ধতি নিয়ে তারা দীর্ঘদিন গবেষণা করে আসছিলেন। তাদের নতুন নিলামতত্ত্ব বিশ্বজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতা ও করদাতারা উপকৃত হয়েছেন।

সাহিত্যে মার্কিন কবি লুইস গ্লুক
সাহিত্যে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন কবি লুইস গ্লুক। সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্লুককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার সরল ও সৌন্দর্য্যময় ভ্রান্তিহীন কাব্যিক কণ্ঠস্বরের জন্য, যা ব্যক্তির অস্তিত্বকে সর্বজনীন করে তোলে। ১৯৪৩ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণকারী এ কবি লঙ আইল্যান্ডে বেড়ে ওঠেন। সারা লরেন্স কলেজ, উইলিয়াম কলেজ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেন। টেকনিকের অভিনবত্ব, সেন্সিটিভিটি তথা স্পর্শকাতরতা তার কবিতার অস্থিমজ্জায়। কবিতার শিল্প প্রকৌশলগত ভিন্নতার কারণে তিনি বহুল প্রশংসিত। ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য লুইস গ্লুক ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল’ পুরস্কার পান।
উল্লেখ্য, সুয়েডীয় বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইলের মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। নোবেল মৃত্যুর পূর্বে উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান। শুধুমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় অসলো, নরওয়ে থেকে। বাকি ক্ষেত্রে স্টকহোম, সুইডেনে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অর্থনীতি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে ১৯০১ সাল থেকে পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে; কিন্তু অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রদান শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালে। আলফ্রেড নোবেল তার উইলে অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল। প্রত্যেক বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেক একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক কিছু পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা।

গ্রন্থনা : রায়হান কবির

Leave a Reply