সরব হয়ে উঠছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন

Spread the love

উত্তরণ প্রতিবেদন: বিশ্ব মহামারিতে রূপ নেওয়ায় করোনা বা কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অন্যান্য পদক্ষেপের ন্যায় সব ধরনের অনুষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টে যায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রেক্ষাপট। তবুও অনলাইনে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে বিভিন্ন আয়োজন। ধীরে ধীরে মুখরিত হয়ে উঠছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন।
হঠাৎ করে ভয়াবহ করোনা মহামারিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে গোটাবিশ্ব। সেই সংকটও বাংলাদেশে পড়ে। মহামারি মোকাবিলায় বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে প্রভাব পড়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। বিভিন্ন টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় পুরনো অনুষ্ঠান। বেকার হয়ে পড়েন শিল্পী ও কলাকুশলীরা। এ পরিস্থিতিতে তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুস্থ শিল্পীদের জন্য দেওয়া হয় বিশেষ প্রণোদনা।
করোনায় তবু থেমে থাকে না সাংস্কৃতিক কর্মকা-। টেলিভিশনসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন শিল্পীরা। করোনা পরিস্থিতি দিন দিন স্বাভাবিক হতে শুরু করায় ক্রমেই সরব হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক অঙ্গন।
গত ১৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের ৫৭তম জন্মবার্ষিকী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আলোচনা সভা, শিশুদের স্ব-রচিত কবিতা পাঠ ও ছড়া আবৃত্তির আয়োজন করে। জাতীয় জাদুঘরে হাসুমণির পাঠশালার আয়োজনে সংগঠনের সভাপতি মারুফা আক্তার পপি’র সভাপতিত্বে এ দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রচিত ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ অবলম্বনে গোলটেবিল আলোচনা ও শেখ রাসেলের ভার্চুয়াল গ্যালারি উদ্বোধন করা হয়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘আঁকো তোমার স্বপ্ন’ শীর্ষক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ক্ষুদে শিশুশিল্পীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
২১ ও ২২ অক্টোবর বাউল সাধক ফকির লালন শাহ’র ১৩০তম তিরোধান উপলক্ষে ‘লালন স্মরণোৎসব, আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সাধুমেলা-২০২০’ অনুষ্ঠিত হয়। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় ফকির লালন শাহ-এর মাজারে নানা আয়োজন করোনা মহামারির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ও ইউনেস্কোর সহযোগিতায় দুদিনব্যাপী এই উৎসব ঢাকাসহ ৬৪ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে একযোগে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে আয়োজনের প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শত বাউলের অংশগ্রহণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের আয়োজন শুরু হয়। এরপর জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজিত হয় বাউল কর্মশালা। ভক্ত অনুরাগী বাউল শিল্পীরা অংশ নেন ‘বিশ্ব মানবতার মুক্তিতে লালন দর্শন’ শীর্ষক এক সেমিনারে। আন্তর্জাতিক এই সেমিনারে অনলাইনে যুক্ত হন দেশ-বিদেশের লালন গবেষকরা। বক্তারা লালনের সমাজ-ভাবনা ও বিশ্ব মানবতা বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। শিল্পী ফরিদা পারভিন, টুনটুন ফকির, ফ্রান্স বংশোদ্ভূত দেবরা জান্নাত, ফকির নহির শাহ, বাউল শফি ম-ল ও সমির বাউলসহ জাতীয় পর্যায়ের বাউল শিল্পীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় লালন সাঁইজির ভাববাণী। এলাহি আলমিন গো আল্লাহ, বাদশা আলম পানা তুমি, পাখি কখন যেন উড়ে যায়, ডুবে দেখ দেখি মন কি রূপ লীলাময়, ইত্যাদি গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা। এরপর সন্ধ্যায় বাউলকুঞ্জে প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের সুরের মূর্ছনা পরিবেশনের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের আয়োজন শেষ হয়।
দ্বিতীয় দিনে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। তারপর জাতীয় নাট্যশালায় ‘বাউল গান ও বাউল দর্শন’ বিষয়ক কর্মশালার অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে একই মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় প্রখ্যাত বাউল শিল্পীরা ফকির লালন সাঁইজির ভাববাণী পরিবেশন করেন। এমন মানব জনম, গুরুর চরণ অমূল্য ধন, যদি তরিতে বাসনা থাকে, ধন্য ধন্য বলি তারে, আঠারো মোকামের মাঝে, ইত্যাদি পরিবেশনার মধ্যে এই পর্বে অংশগ্রহণ করেন কাঙ্গালিনী সুফিয়ান, টুনটুন ফকির, বাউল মানিক দেওয়ান ও সমীর বাউলসহ বিভিন্ন বাউল সংগঠনের বাউল শিল্পীরা।
১৬ অক্টোবর স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের সকল সিনেমা হলগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। করোনা পরবর্তীতে সিনেমা হলগুলো খুলতে পেরে ব্যাপক সাড়া পড়তে শুরু করেছে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে। চলচ্চিত্র প্রযোজকরা করোনা পরিস্থিতিতে দর্শক না পাওয়ার শঙ্কায় নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এদিকে সরকার সিনেমা উন্নয়নের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে সিনেমা হল থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উপমহাদেশের প্রথম সংগ্রামী বীর নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-এর ৮৮তম আত্মাহুতি দিবস উপলক্ষে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ভালবাসা প্রীতিলতা’ চলচ্চিত্রের শুভ মহরত অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত হবে ‘ভালবাসা প্রীতিলতা’ চলচ্চিত্রটি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর তথ্য ভবনে চলচ্চিত্রটির শুভ মহরতে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এমপি।
উল্লেখ্য, বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের সময় তিনি ১৫ জন সশস্ত্র সদস্যের নেতৃত্ব দেন। ক্লাবে সাইন বোর্ডে লিখা ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’। ক্লাবটিতে হামলা দেওয়ার পর পুলিশের কাছে আটক হয় পুরো দলটি। পুলিশের কাছ থেকে আটক এড়াতে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করে দেশমাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসার অকৃত্রিম স্বাক্ষর রেখেছেন।
২৩ অক্টোবর দেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ও চর্চার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ২২০ দিন বন্ধ থাকার পর খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। জাতীয় নাট্যশালার মূল থিয়েটার হল, স্টুডিও থিয়েটার হল ও পরীক্ষণ থিয়েটার হল বিনা ভাড়ায় ব্যবহার করবে নাটকের দলগুলো। জাতীয় নাট্যশালার থিয়েটার হলগুলোর পাশাপাশি জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তন এবং সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনগুলো খুলে দেওয়া হয়। তবে নাটক মঞ্চায়ন করতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার শর্ত বেঁধে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ যত দিন না পর্যন্ত করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিন ছাড়া নাটক মঞ্চায়ন করতে পারবে না নাটকের দলগুলো। জাতীয় নাট্যশালার মূল থিয়েটার হলে সৈয়দ ওয়ালিউল্লার উপন্যাস অবলম্বনে মঞ্চায়িত হয় ‘উজানে মৃত্যু’, পরীক্ষণ থিয়েটার হলে ‘রাজার চিঠি’, স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ ইত্যাদি নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে করোনা মহামারির দীর্ঘ বন্ধের পর খুলল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দ্বার।
২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ১নং গ্যালারিতে ‘আর্ট এগেনেস্ট করোনা’ শীর্ষক মাসব্যাপী শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১১টা হতে সন্ধ্যা ৬টা।
৩০ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৬টায় সাধক আবদুল হালিম বয়াতির ৯১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সকল বন্ধ দরজা খুলে দেওয়ায় খুশি দর্শক, শিল্পী, কলাকুশলী ও সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টরা।

গ্রন্থনা : সোহাগ ফকির

Leave a Reply